শুক্রবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৪

অঞ্জন দত্ত ~ অমিতাভ গুপ্ত

ছেলেটা বাংলায় ৭০পেত। মাছ - ভাত ভালোবাসত। 

ছেলেটা রঞ্জনা নামের একটা মেয়েকে খুব ভালোবাসত।

ছেলেটা ভরদুপুরে সাইকেল নিয়ে রঞ্জনার পাড়ায়, রঞ্জনার বাড়ির সামনে এসে ঘুরপাক খেত - একবার বারান্দায় রঞ্জনাকে দেখবে বলে। 

ছেলেটা অল্প বয়সী ছিল, সদ্য প্রেমে পড়েছিল।

প্রেমে পড়ার সাহস থাকলেও, রঞ্জনার মেজদা'র কব্জির কারিকুরি মোকাবিলা করার সাহস ছিল না, নিজের ঠ্যাং হারানোর মত বুকের পাটাও ছিল না
ছেলেটার। 

ছেলেটা রঞ্জনাকে দুপুরে ঘুমানোর পরামর্শ দিয়ে, কোনো একটা নির্জন বিকেলে রঞ্জনার জীবন থেকে নিশ্চুপে  সরে গেছিল। আমরা অঞ্জন দত্তর গলায় শুনেছিলাম সেই অসফল প্রেমের গল্প। 

ততদিনে আমরা পা দিয়েছি কৈশোরের দোরগোড়ায়.... দেখে নিয়েছি ভেঙে পড়েছে সোভিয়েত রাশিয়া, উদার অর্থনীতি কড়া নেড়েছে আমদের দোরগোড়ায়... সুদূর অযোধ্যায় চোখের সামনে এক এক করে ভেঙে গেছে বাবরি মসজিদের তিনটে আস্ত গম্বুজ... সেই ধূলোয় ঢেকে গেছে গোটা দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আকাশ। 

আবছা হয়ে আসছিল আমাদের চারপাশ; দমবন্ধ লাগছিল; খুব দ্রুত মসজিদের সামনে দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে যেত ছেলেরা, প্রাণপণে মন্দিরের রাস্তা এড়ানোর চেষ্টা করত একটা সম্প্রদায়। 

আমরা আরো একটু বড় হলাম, জিভের তলার কষাটে স্বাদটা আরো একটু বাড়ল... সুদূর গুজরাটের গোধরার একটা পোড়া কামরার গন্ধ কিভাবে যেন চারিয়ে গেল গোটা দেশটায়। অবাক হয়ে দেখলাম, ভোটার লিস্ট ধরে মুসলমান খুন করা একজন নেতা আবার যখন মসনদে বসেন, আমার বাংলা থেকে তাকে হলুদ গোলাপের তোড়ার মোড়কে বন্ধুত্বের ইঙ্গিত পাঠান বাংলারই এক নেত্রী.... 

শিখ দাঙ্গা - বাবরি মসজিদ ভাঙার কলঙ্কিত অধ্যায় - গোধরার লজ্জার মধ্যেও যেখানে আমার বাংলায় একটাও লাশ পড়ে নি, সেখানেই কোথাও খুব সংগোপনে চাষ হচ্ছিল বিষবৃক্ষের। 

রঞ্জনার মুসলিম প্রেমিক হারিয়ে গেছে... কোথায় গেছে আমরা কেউ জানি না... রঞ্জনাও হয়ত আজ কারো গৃহিণী... ওর মেজদাদা হয়ত কাল বা পরশু ট্রেন ধরবে অযোধ্যার উদ্দেশ্যে... 

রাম বাড়ি পাবেন ২২তারিখ... 

ধন্যবাদ অঞ্জন দত্ত, আজ আপনার জন্মদিন, আপনি আমাদের কিশোরবেলাতেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন আগামী ভারতের ছবিটা... 

আমরা বুঝি নি - দোষ আমাদের।

মঙ্গলবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০২৪

সিঙ্গুরে বিপ্লব ~ সৌম্য চট্টোপাধ্যায়

কোলকাতা থেকে গাড়িতে সিঙ্গুরের রাস্তা গুগল ম্যাপে দেখায় দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে। যে সময়ের কথা বলছি, তখন ২০০৮ এর সেপ্টেম্বর মাস।পুরো দেশ, হুগলির সিঙ্গুরের দিকে তাকিয়ে, জমি আন্দোলন তুঙ্গে। ন্যাশানাল হাইওয়ে অবধি যখন তখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শয়ে শয়ে ট্রাক চুপচাপ দাঁড়িয়ে, এখানে ওখানে টায়ার পোড়ানো, রাস্তায় বিভিন্ন জায়গা আটকে, যে পারছে শুয়ে-বসে পড়ছে।বোম্বে রোডের ঝামেলা বাইপাস করে সিঙ্গুরে আসার অন্য রাস্তা হচ্ছে জিটি রোড ধরে সোজা শেওড়াফুলি- বৈদ্যবাটী, সেখান থেকে তারকেশ্বর রোড। এভারেস্টের যেমন বেস-ক্যাম্প হয়, তেমনি স্ট্যালিনগ্রাদ সিঙ্গুর যাবার বেস-ক্যাম্প হলো শেওড়াফুলি। 

ফাঁড়ির মোড়ে, বৈদ্যবাটী চৌমাথায় আকছার ইটিভি বা আজতকের গাড়ি দাঁড়িয়ে। গলায় ব্যাজ ঝুলিয়ে রিপোর্টার পরোটা খাচ্ছে, কোল্ড ড্রিঙ্কস কিনছে।ফাস্ট-ফুডের দোকানের বেঞ্চে খদ্দরের পাঞ্জাবী, লিনেন শাড়ি, অক্সিডাইজড জুয়েলারি পরা বিপ্লবীদের দল। শান্তিতে গোল্ডফ্লেক কিংসটা শেষ করে, পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যোগ দেবেন। প্রণয় রায় ন্যাশানাল টেলিভিশানে বললেন, মনে রাখবেন, হুগলীর এই ছোট্ট গ্রাম ঠিক করে দেবে জমির অধিকার কার! এরকম আনন্দমেলার কমিকস পড়তাম, এস্টেরিক্স-ওবেলিকস, গলেদের ছোট্ট গ্রাম, রোমানরা ঘিরে ফেলেছে, কিন্তু এই গ্রাম লড়ছে। সিঙ্গুরও তাই, চারিদিকে লোভী বুর্জোয়ারা জিতে গিয়ে কোকা-কোলা খাচ্ছে। বিবেক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একা সিঙ্গুর, এযুগের লেনিন সাদা শাড়ি পরে ধর্নায় বসে।  
  
এনডিটিভির রিপোর্টার সেদিন যেখানে দাঁড়িয়ে ন্যাশানাল টেলিভিশানে লাইভ এসেছিলো, সেটা সিঙ্গুর ছিলো না, শেওড়াফুলি ছিলো, চৈতালি সঙ্ঘ ক্লাবের সামনে।তার পাশে আমরা আড্ডা মারতে যেতাম। আমার এক বন্ধু আজো দাবী করে ন্যাশানাল টেলিভিশানে তাকে দেখিয়েছিল, স্ট্যালিনগ্রাদ সিঙ্গুরে ক্যাপিটালিস্টদের চোখে চোখ রেখে, সে হাফপ্যান্ট পরে বিড়ি খাচ্ছে।অক্টোবরের ৩ তারিখ, ২০০৮, দিনটা স্পষ্ট মনে আছে। সেদিন রতন টাটার কলকাতায় প্রেস কনফারেন্সে টাটাদের পাততাড়ি গোটানো কনফার্ম হয়েছিলো। 

স্টেশান থেকে বেরিয়ে ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়েছি যখন, দেখি জিটি রোড বন্ধ করে বিজয় মিছিল হচ্ছে। মিছিলের শেষে একটা রিকশায় লাল ভেলভেটের জামা পরে একটা ছেলে কীবোর্ডে "সাত সমুন্দর পার ম্যায় তেরে পিছে পিছে আ গ্যয়ি' বাজাতে বাজাতে যাচ্ছে, সামনে ড্রাম বাজাচ্ছে আরো কয়েকটা লাল ভেলভেট। ব্যাঞ্জো থেমে গেলে, মাইকে ঘোষণা হয় আর কিছুক্ষণের মধ্যেই সিঙ্গুর থেকে শেওড়াফুলি আসছেন মহাশ্বতা দেবী, মেধা পাটেকার সবাই। উত্তেজনা তুঙ্গে। শেষ সেলেব নাম ঘোষণা হয়, অপর্ণা সেন। মিছিলের জনতা ফুটছে পাগলা আনন্দে, মনে হচ্ছে দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস। 

সেই নাম ঘোষণার পরেই সেদিন শনি-মন্দিরের সামনে ফলের দোকানদার তপাদাকে ফেলে পেটানো হয়, ছোট্ট ঘটনা বলতে পারেন। বিপ্লবে তো তাই হয়, বুর্জোয়া মার খায় ইত্যাদি প্রভৃতি।  বড় পিয়ারা আর নাসপাতিগুলো তপাদার দোকানে সাদা ফোমের নেটে জড়ানো থাকতো। মেরে যখন তপাদার মাথাটা ড্রেনে ঢুকিয়ে দিয়েছে, জল থেকে বিজগুড়ি কাটছে শ্বাসটুকু, তপার মাথার পাশেই ড্রেনের জলে ক্যাম্বিস বলের মতো ভাসছে ইয়া বড়ো বড়ো পিয়ারা। রিকশার লাল ভেলভেটের জামা বাজাচ্ছে, 'ও জুলফি মেরী জাআন, তেরে কাদমো কে নীচে আ গাই, ও ও সাত সমুন্দর...'। মেধা পাটেকার, মহেশ্বতা দেবী সেদিন আসেননি। অপর্ণা সেনও না। আসার কথাও ছিলো না মনে হয়। 

পরের দিন শাসক, মানে তখনকার শাসক, সভা করে বলেছিলো, আমরা জবাব দেবো, ভুলবো না একদম, এইসব আরকি। যিনি বলেছিলেন, তিনি একমাস পরে দলবদল করেন। ভদ্রলোক বলতেন ভালো। বিরোধী দলে, মানে তখনকার আরকি, গিয়ে গ্রামীণ সাবঅলটার্ণদের উত্থান, ভদ্দরলোকেদের এলিটিজমের পতন, উচ্চবর্ণের বাবুদের উঁচু-নাক তিনি দেখেছেন, এসব বলতেন। হাততালিও পেয়েছেন মন্দ না। সেইদিনটার তেরো বছর পর, ৩১শে জানুয়ারী, ২০২২, রাজ্য সরকার সিঙ্গুরের জমিতে মাটি কেটে ভেড়ি বানিয়ে চারাপোনা চাষের সিদ্ধান্ত নেয়। 

জানি না এই লেখা কি করে শেষ করবো, কথায় কথা আসে হইহই করে। ফেসবুকে এরকম লেখা মুশকিল, ফেসবুক বড় লেখার জায়গা না। এই লেখাতে কোন গন্তব্য নেই, এইরকম বহমান লেখা ফেসবুকের পোলারাইজড স্পেকট্রামে দাঁড়াতে পারে না। সোশ্যাল মিডিয়া এনগেজমেন্টে বেঁচে থাকে। কিন্তু সবদিন একটা শোম্যানশিপ, প্লেয়িং টু দ্য গ্যালারি থেকে লেখা আসে না, কিছু লেখা শুধুই কথা বলার জন্য। যেটা বলে শেষ করি, তপাদার ছেলে পলিটেকনিক করে বাইরে থাকে জানতাম। কাল পাড়ার হোয়াটসয়াপ গ্রুপে জানলাম মুম্বাইয়ের অটল সেতুর কাজে যুক্ত ছিলো বেশ কয়েকবছর। আর নিতান্ত কাকতালীয় ভাবে, কদিন আগেই দেখলাম, সেই জ্যেঠু পোস্ট দিয়েছেন ইউক্রেন না প্যালেস্টাইন কোথায় একটা অত্যাচারের বিরুদ্ধে, ক্যাপশানে, মানুষের এতো কষ্ট ...সব ইয়াদ রাখ-খা জায়গা। 

না হে জনাব, কিছুই কেউ ইয়াদ রাখে না, ওরকম শুধু বলতে হয়, শুধু আমাদের বয়স বেড়ে যায়। কারুর ছেলে ব্রিজ বানায়, বন্দর বানায়। কেউ মাছের ভেড়ি আর চব্বিশ পরগণায় বাগানবাড়ি কিনতে থাকে, কিনতেই থাকে। আর আমি ১৫টা বছর পার করে হাসির গল্প লিখতে বসি।সোফায় বাদামী চশমা পরে বিবেক সেজে অপর্ণা সেনকে এনে বসাই। সেদিনের মতো, আজো ওনার আসার কথা নয়, তাও আসতে বাধ্য হন। 

আমি দেখি আমার টাইমলাইন জুড়ে মানুষ হাসছে, হাসতেই থাকছে।
সব রম্য নির্মল নয়। কিছু রম্য ব্যঙ্গ।

সোমবার, ৮ জানুয়ারি, ২০২৪

ইনসাফ ব্রিগেড ~ অবিন দত্তগুপ্ত

সাংবাদিক - জমায়েত দেখে খুশি তো মীনাক্ষী?
মীনাক্ষী - সংখ্যার থেকেও বেশি খুশি মেজাজ দেখে।
সাংবাদিক - শুধু মেজাজ দিয়ে হয় নাকি। সংখ্যা কি বেশি গুরুত্বপূর্ন নয়?
মীনাক্ষী - একেবারেই না। কিউবার বিপ্লব শুরু হয়েছিল ৫০ জনের থেকেও কম লোক নিয়ে। কিন্তু মেজাজটা ছিল। 
সাংবাদিক - সেই মেজাজটা দেখলেন?
মীনাক্ষী - কুচবিহার থেকেই দেখছি। আজকে সারা মাঠ জুড়ে সেই মেজাজকেই দেখলাম।

এটা মেজাজ অথবা সংখ্যা, এসব কিছুই নয়। ভবিষ্যতের ছবি।


শনিবার, ৬ জানুয়ারি, ২০২৪

মাল, চাট ও কলকাতা ~ মানস নাথ

কলকাতার বার বা মদের ঠেকগুলো নিয়ে নানা কারুকার্যময় গালগল্প, মিথ ঘুরে বেড়ায় রসিক সমাজে। এই সব গল্প ঠেক আড্ডার একটা নিজস্ব জগৎ আছে।এই ঠেকগুলোর আছে নিজস্ব ডাকনাম বা আদরের নাম।  এক দাদার হাত ধরে ভবানীপুরের গ্রীন প্যালেস বারে যাওয়া থেকে সেই জগতে আমার এন্ট্রি। তবে আজকে মদের নয় চাটের গল্প বলতে ইচ্ছে করছে।
নেশাড়ু সার্কিটে গ্রীন প্যালেস বার জিপি নামেই পরিচিত। সেখানে মালের সাথে ফ্রিতে বারের তরফ থেকে চাট ছিল এক বাটি কম মশলার সাদা চানাচুর,ভিনিগারে চোবানো পিঁয়াজ আর সরু সরু করে কাটা আদার সাথে বিটনুন। প্রতি পেগ অর্ডারের সাথে চানাচুরটা রিপিট হত। আমি তখন একপেগ রাম নিয়ে টেবিলে বসে থেকে দাদাদের মুখের গল্প শোনার পাবলিক। এক বয়স্ক নেপালী ওয়েটার ছিল জিপিতে। সবাই তাকে সাথীদা বলে ডাকত। তিনি আমাকে এক প্লেট চানাচুর এক্সট্রাই দিতেন।
উল্টোদিকে যদুবাবুর বাজারের উপরে তৃপ্তি বার। একটা সরু প্রায়ান্ধকার গলি দিয়ে ঢুকে মান্ধাতার আমলের মচমচে কাঠের সিঁড়ি দিয়ে পৌছাতে হয় সেই গুহায়। বড় বড় রাস্তার ধারের জানালা আর গোল গোল শ্বেতপাথরের টেবিল। দাম বেশ সস্তা। তবে বিটনুন আর আদা ছাড়া চাটে আর কিছু দিত না তখন।আলু কাবলি পাওয়া যেত, সেটার পরিমান দুজনের পক্ষে যথেষ্ট। 
    ঠেকের মধ্যেই রকমারি চাটের দোকান সাজিয়ে বসতে দেখেছি খালাসীটোলায়। যাকে বন্ধুরা কেত মেরে কেটি বলে ডাকত। খাঁচার আড়ালের কাউন্টার থেকে বোতল কিনে নিয়ে এসে টেবিলে বসতে হত। এবারে পাশেই সারি দিয়ে লাগানো চাটের দোকান থেকে ইচ্ছামত খাবার কিনে নিয়ে এসো। রকমারি মাছ ভাজা... এমনকি আমি কাতলা মাছের মুড়ো ভাজাও দেখেছি!  কারা মাছের মাথা দিয়ে মদ খায় কে জানে!  চিকেন, খাসির ছাঁট, মেটের তরকারি সাজানো থাকত। আলুকাবলি, চানা, ছোলা এসব তো ছিলই। শুঁটকি মাছের রসা অব্ধি দেখেছি! আমি যদিও দু তিনবারই গিয়েছি কেটিতে। তারমধ্যে একবার শর্মিদির সাথে কবি ফাল্গুনী রায়ের উপর একটা ডকু ছবির শুটিং করতে গিয়ে খুব মজা হয়েছিল। সে অন্য গল্প। 
    অলিপাবে মদ খেতে গিয়ে প্রথম খেয়েছিলাম বিফ স্টেক। আমার খুব একটা সুবিধার লাগেনি যদিও ; আর ছিল চিকেন আলা কিয়েভ। ছুরি দিয়ে কাটলেই এত্তটা গলানো মাখন বেরিয়ে পড়ে! তবে চাটের প্যারাডাইস হল গিয়ে ধর্মতলার মেট্রোগলির শ বার। সন্দীপনের লেখাতে পড়েছিলাম তারা সেই বারের নামকরণ করেছিলেন ছোটা ব্রিস্টল। সন্দীপনের মৃত্যুর পর দীর্ঘদিন শ বারের গেট দিয়ে ঢুকে বাঁ হাতের নোটশবোর্ডে ওনার ছবি সহ শোকবার্তা ঝুলতে দেখেছি।এখানে ওয়েটারের কাছে আগে পয়সা দিয়ে টেবিলে বসতে হয়! একসাথে তিন চারটে টেবিলের গোটা পনেরো গ্লাস ওয়েটার একের উপর এক সাজিয়ে একসাথে ব্যালেন্স করে নিয়ে আসে আর প্রত্যেকের সামনে অর্ডার অনুযায়ী নামিয়ে রাখতে থাকে!  আমি প্রতিবার ভাবি কার কোনটা গ্লাস মনে রাখে কী করে!! তবে শ বারের আসল মজা হল রানিং চাট এর পসরা। ট্রেতে সাজানো চাটের প্লেট নিয়ে টেবিলের পাশ দিয়ে ঘুরতে থাকে বিক্রেতারা। রকমারি সিজিনের ফল থেকে নানা রকমের ভাজাভুজি, বাদাম, ছোলা, মটর থেকে চিজ।  মাছ এবং মাংসের বিভিন্ন পদ থেকে মেটে চচ্চড়ি অব্ধি। আর দামও বেশ সস্তা। অনেকে উল্টোদিকের টিপু সুলতান মসজিদের গলি থেকে বিফ শিক কাবাব নিয়ে আসত ঠোঙায় করে। 
    মধ্য কলকাতার বিভিন্ন বারের মধ্যে এককালে মন্টি কার্লোর কথা সবাই বলত মৌরলামাছ ভাজা খাওয়ার জন্য। ইদানীং তার অবস্থা ভাল নয়। পাশের চাংওয়া অবশ্য পর্দাঘেরা কেবিনের জন্য বিখ্যাত।মদের সাথে পর্দার আড়ালে চুমু খেয়েই পেট ভরে যায়। চাট নিয়ে আর ভাবার টাইম থাকে না। সেন্ট্রাল বারে মালের সাথে ধোঁয়া ওঠা ছোলা সেদ্ধ চাট হিসাবে টেবিলে আসে সাথে আসে আদা বিটনুন,জলজিরার বাটি! তবে ইদানীং কালে সবচেয়ে বেশি ক্রেজ ব্রডওয়ে বার নিয়ে।ফেসবুকের চেনাজানাদের মিলনমেলা এখন ওখানেই। ওখানকার একটা চাটের খোঁজ দিয়েই আজকের গল্প শেষ করব। 
    ব্রডওয়ের মেনুকার্ড হাঁতড়েও আপনি সে পদটির সন্ধান পাবেন না। গুরু ধরতে হবে, জানতে হবে। পাশেই আনন্দবাজার এর অফিস,তাদের অনেকেরই নিত্য আনাগোনা ব্রডওয়েতে।আমিও এক আনন্দবাজারের কর্মীর থেকেই সেই গুপ্তধনের আর তার দরজা খোলার চিচিং ফাঁক মন্ত্রের খোঁজ পেয়েছিলাম। আপনারাও পরেরবার গিয়ে এ্যাপ্লাই করে দেখতে পারেন।ফ্লোর ম্যানেজারকে ডেকে বলতে হবে আজ ভালো ভেটকি এসেছে? উনি যদি একগাল হেসে সম্মতি দেন তাহলে বলতে হবে,  এক প্লেট মাস্টার্ড ফিস বানিয়ে দেওয়া যাবে কী?  উনি রান্নাঘরে ঘুরে এসে যদি মুন্ডি হেলিয়ে যান তাহলে নিশ্চিত জেনে রাখুন আপনার দিনটা ভালো হয়ে গেলো। তবে যদি ফিরে এসে বলে স্যার মাস্টার্ড চিকেন বানিয়ে দেবো?  তবে আপনার ইচ্ছা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাবেন কিনা।

    আমার এক বান্ধবীর সাথে বারকয়েক ব্রডওয়েতে মাস্টার্ড ফিস খেয়ে এই পদটির প্রেমে পাগল হয়ে যৌথভাবে আমরা সিদ্ধান্ত নি এটা একদিন বাড়িতে বানিয়ে দেখতেই হবে কতটা ধারেকাছে আসে। সেইমত বাজারে আসল কলকাতা ভেটকি কিনতে গিয়ে জোর ধাক্কা খাই। বিয়ের সিজিন, বেটাচ্ছেলে গোটা মাছ ছাড়া বেচবে না!  শেষে বাধ্য হয়ে দুজনের মত ভোলা ভেটকি নিয়ে আসি। কম্পোমাইজময় মধ্যবিত্ত জীবন শালা। কোন রেসিপি ছিল না, স্বাদের অভিজ্ঞতা থেকে রাঁধা। তাই আমিও কোন রেসিপি লিখছি না। আমার বান্ধবী রন্ধনে দ্রৌপদী না হলেও কাছাকাছি। ভালোই নামিয়েছিল পদটা, ছবি দিলাম। সাথে ব্রডওয়ের মাস্টার্ড ফিসের ছবি দিলাম।

বৃহস্পতিবার, ৪ জানুয়ারি, ২০২৪

একটা মেঠো প্রেমের গল্প ~ শেখ ফইজুল অালম

একটা মেঠো প্রেমের গল্প........ ‌💘
এটা ওদের কম বয়সের ছবি, চোখ মুখ দেখুন। কি উজ্বল, ঝকঝকে, বুদ্ধিদীপ্ত! ওরা নাটক করতো। করতো কারন, ছেলেটি অার বেঁচে নেই। মেয়েটি ছেলেটির স্মৃতি অাঁকড়ে বয়সের ভারে ক্লান্ত। অাজ একটু পরে ওদের কম বয়সের একমাত্র প্রেম ওদের নাটক ওরা করবে গাজিয়াবাদের সাহিবাবাদে, ঝান্ডাপুর এলাকায়।
পিছিয়ে চলুন তিন দশক, মনে করুন অাজ ১৯৮৯ সালের ১লা জানুয়ারী। ওরা রাস্তায় নাটক করে। সাধারন মানুষ, খেটে খাওয়া মজুর, দোকানি, পথচলতি মানুষ ভীড় করে দেখে সে নাটক। ওরা নাটকে শোষনমুক্তির কথা বলে। নাটকের নাম তাই " হল্লা বোল "। গাজিয়াবাদ পৌরসভার র্নিবাচনে ওরা খেটে খাওয়া মানুষের জোট কে অারো শক্তিশালী করতে চায়। সফদর হাসমি অার মলয়শ্রী। নাম দেখে আবার ধর্মের নিক্তি বার করবেন না যেন! বরং ভালোবাসার গল্পটা শুনুন অাজ অাপনার এই ফুর্তির দিনে, মন ভালো হবে। ‌♥️
নাটক শুরু হতেই ভীড় জমে গেল। বেশ জমে উঠছে নাটক এমন সময়ে স্থানীয় এক রাজনৈতিক মাফিয়া মুকেশ শর্মা অার তার দলবল ঝাঁপিয়ে পড়লো নাটকের উপর। বোমার পর বোমা, রড়, লাঠি চলতে লাগলো। সফদরকে ওরা ফেলে রড়, লাঠি দিয়ে মারতে লাগলো। মলয়শ্রী, অন্য সহকর্মীরা অাপ্রান বাঁচাতে চাইলো ওকে। জনতা ছত্রভঙ্গ। সফদর মারা গেছে ভেবে ঘাতকরা তাদের কাজ সেরে চম্পট দিলো। তাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুটলো সবাই। না, জ্বলজ্বলে চোখের ছেলেটি বাঁচেনি। পরদিন চলে গেল মেয়েটিকে একা রেখে। মেয়েটি শ্রমজীবি মানুষের কাঁধে চড়ে অন্তিমের পথে যেতে দেখেছিলো তার ভালোবাসাকে। ‌🔥
সেদিন মেয়েটি কান্নায় ভেঙে পড়েনি। প্রতিটি স্রষ্টার কাছে সৃষ্টি যেমন সন্তানসম তেমনি ওদের সন্তান নাটক কে যে সম্পুর্ন করতে হবে। শ্রেনীশত্রুর চোখে চোখ রেখে যে বলতে হবে... " এ দেশ তোমার লুঠের জন্য নয়! "
তারপর মাত্র দুদিনের অপেক্ষা, মেয়েটি তাদের সৃষ্টি, তাদের ভালোবাসা কে মঞ্চস্থ করলো ৪ঠা জানুয়ারি তারিখে ওই একই জায়গায়, একই সময়ে! হ্যাঁ, মঞ্চ.... রাস্তাই যে ওদের মঞ্চ।
সে রাস্তায় ছিল সেদিন মেহনতি মানুষের অধিকারের গর্জন........ 🛑
" জব ইনকিলাব কি ঝান্ডা লহরায়েগা....
তব না কৌই সফদর নুক্কড় পে মারা যায়েগা...." ‌
ভালোবাসা শুধু পার্কস্ট্রিটে, সিটি সেন্টারে গুনগুন করেনা। কান পাতো, সে অাওয়াজ তোমার হৃদয়ে। খালি সোচ্চারে বলতে শেখো সে ভালোবাসার কথা...." হল্লাবোল ভাই হল্লাবোল "‌🔥
৩০ বছর পরে সফদরের নামটাই হয়তো জানে না আজকের প্রজন্ম। কিন্তু যাঁদের কাছে বর্ষবরণ শুধুমাত্র আনন্দের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দেওয়ার নয়, কিংবা যাঁরা সেই দিনটিতেও জীবনের সেই চরম সত্যটা ভুলতে পারেন না যে সারা পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ বর্ষবরণের রাতে ঘুমোতে গিয়েছেন ভুখা পেটে! অন্তত সেই মানুষগুলির কথা ভেবে আজ অন্তত একবার স্মরণ করুন সফদর হাসমি আর মলয়শ্রী জুটিকে, ওদের অনবদ্য প্রেমকে ! ♥️
মূল রচনা: শেখ ফইজুল অালম
ভাষান্তর ও সম্পাদনা: স্বপন সেন

রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০২৩

পাকী তিন পোয়া হুইস্কি ~ সোমা ব্যানার্জী

কয়েকদিন জ্বরের ঘোরে পড়েছিলাম। আর আট ভাট কত কথাই ভাবছিলাম। কেন জানিনা কফি হাউজের ভেটকির কথা খুব মনে পড়ছিল। আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি। কোন এক দাদা যেন ভেটকিকে দেখিয়ে আমাকে বলেছিলো, ওই দেখ ভেটকি, কফি হাউজের মহাপুরুষ। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে মদ খায়। বাকি সবার সঙ্গেও মদ খায়। মাঝে লিভারটা একটু খারাপ হয়েছিল। তাই এখন লিভ ফিফটি টু  দিয়ে মদ খায়। ভেটকিকে দেখেও যেন মনে হল দ্রব্যগুণেই আছে। চোখ মুখে সামান্য একটু লালচে আভা, যেন ঝামরে জ্বর আসছে। আমি মানসচক্ষে দেখতে পেতাম যে ভেটকি এক মনে মদ খাচ্ছে আর তার পাশে রাখা আছে চাটের বদলে একটি লিভ ফিফটি টু এর কৌটো। বিগড়ে যাওয়া মেটে, রগড়ে ঠিক করে নেওয়ার জন্য গম্ভীর মুখে, কয়েক চুমুক মদের পরেই একটি করে ট্যাবলেট গলাধঃকরণ করছে সে।

আমার তখন বাস্তবে মদ খাওয়া নিয়ে ধারণা খুব একটা স্পষ্ট ছিলো না। মদ খাওয়া যা দেখেছি সব সিনেমায়। বাবার কাছে বরাবর শুনেছি যারা মদ বা সিগারেট খায় তাদের চরিত্র খুবই খারাপ হয়। আর যে সব মহিলারা ওইসব খায় তাদের সম্পর্কে তো ইয়ে, যত কম বলা যায় ততই ভালো! হাউজে কিছুদিন আসার পর, টেবিলে এর ওর থেকে সিগারেট চেয়ে দু-এক টান দিয়ে দেখলাম। ভালোই লাগলো। আমার চরিত্র কেউ টান মেরে ধরে হিড় হিড়  করে অনেক নিচে নামিয়ে নিয়ে গেল বলে তো মনে হলো না। বরং স্বামী বিবেকানন্দের মতো জিজ্ঞাসু মনে এর তার হুঁকোয় পরীক্ষামূলক টান মেরে দেখা হল জাত যায় কিনা। পরীক্ষার ফলাফল? দেখা গেল আমার মন পবিত্র হলে কি হবে আশেপাশের ছেলেরা খুবই হিংসুটে। দু'দিন যেতে না যেতেই তারা বললো তুই তোর সিগারেট কিনে খা! আমারটা দেব না, ইত্যাদি। 

তবে কফি হাউজের নিভে আসা মরা মরা আড্ডায় সবসময় দেখতাম মাতালদের নিয়ে চুটকি বলা হতো। ডজন খানেক এইধরণের চুটকি সব টেবিলেরই হট ফেভারিট ছিল। আড্ডার মরা আঁচে ফুঁ দিতে, বহু ব্যবহৃত ক্লিশে চুটকি গুলো কিন্তু বেশ কাজে দিত! মাঝে মাঝে ওই সবকটা জোকস পুনরায় বসে শোনবার ভয়েও লোকজন তাড়াতাড়ি উঠে বসে কথা শুরু করে দিত! ছেলেরা কোথাও তিনদিনের জন্য বেড়াতে গেলে ফিরে এসে সাতাশ দিন ধরে তার গল্প শোনাত। এক দিন বলতো বেড়াতে গিয়ে কি কি দেখেছে, আর ছাব্বিশ দিন ধরে বলতো কে কে মদ খেয়ে কি কি বিচিত্র আচরণ করেছে! এইসব খিল্লির ফার্স্ট হ্যান্ড অভিজ্ঞতা থেকে আমরা মেয়েরা বঞ্চিতই রয়ে যেতাম। কারণ বাড়ি থেকে কোনোভাবেই অনুমতি পাওয়া যেত না বেড়াতে যাওয়ার। একদল ছেলের সঙ্গে চার-পাঁচ দিন টানা বেড়াতে যাওয়ার প্রসঙ্গ তোলাই যেত না বাড়িতে। আমার বাড়িতে তো একটা একদিনের পিকনিক যাওয়ার জন্য অনুমতি নিতে যা পরিশ্রম করতে হতো, যে আসল পিকনিকের দিনটায় আমার খুব ক্লান্ত লাগতো। মনে হতো গাছতলায় শুয়ে একটু  বিশ্রাম নিই। বা এইসব তুশচু হাসি ঠাট্টা খাওয়া দাওয়ার প্রলোভন পরিত্যাগ করে বানপ্রস্থে চলে যাই। চিত্রকূট পাহাড়ে গিয়ে দুর্বাসা মুনির পেছনে লুকিয়ে থাকি। যে শালা আমাকে খুঁজতে আসবে সে ভস্ম হয়ে যাক বা হাফ ডজন অভিশাপের গুঁতোয় ধরাশায়ী হোক!

যাই হোক, বহু ক্লাস মিস করে, গভীর মনোযোগ সহ সব বেড়ানোর গল্প শুনে, ভালো রেজাল্টের আশা অলকানন্দার জলে ভাসিয়ে দিয়ে, আমি আমার চেনা বন্ধুদের মনে মনে কিছুটা ক্লাসিফাই করতে শুরু করি। প্রথম দল ছিলো চার আনার খেয়ে আট আনার নাটক করা টাইপ। এই দলে সবার আগে নাম ছিল বোধহয় বুম্বা আর কামুর। এরা শক্ত পানীয় দু তিন চুমুক খেয়েই, নিজ নিজ বন্ধুবৃত্তে নিজেদেরকে হলমার্ক যুক্ত 'আসল মাতাল' প্রমাণ করার জন্য মহা উৎসাহে ড্রামা আরম্ভ  করতো। টিভির সব ঝুল সিরিয়ালে এবং হলে সব হিট সিনেমায় মাতালদের যা যা করতে দেখেছে সবই এক এক করে করত এরা। কিছুই বাদ যেত না।

এদের ঠিক বিপরীত মেরুতে ছিল আরেকটি দল। এরা অনভ্যস্ত শরীরে কিছু পরিমাণ অ্যালকোহল ঢোকায় মাথা ভোঁ ভোঁ করলেও কিছুতেই তা স্বীকার করত না।  কিচ্ছুটি হয়নি ভাব দেখিয়ে, নির্লিপ্ত মুখে ঘরের এক কোনায় একটি চেয়ারে চুপ করে বসে থাকতো। হঠাৎ করে 'একটু আসছি' বলে বাইরে গিয়ে বমি করে আবার এসে অম্লানবদনে বসে থাকতো। 'কিছুই হয়নি'র প্রমাণ স্বরপ মাঝে মাঝে স্মিত হেসে 'পা থেকে মাথা পর্যন্ত টলমল করে, দেয়ালে দেয়াল, কার্নিশে কার্নিশ' আবৃত্তি করে শোনাতো। তিন চার লাইন আবৃত্তির পর যেখানটাতে হোঁচট খেত, সেখানে থমকে গিয়ে আবার গোড়া থেকে শুরু করতো। তারপর কেমন একটা লুপে পড়ে যেত। এটা মোটামুটি চলতেই থাকতো।

আর একদল ছিল যারা নিজেদের মস্ত বড় কনোসার ভাবতো। কোনরকম লঘু ক্রিয়া-কলাপ বা বালখিল্যের মধ্যে এরা নিজেকে জড়াতে অপছন্দ করতো। এরা এসে থেকে আকাশে নাক তুলে বসে থাকতো আর বলতো, এই তোরা যে যা পারবি খেয়ে নে। দেখি কার কতটা দম আছে। একটু পরেই অ্যামেচারের দল কাত হয়ে গেলে এরা গম্ভীর মুখে নীলকন্ঠ অবতারের মতন এসে যেখানে যা মদ পড়ে আছে সব ঢক ঢক করে অনায়াসে খেয়ে শেষ করে ফেলত। তবে এরা নিজেদের যোগ্য সম্মান পেতো না দলের কাছে। এদেরকে সবাই ব্লটিং পেপার বলে ডাকতো। অথবা স্পঞ্জ।

এইসবের বহু বছর পরে আমি বাচ্চা নিয়ে সুকল্পদের সাথে বেড়াতে গিয়ে মোনালিসার অভিজ্ঞতা শুনি। সেটা এখানে না বললেই নয়। বিয়ের আগেই সুকল্প তার প্রেসিতে পড়া মিষ্টভাষী হবু স্ত্রীকে বলে নিয়েছিল, আমি কিন্তু বেড়াতে গেলে মদ খাই। মোনালিসা বেচারা এতে দোষের কিছুই দেখতে পায়নি । সে সোনামুখ করে আচ্ছা বলেছিল। বিয়ের দু এক মাস বাদেই সুকল্প বলে চলো, বেড়াতে চলো। তারপর সুকল্প তার তিরিশজন বন্ধুর বিশাল দলে বউ নিয়ে মহাসমারোহে দীঘা ঘুরতে গেল।
সকালবেলায়  বন্ধুদের নিয়ে সমুদ্রে চান করতে গেল। গেল তো গেল, আর ফেরার নাম নেই!  উদ্বিগ্ন মোনালিসা  তখন জনে জনে জিজ্ঞেস করতে থাকলো, হ্যাঁ গো, আমার বর কোথায়? অধিকাংশই টইটুম্বুর মদ খেয়ে ওকে পাত্তাই দিলো না। পরে, কে একজন মায়া করে আঙুল দেখিয়ে বলে দিল, ওই তো আসছে। সেদিকে তাকিয়ে মোনালিসা কিছুই দেখতে পেল না। তারপর সেদিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখতে পেল সুকল্পকে চ্যাংদোলা করে আনা হচ্ছে। হুঁশ নেই। বিকেলবেলায় মোনালিসা সুকল্পকে অনেক ডাকাডাকি করেও তার ঘুম ভাঙাতে পারেনি। সন্ধ্যেবেলায় নিরুপায় মোনালিসা দলের মধ্যে এক দাদার সঙ্গে কি সব মালা ফালা কিনতে দোকানে গেছে। সেখানে আবার এক পরিচিতের সঙ্গে দেখা হয়েছে। দু এক কথার পরেই সে জুলজুল করে চেয়ে মোনালিসাকে ফিসফিস করে বলে, তোর বরের ছবি তো আমরা দেখেছি আগে। তোর সাথে আজ যাকে দেখছি এ তো তোর বর নয়! থতমত খেয়ে মোনালিসা হ্যাঁ মানে, না মানে, বর নয় ঠিক, বরের বন্ধুর সাথে... এইসব আবলান জাবলান অসংলগ্ন উত্তর দিয়ে রাগ করে হোটেলে ফিরে আসে...

কাল বছরের শেষ দিন। তাই আজ সমস্ত মদের দোকানে প্রচণ্ড ভিড়। বুড়ো বাচ্চা লেডিজ জেন্টস সবাই লাইন দিয়েছে। বছর শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে। হয় দুঃখে নয় আনন্দে, কি জন্যে ঠিক বলতে পারবো না। হেমিংওয়ে বলতেন, "I drink to make other people more interesting." সেটাই হল কি? আমরা সকলে কি একে অপরের মুখ দেখে খুব বোর হচ্ছি? চারপাশে সবার সবাইকে খুব বিস্বাদ লাগছে?  নিজের মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতেই ভাবি, সত্যি মাইরি, কি আত্মমগ্ন, যান্ত্রিক লোকজন আমরা সবাই। এর চেয়ে ভেটকি অনেক ভালো ছিলো, ইন্টারেস্টিং ছিলো! কাব্যলোকে আসছে কাল মনে হয় মোবাইল নিয়ে ঢোকা বারণ। মধ্যরাতে মুমূর্ষু তেইশ সালটিকে আলতো করে মদিরায় ভাসিয়ে দেবেন শক্তি আর ভেটকি। নতুন বছরের চিবুক ধরে আদর করে বলবেন, "থুৎনিপরে তিল তো তোমার আছে/ এখন? ও মন, নতুন দেশে যাবি?"

মঙ্গলবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

জীবনের ধাঁধা ~ রজত শুভ্র ব্যানার্জী

মানুষের মেজো ছেলে লোম পরে হুপ হাপ করে,
নিজেকে দেখিয়ে বলে, দেখো, আমি কত বড় হনু,
ওই দূরে বড় মাঠে গোটাকত গরু মোষ চরে,
মেঘ কাটে অবশেষে, আকাশে গজায় রামধনু।

উঠনে তুলসী তলা, ছাগলেরা তায় মাথা ঠোকে,
দু'খানা নেংটি এসে এক কোণে দানা পানি গোঁজে,
পাখিরা বাসায় ফেরে, ইয়ে ক'রে সম্মুখে ঝোঁকে,
পাশে কটা বুড়ো ভাম বসে থাকে সুযোগের খোঁজে।

হঠাৎ পটকা ফাটে, সবাই শিউরে ওঠে ত্রাসে,
আগুন জ্বলতে থাকে সীমানার এধারে ওধারে,
পিপীলিকা ভ্যাবাচ্যাকা, সভয়ে লুকিয়ে পড়ে ঘাসে,
দু'একটা সারমেয় ইতি উতি চেয়ে ল্যাজ নাড়ে।

আর কেউ জানুক বা না জানুক, জন্তুরা জানে
অবশেষে ভগবান ভুলেছেন জীবনের মানে। 

RSB (2023-12-19)

শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২৩

মৎসপুরাণ ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

পারশে নাহয় সর্ষে দিয়ে রেঁধে 
শীতের দুপুর ট্যাংরা পেঁয়াজকলি
বাজার গেলাম চিংড়ি দিল সেধে
ইলিশ কে কি মাছের সেরা বলি!!

গোল বাঁধাল মৌরলা আর পুঁটি
মাছ কাটবার বিভিন্ন পদ্ধতি 
আছেন মাসি, সামান্য ভুল ত্রুটি 
ভেটকি নিলেও এমন কি আর ক্ষতি।।

রুই কাতলা রাজার মত শুয়ে
কেউ খুঁজেছে চিতল মাছের পেটি
মাগুর সিঙ্গি পাবদা বরফ ছুঁয়ে 
কাজরি যেন বড়লোকের বিটি।।

বোয়াল যেন ধ্যানস্থ এক সাধু
উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে শোল
ওভাররেটেড তোপসে জানে জাদু
তেলাপিয়া বাঁধায় গন্ডগোল।। 

সাতসকালে মাছের বাজার টানে
মৎসপুরাণ স্বাদকাহনের মানে।।

শনিবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৩

সুজানা ~ কৌশিক মজুমদার

প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার সাত খুন মাফ সিনেমাটা আছে না? ওই যে যেখানে উষা "দিদি" উত্থুপ আর রেখা ভরদ্বাজ মিলে "ডা-র-র-র-লিং" বলে একটা গান গেয়েছিলেন (যেটা আবার রাশিয়ান গান কালিঙ্কা থেকে অনুপ্রাণিত)...মজার ব্যাপার এই সিনেমাটার আসল শিকড় লুকিয়ে আছে চুঁচুড়ার মাটিতে। 

খাদিনা মোড় থেকে প্রিয়নগরের দিকে যেতে বাঁ হাতে জি টি রোডের ধারে সাদা মন্দির টাইপ একটা স্থাপত্য চোখে পড়ে। অচেনা লোকেরা এঁকে মন্দির ভাবেনও..কিন্তু এখানকার বাসিন্দারা জানেন এই মাটিতে শুয়ে রয়েছেন "সাত সাহেবের বিবি" সুজানা আনা মারিয়া ভারকার্ক। নামটা চেনা চেনা লাগছে? রাস্কিন বন্ড তাঁর বিখ্যাত চার পাতার গল্প Susanna's Seven Husbands এ নায়িকার ঠিক এই নামই দিয়েছিলেন। গল্পের প্লট এক কথায় বন্ড এই রকম বলেছেন "When a guy visits the ruins of an old haveli on G T Road, Old Delhi, he was told the story of the mysterious haveli owner, Susanna and killings of her husbands..."

দিল্লীকে আপাতত ভুলে জি টি রোড আর সুজানা নাম দুটো আমাদের আগ্রহ বাড়িয়ে তোলে। এই গল্প থেকেই কিন্তু গোটা সাত খুন মাফ সিনেমার জন্ম।

কে ছিলেন আসল সুজানা? অষ্টাদশ শতকে ওলন্দাজ ব্যবসায়ীরা দলে দলে চুঁচুড়ায় এসে ভিড় জমালেন। সাথে তাঁদের স্ত্রীরাও। এমনই একজন ছিলেন পিটার ব্রুয়িস। তিনি ১৭৫৪ নাগাদ চুঁচুড়ায় ঘাঁটি গাড়েন। সাথে স্ত্রী সুজানা।  তাঁদের একটি ছেলে , দুটি মেয়েও ছিল।  ১৭৮৩ তে পিটারের মৃত্যু হয়। সুজানা এক ইংরেজ টমাস ইয়েটস-এর প্রেমে পড়েন।  ১৭৯৫ সালের ৩০ মার্চ কলকাতার অ্যাংলিকান চার্চে তাঁদের বিবাহ হয়। সাথে সাথে পুত্র কন্যা সমেত সুজানা খৃষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। এই ছিল সুজানার দুটি বৈধ বিবাহ। কিন্তু লোকে বলে মাত্র দুটি পুরুষে সন্তুষ্ট থাকার মহিলা ছিলেন না সুজানা। অসংখ্য প্রেমিক ছিল তাঁর। ওলন্দাজ, রাশিয়ান, ইংরেজ এমনকি কেউ কেউ বলেন দু -এক জন ভারতীয় থাকলেও আশ্চর্য হবার কিছু নেই। পতঙ্গরা যেমন আগুনে পুড়ে মরে, সুজানার রূপের আগুনে এসে ঝাঁপ দিত পুরুষেরা, আর সবাই কোন না কোন অদ্ভুত ভাবে মারা যেত। কেউ আত্মহত্যা করত বিষ খেয়ে,কাউকে কে যেন বুকে ছুরি বসিয়ে যেত,  বাড়ি শুদ্ধু আগুনে পুড়ে মরত বা কেউ...

১৮০৯ সালের ১২ মে সুজানা মারা যান। তাঁকে কবর দেওয়া হয় আয়েস বাগে। কবরের উপর তৈরী করা হয়  ডাচ- ভারতীয় স্থাপত্যের মিশ্রনে এক অপূর্ব সৌধ। সেখানে আজও শুয়ে আছেন সুজানা। তাঁর কবরে লেখা ""SUSANNA ANNA MARIA YEATS REBOORE VERKERK OBiIT 12 MAY ANNO 1809"। এই REBOORE VERKERK মানে তাঁর আসল পদবি হল ভারকার্ক। সাত স্বামীর সাথে সম্পর্কের পরেও সুজানা তাঁর পিতৃদত্ত পদবিকে ছাড়েন নি।

সুজানার প্রথম স্বামী পিটার ব্রুয়িসও শুয়ে আছেন চুঁচুড়ার মাটিতে। তবে সুজানার থেকে অনেক দূরে। ফুলপুকুর রোডের সেই ওলন্দাজদের কবরস্থানে। কবরখানার দক্ষিন-পশ্চিম কোণের বিশাল ওবেলিস্কটা আসলে পিটারেরই সমাধি। ভাঙাচোরা ইঁট এদিক ওদিক দাঁত বের করে আছে। তার মাঝে এখনও বিবর্ণ ফলকে দেখা যায়  ৫২ বছরে মারা যাওয়া মানুষটির নাম, যারও স্ত্রীর জীবন বাস্তবিক তাঁর থেকে অনেক রঙিন ছিল।

রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ~ অহনা বিশ্বাস

আজ মহামহিম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মদিনে তাঁকে অনন্ত শ্রদ্ধা জানাই। আজ এই উপমহাদেশের সকল মেয়েদের, বিশেষত নবপর্দায় শোভিত মেয়েদের তাঁকে বড় প্রয়োজন।

তাঁর 'অবরোধবাসিনী' (1931) বইটি থেকে খানিক উদ্ধৃত করলাম। যদি কারুর ইচ্ছা হয় তো পড়বেন। 

'প্রায় ৪০/৪৫ বৎসর পূর্ব্বের ঘটনা-কয়েক ঘর বঙ্গীয় সম্ভ্রান্ত জমীদারের মাতা, মাসী, পিসী, কন্যা ইত্যাদি একত্রে হজ করিতে যাইতেছিলেন। তাঁহারা সংখ্যায় ২০/২৫ জন ছিলেন। তাঁহারা কলিকাতায় রেলওয়ে ষ্টেশন পৌঁছিলে পর সঙ্গের পুরুষ প্রভুগণ কার্য্যোপলক্ষে অন্যত্র গিয়াছিলেন। বেগম সাহেবাদিগকে একজন বিশ্বস্ত আত্মীয় পুরুষের হেফাজতে রাখা হয়। সে ভদ্রলোকটীকে লোকে হাজী সাহেব বলিত, আমরাও তাহাই বলিব। হাজী সাহেব বেগম সাহেবাদের ওয়েটিং রুমে বসাইতে সাহস পাইলেন না। তাঁহারা উপদেশ মতে বিবি সাহেবারা প্রত্যেক মোটা মোটা কাপড়ের বোরকা পরিয়া ষ্টেশনের প্লাটফরমে উবু হইয়া (Squat) বসিলেন; হাজী সাহেব মস্ত একটা মোটা ভারী শতরঞ্জি তাঁহাদের উপর ঢাকিয়া দিলেন। তদবস্থায় বেচারীগণ এক একটা বোচকা বা বস্তার মত দেখাইতেছিলেন। তাঁহাদিগকে ঐরূপে ঢাকিয়া রাখিয়া হাজী সাহেব এক কোণে দাঁড়াইয়া খাড়া পাহারা দিতেছিলেন। একমাত্র আল্লাহ জানেন, হজযাত্রী বিবিগণ ঐ অবস্থায় কয় ঘণ্টা অপেক্ষা করিতেছিলেন-আর ইহা কেবল আল্লাহতালারই মহিমা যে তাঁহারা দম আটকাইয়া মরেন নাই।

ট্রেণ আসিবার সময় জনৈক ইংরাজ কর্ম্মচারীটী ভাঙ্গা ভাঙ্গা হিন্দিতে হাজী সাহেবকে বলিলেন, "মুন্সি! তোমারা আসবাব হিয়াসে হাটা লো। আভি ট্রেণ আবেগা-প্লাটফরম পর খালি আদামি রহেগা-আসবাব নেহি রহেগা।" হাজী সাহেব যোড়হস্তে বলিলেন, "হুজুর, ঐ সব আসবাব নাহি-আওরত হায়।" কর্ম্মচারিটী পুনরায় একটা "বস্তায়" জুতার ঠোকর মারিয়া বলিলেন, "হা, হা-এই সব আসবাব হাটা লো।" বিবিরা পর্দ্দার অনুরোধে জুতার গুতা খাইয়াও টু শব্দটী করেন নাই।'
******

'আমরা বহু কাল হইতে অবরোধ থাকিয়া থাকিয়া অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছি সুতরাং অবরোধের বিরুদ্ধে বলিবার আমাদের-বিশেষতঃ আমার কিছুই নাই। মেছোণীকে যদি জিজ্ঞাসা করা যায় যে, "পচা মাছের দুর্গন্ধ ভাল না মন্দ?"-সে কি উত্তর দিবে?

এস্থলে আমাদের ব্যক্তিগত কয়েকটি ঘটনার বর্ণনা পাঠিকা ভগিনীদেরকে উপহার দিব-আশা করি, তাঁহাদের ভাল লাগিবে।

এস্থলে বলিয়া রাখা আবশ্যক যে গোটা ভারতবর্ষে কুলবালাদের অবরোধ কেবল পুরুষের বিরুদ্ধে নহে, মেয়েমানুষদের বিরুদ্ধেও। অবিবাহিতা বালিকাদিগকে অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়া এবং বাড়ীর চাকরাণী ব্যতীত অপর কোন স্ত্রীলোকে দেখিতে পায় না।

বিবাহিতা নারীগণও বাজীকর-ভানুমতী ইত্যাদি তামাসাওয়ালী স্ত্রীলোকদের বিরুদ্ধে পর্দ্দা করিয়া থাকেন। যিনি যত বেশী পর্দ্দা করিয়া গৃহকোণে যত বেশী পেঁচকের মত লুকাইয়া থাকিতে পারেন, তিনিই তত বেশী শরীফ।

শহরবাসিনী বিবিরাও মিশনারী মেমদের দেখিলে ছুটাছুটি করিয়া পলায়ন করেন। মেম ত মেম-সাড়ী পরিহিতা খ্রীষ্টান বা বাঙ্গালী স্ত্রীলোক দেখিলেও তাঁহারা কামরায় গিয়া অর্গল বন্ধ করেন।'
******

'কবির ভাষায় বলিতে ইচ্ছা করেঃ

"কাব্য উপন্যাস নহে, এ মম জীবন,
নাট্যশালা নহে, ইহা প্রকৃত ভবন!"

প্রায় তিন বৎসরের ঘটনা, আমাদের প্রথম মোটর বাস প্রস্তুত হইল। পূর্ব্বদিন আমাদের স্কুলের জনৈকা শিয়িত্রী, মেম সাহেবা মিস্ত্রীখানায় গিয়া বাস দেখিয়া আসিয়া সংবাদ দিলেন যে, মোটর ভয়ানক অন্ধকার···"না বাবা! আমি কখনও মোটরে যা'ব না।" বাস আসিয়া পৌঁছিলে দেখা গেল,—বাসের পশ্চাতের দ্বারের উপর সামান্য একটু জাল আছে এবং সম্মুখ দিকে ও উপরে একটু জাল আছে। এই তিন ইঞ্চি চওড়া ও দেড় ফুট লম্বা জাল দুই টুকরা না থাকিলে বাসখানাকে সম্পূর্ণ "এয়ার টাইট" বলা যাইতে পারিত।

প্রথম দিন ছাত্রীদের নূতন মোটরে বাড়ী পৌঁছান হইল। চাকরাণী ফিরিয়া আসিয়া সংবাদ দিল-গাড়ী বড্ড গরম হয়,—মেয়েরা বাড়ী যাইবার পথে অস্থির হইয়াছিল। কেহ কেহ বমি করিযাছিল। ছোট মেয়েরা অন্ধকারে ভয় পাইয়া কাঁদিয়াছিল।

দ্বিতীয় দিন ছাত্রী আনাইবার জন্য মোটর পাঠাইবার সময় উপরোক্তা মেম সাহেবা মোটরের দ্বারের খড়খড়িটা নামাইয়া দিয়া একটা রঙীন কাপড়ের পর্দ্দা ঝুলাইয়া দিলেন। তথাপি ছাত্রীগণ স্কুলে আসিলে দেখা গেল,—দুই তিন জন অজ্ঞান হইয়াছে, দুই চারিজনে বমি করিয়াছে, কয়েক জনের মাথা ধরিয়াছে, ইত্যাদি। অপরাহ্নে মেম সাহেবা বাসের দুই পাশের দুইটী কড়খড়ি নামাইয়া দুই খণ্ড কাপড়ের পর্দ্দা দিলেন। এইরূপে তাহাদের বাড়ী পাঠাইয়া দেওয়া গেল।

সেই দিন সন্ধ্যায় আমার এক পুরাতন বন্ধু মিসেস মুখার্জ্জি আমার সহিত দেখা করিতে আসিলেন। স্কুলের বিবিধ উন্নতির সংবাদে আনন্দ প্রকাশ করিয়া বলিলেন,—"আপনাদের মোটরবাস ত বেশ সুন্দর হয়েছে। প্রথমে রাস্তায় দেখে আমি মনে করেছি যে আলমারী যাচ্ছে না কি-চারিদিকে একেবারে বন্ধ, তাই বড় আলমারী বলে ভ্রম হয়! আমার ভাইপো এসে বলেল, "ও পিসীমা! দেখ, সে Moving Black Hole (চলন্ত অন্ধকূপ) যাচ্ছে।" তাই ত, ওর ভিতর মেয়েরা বসে কি করে?"

তৃতীয় দিন অপরাহ্নে চারি পাঁচ জন ছাত্রীর মাতা দেখা করিতে আসিয়া বলিলেন, "আপকা মোটর ত খোদা কা পানাহ! আপ লাড়কীয়োঁ কো জীতে জী ক্ববর মে ভয় রহি হয়ঁ।" আমি নিতান্ত অসহায়ভাবে বলিলাম, "কি করি, এরূপ না হইলে ত আপনারাই বলিতেন, "বেপর্দ্দা গাড়ী।" তাঁহারা অত্যন্ত উত্তেজিত হইয়া বলিলেন, 'তব কেয়া আপন জান মারকে পর্দ্দা করেঙ্গী? কালসে হামারী লাড়কীয়াঁ স্ড়্গুল নেহী আয়েঙ্গী।" সে দিনও দুই তিনটী বালিকা অজ্ঞান হইয়াছিল। প্রত্যেক বাড়ী হইতে চাকরাণীর মারফতে ফরিয়াদ আসিয়াছিল যে, তাহার আর মোটর বাসে আসিবে না।

সন্ধ্যার পর চারিখানা ঠিকানারহিত ডাকের চিঠি পাইলাম। ইংরাজী চিঠির লেখক স্বাক্ষর করিয়াছেন, "Muslim Brotherhood" বাকী তিনখানা উর্দ্দু ছিল-দুইখানা বেনামী আর চতুর্থখানায় পাঁচজনের স্বাক্ষর ছিল। সকল পত্রেরই বিষয় একই-সকলেই দয়া করিয়া আমাদের স্কুলের কল্যাণ কামনায় লিখিয়াছেন যে, মোটরের দুই পার্শ্বে যে পর্দ্দা দেওয়া হইয়াছে, তাহা বাতাসে উড়িয়া গাড়ী বে-পর্দ্দা করে। যদি আগামীকল্য পর্য্যন্ত মোটরে ভাল পর্দ্দার ব্যবস্থা না করা যায়, তবে তাঁহারা তাতোধিক দয়া করিয়া "খবিছ" "পলীদ" প্রভৃতি উর্দ্দু দৈনিক পত্রিকায় স্কুলের কুৎসা রটনা করিবেন এবং দেখিয়া লইবেন, এরূপ বে-পর্দ্দা গাড়ীতে কি করিয়া মেয়েরা আসে।

এ তো ভারী বিপদ,—
"না ধরিলে রাজা বধে,—ধরিলে ভুজঙ্গ!"

রাজার আদেশে এমন করিয়া আর কেহ বোধ হয় জীবন্ত সাপ ধরে নাই! অবরোধ-বন্দিনীদের পক্ষে বলিতে ইচ্ছা করিল,—

"কেন আসিলাম হায়! এ পোড়া সংসারে,
কেন জন্ম লভিলাম পর্দ্দা-নশীন ঘরে!"

শুক্রবার, ১ ডিসেম্বর, ২০২৩

পুরনো লেত্তি পুরনো লাট্টু ~ সংকলন সরকার

সে অতি অদ্ভুত বিদঘুটে ভূতুড়ে জায়গা বাপরে বাপ! সাত সক্কাল বেলা ঘুম ভেঙ্গে গেলেই খিদে পেয়ে যায়। বরং বলা ভালো অত সকালে খিদের চোটেই ঘুম ভাঙ্গে! খিদে পেলে হাতের কাছে কিছু না থাকলে চাদর দিয়ে নিজেকে মুড়ে নিয়ে হালকা কুয়াশা ঠেলে গুটি গুটি হেঁটে পৌঁছে যাও থানার পাশে পাঁড়েজীর চায়ের দোকানে। শীত এখানে ভালই পড়ে গেছে। এই সকাল সাড়ে ছটার সময় পাঁড়েজীর দোকানে গরমা গরম চা ছাড়া আর কিছুই গরম পাবে না। কিন্তু খিদে পেয়ে গেছে যে...! একটু মাথা ঘোরালে দেখবে দোকানে মোটে তিন রকমের বিস্কুট আছে, একটা কাচের ঘেরাটোপে গুটিকয় গতকাল সন্ধ্যেবেলার বানানো শিঙ্গাড়া আর গতকাল বিকেলের বানানো জিলিপি। সারারাতের ঠাণ্ডা খেয়ে সে সব খাদ্যবস্তুর গায়ে জমাট ডালডার সাদা পরতের কারুকার্য্য! প্রথম দর্শনে মনে মনে তলপেট থেকে একটা কাল্পনিক চোঁয়াঢেঁকুর খাদ্যনালী বেয়ে উঠে আলজিভের তলায় ঘুরপাক খেতেই পারে। হাজার হোক বাংলার মাটি বাংলার জল বাংলার বায়ু বাংলার ফল খাওয়া পেট তো! কিন্তু বাস্তব ঘটনা আরো খারাপ। সেটা হল পেটের বেসমেন্ট থেকে পেটের টপ ফ্লোর অবধি এখন কম করে খান কুড়ি ছুঁচো দৌড়চ্ছে! তাই আর ডালডার আর্টওয়ার্ক না দেখে ঐ বাসি শিঙ্গাড়া আর জিলিপিই সই। চোখ কান বুজে খেয়েই নেওয়া যাক আপাতত। পরের কেস নাহয় পরে সাল্টে নেওয়া যাবেখন! 

পাঁড়েজীর লোক এখন সবে খোসা সমেত আলুর তরকারীর মালমশলা কেটে বীর বিক্রমে আটা মাখতে লেগেছে। গরমাগরম পুরি তরকারী পেতে পেতে কমকরে আরো ঘন্টা দেড়েক দেরী। সকাল আটটা সোয়া আটটার আগে কোনো মতেই নয়! এখন দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করলে ছুঁচোগুলো সংখ্যায় বেড়ে খান চল্লিশেক হয়ে গিয়ে ছুটোছুটি করে পেট ফুটো করে দিতে পারে। অতএব ছুঁচোগুলোকে ঐ আগের দিনের গোটাচারেক করে ডালডা জমা ঠাণ্ডা বাসি শিঙ্গাড়া জিলিপি খাইয়েই ঠাণ্ডা করে দাও আপাতত। তারপর ছোটো কাচের গেলাসে গরম চা দু' হাতের তালুর মধ্যে নিয়ে আয়েশ করে ছোটো ছোটো চুমুকে শেষ করে আবার গুটি গুটি হেঁটে ফিরে আসা যাক নির্ভেজাল ভূতেদের আড্ডার জন্য বিখ্যাত লালকোঠিতে। এবার এটা ওটা খুটখাট করতে করতে সকালের কাজকম্মো গুলো সেরে নেওয়ার পালা, আমাদের কাজ বলতে সামান্যই। দাঁতমাজা, দাড়িছাঁটা বড়বাইরে ইত্যাদি বাথরুমের কাজ মূলত। এ ছাড়া বেড়াতে এসে তোমার আর কাজ কী! 

অদ্ভুত রকমের রুক্ষ অথচ সতেজ প্রকৃতি শিমুলতলায়। এখানকার লোকজনদের জীবনযাপন আরো অদ্ভুত... কিছুটা সপাট সতেজ কর্মঠ সময় দেখার পরেই দেখতে পাবে, এখানে আর কোনো কাজ নেই। সব কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে... অতএব আবার যেদিকে তাকাবে দেখবে আলস্য বাবাজী সবখানে চাদর বিছিয়ে ঠ্যাং ছড়িয়ে বসে আছে। ভাবখানা এই... আয় আয়, আয় এবার একটু চুপটি করে আমার দালানে ঠেস দিয়ে বোস দিকিনি... হুশহুশিয়ে অনেক কাজ তো করলি রে বাপ, এখন আমায় একটু শান্ত হয়ে বল তো দেখি কী কী কাজ করলি এতক্ষণ ধরে অত হৈহল্লা করে?! তো, এই সব ভাবতে ভাবতে প্রায় পৌনে আটটা বেজে যাবে, আর আমরা আবার প্রচণ্ড অবাক হয়ে খেয়াল করব যে জানলা দিয়ে একটা মন উদাস করা মৌরীফোড়োন দেওয়া খাবারের সুগন্ধ আসছে। সেটা সম্ভবত পাঁড়েজীর দোকানে আলুর তরকারী রেডি হয়ে যাওয়ার গন্ধ... এইবার এক কড়াই গরম তেলে আটার লাল লাল পুরি ভাজা হবে! এবং আরো ভয়ানক অবাক হয়ে আমরা খেয়াল করব, পেটে গোটাপাঁচেক ছুঁচো নড়াচড়া শুরু করেছে! কোলকাতা বা তৎসংলগ্ন অঞ্চলে থাকলে কিন্তু ওই একগন্ডা বাসী শিঙ্গাড়া আমাদের বিকেল পাঁচটা অবধি খিদে পাওয়া থেকে বিরত করে রাখতে পারত। কিন্তু আমরা এখন বাড়িতে নেই... তাই এবার একটা হাফ সোয়েটার চাপিয়ে গুটি গুটি আবার রওয়ানা দেব পাঁড়েজীর দোকানের উদ্দেশ্যে। এবার অবশ্য আর আমরা আর চাদর নেব না। ঝকঝকে রোদ উঠেছে যে... রোদ মাখতে মাখতে হাঁটা যাক। 

তারপর সারাদিন অল্প ঘোরাঘুরি খানিক আড্ডা, ঘুরতে ঘুরতে চলে যাওয়া ধু ধু মাঠে পড়ে থাকা বিশাল রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষের কাছে... তারপর আবার গঞ্জের দিকে ফিরে এসে ফের আমরা ঘুরঘুর করব বিশাল বিশাল গেট ওয়ালা এক কালে জাঁকিয়ে বসা, অধুনা পলেস্তরাখসা ইটের মধ্যে থেকে গাছ গজানো পরিত্যক্ত বাড়িগুলোর চারপাশে... কারো কোনো গেটের থামে মুখোমুখি বসে আছে এক জোড়া বিগতশ্রী সিমেন্টের সিংহ...  যাই হোক... দুপুরে আবার একচোট ভাত ডাল দেশীমুরগীর ঝোল দিয়ে পেটপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে নেওয়ার পরে নাহয় ভাবতে বসা হবে, আমাদের এত খিদে ছিলো কোথায়!? এবং, এই বিকট পরিমাণ খাদ্যাখাদ্য পেটের কোথায় কোথায় চালান হচ্ছে শেষ অবধি?!!!! 

শীতের বেলা ঝটপট শেষ হয়ে আসার তাড়ায় থাকবে। এখানে এখনো লো ভোল্টেজ থাকে। টিমটিমে বাল্বের আলোয় দিনের শেষে সন্ধ্যাকে বরণ করে নেওয়া হবে... এটাই এখানকার দস্তুর। ঝকঝকে তকতকে কোনো ব্যাপার কোত্থাও নেই, সবই ম্যাড়ম্যাড়ে আর ভয়ানক মায়াবী। মায়াবী সন্ধ্যে নেমে গেলেই দেখতে পাবে এই এলাকায় কী বেশী পরিমাণে থিকথিক করছে ভূত! 

এলাকার সমস্ত গহন অন্ধকার জুড়ে কনসেনট্রেটেড ঘন ভূতের দল মাইল কে মাইল ছড়িয়ে পড়ে থাকা অতীত ঘিরে গিজগিজ করছে। ভূতেদের মধ্যে সাহেব বাঙালি দেহাতি সবাই রয়েছে। দু' চারটে ঘোড়া আর অ্যালসেশিয়ান কুকুরের ভূতও রয়েছে। রাতের রাস্তা জুড়ে ঘোড়া ভূতে সওয়ার সাহেব ভূত তার সঙ্গে প্রিয় পোষ্য অ্যালসেশিয়ান কুকুরের ভূতকে সঙ্গে নিয়ে এ অঞ্চলের ভুতুড়েহাওয়া খেতে বের হয়। এখানকার ভূতের দল ভীষণ নির্লিপ্ত। এরা কাউকে একেবারেই ভয় টয় কিচ্ছু দেখায় না! শুধু লম্বা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে! কিন্তু বেড়াতে আসা কেউ কেউ হয়ত অত পরিমাণ ভূত একসঙ্গে দেখে ফেলে ভয় পেতেই পারে! তার জন্য অবশ্য এখানকার ভূতদের কোনোভাবেই দোষ দেওয়া উচিৎ নয়! 

রাতের টিমটিমে আলোমাখা জমাট অন্ধকারে ভূতেদের দু হাতে ঠেলে সরিয়ে সরিয়ে আমাদের এক পা দু' পা করে এগিয়ে যেতে হবে তাজা সবজীর দোকানে। সেই সবজীর দোকান থেকে আমরা ড্যামচিপ তাজা বেগুন কিনবো, পোকা এবং রাসায়নিক ছাড়া সস্তায় তাজা বড় বড় বেগুন কিনে আমরা আবার দু' হাতে ভূত সরাতে সরাতে হেঁটে হেঁটে পৌঁছে যাবো পাঁড়েজীর দোকানে। পাঁড়েজী ওই তাজা বেগুনগুলোর গায়ে মাপ মতন ছুরি চালিয়ে ছ্যাঁদা করে ঢুকিয়ে দেবে চার পাঁচ কোয়া রসুন আর কাঁচা লঙ্কা। তারপর কয়লার উনোনো বেগুনগুলোকে দেশী টমেটোর সঙ্গে খুব যত্ন করে নিজের হাতে পোড়াতে পোড়াতে পাঁড়েজী আমাদের বলবে, যে এখন তো এখানে আর কিছুই নেই... তবে একসময় এই যায়গাটার একটা 'সময়' ছিলো বটে! পাঁড়েজীর সহকারীরা মুখ বন্ধ করে একের পর এক রুটি বেলে তাওয়ায় সেঁকে উনোনে চিমটে দিয়ে ফুটবলের মতন ফুলিয়ে নরম কাপড়ের ওপর রেখে পাঁজা খানেক রেডি হয়ে গেলে চিল চিৎকার করে কর্কশ গলায় বলবে - ফুলকা তৈয়ার হো গ্যায়া হ্যায়। আমরা অবাক হয়ে নিজনিজ পেটে সেই পাঁজা পাঁজা রুটি অবলীলায় পাকস্থলীর বারমুডা ট্র্যাঙ্গেলে ঠেসেঠুসে ভ্যানিশ করে দিয়ে, দু' হাত দিয়ে ঠেলেঠুলে ভূত সরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আবার ভূতের ডেরার লালকোঠিতে পৌঁছে যাবো। 

হ্যাঁ মশাই শিমূলতলার কথা বলছিলাম...  আগামী সপ্তাহের মাঝখানে দিন চারেকের জন্যে আবার একবার বিহারের শিমূলতলা ঢুঁ মারতে চলেছি একটা ছোটোখাটো ড্রাইভে। যাওয়ার আগে ব্যাগ পত্তর গোছাতে গোছাতে হালকা করে স্মৃতিমেদুর হয়ে পড়েছিলাম তাই ছোট্টো একটা স্মৃতিনির্ভর ভূমিকা ছেড়ে রাখলাম। এরপর ফাঁকে ফোঁকরে অথবা ফিরে এসে দু একটা ছবিছাবা আপলোডিয়ে দেবোখন! আসানসোলের পর থেকে চিত্তরঞ্জন পেরিয়ে 'জামতাড়া-গোড্ডা রোড ধরে' নিলেই রাস্তার দু'পাশ পৌঁছানোর আগেই পয়সা উশুল করে দেবে! আশা করছি প্রতিবারের মতন এবারেও শিমূলতলায় পৌঁছে নেট ফেট পাবো না! আর ইয়ে, একটা ভীষণ জরুরী ইনফো দিয়ে রাখি। যাঁরা শিমূলতলা গিয়ে ইঁদারার মিনারেল মেশানো জলের বদলে প্লাস্টিকের বোতলে কেনা মিনারেল ওয়াটার খেয়ে থাকেন তাঁরা অবশ্যই অ্যান্টাসিড ক্যারি করবেন। নইলে ঐ ডালডা মাখা ঠাণ্ডা শিঙ্গাড়া জিলিপি কিন্তু আপনাদের মাথায় চড়ে চেপে বসবে। ওসব হজম করানো বা পাকস্থলীতে বারমুডা ট্র্যাঙ্গেল বানানো কেনা প্লাস্টিকের জলের বোতলের কম্মো নয়... এইবেলা সবাইকে বলে কয়ে রাখলুম!

পুরনো লেত্তি পুরনো লাট্টু... 
শিমুলতলা, ডিসেম্বর ২০১৭

An idea, like a ghost, must be spoken to a little before it will explain itself... 
...Lord Sinha's place, Shimultala. 

বৃহস্পতিবার, ২৩ নভেম্বর, ২০২৩

বেলা আর বাতুল ~ অরিজিৎ গুহ

বেলা আর বাতুল এর গল্প শুনেছেন? অনেকেই শোনেন নি হয়ত। আসুন শুনে নি। গল্পটা আমরা শুনছি বোম্বের প্রসিদ্ধ ফরাস রোডের এক তওয়াইফের মুখ থেকে।
বেলা ছিল রাওয়ালপান্ডির কাছের একটা গ্রামের মেয়ে। ক্লাস ফোরে পড়ত। বাবার খুব আদরের মেয়ে ছিল। এগারো বছর বয়স। আর কয়েকবছর পরেই হয়ত গ্রামেরই কোনো গরীব ছেলের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হত, তারপর সুখে ঘরকন্না করতে পারত।
কিন্তু হঠাৎ করেই কী হল, একদিন আল্লাহ হো আকবর বলে একদল লোক ঝাঁপিয়ে পড়ল বেলার বাড়ির ওপর। বেলার বাবাকে তরোয়ালের কোপে ধর থেকে মুন্ডুটা আলাদা করে দিল, মায়ের স্তন কেটে দিল, আর আরো যেসব হিন্দু বাড়ি ছিল সব বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিল। গ্রান্ট রোডের এপারে ফরাস রোডে জিন্নাহ্ সাহেব কোনোদিনও আসবেন না। শরিফ আদমিরা কখনো গ্রান্ট রোড ক্রস করেন না।কিন্তু জিন্নাহ্ সাহেব একবার যদি বেলার সাথে দেখা করতেন, তাহলে হয়ত বেলাকে বোঝাতে পারতেন বেলার সাথে যা হয়েছে তা করার অধিকার কোরাণে কোনো মুসলমানকে দেয় নি।
বেলা এরপর পালিয়ে চলে আসে রাওয়ালপিন্ডি। সেখানে এক মুসলিম দালাল ওকে নিজের হেপাজতে করে নেয়। সেই দালালের থেকে আরেক দালাল ওকে কিনে নেয়। তারপর বেলার ঠাঁই হয় ফরাস রোডের তওয়াইফখানায়। বেলার মুখটা যদি জিন্নাহ্ সাহেব দেখতে পেতেন, তাহলে বুঝতেন 'মাসুমিয়াত কি কোই মজহব নেহি হোতি'। এক সরল নিষ্পাপ বাচ্চা মেয়ের মুখ। সেই মুখে ধর্ম লেখা নেই। সেই মুখে হিন্দুস্তান পাকিস্তান লেখা নেই। সেই মুখ হিন্দু মুসলিম শিখ ইসাই যে কারো মুখ হতে পারে। জিন্নাহ্ সাহেবের বাংলোতে যে বেলার চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছায় না!
বাতুল থাকত জলন্ধরের কাছের এক গ্রামে। বাবা খুবই গরীব। মুটে মজুরি করে চালায়। অনেকগুলো দিদি আর ভাইদের নিয়ে তার মধ্যেও শান্তিতে থাকত ওরা। বাতুলদের গ্রামে 'নমাজ আদা' করার কোনো হুকুম ছিল না। বাতুল কোনোসময়ে জিন্নাহ্ সাহেবের গল্প শুনেছিল। সেই থেকে জিন্নাহ্ সাহেবকে খুব পছন্দ করত। গলায় একটা লকেট ঝুলিয়েছিল জিন্নাহ্ সাহেবের ছবি দিয়ে।
হিন্দুস্থান পাকিস্থান ভাগ হওয়ার পর বাতুল স্লোগান দিয়ে ফেলেছিল পাকিস্তান জিন্দাবাদ বলে। ঠিক যেরকমভাবে পাঁচ ছ'বছরের বাচ্চা কোনো কিছু না বুঝেই ইনকিলাব জিন্দাবাদ স্লোগান দিয়ে ফেলে, সেরকমই আরকি।
সেই স্লোগান শুনে গ্রামের জাঠরা এসে প্রথমে ওর বাবার জামা কাপড় খোলাল, তারপর মুখে পেচ্ছাপ করল, তারপর বাবার বুকে ছুরি ঢুকিয়ে দিল। দিদিদের টেনে হিঁচড়ে নিয়ে চলে গেল আড়ালে।
এরপর বাতুলকে যখন এক হিন্দু দালালের থেকে ফরাস রোডের ওই তওয়াইফ কিনে নিল, তখন সে দেখেছিল বাতুলের সারা গায়ে আঁচড় কামড়ের দাগ। পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তো অনেক পণ্ডিত মানুষ আর উনিও অনেক শরিফ আদমি। তাই উনিও কখনো ফরাস রোডের তওয়াইফখানায় ঢুকবেন না কোনোদিন। কাজেই বাতুলকেও দেখতে পাবেন না কোনোদিন। যদি দেখতে পেতেন, তাহলে হয়ত উনি বোঝাতে পারতেন যখন বাতুলের সাথে এরকম হচ্ছিল, তখন ঋকবেদ স্তম্ভিত হয়ে গেছিল। গুরু গ্রন্থসাহিব বোবা হয়ে গেছিল। কারণ দুই কিতাবের কোথাও যে লেখা ছিল না বাতুলের সাথে এরকম ব্যবহার করার কথা।
নেহেরুজি'র বাংলোতে যে বাতুলের চিৎকারের আওয়াজ পৌঁছায় নি। নেহেরু জি কী করবেন!
কৃষণ চন্দর যখন 'এক তওয়াইফ কি খৎ জিন্নাহ্ সাব অউর নেহেরু জি কো' লিখেছেন তার কিছু আগেই আজাদি এসেছে। কিন্তু তাও বারেবারে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে গেছেন কৃষণ চন্দর।
'মহালক্সমী কা পুল' গল্পে মহালক্সমী পুলের পাশে বসবাসকারী নিম্নবিত্ত শ্রমিক বস্তির যে ছবি এঁকেছেন তার প্রতিটা ছত্রে লুকিয়ে রয়েছে ভদ্র সভ্য উচ্চবিত্তদের প্রতি বিদ্রুপ।
পুলের পাশে মিল মজদুররা তাদের নিজেদের নিজেদের চওলে থাকে। পুলের ওপর ওদের স্ত্রীদের শাড়ি শুকোতে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছটা শাড়ি শুকোতে দেওয়া হয়েছে। শান্তাবাঈ এর ফ্যাকাসে বাদামী রঙের শাড়ির পাশে যে শাড়িটা ঝুলছে শুকোতে দেওয়ার জন্য, সেই শাড়িটাও পাঠকদের চোখে ফ্যাকাসে বাদামী রঙই মনে হবে। কিন্তু কথক, যিনি একজন পয়ষট্টি টাকা মাইনের ক্লাস টেন পাস করা ক্লার্ক, যখন থেকে শাড়িটা দেখেছেন তখন সেটার রঙ ছিল গাঢ় বাদামী। পুরনো হয়ে রঙ হাল্কা হয়ে হয়ে সেটা ফ্যাকাসি বাদামী রঙে পর্যবসিত হয়েছে। তার পাশে রয়েছে মিল থেকে বহিষ্কৃত শ্রমিক ঝাব্বুর স্ত্রী লোড়ির শাড়ি। লোড়ির শাড়ির পাশে ঝুলছে মঞ্জুলার শাড়ি। সব থেকে ঝকমকে শাড়ি ওটা। কারণ মঞ্জুলার কয়েকমার আগে বিয়ে হয়েছে আর বিয়ের শাড়িটাই ঝুলছে। মঞ্জুলার স্বামী কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। মঞ্জুলার পাশে শেষ যে শাড়িটা ঝুলছিল সেটা ছিল বুড়ি মা'র। যার ছেলে সিতু এখন জেলে। সরকার থেকে যখন হরতাল বে আইনি ঘোষণা করা হয়েছিল, তখন সিতুরা জুলুস বের করেছিল হরতালের সমর্থনে। পুলিশ থেকে মহালক্সমি পুলের পাশের চওলে গুলিবৃষ্টি চলে। সবাই ভয় পেয়ে নিজের নিজের চওলের দরজা বন্ধ করে দেয়। পরে যখন সব শান্ত হয়ে যায় তখন দেখা যায় সিতুর মা গুলি খেয়ে মরে পড়ে আছে। বুড়ি মানুষ, হয়ত তাড়াহুড়ো করে নিজের খোপরে ঢুকতে পারে নি। সেই লাল শাড়িটা এখন পরে সিতুর বৌ। সিতু হরতাল করার জন্য জেলে রয়েছে।
একটু পরই মহালক্সমী পুলের ওপর দিয়ে 'ওয়াজির এ আজম' মানে প্রধানমন্ত্রীর কনভয় যাবে। প্রধানমন্ত্রীর চোখেও সেই ঝোলানো শাড়িগুলো চোখে পড়বে না। যতক্ষণ না প্রধানমন্ত্রীর কনভয় যায় ততক্ষণ ধরে সেই শান্তাবাঈদের কলোনির গল্প শুনিয়েছেন কৃষণ চন্দর।
যুবতী শান্তাবাঈ, বৃদ্ধা জীবনা বাঈ বা কথকের মধ্যবয়সী স্ত্রী সবার গল্প মোটামুটি একইরকমের। প্রতি পদে অর্থের হাহাকার, ছোট্ট ছোট্ট সাধ আহ্লাদ আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ না হওয়ায় জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা আর তারই সাথে কুসংস্কার, সব যেন একসাথে হাত ধরাধরি করে রয়েছে। সবার শাড়িগুলো একসাথে যখন পাশাপাশি উড়তে থাকে তখন প্রত্যেকের শাড়ির রঙগুলো আর আলাদা করে চেনা যায় না।
প্রত্যেকের গল্প বলতে বলতেই কখন যে প্রধানমন্ত্রীর কনভয় চলে যায় বোঝাও যায় না। আসলে কনভয় তো এই মহালক্সমী পুলের পাশে দাঁড়াবে না, প্রধানমন্ত্রীর অত ঠেকাও পড়ে নি। কিন্তু ওই ছ'টা শাড়ি যেন ভারতবর্ষের লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিদিনের গল্প বলে যায়।
১৯৩৬ সালে যখন প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন তৈরি হয় প্রেমচন্দকে সভাপতি আর সাজ্জাদ জাহিরকে সম্পাদক করে, তখন সেই সংগঠন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ইকবাল আর নজরুলের আশীর্বাদ ধন্য হয়ে ওঠে। উর্দু সাহিত্য সেই সময়ে মোটামুটি আগের অবাস্তব আবেগের জায়গা থেকে অনেকটাই সরে এসেছে বাস্তবের মাটিতে।
প্রথম সম্মেলনে আহম্মদ আলি, আলি আব্বাস হুসায়নী, মুলকরাজ আনন্দ, খাজা আহমেদ আব্বাস, শওকত সিদ্দিকে, গোলাম আব্বাস, আহমেদ নাদিম কাশমী প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাম হলেও চারজন যারা পরবর্তীকালে উর্দু সাহিত্যের স্তম্ভে পরিণত হয়েছিলেন তারা হলেন সাদাত হাসান মান্টো, রাজিন্দার সিং বেদি, ইসমাত চুঘতাই আর কৃষণ চন্দর। বলা যায় এই চারজন উর্দু সাহিত্যকে শাসন করেছেন। তবে বাকি তিনজন যেমন চরিত্রদের মনস্তাত্ত্বিক জগৎ নিয়ে পরীক্ষা নীরিক্ষা করেছেন কৃষণ চন্দর আবার চিরকাল সাহিত্য রচনা করে গেছেন শোষিত শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে। প্রোগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশনের পতাকা সার্থক ভাবে বয়ে নিয়ে গেছেন। মান্টোর মতই দাঙ্গা আর দেশভাগকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন।
'গাদ্দার' গল্পে বৃদ্ধ বুলাকি শাহ চারিদিকের শয়ে শয়ে পড়ে থাকা লাশের মধ্যে হাতড়ে হাতড়ে কী যেন খুঁজতে থাকে। বৈজনাথের কন্ঠে চমকে উঠে বলে 'আমি মুসলমান। আমাকে মেরো না।' জবাবে বৈজনাথ যখন বলে মুসলমান হলে এখানেই তোর লাশ ফেলে দেব, তখন উত্তরে বুলাকি শাহ জানায় আমি বুলাকি শাহ। বৈজনাথ এবার আশ্চর্য হয়। গ্রামের সব থেকে বড় মহাজন বুলাকি শাহ! বৈজনাথ জিজ্ঞাসা করে এখানে কী করছ? ততক্ষণে বুলাকি শাহ ভয় কাটিয়ে উঠেছে। বলে সব তো মরে পড়ে রয়েছে এখানে। আমার পরিবারেও কেউ বেঁচে নেই, সম্পত্তিও সব লুঠপাট হয়ে গেছে। শুধু মেয়েটা বেঁচে রয়েছে। তা মেয়েটাকে তো বিয়ে দিতে হবে। যা পাচ্চি এখান থেকে সোনাদানা তাই হাতিয়ে নিচ্ছি পকেট থেকে। তুমিও এসো না। যা পাব ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়ে নেব।
স্তম্ভিত হয়ে যায় বৈজনাথ। মানুষ কোথায় নামতে পারে ভেবে! বুলাকি শাহ বলে মেয়ের বিয়ের যৌতুক ছাড়া কেউ তো মেয়েকে বিয়ে করবে না।
দেশভাগ আর দাঙ্গার নানারূপ দেখেছেন কৃষণ চন্দর। বরাবর গল্প বলেছেন নিম্নবিত্ত খেটে খাওয়া গরীব মানুষের। তাঁদের দুঃখ দুর্দশা, লড়াই করা হেরে যাওয়া এবং আবার জানকবুল লড়াই এর জন্য উঠে পড়া, এই গল্পই শুনিয়ে গেছেন। তেলেঙ্গানা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে 'রোটি কাপড়া মকান' এক অদ্ভুত গল্প।
খাজা আহমেদ আব্বাস যখন সিনেমা করবেন বলে ঠিক করলেন, তখন বাংলার বিজন ভট্টাচার্যের 'নবান্ন' আর 'জবানবন্দি' এই দুটো নাটকের গল্প শোনা হয়ে গেছে। ৪৩ এর মন্বন্তরকে খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন আব্বাস। এরপর কৃষণ চন্দরের 'অন্নদাতা' গল্পে পড়ে ঠিক করলেন তিনটে গল্পকে একসাথে নিয়ে একটা সিনেমা বানাবেন বাংলার ৪৩ এর মন্বন্তরের প্রেক্ষাপটে।
যথা সময়ে 'ধরতি কে লাল' সিনেমা তৈরি হল আইপিটিএ র সব রথী মহারথীর সাহায্যে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিও পেল সেই সিনেমা। এটাই একমাত্র সিনেমা যা আইপিটিএর নিজস্ব প্রযোজনায় তৈরি। সেখান থেকেই ফিল্ম জগতের সাথে যোগাযোগ তৈরি হয় কৃষণ চন্দরের।
এক সময়ে সিনেমার স্ক্রিপ্ট আর গল্প লেখার পেছনে এত সময় দিতে হয়েছিল যে তাঁর নিজের গল্পে সেই প্রভাব পড়েছিল। গল্পের ধার গেছিল কমে।
নীহাররঞ্জন গুপ্তের লেখা 'উত্তর ফাল্গুনি' হিন্দি স্ক্রিপ্ট 'মমতা' কৃষণ চন্দরেরই লেখা। এছাড়াও অসিত সেনের আরেকটি সিনেমা 'সরাফত' যেখানে ধর্মেন্দ্র হিরো ছিল তার গল্পও কৃষণ চন্দরের। কিন্তু তিনি নিজেও বুঝতে পারছিলেন যে সিনেমার জগতে থাকলে তার গল্পের মান নেমে আসছে। অবশেষে ছেড়ে দিলেন সিনেমার জগত। ১৯৭৭ এ যখন মৃত্যু হয় তখন হাসপাতালে তার বেডের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন দ্বিতীয় স্ত্রী সালমা সিদ্দিকি। লিখতে শুরু করেছিলেন নতুন একটি গল্প। কয়েক লাইন লেখার পরই ঢলে পড়েন মৃত্যুর মুখে। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে নিভে যায় উর্দু সাহিত্যের এক স্তম্ভ কৃষণ চন্দরের জীবন দীপ।
১৯৭৭ এ মৃত্যু হলেও একজন লেখক কতটা প্রভাবশালী হতে পারেন তার পরিচয় পাওয়া গেছে এই ২০১৯ সালেও এসে। ২০১৯ সালের এক সার্কুলার জারি করে আইসিএসসি বোর্ডের দশম শ্রেনীর সিলেবাস থেকে 'জামুন কা পেড়' বলে একটি গল্প বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। গল্পটিতে খুব তীক্ষ্ণভাবে মজার ছলে ভারতের ব্যুরোক্রেসির প্রতি, লাল ফিতের ফাঁসের প্রতি প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সরকারের সেসব পছন্দ না হওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই আজও কৃষণ চন্দর কতটা প্রাসঙ্গিক বোঝা যায়।
১৯১৪ সালের আজকের দিনেই অর্থাৎ ২৩ শে নভেম্বর জন্ম হয়েছিল কৃষণ চন্দরের।

রবিবার, ৫ নভেম্বর, ২০২৩

শান্তিগোপাল, লেনিন ও আমরা ~ শুদ্ধ্বসত্ত্ব ঘোষ

কালীপূজো এসে গেল। এমন সময় রেল কলোনীর বিশাল মাঠ ঘিরে ফেলা হত। টিনের দেওয়াল। দেড় মানুষের বেশী উচ্চতা। সেই টিনের দেওয়াল যা ঘিরছে তা কিন্তু সার্কাস না। তা হল যাত্রা।

ভেতরে ঢুকলে দেখতে পাবেন একটা মঞ্চ হচ্ছে। সেই মঞ্চের চারদিক খোলা। লম্বা দুটো স্লোপ চলে গ্যাছে সাজঘর থেকে সোজা সে মঞ্চে। মঞ্চের সামনে বসবে কনসার্ট পার্টি। তাদের জন্য একটু নীচু করে জায়গা রাখা। কখনো দু পাশেও বসতে দেখেছি তাঁদের। পিছনে সাজঘরের দিক থেকে টেপ বাজতো। সামনে, পিছনে আলোর স্ট্যান্ড বসে যাবে। আলোক নিয়ন্ত্রকের বসার ব্যবস্থা হবে ওই দুটো স্লোপের মাঝখানের অংশে। 
শুনেছি এ সব ব্যবস্থা হল যাত্রা সম্রাট স্বপনকুমারের করা। আধুনিক করেছেন তিনি। রবি ঠাকুরের বাড়ির মেয়ে তাঁর জ্যাঠাইমা। মেজদা, বিজন মুখোপাধ্যায়। শিশির ভাদুড়ির সাক্ষাৎ ছাত্র। তিনি, স্বপনকুমার ছিলেন সনৎ, হলেন স্বপন যাত্রায়। বাবা, দাদার মৃত্যুর পরে, দিদির একমাত্র ছেলে দাঙ্গায় মারা যাবার পরে, বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে এসেছিলেন যাত্রায়।   

সন্ধ্যা নামবে একদিন মফস্বলে, শীত আসার আগের সন্ধ্যা। দলে দলে লোক যাত্রার সিজন টিকিট কেটেছে। একেক কোম্পানি আসবে, একেক যাত্রা গাইবে। নট্ট থেকে শুরু করে রয়্যাল বীণাপাণি। সে আমলে শান্তিগোপাল অপেরাও। শান্তিগোপালে আসার আগে বলে নিই আমার ভয় পাওয়ার কথা। মঞ্চে দেখলাম তেমন এক সন্ধ্যায় এক খোঁড়া বাদশার জন্য থালায় সাজিয়ে কাটা মুন্ডু নিয়ে আসছে এক পার্ষদ। অবিকল যেমন দেখতে অভিনেতা একটু আগে খুব লড়ছিলেন বাদশার সঙ্গে তাঁর কাটা মুন্ডু। ভয় পাবো না? তখন কি ছাই জানি ও মুন্ডু মাটির? ও মুন্ডু কৃষ্ণনগরের ফুল-ফলের মতন? তবে বাদশাটি শান্তিগোপাল না, তিনি শিবদাস।

শান্তিগোপাল-ও ভয় দেখালেন। হিটলার-এ। আরেকটু বড় তখন। মেদিনীপুড়, জকপুর, খুড়দা কত কত জায়দায় যাত্রা হয়। বাবার সঙ্গে সঙ্গে, সোনা কাকু, দাদাভাই-এর সঙ্গে চলে যাই। রাত জেগে যাত্রা। দেখতে দেখতে ঘুমিয়েও পড়েছি। আবার আতঙ্কের মধ্যে জেগে থেকেছি সারারাত। স্পার্টাকাসে কালো লোকটা সেই! সেই যে যে স্পার্টাকাসের মতন দাস ছিল, গ্ল্যাডিয়েটর ছিল, যে এরিনায় স্পার্টাকাসকে খুন করতে চেয়েছিল, স্পার্টাকাসের বউ-কে কামনা করেছিল, সেই লোকটা কি কালো, কি ভয় ধরাণো ছিল। অজিতেশ-কে দেখছি আসলে। সেই হাসিটা? কি ক্রুর, কি ভয়ানক! মঞ্চে এসে দাঁড়ালেই মনে হত এই শয়তানটা কেন মরে না? 

কিন্তু যখন স্পার্টাকাস ওকে মারলো না, যখন ও স্পার্টাকাসের বন্ধু হল, যখন ওরা একসঙ্গে বিদ্রোহের কথা বললো, করলো- তখন মন ভরে গেছিলো। মনে হয়েছিল এবারে কেউ স্পার্টাকাসকে হারাতেই পারবে না। ছাই তখন বুঝি শ্রেণী সংগ্রাম কি? সশস্ত্র বিপ্লবের কত কত পথ ও পন্থা? বামের কত মত? যত মত তত পথ না? খুনোখুনি হয়ে যায় বামের বামত্ব মাপতে? কিচ্ছু জানি না এসব। শুধু জানি মালিকেরা বড় ভয়ানক। নিগ্রো মানুষটার চেয়েও। তারা শয়তানের-ও শয়তান। তারা সব লুঠে নেয়। কেমন করে জানলাম? শান্তিগোপাল দেখে। সুকান্ত-র শোন রে মালিক, শোন রে মজুতদার পড়ে। 

সুকান্তর কবিতা, শান্তিগোপালের যাত্রা, সুরেশবাবুর পাপেট থিয়েটার-এর একটি মোরগের কাহিনী সব মিলে মিশে যেত সেই সব শীত সন্ধ্যার অন্তরে অন্তরে। মানুষ গর্জন করতো। মানুষের গর্জন যারা শোনেনি তারা জানে না কেমন ভীষণ সে গর্জন। সমুদ্র-ও শিশু তার কাছে। মহাসমুদ্রের নাদ সে। আমি আমার দুই থেকে বারো অব্দি মজে ছিলাম যাত্রায়। থিয়েটার অল্প স্বল্প এসেছে মফস্বলে। মাচা বেঁধে খুব বেশী দল করতো না ওখানে। ডিহি কলকেতার বাবু মহলের যাত্রা দেখে ফাত্রা লোকের দলে পড়তাম আমরা। 

মফস্বলের-গ্রামের মানুষরা। আমরা সেই ফাত্রা লোক, যারা না খাটলে মাঠ থেকে ধান ওঠে না, যারা না খাটলে কল-কারখানা চলে না। বাবুদের ফুটুনি তিন মিনিটে উবে যায়। আমরা যারা অপমানিত হতাম বাবুদের হাতে, যারা বাবুদের ফাত্রা লোক তারা যাত্রাকে প্রাণ দিয়ে ভালবাসতাম।

শান্তিগোপাল, পোষাকি নাম বীরেন্দ্রনারায়ণ পাল। বাবা প্রেসিডেন্সির ছাত্র, দাদা জজ। ও বাড়ির ছেলে যাত্রা করে না। তিনি করেছিলেন। প্রথমে পাড়ার নাটক, তারপরে গ্রুপ থিয়েটার উদয়াচল, তারপরে একদিন যাত্রা দেখতে দেখতে যাত্রা। বাগবাজারের মদনমোহনতলায় শুরু হত সিজন। সেখানে অমর ঘোষ পরিচালক হয়েছিলেন। 

শান্তিগোপাল, রস্ট্রাম ব্যবহার শুরু করলেন। মাইক্রোফোন এল। চিৎকার করেই যাতে শুধু শোনাতে না হয়। নেপথ্যে টেপরেকর্ডার থেকে শব্দ-প্রক্ষেপণ। এ সব এলো হিটলার-এ। শান্তিগোপাল বলতেন পার্টি ইত্যাদি নয় মানুষকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ থেকে বাকী সব নিয়ে সচেতন করছেন।

আসলে আমরা ভুলেই গিয়েছি নবান্ন, নবনাট্য বাংলার মাঠেঘাটে যত না ঘুরেছে তার চেয়ে বেশী ঘুরেছে যাত্রাপালা। ভক্তিরসের বন্যায় গিরিশেরা পেশাদারী রঙ্গমঞ্চ চুবোচ্ছেন, কারণ যাত্রাতেও ঐ চলছে। একা মুকুন্দদাস বাদ দিলে কেউ আর নীলদর্পণ-এর লড়াইতে ছিল না। যাত্রার দর্শক, গ্রাম-মফস্বলের মানুষই এসেছে সেকালের থিয়েটারে দর্শক হয়ে। একালের দর্শকভেদ আগেই বোধহয় হতে থেকেছে। শহুরে বাবুরা যাকে নাট্য বলবেন, বাকীদের তাকেই নাট্য বলতে হবে। তারপরেও জনগণের কাছাকাছি কিন্তু একমাত্র যাত্রা। জন-রাজনীতিরও কাছাকাছি।

শান্তিগোপাল বুঝেছিলেন। শুধু উৎপল দত্তের কথা আমরা বলি রাজনীতি প্রসঙ্গে। তাঁর কথা বলি না। শান্তিরাম, শান্তিরঞ্জন পেরিয়ে অবশেষে তিনি শান্তিগোপাল হয়েছেন। মম্মথ রায় গলার মালা খুলে দিয়েছেন। গ্রাম বাংলার মাঠে মাঠে রাতের পর রাত ইতিহাস পড়িয়েছেন শান্তিগোপাল। বাংলার এক অনন্য ইতিহাসের শিক্ষক। লোকে বলতো কমিউনিস্ট দালাল। গ্রামের কংগ্রেস গুন্ডা, জোতদার, দালালরা বলতো। লেনিন করে। রাশিয়া যায়। হিটলার করে। আবার আমি সুভাষ-ও করে। মাও সে তুং করে। ব্যাটা নকশাল। কত কি! 
শুনেছি মারার জন্য মুখিয়ে থাকতো তারা। শুনেছি কৃষকদের দল হাতে কাস্তে নিয়ে যাত্রা দেখতে আসতো। দেখেছি পাড়ার কংগ্রেসের ছোট নেতা তড়পে গেলে পালটা রুখে দাঁড়াতে রেলের কর্মী মজদুরদের। যারা ইউনিয়নের লোক। যারা লাল। বা অতিলাল। শান্তিগোপাল  আসবেন-ই। শান্তিগোপাল এসেছিলেন। আমাদের ইতিহাস পড়াতেন। লোকশিক্ষা দিতেন। এবং একটা অনন্য শিক্ষা দিতেন। 
আজ ডিহি কলকেতার বাবুপাড়ার থেটারে এসে দেখি 'লোকে কি খাবে' তা নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলে। আমরা যারা গ্রামে-মফস্বলে শান্তিগোপালের একনিষ্ঠ দর্শক, বোকা এবং ফাত্রা লোক- তারা জানি কে কি খাবে ভেবে রান্না হবে না। এ থ্যাটার হোটেল না, কি স্বাস্থ্যকর, কি দরকারী, কি তারপরেও সুস্বাদু তাই রান্না করা দরকার। যদি রাঁধিয়ের দম থাকে তাহলে পাত পেড়ে খাবে পাড়া-বেপাড়ার লোক। না থাকলে উঠোন কেন ব্যাঁকা তা নিয়ে প্রচুর গবেষণা করতে হবে, নাচা হবে না। 
শান্তিগোপাল, আমাদের শিক্ষক হাতে-কলমে দেখিয়ে দিয়েছেন। চাষাভূষো, মজুর-টজুর বিধিবদ্ধ ফাত্রা লোককে শিক্ষণীয় যাত্রা দেখিয়েছেন হাজারে হাজারে বসিয়ে। হ্যাঁ, তারাও দেখে গিয়েছে। সেলাম করে গিয়েছে, আর গর্জনে উত্তাল হয়েছে। মহাসমুদ্রের মহানাদে। 

ঋত্বিক যখন 'আমার লেনিন' করছেন তখন 'লেনিন লেনিন লেনিন লেনিন/ নূতন আশা নূতন দিন' গানের যুদ্ধতৎপরতায় চরিত্র আর ক্যামেরা এগিয়ে যায় যাত্রার মঞ্চের দিকে। 'লেনিন, কথা বলছেন, বোঝাচ্ছেন, ঘুরে বেড়াচ্ছেন এই গ্রাম্য রাজ্যের মাঝে'। নেপথ্যে ভয়েস ওভার বলছে। বলছে লেনিন বাংলার মঞ্চে গাইছেন ইন্টারন্যাশনাল। এই-ই সম্ভবত সেকালের রাজনৈতিক যাত্রার একমাত্র ফুটেজ। যিনি জানেন কোথায় তাকাতে হয় কোন রাজনীতি নিয়ে - তিনিই দেখেন, বাকীরা দেখি দেখি ভাণ করে মাত্র।

ঋত্বিক দেখেছেন। দেখিয়েছেন। আমরা ফাত্রা লোকেরা দেখেছি। রাজনীতি ঠান্ডা ঘরে বসে, গাড়ি চড়ে ঘুরে, ভোট মাপবার বস্তু নয় জেনেছি। বাবুরা পুলিশ-গুণ্ডা দিয়ে বুথস্তরের সংগঠন গড়ে ক্যাডার বেস্‌ড পার্টি হবার খোয়াব দেখেছে। দেখে এখনও। নির্বাচনে হারা জেতা নয়, আদপেই বাংলার মাঠে মাঠে পুলিশ-গুণ্ডা বাদ দিয়ে কত মানুষ হাতের লাঠি কিম্বা কাস্তে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়, সেখানেই জোর, ভুলে গেছে তারা। 

এখনো, গ্রামে-মফস্বলে, শহরে বিদ্বেষের পারদ উর্ধগামী। ক'টা সিটে জেতার আনন্দে সেদিকে কারো নজর নেই। এখন নেই শান্তিগোপাল। রাতের পর রাত জেগে, নিঃস্ব হয়ে গিয়েও মাঠে মাঠে আদর্শের বীজ বোনার চেষ্টা নেই। খিল্লি আছে শহুরে আমোদগেঁড়ে মধ্যবিত্তের 'কে তুই শান্তিগোপাল' বলে। আর আছে রাজনৈতিক ভয়াবহ শূন্যতা যেখানে যা খুশীকেই রাজনীতি বলে চালিয়ে হাততালি নেবার পালা। ঘৃণ্যকে ঘৃণা না করতে পারার অক্ষমতাই চিনিয়ে দেয় কে কোন শ্রেণীর পক্ষে, কে কোন রাজনীতির পক্ষে। স্তাবকতা আর সাপলুডোর দিনকালে শান্তিগোপালকে তাই মনে পড়ে।

শুক্রবার, ২৭ অক্টোবর, ২০২৩

বিজয়া ~ ডাঃ বিষাণ বসু

শোনো, ছাতিমের ঘ্রাণ বিষাদ অতিক্রম করে মৃত্যু অবধি স্পর্শে সক্ষম, সে কথা তো তোমাকে আগেও বলেছি। নতুন বলতে, শিউলির বৃন্ত থেকে কমলা রঙ থেঁতলে - অশ্রু আর রক্তে ভিজিয়ে - গেরুয়া করে তোলা। যদিও সময় থাকতে তোমাদের আর বলে ওঠা হয়নি - এসবের পরেও - যে সাদা পাপড়িটুকু পড়ে আছে, মাঠে - বৃন্তচ্যুত যদিও - ওই দ্যাখো, ভেসে যাচ্ছে নদীর স্রোতে - সে তো মিছে কিছু নয়।

এই সবই ঠিক, শুধু এটুকু, আজও, রহস্য-ই রয়ে গেল, বিসর্জনের শেষে ফাঁকা মণ্ডপ, পরম অবিশ্বাসীর মনেও, কেন শূন্যতার আবাহন করে! মেঘলা আকাশ। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। রহস্য ক্রমে আরও নিবিড় হয়ে ওঠে। আকুল রহস্যের মধ্যে ঝরে পড়তে থাকে হিম। আর তো দুদিন মাত্র, তার পর চন্দননগরের আলো আস্তে আস্তে আকাশপ্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকবে। কার্তিক তো এসে পড়েছে হে।

তথাপি এ তো কিছু অজানা কথা নয়, যে, নতুন জামা, দুদিন পরেই পুরনো হয়ে যায়। এমনকি পুরনো হতে পারারও আগে, জামার তন্তুতে মিশে যেতে থাকে ঘামের গন্ধ। দর্পনে প্রতিফলিত প্রতিমা-মুখ, কেউ নাড়িয়ে দেওয়ার আগেই, ঝাপসা হয়ে যায়। বস্তুত, প্যান্ডেলের আয়োজন, সে যে নেহাতই চুক্তিভিত্তিক, একথা তো প্রথম খুঁটিটি পড়ার পূর্বেই জানা।

তবু পিছুটান এমনই, সবকিছু জানার পরেও, বিষণ্ণ চোখ শুধু দেখে, প্যান্ডেলের মেঝেতে পড়ে থাকা ইতস্তত সিঁদুর। বিষাদবিধুর।

দ্যাখো, ফুরিয়ে যায় না কিছুই। কেননা, ফুরোনোর পরেও কিছু গল্প শুরু হবে। শুরু হয়-ই। সমাপ্তি কীভাবে আসবে, সেটুকু জানা গেল না - কিন্ত ও নিয়ে আক্ষেপ অবান্তর। কিছু কিছু অজানা এমনই থাকুক না। কিছু অপ্রাপ্তি, কিছু ছাড়তে-না-পারা দীর্ঘশ্বাস। ঘন হয়ে থাকুকই না।

জানা বলতে, বিদায়ী ঢাকের শব্দের সঙ্গে মিলে যেতে থাকে 'চিরদিনই তুমি যে আমার'-এর প্রিল্যুড। গল্প না-ই বা জানলে, গানের কথা যদি জানতে চাও, আরেকটু সবুর করো। আলোগুলো ফুরিয়ে যাক, তারপর… শোনো…

এ জীবন ফুরিয়ে যেদিন
পাবো এক নতুন জীবন
সেদিনও হবে একাকার… 

না হে! ওসব নিতান্তই বাজে কথা। স্তোকবাক্য নিছক। তোমাকেই জানিয়ে রাখি, আসছে বছর আবার হবে, এই শব্দমালা, কোনও এক বছর থেকে, মিথ্যে হয়ে যায়। যাবেই। চিরতরে। 

আকাশে, বাতাসে, ধোঁয়ায়, মলিন হয়ে আসা আলোয় - কিংবা মাটির গভীরে - লীন হয়ে যাওয়ার আগে…

এই বেঁচে থাকাটা, উৎসবের মতোই, পরের বারের জন্য প্রতীক্ষা। একে কি মিথ্যে বলব, বলো? বলব, মায়া? একেই??

শুভ বিজয়া। ভালো থেকো।

পড়ে আসা বেলায় দাঁড়িয়েও বিশ্বাস করতে বড় লোভ হয় - আবার তাহলে…

© বিষাণ বসু

রবিবার, ১৫ অক্টোবর, ২০২৩

পুজোয় চাই নতুন শাড়ি ~ সৌম্য চট্টোপাধ্যায়

কি কঠিন সব শাড়ির নাম হয়ে গ্যাছে আজকাল। বৌয়ের সাথে পুজোয় কেনাকাটা করতে গেছিলাম। একজন বলছে, আপনাকে একটা ফ্লোরাল জরি, জুট-কটন বালুচরি দেখাই! আর একজন বলছে, না, না!আপনি বরং প্রথমে একটা হাতে বোনা এথনিক-মোটিফ জুট সিল্ক দেখুন। শাড়ির নাম না ধামালের ভেনুগোপাল মুতথুস্বামী আইয়ারের পুরো নাম বলা শক্ত। শাড়ির দোকানে গেলে আমি কতগুলো বেসিক্স মাথায় রাখি। যদি দুটো শাড়ির রঙ একদম এক মনে হয়, তাহলে অবশ্যই তাদের রঙ পুরোপুরি আলাদা। প্রথম আধঘণ্টায় দেখানো কোন শাড়ি কখনো ভালো হয় না। এবং কোন শাড়ির কত দাম হতে পারে, পাড়ের নীচে স্টেপল করা কাগজে নিজে না দেখে বোঝা অসম্ভব। শাড়ি আর সৌরভ গাঙ্গুলী শেষ অবধি কত টাকায় বিক্রি হবে কেউ আগে থেকে জানতে পারে না।  

বউ, দুটো শাড়ি অনেকক্ষণ ধরে দেখছে, আমি জানি শেষ অবধি দুটোই নেওয়া হবে, কিন্তু সেটা এখন বললে মানবে না, আমি বলছিও না। দুটো একইরকম শাড়ি কেনার একটা প্রাথমিক শর্ত হল ডিসিশান-মেকিংটাকে প্রথম একঘণ্টা একটা ডিনায়ালের মধ্যে দিয়ে যেতে দিতে হবে। সে হোক, আমার তাড়া নেই, আমি ইউটিউবে ভিডিয়ো দেখছি, ইজরায়েল-প্যালেস্টাইন দিয়ে শুরু করেছিলাম, এখন জিরাফের গলা কি করে এতো লম্বা হলো দেখছি। হঠাত দেখি বৌ বলছে, এর মধ্যে কোনটা নেবো বলতো? এগুলো ট্রিক কোয়েশ্চেন, সত্যি করে উত্তর দিতে নেই। এরকম আমরা স্কুলে জিজ্ঞাসা করতাম, তুই কি এখনও আগের মত শেয়ালদা স্টেশানে পকেট মারিস? সে যাই হোক, এরকম প্রশ্নের উত্তর দেবার একটা টেম্পলেট আছে।দেখবেন মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গল ডার্বির দিন হয়তো স্কুল গ্রুপে উদমা খিস্তিখাস্তা চলছে, হঠাত কোন এক শান্তিগোপাল লিখল, কিন্তু শেষ অবধি জিতে গেলো ফুটবল।

আমি বউকে বললাম, কোনটা নেবে সেটা বড়কথা না, দুটো শাড়িতেই কি সুন্দর হাতে বুনে কাজ করেছে। যেটাই নাও, শেষ অবধি জিতে যাবে শিল্পটা। বউ খুশি হয়েছে, বুটিকের মহিলা, যে কিনা রাত্তিরবেলাতেও অপর্ণা সেনের মত একটা বাদামী গগলস পরে বসে ছিলো, সে অবধি আমাকে গগলস খুলে মাপছে। সে মাপুক, আমি আবার মোবাইলে ফিরে গেছি। ফেসবুকে একজন ভদ্রমহিলা কবিতা লেখেন বলে ফলো করেছিলাম, দেখছি রিলসে কামার্ত দৃষ্টিতে ঠোঁট চিপে তাকিয়ে আছেন। নীচে বাপ্পা সমাদ্দার লিখেছে, দিদি খুব স্নিগ্ধ লাগছে। ভাগ্যিস রবীন্দ্রনাথের সময় রিলস ছিলো না, নইলে আমি স্পষ্ট দেখতে পারছি, রাশিয়ার চিঠিতে মস্কোর বারান্দা থেকে রবিবাবু নবাব গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া পরে পাউট করছেন আর রঞ্জন বন্দোপাধ্যায় লিখেছেন, দাদা, খুব স্নিগ্ধ লাগছে।  

বুটিকের মহিলা বউকে বলছে, আপনাকে একটু সুদীপার কালেকশান দেখাই, আমি কলকাতা থেকে আনিয়েছি।এটা শুনে একটু নড়েচড়ে বসলাম, সাবধান হওয়ার দরকার আছে। কোন শাড়ি দেখানোর আগেই মনে হচ্ছে সুদীপার হাতে আমার একটা কাটা কিডনি দেখতে পাচ্ছি।  সুদীপা রান্নাঘরে বলছে, প্রথমেই আমরা সৌম্যর একটা কিডনি, ছাঁকা তেলে মুচমুচে করে ভেজে নেবো। অপর্ণা সেন বৌকে একটা সাদা ন্যাতার মত শাড়ি দেখাচ্ছে, এরকম শাড়ি পরে জেনেরালি জয়া এহসান বিধবা সেজে ঘোরে কৌশিক গাঙ্গুলীর সিনেমায়। বলছে, একদম সিম্পলের মধ্যে, নাম আঙুরলতা, দামও রিজনেবেল, সত্তর হাজারের রেঞ্জে এইগুলো। আমি মানসচক্ষে দেখতে পারছি, সুদীপা আমাকে বলছে, শুধু কিডনি না, পুরো শরীরটাই চাই সৌম্য, নইলে আঙুরলতা হবে না। আমি দেখতে পাচ্ছি সুদীপার বাড়িতে একটা পুতুল সাজানো আছে, মুখটা একদম আমার মত দেখতে। বাড়িতে কেউ গেস্ট এলেই পুতুলটা ঠক করে নীচে পরে যায়। 

আমি উশখুশ করে বলছি, না না, এইগুলো থাক, অন্য কোন কালেকশান আছে নাকি! বুটিকের অপর্ণা সেন বলছেন, তাহলে একটু সব্যসাচী দেখাবো নাকি? আসলে সকলে দেখতে চায় না! সুদীপার মত সব্যসাচী চক্রবর্তী যে শাড়ির ব্যবসায় নেমেছেন এটা জানতাম না। চিরদিন বামপন্থী মানুষ, গণআন্দোলনে থেকেছেন। নিশ্চয়ই মাস-সেগমেন্ট টার্গেট করেছেন। আমাদের প্রোডাক্ট প্লেসমেন্টে শেখানো হত, Sensodyne এর কাস্টমার আলাদা, আবার বাবুল টুথপেস্টের কাস্টমার আলাদা, একদম ডিফারেন্ট প্রোডাক্ট প্লেসমেন্ট, আলাদা ক্যাচমেন্ট এরিয়া। ভালোই করেছেন, ছেলে দুটো তেমন দাঁড়াতে পারে নি। মাস-সেগমেন্টের, মেহনতি মানুষের প্রোডাক্ট যে এই বুটিকে কেউ দেখতে চাইবে না, এতে আর অবাক হওয়ার কি আছে।

এতক্ষণে বেশ কনফিডেন্ট ফিল করছি, শাড়ীর রঙগুলো ও বেশ ফ্যানাভাত, দুধভাত টাইপের, খেটে খাওয়া মানুষের শাড়ির রঙ যাকে বলে আরকি। বৌকে বললাম, নাহ এবারে তাহলে একটা সব্যসাচী নাও বুঝলে। বউ খুব অবাক, বলছে, এই না না, এইসবের একদম দরকার নেই, এইগুলো কেউ কেনে নাকি, পাগল হয়েছো! শাড়ির দাম দেখার জন্য, পাড়ের নীচটা উল্টে স্টেপল করা কাগজটা দেখলাম। দেখলাম শুধু আমি না, আমার পুরো গুষ্টি, আমার পুরো পাড়া হাতে কিডনি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। 
 
শাড়ি আর সৌরভ গাঙ্গুলী! শেষ অবধি কত টাকায় বিক্রি হবে কেউ আগে থেকে জানতে পারে না মাইরি।

মঙ্গলবার, ১০ অক্টোবর, ২০২৩

ইজরায়েল ~ অভিষেক রয়

একটা ছোট্ট ভূখণ্ড নিয়ে ঝামেলার শেষ নেই। সভ্যতার উষাকাল থেকে যে কাটাকাটি চলছে তার কোনো স্থায়ী সমাধান মনে হয়না সম্ভব। জায়গাটাকে রিজার্ভ ফরেস্ট তৈরি করে মানুষের বদলে জন্তুদের থাকতে দিলে হয়ত এর পরিত্রাণ হতে পারে।

তা মুল ঝামেলা কি নিয়ে? জেরুজালেম (হ্যাঁ শেষের তিনটি অক্ষরই তিনটি গোষ্ঠীর মৌলবাদের পরিচয়), যে ৫৩ বার আক্রান্ত হয়েছে, ৪৪ বার দখলকৃত হয়েছে ২ বার ধ্বংস হয়েছে! 

প্রায় এক হাজার খৃষ্টপূর্ব সময়ে রাজা ডেভিডের সময়ে এটা ইসরায়েল এর রাজধানী ছিল, পরে রাজা সুলেমন এর সময়ে প্রথম মন্দির (যেখানে মসজিদ আল আকসা) তৈরি হয়। এখনকার ইহুদীরা ৯২৫ খৃষ্টপূর্ব সনেই মিশরীয় ফারাও দের দ্বারা বিতাড়িত হয়। এরপর খৃষ্টপূর্ব ৫৮৭ তে ব্যাবিলন সাম্রাজ্য  ও খৃষ্টপূর্ব ১৩৯ এ রোমান সাম্রাজ্যের সময় টেম্পল অফ সুলেমান ভেঙে ফেলা ও বিরাট সংখ্যক ইহুদী বিতাড়ন নথিবদ্ধ আছে।

গোটা ইউরোপ ও মধ্যএশিয়া জুড়ে যে ইহুদী বিদ্বেষ তারাও কিন্তু অন্যদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষভাবই পোষণ করে এসেছে। ওল্ড টেস্টামেন্ট জুড়ে ফিলিস্তিনি দের বিরুদ্ধে তীব্র ঘৃণা ও গণহত্যার কথা নথিবদ্ধ: প্রমিসড ল্যান্ডের বাইরের শহর গুলোর সাথে যুদ্ধে ও প্রমিসড ল্যান্ডের ভেতরে যুদ্ধ (Deut 20:10-15) এবং (Deut 20:16-18) জেসুয়া ও মুসা উভয়েই গণহত্যা চালিয়েছেন। যীশুর ক্রুসিফিকেশন এও ইহুদী চক্রান্তর গল্প আছে।

এরপরে এলো খ্রিস্টানরা। নিউ টেস্টামেন্ট জুড়ে অ্যান্টি সেমিটিজম "Cleansing of the Temple" (11:15-19) ও "Parable of the Vineyard" (12:1-12). আবার যীশুর মৃত্যুর পর আমরা পাই বাইবেলের ভার্স:
"তোমরা নিজেদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দাও যে তোমরা তাদেরই বংশধর যারা নবীদের হত্যা করেছে... হে সাপ, সাপের বংশ! জাহান্নামের শাস্তি থেকে বাঁচবে কিভাবে ?"
- Matthew (23:31-33)
Gospel of John এও ইহুদীদের তুলনা করা হয়েছে অন্ধকার ও শয়তানের সাথে।
এছাড়াও Book of Revelation: (2:9)
"যারা বলে তারা ইহুদী, তারা শয়তানের উপাসনালয়"
লক্ষ্যনীয়, এই ঘৃণার সময়কালে ফিলিস্তিনিরা খ্রিস্টান ছিল, ও ইহুদীদের জেরুজালেমে কোনো প্রবেশাধিকার ছিলনা। লুকিয়ে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়লে মৃত্যু।

সপ্তম শতকে মুসলিম উত্থান হলে দেখা গেল কোরআন ইহুদীদের প্রতি তাৎপর্যপূর্ন বিদ্বেষ পোষণ করে। তারা ঈশ্বরের অবাধ্য (2:93), নিজস্ব চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে (2:100), তারা নিজস্ব তোরাহ অনুসরণ করতে ব্যার্থ (5:66) ঈশ্বরের দ্বারা অভিশপ্ত (2:88, 4:51-52) থেকে সূরা আল বাকারা যেখানে সরাসরি খুন ও বিতাড়নের আয়াত।

মোহাম্মদ নিজে বনু কুরাইজা গোষ্ঠীর উপর যে গণহত্যা ও অত্যাচার চালিয়েছেন তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। এমনকি মৃত্যু শয্যাতেও ওনার শেষ ইচ্ছে ছিল আরবভূমি হতে ইহুদী বিতাড়ন!
আজ যে হামাস এর অতর্কিত হামলা, যুদ্ধবন্দী নারী ও শিশুদের তুলে নিয়ে যাওয়া তাও কোরআন সমর্থিত বর্বরতা।

আব্রাহামিক ধর্মমানুষদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ততক্ষণ শেষ হবেনা যতক্ষন না তারা নিজেদের ধর্মগ্রন্থগুলি ত্যাগ না করে। ইসলামের নামে ভারত ভাগ করে পাকিস্থান তৈরি যতটা ভুল ততটাই ভুল জয়নিজম এর নামে ইসরায়েল তৈরি। ২০০০ বছর আগে পূর্বপুরুষ ছিল বলেই করো অধিকার জন্মায়না যে  নিজেদের ঘরবাড়ি ফেলে অন্যদেশে এসে সেখানকার মানুষকে উৎখাত করে বসা। কাল এন আর আই শ্যামলবাবু আপনার বাড়ি এসে যদি বলেন "৫০ প্রজন্ম আগে আমার পূর্বপুরুষ এই জমিতে থাকতেন, ওই তো পশ্চিমের ভাঙ্গা পাঁচিলটা এখনও আছে, ওখানেই ওরা ইয়ে করতেন, আপনি নিজের বাড়ি থেকে চলে যান" তাহলে আপনি ছেড়ে দিতেন ?
কিন্তু ৭৫ বছর ধরে এটাই চলে আসছে, এর মূল কারণ ইহুদী ধর্মগরন্থ: তোরাহ, যেখানে লেখা আছে হেকেল (বর্তমানে মসজিদ আল আকসা) এর কাছাকাছি থাকা ইহুদীদের জন্য সবচেয়ে পুণ্যের। তাই জেরুজালেম এর এই অংশের প্রপার্টির দাম সবথেকে বেশি। মৌলবাদী ইহুদীরা লক্ষ লক্ষ ডলার খরচ করে   এখানে থাকে। Third Temple গড়ে তোলার জন্য, কল্পিত মাসিহার আগমনের জন্য ইহুদী জনবসতি ইলাস্টিকের মত বাড়ানো হচ্ছে ওয়েস্ট ব্যাংক জুড়ে।

আবার ঠিক তেমনভাবেই দ্ব্যর্থহীন ভাবে বলতে হবে, ভোররাতে ঘুমন্ত জনপদে ৭৫০০ রকেট হামলা করে, নির্বিচারে সাধারণ মানুষকে হত্যা করে নারী শিশুদের গনিমতের মাল বানিয়ে ধর্মীয় স্লোগান দেওয়া শুধুই সন্ত্রাসবাদ কোনো স্বাধীনতা সংগ্রাম নয়। বরং ফিলিস্তিনদের স্বাধীনতা ব্যাহত হওয়ার মুল কালপ্রিট হল হামাস ও হিজবুল্লাহ।

এটাই সংগঠিত ধর্মের সমস্যা। শেষের সেদিন ত্বরান্বিত করার জন্য এরা নিজ নিজ গ্রন্থ অনুযায়ী বদমাইশি করতে থাকে। প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ গুলোতে প্রতি গুড ফ্রাইডে নিয়মিত টাকা তোলা হয় ও স্টেট অফ ইসরায়েল এর জন্য প্রার্থনা হয় যাতে ইহুদীরা যীশুকে ঈশ্বরপূত্র বলে মেনে নেয় (John XXIII)
সেই যীশু, যিনি বলেছিলেন তিনি ফিরবেন পরেরবার যোদ্ধার মত, শাসকের মত শাস্তি দিতে (অবশ্য মানুষকে দেখলে সত্যি মাথা ঠিক রাখা কঠিন, ৫০০ টাকায় যারা ভোট বিক্রি করে তাদের দেখলে আমারই আগাপাশতলা চাবকাতে ইচ্ছে করে)।

যাইহোক যা বলছিলাম, ভবিষ্যত সম্পর্কে সব ধর্মীয় মৌলবাদের প্রায় একই রকম একটা ধারণা আছে। ঈশ্বরপ্রেরিত দূত আসবেন; ইহুদীদের মসিহা, খৃষ্টানদের খ্রিস্ট ও অ্যান্টি খ্রিস্ট, মুসলিমদের দজ্জাল ও তাকে দমন করতে ইমাম মেহেদী ও যীশু, হিন্দুদের কল্কি অবতার। এলেই একটা বিভৎস মারামারি শুরু হয়ে যাবে। লাশ জমবে পাহাড়ের মত, রক্ত বইবে নদীর মত। তারপর ঠিক আপনার বাপ পিতামোর ধম্মটাই নাকি জিতে যাবে! সেই জিত উপভোগ করার জন্য আপনার বংশের কেউ বেঁচে নাও থাকতে পারে হয়ত সেই জয় ভোগ করবে রাস্তায় আপনার মেয়েকে যে টিজ করেছিল সে বা আপনার জমির ভেতরে যে আল দিয়েছে সে! 

তাই এই ভয়ঙ্কর ফ্যান্টাসি থেকে বেরিয়ে আসুন, মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে দেখুন, শিশুকে ভালোবাসুন শুধু শিশু বলে, পৃথিবীকে কেয়ামতের দিনের মাঠ না ভেবে আজকের পৃথিবীকে বাঁচতে দিন, গাছ লাগান। ধর্মনিরপেক্ষতা ও কল্যাণকামী বিজ্ঞাননস্কতাই একমাত্র শুভপথ।

রবিবার, ১ অক্টোবর, ২০২৩

রামগ্রামের আদি স্তূপ ~ স্বাতী ভট্টাচার্য্য

রামগ্রামের নাম কখনও শুনিনি, তাই সেখানে যে একটা বৌদ্ধ স্তূপ আছে, এবং বিশ্বের সব স্তূপের মধ্যে তা বিশিষ্ট, তা জানার কোনও স্কোপ ছিল না। বেড়াতে গিয়ে যা শুনলাম, তাতে রীতিমতো একটা ওটিটি সিরিয়াল হয়ে যায়। যাকে বলে, পিরিয়ড পিস। মহাপরিনির্বাণ সূত্রে গল্পের মূলটা রয়েছে।
ব্যাপার হল, গৌতম বুদ্ধ তো কুশীনগরে দেহ রাখলেন। বছরটা খ্রিস্টপূর্ব ৫৪৩,  সেখানে তখন মল্ল বংশের এক রাজার রাজত্ব। তিনি বুদ্ধের ভস্মাধার এবং অন্যান্য যা কিছু স্মরণিকা, সেই সব কিছু একটি বৃহৎ জন-প্রকোষ্ঠে ('কাউন্সিল হল') কঠোর পাহারার মধ্যে রাখলেন। সেখানে ফুল, ধূপ, গান ইত্যাদি সহকারে শ্রদ্ধা নিবেদন চলতে থাকল। কিন্তু আশেপাশের রাজারা এক যোগে বুদ্ধের সেই সব স্মারকের ভাগ দাবি করলেন। তাদের মধ্যে  কপিলাবস্তুর শাক্য রাজা, পভার মল্ল রাজা, বেথদীপের ব্রাহ্মণ রাজা, বৈশালীর লিচ্ছবি, মগধের মৌর্য, পিপলিবনের মৌর্য এবং রামগ্রামের কোলিয়া (বা কল্য) রাজারা।  গোড়ায় কুশীনগরের মল্ল রাজা বেঁকে বসেছিলেন, কিন্তু অন্য রাজারা বুঝিয়ে দিলেন, দরকার হলে তাঁরা যুদ্ধ করবেন। শেষে কুশীনগরের এক ব্রাহ্মণ, তার নাম দ্রোণ বা দোন রাজাকে বোঝালেন, যে বুদ্ধ সারা জীবন করুণা আর অহিংসার বাণী প্রচার করলেন, তাঁর দেহাবশেষ নিয়ে রক্তারক্তি কি ভাল দেখায়? শেষমেষ সেই সব স্মারক আট ভাগ হল (অথবা দশ ভাগ, নানা মত পাচ্ছি)।

কোলিয়া রাজা বুদ্ধের স্মারক পেয়ে মহাসমারোহে শোভাযাত্রা করে তাঁর রাজধানী রামগ্রামে এনে রাখলেন, এবং তার উপর মহাস্তূপ রচনা করলেন। এই কোলিয়া রাজারা ছিলেন গৌতম বুদ্ধের মাতুলকুল — এঁদেরই কন্যা মায়াদেবী এবং প্রজাপতি গোতমী (দুই বোনকেই বিয়ে করেছিলেন শুদ্ধোধন, বুদ্ধের জন্মের পরে মায়াদেবী মারা যান, গোতমী তাঁকে মায়ের মতোই বড় করেন, তাঁর নিজের দুই ছেলেমেয়েও ছিল)। বুদ্ধের স্ত্রী যশোধরাও কোলিয়া বংশের মেয়ে।
সম্রাট অশোক বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার পর স্থির করলেন, তাঁর গোটা রাজ্যে চুরাশি হাজার স্তূপ তৈরি হবে। তাই তিনি আদি স্তূপগুলি খুলে, তার ভিতরে রক্ষিত স্মারকগুলির অধিকাংশই বার করে নেন। কেবল রামগ্রামের স্তূপটি তিনি খুলতে পারেননি। কেন, তা নিয়ে যথারীতি কাহিনি তৈরি হয়েছে। যেমন, অশোক সেখানে এসে দেখেন, এক মহানাগ সেই স্তূপ রক্ষা করছে। অথবা, হাতির দল সেখানে শুঁড়ে করে জল দিচ্ছে, ফুল দিচ্ছে। এমন কোনও অলৌকিক দৃশ্য দেখে অশোক নিরস্ত হয়েছিলেন। কিংবা হয়তো বুদ্ধের মামাবাড়ির লোকেরা অশোকের 'মামাবাড়ির আবদার' পাত্তা দিতে চাননি, রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। কী হয়েছিল, কে বলতে পারে। শরদিন্দু থাকলে এ নিয়ে একটা আস্ত উপন্যাস লিখতে পারতেন। সেখানে হয়তো রামগ্রামের কোনও দৃপ্ত ভিক্ষুণী দিগ্বিজয়ী সম্রাটকে নতমস্তকে প্রণিপাত করে বিদায় গ্রহণ করতে বাধ্য করতেন।
সে যা-ই হোক, হিস্টরিক্যাল ফ্যাক্ট (কিংবা কনসেনসাস অন ফ্যাক্ট) হল এই যে, রামগ্রামই বিশ্বের একমাত্র আদি স্তূপ, যা আড়াই হাজার বছর ধরে অক্ষত রয়েছে।
তা বলে কি কালের ছায়া পড়েনি তার উপরেও? কয়েকশো বছর লোকে ভুলে গিয়েছিল, কী এই জায়গা, কী এর মাহাত্ম্য। স্থানীয় চাষিরা এই ভূখণ্ডকে বলতেন দুর্ভাগা জমি, কারণ এখানে ফসল লাগালে তা বড় হয় না। হবে কী করে, স্তূপকে ঘিরে মাটির তলায় ঘন ইটের গাঁথনিতে তৈরি সঙ্ঘারাম রয়েছে, তা কি আর তখন জানা গিয়েছিল? ১৮৯৯ সালে এক ব্রিটিশ প্রত্নতাত্তিক ডব্লিই হোয়ি (W Hoey) এটিকে আবিষ্কার করেন। 

লুম্বিনী থেকে চুয়াল্লিশ কিলোমিটার দূরে রামগ্রামের এই স্তূপ রয়েছে মাটির তলায়, সবুজ ঘাসের আচ্ছাদনে ঢাকা তার উপরিভাগ। তবে সত্যি বলতে কী, কারুকার্যময়, সোনালী চূড়ায় শোভিত , বিচিত্র স্থাপত্যে সাজানো স্তূপ তো নেপালে বা ভারতে কম নেই। তার চাইতে এই সবুজ ঘাসে ঢাকা, এক বৃহৎ অশ্বত্থের ছায়ায় শীতল, অতি শান্ত পরিবেশে শুয়ে থাকা স্তূপটি যেন অনেক বেশি স্পর্শ করে মনকে। এমন কোমল কিন্তু অবিচল স্থানে এসেই তো রাজশক্তি লজ্জা পায়, হেরে গিয়ে ফিরে যায়।

কপিলাবস্তু ~ স্বাতী ভট্টাচর্য্য

কপিলাবস্তু। ক'জনই বা গেছে, অথচ, কে না গেছে? প্রাচীন সে শহর মনের চোখে চিরজীবন্ত। এক প্রৌঢ় পিতার তৈরি এমন রমণীয় এক নগরী, যাতে তার তরুণ পুত্র সংসারের প্রতি বীতরাগ না হয়, পিতার সিংহাসনেকে উপেক্ষা করে চলে না যায়। তা-ও সেই পুত্র, মাত্র ২৯ বছর বয়সে, সুন্দরী স্ত্রী আর শিশুপুত্রকে ছেড়ে, স্নেহময়ী বিমাতা প্রজাপতি গোতমীকে ছেড়ে, কপিলাবস্তুর পূর্ব দ্বার দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। নির্বাণ লাভের পরে পিতার আহ্বানে ফিরেছিলেন বটে, তবে কপিলাবস্তু নগরীতে প্রবেশ করেননি। নগরী থেকে ছ'কিলোমিটার দূরে,  বটগাছের বনের ছায়ায় থাকতেন। সেই জায়গার নাম নিগ্রোধারাম। সেখানে সঙ্ঘও তৈরি হয়, সম্ভবত বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই। তার সাক্ষ্য মেলে ধ্বংসাবশেষে।  এখানেই নাকি গোতমী বুদ্ধের থেকে সন্ন্যাস প্রার্থনা করেছিলেন, বুদ্ধের ছেলে রাহুল এখানেই দীক্ষিত হয়েছিলেন সন্ন্যাসে।

যে কোনও তীর্থস্থান তার  মাহাত্ম্য খুঁজে পায় বহু প্রজন্ম-লালিত কাহিনিতে, সেগুলোকে 'আরও সত্য' বলা চলে। পাশাপাশি চলে আর এক বয়ান — ইতিহাসের, প্রত্নতত্ত্বের। ভারত আর নেপাল মিলিয়ে অন্তত তিনটি স্থান ছিল কপিলাবস্তু হওয়ার দাবিদার। শেষ অবধি লুম্বিনীর অনতিদূরে তিলৌরকোটে খননকার্য চালিয়ে প্রাচীন  নগরীর যে নিদর্শন মিলেছে, তাকেই ঐতিহাসিকরা কপিলাবস্তু বলে মোটামুটি স্বীকার করে নিয়েছেন। তা হয়তো আমাদের কল্পিত রাজধানী ছিল না, ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। শুদ্ধোধনও মস্ত রাজা ছিলেন না, ছিলেন রাজপুরুষদের প্রধান। কপিলাবস্তুর চাইতে অনেক বড়, অনেক বিলাসবহুল, সুরম্য নগর তখন ভারতে ছিল। হয়তো তরুণ সিদ্ধার্থ সে সব দেখেওছেন। তবে জীবনের প্রথম ভাগ কপিলাবস্তুতেই যে তিনি কাটিয়েছেন, সে বিষয়ে সংশয় নেই।

১৮৯৯ সালে তিলৌরকোটের প্রত্নতাত্ত্বিক  আবিষ্কারকে প্রাচীন কপিলাবস্তু বলে চিহ্নিত করার কৃতিত্ব এক বাঙালির, তাঁর নাম পূর্ণচন্দ্র মুখোপাধ্যায়। সলজ্জে স্বীকার করি, কপিলাবস্তুতে দাঁড়িয়ে সে দেশের সরকারি দফতরের বোর্ডে তাঁর নাম ( পি সি মুখার্জি) দেখে তাঁর কথা প্রথম জানলাম। আমাদের ইতিহাসের সিলেবাস রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়েই ক্ষান্ত দিয়েছিল, আর নিজের পড়াশোনার দৌড় তথৈবচ। নেট সন্ধান করছে দেখছি, বহু সাহেব হর্তাকর্তার ঈর্ষা-বিষ সয়ে পূর্ণচন্দ্রকে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়াতে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হয়েছিল।

আমাদের সঙ্গের গাইডটি নিজেকে 'গভর্নমেন্ট রেজিস্টার্ড' বলে দাবি করলেন, এবং আগাগোড়া কল্পকাহিনী শুনিয়ে গেলেন। ভাগ্যিস, আবছা হয়ে-আসা সরকারি বোর্ডগুলো ছিল। গাইড বললেন, এই পশ্চিমের দরজা দিয়ে শুদ্ধোধন ঢুকতেন কপিলাবস্তুতে, এটাই ছিল নগরের প্রধান রাজপথ। বোর্ড বলল, এই এলাকায় সম্ভবত সব চাইতে গরিবরা থাকত, কারণ এখানকার বাড়িগুলো সব ভাঙা ইটে তৈরি, বেঁটে বেঁটে দেওয়াল। অতঃপর 'এখানেই মায়া দেবী চান করতেন' 'এটাই রাজার শোয়ার ঘর ছিল' ইত্যাদি ব্যাখান চলল। বোর্ড বলল, এ সবই কুশান আর মৌর্য আমলের, বুদ্ধের সময়ের শহর সম্ভবত মাটির অনেক তলায়। তবে এলাকা যে প্রাচীন, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই, খ্রিস্টের জন্মের আটশো বছর আগেকার সাক্ষ্যও মিলেছে। বুদ্ধের জন্যই এ নগরীকে সবাই চিনলেও, এর নাম তাঁর চাইতেও অন্তত একশো বছর আগেকার এক ঋষির নামে, তিনি কপিল, সাংখ্য দর্শন যাঁর দান। কপিলের বাস্তু, সেই থেকে কপিলাবস্তু। শাক্যদের মধ্যে সাংখ্যের গভীর প্রভাব ছিল, এবং অনেকে মনে করেন যে বুদ্ধের চিন্তাতেও নিরীশ্বরবাদী সাংখ্য দর্শনের প্রভাব রয়েছে।

সর্বত্র যেমন হয়, এখানেও তাই — এক ধর্মস্থান কালক্রমে দখল করেছে অন্য ধর্ম, তৈরি করেছে নিজের বিকল্প কাহিনি। নিগ্রোধারামের নাম এখন কুদান — 'কুদা' অর্থাৎ লাফানো থেকে। শিব নাকি এখানে লাফ দিয়ে দিয়ে নৃত্য করেছিলেন। এই অঞ্চলে দেখা যায়, প্রায় সব বৌদ্ধস্তূপের কাছাকাছি একটা না একটা শিবলিঙ্গ মিলেছে। এই ইতিহাসের বয়সও ফেলনা নয়, ১৮৯৯ সালে পূর্ণচন্দ্র কপিলাবস্তুর প্রাচীর ঘেরা এলাকার মধ্যে এক দেবী মন্দির দেখেছিলেন, যেখানে মনস্কামনা পূর্ণ করতে হাতি গড়ে রেখে দিয়ে যায় লোকে। এখনও সেখানে নানা রঙের, নানা মাপের হাতি দেখে এলাম।  মন্দিরটি নিত্য ব্যবহৃত।  কপিলাবস্তুতে বৌদ্ধ সন্ন্যাসী, পরিব্রাজকরা বিশেষ তিথিতে পুজো করেন, তার ছবি দেখলাম। তবে লুম্বিনীতে মায়া দেবীর মন্দিরে যেমন নিত্য আরাধনা, কপিলাবস্তুতে তেমন ব্যবস্থা আছে বলে মনে হল না।

কপিলাবস্তু বুদ্ধের জীবদ্দশাতেই তছনছ হয়ে যায় কোশল রাজাদের আক্রমণে। সম্ভবত রোহিনী নদীর জল নিয়ে বিবাদ বেধেছিল। অশোক লুম্বিনীতে এসে কপিলাবস্তুতেও এসেছিলেন। চিনা তীর্থযাত্রীরা এখানে ঘুরে গিয়েছেন এবং বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন। তাদের বিবরণের সূত্রেই ফের কপিলাবস্তুকে চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন এক বাঙালি সন্তান।

দুপুরের ঠাঠা রোদে কপিলাবস্তুর সামনে দাঁড়িয়ে কী দেখা যায়? মস্ত এক জমি, সবুজ ঘাসে ঢাকা, নানা জায়গায় আয়তক্ষেত্রের মতো পুরনো ইঁটের গাঁথনি। বুদ্ধের বিচরণক্ষেত্র যদি বা এটাই হয়ে থাকে, তা রয়েছে মাটির নীচে। তাতে কী? ঠিক এখানেই যদি বা না হয়, যদি হয় একটু এ পাশ বা ও পাশে, যদি বা সম্পূর্ণ অন্য রকম হয় ভূগর্ভে প্রোথিত নগরীটির নকশা, তাতে কী আসে যায়? তরুণ সিদ্ধার্থ এই আকাশের নীচেই বিচরণ করেছেন, অকল্পনীয় কষ্টসাধ্য সাধনার পরে ফিরেছেন জ্ঞানপ্রাপ্ত মহামানব হয়ে, করুণাঘন রূপে, বানগঙ্গার তীরে এই জায়গাটি সেই অলৌকিক জীবনের একটি লৌকিক চিহ্ন তো বটে। সেই অচিন্তনীয়কে একটু আপন করে নেওয়ার উপায় — দুপুর রোদে চোখ-মুখ কুঁচকে, গাইডের বকর বকর অগ্রাহ্য করে, সবুজ ঘাস আর ছাতা-পড়া ইটের সারির দিকে তাকিয়ে চিন্তা করা — এই কপিলাবস্তু। এই কপিলাবস্তু।

মঙ্গলবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

সেটিংয়ের 'পিপিপি' মডেল ~ সুদীপ্ত বসু

অষ্টম শ্রেণির ছাত্রও নেটে সার্চ দিয়ে যে তথ্য খুঁজে পেতে পারে তাই এখন ইডির কাছে রকেট সায়েন্সের মত দুর্বোধ্য!!
চিত্রনাট্য এতটাই দূর্বল যে ইডি এক বিশেষ দুই ব্যক্তিকে তদন্তে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, এটা না বুঝতে পারাটা ই এখন ' অপরাধ '!

' সেটিং ' এখন আর রাজনৈতিক দলের অভিযোগের পর্যায়ে নেই।
সেটিং ' চেহারা কেমন তা এখন আদালতের এজলাসে খোদ ইডি প্রমাণ করছে।

কেমন করে? আচ্ছা উদাহরণ দেওয়া যাক.

আইসিআইসিআই ব্যাঙ্কের নিউ আলিপুর শাখা, এইচডিএফসি ব্যাঙ্কের হরিশ মুখার্জি রোডের শাখা, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাঙ্কের চৌরঙ্গী শাখা, স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়ার পার্লামেন্ট শাখা এবং এলাহাবাদ ব্যাঙ্কের হরিশ মুখার্জি রোড শাখা।

এই পাঁচটি অ্যাকাউন্ট অভিষেক ব্যানার্জির। এর মধ্যে শেষ অ্যাকাউন্টটি অভিষেক ব্যানার্জি নির্বাচনী অ্যাকাউন্ট হিসাবে ব্যবহার করেছিলেন ২০১৯ সালের ভোটে।

প্রকাশ্যেই সেই তালিকা রয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে অভিষেক ব্যানার্জি ডায়মন্ড হারবারে তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে যে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন তাতেই রয়েছে সেই তথ্য। 
অথচ ইডি নাকি খুঁজে পায়নি!!!

শুধু তাই নয়, অভিষেক ব্যানার্জির সম্পত্তি বলতে ইডি'র জমা দেওয়া রিপোর্টে উল্লেখ আছে কেবল মাত্র তিনটে জীবন বিমার পলিসি! 
সেই তথ্যও অসম্পূর্ণ। অন্তত অভিষেক ব্যানার্জির নির্বাচনী হলফনামা জানাচ্ছে, তাঁর নামে রয়েছে লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানির অব ইন্ডিয়ার চারটি পলিসি!

তদন্তকারী সংস্থার বিরুদ্ধে 'সেটিংয়ের' যে অভিযোগ উঠছে রাজনৈতিক মহলে, তাকেই যেন বৈধতা দিচ্ছে ইডি'র এমন দায়সারা রিপোর্ট। 

১৮৮ এ, হরিশ মূখার্জি রোডের বিলাসবহুল 'শান্তিনিকেতন' ভবন। সারা বছর এখানে রাস্তার একাংশ বন্ধ থাকে, ফুটপাতেও চলাচল নিষিদ্ধ। স্থায়ীভাবে রয়েছে পুলিশের কিয়ক্সও। চব্বিশ ঘন্টা সেখানে প্রহরা। 
 লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের দুই প্রাক্তন ডিরেক্টর ( অভিষেক ও রুজিরা নারুলা ব্যানার্জি) ও বর্তমান সিইও অভিষেক ব্যানার্জি থাকেন এই বাড়িতে। অথচ ডিরেক্টরদের সম্পত্তির তালিকাতেই উল্লেখ নেই এই প্রাসাদোপম বাড়িটির!

আরো আছে, তালিকা লম্বা। লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস কিসের সংস্থা, ব্যবসা টা কিসের, আয় করে কিভাবে সেটুকুও নাকি তদন্ত করে জানতে পারেনি ইডি!!

কিন্তু ইডি নিজেদের অপদার্থতা এভাবে নিজেই আদালতে প্রকাশ করছে কেন?? 
হিস মাস্টারস ভয়েস! তদন্ত রিপোর্টে তারই প্রতিফলন!

সারদা কাণ্ডের তদন্ত সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ২০১৪ সালে শুরু হয়। সাড়ে নয় বছর পেরিয়ে গেছে।
তদন্তের এই  দীর্ঘসূত্রিতায় লাভ কার?? চোরদের ই লাভ। তদন্তকারী সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা তলানিতে ঠেকলে তখন অভিযুক্তদের অভিযোগই বৈধতা পায়!!!!
চুরি, দুর্নীতি ছাপিয়ে তখন স্বাভাবিকভাবে তদন্তকারী সংস্থার ভূমিকাই মানুষের চোখের সামনে ধরা দেয়!!

ইডি সিবিআই এবং বিজেপি আসলে এরাজ্যে শাসক তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভকে প্রশমিত করতে, দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূল নেতাদের প্রতিহিংসার তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠা করতে, অভিযুক্তের ইমেজকেই রিবিল্ডিং করতে সাহায্য করছে!!!!

পশ্চিমবঙ্গে দুর্নীতিগ্রস্ত তৃণমূলকে এমনভাবে বৈধতা আর কেউ দিতে পারেনি!!!

শুধু এটুকুর জন্যই ২০-২২ টা আসন অনায়াসে উপহার দেওয়া যায়!!

৫ অক্টোবর সিজিও কমপ্লেক্স অভিযান নিছক তাই একটা কর্মসূচি নয়, দুই শাসকের সেটিংয়ের পিপিপি মডেলের বিরুদ্ধে ডাইরেক্ট কনফ্রন্টেশন!!

ইডি সিবিআইয়ের অফিস ঘেরাও করে সারদা থেকে নারদা, কয়লা গোরু থেকে নিয়োগ দুর্নীতির কিংপিনদের গ্রেপ্তারির দাবি তোলা আসলে এরাজ্যের বুকে তৃণমূল বিজেপির বাইনারি ভাঙারই স্লোগান।

সিবিআই - ইডি ' এখন সিআইডি' র 
থেকেও বেশি স্বস্তি দিচ্ছে শাসক দলকে!

তাই আপনি সিজিও কমপ্লেক্স অবরুদ্ধ করুন, অটোমেটিক ঘাম ঝরবে নবান্নের!