শনিবার, ৩০ মে, ২০২৬

আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…~ অরিজিত মুখার্জী

"কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলতো সঙ্ঘের শাখা৷ দলিতদের এলাকার সামনে একটা একলা অশ্বত্থ গাছ। প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলায় সেই গাছের নীচে একটা কেরোসিনের বাতি জ্বালিয়ে একটা মাদুর বিছিয়ে বসতো বছর পঁচিশের সুনীতা। সুনীতা কুমারী। আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছে। কিন্তু ওকালতি করে না। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের পার্টি অফিস থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে এই গ্রামটায়। সঙ্গে কোনো পোস্টার নেই, পতাকা নেই; সুনীতার সম্বল দুই চোখ ভরা স্বপ্ন, আর কাপড়ের পার্সের ভিতরে পার্টির একটা মেম্বারশিপ কার্ড। সে এসে বসতো একটা পুরনো টিনের ট্রাঙ্ক নিয়ে — তাতে থাকত কিছু বই: ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের বই, একটা আইনের বই, একটা সংবিধানের কপি, কিছু ফর্ম, একটা খাতা আর ডটপেন। সুনীতা গ্রামের প্রান্তিক মানুষজনের কথা শুনত, তাদের সাহায্য করত — কারো ফর্ম ভরে দিয়ে, কারো পেনশন আনার জন্য প্রতিদিন বিডিওর দপ্তরে গিয়ে; গল্প বলতো — জল-জমি-জঙ্গলের অধিকারের গল্প, রুজি-রুটির লড়াইয়ের গল্প। গান শোনাতো..."হাম ভুখসে মরনেওয়ালে"। দিন কাটতো। তারপর, পাঁচ বছর পর, একদিন, পঞ্চায়েত ভোটের পরে, সেই অশ্বত্থ গাছের নীচে দাঁড়িয়ে, সুনীতার হাত ধরে, শপথ নিল গ্রামের প্রথম দলিত মহিলা পঞ্চায়েত প্রধান..."
আমাদের কাউন্টার-হেজিমনির ভিত্তি এই গল্পটাই। গল্পটা শেষ করব পরের পর্বে, শেষ পর্বে। আজ লিখব হেজিমনি কীভাবে ভাঙা যেতে পারে তাই নিয়ে আমার আন্ডারস্ট্যান্ডিংটুকু। গ্রামশি আছে, সঙ্গে চার্বাকও - বকলমে পার্থ চ্যাটার্জী।
আধিপত্য-বিরোধিতা বা কাউন্টার-হেজিমনির ম্যানুয়াল…
আগের দুটো পর্বে লেখার চেষ্টা করেছিলাম কীভাবে হিন্দুত্ব তার ওয়ার্ল্ডভিউকে কমন সেন্স হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে প্রায় একশো বছরের অবস্থানের যুদ্ধের মাধ্যমে - স্কুল, মিডিয়া, মন্দির, দৈনন্দিন অভ্যাসের স্পেসকে দখল করে। গ্রামশির কথা মানলে আমরা এও বুঝি যে কোনো আধিপত্যই চিরকালীন নয়। বেকারত্ব, রোজকার রুজি-রুটির লড়াই, হিন্দুত্বের ভিতরের জাতিগত সংঘাত, বিভিন্ন রাজ্যে আঞ্চলিক প্রতিরোধ, নানান কারণে অস্থির যুবসমাজ - অনেক ফাটল রয়েছে এই হেজিমনির মধ্যেও। তবে ফাটল রয়েছে মানেই আপনাআপনি সেই ফাটলে বিপ্লবের গাছ গজাবে, এমনটাও নয়।
গ্রামশি বলেন পাল্টা অবস্থানের যুদ্ধের কথা। চটজলদি ভোটে জেতার স্বপ্ন দেখে লাভ নেই। হঠাৎ কোনো ক্যারিশম্যাটিক নেতা আকাশ থেকে নেমে এসে মুশকিল আসান করে দেবেন - এই খোয়াব দেখেও লাভ নেই। একটা দুটো বা দশটা বিশাল মিছিলেও বিশেষ কিছু হবার নয়। বরং, অনেক ধৈর্য্য ধরে, অনেক সময় নিয়ে কিছু কাজ করে যেতে হবে, আপাতদৃষ্টিতে যেগুলো বড়ই বোরিং কাজ - যেমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান তৈরী করা, বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে থেকেই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল তুলে আনা, সাংস্কৃতিক যুদ্ধে জেতার চেষ্টা করা, আর একদম গ্রাউন্ড-আপ একটা পাল্টা ঐতিহাসিক জোট (historic bloc) তৈরী করা…
পার্থ চ্যাটার্জীর হাত ধরে চার্বাক ফিরে এসেছেন — সেই প্রাচীন সংশয়বাদী দার্শনিক চার্বাক — যিনি এই ধারণাগুলোর একান্ত ভারতীয় রূপ তুলে ধরেন আমাদের সামনে। চার্বাকের কথা অনুযায়ী ভারত কোনো "হিন্দু রাষ্ট্র" নয়, আবার এলিট থিওরেটিকাল "বহুত্ববাদী ধর্মনিরপেক্ষ গণতন্ত্র" বলেও ভারতকে ডিফাইন করা যায় না। ভারতের ইতিহাস, ভারতের সমাজ, সেই সমাজের মানুষজনকে দেখলে ভারত, প্রকৃত অর্থে, একটা "ফেডারেশ অফ পিপলস" — পিপলস ইন প্লুরাল, কারণ এই ভূখন্ড সত্যিই বহু ভাষার, বহু সংস্কৃতি, বহু ধরণের জনগোষ্ঠীর বাসস্থান। বলতে পারেন বিশ্বের সবচেয়ে রঙিন আর কমপ্লেক্স মেলা। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে নিজস্ব আইডেন্টিটি; সবচেয়ে বড় কথা, নানান তফাত থাকা সত্ত্বেও এরা সকলেই একটা অভিন্ন সংবিধানের ছাতার নীচে একসাথে বসবাস করতে রাজী হয়েছে; অন্তত হয়েছিল একটা সময়। সেই সম্মতি বা সমঝোতা বাইরে থেকে ভেসে আসেনি। বেশ জটিল, অগোছালো এবং খানিক অসম্পূর্ণ আলোচনার ফসল এই সমঝোতা, যাকে হিন্দুত্ববাদীরা স্বাধীনতার পর থেকেই মুছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। আজ তারা অনেকাংশে সফল। ফেডারেশন অফ পিপলস-এর বদলে তারা আনতে চাইছে পুরোপুরি সেন্ট্রালাইজড, মেজরিটারিয়ান, এক দেশ এক ভাষা এক আইডেন্টিটি এক পোশাক এক খাদ্যাভ্যাসের তথাকথিত হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান।
শুরুতেই এই প্রচেষ্টাকে "নো থ্যাঙ্কিউ" জানিয়ে চলুন একবার চেষ্টা করি এই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধ পথ খুঁজে বের করতে। এক্ষেত্রে কাউন্টার-হেজিমনির পথ, অর্থাৎ সেই ফেডারেশন অফ পিপলস-কে আবার বাঁচিয়ে তোলার রাস্তা। শুধু "বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য"-এর এলিট স্লোগান নয়, বরং বাস্তবিকভাবে ক্ষমতার কেন্দ্রকে ঝাঁকুনি দেওয়া ফেডারেশন যেখানে সম্পদের পুনর্বন্টন হবে, যেখানে ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্য আর স্থানীয় অঞ্চলগুলোই নিজেদের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে, দিল্লীবাসী কোনো সুপ্রীম লীডার নয়।
প্রশ্ন হল – কীভাবে?
প্রথমতঃ, অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়াল - গ্রামশির বক্তব্য ছিল এই অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে সমস্ত সম্প্রদায় বা জনগোষ্ঠীর মধ্যে থেকে; এমন মানুষ যাঁরা তাঁদের নিজেদের ভাষায় নিজেদের কথা বলবেন; ওপর থেকে উপদেশ দেবেন না। আরএসএস এই তত্ত্বটা ভালো বুঝেছিল। ফলে, তারা সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকেই নিজেদের কথা বলার লোক তৈরী করেছিল - প্রচারক, স্কুলশিক্ষক, মন্দিরের পূজারী, আখড়ার মহন্ত, আধুনিক কালে ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার - যারা সকলেই স্থানীয় ভাষা, স্থানীয় সংস্কৃতি, স্থানীয় ইমেজারি ব্যবহার করে একটা প্যান-হিন্দু আইডিয়া বেচতে পেরেছে সফলভাবে। উল্টোদিকে, সেকুলার লেফটের মধ্যে এতদিন অবধি যারা এই জায়গায় ছিল, তারা প্রায় সকলেই ইংরিজীতে শিক্ষিত, ইংরিজীতে কথা বলাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ, ইউরোপিয়ান বা আমেরিকান ফিলোজফারদের উক্তি তাদের মুখে মুখে ফেরে, এবং অনেক ক্ষেত্রেই স্থানীয় সংস্কৃতি তাদের কাছে ব্যাকওয়ার্ড...এক কথায় একটা "এলিট" সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের কাছে খানিক অন্য গ্রহের বাসিন্দা টাইপ। কাউন্টার হেজিমনি এই ছকে তৈরী হবে না। যেমন ধরুন আমি, কলকাতায় জন্ম বড়-হওয়া একটা লোক যার সঙ্গে কোচবিহারের কোনো সম্পর্ক নেই, দুম করে রাজবংশী সম্প্রদায়ের মুখিয়া হতে গেলে কেউ মানবে না। অর্গ্যানিক ইন্টেলেকচুয়ালদের উঠে আসতে হবে এই সমস্ত কমিউনিটি — দলিত, আদিবাসী, ওবিসি, মুসলমানদের মধ্যে থেকেই। তারা নিজেদের দাবীদাওয়া চাহিদার কথা বলবে। কথা হবে পেরিয়ারকে নিয়ে, আম্বেদকরকে নিয়ে, ভক্তি আন্দোলনের জাতপাতবিরোধী দিকগুলো নিয়ে, দ্রাবিড় মুভমেন্টের ফেডারেলিজম নিয়ে। আর এই মানুষগুলোকে উঠে দাঁড়ানোয় সাহায্য করতে থাকবে স্কলারশিপ, নাইট স্কুল, কো-অপারেটিভ লাইব্রেরি, আইনি সহায়তা, ট্রেড ইউনিয়ন - কিছু দায়িত্ব তো আপনিও নেবেন, নাকি?
দুই নম্বরে আসে কালচার ওয়ার - সাংস্কৃতিক যুদ্ধ। যেখানে সংস্কৃতি কোনো জগদ্দল পাথর বা মোনোলিথ নয়। হিন্দুত্ব এই সংস্কৃতিকে মোনোলিথ বানিয়ে ফেলতে চেয়েছে, এবং অনেকাংশে তারা সফলও। কারণ, তাদের গল্পটা সোজাসাপটা। তাদের ডেফিনেশনে ভারত আদিকাল থেকেই একটা হিন্দু রাষ্ট্র; মুসলমান আর ক্রিশ্চানরা এই দেশে বহিরাগত; দেশপ্রেমিক হওয়ার একমাত্র রাস্তা হল তাদের রাগী চেহারার সিক্স প্যাকওয়ালা রামকে কুর্ণিশ করা, আর হিন্দিতে কথা বলা। হিন্দি - হিন্দু - হিন্দুস্তান। পার্থ চ্যাটার্জীর চার্বাক এই মিথকে পুরোপুরি ধুলোয় মিশিয়ে দেন। চার্বাক আমাদের জানান যে প্রত্যেক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব জাতীয়তাবাদী প্রতীক ও আখ্যান রয়েছে – সঙ্ঘ পরিবার যাকে তাদের ইচ্ছেমতো মুছে দিতে চায়: দক্ষিণে তামিল তাই, তেলগু তাল্লি, কানাড়া তায়ি, কেরলম; ঝাড়খন্ডে সিধু কানু, বীরসা মুন্ডা; মহারাষ্ট্রে শিবাজী; মণিপুরে মেইতি ইমা; পঞ্জাবে ওয়ারিস শাহ। আলাদা আইকন হলেও কোনোটাই বিচ্ছিন্নতাবাদী চিন্তাভাবনা নয়, বরং ফেডারেশন অফ পিপলস-এর মূল মন্ত্র এই আঞ্চলিক সংস্কৃতি। কাউন্টার হেজিমনির জন্যে পাল্টা-সংস্কৃতির লড়াই: ওয়েব সিরিজ, সেখানে মুসলমান নার্স ইউনিয়ন তৈরী করে সহকর্মীদের জন্য লড়াই করে; দলিত কমিউনিটির জাতপাতবিরোধী লড়াইয়ের গল্প নিয়ে গ্রাফিক নভেল; আম্বানি-আদানিদের মুনাফালুটকে ব্যঙ্গ করে লোকসঙ্গীত (হেমাঙ্গ বিশ্বাসের মাউন্টব্যাটন সায়েব গানটা মনে পড়ে); সঙ্ঘের ঘরের পাশে ঈদের ইফতার পার্টি আর আম্বেদকর মেলা; পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে মেয়েদের রুখে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে, পণপ্রথা বিরোধী গল্প নিয়ে যাত্রা; আঞ্চলিক ধর্মীয় সিঙ্ক্রেটিজমের ট্র্যাডিশনের গল্প - সুফি-ভক্তি হেরিটেজ, সত্যপীর বা বনবিবির কথা, বাউল, ফকির, দরগা আর ক্রিসমাস ক্যারলও। বৈদিক মন্ত্র যতটা ভারতীয়, আমাদের এই ট্র্যাডিশনগুলোও ঠিক ততটাই…চাঁদ সদাগরের মণসাপুজোর মত করে লোকসংস্কৃতির সংরক্ষণ দিয়ে সংস্কৃতির যুদ্ধ হয় না; সংস্কৃতি ইন্টিরিয়র ডেকোরেশন নয়; কমন সেন্স তৈরী করার অস্ত্র।
তিন, রোজকার জীবনের বিকল্প প্রতিষ্ঠান - প্রতিদিনের খাওয়াপরা বেঁচে থাকার লড়াইয়ের হাতিয়ার। সঙ্ঘ শাখা তৈরী করেছিল, রোজ সকাল সন্ধ্যেয় তারা একসঙ্গে কিছু একটা চর্চা করত। এখনও করে। কাউন্টার-হেজিমনিকে দাঁড় করাতে এর বিকল্প প্রয়োজন। যেমন ধরুন পাড়ার লাইব্রেরি, যেখানে ছোট স্টাডি সার্কল বসবে, সাধারণ লোককে সঙ্গে নিয়ে। এলিট নাটক প্রবন্ধের চর্চা শুধু নয়, পপুলার কালচার থেকেও মেসেজ বের করে আনা সম্ভব - যেমন ধরুন মার্ভেলের সিনেমা - জেন-জি-দের পছন্দের গল্প; জয় ভীমের মত সিনেমা যেখানে জাতের লড়াইয়ের কথা রয়েছে; ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট থেকে অনুবাদ হয়ে আসা নানান প্রদেশের মানুষের গল্প; নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর বাংলা অনুবাদে টিনটিনের গল্প; বাংলা ক্লাসিক - তারাশঙ্কর, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের...(আরো অনেক নাম আসতে পারে এখানে, বিভিন্ন ভাষায় আলাদা নাম, হরিনারায়ণ আপটে মনে পড়ছে যেমন)। প্রতি সপ্তাহের শেষে কমন সেন্স ওয়ার্কশপ — সেখানে সবাই মিলে সপ্তাহের খবরগুলো পড়ে আলোচনা করতে পারে: খবরে যে ঘটনার কথা বলা হয়েছে সেই ঘটনায় লাভ কার? যেমন ধরুন কোথাও একটা যুদ্ধ হলে কারা লাভবান হয়? তেলের দাম বাড়লে লাভ কার, ক্ষতি কার? একটা একটা করে এরকম ওয়ার্কশপ ছড়িয়ে পড়তে থাকলে বাড়তে থাকবে এই নতুন কাউন্টার কমন সেন্স...বক্তৃতা দিয়ে নয়, বরং শেয়ার্ড এক্সিপিরিয়েন্সের মধ্যে দিয়ে।
চার, নতুন ঐতিহাসিক জোট বা হিস্টোরিক ব্লক। কিন্তু সমস্ত শ্রেণীগত তফাত মুছে একেবারে ফ্ল্যাট সমতল করে দিয়ে নয়। হিন্দুত্ববাদী জোটের অংশীদার উচ্চবর্ণের পুঁজিপতি ব্যবসাদার, উচ্চমধ্যবিত্ত প্রফেশনাল - আইটি ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ডাক্তার ইত্যাদি, আর অন্য পিছিয়ে-পড়া শ্রেণীর লোকজন যাদের হিন্দু হায়ারার্কিতে ওপরে ওঠার উচ্চাশা রয়েছে। এদের সকলের মধ্যে কমন সুতোটা বাস্তবে মুসলমান বিদ্বেষ — সে নানাভাবে এসে থাকতে পারে, যেমন দেশভাগের জেনারেশনাল মেমরি, বা "মুসলমানরা সব দখল করে নিল"-মার্কা হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ড, এমনকী নানান অবদমিত ইচ্ছা থেকেও। কাউন্টার-হেজিমনির নতুন হিস্টোরিক ব্লক হবে একেবারেই আলাদা। এই জোটের কমন সুতো জাতিবিদ্বেষ না হয়ে হবে অভিন্ন বস্তুগত স্বার্থ, যেমন জমির অধিকার, জল জঙ্গলের অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-রুজি-রুটির অধিকার। সম্প্রদায়ের সীমানা ছাপিয়ে ইস্যুভিত্তিক প্রচার প্রতিটি মানুষের কাছে পৌঁছবে। জল জঙ্গল জমির অধিকার জাতপাত, ধর্ম, বর্ণ, উঁচুনীচু, গরীব-বড়োলোক, ধার্মিক-অধার্মিক মানে না। সমস্ত জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব থাকবে এই জোটে, থাকবে না আদর্শগত বিশুদ্ধতার শুচিবাই। ধার্মিক হিন্দু মানেই হিন্দুত্ববাদী নয়, বুঝতে হবে এই দুটো শব্দের মানে আলাদা। আমি নাস্তিক, কাজেই আমার এই জোটে সবাইকে নাস্তিকই হতে হবে — সে জোট জন্মানোর আগেই তার গঙ্গাপ্রাপ্তি নিশ্চিত।
পাঁচ নম্বর - যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করার আন্দোলন। ক্ষমতা ফিরবে রাজ্যের হাতে। শুধু বিজেপির শাসনকালেই নয়, ভারতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে শুরু করেছিল অনেক আগে থেকেই। মোদির আমলে এই টেন্ডেন্সি চরম রূপ নিয়েছে, কারণ হিন্দুত্ববাদীদের লক্ষ্যই হল ফেডারেশ অফ পিপলস-এর আইডিয়াকে মুছে দিয়ে এক দেশ, এক ভাষা, এক ধর্ম-এর হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানের ন্যারেটিভকে ফাইনাল রূপ দেওয়া। ৩৭০ ধারার বিলোপ, হিন্দি ভাষাকে চাপিয়ে দেওয়া নানাভাবে, ন্যাশনাল এডুকেশন পলিসিকে গায়ের জোরে চাপানো, পছন্দের রাজ্য সরকার না হলেই ইডি, সিবিআই, নির্বাচন কমিশন-দের লেলিয়ে দেওয়া...বর্তমানে জুডিশিয়ারিকেও — সবই একটা ইউনিটারি মেজরিটারিয়ান রাষ্ট্র বানানোর লক্ষ্যে। এর পাল্টা কৌশল হল ফেডারেলিজমের পক্ষে ক্রমাগত গলা ফাটানোঃ রাজ্যের হাতে আরও ক্ষমতা; স্থানীয় সরকার, যেমন কর্পোরেশন বা পঞ্চায়ের হাতে আরও রিসোর্স; ভাষাগত আর সাংস্কৃতিক স্বশাসনের দাবী এবং সাংবিধানিক অধিকার; কেন্দ্রীয় আদিবাসী অঞ্চলগুলোকে ষষ্ঠ তফসিলের আওতায় আনা। সংবিধানে বলা যুক্তরাষ্ট্রীয় চেতনার পরিপন্থী সমস্ত আইন প্রত্যাখ্যান করার অধিকার রাজ্যগুলোর রয়েছে, অন্ততঃ যতদিন না এই সরকার সংবিধানকেই বদলাতে পারছে — আর সেটা হতে দেওয়া যাবে না।
সবশেষে, এই লড়াইয়ের মধ্যেই অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের চর্চা। গ্রামশি বলেছিলেন – যে দল গণতন্ত্র চর্চা করে না, তারা আধিপত্যের লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে পারে না। বাস্তব বলে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই ধরণের মুভমেন্ট বা দলগুলোর ভিতরে ক্ষমতা কুক্ষিগত হয়ে রয়েছে এলিট উচ্চবর্ণের পুরুষদের মধ্যে। বাকিরা সেখানে ভোটব্যাঙ্ক। হ্যাঁ, একজন বামপন্থী কর্মী হয়েও লজ্জা না পেয়েই এই কথাটা বলছি, কারণ এটা বাস্তব। অধিকারের কথা বলবেন, অথচ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কোনো প্রতিনিধি থাকবে না সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় – তা তো হয় না। দরকারে অভ্যন্তরীণ সংরক্ষণ থাকবে; নিয়ম করে জাতিবাদ-বিরোধী, পিতৃতন্ত্র-বিরোধী প্রশিক্ষণ থাকবে দলের মধ্যেই – বিভিন্ন অফিসে যেমন প্রতি বছর নিয়ম করে POSH এর কোর্স করতে হয়। আঞ্চলিক সংগঠনের নেতৃত্বে থাকবে স্থানীয় লোক, দিল্লী থেকে নেমে আসা এলিট নেতা নয়। ইংরিজীতে একটা প্রচলিত কথা রয়েছে — “ডু হোয়াট ইউ সে”।
শুরুতেই যেমন বলেছিলাম — এই কাজগুলোর কোনোটাই গ্ল্যামারাস নয়। যন্তরমন্তরের অবস্থানে স্লোগান দেওয়ার মত উত্তেজনাপূর্ণ নয়। বোরিং কাজ যা জনসমক্ষে আসার সম্ভাবনা কম, কারণ অশ্বত্থ গাছের নীচে বসে থাকা সুনীতা কুমারীকে মিডিয়া দেখাবে না। অবস্থানের যুদ্ধ এরকমই হয়। ট্রেঞ্চের লড়াইয়ের মত। দাঁতে দাঁত চেপে ধৈর্য্যের পরীক্ষা।
গ্রামশির কথা ধার করেই বলি: The old world is dying – কংগ্রেস স্টাইলের ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান মৃতই বলা যায়। The new world – ন্যায়পরায়ণ, বহুত্ববাদী, ফেডারেল রিপাব্লিক – is not yet born. In this interregnum, a great variety of morbid symptoms – lynching, surveillance, hate speech – appear – as entertainment.
আমরা ওই ইন্টারেগনামে রয়েছি। নতুনের পথে এগিয়ে যেতে আমাদের সম্বল শুধু অসীম ধৈর্য্য আর পরিশ্রম। নতুনকে নিখুঁত গভীরতার সঙ্গে তৈরী করতে পারলে সেখান থেকেই উঠে আসবে নতুন কমন সেন্স। সঙ্ঘের অনুকরণে নয়, বরং আমাদের – সাধারণ মানুষের – নিজেদের প্রতিষ্ঠান, নিজেদের আখ্যান, নিজেদের আইন, নিজেদের অর্থনীতি গড়ে তোলার মাধ্যমে। এলিট ইংরিজীতে নয়; সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায়।
চার্বাক তাঁর পান্ডুলিপির ইতি টানেন নতুন প্রজন্মকে ডাক দিয়ে: সংহতির কথা বলো; লেখো, গান গাও, বিতর্ক করো, সংগঠিত হও; নিজেদের মাতৃভাষাকে ব্যবহার করো। নেতার অপেক্ষায় বসে থেকো না। এই দেশ, এই ভূখন্ড, এখানে বসবাসকারী প্রত্যেকটা মানুষের — যদি প্রত্যেকে একসঙ্গে এই মাটিকে নিজের করে নেয়।
অশ্বত্থ গাছটার নীচে ফিরে যাও কমরেড। টিনের ট্রাঙ্কটা সঙ্গে রেখো। একজনকে পড়তে শেখাও।
।।। একটা অশ্বত্থগাছের গল্প ।।।
কিটকিটে ধুলোমাখা প্রাচীন ঘিঞ্জি শহরটার অদূরে একটা ছোট্ট গ্রাম। একটা হিন্দু মহল্লা, কিছুটা দূরে একটা কোণে দলিতদের ঝুপড়ি কয়েকটা, আর একটা আধা অন্ধকার মুসলমান বস্তি। দলিতদের ঝুপড়িগুলোর সামনে, একটু ফাঁকা জায়গায় একটা অশ্বত্থ গাছ। বুড়ো হয়েছে গাছটা, মাঝেমধ্যে দু একটা বাচ্চা ছেলে ছাড়া কেউ তার কাছাকাছি আসে না।
হিন্দু মহল্লার মাঝখানে একটা ধুলোওঠা চত্ত্বর, তার পাশে একটা নিমগাছ। রোজ সকালে সেই চত্ত্বরে চলে সঙ্ঘের শাখা৷ আশেপাশের তিনটে গ্রাম মিলিয়ে জনা পঞ্চাশ কমবয়সী ছেলে খাকি প্যান্ট পরে ব্যায়াম করে, ধুলো উড়িয়ে লাঠি খেলে, আর জয় শ্রীরাম বলে চিৎকার করে।
অশ্বত্থগাছটা একলাই দাঁড়িয়ে থাকে।


তারপর একদিন ওরা এল। ওরা মানে পার্টি। মিছিল নয়, গাদাখানেক লোকও নয়। একটা মেয়ে।
সুনীতা কুমারী। বছর পঁচিশের মত বয়স। জেলা সদরের কলেজ থেকে আইন পাশ করেছে, চাকরি করে না, ওকালতিও না। মেয়েটা পার্টির মেম্বার। সেই পার্টিটা যার কথা লোকে ভুলতে বসেছিল। ঘিঞ্জি পুরনো শহরটার ব্যস্ত চৌমাথার পাশের আধভাঙা পার্টি অফিসে বসে জেলা সম্পাদক — বয়স হয়েছে তার, একটু খুঁড়িয়েও চলে — অনেকদিন আগে পুলিশের লাঠিতে পা ভেঙেছিল, আর সারেনি। একটা হাতলভাঙা চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে একদিন সে সুনীতাকে ডেকেছিল। পার্টি অফিসের দেওয়ালে ঝুলতে থাকা লেনিন, ভগৎ সিং আর আম্বেদকরের ছবির নীচে বসে সে বলেছিল — "আমাদের টাকাপয়সা নেই, লোকজনও কমে এসেছে। কিন্তু ওই গ্রামের অশ্বত্থগাছটা আমাদেরই। তুমি যাও — রোজ সন্ধ্যেবেলায় ওখানে বসে থাকবে। স্লোগান দেওয়ার দরকার নেই। শুধু বসে থাকো। অপেক্ষা করো"।
সুনীতা তর্ক করেনি। গ্রামে যাওয়া শুরু করল সে।
প্রথম দিন সন্ধেবেলা, একটা বাঁশের চাটাই, একটা কেরোসিনের লন্ঠন আর সেইদিনের খবরের কাগজটা নিয়ে সে বসে রইল...পাঁচটা থেকে সাতটা, ততক্ষণে গ্রামের বাইরে থেকে শেয়ালের ডাক শুরু হয়ে গেছে। একাই বসে রইল মেয়েটা, কেউ আসেনি তার কাছে। দ্বিতীয়দিন আবার গেল সে, আবারও একই ঘটনা। তিনদিনের দিন, কতগুলো বাচ্চা একটু দূর থেকে উঁকিঝুঁকি মেরে তাকে দেখে গেল। তার পরের দিন, এক মুসলমান চাষী এসে সুনীতার সামনে বসল হাঁটু মুড়ে। নাম ইউসুফ, আটষট্টি বছর বয়স, আট মাস ধরে সে চক্কর কাটছে বার্ধ্যক্য পেনশনের জন্যে। পায়নি। সুনীতা ইউসুফকে খবর পড়ে শোনাচ্ছিল — একটা নতুন সেচ প্রকল্পের খবর — নদীতে নতুন বাঁধ তৈরী হবে একটা। বুড়ো ইউসুফ পাত্তা দিল না। বললো — "জল নিয়া কী করব আমি? আমার পেনশন দ্যাও। বউ অসুস্থ। ওষুধ কিনতে পারি না। আট মাস ধরে ব্লক অফিসের চক্কর কাটতে আছি। ওরা টাকা চায়, টাকা কোত্থিকে দেব?"
সুনীতা বলে — "কাগজগুলো সব আছে তোমার কাছে"? "কাগজ, হুঁ:", বুড়ো হাসে। সুনীতা হাসে না। বরং পরের দিন একটা প্রো ফর্মা অ্যাপ্লিকেশন নিয়ে আসে সে। বুড়োর সঙ্গে বসে ফর্ম ভরে। তারপরের দিন সকালে বুড়ো ইউসুফকে নিয়ে ব্লক অফিসে যায়। বিডিও দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে — "বার বার আসো কেন বুড়ো? বলে দিয়েছি তো"! সুনীতা চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে, ফাইল হাতে। সেই দিনটা কেটে যায়। পরের দিন আবার যায় সুনীতা, আবার দাঁড়িয়ে থাকে অফিসারের সামনে। তারপরের দিন আবার। পাঁচ দিনের দিন অফিসার দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাইলে সই করে দেয়। দুই হপ্তা পর ইউসুফের পেনশনের চিঠি এসে পৌঁছয় গ্রামের বাড়িতে।
ঘুরে দাঁড়ানোর শুরু এইটুকুই। বিপ্লব নয়। একটা পেনশন মাত্র।
পার্টি কৃতিত্ব চায় না। সমাবেশও করে না এই লড়াইয়ে জিতে। শুধু সুনীতাকে পাঠাতে থাকে। রোজ। দিনের পর দিন। প্রতি সন্ধ্যেবেলা, সেই অশ্বত্থ গাছটার নীচে।
একমাস পর, বুড়ো জেলা সম্পাদক একটা টিনের ট্রাঙ্ক পাঠায় সুনীতার কাছে। ট্রাঙ্কে কয়েকটা বই — ভগৎ সিংকে নিয়ে, একটা আম্বেদরকরের লেখা, কয়েকটা আইনের বই, সংবিধানের একটা কপি, নানান ধরণের ফাঁকা কিছু অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম, একটা বাঁধানো খাতা যেখানে লোকজনের কথা লিখে রাখা যাবে, আর কয়েকটা ডটপেন আর রিফিল। সুনীতা ট্রাঙ্কটা অশ্বত্থ গাছের তলাতেই রেখে দেয়। রোজ বিকেলে পাঁচটার সময় এসে সে ট্রাঙ্কের তালাটা খোলে, আবার সাতটার সময় বন্ধ করে দেয়।
তারপর, আস্তে আস্তে আরো অনেকে আসে অশ্বত্থ গাছের তলায়। দলিত পাড়ার এক বউ — তার ছেলেকে বেধড়ক মেরেছে মহাজনের লোকেরা। ছোট জাতের কমবয়সী জোয়ান ছেলে একটা — লোন চেয়েছিল, কিন্তু ফর্ম ভরতে পারেনি; পড়তেই জানে না সে। এক বিধবা — তার রেশন কার্ড হারিয়ে গেছে। এক চাষা — বড় রাস্তা তৈরীর সময় তার জমি নিয়ে নিয়েছিল সরকার, কিন্তু সে তার প্রাপ্য টাকা পায়নি। সুনীতা তাদের সকলের সঙ্গে কথা বলে। সকলকে সাহায্য করতে থাকে। কোনো গরম গরম বক্তৃতা না দিয়েই। শুধু ফর্ম ভরে, দরকার মত কোথাও ফোন করে, আর একটা পুরনো সাইকেলে চালিয়ে ফাইলভর্তি ব্যাগ কাঁধে এই অফিস, সেই অফিস ছুটোছুটি করে...

সঙ্ঘের শাখার নজর পড়ে অশ্বত্থ গাছের দিকে। একদিন সন্ধ্যেবেলা শাখার প্রচারক এসে পৌঁছয় তর্ক করে সুনীতাকে হারিয়ে দেবে বলে; হেরে গেলে মেয়েটা বিদেয় হবে। প্রচারক অনেক চেঁচায় — লাভ জিহাদ আর হিন্দু ঐক্য নিয়ে, আর...পঁচিশ বছরের একলা মেয়ে সুনীতা সন্ধ্যেবেলা দলিত আর মুসলমানদের ঘরের পাশে কী করছে তাই নিয়েও। দপ্‌ করে জ্বলে ওঠে গাছতলায় বসে থাকা গরীব ঘরের লোকগুলো। কিন্তু সুনীতা রাগে না, চিৎকারও করে না। ঠান্ডা মাথায় শুধু জিজ্ঞেস করে — "এই বউটার রেশনকার্ডের উপায় আছে তোমার কাছে"? মেয়েটার শান্ত মুখ দেখে আর চারপাশে একটু অশান্ত লোকজনের ফিসফাস শুনে প্রচারক আর দাঁড়ায় না সেখানে। "পরে আসব" বলে চলে যায়, কিন্তু আর আসে না।
সেদিন সন্ধ্যেবেলা ওদের গান শোনায় সুনীতা। শহরের পার্টি অফিসের ঘরে শেখা গান।
"আজ কমর বান্ধ তৈয়ার হোওয়ে কোটি ভাইয়োঁ,
হম ভুখসে মরনেওয়ালে, কেয়া মওতসে ডরনেওয়ালে"

গানের সঙ্গে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ে গাছতলার মানুষগুলো।
ছয় মাস কেটে যায়। শহরের অফিসে পার্টি একটা মিটিং ডাকে, রাজ্যের বড় নেতাদের নিয়ে। নেতারা জিজ্ঞেস করেন: "কী পেলাম আমরা"? বুড়ো সম্পাদক বলে — "এখনও কিছুই না। তবে ওই অশ্বত্থ গাছটার নীচে এখন অনেক মানুষ আসে তাদের নানান সমস্যা নিয়ে, তাদের নিজেদের কথা বলে তারা। এটুকুও তো আমাদের ছিল না।"
পার্টি এই ছোট্ট মুভমেন্টটাকে ভিত্তি করে আরো বড় মুভমেন্ট গড়বে ঠিক করে। সকলের কাছ থেকে দুশো টাকা করে নিয়ে ওরা একটা টিনের ছাউনি কেনে। অশ্বত্থ গাছের পাশে দলিত পাড়ার মুখে ওই পাড়ার ছেলেদেরই কেটে আনা চারটে বাঁশের খুঁটির ওপর বসে সেই ছাউনি। তারপর পার্টি কেনে আরো একটা ট্রাঙ্ক। একটা ছোট লাইব্রেরি বানায় — শ দুয়েক বই, শহরের লোকজন দান করেছিল। ফসল কাটার আগে সবাই মিলে তৈরী করে শস্যের গোলা একটা। প্রতি সপ্তাহে শহরের এক রিটায়ার্ড উকিল আসতে শুরু করে অশ্বত্থতলায় — একটা লিগাল এইড ক্লিনিক বানিয়ে ফেলে সে। তারপর একটা সহজ যোগাযোগের ব্যবস্থাও বানিয়ে ফেলে নিজেরাই: একটা মিসড কল নেটওয়ার্ক। কারো কোনো জরুরী খবর দেওয়ার থাকলে — পুলিশ রেইড, নতুন সরকারী স্কিম, বাজারে ফসলের দামের বদল — মিসড কল দেবে সে সুনীতাকে। সুনীতা তখনই পালটা ফোন করে সব জেনে নিয়ে পাঁচজন ভলান্টিয়ারকে খবর দেবে, তারা আরও পাঁচজনকে জানাবে...এক ঘন্টার মধ্যে আশেপাশের গ্রামের অন্তত: একশো পরিবারের কাছে পৌঁছে যাবে খবরগুলো। আর, গাছের গুঁড়িতে পেরেক দিয়ে ঠোকা একটা নোটিস বোর্ডে সময়ে সময়ে আপডেট লিখে দেবে কেউ না কেউ...
এক সন্ধ্যেবেলা, কবিতা আসে অশ্বত্থ তলায়। কবিতা, অল্পবয়সী, মাহারদের ঘরের বউ। ক্ষেতে তুলো তুলে পেট চলে তার। দুই বছর আগে শ্বশুরবাড়ির লোক তার মেয়েটার বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল জোর করে; মেয়েটা তখনো চোদ্দ বছরের মাত্র। দু বছর না ঘুরতেই বিধবা হয়ে মায়ের কাছে ফিরে এসেছে। কবিতার ছেলে শহরে সিকিউরিটি গার্ডের কাজ করে, মাস গেলে মায়ের ঠিকানায় কিছু টাকা পাঠায়। কবিতা বলে — "আমাকে আর আমার মেয়েটাকে পড়ালিখা শেখাবে"?
শুরু হয় নাইট স্কুল। বাঁধা সিলেবাস নেই। সার্টিফিকেটও নেই। একটা বালব, একটা ব্ল্যাকবোর্ড আর মাটিতে বসা দশটা মেয়েবউ। কেউ মাহার, কেউ মুসলমান, কিন্তু সেসব নিয়ে কেউ ভাবে না। পাশাপাশি বসে তারা অক্ষর চিনতে শেখে। নিজের নাম লিখতে শেখে। তাদের রেশন কার্ডে কী লেখা আছে, পড়ে সেসব। জমির দলিল পড়তে শেখে। ওদেরই একজন হঠাৎ নজর করে যে মহাজন গ্রামের বাসিন্দাদের দুই একর জমি নিজের নামে করে নিয়েছে, এতদিন কেউ জানতোও না।
কবিতা বলে, "চলো তহশিলদারের কাছে যাই"। যায় ওরা। মহাজন তহশিলদারের খাস দোস্ত। মহাজন হা হা করে হাসে। তহশিলদার ওদের দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়। কিন্তু ওরা আবার যায়। তারপর আবার। পার্টি একজন উকিলকে পাঠায় জেলা সদর থেকে — চুপচাপ একটা লোক যে খুব একটা মিটিং মিছিল বক্তৃতা করে না। সেই উকিল একটা কেস ফাইল করে মহাজনের নামে। দু বছর লেগে যায় কোর্টে। হেরে যায় ওরা। তারপর আপীল করে। শেষ অবধি জিতেও যায় একদিন। জমি ফেরানো হয় গ্রামবাসীদের কাছে।
মহাজন ওদের জলের লাইন কেটে দেয়। পরের দিন সুনীতা পাশের গ্রাম থেকে একজন পুরনো ইঞ্জিনিয়ারকে ধরে আনে — লোকটাকে এক যুগ আগে বরখাস্ত করেছিল সরকার; ডিপার্টমেন্টের উপরওয়ালার দুর্নীতির ধরে ফেলেছিল সে, আজকাল টিউবওয়েল সারিয়ে পেট চালায়। সে ওদের শেখায় বোরওয়েল কী করে বসাতে হয়। ওরা নিজেরাই করে নেয় কাজটা। মহাজন ওদের থামাতে পারে না।
সেদিন রাতে আগুন জ্বালিয়ে তার চারদিকে ঘুরে নাচে ওরা; গান গায়।
"ইতনে বাজু, ইতনে সর, গিন লে দুশমন ধ্যান সে
হারেগা উও হর বাজি, যব খেলে হম জি-জান সে।"
বুড়ো একলা অশ্বত্থ গাছটা ততদিনে আর শুধু গাছ নয়। আর একলাও নয়। তার নীচে মানুষের ঢল নামে। গ্রামের উল্টোদিকে নীমগাছের পাশে সঙ্ঘের শাখা তখন রোজই চলে। কিন্তু, এখন অশ্বত্থ গাছের তলাতেও গড়ে উঠেছে পালটা জোট। ওরা সঙ্ঘের শাখার মত উগ্র জাতীয়তাবাদী স্লোগান দেয় না, বরং ওদের জোট বিকল্প হিসেবে রোজকার জীবনের চাহিদার কথা বলে। মেটিরিয়াল রিয়েলিটি। আর কোনো পেনশন আটকে থাকে না। থানার মিথ্যা মামলাগুলো তুলে নেওয়া হয় ওদের ওপর থেকে। আধিপত্যবাদের কফিনে পোঁতা হয় আরও একটা পেরেক।
আরও দু বছর কাটে। পরের পঞ্চায়েত ভোটে পার্টি চমকে দেয় সকলকে। আগে কখনও এমনটা করেনি তারা। নিজেরা প্রার্থী না দিয়ে পার্টি সমর্থন করে কবিতার মেয়েকে। মাহী। সেই মেয়ে, যাকে চোদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিয়েছিল কবিতার শ্বশুরবাড়ির লোক৷ মাহীর বয়স আজ কুড়ি বছর; ওই অশ্বত্থ গাছের তলায় বসে লিখতে পড়তে শিখেছে সে; জমির ঘটনাটা প্রথম নজরে পড়েছিল তারই; বোরওয়েলটা বসানোর সময় নিজের মাথায় করে ইঁট বয়েছিল সে। মাহী জিতে যায় বারো ভোটের ব্যবধানে।
লাল পতাকা নিয়ে মিছিল করেনি মাহী। নিজেকে কমিউনিস্টও বলেনি। কিন্তু সে খেয়াল রেখেছিল যাতে গাছতলার সেই ছাউনিটা মেরামত হয়; বোরওয়েল পরিষ্কার করা হয়; আর স্কুলের বাড়িটায় একটা নতুন টয়লেট বসে।
পার্টির বুড়ো জেলা সম্পাদক খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে এক সন্ধ্যেবেলা এসে পৌঁছয় অশ্বত্থতলায়। গাছের তলায় বসে সে দেখে — আশেপাশে বেশ কয়েকজন বউ মেয়েরা লন্ঠনের আলোয় পড়ছে। বুড়ো সুনীতাকে বলে — "একেই বলে অবস্থানের যুদ্ধ। বক্তৃতা নয়। মিছিলও নয়। শুধু একটা গাছতলা, একটা
টিনের ট্রাঙ্ক, আর সময়"।
সুনীতা হাসে। চোখ তুলে বলে, "আর, একটা পার্টি যে জানে কখন মুখ বুজে কাজ করে যেতে হয়"।
সেই অশ্বত্থ গাছটা আজও আছে। ট্রাঙ্কটাও। নাইট স্কুলটাও। আর আছে সেই পার্টিটাও। লাল ঝান্ডার পার্টি। আগের মত শুধু স্লোগান দেওয়া ভোটে লড়া পার্টি নয়। নতুনভাবে, ধৈর্য্য ধরে দিনের পর দিন মানুষকে নিয়ে জোট বাঁধার বোরিং কাজগুলো করে যাওয়া পার্টি। এমন একটা পার্টি যারা শুধু গলা তুলে আরো জোরে চেঁচিয়ে জেতার চেষ্টা করে না; এই পার্টিটা জেতে আম আদমির সমস্যার সমাধান ছিনিয়ে এনে — যে সমস্যার সমাধান শাসকশ্রেণী করতে চায় না। এই পার্টিটা জেতে মানুষকে সঙ্গে নিয়ে জোট বেঁধে।
এমনটাই হয় কাউন্টার-হেজিমনি...একমাত্র পথ যেটা কাজ করে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন