ওরা আমরা ভাগাভাগি মোটামুটি শেষ। ভদ্র বাঙালির বৃহদংশ যা চেয়েছেন, তাই পেয়েছেন। কী পেয়েছেন ক্যাশ ও কাইন্ড তাঁরা গুণে গেঁথে নেবেন, তাতে সন্দেহ কিছু নেই। কাল যিনি গ্যাস ডেলিভারি করতে এলেন, তিনি দরজা খুলতেই প্রায় প্রাণ বাঁচানোর মতন করে জয় শ্রীরাম বলে উঠলেন। চেনা লোক, এলে দুটো সুখ দুঃখের কথা হয়। কেমন আছেন, কী চলছে সব প্রশ্নের জবাব ওই জয় শ্রীরাম। তারপর সিলিন্ডার চেক করতে করতে দেখলাম ভারি নিচু গলায় বলছেন “স্বাস্থ্যসাথী আর মনে হয় না দেবে”।
বয়স্ক বাঙালি মেহনতি লোক, বলছেন স্বাস্থ্যসাথী আর মনে হয় না দেবে। বললাম, “ভাবছেন কেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন আয়ুষ্মান ভারত করবেন।” ভদ্রলোক কী বুঝলেন কে জানে, আর এই নিয়ে কিছু বললেন না। শুকনো মুখে চলে গেলেন। ভাবলাম একটু লেখাপড়া করি।
স্বাস্থ্যসাথী নিয়ে এই একটা গুজগুজ চলছে। আয়ুষ্মান ভব আশীর্বাদ এসেছে। লোকজন স্বাস্থ্যসাথী পাচ্ছেন না, ফিরে আসছেন। আয়ুষ্মান ভারত আসছে, রাস্তায় আছে।
আয়ুষ্মান ভারতের কথা একটু শোনা যাক। এই স্কিমের মাপকাঠি খুব উচ্চ পর্যায়ের। সে কাঠি তৈরি হয়েছে ২০১১ সালের ইউপিএ সরকারের Socio-Economic Caste Census, সংক্ষেপে SECC জরিপের ওপর ভিত্তি করে।
গ্রামে থাকা পরিবারের জন্য ছয়টা “বঞ্চনার মাপকাঠি”:
কাঁচা দেওয়াল, কাঁচা ছাদের একটা ঘরে বাস
পরিবারে ১৬ থেকে ৫৯ বছরের কোনো সদস্যই নেই
১৬ থেকে ৫৯ বছরের কোনো পুরুষ সদস্য নেই
পরিবারে অক্ষম সদস্য আছেন, কিন্তু সক্ষম কেউ নেই
তফসিলি জাতি বা উপজাতি পরিবার
ভূমিহীন, যাদের আয়ের বড় অংশ আসে দিনমজুরি থেকে
শহরের জন্য ১১টা পেশাভিত্তিক মাপকাঠি — রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, ঘরের কাজের লোক, ফেরিওয়ালা ইত্যাদি।
এই তালিকায় নাম থাকলে আয়ুষ্মান ভারত পাবেন। না থাকলে পাবেন না। ওকে? এবারে কয়টি কথা।
এই যোগ্য তালিকা ২০১১ সালে তৈরি হয়েছিল। মাঝের পনের বছরে কেউ গরিব হয়ে গেলে, গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে এসে অসংগঠিত শ্রমিক হয়ে গেলে, বিধবা হয়ে একা সংসার সামলাতে গেলে — তার নাম এই তালিকায় নেই, থাকার কোনো উপায়ও নেই। কেন্দ্রীয় সরকার নিজেই সংসদে জানিয়েছে, এই তালিকায় নতুন পরিবার যোগ করার কোনো প্রস্তাব নেই।
কপাল যাবে সঙ্গে, আসুন তবে বঙ্গে।
পশ্চিমবঙ্গে স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্প শুরু হয়েছিল ২০১৭ সালে। তখন লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ কোটি ৪২ লক্ষ পরিবার, যাদের মধ্যে SECC-ভিত্তিক পরিবারও ছিল, RSBY (পুরনো কেন্দ্রীয় প্রকল্প) থেকে আসা পরিবারও ছিল, এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব তালিকার পরিবারও ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে সার্বজনীন ঘোষণার পর ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২.৫ কোটি পরিবারে — মোটামুটি ১০-১২ কোটি মানুষ, পশ্চিমবঙ্গের মোট জনসংখ্যার সিংহভাগ।
তাহলে, আয়ুষ্মান ভারতের SECC মাপকাঠিতে বাংলায় কতজন পড়বেন?
আয়ুষ্মান ভারত SECC-যোগ্য: ১.১২ কোটি পরিবার আছেন পশ্চিমবঙ্গে। তাহলে বাদ পড়বেন প্রায় ১.৩ কোটি পরিবার, অর্থাৎ স্বাস্থ্যসাথীর প্রায় অর্ধেক।
যারা বাদ পড়লেন তারা কারা? এনারা ঠিক “গরিব” নন SECC-র সংজ্ঞায়। তাইলে কি এনারা “মধ্যবিত্ত”? বেসরকারি বিমা নিচ্ছেন? নাকি NITI Aayog যাদের বলে “missing middle” মাঝখানের সেই গর্তে পড়ে যাওয়া মানুষ।
এবারে একটু মেয়েমানুষ নিয়ে কথা হোক?
স্বাস্থ্যসাথীর সরকারি রিপোর্ট (জানুয়ারি ২০২১ পর্যন্ত) থেকে একটা চমকপ্রদ তথ্য বেরিয়ে আসে। এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় উপভোক্তা ছিলেন স্বনির্ভর গোষ্ঠী বা SHG-র সদস্যরা। ৮ লক্ষ ৬৬ হাজারেরও বেশি অ্যাডমিশন, ৮৯৩ কোটি টাকার ক্লেম মোট কভারেজের বিশাল অংশ।
এরা কারা? গ্রামীণ ও মফস্বলের মহিলারা, যারা ১০-২০ জন মিলে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করেছেন। নিজেদের মধ্যে সামান্য টাকা জমিয়ে ক্ষুদ্রঋণ নেন, ছোট ব্যবসা করেন। গরিব, কিন্তু SECC-র সংজ্ঞায় “যথেষ্ট গরিব” নন হয়তো, কারণ তাদের বাড়ি হয়তো পাকা, হয়তো পরিবারে একজন পুরুষ সদস্য আছেন।
পশ্চিমবঙ্গে SHG-র সংখ্যা সারা দেশে সবচেয়ে বেশি। সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত বাংলায় DAY-NRLM-এর অধীনে ১১.৯২ লক্ষ SHG আছে, যা কিনা সারা দেশে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় স্থানে বিহার (১০.৯৭ লক্ষ), তারপর অন্ধ্রপ্রদেশ (৮.৫৫ লক্ষ)। মহারাষ্ট্রে আছে ৬.৪০ লক্ষ SHG। প্রতিটা SHG-তে গড়ে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য ধরলে, বাংলায় শুধু NRLM-ভুক্ত SHG সদস্যের সংখ্যাই ১ কোটি ২০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ৭৫ লক্ষের মধ্যে — এবং এর বাইরেও রাজ্য সরকারের নিজস্ব SHG কাঠামো আছে।
এই মহিলাদের বড় অংশ SECC তালিকায় নেই। কারণ SECC করা হয়েছিল ২০১১ সালে, SHG তার পরেও বিস্তৃত হয়েছে। এবং SECC-র মাপকাঠি মেলেনি অনেকের, পাকা বাড়ি আছে, স্বামী আছেন, জমি আছে অল্প। কিন্তু বড় অসুখে হাসপাতালে ভর্তি হলে সর্বস্বান্ত হওয়ার ঝুঁকি একই।
স্বাস্থ্যসাথী এই মহিলাদের আলাদাভাবে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, কারণ রাজ্য সরকারের কাছে তাদের তালিকা ছিল। আয়ুষ্মান ভারতে এই ক্যাটাগরির কোনো জায়গা নেই। সেই গর্তে পড়ে যাওয়া মেয়েমানুষ।
এবার একটু ডবল ইঞ্জিন মহারাষ্ট্র দেখি। তারা যা করেছে, বাংলা যা করেনি। তুলনাটা দরকারি।
মহারাষ্ট্রেও আয়ুষ্মান ভারত চালু আছে, কিন্তু সেখানে রাজ্য সরকার নিজের প্রকল্প — Mahatma Jyotirao Phule Jan Arogya Yojana বা MJPJAY বন্ধ করেনি। বরং দুটোকে একসাথে চালিয়েছে। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে মহারাষ্ট্রের সব পরিবার এই প্রকল্পের আওতায় — SECC তালিকায় থাকুক বা না থাকুক। SECC-যোগ্যরা পাচ্ছেন MJPJAY + PMJAY মিলিয়ে ৫ লক্ষ। বাকি সবাই পাচ্ছেন শুধু MJPJAY-এ ১.৫ লক্ষ।
অর্থাৎ মহারাষ্ট্র “missing middle”-এর ওই গর্তে পড়ে যাওয়া মানুষদের সমস্যাটা স্বীকার করেছে, এবং রাজ্যের নিজস্ব খরচে আংশিক কভারেজ হলেও দিয়েছে।
বাংলায় কী হবে? রাজ্য বিধানসভায় জানা গিয়েছে ফেব্রুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত ২.৪৪ কোটি পরিবার-এ ৮.৭২ কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসাথীতে এনরোল করেছেন।
স্বাস্থ্যসাথী বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আয়ুষ্মান ভারত আসছে। রাজ্য সরকারের নিজস্ব কোনো পরিপূরক প্রকল্প থাকবে কিনা সেটা এখনও অস্পষ্ট। নতুন BJP সরকার ইতিমধ্যে স্বাস্থ্যদফতরে নির্দেশ পাঠিয়েছে শুধু আয়ুষ্মান ভারত চালু করতে।
দূর দূর। এত নম্বর কপচিয়ে কী লাভ? এইসা উন্নয়ন হবে যে ঘরে ঘরে সবাই এলিট কর্পোরেট বাঙালি হয়ে সুইগি দিয়ে পবিত্র হিন্দু বিরিয়ানি হাঁকাবেন, চিন্তা কীসের?
তাহলে এই Zomato, Blinkit, Ola, Uber-এর হয়ে কাজ করেন যে ডেলিভারি কর্মী, চালক, সেই গিগ কর্মীদের কী হবে?
SECC তালিকায় এনারা নেই, কারণ ২০১১ সালে এই পেশাই ছিল না। ESI বা PF-এ নেই, কারণ তাঁরা “কর্মচারী” নন কোম্পানির দৃষ্টিতে, তাঁরা “পার্টনার”। ২০২৫ সালের বাজেটে ঘোষণা হয়েছে এদের আয়ুষ্মান ভারতের আওতায় আনা হবে। বেশ। কেমন হয়েছে সেসব?
e-Shram পোর্টালে এখন পর্যন্ত সারা দেশে কার্যকরভাবে রেজিস্টার্ড হয়েছেন মাত্র প্রায় ৩ লক্ষ গিগ ওয়ার্কার। এ দেশের আনুমানিক ১ কোটি গিগ ওয়ার্কারের মধ্যে ৩ লক্ষ, অর্থাৎ ৩ শতাংশ। Aggregator-দের থেকে তথ্য সংগ্রহের কোনো বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা নেই, Social Security Fund-এ কোনো টাকা জমেনি। প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকাঠামো নেই।
NITI Aayog নিজেই বলছে, এরা “missing middle” — না গরিব, না মধ্যবিত্ত, কোথাও পড়েন না। গর্ত মশাই, গর্ত।
গাড়ি জনগণ ডেকেছেন। জনগণ ইঞ্জিন বেঁধেছেন। রাস্তার গর্তের দায় জনগণের কপালের মশাই, কপালের। নয়ত সরকারি রবীন্দ্র জয়ন্তী না হতে পারা নিয়ে হাহাকার চলছে, মিম মেটেরিয়াল নিয়ে হোহো হাহা চলছে, এই নিয়ে কেউ আর কপচায়?
সিটবেল্ট বেঁধে বসুন, সামনে মিসিং মিডলের গর্ত থৈ থৈ করছে।
তথ্যসূত্র:
Swasthya Sathi Official Report (January 2021),
Lok Sabha Unstarred Question No. 1524 (February 2023),
DAY-NRLM Lok Sabha Q. No. 2884 (March 2025),
PIB Press Release PRID 2039162,
Maharashtra MJPJAY Government Resolution (July 2023),
NITI Aayog Gig Economy Report (2022)
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন