শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

পানকৌড়ি ~ তাইমুর মাহমুদ শমীক

যেদিন আমি মরে গেলাম, সেদিন ভোরে মিতু ভাত খেতে চেয়েছিল।
ভাত ছিল না। আগের রাতের দুইটা শক্ত রুটি ছিল। পানিতে ভিজিয়ে নরম করে দিলাম। ও খেলো। খেয়ে জিজ্ঞেস করল, মা, তুমি খাবা না?
বললাম, আমার পেট ভরা।
মায়েদের পেট কীভাবে ভরে, এই রহস্য মিতু বড় হয়ে বুঝবে। এখন ওর বয়স পাঁচ।
আমার বয়স উনত্রিশ। এই বয়সেই আমি একবার বউ হয়েছি, একবার মা হয়েছি, একবার ডিভোর্সি হয়েছি। আর একবার মরে গেছি। সবগুলোর গল্প আজ বলব। ধৈর্য ধরে শোনেন।
উনিশ বছর বয়সে আমার বিয়ে হয়। ইন্টার পরীক্ষার রেজাল্টও তখন বের হয়নি। বাবা বলেছিলেন, মাইয়া মানুষের রেজাল্ট দিয়া কী হইব! ঘর হইলেই হইল। পাত্র রাশেদ। ইলেকট্রিকের দোকান আছে নবাবপুরে। ফর্সা, লম্বা। দেখতে আসার দিন আমার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। ওই একটা হাসি দেখে আমি ভেবেছিলাম, মানুষটা ভালো।
উনিশ বছর বয়সে মেয়েরা হাসি দেখে মানুষ চেনে। চিনতে ভুল করে।
প্রথম প্রথম রাশেদ ভালোই ছিল। রাতে ঘরে ফিরে আমার ভেজা চুলের গন্ধ নিত। বলত, তোর চুলে নদীর গন্ধ। আমি লজ্জা পেতাম। কুপির আলোয় আমাদের ছায়া এক হয়ে যেত দেয়ালে। ওর বুকের ভেতর আমি টের পেতাম একটা নদী, জোয়ারে ফুলে উঠছে। আমার শরীর তখন পলিমাটি। যা বুনে দেওয়া হতো, তাই ফলাতে চাইত।
মিতু এলো দুই বছরের মাথায়।
মেয়ে হয়েছে শুনে রাশেদ হাসপাতালে আসেনি। এসেছিল তার মা। নাক কুঁচকে বলেছিলেন, প্রথমটাই মাইয়া। কপাল।
সেদিন থেকেই সংসারটা বদলাতে শুরু করল। নাকি রাশেদ বদলাল। নাকি ও এরকমই ছিল, শুধু আমার চোখে পড়েনি।
রাশেদের বাবাকে আমি দেখেছি মাত্র কয়েকবার। মুখ ভর্তি পান, চোখে সবসময় একটা বিরক্তি। শাশুড়ি বাঁ কানে উনি কম শুনতেন। কেন, সেটা একদিন ননদের কাছে শুনেছি। রাশেদের বয়স যখন সাত, ওর বাবা ভাত ঠান্ডা হওয়ার অপরাধে ওর মাকে কানের ওপর মেরেছিলেন। ছেলেরা দেখেছে। কেউ কাঁদেনি। কাঁদলে বাপ বলতেন, মাইয়াগো লাহান কান্দস ক্যা?
রাশেদ বড় হয়েছে এই পাঠশালায়। ওর কাছে সংসার মানে একটা দোকান। বউ মানে কর্মচারী। বেতনের বদলে ভাত পায়। আর ভুল করলে হাত ওঠে। আমি ওকে এখন আর পুরোপুরি দোষ দিই না। মানুষ যা দেখে বড় হয়, তাই হয়ে ওঠে। কিন্তু দোষ না দেওয়া এক কথা আর মাফ করা আরেক কথা। মাফ আমি করিনি।
প্রথম চড়টা খেয়েছিলাম মিতুর ছয় মাস বয়সে। তরকারিতে লবণ বেশি হয়েছিল। চড় খেয়ে আমি এতই অবাক হয়েছিলাম যে কাঁদতেও ভুলে গেছি। রাশেদ ভাত খেতে খেতে বলল, মায়ে ঠিকই কইছিল। শিক্ষিত মাইয়া আনলে সংসার হয় না।
তারপর চড় ব্যাপারটা লবণের মতোই রোজকার অভ্যাসে পরিণত হলো।
বাপের বাড়ি থেকে টাকা আনতে বলত। বাবা রিটায়ার্ড মানুষ, কোথায় পাবে? না আনলে বলত, খানকির ঘরের খানকি, বইসা বইসা আমার ভাত গিলস, বাপের কাছ থেইকা দুইটা টাকা আনতে পারস না? আমি মিতুর কান চেপে ধরতাম। যেন গালিটা মেয়েটার ভেতরে ঢুকতে না পারে। এখন বুঝি, লাভ হয়নি। এই দেশে মেয়েদের কানে এসব ঢোকে বাতাসের সাথে।
শেষ দিনটার কথা বলি।
মিতুর তখন সাড়ে তিন বছর। রাশেদ সেদিন দোকানের ক্যাশ থেকে টাকা হারিয়ে ফিরেছে। রাগটা ঝাড়ল আমার চুলে। মুঠি পেঁচিয়ে ধরে টানতে টানতে বলল, ক, টাকা তোর বাপে নিছে? আমার সেই চুল, যাতে ও একদিন নদীর গন্ধ পেত। মিতু দৌড়ে এসে বাবার পা জড়িয়ে ধরল। রাশেদ এক ঝটকায় মেয়েটাকে ছুড়ে ফেলল। মিতুর কপাল গিয়ে লাগল চৌকির কোনায়।
রক্ত আমি অনেক দেখেছি। নিজের ঠোঁটের। নিজের নাকের। কিন্তু মেয়ের কপালের রক্ত দেখে আমার ভেতরে কী যেন ছিঁড়ে গেল। আমি উঠে দাঁড়ালাম। রাশেদের চোখে চোখ রেখে বললাম, আর না।
কাবিননামার আঠারো নম্বর ঘরে আমার তালাকের অধিকার লেখা ছিল। বিয়ের রাতে কাজি সাহেব পড়ে শুনিয়েছিলেন। কেউ শোনেনি। আমি শুনেছিলাম। ওই এক লাইনের জোরে আমি বের হয়ে এলাম। রাশেদ ভাবেনি আমি পারব। মহল্লার কেউ ভাবেনি। আমি নিজেও কি ভেবেছিলাম?
লোকে বলে ডিভোর্স দিলে মেয়েদের সব শেষ। মিথ্যা কথা। ডিভোর্সের পর মেয়েদের সব শুরু। যুদ্ধটা শুরু।
প্রথমে গেলাম বাপের বাড়ি। মা দরজা খুলে প্রথম যে কথাটা বললেন, তা হলো, মাইনষে কী কইব?
মানুষ। এই দেশে মায়ের চেয়ে মানুষ বড়, মেয়ের চেয়ে মানুষ বড়।
ভাইয়ের সংসার তখন টানাটানির। ভাবি খারাপ মানুষ না, কিন্তু চার কেজি চালের হাঁড়িতে ছয়জনের ভাত হয় না। আমি বুঝতাম। রাতে শুনতাম ভাবি ভাইকে বলছে, বইনরে কিছু কও না ক্যা? বাবা সারাদিন উঠানে বসে থাকতেন। আমার দিকে তাকাতেন না। ওনার চোখে আমি মেয়ে না, আমি একটা প্রশ্ন। পাড়ার লোকে যে প্রশ্নটা করে, ওই মাইয়া ঘরে বইয়া রইছে ক্যা?
দুই মাসের মাথায় মা একটা সম্বন্ধ আনলেন। পঞ্চান্ন বছরের এক ব্যবসায়ী। আগের বউ মরেছ। চার ছেলেমেয়ে। মা বললেন, মাইয়া লইয়া সংসার করব। রাজি হইছে। এর চাইতে ভালো আর কী পাবি?
আমি সেই রাতে মিতুকে বুকে নিয়ে ভাবলাম। আমার দাম চুকিয়ে দিয়েছে এই সমাজ। ডিভোর্সি, এক বাচ্চার মা। বাজারে আমার দর পঞ্চান্ন বছরের দোজবরে। আমি রাজি হলাম না। মা কাঁদলেন। গালি দিলেন। আবার কাঁদলেন। আমি মিতুর হাত ধরে ঢাকায় চলে এলাম। সঙ্গে একটা টিনের বাক্স আর কানের দুল জোড়া।
মা-বাবাকে আমি ঘেন্না করি না। ওনারা নিষ্ঠুর না, ওনারা ভীতু। এই সমাজে গরিবের ভয়টাই সবচেয়ে বড় সম্পদ। ওইটা দিয়েই তারা বেঁচে থাকে।
ঢাকা শহর একলা মেয়েদের জন্য একটা পরীক্ষার হল। প্রশ্ন কমন পড়ে না। আর পাস করলেও কেউ সার্টিফিকেট দেয় না।
বাসা ভাড়া নিতে গেলাম। বাড়িওয়ালা প্রথম প্রশ্ন করল, সাথে পুরুষ মানুষ কে আছে? বললাম, কেউ না। মুখের ওপর বলে দিল, একলা মাইয়া মানুষরে ভাড়া দিই না। ঝামেলা হয়। তিন বাড়ি ঘুরে চতুর্থ বাড়িওয়ালা রাজি হলো। ভাড়া পাঁচশো বেশি। একলা মেয়ের ট্যাক্স।
চাকরি নিলাম একটা কাপড়ের শোরুমে, সেলসগার্ল। ম্যানেজার সাহেব মাসের পনেরো তারিখে বেতনের অ্যাডভান্স দিতে চাইতেন। শুধু আমাকেই। টাকাটা হাতে দেওয়ার সময় আমার হাতের ওপর এমনভাবে রাখতেন, যাতে আঙুলগুলোর স্পর্শ একটু বেশিক্ষণ থাকে। আমি অ্যাডভান্স নেওয়া ছেড়ে দিলাম। বদলে খবর পেলাম, ম্যানেজার সাব নালিশ করেছেন, মেয়েটার ব্যবহার ভালো না।
বাসে অফিস যেতাম। ভিড়ের মধ্যে পেছন থেকে ভেসে আসা হাতগুলোর কোনো চেহারা থাকে না। ঘুরে তাকালে প্রতিটি মুখই দেবদূতের মতো নিরীহ। একদিন একটা হাত শক্ত করে মুচড়ে ধরেছিলাম। লোকটা উল্টো চেঁচিয়ে উঠল, "কী খারাপ মহিলা রে বাবা!" বাসশুদ্ধ মানুষ তখন আমার দিকেই তাকিয়ে দেখল। খারাপ মহিলা। যে মেয়ে প্রতিবাদ করে, তার নামই খারাপ মহিলা।
মিতুকে স্কুলে ভর্তি করাতে গেলাম। ফর্মে লেখা, পিতার নাম, পিতার পেশা, পিতার স্বাক্ষর। মায়ের জন্য বরাদ্দ মোটে আধখানা লাইন। অফিসের লোকটা বলল, বাপ ছাড়া ভর্তি হইব না, গার্জিয়ান লাগব। আমি বললাম, আমি গার্জিয়ান। লোকটা এমনভাবে হাসল, যেন আমি সস্তা রসিকতা করছি।
পাশের ফ্ল্যাটের এক ভদ্রলো। বয়স চল্লিশের আশেপাশে। বউ থাকে গ্রামে। রাত এগারোটায় দরজায় টোকা দিতেন। ভাবি, একটু ম্যাচটা দিয়েন তো। ম্যাচ, লবণ, মোবাইলের চার্জার। একলা মেয়ের ঘর মানে মহল্লার মিনি মুদি দোকান, যখন খুশি টোকা দাও। একদিন দরজা না খুলে বললাম, দোকান বন্ধ। এরপর উনি রটিয়ে দিলেন, মহিলার চরিত্র ভালো না। রাইতে ঘরে পুরুষ ঢোকে।
চরিত্র। এই শব্দটা এই দেশে শুধু মেয়েদের শরীরে গজায়।
এর মধ্যে রাশেদ দুইবার এসেছিল। প্রথমবার এসে বলল, ভুল হইছে। ফিরা আয়। আমি বললাম, মিতুর খরচ পাঠাও, দেনমোহর দাও। ফিরতে বোলো না। দ্বিতীয়বার এসে আর নরম গলার মানুষটা রইল না। হিংস্র চোখে দাঁত চেপে বলল, “একলা থাকস, দুই পয়সা কামাই করস দেইখা নিজেকে অনেক বড় নবাবজাদী ভাবস, না? দুই দিন পরে ফুটপাতে বইসা ভিক্ষা করবি, মাগী। তখন দেখুম তোর কত দেমাগ!”
আমি দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। দেমাগ শব্দটা আমার ভালো লেগেছিল। গরিব একলা মেয়ের আত্মসম্মানকে এই দেশে দেমাগ বলে ডাকা হয়।
মিতু রাতে ঘুমানোর আগে গল্প শুনতে চায়। আমি ওকে আমার নানির গল্পটা বলি। নানি বলতেন পানকৌড়ির গল্প।
এক ছিল পানকৌড়ি পাখি। কালো, রোগা, গলা লম্বা। হাঁসেরা তাকে দেখে হাসত। বলত, তোর তো তেলই নাই পাখায়, তুই ভিজস, তুই ডুবস। একদিন বড় ঝড় উঠল বিলে। হাঁসেরা পাড়ে উঠে গেল। পানকৌড়ি ডুব দিল। এক ডুব, দুই ডুব। অনেকক্ষণ আর উঠল না। সবাই বলল, মরছে। শোল মাছটা পর্যন্ত বলল, মরছে। কিন্তু নানি এই জায়গায় এসে থামতেন। বলতেন, শোন, পানকৌড়ি ডুবে না। পানকৌড়ি ডুব দেয়। ডুব আর ডুবার মধ্যে ফারাক আছে। যে ডুব দেয়, সে ভেসে ওঠার জন্যই ডুব দেয়।
মিতু জিজ্ঞেস করে, তারপর?
তারপর ঝড় থামল। পানকৌড়ি ভেসে উঠল। ঠোঁটে একটা মাছ।
এই গল্পটা আমি মিতুকে শোনাতাম। আসলে নিজেকে শোনাতাম।
তারপর এলো সেই মাস। যে মাসে আমি মরে গেলাম।
মিতুর টাইফয়েড ধরা পড়ল। ডাক্তার, টেস্ট, ওষুধ। জমানো টাকা গেল। শোরুম থেকে ছুটি নিতে হলো বলে বেতন কাটা গেল। মাসের দশ তারিখে বাড়িওয়ালা এসে দাঁড়াল, ভাড়া না দিলে ঘর ছাড়েন। স্কুলে ভর্তির শেষ তারিখ পনেরো তারিখ, লাগবে তিন হাজার টাকা। আমার হাতে তখন সাতশো বিশ টাকা।
রাশেদকে ফোন দিলাম। জীবনে প্রথমবার নিজে থেকে। মেয়ের অসুখের কথা বললাম। ও শুনল। তারপর শান্ত গলায় বলল, টাকা লাগলে ঘরে ফিরা আয়। পায়ে ধইরা মাফ চাবি, টাকাও পাবি, ঘরও পাবি। আমি ফোন কেটে দিলাম। ওর কাছে আমার দরকারটাই ছিল শেষ জুয়ার দান। মেয়ের অসুখ দিয়ে ও বাজি ধরল।
মাকে ফোন দিলাম। মা লুকিয়ে বিকাশে দুইশো টাকা পাঠালেন। সাথে একটা কথা, তোর বাপরে কইস না। দুইশো টাকা আর একটা নিষেধ। আমার মায়ের সাধ্য এইটুকুই।
চৌদ্দ তারিখ রাতে মিতুর জ্বরটা নামল। মেয়েটা ঘুমাল। আমি বারান্দায় বসে রইলাম। হিসাব মেলালাম। ভাড়া, ভর্তি, ওষুধ, দোকানের বাকি। সব যোগ করলে যা হয়, আমার সারা শরীর বেচলেও তা হয় না। মাথার ভেতর রাশেদের গলা, ফুটপাতে বইসা ভিক্ষা করবি। বাড়িওয়ালার গলা, ঘর ছাড়েন। ম্যানেজারের আঙুল। বাসের হাত। ফর্মের লেখা, পিতার নাম।
আমি মিতুকে পাশের ঘরের রিনা ভাবির কাছে রেখে বের হলাম। বললাম, একটু আসতেছি। রাত তখন এগারোটা।
হাঁটতে হাঁটতে বুড়িগঙ্গার ঘাটে চলে গেলাম। কেন গেলাম, জিজ্ঞেস করবেন না। ওই রাতে আমার ভেতরে যুক্তি বলে কিছু ছিল না। ছিল শুধু ক্লান্তি। এমন ক্লান্তি, যা ঘুমে যায় না। আমি ঘাটের সিঁড়িতে বসলাম। নদীটা ডাকছিল। অন্ধকার পানি বড় নরম গলায় ডাকে। বলে, আয়, আর হিসাব মেলাতে হবে না।
আমার স্যান্ডেল জোড়া সিঁড়িতেই খুলে রেখেছিলাম। এক পা, দুই পা করে পানিতে নেমেছিলাম। এইটুকুই বলব। এর বেশি বলার সাহস আমার আজও নেই।
শুধু বলি, ঠিক তখন নানির গলাটা শুনলাম। পানকৌড়ি ডুবে না। পানকৌড়ি ডুব দেয়।
আর শুনলাম মিতুর নিঃশ্বাস। জ্বর ছাড়ার পর মেয়েটা যখন ঘুমায়, ওর নিঃশ্বাসে একটা শব্দ হয়। খুব মিহি। ওই শব্দটা আমি নদীর ডাকের ভেতরেও শুনতে পেলাম। মায়ের কান বলে কথা।
আমি উঠে এলাম। ভেজা শাড়িতে সারারাত হাঁটলাম। শহরটাকে ওই প্রথম দেখলাম ভয় ছাড়া। ভোরের আজানের পর চাঁদনি চকের পেছনের গলিতে গেলাম। ওখানে চুল কেনে। মেয়েদের লম্বা চুল, পরচুলার কারবারিরা ওজন দরে নেয়।`


আমার চুল ছিল কোমর ছাড়ানো। যে চুলে রাশেদ নদীর গন্ধ পেত। যে চুল মুঠি পেঁচিয়ে ও আমাকে শিখিয়েছিল, ভালোবাসা আর দখলদারি এক জিনিস না। কারবারি কাঁচি চালানোর আগে জিজ্ঞেস করল, মন খারাপ হইব না তো আফা? আমি বললাম, কাটেন। মাথাটা হালকা হইলে বাঁচি।
কাঁচির শব্দটা আমার কানে আজও লেগে আছে। মুক্তির শব্দ কারো কাছে শিকল ভাঙার, আমার কাছে কাঁচির।
চুল বেচে পেলাম চার হাজার দুইশো টাকা।
ফিরে দেখি বাসার সামনে ভিড়। রিনা ভাবি উঠানে বসে বিলাপ করছে। ঘাটে নাকি আমার স্যান্ডেল পাওয়া গেছে। কে যেন রাতে আমাকে নদীর দিকে যেতে দেখেছে। মহল্লা রায় দিয়ে ফেলেছে, ডিভোর্সি মাইয়া। আর কত সহ্য করব। গলায় দড়ি না দিয়া পানিতেই গেছে। খবর পেয়ে রাশেদও এসে হাজির। উঠানে দাঁড়িয়ে গলা কাঁপিয়ে বলছে, আহারে, কতবার কইছি ফিরা আয়। শোকটা ওর মুখে মানাচ্ছিল না। মরা বউয়ের জন্য কাঁদলে সমাজে দর বাড়ে, ও জানে।
আমি ভিড় ঠেলে ঢুকলাম। খালি পা, ভেজা শাড়ি, ছেলেদের মতো ছোট চুল, হাতে খামে মোড়ানো কিছু টাকা।
সবাই এমনভাবে তাকাল, যেন ভূত দেখছে। ঠিকই দেখছিল। যে শিউলি কাল রাতে ঘাটে গিয়েছিল, সে তো আর ফেরেনি। ফিরেছি আমি। এই আমাকে ওরা চেনে না।
রিনা ভাবি কেঁদে জড়িয়ে ধরল। মিতু দৌড়ে এসে আমার ছোট চুলে হাত বুলিয়ে বলল, মা, তোমারে পাখির মতো লাগতেছে।
আমি বললাম, হ রে মা। পানকৌড়ি।
রাশেদ আগায় আসছিল। আমি হাত তুলে থামালাম। সারা মহল্লার সামনে শুধু বললাম, আমার মেয়ের জন্য কাঁদার লোক আছে। তুমি আসতে পারো।
ও চলে গেল। মানুষটা গালির জবাব দিতে জানে, শান্ত গলার জবাব ওর জানা নেই।
পনেরো তারিখে মিতুকে স্কুলে ভর্তি করালাম। ফর্মের পিতার নামের ঘরটা ফাঁকা রেখে নিচে বড় করে লিখলাম নিজের নাম। অফিসের লোকটা কী যেন বলতে চাইল। আমি চোখ তুলে তাকালাম। লোকটা সিল মেরে দিল। শিখেছি, এই দেশে একলা মেয়ের সবচেয়ে বড় দলিল তার চোখের ভাষা।
বাড়িওয়ালার ভাড়া মিটিয়েছি। শোরুমের চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি, ম্যানেজারের আঙুলের স্পর্শসহ। এখন দুই বাসায় রান্না করি। রাতে ব্লাউজ পেটিকোট সেলাই করি। মেশিনটা কিস্তিতে কেনা। আয় বেশি না। তবে এই টাকায় কারো আঙুলের দাগ নেই। গরিবি আমার কাটেনি। হয়তো কাটবেও না। কিন্তু গরিবি আর ভিক্ষা এক কথা না। রাশেদের কথাটা মিথ্যা হয়ে গেছে। আমি ফুটপাতে বসিনি। আমি উঠে দাঁড়িয়েছি।
চুল আবার বড় হচ্ছে। কাঁধ ছুঁয়েছে। এবার এই চুলের গন্ধ শুধু আমার।
শুক্রবার বিকালে মিতুকে নিয়ে সেই ঘাটে যাই। যে নদী আমাকে ডেকেছিল, তার সাথে এখন আমার অন্য সম্পর্ক। পাড়ের কাছে অল্প পানিতে নেমে আমি মেয়েকে সাঁতার শেখাই। নিজেও শিখি। উনত্রিশ বছর বয়সে শিখছি, ডোবা আর ডুব দেওয়ার ফারাক।
মিতু পানিতে হাত পা ছুড়ে হাসে। বলে, মা দেখো, আমি ভাসতেছি!
আমি ওর পিঠের নিচে হাত রাখি। বলি, ভয় নাই রে মা। ডুব দিবি, ভাসবি। তুই পানকৌড়ির মেয়ে।
লোকে এখনো মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, "ওই রাতে ঘাটে কী হইছিল আফা?" আমি হাসি। বলি, "কী আর হইব। একজন মরছে, একজন বাঁচছে। কোনজন কে, সেই হিসাব নদী জানে।"

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন