বৃহস্পতিবার, ২২ এপ্রিল, ২০২১

শঙ্খ ঘোষের একটি বক্তৃতা ~ সংকলন সরকার

"অন্ধের স্পর্শের মতো" কবি শঙ্খ ঘোষের একটি বক্তৃতা। প্রণবেশ সেন স্মৃতি রক্ষা কমিটির অনুরোধে শঙ্খ বাবু এই ভাষ্যটি রাখেন এবং ভাষ্যটির অডিও রেকর্ড করে রাখা ছিলো। পরে সেই অডিও রেকর্ড থেকে 'গাঙচিল' প্রকাশনার তরফে ভাষণটি মুদ্রিত করে একটি চটি বই প্রকাশ করা হয়। আমি সেই স্মারক বক্তৃতাটিকে এখানে তুলে ধরলাম। যদিও গড়পড়তা ফেসবুকের পোস্ট আন্দাজে এইটি বেশ খানিকটা বড় পোস্ট...  যাঁরা ইতিপূর্বে পড়েননি তাঁরা সংগ্রহে রাখতে পারেন। 

অন্ধের স্পর্শের মতো 
সম্প্রচারের ভাষা
প্রণবেশ সেন স্মারক বক্তৃতা ২০০৭
শঙ্খ ঘোষ

'ভালো করে কথা ভাবা এখন কঠিন'

অভ্যাগত সবাইকে আমার নমস্কার জানাই। প্রণবেশ সেনের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাই।

এখানে যে বলা হলাে, এ বছরের স্মারক বক্তৃতা দিতে আমি রাজি হয়েছি, তা ঠিক। কিন্তু সাত দিন আগে পর্যন্তও চেষ্টা করেছিলাম যে, যদি কোনােরকমে এটা বন্ধ করে দেওয়া যায়।

এগুলাে আমি এমনিতেই পারি না। আর তাছাড়া, এই সময়টা! এমন একটা সময়ে এসে পৌছেছি আমরা— জীবনানন্দের কবিতার লাইন মনে পড়ে, 'ভালাে করে কথা ভাবা এখন কঠিন'!

কিন্তু বলতে তবু হবে। তার কারণ ইতিমধ্যেই আমার শেষ মিনতি জানাবার আগেই ছাপা চিঠি নানা জায়গায় পাঠিয়ে দিয়েছেন ভবেশ।

তাঁকে তখন জানাতেও পারিনি যে কী বিষয়ে বলব। এখন যেটা বলা হলাে ('সংযােগের ভাষা') দিনতিনেক আগে কাউকে বলেছি এ-রকম একটা নাম। নাম না, বিষয়। ঘণ্টাখানেক আগে আমার এক বন্ধু জিজ্ঞেস করছিলেন, কী বিষয়ে বলব। লিখে এনেছি, কিন্তু তা সত্ত্বেও তাকে যে বিষয়টা বলতে পেরেছি, তা নয়। একথাগুলাে বলে নিচ্ছি এইজন্যে যে একটু এলােমেলাে কথা হয়তাে থাকবে, লিখে আনা সত্ত্বেও।

ভবেশ আরাে আমাকে বলেছেন যে, এক ঘণ্টা বলতে হবে। সেটা আমার পক্ষে একটু শক্ত হলেও ওটা নিয়ে ভাবছি না, ভাবছি আপনাদের কথা। এই সময়টা আপনাদের একটু সহ্য করতে হবে।

 
এই লেখার প্রথম দিকের কয়েকটা লাইন, পাঁচছটা লাইন, ছেড়ে দিলে, এর আছে পাঁচটা অংশ। অংশগুলি আপনারা বুঝতে পারবেন, সেটা আমি বলে দেব। লেখার একটা নাম আছে। নাম: 'অন্ধের স্পর্শের মতাে'।

জীবনের শেষ কয়েকটা বছর চোখে দেখতে পেতেন না আমার বাবা। বই পড়তে ভালােবাসতেন, কিন্তু পড়া বন্ধ হয়ে গেল। ভালােবাসতেন কথা বলতে। কিন্তু কথাও কিছুটা থমকে গেল। অভ্যাগতেরা কেউ দরজায় এসে দাঁড়ালে চমকে উঠে জিজ্ঞেস করতেন: 'কে?' নাম শুনে কই, হাতটা দেখি' বলে বাড়িয়ে দিতেন হাত। তারপর সেই অভ্যাগতের হাত ধরে অনেকক্ষণ বসে থাকতেন চুপ করে। কথা কখনাে হতাে, কখনাে হতাে না। কিন্তু হাতের ওই জড়িয়ে-থাকাটুকু ছিলই।

০১.

কারাে সঙ্গে যখন আমরা কথা বলি, আমরা চাই যে সেই কথাটা সে বুঝুক; আমার ভাবনাটা বা দৃষ্টিভঙ্গিটা তার কাছে গিয়ে পৌছক। এইরকমই হবার কথা। কিন্তু সবসময়েই কি সে-রকম চাই আমরা? বা, প্রশ্নটাকে অন্যভাবেও সাজানাে যায়: জ্ঞাতসারে তেমনটা চাইলেও, অজ্ঞাতেও কি সেইরকমই চাই সবসময়ে ? সে বুঝুক, জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এটা অবশ্য চাই। কিন্তু কী বুঝুক? আমার কথাটা? ভাবনাটা? না কি অনেকসময়ে এইটে: আমি-যে ভাবতে পারি, সেই ক্ষমতাটা? কিংবা অনেকসময়ে, তারও চেয়ে একটু এগিয়ে, ভাবতে পারি বা না পারি, আমি যে আমি, সেই অবস্থানটা? কথা বলা একটা সংযােগ। কিন্তু ওইসব সময়ে, ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় কেবলমাত্র অ-যােগ নয়— সেটা সমূহ বি-যােগেও গিয়ে পৌছতে পারে।

এসব নিয়ে অল্পসময়ের জন্য একটু ভাবতে হয়েছিল একবার, প্রায় চল্লিশ বছর আগে, আকাশবাণী-গত একটা অভিজ্ঞতার ফলে। সেখান থেকে একটা ডাক এসেছিল অলােকরঞ্জন দাশগুপ্তের আর আমার, বলবার মতাে একটা কাজ পাওয়া গিয়েছিল কয়েক সপ্তাহের জন্য। সন্ধেবেলায়, সংবাদ আর স্থানীয় সংবাদের মধ্যবর্তী পাঁচ মিনিটের বিরতিপর্বে, একটা অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা হয়েছিল 'সমীক্ষা' নামে। সেই সমীক্ষায় আমাদের উপর দায়িত্ব বর্তেছিল সাহিত্যসংস্কৃতি নিয়ে কিছু বলবার। সংবাদ-স্থানীয়সংবাদের মাঝখানে মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে সাহিত্যের কোনাে প্রসঙ্গে কী করে কথা বলব, কী কথাই-বা বলব, অল্পবয়সের উত্তেজনায় সেসব দুরূহ সমস্যা নিয়ে কিছু ভাবিইনি আমরা। সাগ্রহেই, সপ্তাহে একদিন করে, বলেছিলাম কিছু কথা।

 

কিন্তু শ্রোতাদের কেমন লাগছিল সেটা? নিকটবন্ধুদের প্রশ্রয়ে আমরা অবশ্য তৃপ্তই ছিলাম, কিন্তু সে-তৃপ্তিতে ধ্বস নামল একদিন। অলােকরঞ্জনের মা, আমাদের মাসিমা, দুঃখের স্বরে একদিন বললেন আমাকে: অলােক বলে শক্ত শক্ত শব্দ আর তুমি সহজ সহজ, কিন্তু তােমাদের কারাে কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ! চমক লাগল শুনে। বুঝতে পারে না? তাহলে বলছি কেন? এ-প্রশ্নের পরেই মনে হলাে: কারা বুঝতে পারে না? মাসিমার কাছে কারা এই অভিযােগ জানিয়েছে? খেয়াল হলাে তখন: সংবাদ আর স্থানীয় সংবাদ শােনেন যে অসংখ্য মানুষজন, সাহিত্য-বিষয়ে যাঁদের মধ্যে অনেকেরই কোনাে স্বতন্ত্র আকাঙক্ষা বা অধিকার নেই, তাদের আকাঙক্ষা জাগাবার মতাে কোনাে ভাষা বা রীতি কি আমরা ব্যবহার করতে পারছি? সাহিত্য-বিষয়ে অভিজ্ঞ যারা এবং সে-বিষয়ে যাঁরা অনভিজ্ঞ, একইসঙ্গে এই দু-রকমের শ্রোতার কাছে পৌছবার কোনাে পথের কথা কি আমরা ভেবে নিয়েছি? অর্থাৎ এ-লেখার সূচনায় যে-প্রশ্নগুলি তুলেছিলাম, তার সঙ্গে এখানে জুড়ে যায় আরাে কিছু প্রশ্ন: ভেবেছি কি কার সঙ্গে কথা বলছি আমরা, বা কাদের সঙ্গে? কথাটা পৌছে দিতে চাইছি ঠিক কাদের কাছে?

না, শুধু এইটুকুই নয়, প্রশ্ন ওঠে আরাে। শ্রোতাচরিত্রের কথা ছেড়ে দিলেও, যিনি বলছেন, তার অবস্থানটা ঠিক কী? তিনি কি সামনাসামনি একজনের সঙ্গে কথা বলছেন? তিনি কি সামনাসামনি অনেকের সঙ্গে কথা বলছেন? তিনি কি মঞ্চগত দূরত্ব থেকে বলছেন? কিংবা, শ্রোতা বা দর্শক যেখানে অদৃশ্য, সেই দূরদর্শনে বলছেন নিজে দৃশ্যমান থেকে? না কি রাজা নাটকের রাজার মতাে স্বরমাত্র হয়ে ভেসে থাকছেন আকাশবাণীতে? এর প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রোতা আর বক্তার সম্পর্কের মধ্যে একটা বদল ঘটে যায়, আর সেই অনুযায়ী স্থির করে নিতে হয় ভাষা। এমনকী, কখনাে কখনাে হয়তাে, সেই অনুযায়ী স্থির করে নিতে হয়। বিষয়ও। এসব কথা সেদিন আমরা অন্তত আমি ভেবে নিয়েছিলাম বলে মনে পড়ে না। অত্যুৎসাহে আমরা কেবল আমাদের জানা-বােঝাটাকেই প্রকাশ করতে চেয়েছিলাম সেইভাবে, যেভাবে আমরা লিখি, যে-লেখার সামনে কোনাে শ্রোতা নেই, আছে পাঠক। পাঠকের জন্য উদ্দিষ্ট লেখা শ্রোতারও কাছে পৌছবে কীভাবে, সেটা তেমন করে ভাবিনি বলেই মাসিমাকে সকাতরে বলতে হয়: তােমাদের কারাে কথাই যে বুঝতে পারে না কেউ!

 

ধরা যাক আমি কথা বলছি কবিতা আর সমসময়ের সম্পর্ক নিয়ে। কোনাে আনুমানিক ব্যাপার নয় এটা, একদিনের সমীক্ষার বিষয় হিসেবে এটাই ছিল একবার আমার নির্বাচন। পাঁচ মিনিটের অবকাশে সেদিনকার কথিকায় শেষ অনুচ্ছেদটি এবং তার পূর্ববর্তী একটি বাক্য ছিল এইরকম:

কেবল ঐতিহ্য নয়, তখন তিনি [কবি] চান প্রবহমান বিশ্বকালকে তার মধ্যে বহন করতে, আর এ-দুয়ের নিরন্তর সংঘর্ষ থেকে দেখা দিতে থাকে আজকের দিনের আধুনিকতা।

এইটেই মনে ছিল, যখন জীবনানন্দ বলেছিলেন, কবিতার অস্থির মধ্যে চাই ইতিহাসচেতনা আর তার মর্মে চাই পরিচ্ছন্ন কালজ্ঞান। এই জ্ঞানেই উজ্জয়িনীর সময় মিশে যায় মিশর বা গ্রীসের সঙ্গে, এই চেতনাতেই একনিশ্বাসে বাঁধা পড়ে উর্বশী আর আর্টেমিস। কিন্তু কবি কখনােই ভুলে যান না যে এক হাতে এই দেশনিহিত কাল আর অন্য হাতে দেশােত্তর কাল ধারণ করবার মুহূর্তেও তিনি পা রেখে দাঁড়িয়ে আছেন অস্থির সমসময়ের সংকটের ওপর। সময়ের এই জটিল প্রত্যাঘাতই কবিতাকে এক মুহূর্ত থেকে আরেক মুহূর্তে সঞ্চারিত করে নেয়। 

কথাগুলি লিখবার সময়ে সেদিন নিশ্চয় মনেই রাখিনি যে এটা যারা শুনছেন তাদের অনেকেরই কাছে এর কয়েকটি শব্দ প্রায় ধাঁধার মতাে লাগবে, কেননা তারা অনেকেই আধুনিক কবিতার জগৎটাকে ঠিকমতাে জানেন না। তাই উজ্জয়িনীর সঙ্গে মিশর বা উর্বশীর সঙ্গে আর্টেমিস একসঙ্গে বাঁধা পড়বার কথা কেন এখানে উঠে এল হঠাৎ, জীবনানন্দ বা বিষ্ণু দে-র কবিতা নিয়ে সামান্য একটু বিস্তারে না বললে অনেকেরই কাছে পৌঁছবে না এর কোনাে তাৎপর্য। ফলে গােটা অনুচ্ছেদটাই সেই শ্রোতার কাছে থেকে যাবে অনধিগম্য, প্রায় অর্থহীন। কথাগুলি যদি কেউ পড়েন, তাহলে হয়তাে-বা তিনি সময় পেতে পারেন বুঝে নেবার, বিশ্লেষণ করে নেবার, কিন্তু সেই সময়টা তাে শ্রোতার আয়ত্তে নেই। আমাদের বােঝা উচিত ছিল যে অলক্ষ্য এবং অসংখ্য সেইসব শ্রোতার জন্য চাই ভিন্ন একটা ভাষা। ব্যক্তিগত জানার অভিমানে সেকথাটা সর্বতােভাবে আমরা ভাবিনি সেদিন।

কিন্তু আরাে একটা প্রশ্ন আছে এখানে, মাসিমা যখন দুঃখটা জানিয়েছিলেন, তখন কি পুরােপুরি ব্যর্থতারই বােধ জেগেছিল মনে? না কি সেইসঙ্গে গােপন একটা অহমিকাও লালিত হচ্ছিল সেখানে? এই অহমিকা, যে, আমি এমন-কিছু বলছি যা অন্যের আয়ত্তের বাইরে। অর্থাৎ, এইখানে আমি পৃথক, এইখানে আমি খানিকটা উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। আর, সেই পৃথক অধিষ্ঠানকে সম্ভ্রম করছে অন্য লােকে। না-বুঝবার সম্ভ্রম । আমার বুঝবার বা জানবার ক্ষমতার প্রতি অন্যের অক্ষমতার সম্ভ্রম । আর এইটেকেই আমি আমার স্বতন্ত্রতা বলে ভাবছি, ভেবে তৃপ্ত হচ্ছি।

 

কিছুদিন আগেকার একটি সংলাপে নােঅম চম্‌স্কি একবার বলেছিলেন, কারাে কাছে চার সিলেবলের কোনাে শব্দ শুনলেও তিনি বুঝে নিতে চান ওটা এক সিলেবলে বলা সম্ভব ছিল কি না। বলেছিলেন যে, বক্তা অনেকসময়ে ভাবেন তার সব কথা যদি বুঝেই ফেলল সবাই তাহলে তিনি আর বিশিষ্ট কিসে? অনেক চেষ্টায় অনেক কষ্টে একটা জিনিস বুঝতে হয়েছে তাকে, অধিগত করতে হয়েছে, আর অন্যেরা সেটা বুঝতে পারছে না, 'and then that becomes the basis for your privilege and your power'। আমরাও কি সেইদিকেই চলে যাচ্ছিলাম? কিংবা, যাচ্ছি আজও?

অনেকেই যে যাচ্ছি, তাতে সন্দেহ নেই। মনীষার নিয়মিত প্রকাশ থাকে, এই শহরেরই এমন একটি পত্রিকায় তার দু-একটি লেখা বুঝতে না পেরে যখন নিজের বােধবুদ্ধির সীমা ভেবে অবসন্ন হয়ে পড়ছি, তখন একদিন হঠাৎ তার ধীসম্পন্ন অভিজ্ঞ সম্পাদকের একটি মন্তব্য পাওয়া গেল। তিনি বিলাপ করছিলেন এই বলে যে সম্প্রতি এমন লেখাও তাকে ছাপতে হচ্ছে যার সবটা তিনি বুঝে উঠতে পারেন না। তখন নিশ্চয় এই প্রশ্ন ওঠে, ওঠা উচিত, যে, তাঁর মতাে ধীমানও যদি বুঝতে না পারেন তাহলে সেটা পৌছচ্ছে কোথায় ? কোন্ দু-চারজনের বৃত্তে আবদ্ধ থেকে আবর্তিত হচ্ছে সেটা? এ-সমস্যাটা যে কেবল এই শহরের তা নয়, পৃথিবীজোড়া এই সমস্যা। চস্কির যে সংলাপের কথা একটু আগেই ছিল, বিশ্বগত এই দুর্লক্ষণটার কথা সেখানে তিনি তুলেছিলেন এইভাবে:

...it's not necessarily a criticism to say that something doesn't make sense: there are subjects that it's hard to talk sensibly about. But if I read, say, Russell, or analytic philosophy, or Wittgenstein and so on, I think I can come to understand what they're saying, and I can see why I think it's wrong, as I often do. But when I read, you know, Derrida, or Lacan, or Althusser,

It's like words passing in front of my eyes: I can't follow the arguments, I don't see the arguments, anything that looks like a description of a fact looks wrong to me. So may be I'm missing a gene or something, its possible. But my honest opinion is, I think it's all fraud. 

চমস্কির এই শেষ লাইনটির সঙ্গে আমরা অনেকেই নিশ্চয় একমত হব না, এমনকী তিনিও হয়তাে এতটা বলে বসেছেন কোনাে সাময়িক উত্তেজনাবশে।(১) কিন্তু এখান থেকে উঠে আসা এই প্রশ্নটা তবু জরুরি যে কীভাবে, কতটা সহজে, কোনাে ভাবনাকে আমরা পৌছে দিতে পারি শ্রোতার কাছে, বা পাঠকের কাছে।

এটা বুঝে নেওয়া খুব জরুরি যে আমরা কী চাই। আমরা-যে জানি, সেই খবরটাই কি জানাতে চাই? না কি আমরা যা বুঝি, সেই বােঝাটাকে বােঝাতে চাই? দ্বিতীয়টাই হবার কথা, কিন্তু বাস্তব ক্ষেত্রে অনেকসময়েই ঘটে ওঠে না সেটা।

০২.

আমাদের কৈশাের বা যৌবনে যেসব মাস্টারমশাইয়ের কাছে আমরা পড়েছি, তাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকেই মনে হয় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবার যােগ্য। তাদের মধ্যে বিশেষ একজনের কথা প্রায় প্রতিদিনই মনে পড়ে: তিনি গােপীনাথ ভট্টাচার্য। প্রেসিডেন্সি কলেজে দর্শনের অধ্যাপক ছিলেন তিনি। চালচলনে কথায়বার্তায় ছিল স্থির একটা সমাহিত ভাব। ধীর পায়ে ক্লাসে এসে, নাম ডাকবার পর খাতাখানা বন্ধ করে, টেবিলের ওপর চক দিয়ে আলতাে করে লিখতেন দু-একটা কথা, লিখে মুছে দিতেন, তারপর তাকাতেন আমাদের দিকে, শুরু করতেন পড়ানো। মধ্যবর্তী ওই নিঃশব্দ সময়টায়, আমরা বুঝতে পারতাম, আত্মস্থ হয়ে নিচ্ছেন তিনি, নিজেকে অভিমুখী করে তুলছেন বিশেষ এই ক্লাসটির জন্য।

কেমন ছিল তার পড়াবার ধরণ ? খুব শান্ত আর নীচু গলায় কথা বলে যেতেন তিনি। সে-বলার মধ্যে কোনাে বাগ্মিতা থাকত না, কিন্তু একটা জোর থাকত, প্রবাহ থাকত, আর থাকত সরল একটা কথােপকথনের ভঙ্গি।
 

কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে গিয়েছিলেন একদিন। খাতায় নােট নিচ্ছিল যে ছেলেমেয়েরা, একটু অবাক হয়ে মুখ তুলে তাকিয়েছিল তারা। অন্তর্ভেদী দৃষ্টিতে তাদের দিকে চোখ রেখে স্মিতভাবে বলেছিলেন তিনি: 'তাহলে আমি কথা বলব কার সঙ্গে? বােঝাব কাকে যদি তােমাদের চোখ থাকে খাতায়? বুঝব কেমন করে যে কথাগুলি পৌছচ্ছে কোথাও? বিষয়টা তাে তােমাদের আমি বােঝাতেই চাইছি? বুঝে নাও যদি, মাথা ঝুঁকিয়ে নােট নেবার তাে আর দরকারই হয় না তবে।'

ছেলেমেয়েরা কতটা মানত তার এই নির্দেশ, সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু ওই-যে তিনি সকলের চোখে চোখে তাকিয়ে কথা বলতে চাইতেন, তার মধ্যে ছিল একটা সহজ সংযােগের ব্যাকুলতা। শুকনাে ক্লাসপড়ানাে নয়। যেন সেটা, সে যেন কোনাে-একটা সঞ্চারের সময়। আর এই সঞ্চারটা তিনি ঘটাতে চাইতেন একটা মৃদুতার মধ্য দিয়ে, একটা নিরুত্তেজ শান্ত স্বরের মধ্য দিয়ে। কথা বলবার মতাে করে।

এখানে ওই মাত্রাবােধের সূত্রে। 'তাঁর শাস্তি, তাঁর সত্য, তাঁর পবিত্র মূর্তিখানি নিয়ে সেই মাস্টারমশাই তার ছাত্রের জীবনের মাঝখানটিতে তার নিজের জীবনের প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিলেন। যিনি না ভয় করেন নিন্দাকে, না ক্ষতিকে, না মৃত্যুকে', যিনি তাঁর 'অন্তর্যামীকে দেখতে পেয়েছেন, সেইজন্যে আর কিছুতে ওঁকে ভােলাতে পারে না', ঘরে-বাইরে উপন্যাসের সেই চন্দ্রনাথবাবু তার স্বাভাবিক স্থৈর্যের সঞ্চার করে দিয়েছিলেন ছাত্র নিখিলেশের দৈনন্দিনে। চন্দ্রনাথবাবু ছিলেন, তাই আমি কল্যাণকে এমন সত্য করে এমন প্রত্যক্ষ করে পেয়েছি' বলেছিল নিখিলেশ। শান্তিনিকেতন-ভাষণের ওই 'একটু চুপ করাে, একটু স্থির হও' কথাকটিই যেন বারে বারে রূপায়িত হতে থাকে চন্দ্রনাথবাবুরও কথায় বা নিখিলেশের আচরণে। স্বদেশী আন্দোলনের উত্তেজনার। পক্ষে যখন চড়া ভাষায় সওয়াল করে সন্দীপ, তখন চন্দ্রনাথবাবু একটু হেসে বলেন: ছটফট করতে চান করুন, কিন্তু সেইটেকেই বীরত্ব কিংবা কৃতিত্ব মনে করে নিজেকে বাহবা দেবেন না। পৃথিবীতে যে জাত আপনার জাতকে বাঁচিয়েছে তারা ছটফট করে নি, তার কাজ। করেছে।

এতটা যে তাকে মনে পড়ে সে কেবল এজন্য নয় যে পঠিতব্য বিষয়টাকে খুব ভালােমতাে বােঝাতে পারতেন তিনি। মনে পড়ে এইজন্য যে তার ওই ব্যক্তিত্বের মধ্যে, ব্যক্তিত্বপ্রকাশের প্রকরণের মধ্যে, শান্ত স্থির একটা প্রত্যয়ের বিচ্ছুরণ হতাে। বলা যায়, তার ভিতরকার প্রত্যয়টাই সে-প্রত্যয়ের শক্তিটাই এতটা শান্ত রাখতে পারত তাঁকে। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন ভাষণমালার এক জায়গায় আছে:"আমরা সমস্ত দিন কতরকম করে যে শক্তির অপব্যয় করে চলি তার ঠিকানা নেই— কত বাজে কথায়, কত বাজে কাজে। নিষ্ঠা হঠাৎ স্মরণ করিয়ে দেয়, এই যে-জিনিসটা এমন করে ফেলাছড়া করছ এটার যে খুব প্রয়ােজন আছে। একটু চুপ করাে, একটু স্থির হও, অত বাড়িয়ে বলাে না, অমন মাত্রা ছাড়িয়ে চলাে না।" সেখানে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ: 'সিদ্ধিলাভের কাছাকাছি গেলে প্রেমের সহজ প্রাজ্ঞতা লাভ হয়, তখন মাত্রাবােধ আপনি ঘটে।' আমাদের ওই মাস্টারমশাইয়ের কাছে সবচেয়ে বড়াে শিক্ষণীয় যা ছিল, তা এই মাত্রাবােধ। স্বরের, বাচনের, এবং নীরবতার মাত্রা।
 

জীবন থেকে নেওয়া নয়, সাহিত্য থেকে নেওয়া ভিন্ন আরেক মাস্টারমশাইয়ের কথা মনে পড়ে দেশবােধের বা দেশের কাজের এই ভিন্ন দুটো পথের প্রতিস্পর্ধিতা নিয়ে ঘরে-বাইরে উপন্যাস: এই ছটফট করা আর কাজ করা। বা, বলা যায়, ছটফট করে কাজ করা আর স্থিরভাবে কাজ করা। সন্দীপ আর নিখিলেশ। আপাতশক্তি আর নিহিতশক্তি। আপাতশক্তির আস্ফালনে সন্দীপ দ্রুত একটা সংযােগ তৈরি করতে পারবে বলে ভাবে, প্রভাবিত করতে পারবে, সে-প্রভাবের দ্রুত ফল দেখতে পাবে। আর নিহিতশক্তির সঞ্চারে নিখিলেশ চায় কিছু গড়ে তুলতে, যদিও সে জানে যে এ-সংযােগের কোনাে ফল হাতেহাতে মেলে না, এর জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হয় অনেকদিন পর্যন্ত।

এই অপেক্ষা করে থাকাকে কারাে মনে হতে পারে সংকল্পের অভাব বা পৌরুষের অভাব নিখিলেশের হালচাল দেখে বিমলার যেমন মনে হয়েছিল। মনে হতে পারে যে বার্তাটা কোথাও পৌছচ্ছে না, কারাে সঙ্গেই সংযােগ ঘটছে না কোথাও। রেগেমেগে হঠাৎ কিছু করায় যে সংকোচ বোধ করে নিখিলেশ, স্বভাবের সেই মৃদুতাকে অশ্রদ্ধা করতে শিখছে বিমলা। এ-মৃদুতাই যে এনে দেয় ভিতরকার জোর, আর তাও যে কোথাও সঞ্চারিত হতে পারে, বিমলার মতাে আমাদেরও অনেকসময়ে সেটা বিশ্বাস করতে বাধে।

কিন্তু এই মৃদুতা মানে কি সবকিছুকে নির্বিচারে মেনে নেওয়া ? তর্ক থেকে, যুক্তি থেকে, পিছিয়ে আসা? শান্ত ভঙ্গি নিয়েও ঘরে-বাইরে উপন্যাসে একাধিকবার আমরা তর্কে রত দেখেছি নিখিলেশকে, দেখেছি মৃদুতার সঙ্গে তেজের সংযােগ। আগে বিমলা কোনােদিন তার স্বামীকে বাইরের লােকের সঙ্গে তর্ক করতে শােনেনি, সন্দীপের সঙ্গে তার একদিনকার বাগবিনিময় শুনে মনে হলাে 'আজ দেখলুম তার অস্ত্রচালনা'। অথচ, এর কয়েকটা মাত্র লাইন পরেই আছে: 'আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর বেদনা তার মুখের ওপর ছায়া ফেলে চলে গেল। তিনি খুব মৃদু স্বরে বললেন...' ইত্যাদি। বিমলা দেখতে পায়, আর সেইসঙ্গে আমরাও, যে, অস্ত্ৰচালনা আর মৃদুস্বর হাত-ধরাধরি করে চলতে পারে কীভাবে।

আমাদের যে মাস্টারমশাইয়ের কথা বলছিলাম, যাঁর শান্ত আত্মস্থ প্রত্যয় একটা আভা ছড়িয়ে দিত আমাদের মনে, তিনিও কিন্তু তর্ক করতেই শিখিয়েছিলেন তার ছাত্রছাত্রীদের। ক্লাসের মধ্যে কোনাে তর্কণীয় বিষয়ের উত্থাপন করে তিনি চাইতেন সমানে সমানে একটা কথা হােক। ব্যক্তিত্বের নমনীয়তা আর যুক্তির দৃঢ়তা একসঙ্গেই জড়ানাে থাকত তাতে। তিনি শিক্ষক, এই উচ্চপদবলে কখনাে তিনি মাঝপথে থামিয়ে দেননি ছাত্রকে, তর্ক এগিয়ে যেতে দিয়েছেন অবাধে, যাতে নিজেরই বিচারবােধের জাগরণে যথার্থ একটা লক্ষ্যে এসে পৌছতে পারে তার্কিক।

এই তর্কসৌন্দর্যের আরেক বিকাশ আমরা দেখেছি আবু সয়ীদ আইয়ুবের লেখায়, কিংবা তার সঙ্গে নানাজনের ব্যক্তিগত আলাপনে। কথায় বা লেখায় স্বরগ্রাম কখনাে উঁচু হতাে না তাঁর, বিপরীত পথকে বুঝতে চাইতেন এবং বােঝাতে চাইতেন প্রসারিত এক স্থৈর্য নিয়ে, লাবণ্যময় দৃঢ়তায় ভরপুর থাকত তার কথা। প্রকাশ্য একটি বিতর্কের প্রসঙ্গে একপক্ষ যখন একবার চিঠিতে তাকে জানিয়েছিল কোনাে-এক, সাধারণ পাঠকের এই মন্তব্য যে দুজনের ওই তর্কে আইয়ুবই জিতেছেন, তার উত্তরে আইয়ুব লিখেছিলেন একটা স্মরণীয় কথা: 'আমাদের লেখাগুলিকে যাঁরা তর্কের হারজিতের খেলারূপে দেখেছেন তারা ভুল করেছেন; তাদের কথা গণ্য করবার মতাে নয়।'

কেন লিখেছিলেন কথাটা? কেননা যথার্থ তর্ক যাঁরা করেন তারা তাে কোনাে-একটা বিষয়ের সত্যকে বুঝতে চান, বােঝাতে চান। সত্যানুসন্ধানটাই সেখানে বড়াে কথা। আর, দুজনে মিলে কথা বলতে বলতেই পৌছনো যায় - পৌছনাের চেষ্টা করা যায় সেই সত্যে। সে-সত্যে পৌছলে তার্কিকদের মধ্যে কোনাে এক পক্ষ যে জিতে যায় তা নয়, জিতে যায় শুধু সত্য, সত্যের বােধ। তা যদি না ভাবি, তাহলে, তখন, বিষয়ের চেয়ে বিষয়ী হয়ে ওঠে বড়াে, সত্যের চেয়ে বড়াে হয়ে ওঠে অহং। আমিকে রেখেও কীভাবে সেই আমিটিকে মুছে নিতে হয়, তার কিছু নজির আমরা দেখেছিলাম গােপীনাথবাবুর অধ্যাপনায়, আইয়ুবের বিচারণায়, চন্দ্রনাথবাবুর দীক্ষাদানে, নিখিলেশের আচরণে। অন্যদের কাছে এঁরা যা প্রতিষ্ঠা করবার চেষ্টা করেছেন, অন্যদের যা বােঝাতে চেয়েছেন, তা এঁদের আমিটাকে নয়, এঁদের অনুভূত সামগ্রিক এক সত্যকে। আমি দিয়ে প্রকাশের আর আমিকে মুছে নিয়ে প্রকাশের এই দুই ভঙ্গিতে বােধেরও ঘটে যায় অনেকখানি প্রভেদ।

০৩.

অনেকদিন আগে একজন চিকিৎসক এসেছিলেন আমাদের বাড়িতে, রােগী দেখবার জন্য। প্রাথমিক পরীক্ষা করে নেবার পর যখন তিনি বিধান লিখতে যাবেন, তখন বললেন আমাকে: 'এই ওষুধটা দিয়ে দুদিন। আমরা দেখব। এতে যদি ফল না হয় তাহলে আমাদের আরেকম করে ভাবতে হবে। তার কথা শুনে অবাক হচ্ছিলাম। চিকিৎসা তাে করবেন উনি, তাহলে আমরা দেখব' 'আমাদের ভাবতে হবে' এভাবে কেন বলছেন? বলার তাে কথা আমি দেখব' 'আমাকে অন্যরকম ভাবতে হবে'? সেটাই তাে হতাে সত্য কথা? সত্যি হতাে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে এও ঠিক যে ওই একটিমাত্র সত্যিকে মিথ্যে করে দিয়ে, ওই একটিমাত্র শব্দবদলে, 'আমি'র থেকে 'আমরায় পৌছে দিয়ে, ডাক্তারবাবু তার রােগীটির সঙ্গে সঙ্গে রােগীর পরিজনদেরও অনেকখানি শুশ্রুষা করে নিলেন। সেই মুহূর্তে আশ্বস্ত মন বলছিল, উনি আমাদের পারিবারিক লােক, আপনজন। রােগীর এই সমস্যাটাকে কেবল ওঁর জীবিকার দিক থেকে দেখছেন না, দেখছেন ব্যক্তিগতভাবে।

একটু আগে বললাম সত্যিকে মিথ্যে করে দিয়ে। কিন্তু মিথ্যেই কি ওটা? এটা নিশ্চয় শুধু পদ্ধতি হিসেবেই নয়, সত্য করেই তুলতে চেয়েছিলেন সেই ডাক্তারবাবু। অন্তত পরবর্তী কিছুদিনের আনাগােনায় আর। উদ্‌বেগকাতরতায়, নিরাময়ের পর তাঁর অনাবিল আনন্দপ্রকাশে, সত্যই হয়ে উঠেছিল সেটা। একটামাত্র ওই শব্দব্যবহারের মধ্য দিয়ে তৈরি হয়ে গিয়েছিল আমাদের পারস্পরিক ধারাবাহিক এক সখ্য।

'আমি'কে 'আমরা' করে তােলার ভিন্ন একটা বিবরণ পড়েছিলাম সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লেখায়। কমলকুমার মজুমদার একটি উপন্যাস লিখছেন কৃত্তিবাস পত্রিকার জন্য, অল্পে অল্পে এগােচ্ছে সেটা, তাড়া দিচ্ছেন সুনীল। সেইরকম একটা সময়ে ওয়েলিংটন স্কোয়ারের মােড়ে দাঁড়িয়ে কমলকুমার বলছেন: "শােনাে, এই-যে আমরা উপন্যাসটা লিখছি—', বাধা দিয়ে সুনীল বলেন: 'আমরা বলছেন কেন কমলদা, লিখছেন তাে আপনি! কমলকুমার বললেন: "আঃ, থামাে তাে, আমি তাে লিখছি না, ঠাকুর আমাকে দিয়ে লেখাচ্ছেন মাত্র। সেটা আমি না হয়ে তুমিও হতে পারতে, বা অন্য কেউ। আমরা সবাই মিলেই লিখছি।"

এই বলার মধ্যে যে নিছক একটা বিনয় আছে তা নয়, আছে একটা বিশ্বাস। বিশ্বাসটা এই যে, আমার আমিটা খুব বড় কথা নয়, ওটা একটা উপলক্ষ মাত্র। চারদিকের অভিজ্ঞতা একইসঙ্গে নানা ব্যক্তির মধ্যে সঞ্চিত হচ্ছে, কিন্তু তার প্রকাশ হচ্ছে হয়তাে-বা একজন-দুজনের মধ্য দিয়ে। সেই প্রকাশের মুহূর্তে কেউ কখনাে জোর দিয়েই বলতে পারেন যে এটা 'আমি' বলছি, বললে ভুল হয় না। আবার সেইটেকেই কেউ বলতে পারেন আমরা বলছি, আমরা ভাবছি। কমলকুমার একেবারে নিজের উপন্যাস লেখার প্রসঙ্গে ওই বহুবচনটির ব্যবহার কয়েছেন বলে স্বভাবতই চমক লেগেছিল সুনীলের, কিন্তু ভেবে দেখতে গেলে আমাদের লেখায় বা বলায় ও-রকম প্রয়ােগ তাে হামেশাই ঘটে। ঘটে না কি? ধরা যাক অমিয় চক্রবর্তীর পালাবদল বইটির আলােচনায় বুদ্ধদেব বসু যখন লেখেন:

....এর রাত্রি' কবিতার হঠাৎ কখন শুভ্র বিছানায় পড়ে জ্যোৎস্না, / দেখি তুমি নেই'—আমাদের মনে
পড়িয়ে দেয় লিপিকা'র 'পরির পরিচয়'.. 

তখন নিশ্চয় সেটা একক বুদ্ধদেব বসুরই মনে পড়া, এটা বলা যায় না যে অনিবার্যভাবে সব পাঠকেরই ওখানে লিপিকার কথা মনে পড়বে। কিংবা,

তিনটি যাত্রার কবিতা অক্ষয়ভাবে মুদ্রিত আছে আমাদের মনে: বােদলেয়রের ভ্রমণ', রাবাের মাতাল তরণী', ও রবীন্দ্রনাথের 'নিরুদ্দেশ যাত্রা'... 

বা, এইরকম আরাে আরাে অনেক উত্তমপুরুষ বহুবচনের ব্যবহারে বােঝা যায় যে ওটা লেখকের নিজস্ব বক্তব্য, নিজস্ব বিবেচনা, একেবারেই তার। বড়াে জোর তিনি চাইছেন যে, এটা সকলের হয়ে উঠুক। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও লক্ষণীয় যে উদ্ধৃত ওই বাক্যগুলির বহুবচনকে একবচন করে দিলে কথাটা একই থাকে, শুধু মেজাজটা যায় পালটে। এই ধরনটি তার পরবর্তী রচনার মধ্যে যদি ফিরে আসতে থাকে তাহলে আমরা বলতে পারবাে যে বাংলা কবিতার জন্য নতুন একটি প্রদেশ তিনি জয় করলেন'- এই কথাটার 'আমরা'কে যদি 'আমি' করে দেওয়া যায়, সেই আমি-টা তবে বড়াে প্রত্যক্ষ হয়ে বড়াে স্পর্ধিতভাবে ধাক্কা দিতে পারে কোনাে শ্রোতাকে বা পাঠককে, আমরা বলে তাই হয়তাে একটু নরম করে নিতে চাই তাকে।

অবশ্য, এমন 'আমরা'র ব্যবহারও সম্ভব, যেখানে 'আমি'টাই নেই। আমি'র বাইরে অন্য সবকিছু নিয়ে, বা প্রতিপক্ষ নিয়ে, আমরা চেকোস্লোভাকিয়ার কবি মিরােস্লাভ হােলুবের কবিতার প্রশস্তি করতে গিয়ে যদি কেউ লেখেন যে এ-কবিতা পাঠকদের ধাক্কা দেবে, কেননা: আমাদের কুসংস্কারগুলিকে আমরা বড়াে বেশি ভালােবাসি, সেগুলি কেউ ভাঙতে এলে সেই পরিত্রাতাকেই কুৎসিত ভাষায় গাল পাড়ি আমরা, অন্ধকার হতে জ্যোতিতে উত্তীর্ণ হতে আদৌ আমাদের আগ্রহ নেই', তখন বুঝতে পারি যে এই 'আমরা'র মধ্যে বক্তার 'আমি'টি নেই, কেননা তিনি তাে আর কুৎসিত ভাষায় পরিত্রাতাকে গাল দিতে চাইছেন না, প্রশস্তি করতেই তাে চাইছেন তিনি। কিংবা, সমর সেন বিষয়ে শ্রদ্ধা জানাতে কেউ যদি লেখেন যে 'তার কথা ভেবে আমাদের আর লাভ কী, আমরা কলেজে-কি-অফিসে যাবাে, পান চিবােবাে, একে ওকে খােশামােদ করে বাড়তি দু-পয়সার ব্যবস্থা করবাে, আখেরে সুবিধে হলে দু-তিনটে শৌখিন বক্তৃতা দেবাে, রাত্রিতে আমাদের ঘুম খুব নিটোল হবে, পড়ে মরুক গে সমর সেন' তখন, স্বভাবতই এই হীন আমরা-গুলির মধ্যে আমি নেই, কেননা সে-আমিই তাে সমর সেনের কথা এত করে বলছেন।

ফিরে যাই আবার পুরােনাে কথায়। 'আমি'কে 'আমরা'য় পালটে নেবার কথা বলছিলাম আগে। এমনও কখনাে হতে পারে যে 'আমরা'ই পালটে গেল 'আমি'তে। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখােপাধ্যায়ের একটি বইয়ের নাম অনেকেরই মনে পড়বে: আমরা ও তাঁহারা। গােটা বইটি দুইপক্ষের সংলাপ দিয়ে সাজানাে। একপক্ষে তাহারা। আর অন্যপক্ষে? যে-বইয়ের নামের মধ্যে আছে 'আমরা', সে-বইয়ের পাঠের মধ্যে কিন্তু সবসময়েই 'আমি'। ভূমিকায় ধূর্জটিপ্রসাদ বলে নিয়েছেন: 'আমরা ও তাঁহারা-তে একদিকের বক্তা আমি, অন্যদিকের বক্তা তাহারা। নামে তাহলে আমরা কেন? লেখকের কৈফিয়ত: 'নিজের মধ্যে তথাকথিত উচ্চশিক্ষিতের দোষগুলাে লক্ষ্য করেছি বলেই একবচন ব্যবহার করেছি। অর্থাৎ আমি এখানে আমরা-র প্রতিভূ।

সবসময়ে সেটা হয়ে উঠতে পেরেছে কি না, সে অবশ্য স্বতন্ত্র কথা। আমার মুখ দিয়ে ব্যক্ত মতামতগুলাে ঠিক আমার নয়, আমার দলের' একথাটা তিনি মনে রাখতে বলেন পাঠকদের, কিন্তু সেই দল' অর্থাৎ তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত'দের সাধারণ গােত্র থেকে সরে এসে একেবারে ব্যক্তিগত ধূর্জটিপ্রসাদ হিসেবেই কথাগুলি তিনি উচ্চারণ করেন অনেকসময়ে। সে-প্রসঙ্গটা আপাতত বিবেচ্য নয়। আপাতত যেটা বলতে চাই তা এই যে, ধূর্জটিপ্রসাদের অভীষ্ট আমরা এখানে একটা নির্দিষ্ট গণ্ডি তৈরি করে নিচ্ছে। শহুরে উচ্চশিক্ষিতের গণ্ডি। অন্যদিকে আছেন কারা? সাধারণ মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ মানুষ আবার নির্বাচিত। কেননা, ঘােষণা করেই বলেন ধূর্জটিপ্রসাদ: উচ্চশিক্ষিত এবং মুখের সঙ্গে কোন প্রকার কথােপকথন কি ভাবের বিনিময় সম্ভব নয়। সেইজন্যে শিক্ষাভিমানী বুদ্ধিজীবীকে এবং শহরের অন্য শ্রেণীর বন্ধুদেরকে প্রতীক হিসেবে নিতে হয়েছে। এই তাহারা-র প্রকল্পে তাহলে গ্রামীণ মানুষ নেই, মূখ মানুষ নেই, অন্ত্যজ মানুষ নেই।

সেটা তত বিস্ময়ের কথা নয়। বিস্ময়ের কথা এই ঘােষণা যে এই দুই শ্রেণীর মধ্যে কোনাে ভাবের বিনিময় বা কোনাে কথােপকথনই সম্ভব নয় বলে ভাবছেন একজন সমাজতত্ত্ববিদ। তাহলে নির্দিষ্ট এই 'আমরা' ও 'তাহারা'-র বাইরেও যে বিরাট একটা ওরা-র অস্তিত্ব আছে, তাদের সঙ্গে আমাদের সংযােগ হবে কোথায় ? বা, কীভাবে হবে সেটা?

আমরা যেখানে সত্যিই আমরা, আমরা যেখানে আমি, আমরা যেখানে আমিটাই নেই, আমিই যেখানে। আমরা, আর আমরা যেখানে বৃত্তায়িত একটা গােষ্ঠী এই নানারকমের প্রয়ােগের কথা যে ভাবছি, তার সঙ্গে আমাদের জনসংযােগ বা সংযােগহীনতার একটা সম্পর্ক আছে। ধূর্জটিপ্রসাদ 'আমরা' শব্দে যে-শ্রেণীটির কল্পনা করে নিয়েছেন, সে হলাে একরকমের বিভাজন। নানাসময়ে নানাপ্রসঙ্গে, এই বিভাজনটাকে আমরা ভিন্ন নানা জায়গায় পৌছে দিতে পারি। আমরা বিদ্বান ওরা অবিদ্বান, আমরা শহুরে ওরা গেঁয়াে, আমরা শাদা ওরা কালাে, আমরা মুসলমান ওরা হিন্দু, আমরা মেয়ে ওরা পুরুষ, আমরা সি পি এম ওরা কংগ্রেস এবং এ-রকম আরাে আরাে অনেক। কোনাে কোনাে বিবরণের জন্য এ-রকম বিভাজন দেখানাের দরকার হয়ে পড়ে। কিন্তু যেসব সময়ে এই সমস্তটাকে জড়িয়ে নিয়ে ভাবনা করবার কথা, তখন 'আমরা' শব্দের এমন বিভাজিত প্রয়ােগ হয়তাে স্থায়ী কোনাে সংকট তৈরি করে তুলতে পারে, আমাদের বােঝায় অনেক ভুল ঘটে যেতে পারে। ধরা যাক, কোনাে সরকার যখন আমরা উচ্চারণে কোনাে কথা বলেন, তখন সে-আমরা থেকে বিরােধী কোনাে রাজনৈতিক পক্ষ বর্জিত থাকতে পারে বটে, কিন্তু তার অন্তর্গত করে নেবার কথা দেশের সমস্ত সাধারণ মানুষকে। অর্থাৎ, বক্তাকে বুঝতে হবে যে তার সেই 'আমরা'র পরিসর যত ছােটো হয়ে আসবে, তার দেশও হয়ে উঠবে ততটাই খণ্ডিত। কথাটা এ নয় যে 'ওদের' 'আমরা' করে তুলতে হবে, বরং এই হবার কথা ছিল যে ওরা আমরাই'। সেটা লক্ষ না করে, আমরাওরার যে বিভাজনটা দূর করবারই দায়িত্ব ছিল আমাদের, একটা শব্দব্যবহারের মধ্য দিয়ে সেটাকে হয়তাে-বা বাড়িয়েই চলেছি আমরা।

বলা যায়, শব্দব্যবহারটা স্বতন্ত্র কোনাে সমস্যা নয়। শব্দব্যবহার মানসিকতারই বাইরের একটা প্রকাশ মাত্র। ঠিক। কিন্তু এও ঠিক যে মানসিকতা থেকে জাত শব্দটাই আবার সেই মানসিকতাকে প্রভাবিত করতে থাকে। গণ্ডিবদ্ধ 'আমরা বলতে বলতে আরাে বেশি করে একটা দলীয় 'আমরা'র গণ্ডির মধ্যে ঢুকে পড়তে চায় মন, আত্মবিস্মৃত মন।

আর, বাচনের এই 'আমরা' যদি কখনাে হয়ে ওঠে 'আমি'? প্রভুত্বের ওজনটা তখন আরাে বেশি সামনে চলে আসে, আমাদের পেয়ে বসে। যে-কোনাে একটা জায়গায় অল্পবিস্তর স্তরবিন্যাস থাকেই কর্মীদের মধ্যে। সেখানে প্রধান দায়িত্বে যিনি থাকেন, তিনি যদি কেবলই বলতে শুরু করেন 'আমার বিভাগ' 'আমার কর্মী 'আমার লক্ষ্য', তাহলে তার মধ্য দিয়েই একটা বিপদের সূত্রপাত হয়। আমাদের যে ডাক্তারবাবুর কথা বলছিলাম আগে, তিনি একার করা কাজটা নিয়েই বলতেন 'আমাদের কাজ'। আর আমরা অনেকসময়েই সকলের করা কাজটাকে বলতে শুরু করি আমার কাজ। ব্যক্তিগত স্তর থেকে সামাজিক রাজনৈতিক স্তর পর্যন্ত এই 'আমি' তখন হয়ে ওঠে এক ঘােষণা-শব্দ, চিৎকারশব্দ, যার মধ্য দিয়ে এগােতে থাকে অবারণ একটা জোর দিয়ে বলবার প্রতাপভঙ্গি। আর সেই চোরাপথে এগিয়ে আসে ফ্যাসিবাদ। ফ্যাসিবাদ আমাদের স্বভাবের একটা অনিয়ন্ত্রিত চিৎকার।

০৪.

একশাে চব্বিশ বছর আগে ভারতী পত্রিকায় একটি লেখা ছাপা হয়েছিল, তার নাম 'চেঁচিয়ে বলা'। সেলেখায় যে-সাধুভাষার ব্যবহার ছিল, তাকে চলিতের রূপে পালটে নিলে, মনে হতে পারে যেন একেবারে আজকের এই সময়টা নিয়ে, এর সমস্যাটা নিয়ে, কথা বলতে চাইছেন কেউ। সে-লেখার ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে বেশকয়েকটি লাইন এখানে একবার শুনে নেব আমরা:

১. আজকাল সকলেই সকল বিষয়েই চেঁচিয়ে কথা কয়। আস্তে বলা একেবারে উঠিয়া গিয়াছে।...সেকরা গাড়ি যত না চলে, ততােধিক শব্দ করে; তাহার চাকা ঝনঝন করে, তাহার জানলা ঝরঝর করে, তাহার গাড়ােয়ান গাল পাড়িতে থাকে, তাহার চাবুকের শব্দে অস্থির হইতে হয়। বঙ্গসমাজও আজকাল সেই চালে চলিতেছে, তাহার প্রত্যেক ইঞ্চি হইতে শব্দ বাহির হইতেছে।

২. কানটাই আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হইয়াছে। দেখােনা, বাংলা খবরের কাগজগুলি কেবল শব্দের। প্রভাবেই পাঠকদের কান দখল করিয়া বসিয়া আছে। কী যে বলিতেছে তাহা বড়াে একটা ভাবিয়া দেখে না, কেবল গলা খাটো না হইলেই হইল। একটা কথা উঠিলে হয়, অমনি বাংলা খবরের কাগজে মহা চেঁচামেচি পড়িয়া যায়। কথাটা হয়তাে বােঝাই হয় নাই। ভালাে করিয়া শােনাই হয় নাই, হয়তাে সে বিষয়ে কিছু জানাই নাই কিন্তু আবশ্যক কী ? বিষয়টা যত কম বােঝা যায়, বােধ করি, ততই হাে হাে করিয়া চেঁচাইবার সুবিধা হয়। 

লেখাটা, হয়তাে না-বললেও চলে, রবীন্দ্রনাথের। লিখেছিলেন, যখন তার বাইশ বছর বয়স। 'গলা খাটো না হইলেই হইল'— একথা অবশ্য এই সােয়াশাে বছরে ভিন্ন একটা মাত্রা পেয়ে গেছে, কেননা খবরের কাগজের বাইরে এখন আরাে আছে আকাশবাণী বা দূরদর্শন। সেখানে, আলংকারিক অর্থে নয়, বাস্তবতই গলা খাটো করবার একটা যেন প্রতিযােগিতাই চলে। সভাস্থলের বক্তৃতা বিষয়ে 'চেঁচিয়ে বলা' প্রবন্ধে একটা কথা আছে এইরকম: 'বক্তা যখন বক্তৃতা দিতে উঠেন, তখন সে এক অতি কষ্টকর দৃশ্য উপস্থিত হয়। গ্রহণী রােগীর ন্যায় তাহার হাতে পায়ে আক্ষেপ ধরিতে থাকে, গলার শির। ফুলিয়া ওঠে, চোখ দুটো বাহির হইয়া আসিতে চায়। কেবল সভাস্থলে নয়, এ-রকম দৃশ্য অনেকসময়েই আজকাল দেখতে হয় আমাদের, নানা জায়গাতেই।

দেখতে হয়, কেননা, শুধু এ-মাধ্যমে ও-মাধ্যমে নয়, দুরদর্শনের এ-খাতে ও-খাতেও ঘাের একটা প্রতিযােগিতা চলতে থাকে, স্কুপ বা এক্সক্লসিভ বা বাইটজাতীয় নেশার তাড়নায় উত্তেজনার ঝোঁকটা বেড়ে যায়, খবরদেনেওয়ালারা অথবা তার্কিকেরা ভাবতে থাকেন যে স্বরগ্রাম উঁচু থেকে উঁচুতে তুলতে পারলেই সত্য আরাে বেশি করে জোর পাবে। কথাটা যাঁরা শুনছেন তাদের বােধ বা বিবেচনার উপর কোনাে আস্থা থাকে না বলেই এমনটা ঘটে, না কি বক্তা নিজের কথার উপর ততটা ভরসা রাখতে পারেন না বলেই এটা করেন? হয়তাে দুটোই সত্যি। প্রাণের সঙ্গে যখন কোনাে কথা বলি, তখন যাহা বলি তাহারই একটা বল থাকে— যখন প্রাণে বাজে নাই অথচ মুখে বলিতে হইবে, তখন চেঁচাইয়া বলিতে হয়, বিস্তর বলিতে হয়। লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।

চেঁচিয়ে বলার সঙ্গে এখানে যুক্ত হলাে তবে বাড়িয়ে বলা, অত্যুক্তি। আর সেই বাড়িয়ে বলা সহজেই পৌছে যায় বানিয়ে বলায়, মিথ্যাচারে। বুঝিয়ে বলার চেয়ে বক্তার তখন দরকার হয় ঘাের লাগানাে, নেশা ধরানাে, হিনটিজম। এই তাে 'হিপনটিজম' বলেছিল সন্দীপ। এই শক্তিই পৃথিবী জয় করবার শক্তি। কোনাে উপায় নয়, উপকরণ নয়, এই সম্মােহন। কে বলে সত্যমেব জয়তে? জয় হবে মােহের। বলেছিল সে। অত্যুক্তি সইতে পারত না নিখিলেশ, আর সন্দীপের অস্ত্রই হলাে অত্যুক্তি। তাই সন্দীপের প্রসঙ্গ এলেই উপন্যাসে আমাদের শুনতে হয় 'ঝড়ের দমকা হাওয়া'র কথা, বজ্রের উপর বজ্রের গর্জন, বিদ্যুতের উপর বিদ্যুতের চমকানি'র কথা। তার দলবলের চিৎকারে 'আকাশটা যেন ফেটে টুকরাে টুকরাে হয়ে ছিড়ে পড়ে, তার স্বপ্ন জনসমুদ্রের ঢেউয়ের উপর' দুলতে থাকা, যার চারিদিকে গর্জন আর ফেনা। তর্কের জোর বােঝাতে মেঝের উপর লাথি মারে সে, কার্পেট থেকে অনেকখানি নিদ্রিত ধুলাে চম্‌কে উপরে উঠে পড়ে। ভিতরকার শক্তিতে যত দীনতা, বাইরে ততটাই বেড়ে ওঠে আস্ফালন, তাই এত ঠুকতে হয়, এত শব্দ করতে হয়। সত্যকে সে চায় না, সত্যকে সে বানিয়ে তােলে।

বানিয়ে তােলার এই আস্ফালনে এই চিৎকারে চারপাশে গড়ে তােলা যায় নেশায়-পাওয়া দল, যেখানে আত্মব্যক্তিত্বের কোনাে দরকার হয় না আর, দরকার হয় না নিজের প্রতি বা সত্যের প্রতি কোনাে বিশ্বাসের বা অভিমুখিতার। তখন যে-সংযােগ ঘটে, সেটা কোনাে বােধের সঙ্গে বােধের নয়, যন্ত্রের সঙ্গে যন্ত্রের। সে-রকম সংযােগের— না কি অসংযােগের কথা ভেবেই চার অধ্যায়-এর উত্তপ্ত অন্তু বলেছিল দিশেহারা এলাকে: 'আপন শক্তির পরে বিশ্বাসকে গােড়াতেই এমনি করে ঘুচিয়ে দেওয়া হয়েছিল যে, সবাই সরকারি পুতুলের ছাঁচে নিজেকে ঢালাই করতে দিতে স্পর্ধা করেই রাজি হল।' শুধু চার অধ্যায় বা ঘরে-বাইরের ঘটনাকালে নয়, যে-কোনাে রাজনৈতিক সামাজিক আন্দোলনের বড়াে বড়াে মুহূর্তে এই কথাগুলির সত্যতা আমরা বারে বারেই দেখতে পাই। দেখতে পাই যে, পারস্পরিক সংযােগের কোনাে সুঠাম পথে আমাদের সন্ধান থাকে কম, দ্রুত সিদ্ধির লক্ষ্য নিয়ে ব্যক্তির বা দলীয়তার জোর খাটানােটাই হয়ে ওঠে বড়াে। জোর যে শুধু আস্ফালনে নয়, নেশাটাই যে ফলপ্রদ শক্তি নয়, সত্যের সঙ্গে খাটে না কোনাে জোর-জবরদস্তি,-- নিখিলেশের মতাে সেইসব আত্মস্থ বিশ্বাসে আর ভরসা রাখতে পারি না আমরা।

বলছি না যে এ কেবল আমাদের রাজনৈতিক সামাজিক সমস্যা। ঘরে-বাইরে যেমন একইসঙ্গে রাজনৈতিক আর গৃহনৈতিক, আমাদের সমস্ত সমস্যাই প্রায় সেইরকম, একাধিক তলে একইসঙ্গে তার চলাচল। ঘরে কিংবা বাইরে, কাজে কিংবা খেলায়, একের সঙ্গে অন্যের সম্পর্ক রচনায় এই প্রভুত্ব বা জোরটাই আমাদের চালাতে থাকে পদে পদে, সংযােগের অর্থ তখন দাঁড়ায় শুধু প্রচ্ছন্ন সংযােগহীনতা। হাতের থেকে একটু দূরেই থেকে যায় হাত। মাঝখানে জেগে থাকে শুধু আস্ফালনের কথা, অহংগণ্ডির কথা, মহানগরের ঘূর্ণিপাকে ঘুরতে-থাকা অলস উৎক্ষিপ্ত নিষ্ফল বিবর্ণ কিছু কথা। মনে পড়ে, আর্তুরাে উই'তে ব্রেখট্‌ একবার লিখেছিলেন: 'কথা বলবার বদলে যদি শুধু একটু কাজ করতে পারতাম আমরা!'

০৫.

ঘরে-বাইরের নিখিলেশ তর্ক করেছে অনেকসময়ে, সন্দীপের সঙ্গে বিমলার সঙ্গে, কিন্তু অনেক অনেক বলবার-মতাে মুহূর্তে সে বলেওনি কোনাে কথা। আস্তে আস্তে তার উঠে চলে যাওয়ার কিংবা আস্তে আস্তে অল্প কয়েকটা কথা বলার ছবি ধরা আছে বিমলার মনে। একবার যেমন: মনে হল আমার স্বামীর কিছু বলবার আছে, কিন্তু তিনি বললেন না, আস্তে আস্তে চলে গেলেন। এই চলে-যাওয়াও কিছু বলে না কি? দীর্ঘ তপ্ত বাগ্মিতায় সন্দীপ যখন দেশের মেয়েদের অন্যায় শক্তির স্তুতি করছে, আবেগভরে কবিতা শােনাচ্ছে, গর্জে উঠে বলছে আমাদের সকলকে নষ্ট হবার দুর্জয় তেজ দাও', নিখিলেশ তখন তার গায়ে হাত রেখে আস্তে আস্তে বলছে: সন্দীপ, চন্দ্রনাথবাবু এসেছেন। সবকিছুর ওপর নম্রতার একটা প্রলেপ এসে পড়ল।

এই ধীরতার কোনাে সুদূর ফলও কি নেই? এত-যে উদ্ভ্রান্ত অবুঝ বিমলা, সেও কিন্তু কখনাে শরীরের নীরব ভাষায় দেখতে পায়: 'আমার স্বামীর অন্তরের একটি গভীর বেদনা তার মুখের উপর ছায়া ফেলে চলে গেল।' শব্দহীনতা কিছুই যে তাকে বলেনি তা নয়। সে দেখতে পায় কীভাবে সমস্ত উত্তেজনার মধ্যে নিখিলেশকে যেন একটা বিষাদ এসে আঘাত করত। যেটা সামনে দেখা যাচ্ছে তার উপর দিয়েও তিনি যেন আর একটা-কিছুকে দেখতে পেতেন।'

একাধিকবার এ-উপন্যাসে বলা আছে যে নিখিল চুপ করে রইল। নীরবতারও একটা ভাষা আছে। সে-ভাষা পড়তে অনেকসময়ে ভুলে যাই আমরা। শুধু যে পড়তে ভুলি তা নয়, তার ব্যবহারও হয়তাে ভুলে যাই জীবনে, ভুলে যাই যে অনেকসময়ে নীরবতা একটা সামর্থ্য। ভাষার সংযােগের সঙ্গে নীরবতার সংযােগ মিলে গিয়ে যৌথভাবে গড়ে ওঠে একটা সংযােগের ভাষা। জীবনব্যবহারে সেই ভাষাটাকে বারেবারেই হারিয়ে ফেলি আমরা। আর তখনই বেড়ে ওঠে চিৎকার, তখনই বেড়ে ওঠে আমি, তখনই বেড়ে ওঠে পরস্পরের মধ্যে সেতুহীন এক দূরত্ব।

পশ্চিম জগতের একটা প্রথা আছে, সামান্যতম যে-কোনাে প্রাপ্তিতে বলতে হয় 'ধন্যবাদ', না-বলাটা সেখানে অপরাধ। অবশ্য এখন আর পশ্চিমজগতে' বলবার মানে নেই, আমাদেরও এটা কৃত্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। ওই কথাটা কিন্তু এমনভাবেও উচ্চারণ করতে পারি আমরা করে থাকি অনেকসময়ে যাতে শব্দটা থাকে, ধন্যতাটা থাকে না কোথাও। উলটোপক্ষে, কোনাে শব্দের সাহায্য ছাড়াও, আমাদের সেই কৃতজ্ঞ মনােভাবটা প্রকাশ করতে পারি আমরা, আমাদের মুখের রেখায়, চোখের চাওয়ায়, আমাদের সামগ্রিক দৈহিক আভায়। রবীন্দ্রনাথের কণিকায় দুটি লাইন আছে এ-রকম:

দয়া বলে, কে গাে তুমি মুখে নাই কথা?
অশ্রুভরা আঁখি বলে, আমি কৃতজ্ঞতা। 

অশ্রুভরা আঁখিই কেবল নয়, শব্দহীন শরীর নানামুহূর্তে খুঁজে নেয় তার নানারকমের ভাষা। উচ্চারিত শব্দের বাইরেও তখন তৈরি হয়ে ওঠে ভিন্নরকম সংযােগের বােধ। আবার, শব্দের মধ্যে মেলানাে থাকতে পারে অনেক সেই অনুচ্চারণ।

'কানটাই আমাদের এখন একমাত্র লক্ষ্য হইয়াছে' এই আক্ষেপের কথাটা ছিল চেঁচিয়ে বলা' প্রবন্ধে। আর, তার অনেকদিন পরে, এর একেবারে উলটোপ্রান্তে, ফাল্গুনী নাটকে, অন্ধ বাউলের সঙ্গে নবযৌবনের দলবলের একটা সংলাপ চলছিল এইরকম:

কী হে ভাই, ঠিক নিয়ে যেতে পারবে তাে?
ঠিক নিয়ে যাব।
কেমন করে।
আমি-যে পায়ের শব্দ শুনতে পাই।
কান তাে আমাদেরও আছে, কিন্তু
আমি যে সব-দিয়ে শুনি শুধু কান দিয়ে না। 

এই সব দিয়ে শােনার জন্য কখনাে কখনাে প্রস্তুত হতে হয় আমাদের। সে যে কেবল শিল্পের আস্বাদনে তা নয়, সে যে কেবল প্রণয়ের মুহূর্তে তা নয়, সে আমাদের নিছক দৈনন্দিনেও, সে আমাদের সমাজনৈতিক চর্চাতেও। সংযােগের অভিপ্রায়ে তৈরি করে তােলা আমাদের সমস্ত ভাষারই মধ্যে আমরা তাই ছড়িয়ে রাখতে চাই একটা নীরবতার পরিসর, সমস্ত চিৎকারের বাইরে, সমস্ত আমিত্বের বাইরে। আর সেইভাবে, আমাদের যে-কোনাে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যেই, এই এক সব-দিয়ে শােনার জন্য নিজেকে উন্মুখ রাখতে চাই আমরা। তখন, শুধু বাণী নয়, আমাদের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় অন্য কোনাে স্পর্শের জন্য, বলতে ইচ্ছে হয়: হাতখানি ওই বাড়িয়ে আনো।

মাসদেড়েক আগে, বঙ্গসংস্কৃতি সম্মেলনের প্রযােজনায়, একটি অভিনয় চলছিল কার্জন পার্কে। পড়তি বিকেলে, খােলা জায়গায়, ছােটো একটি বৃত্ত তৈরি করে নিয়ে সেখানে রক্তকরবীর অভিনয় করছিলেন কয়েকজন মানুষ, কেউ যাঁরা চোখে দেখতে পান না। দর্শক ছিলেন অল্প কয়েকজন। পূর্ণ অন্ধদের সেই সুঠাম অভিনয়শেষে দর্শকেরা যখন উচ্ছাস জানাচ্ছেন, আশ্চর্য একটি দৃশ্যের জন্ম হলাে তখন। সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে কুশীলবেরা সবাই তাদের খােলা দুহাত বাড়িয়ে রেখেছেন প্রার্থীর মতাে। কী চান তারা? কিছু কি চান? তাঁদের মধ্যে একজন বললেন: 'আপনারা। সবাই এসেছেন, কিন্তু আমরা তাে দেখতে পাচ্ছি না। আপনারা যদি আমাদের সকলের হাতের ওপর একটু হাত ছুঁয়ে যান, আপনাদের ভালােলাগাটা আমাদের মধ্যে পৌছবে, আমাদের ভালাে লাগবে।' দর্শকেরা একে একে সকলের হাতে হাত রাখলেন, কারাে কারাে চোখে এল জল।

আমরা যখন সত্যিকারের সংযােগ চাই, আমরা যখন কথা বলি, আমরা ঠিক এমনই কিছু শব্দ খুঁজে নিতে চাই, এমনই কিছু কথা, যা অন্ধের স্পর্শের মতাে একেবারে বুকের ভিতরে গিয়ে পৌঁছয়। পারি না হয়তাে, কিন্তু খুঁজতে তবু হয়, সবসময়েই খুঁজে যেতে হয় শব্দের সেই অভ্যন্তরীণ স্পর্শ।

শঙ্খ ঘোষ

রবিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২১

লাশ পড়ছে গণতন্ত্রের ~ শমীক লাহিড়ী

একটা নির্বাচন। ৫ জন মৃত। ৪৪ জন প্রার্থী আক্রান্ত। আক্রান্ত সাংবাদিকের সংখ্যা জানা যায়নি। আর আক্রান্ত ভোটার? ওদের নিয়ে আবার আলোচনা হয় নাকি!

কে নেবে দায়িত্ব?  সন্ধ্যাবেলায় সেজেগুজে নির্বাচন কমিশনের কর্তারা বলবেন শান্তিপূর্ণ ভোট, ঐ ৫টা লাশ বাদে। না মরলে ভালো হ'তো, কিন্তু মরেছে যখন, কি আর করা যাবে! 

অযথা হৈচৈ করবেন না। এখন  উৎসব চলছে গণতন্ত্রের! 

লাশের মালিকানা কার, টানাহেঁচড়া চলবে। প্রধানমন্ত্রী- মূখ্যমন্ত্রী- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর চাপানউতর চলবে। বাকি ৪দফা নির্বাচনের দফায় দফায় কে বেশি ফায়দা তুলতে পারে, তার প্রতিযোগিতা  চলতে থাকবে। সন্ধ্যায় সেজেগুজে  টিভি-র সঞ্চালকরা হৈ হৈ করে, রে রে রব তুলে, ঝগড়া বাঁধিয়ে, TRP বাড়াবার জন্য গলা কাঁপিয়ে চেঁচিয়ে তুমুল আলোচনায় মেতে উঠবে। লাশের পাশে মা-বৌদের আছাড়ি পিছাড়ি কান্না, যে যত নিখুঁত সম্পাদনায় উপস্থাপিত করতে পারবে, তার বিজ্ঞাপনও তত মিলবে। 

সবার মুনাফা - কিন্তু ঐ পাঁচের বাপ-মা-ভাই-বোনের কি হবে! ভোটের আইনের প্যাঁচে ইচ্ছা থাকলেও মুখ্যমন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী ক্ষতিপূরনের অঙ্ক ঘোষণা করে সহানুভূতি আদায়ের প্রতিযোগিতায় নামতে বা ফায়দা তুলতে পারছেন না। 

তাই বেচারা লাশগুলো অনেককেই অনেক মুনাফা তোলার সুযোগ দিলেও,  ওদের বাপ-মা-বৌ- সন্তানদের হাতে রইল শূণ্য। 
আসলে লাশ তো পড়েছে গণতন্ত্রের।

নির্বাচনের দিন ঘোষণার আগে থেকেই নানা উস্কানিমূলক কথা বলেই চলেছেন দুই শাসকদলের চুনোপুঁটি নেতা মন্ত্রী থেকে শুরু করে মুখ্যমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচন কমিশন অভিযোগ জমা পড়ার বা  দিল্লির ইশারার অপেক্ষায় না থেকে, নিজে থেকে কোনো উদ্যোগ নিতে পারতো না? 

জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০/৫১ এর ৩২৪ নং ধারায় নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা দেওয়া আছে অবাধ শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সংগঠিত করার। ক্ষমতার কোনো অভাব নেই। তাও নখ-দন্তহীন এই দৈন্য চেহারা কেন? 

যারা উত্তেজক বক্তৃতা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারতো না নির্বাচন কমিশন? ৭২ ঘন্টার জন্য তাদের প্রচারের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারী করতে পারতো না? 

প্রধানমন্ত্রী ৮ দফার নির্বাচনের প্রতিটি দিন এসে ভাষন দিচ্ছেন, আর তার সরাসরি সম্প্রচার হচ্ছে টিভি তে। ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনে সেই বক্তৃতা শুনছে ভোটার। একই কথা মুখ্যমন্ত্রী সহ সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। হয় টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করা হোক, অথবা প্রতি দফার নির্বাচনের ৪৮ ঘন্টা আগে সব সভার অনুমতি  দেওয়া বন্ধ করা হোক। কিছু একটা রাস্তা বলুক।

কসবায় আজ নির্বাচন। রাস্তার ওপারে বালিগঞ্জ কেন্দ্রে পরে নির্বাচন। এপারে মাইক খাটিয়ে ইচ্ছেমতো প্রচার চলছে, বাইক বাহিনী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। 

৪৮ ঘন্টা আগে প্রচার বন্ধ, ৭২ ঘন্টার মধ্যে বাইক মিছিল বন্ধ - এইসব ফাজলামির মানে কি? আসলে লাশ তো পড়ছে নির্বাচন বিধির।

আকাশে বাতাসে কোটি কোটি টাকা উড়ছে। আকাশময় বিজেপি- তৃণমূলের হেলিকপ্টার রোজ চক্কর কাটছে। এলি-তেলি যে খুশী ফাঁকতালে উড়ে নিচ্ছে। দেখছে না নির্বাচন কমিশন? কে দিচ্ছে টাকা? বিজেপি ১০০০ টাকার কুপন বিলি করছে, তৃণমূল ১০০০টাকা ভোট মিটলেই দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে লিফলেট বিলি করছে। কমিশন নিজে তো কিছু করছেই না, অভিযোগ জমা পড়লেও সেগুলোর স্থান হচ্ছে কমিশন দপ্তরের ডাস্টবিনে। আসলে প্রতিদিন লাশ ছড়িয়ে পড়ছে ঐ ডাস্টবিনগুলোয়।

বিশেষ সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ডের টাকার সিংহভাগই  জমা পড়ছে বিজেপি-তৃণমূলের ভান্ডারে। কে দিচ্ছে জানতে চাওয়া নাকি অপরাধ! এই প্রকাশ্য ঘোষিত দুর্নীতির স্বপক্ষে সর্বোচ্চ ন্যায়ালয়ের সীল মোহর পড়েছে! 
লাশ তো গণতন্ত্রের পড়েছে সেইদিনই। 

প্রকাশ্যে নির্লজ্জভাবে অর্থের বিনিময়ে খবর প্রকাশিত হচ্ছে অনেকগুলো বড় বড় সংবাদমাধ্যমে। যাকে বলে খোলামেলা Paid News। দেখছে না নির্বাচন কমিশন? গণতন্ত্রের ৪র্থ স্তম্ভ এখন ফ্যাসিস্ট আর স্বৈরাচারের মুখপত্র। গণতন্ত্রের লাশ তৈরি হচ্ছে কর্পোরেট মিডিয়ার প্রতিটি অক্ষরে প্রতিদিন। গণতন্ত্রের  লাশে বিপুল উৎসাহে রোজই ফুল মালা চড়াচ্ছে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রিত টিভি  আর খবরের কাগজের খবর। 

নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক সংস্থাও যদি সরকারের পেটোয়া হয়ে যায়, তাহলে গণতন্ত্রের শ্রাদ্ধশান্তির তারিখটাও ঘোষণা করে দেওয়া হোক।

৭৩ বছর আগে অর্জিত স্বাধীনতা, স্বৈরাচার আর ফ্যাসিস্টদের হাতে লাশ হতে পারে না। জীবন- জীবিকা-রুটি-রুজির লড়াই ব্যর্থ হয় না। 

ভোট দিন। সবাই ভোট দিন। দলবদ্ধভাবে ভোট দিন। শান্তি সম্প্রীতি জীবন জীবিকা শিক্ষা স্বাস্থ্যের লড়াইয়ের পক্ষে ভোট দিতে লম্বা লাইনে দাঁড়ান। 

গণতন্ত্রকে লাশ হতে দেওয়া যায়না।

শমীক লাহিড়ী 
১০এপ্রিল, ২০২১

শুক্রবার, ৯ এপ্রিল, ২০২১

সিঙ্গুর কেমন আছে ~ অর্ক ভাদুরী

এই লেখাটা দিন কুড়ি আগে লিখেছিলাম। তারপর থেকে আরও বার পাঁচেক সিঙ্গুরে যেতে হয়েছে। পরিস্থিতি বেশ খানিকটা বদলেছে। আগামীকাল সিঙ্গুরে ভোট, তার আগে একটু আধটু বদলে নিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করলাম।


দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নেমে চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করা গেল, তাপসী মালিকের বাড়িটা কীভাবে যাব? তিন-চারজন এগিয়ে এলেন। "এই রাস্তাটা ধরে সোজা এগিয়ে যান। টাটার মাঠের পাশ দিয়ে যাবেন। তারপর কাউকে জিজ্ঞেস করবেন উজ্জ্বল সংঘের মাঠ, বাজেমেলিয়া…"

টাটার মাঠ?

হ্যাঁ, টাটার মাঠ। এক হাজার একরের মাঠ। যে জমিতে একদিন কারখানা হওয়ার কথা ছিল, রাজ্য রাজনীতির ভরকেন্দ্রে ছিল যে জমি, যে হাজার একরকে কেন্দ্র করে পৃথিবীর ইতিহাসে সংসদীয় পথে গড়ে ওঠা সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি কমিউনিস্ট শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন কালীঘাটের টালির চালা থেকে উঠে আসা প্রাক্তন যুব কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই জমি এখন ধু ধু মাঠ। বিক্ষিপ্ত ভাবে দু-এক জায়গায় চাষের কাজ হচ্ছে, অধিকাংশ জায়গাই ফাঁকা, এককালে যে জমি সবুজে সবুজ হয়ে যেত, তার শরীরময় পড়ে আছে মৃত কারখানার কঙ্কাল। মাটির অনেক নিচে বসে থাকা সিমেন্টের ভিত, যা বহু চেষ্টাতেও উপড়ে ফেলা যায়নি, ইতস্তত ছড়িয়ে থাকা এক দশক পুরনো সারি সারি লোহার রড, নিরাপত্তারক্ষীদের থাকার জায়গার ভগ্নাবশেষ। একটু দূরে পর পর কয়েকটি পুলিশ ভ্যান। টাটার মাঠ পাহারা দিচ্ছে বছরভর। চোখে পড়ল কয়েকদিন আগে সিপিএমের করা 'প্রতীকি' শিলান্যাসের ফলক। তার গায়ে ঝুলতে থাকা বাসি মালা যেন বুঝিয়ে দেয়, তরুণ প্রার্থীকে নিয়ে পার্টিবৃত্তে উৎসাহ থাকলেও এই তল্লাটে বামেদের সংগঠন এখনো সেই তিমিরেই। 

সিঙ্গুর স্টেশনের গায়ে মনোরঞ্জন মালিকের এক চিলতে দোকান। ভোট প্রচারে বেরিয়ে সেখানে পৌঁছে গিয়েছিলেন সিপিএমের তরুণ প্রার্থী ছাত্রনেতা সৃজন ভট্টাচার্য। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঘুরে বেড়াচ্ছে সেই ভিডিও। দেখা যাচ্ছে, সৃজনকে হাত তুলে আর্শীবাদ করছেন মনোরঞ্জন। ফাল্গুনের ভরদুপুরে যখন তাঁর বাড়িতে পৌঁছনো গেল, দোকান ফেরত মনোরঞ্জন তখন খেতে বসবেন। রং না হওয়া বাড়ির তক্তপোষে বসে সৃজনের কথা তুললাম।

- আপনি কি সিপিএম প্রার্থীকে আর্শীবাদ করেছেন?

 মনোরঞ্জন বললেন, "ছেলেটি বয়সে তরুণ। আমার দোকানে এসে বলল, আমি ভোটে দাঁড়িয়েছি। আর্শীবাদ করবেন। আমি তখন হাতটা তুলে বললাম, ভাল হোক। এইটুকুই। আমার বাড়িতে যদি কেউ আসে, সে যদি চরম শত্রুও হয়, ভাল ব্যবহার তো করতেই হবে।" এরপরেই তাঁর সংযোজন, "সিপিএম আমার মেয়েকে খুন করেছিল। মেয়েটা বেঁচে থাকলে আজ এই সৃজনের বয়সী হত। সিপিএমকে আমি কখনো ক্ষমা করব না।"

মালিক পরিবারে বাহ্যত নিম্মবিত্ততার ছাপ স্পষ্ট। বাইরের ঘরে দেওয়ালে একটা ফটোফ্রেমে  ছবির কোলাজ। কোন ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে মনোরঞ্জন, কোনটাতে মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে। কয়েকটি ছবিতে উপস্থিত রয়েছে সিঙ্গুরের 'মাস্টারমশাই', প্রবীণ বিধায়ক রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। এই বছর যিনি দল বদলে বিজেপির প্রার্থী। কিন্তু একটি ছবিতেও নেই জমি আন্দোলনের অন্যতম মুখ বেচারাম মান্নার।

কেন? বেচাবাবুর সঙ্গে কি আপনার দূরত্ব রয়েছে?

মনোরঞ্জন দৃশ্যতই বিরক্ত। হাতজোড় করে বললেন, "বেচার সঙ্গে আমার খুবই সুসম্পর্ক। বড় বেশি সুসম্পর্ক। ওর সম্পর্কে কোনও কথা আমায় বলতে বলবেন না।"


সিঙ্গুরে কান পাতলে অবশ্য সেই সম্পর্কের রসায়ন ভালই বোঝা যায়। তাপসী মালিকের বাবার সঙ্গে কার্যত মুখ দেখাদেখি নেই বেচারামের। হরিপালের বিধায়ক এবার সিঙ্গুরে তৃণমূলের প্রার্থী। পাশের আসন হরিপালে লড়ছেন তাঁর স্ত্রী। রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা বেচারামের বিরুদ্ধে সিঙ্গুর জুড়ে অনেক অভিযোগ। তাঁর নাকি এই ক বছরে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। একাধিক পেট্রল পাম্পের মালিক নাকি তিনি। এমনকি, বিজেপির আদি কর্মীদের একাংশের এমনও দাবি, লকেট চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গেও নাকি হটলাইন রয়েছে বেচারামের। তাঁর জয় নিশ্চিত করতেই নাকি ৮৯ বছরের মাস্টারমশাইকে বিজেপির টিকিট দিয়েছেন লকেট। অন্যদিকে, বেচা শিবিরের পাল্টা দাবি, বাইরে থেকে বাড়ি যেমনই হোক, মনোরঞ্জনও নাকি অনেক সম্পত্তির মালিক। আর রবীন্দ্রনাথবাবু বাড়ির বাইরেই বেরোতে চান না। বহুদিন ধরেই নাকি দলের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছিলেন মাস্টারমশাই। বলা বাহুল্য, এই সব অভিযোগ এবং পাল্টা অভিযোগের কোন প্রমাণ নেই৷ বাতাসে ভাসিয়ে দেওয়া কথার মতোই সিঙ্গুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এরকম বহু ফিসফাস।

ভোটের প্রচারে অবশ্য কেবলই বেচারাম। সিপিএমের 'বহিরাগত' প্রার্থী সৃজন ছুটছেন ঠিকই, কিন্তু ধারে ভারে প্রত্যাশিতভাবেই অনেক এগিয়ে তৃণমূল। আর বিজেপি প্রথমে বেশ কয়েকদিন কার্যত প্রচার শুরুই করতে পারেনি। বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথের নাম প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই সিঙ্গুর উত্তপ্ত। বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন বিজেপির আদি কর্মীরা। প্রার্থী বদলের দাবিতে রাস্তা অবরোধ, ভাঙচুর – হয়েছে সবই। সিঙ্গুর স্টেশনের কাছে বিজেপির দফতর গমগম করছে, কিন্তু সেখানে মাস্টারমশাইয়ের কোন ছবি নেই। জমি আন্দোলনের স্মৃতি উস্কে প্রার্থী বদলের দাবিতে ধর্ণামঞ্চ সাজিয়ে বসেওছিন বিজেপি কর্মীদের একাংশ। সিঙ্গুরে কান পাতলে শোনা যাচ্ছিল, প্রার্থী বদল করা হলেও হতে পারে। অথচ লোকসভা নির্বাচনের হিসাবে এই কেন্দ্রটি বিজেপির জন্য সম্ভাবনাময়। তবে আস্তে আস্তে পরিস্থিতি অনেকটাই সামলে নিয়েছে গেরুয়া শিবির। মাস্টারমশাইয়ের সমর্থনে এখন বিজেপি একটি বাদে বাকি শিবিরগুলি বাহ্যত এককাট্টা। খোদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এসে রোড শো করে গিয়েছেন সিঙ্গুরে। কিন্তু তারপরেও প্রচারে, প্রভাবে এগিয়ে বেচারাম মান্নাই।

গত লোকসভা ভোটের ফল বলছে, হুগলী লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত এই বিধানসভা কেন্দ্র থেকে বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায় ১০ হাজার ৪২৯ ভোটের ব্যবধানে জিতেছেন। লকেট পেয়েছেন ৯৩, ১৭৭টি ভোট (৪৬.০৬%)। সেখানে তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী তৃণমূল প্রার্থী রত্না দে নাগের প্রাপ্ত ভোট ৮২,৭৪৮ (৪১.০৩%)।

বেড়াবেড়ি, কেজেডি এবং গোপালনগর — এই তিনটি মৌজা নিয়েই ছিল টাটাদের প্রকল্প এলাকা। এর মধ্যে গোপালনগর পঞ্চায়েতের মোট ১৮টি আসনের মধ্যে লোকসভায় বিজেপি ১১টিতেই জিতেছে। সাতটিতে জিতেছে তৃণমূল। কেজেডি-র ১৮টি আসনেও একই ফল। বেড়াবেড়ি মৌজারও কিছু আসন গিয়েছে তৃণমূলের বিরুদ্ধে। ফলে নিঃসন্দেহে অ্যাডভান্টেজ ছিল গেরুয়া শিবিরের  কিন্তু সব হিসাব গোলমাল করে দিচ্ছে বিজেপির অর্ন্তবিরোধ। যার ফলে হাসি চওড়া হচ্ছে বেচারামের।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা সেরে বেচারাম বললেন, "মাস্টারমশাই শ্রদ্ধেয় মানুষ। ৯০ বছর বয়সে টিকিটের জন্য দলবদল করলেন। কী আর বলব! বিজেপিও প্রার্থী পাচ্ছে না বলে ওঁকে টিকিট দিয়ে দিল। উনি অসুস্থ, তিনবার অ্যাটাক হয়ে গিয়েছে, আশা করব রোদ লাগাবেন না।" মমতা নিজেও অবশ্য বয়স কটাক্ষই করেছেন। বলেছেন, "এই বয়সে পৌঁছে যাওয়া একজনকে প্রার্থী করে দিল বিজেপি! এত গরমে উনি ভোটে লড়বেন! ওঁর কি কষ্ট হয় না? বিজেপির উচিত ছিল মাস্টারমশাইকে সেদ্ধ-ভাত করে দেওয়া, পা টিপে দেওয়া, তেল মালিশ করে দেওয়া। সে সব না করে ভোটে লড়িয়ে দিয়েছে। অমানবিক দল কী আর সাধে বলি!"

রবীন্দ্রনাথবাবু অবশ্য বলছেন, "অসম্মানের জবাব দিতেই আমার লড়াই। আমার সততা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। অনেকের ভাবমূর্তি এমন নয়। মানুষই জবাব দেবেন।" বিজেপি প্রচারে বলছে, তারা সরকারে এলে সিঙ্গুরে কারখানা গড়বে। জমিরক্ষা কমিটির প্রধান নেতা হিসাবে আপনার অস্বস্তি হচ্ছে না? প্রসঙ্গ এড়িয়ে মাস্টারমশাইয়ের সংক্ষিপ্ত উত্তর, "অসম্মান আর অসততা মেনে নেব না। লড়াই হবে।"

একথা ঠিক যে রবীন্দ্রনাথবাবুর ভাবমূর্তি অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন। বামপন্থী ছাত্রকর্মী বলছিলেন, "মাস্টারমশাইয়ের সততা নিয়ে তো প্রশ্ন নেই। ওঁর ইমেজের জন্য উনি প্রচুর ভোট পান। কিন্তু সংগঠনটা পুরোপুরি বেচা মান্নার। এলাকার সব ক্লাব ওঁর নিয়ন্ত্রণে, নিয়মিত জনসংযোগ করেন। তৃণমূল স্তর পর্যন্ত সংগঠন ওঁর সঙ্গেই। মাস্টারমশাই তো বেরতেই পারেন না, বাড়িতে বসেই যা করার করেন। কাজেই ভাবমূর্তি যেমনই হোক, বেচারাম মান্না অনেক এগিয়ে।"

এ তো গেল ভোটের পাটিগণিতের কথা। তার বাইরে সিঙ্গুর জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে চাপ চাপ হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস। জমি আন্দোলনের দেড় দশক পরের সিঙ্গুরে কেবল বিশ্বাস আর স্বপ্নভঙ্গের  অন্ধকার। এতখানি হতাশা পশ্চিমবঙ্গের অন্য কোন বিধানসভায় চোখে পড়েনি। নন্দীগ্রামে তো নয়ই। বস্তুত, ২০২১ সালের সিঙ্গুরে জমি আন্দোলনের  কোন রেশ আর অবশিষ্ট নেই। এক দিকে কারখানা হলে কী হত বা হত না, সেই আলোচনা। অন্য দিকে বন্ধ্যা হাজার একর নিয়ে হাহাকার। তবুও তার মধ্যে যেন ঝিলিক মারে দেড় দশকের পুরনো আবেগ। গোপালনগরে দেখা হল এস ইউ সি আই নেতা শঙ্কর জানার সঙ্গে। বেচারাম মান্নার সঙ্গে যৌথভাবে জমিরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন মৃৎশিল্পী শঙ্করবাবু৷ সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধের পোশাক মলিন। সংসার জুড়ে দারিদ্র্যের ছবি। দুপুরে ভাত খেতে খেতে শঙ্করবাবু বলছিলেন আন্দোলনের দিনগুলোর কথা। কেমন করে গড়ে উঠল জমিরক্ষা কমিটি, কেমন করে গ্রামে গ্রামে তৈরি হল কমিটির শাখা। বলছিলেন ২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের সেই রাতের কথা। যে রাতে  পুলিশের লাঠিতে গুরুতর আহত হন রাজকুমার ভুল। বাড়ি ফিরে মৃত্যু হয় তাঁর। শঙ্করবাবু বলছিলেন, "আমরা ডিএম-কে ঘেরাও করেছিলাম। আমি ছিলাম, আমাদের পার্টির নেতারা ছিলেন, মাস্টারমশাই ছিলেন, বেচা ছিল। তারপর কলকাতা থেকে মমতা এলেন। তখন অনেক রাত। মমতা ডিএম-কে বলতে লাগলেন, এখনই জমি ফেরতের ব্যবস্থা করতে হবে। আমি তো অবাক! এভাবে হয় নাকি…"।  তারপর শুরু হয় অবস্থান। পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবরোধমুক্ত করে ডিএম-কে। বাংলার রাজনীতিতে শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়।

বৃদ্ধ শঙ্কর জানার আক্ষেপ, শহীদ রাজকুমার ভুলকে কেউ মনে রাখেনি। বলছিলেন, "মমতা আন্দোলনটাকে হাইজ্যাক করে নিলেন। আন্দোলনের ফয়দা তুললেন উনি। সিঙ্গুরের মাটি থেকে আন্দোলনটা চলে গেল ধর্মতলার অনশন মঞ্চে। কৃষকরা ঠকলেন। আমরা চেষ্টা করেছিলাম রুখতে, দুর্বল শক্তি নিয়ে পারিনি। তারপর তো যা হল জানেনই…"।

ওঁকে প্রশ্ন করা গেল, এখন ঠিক কী মনে হয়? ভুল করেছিলেন? এই যে কারখানা হল না, চাষও হল না, আপনারা দায় নেবেন না? শঙ্কর জানা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন, "নাঃ, ভুল কিছু করিনি। সময়ের ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম। কারখানা হলে যত লোক কাজ পেত, তার চেয়ে অনেক বেশি লোক কাজ হারাত। এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শিল্পায়ন মানুষের ভাল করতে পারে না।" এরপর, একটু চুপ করে থেকে আবার বলেন, "তবে হ্যাঁ, জমিটাকে যদি বাঁচাতে পারতাম, নষ্ট করতে না দিতাম… তা তো পারিনি… তবে আজও যখন দেখি দিল্লির আন্দোলনকারী কৃষকরা সিঙ্গুরের কথা বলছেন, তখন গর্ব হয়…"

সিঙ্গুর জুড়ে চরকি পাক খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম সেই সময়কার সিপিএম নেতা সুহৃদ দত্তের বাড়িতে। তাকানো যায় না বৃদ্ধের দিকে। সমস্ত শরীর জুড়ে দগদগে ঘা। হাঁটতে পারেন না। ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে যেতে হয়। তিরিক্ষি মেজাজ। কয়েকদিন আগেই বাথরুমে পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছেন। বাড়ি গিয়ে চোখের দেখা দেখলেও কথা হল না। পরদিন ফোনে বললেন, "আমি কে! আমার সঙ্গে কথা বলে হবে কী! ওরা আমায় শেষ করে দিয়েছে, সিঙ্গুরকেও শেষ করে দিয়েছে।" তৃতীয় দিন  মুখোমুখি কথা বলার সুযোগ দিল। বৃদ্ধের চোখে বোবা রাগ। "সমস্ত শরীরে জ্বালা। চামড়ার নিচটা যেন পুড়ে যাচ্ছে। ওরা ষড়যন্ত্র করে জিতে গেল। তবে আর বেশিদিন নয়..."। কী বলব বুঝতে পারলাম না, কিছু বলার থাকে না এমন সময়ে।

একটা মরে যাওয়া কারখানা। একটা মৃত বিতর্ক। অনেকগুলো জীবন্মৃত মানুষ আর দু কাল ছাপানো হতাশা — বিধানসভা নির্বাচনের আগে চুম্বকে সিঙ্গুরের ছবি এটাই। যেখানে দলবদল আছে, জমি আন্দোলন নেই।

বুধবার, ৩১ মার্চ, ২০২১

মীনাক্ষী ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

বয়সটা কম। প্রাজ্ঞতা নেই। ছত্তিরিশ বা সাঁইতিরিশ।
মনের ভেতর জ্বলছে আগুন, রাস্তাতে তুই তাই ফিরিস।

তুই কি পাগল? অ্যাম্বিশনের... আদৌ কি নেই ইচ্ছে তা?
সময় এখন গুছিয়ে নেবার, সবাই দিব্যি নিচ্ছে তা।

টেম্পারেচার চল্লিশ। তার গাল কপালে বইছে ঘাম।
তার মধ্যেই ঘুরছে মেয়ে। কখন নেবে সে বিশ্রাম?

ওদের তৈরি সিণ্ডিকেট আর ওদের আছে দাঙ্গা বিষ!
ভয় করে না? ওই যে ওরা... কীসের জোরে পাঙ্গা নিস?

মুখের ওপর তর্ক করিস, বড়ই দেখছি সাহস তোর।
খেলার ছলেই মুছতে পারে। সেই খেলা স্রেফ বাঁ হস্তর।

প্রশ্ন করলে অভয় শোনাস। কোথায় কারা শুধছে ঋণ!
তোর পাহারায় শুনছি হাজার চোখ জেগে রয় রাত্রিদিন। 

সবার চোখের মণির মতন। সবার আশার ফুল কি তুই?
হয় তো ঠিকই। এই রাত্রির তিমির বিনাশ ফুলকি তুই।

আমার কন্যা পিনাকপাণি। ওই জনতাই পিনাক কি?
বাবার চিন্তা মানতে চায় না! সাবধানে থাক্ মীনাক্ষী!



সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

নন্দীগ্রামের চক্রান্ত ~ সৌনক দত্ত

কাল থেকে মমতার হয়ে এপোলোজিয়া নামানো স্বাধীন বাম , লিবু, ম্যাও সবারই অনেক ন্যারেটিভই চোখে পরছে। সব কটার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না, কিন্ত নির্দিষ্ট একটা ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়াটা খুবই জরুরি, সেটা হলো গুলি চালানো প্রসঙ্গে ১৪ই মার্চের পর  নাকি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের করা একটি মন্তব্য 𝗧𝗵𝗲𝘆 𝗵𝗮𝘃𝗲 𝗯𝗲𝗲𝗻 𝗽𝗮𝗶𝗱 𝗯𝘆 𝘁𝗵𝗲𝗶𝗿 𝗼𝘄𝗻 𝗰𝗼𝗶𝗻 "

টিপিকাল দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা মেশিনারির কায়দা গুলো কি নিখুঁত ভাবে রপ্ত করে ফেলেছে এই রাজ্যের সিপিআইএম বিরোধী লিবারেল, স্বাধীন সহি বাম, অতিবাম সহ কিছু বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবিশেষ। তা হলো আউট অফ কনটেক্স একটা স্টেটমেন্টকে পুরো পুরি বিকৃত করে একটি চূড়ান্ত মিথ্যা  ন্যারেটিভ কনস্ট্রাক্ট করে হোয়াটাবাউট্রি করে যাওয়া, অবাক লাগে এখনো  এরা এতটাই নির্লজ্জ, এতটাই সংকীর্ণ যে এই পর্যায়ের সিপিআইএম বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালাতে এতটুকু ক্লান্তি নেই এদের।


অবশ্যই বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য এই মন্তব্যটি করেছিলেন, কিন্তু মন্তব্যটি ছিল সম্পূর্ণ অন্য কনটেক্সে, অন্য প্রসঙ্গে। দেখা যাক সেই কনটেক্স।

নন্দীগ্রামে কোনো শিল্প অভিযান প্রক্রিয়া শুরুর আগেই, শুধুমাত্র কেমিকাল হাব নির্মাণের পূর্ব পরিকল্পনার আঁচ পেয়েই ২০০৬ এর ডিসেম্বর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি ', যার অংশ ছিল তৃণমূল-কংগ্রেস-বিজেপি-নকশালপন্থী গোষ্ঠী-এসইউসিআই-জামাতে উলেমা হিন্দ -সবাই।  সাথে ঘাঁটি বেঁধেছিলো মাওবাদীরাও। এই ঘটনায় অগ্নিসংযোগ করে শুধুমাত্র দুটো ঘটনা--একটি  ২৩শে ডিসেম্বর সিপিআইএম এর শিল্পায়নের দাবিতে রাজারামচক থেকে সোনাচূড়া পর্যন্ত মিছিল আর দ্বিতীয়টি তার কদিন পরেই সংবাদমাধ্যমে বেরোনো একটি খবর, সালিম গোষ্ঠীর সাথে রাজ্য সরকারের একটি মৌ স্বাক্ষর।

২০০৭ এর  ২রা জানুয়ারি গঠিত  হয়ে যায় 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি' যথেষ্ট সময় এবং  চিন্তা করে ব্যাপক একটি পরিকল্পনার ওপরে ভিত্তি করে আগ্নেয়গিরির প্রথম বিস্ফোরণটা ঘটলো তার পরেরদিন অর্থাৎ ৩রা জানুয়ারি। শুরু হলো গোটা নন্দীগ্রাম জুড়ে অশান্তি। মাত্র দুই তিনদিনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো গোটা নন্দীগ্রামকে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা অবশ্যই অনস্বীকার্য্য, সাথে ছিল অবশ্যই গ্রাস রুটে পার্টির প্রতিরোধের ব্যর্থতা।

এই সব ঘটনা চলছে যখন তখন মহাকরণে বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য জানান, নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তিই জারি হয়নি। নন্দীগ্রামের মানুষ না চাইলে সেখানে কোনো কোনো শিল্প হবে না, জমি অধিগ্রহণের তো প্রশ্নই নেই।

নন্দীগ্রামের সিপিআইএম বিরোধী রংধেনু জোট এতে কিন্তু কর্ণপাত করা দূরের ব্যাপারে, তারা ধরে নেয় সরকার পিছু হাটছে তাদের ভয়ে, এইখান থেকে শুরু হয় নন্দীগ্রামে সিপিআইএম কর্মীদের ওপর নৃশংস অত্যাচার, খুন হতে থাকে একের পর এক কর্মী, কেবল দুদিনে  জ্বালিয়ে দেওয়া, ভেঙে দেওয়া হয় ১০০র ওপর বাড়ি, হামলা চলতে থাকে সিপিআইএম এর পার্টি অফিস এবং দপ্তর গুলোতে। ৭ই জানুয়ারি পাঁচজন সিপিআইএম কর্মীকে ইট পাথর দিয়ে থেঁতলে কুপিয়ে পিটিয়ে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে ফেলে খুন করা হয়, এই পাঁচজন -বিশ্বজিৎ মাইতি (সাউডখালী), ভুদেব মন্ডল(সোনাচূড়া), রবীন ভূঁইয়া, সুদেব মন্ডল (সোনাচূড়া), শঙ্কর সামন্ত( তাল ডাংরা)। এদের মধ্যে শঙ্কর সামন্ত ছিলেন পঞ্চায়েত সদস্য। তাকে ছুড়ি দিয়ে চিরে জ্বলন্ত খড়ের গাদায় ছুড়ে ফেলা হয়। ভুদেব মন্ডলকে তাঁর পরিবারের লোকজনের সমানেই ইট দিয়ে থেঁতলে খুন করা হয়। শিল্প হওয়া দূরের ব্যাপার, শিল্প হচ্ছে না ঘোষণার পর ও আরো বেশি করে চলেছে এই হত্যালীলা। মাত্র দিন চারেকের মধ্যে সহাস্রাধিক সিপিআইএম কর্মী নিরাশ্রয় হয়ে নন্দীগ্রাম ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে পাশের খেজুরী, কনতাই, পটাশপুরের মতো সংলগ্ন অঞ্চলে। এর পরেই ঘটে যায় সেই ১৪ই মার্চের তোলপাড় করা ঘটনা, মুহূর্তের মধ্যে সংবাদমাধ্যম সহ সুশীল বুদ্ধিজীবী মহলের  তরফ থেকে শুরু হয়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী সহ সিপিআইএম এর মুন্ডুপাত, একদিকে চলছে যেখানে মুন্ডুপাত, আরেকদিকে ঠিক এই ঘটনার পরেরদিন থেকে নন্দীগ্রাম হয়ে ওঠে সিপিআইএম কর্মীদের সমাধি ক্ষেত্র, নিত্যদিন ৩-৪ টে সিপিআইএম কর্মীদের মৃতদেহ ছিল নন্দীগ্রামের নিউ নরমাল। অত্যাচারের মাত্রা ছাড়িয়ে যায় কল্পনাতীত সীমা , নিত্য নতুন উপায়ে চলতে থাকে হত্যা প্রক্রিয়া, এর মধ্যেই নির্মম ভাবে গণধর্ষণের পর খুন হন সিপিআইএম এর আরেক পঞ্চায়েত সদস্য সুনিতা জানা, তালিকা এর পর শুধু দীর্ঘ হতে থেকেছে। নৈরাজ্য এবং 'গণতন্ত্রের হত্যাকারী' সিপিআইএম এর বিরুদ্ধে সেই সময় 'সদা সক্রিয়', 'সদা জাগ্রত' একটাও ব্যক্তি বাম অথবা বুদ্ধিজীবি মহল থেকে ওঠেনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রংধেনু জোটের 'মুক্তাঞ্চলে হয়তো এই হত্যালীলাই ছিল তাদের কাছে নব্য যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধী বিপ্লব।

এর পর সাত আট মাস যাবৎ গৃহ হীন সেই সহস্র সিপিআইএম কর্মীদের পরিস্থিতির এতটুকু বদল হয়নি  , ঈদ দুর্গাপুজো তাদের কাটাতে হয়েছে পাশের এলাকায় নয়তো ত্রাণ শিবিরে আর এর পাশাপাশি নন্দীগ্রাম তো তখন শ্মশান। রোজ ৩-৪টে লাশ পরছে সিপিআইএম কর্মী, সমর্থকদের, বাদ যায়নি সাধারণ মানুষও। যারা পালিয়ে আসতে সফল হননি অথবা মোহন মন্ডল, মীর খুরশেদ, চঞ্চল মিদ্যার মতো যারা  শেষ মুহূর্ত অব্দি থেকে যেতে চেয়েছেন অকুতোভয় হয়ে গর্বের সাথে লাল পতাকাকে আঁকড়ে, মূল্য চোকাতে হয়েছে প্রাণের বিনিময়ে।

অনেক আগেই পার্টি মেশিনরীকে ব্যবহার করে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, যা নিতে ব্যর্থ হলেও এবার সহ্যর সব বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর ২০০৭ এর নভেম্বর মাসে সিপিআইএম  তাদের কর্মীদের ঘরে ফেরানোর চেষ্টা করতেই জ্বলে ওঠে অশান্তির আগুন। ঘরের ফেরার এই লড়াই ও কম ভয়ঙ্কর ছিল না। হাজার অনুরোধ, প্রশাসনিক দিক দিয়ে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার প্রচেষ্টা, হাজার আকুতি মিনতি সত্ত্বেও বিরোধী  রঙধেনু জোট কর্ণপাত না করে উল্টে তাকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে সিপিআইএম কর্মীদের খতম অভিযান জারি রাখার  ফলস্বরূপ  নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ওই ঘরে ফেরার পর্বে সিপিআইএম কর্মীদের সশস্ত্র অভিযান ছিল পাল্টা প্রতিরোধ মাত্র (যে প্রতিরোধ. দরকার ছিল আরো আগে থেকেই), এই অভিযান প্রসঙ্গেই বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য বলেছিলেন 𝗧𝗵𝗲𝘆 𝗵𝗮𝘃𝗲 𝗯𝗲𝗲𝗻 𝗽𝗮𝗶𝗱 𝗯𝘆 𝘁𝗵𝗲𝗶𝗿 𝗼𝘄𝗻 𝗰𝗼𝗶𝗻 " 

কোনোভাবেই এই কথা ১৪ই মার্চের দিন বলেননি উনি, বলেছিলেন ৮ মাস পর নিজের কর্মীদের আত্মরক্ষা প্রসঙ্গে।এবার প্রশ্ন উঠতে পারে উনি কী তাহলে এটা বলে ভুল করেননি, আমার মতো অনেকের মতেই হ্যা উনি ভুল করেছিলেন, বিশাল বড়ো ভুল করেছিলেন, এই মানসিকতা উনার শুধু ওই একদিনের জন্য নয়, গোটা ১০টা বছরই দেখানো প্রয়োজন ছিল,  সিপিআইএম এর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসাবে উনার এই সফ্ট স্টান্স এর প্রবল সমালোচক আমি। 

যাই হোক শুধু একবার দেখা যাক ১৪ই মার্চ ঘটনা ঘটার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্যর কি প্রতিক্রিয়া ছিল। অন্তত সিবিআই এর অফিসিয়াল রেকর্ড মতে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে। সেইদিন বিধানসভাতে অধিবেশন চলছিল, গুলি চালানোর ঘটনা শুনেই  হতবাক হয়ে যান বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য। বেশ কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে থাকেন, চোখে মুখে চূড়ান্ত হতাশার ছাপ স্পষ্ট, তারপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একটাই কথা বলেন "গুলি চললো কেনো? গুলি চালানোর তো কথা ছিল না। কি এমন পরিস্থিতি হলো যে গুলি চালাতে হলো!" সেদিন বিধানসভায় কোনো সরকারি বিবৃতি দেননি তিনি, চূড়ান্ত হতাশা থেকে বাকি সময় নিজের ঘরেই কাটিয়ে দেন তিনি। "

 কৃষি নির্ভর এই রাজ্যকে একটি উন্নত শিল্প ভিত্তিক রাজ্যে পরিণত করতে চাওয়ার ব্যাপারে তার পার্টির  সিদ্ধান্ত এবং তার নিজের বাসনার  এরকম  পরিণতি হতে দেখে আত্মগ্লানি এবং অভিমানের মধ্যেই ডুবে গেছিলেন খানিক। ভাবতেও পারেননি সেই সময় থেকেই যে বৃহৎ ষড়যন্ত্রর উল্লেখ করতে গিয়ে বারবার অতি বোদ্ধা, ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কাছে  হাস্যস্পদে পরিণত হয়েছিলেন তিনি এবং তার পার্টি, আজ ১৪ বছর পর সেই সময়ের এই ষড়যন্ত্রের মূল ঘুঁটি নিজের বিনাশকালে, একটি মরিয়া প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে এই ষড়যন্ত্রের মিসিং লিংক গুলো জুড়ে দেবেন।  যাই হোক সব চেয়ে বড়ো মিসিং লিংক এখনো বাকি। সময়ের থেকে এগিয়ে গিয়ে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা দিলে মানুষের জেনারেল কনসেনসাসে গ্রহণযোগ্য হয় না, সময় মতো তাই অন্তিম মিসিং লিংক হিসাবে সিআইএ যোগসূত্র টাও প্রমান হবে। সবে তো শুরু।

P. S-  ওপরের লেখার প্রমান হিসাবে নিচে বিখ্যাত সাংবাদিক অঞ্জন বসুর বই "বাংলায় বামেরা : রাজ পথে ও রাজ্যপাটে"  বই এর দুটো পাতার ছবি কমেন্ট সেকশনে দিয়ে রাখলাম।

.

নন্দীগ্রাম ~ সুশোভন পাত্র

পাঁচ বছর আগে এক সন্ধ্যায় প্রথমবার আলিমুদ্দিন গিয়ে ঘড়ি ধরে ৩০ সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়িয়েছিলাম। মাথা ভর্তি সাদা চুল,  গাল ভর্তি দাড়ি, সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরে বুদ্ধবাবু, 'ফিরে দেখা'র ডিকটেশন দিচ্ছেন। আমি লেখালিখি করার চেষ্টা করি শুনে বললেন, 'লেখ। আমাদের যে ভুলের কথা গুলো কেউ লিখছে না, সেগুলোই সাহস করে লেখ।' 
কাল যখন থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নন্দীগ্রামের স্বীকারোক্তি শুনেছি, পাঁচ বছর আগের সন্ধের ৩০ সেকেন্ডের ঐ অমলিন মুহূর্তটা চোখে ভাসছে বারবার। বুদ্ধবাবু মাফ করবেন। আমি আজ 'আমাদের ভুলের' কথা লিখতে বসিনি। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে নন্দীগ্রাম এবং পরে সিঙ্গুর নিয়ে রাজ্যে, দেশে, বিদেশে আপনার বিরুদ্ধে, বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে, 'আমাদের' বিরুদ্ধে; প্রতিদিন, 'ভুলের' নামে ষড়যন্ত্রের গালগল্প লেখার, কাব্য করার ছ্যাবলামি অনেক হয়েছে। আর না, বুদ্ধবাবু মাফ করবেন!  
তৃণমূল তো ছিলই। গৃহপালিত মিডিয়া তো আছেই। বিসেলেরির ঠাণ্ডা বোতলে চুমুক দিয়ে, কালো সানগ্লাস চোখে চাপিয়ে শহীদ বেদী তে লাথি মারা বুদ্ধিজীবী, কফি হাউসের সিগারেটখোর আঁতেলবাজ, সিপিএম'র থেকে আর একটু বেশি লেনিন জানা স্বাধীন-লিবারেল অণু কিম্বা আর একটু বেশি মার্ক্স বোঝা সংশোধনবাদী সিপিএম কে 'প্রকৃত বিপ্লবের' শত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া অতি বাম পরমাণু –নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরের আদ্যোপান্ত ষড়যন্ত্র কে 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস'-র স্ট্যাম্প মেরে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে অবিরাম। আর না, বুদ্ধবাবু মাফ করবেন!
মর্ফড ছবিতে আপনার মুখে ক্যানাইন দাঁত বসিয়ে, আপনার পাঞ্জাবি তে রক্তের দাগ লাগিয়ে, আপনাকে 'খুনি বুদ্ধ' হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে, পুঁজিবাদের দালাল সাজিয়ে দিয়ে, 'পরিবর্তন চাই' ফেস্টুনে দাঁত কেলিয়ে, নেতা-মন্ত্রীর টিকিট বাগিয়ে, রেল কমিটির ল্যাজ ধরে পয়সা কামিয়ে, ক্যাডবেরি খাওয়া 'অনশন'-'আন্দোলনের' দোহাই দিয়ে রাজ্যটাকে ১০ বছর পিছিয়ে দেওয়া অনুঘটকদের মাতব্বরি অনেক হয়েছে। আর না, বুদ্ধবাবু মাফ করবেন!  
দৃপ্ত কণ্ঠে, কলার তুলে, বুক বাজিয়ে আবারও বলতে চাই; আগেও বলছি, পরেও বলব –কোন ভুল সেদিন বুদ্ধবাবু করেননি। কোন ভুল সিদ্ধান্ত সেদিন বামফ্রন্ট সরকার নেয়নি। কোন বিচ্যুতি সিপিএম-র হয়নি। নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুরে একইঞ্চি 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস' হয়নি। যা হয়েছিল সেটা আগাপাশতলা  নোংরা রাজনৈতিক চক্রান্ত। আদ্যোপান্ত একটা ষড়যন্ত্র।   
টানা বাহাত্তর দিন পুলিশ-প্রশাসনের প্রবেশ নিষিদ্ধ তখন নন্দীগ্রামে। বিস্তীর্ণ এলাকা তখন অবরুদ্ধ নন্দীগ্রামে। ভাঙা রাস্তা, ভাঙা সেতুর দৌলতে বিপন্ন, বিচ্ছিন্ন জনজীবন নন্দীগ্রামে। 'জমি আন্দোলনে'র সলতেতে সাম্প্রদায়িকতার বারুদ তখন নন্দীগ্রামে। বিরোধী নেতা-সাংসদ'দের মদতে বেআইনি অস্ত্রের পাহাড় জমছে তখন নন্দীগ্রামে। একদিনে সিপিএম'র ২৫টা পার্টি অফিসে আগুন জ্বলছে তখন নন্দীগ্রামে। নিয়ম করে শঙ্কর সামন্ত, সুনীতা মণ্ডলদের লাশ পড়ছে তখন নন্দীগ্রামে। 
লাগাতার হামলা শুরু হয় শিল্পের পক্ষে থাকা গ্রামবাসীদের উপর। কেউ ঘরছাড়া, কেউ খুন, কেউ ধর্ষিতা। প্রশাসনের ডাকা সাত-সাতটা শান্তি বৈঠকে যোগ দিলো না তৃণমূল। ৯'ই ফেব্রুয়ারি যেদিন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধবাবু হেড়িয়ার জনসভায় বলেছিলেন "মানুষ না চাইলে কেমিকাল হাব হবে না নন্দীগ্রামে। অধিগ্রহণ হবে না এক ইঞ্চি জমিও"; ঠিক সেদিনেই পেট চিরে পুলিশ কর্মী সাধুচরণ চ্যাটার্জি'র লাশটা ভাসিয়ে দেওয়া হয়েছিল হলদি নদীর জলে।
কি করত সরকার? বুড়ো আঙুল চুষত? ললিপপ খেতো? ১৪ই মার্চ নন্দীগ্রামে পুলিশকে গোপনে পাঠায়নি বামফ্রন্ট সরকার। ১২ই মার্চ সাংবাদিক সম্মেলন করে পুলিশ যাওয়ার পরিকল্পনা জানিয়ে তবেই নন্দীগ্রামে পুলিশ ঢুকেছিল। শখে গুলিও চালায়নি পুলিশ। মাইকে ঘোষণা, কাঁদানে গ্যাস, রবার বুলেট, শূন্যে গুলি -আইনি কপিবুকের ক্রনোলজিতে ভুল করেনি সেদিন পুলিশ।
২০১৪'তে নন্দীগ্রামের ঘটনার চার্জশিট জমা দিয়েছিল সিবিআই। সিপিএম'র 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' কোন নিদর্শনই খুঁজে পায়নি সিবিআই। তালপাটি খালে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে 'সিপিএম'র হার্মাদ বাহিনীর হাতে পা চিরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া একটাও শিশুর লাশ খুঁজে পায়নি সিবিআই। গোটা নন্দীগ্রাম ঘুরে একটাও 'স্তন কাটা মহিলা' খুঁজে পায়নি সিবিআই। 
বরং চার্জশিটে বলা হয়েছিল, সেদিন পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়া হচ্ছিল। বলা হয়েছিল, হামলাকারীদের হাতে তীক্ষ্ণ অস্ত্র ছিল। বলা হয়েছিল, "নন্দীগ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে প্রশাসন এবং পুলিশ অফিসাররা চেষ্টা করেছিলেন। বৈঠকে বিরোধী দলগুলির নেতা এবং ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটির অনুপস্থিতির জন্য তা সম্ভব হয়নি।" 
যারা এরপরেও ২০১১-র বামফ্রন্টের নির্বাচনী পরাজয় কে স্বাভাবিক গণতন্ত্রীয় লিনিয়ার ইকুয়েশন মনে করেন, নন্দীগ্রাম-সিঙ্গুর কে সিপিএম'র 'ক্লাস ক্যারেক্টার'-র স্খলন বলে মনে করেন, কিম্বা নেত্রী মমতার একক রাজনৈতিক ক্যারিশ্মার জাবর কাটেন, তারা কি বলতে পারেন ক্ষমতায় এসে অভিযুক্ত পুলিশ অফিসারদের পদন্নোতির ব্যবস্থা কেন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? বলতে পারেন, কেন তৃণমূল-মাওবাদী-জামাতের নেক্সাস কে প্রচুর অস্ত্র মজুতে মদত দিয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? 
আর যারা বিজেপির বাইনারি তে দোল খাচ্ছেন তারা কি বলতে পারেন, কেন্দ্রীয় সরকারের একই সময় অনুমোদিত নন্দীগ্রামের মতই একটি পেট্রো রসায়ন শিল্প তালুক গুজরাটের দাভোসে হল কি করে? আর হলে, এখানে বিজেপি, সেদিন তৃণমূলের শিল্প বিরোধী ষড়যন্ত্রের পার্টনার ছিল কি করে? না, গুজরাটের মত আম্বানিদের বরাত না দিয়ে বামফ্রন্ট সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মাধ্যমে শিল্প করতে চেয়েছিল বলে বিজেপির গোঁসা হয়েছিল? কিম্বা আরএসএস-র দুর্গা কে পলিটিক্যাল মাইলেজ দিতে হবে বলে কি বিজেপি কসম খেয়েছিল? 
চার আনার পলিটিক্যাল পণ্ডিতরা সেদিন বলেছিলেন বুদ্ধবাবুর 'নৈতিক পরাজয়'। মাননীয়া বলেছিলেন বামফ্রন্টের কৃতকর্মের 'পাপস্খলন' । জানতে চাই কোন পাপস্খলন? কিসের নৈতিকতা? আজ যে, নিশ্চিত ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতে ভুলে যাওয়া বাংলার যুব সমাজের হিমোগ্লোবিনে প্রতিদিন মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে ধর্মের আফিম; ভেঙে ফেলা হচ্ছে হিন্দু-মুসলিম, বাঙালি-অবাঙালি, রাজবংশী-মতুয়ার আইডেন্টিটির টুকরোতে -সেই পাপস্খলনের দায়িত্ব নেবার যোগ্যতা, তার দায় বয়ে বেড়ানোর ক্ষমতা অবশ্য সেদিনও মাননীয়ার ছিল না, আর আজও নেই। রাজ্যের যুব সমাজের এই সামাজিক ও নৈতিক স্খলন চাক্ষুষ করার মত দূরবীন সেদিনও জাতীয় সড়ক অবরোধকারী অনশন মঞ্চে ছিল না, আজও নবান্নের চোদ্দ তলায় নেই। 
না! আজকে নন্দীগ্রামের চক্রান্তের পর্দা ফাঁস হয়ে গেছে বলে প্রায় শয্যাশায়ী, রোগাক্রান্ত বুদ্ধবাবুর নামে সিম্প্যাথি কুড়িয়ে ভোটের বৈতরণী পেরোনোর চেষ্টা করছে না সিপিএম। হুইলে চেয়ারের মেলড্রামা কিম্বা দাড়ি বাড়িয়ে জোকার সেজে রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হওয়ার বদভ্যাস বামপন্থীদের কোনদিন ছিল না। আজও নেই।   
বরং আপামর দুনিয়ার বহমান কমিউনিস্ট আন্দোলনের ও পুঁজিবাদের দ্বান্দ্বিকতার যে  প্রেক্ষিতে বুদ্ধবাবু বাংলা কে গড়ার চেষ্টা করেছিলেন সেই সময়ে, রাজ্য তো বটেই, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও তার গুরুত্ব বোঝে সিপিএম। ৬২ সাংসদ নিয়ে অপ্রতিরোধ্য বামেদের সেই সময় বোতলবন্দী না করতে পারলে কোন শ্রেণীর মানুষের ক্ষতি হতে পারতো সেই শ্রেণীশত্রুদের চেনে সিপিএম। নন্দীগ্রাম, সিঙ্গুর জঙ্গলমহল, কিম্বা গোর্খাল্যান্ড -সেই সময়ের বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে রামধনু জোটের বে-নি-আ-স-হ-ক-লা, প্রতিটা রঙ কে আলাদা করে বিশ্লেষণের ক্ষমতা আছে সিপিএম-র। রাজনীতির রিলে রেসে বুদ্ধবাবুর তুলে দেওয়া ব্যাটন নিয়ে লড়াই করার বারুদ বুকে আছে আমাদের। আর তাই সিম্প্যাথি কুড়োতে নয় লড়তে শিখতে হয় আমাদের।   
ফিদেল বলেছিলেন History will absolve me। বুদ্ধবাবু বলেছিলেন "একটা বড় চক্রান্তের শিকার রাজ্য। ১০ বছর মানুষ ঠিক বুঝতে পারবেন।" পারছেনও। পারবেনও। History কি Absolve করবে কি করবেনা সেটা সময় বলবে। কিন্তু ইতিহাস পড়ার জন্য নয়, ইতিহাসে গড়ার জন্যই লড়ছি আমরা। লড়ছে মীনাক্ষী, লড়ছে সায়নদীপরা। লড়ছে আকিক ,সাদ্দাম, প্রতিকুর, সৃজনরা। লড়ছে দিপ্সিতা-ঐশী-পৃথা-সেলিম-সুজন-পলাশরা। লড়ছি আমরা, বামপন্থীরা। লড়ছি রাজপথে। লড়ছি আলপথে। হেঁটে এবং নেটে। লড়ছি নির্বাচনেও। লড়ব নির্বাচনের পরেও। লড়ব শেষতক। জিতব শেষতক।

বৃহস্পতিবার, ৪ মার্চ, ২০২১

সংযুক্ত মোর্চা বনাম বিজেমূল ~ সুশোভন পাত্র

শাট আপ! ধর্ম নিরপেক্ষতার জ্ঞান কে দিচ্ছে? তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রীরা? কিষানজীর কোয়ার্টার-হাফ-ফুল চামচারা? মার্কামারা বিজেপি? তাদের আদর্শগত বাপ সঙ্ঘ পরিবার? না চার আনার আইটি সেলের ভক্তরা? মুখে ঝামা ঘষে বলে দিন ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে বামপন্থীদের জ্ঞান দেওয়ার যোগ্যতা এদের কোনদিন ছিলনা। আজও নেই। পরেও থাকবে না। 
ধর্ম নিরপেক্ষতার জ্ঞান কে দিচ্ছে? সিমির দালাল আহমেদ হাসান ইমরানকে যারা রাজ্যসভার টিকিট দিয়েছিল? সিদ্দিকুল্লাকে মন্ত্রী বানিয়ে যারা ঠুমকা নেচেছিল? বরকতিকে যারা ব্রিগেডের মঞ্চে তুলে ভাঁজ দেওয়া সাম্প্রদায়িক ভাষণ দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল? না যারা, সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সামনে 'জয় শ্রী রাম' শ্লোগান শুনে মুচকি হেসে রোয়াব নিয়েছিল? গেরুয়া পোশাকের ক্লাউন আদিত্যনাথ কে গতকাল মালদাতে দাঙ্গা লাগাতে চরতে ছেড়েছিল? প্রজ্ঞা ঠাকুরদের পুষে লোকসভা তে পা রাখতে শিখিয়েছিল? বামপন্থীদের ধর্ম নিরপেক্ষতা শেখাবে এরা? জাস্ট শাট আপ!     
ফেজ টুপির সিদ্দিকি বামপন্থীদের হাত ধরলে গায়ে ছ্যাঁকা লেগেছে? ISF-র সভাপতি শিমুল সোরেন। মুসলিম নন, আদিবাসী। ISF-র সর্বোচ্চ নেতাদের অনেকেই তফসিলি জাতি ও অনগ্রসর শ্রেণীর মানুষ। তথাকথিত 'হিন্দু'। তবুও ফেজ টুপি দিয়েই দল চিনবেন, তাই তো? বেশ, চিনুন। রাজনাথ সিং মাথায় ফেজ টুপি পরলেও চিনুন, মোদী ভোটের আগের সলমান খানের সঙ্গে ঘুড়ি ওড়ালেও চিনুন, লকেট হাঁটু মুড়ে দোয়া চাইলেও চিনুন, আর মমতা হিজাব দিয়ে ইফতার পার্টি তে গেলেও চিনুন। আছে হিম্মত?   
আসলে বিজেমূলের বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছে ব্রিগেড। একদিকে 'যে গরু দুধ দেয় তার লাথ তো খেতেই হবে' বলে দিদি মুসলিম ভোট কুড়বেন, আর অন্য দিকে 'হিন্দু খতরে ম্যা' বলে বিজেপি হিন্দু ভোট কনসলিডেট করবে, রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে দাদা-দিদি মুজরা দেখবেন আর মিডিয়া আম্বানিদের পা-চাটার ব্লু প্রিন্ট রেডি করবে –প্ল্যান গুলো ভেস্তে যাচ্ছে? কি তাই তো?    
ভেবেছিলেন, ফেজ টুপি পরে আব্বাস সিদ্দিকি বক্তৃতা করলেই 'মোল্লাদের ব্রিগেড' বলে দাগিয়ে দেবেন! ভেবেছিলেন, রাজনীতির রঙ্গমঞ্চে দুধের দাঁত না ভাঙা সিদ্দিকি বক্তৃতার সময় একটা ফাউল করলেই লাল কার্ড দেখিয়ে দেবেন, ভেবেছিলেন আস্সালাম ওয়ালেকুম, ইনশাল্লাহ বা খোদা হাফেজ দিয়ে বক্তৃতা করবেন, ভেবেছিলেন মঞ্চের উপর থেকে না হোক নীচ থেকে কমপক্ষে আল্লা-হু-আকবর, নারায়ে তকবীর শুনবেন –প্ল্যান গুলো ভেস্তে গেছে? কি তাই তো? 
সিদ্দিকি থেকে দেবলীনা, সূর্য মিশ্র থেকে সেলিম হয়ে সীতারাম, ২৮শে-র ব্রিগেড জুড়ে রুজিরুটির কথা, চাকরির কথা, ধর্ম-জাত-বর্ণ নির্বিশেষে নিপীড়িত শ্রেণীর কথা, বিকল্পের কথা –ঘাবড়ে গেছেন তো? বিজেমূল বিরোধী সমস্ত দলকে এক জায়গায় এনে সংযুক্ত মোর্চা গ্লুয়িং ফ্যাক্টর হিসেবে রকস্টার সিপিএম-র ভূমিকাকে দেখে চমকে চ হয়ে গেছেন তো? এতদিন তিল তিল করে গড়ে তোলা বাইনারি ন্যারেটিভটা ভেঙে যাচ্ছে দেখে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তো? 
এসব একটু হবে! আগামী দু-মাস এরকম অনেক বাইনারি-টাইনারি, লেসার ইভিল-ফিভিলের ফান্ডা হুব্বা হয়ে যাবে। মানিয়ে নিতে অভ্যাস করুন। আব্বাস সিদ্দিকির পুরনো ভিডিও খুঁজে ক্যালোরি খরচা না করে, ২৪ বছরের তৃণমূলের ও তার সুপ্রিমোর ধর্ম নিরপেক্ষতা নিয়ে ছ্যাবলামির ইতিহাসটা দূরবীন দিয়ে দেখা অভ্যাস করুন। কামাল হাসানের ভূমিকায় সদমা সিনেমার শ্রীদেবীর মত 'লিবারেলদের' স্মৃতিশক্তির যত্ন নেওয়া অভ্যাস করুন।  
দেখবেন, দূরবীনে অতীতের প্রিজমে ধরা পড়বে, ৯২-র ৪ঠা ডিসেম্বর, অযোধ্যায় জুটছেন কর-সেবকরা; সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে জনসভা ডাকল বামফ্রন্ট। আর সেদিনই সিধো-কানহু ডহরের সভায় মমতা বললেন, "সব সিপিএম'র ষড়যন্ত্র। বিজেপি অযোধ্যায় কিছুই করবে না।" মনে পড়বে, ৯৮-র লোকসভা ভোটে তৃণমূলের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে খাতা খুলল বিজেপি, আর ৯৯-এ এনডিএ-র শরিক মমতা হলেন রেলমন্ত্রী। ভেসে উঠবে, বিবিসি'র সাক্ষাৎকারে এক ভদ্রমহিলা নিঃসংকোচে বলছেন "বিজেপি তৃণমূলের ন্যাচারাল অ্যালি"। দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর মোদী কে অভিবাদন জানিয়ে পুষ্পস্তবক পাঠাচ্ছেন মমতা ব্যানার্জি। কিম্বা দিল্লিতে 'পাঞ্চজন্য'র অনুষ্ঠানে সংঘ নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে যিনি বলেছিলেন, ''আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আপনারা দেশকে ভালোবাসেন' -তার নামও মমতা ব্যানার্জি। গদগদ আরএসএস নেতারা যাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ''হামারি পেয়ারি দুর্গা" -তার নামও মমতা ব্যানার্জি।  
বামপন্থীরা সময়ের দায়িত্ব জানে। 'One Step Forward, Two Steps Back'-র গুরুত্ব বোঝে। সিপিএম'র হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে "কী করিতে হইবে" সে বিষয়ে প্রতিদিন হোয়াটস-অ্যাপে দু-মুঠো উপদেশ দেওয়া টেক্সাসের টেকনোক্র্যাট, ফেসবুকে পার্টি-লাইনের অন্তঃসার শূন্যতার গবেষক লন্ডনের চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট, পার্টির অভূতপূর্ব দিশাহীনতায় মাথায় হাত রাখা সাংবাদিক, 'সাম্প্রদায়িকতার ব্যাধি' নিরাময়ের ১০৮ প্রকার ওষুধ নিয়ে হাজির সবার থেকে একটু বেশি লেনিন জানা, একটু বেশি মার্ক্স বোঝা তাত্ত্বিক, সংশোধনবাদ কে 'প্রকৃত বিপ্লবের' শত্রু হিসাবে দাগিয়ে দেওয়া কফি হাউসের সিগারেটখোর বিপ্লবী  -এদের সামনে দাঁড়িয়েই ১০০ বছরের বেশি পথ চলছে সিপিএম। এবারও চলবে। 
অভাব-অভিযোগ-কুৎসা-অপপ্রচার-আলোচনা-সমালোচনার বিষমসত্ততা নিয়েই সিপিএম। সাংগঠনিক সাফল্য কিম্বা ব্যর্থতা, নির্বাচনী জয় কিম্বা পরাজয়, আদর্শ বোধের বিচ্ছুরণ কিম্বা বিচ্যুতি এই সব কিছুর বৈপরীত্য নিয়েই সিপিএম। ইতিহাসের দীর্ঘ পথ চলায় রাজনৈতিক ও মতাদর্শ গত এই আক্রমণের আগুনে জ্বলে পুড়েই ইস্পাত কাঠিন্যে বলিয়ান আজ সিপিএম। রাশিয়ান দার্শনিক নিকোলাই চেরনিশেভেস্কি কে উদ্ধৃত করে লেনিন বলতেন "কমিউনিজমের পথটা সেন্ট পিটার্সবার্গের সবচেয়ে লম্বা এবং সুসজ্জিত নেভস্কি প্রস্পেক্টর রাস্তার মত সহজ সরল আর প্রশস্ত নয়। বরং কণ্টকাকীর্ণ"। ঐ কণ্টকাকীর্ণ পথেরই পথিক সিপিএম।
দীর্ঘ পথ চলতে গিয়ে সিপিএম মৌলানা হসরৎ মোহানী এবং অপরজন স্বামী কুমারানন্দ মিলিয়ে দিতে শিখেছে। "Religion is the sigh of the oppressed creature, the heart of a heartless world, and the soul of soulless conditions. It is the opium of the people"- বুঝতে শিখেছে। সিপিএম চিনছে, মৌলবাদীদের। চিনেছে সাম্প্রদায়িকদের। চিনেছে ধর্মপ্রাণ কিম্বা ধর্মভীরু সাধারণ মানুষদের। 
সিপিএম স্বপ্ন দেখে এমন একটা সমাজের যে সমাজে, টিকি কিম্বা দাড়ি, সবাই থাকবে মিলে মিশে, সবাই থাকবে নিজের মত।  নাস্তিক কিম্বা আস্তিক সবাই বাঁচবে রাজার মত। যে সমাজে ধর্ম পালনের অধিকার থাকবে। ধর্ম কে নিয়ে হাসাহাসি করার অধিকারও থাকবে। শিল্পী ঈশ্বর কে নিয়ে ব্যাঙ্গ চিত্র আঁকবে। ভগবানের শুঁড় কেন, চারটে হাত কেন, তিনটে মাথা কেন –যুক্তিবাদীরা প্রশ্নও করবে। দাঙ্গাবাজদের মাথা ভেঙে দেওয়ার লোক প্রশাসন চালাবে। যে সমাজে ধর্মচারণ হবে ব্যক্তিগত। যে রাষ্ট্রের কাজ, সরকার পরিচালনা হবে ধর্ম নিরপেক্ষ। 
৭৭-র বামফ্রন্ট সরকার হয়েছিল ৫ মিনিটের সিদ্ধান্তে। ৫২% আসন জনতা দল কে ছেড়ে দিয়ে সেবারও প্রকৃত জোট ধর্মই পালন করেছিল বামফ্রন্ট। রাজি হননি জয়প্রকাশ। পড়ন্ত বিকেলে ৫ মিনিটের সিদ্ধান্তে প্রমোদ দাশগুপ্ত জানিয়ে দিয়েছিলেন ৫২% বেশি এক ইঞ্চি জমি ছাড়বেনা বামফ্রন্ট। ভেস্তে যায় জোট, ৭৭-র নির্বাচনে ১০০% আসনেই প্রার্থী দেয় বামফ্রন্ট। বাকি লড়াইটা হয়েছিল বুথে। বাকিটা লেখা আছে ইতিহাসে। 
রাজ্য রাজনীতি আরও একটা ঐতিহাসিক কঞ্জাংচারে দাঁড়িয়ে। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে। 'Concrete analysis of the concrete situation'- আরও একবার প্রকৃত জোট ধর্মই পালন করছে বামফ্রন্ট। সিদ্ধান্ত ভুল বা ঠিক হয় না। সিদ্ধান্তকে ভুল বা ঠিক প্রমাণ করতে হয়। তাই এবার ব্রিগেড যাবে বুথে। আগামী দু-মাস সংগ্রামের। আগামী দু মাস লড়াইয়ের। আগামী দু-মাস লেখা থাকবে ইতিহাসে।  
পাড়ার কুকুরটা খেপেছে। যাকে তাকে কামড়ে বেড়াচ্ছে। কুকুরের নাম বিজেমূল । মুগুরের নাম সংযুক্ত মোর্চা। পাগলা কুকুর কে মারবে যারা সব্বাই তারা এক দলে। এবার আপনি ঠিক করুন। কুকুরের সাথে থাকবেন, না মুগুরের। আমরা দাঁড়িয়ে আছি আপনার পাড়ার মোড়ে। পাগল কুকুর কে ঠাণ্ডা করার ডাণ্ডা নিয়ে। উন্নত বিকল্পের সরকার গড়ার ঝাণ্ডা নিয়ে।

মঙ্গলবার, ২ মার্চ, ২০২১

কেন সংযুক্ত মোর্চা ~ শমীক লাহিড়ী

এতো মহা মুস্কিলে পড়া গেল। লোক জুটে গেল , মাঠ ভরে গেল।বিরিয়ানি, মায় ডিম-ভাত খাওয়ানোর গল্প বের করা গেলনা। চিড়িয়াখানা-ভিক্টোরিয়া দেখতে ক'লকাতা আসার গল্পও নেই। পাকাচুলে ভর্তি ব্রিগেডের সবুজ ঘাসকে সাদা দেখানো – সেটাও খাওয়ানো যাচ্ছে না। ছবি অন্য কথা বলে দিচ্ছে। 

তাহলে? দুপুরে ব্রিগেড সভা চলার সময়েই মাথা চুলকে, ঘাড়ের ঘাম মুছে তৃণমূল-বিজেপি-র ভোট ম্যানেজাররা ভেবে কুল পাচ্ছিল না – এবারের ব্রিগেড নিয়ে কি বলা হবে!

কংগ্রেসের সবাই আসেনি, বলাও মুস্কিল। বিশাল সমাবেশে এসে অধীর চৌধুরী আপ্লুত, মান্নান সাহেবও সকাল থেকেই হাজির। দীপা দাশমুন্সীও বেসুরে গাইলেন না। যাকে দিয়ে অনেক কিছু বলিয়ে নেওয়া যায়, সেই মনোজ চক্রবর্তী ব্যস্ত সভা সুষ্ঠুভাবে চলার আয়োজনে। মহা মুস্কিল! 

বামফ্রন্টের শরিকদলের নেতাদের খুঁচিয়ে কিছু পাওয়া যাচ্ছেনা? ঠান্ডা ঘরের নির্দেশ পেয়ে বেচারা সাংবাদিকদের ২/১ জন নেতাকে খোঁচাতে গিয়ে উলটে বিদ্রুপ শুনতে হ'লো।

তাহলে! একজন লাইন দিল - '২০১৯ সালেও ব্রিগেড ভরেছিল - কিন্তু ভোট পেয়েছিল ৭%। তাই এবারের ব্রিগেড ভরলেও ভোট সেই ৭%। এটাই চালানো হোক।'

পালে পালে লোক হাজার হুমকি, বাধাবিঘ্ন পেরিয়ে, গাঁটের পয়সা খরচ করে শত-শত মাইল পথ পেরিয়ে ব্রিগেড এসেছে। এই ব্রিগেড ফিরে গিয়ে বুথেও মরণপণ লড়াই চালাবে না, তার গ্যারান্টি কোথায়? ৭%+৫%= ১৩% ভোট ছিল মরা ভোট বাজারেও, ২০১৯ এ ভাঁটার টানেও।

তাই এত লঘু বস্তাপচা কথায় ভোট ম্যানেজার কোম্পানির  বাবুদের মন ভরলোনা। ভাবো ভাবো। সময় নেই। এক্ষুনি টিভি তে নেমে পড়তে হবে। কাগজে লাইন নামাবার জন্য কয়েক ঘন্টা সময় পাবে, কিন্তু টিভি তে এক্ষুনি লাইন চালু করতে হবে। একবার যদি মানুষের মাথায় ঢুকে যায় বিজেপি-তৃণমূল এই দুইয়ের বিকল্প আছে, তাহলেই ঘোর বিপদ। 

অবশেষে কয়েকটা লাইন পাওয়া গেল - 
লাইন ১ - আব্বাস সিদ্দিকী মাঠে ঢোকার সময়ে, জনতার উচ্ছাসে থামতে হ'লো অধীর চৌধুরীকে। 
না!  শুধু এতে কি হবে? বলো - 'ক্ষুব্ধ  অধীর চৌধুরীকে ভাষণ সাময়িক সময়ের জন্য বন্ধ করতে হ'লো আব্বাস সিদ্দিকীর জন্য।'

কিন্তু এটাতে ঠিক সিপিআই(এম) কে জড়ানো গেলনা। আরও কিছু চাই। ৩০ মিনিট বাদে ভাষ্য পাল্টে হ'লো - 'সিপিআই(এম) নেতা মহঃ সেলিম, লোকসভার বিরোধী দলনেতা অধীর চৌধুরীকে ভাষণ শেষ করতে বললেন, আব্বাস সিদ্দিকী মঞ্চে প্রবেশ করার সময়ে। অপমানিত অধীর চৌধুরীকে কোনোক্রমে বিমান বসু সামাল দিলেন, তাঁকে আবার বলতে দিয়ে।' 

ঠিক আছে - চলবে। তবে এই মান-অপমানের ব্যাপারটা খুব খেলো করে দিয়েছেন ধনকর সাহেব। এত ঘন ঘন নানা ব্যাপারে অপমানিত বোধ করে 'অপমান' শব্দটার মান-সম্মান কিছু রাখেননি।

তাই আরও কিছু চাই। এভাবে ব্রিগেড জমায়েতের প্রভাব কিছুতেই মানুষের ওপর পড়তে দেওয়া যাবেনা। 

মাথা ঘামালেই উপায় বেরোয়। কোটি কোটি টাকা খরচ করে বুদ্ধিমান জীব পুষেছে বিজেমূল , আর উপায় বেরোবে না, তা হয় নাকি!

এবার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে হবে। নতুন লাইন নেমে পড়লো সূর্যাস্তের আগেই।

লাইন ২ -  ছিঃ ছিঃ!! একটা কমিউনিস্ট পার্টি শেষে কি না ধর্মীয় নেতার হাত ধরে  ব্রিগেডের স্টেজে তুলে এই আদিক্ষেতা করলো! ভাবা যায়! এখানে জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য-রা বক্তৃতা করতেন। সেখানে শেষে কি না...!! ছিঃ ছিঃ!

এই লাইনটা বেশ ভালো। ২০১৯ সালে যেসব বাম সমর্থক তৃণমূলকে হারাবার প্রবল স্পৃহায় বামদের জয়ের প্রতি সন্দিহান হয়ে বিজেপির ওপর আস্থা রেখেছিল, তাদের বাম ঘরে ফিরে যাওয়াও  রোখা যাবে। 

এই অংশের বাম সমর্থকেরা আবার ভাবতে শুরু করেছে - বামরা রাস্তায় লড়ছে। হাজার হাজার বাম ছাত্র-যুব কর্মী বেকারত্বের বিরুদ্ধে মরণপণ লড়ছে। সহযোদ্ধার মৃত্যু বা পুলিশের ভয়াবহ অত্যাচারও এদের দমাতে পারেনি। বাম মহিলা কর্মীরা আত্মমর্যাদার দাবীতে সমবেত হ'য়ে পুলিশের লাঠির বাড়ি খেয়েও পালায় নি। এ-সব মানুষ দেখছে। মিডিয়া না দেখালেও বিকল্প সামাজিক মাধ্যমে দেখছে। 

তাই বামের ছেড়ে যাওয়া সমুর্থকদের ফেরার পালা শুরুর আগেই এই ফিরে যাওয়া আটকাতেই হবে। তাই নেমে পড়ো সংবাদমাধ্যম। বসে পড়লো আলোচনা। যাদের ধরে আনা হ'লো, তারা যেখানে জমাতে পারলেন না ভালো, সেখানে সঞ্চালক/সঞ্চালিকারাই লজ্জার মাথা খেয়ে নেমে পড়লেন, চাকরি বাঁচানোর দোহাই দিয়ে। পরের দিন সকালের কাগজে গুছিয়ে গল্প লেখা হ'লো। কোথাও আলিমুদ্দিনের অন্দরমহলের কল্পিত খবর,  কোথাও মাঠে আসা কল্পিত প্রবীণ বা নবীনের মুখে বলে নিজেদের ভাষ্য প্রচার - সবই চলছে বাজারী কাগজে। 

লাইন ৩ - কিন্তু শুধু এতেও হবে না। সংযুক্ত মোর্চাকে ভাঙতেই হবে। কিছুতেই একসাথে এত শক্তিকে রাখা যায় না। বিজেপি-তৃণমূল এই দুয়েরই ভোট কেটে নেবে এরা, আর এটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে এই দুই দলের স্পনসর কর্পোরেট আর তাদের নিয়ন্ত্রিত মিডিয়া?  এ হতেই পারে না। 

খোঁচাও কংগ্রেসের নেতাকে, খোঁচাও IFS নেতাদের। দেখো খুঁচিয়ে কিছু বলানো যায় কি না! সংযুক্ত মোর্চা ভাঙার এই খেলায় টাকার বন্যা বইবে। মিথ্যে প্রচারের বন্যা বইবে। বাজারে অনেক এজেন্ট/এজেন্সি ঘুরবে। কারণ সংযুক্ত মোর্চার ঐক্য দুই শাসক দলের ঘুম কেড়ে নিয়েছে।

রাজ্যের হালহকিকত কি - সবারই জানা। রাজ্যে ১০বছরে কোনও নতুন কলকারখানা হয়নি। আগেরগুলোর বেশীরভাগই তোলাবাজির ঠেলায় পালিয়েছে রাজ্য ছেড়ে। লক্ষ লক্ষ সরকারি পদ খালি - কোনো নিয়োগ নেই। নিয়োগ মানেই ঘুষ দাও তৃণমূলের নেতাদের। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবক-যুবতী রাজ্য ছেড়ে পাড়ি দিয়েছে ভিনরাজ্যে কাজের খোঁজে। 

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে গেলে টাকা দাও। নম্বর যতই থাকুক টাকা না দিলে প্রবেশ নিষেধ। মাস্টার মশাই/দিদিমণি  এই তোলাবাজির বিরুদ্ধে বললে, ধরে পেটাও। 

চাষীর ফসল সরকার আইন করে কার্যত ফড়ে দালালদের হাতে তুলে দিয়েছে। ফল? চাষি আলুর দাম পায় ৫/৬টাকা, আর সেই আলু ক্রেতাকে কিনতে হয়েছে এমনকি ৪৫ টাকাতেও। অবাধ পয়সা লুঠছে ফড়ে-দালালরা।

গ্যাসের দাম-তেলের দাম আকাশ ছুঁয়েছে। দেশে ৭০ বছরে যেটুকু সরকারি  সম্পদ তৈরি হয়েছে, সব তুলে দাও আদানি-আম্বানী বা অন্য কোনো বেসরকারি কোম্পানিকে। মানুষের জমানো ব্যাঙ্ক-বীমার টাকা লুঠের সুযোগও উন্মুক্ত হোক বেসরকারিকরনে - এটাই বিজেপির লক্ষ্য।

রাজ্যের-কেন্দ্রের সরকারের এইসব কাজের সমালোচনা বা  প্রতিবাদ করলেই হামলা নয়তো মিথ্যা মামলা। এই রাজ্যে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার  নেই। এমনকি ভোটও দিতে পারেনা বহু মানুষ। পঞ্চায়েত পৌরসভার ভোটে দাঁড়ানোর অধিকারটুকুও নেই। ওদিকে পার্লামেন্টে সাংসদদেরও ভোট দিতে দেয়না বিজেপি সরকার। 

রাজ্যের ক্ষমতায় স্বৈরাচারী শক্তি। কেন্দ্রে ফ্যাসিস্ট শক্তি। যন্ত্রণাক্লিষ্ট মানুষ কি করবে? জ্বলন্ত উনুন আর ফুটন্ত কড়াইয়ের মধ্যেই তাদের জীবন আটকে থাকবে? 

এই পরিস্থিতিতে কমিউনিস্ট পার্টি বা বাম আন্দোলন কি ভূমিকা গ্রহণ করবে? এটাই যদি প্রশ্ন হয় তাহলে উত্তর - দুই শক্তিকেই পরাস্ত করতে হবে। লেসার এভিল বা কম ক্ষতিকর গল্প চলেনা জীবন মরনের মুখে দাঁড়িয়ে। গোখরো না কেউটে - কোনটা বেছে নেবেন, এই আলোচনা পাগলেও করেনা।

কিন্তু কি ভাবে এই দুই শক্তিকেই হারানো আর ঠেকানো সম্ভব? এটা সম্ভব হবে তখনই, যখন সব স্বৈরাচার ও ফ্যাসীবাদ বিরোধী মানুষকে একসাথে এক মঞ্চে এনে লড়াই করা সম্ভব হবে। এই সব মানুষ বা রাজনৈতিক দলগুলো বা সামাজিক শক্তিগুলো অনেক প্রশ্নেই ভিন্ন মত পোষণ করতে পারে, কিন্তু এই দুই মারণ-শক্তিকে পরাস্ত করার বিষয়ে সহমত থাকলেই, এদের ঐক্যবদ্ধ করার সর্বোচ্চ প্র‍য়াস চালাতে হবে।

সেই লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছে *সংযুক্ত মোর্চা*। এই মোর্চার লক্ষ্য ব্রিগেড সভা থেকেই ঘোষিত হয়েছে। 

বাজারি সংবাদমাধ্যম ও বিজেপি-তৃণমূল যৌথভাবে এইজন্যই রে রে করে উঠেছে। নানা ভেক ধরে নানা প্রশ্ন তুলছে।

৭% ছিলে তাই থাকো। ৫% কংগ্রেসকে সাথে নেওয়ার সাথে সাথে কমিউনিস্ট পার্টির শ্রেণী দৃষ্টিভঙ্গী দিয়ে কি সাংঘাতিক মাথা ব্যথা এক অংশের সংবাদমাধ্যমের। ৭ আর ৫ যোগ করলে তো মাত্র ১৩। তাতে এত  সমস্যা হচ্ছে কেন? কারণ এরা ভালোই জানে ভোটের অঙ্কে ৭+৫ সব সময় ১৩ হয়না। এই যোগফলটাই গত বিধানসভা নির্বাচনে ছিল ৩৬%। কারণ বিকল্প শক্তি জিততে পারে, এই বার্তাটাই বহু অতিরিক্ত ভোট টেনে আনে। আর বিচ্ছিন্ন হয়ে লড়লে কি হয় এই ৩৬% ভোটের, সেটা গত লোকসভা নির্বাচনে দেখা গেছে।

তাই এই যোগ যাতে না হয়, সেইজন্যই বিজেপি-তৃণমূলের  ভোট ম্যানেজাররা অনেক এজেন্ট /এজেন্সিকে বাজারে ছেড়ে দিয়েছে। এদের সাদা চোখে দেখা যায় না। এরা কেউ ৭২-৭৭ সালে অত্যাচারিতের ভেক ধরে লিখছে। কেউ এই জন্যই সিপি আই(এম) ছাড়লাম, বলে ঘোষণা করছে।  নবগঠিত সংযুক্ত মোর্চার ভেতরে পঞ্চম বাহিনীর কেউ আছে কিনা খুঁজতে বেরিয়েছে টাকার থলে নিয়ে এরা। 

এবার গোদের ওপর বিষফোঁড়া। তপশিলি জাতি-উপজাতি, আদিবাসী, ধর্মীয় সংখ্যালঘু  মানুষরা গত ২/৩ বছর ধরেই ফুঁসছিল, তৃণমূল সরকারের বিশ্বাসঘাতকতায়, আর বিজেপির দলিত ও সংখ্যালঘুদের ওপর ক্রমবর্ধমান আক্রমণে। নানা সংগঠনের ছাতার তলায় এরা সংগঠিত হচ্ছিল।

এবার এরা সবাই মিলে একটা বড় মঞ্চ তৈরি করেছেন - ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট। সভাপতি হয়েছেন শিমূল সোরেন আর সম্পাদক আব্বাস সিদ্দিকী। এদের লক্ষ্যও বিজেপি ঠেকাও, তৃণমূল হঠাও।

বাজারে বিজেপি-তৃণমূল এজেন্টরা এদের কাছে টানার জন্য কি না করেছে গত কয়েক মাস ধরে। সাফল্য না পেয়ে এখন মায়াকান্না জুড়েছে। এরা কত সাম্প্রদায়িক, জাতপাতের রাজনীতি করছে, সেই প্রচারে মত্ত হাতির মতো আচরণ করছে সংবাদমাধ্যম।

সোরেন-সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই নতুন দল ব্রিগেড মঞ্চে কি বলেছে? 

না মুখ্যমন্ত্রীর মতো আব্বাস সিদ্দিকী কথায় কথায় ইনশাল্লাহ বলেন নি। ইমাম ভাতা বা হজ যাত্রায় ভাতার দাবী তোলান নি। বলেছেন কর্মসংস্থানের কথা। প্রশ্ন করেছেন কেন চাকরি চাইতে আসা ছাত্র-যুবদের লাঠি মারলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের পুলিশ। কেন পঞ্চায়েত-পৌরসভা- সরকারের টাকা লুঠ হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো সাম্প্রদায়িক? 

কোন কথাটা সাম্প্রদায়িক? কেউ তা বলতে পারছে না। বলছে কেন ফেজটুপী? মুখ্যমন্ত্রী হিজাবী টেনে ভাষণ দিতে পারেন অসুবিধা নেই, কিন্তু একজন মুসলমান কেন ধর্মীয় প্রথা মেনে ফেজ টুপি পড়েছেন সেই প্রশ্ন তুলছেন এরা কি উদ্দেশ্যে, সেটা স্পষ্ট। 

তৃণমূলের মঞ্চে দাঁড়িয়ে টিপু সুলতান মসজিদের ইমাম প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করলে অসুবিধা নেই, যোগী আদিত্যনাথ ঘৃণা ও খুনের রাজনীতির কথা প্রকাশ্যে বলেও বিজেপির নেতা হ'লেও অসুবিধা নেই, গুজরাট দাঙ্গার নায়ক নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দেওয়া যায়, কিন্তু সব বেকারের চাকরির দাবি জানানো আব্বাস সিদ্দিকী সাম্প্রদায়িক? 
বাহঃ। চমৎকার যুক্তি!!

মুসলমান, তপশিলি জাতি-উপজাতি, আদিবাসী মানুষ  কোনো ভিক্ষা চায়না, চায় সংবিধান স্বীকৃত অধিকারের বাস্তবায়ন। ব্রিগেডের মঞ্চে এই কথা বলে কি সাংঘাতিক অপরাধই না করেছে সোরেন-সিদ্দিকীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ISF !!

অনেক বাম সমর্থক ভাবছেন, কাজটা কি ঠিক হ'লো! একজন ধর্মীয় নেতার দলের সাথে বাম দল কেন মোর্চা করবে? 

প্রথমত ধর্ম বিশ্বাস আর সাম্প্রদায়িকতা কি এক? কেবল নাস্তিকরাই কি বামপন্থী হবে? ধর্মাচরণে ব্রতী কি তবে ব্রাত্য বামদের কাছে? 

ধর্ম নিয়ে কার্ল মার্কসের বিখ্যাত উক্তির পুরোটা অনেকেই বলেন না, বলেন একটা অংশ - ধর্ম হ'লো আফিম। কার্ল মার্কস 'A Contribution to the Critique of Hegel's Philosophy of Rights'  লেখায় উল্লেখ করেছিলেন - "ধর্ম হলো শোষিতদের মর্মযাতনা, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়, আত্মাহীন অবস্থার আত্মা। শোষিত মানুষের কাছে ধর্ম হ'লো  আফিম।"

কার্ল মার্কস এই উক্তিটির মাধ্যমে ধর্ম‌কে আফিমের সা‌থে তুলনা ক‌রে‌ছি‌লেন। কিন্তু কেন ?

এই বিষয়‌টির গভী‌রে না গি‌য়ে মোল্লা, পু‌রো‌হিত, ধর্ম ব্যবসায়ীদের কার্যকলাপ না বু‌ঝে কিংবা না জেনে এক‌রৈ‌খিকভা‌বে সরল মানুষগু‌লোর কা‌ছে উপস্থাপন ক‌রে সাধারণ মানুষ‌কে ক‌মিউনিস্ট  বি‌দ্বেষী গড়ে তুলতে এর প্রকৃত ব্যাখ্যা উপস্থিত করে না কমিউনিস্ট বিরোধীরা। এমন‌কি অনেক ক‌মিউনিস্ট কর্মীও এই বিষয়‌টির স‌ঠিক মর্মার্থ উদ্ধার কর‌তে ব্যর্থ হয়ে পু‌রো বিষয়টি‌কেই গুলিয়ে ফে‌লেন।

আস‌লে মূল বিষয়‌টি হ‌চ্ছে, আজ‌কালকার ম‌তো তখনকার সম‌য়ে আফিম কোন নেশাদ্রব্য ছিল না। তখনকার চি‌কিৎসকরা ব্যাথা বা চেতনা নাশক হিসা‌বে আফিমকে ব্যবহার করতেন। আর মার্কস নি‌পীড়িত, শো‌ষিত মানু‌ষের কা‌ছে ধর্ম আফিম স্বরূপ বল‌তে এটাই বোঝা‌তে চে‌য়ে‌ছি‌লেন যে - সমাজ থে‌কে প্রাপ্ত যাবতীয় দুঃখ, যন্ত্রনা, কষ্ট, অন্যায়, নির্যাতন লাঘবের চেষ্টায় যখন ‌কোনও ব্যা‌ক্তি ব্যর্থ হয়, তখন সৃ‌ষ্টিকর্তার কা‌ছে সমস্ত অন্যা‌য়ের বিচা‌রের ভার সে অর্পন ক‌রে।

ধর্ম‌কে আশ্রয় ক‌রেই তার সকল যন্ত্রনা লাঘ‌বের চেষ্টা ক‌রে ‌কিংবা ভুলে থা‌কতে চায়। নি‌জে যখন বদলা নি‌তে ব্যর্থ হয়, তখন সে ম‌নে ক‌রে, এক দিন না এক‌দিন তার প্রতি এ অন্যা‌য়ের বিচার সৃ‌ষ্টিকর্তাই কর‌বেন। এ প্রেক্ষাপ‌টেই মার্কস এ উক্তিটি ক‌রে‌ছি‌লেন।

লেনিনের লেখা ধর্ম প্রসঙ্গে প্রবন্ধাবলীর মধ্যে 'সমাজতন্ত্র ও ধর্ম' প্রবন্ধটি এই প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য।  এখানে তিনি বলছেন - "ধর্মকে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার বলে ঘোষণা করা উচিত। এই উক্তিতেই সাধারণত ধর্ম সম্পর্কে সমাজতন্ত্রীদের মনোভাব স্পষ্ট হয়।..... রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের পরিপ্রেক্ষিতেই আমরা ধর্মকে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যাপার বলে বিবেচনার দাবী করছি। ধর্ম নিয়ে রাষ্ট্রের কোনো গরজ থাকা চলবে না এবং ধর্মীয় সংস্থাসমুহের রাষ্ট্রের ক্ষমতার সাথে জড়িত থাকা চলবে না। যে কোনও ধর্মে বিশ্বাস  অথবা কোনো ধর্মে বিশ্বাস না রাখার অধিকারে সবাই থাকবে স্বাধীন।''

এই প্রবন্ধেই তিনি আরও ব্যাখ্যা করে বলেছেন - কেন কমিউনিস্ট পার্টি নিজেদের পার্টি কর্মসূচীতে নাস্তিকতাবাদ ঘোষণা করেনি এবং কেন তা উচিত নয়। স্থানাভাবে সমগ্র উদ্ধৃতি উল্লেখ করলাম না, আগ্রহী পাঠকরা সমগ্র প্রবন্ধটি পড়ে দেখতে পারেন।

এই প্রসঙ্গে ফিডেল কাস্ত্রোর সাথে ব্রাজিলিয় ধর্মতাত্ত্বিক ফ্রেই ব্রিট্টোর একাধিক সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রকাশিত একটি বইয়ের উল্লেখ হয়তো অপ্রাসঙ্গিক হবেনা। ১৯৮৫ সালে 'ফিডেল এন্ড রিলিজিয়ন' নামে এই বইটি প্রকাশিত হয়। 

কিউবার বিপ্লবের পর স্পেনের ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের সাথে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রাখা এবং তাদের সাহায্য করার জন্য সেই দেশের চার্চের প্রধানদের বিতাড়িত করেছিল নতুন বিপ্লবী সরকার। কিন্তু ধীরে ধীরে চার্চের ভূমিকার পরিবর্তনের সাথে সাথে সেই দেশের সমাজতান্ত্রিক সরকারও তাদের পরিবর্তিত অবস্থান ঘোষণা করে। ১৯৯২ সালে স্বঘোষিত নাস্তিকদের দেশ কিউবা নিজেদের ধর্মনিরপেক্ষ দেশ বলে ঘোষণা করে। 

'আজকের যুগে যীশু জন্ম নিলে তিনি অবশ্যই আমাদের বিপ্লবীদের মতই প্রচার করতেন' - একথা ফিডেল ১৯৯৮ সালে বলেছিলেন। 

কমিউনিস্ট পার্টি রাষ্ট্র ও ধর্ম প্রতিষ্ঠানের পৃথক অস্তিত্বের কথাই বলে। কেউ কারোর কাজে নাক গলাবে না, এটাই আধুনিক রাষ্ট্রের মূল কথা - এটাই মনে করে কমিউনিস্টরা।

যারা এতদিন কমিউনিস্টদের নাস্তিক, ধর্ম বিরোধী বলে প্রচার করতো, তারাই এখন ধর্মীয় মানুষের সাথে কেন কমিউনিস্টরা হাত মেলাচ্ছে বলে গলা ফাটাচ্ছে। সত্যি কি বিচিত্র এদের প্রচার!!!

আমার মা ধার্মিক ছিলেন। নিয়মিত পূজা আর্চা ধর্ম পালন করতেন। কিন্তু তাতে আমাদের বাড়িতে আসমাদি'র কাজ করতে কোনো সমস্যা হয়নি। ওর রাঁধা ভাত আমরা দিব্যি পেটপুরে খেয়েছি। আসমাদি আমাদের বাড়ির ঠাকুর ঘরের সামনেই নমাজ পড়তেন, মা'কে কোনোদিন আপত্তি করতে শুনিনি। আমার মা সাম্প্রদায়িক ছিলেন না, ছিলেন ধার্মিক।

তাই ধর্মাচরণে অভ্যস্ত বা ধর্মীয়যাজকদের সাথে পথ চলতে অসুবিধা কিসের, যদি তিনি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের বিরোধী হন?

যোগী আদিত্যনাথেরা ধর্ম পালন করেনা, ঘৃণার আগুন ছড়ায়। বিজেপি স্পনসর্ড ভোগ বিলাসে মত্ত 'বাবা রামরহিম বা আশারাম বাপু'-রা ধর্মের নামে ব্যবসা করে কোটি কোটি টাকা কামায়। নরেন্দ্র মোদি ধর্মকে ব্যবহার করেন ক্ষমতা দখলের জন্য। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এর ব্যতিক্রম নন।

আর এদের সমর্থক বাহিনী প্রশ্ন তুলছে - কেন পীরযাদা ব্রিগেডে। বুঝতে অসুবিধা হয় না, এই ত্রিশক্তির মিলনে বিজেপি-তৃণমূল আর এদের ক্ষমতায় রাখতে মরীয়া কর্পোরেটরা কেন থরহরিকম্প। এতদিন প্রচার চালাচ্ছিল - বিজেপি তৃণমূলের বিকল্প কেউ নেই, তাই অপছন্দ হলেও বাঁ হাতে মনসা পূজার মতো এই দুজনের কাউকে একটা ভোটটা দিয়ে দিন।

এখন প্রকৃত বিকল্প সামনে উঠে আসছে। যারা ধর্ম জাতপাতের বদলে কাজ, শিক্ষা, গণতন্ত্র,  সংবিধান স্বীকৃত অধিকারগুলোর বাস্তবায়নের দাবী করছে। 

এতদিন মুসলমানদের সামান্য কিছু ইমাম-মোয়াজ্জেম ভাতা ধরিয়েই ঠান্ডা রেখে দিব্যি এদের ভোট পকেটস্থ করতে পারছিল তৃণমূল। মুসলমানদের জুজু দেখিয়ে হিন্দুদের ভোটটাও পাচ্ছিল বিজেপি। কিন্তু ভাত-রুটি-কাজ- অধিকারের দাবী তুলে সব ঘেঁটে দিয়েছে *সংযুক্ত মোর্চা*। তাই  দেশের লগ্নি পুঁজির ধারক বাহকেরা কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে, শিশু অবস্থাতেই একে হত্যা করতে।

এতদিন জাতপাত ধর্ম দিয়ে বেশ ভুলিয়ে রাখা গেছিল সমাজের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া এই অংশকে। কিন্তু বামপন্থীরা এদের ভাত-কাপড়-কাজ-অধিকারের লড়াইতে এনেছে। দেশের মূল গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ধারায় সম্পৃক্ত করার চেষ্টায় নেমেছে সিপি আই(এম)। হ্যাঁ, এটাই মূল কাজ এখন বামপন্থীদের। জড়ো করো বঞ্চিত, অত্যাচারিত, লাঞ্চিত সব মানুষকে, নিজের হক বুঝে পাওয়ার লড়াইতে।

ওরা চেয়েছিল - বামপন্থীরা ছুৎমার্গ দেখিয়ে এদের দূরে সরিয়ে রাখুক। ছূঁয়ো না ছুঁয়োনা ছিঃ, ও যে চন্ডালিকার ঝি - এই মন্ত্র বামপন্থীরা গেলেনি কোনোদিনই। কিন্তু  বামপন্থীদের থেকে সুকৌশলে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছিল এই নিপিড়ীত মানুষদের। যেই ওদের ছলা-কলা- কৌশল বুঝে আদিবাসী, তপশিলি জাতি-উপজাতি, সংখ্যালঘুরা নিজেদের অধিকার বুঝে নেওয়ার লড়াইয়ের সাথী হিসেবে বামপন্থীদের বেছে নিয়েছে - তখনই শুরু হয়েছে মিথ্যার নির্মান। 

যে সমস্ত স্বঘোষিত বামপন্থীরা প্রশ্ন তুলছেন কেন ধর্মীয় নেতার সাথে হাত মেলাচ্ছে সিপি আই(এম), তাঁরা কি ইতিহাস ভুলে গেছেন, না কি ইচ্ছে করে বলছেন না সেই অধ্যায়গুলো। সারা ভারত কৃষক সভার প্রথম সভাপতির নাম ছিল -   স্বামী সহজানন্দ সরস্বতী। ১৯২১ সালে জাতীয় কংগ্রেসের এলাহাবাদ অধিবেশনে প্রথম পূর্ণ স্বরাজের দাবী তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির পক্ষে উত্থাপন করেছিলেন কারা? একজন মৌলানা হসরৎ মোহানী এবং অপরজন স্বামী কুমারানন্দ। এইসব ইতিহাস ওরা আলোচনা করবে না, কারণ বকলমে তৃণমূলের হয়ে ঠিকেদারির অগ্রীম গ্রহণ  করে ফেলেছে এইসব স্বঘোষিত বামপন্থীদের অনেকেই।

তবে একটা কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, ফ্যাসিবাদের সাথে লড়াইটা হবে দীর্ঘ। লম্বা পথ। এই পথে চলতে গিয়ে অনেকেই আসবে। সবাই যে শেষ পর্যন্ত থাকে বা থাকতে পারবে, তার কোনও মানে নেই। এ অনেকটা দিল্লি গামী ট্রেনের মতো। হাওড়া থেকে ওঠা সব যাত্রী দিল্লি যায়না। অনেকে মাঝপথে নানা স্টেশনে নেমে যায়, আবার মাঝপথেই অন্য যাত্রী ওঠে। এই ওঠানামা চলতেই থাকে। সবাই দিল্লি পর্যন্ত যায়না। এই লড়াইয়ের দীর্ঘ পথেও তাই হয়।

সাবধান! অনেক ঝানু লোক মিত্র সেজে ঘুরছে সদ্যগঠিত *সংযুক্ত মোর্চা* ভেঙে দেওয়ার জন্যই। কেউ টাকার থলে নিয়ে, কেউ পরামর্শ দেওয়ার ছলে, কেউ বা নারদের ভূমিকায়। 

পোড় খাওয়া রাজনৈতিক নেতার মতো পাশ কাটিয়ে, কথা খেলিয়ে, কিছু কথা পেটে কিছু কথা ঠোঁটে,  আর অন্য কিছু মাথায় রেখে কথা বলা এখনো আয়ত্ব করে উঠতে পারেন নি, রাজনীতিতে নবাগত আব্বাস সিদ্দিকী। তাই একে দিয়ে ঐক্য বিরোধী কথা বলিয়ে নেওয়ার জন্য ঝানু সাংবাদিকদের লাগিয়ে রেখেছে কর্পোরেট মিডিয়া। সতর্ক অবশ্যই থাকতে হবে সংযুক্ত মোর্চার অন্তর্ভুক্ত সব কটি দলের নেতাদেরই। 

তবে হ্যাঁ মনে রাখতে হবে সংযুক্ত মোর্চায় অনেক দল আছে। তাই সব প্রশ্নে সবাই একমত হবে কেন? তাহলে তো একটা দলেই সবাই মিশে যেত। সবাই একমত হয়েছে - তৃণমূলকে হটিয়ে,  বিজেপিকে ঠেকিয়ে নতুন বাংলা গড়তে হবে, আগামীর জন্য।

তৃণমূল বা বিজেপি তো নিজেদের মধ্যেই মারামারি খুনোখুনি করে। ওদের সভা মানেই চেয়ার টেবিল ভাঙার প্রতিযোগিতা। আর এতগুলো দল নিয়ে সংযুক্ত মোর্চার প্রথম কর্মসূচী ছিল ব্রিগেড সভা। ১০লাখ লোক নিয়ে এমন সুশৃঙ্খল সভা করার হিম্মত আছে নাকি বিজেপি বা তৃণমূলের!!

এখন সুবর্ণ এক সুযোগ ও অধ্যায় সৃষ্টির মুখে বাংলা। জাতপাত ধর্মের বেড়াজাল ভেঙে ভাত-রুটি-কাজ- অধিকারের দাবীতে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে সংযুক্ত মোর্চা। এই ঐক্য অটুট রাখার দায় যেমন নেতাদের, তেমনি কর্মী-সমর্থকদেরও। মানুষের জন্যই এই ঐক্য অটুট রাখতেই হবে। ব্রিগেডের লড়াই নিয়ে পৌঁছে দিতেই হবে বাংলার পাহাড় থেকে সুন্দরবনের প্রতিটি বুথে। আগামী ২টো মাস ঐক্য আর সংগ্রামের মাস।

শমীক লাহিড়ী 
২রা মার্চ, ২০২১