শনিবার, ৯ মে, ২০২৬

রবীন্দ্রনাথ ~ অমিতাভ প্রামাণিক

১৯০৯ সালের শেষদিক। অগ্নিগর্ভ বাংলার আকাশ-বাতাস। আলিপুর বোমার মামলায় দুজনের ফাঁসির আদেশ শুনিয়েছে ব্রিটিশ বিচারক, সঙ্গে সাতজনের দ্বীপান্তর। কংগ্রেস লড়ে যাচ্ছে ভারতবর্ষের শাসনবিধি সংস্কারের উদ্দেশ্যে। ১৯০৬ সালে ব্রিটেনে সাধারণ নির্বাচনে জয়লাভ করেছে লিবারাল পার্টি। সেক্রেটারি অফ স্টেট ফর ইন্ডিয়া হিসাবে ভারতে এসেছেন সেই পার্টির জন মর্লে। জন মর্লে ও ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর মর্লে-মিন্টো সংস্কারের ফলে দেশের শাসনব্যবস্থায় পরোক্ষ ভারতীয় প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা হল, লর্ড সত্যপ্রসন্ন সিংহ নির্বাচিত হলেন প্রথম প্রতিনিধি। 

শীতের বিকেল। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি ইন্সটিট্যুট হলে আয়োজিত হয়েছে এক সঙ্গীতসভা। সেখানে সেতার বাজাবেন বিখ্যাত শিল্পী ইমদাদ আলি খাঁ, তাঁর বয়স একষট্টি। পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজপুত, পরে তারা মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেন। ইমদাদের জন্ম আগ্রায়, ছোটবেলা কেটেছে এটাওয়ায়। বাবা শাহাবদাদ খাঁ খেয়াল গাইতেন, ছিলেন শখের সেতারশিল্পীও। বাবার কাছেই সেতারের প্রাথমিক পাঠ ইমদাদের, পরে বিখ্যাত বীণকার বন্দে আলি খাঁর কাছে তালিম নিয়ে এটাওয়ায় দীর্ঘ বারো বছর লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে একা একা সারস্বতসাধনা করে তৈরি করেছেন নিজস্ব বাদনরীতি। অন্যান্যরা যেখানে শাস্ত্রীয়বাদ্যে ধ্রুপদ ছাড়া ভাবতেই পারে না, তিনি সেখানে তাঁর শৈলিতে নিয়ে এসেছেন খেয়ালের বিচিত্র গুণাবলি। এই রীতিই পরে ইমদাদখানি ঘরানা নামে প্রতিষ্ঠিত হবে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তাকে বয়ে নিয়ে যাবে পুত্র এনায়েৎ খাঁ, পৌত্র বিলায়েৎ খাঁ ও অন্যান্যরা।   

সভাগৃহ পরিপূর্ণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচুর ছাত্রের সমাবেশ। এ সভায় সভাপতিত্ব করছেন আটচল্লিশ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ। প্রাথমিক ভাষণে তিনি অল্পকথায় শিল্পীর পরিচয় ও তাঁর বাদনরীতি সম্বন্ধে কিছু বললেন। এও বললেন যে, এদিনে এই কাজটুকুই তাঁর কর্তব্য। সভাস্থিত সকলকে মুগ্ধ করে রেখে এরপর দীর্ঘক্ষণ ধরে সেতার পরিবেশন করলেন উস্তাদ ইমদাদ আলি খাঁ। 

নিয়ম অনুযায়ী এর পরই সভা ভেঙে যাওয়ার কথা। সভাপতি রবীন্দ্রনাথ মঞ্চে উঠে সভা-অন্তের ঘোষণা করতেই শুরু হল সভাস্থ ছাত্রসহ অনেকের দাবি, তারা রবিবাবুর গান শুনতে চায়। রবি আপত্তি জানালেন। তিনি সুস্থ নন, গলার স্বরও বসা। তাছাড়া তার মন এই মুহূর্তে ঠিক সঙ্গীতজগতে নেই। পুত্র রথীন্দ্রনাথ ফিরে এসেছে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ্যা নিয়ে পড়াশুনা করে, তিনি চান শান্তিনিকেতনে সেই-সংক্রান্ত নতুন কিছু শুরু করা। এই শাস্ত্রীয় সভায় ইমদাদ আলির মত শিল্পীর বাজনার পর তিনি কিছুতেই তার গান গাইতে রাজি নন। এই দুই সঙ্গীতের মেজাজও আলাদা। 

একদম সামনের সারিতে বসে ছিলেন বর্ষীয়ান স্যার গুরুদাস ব্যানার্জি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভারতীয় ভাইস-চ্যান্সেলর। তিনি রীতিমত জিদ করছিলেন রবি যেন একটা গান শোনান। রবির প্রত্যাখ্যান শুনে তিনি আহত হলেন, চেঁচিয়েই বললেন, ভাল গান করেন বলে আপনার এত অহঙ্কার। পাছে সেই অহঙ্কারে ঘা লাগে, তাই গাইতে চাইছেন না। 

স্যার গুরুদাস শুধু একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিই নন, বয়সেও তিনি রবির সেজদা হেমেন্দ্রনাথের বয়সী, রবির চেয়ে প্রায় সতের বছরের বড়। হেমেন্দ্র অবশ্য বহুকাল আগেই মারা গেছেন অকালে। এই তিরস্কারের পর গুরুদাসকে উপেক্ষা করা অসম্ভব। 

মঞ্চে তখনও উপবিষ্ট উস্তাদজি। রবি প্রথমে একটা হারমোনিয়াম নিয়ে খানিকক্ষণ প্যাঁ-পোঁ করলেন। বোধহয় ঠিক করতে পারছিলেন না কী গাইবেন। তারপর উস্তাদজির দিকে দৃষ্টি যেতেই হারমোনিয়াম সরিয়ে খালি গলায় গাইতে শুরু করলেন – তুমি কেমন করে গান করো হে গুণী, আমি অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি ... 

সে সুরের আলো ভুবন ছেয়ে ফেলল, সে সুরের হাওয়া ছুটে চলল গগন বেয়ে। কোনো সঙ্গত নেই, সভাভঙ্গের নির্দেশও দেওয়া হয়ে গেছিল পূর্বেই, তবু সমস্ত শ্রোতারা এই গান শেষ হওয়া পর্যন্ত বসে রইল চিত্রার্পিতের মত। 

অমিতাভ প্রামাণিক
পঁচিশে বৈশাখ, ১৪২৬

---++---++---------++---------------++--------------++--------
বাংলা তেরোশো আটচল্লিশ সালের তেইশে বৈশাখ। আরও একটা জন্মদিন আসতে চলেছে। যেমন তেমন নয়, আশিতম জন্মদিন। শান্তিনিকেতনে নিজের ঘরে বসে রোগাক্রান্ত, অশক্ত রবি চঞ্চল হয়ে উঠলেন। সেই কত বছর আগে শুরু হয়েছিল তার জন্মদিন ঘিরে উৎসব। পরিবার ছাড়িয়ে সে অনুষ্ঠান ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক হয়ে উঠেছে। ব্রাহ্ম রবি মূর্তিপূজায় বিশ্বাসী নন, শান্তিনিকেতনের আনাচে কানাচে কোথাও মহর্ষির একটা ছবি পর্যন্ত নেই, কিন্তু রবি তার জন্মদিন ঘিরে যে উচ্ছ্বাসের ঘনঘটা তৈরী হয় সেটা খুব উপভোগ করেন। নিজেই তৈরী করে নেন তার আবহ।

তার যখন সাতাশ বছর বয়স তখন ভাগ্নী সরলা প্রথম পঁচিশে বৈশাখের এক আনমনা ভোরে উপহার সহ তার পাদবন্দনা করে শুরু করেছিল এই ঘরানা। মেজোবৌঠান বিদেশ থেকে বিদেশী আচার অনুষ্ঠান ঘরে তুলে আনলে কী হয়, তিনি বা বিবি নয়, এ ব্যাপারে টেক্কা দিয়েছিল ন’দিদির মেয়েটা। পরের বছর থেকে এর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন ধর্মপত্নী মৃণালিনী। কত বছরই বা সে এসব করে যেতে পারল? 

নিজের জন্মদিনে রবি প্রথম গান লিখেছিলেন যখন তাঁর বয়স আটতিরিশ। তেরোশো ছয় সালের পঁচিশে বৈশাখে তিনি নিজের রচনা নিজেই গেয়েছিলেন – ভয় হতে তব অভয়মাঝে নূতন জনম দাও হে। বিয়াল্লিশ বছর পেরিয়ে গেল তার পর, এর পর থেকে প্রায় প্রতি বছরই নিজের জন্মদিন উপলক্ষে রবি কবিতা বা গান রচনা করেছেন, আবৃত্তি করেছেন, নিজে গেয়েছেন, অন্যকে শিখিয়ে দিয়ে গাইয়েছেন। আর কতদিন তা করে যেতে পারবেন, তা নিয়ে প্রবল সংশয় দেখা দিয়েছে এখন। শরীর চলতে চায় না। দর্শনধারীদের সঙ্গে দেখা করতে পারেন না, তারা দরজা থেকে ফিরে যায়। লেখালিখি করার মত শক্তিও নেই প্রায়। ব্যক্তিগত সচিব অনিলের স্ত্রী রাণী তাঁর পরিচর্যা করেন, তিনি মাঝে মাঝে রাণীকে মুখে মুখে কবিতা বলে যান, রাণী তা খাতায় লিখে নেয়, পড়ে শোনায়। রবি বলে ওঠেন, না না রাণী, ঐ জায়গাটা ঠিক হল না, এই শব্দটা বদলে দিয়ে এটা লেখো তো। আবার শোনাও। আশি বছর বয়সেও তাঁর নিজের লেখা নিয়ে খুঁতখুঁতুনি গেল না। 

দরজায় টোকা পড়ল। ভাবলেন রাণী এসেছে বুঝি। না, এ তো শান্তিদেব। গরমের ছুটি থেকে সদ্য ফিরেছে শান্তিনিকেতনে একত্রিশ বছরের তরুণ। দেখা করতে গেছে গুরুদেবের কাছে। প্রণাম সেরে শরীরের কুশল নেবার জন্য জিজ্ঞাসু চোখে তাকাতেই রবি বললেন, শান্তি, আর একটা পঁচিশে বৈশাখ এসে গেল। তোরা এবার কিছু করবি না? 

শান্তিদেব বললেন, ও মা, করব না কেন? অন্যবার যা যা করা হয়, সবই করব। আমি তো ছিলাম না, এই এসে পৌঁছালাম, দেখি খবর নিই।

শান্তিদেবেরও জন্মদিনও পঁচিশে বৈশাখেই!

পরদিন সকালে শান্তিদেব এসে অনুযোগ করলেন, আপনি এবার কোনো গান লেখেননি? 
রবি বললেন, গান? তুই তো এক অদ্ভুত ফরমাশ এনে হাজির করলি রে, শান্তি। আমার জন্মদিনে আমি নিজে গান লিখব, সুর দেব, গাইব, লোকে শুনলে বলবে কী? বুড়োটা নিজের ঢাক পিটিয়ে যাচ্ছে! 
শান্তিদেব বললেন, না, না, তা কেন বলবে?
রবি বললেন, বলে না বুঝি? তুই এক কাজ কর। এখানে এত বড় বড় কবি সুরকাররা সব রয়েছে, ওদের বল না লিখতে, সুর দিতে।

শান্তিদেব চুপ করে রইলেন, বোঝাই গেল প্রস্তাবটা তার মনঃপূত হল না। 
রবি আবার বললেন, কেন, তুই কি ভাবিস এরা কবিতা লিখতে পারে না? গানে সুর দিতে পারে না? যা না, চা না গিয়ে ওদের কাছে –
শান্তিদেব বললেন, আপনি থাকতে অন্যদের কাছে যাব, এ হয় নাকি? কেন, এতদিন ধরে আপনি যে নিজের জন্মদিনে কবিতা লিখলেন, গান বানালেন, কেউ কি আপনার দোষ ধরেছে? ওসব হবে না, আপনাকেই করতে হবে। 

রবি হাসতে লাগলেন। ভক্তের অর্ঘ্য নিতে তার কার্পণ্য নেই। এরা তাঁর নিজের ছাত্রই, পুত্রসম। এরা আবদার করবে না তো কারা করবে? বললেন, এক কাজ কর তবে শান্তি, এখন আর নতুন কবিতা লেখার শক্তি নেই। সময়ই বা কোথায়? তুই যা, দপ্তর থেকে আমার পুরনো কবিতাগুলো নিয়ে আয় দেখি, যেগুলো আগের জন্মদিনে লেখা। অনিল জানে, ও সব গুছিয়ে রেখেছে নিশ্চয়। ওকে গিয়ে বলগে।

এসে গেল আগের জন্মদিনগুলোতে লেখা কবিতার রাশি। রবি একটার পর একটা উলটে যেতে লাগলেন। স্থির হলেন যে কবিতাটায় গিয়ে, সেটা লিখেছিলেন তেরোশো ঊনত্রিশ সালে, উনিশ বছর আগে। 'পূরবী' নামে তার কবিতার বইটাতে এই কবিতাটা স্থান পেয়েছে, রবি এর নাম দিয়েছিলেন ‘পঁচিশে বৈশাখ’। তার শুরুটা এমন – 

রাত্রি হল ভোর। 
আজি মোর
জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,
প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি
হাতে করে আনি
দ্বারে আসি দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।  

নিজের লেখা পড়তে পড়তে রবি আচ্ছন্ন হয়ে গেলেন। শেষের স্তবকে লিখেছিলেন – 

হে নূতন,
তোমার প্রকাশ হোক কুজ্ঝটিকা করি উদ্‌ঘাটন
সূর্যের মতন।
বসন্তের জয়ধ্বজা ধরি
শূন্য শাখে কিশলয় মুহূর্তে অরণ্য দেয় ভরি –
সেই মতো, হে নূতন,
রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
ব্যক্ত হোক তোমা-মাঝে অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়।
উদয়দিগন্তে ওই শুভ্র শঙ্খ বাজে।
মোর চিত্তমাঝে
চির-নূতনেরে দিল ডাক
পঁচিশে বৈশাখ।

থমকে গেলেন রবি। বললেন, এই কটা লাইন একটা আলাদা কাগজে লিখে দে তো। সেই নকলের ওপর নিজে এবার কলম চালাতে লাগলেন। 'কুজ্ঝটিকা' কেটে লিখলেন 'কুহেলিকা'। কেটে দিলেন পরের তিনটে লাইন। হে নূতন-এর পর কবিতাটার আগের স্তবক থেকে একটা লাইন তুলে লিখলেন কাঁপা কাঁপা হাতে – দেখা দিক আরবার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ। 'অনন্তের অক্লান্ত বিস্ময়' কেটে লিখলেন 'অসীমের চিরবিস্ময়'। উদয়দিগন্তের পর ‘ওই’টা কুচিকুচি করে কেটে দিলেন। কাটাকুটির মধ্যেই চলতে লাগলো নিজের মনে গুনগুনানি। সুর বসছে কলিতে, ভৈরবীতে। শান্তিদেবকে বললেন, নে নে শান্তি, স্বরলিপি করে ফেল এক্ষুনি। কখন আবার ভুলে যাব, মনে থাকে না আজকাল আর কিচ্ছু।

সে এক সময় ছিল, ডাকারও দরকার হত না, ছুটে আসত বিবি, সরলা, দিনু। আজ কাছেপিঠে তারা কেউ নেই। রবির গানের স্বরলিপি লিখে নিলেন শান্তিদেব। 

পরদিন প্রভাতে আশ্রমের কলকাকলি ভেদ করে বেজে উঠলো আশ্রমিকদের গলায় রবির জন্মদিনের গান –

হে নূতন,
               দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।।
               তোমার প্রকাশ হোক কুহেলিকা করি উদ্‌ঘাটন 
                              সূর্যের মতন।
               রিক্ততার বক্ষ ভেদি আপনারে করো উন্মোচন।
                        ব্যক্ত হোক জীবনের জয়,
               ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।
               উদয়দিগন্তে শঙ্খ বাজে, মোর চিত্তমাঝে
                       চিরনূতনেরে দিল ডাক 
                             পঁচিশে বৈশাখ।।

এটাই রবির সুর দেওয়া শেষ গান। এর সুর দেওয়ার ঠিক তিন মাস পরে এক ঝরো ঝরো বাদলের শ্রাবণদিনে জোড়াসাঁকোয় তাঁর নিজস্ব বাসভবনে শরীরে অস্ত্রোপচারোত্তর ব্যাধিতে কাতর রবি অমর্ত্যলোকে যাত্রা করেন। পেছনে পড়ে থাকে সুদীর্ঘ তেষট্টি বছর ধরে লেখা আর সুর দেওয়া তার দু’হাজার গানের গীতবিতান। 

কান পাতলে শোনা যেত, সে দিনের অবিরল বারিধারা ছাপিয়ে কোথায় বেজে উঠছে অসহ বিরহের গান। মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে লিখেছিলেন রবি, সুর দিয়েছিলেন তার পাঁচ বছর পরে – তবু মনে রেখো, যদি দূরে যাই চলে ...

পঁচিশে বৈশাখ, ১৪২২

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন