আমার প্রকাশক বলেন, আপনার লেখায় আজকাল প্রাণ নাই।
উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
আমি বলি, প্রাণ কই কিনতে পাওয়া যায় বলেন, নিয়া আসি।
উনি হাসেন না। রয়্যালটির চেক লিখতে লিখতে গম্ভীর মুখে তিনটা পরামর্শ দেন। প্রেমে পড়েন। নেশা ছাড়েন। ভোরবেলা হাঁটেন। তিনটার একটাও আমাকে দিয়ে হবে না জেনেও আমি বাধ্য ছেলের মতো মাথা নাড়ি।
বয়স চল্লিশ ছুঁই ছুঁই। দুইটা উপন্যাস, একটা গল্পের বই, আর ড্রয়ার ভর্তি অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি নিয়ে আমার সংসার। মহল্লার লোকে জানে আমি লেখক। ঘনিষ্ঠরা জানে আমি মা তা ল। আর আমি জানি, আমি আসলে একটা দীর্ঘ অপেক্ষা। কীসের অপেক্ষা, জানি না। জানলে তো গল্পই শেষ হয়ে যেতো।
তানভীর আমার একমাত্র বন্ধু, যে এখনো আমাকে মানুষ মনে করে। ডকুমেন্টারি বানায়। এক সন্ধ্যায় আমার ফ্ল্যাটে এসে গ্লাসে চুমুক না দিয়েই বলল, শ্রীমঙ্গল ছাড়াইয়া পাহাড়ের ভিতরে একটা জায়গা আছে। নাম মেঘমাটি। জনা ত্রিশেক মানুষ থাকে। টাকা চলে না, ঘড়ি চলে না, মোবাইলের নেটওয়ার্ক ঢুকতে পারে না। নিজেরা ফলায়, নিজেরা খায়, রাইতে আগুন জ্বালাইয়া গান গায়। যাবি?
আমি জিজ্ঞেস করলাম, বিদ্যুৎ আছে?
সে বলল, চাঁদ আছে।
উত্তরটা আমার পছন্দ হলো। নতুন উপন্যাসের মালমশলা হবে ভেবে ব্যাগে দুইটা শার্ট আর একটা বোতল ভরে রওনা দিলাম। যাওয়ার সময় আমি জানতাম, আমি যাচ্ছি একদল পলাতক অলস মানুষ দেখতে, যারা জীবনের পরীক্ষায় ফেল করে পাহাড়ে পালিয়েছে। ফেরার সময় জানলাম, পলাতক আসলে আমি। পালানোর সাহসটাও নাই বলে ঢাকায় বসে ছিলাম এতকাল।
মেয়েটাকে প্রথম দেখি ঝর্নার পাড়ে। ভেজা পাথরে খালি পায়ে দাঁড়িয়ে চুলে জংলি ফুল গুঁজছে। পরনে আলখাল্লা ধরনের একটা জামা, হাতে রঙ লেগে থাকা আঙুল, আর মুখে এমন একটা নির্ভার ভাব, যেটা আমি ঢাকা শহরে বিশ বছরে একবারও দেখিনি। কারো মুখে না। আয়নায় তো নাই ই।
তানভীর পরিচয় করিয়ে দিলো, ইনি বিখ্যাত লেখক। মেয়েটা হাত মেলালো না, মাথাও নোয়ালো না। শুধু বলল, এইখানে কেউ বিখ্যাত না। খিদা লাগলে রান্নাঘরে খিচুড়ি আছে।
নাম জিজ্ঞেস করলে বললো, রোদ।
আসল নাম?
যেইটা কইলাম, সেইটাই আসল। বাপ মায়ের দেওয়াটা পুরান ঠিকানার মতো। চিঠি আর ওইখানে যায় না।
আমি হাসলাম। মনে মনে ভাবলাম, ফাঁ প র। শহরে এই বয়সী মেয়েরা কর্পোরেট চাকরি করে, আর এরা ফুল গুঁজে দর্শন কপচায়। রাতে খাওয়ার পর উঠানে আগুন জ্বলল। কেউ দোতারা আনলো, কেউ মাটির খোল। আমি একটু দূরে বসে নিজের বোতল খুললাম। কেউ আড়চোখে তাকালো না, কেউ বাহবাও দিলো না। এই প্রথম টের পেলাম, আমি এমন এক জায়গায় আসছি যেখানে আমার নেশাটাও কারো কাছে খবর না। ব্যাপারটায় আরাম পাবো না অপমানিত হবো, বুঝলাম না।
রোদ আগুনের ওপাশ থেকে উঠে এসে আমার পাশে বসল। বলল, আপনে সারাক্ষণ সবাইরে মাপতেছেন ক্যান?
মানে?
আসার পর থেইকা দেখতেছি। চোখ দিয়া সবার দাম ঠিক করতেছেন। এইটা শহরের রোগ। ওইখানে মানুষ দেখলেই আগে হিসাব করে, এর কাছ থেইকা কী পাওয়া যাইবো, একে কতটুকু বিশ্বাস করা যাইবো। আমরা এই হিসাবটা ছাইড়া দিছি। ছাড়ার পর দেখি, দিনে চাইর পাঁচ ঘণ্টা সময় বাঁইচা যায়।
আমি বললাম, এই যে তোমরা সমাজ ছাইড়া পালাইলা, এইটা কি এক ধরনের হার না?
রোদ আগুনের দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকলো। তারপর যেটা বলল, সেটার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না।
উনিশশো সাতষট্টি সাল। আমেরিকার সান ফ্রান্সিসকো শহরের হেইট অ্যাশবেরি নামের এক পাড়ায় এক লাখ তরুণ তরুণী জড়ো হইছিলো এক গ্রীষ্মে। ইতিহাসে ওই গ্রীষ্মের নাম সামার অব লাভ। ভালোবাসার গ্রীষ্ম। এরা কারা? এরা ওই দেশের সবচেয়ে ভাগ্যবান পোলাপান। সবচেয়ে ধনী দেশের, সবচেয়ে সুখী সময়ের সন্তান। বাপের গাড়ি আছে, ভবিষ্যতে ব্যাংকের চাকরি আছে। সব ফালাইয়া এরা রাস্তায় নামলো ক্যান, কন তো?
জানি না।
কারণ সরকার তাগো ভাইদের ধইরা ধইরা ভিয়েতনামের যুদ্ধে পাঠাইতেছিলো। মরতে। যেই যুদ্ধের মানে কেউ জানে না। পোলাপানগুলা বুঝলো, যেই সিস্টেম আমারে গাড়ি বাড়ি দিতেছে, সেই একই সিস্টেম আমার ভাইরে কফিনে ভইরা ফেরত পাঠাইতেছে। তখন তারা ঠিক করলো, এই খেলায় আমরা নাই। তারা বন্দুকের নলের ভিতরে ফুল ঢুকাইয়া দিলো। মিছিলে সৈন্যের বেয়নেটের সামনে খাড়াইয়া এক মেয়ে ফুল ধরলো, সেই ছবি সারা দুনিয়ায় ছড়ায়া গেলো। মানুষ তাগো নাম দিলো ফ্লাওয়ার চিলড্রেন। ফুলের মানুষ। এখন আপনেই কন, বন্দুকের সামনে ফুল নিয়া খাড়ানি হাইরা যাওয়া, নাকি বন্দুকের লাইনে চুপচাপ খাড়ায়া থাকা হাইরা যাওয়া?
আমি উত্তর দিতে পারলাম না। বোতলে আরেকটা চুমুক দিলাম। রোদ উঠে গিয়ে আবার গানের দলে মিশে গেলো। আর আমি টের পেলাম, আমার ভিতরে কোথায় যেন একটা পুরনো দেয়ালে চিড় ধরার শব্দ হলো।
পরদিন থেকে আমি রোদের পিছে পিছে ঘুরতে লাগলাম। লেখক হিসেবে নোট নিচ্ছি, এই অজুহাতে। রোদ সবজি বাগানে কাজ করে, আমি পাশে বসে থাকি। রোদ বাচ্চাদের ছবি আঁকা শেখায়, আমি দূর থেকে দেখি। নিজেকে বোঝাই, এইটা রিসার্চ। কিন্তু রাতে ঘুমাতে গেলে বুঝি, চল্লিশ বছর বয়সে এই প্রথম আমার রিসার্চের বিষয়ের গলার স্বর না শুনলে বুক খালি খালি লাগে। শরীরে মদ না পড়লে যেমন লাগে, তার চেয়েও খারাপ। এই তুলনাটা যে করতে পারলাম, এতেই বোঝেন অবস্থা কই গেছে। আমি প্রেমে পড়ছি। পাগলের মতো, কিশোরের মতো, হাবুডুবু খেয়ে।
রোদের কাছ থেকেই জানলাম, ও অর্থনীতিতে মাস্টার্স করা মেয়ে। মাল্টিন্যাশনালে চাকরি করতো। একদিন অফিসের চেয়ারে বসে হিসাব করে দেখলো, বেতনের টাকায় সে যা যা কিনতেছে, তার সবগুলাই আসলে ওই চাকরিটা করার ক্ষতিপূরণ। দামি জামা কিনতেছে অফিসে পরার জন্য। দামি রেস্টুরেন্টে খাইতেছে অফিসের ক্লান্তি ভুলতে। দামি ছুটিতে যাইতেছে অফিস থেইকা পালাইতে। ও বলল, বুঝলেন, আমি বেতন দিয়া আসলে ওষুধ কিনতেছিলাম, আর অসুখটার নাম ওই বেতন।
এই মেয়ের সাথে তর্কে পারা মুশকিল। আমি তবু চেষ্টা করতাম। একদিন বললাম, তোমাদের এই হিপ্পি ব্যাপারটা তো পুরাটাই বিদেশি জিনিস। আমদানি করা দর্শন।
রোদ এমনভাবে হাসলো, যেন আমি খুব মজার একটা ভুল করছি। বলল, উল্টা। জিনিসটা ওরাই আমাগো কাছ থেইকা নিছে। ষাটের দশকে অ্যালেন গিন্সবার্গ নামে এক আমেরিকান কবি বছর দেড়েক পইড়া ছিলেন কলকাতা আর বেনারসে। বাউল ফকিরগো লগে ঘুরছেন, শ্মশানে রাইত কাটাইছেন। দেশে ফিরা উনি আর উনার বন্ধুরাই হিপ্পিগো গুরু হইলেন। বিটলসের কথা তো জানেনই, আটষট্টি সালে পুরা ব্যান্ড ভারতে আইসা ঋষিকেশে আশ্রমে উঠলো, ধ্যান শিখতে। আর লন্ডন থেইকা ইস্তাম্বুল, তেহরান, কাবুল হইয়া কাঠমান্ডু পর্যন্ত একটা রাস্তা চালু হইলো, রঙচঙা বাসে কইরা হাজার হাজার তরুণ তরুণী পূবের দিকে আসতো। ইতিহাসে ওই রাস্তার নাম হিপ্পি ট্রেইল। কাঠমান্ডুতে যেই গলিতে তারা থাকতো, সেই গলির নাম হয়া গেলো ফ্রিক স্ট্রিট। পাগলগো রাস্তা। ভাইবা দেখেন, দুনিয়ার সবচেয়ে ধনী দেশগুলার পোলাপান সব ছাইড়া ছুইড়া আমাগো এই গরিব পূব দিকে আসতো। কী খুঁজতে আসতো? যেই জিনিস ডলারে কিনতে পাওয়া যায় না, সেইটা।
আর সবচেয়ে বড় কথাটা কী জানেন? রোদের গলা নরম হয়ে এলো। একাত্তরে যখন আমরা মরতেছি, শরণার্থী হয়া ভাসতেছি, তখন দুনিয়ার কোন মানুষগুলা সবার আগে আগায়া আসছিলো? এই হিপ্পিরাই। গিন্সবার্গ নিজে যশোর রোডে আইসা শরণার্থীগো লাইন দেইখা কবিতা লেখলেন, সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড। আর জর্জ হ্যারিসন, রবিশঙ্করের ডাকে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেনে কনসার্ট করলেন, দ্য কনসার্ট ফর বাংলাদেশ। ইতিহাসের প্রথম বড় চ্যারিটি কনসার্ট, আর সেইটা হইছিলো আমাগো নামে। চল্লিশ হাজার মানুষ টিকেট কাটছিলো আমাগো শরণার্থীগো জন্য। যেই ফুলের মানুষগুলারে আপনে অলস কন, আমাগো সবচেয়ে খারাপ দিনে তারাই আমাগো নাম দুনিয়ারে চিনাইছিলো।
আমি চুপ করে রইলাম। আমার লজ্জা লাগছিলো। লেখক মানুষ, অথচ এই ইতিহাস আমি এইভাবে কোনোদিন ভাবিনি।
আরেকদিন জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, লালন ফকিরের নাম তো তোমরা খুব নেও। উনার সাথে এইসবের সম্পর্ক কী?
রোদ বললো, সম্পর্ক না, উনিই তো আদি। হিপ্পিরা যা করছে ষাট সালে, আমাগো বাউল ফকিররা তা করছে তারও দুইশো বছর আগে। জাত মানে না, সম্পত্তি জমায় না, একতারা নিয়া পথে পথে ঘোরে, আখড়ায় দল বাইন্ধা থাকে, আর গানরে বানাইছে প্রতিবাদের ভাষা। সমাজ তাগো পাগল কইছে, ছেঁউড়িয়ায় লালনের আখড়া ভাঙছে, তবু তারা থামে নাই। উডস্টকের কথা শুনছেন? উনসত্তর সালে এক খামারে পাঁচ লাখ মানুষ তিনদিন ধইরা গান শুনছিলো, বৃষ্টিতে ভিজা, কাদায় মাখামাখি হইয়া, একটাও মারামারি হয় নাই। সবাই কয় অলৌকিক ঘটনা। আর আমাগো কুষ্টিয়ায় দেড়শো বছর ধইরা দোলপূর্ণিমায় লাখ মানুষের সাধুসঙ্গ হয়, কেউ খবরও রাখে না। আসলে কী জানেন, দুনিয়ার সব জায়গায়, সব যুগে, কিছু মানুষ থাকে যারা দৌড়াইতে রাজি না। তারা হাঁটে। আর হাঁটে বইলা তারাই একমাত্র রাস্তার ফুলগুলা দেখতে পায়।
এইসব শুনতে শুনতে আমার দিন কাটতে লাগলো। বোতলটার কথা মাঝে মাঝে মনেই থাকতো না। ব্যাপারটা আমি রোদকে বলিনি। বললে বলতো, দেখছেন, নেশা জিনিসটা আসলে শূন্যস্থান পূরণ। জায়গা ভরা থাকলে নেশার জায়গা হয় না। এই মেয়ের সমস্যা হলো, ওর সব কথাই ঠিক হয়। আর যেই মানুষের সব কথা ঠিক হয়, তার প্রেমে না পইড়া উপায় থাকে না।
পূর্ণিমার রাতে ওদের বড় আসর বসলো। মশাল, দোতারা, খোল, আর গলায় গলায় লালন। আমি সেই রাতে একটা অদ্ভুত জিনিস টের পেলাম। গানের মাঝখানে হঠাৎ মনে হলো, সময় জিনিসটা থেমে গেছে। ঘড়ি নাই বলে না। ভিতরের যেই ঘড়িটা সারাক্ষণ বলে, দেরি হয়া যাইতেছে, দৌড়া, সেই ঘড়িটা থেমে গেছে। আমার মনে হলো, আমি আমার মৃত মায়ের রান্নাঘরে বসে আছি। মনে হলো, আমি ক্লাস সেভেনের সেই দুপুরে ফিরে গেছি, যেদিন প্রথম কবিতা লিখে মনে হয়েছিলো, আমার হাতে জাদু আছে। আমার চোখ ভিজে উঠলো, এবং লুকানোর জন্য আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলাম। চাঁদটাও কেমন টলটল করছিলো। ঘোর। শব্দটার মানে আমি সেই রাতে প্রথম বুঝলাম। নেশায় যেই ঘোর হয়, এইটা সেই ঘোর না। ওইটা ভুলে থাকার ঘোর, এইটা মনে পড়ার।
সেই রাতেই, আসর ভাঙার পর, ঝর্নার পাড়ে আমি রোদকে বললাম কথাটা। চল্লিশ বছর বয়সী মানুষ, দুই হাত কাঁপছে কিশোরের মতো। বললাম, আমার সাথে ঢাকা চলো। বিয়া করি। তুমি ছবি আঁকবা, আমি লেখবো।
রোদ অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো। ওর চোখে করুণা না, বিরক্তি না, অন্য কিছু একটা। তারপর বলল, আপনে আমারে ভালোবাসেন, না আমার এই থাকাটারে ভালোবাসেন?
মানে?
আপনে ঢাকায় আমারে নিতে চান ক্যান জানেন? যেমনে মানুষ পাহাড় থেইকা ঝর্নার পানি বোতলে ভইরা নিয়া যায়। বাসায় গিয়া খুইলা দেখে, এইটা তো সাধারণ পানি। ঝর্নাটা আসলে পানি না। ঝর্নাটা হইলো পাহাড়, গাছ, পাথর, আর নামতে থাকা। আমারে এই জায়গা থেইকা তুইলা নিলে যেইটা পড়ে থাকবো, সেইটা আমি না।
আমি বললাম, তাইলে আমিই এইখানে থাইকা যাই?
সে মাথা নাড়লো। আপনেও পারবেন না। আপনের নেশা খালি বোতলে না, আপনের নেশা দুঃখে। আপনে দুঃখ দিয়া লেখেন। এইখানে থাকলে আপনের দুঃখগুলা শুকায়া যাইবো, আর আপনে আমারে দোষ দিবেন। ভালোবাসা মুঠায় ধরার জিনিস না, লেখক সাহেব। বাতাস মুঠায় ধরলে হাতে কী থাকে? ঘাম।
তারপর সে যা বললো, তার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। বললো, আমি পরশু রওনা দিতেছি। পুরানা রাস্তাটায়। বাসে কইরা, ট্রাকে কইরা, হাঁইটা। নেপাল, কাঠমান্ডু, ফ্রিক স্ট্রিট। যেই রাস্তায় পঞ্চাশ বছর আগে ফুলের মানুষরা হাঁটছে, আমি উল্টাদিক থেইকা হাঁটুম। দেখতে চাই, রাস্তাটার ফুল এখনো ফোটে কি না।
যাওয়ার দিন ভোরে সে আমার হাতে একটা শুকনা ফুল দিলো। চুলে গোঁজা ফুলগুলার একটা। বলল, মন খারাপ কইরেন না। হিপ্পিগো একটা কথা আছে। যারে ভালোবাসো, তারে ছাইড়া দাও। ফিরা আসলে বুঝবা সে তোমারই আছিলো।
আর ফিরা না আসলে?
রোদ হাসলো। সেই নির্ভার হাসি। বলল, না ফিরলে বুঝবেন, সে আসলে একটা রাস্তা আছিলো, ঠিকানা না। রাস্তার কাম পৌঁছানো না, হাঁটানো।
আমি ঢাকায় ফিরলাম। জ্যামে বসে থাকি, মিটিং করি, মাস শেষে বিল দেই। সবই আগের মতো। খালি একটা জিনিস বদলাইছে। আমি এখন লিখি। রোজ ভোরে উঠে লিখি। ছয় মাসে যেই উপন্যাসটা দাঁড়ালো, প্রকাশক পড়ে ফোন দিয়ে বললেন, এইবার হইছে। প্রাণ আইছে। কই পাইলেন?
আমি বললাম, কিনি নাই। একজন এমনি দিছে।
বোতলটা এখনো আছে। মাঝে মাঝে খুলি। তবে আগের মতো শূন্যস্থান ভরতে না, পুরান বন্ধুর সাথে দেখা করার মতো করে। আর আমার লেখার টেবিলে, বইয়ের ভাঁজে, সেই শুকনা ফুলটা রাখা। মাঝে মাঝে রাত জেগে লিখতে লিখতে মনে হয়, ঘরে বুনো ফুলের গন্ধ। জানি, শুকনা ফুলের গন্ধ থাকে না। তবু পাই।
গত সপ্তাহে ডাকবাক্সে একটা পোস্টকার্ড পাইলাম। কাঠমান্ডুর ছবি। প্রেরকের নাম নাই, ঠিকানা নাই। পিছনে খালি এক লাইন লেখা।
রাস্তার ফুল এখনো ফোটে।
আমি পোস্টকার্ডটা বুকপকেটে নিয়ে সারাদিন অফিস করলাম। কেউ টের পাইলো না, জ্যামে আটকা পড়া এই শহরের ভিতর দিয়ে একটা লোক সারাদিন হেঁটে বেড়াইলো কাঠমান্ডুর রাস্তায়, চুলে ফুল গুঁজে।
১৮/৭/২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন