বাংলাকে ভাগ করা হয়েছিল ধর্মের ভিত্তিতে। পার্টিশনের পরেই বিপুল সংখ্যক হিন্দু উদ্বাস্তু পূর্ববঙ্গ থেকে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসতে বাধ্য হন৷ সেই সময় শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় জাতীয় রাজনীতিতে রীতিমতো বড় নাম৷ স্বাভাবিকভাবেই বিভাজিত বাংলায় হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি প্রবল শক্তিশালী হয়ে ওঠার যথেষ্ট সম্ভাবনা ছিল। কিন্তু তা হয়নি৷ ১৯৫২ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস পেয়েছিল ১৫০ আসন৷ বামপন্থী জোট পেয়েছিল ৪০+ আসন৷ কমিউনিস্ট পার্টি একাই পেয়েছিল ২৮ আসন। ফরওয়ার্ড ব্লকের মার্কসবাদী অংশটি ১১ আসনে জিতেছিল৷ এর বাইরেও জয়নগর থেকে এসইউসির সুবোধ ব্যানার্জি খাতায় কলমে নির্দল প্রার্থী হিসাবে জিতেছিলেন৷ ফরওয়ার্ড ব্লকের আরেকটি অংশ খান দুয়েক আসন জিতেছিল৷ তৎকালীন কৃষক মজদুর প্রজা পার্টি, যারা ওই '৫২ সালেই সোস্যালিস্ট পার্টির সঙ্গে মিশে গিয়ে প্রজা সোস্যালিস্ট পার্টি গঠন করবে, তারা পেয়েছিল ১৫ আসন৷ হিন্দুত্ববাদীরা পেয়েছিলেন মাত্র ১৩টি আসন। জনসংঘ ৯, হিন্দু মহাসভা ৪। যদিও বামপন্থীদের সঙ্গে হিন্দুত্ববাদীদের ভোট শতাংশে খুব ফারাক ছিল না।
১৯৫৩ সালে শ্যামাপ্রসাদ মারা গেলেন৷ বাংলার হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি কার্যত অভিভাবকহীন হয়ে পড়ল৷ যে কলকাতা দক্ষিণ পূর্ব লোকসভা কেন্দ্রে ১৯৫২ সালের নির্বাচনে শ্যামাপ্রসাদ ৪৫% ভোট পেয়ে জিতেছিলেন (কংগ্রেসের ভোট ছিল ৩০%+, কমিউনিস্ট পার্টির ২২%+), তাঁর মৃত্যুর পর সেই আসনেই কমিউনিস্ট পার্টি জিতে গেল ৫৮%+ ভোট পেয়ে। জনসংঘের ভোট ৪৫% থেকে হু হু করে কমে নেমে এল ৫ শতাংশে। এক বছরের মধ্যে।
১৯৫৭ সালের নির্বাচনেও কংগ্রেস ক্ষমতায় এল ১৫২ আসন পেয়ে। বামপন্থীদেরও বিপুল উত্থান হল৷ তাঁরা প্রায় ৮০টি আসন জিতলেন৷ হিন্দুত্ববাদীরা শূন্য হয়ে গেলেন৷ না জনসংঘ, না হিন্দু মহাসভা- কেউ কোনও আসন পেল না। স্বাধীনতা/দেশভাগের ১০ বছরের মধ্যে বাংলার সংসদীয় রাজনীতি থেকে হিন্দুত্ববাদীরা ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেলেন। ১৯৭৭ সালে লোকসভায় (এবং বিধানসভাতেও খুব সামান্য) 'জনতা-ঝড়' তাঁদের কিঞ্চিৎ সুবিধা করে দিয়েছিল বটে, কিন্তু বামপন্থী রাজনীতির বিপুল উত্থানের সামনে তা কিছুই নয়৷ তারপর থেকে বহু বহু বছর তাঁদের সংসদীয় পরিসরে বলার মতো সাফল্য কিছুই ছিল না৷ ১৯৯২ পরবর্তী সময়েও তাঁরা বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। কিন্তু আরএসএস নিরলসভাবে কাজ করে গিয়েছে। ১৯৯৮ সালে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা ব্যানার্জি জোট করলেন বিজেপির সঙ্গে। ১৯৯৯ সালের লোকসভায় দমদম কেন্দ্রে মার্কসবাদী কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীর চিত্তাকর্ষক পরাজয় ঘটল বিজেপির তপন শিকদারের কাছে৷ কৃষ্ণনগরেও জুলুবাবু জিতলেন। শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় সংসদীয় পরিসরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পুর্নবাসন ঘটল৷ তবে তৃণমূলের জুনিয়র পার্টনার হিসাবে৷ এর পরের গুরুত্বপূর্ণ কালপর্ব ২০১৪ থেকে৷ কেন্দ্রে মোদী সরকার আসার পর। সে অন্য আলোচনা।
পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ হিন্দু উদ্বাস্ত কেন জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভাকে ভোট দিলেন না? এমনকি, ১৯৫২ সালের নির্বাচনেও হিন্দুত্ববাদীরা যে সব আসনে জিতেছিলেন, সেগুলি রাজ্যের পশ্চিমপ্রান্তে৷ বাঁকুড়ায়, জঙ্গলমহলে। সেগুলি মোটেই দেশভাগের দগদগে ক্ষত বুকে নিয়ে চলে আসা উদ্বাস্তু মেজরিটি আসন নয়৷ এর কারণ কী? শ্যামাপ্রসাদের মৃত্যু একটা বড় কারণ নিশ্চয়৷ তাঁর মৃত্যুর পরে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বড় মুখ তেমন কেউ ছিলেন না, যিনি জ্যোতি বসুকে টেক্কা দিতে পারেন৷ কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ তো মারা গিয়েছিলেন '৫৩ সালে। তার আগের ৬ বছর তিনি সক্রিয় ছিলেন৷ কিন্তু বিশেষ কিছু করতে পারেননি।
একটা সহজ, জনপ্রিয় (এবং আমার পছন্দের) ব্যাখ্যা এমন হতে পারে, উদ্বাস্তু জনগণের পাশে বুকটান করে দাঁড়িয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টি-সহ বামপন্থীরা। ইউসিআরসি গড়ে উঠেছিল। ফলে তাঁদের বড় অংশের সমর্থন বামপন্থীরা পেয়েছিলেন৷ জনসংঘ বা হিন্দু মহাসভার তেমন সংগঠন ছিল না৷ ফলে তাঁরা এঁটে উঠতে পারেননি।
এই সহজ ব্যাখ্যার মূলস্রোতের আড়ালে কি আরও কিছু ব্যাখ্যার সুযোগ আছে? বামপন্থী রাজনীতির ভিতরমহলে কি চারের দশক থেকে ক্ষমতাকেন্দ্রের সরণ ঘটছিল? যদি ঘটে থাকে, তাহলে কি তাকে আরেকটু তলিয়ে, অন্য কোনও লেন্সে পাঠ করার সুযোগ আছে? বামপন্থার কথা থাক। একটু ফুটবলের কথায় আসি৷ তিনের দশক, চারের দশকে কলকাতা ময়দান দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মহামেডান স্পোর্টিং। পর পর লিগ জিতছে। কমিউনিস্ট রাজনীতিতেও তখন সোমনাথ লাহিড়ীদের পাশাপাশি উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো অবস্থান করছেন কমরেড হালিম, কমরেড কাকাবাবু। ময়দানে চারের দশক থেকে প্রবল উত্থান ঘটছে ইস্টবেঙ্গলের। পূর্বঙ্গের হিন্দু বাঙালির দল৷ স্বাধীনতার পর থেকে আস্তে আস্তে প্রভাব কমছে মহামেডানের৷ ময়দানে মোহনবাগানের প্রতিপক্ষ ইস্টবেঙ্গল। বাংলার কমিউনিস্ট রাজনীতিও ততদিনে পেয়ে গিয়েছে এমন দুই দুর্দান্ত চরিত্রকে, যাঁরা আগামী অনেকগুলো বছর নেতৃত্ব দেবেন বামপন্থী আন্দোলনকে- জ্যোতি বসু, প্রমোদ দাশগুপ্ত।
বিজেপি বাংলার সরকারে চলে এসেছে। বিজেপির বিরুদ্ধে তীব্র লড়াই চলবে। কিন্তু আমরা একসঙ্গে মিলে আমাদের ঐতিহাসিক ফল্টলাইনগুলির খোঁজ করব না? ঝগড়াঝাঁটি না করে, একে অন্যের উপর রাগ না করে, শান্ত হয়ে ইতিহাসের গল্প করলে কিন্তু আখেরে ক্ষতি হবে না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন