বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

এ কে আর স্যার ~ অরিজিৎ গুহ

আইআইটির প্রথম বর্ষে যে যেই স্ট্রিমেই থাকুক না কেন, প্রত্যেককে সাধারণভাবে কিছু জিনিস পড়তেই হয়। তার মধ্যে একটা হচ্ছে নিউটনের মেকানিক্স। এই বিষয়টা ছাত্রছাত্রীরা সেই ক্লাস নাইন টেন থেকে পড়ে আসছে, আর যারা আইআইটি তে চান্স পেয়েছে সেইসব ছাত্রছাত্রীরা তো এই বিষয়ে নিজেদের একদম অথরিটি ভাবে। উচ্চমাধ্যমিকে হার্ডার প্রবলেম নামের সব অঙ্ক টঙ্ক সলভ করে তারা আইআইটি তে ঢুকেছে। তো তাদেরকে মাস্টারমশাইরা এই মেকানিক্স বিষয়টা পড়াতে গিয়ে বেশ বিব্রতই হন। ছাত্রছাত্রীরা যেন তৈরিই হয়ে থাকে যে কত বড় অধ্যাপক আছে দেখি যে আমাকে নিউটনের মেকানিক্স পড়াবে! কাজেই এই ক্লাসটা করানো মাস্টারমশাইদের কাছে প্রায় দু:স্বপ্নের মত।(অনেকেই হয়ত ভালো পড়ান, আমি গল্পটা শুনেছি এক আইআইটির অধ্যাপকের কাছেই)। তো এরকমই আইআইটির এক অধ্যাপককে ফার্স্ট ইয়ার মেকানিক্স এর ক্লাস নিতে হবে। উনি তো পড়লেন মহা সমস্যায়। ছাত্রছাত্রীদেরকে ক্লাসে ধরে রাখা শুধু নয়, বেয়ারা বেয়ারা উদ্ভট প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দেওয়া সবই সামলাতে হবে। ভাবতে ভাবতেই তাঁর মাথায় এলো প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময়ে তাঁর নিজের মাস্টারমশাই, যাঁর ক্লাস তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতেন তাঁর কথা। মেকানিক্স নিয়ে তাঁর একটা বইও রয়েছে। বইটা তিনি পড়েছেন। অধ্যাপক করলেন কি তাঁর মাস্টারমশাই এর লেখা বইটা থেকে লাইন বাই লাইন তুলে ক্লাসে পড়াতে শুরু করলেন। পুরো ক্লাসরুম মন্ত্রমুগ্ধের মত নিউটনের মেকানিক্স এর ওপর লেকচার শুনে গেল। যেন পিনপতনের মত নিস্তব্ধতা ক্লাস রুম জুড়ে। ক্লাস শেষ হওয়ার পর অধ্যাপক মশাই হাঁপ ছেড়ে বাচলেন। আরেকবার তাঁর স্যারের উদ্দেশ্যে মনে মনে প্রণাম ঠুকলেন। 

      যে স্যারের লেখা বই থেকে আইআইটির ওই অধ্যাপক ক্লাসে পড়ালেন সেই স্যারকেই সাহা ইন্সটিটিউটে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে টক দেওয়ার জন্য। বিখ্যাত পদার্থবিদ, সাহা ইনস্টিটিউটের তৎকালীন ডিরেক্টার ডক্টর বিকাশ সিনহা ছাদে নিয়ে গিয়ে স্যারের সাথে আড্ডা মারতে মারতেই বলে উঠলেন সরকার থেকে একটা বড় গ্রান্ট আসছে আমাদের আগামী এই প্রোজেক্টের জন্য বলে প্রোজেক্টের নামটা বললেন। বিকাশ সিনহা এরপর সেই প্রসঙ্গে স্যারের মতামত জানতে চাইলেন। স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ একটু মুচকি হেসে বললেন আমি আমার কাজ করি কাগজের পাতায়। সেখানে ইকুয়েশন লিখি, সলভ করি, এরপর সেগুলো ডাকযোগে পাঠাই বিদেশে। খুব বেশি হলে হয়ত শ খানেক টাকার ব্যাপার। আপনাদের এই কোটি কোটি টাকার প্রোজেক্ট কি আমি বুঝব! স্যারের স্বভাবসুলভ রসিকতা। উল্লেখ্য বাঙালি এই পদার্থবিদের গবেষণা নিয়ে তখন কাজ করছেন বেশ কয়েকজন নোবেল লরিয়েট, এবং ভবিষ্যতেও কয়েকজন পদার্থবিদ নোবেল পাবেন তাঁর কাজের ওপর ভিত্তি করেই। 
 
কী নিয়ে কাজ করেছিলেন বাঙালি এই পদার্থবিদ? একটু দেখে নিই। 
    এই যে মহাবিশ্বে আমরা সহ সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথের অবস্থান, এরা আসলে ডুবে রয়েছে এক বিশাল মহাসমুদ্রের মধ্যে। এই মহাসমুদ্রের নাম স্পেস-টাইম। নিউটন যে গ্রহ নক্ষত্র বা যে কোনো দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বলের কথা বলেছিলেন, আইনস্টাইন নিউটনের সেই তত্ত্বকে কিছুটা পরিমার্জিত করে সেই আকর্ষণ বলকে বলেছিলেন স্পেস-টাইমের বক্রতা। আসলে দুটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে নিউটনের ভাষ্যমতে। এবং এটাই বস্তুর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। বস্তুর এই প্রবৃত্তি বা আকর্ষণ বলের নাম তিনি দিয়েছিলেন গ্র‍্যাভিটি। আইনস্টাইন বললেন যে না, গ্র‍্যাভিটি কোনো আকর্ষণ বল নয়। যে কোনো বস্তু ডুবে থাকে স্পেস-টাইমের মহাসমুদ্রের মধ্যে এমনভাবে, ঠিক যেমনভাবে রবারের চাদরের মধ্যে কোনো বস্তু ডুবে থাকে। রবারের চাদরটা হচ্ছে স্পেস-টাইম। এবার সেই স্পেস-টাইমের মধ্যে বস্তু ডুবে থাকলেই সেই বস্তু তার চারদিকের রবারের চাদরটাকে যেমন বেকিয়ে চুরিয়ে দেয়, সেরকমই যে কোনো বস্তু তার চারদিকের স্পেস-টাইম বেকিয়ে চুরিয়ে দেয়। এই যে বেকিয়ে চুরিয়ে দেওয়া হল সেই বক্রতার মধ্যে অন্য কোনো বস্তু এসে পড়লে আগের বস্তুর দিকে সে ধেয়ে যাবে যদি আগের বস্তুর থেকে পরের বস্তুটা হাল্কা হয়, অথবা আগের বস্তুটাকে নিজের দিকে টেনে আনবে যদি ভারী হয়। আইনস্টাইন বললেন এটাই গ্র‍্যাভিটি। অর্থাৎ এটা বস্তুর কোনো আকর্ষণ বল নয়। বস্তুর স্পেস-টাইমের বক্রতাটাই হচ্ছে গ্র‍্যাভিটি। 
     বেশ ভালো কথা। মহাজাগতিক যে কোনো স্থানে যদি কোনো বস্তুর উপস্থিতি না থাকে তাহলে সেখানে স্পেস-টাইম থাকবে একদম টানটান হয়ে। অর্থাৎ ফ্ল্যাট স্পেস-টাইম। এই ফ্ল্যাট স্পেস-টাইম এর মধ্যে যদি ধরে নিই যে কোনো দুটি বস্তুকে যারা এই স্পেস-টাইমকে প্রভাবিত করছে না, অর্থাৎ টানটান করে রাখা চাদরের ওপর দুটো চিনির দানাকে যদি ধরে নিই, তাহলে সেই চিনির দানা দুটো নিউটনের তত্ত্ব অনুযায়ী একে অপরকে আকর্ষণ করবে এবং এই আকর্ষণ বলের মান হবে দুজনের ভরের সমানুপাতিক এবং দুরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক। এমনকি চিনির দানা দুটোকে স্থির অবস্থায় ফেলে রাখলে ওই চাদরেই তারা স্থির অবস্থায় চিরকাল থেকে যাবে এবং বাইরে থেকে যে কোনো একটা চিনির দানাকে কিছুটা এগিয়ে দিলে যদি চাদরের ঘর্ষণ বল ধরে নিই শূন্য তাহলে সেই চিনির দানাটা চিরকাল একই বেগে চলতে থাকবে। নিউটনের প্রথম সূত্র। অর্থাৎ স্পেস-টাইমের প্রভাব না থাকলে নিউটনের সূত্র একদম খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যখনই স্পেস-টাইমকে বিবেচনার মধ্যে আনছি তখন আর নিউটনের সূত্র কাজে দিচ্ছে না। তখন যে সূত্র মানতে হবে সেটা ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন বের করেছিলেন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সূত্রে। 
    আইনস্টাইনের এই আপেক্ষিকতাবাদের সূত্র আবিষ্কারের পরের বছরই সেই সূত্রের একটা সমাধান বের করলেন সোয়ার্জচাইল্ড যেখানে তিনি এক অদ্ভুত সমস্যার উত্থাপন করলেন। কোনো বস্তুকে চাপ দিয়ে ছোট করতে করতে এমন একটা অবস্থা আসে যে অবস্থায় সেই বস্তু তার চারপাশের স্পেস-টাইমকে এমনভাবে গুটিয়ে ফেলে যে তার ভেতর থেকে কোনো কিছুরই আর বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। এটাকে যদি রবারের চাদর দিয়ে ভাবি তাহলে কীরকম হবে দেখা যাক। রবারের চাদরের মধ্যে ধরা যাক দশ কেজি ওজনের বেশ বড়সর, মানে একটা ফুটবলের আকারের একটা লোহার বল রেখেছি। সেই বলটা তার আসেপাশের চাদরটাকে দুমরে মুচরে দিয়ে স্পেস-টাইমের বক্রতা সৃষ্টি করেছে। এবার লোহার বলটাকে গলিয়ে ছোট করে একটা ক্রিকেট বলের সাইজ করে ফেললাম। অর্থাৎ দশ কেজি ওজনের একটা ক্রিকেট বল। সেই বলটা তখন চাদরটাকে যে দুমরে মুচরে দেবে এবং নিচে টেনে ধরে রেখে দেবে তার গভীরতা আগের বলের থেকে অনেক বেশি হবে। এবার যদি বলটাকে একটা দশ কেজি ওজনের গুলির সাইজে নিয়ে আসি তাহলে তখন গুলিটা চাদরটাকে এমনভাবে নিচের দিকে টেনে ধরে রাখবে যে ওপর থেকে সেটাকে অনেক গভীর বলে মনে হবে। এবার একটা পিঁপড়েকে ওই চাদরের মধ্যে ফেলে দিলাম। তখন কী দেখা যাবে? দেখা যাবে বলটা যখন ফুটবলের আকারে ছিল, পিঁপড়েটা তখন রবারের চাদরে বলের প্রভাব এড়িয়ে দোমড়ানো মোচড়ানো জায়গা পেরিয়ে টানটান জায়গায় উঠে আসতে পারছে। ক্রিকেট বলের সাইজে যে রবারের চাদরের দোমড়ানো মোচড়ানো অবস্থা, হাঁচড়পাঁচড় করে হলেও উঠে আসতে পারছে, কিন্তু গুলির সাইজের বলটা চাদরের যে অবস্থা করছে, সেখান থেকে পিঁপড়েটা আর টানটান জায়গায় উঠে আসতে পারছে না। এরকমভাবে গুলির সাইজ আরো ছোট করতে করতে বিন্দুসম করে ফেললে তার আসেপাশের রবারের চাদরের বক্রতাকে সেই গুলিটা করে ফেলবে অসীম। 
     ওই গুলির সাইজের বলটা চাদরের যে অবস্থা তৈরি করল সেটাকে নাম দেওয়া হল ট্র‍্যাপড সারফেস। দেখা গেল এই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সূত্র ঠিকঠাক মিলছে না। কোনো বস্তু, আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রে ওই পিঁপড়েকে যদি ধরি, তাহলে পিঁপড়েটা ওই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে পড়লে অবধারিতভাবে সে গুলিটা চাদরটাকে টেনে ধরে যে একদম নিচের দিকে নামিয়ে এনেছে, সেই নিচের দিকে এগিয়ে চলবে। এর প্রভাব থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই। যেহেতু ওই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে স্পেস-টাইমের বক্রতা হয়ে যাচ্ছে অসীম বা আনডিফাইনড, কাজেই সেক্ষেত্রে আইনস্টাইনের সমীকরণ এই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে কাজ করছে না। বোঝাই যাচ্ছে যে এই ট্র‍্যাপড সারফেস বলে যেটা বলছি সেটা একটা ব্ল্যাক হোলকে বোঝাচ্ছে। ব্ল্যাক হোলের মত অভ্যন্তরের জ্যামিতি বা অভ্যন্তরে বস্তুর পরিণতি এটা যখন আইনস্টাইনের সমীকরণ দিয়ে বের করা সম্ভব হল না তখন প্রয়োজন হল আরো সাধারণ একটা সমীকরণের। 
            ১৯৫৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বরে প্রথমবার কলকাতায় প্রকাশিত একটা পেপার যা পরে ফিজিকাল রিভিউ নামের বিজ্ঞান পত্রিকায় ১৯৫৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়; সেই পেপার এই ট্র‍্যাপড সারফেসের অভ্যন্তরে স্পেসটাইমের বক্রতা সংক্রান্ত সমস্যা থেকে বিজ্ঞানীদের মুক্তি দিল। পরবর্তীকালে এই পেপারে যে সূত্র প্রকাশিত হয়েছিল সেই সূত্রকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ প্রমাণ করলেন কৃষ্ণগহ্বর থাকলে অবধারিতভাবে তার একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দুসম স্থান থাকবে যার নাম সিঙ্গুলারিটি বা সিঙ্গুলার পয়েন্ট; যেখানে স্পেস-টাইম কার্ভেচার হবে অসীম।      পেনরোজের এই ধারণা এবং তিরিশের দশকে এডউইন হাবল এর পর্যবেক্ষণের ফলে প্রাপ্ত মহাবিশ্বের প্রসারণের ধারণা, এই দুই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে স্টিফেন হকিং কিছু গাণিতিক হিসাব নিকাশের মাধ্যমে মহাবিশ্বের একটা সম্ভাব্য শুরুর সময় বের করে ফেললেন। উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা গেল মহাবিশ্বের শুরুর সেই সময়তেও অবধারিতভাবে একটা সিঙ্গুলারিটি ছিল যে সিঙ্গুলারিটিতেও স্পেসটাইমের বক্রতা ছিল অসীম।
    যে কোনো বড় নক্ষত্রের ভবিষ্যৎ পরিণতি হচ্ছে ব্ল্যাক হোল আর মহাবিশ্বের অতীত শুরু হচ্ছে বিগ ব্যাঙ্গ থেকে এবং এই দুই ক্ষেত্রেই, অর্থাৎ একটা ভবিষ্যতের পরিণতি এবং আরেকটা অতীতের শুরুর সময়ে, দুই ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবেই একটা সিঙ্গুলারিটি থাকবে। এই তত্ত্বকে হকিং আর পেনরোজ দুজনের নামে বলা হয় হকিং-পেনরোজ সিঙ্গুলারিটি থিওরেম। 
           হকিং আর আর পেনরোজ এই দুই পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী তাঁদের সিঙ্গুলারিটির তত্ত্ব আবিষ্কারই করতে পারতেন না ১৯৫৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় প্রথমবার প্রকাশিত ওই পেপারের একটি গাণিতিক সূত্র ছাড়া। গর্বের বিষয় সেই গাণিতিক সূত্রটি প্রণীত হয়েছিল এক কৃতি বঙ্গসন্তান দ্বারা।
    
             মহেন্দ্রলাল সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা কাল্টিভেশন অফ সাইন্স এর অধিকর্তা তখন মেঘনাদ সাহা। প্রতিষ্ঠান কাজ করে মূলত পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের এর ওপর। নানা যন্ত্রপাতির ক্রমাঙ্কন, পরীক্ষাগারে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা এ সবই হচ্ছে তখন প্রতিষ্ঠানের কাজ। এরকম সময়ে কলকাতার সাইন্স কলেজ থেকে অমল নামের একটি ছেলে যুক্ত হল ইনস্টিটিউশনে। ছেলেটির উৎসাহ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে। মহাবিশ্বের রহস্য তাকে অপার বিস্ময় প্রদান করে। সে যখন মাস্টার্স ডিগ্রি করছে তখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার ওপর কাজ করছেন ফাউলার চন্দ্রশেখর ওপেনহাইমার যাদের নাম আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। হোয়াইট ডোয়ার্ফ, নক্ষত্রের পরিণতি, ম্যাজিক স্ফিয়ার বা ডার্ক স্টার (ব্ল্যাক হোল নাম তখনো আসে নি, খুব আদি পর্যায়ে কৃষ্ণগহ্বরের একটা ধারণা যা সোয়ার্জচাইল্ডের তত্ত্ব থেকে এসেছিল, সেরকম একটা ধারণা পোষণ করা হত। হুইলার কৃষ্ণগহ্বর নামকরণের আগে এরকম বস্তুকে এইসব নামেই ডাকা হত) এইসবই তখন তাকে বুঁদ করে রেখেছিল। অথচ কাল্টিভেশনে এসে তাকে ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানে যা তার একেবারেই না পসন্দ। কাজের জায়গা পছন্দ হচ্ছে না। অথচ ইন্সটিটউশন ছেড়েও সে কিন্তু যেতে পারছে না। তাকে আটকে রাখছে ইনস্টিটিউশনের লাইব্রেরির সম্ভার। প্রচুর প্রচুর বই এর সন্ধান সে পাচ্ছে লাইব্রেরি থেকে যার মধ্যে তার পছন্দের বিষয়ের বইও রয়েছে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ অব্দি সে থেকে গেল ইনস্টিটিউটে।      ১৯৪৯ এ আশুতোষ কলেজে একটা অস্থায়ী লেকচারের পদে যোগ দিল। এই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিখিল রঞ্জন সেনের সংস্পর্শে আসে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন জেনারাল রিলেটিভিটি নিয়ে একমাত্র নিখিল রঞ্জন সেনদের গ্রুপ কাজ করছিলেন। কলেজে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সে এই অধ্যাপকের সেমিনারগুলোয় উপস্থিত থাকতে শুরু করল।
     ১৯৫১ সালে আবার সে কাল্টিভেশনে ফিরে এলো। এবার স্থায়ী রিসার্চ ফ্যাকাল্টি হিসেবে। ১৯৫৩ সালে কাল্টিভেশনে থাকতে থাকতেই সে তার প্রথম গবেষণা পত্রটি লিখল যা সাধারণ অপেক্ষবাদের অনেকদিনের সমস্যার সমাধানের দ্বার খুলে দেয়। ১৯৫৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর কাল্টিভেশন অফ সাইন্সে গবেষণারত ছেলেটির তিরিশ বছরের জন্মদিনের দিন কাল্টিভেশন অফ সাইন্সেই একদল বরিষ্ট বিজ্ঞানীদের সামনে সে তার পেপারটি পেশ করল। ছেলেটির এই দিনটির কথা খুব ভালোভাবে মনে ছিল যেহেতু সেটা তার জীবনের বিশিষ্ট্য একটা দিন এবং ঘটনাক্রমে সেটা তার জন্মদিনেরই দিন। ইকুয়েশনটা শুধুমাত্র যে স্পেস-টাইমের যে কোনো অবস্থার একটা সাধারণ ইকুয়েশন শুধু তাই নয়, যেখানে যেখানে বস্তু আছে এবং যেখানে শক্তি, ভরবেগ,,চাপ আর shear stress(এর বাংলা পাওয়া গেল না। বিষয়টা অনেকটা একটা বাক্সের দুটো পাশ দু হাত দিয়ে ধরে এক হাত দিয়ে বাক্সটাকে ওপর দিকে চাপলে আরেক হাত দিয়ে বাক্সটাকে নিচের দিকে চাপলে বাক্সটা যেরকম চাপ অনুভব করবে সেরকম চাপ) থাকবে, সেই জায়গাতেই এই ইকুয়েশন কাজ করবে। যেমন সুনামির ক্ষেত্রে যে shear stress থাকে তার কস্টিক পয়েন্ট অর্থাৎ যেখানে সুনামির প্রাবল্য সর্বাধিক, সেই কস্টিং পয়েন্ট বের করা সেটাও এই ইকুয়েশন দিয়ে সম্ভব। 
     কাল্টিভেশনের ওই সিনিয়ার বিজ্ঞানীদের পক্ষে তখনই আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না অমল নামের ওই ছেলেটির সূত্রটা কতটা শক্তিশালী! সে যে মহাবিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের সমাধান করে ফেলেছে সেটা কাল্টিভেশনের এক ঘন্টার সেই সেমিনারে উপস্থিত থাকা বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। পরিবর্তে তাকে ইনস্টিটিউট থেকে প্রফেসার প্রিয়দারঞ্জন রায়ের সাথে দেখা করতে বলা হয় এবং প্রিয়দারঞ্জন রায় তাকে বলেন 'অমল, ওইসব রিলেটিভিটি ফিটি ভুলে যাও, তুমি কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি নিয়ে কাজ করো'। প্রফেসার তাকে অনেক বই পত্তরও দেন পড়াশোনা করার জন্য। এমনকি ১৯৫৫'র মাসে যখন ফিজিকাল রিভিউতে প্রকাশিত হয় এই পেপারটি, তখনও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে খুব একটা সাড়া জাগায় নি। অবশেষে ১৯৫৫ সালে হামবুর্গে পাস্কাল জর্ডান সেমিনারে সৌভাগ্যবশত পদার্থবিদ রতনলাল ব্রহ্মচারী উপস্থিত ছিলেন। যিনি পরে ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞ হন। রতনলাল ব্রহ্মচারী লক্ষ্য করেন জ্যোতির্পদার্থবিদ অটো হেকমান আর এঙ্গেলবার্ড শুকিঙ্গ 'রায়চৌধুরি ইকুয়েশন' বলে একটা পেপার নিয়ে বেশ আগ্রহের সাথে আলোচনা করছেন। রতনলাল ব্রহ্মচারীর মাধ্যমে অমল কুমার রায়চৌধুরীর কাছে খবর এসে পৌঁছায় যে বিদেশে তার 'ইকুয়েশন' এর খুব আলোচনা চলছে। এর দশ বছর পরে যখন হকিং পেনরোজ সিঙ্গুলারিটি থিওরেম প্রকাশিত হল এই রায়চৌধুরী ইকুয়েশনকে চাবিকাঠি করে ততদিনে অমল কুমার রায়চৌধুরী প্রেসিডেন্সিতে অধ্যাপক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২০ সালে রজার পেনরোজ ব্ল্যাক হোল গবেষণার জন্য যখন নোবেল প্রাইজ পেলেন, ততদিনে প্রয়াত হয়েছেন একেআর।
            প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরীকে আম বাঙালি স্টিফেন হকিং বা রজার পেনরোজের মত অত ভালোভাবে না চিনলেও প্রেসিডেন্সির যারা পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী, বিশেষত ১৯৬১ থেকে ১৯৮৮ অব্দি, তাঁরা প্রত্যেকেই একেআর নামের সাথে সুপরিচিত। তিনি যে একজন বিখ্যাত গবেষক বা উজ্জ্বল পদার্থবিদ ছিলেন শুধু তাই নয়, শিক্ষক হিসেবেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর 'রায়চৌধুরী ইকুয়েশন' যদি নাও থাকত, শিক্ষক হিসেবেই তিনি একজন জ্যোতিষ্ক হিসেবে বিরাজমান থাকতেন। তাঁর শিক্ষক জীবনের অসংখ্য গল্পের মধ্যে দুটি খুব বিখ্যাত গল্প তাঁরই ছাত্রদের মুখে শোনা যেখানে বোঝা যায় বিখ্যাত 'একেআর স্যার' হিসেবে তিনি তাঁর ছাত্রদের কীভাবে আগলে রাখতেন। এছাড়াও তাঁর স্বভাবগত রসিকতাও গল্পদুটির মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে।  
             সাতের দশক। ঘোর নকশাল আমল। প্রেসিডেন্সিতে ক্লাস করাচ্ছেন একেআর। ঠিক সেইসময়ে কয়েকটা ছেলে হইহই করে এসে ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়াল। লক্ষ্য ক্লাসরুমের মধ্যের তাদের বিরোধী ছাত্র ইউনিয়নের একটা ছাত্র। ক্লাস শেষ হলেই তাকে তারা ধরবে এবং উত্তম মধ্যম দেবে। একেআর বুঝে যান সেটা। ক্লাস শেষ হওয়ার পর তিনি বাইরের সেই ছাত্রদের মুখোমুখি দাঁড়ান। জিজ্ঞাসা করেন তোমরা এখানে কেন? ছাত্রদের মধ্যে যে একটু নেতা গোছের, সে বলে স্যার আমরা অমুকের সাথে একটু দেখা করব। ইতিমধ্যে সেই অমুক ছাত্রটি ক্লাসরুমের ভেতর দিয়ে টিচার্স রুমে ঢুকে সেখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ভূগোলটা যারা জানেন তারা এই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। ক্লাস রুমের ভেতর দিয়েই টিচার্স রুমে আসা যাওয়া করা যেত। 
     নেতা গোছের ছাত্রটির কথা শুনে একেআর বললেন 'কিন্তু আমি যতদূর জানি সে তো তোমাদের সাথে দেখা করতে চায় না'।
    'না স্যার, ওর সাথে আমাদের দেখা করতেই হবে' ছাত্ররাও নাছোরবান্দা। 
   স্যার বললেন 'তোমাদের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে তোমরা ছেলেটিকে পছন্দ করো না। আর ছেলেটিও আমি জানি তোমাদের পছন্দ করে না। তো তোমারা কেউই যখন কাউকে পছন্দ করো না তখন সব থেকে ভালো সমাধান হচ্ছে তোমরা কেউই কারো সাথে দেখা করো না'।
    ছাত্র নেতার ছাত্রদের বক্তব্য 'স্যার আপনি বুঝতে পারছেন না, ও আমাদের ইউনিয়নে ছিল, ভুল করে অন্য ইউনিয়নে চলে গেছে। ছেলে যখন ভুল করে তখন অভিভাবক হিসেবে বাবাই তো তাকে বোঝাবে! আমরা ওকে বোঝাতে এসেছি'। 
    স্যার বললেন, 'ও তুমি ওর বাবা! আচ্ছা। আমি আসলে বুঝতে পারি নি তোমাকে দেখে'। 
   ছাত্ররা এরপর আর স্যারের সামনে কোনো প্রতিযুক্তি খাঁড়া করতে না পেরে রণে ভঙ্গ দেয়।
   ওই সাতের দশকেরই ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন কুড়ি দফা কর্মসূচী। তাঁর দলের ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ছাত্রদের জন্য একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছে। সেই প্রশ্নের মধ্যে একখানা প্রশ্ন রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কুড়ি দফা কর্মসূচী সম্পর্কে তোমার কী মত। সেই প্রশ্নের উত্তরে একজন ছাত্র লিখেছে 'পুরো ধাপ্পা'। ছাত্র ইউনিয়ন তো সেই উত্তর দেখে রেগেই অগ্নিশর্মা! কোনোরকমভাবে একেআর উক্ত ছাত্র আর ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা স্যারকে বলে, 'স্যার দেখুন, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচীকে কীভাবে লিখেছে! আপনি বলুন স্যার এভাবে লেখা কি ঠিক হয়েছে?' 
   স্যারের জবাব 'ছোটর মধ্যে গুছিয়ে ভালোই তো লিখেছে!' স্যারের কথার ওপরে আর কথা চলে না। সে যাত্রায় উক্ত ছাত্রটি ছাত্র ইউনিয়নের হাত থেকে স্যারের জন্য বেঁচে গেল।

     এই ছিলেন একেআর। খুব কম শিক্ষকই হয়ত এভাবে ছাত্রদের আগলে রাখে। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা একেআর স্যারের প্রচুর প্রতিষ্ঠিত ছাত্র এখনো একেআর বলতে অজ্ঞান। বাঙালির অনেক আক্ষেপের মধ্যেই আরো বড় এক আক্ষেপ যোগ হতে পারে হাতেগোণা কয়েকটা ইনস্টিটউশন ছাড়া বিখ্যাত এই অধ্যাপকের জন্মশতবর্ষ সম্পর্কে আর কেউ অভিহিতই হল না। আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে ১৯২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর যে মহীরুহের জন্ম হয়েছিল, তাঁর জন্ম বাঙালির অনায়াসেই গর্বে বুক ফুলে ওঠার কথা।

(পরের গল্প দুটি কাল্টিভেশন অফ সাইন্সে একেআর এর জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে প্রফেসার পলাশ বরণ পালের মুখে শোনা। দ্বিতীয় ছবিতে কাল্টিভেশনেরই ওই অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্সির বর্তমান ফিজিক্স এর হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট প্রফেসার অরুনাভ চক্রবর্তীর প্রাক্তন হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট প্রফেসার একেআরের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।)

রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

শায়নাদের স্বপ্ন ~ দিপসিতা ধর

এই যে এক চিলতে ঘর দেখছেন, এ আমার লন্ডন এর দুদিনের ঠিকানা। মেয়েটির নাম ধরে নিন শায়না, কেরালার পালাক্কাদ এর মেয়ে। বাবা মুটে মজুরী করেন, মা ও। একটা ভাই একটা বোন, ছোটো। এক বছর আগে ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি তে Data Science পড়তে এসেছিলো কেরালা সরকারের স্কলারশিপ এ। স্কলারশিপ এ কোর্স ফি হয়ে যায়, কিন্তু থাকা খাওয়া? সপ্তাহে ৩ দিন Mcdonalds এ কাজ করে ও, ৬ ঘন্টা ৩ দিন। সপ্তাহে ১৮ ঘন্টার বেশি কাজের অনুমতি নেই ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস দের। তাতে থাকা খাওয়া চলে যায়, চলে যাওয়ার মতোই। এই দু তলার ১০x১০ ঘরের মাসিক ভাড়া ৬০০ পাউন্ড, ভারতীয় মুদ্রায় ৬০,০০০ টাকা। ফ্যান নেই, ফ্যান এর টাকা আলাদা, এই মুহূর্তে ফ্যান কেনার টাকা নেই শায়নার, তাই ৩০-৩১° সেলসিয়াসে কখনো ভেজা তোয়ালে, কখনো ভেজা জামা সম্বল। যদিও এসব ভাবার সময় নেই ওর, সামনেই dissertation, তারপরে একটা চাকরি, শাটোর্ধ মা কে আর মাল বইতে দেবে না শায়না।

শায়না একা নয় গোটা লন্ডন জুড়ে কয়েক লক্ষ ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার ওয়ার্কিং স্টুডেন্টস দের দেখা মিলবে। কেউ ফাস্ট ফুড সেন্টার, ডেলিভারি ওয়ার্কার, ভালো জীবন এর লড়াই ক্লান্তিহীন দৌড়। গত বছরই SFI United Kingdom সার্ভে করেছ, উঠে এসেছে এমন নানা তথ্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর MP দের কাছে রুম রেন্ট কন্ট্রোল এর আবেদন ও করেছে ওরা।

শায়না গল্প করছিলো, ফ্লাইট এ টিকিট কাটার পয়সা ছিলো না ওর, বন্ধুরা ধার করে ভিসা, কোর্স এর ডাউন পেমেন্ট দিয়েছিলো, কিন্তু টিকিট হবে কি করে? SFI UK এর বিশাল দায়িত্ব নিলো, এখানকার কমরেড দের সাথে নিয়ে চাঁদা করে টিকিট কাটা হোলো শায়নার। স্বপ্ন উড়ান।

আপাতত শায়না দের স্বপ্ন বাঁচানোর লড়াই এ অনেকটা পথ হাঁটা বাকি, লড়াই বাকি অনেকটা।

বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৩

নিরীহাসুরের খিক্স ~ ডাঃ সব্যসাচী সেনগুপ্ত

ইমারজেন্সি নাইট ডিউটি চলছিল সেদিন। রাত পৌনে বারোটা-র মতো বাজে। হুড়মুড় করে পেশেন্টের পর পেশেন্ট আসার আর বিরাম নেই। এসেই যাচ্ছে তো এ-সে-ই যাচ্ছে। নাগাড়ে। কাতরাতে কাতরাতে। ঝাঁপাতে লাফাতে। এবং...অতি অবশ্যই–খিস্তাতে খিস্তাতে! হুঁ হুঁ বাওয়া, যে সে দিন তো আর নয়! 'অমৃৎ মহোৎসব'-ওয়ালা স্বাধীনতা দিবস বলে কথা। বন্যার স্রোতের মতো রোগী যে আসবেই, এ কথা তো জানাই ছিল আগেভাগেই। 
                         অন্তত পঞ্চাশ জনকে ভর্তি করে ফেলেছি এলরেডি। মদ খেয়ে হুড়ুম বাইক চালিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন করতে গিয়েছিল বেটা-বিটিরা। ওই সেই তারাই এসে যাচ্ছে। নাগাড়ে। কারো খুলি ফেটে দুই ভাগ, কেউ লেংচে, কারোর ডান হাতখানি আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়ে লটপট করছে পতাকার মতোই। নারী পুরুষের বিভেদ নেই। 
        হ্যাঁ, স্বাধীন আমরা হতে পেরেছি বটে– এ কথা বোঝা যাচ্ছিল বেশ রকম। আর... তারই মাঝে, ওই যে বললাম, রাত তখন পৌনে বারোটা মতো হবে, উর্ধস্বসে উর্ধ্বশ্বাসে রোগী দেখে চলেছি আমি। 

এক্ষণে, আপাতত,  আমার সামনে চারটে ট্রলি পরপর দাঁড়িয়ে। একটিকে পরীক্ষা করছি পেট টিপে টুপে। সম্ভবত গল ব্লাডারে পাথর হয়েছে তার। বিশেষ স্থানে একটু চাপ দিতেই হাউ মাউ করে চিল্লাছে বিকট। পিছনের অপেক্ষমান ট্রলিগুলির একটিতে হাঁফানি, বাকি দুইখানি বাইক দুর্ঘটনা ঘ্রিয়াওঁ। বাতাসে বাতাসে তখন আমার ম ম করছে মদের গন্ধ ফুরফুরিয়ে। 

এমত সসেমিরা অবস্থায় হঠাৎ খেয়াল হলো, কাঁধে টুকটুক করে টোকা মারছে কেউ একজন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই – টলটলায়মান এক ছোকরা। আঙুল উঁচিয়ে কি যেন একটা বলার চেষ্টা করছে চোখ মুখ কুঁচকে। বাম কানের স্টেথোর ইয়ার পিস সরিয়ে ঠাহর করলাম সেকেন্ড খানিক।টলটলায়মান যুবকটির বক্তব্য। শোনার পরেও, বুঝতে সময় লাগলো আরো সেকেন্ড খানিক। ছেলেটি যা বলছে স্খলিত ভাষ্যে, তার অর্থ হলো– "দশ সেকেন্ড"। 
হ্যাঁ ওই একটি কথাই সে বলে যাচ্ছে নাগাড়ে–, দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড। 

খানিকটা ভ্যাবলার মতোই জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম তাই –" কী হয়েছে ভাই? কী দশ সেকেন্ড?" 
ফলাফল হলো ভয়াবহ। নিজের বাম হাতের তর্জনীটি দেখিয়ে বললো যুবক–" দেখতে পাচ্ছিস, পা-চ্ছি-স? হারামি?"

খিস্তি আমরা, স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক শুনেছি। সেসব কথা এখন বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে বেমালুম। তবুও, জীবনের প্রথম খিস্তি শোনার গল্পটা নাহয় বলেই যাই খানিক।

এ ঘটনা বছর বিশেক আগেকার। ইন্টার্নশিপ চলছে তখন আমার। বিদেশ ফেরত এক প্রফেসর পড়াতে এলেন আমাদের সার্জারি ওয়ার্ডে। সকালের রাউন্ড চলছে, আর স্যারের পিছু পিছু ঘুরছি আমরা। গন্ডগোলটা বাঁধলো এক্কেবারে শুরুয়াতি পেসেন্টেই। রোগীটি গতরাতেই ভর্তি হয়েছে। আঘাত পেয়ে, রক্ত জমেছে মস্তিষ্কে। ফ্রন্টাল লোব। আর তাই, হাত পা তার বেঁধে রাখা হয়েছে দড়ি দিয়ে। 
যখন পৌঁছেছি সদলবলে আমরা রাউন্ড দিতে, রোগী তখন সেই বাঁধা হাতই টেনেটুনে চোখের উপর রেখে ঘুমাচ্ছে বিন্দাস। সিনিয়র পি.জি.টি ( পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেইনি), অভ্যাস মাফিক বলতে গেলো তড়বড়িয়ে–" স্যার, ইটস আ কেস অফ ফ্রন্টাল লোব হেমাটোমা। একটু সামলে হ্যান্ডেল করতে হবে। হ্যাঁ... এই...এই যে ভাই... তাকাও তো...।" 
                      বিলেত ফেরত স্যার ক্ষেপে গেলেন দুম করে– " হোয়াট ননসেন্স ইজ গোয়িং অন! হাত বেঁধে রেখেছো? হোয়াট এবাউট হিউম্যান রাইটস! ছিঃ! আর তোমরা কি পেশেন্ট এক্সামিনেসন প্রশিজিওর টুকুও ভুলে গেছো ভাই? ইউ হ্যাভ টু গ্রিট দা পেশেন্ট ফার্স্ট। লেট মি ডেমনস্ট্রেট। দ্যাখো, কি ভাবে করতে হয় এসব।"  
              এই ব'লে ট'লে, ভদ্রলোক টাই গুছিয়ে পেসেন্টের কানের পাশে গেলেন ধীরে ধীরে। তারপর রোগীর চোখে ঢাকা কনুইটি ধরে, তুমুল ভালোবাসা ঝরিয়ে বললেন– " হেক্সকিউজ মি স্যার, ক্ষমা করবেন । মাই সেলফ...আমি... আপনার ডক্টর। একটু দেখব আপনাকে। আপনার হাতটা সরাতে হচ্ছে আমাকে, ক্ষমা করবেন। পিউপিল এক্সামিন করব। স্যার... শুনছেন... স্যার...এলাউ মি প্লিজ।" 
                      উত্তরে, পেশেন্টটি এক ঝটকায় হাত সরিয়ে বলেছিল– "এই কোন খানকির বাচ্চা ঘুম ভাঙালি রে গাঁড়মারানি?"
                      স্যার, সভয়ে ছিটকে গিয়েছিলেন। আমরা ফ্যাকফ্যাক করে হেসেছিলাম। আর পি জি টি বলেছিল– "স্যার বললাম না? ফ্রন্টাল লোব? ফ্রন্টাল লোব ড্যামেজ হলে তো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না স্যার। "
                     

 তো ওই। ওই শুরু আমার খিস্তি শোনার। কখনো রোগের উপসর্গের কারণে। কখনো আবার দাদা কিংবা দিদির আশীর্বাদ ধন্য বলে। মোটমাট কথা এই যে, বাবা এবং মা ধর্মী খিস্তি, আমাদের রোজকার বরাদ্দ। অবাক হই না তাই আর। ফলত,  সেদিন ইমারজেন্সিতে টলটলায়মানের মুখে 
"হারামি" শুনেও তাই ঘাবড়ে যাইনি এতটুকুও। বরং একটু  অবাক হয়েই দেখেছিলাম, ছেলেটির বাম তর্জনীতে এট্টুসখানিক খেটে গেছে। আর তাই নিয়েই সে তড়পে যাচ্ছে–" দশ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ডের মধ্যে মাই টিটমেন্ট না হলে,মাডার করে দেব তোকে বাঁড়া।" 

নিজের কষ্টটা সব্বার কাছেই সবচাইতে বেশি 'কষ্ট', একথা যদিও অনস্বীকার্য। ঠিক তেমনই এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে 'ট্রায়াজ' নামক একটি বিষয় আমাদের পড়তে হয়েছে পাঠ্যক্রমে। যে ' ট্রায়াজ'-এর মোদ্দা কথা হলো– যদি জরুরি বিভাগে তোমার সামনে একসাথে একাধিক রোগী এসে উপস্থিত হয়, তবে সব্বার আগে তাকেই দেখবে, যার অবস্থা সবচাইতে সঙ্গীন।

ট্রায়াজ বোঝাবো, এমন স্বাধীনতা আমরা ছিল না। ছেলেটি ততক্ষণে কলারে হাত দিয়েছে,– " দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড বাঞ্চত...দশ সেকেন্ড দিলাম তোকে। "

হিসাব মাফিক এ সময়ে সিকিউরিটি অথবা পুলিশের কথাই মনে আসা উচিত প্রথমে। কিন্তু... আসে না। আমাদের। আমাদের মানে, আমরা যারা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের। পুলিশ বা হোমগার্ড যদিও একজন থাকেন বটে। তবে তাঁদের উপর অলক্ষ্যে নির্দেশ থাকে– ঝামেলা করতে যাবেন না। যা হচ্ছে হতে দিন। 
বিডিওর রুমের বাইরে দণ্ডায়মান সান্ত্রী কিংবা ব্যাংকের ম্যানেজারের কেবিনের বাইরের নিরাপত্তা যতখানি, যে সবখানে স্রেফ প্রবেশ করতে হলেও রক্তচক্ষু দেখতে হবে তুমুল, তার দশ ভাগের এক ভাগও পাওয়া যাবে না সরকারি হাসপাতালে হুলিগ্যান তান্ডব চললেও। অথচ, পদাধিকার বলে, উপরিউক্ত আমরা সক্কলেই  'গ্রূপ A' অফিসার। অথচ, সবটাই সরকারি পরিকাঠামোর অফিস। 

যাক গে যাক। যাক সে কথা। তর্ক করব না। সে রুচিও নেই।  মোটমাট বিষয় এই যে, পুলিশের ভারী বয়ে গেছে আমাকে কলার ধরে কেউ 'বাঞ্চত' বললে। এ তো আমাদের, স্বাস্থ্যকর্মীদের জানা কথাই। আর তাই আমাদের ইন্ডিজেনাস পদ্ধতিতে ভরসা করতে হয় সর্বদা। অধুনা যার নাম- জুগাড়। 
          এবং সেই 'জুগাড়'ই করলাম। খুব শান্ত ভাবে বললাম–" ইউ টক ইংলিশ? ওকে! আই টক ইংলিশ টু। ওয়ান থেকে দশ কাউন্ট করুন তো স্যার। যদি তার মধ্যে আপনাকে না দেখি, দেন লাথ মারুন আমাকে। ফাক মি।  কই! কী হলো? শুরু করুন, কাউন্ট। ওয়ান টু...। করুন। করুন।"

                ব্যাস! তারপর আর কি! আমি ট্রলিতে শায়িত ওই চারজনকে তো দেখলামই। তারপরেও আরো জনা চার পাঁচ জনকে দেখে ফেললাম বিন্দাস। এবং শেষমেশ ফাঁকা হলাম যখন, তখন ছোকরার সামনে এসে বললাম এক গাল হেসে–
" দেখলেন তো? দাদা? দশ সেকেন্ডও লাগলো না?"
ছোকরা তখনও পাখি পড়ার মতো বলে যাচ্ছে– 
" পাঁ-চ! পাঁচ। বাঁড়া পাঁচের পর কী? এই সঞ্জয়? বোকচোদ? পাঁচের পর কী বাঁড়া?...ফাইভ...
সি– হিক্স। হিক্স।"

যাওয়ার আগে রীতিমত আমার পা ছুঁয়ে গিয়েছিল ব্যাটা। বলেছিল–" দশ সেকেন্ডও লাগলো না বস তোমার। তুমি...শুওয়ের বাচ্চা গড বাঁড়া। ভগবান। হিক্স। "

এবং আরো একবার বেঁচে বর্তে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম আমি। খিক্স।

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৩

ভানু বন্দ্যোাধ্যায় ~ কৌশিক মজুমদার

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটে দোষ ছিল। 

তিনি নিজেই বলেছেন সাংবাদিক রবি বসুর কাছে। এক, তিনি টাকা ধার দিয়ে ফেরত চাইতে পারতেন না। দুই, নিজের জন্য কিছু চাইতে পারতেন না। আর তিন, সেটাই সবচেয়ে ঝামেলার, তিনি কারও অন্যায় কথাবার্তা সহ্য করতে পারতেন না। আর এই শেষেরটার জন্য কত মানুষের অপ্রিয় হয়েছেন কতবার। 

সেই সেবার এক ইন্টালেকচুয়াল স্টার থিয়েটারে বসে একমনে মহাশ্বেতা দেবীর কুৎসা গাইতে ব্যস্ত। কেন তিনি বিজন ভট্টাচার্য্যকে ছেড়ে অজিত গুপ্তকে বিয়ে করলেন তা নিয়ে রসিয়ে চারটি গপ্পো করছিলেন। বোঝেন নি ভিতরেই ভানুবাবু আছেন। আচমকা বাইরে এসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন "আচ্ছা মশাই আপ্নের পিতৃদেব এই বৎসর কত বিঘা জমিতে ধান চাষ দিছেন?"
ভদ্রলোক অবাক। "আমার বাবা ধান চাষ করবেন কেন? তিনি তো দেহ রেখেছেন অনেকদিন হল"
"বেশ। তবে বাঁইচা গেছেন। জীবিত থাকলে জিগাইতাম মহাশ্বেতা দেবী আপনের কয় বিঘা জমির পাকা ধানে মই দিসে যে আপনের ইন্টালেকচুয়াল পুত্তুর তারে লইয়া প্যাচাল পাড়তাসে? জন্মের সময় এমন পোলারে নুন দিয়ে মাইরা ফেলেন নাই ক্যান?" 

আবার এই ভানুই যখন জানতে পারেন এইচ এম ভি নতুন কমেডিয়ান সুশীল চক্রবর্তীকে ভাগিয়ে দিয়েছে, বলেছে ভানু ছাড়া কারও রেকর্ড করবে না, তখন তিনিই ফোন করে শর্ত রাখেন "সুশীলের রেকর্ড করলেই আমি রেকর্ড করুম। নয়তো গুডবাই"। এইচ এম ভি মেনে নিতে বাধ্য হয় তার কথা। 

আমরা দুর্ভাগা এখনও আশিতে আসিও না, মাসিমা মালপোয়া খামু, ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট কিংবা ওরা থাকে ওধারে-র "অরে আর ঢুকতেই দিমু না" কিংবা কমেডি স্কিটে ইনি আর গীতা দে-র সেই সব অসামান্য নাটকের বাইরেও যে এক সিরিয়াস ভানু আছে, তা আমরা মানতে নারাজ। কমেডিয়ানদের সমস্যা হয়তো এটাই। কেউ মানতেই চায় না কমেদি ইজ এ সিরিয়াস বিজনেস। সেই সৌমিত্রবাবুর গল্পটা মনে পড়ে। তখন আর্টিস্ট ফোরাম আর শিল্পী সংসদ নিয়ে চরম দোলাচল। ভানু এসেছেন সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আলোচনায়। গাড়িতে বসে কথা হচ্ছে। এমনসময় প্রায় ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে এক ফাজিল জিজ্ঞেস করলে "কেমন আছেন ভানুবাবু?"। ভানু একটু বিরক্ত। বললেন "আগে যেমন ছিলাম" বলে আবার আলোচনা শুরু করলেন। 
সে থামবার পাত্র নয় । রস করে বললে "আগে কেমন ছিলেন সেটাও ত জানি না"
ভানু এবার চার অক্ষরের এক গালি দিয়ে বললেন "সেটা যদি নাই জানো, এখন কেমন আছি জাইন্যা কি করবা?"  

মাত্র ১২ বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন ভানু। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে গুরু মানতেন৷ তাঁদের কাছেই সংগ্রামের প্রথম পাঠ । এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় রিভলভার পাচারও করেছেন বহুবার। সত্যেন বসুর প্রিয় এই মানুষটি তরুনকুমারকে একবার দেখা করাতে নিয়ে গেছিলেন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সে গল্প কে না জানে? অবশ্য তাঁর কাছে তিনি ভানু নন। সাম্যময়। বাংলা সিনেমায় বাঙাল বা পুব বঙ্গের কমেডিকে প্রায় একার কাঁধে বয়েছেন এককালে। ঠিক যেমন এই ছবিতে নায়িকা রুমাকে বইছেন।  

আজ তাঁর জন্মদিন। প্রণাম রইল।

শুক্রবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৩

যাদবপুরের গল্প ~ কৌশিক মজুমদার

লোয়ার সার্কুলার রোডে কলকাতার সবচেয়ে ধনী পার্সি সদাগর রুস্তমজী কাওয়াসজী বানাজী এক বিরাট বাগান বানিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকার মত বাড়ি। গৃহ প্রবেশের দিন বল নাচ, বাই নাচ হয়েছিল। এসেছিলেন স্বয়ং বড়লাট লর্ড অকল্যান্ড। এই বাগানবাড়িতেই ১৮৫২ সালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে মানেকজী রুস্তমজী এই বাড়ি থেকেই ব্যবসা চালাতেন। ১৮৭৪ সালে তাঁকে কলকাতার শেরিফ করা হল। তিনিও এই বাড়ি, এই বাগান ছেড়ে উঠে এলেন সাহেবপাড়ায়। সেই বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে হিন্দুমেলার আয়োজন শুরু হল। ১৮৭৬ সালে পটলডাঙ্গার বসুমল্লিক পরিবারের দীননাথ এই বাগান কিনে নেন। কিন্তু আগের মালিকের নাম অনুসারে পার্সিবাগান নামটুকু রয়ে যায়। আর আশেপাশের এলাকা মানেকজির নামে মানিকতলা নামে ডাকা হত। 

বসুমল্লিকরা এই বাগান ধরে রাখতে পারেন নি। তাঁর দুই ছেলে নগেন্দ্র আর যোগেন্দ্র মিলে এই বাগান যখন কালীকৃষ্ণ ঠাকুরকে বিক্রি করেন তখনই এর মৃতপ্রায় দশা। ১৮৯৮ সালেই ইন্দিরা দেবীর প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে লেখেন-

কাল ওঁরা একদল... একটা কি প্রকাণ্ড বাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন – পার্সিবাগান - নামটা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি, কিন্তু কখনো দেখিনি। শুনলুম খুব জাঁকালো মস্ত ব্যাপার, যদিও অযত্নে পড়ে আছে ঘরের অবধি নেই, সর্বত্র মার্বেল পাথর বসানো, কেতাদুরক্ত বাগান, ফোয়ারা, ফুলের গাছ ইত্যাদি যেমন বাদশাহী কাণ্ড হতে হয়।
ধীরে ধীরে এই বাগান নষ্ট হয়ে বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যায়। প্রায় দশ বারো বছর এর নাম কেউ শুনল না। 

আচমকা ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার দিন আদর্শের বিরোধে তারকনাথ পালিত মশাই কারিগরী শিক্ষার জন্য এক আলাদা সংস্থার প্রস্তাব দিলেন। ভোটাভুটি হল। তিনি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে আলাদা বেঙ্গল টেকনিক্যাল স্কুল খুলবেন বলে ঠিক করলেন। করলেন তো বটে, কিন্তু খুলবেন কোথায়? সেই কাজেই ৩০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে পার্সিবাগানের পড়ে থাকা বাগানবাড়ি ভাড়া করা হল। ১৯১২ সালের শেষের দিকে এটি পঞ্চবটি ভিলায় চলে গেলে আশুতোষ মুখুজ্জের সহায়তায় পার্সিবাগানের জমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় সায়েন্স কলেজ। 

আর সেই টেকনিক্যাল স্কুলের কি হল? ১৯২৪ সালে সেটি স্থানান্তরিত হল যাদবপুরে। এই যাদবপুর আবার সোনারপুরের জমিদার যাদবচন্দ্র সরকারের নামে।

কিন্তু যাদবপুরেই কেন? আসলে আধার প্রস্তুত ছিল আগেই। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার এখানেই  প্রতিষ্ঠা করেন  Indian Association For The Cultivation Of Science , ১৯০৬ তে রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিক , ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ও অন্যান্যদের বদান্যতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয় । যে যাই হোক, নতুন কলেজের নাম হল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলোজি। স্বাধীনতার পরে  সেটাই আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

সঙ্গে রইল সরকারী আদেশনামার প্রথম পাতা।

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০২৩

প্রসঙ্গ CCTV ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


এ নিয়ে হাজার একটা কথার ফুলঝুরি হয়ে যাওয়ার পরেও দুটো লাইন লিখতে ইচ্ছে হল। কারণ একটাই। বহুবার দেখেছি যে নাকের ডগায় বুম আর মুখে তাগ করে জুম এই অবস্থায় দুম করে বলে দেওয়া কথাবার্তার ওপরে দাড়িয়েই আজকাল জনমত তৈরি এর চেষ্টা চলছে এবং সেটা সফলও হচ্ছে। চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, ওসব অবকাশ নেই, দু মিনিট ইনস্ট্যান্ট ম্যাগীর মতো ইনস্ট্যান্ট সব সমাধান চলে আসছে আমাদের সামনে আর আমরাও অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই সেগুলো টপাটপ গিলে ফেলেছি। অথচ একটু তলিয়ে ভাবলে আমরা কি দেখতে পাবো ?
যে সব কলেজ বা বিশ্ব বিদ্যালয় তে যথেষ্ট সংখ্যক সিসিটিভি আছে সেগুলোর সব কটা তে ragging বন্ধ হয়ে গেছে ? উত্তরটা হল, না বন্ধ হয় নি। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে ragging বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলির সবকটিতে সিসিটিভি বসানো আছে। এর ও উত্তর হল না, বসানো নেই। Ragging বন্ধে সিসিটিভি এর অনস্বীকার্য কোনো ভূমিকা তাই আদৌ প্রতিষ্ঠিত নয়। এবার যারা প্রবল ভাবে চাইছেন যে সিসিটিভি দিয়ে যাদবপুর মুড়ে ফেলা হোক, প্রতিটি কোনায়, প্রতিটি ইঞ্চিতে তাদের দাবির যথার্থতা মেনে নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। আচ্ছা, সিসিটিভি বসালে ঠিক কি সুবিধে হবে ragging আটকানোর ? আজ্ঞে না, এটা বোকার মতো প্রশ্ন নয়, সত্যি করেই বলুন না কি কি সুবিধে হবে। অনেকেই বলবেন, কেন, এতে ওই দুষ্কৃতি ধরা পড়বে, দেখতে পাওয়া যাবে কে বা কারা ওই অপকর্ম করছে, মানুষের চোখ কে ফাঁকি দেয়া যায়, ক্যামেরার চোখ কে নয়। ঠিকই তো। এই বার আসছে দ্বিতীয় প্রশ্ন।
যারা নজরদারি চালাবেন সেই কর্তপক্ষের চোখে ধরুন ধরে নিলাম যে ওই অপকর্মের খল নায়ক এরা ধরা পড়লো (যদিও তার সম্ভাবনা খুবই কম কারণ ওই অপকর্মের বেশিরভাগ টাই হয় হোস্টেলে বন্ধ দরজার আড়ালে যেখানে সিসিটিভি এর চোখ নেই)। তারপর ? আপনি আমি কি শিওর যে তারপরে কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে ? আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কি বলে ?
যে কিশোর ছাত্রটি মারা গেল, তার হোস্টেলে একজন সুপার ছিলেন, মনে পড়ে ? হোক সামান্য বেতনভুক কর্মচারী, ছিলেন তো একজন। তাঁর অভিজ্ঞতা কি ? তিনি খোলাখুলি স্বীকার করছেন j তিনি হোস্টেলের বারান্দা ঘর কোনো কিছুতেই টহল দিতেন না, নজরদারি চালাতেন না, বলা ভালো, পারতেন না ভয়ের চোটে। হোস্টেলের গেটে সিকিউরিটি কর্মীরা মোতায়েন ছিলেন। হতে পারে তারা আরো সামান্য বেতনের নগন্য কর্মচারী, তবুও ছিলেন তো। তাদের সামনে দিয়ে বহিরাগত দের অবাধ আনাগোনা, নিষিদ্ধ মাদকের চালান, কোনো কিছুই বাদ যায় নি। তারা আটকানোর চেষ্টাই করেন নি, বা পারেন নি, ভয়ের চোটে।
দিনের শেষে মোদ্দা কথা এটাই দাড়ায় যে অনৈতিক, অসামাজিক এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম বন্ধ করতে সিসিটিভি কোনো জাদুমন্ত্র হতে পারে না যেমনটা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বা অব্যবহার বা অপব্যবহার নয়, শেষ কথা বলে কর্তৃপক্ষের, প্রশাসকের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, এবং সাহস। কোন কর্তৃপক্ষের, কোন প্রশাসকের, এবং তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক দেশের কোন শাসক দলের মধ্যে আমি আপনি সেই সদিচ্ছা, সেই আন্তরিকতা সেই সাহস দেখেছি ? ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে ওই দ্বায়িত্বে থাকা মানুষজনের একজনও পদত্যাগ করেছেন ?
রাজনীতির ঘোলা জলে মাছ ধরতে যাওয়ার নামে, লাশের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে যাদবপুরের মাটিতে নিজেদের দলের একটু জমি শক্ত করার কুৎসিত প্রতিযোগিতা ছাড়া তাদের কাছ থেকে আমরা কি উপহার পেয়েছি ? একটি কিশোরের অকাল মৃত্যুতে ব্যথিত, বিচলিত, ক্রুদ্ধ জনতা যাতে এই অস্বস্তিকর প্রশ্ন না তুলতে পারে তার জন্যই তার মুখে ওই সিসিটিভি এর ললিপপ গুঁজে দেয়ার এত তোড়জোড়। প্রশ্ন করিস না বাপ। সিসিটিভি চুষে খা। খা সিসিটিভি।

বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৩

সত্যি ভূতের গল্প ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত



একটা ভূত তখন তারক জিডিএ এর সঙ্গে থাকে। প্রাইমারি হেল্থ সেন্টারের পুকুর পাড়ের পেছল পথ ধরে তারক যখন বর্ষার রাতে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার থেকে একহাতে ছাতা আর অন্য হাতে কলবুক নিয়ে ডাকতে যায় ভূতটা তখন সঙ্গে থাকে। তারকের পাশে পাশে হাঁটে। আশেপাশের ঘাস জঙ্গলের বনে, ভেঙে পড়া পাম্প হাউসের ইটের পাঁজায় বসে থাকা দাঁড়াশ আর কালাচগুলোকে ভূতটা আঙ্গুল তুলে শাসানি দেয়। খবরদার তারকের কাছে আসিস না।

আরেকটা ভূত তখন নীলিমা সিস্টারের সঙ্গে থাকে। মাঝরাতে এপিএইচ ব্লিডিং এর পরে ক্লান্ত ফ্যাকাসে মায়ের ঠান্ডা হয়ে আসা হাতটা ধরে লেবার রুমের আলোয় চ্যানেল করার জন্য ভেন খুঁজতে গিয়ে হয়রান নীলিমার মাথার ওপর দিয়ে ভূতটা উঁকি দেয়, স্পট ল্যাম্পটা একটু বাঁকিয়ে ফোকাস ফেলে হাতের ওপর। এই তো অনায়াসে শিরার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে জেলকোর সরু সূচ।

আরেকটা ভূত তখন অয়ন ডাক্তারের সঙ্গে থাকে। ভোর রাতে সাপে কাটা বাচ্ছা ছেলেটার শরীর থেকে নেয়া রক্ত টোয়েন্টি ডাবলুবিসিটির টেস্ট টিউবে ঢেলে দিয়ে অয়ন যখন ইমারজেন্সি ঘরে কুড়িজন পেশেন্ট পার্টির তৈরি করা চক্রব্যূহে অভিমন্যুর মতো অপেক্ষা করে তখন ওই ভূতটাইতো অয়নের কাঁধে বসে ভরসা দেয়। কানে কানে বলে আরে কিচ্ছু হবে না, এরা ভালো লোক, রুগী মরে গেলেও তোর গায়ে হাত দেবে না। অয়ন ভরসা পেয়ে সিরিঞ্জ ঢোকায় এভিএস এর শিশিতে। 

তারক রিটায়ার করে যায়। নীলিমা বদলি সুপার স্পেশালিটিতে। অয়ন নিট পিজিতে চান্স পেয়ে পড়তে। হেল্থ সেন্টারে রাতে আর রুগী আসে না। লোকে ভূতের বাড়ি বলে বদনাম দেয়। ভূতগুলো খালি এমনি এমনি হেল্থ সেন্টারের এঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ায়। 

নীলিমার যত্ন করে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে বাঁধানো রেজিস্টারগুলোতে ওরা হাত বোলায়। তারকের গজ থান কাটার কাঁচিটা সযত্নে কাচ ভাঙা আলমারিতে তুলে রাখে। অয়ন এর নিজের পয়সায় কেনা চা খাওয়ার সেই ইলেকট্রিক কেটলির জল ফেলে মুছে দেয়। ওরা আশায় থাকে। আরেকটা তারক, আরেকটা নীলিমা, আরেকটা অয়ন কবে আসবে আবার। ওদের বড় একা লাগে। ওদের মন খারাপ হয়। ভূত বলে কি ওরা মানুষ নয় ?

ব্লকের নতুন বড় ডাক্তারবাবু আসে। পিএইচসির এ ঘর, ও ঘর ঘুরে দেখে। ভূত গুলো খবর পেয়ে শেওড়া গাছ থেকে সুরুৎ করে নেবে আসে। খুব খটোমটো নাম, সুহৃদ না সুরহিত কি একটা। ওদের চোখে চোখে কথা হয়। এ কি পারবে হাল ফেরাতে ? অভিজ্ঞ ভূতেরা মাথা নেড়ে কচিগুলোকে স্বান্তনা দেয়, দেখছিস না, এক্কেবারে ছেলেমানুষ বিএমওএইচ, গোঁফ ওঠেনি ভালো করে, মনে তো হয় পারবে না। তবে চোখ দুটো খুব জ্বলজ্বলে। কচিগুলো মাথা নেড়ে সায় দেয়, পারবে না, পারবে না। গাছের পাতাগুলো সায় দেয়। 

সুহৃদ না সুরহিত ডাক্তার বোধহয় শুনতে পায়, চোখ দুটো সত্যিই জ্বলে ওঠে। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, রকে  বসে আড্ডা দেয়া, মাস্তানি করা সবই তো এই গ্রামে। পারবে না মানে। ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি।  জামার হাতা দুটো গুটিয়ে নিয়ে কাজে নামে। এখান থেকে দুটো টাকা জোগাড় করে ওখানে একটু চুনকাম, সেখান থেকে তিনটে টাকা যোগাড় করে ইলেকট্রিকের নতুন একটা লাইন। ডেপুটি সিএমওএইচ তিন এর কাছ থেকে ভিক্ষে করে চারটে নতুন লোক। ধেড়ে ভূতগুলো দেখে আর বড় বড় নিশ্বাস ফেলে, হচ্ছে টা কি বাপু, বাপের জন্মেও দেখিনি। 

দিন নেই, রাত নেই মোটর সাইকেল দাবড়ে সুহৃদ না সুরহীত ডাক্তার পি এইচ সি থেকে ঢোকে আর বেরোও। নীলিমা সিস্টারের জায়গায় মায়া, ছায়া, আরো চারজন নতুন সিস্টার। তারা তাদের স্যার কে দেখায়, ঐখানে একটা বেসিন লাগবে স্যার, আর এইখানে অটোক্লেভ এর প্লাগ পয়েন্ট। সব লেগে যায় একে একে।  কিচ্ছুটি চুরি হয় না, ভেঙ্গে যায় না। কচি ভূতেরা পাহারায় আছে যে। 

ডেপুটি সিএমওএইচ এক এর লোকেরা সাদা হাতি করে নামিয়ে দিয়ে যায় স্যালাইন এর পেটি। ডেপুটি সিএমও এইচ দুই পাঠায় এন্টি স্নেক ভেনম সিরাম। তারকের জায়গায় কাজে আসা নতুন জিডিএ চন্দন, নন্দনরা ফটাফট নামিয়ে ফেলে সে সব। ভূতগুলোও হাত লাগায়। ফার্মাসিস্ট বিপুল কোথায় কোনটা রাখবে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে চুমুক দিয়ে ফেলে ঠাণ্ডা চায়ের কাপে। একটা ছোকরা ভূতকে ধমক দিয়ে গরম চা নিয়ে আসতে বলে। সুরহিদ ডাক্তার দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করে।  ইটের পাজায় পাশাপাশি বসে দাঁড়াশ আর কালাচ দুটো দেখে চোখ মেলে।

আবার গুটি পায়ে একটি দুটি রুগী আসে সন্ধ্যে বেলায়, মাঝরাতে। ভর্তি হয়, স্যালাইন চলে, মুখে গোঁজা হয় থার্মোমিটার, পেটে পড়ে প্যারাসিটামল। ভূত গুলো জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। ছায়া সিস্টার ভাবে বাতাসে উড়ে গেল পর্দা বুঝি।

কচি ভূতগুলো ধেড়েদের দু য় দেয়, তবে যে বলেছিলে পারবে না, পারবে না। তোমরা বুড়োরা হেরে ভূত। এই শুনে ধেড়েগুলো হাসে। কচিগুলোও। হাসতে হাসতে কেঁদেও ফেলে। বাইরে তখন শ্রাবণ মাসের অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ভূতদের চোখের নোনা জল মিশে যায় উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যমগ্রামের, উত্তমগ্রামের, অধমগ্রামের মাটিতে। ভূত বলে কি আনন্দে কাঁদতে নেই ?

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৩

স্বাধীনতা ৭৫ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষন দেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা। সেটা প্রচার করে সরকারি গণমাধ্যম। ক্ষমতায় না থাকা মানুষজনের সে ক্ষমতা নেই। তারা কেবল আপনাদের কিছু শোনাতে পারে এই মাধ্যমে। ভাষণ নয়, গল্প, গল্পও ঠিক নয়, সত্যকাহিনী। শুনতে চাইলে এগিয়ে যান। 

প্রথম কাহিনী ১৯৩২ সাল:-
ওই সময় সবে পরীক্ষা দিয়ে উঠেছে ওই কিশোর, সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল তখনো বাকি। ভগত সিং এর প্রথম শহিদ বার্ষিকী পালনের কথা হচ্ছে। গর্ভনর এর সেদিন জলন্ধর থেকে ৪০ কিমি দূরে হোসিয়ারপুর দেখতে আসার কথা। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করলো যে সেদিন জেলা আদালত প্রাঙ্গনে ইউনিয়ান জ্যাক এর বদলে ত্রিবর্ন পতাকা ওড়ানো হবে। এই কর্মসূচি বানচাল করার জন্য জেলা শাসক আর্মি মোতায়েন করেন আর কেউ পতাকা তোলার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করার আদেশ জারি করেন। 



সেদিন হোসিয়ারপুর পোঁছে মন খারাপ কিশোরের। শুনলো পতাকা তোলার কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস অফিস সম্পাদক হনুমানজির কাছে কিশোর দাবি করলো, কেন বাতিল হল। উনি প্রশ্ন করলেন, গুলি চালানোর আদেশ এর কথা ঐ কিশোর জানে কি না। তাই শুনে খেপে গিয়ে কিশোর পাল্টা বললো, "গুলি খাওয়ার ভয়ে আপনারা হাল ছেড়ে দিলেন ? এত জাতির প্রতি অপমান!" উনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসেন," এতই যদি তোমার সাহস, তাহলে তুমিই পতাকা তুলে দেখাও।"

কিশোরটি অফিসের একটি ডান্ডায় লাগানো পতাকা খুলে নিয়ে কোর্টের দিকে দৌড় দিল, সেই আদালত যাকে সেই সময়ে ব্রিটিশ শক্তির একটা নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। কর্মসূচির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়াতে তখন পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে একটু ঢিলেঢালা ভাব। তার সুযোগ নিয়ে সিঁড়ি টপকে ছাদে উঠলো কিশোর, ইউনিয়ন জ্যাক খুলে নামিয়ে দিল, লাগিয়ে দিল ত্রিবর্ন পতাকা। তাই দেখার পরে গুলি চালানো শুরু হয়। দুটো গুলি কিশোরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়, গায়ে লাগেনি। ডেপুটি কমিশনার বাখলে বেরিয়ে আসেন। কিশোরটিকে বাচ্চা ছেলে দেখে তিনি গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ দেন। কিশোর স্লোগান দিতে শুরু করে। তার কাছে কোনো অস্ত্র নেই,সে নিরস্ত্র এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেনারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায়।

পরের দিন বিচার শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞেস করলে কিশোর বলে, "আমার নাম লন্ডন তোড় সিং।" আসল নাম কিছুতেই বের করতে পারেনি। যা করেছে তার দায় স্বীকার করে কিশোর, ভগত সিং এর অনুপ্রেরণার কথা বলে। ওর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। "মাত্র এক বছর ?" ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বাড়িয়ে চার বছর কারাবাস এর আদেশ দেন।" 

সেদিন জাতীয় পতাকা তোলার জন্য প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে আসা কিশোরের আসল নাম হরকিসেন সিংহ সুরজিৎ। ডান্ডা বেড়ি পরে অকথ্য পরিবেশে হাজতবাস করা সেদিনের সেই কিশোর পরবর্তীকালে ভারতের মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় কাহিনী, এবার ১৯৪২ সাল:-
"ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে যোগ দিয়েছে এক ছাত্রী। ১৫ আগস্ট জেলে বন্দী অবস্থায় মারা গেলেন গান্ধীজির সচিব মহাদেব দেশাই। অহল্যার নেতৃত্বে ছাত্রীরা পথে নামলো প্রতিবাদে। মিছিল। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হল ছাত্রীটি, হল তিনমাসের জেল, পুণের ইয়েরওয়াড়ায়। জেলের মধ্যে থাকাকালীন আবার অবাধ্যতার জন্য শাস্তি হয় ছাত্রীটির, বন্ধু ইন্দুতাই কেরকারের সাথে সাত দিনের সলিটারী। 

সেই ছাত্রীটির নেতৃত্বে ঠিক হয় ইয়েরওয়াড়া জেলের উঁচু পাঁচিল সাজানো হবে জাতীয় পতাকায় যাতে দূর দূর থেকে লোক দেখতে পারে। প্রথমে মহিলা বন্দীদের কাছ থেকে শাড়ি সংগ্রহ করা হয়। তার পরে সেগুলির কাপড় থেকে সেলাই করে তৈরি হয় জাতীয় পতাকা। এবার ওড়ানো হবে সেই পতাকা। কিন্তু কি ভাবে ? মহারাষ্ট্রে ছেলেরা একজন আরেকজনের পিঠে কাঁধে চড়ে হিউম্যান পিরামিড তৈরিতে ওস্তাদ। সেই আইডিয়া ধার করে মেয়েদের দিয়ে তৈরি হয় হিউম্যান পিরামিড। জেলের প্রাচীরের ওপরে পৌঁছে গিয়ে তোলা হয় জাতীয় পতাকা। ছাত্রীটির মুঠি বাঁধা হাত তখন আকাশের দিকে। 

ছাত্রীটির নাম অহল্যা রঙ্গনেকর যার জঙ্গী মনোভাব দেখে পদবি পাল্টে ডাকা হত অহল্যা "রণরঙ্গিনী" বলে। ছাড়া পাওয়ার পরে মহিলা সংগঠনের নেত্রী, মুম্বাই এর কর্পোরেটর, সাংসদ, সিআইটিইউ এই ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য।

এবার তৃতীয় ও শেষ কাহিনী, ১৯৪৭ সাল:-
শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে এই কমরেড প্রথমে কংগ্রেসে তার পরে কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টিতে। তার পরে মোহ ভঙ্গ হয়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীনতার আগেই অসংখ্যবার কারাবরণ, অত্যাচার সহ্য করা আবার আরেকদিকে প্রথম শ্রেণীর বন্দীর আরাম আয়েশ অগ্রাহ্য করে জেল ভেঙে বেরিয়ে আসা। কালিকট এ ১৯৪৬ সালে পার্টির প্রার্থী। কংগ্রেস এর হাতে হেরে যাওয়া। গণ আন্দোলনে আবার ঝাঁপ পুনাপ্রা ভায়ালার, বিড়ি শ্রমিক ধর্মঘট, চিড়াক্কল কৃষক বিদ্রোহ। 

মাদ্রাজে তখন প্রকাসম মন্ত্রিসভা। কমরেডকে আবার জেলে ভরা হল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের সেই রাতে কুন্নুর জেলের সলিটারী সেলের গারদ ভেদ করে ভেসে আসছে আওয়াজ, "মহাত্মা গাঁধীজি কি জয়, ভারতমাতা কি জয়।"। কমরেড এর নিজের জবানিতে, "গোটা দেশ অপেক্ষায় আছে কাল সকালের সূর্যোদয়ের, তার পরেই শুরু হবে উৎসব। কতজন কত বছর ধরে অপেক্ষা করছে, সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছে। আমিও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আনন্দিত যার জন্য আমি জীবন-যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলাম।" কমরেড বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন কংগ্রেস এর হাতে বন্দী হয়ে, আর তারই এককালের সহকর্মী তখন বিশ্বের সামনে ভাষণ দিচ্ছেন "নিয়তির সাথে অভিসার"।

পরের দিন সকাল। একটা তেরঙা পতাকা জোগাড় করে সেটা তুলে জেল চৌহদ্দির পরিধি বরাবর হাঁটলেন কমরেড। তারপর জেলের ছাদে তোলা হল সেই পতাকা। সব বন্দীরা তার সামনে জড়ো। কমরেড তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তাদের বুঝিয়ে বললেন দিনটির তাৎপর্য। নেমে এসে আবার সলিটারী সেল। জেলার এর বদান্যতার  কয়েক ঘন্টার মেয়াদ শেষ। 

কমরেড এর নাম এ কে গোপালন। ছাড়া পাওয়ার পরে পাঁচ বার সাংসদ। ভারতের মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এর প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন। 


পোকায় খাওয়া একটা দেশ লাভের ৭৫ বছরের বেশি বুড়িয়ে যাওয়া অগ্রাহ্য করে কাল আবার সেই জাতীয় পতাকা উঠবে দেশের কোনায় কোনায়। আসুন, একবার, সেই পুরোনো রংচটা তিনটে পতাকার কথা মনে করে একটু রং লাগাই। হোসিয়ারপুর আদালতের মাথায়, ইয়েরওয়াড়া জেলের প্রাঙ্গনে, কুন্নুর জেলের পাঁচিলের ওপর পতপত করে উড়তে থাকা সেই পতাকা, আমার আপনার প্রিয় তেরঙ্গা।

মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

২২শে শ্রাবণ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আজকের দিনে যে মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি আমাদের মধ্যে কতটা জড়িয়ে ছিলেন তার ব্যাপ্তি হিসেবে চারটে ছোট্ট গল্প শোনাবো। 

ঘটনা এক। সুদূর বিদেশের। "ঘটনাটা ঘটেছিল পোল্যান্ডের বুকে। ১৯৪২ সাল, পোল্যান্ড তখন পুরোপুরি নাৎসি সেনাদের দখলে। ৩৫ লক্ষ ইহুদি জানেন না আদৌ এই সময় পেরিয়ে যেতে পারবেন কিনা। ধরে ধরে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। হয় তাঁদের ক্রীতদাসের মতো খাটানো হচ্ছে, আর নয়তো মেরে ফেলা হচ্ছে। সেইসময় পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরের বুকে একটি অনাথ-আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন ইয়ানুস কোরচাক নামে এক ব্যক্তি। তাঁর আশ্রমের প্রায় ২০০ বালক-বালিকার সকলেই ইহুদি। তাদের জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইহুদি ঘেটোতে। ঘেটো মানে বিরাট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জেলখানা। সেই সময়েও শিশুদের হাত ছেড়ে দেননি কোরচাক। তিনিও আশ্রয় নিলেন সেই ঘেটোর মধ্যেই। সেখান থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ত্রেবলিনকা মৃত্যুকূপে। কাউকে আবার প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। তাঁদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা ইহুদি। মৃত্যু আর বেশি দেরি নেই। এই সত্যিটা বুঝতে সময় লাগেনি। আর এই মৃত্যুচেতনার মধ্যে সেদিন আবারও আশ্রয় দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবি নিজে ততদিনে পাড়ি দিয়েছেন সেই পাঁচমুড়ো পাহাড়ের নিচে, শ্যামলী নদীর ধারে – আর এই অসহায় শিশুদের গন্তব্যও সেখানেই। খুব শিগগিরি। নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন কোরচাক। কিন্তু এই শিশুরা! এদের তিনি প্রস্তুত করবেন কীভাবে? ঠিক করলেন সেই ইহুদি ঘেটোর মধ্যেই একটি নাটক অভিনয় করাবেন শিশুদের দিয়ে। কী সেই নাটক? নাটকের নাম 'পোচতা'। পোলিস ভাষায় যার অর্থ 'ডাকঘর'। হ্যাঁ, ১৮ জুলাই ১৯৪২, রবীন্দ্রনাথের সেই অমল আর দইওয়ালার কথোপকথনের সাক্ষী ছিল সেদিন ঘেটোর মধ্যে মৃত্যুর জন্য দিন গুনতে থাকা অসংখ্য মানুষ। যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী অমল তার নিশ্চিত ভবিষ্যতকে গ্রহণ করেছে আবিষ্কারের আগ্রহে। নাটকে অবশ্য অমল তার কাঙ্খিত রাজার চিঠি হাতে পায়নি। কিন্তু ইহুদি ঘেটোর সেই শিশুরা শমন পেল কিছুদিনের মধ্যেই। ৬ আগস্ট ১৯৪২, অর্থাৎ নাটকের অভিনয়ের ঠিক আড়াই সপ্তাহ পর কোরচাক, তাঁর সমস্ত সহকর্মী এবং ১৯৫ জন অনাথ বালক-বালিকাকে চলে যেতে হয় ত্রেবলিনকায়।অদ্ভুত এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিল সেদিন নাৎসি বাহিনী। কোরচাকের পিছনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্ত বালক বালিকা। একে একে তারা এগিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুকূপের দিকে। কারোর চোখেমুখে কোনো ভয় বা আতঙ্ক নেই। মৃত্যুকে তারা গ্রহণ করেছে সহজ ভাবেই। আর সেই নির্ভীক দৃষ্টি যেন আবারও রবীন্দ্রনাথের সেই কথাই মনে পড়িয়ে দেয়, 'আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়।"

ঘটনা দুই। ঘরের কাছে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ এর সময় নিউইয়র্ক এর পাকিস্তান রাষ্ট্রদূত দপ্তরের কর্মচারীরা দোটানায় পড়েছিলেন। কোনদিকে থাকবেন, একদিকে ফরেন সার্ভিসের উঁচু লোভনীয় পদ, পোস্টিং অন্যদিকে চালচুলোহীন নবীন রাষ্ট্র তৈরি হলেও হতে পারে। মন্ত্রী এনায়েত করিমকে তার বন্ধু কথা সাহিত্যিক ও কবি শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহবান জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি পাঠ করে করিম সাহেব ও আরো চোদ্দজন বাঙালি রাজপুরুষ মনস্থির করে পদত্যাগ এর পরে যোগ দেন মুক্তি সংগ্রামে। পরে ওরা বলেছিলেন যে ওসমান এর চিঠির শেষ চারটে লাইন তাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেই লাইন গুলি ছিল: "জমা হয়েছিল আরামের লোভে/ দুর্বলতার রাশি,// লাগুক তাহাতে লাগুক আগুন,/ ভস্মে ফেলুক গ্রাসি।" 

ঘটনা তিন। নিজের দেশের মাটিতে।।"..জেলার সাহেব আমাদের নারায়নদা ও নিরঞ্জনদা (ডা নারায়ণ রায় ও নিরঞ্জন সেন সেলুলার জেলে বন্দী দুই বিপ্লবী ও পরে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের নেতা)কে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বললেন, দুঃখের বিষয় মোহন, মোহিত ও মহাবীর (১৯৩৩ সালের অনশন ধর্মঘটের তিন শহীদ মোহনকিশোর নমদাস, মোহিত মৈত্র ও মহাবীর সিং) তিন জনেই মারা গেছে। সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হল। বন্দীদের মুখে কোনো কথা নেই। নীরব প্রতিজ্ঞার মাঝে শুধু অশ্রু ঝরছে। এর পর থেকে অনশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর 'সেল' খোলে নি। ২৪ ঘন্টা সেল বন্ধ। এই আবদ্ধ অবস্থায় সেল থেকে সেলে চিৎকার করে জানিয়ে দেওয়া হল - আরো বেশিদিন টিঁকে থাকতে হবে, চালিয়ে যেতে হবে। বন্ধুরা গান ধরল: "নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার"। 

ঘটনা চার। হৃদয়ের আরো কাছাকাছি। "১৯৩৮ সাল। রানীগঞ্জের কাছে বল্লভপুর পেপার মিলে শ্রমিক ধর্মঘট – তাতে পিকেটিং জোরদার করতে হবে।কর্মীরা সবাই জড় হয়েছে। ইউনিয়নের তরুণ নেতা কমিউনিস্ট কর্মী সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন মাত্র বিয়ে  করেছেন। নববধূ মিনতি করে চিঠি লিখেছিলেন সংগ্রামের আগে একবার দেখা করে যেতে। সুকুমার যেতে পারেন নি -আসন্ন কঠিন সংগ্রামের প্রস্তুতির কাজে। কর্মীরা সবাই জড়ো হয়েছেন। একজন হটাৎ বললেন, "সুকুমার, আজ একটা গান করুন না। কাল থেকে তো আর নিশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যাবে না।" উচ্চবাচ্য না করে হাতের চায়ের পেয়ালা এক চুমুকে শেষ করেই গান ধরলেন, "যাও,যাও,যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।" সবাই অবাক হয়েছিল, কি মিষ্ঠি গলা। প্রাণ ঢেলে গাইলেন। গান থামতেই সবাই সমস্বরে বলে উঠল - "আর একটি"।।বিনয় নম্র হেসে গলা ছেড়ে ধরলেন -"ওগো সুন্দর"। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনলে। সে গানের আওয়াজ কি গিয়ে পৌঁছল সেই বিশেষ ব্যাকুল হৃদয়ের কাছে। এর কয়েকদিন পরেই পিকেটার সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর দেহ নিষ্পিষ্ট হয়ে গেল মালিকের লরির চাকার তলায়। পুলিশের সাহায্যে ধর্মঘট ভাঙার জন্য লরিতে করে মালিক লোক আনছিল বাইরে থেকে।"

এই মানুষটি আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবেন? আমরাই  বা কোথায় যাবো তাঁকে ছেড়ে? আমাদের ঠাকুর তো একটাই। রবি ঠাকুর।

"বিদায় করেছ যারে নয়ন-জলে,
এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে?"

শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

পার্টি ও আপোষ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

ভাবতে খুব অবাক লাগে যে লেনিন কি কোনো জাদুমন্ত্র বলে জানতে পেরেছিলেন যে ভারতের নামের একটি দেশে একটি বামপন্থী দলের একটি ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চে যোগদানকে ঘিরে গোটা বঙ্গ রাজনীতি তে আলোড়ন পরে যাবে গোটা জুলাই মাস ঘিরে? যে যোগদানকে আপোস হিসেবে চিহ্নিত করতে ওই দলের একদল কর্মী সমর্থক উঠে পরে লাগবেন।

সেই দল যারা ঘোষিত ভাবে মার্কসবাদী লেনিনবাদী তাদের অভ্যন্তরীণ এই বিতর্ককে মাথায় রেখেই কি লেনিন আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন তার ব্যস্ত জীবনের মাঝে সময় বের করে? ঠিক কি লিখেছিলেন লেনিন একটু দেখা যাক। [সূত্র: লেনিন কালেক্টেড ওয়ার্কস ভলিউম ২৫ পৃষ্ঠা ৩০৯-৩১৪]

যে কোনো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লেখার সময় লেনিন যে ভাবে শুরু করতেন এই প্রবন্ধটা ও  সেভাবেই শুরু করছেন, আপোস শব্দটা র একটি সংজ্ঞা নির্মাণ করে। তাঁর ভাষায়, "রাজনীতিতে আপোস শব্দটি বোঝায় নির্দিষ্ট 
কিছু দাবির আত্মসমর্পণ, অন্য দলের সাথে চুক্তির মাধ্যমে অন্যদলের দাবির কিছু অংশ ত্যাগ করা।"

এরপরে লেনিন ওই আপোস নিয়ে তার পার্টির দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছেন। লেনিন বলছেন, "বলশেভিকদের সম্বন্ধে রাস্তায় ঘোরাফেরা করা একজন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ধারণা, যে ধারণা যে অপবাদ সংবাদপত্রের জগৎ উৎসাহের সাথে প্রচার করে, সেই অপবাদটি হল বলশেভিকরা কখনই কারও সাথে আপস করতে রাজি হবে না।

মনোযোগী পাঠকের কাছে আশা করা যায় যে এই শব্দগুলি নজর এড়িয়ে যাবে না, "সংবাদপত্রের উৎসাহ"। বামপন্থীদের নিজেদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দেখে, সংবাদ মাধ্যম কি ভাবে উল্লাস করেছে এই গোটা জুলাই মাসটা ধরে, কি ভাবে পার্টির মধ্যেকার ফাটলটা আরো চওড়া করা যায় উৎসাহ যুগিয়ে, কোনো আপোস নয় এই স্লোগানকে চ্যাম্পিয়ন করার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আপোসপন্থী হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে সেটা লেনিন বোধ হয় মুসোলিয়ামে শুয়ে শুয়ে দেখছেন আর হাসছেন। 

বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের পার্টি হিসেবে এই ধারণাটি আমাদের কাছে চাটুকারিতা মাত্র, কারণ এটি প্রমাণ করে যে এমনকি আমাদের শত্রুরাও সমাজতন্ত্র এবং বিপ্লবের মৌলিক নীতির প্রতি আমাদের যে আনুগত্য রয়ে গেছে সেটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবুও, আমাদের বলতে হবে যে এই ধারণাটি ভুল।"

কেন ধারণাটি ভুল, সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিন তুলে এনেছেন এঙ্গেলস যেভাবে ব্ল্যাঙ্কিপন্থী কমিউনিস্টদের সমালোচনা করেছিলেন সেই উদাহরণের কথা যেখানে এঙ্গেলস উপহাস করে বলছেন, "কোন আপস নয়!" এটি একটি ফাঁকা বুলি মাত্র, কারণ পরিস্থিতির জন্য প্রায়শই লড়াকু পার্টির উপর আপোষ করার বিষয়টা অনিবার্যভাবে চেপে বসে, এই বিষয়টা অস্বীকার করা অযৌক্তিক।" [মার্ক্স এঙ্গেলস সংগৃহীত রচনাবলী]।

এঙ্গেলস এর এই শিক্ষার সাথে লেনিন যোগ করছেন, "একটি সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টির কাজ এটা ঘোষণা করা নয় যে, সমস্ত আপস ত্যাগ করা অসম্ভব, তার কাজ হল এটাই যে, সব রকম আপসের মাধ্যমে, যখন সেগুলি অনিবার্য হয়, তখন তার নীতির প্রতি, তার শ্রেণির প্রতি, তার বিপ্লবী উদ্দেশ্যের প্রতি সৎ থাকতে থাকতে পারার মধ্যে দিয়ে বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করা এবং জনগণকে বিপ্লবে বিজয়ের জন্য শিক্ষিত করা"

আপোস শব্দটা শুনলেই যে সব কমিউনিস্টদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে, তাদের উদ্দেশ্যে লেনিনের সাবধানবাণীর তাৎপর্য এটাই যে, পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝে একগুঁয়ে এর মতো আপোস এর বিরোধিতা করার অর্থ হল ব্ল্যাঙ্কিপন্থায় আত্মসমর্পণ করা, এককথায় অতিবাম বিচ্যুতি, বাম সংকীর্ণতাবাদ। 

এই অবধি পড়ে যে সব আপোস পন্থীরা আহ্লাদে লাফালাফি করবেন আর যে সব আপোস বিরোধীরা এই লেখক কে দালাল ফালাল বলে দাগিয়ে দেয়ার তোড়জোড় করবেন তাদের একটাই অনুরোধ, আরেকটু পড়তে হবে। কারণ মূল প্রবন্ধের লেখকের নাম ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সফল বিপ্লবের বিচক্ষণ জনক হওয়ার পাশাপাশি তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা বিপ্লবীও বটে। তিনি জানতেন যে বাম সংকীর্ণতা বাদ এর গাড্ড থেকে পার্টিকে বাঁচাতে গিয়ে সেটা আবার ডান পন্থী বিচ্যুতির দিকে ঢলে না যায়। তিনি জানতেন যে সংশোধনবাদী এরা ভবিষ্যতে আপোস নিয়ে ওপরে লেখা তাঁর বক্তব্যকে প্রেক্ষিতহীন উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করার লোভ সামলাতে পারবে না। 

তাই একজন আদ্যন্ত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী হিসেবে লেনিন এইবার আসছেন আপোস প্রসঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্টে। আপোস করার দুটি স্পষ্ট ভাগ করছেন উনি। এক, যেখানে পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে আপোস করতে হয় কমিউনিস্ট পার্টিকে আর দুই, যেখানে সেই পরিমাণ বাধ্যবাধকতা নেই, কমিউনিস্ট পার্টি স্বেচ্ছায় আপোস করার রাস্তা বেছে নিচ্ছে। 

প্রথম পরিস্থিতির চেয়ে দ্বিতীয় পরিস্থিতির গুরুত্ব কিছু কম নয়, বরঞ্চ বেশি। কারণ সেখানে আপোস করা বা না করা দুটি পার্টি কৌশল প্রয়োগ করার রাস্তা খানিকটা খোলা আছে। সেই পরিস্থিতি তে কমিউনিস্ট পার্টি কি করবে ? লেনিন একটা ফ্রেম ওয়ার্ক তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যার জরুরী পয়েন্ট গুলি হল: 

এক) কমিউনিস্ট পার্টি কোনো অবস্থাতেই তার সরাসরি এবং প্রধান শ্রেণী শত্রু বুর্জোয়া পার্টি গুলিকে কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দেবে না, বড়োজোর মেনশেভিক ও সোস্যালিস্ট রেভ পার্টির মতো পাতি বুর্জোয়া দলগুলিকে দিতে পারে, তারা শাসক দল হলেও;
দুই) এই আপোস সমঝোতাকে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে ধরতে হবে, রুটিন নয়,;
তিন) এই সমঝোতা আপোস হবে অতি স্বল্প মেয়াদী ঘটনা, কোনো পাকাপাকি বন্দোবস্ত নয়;
চার) এই আপোস এর সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে কমিউনিস্ট পার্টি আরো শক্তিশালী হবে নাকি, বিপ্লবের পথ আরো সুগম হবে নাকি। 

ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চে কমিউনিস্ট পার্টির যোগদানের সিদ্ধান্তকে এইবার আপোস বিরোধী ও আপোসপন্থী দু'দল ই যদি এই লেনিনিয় ফ্রেম ওয়ার্ক এ ফেলে বিচার করেন তাহলে কমিউনিস্ট পার্টির এই অবস্থান নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। মুশকিল টা এইখানেই যে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য সমর্থকদের একটা বড় অংশ বিতর্কের বদলে বিশ্বাসে আস্থা রাখেন, "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর।"

একদল মনে করেন যে পলিটব্যুরো কোনো ভুল করতে পারে না, প্রায় কিং ক্যান ডু নো রং এর ঢংয়ে। অন্যদলের বিশ্বাস যে যাবতীয় প্রজ্ঞার উৎসস্থল হল জনগণের সাথে নিবিড় সংযোগ। ঠাণ্ডা ঘরে থাকা পলিট ব্যুরো থোড়াই জানে শ্রেণী শত্রুর হাতে সদ্য লাঞ্ছিত নিপীড়িত সংগ্রামী জনগণের মনের কথা। 

ভাবের ঘরে চুরি সেটা চুরিই। দু পাতা লেনিন পড়ে নিজেকে লেনিনের থেকেও বড় মার্কসবাদী ভেবে নেয়াটা যেমন ভুল, তেমনি পঞ্চায়েতে বুক দিয়ে বুথ আগলিয়েছেন বলেই ডলোরেসস ইবারুরি স্টাইলে "নো পাসারণ" বলে হুংকার ছাড়াটাও ভুল। ভাববাদের চর্চা তো অনেক হল, এবার কিঞ্চিৎ বস্তুবাদের চর্চা হোক, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের। বিতর্ক হোক  সেই পথ ধরে। লেনিন পথ দেখাবেন।

সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

মণিপুর ~ সুমিত সান্যাল

জীবিকার কারণে বহুদিন মনিপুরে যেতে হতো। প্রতি মাসে ৪ দিনের জন্য ইম্ফল যেতাম। আর প্রতি দুমাসে একবার চূড়াচাঁদপুর যেতাম। মণিপুরের মানুষ গুলোকে খুব কাছ থেকে চিনি। এখনও অনেক বন্ধু আছে মনিপুরে।
মণিপুরের শহরাঞ্চলে মিতেই সম্প্রদায়ের বাস। মিতেই সম্প্রদায় মণিপুরের মূল উপজাতি। এদের বেশিরভাগ পদবী সিং। ধর্ম হিন্দু। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের পরে শ্রীহট্ট থেকে বৈষ্ণব ধর্মগুরুরা গিয়ে এদের বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করে। মিতেই দের সংখ্যা শহরে প্রায় ৮২%। আর মণিপুরের পাহাড় ঘেঁষা গ্রাম গুলোতে মূলত কয়েকশ বছর ধরে নাগা, মিজো আর কুকিরা বাস করে।
 কুকিরা মূলত নাগাল্যান্ডের উপজাতি। খ্রিষ্টান পাদ্রীরা মিজো, কুকি ও নাগাদের বেশিরভাগ উপজাতি কে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করে। আর আছে মুসলিম এদের সংখ্যা ৮.৫% সারা রাজ্য। মণিপুরের রাজা ১০০০ মুসলিম সৈন্য বঙ্গ দেশ থেকে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের উত্তরাধিকারীরা মুসলিমদের মূল অংশ। মনিপুর রাজ্য ৪২.৪% হিন্দু ৪২.৩% খ্রিষ্টান আর ৮.৫% মুসলিম। তবে মিতেইরা বেশিরভাগ শহরে বাস করে।

 মিতেইরা মনে করে যে তাদের অঞ্চল কুকি,নাগা,মিজোরা অনুপ্রবেশ করে দখল করেছে। যা আংশিক সত্যি। তাই ছোটখাট জাতিভিত্তিক গন্ডগোল চিরকালই হয়। বড় গন্ডগোলও মিতেইদের সাথে কুকি বা নাগাদের হয়েছে। কিন্তু এতদিন এটা ছিল সম্পূর্ন জাতি ভিত্তিক। এমনিতে মিতেইরা ঠান্ডা প্রকৃতির ধর্মপরায়ণ জাতি। কয়েকশ বছর ধরে শ্রীহট্টর বাঙালিদের সাথে মিতেইদের সংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক। মণিপুরের ভাষার হরফ বাংলা হরফ। মিতেইদের ওপর বাঙালিদের প্রভাব কয়েকশ বছর ধরে। মিতেইরা শিক্ষিত জাতি ও প্রায় ১০০% হিন্দু বৈষ্ণব। কিন্তু এবার মিতেইদের সাথে কুকি বা নাগা বা মুসলিমদের গন্ডগোল কোন জাতি ভিত্তিক গন্ডগোল নয়। একে বারে ধর্ম ভিত্তিক গন্ডগোল। মণিপুরের জাতিসত্তা বজায় রাখতে কংগ্রেসের ও কমিউনিস্টদের একটা প্রধান ভূমিকা ছিল।
 কংগ্রেস তো এখানকার প্রধান দল ছিল আর কমিউনিস্ট বিশেষ করে সিপিআই এর একটা বড় সংগঠন ছিল। আর ছিল এমপিপি বা ওখানকার মনিপুর পিপলস পার্টি যারা জাতি ভিত্তিক রাজনীতি করত। কুকি ও নাগাদের রাজনৈতিক দল ছিল কিন্তু সব আঞ্চলিক ভিত্তিক। কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপি আসার পরই শুরু হলো ধর্মভিত্তিক দ্বন্দ্ব। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট দের সাংগঠনিক দুর্বলতায় বিজেপি ও আরএসএস মিতেইদের বোঝালো যে ওরা হিন্দু আর কুকি,মিজো ও নাগারা খ্রিষ্টান। বোঝালো যে একদিন খ্রিস্টানরা হিন্দুদের হটিয়ে মনিপুর দখল করে নেবে। সরলপ্রাণ মিতেইরা এটা বিশ্বাস করল আর একটা জাতিগত বিদ্বেষ সম্পূর্ন ধর্মগত বিদ্বেষে পরিণত হলো। মণিপুরের মানুষ নারীদের ভীষণ শ্রদ্ধা করে। ওখানে মহিলারা জাতির মূল চালিকা শক্তি। সেই মহিলাদের ধর্ষণ করে নগ্ন করে ঘোরানো মণিপুরের মিতেইদের সংস্কৃতির সম্পূর্ন পরিপন্থী ও আমার ভাবনার বাইরে।




 মার্কস বলেছিলেন ধর্ম মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে দেয় এটাযে কতটা সত্যি সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আজ মনিপুর তার জীবন্ত প্রমাণ। একটা হিন্দু বৈষ্ণব শান্ত শিক্ষিত জাতি ধর্মের ভাবাবেগে জন্তুতে পরিণত হয়ে গেল। এতদিনের গড়ে উঠা সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেল। বিজেপির ভোট রাজনীতি শুধু হিন্দু ভোটকে নিজের দিকে সংহত করতে ও কংগ্রেসের হিন্দু ভোট নিজের দিকে নিয়ে আসতে এরা মণিপুরের সব অংশের মানুষের বিরাট ক্ষতি করে দিল। এই ক্ষত শুকাতে কয়েক দশক লাগবে। একটা শিক্ষিত বৈষ্ণব ভাবধারায় বিশ্বাসী জাতিকে বিশ্ববাসীর সামনে ধর্ষক খুনীতে পরিণত করল। বিজেপির মতো দেশদ্রোহী পার্টি ভূ ভারতে তৈরি হয়নি। নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে এরা কতটা নীচে নামতে পারে মনিপুর তার একমাত্র প্রমাণ। আজ সুপ্রিম কোর্ট মণিপুরের ব্যাপারে একতরফা প্রক্রিয়া গ্রহণ করার ঘোষণা না করলে নরেন্দ্র মোদী সাংবাদিক ডেকে দুঃখের এই নাটক করত না। দুর্ভাগ্য ৭৮ দিন পর একটা গণধর্ষনের ব্যাপারে বিজেপি প্রশাসন মুখ খুললো বা খুলতে বাধ্য হলো। কারণ বিজেপি জানত হিন্দু ভোট সংহত করতে এই পুরো হিংসা,খুনের পটভূমি তাদের ও আরএসএস এর মস্তিষ্ক প্রসূত। এই গন্ডগোল চললে তাদের লাভ। ২০০২ সালে গুজরাট গনহত্যার পর ভারতে মণিপুরের মতো এত বড় গনহত্যা আর হয়নি। দুটো গনহত্যার পেছনেই বিজেপির মূল ভূমিকা। এই হলো বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার যে সরকার সরাসরি ধর্ম ভিত্তিক বা জাতি ভিত্তিক দাঙ্গা স্পন্সর করে। আজকের মনিপুর আমার কাছে সম্পূর্ন অচেনা। এ মনিপুর আমি দেখিনি এ মনিপুর আমি চাইনা। আমি আবার দেখতে চাই সেই মনিপুর যেখানে মিতেই,কুকি,মিজো,নাগা,মুসলিম সবাই একসাথে বাস করে। হিন্দু,খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে কোন ধর্মগত বিবাদ নেই।
 চার্চ আর মন্দির পাশাপাশি সহাবস্থান। তবে বিজেপি সরকারে থাকলে এটা কখনই সম্ভব নয়। ক্ষমতার জন্য এরা ধর্মে ধর্মে জাতে জাতে  হানাহানি করবেই। এদের মূল শত্রু ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই আবার বলব ২০২৪ সে বিজেপি হটাও দেশ বাঁচাও!

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০২৩

ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

কাঁথি হাসপাতালের নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে একটা কোর্সের পরীক্ষা ছিল। শেষবেলায় সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যখন ঘরে ফিরে আসছি তখন চোখে পড়েছিল একটি দৃশ্য। অতি সাধারণ। ওই কোর্সের এক ছাত্রীকে নিতে এসেছে তার স্বামী আর তার কিশোরী মেয়ে স্কুটার নিয়ে। 

ওই কোর্সের অনেক ছাত্রীই বিবাহিত, সন্তানের মা কারণ ওটা ছিল ইন সার্ভিস কোর্স। চাকরি করতে করতে ছুটি নিয়ে পড়া। সংসার সামলে, স্বামী, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করে ছাত্রী সুলভ টিপিক্যাল বয়েস পেরিয়ে এসেও অনেকেই যে অখন্ড মনযোগ সহকারে লেখাপড়াটা করলেন, থিওরি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেন তাদের চেয়ে অনেক ছোট সহপাঠিনীদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের কথাই আজ মনে পরে গেল কারণ আজ এক বিশেষ মহিলার জন্মদিন।

ঠিক কবে থেকে ওই মহিলা মানে কাদম্বিনী বসুর চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল সেটা জানতে পারিনি। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি যে ১৮৮২ সালে উনি এফ এ পাশ করার পরেই ডাক্তারি পড়ার চেষ্টা করেন কিন্তু গ্র্যাজুয়েট না হওয়ার কারণে সুযোগ পাননি। এর পরে ১৮৮৩ সালে বি এ পাশ এর মধ্যে উনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন নিজের থেকে ১৭ বছরের বড় বিপত্নীক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে। বিয়ের সময় দ্বারকানাথের দুই সন্তান, কন্যা বিধুমুখী আর পুত্র মানসিক প্রতিবন্ধী সতীশচন্দ্র। চিকিৎসক হওয়ার সেই অদম্য ইচ্ছে কিন্তু কমে নি। 

বি এ পাশ করার পরে আবার আবেদন করেন। 
মেডিক্যাল কাউন্সিল আপত্তি করে। বিদেশি শাসকের আমলাতন্ত্রের আপত্তির কারণ তবু কিছুটা আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এর সাথে দেশীয় লোকজনও হৈ চৈ শুরু করে। একটি মেয়ে ডাক্তারি পড়বে এমন অনাসৃষ্টি কান্ড তারা সহজে মেনে নেয় নি। মেডিক্যাল কলেজের একজন বাঙালি অধ্যাপকের তো ঘোর আপত্তি ছিল। 

বাজারী পত্রিকায় ২রা জুলাই, ১৮৮৩ সালে ওইসব আপত্তিকে তাদের বিবেচনায় "যুক্তিসঙ্গত" আখ্যা দিয়ে লেখা হল, "শ্রীমতি কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (বসু?) বি. এ. কলিকাতার মেডিকেল কালেজে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। মেডিকেল কালেজের অনেক শিক্ষক কয়েকটি প্রধান কারণ দর্শাইয়া স্ত্রীলোকদিগের উক্ত কালেজে প্রবিষ্ট করিবার সম্বন্ধে আপত্তি করেন। তাঁহারা বলেন, উক্ত কালেজে ছাত্র দিগের রাত্রিতে যখন কালেজে থাকিতে হয়, তখন দুইজন করিয়া ছাত্র একঘরে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্ত্রীলোক কিরূপ করিয়া পুরুষের সহিত এক ঘরে থাকিবে। এবং যখন ছাত্রদিগকে পুরুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বুঝাইয়া দিতে হয়, তখন পুরুষ শিক্ষক স্ত্রীলোকদিগকে কিরূপে উহা বুঝাইয়া দিবে। আরও অন্যান্য আপত্তির মধ্যে উক্ত কালেজের একজন ছাত্র বলেন যে নিয়ম আছে সমস্ত বক্তৃতাতে উপস্থিত না থাকিলে, পরীক্ষা তে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। এবং যদি এই পাঁচ বৎসরের মধ্যে কোন রমণীর গর্ভ হয়, তবে প্রসবকালীন তিনি কি করিয়া বক্তৃতায় উপস্থিত থাকিবেন ?"

এর বিপরীতে দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখ আন্দোলন করেন। এসব জানার পরে ছোট লাট রিভার্স অগাস্টাস টমসনের হস্তক্ষেপে মেডিক্যাল কাউন্সিল তাদের আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে কাদম্বিনীকে ভর্তির অনুমতি দেয়। বাধা বিপত্তি এড়িয়ে ভর্তি হয়েও বিপদ কাটেনি। কিছু পরীক্ষকের রোষে (সম্ভবত ওই বাঙালি চিকিৎসক অধ্যাপক ও ছিলেন তার মধ্যে) কাদম্বিনী মেটিরিয়া মেডিকা ও এনাটমিতে ফেল করেন। তাঁকে গ্রেস নম্বর দিয়ে পাশ করানো হয়। 

এই গ্রেস দেয়া নিয়েও পত্রিকা লেখে, "শ্রীমতী গঙ্গোপাধ্যায় মেটিরিয়া মেডিকা ও এনাটমিতে ফেল হন। এখন শুনিতেছি সিন্ডিকেটের দয়ায় তিনি এ পরীক্ষায় পাশ করেন" 

এই আপত্তিকর "দয়া" শব্দটা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা আমরা এক্ষুনি দেখবো। ১৮৮৮ সালে কাদম্বিনী গ্রাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ উপাধি পেয়ে কলেজ থেকে বের হন। এর পরে ১৮৯২ সালে স্বামী পুত্র কে বাড়িতে রেখে বিলেত যান আর ১৮৯৩ সালের মধ্যে এডিনবরা থেকে LRCPL এবং LRCS আর গ্লাসগো থেকে LFPS এই তিন খানি ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন। 

কোনোভাবে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল কাদম্বিনী (গঙ্গোপাধ্যায়) সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন।।১৮৮৮ সালের  ২০শে ফেব্রুয়ারি তিনি তার এক বন্ধুকে লিখছেন:-

"তুমি মিসেস গাঙ্গুলি সম্পর্কে কিছু জানো, আমায় কিছু পরামর্শ দিতে পারবে ? এর মধ্যেই ওই মহিলা সেই পাশ করে ফেলেছেন যাকে বলে মেডিসিন আর সার্জারিতে ফার্স্ট লাইসেনসিয়েট এর পরের মার্চে ফাইনাল এক্সামে বসছেন। এই ইয়াং লেডি, মিসেস গাঙ্গুলি নাকি বিবাহিত ! বিয়ের পরেই নাকি উনি ডাক্তার হবেন বলে মনস্থির করেন ! আর ওনার না কি একটি নয়, দুটি ছোট বাচ্ছা আছে ! ইনি বাচ্ছা হওয়ার পরে মাত্র তেরো দিন শুয়ে ছিলেন, একটাও লেকচার ক্লাশ না কি মিস করেন নি।"

মিস নাইটিংগেল নিজে একজন মেয়ে হয়ে বুঝতেন যে বিয়ের পরে, মা হয়ে যাওয়ার পরে, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, মেয়েদের পক্ষে কত কষ্টকর। তাও আবার সেই সময়ের ভারতে, বাংলাদেশে। তাই তার ওই ছোট্ট চিঠিতে বিস্ময়বোধক চিহ্নের এতো ছড়াছড়ি। সেই বিস্ময় বোধ থেকে জন্ম নেওয়া মুগ্ধতা, সে থেকে জন্ম নেওয়া শ্রদ্ধা, ভালোবাসা থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, উনি লেডি ডাফরিন কে সুপারিশ করছেন বাংলা তথা ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার এর একটা চাকরির জন্য, "ফর এনি পোস্টস এবাউট দ্যা ফিমেল ওয়ার্ড অফ ক্যালকাটা।

কাঁথি হাসপাতাল চত্বরের সেই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় দেখা দৃশ্যটা আজও মনে পরে। শিক্ষক নয়, একটু আগের পরীক্ষক নয়, আমি তখন নিছক দর্শক। আমাদের ওই ছাত্রীটি স্কুটারের কাছে গিয়ে মেয়ের গাল টিপে একটু আদর করে চেপে বসল স্বামীর পেছনে। কোমরটা একটু জড়িয়ে। দ্বারকানাথ আর কাদম্বিনীর যুগলমূর্তি এগিয়ে গেল গেটের দিকে। 

বিশ্বাস করুন, সেকালেও সহজ ছিল না, আজও সহজ নয়, খুব, খুব কঠিন কাজ। কাদম্বিনীদের প্রেরণা হয়ে ওঠার কাহিনীগুলো মনে রাখাটা তাই জরুরী আমাদের কাছে। কাদম্বিনীরা আমাদের আসে পাশেই আছে, চিনে নিতে হবে শুধু।

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০২৩

নেরুদা ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আজকের গল্পটার চারজন নায়ক আছেন। তার মধ্যে দু জন কবি, একজন আবার নোবেল পুরষ্কার পাওয়া, একজন বিশ্ব খ্যাত চিত্রকর , আরেকজন হলেন এক ডাক্তার। গল্পটা বলতে একটু দেরি হয়ে গেল। এক কবির জন্মদিন গেছে দু দিন আগেই। সে দিন বলতে পারলে ভালো হতো, সময়ের অভাবে লিখতে না পারার জন্য সুধী পাঠক মার্জনা করবেন। 

গল্পের প্রথম নায়ক এক কবি, গল্পটা শুরুর আগেই মারা গেছেন। গল্পের শুরুটা ১৯৩৯ সালের চৌঠা আগস্ট তারিখে। উইনিপেগ বলে একটা ছোট্ট জাহাজ ফ্রান্সের পইলাক বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে চিলির (বা চিলে) ভ্যালপেরাইজো বন্দরের উদ্দেশ্যে। এই যাত্রা শুরু এর মূল কারিগর বছর চিলের ছত্রিশের এক কবি যিনি সম্ভবত স্প্যানিশ ভাষায় সর্বকালের সেরা কবি, নাম পাবলো নেরুদা। 

সময়টা উত্তাল। একটানা গৃহযুদ্ধের পরে ইন্টারন্যাশনাল  বিগ্রেড পরাজিত, বিজয়ী ফ্যাসিস্ট একনায়ক ফ্র্যানকো দখল করে নিয়েছেন গোটা দেশটা। মরিয়া প্রজাতন্ত্রীরা দলে দলে দেশ ছাড়ছেন। তাদের একটা বড় অংশ ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পিরেনিজ পর্বত টপকে ফ্রান্সে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। 

চিলের কনসাল হিসেবে স্প্যানিশ রিপাবলিকে কাজ করার সুবাদে নেরুদা খুব লাভ থেকে ফ্যাসিস্টদের কার্যকলাপ দেখেছিলেন। স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির ওপর এই আক্রমণ তাঁর মনকে গভীর ভাবে বিচলিত করেছিল। বিশেষত যার হাত ধরে স্পেন তথা ইউরোপের শিল্পী সাহিত্যিকদের সাথে নেরুদার যোগাযোগ শুরু সেই তরুণ স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা যখন ১৯৩৬ সালে ফ্যাসিস্টদের হাতে খুন হয়ে যান, তারপর থেকে নেরুদার দৃষ্টিভঙ্গি তে বড় পরিবর্তন আছে, আসে তার কাব্য রচনার শৈলীতে। বামপন্থী নেরুদা হয়ে ওঠেন পুরোপুরি কমিউনিজম এর সমর্থক। 

ফ্রান্সে পালিয়ে আসা এইসব স্প্যানিশ শরণার্থীদের জন্য নিজের দেশ চিলি হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় স্থল এই চিন্তা থেকে নেরুদা তার দেশের রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেন তাঁকে ফ্রান্সে কনসাল হিসেবে নিয়োগ করার জন্য এবং ওই গৃহহীন প্রজাতন্ত্রী দের চিলিতে জায়গা দেওয়ার জন্য। আগুরী কেরদা প্রথম অনুরোধটা রাখলেও দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে টালা বাহানা করেন। তাঁকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। চিলির বিরোধী দক্ষিণপন্থী দল গলো এই আশ্রয় দেয়া দিয়ে তীব্র বিরোধিতা করে। শেষমেষ রাষ্ট্রপতি রাজি হয়ে যান।

নেরুদার সামনে তখন আর এক চ্যালেঞ্জ। দু চারজন করে শরণার্থী পাঠানোর বদলে উনি চেষ্টা করতে থাকেন যদি একসাথে অনেক জন কে পাঠানো যায়। একমাত্র উপায় হল জাহাজ। যাত্রীবাহী জাহাজ ভাড়া করা প্রায় অসম্ভব। তখন নজরে আসে এই উইনিপেগ। ছোট জাহাজ, আদতে মালবাহী। তাকে এবার যাত্রীবাহী বানিয়ে তুলতে হবে। থাকার শোয়ার জায়গা, ল্যাভেটারি, ছোট ডিসপেনসারি মায় ছোটখাটো নার্সারি। 

অর্থের প্রয়োজন। পাগলের মতো চেষ্টা করতে লাগলেন নেরুদা। ইউরোপ থেকে ল্যাটিন আমেরিকা, সমস্ত চেনাজানা মানুষজনের কাছে হাত পারলেন। নিরাশ করেন নি কেউ এই বিশ্বখ্যাত কবিকে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন পাবলো পিকাসোও। টাকা যোগাড় হল। জাহাজের খোল নলচে পাল্টে ফেলা হল। যাত্রা শুরু করলো উইনিপেগ। যাত্রী কমবেশি ২০০০ শরণার্থী। শিন্ডলার লিস্টের সিন্ডলার বাঁচিয়ে ছিলেন প্রায় বারোশ মানুষকে। 

কতগুলি অসীম সাহসী মানুষ যারা বুক চিতিয়ে নিজের দেশে ফ্যাসিস্ট দের মোকাবিলা করেছিল তারা অতল সাগরের বুকে মোচার খোলার মতো পুঁচকি জাহাজে চড়ে পাড়ি দিল হাজার মাইল। অচেনা অদেখা দেশ। কেবল ভাষাটা এক। 

কপর্দক শূন্য ওই মানুষগুলোকে সাদর অভ্যর্থনা করার জন্য জাহাজঘাটে প্রেসিডেন্ট কেরদা  পাঠিয়েছিলেন তাঁর মন্ত্রিসভার তরুণ স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে। যার নাম ডাক্তার সালভাদর আয়েন্দে। শরণার্থীদের প্রথম পা চিলির মাটিতে পড়ার আগেই তাদের সমস্ত ক্লান্তি সমস্ত আশঙ্কা হাওয়ায় উড়ে গেল। আয়েন্দের নেতৃত্বে জয়ধ্বনি দেয়া সমবেত জনতা গলা ছেড়ে গাইছে স্প্যানিশ প্রতিরোধের সেই সব চেনা গান। 

নেরুদা জীবনে বহু অবিস্মরণীয় কবিতা রচনা করে গেছেন। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায়, "ধোঁয়া ছেড়ে ফ্রান্সের বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়া উইনিপেগ এর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, এটাই আমার জীবনে রচিত শ্রেষ্ট কবিতা।" লোহা লক্কর, কয়লা দিয়ে তৈরি কবিতার রচয়িতা নেরুদা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন একজন কমিউনিস্ট এর কাছে প্রলেতারি আন্তর্জাতিকতার এর মানে টা কি।  

কবিতা কি তাই ?
কবিতা কি শুধু তাই ?
মনের খেয়ালে কাগজে-কলমে
শব্দ সাজাই ?

কবিতা কি শুধু রম্য-রচনা
ফুল পাখি আর চাঁদের জোছোনা
প্রিয়ার সঙ্গে জল-তরঙ্গ
নৌকো ভাসাই ?

কবিতা কি শুধু "ওমর খয়াম"
অথবা বিরহী যক্ষের নাম
প্রেমের অনলে একাকিনী জ্বলে
"বিরহিনী রাই" ?

কবিতা বন্দী চার-দেওয়ালে
তোমার আমার চোখের আড়ালে
কবিতাকে আনো রাজপথে আজ
মিছিলে চাই॥

সেলাম, কবি, তোমাকে সেলাম।

রবিবার, ৯ জুলাই, ২০২৩

পঞ্চায়েত নির্বাচনের হিসেব ~ ডাঃ বিষাণ বসু

হিসেব খুব সহজ নয়, আবার অত জটিলও নয়।

পঞ্চায়েতে এরকম জালিবাজি হবে। হতে থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকার সে নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না (করাটা খুব অভিপ্রেত, এমনও নয়, কেননা তাঁদের রেকর্ডটিও তো বড় মুখ করে গল্প করার মতো নয়)। কেননা, এই রাজ্যে প্রশাসন তৃণমূলের হাতে থাকলে বিজেপির ক্ষতি নেই। বরং যত বেশি পঞ্চায়েত তৃণমূলের হাতে, তত দুর্নীতি, তত ইডি-সিবিআই, তত বেশি করে তৃণমূল নেতাদের টিকি বিজেপির ঘরে বাঁধা। বিজেপির লক্ষ্য, লোকসভায় এই রাজ্য থেকে গোটা বারো-পনের সিট - বেশি হলে ভালো, নইলে ওটুকু দিয়ে আপাতত কাজ চালানো। আর রাজ্যসভা-লোকসভায় যেকোনও ইস্যুতে তৃণমূলের সমর্থন - সরাসরি না হয়ে অভিনব পদ্ধতিতে হলেও ক্ষতি নেই, যেমন ওয়াক-আউট ইত্যাদি প্রভৃতি। এবং মাঝেমধ্যে কিছু রাজ্যের নির্বাচনে টুকটাক ভোট কাটাকাটি করে সাহায্য, এটুকু।

লোকসভায় তৃণমূল বিজেপিকে সেই কোটার সিট দেবে। বছরভর বাকি সহযোগিতা তো বলাই বাহুল্য। উপায়ও নেই, কেননা চুরিচামারির কারণে টিকি ওপাড়ায় বাঁধা।

তো পঞ্চায়েতের মাসকয়েকের মাথায় লোকসভা নির্বাচনে এমন ফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মিডিয়া সমস্বরে বলবে, এই ফল হলো পঞ্চায়েত ভোটে অনাচারের প্রতিবাদে মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। তৃণমূলের দু-চারজনও সেই মর্মে কথা বলবেন - মানে, আত্মসমীক্ষা আত্মবিশ্লেষণ জাতীয় কথাবার্তা, তৃণমূলের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই আর কি।

তবে সেই রেজাল্ট দেখে আসল বিচলিত হবেন বুদ্ধিজীবী-বিচক্ষণ-বোদ্ধারা। বলার সুযোগ পেয়ে যাবেন, রাজ্যের পক্ষে বিজেপি বড় বিপদ। প্রাথমিক বিপদ বিজেপিই। অতএব, যেকোনও মূল্যে বিজেপিকে ঠেকাতে, ইত্যাদি প্রভৃতি... 

আর হ্যাঁ, এসবের মাঝে মিডিয়া শোনাতে থাকবে, এই রাজ্যের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বলতে খুনোখুনি আর হিংসা। দায়ী বলতে প্রশাসন বা কোনও দল নয় - দায়ী আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অশিক্ষা, দারিদ্র্য ইত্যাদি প্রভৃতি আর কিয়দংশে দুর্ভাগ্য। অনেকে বলবেন, আগে তো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না, থাকলে আরও অনেক খবর জানা যেত। এমনিতে এই রাজ্যের মিডিয়া চট করে তথ্যটথ্যর ধারপাশ মাড়ায় না - নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে যায়, জানি না - নইলে পরিবর্তনের আগের চৌঁত্রিশ বছরে রাজ্যে ঠিক কতগুলো পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি আর জেলা পরিষদ বিরোধীদের হাতে ছিল, এই সহজ তথ্যটুকু কেন যে কেউ খুঁজে দেখে না!! নাকি, উন্নয়নের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহে বিরোধী শক্তি স্রেফ ভেসে চলে গেছে, একথা তাঁরাও বিশ্বাস করেন, কে জানে!

তো এভাবেই চলতে থাকবে।

পাপচক্র, দুষ্টচক্র, বিষচক্র - যা-ই বলুন - এই চক্র ভাঙা সহজ নয়।

হতাশ লাগে। আবার যাঁরা প্রতিরোধে সামিল হলেন, তাঁদের জন্য গর্বও হয়। ঘরকুনো মধ্যবিত্ত অপোগণ্ড হিসেবে এর বেশি আর কী-ই বা পারি!

শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩

পঞ্চায়েত নির্বাচন ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


একটা সময় ছিল যখন শহরবাসী বাঙালির বেশিভাগের একটা দেশের বাড়ি থাকতো, সপ্তাহান্তে না হোক, বছরে অন্তত দুবার বাঙালি তার সেই দেশের বাড়ি ফিরে যেত। গ্রামের সাথে শহরের বাঙালির দেখা সাক্ষাৎ হত। ষাট এর দশকেও বাঙালির উপন্যাস চলচ্চিত্র, কবিতায় নাটকে একটা গ্রাম বাংলা থাকতো।


এর পরে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই শহররায়ন হল। বাঙালি মধ্যবিত্ত মেট্রোপলিটন মননে গ্রাম বাংলার জায়গা সংকুচিত হতে থাকলো। শিল্পী হিসেবে নবান্নের ধানের গন্ধের সাথে রাত দেড়টায় মাচায় উঠে, "ভালো আছো বাংলা?" বলে ইকো চেম্বার নিয়ে চিৎকার করা ছাড়া আর কিছু বাকি থাকলো না। গ্রাম নিয়ে যাবতীয় খবরাখবর এর উৎস হয়ে পড়ে থাকলো লক্ষ্মীকান্তপুর বা ক্যানিং লোকাল থেকে আগত গৃহকর্মীদের সাথে গৃহিণীর অলস বিশ্রম্ভালাপ। টেলিগ্রাফ বা স্টেটসম্যানের পাতা ওলটানোর ফাঁকে গৃহকর্তার কানে যাওয়া সেই আলাপের ছেঁড়া টুকরো। গ্রাম বাংলা কেবল ফিরে আসে মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে পঞ্চায়েত ভোটের সময়। সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরুতে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে অশোক মিত্র, বিনয় চৌধুরীর নেতৃত্বে গ্রাম বাংলায় ঘটে যাওয়া পঞ্চায়েত নামক নিঃশব্দ বিপ্লব নিয়ে মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালি উদাসীন থেকেছে, বড়জোর গ্রাম থেকে আগত অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহ পরিচারিকার সরবরাহে ঘাটতি পড়ায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করেছে।

বার্কলে থেকে প্রণব বর্ধন একের পর এক গবেষণাপত্রে সংসদীয় বামপন্থীদের এই বিকেন্দ্রিকরণের মহত্তম এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে উচ্ছাসিত হলেও শিক্ষিত বাঙালির তাতে বিশেষ হেলদোল দেখা যায় নি। জ্যোতি বাবু ও তাঁর সহযোগীরা অতি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি যে ফান্ড ফাংশন ফাংশানারির বিকেন্দ্রীকরণের তাদের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে জন্ম দেবে এক ফ্র্যাঙ্কনস্টাইনের। পঞ্চায়েত এর এই মধু ভান্ডারের স্বাদ পেতে মরিয়া হয়ে বাংলার বুকে এমন মুষল পর্ব দেখবে গোটা ভারত যে যদু বংশও লজ্জা পাবে। গণতন্ত্রের এই ধর্ষণ বোধ করি হিটলারকেও লজ্জিত করতো। বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল জানে যে না তারা না কোনো পার্টির প্রথম সারির নেতা নেত্রী, কারুর গায়েই আঁচটি পরবে না এই গ্রামের নির্বাচনে। নির্বাচনের দিন ঘোষণা থেকে নির্বাচনের দিন, বড়জোর হপ্তা দুয়েক বাংলা জুড়ে একটা উন্মত্ততা চলবে, যেটা নজর আন্দাজ করলেই হল। এর পরেই জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাবে রহিম শেখ বা রামা কৈবর্ত নামক শহীদদের কাহিনী। টিভির চ্যানেলে চ্যানেলের সান্ধ্য আসরে কেচ্ছা কাহিনীর অভাব হবে না।

বিবেক খুব কুটকুট করলে সোশ্যাল মিডিয়াতে একবেলার জন্য পবিত্র ঘৃনা উগড়ে দিলেই হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাশাপাশি বসবাস করা পরিবার গুলোর মধ্যে যে ঘৃণার রাজনীতির চাষ অনায়াসে অক্লেশে মানুষকে লাশ বানিয়ে ফেলছে, গ্রামীণ পল্লী সমাজে আমদানি করছে সন্দেহ অবিশ্বাস এর বাতাবরণ, ধ্বংস করে দিচ্ছে গরীব খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্য, তাদের একে অন্যকে দাঁড় করাচ্ছে মুখোমুখি সংঘর্ষের আঙিনায় সে নিয়ে বাংলার বুদ্ধিজীবি সমাজের বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। আগ্নেয়গিরির শিখরে বসে নাগরিক বাঙালি বুদ্ধিজীবী পিকনিক করছে, বুঝতে পারছে না পঁচাত্তর হাজার গ্রাম বাঁচলে তবেই বাঁচবে বাংলা। বুঝতে পারছে না বাংলার সর্বনাশ হচ্ছে, হয়ে গেছে। 

"আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেবেছিলাম
যার উদ্দেশ্যে ধ্রূপদী বিন্যাসে কয়েক অনুচ্ছেদ প্রশস্তি লিখেছিলাম
গতকাল বলাই বাবু বললেন, 'ঐটি বাঁদরলাঠি গাছ'।
অ্যালসেশিয়ান ভেবে যে সারমেয় শাবকটিকে
আমরা তিন মাস বক্‌লস পরিয়ে মাংস খাওয়ালাম
ক্রমশ তার খেঁকিভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট্‌ পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের কবে সর্বনাশ হয়ে গেছে।"

বুধবার, ২৮ জুন, ২০২৩

জাহানারা ইমাম ~ আদৃতা মেহজাবিন

'হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ ? ' কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন মা।

খুব অল্প বয়সী একজন আর্মি অফিসার দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনেই বহুজন। অনেকের উর্দু শুনে বোঝা যাচ্ছে তারা বিহারী।

অফিসারটি হাত তুলে একটু সালামের ভঙ্গি করে ইংরেজীতে বলল - আমার নাম ক্যাপ্টেন কাইয়ুম, আমরা তোমার বাড়িটা একটু সার্চ করব।
- কেন, কী জন্য?
- এমনিই একটু রুটিন সার্চ আর কি। তোমাদের বাড়িতে মানুষ কয়জন? কে কে থাকে? তোমাদের ছেলেদের নাম কি?
- রুমী, জামী ---
রাতটি ছিল ২৯ আগস্ট রবিবার। ১৯৭১ সন। দুই সন্তান সহ স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল তারা।
মা সারারাত ঘর বার করেন। ওরা বলেছিল আধা ঘণ্টা পৌণে এক ঘন্টার মাঝেই ফিরবে তারা। কই ফিরল না তো! এইতো কাল ও রুমী ছিল হেসে হেসে বলছিল আম্মা জানো ' সেদিন আসার সময়েও রেডিওতে একটা গান শুনেছি, ' একবার বিদায় দে মা ঘুড়ে আসি' জানি না কপালে কী আছে!
যে সন্তানকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মা 'একদিন নিজেই তাকে বললেন ' যা তোকে দেশের জন্য কোরবানি করলাম। '

সেদিনই অন্য একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় রাস্তায়, দৌঁড়ে গিয়ে মা দেখেন, সে স্বপন। তুমি রুমীর বন্ধু স্বপন না!

এখুনি পালাও রুমী ধরা পড়েছে। এর পরে দরজায় আস্তে টুকটুক এসেছে আরো দুজন ' ফঁতে আর জিয়া। ' ধরে নিয়ে গেছে সামাদকে খবর দিতে এসেছে ওরা। ওদেরকেও দ্রুত চলে যেতে বলেন মা।

দুদিন কাটে আর দুটো বিনিদ্র রাত। এমপি হোস্টেল থানা সবখানে খুঁজে বেড়ান মা তার সন্তানদের আর স্বামীকে। রুমীদের সাথে ভাই সাইফ ইমামকেও ধরে নিয়ে গেছে হানাদারেরা।

ওদিকে টর্চার সেলে চলছে অন্য গল্প, রুমী বাবাকে বলে আপনারা কিছুতেই স্বীকার করবেন না। কোন কিছু, আমার যা হয় হোক।

৩১ আগস্ট ছোট ছেলে জামী সহ ফিরে আসে স্বামী শরিফ । সাথে রুমী নেই। আর্তচিৎকার করে ওঠেন মা।

রুমীকে ছাড়েনি?

স্বামী সন্তানের দিকে চেয়ে দেখেন ওদের মুখে গভীর যন্ত্রণা, দুঃখ আর অপমানের ছাপ। গ্লাস গ্লাস পানি খাইয়েও তাদের তৃষ্ণা মেটানো যায় না।
' যে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে 'রুমী ' মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তাদের কাছে সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে সন্তানের সম্মানকে নষ্ট করেননি যেই মা যে জননী
তিনিই আমাদের শহিদ জননী ' জাহানারা ইমাম।'
আজীবন সন্তানের জন্য দুঃখ বয়ে বেড়িয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ' অসামান্য। '

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন, ' একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। '

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়েছেন বহুবছর। তবুও তার আন্দোলন থেমে থাকেনি। তার ডাকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে একাত্তরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় গণ আদালত।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে একদিন জন্ম হয়েছিল এই মহীয়সী নারীর। কলকাতার লেডি বেব্রোন কলেজ থেকে বি এ, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ করেছিলেন তিনি। ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইন্সটিটিউটে খণ্ডকালীন প্রভাষক ও ছিলেন তিনি।

সবাই তাকে বলতো বাংলার সুচিত্রা সেন। ক্যান্সারের কারণে সেই চুল বিসর্জন দিতে হয় তাকে। কেটে ফেলতে হয় মুখের একপাশের মাড়ি। উনার চুল কাটার খবর পেয়ে সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বড় কন্যা
'নোভাও তার চুল কেটে ফেলে। '

হুমায়ূন আহমেদ তাকে একথা জানাতেই তিনি বলেন
- আপনার মেয়েকে বলুন ' লম্বা চুল আমার খুব প্রিয়।
তার বয়সে আমার হাঁটুর সমান চুল ছিল। ' এই মহীয়সী নারী সব মানুষের হৃদয় দখল করে নিয়েছিলেন।

জাহানারা ইমাম দুইবার জন্ম নেন না। একবারই তিনি এসেছিলেন আমাদের মাঝে ।

কি পরিমান শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জমা আছে উনার প্রতি, এই দেশের প্রতিটি মানুষের। সেটা কি তিনি কখনো বুঝতে পেরেছিলেন? হয়তো বুঝতেন তাই আবার তাদের নিয়েই আন্দোলনে নেমেছিলেন। আশার কথা এই যে সেই আন্দোলন থেমে থাকেনি।

১৯৯৪ সালের ২৬ জুন, আজকের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। ওপাশের জগত থেকে আজ তিনি নিশ্চয়ই আমার বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারছেন। উনি নিজ সন্তান দেশের তরে কোরবানি দিয়েছেন। তিনি তো বঙ্গ-জননী।

বাংলার পবিত্র মাটিতে তার পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না এটা ঠিক। তবে বাংলার হৃদয়ে তিনি জ্বেলে দিয়েছেন অনির্বাণ শিখা। ঝড়-ঝাপ্টা যত প্রচন্ডই হোক না কেন সেই শিখা জ্বলতে থাকবে।

' সৌভাগ্য আমাদের, তিনি জন্মেছিলেন এই বাংলায়।'