মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬

বীণা দাস আমার ছোটদিদু ~ সুব্রতা দাসগুপ্ত

গত বেশ কয়েকবছর ধরে ফেসবুকের পাতায় এবং হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে কোনও এক ইতিহাসের অধ্যাপকের একটি কাল্পনিক লেখা ঘোরাফেরা করছে। সমাজমাধ্যমে এইধরনের অনেক লেখা ঘোরাফেরা করে, সেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া কর্মহীনের পক্ষেই সম্ভব, আপাতত তাই যথাসম্ভব উপেক্ষাই করি। বীণা দাসকে কেন্দ্র করে লেখা এই গল্পটিকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি কারণ বীণা দাস আমার ছোটোদিদু। আমি নিজে তাঁকে ছোটবেলায় অল্পস্বল্প দেখেছি। তার চেয়েও বড় কথা আমার মা, এবং অন্যান্য মাসীদের জীবনযাত্রায় ওপর ওঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব থেকে বুঝেছি, গোটা পরিবারের কাছেই তিনি কতটা শ্রদ্ধার আসন অলংকৃত করে আছেন। সমাজমাধ্যমে প্রচলিত গল্পের উত্তরটিও সমাজমাধ্যমে, মানে ফেসবুকের জন্যেই লিখেছিলাম। পড়ে অনেকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, কেউ কেউ দুঃখিতও হয়েছেন। কিন্তু এতদিন পরে আবার ‘উৎস মানুষ’ সম্পাদক মহাশয় আমায় অনুরোধ করলেন বিষয়টি নিয়ে আরও বিস্তৃত আকারে লিখতে। আমি সম্পাদক মহাশয়কে অনুরোধ করব ওই লেখাদুটি অবিকৃত অবস্থাতেই প্রকাশ করতে। এই লেখাটি থাক সংযোজন হিসেবেই। 

‘বিস্তৃত আকারে’ কিছু লেখা অবশ্য মুশকিল। কারণ আগেই বলেছি, আমার ছোটদিদুকে আমি দেখেছি মাত্রই কয়েকবার। সেও ছোটবেলায় ওঁদের আনোয়ার শা রোডের সরকারি আবাসনে। আমরা বেশ অনেকে মিলেই সেখানে যেতাম। উনি যে ছোটদের দেখে বিশেষ খুশি হতেন সেটা বুঝতে পারতাম ওখানে গিয়ে। এ ছাড়াও ওঁর সঙ্গে দেখা হত আমার নিজের দিদু, বীণা দাসের সেজদিদি পুণ্যপ্রভা বসু (দাস)-এর বাড়িতে। বড়মাসী ধীরা ধরের বাড়ি ছিল, সেন্ট্রাল পার্কে, সেখানেও ওঁরা খুব আসতেন। আমি সেখানেও দেখেছি বেশ কয়েকবার। সেন্ট্রাল পার্কে বড়মাসীর বাড়ি আসতেন আরেকজনও। কল্যাণী ভট্টাচার্য-বীণা দাসের ছুটুদিদি-ছাত্রী সংঘের প্রতিষ্ঠাতা, স্বাধীনতা সংগ্রামী, এবং অক্লান্ত সমাজসেবী। বীণা, কল্যাণী, পুণ্যপ্রভা-দের মায়ের স্মৃতিতে সরলা পুণ্যাশ্রম প্রতিষ্ঠা ছাড়াও আরও কত ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে যে কল্যাণী ভট্টাচার্য অর্থ, শ্রম ও নেতৃত্ব দিয়ে অংশ নিয়েছেন তারও কোনও যথাযথ ডকুমেন্টেশন হয়নি। কল্যাণী ভট্টাচার্যের স্বামী দিল্লীতে খুবই উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন, তাঁর জীবনযাত্রা, পোষাক আশাক বা আদব কায়দার মধ্যে একধরনের পারিপাট্য ছিল। কিন্তু কল্যাণী ভট্টাচার্য ছিলেন একেবারে বিপরীত। এত আত্মবিস্মৃত কর্মী মানুষ আমি আর দেখিনি বললেই চলে।

আমার মা ইন্দিরা, বড়মাসী ধীরা এবং মেজমাসি ইরা-এঁরা তিনজনেই আবার কল্যাণী ও বীণার বিশেষ ভক্ত ছিলেন। কল্যাণী ভট্টাচার্যের লেখা ‘জীবন অধ্যয়ন’ বইটিতে পাওয়া যাচ্ছে ধীরা তাঁর মাসির সঙ্গে বিয়াল্লিশ-তেতাল্লিশে দুর্ভিক্ষের সময় চট্টগ্রামে চলে যাচ্ছেন সমাজসেবার কাজে। পরবর্তী সময় বীণা দাসের পরামর্শেই সম্ভবত, এই বোনেরা কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টির সঙ্গে কাজ করেছেন। চটকল শ্রমিক পরিবারের মেয়েদের মধ্যে তাঁদের কাজের স্বীকৃতি আছে অধ্যাপক শমিতা সেন-এর লেখাতেও। এই ধীরা গত হয়েছেন অল্প কিছুদিন আগে, প্রায় একশ বছর বয়েসে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে পর্যন্তও রবীন্দ্রনাথ, বিভূতিভূষণ থেকে শুরু করে সুনীল গাঙ্গুলী পর্যন্ত বিভিন্ন লেখকের লেখার অনুবাদ করে গিয়েছেন শুধুমাত্র বাংলার বাইরে বা দেশের বাইরে বড় হওয়া বঙ্গসন্তানদের জন্য, যারা কোনও না কোনও কারণে বাংলা ভাষায় সাহিত্যের রসাস্বাদনে সক্ষম হয়ে ওঠেনি। 

এই লেখা বীণা দাসের জন্যই। কিন্তু আগেই বললাম বীণা দাসকে আমি চিনেছি শৈশবের চোখে, সেই চেনা সমৃদ্ধ ও পূর্ণতর হয়ে উঠেছে যাঁদের সংযোগে তাঁরা হলেন এই ধীরা, ইরা ইন্দিরা প্রভৃতি আমার মা মাসীরা। তাঁরা নিজেরাই যথেষ্ট সমীহ-সম্ভ্রম উদ্রেককারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন কিন্তু বীণা দাসের প্রতি আবার তাঁদের যে আনুগত্য, সম্ভ্রম, এবং অনুরাগ দেখেছি, তা থেকে বীণা দাসের ব্যক্তিত্বের মহত্ব আমার কাছে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। দিদি কল্যাণীর মতো একদমই আলুথালু প্রকৃতির ছিলেন না ছোটদিদু। তিনি দীর্ঘাঙ্গী, অত্যন্ত সুন্দরী এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্ব সম্পন্না ছিলেন। আমরা ছোটরা তাঁর কাছে প্রবল প্রশ্রয় পেলেও নিজের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য বড়দের নানা পরামর্শ বা অনুযোগকে তিনি এমন তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষার সঙ্গে প্রত্যাখান করতেন যে, তা দ্বিতীয়বার বলার সাহস কারও হত না। তিনি যা করবেন না সেটা তাঁকে দিয়ে করানো অথবা তিনি যা করবেন স্থির করেছেন সেটা থেকে তাঁকে নিরস্ত করা, দুইই অসম্ভব ছিল। 

কল্যাণী ভট্টাচার্য নিজের ছোটবোন সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণা করেছেন। প্রাসঙ্গিক মনে হওয়ায় তার থেকে কয়েকলাইন তুলে দিচ্ছি। বীণা দাস সেই বছর ম্যাট্রিক পরীক্ষা দিয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে পুরী বেড়াতে গিয়েছিলেন। কল্যাণীও ছিলেন। ওঁদের সঙ্গেই গিয়েছিলেন এক বিধবা মামী এবং তাঁর একমাত্র মেয়ে অনু। সম্ভবত সেও সেইবছর ম্যাট্রিক দিয়েছিল বীণার সঙ্গেই। স্নান করার সময় নুলিয়ার সঙ্গে অনু এবং বীণা সমুদ্রের অনেক ভিতরে চলে গিয়েছিলেন। একটা সময় মনে হয়েছিল, তাঁরা বুঝি ফিরতে পারবেন না। নুলিয়াও ওঁদের দুজনকে নিয়ে ফিরতে পারছিলেন না। বীণা তখন নুলিয়ার হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে বলেছিলেন দুজনকে বাঁচানো সম্ভব নয়। যদি একজন বাঁচে তা হলে ওই বাঁচুক। ওকে নিয়ে তীরে চলে যাও। বীণা এরপর ভেসেই যাচ্ছিলেন, ফেরা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু এইসময় অন্য নুলিয়ারা দেখতে পেয়ে বীণাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন। আরেকটি জায়গায় কল্যাণী লিখছেন, স্ট্যানলি জ্যাকসনের ওপর গুলি চালানোর পর বীণার সঙ্গে তাঁর বাবা বেণীমাধব দাস ও মা সরলা দাস-এর দেখা করানো হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, ‘দেখুন আপনার ধরা পড়ার খবরে আপনার বাবা মায়ের কী অবস্থা হয়েছে। আপনি শুধু বলে দিন এই রিভলভার আপনি কার কাছ থেকে পেয়েছেন, আমরা আপনাকে ছেড়ে দেব।‘ বীণা নাকি একটু হেসে বলেছিলেন, “আমার বাবা এমন শিক্ষা দেননি আমায় যাতে আমি বিশ্বাসঘাতকের কাজ করব।” এরপর বীণাকে নানাধরনের অত্যাচারের সম্মুখীন হতে হয়েছে পুলিশ হেফাজতে। ফাঁসির ভয় তো ছিলই। কিন্তু কোনও ভয় বা প্রলোভনেই তিনি নিজেকে বাঁচানোর জন্য এতটুকু অমর্যাদার কাজ করতে রাজি হননি। তখনও না। পরবর্তী সময়েও না। এইজন্যই বীণা দাস তাঁর পেনসনের জন্য ডি আই এর কাছে কাকুতিমিনতি করছেন এই দৃশ্যটি এত করুণার সঞ্চার করে- বীণা দাসের প্রতি নয়, ওই গল্পলেখকের প্রতি। কারণ বীণা দাসের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা বা প্রতিবেশীরা, যাঁদের সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, তাঁরা কেউই বীণা দাসের অর্থাভাবের কথা কখনও বলেননি বা লেখেননি। বরং সরকারি আর্থিক অনুদানগুলিকে তিনি এড়িয়ে চলতেন বলেই আমরা জানি। ১৯৬০ সালে সমাজসেবার জন্য তিনি পদ্মশ্রী পেয়েছিলেন। 

Uploaded Image বীণা দাসের শেষ জীবন সম্পর্কে যে সমস্ত তথ্য পাওয়া যায় তা এইরকম। ১৯৮৬ সালের ১৯ নভেম্বর রাত্রে তাঁর স্বাধীনতা সংগ্রামী স্বামী, সরকারি কলেজের অধ্যাপক জ্যোতিষ ভৌমিক মারা যান। বীণা দাসের প্রতিবেশী কল্পনা দাস বলছেন, এই সময় তাঁদের শুভানুধ্যায়ীরা খুব বেশি বেশি ওঁর কাছে আসতে থাকেন। কিন্তু এই ধরনের সহানুভুতিসিক্ত জীবন বীণার সহ্য হচ্ছিল না। তিনি বারবারই এসময়ে বলেছেন তাঁকে একটু একা থাকতে দেওয়া হোক। বলেছেন তিনি বাইরে কোথাও চলে যেতে চান। আত্মীয়বন্ধুরা প্রতিবেশীরা সকলেই আপত্তি করেছিলেন। কিন্তু, ওঁর ব্যক্তিত্ব, তেজস্বিতা, এবং অগ্নিকন্যা বীণা হিসেবে তাঁর যে গরিমা ও মানসিক দৃঢ়তা-তার সঙ্গে কেউই যুঝে উঠতে পারেননি। তিরিশে নভেম্বর জ্যোতিষ ভৌমিকের স্মরণসভা ছিল। তিনি সেইরাত্রের দুন এক্সপ্রেসের টিকিট কেটে রেখেছিলেন বেনারস যাবেন বলে। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর বিকেলবেলাই তিনি এক ঘনিষ্ট প্রতিবেশীকে বলেছিলেন, এক্ষুণি হাওড়া স্টেশন চলে যাওয়া দরকার, নয়ত আবার কেউ এসে পড়বে, যাওয়ায় ব্যাঘাত ঘটবে। এইভাবে তিনি বারাণসী পৌঁছন। সেখানেই কিছুদিন ছিলেন। এইসময়েও তিনি কলকাতায় চিঠি লিখে পৌঁছ সংবাদ দিয়েছেন ভাইয়ের ছেলেকে এমনকি প্রতিবেশীদেরও। প্রয়োজনমতো টাকাও চেয়ে পাঠিয়েছেন। কিন্তু ১৭ ডিসেম্বরের পর তাঁর আর কোনও চিঠি আসেনি। এমনকি পাঠানো টাকাও ফেরত আসে। তিনি উঠেছিলেন উপবন নামের একটি গেস্ট হাউসে। তারা জানায় তিনি হৃষিকেশের উদ্দেশে রওনা দিয়েছেন। এরপর সকলেই খোঁজ করতে হৃষিকেশে পৌঁছন। সেখানেই পুলিশের কাছ থেকে জানা যায় ২৫ ডিসেম্বর ওখানকার একটি হসপিটালে তাঁকে ভর্তি করতে হয়েছিল এবং পরের দিন, অর্থাৎ ২৬ ডিসেম্বর সেখানেই তিনি মারা যান। 

এক হিসেবে দেখলে বুদ্ধ থেকে বীণা দাস পর্যন্ত কোনও মহাপুরুষের জীবনই একশ শতাংশ সফল নয়। কারণ এই পৃথিবীর কুশ্রীতা, ভীরুতা আর নীচতাকে কেউই তো পারলেন সম্পূর্ণ দূর করতে। এই ব্যর্থতার ছবিটা আরও স্পষ্ট হয় যখন আমরা দেখি বীণা দাসকে গরিয়সী মূর্তিতে পূজার বেদিতে স্থাপন করার ছলে কেউ কেউ আসলে তাঁকে অবজ্ঞা করছেন, তাঁর জীবন তাঁর শিক্ষা, তাঁর বাণী এগুলোকে অস্বীকার করছেন আর তাঁকে পরিণত করেছেন এক করুণার পাত্রে। অগ্নিকন্যা বীণার জীবনদীপের আগুনে এই সমস্ত মিথ্যা প্রচারের চির অবসান হোক, এই কামনা করি।


পূর্ব প্রকাশিত - উৎস মানুষ

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন