শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

পার্টি ও আপোষ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

ভাবতে খুব অবাক লাগে যে লেনিন কি কোনো জাদুমন্ত্র বলে জানতে পেরেছিলেন যে ভারতের নামের একটি দেশে একটি বামপন্থী দলের একটি ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চে যোগদানকে ঘিরে গোটা বঙ্গ রাজনীতি তে আলোড়ন পরে যাবে গোটা জুলাই মাস ঘিরে? যে যোগদানকে আপোস হিসেবে চিহ্নিত করতে ওই দলের একদল কর্মী সমর্থক উঠে পরে লাগবেন।

সেই দল যারা ঘোষিত ভাবে মার্কসবাদী লেনিনবাদী তাদের অভ্যন্তরীণ এই বিতর্ককে মাথায় রেখেই কি লেনিন আস্ত একটা প্রবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন তার ব্যস্ত জীবনের মাঝে সময় বের করে? ঠিক কি লিখেছিলেন লেনিন একটু দেখা যাক। [সূত্র: লেনিন কালেক্টেড ওয়ার্কস ভলিউম ২৫ পৃষ্ঠা ৩০৯-৩১৪]

যে কোনো বিতর্কিত বিষয় নিয়ে লেখার সময় লেনিন যে ভাবে শুরু করতেন এই প্রবন্ধটা ও  সেভাবেই শুরু করছেন, আপোস শব্দটা র একটি সংজ্ঞা নির্মাণ করে। তাঁর ভাষায়, "রাজনীতিতে আপোস শব্দটি বোঝায় নির্দিষ্ট 
কিছু দাবির আত্মসমর্পণ, অন্য দলের সাথে চুক্তির মাধ্যমে অন্যদলের দাবির কিছু অংশ ত্যাগ করা।"

এরপরে লেনিন ওই আপোস নিয়ে তার পার্টির দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাখ্যা দেয়া শুরু করেছেন। লেনিন বলছেন, "বলশেভিকদের সম্বন্ধে রাস্তায় ঘোরাফেরা করা একজন সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ধারণা, যে ধারণা যে অপবাদ সংবাদপত্রের জগৎ উৎসাহের সাথে প্রচার করে, সেই অপবাদটি হল বলশেভিকরা কখনই কারও সাথে আপস করতে রাজি হবে না।

মনোযোগী পাঠকের কাছে আশা করা যায় যে এই শব্দগুলি নজর এড়িয়ে যাবে না, "সংবাদপত্রের উৎসাহ"। বামপন্থীদের নিজেদের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব দেখে, সংবাদ মাধ্যম কি ভাবে উল্লাস করেছে এই গোটা জুলাই মাসটা ধরে, কি ভাবে পার্টির মধ্যেকার ফাটলটা আরো চওড়া করা যায় উৎসাহ যুগিয়ে, কোনো আপোস নয় এই স্লোগানকে চ্যাম্পিয়ন করার মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে আপোসপন্থী হিসেবে দাগিয়ে দিয়ে সেটা লেনিন বোধ হয় মুসোলিয়ামে শুয়ে শুয়ে দেখছেন আর হাসছেন। 

বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের পার্টি হিসেবে এই ধারণাটি আমাদের কাছে চাটুকারিতা মাত্র, কারণ এটি প্রমাণ করে যে এমনকি আমাদের শত্রুরাও সমাজতন্ত্র এবং বিপ্লবের মৌলিক নীতির প্রতি আমাদের যে আনুগত্য রয়ে গেছে সেটা স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তবুও, আমাদের বলতে হবে যে এই ধারণাটি ভুল।"

কেন ধারণাটি ভুল, সেটি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লেনিন তুলে এনেছেন এঙ্গেলস যেভাবে ব্ল্যাঙ্কিপন্থী কমিউনিস্টদের সমালোচনা করেছিলেন সেই উদাহরণের কথা যেখানে এঙ্গেলস উপহাস করে বলছেন, "কোন আপস নয়!" এটি একটি ফাঁকা বুলি মাত্র, কারণ পরিস্থিতির জন্য প্রায়শই লড়াকু পার্টির উপর আপোষ করার বিষয়টা অনিবার্যভাবে চেপে বসে, এই বিষয়টা অস্বীকার করা অযৌক্তিক।" [মার্ক্স এঙ্গেলস সংগৃহীত রচনাবলী]।

এঙ্গেলস এর এই শিক্ষার সাথে লেনিন যোগ করছেন, "একটি সত্যিকারের বিপ্লবী পার্টির কাজ এটা ঘোষণা করা নয় যে, সমস্ত আপস ত্যাগ করা অসম্ভব, তার কাজ হল এটাই যে, সব রকম আপসের মাধ্যমে, যখন সেগুলি অনিবার্য হয়, তখন তার নীতির প্রতি, তার শ্রেণির প্রতি, তার বিপ্লবী উদ্দেশ্যের প্রতি সৎ থাকতে থাকতে পারার মধ্যে দিয়ে বিপ্লবের পথ প্রশস্ত করা এবং জনগণকে বিপ্লবে বিজয়ের জন্য শিক্ষিত করা"

আপোস শব্দটা শুনলেই যে সব কমিউনিস্টদের রক্ত গরম হয়ে ওঠে, তাদের উদ্দেশ্যে লেনিনের সাবধানবাণীর তাৎপর্য এটাই যে, পরিবেশ পরিস্থিতি না বুঝে একগুঁয়ে এর মতো আপোস এর বিরোধিতা করার অর্থ হল ব্ল্যাঙ্কিপন্থায় আত্মসমর্পণ করা, এককথায় অতিবাম বিচ্যুতি, বাম সংকীর্ণতাবাদ। 

এই অবধি পড়ে যে সব আপোস পন্থীরা আহ্লাদে লাফালাফি করবেন আর যে সব আপোস বিরোধীরা এই লেখক কে দালাল ফালাল বলে দাগিয়ে দেয়ার তোড়জোড় করবেন তাদের একটাই অনুরোধ, আরেকটু পড়তে হবে। কারণ মূল প্রবন্ধের লেখকের নাম ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন, সফল বিপ্লবের বিচক্ষণ জনক হওয়ার পাশাপাশি তিনি সর্বকালের অন্যতম সেরা বিপ্লবীও বটে। তিনি জানতেন যে বাম সংকীর্ণতা বাদ এর গাড্ড থেকে পার্টিকে বাঁচাতে গিয়ে সেটা আবার ডান পন্থী বিচ্যুতির দিকে ঢলে না যায়। তিনি জানতেন যে সংশোধনবাদী এরা ভবিষ্যতে আপোস নিয়ে ওপরে লেখা তাঁর বক্তব্যকে প্রেক্ষিতহীন উদ্ধৃতি হিসেবে ব্যবহার করার লোভ সামলাতে পারবে না। 

তাই একজন আদ্যন্ত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী হিসেবে লেনিন এইবার আসছেন আপোস প্রসঙ্গে তাঁর দ্বিতীয় পয়েন্টে। আপোস করার দুটি স্পষ্ট ভাগ করছেন উনি। এক, যেখানে পরিস্থিতির চাপে বাধ্য হয়ে আপোস করতে হয় কমিউনিস্ট পার্টিকে আর দুই, যেখানে সেই পরিমাণ বাধ্যবাধকতা নেই, কমিউনিস্ট পার্টি স্বেচ্ছায় আপোস করার রাস্তা বেছে নিচ্ছে। 

প্রথম পরিস্থিতির চেয়ে দ্বিতীয় পরিস্থিতির গুরুত্ব কিছু কম নয়, বরঞ্চ বেশি। কারণ সেখানে আপোস করা বা না করা দুটি পার্টি কৌশল প্রয়োগ করার রাস্তা খানিকটা খোলা আছে। সেই পরিস্থিতি তে কমিউনিস্ট পার্টি কি করবে ? লেনিন একটা ফ্রেম ওয়ার্ক তৈরি করার চেষ্টা করছেন, যার জরুরী পয়েন্ট গুলি হল: 

এক) কমিউনিস্ট পার্টি কোনো অবস্থাতেই তার সরাসরি এবং প্রধান শ্রেণী শত্রু বুর্জোয়া পার্টি গুলিকে কোনো সমঝোতার প্রস্তাব দেবে না, বড়োজোর মেনশেভিক ও সোস্যালিস্ট রেভ পার্টির মতো পাতি বুর্জোয়া দলগুলিকে দিতে পারে, তারা শাসক দল হলেও;
দুই) এই আপোস সমঝোতাকে একটি ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবে ধরতে হবে, রুটিন নয়,;
তিন) এই সমঝোতা আপোস হবে অতি স্বল্প মেয়াদী ঘটনা, কোনো পাকাপাকি বন্দোবস্ত নয়;
চার) এই আপোস এর সিদ্ধান্তে ভবিষ্যতে কমিউনিস্ট পার্টি আরো শক্তিশালী হবে নাকি, বিপ্লবের পথ আরো সুগম হবে নাকি। 

ফ্যাসিবিরোধী মঞ্চে কমিউনিস্ট পার্টির যোগদানের সিদ্ধান্তকে এইবার আপোস বিরোধী ও আপোসপন্থী দু'দল ই যদি এই লেনিনিয় ফ্রেম ওয়ার্ক এ ফেলে বিচার করেন তাহলে কমিউনিস্ট পার্টির এই অবস্থান নিয়ে কোনো বিতর্ক থাকার কথা নয়। মুশকিল টা এইখানেই যে কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য সমর্থকদের একটা বড় অংশ বিতর্কের বদলে বিশ্বাসে আস্থা রাখেন, "বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদুর।"

একদল মনে করেন যে পলিটব্যুরো কোনো ভুল করতে পারে না, প্রায় কিং ক্যান ডু নো রং এর ঢংয়ে। অন্যদলের বিশ্বাস যে যাবতীয় প্রজ্ঞার উৎসস্থল হল জনগণের সাথে নিবিড় সংযোগ। ঠাণ্ডা ঘরে থাকা পলিট ব্যুরো থোড়াই জানে শ্রেণী শত্রুর হাতে সদ্য লাঞ্ছিত নিপীড়িত সংগ্রামী জনগণের মনের কথা। 

ভাবের ঘরে চুরি সেটা চুরিই। দু পাতা লেনিন পড়ে নিজেকে লেনিনের থেকেও বড় মার্কসবাদী ভেবে নেয়াটা যেমন ভুল, তেমনি পঞ্চায়েতে বুক দিয়ে বুথ আগলিয়েছেন বলেই ডলোরেসস ইবারুরি স্টাইলে "নো পাসারণ" বলে হুংকার ছাড়াটাও ভুল। ভাববাদের চর্চা তো অনেক হল, এবার কিঞ্চিৎ বস্তুবাদের চর্চা হোক, দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের। বিতর্ক হোক  সেই পথ ধরে। লেনিন পথ দেখাবেন।

সোমবার, ২৪ জুলাই, ২০২৩

মণিপুর ~ সুমিত সান্যাল

জীবিকার কারণে বহুদিন মনিপুরে যেতে হতো। প্রতি মাসে ৪ দিনের জন্য ইম্ফল যেতাম। আর প্রতি দুমাসে একবার চূড়াচাঁদপুর যেতাম। মণিপুরের মানুষ গুলোকে খুব কাছ থেকে চিনি। এখনও অনেক বন্ধু আছে মনিপুরে।
মণিপুরের শহরাঞ্চলে মিতেই সম্প্রদায়ের বাস। মিতেই সম্প্রদায় মণিপুরের মূল উপজাতি। এদের বেশিরভাগ পদবী সিং। ধর্ম হিন্দু। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দের পরে শ্রীহট্ট থেকে বৈষ্ণব ধর্মগুরুরা গিয়ে এদের বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত করে। মিতেই দের সংখ্যা শহরে প্রায় ৮২%। আর মণিপুরের পাহাড় ঘেঁষা গ্রাম গুলোতে মূলত কয়েকশ বছর ধরে নাগা, মিজো আর কুকিরা বাস করে।
 কুকিরা মূলত নাগাল্যান্ডের উপজাতি। খ্রিষ্টান পাদ্রীরা মিজো, কুকি ও নাগাদের বেশিরভাগ উপজাতি কে খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত করে। আর আছে মুসলিম এদের সংখ্যা ৮.৫% সারা রাজ্য। মণিপুরের রাজা ১০০০ মুসলিম সৈন্য বঙ্গ দেশ থেকে নিয়ে গিয়েছিল। তাদের উত্তরাধিকারীরা মুসলিমদের মূল অংশ। মনিপুর রাজ্য ৪২.৪% হিন্দু ৪২.৩% খ্রিষ্টান আর ৮.৫% মুসলিম। তবে মিতেইরা বেশিরভাগ শহরে বাস করে।

 মিতেইরা মনে করে যে তাদের অঞ্চল কুকি,নাগা,মিজোরা অনুপ্রবেশ করে দখল করেছে। যা আংশিক সত্যি। তাই ছোটখাট জাতিভিত্তিক গন্ডগোল চিরকালই হয়। বড় গন্ডগোলও মিতেইদের সাথে কুকি বা নাগাদের হয়েছে। কিন্তু এতদিন এটা ছিল সম্পূর্ন জাতি ভিত্তিক। এমনিতে মিতেইরা ঠান্ডা প্রকৃতির ধর্মপরায়ণ জাতি। কয়েকশ বছর ধরে শ্রীহট্টর বাঙালিদের সাথে মিতেইদের সংস্কৃতিক ও সামাজিক সম্পর্ক। মণিপুরের ভাষার হরফ বাংলা হরফ। মিতেইদের ওপর বাঙালিদের প্রভাব কয়েকশ বছর ধরে। মিতেইরা শিক্ষিত জাতি ও প্রায় ১০০% হিন্দু বৈষ্ণব। কিন্তু এবার মিতেইদের সাথে কুকি বা নাগা বা মুসলিমদের গন্ডগোল কোন জাতি ভিত্তিক গন্ডগোল নয়। একে বারে ধর্ম ভিত্তিক গন্ডগোল। মণিপুরের জাতিসত্তা বজায় রাখতে কংগ্রেসের ও কমিউনিস্টদের একটা প্রধান ভূমিকা ছিল।
 কংগ্রেস তো এখানকার প্রধান দল ছিল আর কমিউনিস্ট বিশেষ করে সিপিআই এর একটা বড় সংগঠন ছিল। আর ছিল এমপিপি বা ওখানকার মনিপুর পিপলস পার্টি যারা জাতি ভিত্তিক রাজনীতি করত। কুকি ও নাগাদের রাজনৈতিক দল ছিল কিন্তু সব আঞ্চলিক ভিত্তিক। কংগ্রেসকে সরিয়ে বিজেপি আসার পরই শুরু হলো ধর্মভিত্তিক দ্বন্দ্ব। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট দের সাংগঠনিক দুর্বলতায় বিজেপি ও আরএসএস মিতেইদের বোঝালো যে ওরা হিন্দু আর কুকি,মিজো ও নাগারা খ্রিষ্টান। বোঝালো যে একদিন খ্রিস্টানরা হিন্দুদের হটিয়ে মনিপুর দখল করে নেবে। সরলপ্রাণ মিতেইরা এটা বিশ্বাস করল আর একটা জাতিগত বিদ্বেষ সম্পূর্ন ধর্মগত বিদ্বেষে পরিণত হলো। মণিপুরের মানুষ নারীদের ভীষণ শ্রদ্ধা করে। ওখানে মহিলারা জাতির মূল চালিকা শক্তি। সেই মহিলাদের ধর্ষণ করে নগ্ন করে ঘোরানো মণিপুরের মিতেইদের সংস্কৃতির সম্পূর্ন পরিপন্থী ও আমার ভাবনার বাইরে।




 মার্কস বলেছিলেন ধর্ম মানুষকে নেশাগ্রস্ত করে দেয় এটাযে কতটা সত্যি সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। আজ মনিপুর তার জীবন্ত প্রমাণ। একটা হিন্দু বৈষ্ণব শান্ত শিক্ষিত জাতি ধর্মের ভাবাবেগে জন্তুতে পরিণত হয়ে গেল। এতদিনের গড়ে উঠা সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে গেল। বিজেপির ভোট রাজনীতি শুধু হিন্দু ভোটকে নিজের দিকে সংহত করতে ও কংগ্রেসের হিন্দু ভোট নিজের দিকে নিয়ে আসতে এরা মণিপুরের সব অংশের মানুষের বিরাট ক্ষতি করে দিল। এই ক্ষত শুকাতে কয়েক দশক লাগবে। একটা শিক্ষিত বৈষ্ণব ভাবধারায় বিশ্বাসী জাতিকে বিশ্ববাসীর সামনে ধর্ষক খুনীতে পরিণত করল। বিজেপির মতো দেশদ্রোহী পার্টি ভূ ভারতে তৈরি হয়নি। নিজের ক্ষমতা রক্ষা করতে এরা কতটা নীচে নামতে পারে মনিপুর তার একমাত্র প্রমাণ। আজ সুপ্রিম কোর্ট মণিপুরের ব্যাপারে একতরফা প্রক্রিয়া গ্রহণ করার ঘোষণা না করলে নরেন্দ্র মোদী সাংবাদিক ডেকে দুঃখের এই নাটক করত না। দুর্ভাগ্য ৭৮ দিন পর একটা গণধর্ষনের ব্যাপারে বিজেপি প্রশাসন মুখ খুললো বা খুলতে বাধ্য হলো। কারণ বিজেপি জানত হিন্দু ভোট সংহত করতে এই পুরো হিংসা,খুনের পটভূমি তাদের ও আরএসএস এর মস্তিষ্ক প্রসূত। এই গন্ডগোল চললে তাদের লাভ। ২০০২ সালে গুজরাট গনহত্যার পর ভারতে মণিপুরের মতো এত বড় গনহত্যা আর হয়নি। দুটো গনহত্যার পেছনেই বিজেপির মূল ভূমিকা। এই হলো বিজেপির ডবল ইঞ্জিন সরকার যে সরকার সরাসরি ধর্ম ভিত্তিক বা জাতি ভিত্তিক দাঙ্গা স্পন্সর করে। আজকের মনিপুর আমার কাছে সম্পূর্ন অচেনা। এ মনিপুর আমি দেখিনি এ মনিপুর আমি চাইনা। আমি আবার দেখতে চাই সেই মনিপুর যেখানে মিতেই,কুকি,মিজো,নাগা,মুসলিম সবাই একসাথে বাস করে। হিন্দু,খ্রিষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে কোন ধর্মগত বিবাদ নেই।
 চার্চ আর মন্দির পাশাপাশি সহাবস্থান। তবে বিজেপি সরকারে থাকলে এটা কখনই সম্ভব নয়। ক্ষমতার জন্য এরা ধর্মে ধর্মে জাতে জাতে  হানাহানি করবেই। এদের মূল শত্রু ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতা। তাই আবার বলব ২০২৪ সে বিজেপি হটাও দেশ বাঁচাও!

মঙ্গলবার, ১৮ জুলাই, ২০২৩

ডাক্তার কাদম্বিনী গাঙ্গুলী ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

কাঁথি হাসপাতালের নার্সিং ট্রেনিং সেন্টারে একটা কোর্সের পরীক্ষা ছিল। শেষবেলায় সেখানে কিছুক্ষণ কাটিয়ে যখন ঘরে ফিরে আসছি তখন চোখে পড়েছিল একটি দৃশ্য। অতি সাধারণ। ওই কোর্সের এক ছাত্রীকে নিতে এসেছে তার স্বামী আর তার কিশোরী মেয়ে স্কুটার নিয়ে। 

ওই কোর্সের অনেক ছাত্রীই বিবাহিত, সন্তানের মা কারণ ওটা ছিল ইন সার্ভিস কোর্স। চাকরি করতে করতে ছুটি নিয়ে পড়া। সংসার সামলে, স্বামী, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালন করে ছাত্রী সুলভ টিপিক্যাল বয়েস পেরিয়ে এসেও অনেকেই যে অখন্ড মনযোগ সহকারে লেখাপড়াটা করলেন, থিওরি প্রাকটিক্যাল পরীক্ষার প্রস্তুতি নিলেন তাদের চেয়ে অনেক ছোট সহপাঠিনীদের সাথে পাল্লা দিয়ে তাদের কথাই আজ মনে পরে গেল কারণ আজ এক বিশেষ মহিলার জন্মদিন।

ঠিক কবে থেকে ওই মহিলা মানে কাদম্বিনী বসুর চিকিৎসক হওয়ার ইচ্ছে হয়েছিল সেটা জানতে পারিনি। কিন্তু দেখতে পাচ্ছি যে ১৮৮২ সালে উনি এফ এ পাশ করার পরেই ডাক্তারি পড়ার চেষ্টা করেন কিন্তু গ্র্যাজুয়েট না হওয়ার কারণে সুযোগ পাননি। এর পরে ১৮৮৩ সালে বি এ পাশ এর মধ্যে উনি প্রেম করে বিয়ে করেছেন নিজের থেকে ১৭ বছরের বড় বিপত্নীক দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে। বিয়ের সময় দ্বারকানাথের দুই সন্তান, কন্যা বিধুমুখী আর পুত্র মানসিক প্রতিবন্ধী সতীশচন্দ্র। চিকিৎসক হওয়ার সেই অদম্য ইচ্ছে কিন্তু কমে নি। 

বি এ পাশ করার পরে আবার আবেদন করেন। 
মেডিক্যাল কাউন্সিল আপত্তি করে। বিদেশি শাসকের আমলাতন্ত্রের আপত্তির কারণ তবু কিছুটা আন্দাজ করা যায়। কিন্তু এর সাথে দেশীয় লোকজনও হৈ চৈ শুরু করে। একটি মেয়ে ডাক্তারি পড়বে এমন অনাসৃষ্টি কান্ড তারা সহজে মেনে নেয় নি। মেডিক্যাল কলেজের একজন বাঙালি অধ্যাপকের তো ঘোর আপত্তি ছিল। 

বাজারী পত্রিকায় ২রা জুলাই, ১৮৮৩ সালে ওইসব আপত্তিকে তাদের বিবেচনায় "যুক্তিসঙ্গত" আখ্যা দিয়ে লেখা হল, "শ্রীমতি কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায় (বসু?) বি. এ. কলিকাতার মেডিকেল কালেজে প্রবিষ্ট হইয়াছেন। মেডিকেল কালেজের অনেক শিক্ষক কয়েকটি প্রধান কারণ দর্শাইয়া স্ত্রীলোকদিগের উক্ত কালেজে প্রবিষ্ট করিবার সম্বন্ধে আপত্তি করেন। তাঁহারা বলেন, উক্ত কালেজে ছাত্র দিগের রাত্রিতে যখন কালেজে থাকিতে হয়, তখন দুইজন করিয়া ছাত্র একঘরে থাকে। এরূপ অবস্থায় স্ত্রীলোক কিরূপ করিয়া পুরুষের সহিত এক ঘরে থাকিবে। এবং যখন ছাত্রদিগকে পুরুষ অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বুঝাইয়া দিতে হয়, তখন পুরুষ শিক্ষক স্ত্রীলোকদিগকে কিরূপে উহা বুঝাইয়া দিবে। আরও অন্যান্য আপত্তির মধ্যে উক্ত কালেজের একজন ছাত্র বলেন যে নিয়ম আছে সমস্ত বক্তৃতাতে উপস্থিত না থাকিলে, পরীক্ষা তে উত্তীর্ণ হওয়া যায় না। এবং যদি এই পাঁচ বৎসরের মধ্যে কোন রমণীর গর্ভ হয়, তবে প্রসবকালীন তিনি কি করিয়া বক্তৃতায় উপস্থিত থাকিবেন ?"

এর বিপরীতে দ্বারকানাথ গাঙ্গুলি প্রমুখ আন্দোলন করেন। এসব জানার পরে ছোট লাট রিভার্স অগাস্টাস টমসনের হস্তক্ষেপে মেডিক্যাল কাউন্সিল তাদের আগের সিদ্ধান্ত পাল্টে কাদম্বিনীকে ভর্তির অনুমতি দেয়। বাধা বিপত্তি এড়িয়ে ভর্তি হয়েও বিপদ কাটেনি। কিছু পরীক্ষকের রোষে (সম্ভবত ওই বাঙালি চিকিৎসক অধ্যাপক ও ছিলেন তার মধ্যে) কাদম্বিনী মেটিরিয়া মেডিকা ও এনাটমিতে ফেল করেন। তাঁকে গ্রেস নম্বর দিয়ে পাশ করানো হয়। 

এই গ্রেস দেয়া নিয়েও পত্রিকা লেখে, "শ্রীমতী গঙ্গোপাধ্যায় মেটিরিয়া মেডিকা ও এনাটমিতে ফেল হন। এখন শুনিতেছি সিন্ডিকেটের দয়ায় তিনি এ পরীক্ষায় পাশ করেন" 

এই আপত্তিকর "দয়া" শব্দটা কতটা যুক্তিযুক্ত সেটা আমরা এক্ষুনি দেখবো। ১৮৮৮ সালে কাদম্বিনী গ্রাজুয়েট অফ বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ উপাধি পেয়ে কলেজ থেকে বের হন। এর পরে ১৮৯২ সালে স্বামী পুত্র কে বাড়িতে রেখে বিলেত যান আর ১৮৯৩ সালের মধ্যে এডিনবরা থেকে LRCPL এবং LRCS আর গ্লাসগো থেকে LFPS এই তিন খানি ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন। 

কোনোভাবে ফ্লোরেন্স নাইটিংগেল কাদম্বিনী (গঙ্গোপাধ্যায়) সম্পর্কে জানতে পেরেছিলেন।।১৮৮৮ সালের  ২০শে ফেব্রুয়ারি তিনি তার এক বন্ধুকে লিখছেন:-

"তুমি মিসেস গাঙ্গুলি সম্পর্কে কিছু জানো, আমায় কিছু পরামর্শ দিতে পারবে ? এর মধ্যেই ওই মহিলা সেই পাশ করে ফেলেছেন যাকে বলে মেডিসিন আর সার্জারিতে ফার্স্ট লাইসেনসিয়েট এর পরের মার্চে ফাইনাল এক্সামে বসছেন। এই ইয়াং লেডি, মিসেস গাঙ্গুলি নাকি বিবাহিত ! বিয়ের পরেই নাকি উনি ডাক্তার হবেন বলে মনস্থির করেন ! আর ওনার না কি একটি নয়, দুটি ছোট বাচ্ছা আছে ! ইনি বাচ্ছা হওয়ার পরে মাত্র তেরো দিন শুয়ে ছিলেন, একটাও লেকচার ক্লাশ না কি মিস করেন নি।"

মিস নাইটিংগেল নিজে একজন মেয়ে হয়ে বুঝতেন যে বিয়ের পরে, মা হয়ে যাওয়ার পরে, পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, মেয়েদের পক্ষে কত কষ্টকর। তাও আবার সেই সময়ের ভারতে, বাংলাদেশে। তাই তার ওই ছোট্ট চিঠিতে বিস্ময়বোধক চিহ্নের এতো ছড়াছড়ি। সেই বিস্ময় বোধ থেকে জন্ম নেওয়া মুগ্ধতা, সে থেকে জন্ম নেওয়া শ্রদ্ধা, ভালোবাসা থেকেই আমরা দেখতে পাচ্ছি, উনি লেডি ডাফরিন কে সুপারিশ করছেন বাংলা তথা ভারত তথা সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট ডাক্তার এর একটা চাকরির জন্য, "ফর এনি পোস্টস এবাউট দ্যা ফিমেল ওয়ার্ড অফ ক্যালকাটা।

কাঁথি হাসপাতাল চত্বরের সেই পড়ন্ত বিকেলের আলোয় দেখা দৃশ্যটা আজও মনে পরে। শিক্ষক নয়, একটু আগের পরীক্ষক নয়, আমি তখন নিছক দর্শক। আমাদের ওই ছাত্রীটি স্কুটারের কাছে গিয়ে মেয়ের গাল টিপে একটু আদর করে চেপে বসল স্বামীর পেছনে। কোমরটা একটু জড়িয়ে। দ্বারকানাথ আর কাদম্বিনীর যুগলমূর্তি এগিয়ে গেল গেটের দিকে। 

বিশ্বাস করুন, সেকালেও সহজ ছিল না, আজও সহজ নয়, খুব, খুব কঠিন কাজ। কাদম্বিনীদের প্রেরণা হয়ে ওঠার কাহিনীগুলো মনে রাখাটা তাই জরুরী আমাদের কাছে। কাদম্বিনীরা আমাদের আসে পাশেই আছে, চিনে নিতে হবে শুধু।

শুক্রবার, ১৪ জুলাই, ২০২৩

নেরুদা ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আজকের গল্পটার চারজন নায়ক আছেন। তার মধ্যে দু জন কবি, একজন আবার নোবেল পুরষ্কার পাওয়া, একজন বিশ্ব খ্যাত চিত্রকর , আরেকজন হলেন এক ডাক্তার। গল্পটা বলতে একটু দেরি হয়ে গেল। এক কবির জন্মদিন গেছে দু দিন আগেই। সে দিন বলতে পারলে ভালো হতো, সময়ের অভাবে লিখতে না পারার জন্য সুধী পাঠক মার্জনা করবেন। 

গল্পের প্রথম নায়ক এক কবি, গল্পটা শুরুর আগেই মারা গেছেন। গল্পের শুরুটা ১৯৩৯ সালের চৌঠা আগস্ট তারিখে। উইনিপেগ বলে একটা ছোট্ট জাহাজ ফ্রান্সের পইলাক বন্দর থেকে যাত্রা শুরু করে চিলির (বা চিলে) ভ্যালপেরাইজো বন্দরের উদ্দেশ্যে। এই যাত্রা শুরু এর মূল কারিগর বছর চিলের ছত্রিশের এক কবি যিনি সম্ভবত স্প্যানিশ ভাষায় সর্বকালের সেরা কবি, নাম পাবলো নেরুদা। 

সময়টা উত্তাল। একটানা গৃহযুদ্ধের পরে ইন্টারন্যাশনাল  বিগ্রেড পরাজিত, বিজয়ী ফ্যাসিস্ট একনায়ক ফ্র্যানকো দখল করে নিয়েছেন গোটা দেশটা। মরিয়া প্রজাতন্ত্রীরা দলে দলে দেশ ছাড়ছেন। তাদের একটা বড় অংশ ফ্রান্সের কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পিরেনিজ পর্বত টপকে ফ্রান্সে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করছেন। 

চিলের কনসাল হিসেবে স্প্যানিশ রিপাবলিকে কাজ করার সুবাদে নেরুদা খুব লাভ থেকে ফ্যাসিস্টদের কার্যকলাপ দেখেছিলেন। স্বাধীনতা ও সংস্কৃতির ওপর এই আক্রমণ তাঁর মনকে গভীর ভাবে বিচলিত করেছিল। বিশেষত যার হাত ধরে স্পেন তথা ইউরোপের শিল্পী সাহিত্যিকদের সাথে নেরুদার যোগাযোগ শুরু সেই তরুণ স্প্যানিশ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা যখন ১৯৩৬ সালে ফ্যাসিস্টদের হাতে খুন হয়ে যান, তারপর থেকে নেরুদার দৃষ্টিভঙ্গি তে বড় পরিবর্তন আছে, আসে তার কাব্য রচনার শৈলীতে। বামপন্থী নেরুদা হয়ে ওঠেন পুরোপুরি কমিউনিজম এর সমর্থক। 

ফ্রান্সে পালিয়ে আসা এইসব স্প্যানিশ শরণার্থীদের জন্য নিজের দেশ চিলি হবে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আশ্রয় স্থল এই চিন্তা থেকে নেরুদা তার দেশের রাষ্ট্রপতিকে অনুরোধ করেন তাঁকে ফ্রান্সে কনসাল হিসেবে নিয়োগ করার জন্য এবং ওই গৃহহীন প্রজাতন্ত্রী দের চিলিতে জায়গা দেওয়ার জন্য। আগুরী কেরদা প্রথম অনুরোধটা রাখলেও দ্বিতীয়টার ক্ষেত্রে টালা বাহানা করেন। তাঁকে খুব বেশি দোষ দেয়া যায় না। চিলির বিরোধী দক্ষিণপন্থী দল গলো এই আশ্রয় দেয়া দিয়ে তীব্র বিরোধিতা করে। শেষমেষ রাষ্ট্রপতি রাজি হয়ে যান।

নেরুদার সামনে তখন আর এক চ্যালেঞ্জ। দু চারজন করে শরণার্থী পাঠানোর বদলে উনি চেষ্টা করতে থাকেন যদি একসাথে অনেক জন কে পাঠানো যায়। একমাত্র উপায় হল জাহাজ। যাত্রীবাহী জাহাজ ভাড়া করা প্রায় অসম্ভব। তখন নজরে আসে এই উইনিপেগ। ছোট জাহাজ, আদতে মালবাহী। তাকে এবার যাত্রীবাহী বানিয়ে তুলতে হবে। থাকার শোয়ার জায়গা, ল্যাভেটারি, ছোট ডিসপেনসারি মায় ছোটখাটো নার্সারি। 

অর্থের প্রয়োজন। পাগলের মতো চেষ্টা করতে লাগলেন নেরুদা। ইউরোপ থেকে ল্যাটিন আমেরিকা, সমস্ত চেনাজানা মানুষজনের কাছে হাত পারলেন। নিরাশ করেন নি কেউ এই বিশ্বখ্যাত কবিকে। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন পাবলো পিকাসোও। টাকা যোগাড় হল। জাহাজের খোল নলচে পাল্টে ফেলা হল। যাত্রা শুরু করলো উইনিপেগ। যাত্রী কমবেশি ২০০০ শরণার্থী। শিন্ডলার লিস্টের সিন্ডলার বাঁচিয়ে ছিলেন প্রায় বারোশ মানুষকে। 

কতগুলি অসীম সাহসী মানুষ যারা বুক চিতিয়ে নিজের দেশে ফ্যাসিস্ট দের মোকাবিলা করেছিল তারা অতল সাগরের বুকে মোচার খোলার মতো পুঁচকি জাহাজে চড়ে পাড়ি দিল হাজার মাইল। অচেনা অদেখা দেশ। কেবল ভাষাটা এক। 

কপর্দক শূন্য ওই মানুষগুলোকে সাদর অভ্যর্থনা করার জন্য জাহাজঘাটে প্রেসিডেন্ট কেরদা  পাঠিয়েছিলেন তাঁর মন্ত্রিসভার তরুণ স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে। যার নাম ডাক্তার সালভাদর আয়েন্দে। শরণার্থীদের প্রথম পা চিলির মাটিতে পড়ার আগেই তাদের সমস্ত ক্লান্তি সমস্ত আশঙ্কা হাওয়ায় উড়ে গেল। আয়েন্দের নেতৃত্বে জয়ধ্বনি দেয়া সমবেত জনতা গলা ছেড়ে গাইছে স্প্যানিশ প্রতিরোধের সেই সব চেনা গান। 

নেরুদা জীবনে বহু অবিস্মরণীয় কবিতা রচনা করে গেছেন। কিন্তু তাঁর নিজের ভাষায়, "ধোঁয়া ছেড়ে ফ্রান্সের বন্দর থেকে বেরিয়ে যাওয়া উইনিপেগ এর দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছিল, এটাই আমার জীবনে রচিত শ্রেষ্ট কবিতা।" লোহা লক্কর, কয়লা দিয়ে তৈরি কবিতার রচয়িতা নেরুদা আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন একজন কমিউনিস্ট এর কাছে প্রলেতারি আন্তর্জাতিকতার এর মানে টা কি।  

কবিতা কি তাই ?
কবিতা কি শুধু তাই ?
মনের খেয়ালে কাগজে-কলমে
শব্দ সাজাই ?

কবিতা কি শুধু রম্য-রচনা
ফুল পাখি আর চাঁদের জোছোনা
প্রিয়ার সঙ্গে জল-তরঙ্গ
নৌকো ভাসাই ?

কবিতা কি শুধু "ওমর খয়াম"
অথবা বিরহী যক্ষের নাম
প্রেমের অনলে একাকিনী জ্বলে
"বিরহিনী রাই" ?

কবিতা বন্দী চার-দেওয়ালে
তোমার আমার চোখের আড়ালে
কবিতাকে আনো রাজপথে আজ
মিছিলে চাই॥

সেলাম, কবি, তোমাকে সেলাম।

রবিবার, ৯ জুলাই, ২০২৩

পঞ্চায়েত নির্বাচনের হিসেব ~ ডাঃ বিষাণ বসু

হিসেব খুব সহজ নয়, আবার অত জটিলও নয়।

পঞ্চায়েতে এরকম জালিবাজি হবে। হতে থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকার সে নিয়ে উচ্চবাচ্য করবে না (করাটা খুব অভিপ্রেত, এমনও নয়, কেননা তাঁদের রেকর্ডটিও তো বড় মুখ করে গল্প করার মতো নয়)। কেননা, এই রাজ্যে প্রশাসন তৃণমূলের হাতে থাকলে বিজেপির ক্ষতি নেই। বরং যত বেশি পঞ্চায়েত তৃণমূলের হাতে, তত দুর্নীতি, তত ইডি-সিবিআই, তত বেশি করে তৃণমূল নেতাদের টিকি বিজেপির ঘরে বাঁধা। বিজেপির লক্ষ্য, লোকসভায় এই রাজ্য থেকে গোটা বারো-পনের সিট - বেশি হলে ভালো, নইলে ওটুকু দিয়ে আপাতত কাজ চালানো। আর রাজ্যসভা-লোকসভায় যেকোনও ইস্যুতে তৃণমূলের সমর্থন - সরাসরি না হয়ে অভিনব পদ্ধতিতে হলেও ক্ষতি নেই, যেমন ওয়াক-আউট ইত্যাদি প্রভৃতি। এবং মাঝেমধ্যে কিছু রাজ্যের নির্বাচনে টুকটাক ভোট কাটাকাটি করে সাহায্য, এটুকু।

লোকসভায় তৃণমূল বিজেপিকে সেই কোটার সিট দেবে। বছরভর বাকি সহযোগিতা তো বলাই বাহুল্য। উপায়ও নেই, কেননা চুরিচামারির কারণে টিকি ওপাড়ায় বাঁধা।

তো পঞ্চায়েতের মাসকয়েকের মাথায় লোকসভা নির্বাচনে এমন ফল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মিডিয়া সমস্বরে বলবে, এই ফল হলো পঞ্চায়েত ভোটে অনাচারের প্রতিবাদে মানুষের ক্ষোভের স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ। তৃণমূলের দু-চারজনও সেই মর্মে কথা বলবেন - মানে, আত্মসমীক্ষা আত্মবিশ্লেষণ জাতীয় কথাবার্তা, তৃণমূলের পক্ষে যতটুকু সম্ভব, ততটুকুই আর কি।

তবে সেই রেজাল্ট দেখে আসল বিচলিত হবেন বুদ্ধিজীবী-বিচক্ষণ-বোদ্ধারা। বলার সুযোগ পেয়ে যাবেন, রাজ্যের পক্ষে বিজেপি বড় বিপদ। প্রাথমিক বিপদ বিজেপিই। অতএব, যেকোনও মূল্যে বিজেপিকে ঠেকাতে, ইত্যাদি প্রভৃতি... 

আর হ্যাঁ, এসবের মাঝে মিডিয়া শোনাতে থাকবে, এই রাজ্যের রাজনৈতিক ঐতিহ্য বলতে খুনোখুনি আর হিংসা। দায়ী বলতে প্রশাসন বা কোনও দল নয় - দায়ী আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, অশিক্ষা, দারিদ্র্য ইত্যাদি প্রভৃতি আর কিয়দংশে দুর্ভাগ্য। অনেকে বলবেন, আগে তো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না, থাকলে আরও অনেক খবর জানা যেত। এমনিতে এই রাজ্যের মিডিয়া চট করে তথ্যটথ্যর ধারপাশ মাড়ায় না - নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে চেপে যায়, জানি না - নইলে পরিবর্তনের আগের চৌঁত্রিশ বছরে রাজ্যে ঠিক কতগুলো পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি আর জেলা পরিষদ বিরোধীদের হাতে ছিল, এই সহজ তথ্যটুকু কেন যে কেউ খুঁজে দেখে না!! নাকি, উন্নয়নের স্বতঃস্ফূর্ত প্রবাহে বিরোধী শক্তি স্রেফ ভেসে চলে গেছে, একথা তাঁরাও বিশ্বাস করেন, কে জানে!

তো এভাবেই চলতে থাকবে।

পাপচক্র, দুষ্টচক্র, বিষচক্র - যা-ই বলুন - এই চক্র ভাঙা সহজ নয়।

হতাশ লাগে। আবার যাঁরা প্রতিরোধে সামিল হলেন, তাঁদের জন্য গর্বও হয়। ঘরকুনো মধ্যবিত্ত অপোগণ্ড হিসেবে এর বেশি আর কী-ই বা পারি!

শনিবার, ৮ জুলাই, ২০২৩

পঞ্চায়েত নির্বাচন ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


একটা সময় ছিল যখন শহরবাসী বাঙালির বেশিভাগের একটা দেশের বাড়ি থাকতো, সপ্তাহান্তে না হোক, বছরে অন্তত দুবার বাঙালি তার সেই দেশের বাড়ি ফিরে যেত। গ্রামের সাথে শহরের বাঙালির দেখা সাক্ষাৎ হত। ষাট এর দশকেও বাঙালির উপন্যাস চলচ্চিত্র, কবিতায় নাটকে একটা গ্রাম বাংলা থাকতো।


এর পরে প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই শহররায়ন হল। বাঙালি মধ্যবিত্ত মেট্রোপলিটন মননে গ্রাম বাংলার জায়গা সংকুচিত হতে থাকলো। শিল্পী হিসেবে নবান্নের ধানের গন্ধের সাথে রাত দেড়টায় মাচায় উঠে, "ভালো আছো বাংলা?" বলে ইকো চেম্বার নিয়ে চিৎকার করা ছাড়া আর কিছু বাকি থাকলো না। গ্রাম নিয়ে যাবতীয় খবরাখবর এর উৎস হয়ে পড়ে থাকলো লক্ষ্মীকান্তপুর বা ক্যানিং লোকাল থেকে আগত গৃহকর্মীদের সাথে গৃহিণীর অলস বিশ্রম্ভালাপ। টেলিগ্রাফ বা স্টেটসম্যানের পাতা ওলটানোর ফাঁকে গৃহকর্তার কানে যাওয়া সেই আলাপের ছেঁড়া টুকরো। গ্রাম বাংলা কেবল ফিরে আসে মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে পঞ্চায়েত ভোটের সময়। সত্তরের দশকের শেষ থেকে আশির দশকের শুরুতে জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে অশোক মিত্র, বিনয় চৌধুরীর নেতৃত্বে গ্রাম বাংলায় ঘটে যাওয়া পঞ্চায়েত নামক নিঃশব্দ বিপ্লব নিয়ে মধ্যবিত্ত শহুরে বাঙালি উদাসীন থেকেছে, বড়জোর গ্রাম থেকে আগত অপ্রাপ্তবয়স্ক গৃহ পরিচারিকার সরবরাহে ঘাটতি পড়ায় কিঞ্চিৎ বিরক্ত বোধ করেছে।

বার্কলে থেকে প্রণব বর্ধন একের পর এক গবেষণাপত্রে সংসদীয় বামপন্থীদের এই বিকেন্দ্রিকরণের মহত্তম এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে উচ্ছাসিত হলেও শিক্ষিত বাঙালির তাতে বিশেষ হেলদোল দেখা যায় নি। জ্যোতি বাবু ও তাঁর সহযোগীরা অতি দুঃস্বপ্নেও ভাবতে পারেন নি যে ফান্ড ফাংশন ফাংশানারির বিকেন্দ্রীকরণের তাদের এই প্রচেষ্টা ভবিষ্যতে জন্ম দেবে এক ফ্র্যাঙ্কনস্টাইনের। পঞ্চায়েত এর এই মধু ভান্ডারের স্বাদ পেতে মরিয়া হয়ে বাংলার বুকে এমন মুষল পর্ব দেখবে গোটা ভারত যে যদু বংশও লজ্জা পাবে। গণতন্ত্রের এই ধর্ষণ বোধ করি হিটলারকেও লজ্জিত করতো। বাংলার বুদ্ধিজীবী মহল জানে যে না তারা না কোনো পার্টির প্রথম সারির নেতা নেত্রী, কারুর গায়েই আঁচটি পরবে না এই গ্রামের নির্বাচনে। নির্বাচনের দিন ঘোষণা থেকে নির্বাচনের দিন, বড়জোর হপ্তা দুয়েক বাংলা জুড়ে একটা উন্মত্ততা চলবে, যেটা নজর আন্দাজ করলেই হল। এর পরেই জাতীয় বা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাবে রহিম শেখ বা রামা কৈবর্ত নামক শহীদদের কাহিনী। টিভির চ্যানেলে চ্যানেলের সান্ধ্য আসরে কেচ্ছা কাহিনীর অভাব হবে না।

বিবেক খুব কুটকুট করলে সোশ্যাল মিডিয়াতে একবেলার জন্য পবিত্র ঘৃনা উগড়ে দিলেই হবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পাশাপাশি বসবাস করা পরিবার গুলোর মধ্যে যে ঘৃণার রাজনীতির চাষ অনায়াসে অক্লেশে মানুষকে লাশ বানিয়ে ফেলছে, গ্রামীণ পল্লী সমাজে আমদানি করছে সন্দেহ অবিশ্বাস এর বাতাবরণ, ধ্বংস করে দিচ্ছে গরীব খেটে খাওয়া মানুষের ঐক্য, তাদের একে অন্যকে দাঁড় করাচ্ছে মুখোমুখি সংঘর্ষের আঙিনায় সে নিয়ে বাংলার বুদ্ধিজীবি সমাজের বিন্দুমাত্র মাথা ব্যথা নেই। আগ্নেয়গিরির শিখরে বসে নাগরিক বাঙালি বুদ্ধিজীবী পিকনিক করছে, বুঝতে পারছে না পঁচাত্তর হাজার গ্রাম বাঁচলে তবেই বাঁচবে বাংলা। বুঝতে পারছে না বাংলার সর্বনাশ হচ্ছে, হয়ে গেছে। 

"আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া গাছ ভেবেছিলাম
যার উদ্দেশ্যে ধ্রূপদী বিন্যাসে কয়েক অনুচ্ছেদ প্রশস্তি লিখেছিলাম
গতকাল বলাই বাবু বললেন, 'ঐটি বাঁদরলাঠি গাছ'।
অ্যালসেশিয়ান ভেবে যে সারমেয় শাবকটিকে
আমরা তিন মাস বক্‌লস পরিয়ে মাংস খাওয়ালাম
ক্রমশ তার খেঁকিভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝরণা কলম কবে ডট্‌ পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাবু কবে হেড অ্যসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের কবে সর্বনাশ হয়ে গেছে।"

বুধবার, ২৮ জুন, ২০২৩

জাহানারা ইমাম ~ আদৃতা মেহজাবিন

'হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউ ? ' কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন মা।

খুব অল্প বয়সী একজন আর্মি অফিসার দাঁড়িয়ে আছে, তার পেছনেই বহুজন। অনেকের উর্দু শুনে বোঝা যাচ্ছে তারা বিহারী।

অফিসারটি হাত তুলে একটু সালামের ভঙ্গি করে ইংরেজীতে বলল - আমার নাম ক্যাপ্টেন কাইয়ুম, আমরা তোমার বাড়িটা একটু সার্চ করব।
- কেন, কী জন্য?
- এমনিই একটু রুটিন সার্চ আর কি। তোমাদের বাড়িতে মানুষ কয়জন? কে কে থাকে? তোমাদের ছেলেদের নাম কি?
- রুমী, জামী ---
রাতটি ছিল ২৯ আগস্ট রবিবার। ১৯৭১ সন। দুই সন্তান সহ স্বামীকে ধরে নিয়ে গেল তারা।
মা সারারাত ঘর বার করেন। ওরা বলেছিল আধা ঘণ্টা পৌণে এক ঘন্টার মাঝেই ফিরবে তারা। কই ফিরল না তো! এইতো কাল ও রুমী ছিল হেসে হেসে বলছিল আম্মা জানো ' সেদিন আসার সময়েও রেডিওতে একটা গান শুনেছি, ' একবার বিদায় দে মা ঘুড়ে আসি' জানি না কপালে কী আছে!
যে সন্তানকে ইঞ্জিনিয়ার বানানোর স্বপ্ন দেখেছিলেন মা 'একদিন নিজেই তাকে বললেন ' যা তোকে দেশের জন্য কোরবানি করলাম। '

সেদিনই অন্য একটা গাড়ি এসে দাঁড়ায় রাস্তায়, দৌঁড়ে গিয়ে মা দেখেন, সে স্বপন। তুমি রুমীর বন্ধু স্বপন না!

এখুনি পালাও রুমী ধরা পড়েছে। এর পরে দরজায় আস্তে টুকটুক এসেছে আরো দুজন ' ফঁতে আর জিয়া। ' ধরে নিয়ে গেছে সামাদকে খবর দিতে এসেছে ওরা। ওদেরকেও দ্রুত চলে যেতে বলেন মা।

দুদিন কাটে আর দুটো বিনিদ্র রাত। এমপি হোস্টেল থানা সবখানে খুঁজে বেড়ান মা তার সন্তানদের আর স্বামীকে। রুমীদের সাথে ভাই সাইফ ইমামকেও ধরে নিয়ে গেছে হানাদারেরা।

ওদিকে টর্চার সেলে চলছে অন্য গল্প, রুমী বাবাকে বলে আপনারা কিছুতেই স্বীকার করবেন না। কোন কিছু, আমার যা হয় হোক।

৩১ আগস্ট ছোট ছেলে জামী সহ ফিরে আসে স্বামী শরিফ । সাথে রুমী নেই। আর্তচিৎকার করে ওঠেন মা।

রুমীকে ছাড়েনি?

স্বামী সন্তানের দিকে চেয়ে দেখেন ওদের মুখে গভীর যন্ত্রণা, দুঃখ আর অপমানের ছাপ। গ্লাস গ্লাস পানি খাইয়েও তাদের তৃষ্ণা মেটানো যায় না।
' যে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে 'রুমী ' মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছে। তাদের কাছে সন্তানের প্রাণ ভিক্ষা চেয়ে সন্তানের সম্মানকে নষ্ট করেননি যেই মা যে জননী
তিনিই আমাদের শহিদ জননী ' জাহানারা ইমাম।'
আজীবন সন্তানের জন্য দুঃখ বয়ে বেড়িয়েছেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান ' অসামান্য। '

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবীতে ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত করেন, ' একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। '

ক্যান্সারের সঙ্গে লড়েছেন বহুবছর। তবুও তার আন্দোলন থেমে থাকেনি। তার ডাকেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে লাখো জনতার উপস্থিতিতে একাত্তরের ঘাতকদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয় গণ আদালত।

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার সুন্দরপুর গ্রামে একদিন জন্ম হয়েছিল এই মহীয়সী নারীর। কলকাতার লেডি বেব্রোন কলেজ থেকে বি এ, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ করেছিলেন তিনি। ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী বালিকা বিদ্যালয়ের ছিলেন প্রধান শিক্ষিকা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা ইন্সটিটিউটে খণ্ডকালীন প্রভাষক ও ছিলেন তিনি।

সবাই তাকে বলতো বাংলার সুচিত্রা সেন। ক্যান্সারের কারণে সেই চুল বিসর্জন দিতে হয় তাকে। কেটে ফেলতে হয় মুখের একপাশের মাড়ি। উনার চুল কাটার খবর পেয়ে সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের বড় কন্যা
'নোভাও তার চুল কেটে ফেলে। '

হুমায়ূন আহমেদ তাকে একথা জানাতেই তিনি বলেন
- আপনার মেয়েকে বলুন ' লম্বা চুল আমার খুব প্রিয়।
তার বয়সে আমার হাঁটুর সমান চুল ছিল। ' এই মহীয়সী নারী সব মানুষের হৃদয় দখল করে নিয়েছিলেন।

জাহানারা ইমাম দুইবার জন্ম নেন না। একবারই তিনি এসেছিলেন আমাদের মাঝে ।

কি পরিমান শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জমা আছে উনার প্রতি, এই দেশের প্রতিটি মানুষের। সেটা কি তিনি কখনো বুঝতে পেরেছিলেন? হয়তো বুঝতেন তাই আবার তাদের নিয়েই আন্দোলনে নেমেছিলেন। আশার কথা এই যে সেই আন্দোলন থেমে থাকেনি।

১৯৯৪ সালের ২৬ জুন, আজকের এই দিনে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান। ওপাশের জগত থেকে আজ তিনি নিশ্চয়ই আমার বিপুল শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অনুভব করতে পারছেন। উনি নিজ সন্তান দেশের তরে কোরবানি দিয়েছেন। তিনি তো বঙ্গ-জননী।

বাংলার পবিত্র মাটিতে তার পায়ের চিহ্ন আর পড়বে না এটা ঠিক। তবে বাংলার হৃদয়ে তিনি জ্বেলে দিয়েছেন অনির্বাণ শিখা। ঝড়-ঝাপ্টা যত প্রচন্ডই হোক না কেন সেই শিখা জ্বলতে থাকবে।

' সৌভাগ্য আমাদের, তিনি জন্মেছিলেন এই বাংলায়।'

শুক্রবার, ২৩ জুন, ২০২৩

মেয়েদের জন্য - সম্পর্ক ও সুরক্ষা ~ সঙ্গীতা দাশগুপ্তরায়

আমরা মেয়েরা সবাই আসলে গলায় একটা দড়ি পরেই থাকি জন্মানোর পর থেকেই।  এ নিয়ে নিযুত কোটি  লেখালেখি আছে । কাব্যি না করে সোজা কথায় আসা যাক। একটা বাড়িতে যতগুলোই মেয়ে থাক, বাড়ির "পুরুষ" তাদের সুরক্ষা দেবে... এই কনসেপ্টটাই দড়ির প্রথম সুতো। 

বড় হতে হতে মেয়েদের মনে এটা  দেগে দেওয়া হয় যে সঙ্গে একজন পুরুষ থাকা জরুরী। ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে বা ফাঁকা জীবনের পথে এগোতে, ওই একই... একটা পুরুষ।  পনেরো বছর বয়সী দিদির সঙ্গে আট বছর বয়সী ছোট ভাইকে জুড়ে দেওয়া, যা , সঙ্গে একটা ব্যাটাছেলে  থাকা দরকার .. এ খুব স্বাভাবিক ছবি। একই ভাবে সঙ্গে একটা পুরুষ থাকলে রাস্তায় উটকো বিরক্তিকর নোংরামো কম সহ্য করতে হয় এও সত্যি।
আরও একটু বড় হলেই বিয়ে কর।  এটা খুব পরিষ্কার ভাবে দাগানো যে মেয়েরা বিয়ে করবে সুরক্ষার জন্য আর ছেলেরা বিয়ে করবে যাতে অফিস থেকে ফিরে গরম ভাত আর গুছোনো ঘর পায়। এই প্রসেসের মধ্যে যৌনতা  ইত্যাদি কো-অ্যাডভানটেজ মাত্র (কে না জানে পোষ্ট ম্যারেটাল যৌনতার মত ম্যাড়ম্যাড়ে ব্যাপার আর কিচ্ছু নেই। ও জিনিস দাঁত মাজা বাথরুমে যাওয়ার মতই শরীরটুকুকে রাখার জন্য করে থাকে মানুষ) 
এবার এই যে বিয়ে কর, সঙ্গে একটা পুরুষ চাই, এটা বাড়ির লোকেরা মেয়েটার ভালো চেয়েই বলতে থাকে। আমাদের দেশে অবিবাহিতা মেয়েকে ঘর ভাড়া অবধি দিতে চায় না লোকে।  অবিবাহিত মহিলার প্রতি সোসাইটির নজরও অতি তীক্ষ্ণ।  অবিবাহিতা মেয়ে  মা বাবার সঙ্গে থাকলে কিছু ছাড় পাওয়া যায় কারণ মেয়েটা মা বাবার সঙ্গে আছে ওদের দেখাশোনা করবে বলে। তাই বিয়েও করছে না। সরলীকরণের চূড়ান্ত। কিন্তু অবিবাহিতা মেয়ে একা ফ্ল্যাটে আছে মানেই... হুঁ হুঁ... 
মোদ্দা কথা ছোট থেকেই মেয়েদেরকে শিখিয়ে দেওয়া হবেই যে বড় যদি হতে চাও বউ হও  তবে।  বড় যদি হতে চাও সুরক্ষা কেনো চড়া দামে।
এবার, এই অঙ্ক সবার ক্ষেত্রে আজকাল খাটে না।  লক্ষ্মীমন্ত মেয়ের সাপ্লাই কমেছে গত কিছু বছরে। আবার এর মধ্যেই অনেকেই আবার এখনও ভালোবাসায় বিশ্বাস রাখে।  সেই বিশ্বাস একসময় অবসেশনের পর্যায়ে চলে যায়, জেদের দিকে টার্ন নেয়। যত ভালোবাসা তত বিশ্বাস আর  তত অলিগলি। 
কিন্তু বিশ্বাস ব্যাপারটাও লক্ষ্মীমন্ত মেয়ের সাপ্লাইয়ের মত, ঘাটতিতেই আছে। নিচে এই বিশ্বাস আর জেদের গোটা  উদাহরণ দিচ্ছি

১। বছর চারেকের প্রেম। দুজনেই মধ্যে তিরিশের। ছেলেটি  বার বার এদিক ওদিক প্যারালালি সম্পর্কে জড়িয়েছে। মেয়েটি জানতে পারে , ঝগড়া হয়, ছেলেটি সামহাউ কনভিন্স করে দেয় কেঁদে কেটে  হাতেপায়ে ধরে যে ওই মেয়েগুলোই ওকে ফাঁসায়। সে না বলতে পারে না। ভদ্রতা করতে গিয়ে ফাঁদে পড়েছে নাকি। মেয়েটির সন্দেহ নিরসন হয় না। কিন্তু একজন পুরুষ পাশে থাকলে নিশ্চিন্ত লাগে। একজন পুরুষ সঙ্গে থাকলে মেয়েটিকেও কম ফালতু কথা শুনতে হয়।  ইঙ্গিত টিঙ্গিত কম সহ্য করতে হয়। বাড়ির লোকেরাও নিশ্চিন্ত যে মেয়ে তাদের একা নেই... অতএব...  পলিগ্যামির সম্পূর্ণ দলিল মেয়েটি হজম করে নেয়। 

২। একটি পুরুষ একাধিক মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক করছে। মেয়েগুলো বুঝতে পারছে সব, জানতে পারছে। সবাই ভাবছে এই পুরুষটা আমার। সবাইকেই লোকটা বলছে তুমিই সব। গোপন রগরগে চ্যাট করে একজনকে বঁড়শিতে গাঁথছে আর অন্যজনকে বলছে তুমিই স্বর্গ তুমিই নরক। যে মেয়েটি বেশিদিন সঙ্গে আছে সে পুরুষটিকে বন্ধুদের মধ্যে নিজের স্বামী বলে পরিচয় দিচ্ছে, মাঝেমাঝে সিঁদুর পরে গেট টুগেদারে যাচ্ছে। প্রশ্ন করলে লাজুক হাসছে । থেরাপিস্ট প্রশ্ন করলে বলছে তাতে কি? রেখাও তো পরেন সিঁদুর। তাঁর স্বামী কে?  ওদিকে অন্য মেয়েটি যে টাটকা এবং  রগরগে চ্যাটের প্রভাবে ধরেই নিচ্ছে পুরুষটি তার, সে এই প্রথম মেয়েটির ওপর চড়াও হচ্ছে। প্রমাণ দেখিয়ে দেখিয়ে এস এস পাঠিয়ে মেয়েটিকে বলে দিচ্ছে দেখ, তোমার অমুক আমাকে ভালোবাসে...  শেষে দেখা যাচ্ছে মেয়ে দুটি একে অন্যের শত্রু হয়ে উঠছে প্রায় । পুরুষটি ততক্ষণে এই সব "হ্যাজ পোষায় না" মোডে গিয়ে তিন নম্বরের সঙ্গে হাত ধরে আইনক্সে।
মাঝখান থেকে এই মেয়েদুটো জেদের বশে পুরুষটিকে জয় করে শোকেসে সাজিয়ে রাখার যুদ্ধে মেতে নিজেদের ক্ষতবিক্ষত করছে।

আজকাল  পরকীয়া আইনসিদ্ধ হয়েছে জানি। তবে পরকীয়া মানে তো আইনতঃ যাকে ভালোবাসবে বলেছ তাকে ছেড়ে আর কাউকে ভালবাসছ। কিন্তু আইনের শিলমোহরের ভালোবাসার লোকটাকে ছাড়ছ না। 
তা প্রশ্ন হল এটা মেনে নেওয়ার জন্য আইনের হস্তক্ষেপ কেন? আর সেটাই কি যথেষ্ট? যে আইনের মোহর নিয়ে বসে আছে সে মেনে নেবে কি? তাকে কি আইন এটা মানতে বাধ্য করতে পারে?  না পারে না। কিন্তু তাকে আইন কিছু সুবিধা ভাগ করে নিতে বাধ্য করতে পারে । 
কী সেই সুবিধা? সে সুবিধা সুরক্ষার।  সঙ্গে থাকার ফিজিক্যাল সুরক্ষা। প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে দেওয়ার জন্য অর্থনৈতিক সুরক্ষা।
এরই মধ্যে মিডিয়া আমাদের দেখায় বিখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের এই সুরক্ষাকবচের কারণে নাচ গান, আনন্দ উৎসবের ছবি যা  আসলে কিছু  ভালোবাসার ব্যবসাদারদের অনেক বেশি সাহস আর সুযোগ জুগিয়ে চলেছে।
ফলে যেটা হচ্ছে সেটা হল  সহবাসের সাহস আর সুযোগ দুইই থাকছে। থাকছে ইচ্ছা এবং ইচ্ছার ব্যবহারও। শুধু যেটা আসলে আর থাকছে না সেটা হল ওইই, সুরক্ষা। না আইনি না বে আইনি। কোনো সুরক্ষাই নেই। 
এসব বোঝাতে গিয়ে দেখেছি কোনো কোনো মেয়ে অদ্ভুত ভাবে শক্ত হয়ে গিয়ে বিরোধীতা করে এই বলে যে সে সুরক্ষা চায় না। সে ভালোবাসা চায়। সে যা করছে "ভালোবেসে" করছে। 
এবার প্রশ্ন করি তা ভালো যে বাসছ এত তাও তোমার অমুক  আরও অন্য মেয়েদের পিছনে পড়ে আছে কেন?
তখন কেউ অসহায় কাঁদে কেউ ওই প্রথম পয়েন্টটাতে আটকে যায়। বিশ্বাস করে যে আসলেই লোকটি বড় ভদ্র আর তাঁর আশেপাশের মেয়েগুলো অত্যন্ত দুশ্চরিত্র, ছেনাল।

কেন? কেন? কেন? এই প্রশ্ন প্রচুর। কে কাকে কত সময় দিতে পারে এই প্রশ্নও প্রচুর। কিন্তু আমি যদি নিচের  প্রস্তাবটা দিই,   জানতে চাই  যে কতজন এটা দিনের পর দিন বছরের পর বছর করতে পারবেন তো এই প্রশ্নকর্তারা বাদে বাকি অনেকেই কিছু পজিটিভ বা নেগেটিভ উত্তর অন্তত দেবেন জানি।  
প্রস্তাবটা এমন -  
প্রত্যেক পাড়ায় একটা মহিলা মেন্টাল সাপোর্ট গ্রুপ তৈরি করতে চাইলে কে কার বাড়িতে  সপ্তাহে দুদিন এক ঘন্টা করে জায়গা দেবেন যাতে কিছু মেয়ে একসঙ্গে বসে শুধু একে অন্যের কথা শুনবে, ভেন্ট আউট করবে। এটা  কতজন অ্যাকোমডেট করতে পারবেন। লজিস্টিকস ভেবে এ প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে বাড়িতে একটা বসার জায়গা যেখানে ওই সময় আর কোনো ইন্টারাপশন থাকবে না এবং একটা বাথরুম , ব্যবহার যোগ্য। চা কফি না, গেট টুগেদার না। এটা জাস্ট সাপোর্ট গ্রুপ। চেনা অচেনা যে কেউ যারা সম্পর্ক নিয়ে যন্ত্রণায় আছে ডিলেমায় আছে অথবা এককালে যন্ত্রণা ও ডিলেমায় ছিল, আজ নেই কিন্তু তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করার জন্য ও শোনার জন্য সময় দিতে পারবে, এরাই যোগ দেবে সেখানে। 
মাঝেমাঝে এঁরা নিজেরা একটা ওয়ার্কশপ করবে যাতে তাঁরা অ্যালার্মিং বিহেভিয়ার ডিসকাস করা হবে। সেই ডিসকাসনের থেকে উঠে আসা তথ্য আরও বহু মেয়েকে সেটা শেখাতে পারবে।  না, কোনো চা কফি শিঙারা সেলফি নেই। শুধু মেন্টাল হেলথ-এর কারণে একজায়গায় জড়ো হওয়া। এবং অবশ্যই সেখানে যা আলোচনা হচ্ছে সেটাকে রসালো গসিপ হিসেবে আর কোথাও না জানিয়ে ১০০% সিক্রেসি মেনটেন করা।
এই প্রস্তাবটা শুনতে ভাল কিন্তু টানা কিছুদিন ধরে  বাস্তবায়িত করা প্রায় অসম্ভব  । কারণ মেয়েরা নিজেরাও নিজেদের মেন্টাল হেলথ ব্যাপারটাকে প্রায়োরিটি লিস্টের একদম শেষে রাখতে অভ্যস্ত। সমাজও তাই চায়, সংসারও তাই চায়। অতএব মেয়েরাও তাইই চায়। সে তো সমাজ সংসারের বাইরে নয়! এর জন্য কাউকে দোষ দেওয়ার নেই।  তবু চেষ্টা করা যেতে পারে।  যদিও এই চেষ্টায় বহু বাধা থাকবে। 
ফেসবুকেই বেশ কিছু এই ধরণের গ্রুপ আছে । সেখানে কিছু মেম্বার অ্যাকটিভ কিছু রিঅ্যাকটিভ কিছু প্রোঅ্যাক্টিভ। তবে সমস্যা হল নিজের সমস্যার কথা খোলাখুলি লিখে বসে থাকাটা  আসলে আলোচনা নয়। ওতে সমাধান যদি বা ২০ শতাংশ আসে, ভয় আসে সঙ্গে ৫০ শতাংশ । এই বুঝি সেসব লেখার এসএস বাজারে বার করে দিল।  এই বুঝি কেউ ফেক প্রোফাইলের আড়ালে বসে সব পড়ে ফেলল।  ফলে যারা লেখে তারা খুব সাহসী না হলে অ্যাননিমাস আইডেন্টিটির আড়ালে লেখে।  অর্থাৎ যেখানে গিয়ে সাহস খুঁজছে আশ্রয় খুঁজছে সেখানেও কাউকে বিশ্বাস করতে ভয় পাচ্ছে।  এই ভয়টা স্বাভাবিক। কারণ মানুষগুলো সবাই অচেনা। সেক্ষেত্রেও একঝাঁক অচেনা মানুষকে বিশ্বাস করার বদলে একজন অবিশ্বাসীকে আঁকড়ে থাকার মধ্যে স্বস্তি।
এগুলো সব আমার ব্যক্তিগত অবজার্ভেশন এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অভিজ্ঞতা থেকে লিখলাম। এ বিষয়ে হয়ত একটা বই লিখে ফেলার মত রসদ আমার কাছে আছে। তবে আপাতত আজ এই অবধিই। এইসব শব্দের মধ্যে নিজেকে যদি ১০% ও পেয়ে থাকেন তো প্লিজ কথা বলুন। নিজের সঙ্গে বলুন, নিজের প্রিয়জনের সঙ্গে বলুন। আর হ্যাঁ । সম্পর্ক যদি সুরক্ষার কারণে করে থাকেন তাহলে জানবেন সুরক্ষাটা আইনি শিলমোহরের। তাহলে সেব্যাপারেও কিছুটা জেনে রাখুন প্রত্যেকেই।  

নিচের লেখাটুকু আমি শতাব্দী দাশের লেখা থেকে তুলে দিলাম। এক দুটো লাইন নিজের মত জুড়েছিও

১৯৭৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের এক রায় অনুসারে *বিষমকামী* লিভ-ইন ভারতে বৈধ, যদি তা
১) পরস্পরের সম্মতিতে হয়। 
২) সম্মতির বয়স পাত্র-পাত্রীর হয়ে থাকে।
৩) তারা মানসিক ভাবে সুস্থ হয়।

আলাদা করে লিভ-ইন সংক্রান্ত কোনো আইন ভারতে নেই। হওয়া উচিত, কিন্তু নেই। তার অবর্তমানে আপনাকে বিয়ে-সংক্রান্ত আইনগুলিই মনে রাখতে হবে। তবে তা বিচারকের 'ইন্টারপ্রিটেশন'-এর মুখাপেক্ষীও বটে। 
আদালতে, বাস্তবক্ষেত্রে আমরা দেখি, লিভ-ইন প্রমাণ করতে অসুবিধে হচ্ছে। কী কী ভাবে আদালতে লিভ-ইন প্রমাণ করা যায়?

১) যৌথ ছবি। (ছবি তুলতে সঙ্গী আপত্তি করলে সন্দেহজনক।)
২) প্রতিবেশীরা দীর্ঘ সময় ধরে তাদের একসাথে থাকতে, খেতে, বসতে, শুতে দেখেছেন। (এই স্বাভাবিকতায় এক পক্ষের আপত্তি থাকলে তা সন্দেহজনক)
৩) কিছু কাগজপত্র, যেমন জয়েন্ট ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কোনো সম্পত্তি ক্রয় বা ভাড়ার নথিতে একসঙ্গে দুজনের নাম ইত্যাদি। (ভেবে দেখুন, কাগজপত্র এড়িয়ে রাষ্ট্রকে টেক্কা দেবেন ভেবেছিলেন, কিন্তু রাষ্ট্রের আইন আবার, আপনার সঙ্গে অপরাধ হলে, প্রথমে কাগজপত্রই দেখতে চাইবে। ম্যারেজ রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেটের বদলে অন্য রকম কাগজপত্র, এই আর কী। যাইহোক, কাগজপত্র একসাথে রাখতে না চাইলেও তা সন্দেহজনক। আবার রাখাটাও রিস্কি বিশেষ করে সম্পত্তির ব্যাপারে)

৪)  আপনি কি কোনো বিবাহিত পুরুষ বা নারীর সঙ্গে থাকছেন? তাহলে লিভ-ইনের বৈধতা প্রথমেই নাকচ হবে। ঠিক যে কারণে বিবাহিত অবস্থায় অন্য বিয়ে অবৈধ, সেই কারণেই বিবাহিত অবস্থায় লিভ ইন-ও অবৈধ। এমন লিভ-ইন করার জন্য শাস্তি কেউ পাবে না কারণ অ্যাডাল্টারি আইন উঠে গেছে। কিন্তু আপনার সম্পর্কটি আর বৈধ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নয়। 
এবার, যে মুহূর্তে সেটি আর বৈধ অন্তরঙ্গ সম্পর্ক নয়, সে মুহূর্তে কোনো একজনের উপর ঘটা ভায়োলেন্স এমনিই ভায়োলেন্স। ডমেস্টিক ভায়োলেন্স নয়। ৪৯৮এ-র আওতায় তা আসবে না। ডমেস্টিক ভায়োলেন্স অ্যাক্টের আওতাতেও না৷ উত্তরাধিকার, সন্তানের স্বীকৃতি এসব তো মরীচিকা। হ্যাঁ, আপনি খুন হলে সঙ্গী হয়ত ফাঁসবে। কিন্তু খুনের চেয়ে সামান্য গৌণ অপরাধে সহজেই ছাড় পাবে। 

বিশেষ অনুরোধ - এই লেখাটা সম্পূর্ণ ভাবেই মেয়েদের সুরক্ষার কথা ভেবে লেখা। এই লেখার নিচে এসে "কিন্তু ছেলেদের সুরক্ষা?" অথবা "ছেলেদেরকেও কত ভাবে মরতে হয় তার খবর কে রাখে?" টাইপের মন্তব্য করবেন না। সে নিয়ে আবার কখনও নিশ্চই লিখব। তবে এই লেখাটায় ভুলভাল তর্ক শুরু করে সময় নষ্ট করবেন না। তা করলে ধরে নেব আপনার বাড়ির দেওয়ালে ঘুন ধরলে আপনি ঘুনের ট্রিটমেন্ট করে বাড়ি বাঁচান না, উল্টে মাটির বাড়ির দেওয়ালেও কত সমস্যা হয় সেই নিয়ে তর্ক করতে বসেন। অনুরোধ করব অকারণ তর্ক না জুড়তে।

সংশোধন - বন্ধুদের কমেন্ট থেকে জেনে ভুল শুধরালাম
১. বহুগামিতা আইনতঃ সিদ্ধ ; ভূল কথা। এই লেখা টা পুরোটা পড়লেই পাঠক দেখবেন, তা নয়। মহিলাদের হাতে কোনোদিন ক্ষমতা ছিল না তাঁরা পুরুষদের কোনরকম আইনতঃ শাস্তির ব্যবস্থা করবেন বহুগামিতার জন্যে। ডিভোর্স নিতে পারতেন এই গ্রাউন্ড এ। যেটা এখনও সম্ভব।হ্যাঁ, পুরুষরা বিবাহিত মহিলার প্রেমিকের বিরুদ্ধে মামলা আনতে পারতেন কিন্তু সেই আইন বদলেছে। বাঁচা গেছে! বহুগামিতা আইনসিদ্ধ হয় নি।
২. ৪৯৮ এ ধরনের ধারা কেউ live in এ কখনই ব্যবহার করতে পারবে না। ওটা প্রযোজ্য dowry related violence এ। তাই ভুলভাল বুঝিয়ে লাভ নেই। লিভ ইন এর পুরুষ married কি unmarried কিছু এসে যায় না ৪৯৮ এ র জন্যে। PWDVA অ্যাপ্লিকেবল ইন লিভ ইন রিলেশনশিপ।
বাকি, মেয়েদের অন্য মেয়ের ওপর রাগ না করে পুরুষদের খেলাটা বোঝা উচিৎ, সে আর বলবার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই মেয়েরা পুরুষটির ভাষ্য বিশ্বাস করে, কোমর বেঁধে ঝগড়ায় নেমে পড়েন। সোশ্যাল মিডিয়াতে বা জীবনে। আর এখানেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের জয়।

বৃহস্পতিবার, ১ জুন, ২০২৩

ব্রিজভূষণ ও বিজেপি ~ বিহঙ্গ দত্ত

বিজেপি কেন ব্রিজভূষণকে রেসলিং ফেডারেশনের সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দিচ্ছে না?  

তার নামে যে যে মারাত্মক অভিযোগ এসেছে তাতে প্রতিটা মনুষ্যপদবাচ্য রাজনৈতিক দলেরই উচিত তদন্ত চলাকালীন তাকে সবরকম সাংবিধানিক পদ থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেওয়া। অন্তত গণতন্ত্রের চূড়ান্ত লোকদেখানো ধাঁচাতেও এইটাই দস্তুর। তারপরেও এ কাজ না করার পেছনে কয়েকটি কারণ আছে। এক এক করে দেখা যাক। 


১) তিনি উত্তরপ্রদেশের কাসরগঞ্জের সাংসদ। টানা ছয়বার জিতেছেন। ২০০৮ সালে স্বয়ং বিজেপিই এনাকে আস্থা ভোটে ক্রস ভোটিং করার জন্য বহিষ্কার করে। তখন তিনি সমাজবাদী পার্টিতে যোগদান করেন। ৯-এ সমাজবাদী পার্টির সাংসদ হন। ১৪-এ আবার ফিরে আসেন ভাজপা-য়। সুতরাং এটুকু বোঝা যায় উত্তরপ্রদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে তিনি একজন বিগ ফিশ। 

২) কতটা বিগ ফিশ বুঝতে গেলে তার ট্র্যাক রেকর্ডের দিকে তাকাতে হবে। তিনি বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ঘটনায় প্রাইম সাসপেক্ট লিস্টে ছিলেন। সঙ্গীরা হলেন লালকৃষ্ণ আদবানী, মুরলি মনোহর যোশী প্রমুখ। শুধু কাসরগঞ্জ নয় উত্তরপ্রদেশের আরও বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে তার রাজনৈতিক দাপট অব্যহত। 

৩) এই রাজনৈতিক দাপট কীভাবে হল? অর্থনৈতিক ও মাসল পাওয়ার দুইয়েরই ভূমিকা আছে। ব্রিজভূষণ একটি প্রতিষ্ঠানও বটে। উত্তরপ্রদেশে অন্তত ৫০টি বেসরকারি স্কুল চলে তার মালিকানায়। বেশ কিছু টেকনো কলেজ ও গমকলের মালিক তিনি। ব্যক্তিগত প্রাসাদোপম বাড়ি, গাড়ি, জমি জায়গার ছড়াছড়ি এমনকি রয়েছে হেলিকপ্টারও। 

৪) এই প্রভাব শুধু রাজ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গোয়া বিধানসভা নির্বাচনে তিনজন ভিন্ন দলীয় বিধায়ক কেনার ব্যাপারেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। 

৫) কাহানি মে ছোটাসা টুইস্ট। এহেন ধুঁয়াধার ব্যক্তিত্বের সঙ্গে যোগী আদিত্যনাথের সম্পর্ক মোটেও সুবিধার নয়। দুইয়ের মধ্যে ভালোই ক্যাচাল আছে যা সুবিদিত। তারপরেও ব্রিজভূষণকে টলানো যায়নি। তিনি তার রাজত্ব কায়েম রেখেছেন। তার যোগাযোগ সরাসরি কেন্দ্রীয় দপ্তরের সঙ্গে। এখান থেকেই হয়তো বোঝা যায় কেন তিনি বারবার উল্লেখ করছেন- নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ না বললে তিনি পদ ছাড়বেন না। 

এই চূড়ান্ত পাওয়ারফুল ব্যক্তিত্বকে ২৪-এর আগে চটানো বিজেপির পক্ষে বিপজ্জনক। অযোধ্যার রামমন্দিরের প্রধানতম সৈনিকের সেন্টিমেন্ট জড়িয়ে আছে ওনার নামের সঙ্গে। 

এবার একটু দ্বিতীয় চ্যাপ্টারে আসুন। কুস্তি ফেডারেশন নামেই ভারতীয়। এই ফেডারেশনের সুপারস্টাররা সকলেই উত্তর ভারতের যে অঞ্চল বিজেপির একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের শান মান বলে চিহ্নিত করা হয় সাক্ষী মালিক, বজরঙ্গ পুনিয়াদের। কুস্তি ভারতে একেবারে আনপপুলার স্পোর্টস ভাবলে আপনি মূর্খের স্বর্গে বাস করছেন।  হরিয়ানার ক্ষেতি করা ছেলেপুলে যতটা কোহলি বা ধোনি হতে চায় ঠিক ততটা না হলেও অনেকটাই বজরঙ্গ পুনিয়া, বা সুশীল কুমার হতে চায়। ভীনেশ ভোগট বা সাক্ষী মালিক হতে চায়। 
(সুশীল কুমার নামটি বর্তমানে ভয়াবহভাবে পরিত্যাজ্য। কেন তাও জানেন আপনারা। একাধিক নারী নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ইনি। অথচ কি অসাধারণ রেস্টলার ছিলেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্র ক্রীড়াক্ষেত্রের অবিস্মরণীয় ভূমিকার স্বাপেক্ষেই এই নাম রাখলাম। আজ যখন বজরঙ্গ- সাক্ষী, ভীনেশদের সঙ্গে এক রাস্তায় এক মঞ্চে মার খাচ্ছেন তখন সুশীলকে দেখে ঘেন্না ছাড়া আর কিছু পায় না। )
 সুতরাং নিজেদের ক্ষমতার কেন্দ্রের  সুপারস্টারদের চূড়ান্তভাবে হেয় করার সাহস কীভাবে বিজেপি পাচ্ছে? 

এখানেই বিজেপি ফ্যাসিস্ট। ক্লাসিক অর্থে ফ্যাসিস্ট। সে ফ্যাসিজমের সবকটা শর্ত এক এক করে পূরণ করছে। পপুলার যা সব প্রচার সে গত পাঁচ ছয় বছরে করেছে। ফ্যানবেস তৈরি করেছে। আরএসএসের মাধ্যমে সে সেই মাসের কাছে নিজের মতাদর্শ নিয়ে গেছে। সব মাস এই মতাদর্শের সঙ্গে থাকেনি। তাতে তার কিছু যায় আসেনি। সে এবার দ্বিতীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। 

"এক লাখ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হওয়ার থেকে বেশি দরকারি দশ হাজার এমন সৈনিক তৈরি করা যারা দশ লাখকে ঠাণ্ডা রাখতে সক্ষম"। 
বিজেপির হাতে এরকম অযুত নিযুত সৈনিক আছে। তারা রাতদিন সাতদিন চায়ের দোকান থেকে সোশাল মিডিয়ায় খেটে যায়। এই কর্মীদের দেখা পেতে গেলে সাক্ষী মালিকের আজকের টুইটার যান। রিপ্লাইগুলো দেখুন। অত খাটতে না চাইলে ইনস্টাগ্রাম বা ফেসবুকের যে কোনও নিউজ পোর্টালের কমেন্টবক্সে যান। আর অন্য বিশ্ব দেখতে চাইলে পাড়ার চায়ের দোকানে দুটো বিড়ি আর এক কাপ চা নিয়ে বসে পড়ুন। দেখবেন সবকিছু পার করে 'ওদের খুব বাড় বেড়েছে' ধ্বনিই কানে আসবে। 

এই সৈন্যদল দিয়ে সবকিছু সাফ করে দেওয়া যায়। শালা, দু আনার এক বনগাঁর ক্ষেপুড়ে দেখলাম আজ এবিপির কমেন্টবমক্সে গিয়ে লিখেছে- এরা পলিটিকাল প্লেয়ার। যখন উঠেছে ব্রিজভূষণজির ব্যাক আপেই উঠেছে। আমাদের পেছনে পলিটিক্স ছিল না।'
 ওটারে আমি বনগাঁ স্টেডিয়ামে বল বয় ছাড়া কোনওদিন কোনও রোলে দেখিনি। সেও আজ অবলীলায় সাক্ষী মালিক, বজরঙ্গ পুনিয়াদের পলিটিকাল প্লেয়ার ঘোষণা করছে। অবলীলায়। আয়নাও দেখে না সোগো!   

তো দোস্তো! এই হল ব্যাপার। ফ্যাসিজম যখন ফুটে ওঠে এভাবেই ওঠে। ৩০-৪০ বছর পর এই নিয়ে ইতিহাস লেখা হবে। কোন ইতিহাস সেটা এন-ই-পি সমৃদ্ধ বাচ্চারা বলবে। যদি ট্রেণ্ড সেম টু সেম চলতে থাকে তাহলে আপনারা সাক্ষী মালিকের নাম সাক্ষী ইয়াসমিনও পড়তে পারেন ইতিহাস বইতে।

শুক্রবার, ২৬ মে, ২০২৩

পুনরুত্থান ~ বিপুল দাস

এক
অনেকগুলো রাশিয়ান শব্দ শিখেছিলাম। দু'চারটে ছোট ছোট বাক্যও বলতে শুরু করেছিলাম। মুখের ভেতরে জিভের ডগায় শব্দগুলো বসিয়ে নাড়াচাড়া করার সময় আমার শরীরে এক রকম পুলক তৈরি হত। টের পেতাম অজানা একটা সুখ আমার শরীরকে দৃঢ় করে তুলছে। আমাদের বাক্যবিন্যাসে অনভ্যস্ত ওই শব্দগুলো বারে বারে উচ্চারণ করতে আমার ভালো লাগত। স্বীকার করতে লজ্জা নেই – একটু যেন যৌন উত্তেজনাও হত।
রাশিয়ান এক্সপার্টদের হস্টেলের জন্য কারখানার হিসেবনিকেশের দপ্তর ছেড়ে কেয়ার-টেকারের কাজটা আমি করব কিনা জানতে চাইলে উত্তেজনায় প্রথমে আমি কিছুই বলতে পারিনি। আহা, আমার সেই স্বপ্নের দেশের মানুষগুলোকে আমি কত কাছাকাছি পাব। ওদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পাব। মাইনিং অ্যান্ড অ্যালায়েড মেশিনারির দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ওরা এই শিল্পনগরীতে এসেছে। এতদিন কারখানায় আসাযাওয়ার পথে ওদের হস্টেলটা দেখতাম। একজন দুজন রাশিয়ানকে দেখতাম। আমার বুকের ভেতরে শিরশির করত। এরা সেই মহান দেশের নাগরিক। আমার স্বপ্নের দেশ। ইউনিয়ান অফ সোভিয়ত সোশ্যালিস্ট রিপাবলিক।
আমাদের পাড়ার শৈলেন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারে সোভিয়েত দেশ পত্রিকা রাখা হত। সোভিয়েত নারীও। আমি লাইব্রেরিয়ান শিশিরকাকুকে বলে আমার মায়ের জন্য পুরনো সোভিয়েত নারী বাড়িতে নিয়ে আসতাম। সেখানে সোয়েটারের ডিজাইন, মহান অক্টোবর বিপ্লবে বীরগতিপ্রাপ্ত শহীদদের মায়ের অবদান, লেবু জারানো, গোলরুটির গল্প থাকত। আস্ত্রাখান টুপি, গালোশ, সামোভার – এসব শব্দ শিখছিলাম। ইভান, পাভেল, ভানিয়া, কাতিয়া – এসব ছিল চরিত্রদের নাম। গোগ্রাসে গিলতাম।
লাইব্রেরিতে সোভিয়েত দেশ খুব একটা কেউ পড়ত না। বরং 'কালনাগিনীর প্রতিহিংসা' কিংবা 'মরণগুহার ভয়ংকর' খোঁজ করেও পাওয়া যেত না। আমার কিন্তু সোভিয়েত দেশ ভালো লাগত। কী মসৃণ ঝকঝকে কাগজ, কী সুন্দর রঙিন ছবি। তখন অন্য কোনও পত্রিকায় রঙিন ছবি প্রায় দেখাই যেত না। নতুন পত্রিকা এলেই আমি প্রথমে পৃষ্ঠা খুলে গন্ধ শুঁকতাম। কাগজ থেকে, অক্ষর থেকে রাশিয়ার বাতাস ফুসফুস ভরে টেনে নিতাম। বুকের ভেতরটা বিশ্বাসে ভরে উঠত। মনে হত আমার শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে লেনিনগ্রাদ, মস্কো, বাকু, আজারবাইজান, তাসখন্দের বাতাস। আমি গভীরভাবে বিশ্বাস করতাম পৃথিবীর ভেতরে শ্রেষ্ঠ দেশ হচ্ছে ইউ এস এস আর। পত্রিকায় এক একজন লেখকের নাম খুঁজে পাই, লাইব্রেরি থেকে তাদের বই খুঁজে নিয়ে পড়ি। বাংলায় অনুবাদ। তুর্গেনিভ, গোগোল, তলস্তয়, দস্তয়েভস্কি। নিকোলাই অস্ত্রয়েভস্কির 'ইস্পাত' পড়ে তো দু'রাত ঘুমই হল না। আমারও ইচ্ছে করত মাতৃভূমি না বলে আমাদের দেশকে পিতৃভূমি বলে ডাকতে। সেই লেনিনগ্রাদ থেকে ভারখায়ানস্ক – পৃথিবীর আদ্ধেকটা জুড়ে তো ওরাই রয়েছে। যুদ্ধ হলে শুধু একটা বোতাম টিপবে, আমেরিকা ফিনিশ।
এম এ এম সিতে আমি পাঁচ বছর চাকরি করেছিলাম। তখন সেই শিল্পনগরীতে যারা এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি করত, তাদের এক ধরণের কুলীনকুলসর্বস্বতা ছিল। কোনও সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজের প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারণ করার সময় কন্ঠ থেকে ঝরে পড়ত নিয়ন্ত্রিত আভিজাত্য। অন্যান্য সেক্টরের মানুষদের চোখে স্পষ্টই টের পেতাম সম্ভ্রম, ঈর্ষা, হয়তো বেদনাও। ঘাড়ের রোঁয়া ফুলে উঠত আমার। ভাগ্যিস চাকরিটা এখানেই পেয়েছিলাম। রিজিওন্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ তখনও এন আই টি হয়নি। এত প্রাইভেট কলেজ ছিল না। কোপার্নিকাস মার্গের কোয়ার্টারে মাকে নিয়ে থাকি। মামড়া মোড়ের ও দিকটায় শালের জঙ্গল। কম্যুনিটি হলে পথের পাঁচালি, পঁচিশে বৈশাখে ডাকঘর। জি টি রোডে ডিভিসি মোড়ের কাছে ঘন অরণ্য। পুরনো কোনও মন্দিরের গল্প একদিন কলিগের মুখে শুনলাম। বললাম – চল নিয়োগী, একদিন দেখে আসি। চারু নিয়োগী আমাকে ডাকাতের ভয় দেখাল।
লোহা এবং ইস্পাত শিল্পের জন্য দুর্গাপুর ছিল আদর্শ জায়গা। শ্রমিক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আকরিক, জ্বালানি – এ সবই ছিল সমাধানযোগ্য। এই বিশাল কর্মকান্ড অনবরত সচল রাখার জন্য চাই নিরবচ্ছিন্ন কাঁচামাল আর জ্বলানির সরবরাহ। আকরিক সংগ্রহের জন্য চাই আধুনিক যান্ত্রিক ব্যবস্থা। মাইনিং-এর স্বয়ংসম্পূর্ণ পরিকাঠামো ছিল আমাদের। যন্ত্রপাতি বানানো, সারানো এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়ে রাশিয়ান ইঞ্জিনিয়াররা আমাদের কারখানায় এসেছিল। তখন নতুন ভারত গড়ার লক্ষ্যে বন্ধুত্বের হাত সবার আগে বাড়িয়ে দিয়েছিল যে দেশ, তার নাম সোভিয়েত রাশিয়া। ওদের দেখলেই আমার শৈলেন্দ্র স্মৃতি পাঠাগারের কথা মনে পড়ত। সোভিয়েত দেশ পত্রিকা, পুশকিনের কবিতা, গোগোলের 'ওভারকোট' গল্পের কথা। রাতের আকাশে তাকালে চাঁদ কিংবা তারা নয়, আমার মনে পড়ত গাগারিনের নাম। যেদিন এক্সপার্ট হস্টেলে ওদের দেখাশোনার দায়িত্ব পেলাম, মনে হল আমিও বোধহয় পৃথিবীর টান অগ্রাহ্য করে মুক্তিবেগ অর্জন করেছি।
মাত্র দু'বছর ছিলাম হস্টেল তদারকিতে। অনেকগুলো রাশিয়ান শব্দ শিখেছিলাম। বচন এবং কালভেদে ক্রিয়াপদের তারতম্য বুঝতে শুরু করেছিলাম। ছোট ছোট বাক্য বলতে পারি। হসন্ত এবং ৎ-প্রধান ওদের শব্দগুলো নিয়ে মুখের ভেতরে নাড়াচাড়া করার সময় এক রকম বিশ্বাস ও সুখমেশানো লালায় শব্দগুলো পিচ্ছিল হতে থাকে। শব্দগুলো গিলে ফেলি। শব্দগুলো আমি হজম করতে চাই। শরীরে রক্তের সঙ্গে মিশে যাক আ বে ভে গে দে। বর্ণমালার অক্ষরসমূহ। বিশ্বকর্মানগরে কী দুরন্ত কর্মকান্ড চলে দিনরাত। ওদিকে স্টিল প্ল্যান্টের কাজ, এদিকে মাইনিং-এর উপযোগী, সহায়ক যন্ত্রপাতি তৈরি। আরও উন্নত যন্ত্র তৈরির নকশা, তৈরি যন্ত্রের পরীক্ষা, রক্ষণাবেক্ষণ, সেগুলো চালানোর ট্রেনিং। সে এক দুরন্ত সময়। সমস্ত ভারতবর্ষের নজর আমাদের এই শিল্পনগরীর দিকে। আশপাশের কোলিয়ারি থেকে রোজ টন টন কয়লা ঢুকছে। রাতে ফার্নেসের আলো দেখা যায় কতদূর থেকে। আকাশ আগুনের আভায় হলদে হয়ে থাকে। লোহা গলে তরল আগুন হয়ে গড়িয়ে যায় লাভাস্রোতের মত।
আমাদের ব্যাপার আলাদা। কী সুন্দর আমাদের কারখানা, অফিস-বিল্ডিং। অফিসের চারপাশে কী চমৎকার ফুলের বেড। দেখাশনা করার জন্য মালী রয়েছে। সারা বছর ওরা ফুল ফোটায়। অফিসের বাইরে কী অসাধারণ নক্‌শা করা আমাদের কর্পোরেশনের মনোগ্রাম। কী দারুণ ক্যালেন্ডার হয় আমাদের। এম এ এম সি'র ক্যালেন্ডারের জন্য সবাই হামলে পড়ে। কারও ঘরের দেয়ালে আমাদের ক্যালেন্ডারের শোভা যেন তার টুপিতে আরও একটা পালক গুঁজে দেয়। আমি বাঁকুড়ার সোনামুখীর ছেলে, এখানকার গরম গায়েই লাগত না। কোপার্নিকাস মার্গ থেকে এসে অফিসে ঢোকার সময় ওই প্রতীক চিহ্নের দিকে তাকালে বুকের ভেতরেও যেন ওই রকম একটা খাঁজকাটা চাকা ঘুরত। চাকা বয়ে আনত সুসময়ের বাতাস, চারদিকে সুলক্ষণ দেখতে পেতাম। সন্ধেবেলা ফার্নেসের-আভায়-উজ্জ্বল আকাশের দিকে তাকালে মনে হত স্বয়ং বিশ্বকর্মার মুকুট থেকে দিব্যজ্যোতির প্রকাশ যেন ওই আলোকবিভা। হঠাৎ মনে পড়ত দারোফা মানে পথ, কাক ভাস্‌ জাবুৎ মানে তোমার নাম কী।
আমার পলিটেকনিক ডিগ্রির সুবাদে একটা সরকারি চাকরির ইন্টারভিউ-এ ডাক পেয়েছিলাম। বেশ উঁচু পদ ছিল সেটা। সেখানেও, হয়তো এই এম এ এম সি'র অভিজ্ঞতাবাবদ ভালো নম্বর যোগ হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে ইন্টারভিউ বোর্ডের তিনজনই বোধহয় অবাক হয়েছিল আমাকে এখানে দেখে। চাকরিটা পেলে আমি করব কি না – ওরা জানতে চেয়েছিল। আমার কোনও উপায় ছিল না। আমার বিধবা মায়ের চোখের জল, দধিমুখ্যা গ্রাম থেকে আমার গার্জিয়ান মেজোকাকার সংশয় ও সতর্কবার্তা এবং সরকারি চাকরির দিকে মধ্যবিত্ত মানসিকতাজাত বিশ্বাস – দারোফা, পুশকিন, গাগারিন, আমাদের কর্পোরেশনের সেই বিখ্যাত প্রতীকচিহ্ন থেকে আমাকে উপড়ে নিল। আমি রাতে লুকিয়ে কাঁদলেও ইন্টারভিউ বোর্ডে হাসি হাসি মুখে বলেছিলাম – উইথ প্লেজার, স্যার। তখনই মনে পড়েছিল ডিজাইনের দিমিত্রিভ বলেছিল আমাকে একটা ইংলিশ টু রাশিয়ান ডিকশনারি উপহার দেবে। ইন্টারপ্রেটর শেভচেঙ্কোর বউ একদিন প্রচুর মদ খেয়ে আমার গলা জড়িয়ে বলেছিল – মিশ্‌রা, ইয়া তেব্যা ল্যুভল্যু। আমি বোকা বোকা মুখে শেভচেঙ্কোর দিকে তাকালে সে আমাকে চোখ টিপে বলেছিল এই বাক্যের অর্থ আমাকেই বুঝে নিতে হবে।
দুই
আমি প্রথমে বুঝতেই পারিনি পেটমোটা ব্রাউন পেপারের বড় এনভেলাপের ভেতরে অত টাকা রয়েছে। আমি তখন শিলিগুড়ির ডিভিশনাল অফিসে। দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রশাসক হিসেবে ডিভিশনে তো বটেই, মহাকরণে আমার দপ্তরের মন্ত্রীর সুনজরে আছি – এ রকম খবর আমার কাছে ছিল। মন্ত্রীর খাস লোক – এই প্রচারে আমার লাজুক হাসির একটা সস্নেহ প্রশ্রয় ও সম্মতি ছিল। ফলে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি ওজন নিয়ে আমি অফিসে ওয়ার্ক-অ্যাসিস্ট্যান্ট থেকে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার, ওদিকে চুনোপুটি থেকে রাঘববোয়াল ঠিকাদারদের কন্ট্রোলে রাখছিলাম।
ফাইল সই করতে করতে হঠাৎ কোনও দিন জানালা দিয়ে বাইরের লাল কৃষ্ণচূড়ায় ভরে থাকা গাছের দিকে তাকিয়ে মনে পড়ে শিশিরকাকুর কথা। ইস্পাত, ক্রাইম অ্যান্ড পানিশমেন্ট, ব্রাদার্স কারামাজভ, ওভারকোট, অক্টোবর বিপ্লব, সোভিয়েত ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়া। মাঝে মাঝে মনে হয় তা হলে আমেরিকাই জিতল। ভেঙে গেল শক্তির সমূহ ঐক্য। পেরেস্ত্রৈকা ... গর্বাচেভের সময় থেকেই বোঝা যাচ্ছিল। মুক্ত বাতাস ছুটে এল। আগল খুলে দিতেই ভেঙে পড়ল সোভিয়েত।
বাড়িতে আমার টেবিলের ওপর থেকে ব্রাউন খাম নিয়ে সেটার মোটা পেটের ওপর অনীতা তীক্ষ্ণ নখ বসিয়ে ফরফর করে ছিঁড়ে ফেলল। নোটের বান্ডিল নিয়ে বিজয়োল্লাসে মেতে উঠল আমার বউ। অনীতার তীক্ষ্ণ নখ বসে যাচ্ছিল আমার মুখোশের ওপর। কতদূর বুঝতে পারে মূর্খ মেয়েছেলে। অনীতা কি জানে সোভিয়েত দেশের সেই পৃষ্ঠাগুলোর গন্ধ এখনও আমার নাকে আসে। অনীতা কি জানে সোভিয়েত ভেঙে গেলে আমি ভিখারি হয়ে গেছি। মুক্ত হাওয়ায় রতনবাহাদুর মোক্তান, লাল্টু প্রামানিক আমাকে ব্রাউন খাম দিয়ে বলে – স্যার, এটা ব্যাগে রেখে দিন। বাড়িতে গিয়ে খুলবেন। রতনবাহাদুর কার্শিয়াং-এ ডাওহিলে আমার মেয়ের ভর্তির সব ব্যবস্থা করে দিয়েছে। লাল্টু প্রামানিকের ইন্ডিকায় হলং ঘুরে এলাম। হাতির পিঠে চড়ে জঙ্গল-সাফারি। লাল্টু পিঠটাকে কেন্নোর মত গোল করে বলে আমার মত অফিসার বাপের জন্মে দ্যাখেনি। হাঃ, মুক্ত হাওয়া।
দুর্গাপুরে অফিস ট্যুরে গিয়ে দেখলাম শহরটা কত পালটে গেছে। ডিভিসি মোড়ের সেই শালের জঙ্গল উধাও। সিটি সেন্টার ঝলমল করছে। একটু এগোলেই কোনও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। এটা এখন শিল্পনগরী, না কি কোনও শিক্ষাচর্চার পীঠস্থান – গোলমাল হয়ে যায়। ড্রাইভারকে এম এ এম সি'র কথা বললে মনে হল যেন বিভ্রান্ত। কোনও এক ট্যুরিস্ট যেন নেই-এক-দুর্গের কথা জানতে চেয়েছে ট্যাক্সি ড্রাইভারের কাছে। খবরের কাগজে মাঝে মাঝে দেখতাম এম এ এম সি'র অবস্থা খুব খারাপ। দুর্গাপুরে পৌঁছে প্রথমেই মনে পড়েছিল আমার পুরনো কোম্পানির সেই প্রতীক চিহ্নের কথা। একটা দাঁতওয়ালা চাকা, যেটা ঘুরলেই ভূগর্ভ থেকে উঠে আসে ম্যাগনেটাইট, হেমাটাইট। যৌগ ভেঙে যেতে থাকে। পুড়তে পুড়তে তার আসল রসটুকু শুদ্ধ থেকে শুদ্ধতর হয়ে স্রোতের মত বইতে থাকে। ইস্পাতনগরীর আকাশ স্বর্ণাভ হয়ে ওঠে। মাটির সাত পরত নীচে লুকিয়ে থাকা সেই ঐশ্বর্যের সম্ভার তো আমরাই স্রোতধারায় বইয়ে এনেছি মাটির পৃথিবীতে। আমাদের কোম্পানি ছিল যজ্ঞের পুরোহিত। লৌহ-সভ্যতার ভগীরথ। ড্রাইভারকে হেসে পথ বলে দিতেই সে ম্লান হাসল।
গোটা কতক ফুলগাছ এখনও কোনও মতে বেঁচে আছে। মরতে মরতে এখনও ফুল ফোটানোর চেষ্টা করে চলেছে। আমার মনে হল দুটো শ্মশানচাঁপা ফুটে আছে। যা ছিল অমরাবতী, এখন যেন প্রেতলোক। জীবনের সাড়া নেই কোথাও। কোথায় গেল প্রাণস্পন্দনে মুখর আমাদের সেই ক্যান্টিনের কোলাহল। কোথায় গেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এস্টাব্‌লিশ্‌মেন্টের লোকজন, প্ল্যান্টের লোকজন। মৃতদের শহরে আমি একা দাঁড়িয়ে আছি।
অফিসে ঢোকার মুখে ডানদিকের দেয়ালে সেই বিখ্যাত প্রতীক চিহ্ন কেমন বিবর্ণ হয়ে গেছে। কেমন করে মাটির নীচ থেকে উঠে আসবে গাঢ় ধূসর ম্যাগনেটাইট, উজ্জ্বল হলুদ হেমাটাইট, কোন যন্ত্রে আরও নিখুঁত, আরও বেশি করে, আরও কম পরিশ্রমে, কম খরচে মাইনিং-এর কাজ হবে – সেই সব যন্ত্রশিল্পীরা আজ কোথায় হারিয়ে গেল।
খাঁজকাটা চাকাটার দিকে তাকিয়ে আমার হঠাৎ নিজেকে মনে হল চেকভের সেই 'একজন কেরানির মৃত্যু' গল্পের কেরানি। মনে হল কমিউন মিথ্যে, পিতৃভূমির লড়াই-এ লালফৌজের বীরত্বের গল্প মিথ্যে। আমার ছেলেবেলায় সোভিয়েত দেশ নামে কোনও পত্রিকা ছিল না। কোনও দিন কোনও এক্সপার্ট এসে আমাদের শেখায়নি কোন অস্ত্র দিয়ে, কেমন করে খুঁড়ে আনতে হয় আকরিক লোহা। থেমে গেছে খাঁজকাটা দাঁতওয়ালা চাকা। পেটমোটা বাদামি খাম উড়ছে পৃথিবীজুড়ে। ভেঙে পড়ছে শক্তির সমূহ ঐক্য।
দুজন সিকিওরিটির লোক গেটের সামনে পাহারা দিচ্ছে। ওদের সঙ্গে আর কথা বলতে ইচ্ছে করল না। বুঝতে পারলাম, এখনও যে সব সামান্য কল-কব্জা অবশিষ্ট আছে, ওরা সেগুলো পাহারা দিচ্ছে।
খুব সামান্য সময়ের জন্য এই ঘোরের ভেতরে আমি ছিলাম। তার পরই আবার আমার গদিওয়ালা নরম চেয়ারে ফিরে এলাম। দক্ষ প্রশাসক, একজিকিউটিভ ইঞ্জিনিয়ার প্রভাত মিশ্র। সেবার ভূমিকম্পের পর মহাকরণে আমাদের মন্ত্রী জরুরি বৈঠক ডেকেছিলেন। মিটিং-এর শেষে মন্ত্রী একবার আমার কাঁধে স্নেহের হাত রেখে কথা বলেছিলেন। পটাপট ছবি উঠেছিল। সেই ছবির দৌলতে আমার বাড়বাড়ন্ত। এসব গল্প খুব দ্রুত ডালপালা ছড়ায়। আমাদের দপ্তরের সচিব পর্যন্ত ফোন করে আমার সুবিধা-অসুবিধার খোঁজখবর নিত। মন্ত্রীমশাই আদতে বাঁকুড়ার লোক হওয়ায় এমন জনশ্রুতিও প্রচার পায় যে, তিনি আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। কেউ জিজ্ঞেস করলে আমি স্মিতমুখে তার দিকে তাকাই।
তিন
রিটায়ারমেন্টের পর আমার শরীর দ্রুত ভেঙে পড়ছিল। কেমন যেন জবুথবু টাইপের হয়ে পড়ছিলাম। আগের সেই কাজকর্মের ব্যস্ততা নেই, তবু অসম্ভব ক্লান্ত মনে হয় নিজেকে। আমার বউ অনীতা খুব স্বাস্থ্য সচেতন। দিব্যি টাইট রেখেছে তার ফিগার। পুরুষ মানুষের শরীর, অন্তর্জলীতে না যাওয়া পর্যন্ত কামনাবাসনার শেষ হতে চায় না। অথচ আমার শরীর যেন শীতঘুমে যাওয়া এক কুন্ডলীপাকানো সাপ। অনীতা অবশ্য আমার চেয়ে অনেকটাই ছোট। তা হলেও তো পঞ্চাশ হল প্রায়। কিন্তু অনীতা সাজতে জানে। নিয়মিত জিমে যাওয়ার ফলে তার শরীরের গ্রন্থি ও পেশির ঔদ্ধত্য অমলিন। শরীরের খিদে ভালো। কিন্তু আমার আজকাল শুধু ঘুম পায়। শরীরজুড়ে অবসাদ। অনীতা দারুণ সেজে শপিং-এ যায়। আমি ওর সামনে পেছনে ক্লিভেজ দেখি, তবু ঘুম পায়। রাত একটু ঘন হয়ে এলে ব্যালকনির বেতের চেয়ারে বসে সোডা মিশিয়ে হুইস্কির গ্লাসে আস্তে আস্তে চুমুক দিই। এ অভ্যাস আমাকে ধরিয়েছিল কালিম্পং-এর ঠিকাদার যোশেফ মোক্তান। তার সুবাদেই স্কচের নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহে সাঁতার কেটেছি। এখন আর অতটা পারি না। দেশি মতেই আচমন সারি। কলকাতায় হাইল্যান্ড পার্কে একটা, শিলিগুড়ির উত্তরায়ণে একটা ফ্ল্যাট কিনে রেখেছি। আরও পারতাম, ভিজিলেন্সের ভয়ে পারিনি। মন্ত্রীমশাইয়ের কি আর আমার কাঁধে হাত রাখার কথা মনে আছে।
দেখেছ, সাপটা কেমন ফোঁস করে উঠল।
বিছানায় শুয়ে টিভি দেখছিলাম, বিজ্ঞাপনটা দেখাতেই আমার দিকে তাকিয়ে অনীতা হেসে বলল। অপমানের এক রকম ঘন ছায়া বিছানায় ছড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ শীত করে উঠল আমার।
কী ভাবে যে এসব বিজ্ঞাপন দেখায়। বাড়িতে উঠতি বয়সের ছেলেমেয়ে থাকলে বাবামায়ের সামনে ... কী রকম অস্বস্তিকর বলো।
আজকালকার জেনারেশন অনেক অ্যাডভানসড্‌। এসব ওদের কাছে জলভাত। স্কুলের সিলেবাসে পর্যন্ত সেক্স এডুকেশন এসে গেছে।
ঠিকই বলেছ। আমাদের তিতলি, তোমার হয়তো মনে নেই, টিভিতে স্যানিটারি ন্যাপকিনের বিজ্ঞাপন দেখালে চট করে চ্যানেল পালটে দিত। আমরাই কিছু বুঝতাম না। সে রকম বাজে ছেলের পাল্লায় পড়লে সর্বনাশ হয়ে যেত।
একটু বাদেই বিজ্ঞাপনটা আবার ফিরে এল। এটা আজকাল খুব দেখাচ্ছে। এক ফোঁটা তেলের স্পর্শে কুঁকড়েমুকড়ে থাকা সাপ কেমন ভয়ংকরভাবে ফোঁস করে উঠছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অনীতা মুখে ক্রিম ঘষছে। স্বচ্ছ নাইটির ভেতর দিয়ে অনীতার বাট-ক্লিভেজ স্পষ্ট বোঝা যায়। আয়নার ভেতরে ফ্রন্ট-ক্লিভেজ। পাশ ফিরে শুয়ে এক মিনিটের ভেতরে ঘুমিয়ে পড়লাম। ঘুমনোর আগে শুধু মনে করার চেষ্টা করেছিলাম আয়নায় অনীতার ঠোঁটের পাশে কি মৃদু ভেঙে যাওয়া রেখা ছিল। থাক, আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।
রিটায়ার্ড ফৌজি অফিসার রামজি বসাকের সঙ্গে আমার আলাপ ভোরবেলা মাঠে দৌড়তে গিয়ে। নীল ট্র্যাকস্যুট, নাইকের সাদা স্পোর্টস শু, পেল্লায় মোচ – ভদ্রলোক মাঠের পাশে বকুলতলায় সিমেন্টের বেঞ্চে বসেছিলেন। আমি একপাক হালকা পায়ে দৌড়ে এসে গরমকালের কুকুরের মত জিভ বার করে হাঁপাচ্ছিলাম। ব্রিদিং একটু নর্মাল হলে ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলেন।
কিছু মনে করবেন না, আপনাকে একটা কথা বলব ?
বলুন। আমি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে লোকটাকে দেখলাম। এই কমপ্লেক্সে বোধহয় নতুন এসেছে। এর আগে দেখিনি।
আপনি জগিং করবেন না। যাতে ঘাম ঝরে, এভাবে একটু জোর কদমে হাঁটুন। আমাদের মত উমরের লোকদের জগিং করা ঠিক হবে না।
আপনি ...
আমি রামজি বসাক। এ সিক্স। ছেলের কাছে এসেছি। ফৌজিতে ছিলাম। কার্গিল অপারেশনে ছিলাম। অ্যাকচুয়ালি রামগোপাল বসাক, ব্যারাকে সবাই রামজি বলে ডাকত। একটু পুণ্য করে নিত।
আমি প্রথমে নমস্কার করতে গিয়েছিলাম। লোকটা তার হাত বাড়ালে আমি আধা নমস্কার আধা হ্যান্ডশেক করলাম। তারপর থেকে রামজির সঙ্গে আমার খুব জমে গেল। যুদ্ধের গল্প, ডিফেন্স-এ পুকুরচুরির গল্প, সিনিয়ার জুনিয়ারদের ভেতরে প্রায় ব্রাহ্মণ শূদ্রের মত আচারব্যবহার, সিনিয়ার অফিসারদের বউ-এর সঙ্গে জুনিয়ার অফিসারদের ফষ্টিনষ্টি। ফৌজিদের লাইফ সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। লোকটা জমিয়ে গল্প বলতে পারত। আর, আদিরসঘেঁষা রসিকতাগুলো বলার সময় তার আহ্লাদ যেন উপচে পড়ত। দেশের সবচেয়ে সুশৃঙ্খল বাহিনিতেও এ রকম দুর্নীতি হয় জেনে আমার ভেতরটা বেশ স্নিগ্ধ হয়ে উঠত।
এ ভাবেই একদিন এসে পড়েছিল কামশীতল নারী ও অক্ষম পুরুষদের গল্প। এসেছিল চিনদেশের মানুষদের বিশ্বাস, ভায়াগ্রা, বাঘের চর্বি-গলানো তেল, পরিপূর্ণ সুখলাভের তরিকা ইত্যাদি প্রসঙ্গ। রামজি তখন আমাকে মিশিরজি বলে ডাকত – বলেছিল নিয়মিত যৌনতা ও পরিমিত মদ্যপানই দীর্ঘজীবন সুস্থ থাকার রহস্য। শরীর ও মন ফিট রাখার গুপ্তকথা। কিন্তু সে আমাকে দু'হাতের আঙুল দিয়ে মৈথুন-মুদ্রা দেখিয়ে বলেছিল নিয়মিত যৌনতা বলতে শুধু সেটা নয়, সব মিলিয়ে বেঁচে থাকার ভেতরে যেন সেটা থাকে। ওটাই আসল ভাইটাল ফোর্স।
রামজি বোধহয় আমার দৈন্যদশা টের পেয়েছিল। শীতঘুমে চলে যাওয়া আমার এই শরীর, আমার আড়ষ্টতা নিশ্চয় সে বুঝতে পেরেছিল। ক্যান্টনমেন্টে কর্নেল চৌধুরির বউ-এর সঙ্গে জুনিয়ার অফিসার রাঠোরের এক বিছানায় রাত্রিযাপন, রাজাবাদশাদের অনন্ত ভোগবাসনা, সুবেদার মেজর দীপক কাপুরের সমকামিতা – এসব গল্প বলে সে নিশ্চয় আমাকে জাগাতে চাইত।
তারপর রামজি একদিন আমাকে এক ফোঁটা ম্যাজিক তেলের কথা বলল। ঘুমিয়ে থাকা সাপ কেমন ফোঁস করে ওঠে। পরিপূর্ণ বিষের থলি নিয়ে ছোবল মারবে বলে কেমন তার চমৎকার উত্থান হয়। আমি তো জানি, টিভিতে রোজ যখন বিজ্ঞাপন দেখায়, অনীতা না থাকলে আমি সাপটাকে ভালো করে দেখি। ওর চলন, ওর গ্রেস, ওর ফণা তোলার ভঙ্গি – সব লক্ষ করি। চুপ করে রইলাম। রামজি বোধহয় সেটাই সম্মতির লক্ষণ ভেবেছিল। পরদিন সন্ধেবেলা পার্কের বেঞ্চে বসে রামজি আমার হাতে প্যাকেটসহ একটা শিশি দিল।
ভিতরে লিট্রেচার আছে। ভাল করে পড়ে ইউজ করবেন। কাল আমি একটু বাইরে যাচ্ছি। এসে আপনার স্টোরি শুনব।
কোথায় যাচ্ছেন ?
আমার ছেলে তো শিল্পনিগমের বড়া অফসার। দুর্গাপুরে ওদের একটা মিটিং আছে। আমিও যাব। আমার ছোটভাই থাকে। সি এম ই আর আই-এর ইঞ্জিনিয়ার। দেখা করে আসব।
কীসের মিটিং ?
দুর্গাপুর শুনেই আমার বুকের ভেতরে কেমন খলবল করে উঠল। যেন পচা ডোবায় বর্ষার নতুন জল পড়েছে। কইমাছগুলো লাফাচ্ছে।
পুরানা একটা বন্ধ কারখানা, এম এ এম সি -- আবার খুলবে। কথাবার্তা চলছিল। ফাইন্যাল পলিসি, কুছ কন্ডিশন – এসব নিয়েই মিটিং। ছেলে বলছিল।
রামজির হাত থেকে তেলের শিশিটা ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে শূন্যে ছুঁড়ে দিলাম। অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে ম্যাজিক তেলের শিশি। আমার শরীরের সমস্ত পেশিজুড়ে মোচড় দিচ্ছে খরিস, চিতি, ময়াল। আমি এঁকেবেঁকে ছুটছি বাড়ির দিকে। রামগোপাল বসাক নিশ্চয় অবাক হয়ে পেছন থেকে আমাকে দেখছে। ও কি করে জানবে আমার গুপ্তকথা, পুনরুত্থানের রহস্য। ও তো সোভিয়েত দেশ পড়েনি, ননী ভৌমিকের নামও শোনেনি। আমার বুকের ভেতরে একটা খাঁজকাটা দাঁতওয়ালা চাকা ঘুরতে শুরু করেছে।
অনীতা রান্নাঘরে ছিল। আমি ওকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে রান্নাঘরের মেঝেতেই শুয়ে পড়েছিলাম। চাকাটা ঘুরছে। এখন মাইনিং শুরু হবে। অনীতার শরীরের সাত পরত নীচে যাব বলে আমি ওকে দুরন্ত বিদ্ধ করেছি। এখন গভীর থেকে উঠে আসবে ম্যাগনেটাইট, হেমাটাইট। এখন লাভাস্রোত বইবে। অসম্ভব সুখে শীৎকার করে উঠছে মাটি। ফণা দুলিয়ে বিষ ঢালতে ঢালতে আমি হয়তো বলতে চেয়েছিলাম – আই লাভ ইউ অনীতা, কিন্তু হিসহিস করে আমি বলতে থাকি – ইয়া তেব্যা ল্যুভল্যু, ইয়া তেব্যা ল্যুভল্যু ...
এ সবই হল রাশিয়ান কলকব্‌জার কেরামতি। এর কাছে কোথায় লাগে জাপানী তেল।

মায়ের কিঙ্করদা ~ উর্বী মুখোপাধ্যায়

মায়ের সাইকেলের পিছনের ক্যারিয়ারে চাপতে বড় ভালো লাগত। চালকের আসনে বসা মাকে ঘিরে এক প্রবল বিস্ময়বোধ তৈরি হত। মায়ের অনায়াস ভঙ্গিতে যৌথ পরিবারের বিরাট হেসেলে রান্না করা, রান্না করতে করতে নির্ভুল সুরে গান করা, সারা দিনের শেষে রাতের বেলা পিঠে অসংখ্য মশার কামড় সহ্য করেও হঠাত হঠাত ছবি আঁকার ধুম, অথবা দম বন্ধ করা গরমে হঠাতই ফ্যান নিভিয়ে হ্যারিকেনের আলোয় বাটিক করা সবই মুগ্ধ করত। কিন্তু তার চেয়েও বেশি মুগ্ধ করত ছুটিতে শান্তিনিকেতনে গিয়ে খোয়াই এর উঁচু নিচু অগ্রাহ্য করে সাইকেলের পিছনে আমাকে নিয়ে ঘোরা। মাকে মনে হত শিশু পুত্র পিঠে নিয়ে রনাঙ্গণে সাক্ষাত লক্ষ্মীবাঈ। আর যেতামও তো নানান অভিযানে। মা সাইকেল চালাতে চালাতে তার পুরো দস্তুর শহুরে মেয়েটাকে চেনাতো মুচকুন্দ ফুলের গন্ধ, বনপুলকের ঝোপ, চেনাত তক্ষকের ডাক, লালমাটির প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা তাল গাছের সারি আর নিয়ে যেত সব আজব লোকের বাড়িতে, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মায়ের মাস্টারমশাই। মনে আছে একবার গৌরীদি (গৌরী ভঞ্জ, নন্দলাল বসুর মেয়ে)র বাড়ি গিয়ে দেখি তিনি ব্যস্ত হয়ে হরতকি ফুটিয়ে রং বের করছেন, যেতাম সোমনাথ হোরের বাড়ি বা স্টুডিওতেও। সেখানে ছড়ানো কাগজে কত ছাগলের স্কেচ। এভাবেই যেতাম দিনকর কৌশিকের বাড়ি, অনেক কাল বাদে জেনেছিলাম তিনি বাঙালি নন। তবে মায়ের আরেক মাস্টারের বাড়ি নিয়ে যাওয়ার সময়ে অনেকেই আপত্তি করতেন, বলতেন, বাচ্চাটাকে নিয়ে যাস না। কিন্তু আমি বুঝতাম না কেন এত আপত্তি। তাঁকে দেখতে ছিল ঘুব সাদামাটা, গালে না-কাটা দাড়ি, খালি গায়ে লুঙ্গি পরে থাকতেন। তিনি রামকিঙ্কর। মায়েরা ডাকতেন কিঙ্কর দা। তাঁর করা মুর্তি দেখতাম শান্তিনিকেতন জুড়ে, কলের ডাক, হাটুরে। আমার সব থেকে ভালো লাগত ইউক্যালিপ্টাসের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া দীর্ঘ দেহী সুজাতাকে।
তাঁর বাড়ি যখন যেতাম, তখন সন্দেহ হত, ইনিই কি সেই শিল্পী? ঘরটা মায়ের অন্যান্য মাস্টারমশাইদের বাড়ি থেকে যেন কিছুটা বেশি নোংরা থাকত। তার মাঝেই বসে থাকতেন বৃদ্ধ কিঙ্করদা। বাড়িতে অনেক বেড়াল ছিল। বেড়ালের গন্ধ উঠত আরো অনেক অপরিচিত গন্ধের সঙ্গে। মা এলেই খুব জোরে 'আয় আয়' বলে হাঁক ছাড়তেন। প্রণাম নিতেন না, জড়িয়ে ধরে বলতেন, 'বাইরে চল, গান গাইবি।' এদিক ওদিক ছড়ানো মাটি পাথরের দাওয়ায় মোড়া পেতে বসতাম আমরা। মা গাইত। যে গানই গাক না কেন মুগ্ধ হয়ে শুনতেন, শেষে বলতেন, 'আর সেইটা? সেইটা গাইবি না?' মা যেন জানত। হেসে গান ধরত, 'বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো'। ঘোর শীত বা গরমেও এই গানটাই শুনতে চাইতেন বারবার। আর গান শেষ হলে আমার দিকে তাকিয়ে প্রতিবারই একটাই গল্প বলতেন- 'তোমার মা জানো, একবার একটা ছবি একেছিল, অগ্নিশিখা ফুলের। তুমি দেখেছ অগ্নিশিখা?' আমি মাথা নাড়তাম। শান্তিনিকেতনে মা এই ফুলটা আর খুঁজে পায়না, তাই আর দেখায়ও নি। কিন্তু যে গল্পটা বলতেন, সে গল্পটা আমার জানা। মা তখন কলাভবনে সবে মাত্র ঢুকেছে। নেচার স্টাডির ক্লাসে দেওয়া হয়েছে ফ্লাওয়ার স্টাডি। মার ফ্লাওয়ার স্টাডির জন্য কোনো ফুলই পছন্দ হয়না। হঠাত একদিন ঝোপঝাড়ের মাঝে আবিষ্কার করে এক অদ্ভূত দর্শন ফুল- অগ্নিশিখা। এঁকে ফেলে সেই অগ্নিশিখাকেই। অদ্ভুত তার আকার আর অপূর্ব তার রঙ। এর কদিন বাদেই বাড়িতে হঠাত সশরীরে উপস্থিত কিঙ্করদা, রাম কিঙ্কর বেইজ। মাকে বললেন, 'দেখা দেখি কী এঁকেছিস? সবাই এত বলছে কেন?' মা ভয়ে ভয়ে দেখিয়েছিলেন ছবিটা। সস্নেহে বলেছিলেন, 'এত ফুল থাকতে তোর এই ফুলটাই কেন ভাল লাগল রে বেটি?' মায়ের গল্পটা এখানেই শেষ হয়ে যেত। মা কেন এঁকেছিল সেই অগ্নিশিখা তা যেন কোন দিন ভাল করে বোঝাতে পারেনি কিঙ্করদাকে। তাই সেই গল্পের শেষেও কিঙ্করদা একই প্রশ্ন করতেন, কেন এঁকেছিলি রে অগ্নিশিখা?
মা যখন আমাকে এই গল্পটা বলত, আমি জিজ্ঞেস করতাম,' কিঙ্করদা তোমাদের কী শেখাতেন মা?' মা হেসে বলত 'স্কাল্পচার, ভাস্কর্য। কিন্তু ক্লাসে আমাদের কিছু শেখাতেন না, আমরা স্টুডিওতে কাজ করলেও বাইরে ডেকে আনতেন, বলতেন দেখ, দেখ বাইরেটা দেখ… কী হবে মুর্তি গড়ে… ওই মুর্তিকারের কাছে আমরা সবাই …। বলে বুড়ো আঙ্গুল তুলে কলা দেখাতেন।' আকাশে মেঘ জমলেই ডাক পড়ত মায়ের। হেকে বলতেন,' আয়… গান ধর … বহু যুগের ওপার হতে…।' মালবিকা অনিমিখে এলেই উনিও গলা মেলাতেন। মা বলত, খুব আনন্দ করে গাইতাম ঠিকই কিন্তু কিঙ্করদার ক্লাসের শেষে সাবমিশনের সময়ে বুক ঢিপঢিপ করত। কাজ তো হয়নি কিছুই। ধরে বেধে নিয়ে আসতাম কিঙ্করদাকে। স্টুডিওতে । আমাদের কাজ দেখে হাহা করে হাসতেন, মাঝে মাঝে হাতের চাপড়ে ভেঙ্গে দিতেন আমাদের বহুদিন ধরে যত্নে গড়া মুর্তিগুলো। মায়ের একবার প্রায় শেষ একটা মুর্তি এভাবে ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। মায়ের খুব রাগ হয়েছিল। মা বলে সেদিন সন্ধেবেলায় সেই বনপুলকের মাঝে কিঙ্করদার আড্ডায় সেদিন যখন সবাই গান ধরেছে, মা নাকি চুপ করেই বসেছিল ভারাক্রান্ত মনে। হঠাত কিঙ্করদার নজরে পড়ে মাকে। বলেন, কি রে, চুপ কেন? তোর মুর্তি ভেঙে দিলাম বলে? আমরা কি আর নিটোল মানুষ রে …। আমরা হলাম কাঁকরের দেশের মানুষ, তাদের কি ভেঙ্গে পড়লে চলে? মা বলেছিল, ঠিক সেই সময়েই আমার চোখ গেল চাঁদের আলোয় ভাসা প্রাঙ্গণে আমাদের কাঁকুড়ে মাটিতে পড়া এবড়ো খেবড়ো ছায়ার দিকে। মনে হল, সত্যি আমার মুর্তি ছিল অনেক নিটোল, এমন এবড়ো খেবড়ো মাটিতে বেমানান। পরদিন ফের শুরু করলাম কাজ। এবার যে মুর্তি হল, কিঙ্কর দা ভাংলেন না, সোমনাথদা কে ডেকে বললেন, দেখো, কেমন কাজ করে এই মেয়েটা।
কিঙ্করদার নানা গল্প শুনতাম শান্তিনিকেতনে মাদের বন্ধুদের কাছে। রিক্সোতে উঠেই নাকি রিক্সোওয়ালাকে দশ টাকা দিয়ে দিতেন। তারপর ছেলেমানুষের মত তাঁর বায়না শুরু হত, আমায় তেলেভাজা খাওয়া, আমায় ফুল কিনে দে, আমার ঐ টুপিটা চাই। এই ভাবেই যেতেন। যদি সে সওদার শেষে রিক্সোওয়ালার কিছু বাঁচত, তাহলে সে যাই বাঁচুক তার, আর লোকসান হলেও তার।
শুনেছিলাম, বাইরের রাজনীতির খবর কিঙ্করদা বড় একটা রাখতেন না। কংগ্রেসের ভোটের প্রতীক জোড়া বলদ থেকে যখন গাই-বাছুর হল, তখন নাকি তিনি বুথ থেকে ব্যালট হাতে বেরিয়ে এসে চেঁচামিচি জোড়েন, আমার জোড়া বলদ কোথায় গেল? আমি ভোট দেব না। অনেক বামপন্থীর মতে অবশ্য সেটা তিনি সজ্ঞানেই করেছিলেন, কারণ তিনি সেবার কংগ্রেসকে ভোট দিতে চাননি।
শুনতাম তা সত্তেও ইন্দিরা গান্ধী নাকি কিঙ্করদাকে বিশেষ শ্রদ্ধা করতেন। মায়ের বন্ধু মইনূল মামার কাছে অবশ্য শুনেছিলাম এমারজেন্সির সময়ে বা একটু পরে কোনও একটা প্রদর্শনী উদ্ভোধনের সময়ে ইন্দিরা গান্ধীর পাশে দাঁড়ানো কিঙ্করদা হঠাতই প্রধানমন্ত্রীর নাক টিপে ধরেন। দেহরক্ষীরা ছুটে এলে কিঙ্করদা নির্বিকার চিত্তে বলেন, ভয় লাগছিল, ওর নাকে আগুন লেগে যেতে পারে। এ রকম সব ঘটনা কিঙ্করদাই পারতেন, তা তালে না বেতালে কেউ জানত না।
শেষ বার মা যখন পি জি হাসপাতালে দেখা করতে গেছে, আমি সঙ্গে ছিলাম। মা মাথায় হাত রাখাতে চোখ মেললেন। বোধহয় চেষ্টা করলেন নামটা মনে করতে। তারপর, এক অপার্থিব গলায় বললেন, গা … মালবিকা অনিমিখে / চেয়েছিল পথের দিকে…।