সোমবার, ২৮ জানুয়ারী, ২০১৯

হিন্দু কোড বিল ~ শুভদীপ দে

ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রথম অ্যাসিড টেস্টঃ হিন্দু কোড বিল।

স্বাধীনতার পর গণপরিষদের অন্যতম বড় টাস্ক ছিল হিন্দু বিবাহ ও সম্পত্তি আইনের কোডিফিকেশন, একীকরণ ও সংস্কার । বি এন রাউ এর করা খসড়া-র রিভিশনের ভার পড়ে সিলেক্ট কমিটির হাতে, যার মাথায় ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী বাবাসাহেব আম্বেদকর । 

নতুন আইনের অন্যতম সূচীমুখ ছিল- স্বামী বা পিতার সম্পত্তিতে স্ত্রী ও কন্যার অধিকার, সেপারেটেড স্ত্রীর খোরপোষের অধিকার, বিবাহবিচ্ছেদ এর অধিকার,   সকল প্রকার ইন্টারকাস্ট বিবাহের অধিকার, সন্তান দত্তকের অধিকার, বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি । 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হয়তো মনে হবে, এগুলো খুবই মিনিমাম দাবী, এটা তো সাধারণ অধিকার, এ নিয়ে এত মাতামাতির কী হল ? কিন্তু আজ থেকে সত্তর বছর আগে ব্যাপারটা মোটেই সহজ হয়নি । ব্রাহ্মন্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজপতিরা মেয়েদের এইটুকু অধিকার দিতেও রাজী হচ্ছিল না । পেছনে যুক্তি কী ছিল ? সতীদাহ, বিধবাবিবাহ থেকে শুরু করে শবরীমালা অবধি এদের যে দাবী, হিন্দু কোড বিলের ক্ষেত্রেও তাই ছিল- "ট্র্যাডিশন" । যদিও বাবাসাহেব প্রথমেই এদের সঙ্গে অফেন্স এ যাননি, বরং প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র থেকে রেফারেন্স টেনে এনে দেখাতে চেয়েছিলেন যে শাস্ত্রে স্ত্রীকে পুরুষের দাসী বানানোর কথা বলা হয়নি । এইভাবে বাবাসাহেব আসলে রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের পথই ফলো করছিলেন, তবে তাতে করে ব্রাহ্মন্যবাদীদের টলানো যায়না, যায়নি । 

বিলের প্রথম বিরোধিতা আসে গণপরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান তথা পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের পক্ষ থেকে । যার যার ওনার সম্পর্কে খুব গ্রেট ফীলিং আছে, তাদের প্রণিধানের জন্য বলে রাখি- কংগ্রেসের যে লবি সুভাষ বসুকে দলছাড়া করিয়েছিলেন, বাবুজী ছিলেন সেই লবির সেনাপতি বিশেষ । হিন্দু কোড বিল নিয়ে তার বক্তব্য ছিলো, স্ত্রী অধিকার, সমানাধিকার এসব বিদেশী আইডিয়া, মুষ্টিমেয় কিছু লিবেরাল লোকজন এসব বিদেশী জিনিস ভারতের হিন্দুদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে । হায়, উনি সতীদাহ নিবারণের সময় থাকলেন না, থাকলে কী বলতেন শোনার ইচ্ছে ছিল । যাই হোক, শোনা যায় রাজেন্দ্রপ্রসাদ নেহরুকে এই নিয়ে একটি কড়া চিঠি লিখেছিলেন, সেটা পাঠানোর আগে কংগ্রেসে তার লবির অন্যতম সুহৃদ সর্দার প্যাটেলকে সেটা দেখিয়েছিলেন । প্যাটেলের মনে কী ছিল জানা নেই, তবে বাস্তববাদী পলিটিশিয়ান হিসেবে উনি প্রসাদকে বুদ্ধি দেন চেপে যেতে, কারণ গণপরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছিল, ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে কংগ্রেসের মেজরিটি দক্ষিণপন্থী লবির পছন্দ ছিলেন প্রসাদ, ওদিকে নেহরুর পছন্দ ছিলেন রাজাগোপালাচারী । এই চিঠি নেহরুর কাছে পৌঁছলে তিনি প্রসাদের নামে ভেটো দিয়ে দিতেন, এবং কংগ্রেস ভাঙ্গনের দিকে চলে যেতো । বন্ধুর সুপরামর্শে বাবুজী সরাসরি বিরোধিতার পথ থেকে সরে আসেন । এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ।

ঘরের চাড্ডীদের সামলে উঠতে পারলেও পিকচার এখনো অনেক বাকি ছিল । ধর্মশাস্ত্রে হাত পড়ছে, হিন্দু সংসারের বেসিক স্ট্রাকচার ভেঙ্গে দিতে চাইছে এই বিলেত ফেরত নেহরু আর আম্বেদকার, এইসব বক্তব্য দিয়ে গঠিত হল হিন্দু কোড বিল বিরোধী কমিটি । একে একে জুটলো ধর্মীয় গুরু,  পেটোয়া সাধু সন্ন্যাসী যারা নামে সন্ন্যাসী হলেও পুরোপুরি গার্হস্থ্য জীবনযাপন করেন । আজকের দিনেও এদের দেখতে পাবেন, আরএসএস আয়োজিত মঞ্চে এসে কখনো এরা রামমন্দির চায়, কখনো শবরীমালা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আর পিনারাই বিজয়নের মুন্ডপাত করে ।  দ্বারকার শঙ্করাচার্য্য এই বিলের বিরুদ্ধে ফতোয়া গোছের দিলেন । ১৯৪৯ এর ১১ই ডিসেম্বর, দিল্লীর রামলীলা ময়দানে আরএসএস হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে সমাবেশ করলো, সেখানে বলা হল নারীর সম্পত্তি ও ডিভোর্সের অধিকার আসলে হিন্দুধর্মের ওপর পরমাণু বোমার আঘাত । নারী অধিকার পেলে হিন্দু সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে । একজন  নেহরুর ফাঁসিও চেয়েছিল । এক বক্তা বলেছিল "আম্বেদকর অস্পৃশ্য সমাজের লোক, হিন্দু ধর্ম নিয়ে বিধান দেওয়ার কোনো অধিকারই ওনার নেই" । এর পঞ্চাশ বছর পর আরেক শঙ্করাচার্য্য একই কথা বলবেন, তারও পনেরো বছর পর এই ভন্ড সাধুসন্ন্যাসীরা প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আলো করে বসে থেকে সরকারের মনোভাবের আবরণ উন্মোচন করবেন, অবশ্য ততোদিনে আমরা সহ্য করতে শিখে গেছি, থাক সে কথা । 
কোড বিল বিরোধী বিক্ষোভের মাথা ছিলেন আরেক ভন্ড সাধু, স্বামী কর্পাত্রি মহারাজ । তিনি আরএসএস ও অন্যান্য সংগঠনের উদ্যোগে দেশজুড়ে উস্কানি দিয়ে বেড়ালেন । দাঙ্গা হাঙ্গামার হুমকি দিলেন । দেশ ভেঙ্গে টুকরো করার হুমকি দিলেন । রাষ্ট্রপতির চেয়ার নিশ্চিত হওয়ার পর মাঠে নেমে পড়লেন বাবুজীও, বললেন তিনি এই বিলে সই করবেন না । এই জায়গায় পিনারাই বিজয়ন থাকলে হয়তো আরএসএস-জনসঙ্ঘ নেতাদের স্ত্রীদের দিয়ে ডিভোর্স করিয়ে নিতেন, জ্যোতি বসু থাকলে দলের লোকজন দিয়ে এসব ভন্ড সাধুদের তুলিয়ে হিমালয়ে দিয়ে আসতেন, কিন্তু নেহরুর ততোটা জোর তখনও ছিল না । শশী থারুরের মতো ওনারও লিবেরাল জহরকোটের আড়ালে ভোটব্যাঙ্ক নির্ভর পলিটিশিয়ানের কম্পমান হৃদয় ছিল । উনিও আর ভোটের আগে এই নিয়ে এগোলেন না । অপমানিত, ভগ্নহৃদয় হয়ে বাবাসাহেব আম্বেদকর পদত্যাগ করলেন । 

তবে নেহরু আর যাই হোক, শশী থারুর নন । নির্বাচনী প্রচারে বারবার করে হিন্দু কোড বিলের কথা উনি তুলেছিলেন দেশজুড়ে । সমর্থন চেয়েছিলেন, যাতে প্রথম পার্লামেন্ট এ বিল পাশ করা যায় । তার বিরুদ্ধে এলাহাবাদ আসনে জনসঙ্ঘ-রামরাজ্য পরিষদ- হিন্দু মহাসভা যৌথ প্রার্থী করেছিল কোড বিল বিরোধী হাঙ্গামার অন্যতম নায়ক প্রভুদত্ত ব্রহ্মচারীকে । সেই আসনে নেহরু বিপুল ভোটে জয়ী হন । দ্বিতীয় হয়েছিলেন কৃষক মজদুর প্রজা পার্টির প্রার্থী বংশীলাল । ব্রহ্মচারী ফুটে যান । 

প্রথম লোকসভায় হিন্দু কোড বিল চার খন্ডে ভাগ হয়ে পাশ হয় ।

বুধবার, ২৩ জানুয়ারী, ২০১৯

কাবাব রুটি ও পাহাড়ি চটির গপ্প ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

- যাব্বাবা, এ তো গলা ছিপি হয়ে যাবে গিলতে, রুটি গুলো হিমঠান্ডা, আর কাবাবও তথৈবচ
- কি করি বলুন তো? এই মাঝরাত্তিরে আমি কোত্থেকে পোলাও কালিয়া পাই?
- পোলাও কালিয়া কে চেয়েছে হে? এট্টু জল পেলেও ... শুকনো রুটি তো গিলতে পাচ্চিনা এই মাঝরাতে ...
- জল দিয়ে রুটি গিলবেন? এই ঠান্ডা পাহাড়ি দেশে যেখানে সেখানে জল খাওয়া কি ঠিক আপনার? আপনি শহুরে মানুষ...
- সে তোমাকে ভাবতে হবে না। কত ঘাটের জল খেয়ে হজম করে দিলুম
- সে করেছেন, বেশ করেছেন। এখন এখানে ওই নোংরা কুঁজোর জল খেয়ে যদি আপনার পেট খারাপ হয়, কলেরা হয় , তাহলে জবাবদিহি কে ...
- বড্ড বকবক করো হে ছোকরা ... থাক , আমার আর খেয়ে কাজ নেই, শুয়ে পড়ো দিকি।
- আপনি কিছু না খেলে যে উঠতে পারবেন না। কাল যে অনেক রাস্তা হাঁটা বাকি
- ও আমি ঠিক ...
- পারবেন না। আরে আমি আপনার গাইড। পাহাড়ে গাইডের কথা শোনার তো একটা নিয়ম আছে, না কি? 
- বেশ, হুকুম কিজিয়ে উস্তাদ
- আপনাকে খেতেই হবে
- কিছুতেই ওই লেড়ো বিস্কুট মার্কা খড়খড়ে রুটি আর জুতোর শুকতলা মার্কা কাবাব আমি খাবো না। ভুখ জিন্দা রহে।
- আপনি ... আপনি ... কি জেদি লোক রে বাবা... মহা মুশকিলে পড়লাম... একে গায়ে জ্বর, তার ওপরে বলছে খাবে না...
- খুব মুশকিলে পড়েছ, তাই না ভকৎরাম? আমি লোকটাই এরকম। জেদি, একগুঁয়ে। মুশকিলে ফেলি সবাইকে। ব্রিটিশ সরকারও আমাকে মুর্তিমান শীরঃপিড়া মনে করে।
- সে আর বলতে বোসবাবু? তারা এখন গোটা ভারত তোলপাড় করে আপনাকে খূঁজছে, কিন্তু ভাবতেও পারছেনা, সুভাষ বোস খাইবার পাস পেরিয়ে আফগানিস্থানের একটা অজ গাঁয়ে সরাইখানায় এক গাদা নোংরা পোশাক পরা গরীব পাঠানের মধ্যে গায়ে জ্বর নিয়ে শুয়ে আছে, আর তিন দিন অভুক্ত থেকেও বাচ্চা ছেলের মত জেদ করে খেতে চাইছেন না।
- রোটি তোড়ো, তুম ভি খাও, হাম ভি খায়েগা ভকৎরাম তলোয়ার। আমি জানি তুমি কিচ্ছু খাওনি, আমাকে ডাহা ঝুট বলেছ। 
- কি করে ধরলেন বোসবাবু? 
- ওসব ছাড়ো ছোকরা। একবার বেরিয়ে দেখো তো হে, যদি সরাইয়ের পাশে চায়ের দোকানটা খোলা থাকে...
- চা পেলে খাবেন তো? 
- তুম ভি খাওগে, হাম ভি
- আভি আয়া বোসবাবু

** ভকৎরাম তলওয়ারের স্মৃতিকথা থেকে সংগ্রহ করা একটা ছোট্ট ঘটনা। চা পাওয়া গিয়েছিল এবং দুজনে চায়ে ডুবিয়ে সে রাতে রুটি ভাগ করে খেয়েছিলেন।

সোমবার, ২১ জানুয়ারী, ২০১৯

ডাক্তার ~ ডা: বিষাণ বসু

দেখুন, গাঁড়লের মতো তর্ক করবেন না। বেসিক ব্যাপারটা বুঝুন।

প্রবল হাওয়ায় কি মোমবাতি জ্বলে? জ্বালিয়ে রাখা যায়? জ্বালানো সম্ভব?

তার জন্যে অনুকূল পরিবেশ লাগে।

প্রতিকূল অবস্থায় মোমবাতি জ্বালানোর কথা ভাবে, ওই আপনার মতো, গাণ্ডু। আর, আপনি যদি ভাবেন, মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন না কেন বাকিরা, তাহলে তো আপনি একটা আস্ত…..নাঃ, থাক, লোকে আমাকেই খারাপ ভাববে।

অতএব, বাস্তবতাটা বুঝুন।

কুকুরশাবকের মৃত্যু হলে মোমবাতি জ্বালাতে সেলিব্রিটি জোটানো কঠিন নয়। কেননা, ওই যে বললাম, পরিবেশ অনুকূল।

কিন্তু, দার্জিলিং-এ ডাক্তারদিদির মাথায় আস্ত লোহার রড পড়লে…..ক্যালানের মতো কথা বলবেন না, প্লীজ…..ডাক্তার এবং সেই রিলেটেড যেকোনো ইস্যুতেই পরিবেশ যে প্রতিকূল,অ্যাদ্দিনে এটুকুও যদি না বোঝেন, তাহলে মেনটস ছাড়া আর কেউই আপনার দীমাগ কি বাত্তি জ্বালানোর দায়িত্ব নেবে না।

সুতরাং, ব্যাপারটা সিম্পল।

আরে বাবা, স্বয়ং পুলিশ লিখিত উত্তরে জানিয়ে দিয়েছেন, যে, ডাক্তারদের উপর আক্রমণের ঘটনার লিস্টি তাঁরা মেইনটেইন করেন না।

করবেনই বা কেন? আর কোনো কাজ নেই নাকি?!!

দার্জিলিং-এ ডাক্তারদিদির মাথায় রডের বাড়ি পড়লে মিডিয়ায়, প্রথম পাতায় সেই খবর নেই কেন, এমন প্রশ্নও অবান্তর। কেননা, সবাই জানে, কুকুর মানুষকে কামড়ালে খবর হয় না, মানুষ যদি কুকুরকে কামড়াতে যায়, খবর হয় সেইটাই।

কাজেই, ডাক্তার মার খেলে খবর হওয়ার প্রশ্নটাই বা আসছে কোত্থেকে!!

হ্যাঁ, খবর হবে তখনই, যদি সেই মার খেয়ে ডাক্তারেরা প্রতিবাদ করেন, পথে নামেন, কাজ বন্ধ করেন, মিছিল করেন। আরে বাবা, ডাক্তারদের এই হারামিপনার জন্যে মানুষের হয়রানির কথাটা তো তুলে ধরতে হবে!!

এর পরে, হাওয়া যে অনুকূল নয়, সেইটা বুঝতে কি হাওয়ামোরগ হতে হয় নাকি!! 

সেলিব্রিটিরা বিদ্বজ্জন কেন? আপনি তো আর বিদ্বজ্জন নন। তাঁরা বিদ্বজ্জন একারণেই, যে, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তি, ইন্দ্রিয় আপনার-আমার থেকে এগিয়ে। 

কাজেই, এই এগিয়ে বাংলা-য়, তাঁরাও এগিয়ে। 

তাঁরা আলোর পথযাত্রি।

মোমবাতি জ্বেলে তাঁরা আলো দেখান।

যে অপদার্থ ডাক্তারদিদি ঝলমলে কাঞ্চনজঙ্ঘা ছেড়ে নারীর জঙ্ঘার মাঝখান থেকে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর চেষ্টা করেন, এবং সেইটাও পেরে ওঠেন না, তাঁর তো আলোর অধিকারই নেই।

কাজেই, দুঃখিত ম্যাডাম, আপনার জন্যে মোমবাতি নেই। আপনার জন্যে কালো ব্যাজ, মুখে কালো কাপড়, শোকমিছিল - না, কিচ্ছুটি নেই।

ছেলেবেলায় সমাজবন্ধুদের লিস্টটি পড়েছিলেন তো? হ্যাঁ, সমাজের গু পরিষ্কারের দায়িত্ব থাকা আপনি, মানে ডাক্তাররা, সমাজবন্ধু, মানে সমাজের বন্ধু। কিন্তু, সমাজও আপনার বন্ধু হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি তো আপনাকে কেউ দেয় নি। মানে, আপনি বিরাট কোহলির ফ্যান যদি হন, তাহলেই কি আপনি আশা করবেন যে বিরাট-ও আপনার ফ্যান!!

মনে রাখবেন, আপনি, আপনি স্রেফ একটা দাস। ক্রীতদাস।

এই ট্যাক্সপেয়ারদের পয়সায় আপনি ডাক্তারি পড়েছেন।

হ্যাঁ, এই কথাটা আপনাকে মনে করিয়ে দেবেন সেই সব শুয়োরের বাচ্চারা, যাঁরা জীবনে ট্যাক্স দেন নি, দেন না। কিন্তু, আপনাকে চুপ থাকতে হবে, থাকতেই হবে।

কেননা, মনে রাখুন, এইট পাশ যে মন্ত্রী আপনার মাথার উপরে, তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন নিজের পয়সায়। যে বন্ধু ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন স্টেটসে বসে দেশ এবং দশের হাল নিয়ে ভয়ানক চিন্তিত, তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন নিজের পয়সায়। এমনকি, যে দিগগজ বিদেশে পাড়ি জমানোর পাথেয় হিসেবে একটি পিএইচডি করছেন, তাঁর সেই রিসার্চ গ্র‍্যাণ্টের পয়সার একটুও ট্যাক্সপেয়ার্স মানি নয়।

নেতার ওয়ার্ল্ডট্যুর, কিম্বা মাটি উৎসবের ফান্ড। আকাশছোঁয়া রামের স্ট্যাচ্যু বা ইমাম ভাতা।

মনে রাখবেন, উপরের একটিতেও ট্যাক্সপেয়ার্স মানি খরচ হয় না, যেমন করে খরচ হয়, কিছু অপোগন্ডকে ডাক্তারি পড়াতে।

আর, যেহেতু আপনি এতো খরচ করেছেন এইসব চুথিয়াদের পেছনে, তারা পছন্দমতো সার্ভিস দিতে না পারলেই, মানে নব্বই বছরের বৃদ্ধকে টাট্টুঘোড়ার মতো চাঙা করতে না পারলেই বা আগেভাগে চেক-আপে না আসা প্রসূতি জটিল অবস্থায় হাসপাতালে এসে জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সমস্যাহীন প্রসব না হলেই….আপনি ভাবেন…

শাল্লা….দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি!!!

আর, সাপ দেখলে আপনি কী করেন!!

তবে কি, একটু রয়েসয়ে। সাপের ব্যাপারে একটু সাবধান।

সাপ কিন্তু ডাক্তার নয়।  

দুমদাম লোহার রড নিয়ে চড়াও হবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। 

দেশে আইনকানুন আছে। মানেকাজি আছেন।

গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী মিডিয়া আছে।

সমাজসচেতন বিদ্বজ্জনেরা আছেন।

শনিবার, ১৯ জানুয়ারী, ২০১৯

সাবাস ~ অনামিকা

এখন থেকে কোথাও গেলে জানিয়ে যেও... কেমন!
ভিন পাড়াতে বন্ধুরা নেই... দাঁড়িয়ে আছে ডেমন।
এই বাংলার আলতো ছেলে, তুমি অরাজনীতি
এপাং-ওপাং ট্রামলাইনের সিনেমাটিক গীতি।
কড়ি কোমল প্রতিভাময়, জ্বলন্ত তরতাজা
ফুল রাইমএর মশাল তুমি, হাফ রাইমের রাজা।
কী অনায়াস অনভ্যস্ত ভাষার আঁকিবুঁকি 
সবাই লেখা নকল করি। ছন্দ থেকেও টুকি।

মধ্যবয়স পৌঁছে গেলে না খুঁজে ছলছুতো 
বঙ্গভাষী কলম আখের গুছিয়ে নেবেই দ্রুত।
এই রকমই নিয়ম যদি, কীসের তবে দেরি?
মঞ্চে ওঠো। কলমটাকে করতে থাকো ফেরি।
হাফ রাইমের ঈশ্বর হে, বেজায় মাথা চুলকে
সময় মতন করছ রিপু ঈশ্বরীয় ভুলকে।
সাবাস তোমায়, সার কথাটি ফেললে বুঝে আস্ত।
বাঁশ কিম্বা দূর্বা সবই দিনের শেষে ঘাস তো!

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারী, ২০১৯

মকর সংক্রান্তি ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

উত্তরায়ণ সংক্রান্তি  সমাগত, সে দিনে সকাল সকাল মকর স্নান করার জন্য মাতা যশোমতী বালক শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে সংক্রান্তির পূর্ব রাত্রে বলেছেন-
"আসিল যে পৌষ মাস শুনহ রাজন।
দ্বিদশ  নবম  দিন  দিল  দরশন ॥

সকালে স্নান শুনেই শ্রীকৃষ্ণের পেট গুড়গুড় শুরু হয়ে গেল, সেই ঠাণ্ডা জলে স্নান সে একমাত্র বহু কষ্টে সরস্বতী পুজোর দিন করে তাও যদি দেবী রুষ্ট হয়ে অঙ্কে ফেল করিয়ে দেন সেই ভয়ে, তাই কৃষ্ণ মাতা যশোমতীকে নানা অজুহাত দেওয়া শুরু করল। যশোমতী আবার এসব স্কুলে বহুদিন আগেই পড়াশুনো করেছেন, সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের শরীর ভাল নেই, সর্দি লেগেছে। গা ম্যাজম্যাজ করছে বিশেষ পাত্তা পেল না। যশোমতী বললেন হ্যাঁ রে এই যে সারা দুপুর টোটো করে ঘুরে বেড়াস, বাঁশি বাজাস, ২০-২০ খেলিস তখন তো তবিয়ৎ আচ্ছা থাকে, যশোমতী বহুদিন মথুরায় ছিলেন তাই কথায় মাঝে মধ্যে হিন্দি শব্দ ঢুকে পড়ে।

শ্রীকৃষ্ণ শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রস্তাব দিলেন গরম জলে স্নান করলে হবে না, শুনে যশোমতী যেন আকাশ থেকে পড়লেন, বললেন আরে এ স্নান গঙ্গাসাগরে করতে হবে, অনেক দূরের পথ, রাত থাকতে বেরতে হবে, শেলদা, ডায়মন্ড হারবার, নামখানা গঙ্গাসাগর। শ্রীকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা এ পথে কি তিব্বত ডোকালামও যাওয়া যায়? যশোমতী তখন কয়লার উনুনে রুটি ভাজছিলেন, বললেন সে আমি অত জানি না, দরকার হয় তো গুগুল ম্যাপ দেখে নে।

মোবাইল তখন চার্জে বসানো, শ্রীকৃষ্ণ দেখেন একগাদা মেসেজ, হোয়াটসএপে হ্যাপি মকর সংক্রান্তির ছবি, শুভেচ্ছা ভর্তি, একজন সাধু একগলা জলে দাড়িয়ে পুণ্যস্নান করছেন আর সূর্যপ্রনাম করছেন। শ্রীকৃষ্ণ মনে মনে ভাবলেন কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ।তবে আগে স্নান না আগে সূর্যপ্রণাম এ নিয়ে তিনি ভয়ানক দ্বন্দে পড়ে গেলেন। উপায়, উপায় একটাই বেনিমাধব শীলের হাফ পঞ্জিকা, কিন্তু কাজের সময় কি সে হাতের কাছে পাওয়া যাবে?

 

যশোমতী পিঠে বানাবেন, নারকেল, খেজুর গুড়, চালের গুড়ো সব বাজার থেকে শ্রীকৃষ্ণকে দিয়ে আনিয়েছেন, বালক শ্রীকৃষ্ণর আজ ভারি মজা, রুটি তরকারি খেতে খেতে পেটে চড়া পড়ে গেছে, খাওয়াদাওয়াতে খানিক ভ্যারাইটি না হলে হয়, ইদানিং আবার অনলাইনের এক ফ্যাসান হয়েছে, সেদিন ধৃতরাষ্ট্র জ্যাঠার বাড়ি অনলাইনে আনা পাটিসাপটা দিয়েছিল জেঠি সে যে কি অখাদ্য যে না খেয়েছে কি বুঝবে। ওদিকে দুর্যোধন কানের কাছে ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আমাদের হয়ে লড়াই করুন, সকাল বিকেল পাটিসাপটা পায়েস ফ্রি। শুনে কৃষ্ণ তো বলেই বসলেন তোরা খালি কখন অনলাইনে সেল লাগে সেই খোঁজ রাখ আর যত পুরনো এক্সপায়ার পিঠে , পায়েস খেয়ে দুহাত তুলে নাচ। আসিস সংক্রান্তির দিন, পেট ভরে পিঠে খেয়ে যাস।

শুনে গান্ধারী বললেন কি করি বল, এখন আর সেই নারকেল কোড়ানো, চাল গুড়ো করা, দুধ জাল দেওয়া, সরুচাকলি বানানো একহাতে পেরে উঠি না। তাই অগত্যা।

 

ওদিকে ভীষ্ম শরশয্যায়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দশম দিনে অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রথ থেকে মাটিতে পড়ে যান, তিনি জানতেন মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপগ্রস্ত হয়ে ইহলোকে মনুষ্য হিসাবে কৃতকর্ম ভোগের জন্য জন্ম নিয়েছিলেন। হিসেবমত তাঁকে দেবলোকে ফিরে যাবার কথা, কিন্তু প্রবলেম হল দক্ষিনায়নের সময় দেবলোকে রাত্রি, সবকিছু বন্ধ থাকে, অনেকটা সেই স্কয়ান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মত, সুতরাং অপেক্ষাই যখন করতে হবে তিনি মনস্থ করেছিলেন পৃথিবীতে থাকবার। অন্তত কিচু চেনা মানুষজন দেখা যাবে, দু একটা সুখ দুঃখের কথা বলা যাবে আর দেবলোকের বাইরে সেই অন্ধকারে অপেক্ষা করবার কোন অর্থ হয় না, না সেখানে মোবাইল সিগন্যাল আছে না আছে ঘণ্টাখানেক সুমন।

ভোর হয় হয়, পৌষ সংক্রান্তি, উত্তরায়ণের প্রারম্ভ। সেই সাগরে হাজায় মানুষের সাথে শ্রীকৃষ্ণ ডুব দিলেন, তিনি ভুলেই গেছেন এ বিশ্ব সংসারের তিনিই স্রষ্টা, বিধাতা, নিয়ন্তা।

পিতামহ ভীষ্ম সদ্য শরীর ত্যাগ করেছেন চলেছেন দেবলোকের পথে।
 
যশোমতী আজ উঠোনে সকাল সকাল আলপনা দেবে, পিঠে বানাবে আর সেই আতপ চাল, নারকোল, গুড়ের গন্ধে ভেসে যাবে বিশ্ব চরাচর।

শুভ মকর সংক্রান্তি।

বুধবার, ১৬ জানুয়ারী, ২০১৯

কুকুর ~ ড: রেজাউল করীম

এক চাষার ব্যাটা একবার জাঁক করে বলেছিলেন- হেলে ধরতে পারে না, কেউটে ধরতে গেছে। ঘটনাচক্রে, উপমাটা মনে হল এই জন্যে যে, মহাজোটের কাণ্ডারী তো রাজ্য সামলাতেই ল্যাজেগোবরে, দেশ সামলাবেন কি করে? "পঞ্চাশ টাকা বেশী দামের পশু খুনে" দুজন অল্পবয়সী মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের অপরাধ খাটো করে দেখতে চাই না, কিন্তু এর জন্য ও কি তারাই দায়ী নয়, যারা শাসন ক্ষমতায় আসীন? এই অবুঝ মেয়েগুলো কিভাবে বুঝবে মানুষের চেয়ে গরু আর কুকুরের জীবনের দাম বেশী? অসংবেদনশীলতা তারা শিখেছে রাজনীতির কারবারিদের কাছে, যারা নিত্যদিন নতুন নতুন অবিমৃষ্যকারিতার ইতিহাস তৈরী করছে। যেদিন সুজেত জর্ডন ধর্ষিতা হন, সেদিন একজন বলেছিলেন সাজানো ঘটনা। অসংবেদনশীলতা নয়? যেদিন কাটোয়াই একজন মহিলা স্টেশনে ধর্ষিতা হয়ে ছিলেন সেদিন সেই একই ব্যক্তি বলেছিলেন- সিপিএম। অসংবেদনশীলতা নয়? এর পর নানা ঘটনায় দেখা গেছে প্রতিদিন কত অসংবেদনশীলতার ইতিহাস তৈরী হচ্ছে "দুষ্টু ছেলেদের" হাতে, হাতে হাতে লাল বাতাসা নিয়ে অপেক্ষমান উন্নয়নের হাতে! তারা প্রতিদিন এই অসংবেদনশীল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, কি করে বুঝবে কুকুরছানা মরলে হাজতে যেতে হবে! এই তো কিছুদিন আগে একজন শিক্ষকের মৃতদেহ পাওয়া গেল, রেল লাইনের ধারে, নৃশংস ক্ষতচিহ্ন নিয়ে। কতজন গ্রেফতার হয়েছে? একজন পুলিশকে দিনদুপুরে খুন হতে হল। কতজন গ্রেফতার হয়েছে? উত্তরপ্রদেশে গরু খুনে গ্রেফতার হয় বলে যারা চিৎকারে আকাশ ভরিয়ে তোলেন তারা কুকুর খুনকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন, মানুষ খুনে কেন পায় না বিচার বলতে পারবেন? কাল একজন যুবক "নানা হাসপাতালে ঠোক্কর খেয়ে হাত হারিয়েছে"(আবাপ)। অসংবেদনশীলতা নয়? কে দায়ী? আপনি দায়ী। কারন ভোটে নির্বাচিত হয়ে ও বেড বাড়াননি, ডাক্তার বাড়াননি, পরিকাঠামো উন্নয়ন করেননি। তার কি কোন শাস্তি আছে? না নেই, ক্ষমতার চাবিকাঠি আপনার হাতে। বিচার করতে গেলে জজের ও হাত কাঁপে। আমাদের মত ছাপোষা মানুষদের জীবনের কোন দাম নেই। যে কোন সময় নেই হয়ে যেতে পারি। যেমন অম্বিকেশের হয়েছিল। যেমন প্রেসিডেন্সির সেই ছাত্রীটিকে দেগে দেওয়া হয়েছিল, যেমন সেদিন শালবনির ডাক্তারদের দেগে দেওয়া হয়েছে। কেউ সিপিএম কেউ মাওবাদী।
কাল একজন ডাক্তার মারা গেছে। একটি ছোট্ট শিশুর হার্ট সচল করতে গিয়ে নিজের হার্ট স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার আরো ১৯২ জন সাথী আক্রান্ত হয়েছে। প্রানে মেরে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, একজনকে তো সপরিবারে। কেউ গ্রেফতার হয়েছে? কেন প্রতুল মাহাতো গ্রেফতার হয় নি? কেন পুলক দত্ত গ্রেফতার হয়নি? অসংবেদনশীলতা শুধু নয়, বিচারব্যবস্থা কে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেওয়া। আইনকে ইচ্ছামত বাঁকানো। 
এই ইতিহাসের মহাভারত রচনা করা যায় কিন্তু  পাহাড় প্রমান নির্বুদ্ধিতা আর অসৌজন্য ও অসংবেদনশীলতার ইতিহাস লাগে না, বুঝ মন যে জানে সন্ধান। আসল কথা হল গনতন্ত্রের নব নব সংজ্ঞা উদ্ভাবন করে নিজের সব পাপ কার্পেটের তলায় ঢুকিয়ে ফেলা। তারপর সন্ন্যাসী সেজে বসা। দেশের শাসক হয়ে বসার আগে আগে "সর্বজন হিতায়, সর্বজন হিতায়" নীতি নিজের জন্য প্রয়োগ করুন। আগে প্রমান করুন, হেলে ধরতে পারেন, কেউটে দূর অস্ত।

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০১৯

কৃষক কেন দাম পায়না ~ অংশুমান মজুমদার

বিপ্লব সেনগুপ্ত বা দীপঙ্কর মুখার্জীর লেখায় বাজারের সমস্যা নিয়ে একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পটি ইংল্যান্ডের কয়লাখনি শ্রমিকের পরিবারে কথোপকথন। অনেকেই গল্পটা পড়েছেন, তবুও শীতের রাতে খনি শ্রমিকের পারিবারিক কথাবার্তায় আজকের চিত্রও ফুঁটে ওঠে।
শ্রমিকের ছেলে তার মা কে প্রশ্ন করে: বাড়িতে আজ ঘর গরম করার জন্য ফায়ার প্লেসে কয়লা দাওনি কেন?
মায়ের উত্তর: বাড়িতে কয়লা আর নেই।
ছেলের প্রশ্ন: তাহলে দোকান থেকে কয়লা কিনে আনো।

মায়ের উত্তর: কয়লা কিনতে তো টাকা লাগবে। কিন্তু আমাদের যে টাকা নেই।
ছেলের প্রশ্ন: টাকা নেই কেন?
মায়ের উত্তর: তোমার বাবাকে খনির মালিক বেতন দেননি এবং চাকরিটাই চলে গেছে। তাই আমাদের টাকা নেই।
ছেলের প্রশ্ন: বাবার চাকরি হারালো কেন?
মায়ের উত্তর : বাজারে কয়লার মজুদ বেশি হয়ে গেছে। সে জন্য খনির কাজ বন্ধ। ফলে তোমার বাবার চাকরি গেছে। চাকরি নেই, তাই হাতে টাকা নেই। টাকা নেই, তাই কয়লা কেনা যায়নি। বাজারে কয়লার পরিমাণ 'বেশি' হয়ে যাওয়ার কারণে আজ আমাদের ঘরে কয়লা 'নেই'।
গল্পটি পড়লে আজকে আনন্দবাজার পত্রিকার আট পাতায় প্রকাশিত '৫ পয়সা কেজি পেঁয়াজ, খাচ্ছে গরুতে' খবরের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।
খুচরো বাজারে পেঁয়াজের দাম আছে, অতি ফলনের খবর নেই, তবুও কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছে না!
বাজারে অবশ্য গরু আছে খবরেই প্রকাশ, আর আছে ফঁড়ে, যেটা খবরে নেই। তবে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের দাম সুনিশ্চিত করার প্রচেষ্টার মারাত্মক ঘাটতি যে আছে, সে কথা প্রকাশের প্রয়োজন হয় না।
দুর্দশার অন্য খবরও আছে। মহারাষ্ট্রের আখচাষীদের অল্প দামে তাঁদের কাছ থেকে আখ কিনে কারখানার মালিকরা চড়া দামে বিক্রি করে তার থেকে তৈরি হওয়া চিনি। মালিকপক্ষের কাছ থেকে বিক্রির সেই সামান্য টাকা তুলতেও কালঘাম ছুটে যায় কৃষকদের। বারবার অভিযোগ করেও কারখানার মালিকদের কাছথেকে বকেয়া না পেয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। শুক্রবার ক্ষুব্ধ চাষীরা ভাঙচুর চালায় সাতারার কৃষ্ণা চিনি কারখানায়।

মেল গ্যেজ বনাম পুরুষের মুগ্ধতা ~ উর্বা চৌধুরী

এই তো সেদিন গড়িয়াহাটের চারমাথা থেকে পার্কসার্কাসের সাতমাথায় যাব বলে অটোরিকশায় উঠেছি। পাশে যে মেয়েটি  বসেছিল, সে এক অপূর্ব সুন্দর মেয়ে। চোখ ফেরানো যায় না। তাও যদি বা আমার চোখ ফেরে, অটোচালকের চোখ তো মোটেই ফেরে না। ডানদিক-বামদিক যখন যে আয়না দিয়ে সম্ভব একজোড়া চোখ দেখে চলে। নিষ্পলক। মধ্যে মধ্যে মনে হচ্ছিল বলি, "ভাইয়া, সামনে দেখকে চালায়েঙ্গে!" কিন্তু বলতে আর পারি কই! অমন ব্যাকুল চাহনিকে কি আর ফিরত যেতে বলা যায়!

'মেল গ্যেজ' শব্দখানা ব্যবহার করতে হলে বড় নির্দয় লাগে নিজেকে। খুব বেশিদিন এ শব্দের অতিপ্রয়োগ চলছে তা নয়। ক'বছর হল। তাবলে পুরুষের চাহনি নিয়ে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করিনি তা তো নয়! খারাপ ভাবে তাকানো, বিশ্রীভাবে তাকানো, লোলুপ চোখ, কামুক চোখ এসব তো বলতামই। 

আবার মুগ্ধ চোখের কদরও যে করিনি তেমনটা নয়! চাঁদ দেখতে গিয়ে তোমায় দেখে ফেলা চোখের জন্য আহ্লাদও নেহাত কম থাকে না। 

তেমনটাই ছিল অটোচালকের চোখে। হিমসিম খাওয়া মুগ্ধতা! নাচার মুগ্ধতা! পনেরো মিনিটের পথে যতক্ষণ পারা যায় ততক্ষণ তাকিয়ে থাকার মতো মুগ্ধতা!

মুগ্ধতাই তো! একই সমাজে বাঁচব। একই পৃথিবীতে বাঁচব। একই সঙ্গে বাঁচব! স্বস্তিতে বাঁচব! আনন্দে বাঁচব! তৃপ্তিতে বাঁচব! মুগ্ধ হব না! সে মুগ্ধতা প্রেমের হোক বা বাৎসল্যের, যৌনতার হোক বা স্নেহের, উচাটনের হোক বা আরামের, শেষতক, মুগ্ধতাই তো! 

তবে কোনোদিন সেই মুগ্ধতা যদি ঘুচবে, তবে এমনভাবে ঘুচবে যে, দেখার মানুষটি বেঁচে থেকেও মৃতের মতো বীভৎস ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। ফ্যাটফ্যাটে হয়ে যাবে। সেদিন আর তার সে সৌভাগ্য থাকবে না, যে সৌভাগ্যে চাইলেই পলাশকে আগুন লাল রঙে দেখা যায়, শ্বেতকাঞ্চনের দিকে তাকালে আরাম পাওয়া যায়, স্থলপদ্মের হরেক রঙ খুঁজে পাওয়া যায়। 

সীলড্ বটল্। কীই বিস্ময়! আমার সহনাগরিক, আমাকে এমন একটি জড়বস্তুর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, যার না আছে বুকের ধুকপুকানি, না আছে স্পর্শের রকমফের, না আছে চাহনির কোনো বার্তা, না আছে দেহের ভাষা, না আছে দাবি, না আছে ইচ্ছা, না আছে কোনো আগ্রহ। যৌন আবেদন! আছে! তাও তো নাই! 

আমার সহনাগরিক আমার মর্যাদা এমন মাটিতে মেশান যে, মাথা কুটে মরলেও তিনি আমার কাছ থেকে কণামাত্র মানবিক ছোঁয়াটুকুও আর পান না। আমাকে তিনি আস্ত একখানা জড়বস্তু বানিয়ে ছেড়ে দেন। 

শিক্ষক আকাশ থেকে পড়েন না। আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ও নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক সংস্কৃতি থেকে কোনো সুইচ টিপে ভিন্ন হয়ে যায় না। 

টেলিভিশনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে তাদের অধ্যাপক কনক সরকার প্রসঙ্গে বলতে শুনলাম, "যাদবপুরের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে..."!

মন খারাপ লাগছিল ভেবে যে, বাচ্চা বাচ্চা কিছু ছেলেমেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে গর্বের সঙ্গে প্রতিবাদ করতে গিয়ে থমকে যাচ্ছে। মন খারাপ লাগছিল ভেবে যে, তারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরও যে একটি গড়পড়তা বাস্তব ছবি রয়েছে, তা হুট্ করে দেখতে পেয়ে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে। 

কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বাস্তবতার একটি বাস্তবতা এরকমই। 

সব প্রতিষ্ঠানেরই এমন এক একটি কান্না পেয়ে যাওয়ার মতো বাস্তবতা থাকে। সে বাস্তবতা সবটা নয়। তবে কিছুটা যেহেতু বটেই, তাই বারবার ফিরে যেতে হয় সেই অটোচালকটির কাছে, যাঁর মুগ্ধ চোখের ব্যাকুল চাহনিকে মোটেই ফিরত যেতে বলা যায় না। তিনি অন্তত জানেন, কামনার মানুষটির দিকে জড়ভ্রমে তাকাতে নাই। 

অধ্যাপক কনক সরকারের মতো বুরবকেরা নারীর মর্যাদাহানি করুন, ক্লেদে ডুবে থাকুন...তাই বলে ভাববেন না, নারীকে দেখার মতো মুগ্ধ পুরুষচোখের অভাব ঘটবে, ওটি আপনিই জুটে যাবে। নিত্যদিন!

বৃহস্পতিবার, ১০ জানুয়ারী, ২০১৯

উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ ~ শতাব্দী দাস

১) সংরক্ষণ-বিলে 'উচ্চবর্ণ সংরক্ষণ' কোথাও লেখা নেই।

২) অর্থনৈতিক অনগ্রসরদের সংরক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

৩) বলা হয়েছে, যারা এমনিতেই তপশিলী জাতি-উপজাতি-ওবিসি হওয়ায় সংরক্ষণ  পাচ্ছেন, তাঁরা এই সংরক্ষণ আর পাবেন না । এই ক্লজকেই 'উচ্চবর্ণের সংরক্ষণ' বলে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এক মানুষকে দুরকম সংরক্ষণ দেওয়ার থেকে নতুন অভাবী মানুষকে সংরক্ষণের আওতায় আনা খুব মন্দ কিছু কি?  অর্থনৈতিক অনগ্রসরদের সংরক্ষণ খারাপ কিছু নয় মনে হয়৷ মণ্ডল কমিশনেও এমন সুপারিশ ছিল।

৪) কত আয় হলে অর্থনৈতিক অনগ্রসর বলা হবে, তা এখনও স্থির হয়নি৷ বিজেপি প্রচার করছে- বার্ষিক আট লাখ। কিন্তু তা বিলে এখনও নেই৷

^ এই জায়গাটি নিয়ে,  আবার বলছি, ঠিক এই জায়গাটি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলতে পারে৷ সর্বাধিক কত আয় হলে এই বিলের আওতায় আসা যাবে, তা ধার্য করার বিষয় নিয়ে সব পার্টি ভাবুক৷ বিরোধীরা আন্দোলন করুক এই জায়গাটি নিয়ে৷ আমাদের দেশের নিরিখে বার্ষিক আট লক্ষ টাকা আয়ের মানুষকে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া বলা যায় না৷ এই দশ পার্সেন্টের মধ্যে যেন অযাচিত সুবিধালোভীদের ভিড় না বাড়ে, তা লক্ষ্য রাখার জন্য আন্দোলন হোক।

৫) এই মুহূর্তে এটি একটি সম্ভাবনাময় বিল, যাকে ভাল বা খারাপ উভয় কাজেই লাগানো যেতে পারে। কেউ 'উচ্চবর্ণ সংরক্ষণ বিল' পাশ করায়নি। কিন্তু বিজেপি উক্ত বিলটিকে কার্যক্ষেত্রে 'উচ্চবর্ণ সংরক্ষণ বিল' করে তোলার আগে রুখে দিন।

৬) বিজেপি 'উচ্চবর্ণ সংরক্ষণ বিল' হিসেবে এটিকে প্রচার করছে। তারা মূর্খ বলে নয়, তারা উচ্চবর্ণের ভোট হারিয়েছে, সেই ভোট আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে ফিরে পেতে চায় বলে। খুবই ধূর্ততার পরিচয়৷ কিন্তু বিষয় নিয়ে যথেষ্ট হোমওয়ার্ক ছাড়া এই ধূর্ততা আসেনা। এই হোমওয়ার্ক থাকলে, তথাকথিত বামপন্থীদের বিরোধিতাও সঠিক দিশায় ধাবিত হবে, আশা করা যায়। আপাতত যা চলছে, তা বালখিল্যতা।


রবিবার, ৬ জানুয়ারী, ২০১৯

ডাক্তার ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ~ ডা: রেজাউল করীম

আবার একজন ডাক্তারকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। যে পুলিশ রাজনৈতিক নেতার খুন, রাহাজানি, লুটতরাজ, ধর্ষনের এফ আই এর নেয় না, তদন্ত না করে এফ আই আর নেওয়া যাবে না এই যুক্তিতে, তাদের গ্রেফতার করা তো দূর অস্ত, সেই পুলিশ পলকে ডাক্তারদের হাজতে প্রেরণ দেয় কোন প্রমান ছাড়াই। এই রাজ্যের গনতন্ত্রের এই হাল। যারা শিক্ষিত ও মানী লোক তারারাজনৈতিক চাটুকার না হলে তাদের কপালে হাজতবাসের সম্ভাবনা প্রভূত। 
নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে চাটুকার বাজারী আনন্দ আর অন্যসব কৃপা-ভিক্ষুক মিডিয়া রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ইমেজ বিল্ডিং শুরু করেছে। এদের দৃষ্টিতে কোন কোন নেতানেত্রী একাধারে কবি, গীতিকার, শিল্পী, দার্শনিক আরো কত কি? কিন্তু যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই, প্রীতি নেই, যারা নিজের চোখে দেখতে পান না, নিজের কানে শুনতে পান না, তাদের সকল কথাই অনৃতভাষন তাঁরা কি করে মহাপুরুষ পদবাচ্য হয়ে ওঠে স্বয়ং ভগবান ই বলতে পারেন। 
আজকের আনন্দবাজার দেখুন। সরকারের হাতে আছে ১৪২০০০ শয্যা। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা কম করে ১০ কোটি। তাহলে মাথাপিছু কটি শয্যা হয়। আনন্দবাজার অঙ্ক কষে বার করেছে প্রতি ১১৯২ জন প্রতি ১টি শয্যা। কোন স্কুলে এরা লেখাপড়া করেছে ভগবান জানেন। কিন্তু, হাতে যখন কলম আছে তখন যত্রতত্র ছিটিয়ে নিজের বিদ্যাবুদ্ধি জাহির করবে তাতে আর আশ্চর্য কি? বিশেষতঃ বাংলার সবচেয়ে বড় বুদ্ধিজীবী যখন দোসর তখন মিথ্যার ফানুসের যে কোন পরিসীমা থাকবে না, তাতে আর সন্দেহ কি? 
সারা রাজ্যের মানুষের কাছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার গুরুতর ত্রুটি তুলে ধরার দায়িত্ব তাই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিতে হবে। এ কোন রাজনৈতিক ভাষ্যের বিষয় নয়, আমাদের ভবিষ্যতের ভালমন্দ এর সাথে জড়িত। এই রাজ্যে সবচেয়ে বেশি নাবালিকা বিবাহ হয়। জনস্বাস্থ্যের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এই রাজ্য পিছিয়ে আছে। বেসরকারি ক্ষেত্রকে অন্যায় ব্যবসা করার অধিকার দেওয়া হয়েছে, জনগনের সম্পত্তি সরকারী হাসপাতাল বিনা পয়সায় বেসরকারি পুঁজিপতিকে উপহার দেওয়া হয়েছে, এর কোনটিই গ্রহণযোগ্য নয়।

চিকিৎসকদের মানসম্মান এই সরকারের আমলে ধুলোয় লুটিয়ে গেছে। মারধর, গ্রেফতার, হুমকি আর তোলাবাজি কোন কিছুই বাকি নেই। সরকার যে প্রতিশ্রুতি গতবছর দিয়েছিলেন তার কোনটি ই পালন করেন নি। এই অবস্থায় চিকিৎসকদের দাবী আদায়ের জন্য করণীয় কাজ করতে হবে। 
সব চিকিৎসক বন্ধু ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বুঝতে হবে যে আমাদের পেশাগত স্বাধীনতা ও নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার এই আন্দোলন সফল না হলে ভবিষ্যত প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না।

শনিবার, ৫ জানুয়ারী, ২০১৯

বামপন্থীদের কথা বিশ্বাস করবেন না ~ সুশোভন পাত্র

বামপন্থীদের কথা বিশ্বাস করবেন না। বিশ্বাস করতে হলে আনন্দবাজার কে করবেন, চোস্ত ইংলিশে স্টুডিও কাঁপানো অর্ণব গোস্বামীদের করবেন, বিকাশের চৌকিদার কে করবেন, সততার পিসি কে করবেন, গেরুয়া কামিজে নিমেষে ঠ্যাং মাথায় তুলে দেওয়া 'বাবা' কে করবেন, তিন হাত লম্বা দাড়িওয়ালা ভাষণবাজ 'মৌলবি' কে করবেন। কিন্তু এক গলা গঙ্গা জলে ডুবে বললেও খবরদার, বামপন্থীদের কথা একদম বিশ্বাস করবেন না।

২৮ বছর আগে,আর্থিক সংস্কারে বায়নায় দেশের 'হটডগ' বাজার পৃথিবীর জন্য মুক্ত করে দিয়ে, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী মনমোহন সিং পার্লামেন্টে বলেছিলেন "এই সংস্কার আর্থিক সমতা ও সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত করবে। পাঁচ বছর পর দেশে আর কেউ গরীব থাকবে না।" মুক্তবাজার অর্থনীতির ইনফ্যাচুয়েশেনের লুস-মোশেনে ভেসে গিয়েছিল মগধ থেকে পাটলিপুত্র, ছাতনা থেকে ছিন্নমস্তা। রাম-শ্যাম-যদু-মধু সমস্ত রাজনৈতিক দল কোরাস গেয়ে বলেছিল, "বাহ! ওস্তাদ বাহ!।" একমাত্র ঐ হাতে গোনা বামপন্থীরাই সেদিন বিরোধিতা করে বলেছিল, এই নীতি অচিরেই দেশজুড়ে আর্থিক বৈষম্য আরও প্রশস্ত করবে। ধনীরা আরও ধনী হবে। গরীবরা আরও গরীব। 

২৮ বছর পর, অক্সফামের রিপোর্ট বলছে, একদিকে দেশের ১% মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৭৩% কুক্ষিগত। আর অন্যদিকে বিশ্বের ১/৪ ক্ষুধার্তের ঠিকানা আজ ভারতবর্ষ। একদিকে শেষ যে ২৮ বছরে ভারতবর্ষে বিলিয়নারির সংখ্যা ১ থেকে ১৩২ হয়েছে, সেই ২৮ বছরেই ১০০টাকা উৎপাদন মূল্যে শ্রমিক'দের প্রাপ্য মজুরি কমে ৯.৯ টাকায় ঠেকেছে। কি ভুলই না বলেছিলে সেদিন বামপন্থীরা! তথ্যই বলে দিচ্ছে, বামপন্থীদের মুখে ছাই দিয়ে, গত ২৮ বছরে দেশে কেমন 'আর্থিক সমতা ও সামাজিক ন্যায়' প্রতিষ্ঠা হয়েছে। গরীব খুঁজতে তো আজকাল গ্যালিলিওর দূরবীনও ভাড়া করে মিউজিয়ামে যেতে হচ্ছে। ঐ যে বললাম বামপন্থীদের কথা একদম বিশ্বাস করবেন না। 

রঙ্গরাজন এবং কিরীট পারিখ কমিটির সুপারিশে, সরকার তখন পেট্রোল-ডিজেলের দাম বিনিয়ন্ত্রণ করছে। কেতাদুরস্ত অর্থনীতিবিদরা বললেন, ভর্তুকির গলদঘর্ম ত্যাগ করলে, ৮০% তেল আমদানি করা ভারতে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের মূল্য কমলেই তার সরাসরি সুবিধা পাবেন আম জনতা। কংগ্রেস বলল 'বহুত আচ্ছা'। বিজেপি বলল 'মাশা আল্লাহ'। আর আম্বানিরা-আদানিরা বলল, 'জিও পাগলা'। একমাত্র ঐ হাতে গোনা বামপন্থীরাই সেদিন বিরোধিতা করে বলেছিল, বিনিয়ন্ত্রণ আসলে খুড়োর কল। অপরিশোধিত তেলের মূল্য বাড়লে তার দায় সাধারণ মানুষের ঘাড়েই চাপানো হবে। আর কমলে, তেল উত্তোলনকারী মুষ্টিমেয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী মুনাফা ভোগ করবে। 

২০০৪-এ পেট্রোল-ডিজেলের দাম ছিল ৩৬.৪৯টাকা, ২৪.৩৫ টাকা। আর এখন? তাহলেই ভাবুন, কি ভুলই না বলেছিলে সেদিন বামপন্থীরা! বিনিয়ন্ত্রণের পর অপরিশোধিত তেলের মূল্য কমলে, সরাসরি সুবিধা আপনি পাচ্ছেন তো? গত চার বছরে ডিজেলে এবং পেট্রোলের বর্ধিত 'এক্সাইস ডিউটি' আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন হয়ে আপনার বারান্দায় টপকে পড়েছে তো? বেশ সস্তায় আপনার রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার ঘরে ডেলিভারি হচ্ছে না? আর মুনাফার অভাবে, অনটনে নুন আনতে পান্তা ফুরানো সংসারে মাত্র ১০০ মিলিয়ন ডলার খরচা করে কোন ক্রমে মেয়ের বিয়ে দিতে আম্বানিরা বাধ্য হচ্ছে না? ঐ যে বললাম বামপন্থীদের কথা একদম বিশ্বাস করবেন না। 

জঙ্গলমহল তখন ভিজে যাচ্ছে রক্তে। সালকু'র লাশটা যখন পাওয়া গেলো শরীরের চামড়া তখন পচে গলে যাচ্ছে। পোকাতে কুরে খাচ্ছে সারা দেহ, চারিদিকে দুর্গন্ধ। অথচ মাওবাদী'দের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, মৃতদেহ সৎকারে সাহস করছে না ধরমপুর গ্রামের কেউ! শীতের রাতে, দুবরাজপুর গ্রামে, বাদল আহির কে মাওবাদীরা খুন করল গোটা শরীরে গুণে গুণে পেরেক পুঁতে। 

বুদ্ধিজীবীরা অবশ্য তখন সানগ্লাস। বুদ্ধিজীবীরা তখন লালগড়। বিসেলারির বোতলে তখন 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' তুফানি চুমুক। এ যুগের পাবলো পিকাসোর ছবি তখন বিক্রি হচ্ছে ১.৮৬ কোটি টাকায়। হবু মুখ্যমন্ত্রীর 'সঙ্গে সুমন' হেলিকপ্টারে চেপে তখন কুচবিহার থেকে কাকদ্বীপ। বামপন্থীরা বলেছিল, দিনে যারা তৃণমূল, তাঁরাই রাতে মাওবাদী। বামপন্থীরা বলেছিল, এতো টাকার উৎস কি? ডেলোর বাংলো তে গভীর রাতের কেলোর মিটিং'র রহস্য কি?  চ্যানেলে টেনের সীমাহীন স্তাবকতার রেসিপি কি?  সো হোয়াট, জঙ্গলমহলের বেতাজ বাদশা অবশ্য তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মধ্যেই 'প্রকৃত কমিউনিস্ট' দেখতে পেলেন।

তারপর একদিন সেই 'প্রকৃত কমিউনিস্ট'ই মুখ্যমন্ত্রী হলেন। দফায় দফায় সেজেগুজে, পাউডার মেখে বিপ্লবী 'মাওবাদীরা' মহাকরণের অলিন্দে পৌঁছে গেলেন। কেউ আত্মসমর্পণের প্যাকেজ পেলেন। কেউ সরকারী চাকরী পেলেন। সুচিত্রা মাহাতো তৃণমূল নেতা প্রবীর গড়াই কে বিয়ে করলেন। পয়সা হল, গাড়ি হল, বাড়ি হল। পরের বৈশাখে, সুদীপ্ত সেনও গ্রেপ্তার হল। তৃণমূলের মন্ত্রী-সাংসদরা আর্থিক তছরুপের দায়ে জেলের ঘানি টানল। মুকুল রায়ও বিজেপি যোগ দিয়ে ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে গেলো। সবই হল, শুধু 'প্রকৃত কমিউনিস্ট'র রাজত্বেই কিষানজি কে এনকাউন্টারে মরতে হল। আর আমানতদারীদের টাকাটা আজও বিশ বাঁও জলেই ডুবে রইলো।   

কি ভুলই না বলে বামপন্থীরা! তাই না? তাই অতীত থেকে শিক্ষা নিন। রাজনৈতিক সমীকরণের সংকীর্ণ স্বার্থেই সারদা-নারদা তদন্তে সিবিআই তৎপর হচ্ছে না কিম্বা সিবিআই'র জুজুতেই মুখ্যমন্ত্রী আজ রাফালে নিয়ে সাত চড়েও রা কাটছে না; রামনবমী আর হনুমান জয়ন্তীর নামে রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের তাস সাজাচ্ছে বিজেপি, কিম্বা ফেডারেল ফ্রন্টের নামে বিজেপি বিরোধী ঐক্য কে ভাঙতে চাইছে তৃণমূল, মানুষের জীবন জীবিকার সমস্যা থেকেই দৃষ্টি ঘোরাতে রামমন্দিরের হিড়িক তুলছে বিজেপি, কিম্বা  বিজেপি সরকারের জনবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ধর্মঘট কে রুখতেই 'কর্মসংস্কৃতির' ন্যাকামি করছে তৃণমূল -এক গলা গঙ্গা জলে ডুবে বললেও খবরদার, বামপন্থীদের এসব কথা বিশ্বাস করবেন না একদম। 

আর গঙ্গা জলে ডুবে বললেই বিশ্বাস করবেনই বা কেন বলুন তো? গঙ্গার জল কি আদেও পবিত্র নাকি? 'নমামি গঙ্গার' ঢপ বাজিতে গঙ্গার জল আদেও পরিষ্কার নাকি? দূষণ মুক্ত হয়েছে নাকি? আবার শুনছি, ঐ গঙ্গার জলে তর্পণ করেই, চৌকিদাররা রাফালে চুক্তি তে চুরি করেছে নাকি?

মঙ্গলবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০১৮

নিরুপম সেন ~ অর্ক রাজপন্ডিত

আজ বছর দশ পর....

দশ বছর আগের ক্রিসমাস ইভ। ২০০৮ সালের ২৪শে ডিসেম্বর। তখন আজকের মত পার্ক স্ট্রিটে 'বড়দিনের কার্নিভাল' ছিল না। তবে উৎসব ছিল বই কি! কলকাতা শহর, শহরতলি, মফস্বল থেকে তখনও মানুষ আসতেন বড়দিনে কলকাতায়।

চিড়িয়াখানা, জাদুঘর, নিকো পার্কে তখনও বড়দিনের আগের দিন থেকেই ছিল বেলুনের জন্য শৈশবের বায়না। তখনও ছিল আইসক্রিমের জন্য কৈশোরের নাছোড়বান্দা আবদার। দশ বছর আগে বড়দিনের আগের দিন তখনও ছিল পার্ক স্ট্রিটে ভিড়।

যাই হোক, ২০০৮ সালের ২৪শে ডিসেম্বর। দশ বছর আগের ঠিক এই দিন ছিল বুধবার। আলো ঝলমলে বড়দিনের আগের দিন আলো ঝলমল ছিল মিলনমেলা আর উল্টোদিকের সায়েন্স সিটিতে।

দশ বছর আগে, ২০০৮ সালের ২৪শে ডিসেম্বর। সায়েন্স সিটিতে সেদিনের সন্ধ্যায় শুরু হয়েছিল 'ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেগা ট্রেড ফেয়ার'। দশ বছর আগে ঠিক এই দিনে শিল্পমেলার উদ্বোধন করেছিলেন নিরুপম সেন।

২০০৮ সালে মানে মহামন্দার শুরু। ঝাঁপ পড়েছে লেম্যান ব্রাদার্সে। ঝাঁপ পড়েছে মেরিল লিঞ্চে। নাসড্যাক থেকে সেনসেক্স দুনিয়ার সব শেয়ার বাজারে লালবাতি।

আজ থেকে ঠিক দশ বছর আগে ২০০৮ সালের ২৪শে ডিসেম্বর 'ইন্ডিয়া ইন্ডাস্ট্রিয়াল মেগা ট্রেড ফেয়ার' উদ্বোধন করে নিরুপম সেন বলেছিলেন 'দুনিয়া জোড়া মন্দার আঁচ পড়েনি পশ্চিম বাংলায়। এখনও পর্যন্ত রাজ্যের একটিও নির্মীয়মান শিল্পে প্রভাব পড়েনি।'

মোট ৩০০টি শিল্প সংস্থা যোগ দিয়েছিল সেই মেলায়।

সেই সময়। কদিন আগেই সিঙ্গুর থেকে চলে গেছে মোটর গাড়ির প্রকল্প।

..................................

দশ বছর পর আজকের ক্রিসমাস ইভ। আজ পার্ক স্ট্রিটে 'কার্নিভাল' আছে চার দিন আগে থেকেই।

ঠিক দশ বছর পর ২০১৮ সালের ২৪শে ডিসেম্বরের সন্ধ্যা। 'পিস ওয়ার্ল্ড'-র বরফে ঢাকা কফিনে ঘুমিয়ে আছেন নিরুপম সেন।

ভোর ৫টা দশ মিনিট। প্রয়াত হয়েছেন নিরুপম সেন।

এছাড়াও আজকের সন্ধ্যায় আরেকটা বড় খবর। রথযাত্রা নিয়ে বিজেপি-র চটজলদি শুনানির আবেদন বাতিল হয়েছে সুপ্রিম কোর্টে!

দশ বছর আগের ২৪শে ডিসেম্বর। বাধা স্বত্তেও কর্মসংস্থানের স্বার্থে শিল্পে এগোনো। দশ বছর পর আজকের ২৪শে ডিসেম্বর। কাজ নয়, শিল্প নয়। বিতর্ক রথের পথ নিয়ে!

..............................

আজ থেকে ঠিক দশ বছরেরও বেশি আরেকটু সময়। সিঙ্গুরে মোটরগাড়ির কারখানা তখনও জিন্দা ছিল। রোজ সন্ধ্যায় প্রকল্প থেকে মনের আনন্দে বাড়ি ফিরতেন মৃণাল কান্তি খাঁড়া। তাঁর ঠাকুমা প্রয়াতা মঙ্গলা খাঁড়া ছিলেন প্রকল্পে প্রথম জমি দাতা। প্রয়াতা মঙ্গলা খাঁড়ার নাতি মৃণালকান্তি খাঁড়া। সিঙ্গুর প্রকল্পের প্রথম জমিদাতা হিসাবে এখনও তাঁদের পরিবারের গর্ববোধ রয়েছে। সিঙ্গুর প্রকল্পে চার বিঘা জমি দিয়েছিলেন তাঁদের পরিবার।

'সেদিনটা এখনও ভুলতে পারি না, ২০০৬ সালের ২৫শে সেপ্টেম্বর। আমিই ঠাকুমাকে বাইক চাপিয়ে নিয়ে গিয়েছিলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে হল। বাইরের গেটে ভিড় বাড়ছে। বিডিও অপিস ঘিরে রেখেছে তৃণমূল। মমতা এলেন, আরও ঝামেলা বাঁধলো। বুড়ি ঠাকুমাকে নিয়ে কিভাবে বাড়ি যাব ভেবে পাচ্ছিলাম না, বাইরে ঝামেলা হচ্ছে, কোন মতে ডি এম সাহেব একটা গাড়ির ব্যবস্থা করে ঠাকুমাকে বাড়ি পাঠিয়েছিলেন, সেদিন থেকে জমি দেওয়ার কারণে আমরা ছিলাম তৃণমূলের টার্গেট', বলেছেন মৃণালকান্তি।

এমন একটা দিন যায়নি যেদিন খাঁড়া পরিবারকে হুমকি দেওয়া হয়নি। মোটরগাড়ির কারখানা উঠে যাওয়ার আগের দিন পর্যন্ত ওঁদের বাড়িতে ঢিল পড়েছে, দরজা জানলা ভাংচুর হয়েছে। 'রোজ লুকিয়ে বাড়ি ফিরতাম, এই বুঝি কেউ মেরে দেয়, সব সময়ে থাকতাম ভয়ে ভয়ে', বলেছেন মৃণালকান্তি।

উচ্চ মাধ্যমিক পাশ মৃণাল কান্তি খাঁড়া কারখানায় চাকরির জন্য ট্রেনিং নিয়েছিলেন। রামকৃষ্ণ মিশন বেলুড়ের পর গিয়েছিলেন পুনায়, উত্তরাখন্ডে টাটা মোটরস্‌ কারখানায় হাতে কলমে কাজ শিখতে। টাটা মোটরস্‌-র অফার লেটার, টাটা ভোল্টাস কোম্পানির সার্টিফিকেট সব এখনও সযত্নে রেখে দিয়েছেন মৃণালকান্তি।

দশ বছর পার করে মৃণাল কান্তি আজকের রাতে ভাঙা মন নিয়ে বাড়ি ফেরেন, যেমন ফেরেন গত দশ বছর ধরেই।

এখন মৃণালকান্তি সিঙ্গুরের বাজেমেলিয়া মোড়ে দোকান দিয়েছেন। কালিমাতা রিপেয়ারিং শপ। স্টোভ আর গ্যাসের ওভেন সারান।

............................................

৮এবং ৯ই জানুয়ারির ধর্মঘটের বড় দাবি এরাজ্যে বন্ধ কারখানা খোলা। ধর্মঘটের বড় দাবি কর্মসংস্থান।

৮এবং৯ই জানুয়ারি অচল হবে দেশ। অচল করতে হবে বাংলা।

ধর্মঘটে জবাব দিতে হবে আজকের শাসককে। আসুন প্রস্তুতি নিই। আর নয়। আর নয় আমাদের অনুজ,সন্তান সন্ততিদের ভবিষ্যৎ এই নরখাদকদের হাতে ছেড়ে দেওয়া।

৮এবং ৯ই জানুয়ারির ধর্মঘট সফল করেই আসুন আমরা সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা জানাই কমরেড নিরুপম সেনকে।

কমরেড নিরুপম সেন লাল সেলাম। কমরেড নিরুপম সেন অমর রহে।

পুনশ্চ: সঙ্গে রইলো দশ বছর আগের ও দশ বছর পরের ঘটনাগুলির ছবি।

সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০১৮

কেবলই স্বপন, করেছি বপন ~ অনামিকা

কেন আজ সিপিএম নেই ক্ষমতায়?
বিপ্লবীদের সে'টা দারুণ ভাবায়।
'অতি' বলে 'প্রতি' তোর মাথা অতি মোটা
বুঝিস না কিছুতেই সোজা অঙ্কটা।
অমুক সে বইটার তমুক পাতায়
লেখা আছে কী আগুন কত খাওয়া যায়।

প্রতি বলে, দাঁড়া আগে বেচে নিই ছবি।
সুবোধ্য হেসে ওঠে নেট বিপ্লবী।
নিও কম্যুনিজমের সোজা অঙ্কটি। 
ঢুকে যায় ফোকটিয়া প্রায় দুই কোটি।
গুরুতর চণ্ডাল আঁচ পেয়ে ঢিমে
আত্মপ্রসাদে মন ঢেলে দেয় মিমএ।

ফেসবুক বিপ্লবী বলে সাদা চুল
কমিউনে আজও কেন? এইটেই ভুল।
আলোকিত করেছে যে রাজ্য কমিটি
সপুত্র চেটে নিল নিজের বমিটি।
মহা বিপ্লবী হুঁ হুঁ... চাষার ব্যাটা সে
গলায় গামছা দিয়ে ক্ষমতার পাশে।

দু' বগলে ডিও যার। সেন্ট পারসেন্ট
ঘন বিপ্লবী হাঁকে চাই মুভমেন্ট
যে কৃষক হাঁটে, যার পা গিয়েছে ফেটে,
নেই বটে সে মিছিলে, এই মার্কেটে
মানসিক ভাবে আছি। ক'জনে তা' থাকে?
টিভিতে তরজা শুনি। চেনো তো আমাকে!

গরু বিপ্লবী বলে খেলবই জুয়া।
ত্রিপুরায় 'বিপ্লব'... এনেছে গেরুয়া।
ইভিএমে ডুবে মরে পাতি বিপ্লবী।
এত কথা শোনে, তবু ভুলছে না ভবি।
সে এত বোঝে না কিছু। হতাশা ও প্রেম
তার সব কিছু আজও বোকা সিপিএম।

শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৮

রাফাল ও মোদী সরকার ~ অবিন দত্তগুপ্ত

আমি আইন কানুন বিশেষ বুঝি না । কালকে একটা রুলিং দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট । তাতে বলেছে রাফায়েল বিমান কেনার ক্ষেত্রে কোন গড়মিলের হদিস তারা পায়নি । এই শুনে ব্রেনলেস্‌ বিজেপি সমর্থকরা যারপরনাই উল্লসিত । তা হতেই পারেন ,আসুন সকলেই একটু ভালো করে বুঝে নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করি ।

১। রায় দেওয়ার বেসিস্‌ হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট যে ডকুমেন্টের কথা বলেছে সেটা হলো সি এ জি রিপোর্ট বা Comptroller and General Audit Report . এই রিপোর্টে নাকি সরকার প্লেনের দাম সম্পর্কিত সমস্ত ডিটেল দিয়েছে । এবং এই ডিটেল নাকি শেয়ার করা হয়েছে Public Accounts Committe বা PAC-এর সাথে । উল্লেখ্য PAC একটি পার্লামেন্টারি কমিটি ।

২। এই রায়ের পর গতকাল-ই PAC-এর চেয়ারম্যান একটি প্রেস কনফারেন্স করেন এবং জানান সি এ জি কোন রিপোর্ট তাদের জমা দেন নি । শুধু তাই নয় , তিনি এটাও জানান যে সি এ জি-র কাছেও এই রিপোর্ট নেই বলে সি এ জি-র ডেপুটি কমিশনার তাকে মিটিং-এ জানিয়েছেন ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে ,যে রিপোর্টটা বাস্তবে কোথাও নেই ,তার উপর ভিত্তি করে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিল কেন ? অথবা সুপ্রিম কোর্ট তাহলে কি রিপোর্ট দেখে রায় দিল । রিপোর্ট তো সুপ্রিম কোর্টকে পেশ করেছে কেন্দ্র সরকার , তারা তবে কোথাকার PAC-র রিপোর্টের কথা বলছে ? কোথায় বসে সেই কমিটি ? আম্বানির বাড়িতে ? তার চেয়ারম্যান কে ? 

এই একটা প্রশ্নের উত্তরো কাল কেন্দ্রিয় সরকার দিতে পারে নি । এই দুরন্ত মিথ্যার উপর দাড়িয়ে গতকালের রায় ।
বাস্তব হচ্ছে , নরেন্দ্র মোদী তার প্রভু অনিল আম্বানিকে ৩০হাজার কোটি টাকা চুরি করতে সাহায্য করেছেন । যে লোকটা পেরেক পর্যন্ত ম্যানুফ্যাকচার্‌ করতে পারে না তাকে প্লেনের বরাত দিয়েছেন । রাষ্ট্রায়ত্ত HAL বা Hindustan Aeronautics Limited বহু বছর ধরে প্লেন বানালেও তারা বরাত পাননি । 
এখন অনিল আম্বানি তো পেরেক-ও বানাতে পারেন না ,প্লেন বানাবেন কিভাবে ? অতএব নরেন্দ্র মোদী ,ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে ফ্রান্সে গিয়ে ফ্রান্সের একটি কোম্পানিকে ৩৬টি রাফায়েল বিমান বানিয়ে অনিল বাবুকে বেচতে বলেছেন (ফ্রান্সের রাষ্ট্রপতি এটা কনফার্ম করেছেন) । কতো দামে অনিল বাবু প্লেন কিনলেন সেটা জানতে চাওয়া হলে , আমাদের দেশের সরকার বলেছে এটা ন্যাশানাল সিক্রেট্‌। ফ্রান্সের প্রধান্মন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে উনি অবাক হয়ে বলেছেন ,"আপনাদের দেশের লোকের ট্যাক্সের টাকায় কেনা জিনিস, আপনাদের দেশের লোকের কাছে সিক্রেট্‌ হবে কেন?" । এই দামের ব্যাপারেই সি এ জি রিপোর্ট আলোকপাত করতে পারত । এবং আপাতত সেটা কোথায় ,একমাত্র নরেন্দ্র বাবু বলতে পারবেন ।  অনিল বাবু তারপর আরও চড়া দামে এই প্লেন গুলি ভারতের সরকারকে বেচবে । 
অর্থাৎ আমার আপনার টাকা দিয়ে আম্বানিদের সিন্দুক ভরবে । ৭০০ কোটি টাকা ব্যয় করে আম্বানির মেয়ের বিয়ে হবে । সেই বিয়ের ভিডিও আপনার কাছে আসবে ,আপনি আম্বানির জিও ডেটা খরচা করে সেটা গোগ্রাসে গিলবেন ।

বৃহস্পতিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৮

স্বপ্ন যখন যৌথখামার.. ~ সুশোভন পাত্র

কি আছে বামপন্থীদের? কতটুকু ক্ষমতা? ঐ তো মরু রাজ্যের দুটো আসন। মেরেকেটে ৫রাজ্যে ৭.৮২ লক্ষ ভোট। গোটা দেশে ৪%। ২০টা সাংসদ নেই। দেড়শটা বিধায়ক নেই। কেরালা ছাড়া একটা রাজ্যেও সরকার নেই। সরকার গঠনে নির্ণায়ক কোন ভূমিকা নেই। ভোটের পরে কেনা-বেচার ২-৪টা ডাগর ঘোড়া নেই। রুদ্ধশ্বাস ক্যাবিনেট মিটিং'-এ ফটো ফিনিশেরও চান্স নেই। 
কি আছে বামপন্থীদের? রাস্তায় বেরোলে ১৫ ফুট হোর্ডিং-এ নেতাদের সদা হাস্য মুখ নেই। পাতা জোড়া বিজ্ঞাপন নেই। পার্টি ফান্ডে আম্বানি-আদানি'দের পয়সা নেই। সেলেব একটা ব্র্যান্ড-অ্যাম্বেসেডার নেই। চার্টার্ড বিমান চেপে নির্বাচনী প্রচার নেই। ভোটের মুখে রাম নাম নেই। পেট ভরে দু-মুঠো ঘুষ খাওয়ার স্টিং অপারেশন নেই। একটা তাগড়া আইটি সেল? ধুর ছাই, সেটাও নেই। 
কি আছে বামপন্থীদের? তৃণমূলের ৩৪টা সাংসদ, ২১জনই কোটিপতি। ৬জন ফিল্মস্টার। তাছাড়াও সরকারী প্রসাদপুষ্ট বুদ্ধিজীবীরা আছেন। লেজুড়বৃত্তি করার লেখক-কবিরা আছেন। মঞ্চ আলো করে নায়ক-নায়িকারা আছেন। গৃহপালিত মিডিয়া আছে। ক্লাবে পোষা গুণ্ডা আছে। সিভিক-পুলিশ-প্রশাসন-সিআইডি-কমিশন, সব আছে। 
কি আছে বামপন্থীদের? বিজেপির ২৭২জন সাংসদ, ২৩৭জনই কোটিপতি। দিল্লির দীনদয়াল মার্গে ১.৭০লক্ষ বর্গফুটের অট্টালিকায় পার্টি অফিস আছে। বার্ষিক ১,০৩৪কোটি আয় আছে। ৫৩২কোটির কর্পোরেট ডোনেশেন আছে। আশোকা রোডে দু-তলা বাড়িতে সাজানো মিডিয়া সেল আছে। হিন্দু ধর্মের উপর নাকি বাপের জমিদারি আছে। 'স্বয়ং সেবক'দের লেলিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আছে। গুজরাট-মুজ্জাফরনগর কে নরক বানানোর গোলিয়াথরা আছে। 
কিন্তু মুশকিল হল, ইতিহাসে কোনদিন শেষ অবধি এই গোলিয়াথরা জেতেনি। জিতেছে ডেভিডরাই। ৫রাজ্যে ভোটের ফলের সংশ্লেষ বলছে, গ্রাম ভারতে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাচ্ছে বিজেপি। মধ্যপ্রদেশের গ্রামে দখলে থাকা ৭৫টির বেশি বিধানসভা খুইয়েছে বিজেপি। রাজস্থানের প্রায় ৪০। ছত্তিসগড়ে ৩০। দেশে ৬২% মানুষ কৃষিজীবী। নাসিক থেকে মুম্বাইয়ের 'কিষান 'লং মার্চ' কিম্বা দিল্লির সংসদ মার্গে 'কিষান মুক্তি মার্চ' –গত দু'তিন বছরে চাষিরা যখন বারবার ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে পথে নেমেছেন, যখন ঋণ মকুবের দাবিতে সোচ্চার  হয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তখন নিরভ মোদীর সঙ্গে দাভোসে গিয়ে ফটো সেশেন করেছেন। ৫রাজ্যের ভোটে কৃষক অসন্তোষের যে ট্রেলর গোলিয়াথরা আজ দেখছেন, সেদিন সেই কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিল ঐ ডেভিডরাই। বামপন্থীরাই।
বছরে ২কোটি বেকারের চাকরি হয়নি। দেশ জুড়ে যখন বিভিন্ন মাঝারি শিল্পে ২৯লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তখন বেকারদের পোকোড়া ভাজতে উপদেশ দিয়েছেন।  শেষ ২০বছরের সমস্ত রেকর্ড টপকে ৬.৯% হারে দেশের বেকারত্ব যখন সর্বোচ্চ বেড়েছে, গোলিয়াথরা তখন ৩হাজার কোটির সর্দার প্যাটেলের মূর্তি বানিয়েছে। ৫রাজ্যের ভোটে বেকার'দের পেটের জ্বালার যে ট্রেলর গোলিয়াথরা আজ দেখছেন, সেই বেকার'দের কাজের দাবিতেই প্রতিদিন রাস্তায় থেকেছে ঐ ডেভিডরাই। বামপন্থীরাই।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হিসেবে 'কালো টাকা' ফেরত আসেনি। আপনার-আমার অ্যাকাউন্টে ১৫লাখ জমা পড়েনি। জাল নোটের রমরমা কমেনি। সন্ত্রাসবাদেরও মেরুদণ্ড ভাঙ্গা যায়নি। বরং এটিএম'র লাইনে দাঁড়িয়ে যখন প্রাণ হারিয়েছে শতাধিক সাধারণ মানুষ, তখন বিজেপির বার্ষিক আয় বেড়েছে ৮৫%। পরিযায়ী শ্রমিকরা যখন কাজ হারিয়ে দিশেহারা, তখন ১৬,০০০ গুন মাল কামিয়েছে অমিত শাহ'র পুত্ররা। ৫রাজ্যের ভোটে নোট বাতিলের ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের অসন্তোষের যে ট্রেলর আজ গোলিয়াথরা দেখছেন, সেই নোট বাতিলের আপাদমস্তক দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ জানিয়েছিল ডেভিডরাই। বামপন্থীরাই।
তামাম দুনিয়ার সংগ্রামী ইতিহাস সাক্ষী, ডেভিডরা হারেনি। সংসদীয় রাজনীতির পাটিগণিতে তুরুপের তাস হয়ে উঠতে না পারলেও সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার যন্ত্রণটার শীতলপাটি হওয়ার ক্ষমতা বামপন্থীদের আগেও ছিল, এখনও আছে আর পরেও থাকবে। জান কবুল মান কবুল লড়াই'র হিম্মতটা বামপন্থীদের আগেও ছিল, এখনও আছে আর পরেও থাকবে। তাই যারা বিদ্রূপ করে জিজ্ঞেস করেন, '৫রাজ্যে বামপন্থীরা কটা আসন পেল?', কিম্বা ঔদ্ধত্যের সাথে ঘোষণা করেন '১৯টি রাজ্যে আমরা ক্ষমতায়', তোরা কটায়?', কিম্বা ব্যাঙ্গ করে বলেন 'মধ্যপ্রদেশে বিজেপি হারলে কম্যুনিস্টদের কি লাভ?' -তাঁদের বলি, লাভ বামপন্থীদের একটা আছে। যতই হোক, পাড়ার পাগল কুকুর তো, মরলে গোটা পাড়ারই লাভ আছে।
আসলে মেহনতি মানুষের পক্ষ নিতে কম্যুনিস্টদের কোনদিন ভুল হয়নি। হিটলার-মুসোলিনি-ফ্র্যাঙ্কো কিম্বা আজকের নরেন্দ্র মোদী –ফ্যাসিস্টদের ম্যাসকট'দের চিনতে কম্যুনিস্টদের কোনদিন ভুল হয়নি। ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কম্যুনিস্টরা কোনদিন কসুর রাখেনি। আর রাইখস্ট্যাগের মাথায় লালপতাকা উড়িয়ে দেওয়ার আগে অবধি কম্যুনিস্টদের সেই লড়াই থামেনি। ১১৫২ খ্রিস্ট পূর্বের মিশরে ফেরাও'র বিরুদ্ধে রেশনের দাবি তে শ্রমিক ধর্মঘটই হোক কিম্বা ১৯৫৯'র সালে পুঁজিবাদের আঁতুড় ঘর আমেরিকার রাস্তায় ৫লাখ ইস্পাত শিল্পের শ্রমিক'দের মিছিল। ৭৪'র ইন্দিরার সরকারের বিরুদ্ধে রেল ধর্মঘটই হোক কিম্বা মার্গারেট থ্যাচারের দেশে খনি শ্রমিকদের অনশন, এই সেদিনের ৫০হাজার কৃষকের সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযানই হোক কিম্বা আজকের প্যারিসে পেট্রো-পণ্যের মূল্যের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ -পৃথিবীর যে প্রান্তে, যে কোণায় যখনই মেহনতি মানুষরা শাসকের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছে, সেই লড়াইয়ে নেতৃত্বে কম্যুনিস্টরাই থেকেছে। 
তাই ঐ সব ব্যাঙ্গ-বিদ্রূপে মুচকি হাসুন। আর বিনয়ের সাথে, ওঁদের কাঁধে হাত রেখে, মনে করিয়ে দিন যে, পৃথিবীর প্রত্যেকটা মহাদেশের, প্রত্যেকটা দেশের, প্রত্যেকটা শহরের, প্রত্যেকটা গ্রামের, প্রত্যেকটা জনপদে; হয়ত কোন ফ্যাক্টরির গেটের সামনে, কিম্বা হয়ত কৃষকের এক ফালি জমির মাঝে, হয়ত কংক্রিটের মিছিলে বেকারের কাঁধে, কিম্বা স্বৈরাচারী শাসকের বিরুদ্ধে মেহনতির প্রতিবাদের ভাষায়, কখনও লিঙ্গ বৈষম্যের বিরুদ্ধে উদ্ধত শ্লোগানে সেজে, কখনও যুদ্ধবিরোধী মিছিলে শান্তির পতাকা হয়ে কেস্তা-হাতুড়ি আঁকা ঐ একটুকরো লাল কাপড় কিন্তু ঠিক উড়ছে। আর উড়ছে, অযোধ্যায় রামমন্দির প্রতিষ্ঠার দাবি তে নয়, মহম্মদ আর রামের নামে মানুষ ক্ষ্যাপাতে নয়, উৎসব আর মেলায় মাতিয়ে রাখতে নয়। হক আদায়ের লড়াই করতে। দুনিয়ার মেহনতি মানুষ কে আগলে রাখতে। শোষণ-বঞ্চনাহীন নতুন ভোরের স্বপ্নটাকে সাচ্চা করতে।

চিকিৎসা ব্যবস্থা ~ ড: গৌতম মিস্ত্রি

যে ভাবে আমরা এখন হৃদরোগের চিকিৎসা করছি, তাতে সমাজের বৃহদাংশের সুচিকিৎসা সম্ভব নয়। একটা কাল্পনিক গল্পের মাধ্যমে প্রসঙ্গটা ব্যাখ্যা করি। একজন উচ্চশিক্ষিত সদ্য পাশ করা নবীন চিকিৎসক নদীর পাড়ে হাওয়া খেতে গেছে। হঠাৎ দেখে, একজন মানুষ নদীতে ভেসে যাচ্ছে। নদীতে ঝাঁপিয়ে তাকে তুলে, নিজের সদ্যপ্রাপ্ত চিকিৎসাবিদ্যার প্রয়োগে তাকে সুস্থ করে তুললো। এর পর সেই নবীন চিকিৎসক দেখল,  কোন আশ্চর্য্য কারণে নদীতে ভেসে আসা মৃতপ্রায় মানুষের সংখ্যা বাড়তে লাগলো। বুদ্ধিমান নবীন চিকিৎসক তার বেশ কিছু সহকর্মীদের সাথে নিয়ে অক্লান্ত  প্রচেষ্টায় আরও কিছু মানুষকে বাঁচাতে পারলো। কিন্তু সেই নদীতে ভেসে আসা মৃতপ্রায়ের সংখা ক্রমেই বাড়তে লাগলো।  এরপর নবীন চিকিৎসকের দল যেটা করলো, তাতে সবাই সাধুবাদ দিলো। নদীর পাড়ে একটা হাসপাতাল গড়ে উঠলো চিকিৎসকদের উদ্যোগে আর পরোপকারী(!) কিছু ব্যবসায়ীদের অর্থে। অধিকাংশ মরণাপন্ন মানুষ নদীর জলে ভেসে গেলেও নদীতে ভেসে আসা কিছু মানুষ অবশ্য বেঁচে গেলো।  নদীপাড়ে গড়ে উঠলো বড় জনপদ, অনেক চিকিৎসকের কাজের সংস্থান হল আর হল ব্যবসায়ীদের অর্থ সমাগমের সুবন্দোবস্ত।  

এই সমাজকল্যাণ মূলক কর্মকান্ডে বাধ সাধলো গুটিকয় খুঁতখুঁতে চিকিৎসক।  এরা নদীর উজান বেয়ে অন্যভাবে হাওয়া খেতে গিয়ে দেখলো, এক দৈত্য একটা প্রকান্ড মুগুর নিয়ে মানুষ মেরে চলেছে। এই খুঁতখুঁতে চিকিৎসকের দল দৈত্যকে মেরে ফেললো।  হাসপাতালের ব্যবসায় মন্দা পড়লো, নবীন চিকিৎসকরা ক্ষুন্ন হলো, তবে সাধারন মানুষ বললো একটা সুচিকিৎসা হলো।

স্বাস্থ্যখাতে সরকারি আর বেসরকারি প্রচেষ্টায় যে পরিমান অর্থ ব্যয় হয়, তার মুখ্যভাগই খরচ হয়ে যায় গুটিকয় শহরের বড় হাসপাতালে।  কোন বেসরকারি হাসপাতালে কালেভদ্রে কোন জটিল অপারেশন হলে খবরের কাগজের প্রথম পাতায় স্থান পায়। কিন্তু এতে সামগ্রিকভাবে সমাজের মোট রোগভোগের আর সাধারণ মানুষের ভোগান্তির কোন হেরফের হয় না। খবরের কাগজের এই চমক জাগানো খবরে হরিপদ কেরানির হাঁপানি রোগের সুরাহা হয় না। এই দৃষ্টিভঙ্গি কোনমতেই আমাদেও মত উন্নয়নশীল দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্যরক্ষায় সফলকাম হতে পারেনা।  আপৎকালীন চিকিৎসায় যৎকিঞ্চিত সরকারি পয়সাকড়ি আর স্বেছাসেবী সংস্থার উদ্যোগ নিশেঃষ না করে, প্রতিরোধমুলক চিকিৎসায় জোর দেওয়া হলে হরিপদদের মত মানুষগুলোর রোগের ফাঁদে পড়া আটকানো যায়।  ব্যক্তিগত ও সরকারি চিকিৎসাখাতে খরচের মুখ্যভাগই হৃদরোগ আর ডায়াবেটিস রোগে ব্যয় হয়ে যায়, যদিও এই দুই রোগের প্রকোপ অনেক অল্প খরচেই নিবারণযোগ্য।  যে দৃষ্টিভঙ্গিতে চিকিৎসা চলছে, তাতে মুষ্টিমেয় সচ্ছলের রোগউপশম (paliation), চিকিৎসকের আত্মশ্লাঘা পূরণ, আর সর্বোপরি বহুজাতিক ঔষধপ্রস্তুতকারি ও প্রযুক্তি নির্মাণকারী সংস্থার অর্থসমাগমের সুবন্দোবস্ত হচ্ছে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনের আশু প্রয়োজন। প্রশ্ন উঠতে পারে, এই সহজবোধ্য অথচ সস্তা রোগ নিবারণে উদ্যেগের অভাব কেন?

আমার মত অল্পবুদ্ধি নগন্যকে এই সহজ প্রশ্নটা বেশ পীড়া দিলেও এর উত্তরটা বেশ জটিল।  কলেরা বা ডিপথেরিয়া রোগ প্রতিষেধকের মত হৃদরোগ প্রতিরোধের কোন টিকা নেই, যেটা কিনা অল্প আয়াসে প্রয়োগ করা যায়। হৃদরোগের নিবারণের জন্য চাই বৃহত্তর সমাজের জীবনযাত্রার আর অভ্যাসের পরিবর্তন।  এই বিপুল কর্মকান্ডের সুফল চটজলদি মেলেনা।  আর এর জন্যই এই আন্দোলনটা একক ভাবে অথবা সামগ্রিকভাবে (সরকারি অথবা বেসরকারি) আকর্ষক নয়।  কেবল এই বৈষম্যটাই পীড়াদায়ক, যখন দেখি, এইডসের (aquired immune deficiency syndrome) মত রোগ, যেটা কিনা সংখ্যাগরিষ্ঠ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তকে স্পর্শ করে না, তার প্রতিরোধের বার্তা মিডিয়ার দৌলতে গ্রামে গঞ্জে পৌঁছে গেছে। প্রতিবেশী দেশ চিনেও ধূমপান বিরোধী সরকারি বিলবোর্ড আছে। চিনে প্রকাশ্যে, নিভৃতে  ঘরের কোণের বাইরে সিগারেট ফুঁকলে মোটা জরিমানা আপনাকে যৎকিঞ্চিত জরিমানার প্রতিদানে সুস্বাস্থ্য উপহার দেবে।  আমাদের দুর্ভাগ্য, মন্দির-মসজিদ আর সুউচ্চ মুর্তি খাড়া করার বাইরে সফল ও প্রয়োজনীয় জনহিতকার প্রকল্পের কল্পনাও দেশের কান্ডারীদের মাথায় নেই। হৃদরোগ প্রতিরোধের জন্য সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা  জানা আছে, কেবল জানা নেই তার সফল প্রয়োগের আমলাতান্ত্রিক কুটনীতি।

একটা প্রাচীন প্রবচন আছে। চিকিৎসক তিন প্রকারের হয়। উচ্চশিক্ষিত, পরিশ্রমী ও সফলকাম চিকিৎসক জটিল ও আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার প্রয়োগে মরণাপন্ন রোগীকে সুস্থ করে তোলেন ।  এঁদের চেয়েও ভালো চিকিৎসক রোগের প্রাথমিক লক্ষণ দেখা মাত্রই অল্প আয়াসে রোগমুক্তি ঘটাতে পারে।  সুচিকিৎসক তার বিদ্যার প্রয়োগে, রোগ নিবারণ করে থাকে। সুচিকিৎসকের কর্মকান্ড বৃদ্ধি পেলে, প্রথমোক্ত চিকিৎসকদেও অবশ্য কর্মহীন হবার আশঙ্কা থেকে যায়।  সুচিকিৎসকদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও তাঁদের নিষ্কন্টক কর্মকাণ্ড কামনা করি।

সোমবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০১৮

মমতা ও আরএসএস ~ সুশোভন পাত্র

নিউটনের ঘরের কেয়ারটেকার সেদিন পরিচারিকা কে পই পই করে বলেছিলেন, "ডিমটা সেদ্ধ করে, বাবুকে খাইয়ে, তবেই আসবি।" কিন্তু গবেষণায় বিঘ্ন ঘটবে বলে, নিউটন নিজেই ডিম সেদ্ধ করে, সময়ে খেয়ে নেবার আশ্বাস দিয়ে তাঁর পরিচারিকা কে ফেরত পাঠিয়ে দেন। একঘণ্টা পর পরিচারিকা এসে দেখেন, সসপ্যানে রিষ্ট ওয়াচটা সেদ্ধ হচ্ছে আর নিউটন উনুনের সামনে ঠাই দাঁড়িয়ে, হাতে ধরা ডিমের দিকে তাকিয়ে সময় দেখছেন।
টিকিট চেকার টিকিট চাইতেই আইনস্টাইন অনেক খুঁজেও টিকিটটা পেলেন না। টিকিট চেকার আইনস্টাইনকে চিনে বলেছিলেন, "আরে প্রফেসর, আর খুঁজতে হবে না। আমি নিশ্চিত আপনি টিকিট কেটেছেন।" কাতর স্বরে আইনস্টাইন বলেছিলেন, "না, না খুঁজতে তো হবেই। ওটা না পেলে আমি জানব কি করে কোথায় যাচ্ছি!"
ক্লাসিক্যাল মেকানিক্সের পথিকৃৎ নিউটন ডিমের বদলে ভুল করে রিষ্ট ওয়াচ সেদ্ধ করেছিলেন। থিওরিটিক্যাল ফিজিক্সের জাদুকর আইনস্টাইন টিকিট আনতে ভুলেছিলেন। আর দিল্লীর মসনদ দখলের দিবাস্বপ্নে মশগুল আমাদের মুখ্যমন্ত্রী স্বরচিত ইতিহাসটাই ভুলে গেছেন। আসুন দায়িত্বশীল কামাল হাসানের ভূমিকায় সদমা সিনেমার শ্রীদেবীর যত্ন নিন। কর্তব্যপরায়ণ নাগরিক হিসেবে তাঁর কৃতকর্ম স্মরণ করিয়ে দিন।  
জরুরী অবস্থায় সিদ্ধার্থশংকর রায়ের তাঁবেদারি করে, জয়প্রকাশ নারায়ণের গাড়ির বনেটে নেচে ¹, ইন্দিরা হত্যার সহানুভূতির ভোটে প্রথম সাংসদ হয়ে ², শ্রীমতী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন আনন্দবাজারের হবু 'অগ্নিকন্যা'। ধর্মীয় মেরুকরণের চ্যাংড়ামি তে জাতীয় রাজনীতিতে দ্রুত উঠে আসছে বি.জে.পি ³ । 'লৌহ পুরুষ' রথে চেপে, বাড়ি বয়ে বলে আসছেন 'মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে'। অযোধ্যায় জুটছেন কর-সেবকরা। ৯২'র ৪ঠা ডিসেম্বর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে শহীদ মিনারে জনসভা ডাকল বামফ্রন্ট। আর সেদিনই সিধো-কানহু ডহরে সভা করে 'ইন্ডিয়া ইয়ুথ কংগ্রেসের' সাধারণ সম্পাদিকা মমতা বললেন, ''সব সি.পি.এম'র ষড়যন্ত্র। বি.জে.পি অযোধ্যায় কিছুই করতে পারবে না। আসলে সি.পি.এম আমাদের আটকাতেই ক্যাডার জড়ো করছে" ⁴ ।  ৯৭'র ডিসেম্বরে কংগ্রেস থেকে বহিষ্কৃত মমতা'ই জোটসঙ্গী প্রসঙ্গে বলেছিলেন, "বি.জে.পি তো  অচ্ছুৎ নয়" ⁵।  বাস্তবেই ছুৎমার্গ শিকেয় তুলে ৯৮'র লোকসভা ভোটে‍‌ তৃণমূলের হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে খাতা খুলল বি.জে.পি। আর ৯৯' এ এন.ডি.এ'র শরিক মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হলেন রেলমন্ত্রী ⁶।
ম্যাডাম, আজ আপনার বি.জে.পি কে 'সাম্প্রদায়িক' মনে হচ্ছে? কিন্তু আপনিই তো বি.বি.সি'র সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন বি.জে.পি নাকি তৃণমূলের "ন্যাচারাল অ্যালি" ⁷? গুজরাট দাঙ্গার সময়ে আপনি বাজপেয়ী সরকারে মন্ত্রী ছিলেন না ⁶?  সংসদ যখন গুজরাটের রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহণ করছে তখন সরকারের পাশে দাঁড়াবার আশ্বাস দিয়ে বাজপেয়ী কে আপনি চিঠি লেখেননি ⁸? তবে যে আপনারই সাংসদ কৃষ্ণা বসু তাঁর 'অ্যান আউটসাইডার টু দি পলিটিক্স' বইয়ে লিখেছেন, লোকসভায় যেদিন গুজরাটে কেন্দ্রীয় সরকারের হস্তক্ষেপ চেয়ে ভোটাভুটি হচ্ছে সেদিন আপনিই নাকি এন.ডি.এ সরকার কে ভোট দেবার হুইপ জারি করেছিলেন ⁹? আপনিই তো দাঙ্গা পরবর্তী বিধানসভা নির্বাচনে জয়লাভের পর নরেন্দ্র মোদী কে অভিবাদন জানিয়ে পুষ্পস্তবক পাঠিয়েছিলেন ¹⁰। আপনিই তো ২০০৪'র লোকসভা এবং ২০০৬'র বিধানসভা নির্বাচনে বি.জে.পি'র সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছিলেন ⁴ । 
ম্যাডাম, আজ আপনি বলছেন আর.এস.এস 'ভয়ঙ্কর'? আর ২০০৩'র ১৫ই সেপ্টেম্বর দিল্লিতে 'পাঞ্চজন্য'র অনুষ্ঠানে আপনি সংঘ নেতৃত্বের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন, ''আপনারা সত্যিকারের দেশপ্রেমিক। আপনারা দেশকে ভালোবাসেন। আপনাদের ১% সাহায্যে আমরা কমিউনিস্টদের সরাতে পারবো।'' মনে পড়ে গদগদ আর.এস.এস নেতারা আপনাকে আশ্বস্ত করে বলেছিলেন, ''হামারি পেয়ারি মমতাদি সাক্ষাৎ দুর্গা'' ¹¹?  এই তো সেদিন 'দুর্গার' সাফল্যে খুশি হয়ে আর.এস.এস'র রাজ্য মুখপত্র 'স্বস্তিকা' সম্পাদকীয় তে লিখেছিল "দায়িত্বশীল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দুঃশাসনের অবসান" ¹² । এই তো সেদিন আর.এস.এস'র জাতীয় মুখপত্র 'ওর্গানাইজার' স্বর্ণাক্ষরে উত্তর-সম্পাদকীয় তে ছেপেছিল, "মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের সেই বিরলতম প্রজাতির রাজনীতিবিদ যিনি আর্থিক ভাবে সৎ। দেশে তাঁর মতই রাজনীতিবিদ প্রয়োজন" ¹³ ।
সাইকো-অ্যানালিস্ট গিরিন্দ্রশেখর বসু কে একদিন তাঁরই এক রোগী বললেন "স্যার, গতরাতে স্বপ্নে দেখেছি আপনি নর্দমায় পড়ে গেছেন; আর আমি আপনাকে অনেক কষ্টে ওঠাতে চেষ্টা করছি।" গিরিন্দ্রশেখের মুচকি হেসে বলেন, "আমি অত্যন্ত আনন্দিত আপনার সাহায্য পেয়ে। কিন্তু নর্দমায় আমাকে ফেলেছিল কে?" ম্যাডাম, আপনার রাজত্বে যখন গত পাঁচ বছরে পাঁচ গুন বেড়েছে আর.এস.এস'র শাখার সংখ্যা ¹⁴, আজ যখন অনাহারে মরা চা শ্রমিকের রাজ্যে যাদবপুরে 'গরু পূজার' ছ্যাবলামি করছে মাথায় গোবর ভর্তি সন্তানরা, আজ যখন মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রকাশ্যে তিন তালাকের সমর্থন জানাচ্ছে আপনারই মন্ত্রীরা, আজ যখন হাজিনগর থেকে ধুলাগড়ে ধর্মের নামে ঘরে ঘরে দাঙ্গার আগুন ছড়াচ্ছে আপনার ভাইরা; তখন  রাজনীতির অঙ্ক কষতে সিদিকুল্লা-তোহা সিদ্দিকী'দের মাথায় তুলে রাখছেন আপনি? মোহন ভাগবত'দের কলকাতায় সভা করে বিষ ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছেন আপনি? বি.জে.পি-সংঘ বিরোধিতায় ভেকধারী খড়গহস্ত হওয়ার তামাশা করছেন আপনি? গোটা রাজ্য কে ধর্মীয় মেরুকরণের বারুদে সাজিয়ে, পায়ের উপর পা তুলে মুজরা দেখছেন আপনি? আগে বলুন তো মাননীয়া, এদ্দিন এরাজ্যে আর.এস.এস আগলে রাখল কে?  বলুন সম্প্রীতির বাংলায় বি.জে.পি'র বীজ বপন করেছিল কে? নিজের গোয়ালে, নিজের আঁচলে, লুকিয়ে দুধ কলা দিয়ে কালসাপ পুষেছিল কে? আমি আনন্দিত আজ আপনি বি.জে.পি-সংঘের বিরোধিতা করছেন। কিন্তু আগে বলুন তো ঐ নর্দমায় আমাদের ফেলেছিল কে?   
একদিন মার্ক টোয়েন সকালবেলা শার্ট পরতে গিয়ে দেখলেন শার্টে বোতাম নেই। একটার পর একটা, তিনটে শার্ট বার করে পরতে গিয়ে দেখেন সব সার্টেই একটা করে বোতাম নেই। রাগে অকথ্য গালিগালাজ করতে করতে মার্ক টোয়েনে যখন চতুর্থ শার্টটা বের করছেন, তখন তাঁর রুচিশীল স্ত্রী, সব শুনে, স্বামীকে অপ্রস্তুত করার জন্যেই প্রত্যেকটি গালিগালাজ স্পষ্ট করে আবার উচ্চারণ করলেন। মার্ক টোয়েন সেটা শুনে বলেছিলেন, "তোমার শব্দগুলো সব ঠিকই আছে, কিন্তু... ইমোশনটা মিসিং।"
ম্যাডাম,  আজ আপনি বি.জে.পি -সংঘের বিরোধিতা করছেন বটে।  কিন্তু ঐ যে... ইমোশনটা মিসিং।

















শুক্রবার, ৩০ নভেম্বর, ২০১৮

দিল্লি চলো ~ অবীন দত্তগুপ্ত

বহুকাল লিখি না । কিছু কিছু মাহেন্দ্রক্ষনে লিখতে হাত নিশপিশ করে,কিন্তু লেখা বেরোয় না । আজকে লিখতেই হবে ,যে করে হোক , কিন্তু কিভাবে ? কোথায় একটা শুনেছিলাম , রবিকবি নাকি বলেছিলেন " লেখা না এলে ,অনুবাদ করো ।" আদপে বলেছিলেন কিনা জানি না ,কিন্তু আজ দুপুরে নিজের সুবিধার্থে বিশ্বাস করলাম । লেখার মতোই টিভিতে খবরও দেখিনা বহুদিন । কাহাতক আর বড়লোকের দালালি গেলা যায় ? গতকাল এক বন্ধু বললো , এন ডি টি ভি-তে রাভিশ কুমারের কাজগুলো দ্যাখ - অন্যরকম । আজ দুপুরে এন ডি টি ভি-তে কিষান মুক্তি মার্চের কভারেজ দেখলাম । সৎ মানুষ দেখলে আজকাল গায়ে কাঁটা দেয় , সৎ সাংবাদিক - ডায়নোসরের ডিম। আজ রাবিশবাবুকে দেখলাম । রাবিশ কুমার ইউনিকর্নের মতো ,বিলুপ্ত প্রজাতির । অদ্ভুত সুন্দর সাংবাদিকতা । শেষে একটা চিঠি পড়লেন ( চিঠির ছবি নীচে দিলাম) । বললেন লাল ঝান্ডা কাঁধে এক কৃষক গতকাল ওনাকে চিঠিটা দিয়েছে ।  শুনেই ঠিক করলাম এইবার আমার হাতের আড় ভাঙ্গার সময় হয়েছে । চিঠিটা অনুবাদ করব ।  অতএব ...

                         মাফ করবেন
আমাদের আজকের মিছিলে আপনার হয়তো অনেক অসুবিধে হয়েছে ।

আমরা কৃষক । আপনাকে বিরক্ত করার কোন ইচ্ছে আমাদের নেই । আমরা নিজেরাই খুব অসুবিধের মধ্যে রয়েছি । আপনাকে এবং সরকারকে নিজেদের কষ্টের কথা বলতেই আমরা আজ বহুদূর থেকে এসেছি । আমরা আপনার ঠিক এক মিনিট সময় চাই । 

আপনি কি জানেন , ডাল,সব্জি,ফল বেচে আমরা কতো টাকা পাই আর আপনি কতোতে কেনেন ? 

মুগ ডালঃ আমরা বেচি - ৪৬টাকা কিলো । আপনি কেনেন ১২০টাকা কিলো ।
  টমেটোঃ আমরা বেচি - ৫টাকা কিলো  । আপনি কেনেন ৩০টাকা কিলো ।
  আপেলঃ আমরা বেচি - ১০টাকা কিলো  । আপনি কেনেন ১১০টাকা কিলো ।
      দুধঃ আমরা বেচি - ২০টাকা লিটার  । আপনি কেনেন ৪২টাকা লিটার ।

এটাই আমাদের অসুবিধা । আমরা সমস্ত জিনিস সস্তায় বেচি আর বেশী টাকায় কিনি । আমাদের জিবনটাও খুব সস্তা জানেন। গত ২০ বছরে তিন লাখের বেশী ,'আমরা' আত্মহত্যা করেছি । আমাদের মুশকিল আসান করতে পারে একমাত্র কেন্দ্র সরকার , কিন্তু আমাদের কথা তারা শোনে না । সরকার একমাত্র মিডিয়ার কথা শোনে , কিন্তু মিডিয়া আমাদের খুঁজেই পায় না । এই মিডিয়ার ঝুটিটা কিন্তু আপনার হাতেই ধরা । তাই আমরা নিজেদের দুঃখের- দুর্দশার গল্প আপনাকে বলতে এসেছি ।

আমরা শুধু চাই যে কৃষকদের সমস্যার কথা আলোচনা করার জন্য সংসদের একটি অধিবেশন ডাকা হোক । আমরা চাই, সেই অধিবেশনে দুটো আইন পাশ হোক ।
১। কৃষকের ফসলের সঠিক দাম ঠিক করার আইন
২। সমস্ত কৃষককে ঋণমুক্ত করার আইন । 
আমরা কি ভুল কিছু চাইছি ?

আমাদের কথা আপনার ঠিক মনে হলে ,আজকে আমাদের সাথে দুকদম হাটুন । কাল ৩০ নভেম্বর সংসদের সামনের রাস্তায় আমরা সকলে থাকবো । আপনি এলে আমাদের মনোবল বাড়বে । আসবেন তো ? "

বুধবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৮

বাংলা মিডিয়া ~ সুশোভন পাত্র

জাস্ট একবার ভাবুন। বুদ্ধবাবু মুখ্যমন্ত্রী। বুদ্ধবাবু ফি-বছরে ২লক্ষ চাকরি দেবেন বলে স্বপ্ন দেখান। সরকারী পয়সায় 'বেঙ্গল মিন্স বিজনেস'র আসর বসান। অমুক লগ্নি, তুমুক বিনিয়োগের গল্প শোনান। শিল্প ধরতে বিদেশ গিয়ে মিকি মাউসের পিয়ানো বাজান। অথচ, সেই বুদ্ধবাবুর নাকের ডগায় রাইটার্সে, বেকারির জ্বালায় গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করলেন সঞ্জয় সাহা। দুধের শিশু কোলে নিয়ে, কাঁদতে কাঁদতে স্ত্রী শর্মিষ্ঠা বলছেন, এলাকার প্রভাবশালীর সিপিএম নেতার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা প্রোমোটারের দৌরাত্ম্যের প্রতিবাদ করায় দুদিন আগেই হেনস্তা হতে হয়েছিল তাঁর স্বামী কে। 
জাস্ট একবার ভাবুন। বুদ্ধবাবু গলার শিরা ফুলিয়ে 'জঙ্গলমহল হাসছে' বলে মঞ্চ কাঁপান। অলিতে গলিতে ২টাকা/কেজি চালের বাতেলা শোনান। সরকারী পয়সায় নিজের হোর্ডিং টাঙ্গিয়ে ফুটুনি মারান। আর পূর্ণাপানির শবররা অনাহারে-অপুষ্টি তে প্রিয়জন'দের লাশ কুড়ান। রেকর্ড ৩৪% বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা পঞ্চায়েতে লুটের রাজত্ব। 'হার্মাদ'দের তোলাবাজি তে বন্ধ গ্রামের রেশন। অবশ্য মুখে ভাত না থাক, এলাকায় চোলাই মদের কোন অভাব রাখেন না সিপিএম নেতারা। 
জাস্ট একবার ভাবুন, বুদ্ধবাবু বলছেন, 'উৎসব করব না তো কি শ্রাদ্ধ করব?।' বুদ্ধবাবু শবরদের গ্রামের বাইরে খাকি পোশাকের পুলিশ লেলিয়ে দিচ্ছেন। তাক লাগানো মেনুর সম্ভারে আহারে বাংলায় অনুপ্রেরণা দিচ্ছেন। হেলিকপ্টারে উড়ে জগদ্ধাত্রী পূজার উদ্বোধন করছেন। বুদ্ধবাবু ফিরে এসে নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে ক্যাডার মিটিং-এ দিল্লি জয়ের ডাক দিচ্ছেন।  
বুদ্ধবাবু-সিপিএম-আত্মহত্যা-চোলাই-অনাহার-হেলিকপ্টারর-পুলিশ। জমকালো স্টোরি লাইন না? ব্রেকিং নিউজে 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' সাজানো প্লেট। প্লেটের উপর বামফ্রন্ট সরকার কে কচুকাটা করে সাজানো ডিশ। আর মুখ্যমন্ত্রীর ঔদ্ধত্য তো 'আইস অন দি কেক'। শর্মিষ্ঠা সাহা কে স্টুডিও তে বসিয়ে এক্সক্লুসিভ ইন্টার্ভিউ হবে। শবরের শব সাজিয়ে সিক্সটি পয়েন্টের হেডিং হবে। অনাহারদীর্ণ জঙ্গলমহল আর আহারে বাংলা -পাশাপাশি রেখে ভিসুয়াল হবে। বুদ্ধিজীবীরা ঘণ্টাখানেকে সিপিএম'র বাপ-বাপান্ত উদ্ধার করে দেবে। জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী প্রতিদিন সকালে পাঁচ জন সিপিএম'র লাশ দেখতে চেয়ে চায়ের কাপে ঝড় তুলে দেবে। লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন, দুধ জমে ক্ষীর হয়ে যাবে।  
কিন্তু কি আশ্চর্য, এসব কিছুই হল না। ৯৯-র সাইক্লোনে গল্পের গরু গাছে চড়ানো মিডিয়া জানতেই পারলো না, সঞ্জয় সাহা খোদ নবান্নের সামনে গায়ে আগুন লাগিয়ে আত্মহত্যা করল। মাননীয়া ছাড়া কারও তাঁবেদারি না করা মিডিয়া দেখতেই পেল না, সাতটা লাশের বিনিময়ে শবরদের পাতে আজ ভাত জুটল। সেদিন জঙ্গলমহলে আতস কাঁচে 'হার্মাদ ক্যাম্প' খোঁজা মিডিয়া প্রশ্নই করল না যে রেশনহীন গ্রামে বে-আইনি চোলাই মদের ভাটি চলছিল কার অনুপ্রেরণায়? আর শবর'দের লাশ সাজিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হেলিকপ্টার চাপার আহ্লাদিপনা করেন কার বাপের পয়সায়? করল না কারণ, মুখ্যমন্ত্রীর নামটা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নয়। গত ১৫দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো সিপিএম'র আমলে নয়। শাসক দলের সদর দপ্তর আলিমুদ্দিনে নয়। বরং কালীঘাটে। আর ঘটনা গুলো তৃণমূলের রাজত্বে। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হুকুমতে। 
রেজ্জাক মোল্লা তখন সিপিএম। "হেলে ধরতে পারেনা কেউটে ধরতে গেছে" মন্তব্য তখন হট কেক। 'বাম বিদায়ের' কাটা ঘায়ে নুনের ছিটে দিতে রেজ্জাক মোল্লার বিদ্রূপ কে দায়িত্ব নিয়ে বেডরুমে পৌঁছে দিয়েছিল মিডিয়া। আর আজকে সিঙ্গুরের তৃণমূল বিধায়ক, পাঁচ বছর ক্যাবিনেটের সদস্য রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য বলছেন, "সিঙ্গুরে টাটারা কারখানা শুরু হলে সব কৃষকই জমি দিয়ে দিতেন। তাঁরা বুঝতেন এতে কাজ হবে, প্রশিক্ষণ মিলবে। ফলে কিছুদিনের মধ্যেই টাটারা পুরো জমিটাই পেয়ে যেতেন। আর এটা সরকারের বিরাট সাফল্য হতো। সিপিএম আরও বেশ কিছুদিন রাজ্যের সরকারে থাকতে পারতো।" সেদিন রেজ্জাক মোল্লা কে বুদ্ধবাবুর "জনবিরোধী শিল্পনীতির" বিরুদ্ধে প্রক্সি-ওয়ারের ক্রুসেডর বানানো কোন মিডিয়ার হিম্মত আছে নাকি রবীন্দ্রনাথ বাবুর বিবৃতি মুখ্যমন্ত্রীর মুখে ছুঁড়ে মেরে সিঙ্গুরের 'জমি আন্দোলনের' ন্যাকামির কৈফিয়ত চাওয়ার? কোন মিডিয়ার হিম্মত আছে নাকি সিঙ্গুরের কৃষক'দের চাওয়া পাওয়ার সাচ্চা ময়নাতদন্ত করার? বাংলার বেকার'দের জীবন যন্ত্রণার আর্তনাদের প্রতিধ্বনি ছাপার?
নেই! কারণ এই গৃহপালিত মিডিয়াই তো সেদিন মমতা কে মসিহা বানিয়েছিল। চ্যাংড়া তৃণমূল কে 'কৃষক দরদী' সাজিয়ে পাড়া মাথায় তুলেছিল। 'পরিবর্তন চাই' বলে কাঁদুনি গেয়েছিল। আর এই গৃহপালিত মিডিয়াই সেদিন আপনাকে "৩৪ বছরে কিছুই হয়নি" বলতে শিখিয়েছিল। 
১৯৯৮-২০১০, রাজ্যে প্রতি বছর এস.এস.সি'র মাধ্যমে নিয়োগ হয়েছিল ১,৮৫,৮৪৫ জন। পেটো মস্তানদের ৮-১০লক্ষ ঘুষ দিতে হয়নি। হাইকোর্টের কাছে বারবার মুখ ঝামা খেতে হয়নি। ২০০৪-২০১০, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সাধের 'গুজরাট মডেল' কে টেক্কা দিয়ে সেরা হয়েছিল বাংলা। সরকারী পয়সায় মুখ্যমন্ত্রী কে বিদেশ সফরে যেতে হয়নি। 'বেঙ্গল মিন্স বিজনেস'র আদিখ্যেতা করতে হয়নি। ৩৪ বছরে কোনদিন, বাংলার মন্ত্রী-মেয়র'দের ক্যামেরার সামনে ঘুষ খেতে হয়নি। সাংসদ'দের চিট-ফান্ডের চিটিং বাজির জন্য জেলে যেতে হয়নি। ৩৪ বছরে কোনদিন, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী'দের ১.৮৬ কোটির ছবি বিক্রি করতে হয়নি। ডেলোতে সুদীপ্ত সেন'দের সাথে গভীর রাতে বৈঠক করতে হয়নি। ৩৪ বছরে কোনদিন, দলের চোর-লম্পট'দের আড়াল করতে সিবিআই তদন্তে বাধা দিতে হয়নি। বিজেপির সাথে সেটিং করে সিবিআই'র জুজুতে রাফালে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকতে হয়নি। ৩৪ বছরে কোনদিন, ১লক্ষ সরকারী শূন্যপদে নিয়োগ বাকি রেখে সরকার মোচ্ছবে মাতেনি। মহার্ঘ্য ভাতা বকেয়া রেখে ক্লাবে ক্লাবে গুণ্ডা পুষতে হয়নি। ৩৪ বছরে কোনদিন, বাংলার রাজনীতি তে ধর্মের নামে ভোট চাইতে হয়নি, জীবন-জীবিকার সমস্যা কে আড়াল করে রথের চাকায় সাম্প্রদায়িকতার বারুদ সাজাতে হয়নি। ৩৪ বছরে কোনদিন, বুদ্ধিজীবী'দের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করে সরীসৃপ সাজতে হয়নি। মিডিয়া কে এই নজিরবিহীন নির্লজ্জ স্তাবকতা করতে হয়নি। সীমাহীন ঔদ্ধত্য কে 'সততার প্রতীক' বলে চালাতে হয়নি। 
সত্যিই তো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো ঠিকই বলেন, ৩৪ বছরে তো কিছুই হয়নি। গৃহপালিত মিডিয়া তো ঠিকই বলে ৩৪ বছরে তো কিছুই হয়নি। জাস্ট একবার ভাবুন তো, ৩৪ বছরে তো কত কিছুই হয়নি।

মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৮

দাংগা ও দিদি ~ আরকাদি গাইদার

- তাড়াতাড়ি শেষ করো, অনেকক্ষন ধরে বসে আছি, এবার ক্লান্ত লাগছে।

- হ্যা, আর কয়েকটা বিষয় বাকি, সেগুলো আলোচনা করে নিলেই মিটিং শেষ।

- বলো, বলো।

- বিজেপি - আরএসএসের রথযাত্রা নিয়ে সেরকমভাবে কোন বিশেষ প্রশাসনিক পদক্ষেপের নির্দেশ পাইনি। ওটা কি করবো?

- কিছুই করবে না।

- কিছুই করবো না!

- না। পারমিশন আছে তো। নিয়ম মেনে সাথে এসকর্ট দেবে। ব্যাস, আরকি।

- কিন্তু..আসলে, মানে ব্যাপারটা তো এত সহজ না। এটা তো সাদামাটা রাজনৈতিক প্রচারযাত্রা নয়। এটার উদ্দেশ্য তো অন্য। সেই '৯২তে রথযাত্রা করেছিলো। যেখান দিয়ে রথ গেছিলো সেখানেই দাঙা লাগিয়েছিলো। এবারেও তাই করবে। গোটা বাংলা জুড়ে রথ চলবে, পেছনে গুন্ডা, দাঙাবাজদের দলবল থাকবে, সব জায়গায় দাঙার আগুন লাগবে।

- হুম।

- তাই বলছিলাম, একটু কড়া ভাবে যদি কন্ট্রোল করা যেতো। সেরকম নির্দেশ..

- আচ্ছা, এত বয়স হলো তোমার। রাজনীতি কবে বুঝবে? ধরো তোমার কথাই সত্যি। ওরা রথযাত্রা করলো। দাঙা লাগালো। সেটা ভালো না খারাপ?

- ভালো না খারাপ? ইয়ে, মানে?

- আরে ছাগল, দাঙা লাগলে কি হবে? বাড়ি ঘর জ্বলবে, অনেক লোক ঘরছাড়া হবে, ক্যাম্পে যাবে। কয়েকজন খুনও হতে পারে। তারপর সেই সমস্ত ছবি টিভিতে দেখানো হবে, পেপারে বেরোবে। তাতে কি হবে? লোক ভয় পাবে। ভয়, ভীতি, প্যানিক - এইগুলো হলেই মানুষ পরিত্রাতা খুজবে। সামনের বছরে নির্বাচন। ভয় পেলে মানুষ এই দাঙাবাজদের আটকাতে আমাদের দিকেই আসবে। 

- কিন্তু আগে থেকেই দাঙা আটকানো ভালো না?

- আগে থেকে আটকালে তো কোন ক্রাইসিসই হলো না। ভয় নেই। প্যানিক নেই। তখন দাঙা নিয়ে মানুষ চিন্তাভাবনা করবে? নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে না হলে মানুষ তখন অন্যান্য জিনিস নিয়ে ভাববে তো। তখন কি হবে ভেবে দেখেছো? 

- না, সেটা ভাবিনি।

- তাহলে ভাবো। কল্পনা করে নাও বাংলায় আমরা এর আগের কয়েকবছরে একটাও দাঙা ঘটতে দিইনি। কড়া হাতে দমন করেছি। কেউ মারা যায়েনি। কোন রক্ত ঝরেনি।  আজকের মতন মানুষ সাম্প্রদায়িক হিংসে নিয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে নেই। এরকম পরিস্থিতিতে এই যে আমাদের দলের প্রমোটারের অত্যাচারে বেকার যুবক নবান্নের সামনে এসে নিজের গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যা করলো বা তারপর ধরো ৭টা শবর অনাহারে মারা গেলো। তখন টিভি, পেপার, পাব্লিক স্পেসের আলোচনা-আড্ডা কি নিয়ে হতো? সেখানে আমাদের কি হাল হতো?

- এটা ভাবিনি।

- জানি। তাই ভাবতে বলছি। ধরো রথযাত্রা পরবর্তী হিংসেয় একজন মারা গেলো।  এই যে ৭জন শবর না খেতে পেয়ে মারা গেলো, তার থেকে দশগুন বেশি দৃশ্যমান হবে সেই ঘটনা। সবাই অনেক বেশি নাচানাচি করবে। কারন আপাতত বাজারে সাম্প্রদায়িকতার টিআরপি বেশি। তাহলে সেটা আমাদের জন্যে ভালো, না খারাপ?

- আপনি কি ব্যাটম্যান দেখেছেন? ওখানে জোকার এরকমই বলেছিলো - No one bothers when things go according to 'plan'..

- তুমিও কি বোকা লিবারবাল হয়ে গেলে নাকি? এরকম জ্ঞানপাপীদের মতন ডায়ালগ ঝাড়ছো কেন? যাই হোক, তাহলে এই নিয়ে আর কনফিউশন নেই তো? একটু ঝামেলা হলে ভালো। বাদবাকি দায়িত্ব লিবারবালরা নিয়ে নেবে। নেচে কেদে সমস্ত স্পটলাইট ওই দাঙাতেই ফোকাস করাবে। আর কিছু আছে?

- হ্যা, আর দুটো বিষয়। ওই শ্রমিক-কৃষক সংগঠনগুলোর পর পর কিছু দেশব্যাপী কর্মসূচী আছে।

- তাতে আমাদের কি?

- ওই কর্মসূচীগুলোর মধ্যে একটা ৮-৯ই জানুয়ারীর সারা ভারত সাধারন ধর্মঘট আছে। সেটা তো আমাদের রাজ্যেও হবে।

- সর্বশক্তি দিয়ে আটকাতে হবে। আমাদের রাজ্যে কোন শ্রমিক কৃষকের ব্যাপার নেই। ওসব যেন এখানে দৃশ্যমান না হয়। আজকে বলছে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে, কালকেই একই ইস্যুগুলো আমাদের দিকে ঘুরিয়ে দেবে। চাষ নিয়ে যা বলছে তা তো আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রেও সত্যি। তখন সামলাবো কি দিয়ে? আমাদের রাজ্যে যা হবে স্রেফ এই হিন্দু-মুসলমান-সেকুলার-দাঙাবাজ লাইনে, বুঝলে? নাহলে আমাদের চাপ আছে। শেষ বিষয় কি?

- ওই যে আপনি সরকারি ফুড ফেস্টিভাল করছেন না - আহারে বাংলা, আজ ওটার বাইরে বিরোধী বিধায়ক বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন ওই ৭ শবরের অনাহারে মৃত্যু নিয়ে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর আগে তো আবার ওই কয়েকটা ছেলেকে মাওবাদী বলে গ্রেপ্তার করা হলো। এই ঘটনাটা সামনে চলে আসছে বারবার। 

- হুম। দেখি মিডিয়ার লোকজনের সাথে কথা বলে। শোভন আর বৈশাখীর ব্যাপারটা বেশি বেশি করে প্রচার করলেই লোকে আর অন্যকিছু নিয়ে মাথা ঘামাবে না। দলেও বলে দেবো, এই বিষয় কিছু বাইট ফাইট দিয়ে পাব্লিক কে একটু বিভ্রান্ত রাখতে। আর কিছু?

- না। আসি তাহলে।

- এসো।

(প্রায় দু দশক আগে, লালুপ্রসাদ যাদব এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন - 'সরকার না চাওয়া, তো দাঙা না হোওয়া')


শনিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৮

বনপলাশীর পাখ-পাখালি ~ মিনহাজ

এই যে আমরা শহুরে বাঙালিরা ইট কাঠ পাথরের জঙ্গলে দৌড়তে দৌড়তে হাঁপিয়ে গিয়ে একটু খানি দম ফেলার ফুরসত পেলেই ছুটে যাই গ্রাম বাংলায় তার একটা উদ্দেশ্য নিশ্চিত ভাবে গাছপালা নদী নালা পাহাড় টিলা র সৌন্দর্য্য আর সঙ্গে দূষন মুক্ত পরিবেশে ফুসফুসে কিছুটা বাড়তি অক্সিজেন জুগিয়ে নেওয়া। তারপর ফিরে এসে নতুন উদ্যমে আবার দৌড় শুরু করা। কেউ ইঁদূরর আর কেউ বা বেড়াল হিসাবে।এরকম ই এক উদ্দেশ্যে গত পুজোয় ১১ জন বন্ধু বান্ধব কাচ্চা বাচ্চা মিলে ঘুরে এলাম মুরুগুমা। পুরুলিয়ার পশ্চিম প্রান্তে অযোধ্যা পাহাড়ের ঢালে মুরুগুমা ড্যাম। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন প্রাক্তন ছাত্রের যৌথ উদ্যোগে প্রকৃতির কোলে ছবির মত সুন্দর রিসর্ট-বনপলাশী ইকো হাট। ছিম ছাম-খোলা মেলা গাছ গাছালি পুকুর- আড্ডা ঘর-গেজিবা সমেত একটা দারুণ ব্যাপার।প্রয়োজনীয় সব আছে কিন্তু বাহুল্য নেই। ড্যামের পাশে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখা- পাকদন্ডি ধরে গাড়িচালিয়ে উঠে যাওয়া পাহাড়ে জঙ্গলে আদিবাসী গ্রামে ঘুরে বেড়িয়ে তিনটে দিন কেটে গেল হুস করে। মাঝে একটা দিন বাঁশপোড়া চিকেন আর ঝলসানো শোল মাছ সহযোগে খানাপিনা আর একটা সন্ধে পুরুলিয়ার বিখ্যাত ছৌ নাচের আসর আমাদের বেড়ানোর আনন্দ কানায় কানায় ভরিয়ে দিয়েছিল। সে কথা বিস্তারে লেখা যাবে অন্য কোন সময় । আজ লিখব একটু অন্য বিষয়ে।











এরকম পারিবারিক বেড়ানোর পাশাপাশি আমার ব্যক্তিগত আগ্রহের একটি বিষয় হল পাখি। রঙ বেরঙ এর বিভিন্ন ধরনের দেশ বিদেশের পাখি বিভিন্ন সময় আসে আমাদের এই বাংলার আনাচে কানাচে। তাদের দেখা আর ছবি তোলার মধ্যে একটা অনাবিল আনন্দ আছে। সেই কারণে কোথাও বেড়াতে গেলে আমার ক্যামেরার ব্যাগ টা সঙ্গে নিয়ে নিই।

মুরুগুমা আলাদা করে পাখির জন্য খুব একটা বিখ্যাত জায়গা না হলেও গাছ পালা-খাল বিল আছে আর পাখি থাকবে না এমন হয়?
পৌঁছনর পরের দিন তাই একটু ভোর ভোর উঠে আশপাশ টা ঘুরে দেখার বাসনায় বেরতে যাব ওমনি দেখি আড্ডা ঘরের খড়ের চালে বাসা বানাতে ব্যস্ত বেশ কয়েকটা মুনিয়া পাখি। এদের ইংরেজী তে বলে Silver bill। পাশেই ছোট্ট পুকুর। পুকুর পাড়ে মাছ কিম্বা ব্যাঙ পাকড়ানোর ধান্দায় ঘুরে বেড়াচ্ছে ধবধবে সাদা বক (Little egret) আর ল্যাজ নেড়ে নেড়ে খেলা করছে ছোট্ট পাখি খঞ্জনা (White Wagtail)। সারা গরম কাল ইউরোপ আর উত্তরের দেশগুলোতে কাটিয়ে শীত পড়তে না পড়তে সে চলে এসেছে আমাদের বাংলায়। 

গেটের মুখে পৌঁছে দেখি মিস্টার অ্যান্ড মিসেস রবিন (Indian robin)খেলা করছেন ইতি উতি। রিসর্টের নামের সাথে সাযুজ্য রেখেই বনপলাশীর আঙিনায় রয়েছে বেশ কয়েকটা পলাশ গাছ। পলাশের ডালে ডালে ঘুরে বেড়াচ্ছে ছোট্ট ছোট্ট সব পাখি। বসন্তে যখন পলাশ ফুটবে -পাখিদের আনা গোনাও নিশ্চয় বাড়বে। আপাতত দুর্গা টুনটনি (purple sunbird) আর pale billed flowerpecker দেখতে পেলাম। দূরে ক্ষেতের মধ্যে একটা ছোট পলাশ চারার ওপর চুপটি করে বসে আছে কাজল পাখি (Brown shrike)। চোখের ওপর কালো দাগ থেকেই এমন নাম তার। ওই টুকু ছোটো পাখি-কিন্তু কি জোর তার ওই টুকুনি ডানায়! যার ওপর ভরসা করে সুদূর মোঙ্গলিয়া কিম্বা সাইবেরিয়া থেকে পাড়ি দিয়েছিল আকাশ পথে একটু উষ্ণতার জন্য। জিপিএস নেই কম্পাস নেই-শুধু অভিজ্ঞতা আর দুডানায় ভরসা করে হাজার হাজার নটিক্যাল মাইল জিওডেসিক পেরিয়ে সে পৌঁছে গেছে আমাদের দেশে।সেপ্টেম্বর থেকে এপ্রিল আমাদের সাথে কাটিয়ে আবার ফিরে যাবে ওদেশে। ভিসা ও লাগবে না-ইমিগ্রেশনের ঝামেলা ও নেই। সংস্কৃত দেশ কথাটা র অর্থ যে ভৌগলিক সীমাবদ্ধ ভূখন্ড মাত্র নয়- এক ব্যাপক বিশাল পরিসর তা তথাকথিত সভ্য মানুষেরা না বুঝলেও এই পুঁচকে পরিযায়ী রা বোঝে।আর তাই বুঝি ছুটে আসে সেই সূর্যের দেশে যেখানে সংগীত এর নাম দেশ।
আমাদের দলনেত্রী অঙ্কের অধ্যাপিকা নীলাঞ্জনার (বউ এর ও বন্ধু আমার ও বন্ধু) ও পাখি দেখার সখ আর বেশ ভালো কোম্পানির দূরবীন দুই ই রয়েছে। সে ও দেখি ভোর ভোর উঠে রাস্তার ওপর থেকে ড্যাম এর দিকে তাক করে পাখি খুঁজছে। তার দূরবীনের অভিমুখ অনুসরণ করে দেখি একদল বেশ বড়সড় বাঁকাঠোঁট ওয়ালা পাখি আপন মনে খাওয়া দাওয়া সারছে। ক্যামেরায় চোখ লাগিয়ে দেখলাম লাল ঝুটি ওলা Black Ibis বা Red Naped Ibis (কালো দোচারা) এর দল রাস্তার ওপারে প্রায় ২০০ মিটার দূরে ড্যামের অর্ধেক শুকিয়ে যাওয়া অংশটায় চরে বেড়াচ্ছে। মিশরীয় হায়রোগ্লিফিক হরফে খুব দেখা যায় এই ধরণের পাখি র ছবি।আমিও গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম যদি একটু কাছ থেকে ওদের ছবি পাওয়া যায়। এইখানে বলে রাখি, পাখিরা কিন্ত খুব সহজেই বুঝতে পারে কেউ তাদের দিকে বাড়তি নজর দিচ্ছে কিনা।তাই যে পাখির ছবি তুলতে চান তার কাছাকাছি যাওয়ার উপায় হল তার দিকে নজর না দিয়ে এটা ওটা করতে করতে অন্যান্য দিকে তাকিয়ে রয়ে বসে এগোতে থাকা। মানে এমন একটা ভাব করা যেন ওই পাখি গুলিই সব থেকে তুচ্ছ আর বাকি সব কিছুই আপনার কাছে ভীষণ মূল্যবান। যাওয়ার পথে দেখা হয়ে গেল বেশ কিছু মাঠ চড়াই (Paddy Field Pipit) এর সাথে। তারা বেশ জোড়ায় জোড়ায় খেলা করছে নিজেদের মধ্যে। তা এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে পৌঁছে গেলাম প্রায় আধ ঘন্টা মত সময় নিয়ে আইবিস গুলোর ৩০/৪০ মিটার এর মধ্যে। তারাও খুব বেশী গুরুত্ব দিলনা আমাকে। আর আমিও প্রাণ ভরে ছবি তুল্লাম। কিছুক্ষণ পরে দেখি উল্টো দিক থেকে দুজন মানুষ দুটো সাইকেল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসছেন পাখি গুলোর দিকে। এমনি তে পাখিরা এলাকার পরিচিত পোষাক আসাক পরা মানুষ দের খুব একটা পাত্তা দেয়না। তা বলে খুব কাছে চলে এলে ওরাই বা চান্স নেবে কেন? সাইকেল আরোহীদের কৃপায় আমিও পেয়ে গেলাম ফ্লাইং শট্। ব্ল্যাক আইবিস এর ডানার সাদা দাগ গুলো উড়ন্ত অবস্থায় যতটা পরিস্কার হয় বসা অবস্থায় ততটা হয় না। আইবিস এর ছবি তুলে ফিরছি তখন। রাস্তায় ওঠার মুখে একটা বন কলমি র জঙ্গল আছে।ওটার পাশ দিয়ে আসার সময় দেখি একজোড়া ছোট্ট পাখি মাটি ঘেসে উড়ে বেড়াচ্ছে। হাভভাব আর আকারে অনেকটা ভিরিরি বা Bengal bush lark এর মত। কিন্তু দেখতে যেন একটু আলাদা! ক্যামেরার টেলি লেন্স এ চোখ লাগিয়ে বুঝলাম ইনিও Lark তবে Bushlark নন Sparrowlark। বাড়ি ফিরে Inskipp এর বই দেখে চিনলাম এর নাম Ashy Crowned Sparrowlark. এইটুকু রাস্তায় আরো চমক অপেক্ষা করছিল আমার জন্য! Sparrow Lark এর ছবি তুলে রাস্তায় উঠেছি অমনি দেখি মিহি সুরেলা গলায় ডেকে চলেছে একটি হলুদ চোখো ছাতারে (Yellow Eyed Babbler)। নামে এরা ছাতারে হলেও আমাদের পরিচিত ছাতারে বা সাতভাই এর থেকে আকারে অনেকটাই ছোটো, সুন্দর আর সুরেলা। 

ফিরে এসে আড্ডা ঘরে বসে নাস্তা সারতে সারতে ই দেখি পশ্চিমের মাঠে খেলা করছে একজোড়া ল্যাপউইং। বাংলায় আমরা যাদের বলি হো টি টি (Red Wattled Lapwing) এরা তাদের জাতভাই Yellow Wattled Lapwing. নীচে দেওয়া ছবি দেখলেই বোঝা যাবে এদের নামের উৎস কি। ব্রেক ফাস্টের পর আমি আর আমার সদ্য কৈশোর পার করা ভাইপো প্রত্যয় মিলে একটু চরতে বেরোলাম যদি আর কিছু পাখির দেখা মেলে। রাস্তা ধরেই একটু এগিয়েছি-ওমনি দেখি একটা চন্দনা মাথার ওপর চক্কর কাটছে। ইংরেজি তে এদের বলে Alexandrine parakeet। চক্কর কাটতে কাটতে কি হল কে জানে-আমাদের বুঝি তার ভীষণ পছন্দ হয়ে গেল-সে এসে বসল আমার একেবারে কয়েক হাতের মধ্যে একটা পলাশ চারার ওপর। আর আমিও কন্টিনিউয়াস মোড এ কতকগুলো স্ন্যাপ নিয়ে নিতে কসুর করলাম না। আর একটু ঘোরাঘুরি করে ভাইপো কে কিছু গাছ-পাখি চেনাতে চেনাতে ই বেশ রোদ উঠে গেল। আর রোদ কড়া হয়ে গেলে পোকা মাকড় রা ও গাছের পাতা- ছালের আড়ালে চলে যায়। ফলে পাখি দের ও আনা গোনা কমে যায়। তাই আমরা ও নিলাম ফেরার পথ। বনপলাশীর গেটে ঢোকার ঠিক আগে দেখলাম একটা কাঠ শালিখ বা Chestnut Tailed Starling শুকনো ডালের ওপর বসে আড়মোড়া ভাঙছে। কাঠ শালিখের ভঙ্গিমা ক্যামেরা বন্দি করে আর ক্যামেরা ব্যাগবন্দি করে ফেললাম সেদিন এর মত। কোলকাতা ফেরার দিন প্যাকিং এর ঠিক আগে সকাল সকাল একবার বেরিয়েছিলাম। সূর্য তখন উঠে গেছে।আগে শুনেছিলাম মুরুগুমা র ড্যামে পরিযায়ী হাঁসেরা নামে না। কিন্ত আকাশে ওগুলো কি উড়ছে দল বেঁধে? দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে। ক্যামেরার টেলি তে চোখ লাগিয়ে পরিস্কার দেখলাম বেশ বড় আকারের হাঁস! আলোর উল্টো দিকে থাকায় রঙ বুঝতে পারলাম না। কিন্ত এটা আশা করাই যায় যে মুরুগুমার জলে এবার হাঁস নামবে। 

আজ আর সময় নেই-ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়তে হবে এখনি। প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। 'আবার আসিব ফিরে' -বনপলাশীর আঙিনায়-এবার বসন্তে।
  

নভেম্বর, ২০১৮