ছবি আঁকা শিখেছি চারুকলায়। আর দেখতে শিখেছি এক বেদেনীর কাছে।দুইটা যে এক জিনিস না, এই সহজ কথাটা বুঝতে আমার লেগেছে পঁয়ত্রিশ বছর।
আমাদের বাড়িতে তিনজন মানুষ থাকতো। ঠিকানা এক, জগত তিনটা। বাবা থাকতেন অফিসে আর ভবিষ্যতের হিসাবে। মা বলতেন, তোর বাবা খারাপ মানুষ না, উনি খালি এই বাড়িতে থাকেন না। আর মা নিজে থাকতেন অন্য কোথাও। কোথায়, জিজ্ঞেস করার সাহস আমাদের কারো ছিলো না।
চারুকলায় চান্স পাওয়ার খবরে বাবা দীর্ঘশ্বাস ফেলেছিলেন। ওটা তার প্রত্যাশার হিসাবে তালগোল পাকাবার জন্য। আমার জন্য না।
ক্যানভাসের সামনে দাঁড়িয়ে টের পেতাম, আমি আসলে শিখছি মানুষের দিকে না তাকিয়ে বাঁচার কৌশল। ক্যানভাস প্রশ্ন করে না। কৈফিয়ত চায় না। দরজা খুলতে দেরি করে না।
সেকেন্ড ইয়ারে আমার প্রিয় রং ছিলো নীল। শিক্ষক জিজ্ঞেস করলেন, কেন? আমি সবজান্তার মতো বললাম, স্যার, দুনিয়ার সবচেয়ে দামি রং। রেনেসাঁর আলট্রামেরিন বানানো হতো ল্যাপিস লাজুলি পাথর গুঁড়িয়ে। পাথর আসতো আফগানিস্তানের খনি থেকে। উটের পিঠে, জাহাজের খোলে, ভেনিস ঘুরে। ওজন দরে সোনার চেয়ে দামি। মিকেলাঞ্জেলো ওই নীল কিনতে না পেরে আস্ত ছবি অসমাপ্ত ফেলে রেখেছিলেন। ভার্মিয়ার কিনতেন ধারদেনা করে। মরার সময় রেখে গেলেন এগারোটা সন্তান আর রুটিওয়ালার দেনা।
শিক্ষক আমার স্কেচখাতা উল্টেপাল্টে দেখলেন। বললেন, মুখস্থ বুলি আওড়ে ছবি হয় না রে বোকা ছেলে!
কথাটার মানে সেদিন বুঝিনি। বুঝেছি অনেক পরে, বংশী নদীর এক ঘাটে।
দ্বিতীয় প্রদর্শনীর তারিখ ঠিক। আর আমার হাত বন্ধ। মাসের পর মাস সাদা ক্যানভাস। তুলি ডোবাই, তুলে রাখি। ডকুমেন্টারি বানিয়ে হাত পাকানো বন্ধু কামরুল ফোন দিয়ে বললো, সাভার যাচ্ছি, বংশীতে বেদের বহর নামছে। চল্। সাপ দেখলে যদি তোর হাত খোলে।
গেলাম। ঘাটে গিয়ে প্রথম যা চোখে পড়লো তা সাপ না, নৌকা। সরু, লম্বা, কালচে খোল। ছইয়ের নিচে একেকটা আস্ত সংসার। মাটির চুলা, হাঁড়িকুড়ি, দড়িতে শাড়ি, গলুইয়ে বাঁধা মোরগ। জলের ওপর একটা ভাসমান গ্রাম। কামরুল ক্যামেরা তুলতেই ছেলেপুলেরা ঘিরে ধরলো। আর মেয়েরা মুখ ফিরিয়ে নিলো। যাদের ছবি লোকে না জিজ্ঞেস করে তোলে, ক্যামেরা দেখলে তারা মুখ ফেরায়।
পদ্মাকে প্রথম দেখি ঘাটের সিঁড়িতে। কাঁধে বেতের ঝাঁপি, রোদে পোড়া তামাটে রং, হাত ভর্তি রুপালি চুড়ি। চোখে এমন সটান ভঙ্গি, যেন পৃথিবীর কারো কাছে তার কোনো দেনা নেই। কাছে এসে ঝাঁপি নামিয়ে বললো, ভাইজান, তাবিজ লাগবো? সাপের নজর, বিছার কামড়, ব্যবসায় মন্দা, বউয়ের মন উদাস?
বললাম, আমার বউ নাই।
সে চোখও তুললো না। বললো, ওই দুঃখের তাবিজ আমরা বানাই না।
কামরুল হেসে ফেললো। আমি পারলাম না। আমি তখন মেয়েটার হাত দেখছি। ঝাঁপির ঢাকনায় রাখা স্থির, লম্বা আঙুলের হাত। সাপ ধরা হাতের একটা নিজস্ব স্থিরতা থাকে। আমার হাতে ওই স্থিরতা নেই। ছয় মাস ধরে নেই।
দুপুরে ঘাটের পাশে খেলা বসলো। পদ্মা ডুগডুগি বাজায়। ঝাঁপি থেকে ফণা তোলে গোখরা। ভিড় জমে, পয়সা পড়ে। খেলা শেষে একটা লোক দশ টাকার নোট এমনভাবে ছুড়লো যে নোটটা গিয়ে পড়লো ধুলায়। পদ্মা নোটটা তুললো। ধুলা ঝাড়লো। ট্যাঁকে গুঁজলো। মুখের একটা রেখাও কাঁপলো না। আমি কামরুলকে বললাম, দেখলি? সে বললো, কী? বললাম, কিছু না। কিছু জিনিস ক্যামেরায় ওঠে না।
বিকেলে দূর থেকে ওর একটা স্কেচ করলাম। কীভাবে যেন টের পেয়ে গেলো। সটান হেঁটে এসে খাতাটা টেনে নিলো। অনেকক্ষণ দেখলো। তারপর রায় দিলো, সাপটা মরা।
মানে?
আপনে সাপ আঁকছেন ডরাইয়া। ডর দিয়া সাপ হয় না, হয় দড়ি।
চারুকলার শিক্ষক যে কথা পনেরো বছরে বোঝাতে পারেননি, নিরক্ষর এক বেদেনী তা বুঝিয়ে দিলো এক বাক্যে। সেই সন্ধ্যায় আমি ঢাকায় ফিরলাম না। পরের সন্ধ্যায়ও না। কামরুল ফুটেজ নিয়ে ফিরে গেলো। আমি বাজারে এক ডেকোরেটরের দোকানের ওপরের টিনশেড ভাড়া নিলাম।
বহরের সবচেয়ে পুরনো মানুষ পদ্মার দাদি। উনার নৌকার ছইয়ে আমার দিন কাটতে লাগলো। শুনলাম, ওদের নিজেদের ভাষা আছে। নাম ঠার। হরফ নেই, ব্যাকরণ নেই। মুখে মুখে বেঁচে আছে শত শত বছর। ডাঙার লোক কাছে এলে ওরা ঠারে চলে যায়। দাদি বললেন, জমিজমা তো নাই বাজান। ভাষাটাই আমাগো শেষ ভিটা। ওই ভিটায় কেউ ঢুকবার পারে না।
শুনলাম ওদের আসার গল্প। সন ধরে বলে ওরা, ষোলোশো আটত্রিশ। আরাকানের রাজা বল্লালের সঙ্গে পূর্বপুরুষ এসেছিলো বিক্রমপুরে। রাজা হারালো রাজত্ব, ওরা হারালো ডাঙা। সেই থেকে জলে জলে। ইতিহাস না কিংবদন্তি, জানি না। তবে যে জাতির ঘর নেই, তার একটা পুরনো তারিখ লাগে। নোঙরের মতো। মাটিতে না হোক, সময়ের গায়ে তো বাঁধা থাকা যায়।
ওদের ঘরের নিয়মও উল্টো। মেয়েরা ভোরে ঝাঁপি নিয়ে গ্রামে গ্রামে যায়। সিঙা লাগায়, দাঁতের পোকা ফেলে, তাবিজ বেচে, সাপ খেলায়। পুরুষরা নৌকা সামলায়, জাল ফেলে, সাপ ধরে। পদ্মা বললো, আপনেগো ঘরে মাইয়ারা ভাত রান্ধে। আমাগো ঘরে মাইয়ারা ভাত জোগায়। কথায় অহংকার নেই, অভিযোগও নেই। মানুষ যেভাবে নদী দেখিয়ে বলে, এইটা নদী।
সন্ধ্যায় দাদি বিড়ি ধরিয়ে বেহুলার গল্প বলেন। ওরা মুসলমান, নামাজ রোজার খবর রাখে। অথচ সাপের মন্ত্রে আজও বিষহরির নাম। লোহার বাসরঘরে সুচের মতো ছিদ্র। লখিন্দরের নীল শরীর। ভেলায় গাঙুড় পেরোনো এক নববধূ। দাদি বলেন, সাপের বিষের অষুধ আছে রে বাজান। কপালের বিষের অষুধ নাই। বেহুলা হেই কপাল লইয়া ভাসছিলো। আমরাও হেই থিকা ভাসতেছি।
পদ্মা নামটাও মনসারই আরেক নাম। পদ্মাবতী। জেনে চমকে গেলাম। বললাম, দেবীর নামে নাম, অথচ তুমি সাপ ধরো। ভয় করে না? সে হাসলো। দেবীর লগে ঘর করলে ডর কিসের। ডর তো আপনেগো, যারা দেবীরেও দেয়ালে বান্ধা রাখেন।
এই মেয়ের সঙ্গে তর্কে পারা যায় না। আমি চাইতামও না। হেরে যাওয়ার লোভেই প্রশ্ন করতাম।
আমার হাত ততদিনে খুলে গেছে। খাতার পর খাতা ভরে ওঠে। নৌকার গলুই, ঝাঁপির বেত, ভাটির টানে হেলে থাকা লগি, ধোঁয়ার ভেতর রান্না করা কিশোরী। আর প্রতিটা খাতার মার্জিনে, বারবার, একই মুখ। আঁকি, কেটে দিই, আবার আঁকি। ভার্মিয়ারের নীলের কথা মনে পড়ে। কিছু রং মানুষ দেনা করে কেনে।
একদিন দুপুরে পদ্মা আমার সামনে ঝাঁপি খুলে বসলো। বললো, হাত পাতেন।
কী?
হাত পাতেন। আপনের হাত কাঁপে, দেখছি আমি। যেই হাত কাঁপে, হেই হাতে তুলি চলে কেমনে?
ঝাঁপি থেকে যেটা বের হলো সেটা দাঁড়াশ। বিষ নেই। কিন্তু আমার শরীর সে খবর জানে না। ঠান্ডা, মসৃণ, জ্যান্ত একটা ভার নামলো দুই হাতের ওপর। আমি পাথর। পদ্মা নিচু গলায় বললো, মুঠ কইরেন না। সাপরে চাইপা ধরলে হে পলাইতে চায়। ভার রাখতে দিলে থাকে। মানুষও তাই।
শেষ কথাটা সে সাপের দিকে তাকিয়ে বলেছিলো, নাকি আমার দিকে, আজও জানি না। শুধু জানি, ওই দুপুরের পর আমার হাত আর কাঁপেনি।
ভালোবাসা কীভাবে হলো, হিসাব দিতে পারবো না। ওই হিসাব প্রেমিকরা রাখে না। শুধু জানি, আমি ওর কাছে রং শিখতে শুরু করলাম। চারুকলার পাঁচ বছরে যা শিখিনি। ও চেনালো শঙ্খিনীর হলুদ, কালো জমিনে যে হলুদ জ্বলে হ্যাজাক বাতির মতো। চেনালো ঢোঁড়ার পিঠের জলপাই, ভরা বর্ষার ঘোলা জল। আর এক গোধূলিতে চেনালো গোখরার ফণার ভেতরের দিক। মরা আলোয় ধূসর, বাদামি, তার সঙ্গে এমন এক আভা, যার পাশে আমার সব টিউবের রং জোলো। তিন সপ্তাহ ওই রং বানানোর চেষ্টা করলাম। প্যালেটে ঝুঁকে থাকি, মেশাই, মুছি। হয় না। পদ্মা হাসে। বলে, ওই রঙের নাম আছে আমাগো ঠার ভাষায়।
বলো।
না।
কেন?
যেই ভাষার হরফ নাই, হেই ভাষার শব্দ ধার দিলে আর ফেরত পাওয়া যায় না। আপনেরা নিয়া যান, তারপর নিজের নামে চালান।
এক সন্ধ্যায় ওকে ভ্যান গঘের গল্প শোনালাম। সূর্যমুখীর সেই বিখ্যাত হলুদ, ক্রোম ইয়েলো, ছিলো কারখানার সস্তা রং। দেড়শো বছর আলো খেতে খেতে সেই হলুদ এখন জাদুঘরের দেয়ালে কালচে হয়ে যাচ্ছে। ফেরানোর উপায় নেই। পদ্মা মন দিয়ে শুনলো। বললো, রংও তাইলে মরে। বললাম, মরে। সে ঝাঁপির দিকে তাকিয়ে বললো, খালি সাপে জানে বাঁচনের কায়দা। চামড়া পুরান হইলে খোলস ছাইড়া দেয়। জানেন, খোলস ছাড়তে না পারলে সাপ কানা হইয়া যায়? চোখের পর্দাটাও তো খোলসের লগেই যায়। পুরানটা না ছাড়লে নতুন চোখ ফোটে না।
সেই রাতে ঘুম হলো না। বারবার মনে হলো, আমি পঁয়ত্রিশ বছর ধরে একটা পুরনো খোলসের ভেতরে বসে আছি। আর আস্তে আস্তে কানা হয়ে যাচ্ছি।
মায়ের কথাটা পদ্মাকেই প্রথম বললাম। কাউকে বলিনি কোনোদিন। বাবাকেও না। ক্লাস ফোরে পড়ি তখন। স্কুল থেকে ফিরে অনেকক্ষণ কড়া নাড়ার পর মা দরজা খুললেন। ঠোঁটে তাড়াহুড়ায় মোছা লিপস্টিক, কপালের টিপ সামান্য বাঁকা। ভেতরের ঘরে অচেনা সিগারেটের গন্ধ। বাবা সিগারেট খেতেন না। আর সে সপ্তাহে তিনি চট্টগ্রামে। মা আমার হাতে চব্বিশ শেডের একটা রংপেন্সিলের বাক্স দিয়ে বললেন, কাউকে বলিস না বাবা। তুই তো আমার লক্ষ্মী ছেলে।
সেদিনই প্রথম টের পেয়েছিলাম, রঙের একটা দাম আছে। আর সে দাম সবসময় টাকায় শোধ হয় না।
পদ্মা সব শুনে অনেকক্ষণ চুপ। তারপর জিজ্ঞেস করলো, আপনের মায়েরে আপনে আঁকছেন কোনোদিন?
না।
ক্যান? ডরান?
উত্তর দিতে পারলাম না। সে নিজেই বললো, আপনের মায়ের কথা শুইনা আমার ঘিন্না লাগলো না। মায়া লাগলো। মানুষটা ভুল ঘরে আছিলো। বাইর হওনের সাহস পায় নাই। খাঁচার পাখি আর ঝাঁপির সাপ, দুইটার কষ্ট এক না। সাপ জানে, ঢাকনা খুললেই হে যাইতে পারবো। পাখি জানে, দুয়ার খুইলা দিলেও তার ডানায় আর জোর নাই।
এত সহজ ক্ষমা আমি জীবনে দেখিনি। যেটা আমি পঁচিশ বছরে পারিনি, বাইরের একটা মেয়ে করে দিলো দুই মিনিটে। সম্ভবত ওই মুহূর্তেই ঠিক করে ফেললাম, এই মেয়েকে ছাড়া আমার চলবে না।
কিন্তু গল্পটা এখানে আর আমার একার থাকলো না।
ঘাটের ইজারা সে বছর নতুন হাতে গেছে। হাশেম ব্যাপারী। ধবধবে পাঞ্জাবি, কড়া আতর, বালুর ব্যবসা। আর হাসিমুখে কথা বলার অসামান্য ক্ষমতা। চায়ের দোকানে আমাকে দেখলেই ডেকে বসান। শহরের শিল্পী বলে আলাদা খাতির। একদিন চায়ে চুমুক দিয়ে খুব নরম গলায় বললেন, ভাই, একখান কথা কই, কিছু মনে নিয়েন না। ভদ্রঘরের পোলা আপনে। বাইদ্যাগো লগে এত মিশা ভালা না। অগো মাইয়ারা বাণ মারতে জানে। কত ভালা পোলা শেষ হইয়া গেলো।
হেসে বললাম, আমার শেষ হওয়ার কিছু নাই।
উনি হাসিটা ধরে রাখলেন। কিন্তু চোখটা এক মুহূর্তের জন্য অন্যরকম হয়ে গেলো। ওই চোখ আমি পরে বহুবার আঁকার চেষ্টা করেছি। পারিনি। ঘৃণা আঁকা সহজ। ওটা ঠিক ঘৃণা ছিলো না।
উত্তরটা পেলাম দাদির কাছে। হাশেম ব্যাপারীর নাম শুনে বুড়ি অনেকক্ষণ চুপ। তারপর বললেন, ওর দাদিরে চিনতাম। ফুলবানু। আমাগো বহরেরই মাইয়া। ডাঙার এক গিরস্তের লগে ভাইগা গিয়া সংসার পাতছিলো। পোলাপানরা বড় হইয়া মায়ের জাত লুকাইলো। হুনছি, হাশেমরে ছোটবেলায় ইস্কুলে খেপাইতো। বাইদানির নাতি, বাইদানির নাতি। বুড়ি বিড়িতে লম্বা টান দিলেন। বললেন, মানুষ সবচাইতে বেশি ঘিন্না করে হেই জিনিস, যেইটা তার নিজের রক্তে থাকে। সাপ খোলস ছাইড়া পিছনে ফিরাও চায় না। মানুষ পারে না। মানুষ রোজ রাইতে তার পুরান খোলসের কাছে ফিরা যায়। আর ডরায়।
সেদিন বুঝলাম, এই ঘাটের সমস্যা বালুর না। হাশেম ব্যাপারীর বৈঠকখানার জানালা দিয়ে রোজ সকালে বহরটা দেখা যায়। ওই বহর তার আয়না। আয়না কেউ পাশের বাড়িতে সহ্য করে না।
শুরুটা হলো খুব নিরীহভাবে। প্রথমে সাইনবোর্ড। ঘাট সংস্কার হবে, উন্নয়ন। তারপর প্রস্তাব। খাসজমিতে পুনর্বাসন, টিনের ঘর, প্রশিক্ষণ। বহরের মোড়ল হাতজোড় করে বললো, আমরা জলের মানুষ। ডাঙায় আমাগো ঘুম হয় না। হাশেম ব্যাপারী হাসিমুখে ফিরে গেলেন। রাগ করলেন না। যারা গভীরভাবে ক্ষতি করতে জানে, তারা রাগে না।
তারপর বাজারে গুজব নামলো। কে ছড়ালো কেউ জানে না। বেদেরা নাকি বাচ্চা ধরে। শহরে বেচে। কোন গ্রামের কোন খালার বোনের দেবরের ছেলে নাকি হারিয়েছে ঘাটের কাছে। গুজবের এই এক স্বভাব। তার বাপ মায়ের পরিচয় লাগে না, খালি মামা লাগে। আর মামার নামটা কেউ মুখে আনে না। শুধু চায়ের দোকানদার একদিন ফিসফিস করে বললো, ভাইজান, যেই মুখগুলা কথাডি রটাইতেছে, হেগো চা বিলের খাতা কিন্তু একটাই।
এক রাতে থানার লোক এলো। বন্যপ্রাণী আইন, দুই হাজার বারো সাল। সাপ ধরা নিষেধ, পোষা নিষেধ, খেলা দেখানো নিষেধ। তিনটা ঝাঁপি নিয়ে গেলো। সঙ্গে দুইজন পুরুষ। আইনটা মিথ্যা না। আর ওইটাই এই চালের সবচেয়ে মজবুত জায়গা। দাদি সেই রাতে বললেন, আগে সাপের বিষে মানুষ মরতো। অখন আইনের বিষে বহর মরে। যেই দ্যাশে সাপ বাঁচানির আইন আছে, হেই দ্যাশে সাপুইড়া বাঁচানির আইন নাই।
তারপর এক হাটবারের রাতে ঘাটের অন্ধকারে জ্বলে উঠলো মশাল। গুজব তখন টনটনে পাকা ফোঁড়া, খালি খোঁচার অপেক্ষা। কারা যেন খোঁচাটা দিলো। শ দেড়েক লোক, লাঠি, টর্চ, চিৎকার। ভাঙচুর হলো। দুইটা নৌকায় আগুন। মানুষ মরেনি, এইটুকুই। ভোরে পুলিশ এসে দুই পক্ষকে শান্ত থাকতে বলে গেলো। যে পক্ষের ঘর পুড়েছে, তাকেও।
খবর পেয়ে ছুটে গেলাম। পদ্মা পোড়া নৌকাটার সামনে দাঁড়িয়ে। কাঁদছে না। মুখে সেই দশ টাকার নোট তোলার দিনের ভঙ্গি। আমাকে দেখে শুধু বললো, দ্যাখেন, আগুনের কতগুলা রং। এই রংগুলা আপনের বাক্সে আছে?
আমি ওর হাত ধরলাম। বললাম, চলো। ঢাকায় চলো। বিয়ে করবো। ঝাঁপি ছাড়তে হবে না। কিছু ছাড়তে হবে না। কিন্তু এখানে আর না।
পদ্মা অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলো। তারপর খুব ধীরে হাতটা ছাড়িয়ে নিলো। বললো, আপনে অহনো বোঝেন নাই। দোষ আপনের না। ঝাঁপির ভিতরে সাপ যতোদিন, খেলা ততোদিন। ঝাঁপি ঘরে সাজাইয়া রাখলে ওইটা হয় শোপিস। আমি আপনের ঘরে গিয়া শোপিস হইতে পারুম না। আর বহর বিপদে থাকলে বহরের মাইয়া বহর ছাড়ে না। এই নিয়ম ভাঙলে আমি আর আমি থাকি না। আপনে তো আমারেই চান, নাকি?
শেষ প্রশ্নটার উত্তর হয় না। দিলে মিথ্যা। না দিলে বিদায়।
বহর নোঙর তুললো তিন দিন পরে। শেষরাতে, ভাটার টানে। আমাকে কেউ খবর দেয়নি। ভাসমান মানুষের প্রতিবাদের ভাষা একটাই। নোঙর তোলা। সকালে ঘাটে গিয়ে দেখি ধু ধু জল, পোড়া নৌকার কালো কঙ্কাল। আর কিছু নেই। কোথায় গেছে, কেউ জানে না। যাদের ঠিকানা নেই, তাদের নতুন ঠিকানাও থাকে না।
শুধু ঘাটের বাঁশের খুঁটিতে লাল সুতায় বাঁধা একটা জিনিস। সাপের খোলস। আস্ত, স্বচ্ছ, দাঁড়াশের। যে ভয়টা সে আমার হাত থেকে তুলে নিয়েছিলো, এইটা বোধহয় তার রসিদ।
হাশেম ব্যাপারীর সঙ্গে শেষ দেখা চায়ের দোকানে। উনিই ডাকলেন। চা খাওয়ালেন। আফসোস করলেন, দেখলেন তো ভাই, পাবলিকরে বিশ্বাস নাই। কত কইলাম শান্ত থাকতে। যাউকগা, ঘাটটা অহন ভালা কামে লাগবো ইনশাল্লাহ। উনার পাঞ্জাবি থেকে আসছিলো কড়া আতরের গন্ধ। আতরের একটা গুণ আছে। অনেক কিছুর গন্ধ চাপা দিতে জানে। কেরোসিনেরও পারে কি না, জানি না। গন্ধের সাক্ষ্য আদালতে চলে না। কাপটা নামিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দুই পা গিয়ে ফিরে তাকালাম। ব্যাপারী সাহেব, ফুলবানু নামটা কিন্তু সুন্দর।
মানুষটার মুখ থেকে হাসি মুছে যেতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো। ওই কয়েক সেকেন্ডই আমার প্রতিশোধ। এর বেশি ক্ষমতা শিল্পীর নেই। আমরা বড়জোর মানুষের খোলসের গায়ে আঙুল রাখতে পারি।
ঢাকায় ফিরে ছয় মাসে ছবিগুলো আঁকলাম। প্রদর্শনীর নাম, খোলস। উনিশটা ক্যানভাস। জলের ওপর ভাসমান গ্রাম। ঝাঁপির অন্ধকারে জেগে থাকা একজোড়া চোখ। ধুলায় পড়ে থাকা দশ টাকার নোট। পোড়া গলুই। আর ফণার ভেতরের সেই রং। বুড়ো সমালোচক এলেন, ঘুরলেন, একেকটা ছবির সামনে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলেন। যাওয়ার আগে কাঁধে হাত রেখে বললেন, এইবার ঘামের গন্ধ পাইতেছি। এক ক্রেতা জানতে চাইলেন, সাত নম্বর ছবির প্রধান রংটার নাম ক্যাটালগে নেই কেন। বললাম, রংটার নাম এমন এক ভাষায়, যে ভাষার হরফ নাই। ভদ্রলোক ভাবলেন রসিকতা করছি। ছবিটা উনিই কিনলেন।
বিশ নম্বর ক্যানভাসটা প্রদর্শনীতে ছিলো না। ওটা আমার ঘরে, দেয়ালের দিকে মুখ করানো। মায়ের মুখ, ক্লাস ফোরের সেই দুপুরের। বাঁকা টিপ, তাড়াহুড়ায় মোছা লিপস্টিক। আর চোখে সেই জিনিস, যা দেখতে আমার পঁচিশ বছর লেগেছে। ঘৃণা না, ছলনা না। নিজের খোলসে আটকা পড়া একটা মানুষের ক্লান্তি। খাঁচার পাখির চোখ।
মা বেঁচে আছেন। বাবাও। এখনো এক ঠিকানায় তিনটা আলাদা জগত। ছবিটা মাকে দেখাইনি। দেখাবোও না হয়তো। কিছু ছবি দেখানোর জন্য আঁকা হয় না। আঁকা হয় ক্ষমা করার জন্য।
খোলসটা রেখেছি সেই চব্বিশ শেডের টিনের বাক্সে। রংপেন্সিলগুলো ক্ষয়ে গেছে কবে। বাক্সটা রয়ে গেছে। মাঝে মাঝে খোলসটা বের করে জানালার আলোয় ধরি। শুকনা, ওজনহীন, স্বচ্ছ। ভেতরে সাপ নেই। তবু ফণার ভঙ্গিটা রয়ে গেছে।
পদ্মা বলতো, পুরান খোলস না ছাড়লে নতুন চোখ ফোটে না।
আমার নতুন চোখ ফুটেছে। সমস্যা একটাই। এই চোখ এখন যেদিকে তাকায়, জল দেখে। আর প্রতিটা জলের ওপর খোঁজে সরু, লম্বা, কালচে খোলের কয়েকটা নৌকা। ছইয়ের নিচে সংসার। গলুইয়ে বাঁধা মোরগ। আর ঝাঁপির অন্ধকারে ঘুমিয়ে আছে ধৈর্যশীল, প্রাচীন, ঘরহীন এক দেবী।
২০/৭/২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন