শুক্রবার, ২৯ মার্চ, ২০১৯

ভোট ~ সুশোভন পাত্র

পাত্তা দেওয়ার মত বামপন্থী'দের প্রার্থী তালিকায় কি আছে মশাই? না আছে চমক, না আছে গায়ক, না আছে নায়ক। প্রার্থী তালিকা হবে তৃণমূলের মত। ভোজ বাড়ির পাতের শুরুতেই রায়গঞ্জে মার্কা মারা সঙ্ঘ পরিবারের ক্যাডার থাকবে। ডাল-ভাতের পর শুক্তোর সাথে মাঝ পাতে মতুয়া'দের ধর্মীয় ভাবাবেগ চটকে দেওয়ার রেসিপি থাকবে। ঘরে ছেলে ঢুকিয়ে দেওয়া সাংসদের এক্সচেঞ্জ অফারে, আমেরিকার ম্যাসাচুসেটসের কোকাকোলা খাওয়া প্রার্থীর কনটেম্পোরারি টাচ থাকবে। দক্ষিণবঙ্গে কোলেস্টরেল কে ভেংচি কেটে শিঙ্গাড়ার সাথে ঘুষ খেতে অভ্যস্ত'দের টিকিট জুটবে। আর্থিক দুর্নীতি তে অভিযুক্ত জেল ফেরত আসামীরা তালিকায় জামাই আদর পাবে। সংসদে ১১% উপস্থিতির রেকর্ড নিয়ে 'মহানায়ক' আবার ভোট চাইবে। আর শেষ পাতে মাস্টার শেফের ট্রাম্প কার্ডে গ্ল্যামার দুনিয়ার চমচম কেষ্টদা'দের প্লেটে নকুলদানা হয়ে গড়াগড়ি খাবে। মিমি কি খেলেন, নুসরত কি পরলেন -স্টুডিও তে ঘণ্টাখানেক বসবে। অবশ্য গৃহপালিত হলেই যে মিডিয়ার মেরুদণ্ড থাকতেই হবে এমন তো মাথার দিব্যি দেওয়া নেই। সরকারী বিজ্ঞাপন পেলে সরীসৃপও তো পোষ মানে।  
পাত্তা দেওয়ার মত বামপন্থী'দের ইশতেহারে কি আছে মশাই? ইশতেহার হবে এন্টারটেনমেণ্ট প্যাকেজের মত। রামমন্দিরের সুড়সুড়ি দেবে। কাশ্মীর নিয়ে গসিপ করবে। এনআরসি নিয়ে চিমটি কাটবে। ১৫ লক্ষ ঢুকিয়ে দেওয়ার হিসেব কষবে। বছরে ২কোটি চাকরির গরু গাছে চড়বে। কোথায় হালকা করে বগলের নিচে চুলকে দিয়ে পাকিস্তান নিয়ে তিনটে প্যারাগ্রাফ নামাবে, তা না, বামপন্থী'রা ইশতেহারে কৃষক-শ্রমিক-বেকার'দের নিয়ে পাতা ভরিয়ে পাড়া মাথায় তুলেছে। মাসিক ৬হাজার বার্ধক্য ভাতা চেয়েছে। জনস্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বাড়িয়ে জিডিপির ৫% করার গাজন গেয়েছে। কি আহাম্মক বলুন দেখি? আরে, ভোটের মুখে গাজন গাইতে হলে রামের নামে গাও, তা না, আবার সর্বজনীন গণবন্টন ব্যবস্থা শক্তিশালী করার কাঁদুনি গাইছে? শিক্ষাক্ষেত্রে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৬% করতে বলে কেত্তন করছে? ধনী'দের সম্পদের উপর ট্যাক্স বৃদ্ধি চাইছে? মগের মুল্লুক নাকি? স্বাস্থ্য-শিক্ষা খাতে জিডিপির ১১% ব্যয় করলে, ফি-বছরে সরকারী কোষাগার থেকে লক্ষ কোটির কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড় দেওয়ার হিসেবটা কি অরুণ জেটলির খাতায় কে সি নাগ এসে মিলিয়ে দিয়ে যাবে? আর ধনী'দের সম্পদের উপর ট্যাক্স বাড়ালে আম্বানি-আদানি'দের মালাই চেটে চর্বি জমানো নেতা গুলো কি না খেতে পেয়ে মরবে? যতসব!    
ভুলেও বামপন্থী'দের ভোট দেবেন না। ক্ষমতার লোভ নেই। লাল বাতির গাড়ি চাপার জন্য জিভে জল নেই। কুর্সির শাহানশাহ খুঁজতে রুদ্ধদ্বার বৈঠকে রোমাঞ্চ নেই। ২০০৪-এ লোকসভা নির্বাচনে ৬১টা আসন জিতে একটাও মন্ত্রিত্ব নিল না মশাই। আদর্শ, সততা, প্রত্যয়, নীতিনিষ্ঠতা? কি করবেন এসব নিয়ে? পাঁপড় ভাজবেন? মনে নেই, সেদিন যখন পরিষ্কার বামপন্থীদের ছাড়া নতুন সরকার গঠন অসম্ভব, ওমনি বাজপেয়ী সরকারের বিলগ্নীকরণ মন্ত্রকের ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে এ বি বর্ধন বলেছিলেন, 'ভাড় মে যায়ে উয়ো মন্ত্রক, অর উসকা মন্ত্রী।' ব্যাস, ঐ দুটো লাইনেই ঠিক হয়ে গিয়েছিল আগামী ৫ বছরের রাজনীতির অ্যাজেন্ডা। ভেইল, নালকো -একের পর এক শিল্পে, শ্রমিকদের জঙ্গি মেজাজ আর ধর্মঘটের জেরে বিলগ্নী করতে নেমেও গুটিয়ে যায় কেন্দ্র। বামপন্থী'দের চাপেই তৈরি হয়ে কমন মিনিমাম প্রোগ্রাম। হাতি-ঘোড়া কি ছিল সেই প্রোগ্রামে? 
ছিল বলতে কিছু পিকচারের ট্রেলর। আজ গোটা দেশ জুড়ে চাষিরা যখন বারবার ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে পথে নেমেছেন, ঋণ মকুবের দাবিতে সোচ্চার হয়েছেন, ৫রাজ্যের ভোটে কৃষক অসন্তোষের যে পিকচার নরেন্দ্র মোদীরা দেখেছেন, সেই পিকচারের ট্রেলর। লোকে বলে, স্বামীনাথন কমিশন। আজ গোটা দেশ জুড়ে শ্রমিকরা যখন বারবার ন্যায্য মজুরি চেয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিট স্তব্ধ করে দিয়েছেন, সামাজিক নিরাপত্তার দাবিতে হরতাল করেছেন, ৫রাজ্যের ভোটে শ্রমিক অসন্তোষের যে পিকচার নরেন্দ্র মোদীরা দেখছেন, সেই পিকচারের ট্রেলর। লোকে বলে, অর্জুন সেনগুপ্ত কমিশন। ছিল বলতে, সবার জন্য ১০০ দিনের কাজের আইন, আদিবাসী'দের জন্য অরণ্যের অধিকার আইন, গার্হস্থ্য হিংসা বিরোধী আইন, তথ্যের অধিকার আইন। ছিল মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ দাবি, রুগ্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার পুনরুজ্জীবনের দাবি। মাত্র ৬১টা আসন পেয়েই দেশের রাজনীতির অ্যাজেন্ডাই পুরো বদলে দিয়েছিল। কি বিপজ্জনক ব্যাপার ভাবুন!   
ভুলেও বামপন্থী'দের ভোট দেবেন না। সাংসদ করতে হলে মরশুমি মুনমুন সেন কে করুন, বাঁকুড়ার গরমে প্রচারে যেতে যিনি নতুন সানস ক্রিম খুঁজবেন। সাংসদ করতে হলে মিমি-নুসরত কে করুন, যাঁদের ভোটে জিতিয়ে দিলেই নিয়মিত সিনেমার পর্দায় দেখতে পাবেন। সাংসদ করতে হলে অর্জুন সিং, অনুপম হাজরা কে করুন, যাঁদের ভোটে জিতিয়ে দিলেই তৃণমূল-বিজেপির দড়ি টানাটানি দেখতে পাবেন। কৃষক আত্মহত্যা করে মরছে, মরুক; আপনি বরং গণেশের শুঁড়ের প্লাস্টিক সার্জারি নিয়ে ভাবুন। শ্রমিক না খেতে পেয়ে মরছে, মরুক; আপনি বরং গোমূত্রে ভেষজ গুন খুঁজুন। দেশের বেকারত্বের হার ৪৫ বছরে সর্বোচ্চ, হোক না; ভোটে আপনার অ্যাজেন্ডা কিন্তু মন্দির-মসজিদ আর গোমাতা। 
বামপন্থীরা ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়ানো স্পিসিস। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও পেট্রোল-ডিজেলের-গ্যাসের দামে আপনার হেঁশেলে টান পড়লেই লাল ঝাণ্ডা নিয়ে রাস্তায় নামবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও কৃষকের ফসলের ন্যায্য দাম চেয়ে মাইলের পর মাইল পথ হাঁটবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি চেয়ে পার্লামেন্টে তালা ঝুলিয়ে দেওয়ার হুমকি দেবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও ধর্মের নামে মানুষ খ্যাপানোর বিরুদ্ধে এলাকায় শান্তি মিছিল বের করবে। বামপন্থীরা ঠিক আজকের মতই, ভোটের পরেও আপনার বেকার ছেলের কাজের দাবিতেই রাত জেগে অনশন করবে। বামপন্থীদের না আছে চমক, না আছে গায়ক না আছে নায়ক। বামপন্থীরা ম্যাড়ম্যাড়ে। বামপন্থীরা সাদাকালো। বামপন্থীরা আপনার আমার মতই খুব সাধারণ। তাই একদম পাত্তা দেবেন না। আর পাত্তা দিলেও, ঐ যে বললাম ভুলেও বামপন্থী'দের ভোট দেবেন না।

বুধবার, ২৭ মার্চ, ২০১৯

অনশন ও স্ট্র্যাটেজি ~ অমিতাভ প্রামানিক

- দিদি, কেসটা কিন্তু দিন দিন জটিল হয়ে যাচ্ছে। 
- কোন কেস রে?
- এই যে অনশন। এতগুলো ছোঁড়াছুঁড়ি এতদিন ধরে অনশন করছে।
- ওরাম অনশন আমি অনেক করেচি। আমার রেকট আছে। ওদের কতদিন হয়েচে?
- না দিদি, আপনার রেকর্ড ভেঙে গেছে। তার চেয়েও চিন্তার হচ্ছে, আগে এসব নিয়ে কেউ বিশেষ মাথা ঘামাচ্ছিল না, এখন কিন্তু অনেক বড় বড় লোক ওদের হয়ে কথা বলছে।
- কে বড় বড় লোক? বিস্যোবাংলায় আবার বড় বড় লোক কোতায় দেকলি?
- না দিদি, শঙ্খ ঘোষ, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সবাই ওদের হয়ে লিখছে।
- আরে রাখ। ওদের কাজই ওই, বাজে বকা। ওসব নিয়ে তোকে মাথা ঘামাতে হবে না। নেক্সট ইয়ারে দুটোকে একটা করে বিস্যোস্যি দিয়ে দিস আর মুখটা বন্ধ রাখতে বলিস। 
- কিন্তু দিদি, ফট করে এই ছোঁড়াছুঁড়িদের কেউ যদি ইয়ে হয়ে যায়?
- কিয়ে হয়ে যায়? আমি তো ছাব্বিশদিন অনশন করেচিলাম, ইয়ে হয়ে গেচিলাম?
- না, আপনার তো রাত্তিরে সব ফিট করা থাকত। এদের তো কিছু নেই।
- আরে রাখ। অনশনে কেউ ইয়ে হয় না। গান্ধীজি তো হরদম অনশন করত, ইয়ে হয়েচে? ঐ যে বুড়োভাম, কী যেন নাম, হ্যাঁ হ্যাঁ হাজারে, আন্না হাজারে, আমার খালি হাজরা হাজরা মনে হয় –
- কেন দিদি, কালিঘাট থেকে তো অনেক দূরে থাকে, হাজরা হাজরা কেন মনে হয়?
- কী জানি! কেন মনে হয় বলতো?
- লোকটা ড্রামাবাজ বলে? 
- মানে ঘুরিয়ে আমাকে ড্রামাবাজ বললি? যাগগে, ঐ লোকটা তো কতায় কতায় অনশন করে, ইয়ে হয়েচে? 
- কেন দিদি, যতীন না কে যেন – 
- বাঘা যতীন? ওর কেসটা আলাদা। ও তো অনেকদিন টেনেছিল কিস্যু না খেয়ে। জলও টাচ করেনি। ওরাম করলে তো মরবেই। 
- কিন্তু দিদি, আমি খবর যা পাচ্ছি, এদের কয়েকজন কিন্তু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
- পরুক। এসব নাটক আমার অনেক দ্যাকা আচে। কাগজে লিকচে?
- না দিদি। কাগজ সবগুলোতে বলা আচে, কেউ যেন এসব ফালতু জিনিস খবর না করে। আপনি যেমন বলেছিলেন। 
- এবার যা, গিয়ে বল, সামনের বিষ্যুৎবার থেকে ছোট ছোট খবর করতে।
- কেন দিদি? সামনের বিষ্যুৎবারে কী? 
- এতদিন আমার সঙ্গে থেকে কী শিকলি, ছোঁরা? সব কিচুর টাইমিং আচে। আগেরবার যে অনশন করেচিলাম, টাইমিংটা কেমন ছিল বল? লোকজন বেশিদিন কিচু মনে রাকতে পারে না। ভোটের ঠিক আগে যেটা হয়, সেই বুজে ভোট দ্যায়। 
- এটাও তো ভোটের মুখেই দিদি। এতে কেস গড়বড় হয়ে যাবে না?
- সেই জন্যেই তো বলচি, এবার খবরের কাগজে আস্তে আস্তে জিনিসটা ছাড়তে বল।
- তাতে তো লোকে ওদের ফরেই চলে যাবে, দিদি। 
- আরে ধুর, তুই ওসব বুজবি না। ওদের চারটে ছুঁড়িকে যদি অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার ধরিয়ে দিই ভোটের ঠিক আগে আগে, তাহলে ... কী বুজলি? 
- আরে দিদি, তুমি জিনিয়াস। কাগজে খবর হবে – মহানুভব নেত্রী নিজের উদ্যোগে কর্মসংস্থান করলেন অসুস্থ ছাত্রীদের সাহায্যার্থে। শিক্ষাক্ষেত্রে নজির গড়ল বিশ্ববাংলা। ফাটাফাটি। ভোটে কে ঠেকায়! 
- অত উল্লাস দেখাতে হবে না। অনুব্বতদের রেডি রাকিস। ইলেকশন কমিশনের মাকড়াগুলোকে কোতায় কোতায় ঘোরাতে নিয়ে যাবি তার লিস্টি করেছিস? করিসনি একোনো? যা ফোট আমার সামনে থেকে ...

শুক্রবার, ২২ মার্চ, ২০১৯

মাস্টারদা ~ চন্দন দাস

নেত্র সেনের 'খুনী' কে?
সাভারকারের নামে বিমানবন্দর কেন?

আজ মাস্টারদার জন্মদিন। কিন্তু আজ আগে একজনের মৃত্যুর কথা বলবো ---নেত্র সেনের মৃত্যুর কথা। 
নেত্র সেন খেতে বসেছিল। তখন রাত। তবে বেশী নয়। তার স্ত্রী খাবার বাড়ছিলেন। এমন সময়ে ঘরে এক কিশোর ঢোকে। কোন কিছু বোঝার  আগেই কিশোরটি দায়ের এক কোপে নেত্র সেনের মুন্ডুটা ঘাড় থেকে নামিয়ে দেন। বিশ্বাসঘাতকতার শাস্তি!
নেত্র সেন ধরিয়ে দিয়েছিল মাস্টারদাকে। তাই নেত্র সেনের 'শাস্তি'। কিন্তু দুটি প্রশ্নের সমাধান আজো হয়নি। নেত্র সেনকে শাস্তি দেওয়া সেই অগ্নিকিশোর কে ছিলেন? নাম জানা যায়নি। যিনি জানতেন সম্ভবত সেই নেত্র সেনের স্ত্রীকে দিয়ে কিছু বলাতে পারেনি ব্রিটিশ! 
নেত্র সেন সেই মহিলার স্বামী ছিলেন। কিন্তু সূর্য সেন? স্বপ্নের মানুষ, ভালোবাসা, মুক্তির স্বপ্নের নায়ক। এক কিশোরের পরিচয় গোপন করে মহিয়সী হয়ে ওঠা সেই মহিলার নাম? ইতিহাস মনে রাখেনি। 
এখন সেই সর্বাধিনায়ক সূর্য সেনের নামে শহরতলির একটা সাধারন মেট্রো স্টেশন। সাভারকারের নামে সমুদ্রের ধারে বিমানবন্দর! 
তুমি কে হে? কী তোমার ভূমিকা দেশের জন্য লড়াইয়ে? স্বাধীনতা সংগ্রামে কী করেছো তুমি? স্বাধীনতা সংগ্রাম মানে তুমি তো বাবর, হুমায়ুন, আকবরের বিরুদ্ধে লড়াই বুঝেছো, বুঝিয়েছো চিরকাল। ফাঁকতালে ব্রিটিশের সঙ্গে বোঝাপড়া। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, মার্কিন দখলদারি, দাদাগিরি, তেলের ভাণ্ডারের লোভে দেদার, দু' কান কাটা বোমাবাজি — তুমি তো দেখতেই পাও না। 
সব গডসের ভাইবোন। সবসময় সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে দেবে। 
কী করেছিল তোমাদের নেতা 'বীর সাভারকার', আন্দামানের জেলে? ১৯১৩-র চিঠিটি মনে আছে? ব্রিটিশ সরকারকে কী লিখছেন 'বীর' সাভারকার? ''...অন্যভাবে যা পাওয়া যেতে পারে সে তুলনায় আমাকে জেলে আটকে রাখলে কিছুই পাওয়া যাবে না। শক্তিশালীর পক্ষেই একমাত্র ক্ষমাশীল হওয়া সম্ভব। কাজেই অনুতপ্ত সন্তান পিতৃতুল্য সরকারের দরজায় ছাড়া আর কোথায় ফিরে যাবে? মহামান্য হুজুর অনুগ্রহ করে বিষয়গুলি বিবেচনা করবেন এই আশা রইল।''
স্বাধীনতা সংগ্রামীর অনুতাপ। তাও আবার ব্রিটিশের কাছে। তাঁর অনুগতদের কাছে এখন কিনা দেশপ্রেমের সংজ্ঞা শিখতে হচ্ছে?
আর একজন? মাস্টারদা। লন্ডনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিলেন মানুষটি, সঙ্গীদের নিয়ে। গ্রেপ্তার হয়েছেন। মুচলেকা দেননি। জাত-পাত-বোষ্টম-মুসলমান কিচ্ছুটি কোনদিন বিচার করেননি। জেলবন্দী সূর্য সেন সম্পর্কে লিখছেন তাঁর সহকর্মী, পরবর্তীকালে কমিউনিস্ট নেত্রী হয়ে ওঠা কল্পনা দত্ত —''জেলে গিয়েও দেখি মাস্টারদা চুপ করে নেই। তিনি জানতেন, তাঁর ফাঁসি সুনিশ্চিত, তাই তিনি সমস্ত কাজ বুঝিয়ে দিতেন তারকেশ্বর দস্তিদারকে কাঠগড়ায় বসে। তাঁর ধারণা ছিল — তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসি হবে না। শুধু কাঠগড়ায় বসে নয়। জেলের ভেতরেও। ...মাস্টারদা একদিন আমাকে বললেন— জেল থেকে বেরিয়ে এসে শহীদদের জীবনী প্রকাশ করবার চেষ্টা করি যেন আমরা। মৃত্যুর সামনে দাঁড়িয়েও তাদের কথা তিনি ভুলতে পারেননি।''
এই লোকটি আমার ধমনীতে। আমাদের ঐতিহ্য। দেশপ্রেম ও মুক্তির স্বপ্ন আমাদের সম্পদ। তোমরা সাভারকারের ধ্বজাধারী, 'স্বাধীনতার' বানিয়া। তোমাদের কী যোগ্যতা আছে দেশপ্রেমের ব্যাকরণ শেখানোর?

বৃহস্পতিবার, ২১ মার্চ, ২০১৯

এসএসসি অনশন ~ প্রতিভা সরকার

প্রশ্ন তো উঠতেই পারে ওয়েট লিস্টে যারা তাদের কেন চাকরি হবে? মেইন লিস্টে যারা আছে তাদেরই হলো না যখন এখনও? ওয়েট লিস্ট অনশনে বসে পড়লেই হলো? মামদোবাজি !! 

দোলের দিন পাড়ায় প্রভাতফেরি হল। কী সুন্দরী সব মহিলা, সুবেশ পুরুষ, খোল দ্বার খোলের সঙ্গে অভিজাত পদক্ষেপে হেঁটে যাচ্ছেন। যে তরুণের বাইকে চেপে প্রেস ক্লাবে যাচ্ছিলাম সে বলল,দেখছেন রাস্তাও লালে লাল, আর আবীরের গন্ধমাখা। 

অসাধারণ গদ্য আর কবিতাও সারাদিনে পড়লাম কিছু। সত্যি অসাধারণ।  এমনকি যেখানে ছেলেমেয়েরা অনশনে বসেছে সেখানেও বাঁধানো বেদীর মস্ত গাছে নতুন কচি পাতা। শুধু বাইশ দিনের উপোসে শুকনো মুখগুলোতে বসন্ত অনুপস্থিত। হাতে প্ল্যাকার্ড, রোদ এড়াতে ছাতা আর ফুটপাথে বিছানো ত্রিপলের ওপর ক্ষিদে আর আশাভঙ্গের অভিঘাতে শুয়ে আছেন যারা, তারা এ দেশের হবু শিক্ষক ! 

অজস্র মেয়েরা অনশন করছেন। ধারেকাছে লেডিজ টয়লেট নেই, আর্মি এরিয়া বলে ত্রিপল খুলে দেয় বার বার, রাতের হাওয়ায় অশ্লীল ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ভেসে আসে, একজন নয়, দুজনের গর্ভপাত হয়েছে, দ্বিতীয়জনের পারিবারিক সম্মানবোধ সে কষ্ট তাকে নীরবে গলাধঃকরণ করিয়েছে, তবু তারা লড়ছেন। ছেলেদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অনশন করছেন আজ বাইশদিন। আমার পাশে বসা মেয়েটির মুখ বড় মলিন। জিজ্ঞেস করে জানলাম সে হাসপাতালফেরত। অক্সিজেন নেওয়া শেষ হতেই আবার এসে বসেছে।অঙ্কের এম এস সি মেয়েটির প্রশ্ন, সরকার যে বলে বিজ্ঞানের শিক্ষক নেই বলে এতো পদ খালি, আমরা তবে কারা ?  
             
 প্রথমেই যে প্রশ্ন তোলা তার উত্তরেই লুকিয়ে আছে গোটা ব্যাপারখানার ব্যাখ্যা। শুনুন তবে, গোটা পশ্চিমবঙ্গে মোট কতো স্কুলটিচারের পদ খালি আছে তার কোন ঘোষণা হয়নি। অথচ স্কুল সার্ভিস কমিশনের গেজেট অনুযায়ী চূড়ান্ত মেধা তালিকা প্রকাশের ১৫দিন আগে আপ টু ডেট ভেকেন্সি জানাতে তারা বাধ্য। অনশনকারীরা জানাচ্ছেন নিজের নিয়ম নিজেই ভাঙছে সব সরকারি সংস্থা। ২০১৭ মে মাসে রেজাল্ট বেরলো, নিয়মানুযায়ী উচিত ছিল ২০১৭র এপ্রিল অব্দি কতো শূন্যপদ আছে তার তালিকা প্রকাশ করা। কিন্তু বাস্তবে করা হল ২০১৫ অব্দি। মাঝের দুবছর কি উবে গেল ? 

নিয়ম হয়েছিল ১ঃ ১ঃ ৪  রেশিওতে নিয়োগ হবে। অর্থাৎ ১০টি সিট থাকলে ১৪ জনকে ডাকবে, ১০ জন এমপ্যানেল্ড হবে, আর ৪ জন থাকবে ওয়েটলিস্টে। তার মানে ১০০ জনে ৪০ জন থাকবে ওয়েট লিস্টে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ১০০ পদের ওয়েট লিস্টে রাখা হয়েছে ২৫০/৩০০ জনকে। এই বেনিয়মগুলো না হলে আমরা আজ রাস্তায় শুয়ে থাকতাম না, সখেদে বলে লক্ষ্মীকান্তপুরের তরুণটি। তার প্রশ্ন গত ৭ বছর রিক্রুটমেন্ট হয়নি, ভেকান্সিগুলো গেল কোথায়? 
এছাড়াও অঙ্কিত অধিকারীসংক্রান্ত ঘটনা, টাকাপয়সার লেনদেন, আরো অনেক বেনিয়ম নিয়ে কথা বলতে তারা দৃশ্যতই বিব্রত বোধ করছে। কারণ মঞ্চটিকে অরাজনৈতিক রাখতে হবে তো। কিন্তু মুখ খুললেই যে জড়িয়ে যাচ্ছে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দল। সান্ত্বনা দেবার সাধ্য ছিল না, তাদের ফান্ডে অল্প সাহায্য আর সমবেদনার প্রকাশ ছাড়া এ শর্মার আর কোন সাধ্যই নেই। 
তবু ফিরতি পথে পাশ দিয়ে হুশ করে বেরিয়ে যাওয়া দেড় কোটি টাকার গাড়ি, উড়ালপুলের ওপর থেকে পাঁচতারা হোটেলের কালো কাচ ফুঁড়ে তার সুসজ্জিত অন্দরমহল দেখতে দেখতে ফিরতি আমি-র কানে বাজতে লাগলো এক তরুণের আক্ষেপ - একটা সিস্টেম গড়ে উঠতে এতো সময় লাগে, আর সেই সিস্টেমকে ধ্বংস করে দিতে কতো অল্প সময় ! মদ খেয়ে মরলে ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়, আমরা অনশনে মরলে কি হবে ?  

আমার কথা যাদের বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হবে না, তাদের দোলের চূড়ান্ত শুভেচ্ছা জানিয়েও বলি, আমাকে মিথ্যুক এবং অনশনকারীদের ষড়যন্ত্রী প্রমাণের জন্যও তো ওদের কাছে আপনার একবার যাওয়া উচিত, ওদের বক্তব্য শোনা উচিত। 

আর যারা আমার কথা যুক্তিযুক্ত মনে করলেন তাদের অনেক ভালবাসা। কল্লোলিনী কলকাতার যে হৃদয় আছে তা প্রমাণে আপনাকে যেতেই হবে, দাঁড়াতে হবে ওদের পাশে। বাইশদিন না খেয়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলোর চকোলেট, স্যান্ডউইচের দরকার নেই, মনোবল আর লড়াকু চেতনার বড় দরকার। 

আর দেরি করবেন না, সাথী ।

বুধবার, ২০ মার্চ, ২০১৯

ডাঃ রেজাউল করিম-এর প্রার্থীপদ ~ ডাঃ বিষাণ বসু

আমার মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গ থেকে এই প্রথমবার ভোটে দাঁড়ালেন একজন চিকিৎসক-নেতা। হ্যাঁ, আমি ডাক্তার রেজাউল করিমের কথা বলছি।

না, আমি একবারের জন্যেও ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে ডাঃ সূর্যকান্ত মিশ্র বা ডাঃ রামচন্দ্র ডোম, এমনকি ডাঃ কাকলি ঘোষ দস্তিদার বা ডাঃ মমতাজ সঙ্ঘমিত্রা অথবা ডাঃ নির্মল মাজি, কারো কথাই ভুলে যাচ্ছি না।

আমার বক্তব্য, এঁদের পরিচিতি রাজনীতিক হিসেবে। এঁদের সাফল্য বা ব্যর্থতার দায়ও ব্যক্তিগতভাবে রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই, বা সমষ্টিগতভাবে তাঁদের দল বা দলের রাজনীতির।

কিন্তু, এক এবং একমাত্র চিকিৎসক-আন্দোলন থেকেই উঠে এসে রাজনীতির আঙিনায় পা রাখার নজির, অন্তত এই রাজ্যে, আর নেই।

তিন কি চার দশক আগে, বিশেষ করে বাম দলগুলিতে, এক বিশেষ আন্দোলনের ঘরাণা থেকে নেতা উঠে আসার প্রচলন ছিল। মানে, কৃষক ফ্রন্ট বা শ্রমিক ফ্রন্ট। এই রাজ্যে, সরকারি বাম দলের প্রভাব কমে আসার সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত এই দুই উজ্জ্বল স্রোতের ক্ষীয়মানতা। কলকাতা শহরকেন্দ্রিক ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নেতাদের হাতে যে মুহূর্তে বাম আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হল, সেই মুহূর্তেই তাঁদের শেষের শুরুটি সূচিত হয়েছিল, এমনটাই মনে করি। পরবর্তীকালেও, অন্যান্য দলেও, বিশেষ একটি আন্দোলনের ফ্রন্ট থেকে নেতা নির্বাচিত হওয়ার নজিরটি বিরল হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষিতে, ডাঃ রেজাউল করিমের উঠে আসাকে ব্যতিক্রম ধরা যেতে পারে।  

যাঁর প্রত্যক্ষ কোনো দলীয় রাজনীতির অতীত নেই। থাকা সম্ভবও নয়, কেননা তিনি সরকারি চাকরি করতেন। দলমতনির্বিশেষ এক চিকিৎসক আন্দোলনের প্রাণপুরুষ হিসেবেই তাঁর উত্থান। বর্তমান পরিস্থিতিতে, চিকিৎসকদের যদি একটি সুবিধাভোগী শ্রেণীর অন্যতম হিসেবে না ভেবে বিশেষ একটি আক্রান্ত শ্রেণী হিসেবে যুক্তিসঙ্গতভাবে ধরা হয়, বা অন্তত আক্রান্ত শ্রেণীর অন্তর্গত একটি গোষ্ঠী হিসেবে ভাবা হয়, তাহলে সেই চিকিৎসকদের সার্থক প্রতিনিধি হিসেবে ডাঃ করিমের চেয়ে উপযুক্ত কোনো নাম, এই মুহূর্তে, মাথায় আসে না।

এরই সাথে সাথে, তাঁর আন্দোলন শুধুমাত্র চিকিৎসকদের স্বার্থটুকুই যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে, এই ধরনের মায়োপিক নয়। কেননা, তাঁর অন্তর্দৃষ্টি বলে, চিকিৎসকদের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে, বা চিকিৎসকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে, সাধারণ মানুষকে পাশে না পেলে চলবে না। আর, রোগী-চিকিৎসকের এই অবিশ্বাসের মূলে রয়েছে সাধারণ মানুষের মনে চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও অসহায়তা, এবং সেই অনিশ্চয়তা-অসহায়তারও মূলে চিকিৎসার বাণিজ্যিকীকরণ। 

অতএব, ডাঃ রেজাউল করিমের জনমুখী আন্দোলন মুখ্যত সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবীতে আন্দোলন, সবার সামর্থ্যের মধ্যে স্বাস্থ্যের দাবীতে আন্দোলন।

স্বাধীনতার পর সাতটি দশক পার হয়ে গেলেও, একটিও সাধারণ নির্বাচন লড়া হয়নি সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবীকে সামনে রেখে। স্বাস্থ্যচিকিৎসা প্রথম দশটি ইস্যুর অন্যতম, এমন কোনো দলীয় নির্বাচনী ম্যানিফেস্টোও চোখে পড়েনি কোনোদিন।

দেশের প্রথম সারির সবকটি দলের জনগণের স্বাস্থ্য বিষয়ে এমন প্রকাশ্য অনীহা বা অবজ্ঞার উল্টোপিঠেই থাকে চিকিৎসক ও রোগীকে যুযুধান প্রতিপক্ষ হিসেবে খাড়া করা। এরাজ্যের বাম দলগুলিকে ধন্যবাদ, যে, তাঁরা নির্দল প্রার্থী ডাঃ রেজাউল করিমকে সমর্থন জুগিয়ে এই গড্ডালিকা প্রবাহের বিপরীতে প্রথম পদক্ষেপটি নিলেন।      

ডাঃ করিম জিতবেন কি জিতবেন না, সেই প্রশ্ন ভিন্ন। কেননা, নির্বাচনের সমীকরণ ভারি জটিল বিষয়। এবং, এদেশের নির্বাচনে, বিশেষ করে এই বাজারে, শিক্ষিত ভদ্রলোকের জয়ের সম্ভাবনা প্রথম থেকেই কমে যায়, কেননা খেউরের লড়াইয়ে তাঁদের অদক্ষতা লক্ষ্যণীয়। আর, একথা মাথায় রাখতে হবে, পিপল গেট দ্য লিডার দে ডিজার্ভ। কাজেই…..  

কিন্তু, তাঁর প্রার্থী হওয়া বা প্রচার-পদক্ষেপের মধ্যে দিয়ে সবার জন্যে স্বাস্থ্যের দাবী কিছুটা সামনের সারিতে আসতে পারবে, কিছুটা মান্যতা পাবে, এই দাবী প্রকৃতঅর্থেই জনসাধারণের মধ্যে থেকে উঠে আসা জনসাধারণের দাবী হয়ে উঠতে পারবে, এইটাও খুব বড় পাওনা।

সেইদিক থেকে বিচার করলে, ভোটের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া বা ফলপ্রকাশের বহু আগেই, ডাঃ রেজাউল করিম ও তাঁর অ্যাজেন্ডাটি জিতে গিয়েছে। 

আপনিও গর্ববোধ করুন, কেননা অ্যাজেন্ডাটি আপনারও।

সোমবার, ১৮ মার্চ, ২০১৯

Revolution Recounted ~ সম্রাট চক্রবর্তী

ভালো আছেন অর্ণব দাম ?ও বিপ্লবী অর্নব বাবু?আইআইটি ড্রপ আউট অর্ণব।আপনি মেধাবী ছিলেন।মাওবাদী রাজনীতিতে বিশ্বাসী তরুণ।মধ্যবিত্ত বাঙালি পরিবারের স্থিতধী তাত্ত্বিক ।

জঙ্গল মহলে বিপ্লবের আশায় পা রাখেন।মুক্তাঞ্চল গড়বেন।সে প্রায় এক দেড় দশক আগের কথা।'যুদ্ধে হেরে'বা মন জগতে পরিবর্তনের ফলে যে কারণেই হোক রাষ্ট্রের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন।এখন ইতিহাসে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতকোত্তর।পোস্ট গ্র্যাজুয়েট।স্টেট এলিজিবিলিটি টেস্ট পরীক্ষায় মুন্সিয়ান দেখিয়েছেন।কারান্তরালে দেশের কঠিনতম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ অভিনন্দন অর্ণব।উর্ফ আকাশ বা বাতাস বাবু।আকাশ ,বাতাসের কথায় মনে পড়লো!তিলক টুডুর কথা।অর্নবের কমরেডরা ছাত্র ফেডারেশনের এই ছাত্র কর্মীর মাথায় খুব কাছ থেকে গুলি করে।আধমরা তিলকের রক্তাক্ত দেহের পাশে বসে মুরগির ঝোল দিয়ে ভাত খেয়েছিল।এক দশক অতিবাহিত।কে জানে তিলক বেঁচে থাকলে আজকে হয়তো কোনও প্রতিযোগিতা মূলক পরীক্ষার জন্য তৈরি হতেন!অথবা ছবি মাহাতো।একুশ জন বিপ্লবী ধর্ষণ করে যাঁকে পুঁতে দিয়েছিল জঙ্গলে!তার সন্তানরাও নিশ্চই অর্নবের সাফল্যে খুশি হবে।সহ নাগরিকের সাফল্য প্রত্যেকটি মানুষকে উদ্দীপ্ত করে।প্রতিকূল পরিবেশে বেঁচে থাকার লড়াই!প্রতিকূল পরিবেশ।সৌম্যজিত বসু ,পার্থ বিশ্বাসের পরিবারের মত প্রতিকূল।স্কুল শিক্ষক সৌম্যজিত ,কলকাতা পুলিশের কর্মী পার্থর পরিবার অবশ্য এতটা সৌভাগ্যবান ছিলেন না।শুধু করোটির একটা অংশ আর কঙ্কাল পাওয়া গিয়েছিল।সঙ্গে গুটি কতক হাড়গোড়।শল্কু সোরেদের বাপ মায়েদের থেকে একটু কম সৌভাগ্যবান।পোঁকায় কাটা পঁচা গলা লাশের জায়গায় শুধু খুলি আর হাড়গোড়।হায়দ্রাবাদের গবেষণাগার থেকে 'ফলাফল' জানতে দীর্ঘ প্রতীক্ষা তাঁদের পরিবারের লোকেদের।কঙ্কাল গুলো তাঁদের পরিবারের প্রিয়জনের তো!ভালো থাকুন অর্ণব।

মানস চক্ষে দেখতে পাচ্ছি অধ্যাপক অর্ণব ইতিহাসের ক্লাসে সমাজ পরিবর্তনের ইতিহাস ব্যাখ্যা করছেন।শ্রেণী বিপ্লব, ক্লাস ইক্যুয়েশন, কায়িক ও বৌদ্ধিক শ্রমের তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইতিহাসের ছাত্রছাত্রীদের সামনে দন্ডায়মান।ছেলেমেয়েরা গণতন্ত্র, প্রলতাড়িয়েত সমাজে রাজবন্দীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ছুড়ছেন অধ্যাপক অর্নবের দিকে।একের পর এক প্রশ্ন বানে বিপন্ন অর্ণব ঢোক ঢোক করে ঠান্ডা জল খেলেন।যে জল টুকুও ১৫বছরের তিলক টুডু পায় নি।বিপ্লবীরা অবশ্য বেসক্যাম্পে যাবার আগে আধমরা তিলকের গলার কন্ঠনালী কুচুৎ করে কেটে 'শ্রেণী শত্রুর রক্তে' হাত রাঙিয়ে বিপ্লবের উদ্বৃত্তের মূল্য উশুল করে দিয়েছিলেন।অর্ণবের পরীক্ষার খাতায় শিক্ষকের কলমের লাল দাগের মত যা বিরলতম।'শ্রেণীশত্রু
ভাগচাষীর' মেধাবী পুত্রের  রক্ত।একটু লাল সেলাম হবে না কমরেড?

শনিবার, ১৬ মার্চ, ২০১৯

অনশন চলছে ~ হাবিব বাপি

আগে পড়াশোনা করে পরীক্ষায় পাশ করলে চাকরি হত। এখন পড়াশুনা করতে হয়। ফর্ম ফিলাপ এর জন্য আন্দোলন করতে হয়। রিটেন একজ্যাম দেওয়ার জন্য আন্দলন করতে হয়।  রেজাল্ট বের করার জন্য, ইন্টারভিউ নেওয়ার জন্য, মেরিট লিস্ট পাব্লিশ করার জন্য কেস অথবা আন্দোলন করতে হয়।  কাউন্সেলিং এবং জযেনিং এর জন্য আবার আন্দোলন করতে হয়। 

৫-৬ বছরের একটা প্রসেস।  যার মধ্যে পড়াশুনো ৬ মাস আর বাকি সাড়ে ৫ বছর আন্দোলন, কেস এবং অনশন করতে হয়।  

অনশন এখনো  চলছে ।

মঙ্গলবার, ১২ মার্চ, ২০১৯

হিটলারের জুমলা ~ অরিজিত মুখার্জী

সরকারি জুমলার একটা গল্প বলি শুনুন।

১৯৩৮ সালের কথা। তার বছর কয়েক আগে, সঠিকভাবে বলতে গেলে ১৯৩৩ সালের জানুয়ারি মাসে অ্যাডলফ হিটলার প্রথমবার জার্মানির চ্যান্সেলর হিসেবে ডাক পান তৎকালীন প্রেসিডেন্ট, ফিল্ড মার্শাল হিন্ডেনবার্গের কাছ থেকে। প্রথমে ছিলো কোয়ালিশন, কিন্তু অচিরেই একে একে সবাইকে সরিয়ে, অন্য দলগুলোকে বেআইনি ঘোষণা করে, লেবার ইউনিয়ন বাতিল করে সেখানে ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট বা নাৎসি পার্টির একমাত্র সংগঠন বসিয়ে হিটলার জার্মানির একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন। রাইখস্ট্যাগ তখন ছিলো নাম কা ওয়াস্তে, রাবারস্ট্যাম্প মাত্র। গোয়েবলস তখন প্রোপাগান্ডা মিনিস্ট্রির সর্বেসর্বা, তাঁর ইশারায় দেশের সমস্ত সংবাদমাধ্যম পরিচালিত হত - তিনিই বলে দিতেন কবে কোন খবর কীভাবে লিখতে হবে। সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে শুরু করে ইউনিভার্সিটি অবধি - সর্বত্রই ন্যাশনাল সোশ্যালিজমই একমাত্র এবং আবশ্যিক বিষয়। ইউনিভার্সিটিতে পড়ানো হত জার্মান সায়েন্স, জার্মান হিস্টরি, জার্মান জাতিগত তত্ত্ব ইত্যাদি - নামীদামী যে অধ্যাপক বা সংস্কৃতি কর্মীরা এ পথে হাঁটতে চাননি, তাঁদের তখনই কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পাঠানো শুরু হয়ে গেছে, কখনো খুন করাও। এর মধ্যে বার্লিন এবং অন্যান্য শহরে লাইব্রেরির সমস্ত বই জ্বালিয়ে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটে গেছে।

তো যেটা বলছিলাম - সাধারণ জার্মানরা কিন্তু কঠিন অবস্থা সত্ত্বেও বেশ মানিয়ে নিয়েছিলো, কারণ জাতীয়তাবাদের হিস্টিরিয়া হিটলার সফলভাবে চালাতে পেরেছিলেন, বিশেষ করে ভার্সাই চুক্তির ফলে জার্মানীর দুরবস্থা আর তা কাটানোর জন্যে লীগ অফ নেশনস থেকে বেরিয়ে আসা, এমনকি অসামরিক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত রাইনল্যান্ডে জার্মান সৈন্য পাঠানো - বিভিন্ন প্লেবিসাইটে জার্মানরা ঢেলে হিটলারের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। হ্যাঁ, গেস্টাপোর ভয়ে অনেকেই হয়তো না-কে হ্যাঁ লিখেছেন, কিন্তু তাতেও এই বিপুল সমর্থনকে অস্বীকার করা যায় না।

এই সময়ে, হিটলার, সাধারণ জার্মান কর্মীদের মধ্যে আরও জনপ্রিয়তার লক্ষ্যে একটি "জনসাধারণের গাড়ি" তত্ত্ব বাজারে আনেন। গোদা বাংলায়, সমস্ত জার্মান কর্মীদের জন্যে সহজলভ্য গাড়ি তৈরী হবে, তার দাম থাকবে ৯৯০ মার্ক, অর্থাৎ তখনকার হিসেবে ৩৯৬ ডলার। তৈরী হয় ভোকসওয়াগন - যার আক্ষরিক অর্থ - "পিপলস কার"। বলা হয় (হিটলারের নিজস্ব দাবীও তাই) যে অস্ট্রিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ডঃ ফার্ডিন্যান্ড পোর্শের করা বীটলসের ডিজাইনে হিটলার অবদান ছিল। এবারে বেসরকারি কোনো সংস্থার পক্ষে ওই দামে গাড়ি বানানো সম্ভব নয় – তাই হিটলারের নির্দেশে তৈরী হল সেই সময়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গাড়ি তৈরীর কারখানা, একটি সরকারী সংস্থা, যার মাথায় হিটলার বসালেন নাৎসি পার্টির লেবার ফ্রন্টকে। বলা হল এই কারখানা থেকে প্রতি বছর  পনেরো লক্ষ গাড়ি বাজারে আসবে। গোয়েবলসের দল প্রচারে নেমে পড়লো এই নিয়ে, বছরে পনেরো লক্ষ গাড়ি, কোথায় লাগে ফোর্ড কোম্পানি? লেবার ফ্রন্টের তরফ থেকে কারাখানা শুরুর জন্যে পাঁচ কোটি মার্ক দেওয়া হল। কোথা থেকে এলো এই টাকা? সেই যে হিটলার ট্রেড ইউনিয়নের বদলে নাৎসি সংগঠন বাধ্যতামূলক করলেন - তাদের তো সাপ্তাহিক চাঁদা দিতে সমস্ত কর্মীকে - তাই দিয়েই তৈরী হয়েছিল লেবার ফ্রন্টের "ফান্ড"।

এবার আসরে নামলেন ডঃ রবার্ট লে, যিনি জার্মানিব্যাপী লেবার ফ্রন্টের দায়িত্বে ছিলেন। তিনি কর্মীদের জন্যে আনলেন একটা নয়া স্কিম - অনেকটা গাড়ির দামের দরুণ সপ্তাহে একটা ইনস্টলমেন্ট - সমস্ত কর্মীকে এই টাকা দিতে হবে প্রতি সপ্তাহে - যতটা সে পারবে - দশ বা পনেরো মার্ক করে। এই টাকা জমে যখন ৭৫০ মার্ক হবে, তখন সেই কর্মী একটা রসিদ পাবে অর্ডার নম্বর সহ, তাতে লেখা থাকবে যে কারখানা থেকে গাড়ি বেরোলেই সেই কর্মী একটি গাড়ি পাবে। এভাবে জার্মানির সমস্ত কর্মীর কাছ থেকে কয়েক বছর ধরে তোলা হল লক্ষ লক্ষ মার্ক।

বলাই বাহুল্য, ভোকসওয়াগনের কারখানা থেকে নাৎসি শাসন চলাকালীন একটিও গাড়ি রাস্তায় বেরোয়নি। ১৯৩৯ সালের পয়লা সেপ্টেম্বের জার্মান ট্যাঙ্কবাহিনী পোল্যান্ডের বর্ডার বেরোয়। ততদিনে ভোকসওয়াগনের কারখানা গাড়ির কারখানা থেকে বদলে হয়ে গেছে যুদ্ধাস্ত্র তৈরীর কারখানা। "জনসাধারণের গাড়ির" তত্ত্ব দেখিয়ে জার্মান কর্মীদের কাছ থেকে সংগৃহীত লক্ষ লক্ষ মার্ক গাড়ির বদলে কাজে লাগলো যুদ্ধাস্ত্র তৈরীতে, আর তার পরের কথা আর কাউকে বলে দেওয়ার দরকার নেই। আমরা সবাই জানি সেই গল্পটা।

শেখার বিষয় এইটাই যে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর "গ্র্যান্ড স্কিম" গুলোও এরকমই জুমলা। 

যেমন ধরুন "প্রধানমন্ত্রী ফসল বীমা যোজনা"। চাষীদের কাছ থেকে ফসল বীমার জন্যে টাকা নেওয়া হয় যাতে খরা, বন্যা, অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত ফসলের জন্যে চাষীদের ক্ষতি আটকানো যায়। ২০১৬ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এই স্কিম চালু করেন। আরটিআই সুত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী জানা যাচ্ছে ২০১৪-১৫ বা ২০১৬-১৬ সালে (অর্থাৎ, নতুন চালু করা স্কিমের আগের বছরে), যখন পুরনো ফসল বীমা চালু ছিলো, তখনকার তুলনায় ইনসিওরেন্স প্রিমিয়াম বেড়েছে ৩৪৮% (১০,৫৬০ কোটি থেকে বেড়ে ৪৭,৪০৮ কোটি)। এবং হাতে গোণা কয়েকটি বেসরকারি বীমা সংস্থা, রিলায়েন্স যাদের মধ্যে অন্যতম, ২০১৬-১৭ সালে মুনাফা করেছে ৭০০০ কোটি টাকার, যেখানে গড়ে ক্ষতিগ্রস্ত চাষী খরিফ মরসুমের জন্য পেয়েছে মাত্র ১০,০০০ টাকা। নাম আসবে আরো অনেক স্কিমের - যেমন এগ্রিকালচারাল ক্রেডিট, প্রধানমন্ত্রী কিষাণ সম্মান নিধি, স্বচ্ছ ভারত, স্মার্ট সিটি ইত্যাদি - সবই দেখা যাচ্ছে জুমলা। ভোকসওয়াগন কারখানার মত এখানেও স্কিমগুলো তৈরী যাদের উদ্দেশ্যে, তারা কিন্তু যে তিমিরে ছিলো সেই তিমিরেই রয়ে গেছে। ১৯৩৮ সালে কর্মীদের দেওয়া টাকায় তৈরী হয়েছিলো যুদ্ধাস্ত্র। আজ ভারতে চাষী বা কারখানার শ্রমিকদের টাকায় কর্পোরেটপ্রেমী প্রধানমন্ত্রী তুষ্ট করছেন কখনো আম্বানিকে, কখনো আদানিকে।

এটা আমরা যত তাড়াতাড়ি বুঝবো, ততই মঙ্গল।

[Source: The Rise and the Fall of the Third Reich, William Shirer]

সোমবার, ১১ মার্চ, ২০১৯

৫৬ ইঞ্চি ~ দেবতোষ দাস

শ্রীশ্রীভূষণ্ডি কাগায় নমঃ। 

শ্রী কাক্কেশ্বর কুচকুচে। ৪১ নং গেছোবাজার, কাগেয়াপটি। আমরা হিসাবি ও বেহিসাবি, খুচরা ও পাইকারি, সকল প্রকার গণনার কার্য বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করিয়া থাকি। আমরা সনাতন বায়সবংশীয় দাঁড়ি কুলীন, অর্থাৎ দাঁড়কাক। 

কিন্তু গভীর দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমাদের পাণ্ডা অকাল-পক্ক দণ্ডবায়স শ্রী কাক্কেশ্বর, স্মার্টবোমের সার্জিকাল আঘাতে অকাল-অক্কা হওয়াতে, গণনা আপাতত স্থগিত আছে।
 
অমনি গাছের ফোকর থেকে বেরিয়ে এক দেড়েল বুড়ো বলল, ১০ দিন পার হয়ে গেল, এখনও হিসেবটা হয়ে উঠল না? তারপর কয়েকখানা রঙিন কাচ দিয়ে বারবার চারপাশ দেখে দরজির ফিতেটা বার করল। তারপর হাওয়ায় খানিক মাপ-টাপ নিয়ে বলল, ছাতি যখন ৫৬ ইঞ্চি, বন্দুকও যখন ৫৬ মানে একে ৫৬, তখন লাশও ৫৬ হবে! 

একটা তকমা-আঁটা পাগড়ি-বাঁধা কোলা ব্যাং রুল উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, ভুল হিসেব! মানহানির মোকদ্দমা! শামলাপরা কুমির সর্দিবসা মোটা গলায় বলতে লাগল, ধর্মাবতার হুজুর! এটা মানহানির মোকদ্দমা। সুতরাং প্রথমেই বুঝতে হবে "মান" কাকে বলে। মান মানে কচু। 

সেই শুনে হিজিবিজবিজ হেসে বলল, একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার কোটের নাম ছিল 'বিমুদ্রাকরণ'। তার জুতোর নাম 'অবিমৃষ্যকারিতা'। তার গাড়ুর নাম ছিল 'পরমমিত্রোঁওওও' – কিন্তু যেই তার বাড়ির নাম দিয়েছে 'কিংকর্তব্যবিমূঢ়' অমনি ভূমিকম্পে বাড়ি-টাড়ি সব পড়ে গিয়েছে।
 
তাই দেখে ব্যাকরণ সিং-এর ব্যা-ব্যা করে কী জোশ! থেকে থেকে চিৎকার করছে, যুদ্ধ চাই! যুদ্ধ! ছাগল ফুঁপিয়ে বলল, যুদ্ধে আমার সেজোমামার আধখানা কুমিরে খেয়েছিল, বাকি আধখানা মরে গেল দেশপ্রেমে! তারপর? ছাগল বলল, তার আর পর কী? আমিও মনের দুঃখে ফাইলগুলো খেয়ে ফেললাম! 

তবে আপাতত গণনা স্থগিত। দণ্ডবায়স প্রয়াত। তার জন্য খানিক নীরবতা পালন করা যেতে পারে। কতটা? এই ৫৬ ইঞ্চি!

মঙ্গলবার, ৫ মার্চ, ২০১৯

দেশদ্রোহী ~ শঙ্কর কুমার দাস

পাকিস্তান-চিন-রাশিয়া-কিউবা-ভেনেজুয়েলার দালালদের কুৎসিত অতীতটা একটু জানবেন না?

১) মুজফ্ফর আহমেদ - মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় ব্রিটিশ সরকার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়,যার মধ্যে ৩ বছর সেলুলার জেল এ কাটে।স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।

২) গণেশ ঘোষ-চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের অন্যতম নায়ক।সূর্য সেনের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জালালাবাদ পাহাড় এ লড়াই করেন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে।১৬ বছর সেলুলার জেলে সশ্রম কারাদণ্ড । পরবর্তী কালে সিপিআই MLA,
৩ বারের জন্য ও সিপিএমের M.P.

৩) কল্পনা দত্ত- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর সহোযোগিনী এবং চট্টগ্রাম বিদ্রোহের অন্যতম মুখ।৬ বছর এর দ্বীপান্তর।ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগ দেন ও ভোটে দাঁড়ান।

৪) সুবোধ রায় - চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন,জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে কনিষ্ঠতম সৈনিক।
১০ বছর সশ্রম কারাদণ্ড হয়, যার মধ্যে ৬ বছর সেলুলার জেল। সিপিএম রাজ্য কমিটি সদস্য আজীবন।

৫) অম্বিকা চক্রবর্তী- চট্টগ্রাম বিদ্রোহের জন্য ১৬ বছর সেলুলার জেলে সশ্রম কারাবাস।স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদান ও নির্বাচিত MLA.

৬) অনন্ত সিং - চট্টগ্রাম বিদ্রোহের জন্য ২০ বছর (১৬ বছর সেলুলার জেলে) সশ্রম কারাবাস। স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে যোগদান।

৭) শিব ভার্মা - ভগৎ সিংএর সহযোগী। লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় একসাথে গ্রেপ্তার হন।ভগৎ সিং এর ফাঁসি হয় ও এনার যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর আন্দামানে।১৭ বছর পর ফিরে যোগ দেন কমিউনিস্ট পার্টিতে।পরে সিপিএম উত্তর প্রদেশ রাজ্য কমিটির সেক্রেটারি।

৮) হরেকৃষ্ণ কোনার- ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপ এর জন্য ৬ বছর আন্দামানে এ দ্বীপান্তর। আন্দামানে বিপ্লবীদের নিয়ে কমিউনিস্ট কনসোলিডেশন গঠন ও পরে কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রধান মুখ।

৯) লক্ষী সায়গল - আজাদ হিন্দ বাহিনীর রানী ঝাঁসি রেজিমেন্ট এর ক্যাপ্টেন।আজাদ হিন্দ বাহিনীর হয়ে ইমফল ও কোহিমা ফ্রন্টে লড়াই করেন।স্বাধীনতার পর কমিউনিস্ট পার্টি তে আসেন। আমৃত্যু সদস্য ছিলেন।

১০, ১১, ১২ ) জয়দেব কাপুর , অজয় ঘোষ ও কিশোরীলাল- ভগৎ সিংএর সহযোগী লাহোর ষড়যন্ত্র মামলায় একসাথে গ্রেপ্তার হন এবং যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয় আন্দামান সেলুলার জেলে। স্বাধীনতার পর মুক্তি পেয়ে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

১৩) সতীশ পাকড়াশী - মেছুয়াবাজার বোমা মামলায় ১০ বছর এর জন্য সেলুলার জেল। ফিরে এসে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ও সিপিএম বিধায়ক।

১৪) পি সি জোশি- মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় যাবজ্জীবন, যদিও মেয়াদের আগে মুক্তি পান। ৩ বছর কাটান সেলুলার জেলে, কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম জেনারেল সেক্রেটারি।

১৫)অরুণা আসাফ আলী - ১৯৪৬ এর নৌ বিদ্রোহের সংগঠক কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে ৬৬ টা যুদ্ধ জাহাজ ও ১০০০০ নৌ সেনা নিয়ে গড়ে ওঠা ব্রিটিশ বিরোধী যে বিদ্রোহ কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও হিন্দু মহাসভার পিছন থেকে ছুরি মারায় অঙ্কুরে বিনাশ পায়। এই বিদ্রোহী দের মধ্যে আরো অনেক কমিউনিস্ট ছিলেন যারা ব্রিটিশ এর গুলিতে মারা যান, উৎপল দত্তের 'কল্লোল ' নাটকে এর বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়।

১৬) বি টি রণদিভে - ১৯২৫ থেকে ১৯৪২ , ১৭ বছর ধরে ব্রিটিশ সরকার এর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা মাথায় নিয়ে কৃষক শ্রমিক কে সংগঠিত করেছেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নৌ বিদ্রোহের সমর্থনে সারা ভারত ব্যাপী হরতাল সংগঠিত করেন ও ব্রিটিশ সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা করেন। স্বাধীনতার পর সিপিআই এ, পরে সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটি তে।

১৭) ই এম এস নাম্বুদিরিপাদ - ১৯৩৪ - ১৯৪২ ব্রিটিশ সরকারের ' ওয়ান্টেড লিস্ট' এ প্রায় গোটা যৌবন তাই আত্মগোপন করে কাটিয়ে দিয়েছেন। পরে কেরালার প্রথম কমিউনিস্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী।

১৮, ১৯ ) বীরেন্দ্রনাথ দাশগুপ্ত ও সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর-- ছাত্রাবস্থায় পালিয়ে যান জার্মানি তে ইন্ডিয়ান ইনডিপেনডেন্স লীগ এর বার্লিন কমিটি এর সদস্য হয়ে ভারত বর্ষের বিপ্লবীদের অস্ত্র যোগান দেওয়ার দায়িত্ব নেন।
হিটলারের নাত্সি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার ও দীর্ঘ কারাবাস জার্মানিতেই।কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

২০ ) শওকত উসমানী- মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার প্রধান অভিযুক্ত।কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।

এইরকম কুৎসিৎ অতীত একমাত্র বামপন্থী দেশদ্রোহী দেরই আছে।

আর কারো আছে নাকি???

আর থাকবেই বা কেন?
ওরা তো দেশপ্রেমী!

অনেক তো 'দেশদ্রোহী' সিপিএমের কুৎসিত অতীতের কথা তো জানলেন।এবার জানুন সত্যিকারের 'দেশপ্রেমিক'দের কথা।

১)মাধব সদাশিব গোলওয়ালকর(আরএসএসের দ্বিতীয় স্বরসঙ্ঘচালক) : "হিন্দুরা ব্রিটিশদের সাথে লড়াই করে তোমাদের শক্তি খরচ না করে,আসল শত্রু মুসলমান,খ্রিস্টান আর কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে লড়াই করো।"

২)বিনায়ক দামোদর সাভারকর('হিন্দুরাষ্ট্র' বই-এর লেখক এবং হিন্দুত্ব আইডিওলজির জনক) : ইংরেজ সরকারের কাছে মুচলেকা দিয়ে লেখেন যে তিনি আর কোনও দিনও ব্রিটিশ বিরোধী ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেবেন না।

৩)নাথুরাম বিনায়ক গডসে(আরএসএসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা) : জীবনে কোনওদিন ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ না নিলেও গান্ধীজীকে খুন করেন[প্রসঙ্গত,গান্ধীজীর আদর্শকে সমর্থন করিনা,তবে তাঁকে খুন করাটাও ঘৃণ্যতম অপরাধ বলেই মনে করি]।

৪)অটল বিহারী বাজপেয়ী(আরএসএস নেতা,পরবর্তীকালে বিজেপির টিকিটে জিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী) : ১৯৪২সালে ভারতছাড়ো আন্দোলনের সময় উত্তরপ্রদেশের বটেশ্বর গ্রামে ব্রিটিশ সরকারের রাজসাক্ষী হয়ে অসংখ্য বিপ্লবীকে ইংরেজ সরকারের কাছে ধরিয়ে দেন।

৫)শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় (আরএসএস নেতা তথা বিজেপির প্রাণপুরুষ) : ১৯৪৭ সালের ২রা মে ভাইসরয় মাউন্ট ব্যাটেনকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেন ভারত ভাগ পরে করা হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু বাংলাকে যেন অবিলম্বে ভাগ করা হয়[যে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ থেকে নজরুল রাস্তায় নেমে এসেছিলেন]।

৬)কে বি হেডগেওয়ার (আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা) : ১৯৩০সালে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের সময় দেশবাসীকে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের তেরঙ্গা পতাকা বর্জনের আহ্বান জানিয়ে সত্যাগ্রহ সহ ব্রিটিশ বিরোধী সমস্ত আন্দোলন থেকে দূরে থাকতে আহ্বান জানান।

এই ইতিহাস জানতে 'দেশদ্রোহী বাম' ঐতিহাসিকদের লেখা পড়ার প্রয়োজন নেই।
'দেশভক্ত আরএসএস বিজেপি'র নিজস্ব ইতিহাস বইগুলোই যথেষ্ট।

শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০১৯

বালাকোট ~ পুরন্দর ভাট

বিশ্বব্যাপী সংবাদ সংস্থা, এসসিয়েটেড প্রেস বলছে তাদের সাংবাদিকদের ২৬ তারিখ সকালবেলাই বালাকোটের সেই কুখ্যাত পাঁচতারা টেররিস্ট ক্যাম্প, যা ভারতীয় বায়ুসেনা বোমা মেরে ধ্বংস করে দিয়েছে, সেখানে নিয়ে গেছিল পাকিস্তানের সেনাবাহিনী। সঙ্গে পাকিস্তানি মিডিয়ার সাংবাদিকরাও ছিল। এসসিয়েটেড প্রেসের সাংবাদিকরা সেই পাহাড়ে কিছু উপড়ে পড়া গাছ আর দুটো ভাঙা মাটির বাড়ি ছাড়া কিছু দেখতে পায়নি। (লিংক:  https://www.apnews.com/e64d72f76c4f475493e4d41501ebab06 )

চলে আসা যাক আমেরিকার ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল রক্ষণশীল সংবাদপত্র, ওদের মালিক হলো কুখ্যাত ফক্স নিউজের মালিক - রুপার্ট মারডক। ওরা ট্রাম্প সমর্থক, খোলাখুলি ইসলাম বিদ্বেষী না হলেও কেউ ওদের ইসলামপন্থী বলে প্রশংসা করতে পারবে না। তবে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল একটা সম্মানীয় পত্রিকা, ফক্স নিউজের মত নয়। তো সেই ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও জানাচ্ছে যে বালাকোটে যেখানে বোমা ফেলা হয়েছে সেখানে কিছুই নেই কয়েকটা গাছ ছাড়া। (লিংক: https://bit.ly/2TphqtS )

একই কথা বলছে নিউ ইয়র্ক টাইমস এবং লন্ডনের টাইমস। ইংল্যান্ডের গার্ডিয়ান পত্রিকাও সন্দেহ করছে যে ফাঁকা জঙ্গলে বোমা ফেলেছে বায়ুসেনা। নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে যে পাকিস্তানে বহুদিন যাবৎ বড় বড় টেররিস্ট ক্যাম্প বন্ধ হয়ে গেছে, যা আছে তা হলো ছোট ছোট টেররিস্ট সেল যারা কয়েকদিন পর পর জায়গা বদলায়। বালাকোটে, এক দশক আগে জঙ্গি ঘাঁটি থেকে থাকলেও এখন কিছুই নেই। (লিংক: https://nyti.ms/2GLbe9B , https://www.thetimes.co.uk/article/india-bombs-terror-camp-inside-pakistan-9cggx6lmt )

বিবিসি, সিএনএন, ইন্ডিপেন্ডেন্ট - তাবর তাবর সংবাদমাধ্যম ঘেঁটেও কোথাও পেলাম না যেখানে তারা পাঁচতারা জঙ্গিঘাঁটির কথা বিশ্বাস করেছে।

একমাত্র আলজাজিরা বালাকোটের কাছে জৈশে মোহাম্মদ পরিচালিত একটা ছোট মাদ্রাসার অস্তিত্ব খুঁজে পেয়েছে। সেখানে জঙ্গি প্রশিক্ষণ হোক না হোক, অন্তত জঙ্গি রিক্রুটমেন্ট যে হত সেইটা ধরে নেওয়াই যায়। কিন্তু সেই একচালা মাদ্রাসা কোনোভাবেই সুইমিং পুল শোভিত পাঁচতারা জঙ্গি প্রশিক্ষণ শিবির বলা যাবে না এবং সেই মাদ্রাসাটি অক্ষতই আছে, বোমার আঘাত লাগেনি। জেহাদী মতবাদে দীক্ষা দেওয়ার জন্য এরকম ছোট ছোট মাদ্রাসা গোটা পাকিস্তান অকুপাইড কাশ্মীরে ভুরি ভুরি আছে, তাই এটা খুব হাই প্রোফাইল টার্গেট বিশ্বাস করাও কঠিন। (লিংক: https://bit.ly/2H5B7QO )

এতগুলো রিপোর্ট দেখেও আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই ভক্তদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেশ, জেহাদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি লড়াই করা দেশ - ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম ঘাঁটলাম। বায়ুসেনা যে বোমাগুলো ফেলেছে সেগুলোও তো ইজরায়েলি, ওরা নিশ্চই পাঁচতারা সন্ত্রাসবাদী ক্যাম্পের কথা লিখবে। ইজরায়েলের সব থেকে বড় সংবাদপত্র হারেতজের ওয়েবসাইটে গেলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য ওরাও বলছে যে বালাকোটের সেই পাহাড়ে দু চারটে কুঁড়ে ঘর ছাড়া কিছু নেই!! (লিংক:  https://bit.ly/2Nyf06O )

এবার আমি পড়লাম বিপদে। কাকে বিশ্বাস করবো? বিশ্বের সেরা সংবাদমাধ্যমগুলোকে, যাদের সাংবাদিকরা ভুরি ভুরি পুলিতজার পুরস্কার পায় নির্ভীক সাংবাদিকতার জন্য, নিজেদের প্রাণ সংশয় করে যারা সংবাদ জোগাড় করতে যুদ্ধক্ষেত্রে চলে যায় হামেশা - সেই সব সংবাদমাধ্যমকে? নাকি ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলোকে, যারা স্টুডিওয় বসে, ভিডিও গেমের ফুটেজ, পুরোনো ছবি, কুৎসিত গ্রাফিক্স সাজিয়ে বোমায় মৃতের সংখ্যা ২০০-২৫০-৩০০ বলে হাঁকাচ্ছে? আমি দেশদ্রোহী হতে চাই না তাই ভারতের সংবাদমাধ্যমকেই বিশ্বাস করলাম। বিশ্বাস করতেই হবে কারণ বিশ্বাস না করলে মেনে নিতে হয় যে ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ান, দুজন পাইলটের বদলায় আমরা শুধু কিছু গাছ মেরেছি।

আজকে দেখলাম অনেকে ইমরান খানের প্রশংসায় গদগদ কারণ সে বলছে যে শান্তি চাই, বায়ুসেনার পাইলট অভিনন্দনকে বিনা শর্তে মুক্তি দিয়েছে সে। তাদের বলবো যে ৪৪ জন সিআরপিএফ জওয়ান, দুজন বায়ুসেনা পাইলট - এই সংখ্যাগুলো ভুলবেন না । ৪৬ জনের কফিনের সামনে দাঁড়ালে ইমরান খান কত শান্তির বাণী শোনাতেন তা আমার জানা আছে। প্রতিপক্ষকে বেকায়দায় ফেললে সহজেই মহান সাজা যায়। 

আমাদের এই ব্যর্থতা জন্য কিন্তু বায়ুসেনা একেবারেই দায়ী নয়। অন্ধকারে ৫ হাজার ফিট ওপর থেকে বোঝা সম্ভব নয় কোনটা জঙ্গি ঘাঁটি কোনটা নয়। বায়ুসেনাকে টার্গেট দিয়েছিল আমাদের গোয়েন্দারা, তারা সেই মত দুঃসাহসিক অভিযান চালিয়ে বোমা ফেলে এসেছে। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না যে এই গোয়েন্দা বিভাগের দায়িত্বে অজিত দোভাল নামের এক অপদার্থ। ভুলে গেলে চলবে না যে এই অজিত দোভাল গোয়েন্দা বিভাগের সব স্বাধীনতা জলাঞ্জলি দিয়ে মোদি নামক এক চূড়ান্ত অপদর্থের পায়ে তাকে সপে দিয়েছে, যাতে করে দেশের নিরাপত্তা, তার সামরিক নীতি - সবকিছু থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে পারে বিজেপি।

মোদির মত অপদার্থ সত্যিই খুব কম হয়। সারা মিডিয়া কিনে নেওয়ার পরও নিজের অপদর্থতা লুকোতে পারছে না। ভারত পাকিস্তানের সাথে খোলাখুলি যুদ্ধে যেতে পারবে না এটা অর্ণব গোস্বামীও জানে আর ভারতের পক্ষে জেহাদী জঙ্গি দিয়ে পাকিস্তানের সাথে ছায়াযুদ্ধ করাও সম্ভব না। উপায় একটাই - কূটনৈতিক চাপ। ভারত সোজাসুজি দাবি করতে পারতো মাসুদ আজহারকে ইন্টারপোলের হাতে যতক্ষণ না তুলে দিচ্ছে পাকিস্তান ততক্ষণ কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকবে না। সারা বিশ্বে পাকিস্তানকে শুধু মাসুদ আজহারের ইস্যুতেই একলা করে দেওয়া যেত, সমস্ত রাষ্ট্রকে দিয়েই চাপ দেওয়ানো যেত যাতে মাসুদ আজহারকে ইন্টারপোলের হাতে তুলে দেয়। সেটা করতে গেলেই ইমরান খানের বিচি শুকিয়ে যেত কারণ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মধ্যে বহু মাসুদ আজহারের ভক্ত রয়েছে। কিন্তু সেই কূটনৈতিক লড়াই মোদি সেদিনই হেরে গেছে যেদিন পাকিস্তানকে বিপুল সাহায্য ঘোষণার পরদিনই সৌদি রাজপুত্রকে এয়ারপোর্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। 

তাই আজ এই বিরাট ব্যর্থতা ও অসহায়তার মাঝে, ভারতীয় মিডিয়ার পাঁচতারা জঙ্গি ঘাঁটিতে ২০০-৩০০ জঙ্গির লাশ গোনা ছাড়া আর কিছুই করার নেই আমাদের। অবস্থা এতটাই করুন যে সেনাবাহিনীর তিন প্রধানকে বিবৃতি দিতে হচ্ছে প্রকাশ্যে, যাতে সেনাবাহিনীর মনোবল না নষ্ট হয়ে যায়।  এই ব্যর্থ সরকারকে ছুঁড়ে না ফেললে আরো বেইজ্জত হবে দেশ।

বৃহস্পতিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

নেশান ওয়ান্টস টু নো ~ অভিজিৎ মজুমদার

সন্মুখে সম্ভাব্য মৃত্যুসমুদ্র দেখিয়া অর্জুন কম্পিতকন্ঠে কহিলেন, "হে কেশব। আমার হস্ত শিথিল হচ্ছে, আমি গান্ডীব ধরে রাখতে পারছি না। আমার শরীরে কম্পন অনুভব হচ্ছে, সর্বাঙ্গে স্বেদনি:সরণ হচ্ছে। এ যুদ্ধ আমার পক্ষে সম্ভব নয়, মধুসূদন। তুমি আমায় পথ দেখাও।" 

অর্জুনের বিচলিত অবস্থা দেখিয়া বাসুদেব স্থিরকন্ঠে কহিলেন, "হে সখা, শান্ত হও। তোমার মত স্থিতধী পুরুষের এমন নার্ভাস ব্রেকডাউন সাজে না। যদি তুমি এই যুদ্ধে জয়লাভ কর তবে সসাগরা ধরিত্রীর অধীশ্বর হবে। আর যদি বীরগতি লাভ কর, তবে লোকে তোমার ছবি নিয়ে ভোট চাইবে। অতএব আত্মসংবরণ কর।"

অর্জুন কৃষ্ণর কথায় বিশেষ আশ্বস্ত হইলেন না। সংশয়াচ্ছন্ন কন্ঠে বলিলেন, "নিজের মৃত্যু নিয়ে শঙ্কিত নই গিরিধর। কিন্তু দুরাত্মা দুর্যোধনকে শাস্তি দিতে গিয়ে এই অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের প্রাণ নেওয়া কি জাস্টিফায়েড? শান্তি কি যুদ্ধ অপেক্ষা অধিক কাঙ্খিত নয়?"

কৃষ্ণ কহিলেন, "চুপ, চুপ। মিত্র, এমন বাক্য মুখেও এনো না। লোকে শুনলে তোমায় তো দেশদ্রোহী বলবেই, তোমার সাথে সাথে আমাকেও আরবান নক্সাল বলে দাগিয়ে দেবে। নাও, মুখ খোলো, দু-দাগ রাস টক্স খেয়ে নাও। নার্ভ চাঙ্গা হবে। এবার ভালো করে শোনো। আমি তোমায় যুদ্ধের অবশ্যম্ভাব্যতা নিয়ে কিছু উপদেশ দেব। এই উপদেশ মানুষ যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন যুদ্ধকে জাস্টিফাই করতে ব্যবহার করবে। ইয়দা ইয়দা ভোট উপস্থিত হবে, তখন তখন এর প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হবে।"

এতৎ বলিয়া শ্রীকৃষ্ণ তাঁহার দুইহাত প্রসার করিয়া এক অপূর্ব মায়াজাল সৃষ্টি করিলেন। চতুর্দিক এক সুগন্ধী ধূম্রে আচ্ছন্ন হইল। সেই ধূম্রজালের ভিতর হইতে শোনা গেল এক জলদগম্ভীর স্বর, "ইফ ইউ আর নট ইন ফেভার অফ ওয়ার, ইউ আর উইথ দেম। ইফ ইউ আর ইভেন্ থিংকিং অফ পীস, ইউ আর উইদ দেম। নাও টেল মি, আর ইউ উইদ দেম? টেল মি,টেল মি। নেশন ওয়ান্টস টু নো.."

অর্জুন সেই মোহক কন্ঠের জাদুকরীতে অভিভূত হইয়া পুনর্বার গান্ডীব ধারণ করিলেন। ভীমসেন কৃষ্ণের দিকে তাকাইয়া চক্ষু মারিলেন। বাসুদেব স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে স্মিত হাসিয়া আপনার সারথিকার্যে মনোনিবেশ করিলেন। 

বাকি গল্পটা তো আপনারা জানেনই।

বুধবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

যুদ্ধ ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

যুদ্ধ
রূদ্ধ
দুনিয়া
শুদ্ধ

লন্ড
ভন্ড
পাগলা
ষন্ড

বুদ্ধি
শুদ্ধি
গুলিয়ে
রদ্দি

রক্ত
ভক্ত
বোঝানো
শক্ত

কষ্ট
নষ্ট
বিরোধ
স্পষ্ট

যুদ্ধ
রুদ্ধ
শুদ্ধ
চিন্তা
 
রুদ্ধ
যুদ্ধ
মুক্ত
চিন্তা

মুনাফা কার? ~ আর্কাদি গাইদার

ইংরেজিতে একটা শব্দবন্ধ রয়েছে -a gift that keeps on giving. একবিংশ শতাব্দীতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের শাসকরা এরকম একটা উপহার আবিষ্কার করেছে - low scale conflict বা ক্ষুদ্র আকারের সংঘাত।এ যেন সোনার ডিম দেওয়া হাঁস, হাঁসটাকে যতদিন বাঁচিয়ে রাখা যায়,ততদিন সোনার ডিম দেবে।ইজরায়েলের প্যালেস্তাইন, রাশিয়ার চেচনিয়া,আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য,ভারতের কাশ্মীর,এই সংঘাতগুলো দীর্ঘকালীন সময় ধরে চলছে,তার প্রধান কারণ এটাই যে এই সংঘাতগুলো মিটিয়ে ফেলায় মুনাফা নেই।

মুনাফা।একশো বছরেরও বেশি সময় আগে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে রাশিয়ার লেনিন নামে একজন লোক একটা তিন প্যারাগ্রাফের নোট লিখেছিলেন।নাম ছিলো 'কার লাভ' (who stands to gain)?নোটে বলা ছিলো যে,যে কোন ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে গেলে সেই ঘটনার সরাসরি অংশগ্রহণকারী কারা,কারা তার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে গলা ফাটাচ্ছে,কারা প্রতিক্রিয়ার তত্ত্ব এনে জনমানসকে প্রভাবিত করবার চেষ্টা করছে, এই বিষয়গুলোর থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে মুনাফা কার? তাই কাশ্মীরের সংঘাতের পেছনে কারণ খুঁজতে একশোটা বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লেখা যেতে পারে, হাজারটা তর্কে অংশগ্রহণ করা যেতে পারে, কিন্তু এর সমাধান খুঁজতে গেলে অন্যতম যে প্রশ্নটাকে এড়ানো চলবে না, তা হলো - মুনাফা কার? ইসলামী মৌলবাদী গোষ্ঠীর মাথাদের, যারা এই কাশ্মীরের মতন উপদ্রুত অঞ্চলের বাসিন্দাদের ক্ষোভকে মূলধন করে তাদের মধ্যে থেকে নিজেদের সংগঠনের সদস্যদের সাপ্লাই লাইনের যোগানের ব্যবস্থা করে?পাকিস্তান এবং ভারতের শাসকগোষ্ঠীর,যারা নিজেদের দেশের যে কোন সমস্যার থেকে নাগরিকদের নজর ফেরাতে কাশ্মীর এবং বর্ডারের সংঘাতকে ব্যবহার করে? আমাদের দেশের হিন্দু মৌলবাদীদের, যারা কাশ্মীর (মুসলমান সন্ত্রাসবাদী) এবং পাকিস্তান (মুসলমানদের দেশ) এর ইস্যুকে ব্যবহার করে নিজেদের রাজনীতির দিকে ঝোল টানতে? চীন, যার কাশ্মীর এবং বর্ডার অঞ্চলে বিশাল বিনিনিয়োগ রয়েছে পরিকাঠামোর স্তরে, ব্যবসা এবং সামরিক ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে?

না। প্রধান মুনাফা এদের না।এরা তো স্রেফ একটি সংঘাতের আনুষাঙ্গিক সুবিধে উপভোগ করে।আসল মুনাফা তাদেরই, যাদের নিয়ে সেই ১৯১৩তেও লেনিন তাঁর প্রবন্ধ লিখেছিলেন।অস্ত্র ব্যবসায়ীদের।বিশ্বে এই মুহুর্তে সামরিক খাতে খরচা হলো ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলার।সর্ববৃহৎ অস্ত্র রপ্তানি করা দেশ কে? আমেরিকা।

আর সর্ববৃহৎ অস্ত্র আমদানি করা দেশ? ভারত।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বের মধ্যে 'মোস্ট হেভিলি মিলিটারাইজড জোন' কাশ্মীরের সংঘাত যতদিন টিকে থাকবে, ততদিন মুনাফা করবে এই ব্যবসায়ীরা।মুনাফা করবে রাফায়েল বিমান বেচে, বোফর্স বেচে। দুদিকের লোককেই অস্ত্র বেচবে তারা। ডিজিটাল যুগে অস্ত্র মানে শুধু গোলা বারুদ বন্দুক না, সাইবারসিকিউরিটি এই সামরিক শিল্পের এখন এক অন্যতম অংশ।তাহলে শান্তিচুক্তি করে,গোল টেবিল বৈঠক করে, বা উলটো দিকে নির্ণায়ক যুদ্ধ করে এই সমস্যা মিটিয়ে ফেলা তো ব্যবসায়ীদের পক্ষে ক্ষতিকর।ওষুধ কোম্পানিগুলোর মতনই, অস্ত্র কোম্পানিরাও জানে, সুস্থ বা মৃত মানুষে মুনাফা নেই। মুনাফা আছে খালি অসুস্থ মানুষে।

তাহলে ব্যাপারটা এরকম দাঁড়ায়, যে কাশ্মীর নিয়ে ভারতের বা পাকিস্তানের আসলে যে বিদেশনীতি, বা সামরিক নীতি, তা আদতে ভারত বা পাকিস্তান নামক জাতিরাষ্ট্রের নীতিই না।তা হলো ব্যবসায়ীদের কর্পোরেট নীতি, সেই নীতি নির্ধারকদের মধ্যে আমেরিকা আছে, চীন আছে, ইজরায়েল আছে, বা বলা ভালো এই দেশগুলোর ব্যবসায়িক স্বার্থ আছে। স্বাধীন বিদেশনীতি আসলে সোনার হরিণ, ওটা নাগরিকদের চোখে ধুলো দেওয়ার জন্যে, জাতিরাষ্ট্রের নীতি আসলে কর্পোরেটদের মুনাফার নীতি। প্রায় দশ বছর আগে ইংরেজি সংবাদপত্র গার্জেনে একটি লেখা বেরিয়েছিলো, যে নেশন স্টেটের এক্সপেরিমেন্ট শেষের পথে, নেশন স্টেটের শবদেহের ওপর কর্পোরেট স্টেটের নির্মাণ চলছে। যদিও শবদেহটাকে পুড়িয়ে ফেলা হয়নি বা কবর দেওয়া হয়নি, নাগরিকদের বোকা বানাতে ওইটূকু রাখতেই হবে।

আমরা যারা নিজেদের যুক্তিবাদী, প্রগতিবাদী এবং গণতান্ত্রিক স্রোতের অংশ মনে করি, তাদেরকেও এই ভারত, পাকিস্তান, চীন, আজাদ কাশ্মীরের গোলকধাঁধার মধ্যে থেকে নিজেদের আখ্যানকে বার করে আনতে হবে, তৈরি করতে হবে সঠিক আখ্যান, বারবার বলতে হবে মুনাফাবাজদের কথা, যেই মুনাফাবাজদের ব্যালেন্স সীট মেলাতে পুলওয়ামাতে মরতে হয় ৪৪ জন দরিদ্র পরিবারের জওয়ানকে, বা গত ২০ বছর ধরে শয়ে শয়ে ভারতীয় নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যদের, গুলি খেতে হয় কাশ্মীরের বাসিন্দাদের, বারবার চিহ্ণিত করতে হবে সেই গোষ্ঠীকে যাদের মুনাফা বাড়াতে অস্ত্র কেনা হয় আমাদের পয়সা দিয়ে। মোদী, যুবরাজ সালমান, দোভাল, ইমরান খান, এরা আদতে গ্লোরিফায়েড ব্রোকার।এদের মালিক আম্বানি, লকহিড মার্টিন, বোয়েইং, আমেরিকা, ইজরায়েল, ফ্রান্স - সেই চক্রটা যাকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইজেনহাওয়ার মিলিটারি ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স বলেছিলো। এই চক্রকে চিহ্নিত করা প্রথম কাজ - নাহলে এদের মুনাফার স্বার্থে এরকম আরও অনেক পুলওয়ামা হবে, আর আমরাও মেকি জাত্যাভিমান আর দেশপ্রেমের আখ্যানে ভেসে গিয়ে ধ্বংস হবো।

বুধবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

চুমুৎকার রিভিজিট ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

চুমু খায় রাজা রানী, সেনাপতি সৈন্য
জ্যাঠা বলে এতো স্রেফ চিন্তার দৈন্য;
বিপ্লবী চুমু খায় , অবিচল লক্ষ্যে
একে তাকে টেনে নেয় ভালোবেসে বক্ষে;
বিজ্ঞানী চুমু খায় সুদে ভগ্নাংশে
কিছু চুমু নিষিদ্ধ খানদানি বংশে!
চুমু খেলে শিক্ষক, গার্জেন ক্রুদ্ধ
বিক্ষোভ অবরোধ সারা দেশ শুদ্ধ;
গবেষক চুমু খায় পেপারে কি থিসিসে
সাল্মান বলে হাম কম নেহি কিসি সে;
গায়কের কিবা দোষ চুমু দিলে ভক্ত
চুন বালি সিমেন্টে প্রেম পাকাপোক্ত;
চুমু খায় প্রমোটার ক্যাডার কি আমলা
নমো বলে রাগা তুই মহাজোট সামলা!
পুটিনেও চুমু খায়, চুমু খায় ট্রাম্পে
লঙ্কায় গিয়ে কেউ জেতে হাইজাম্পে;
কবিগন চুমু খায় বসন্তে ফাগুনে
প্রকাশক সুখে থাকে পোকা কাটা বেগুনে;
চুমু খায় মন্ত্রীরা ছোট বড় নেতারা
সুরে গানে চুমু খায় করতাল দোতারা;
চুমু খায় ব্যবসায়ী গোয়ালা কি বেকারে
পুস্তকে লেখা থাকে চুমু শত প্রকারে;
রাশিয়ান চুমু নাকি ফিকে লাল উদাসী
চুমু নাকি কিস হয় আজ যারা প্রবাসী;
ধার্মিক চুমু খায় চুপিচুপি গোপনে
মাধবীকে চুমু খেল তপাদার স্বপনে;
চুমু নাকি নিষিদ্ধ লেখা আছে শাস্ত্রে
বুমেরাং হবে দেখ নিজেদের অস্ত্রে!
ব্যস্ততা সারাদিন মৌলবি পুরুতে
কেউ থাকে আড়ষ্ট চুম্বন শুরুতে;
গুণধর চুম্বনে মহা পারদর্শী
থাকে কেউ ধান্দায় হাতে ছিপ বড়শি;
চুম্বন অশ্লীল সেন্সর বিধানে?
কি যে আছে কার মনে জনগন কি জানে!
চুমু খায় চাঁদ মামা টিপ দেয় কপালে
দু কলম লিখে দেব শুধুশুধু খ্যাপালে।।

শুক্রবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

সিবিয়াই ~ অমিতাভ প্রামাণিক

রোব্বারের সন্ধে। অমিতভাইকে টা টা করে দিয়ে মোদিজি 'মদীয়' বাসভবনে খাড়ি-শক্কর কি চায় আর দুটো ফাফরা নিয়ে সোফায় বসে টিভিতে আস্থা চ্যানেলে অনুকূল ঠাকুরের 'জয় রাধে রাধে কিষ্ণো কিষ্ণো গোবিন্দ গোবিন্দ বলো রে' দেখছিলেন। অমিতভাই চালু মাল, প্রিয়াঙ্কা ফিল্ডে নামতেই ওর বরের পেছনে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টোরেট লেলিয়ে দিয়েছেন। পাঁচ-পাঁচটা বছর গেল, এতদিন রবার্ট ভদ্র রবারের মত নমনীয় ভদ্র বালক ছিল। তার আগে, মানে আগের ইলেকশনের আগে অবশ্য সে ছিল এক নম্বর ইস্যু। কং পার্টির স্ক্যামস্টারদের পাশাপাশি তার নামও রোজ খবরের প্রথম পাতায় আর যাবতীয় প্রি-ইলেকশন জনসভায় শোনা যেত। ইলেকশনে জিতে যেতেই সব ধামাচাপা। আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে, এখন আবার রবার্টকে নিয়ে টানা-হ্যাঁচড়া হবে। রবার্টের তুলসীপাতা কতটা ধোয়া, সেই জানে। জনগণের টাকা কেউ চুষে নেয় বছর বছর। জনগণ কাগজে দ্যাখে, তার পেছনে আছে অমুক। কেউ অবশ্য জেলে যায় না। জনগণের টাকা চক্কর কাটে খবরের কাগজে আর ইলেকশনের র‍্যালিতে। 

অনুকূল ঠাকুরের বংশধর শ্রীশ্রীবড়দা ভুঁড়ি পেতে বসে পৈতেটা ধরে হাওড়া-শিয়ালদা করতে করতে টিভির পর্দা জুড়ে বিরাজ করছেন। পেছনে 'জয় রাধে রাধে' গান বাজছে। সেদিকে তাকিয়ে মোদিজি ফোঁস করে এক বড় নিঃশ্বাস ফেললেন। রামদেব তো তাও ভুঁড়িতে ঢেউ খেলাতে পারেন, ইনি স্রেফ ঐ ওঁচা একটা গান গেয়েই এ রকম একটা বিজনেস বানিয়ে ফেললেন! হেড অফিস দেওঘর। বাঙালি নাকি বিজনেস বোঝে না! বোঝে, বোঝে। তাঁর নিজের যে চায়ের বিজনেস ছিল, চা-টা আসত কোথা থেকে? ঐ বাংলা-আসাম দেশেরই তো চা। এখন অবশ্য বাংলায় চায়ের চেয়ে চপটাই বেশি চলছে বিজনেসের জন্যে। মোদিজি চপ জিনিসটা তেমন খাননি। কেমন খেতে, ঢোকলা-ফাফরার চেয়ে ভাল কি? বাংলার দিদিকে জিজ্ঞেস করতে হবে। দিদি তো মোদি বলতে অজ্ঞান। জনসভা হলেই মোদি-মোদি করে কানের পোকা বের করে দেন।

ভাবতে ভাবতেই ফোন। দিদিরই ফোন। 

- কেয়া করতা হ্যায় মোদিজি? বসে বসে ছাস পি রাহা হ্যায়? এদিকে বিগেড মে ক্যা হুয়া আপকো পাতা হ্যায়? বামফন্ট নে বিগেড পুরা ভর দিয়া। ম্যায় ডিম্ভাত দেকে যো নেহি কর পায়া ও রুটি তরকারি সে কর লিয়া। 

- তো আপকা ক্যা, দিদিইইই? আপ তো মেলে মে মোদি মোদি করকে মেরা দিমাগ চাটোগি। আব দেখো কিৎনা প্যাডি মে কিৎনা রাইস। 

- ও সব বাৎ ছোড়ো মোদিজি। বাদ মে দিখা যায়েগা। অব বাতাও হাম ক্যা করেঙ্গে? হাম এ বামফন্টকো সহ্য নেহি কর সকতা হ্যায়। কোই হেমবম বোলকে এক মহিলা ডায়লগ মারকে গিয়া, উসকো বহুৎ হাততালি মিলা। এ হামদম মুঝে বরদাস্ত নেহি হোগা। কুছ উপায় বাতাইয়ে। 

- ম্যায় ক্যা উপায় বাতায়ুঙ্গা দিদিইই? উপায় তো আপকো মালুম হ্যায়। আপ তো ইলেকশন ভি ঠিক তরে সে হোনে নেহি দেতে হ্যায়। 

- উফ, ফির ইলেকশন ইলেকশন করকে মুঝে সাতাও মৎ। কুছ বোলো।

- ক্যা বোলুঁ দিদিইইই?

- অ্যায়সা কুছ বোলো, যাতে এ বিগেড কা নিউজ লোগো তক না পৌঁছায়। কাল পেপারমে ও নেহি আনা চাহিয়ে। আপ কুছ করো না। আপকা হাত মে তো সিবিয়াই হ্যায়। 

- সিবিয়াই হ্যায় তো ক্যা? বামফ্রন্ট মে স্ক্যাম হ্যায় কিধর? লোগ হি নেহি হ্যায় তো স্ক্যাম। বঙ্গাল মে স্ক্যাম কা পুরা ফিল্ড তো আপ কা হাথ মে। বামফ্রন্ট কা কিসকা পিছে সিবিয়াই ডালুঁ, দিদিইইই?

- আরে ধুর, উসকা নেহি, মেরে পিছে ডাল দো। ম্যায় দেখ লুঙ্গি ক্যা কর সাকতা হুঁ। ডামা হোগা রাতভর। সুবে লোগ বিগেড ভুল যায়গা। পেপারমে ডামা কা খবর ছাপেগা। 

- ক্যা বোল রহী হো, দিদিইইই? আপ ভুবনেশ্বর যানে কে লিয়ে তৈয়ার হ্যায়? ম্যায়নে শুনা হ্যায় কি ও জেল মে টয়লেট আচ্ছা নেহি হ্যায়। ছ্যাৎলা পড় গয়া, ইসি লিয়ে হাওয়াই চটি ভি স্লিপ কাটতা হ্যায়।

- আরে ধুর, ভুবনেশ্বরে আমি মরতে যাব নাকি? আচ্ছা, ঠিক হ্যায়, এ বাৎ ছোড়ো। অব মুঝে ইধারকা লোগ দিদি নেহি, পিসি বোলতা হ্যায়। আপ সিবিয়াই কো বোল দো কলকাত্তা সে পিসিকো উঠানে কে লিয়ে। 

- ফির? 

- ফির বাদ মে দিখা যায়েগা। আব মেরা পাস টাইম নেহি হ্যায়। বুকফেয়ার চল রাহা হ্যায় মেরা অনুপ্পেরণা সে। আপ তো কিতাব-সিতাব পঢ়তে ভি নেহি হো, লিখতে ভি নেহি। মেরা সাত সাত নয়া কিতাব হ্যায়। এ লেকে সাতাশিটা হুয়া। আপ তো খাতা ভি নেহি খুলা, ওদিকে চিল্লাতে হো মেরা নামমে খিল্লি উড়াকে। সাতাশি কিতাব এ জনম মে পঢ়া ভি নেহি হোগা। মেলে মে নয়া সাতকা মোড়ক উন্মোচন হোগা এক এক করকে, গোপাল বৈঠা হ্যায় চেয়ার-টেয়ার মুছকে। বিগেডবালা ভি উধার গিয়া হ্যায়। আভি ভেজো সিবিয়াই। কোলকাতা মে যো অফিসার হ্যায় উস্কোই ভেজ দো। দিল্লি সে লানেকা টাইম নেহি হ্যায়। বোল দো নীল শাট পহনকে ফটাফট যাকে পিসিকো উঠা লো। ফির ম্যায় দেখতা হুঁ, কী করা যায়। ম্যায় যো করেগি, আপ চুপচাপ দেখতে রহেনা, ফট করকে ফোর্স মোর্স নেহি ভেজনা মোদিজি। খুব খারাপ হো যায়েগা।

- এ ক্যা বাৎ হুয়ি দিদিইই। উধার কেজরি হামে ডাঁটতে হ্যায়, ইধার আপ হামে ডাঁটতে হো। ডাঁট খাকে খাকে মেরা তো সারে খানা ডাঁটা য্যায়সা লাগতে হ্যায়। 

- ইসি লিয়ে তো সেম জোক বোল বোলকে ছিবড়ে কর ডালা। মেরা য্যায়সা নয়া নয়া শুনাও। নেক্সট উইক সরস্বতী পূজা হ্যায়। আ যাও বাংলা মে, মা কি পুজো করো তো পেট মে থোড়া বিদ্যা আয়েগা। মন্ত্র বোলুঁ ম্যায় ইয়ে বসন্ত্‌ উৎসব কা? সরসোতি মোয়াভাগে –

- নেহি নেহি, রহনে দিজিয়ে। ম্যায় সিবিয়াই ভেজ রহা হুঁ। সিবিয়াই, সিবিয়াই – 

(পরবর্তী ঘটনা সোমবারের আনন্দবাজারে পড়েছেন নিশ্চয়)

মঙ্গলবার, ৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

আমরা - ওরা ~ সুশোভন পাত্র

'আমরা', 'ওরা' পার্থক্যটা চোখে পড়ছে? রাজ্যে আট বছর ক্ষমতায় নেই বামপন্থীরা। মিডিয়ার ভাষায় বামপন্থীরা 'ফিনিশ'। কেতাদুরস্ত নবান্নের মালকিন বলেছেন, 'সিপিএম খুঁজতে দূরবীন লাগবে'। আম্বানি-আদানির মালাইয়ে কব্জি ডুবিয়ে চর্বি জমানো অমিত শাহ'দের খোয়াবনামা, 'কমিউনিস্ট মুক্ত দেশ গড়বেন'। গত এক দশকে রাজ্যে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হয়েছেন বামপন্থীরা। সালকু সরেন, অজিত লোহার, পূর্ণিমা ঘড়ুই থেকে শুরু করে, সুদীপ্ত-সইফুদ্দিন হয়ে হালফিলের কাকদ্বীপ -বামপন্থীদের রক্তে প্রতিদিন ভিজেছে বাংলার মাটি। পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে পার্টি অফিস, জবরদখল গন সংগঠনের হাজারো দপ্তর, ঘরছাড়া অসংখ্য কর্মী-সমর্থক। লেনিনের মূর্তি থেকে জ্যোতি বসুর নামাঙ্কিত ফলক, ভিটে-মাটি থেকে শুরু করে মা-বোনদের ইজ্জত -মদ্যপ লুম্পেন বাহিনীর হাতে রক্ষা পায়নি কিছুই। দলদাস প্রশাসনের কাছে 'আমাদের' ব্রিগেডের জন্য নুন্যতম সহযোগিতা পাওয়া যায়নি, ইউনিয়নের রক্তচক্ষু তে যথেষ্ট গাড়ি জোগাড় করা যায়নি, প্রবল শীতে রাত্রি বাসের জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা করা যায়নি, সকলের মুখে দু-মুঠো খাবার তুলে দেওয়া যায়নি। 
'ওঁদের' ব্রিগেডে 'পাগলু' ড্যান্স'র আকর্ষণ ছিল। আগের রাতে খিচুড়ি মাংসের পাত পড়ে ছিল। মদের বোতলের চুইয়ে পড়া মাদকতা ছিল। সানগ্লাসের আড়ালে ভেঙ্কটেশ ফিল্মের ভাড়া করা টলিউড তারকাদের ভিড় ছিল। মাথায় অক্সিজেনের কমে যাওয়া কেষ্ট-বিষ্টু সংগঠক ছিল। বাঁকুড়ার গরমে ভোটের প্রচারের জন্য নতুন 'সানস ক্রিম' খোঁজা মুনমুন সেনের মত সাংসদ ছিল। সরকারী প্রকল্পে সুযোগ পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন ছিল। হুমকি ছিল, ধমকি ছিল। মঞ্চে ২৪দলের নেতাদের ভজকট ভিড় ছিল। কৌন বানেগা প্রধানমন্ত্রীর  মিউজিক্যাল চেয়ার কম্পিটিশন ছিল। আর 'আমাদের' ব্রিগেডে সরজমিনে মানুষ ছিল। নেতা নয়, নীতি বদলের ডাক ছিল। জান কবুল, মান কবুল লড়াইয়ের শপথ ছিল। আপামর বাংলার মেহনতি মানুষের চোখে স্বপ্ন ছিল। নতুন লড়াই'র রসদ ছিল। 'আমাদের' ব্রিগেডে প্রাণ ছিল।
'আমরা', 'ওরা' পার্থক্যটা চোখে পড়ছে? রাজ্যে ব্যাঙের হাঁচি হলেও সিবিআই তদন্ত চেয়ে তখন পাড়া মাথায় তুলতেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। টানা বাহাত্তর দিন পুলিশ-প্রশাসনের প্রবেশ নিষিদ্ধ তখন নন্দীগ্রামে। বিরোধী নেতা-সাংসদ'দের মদতে বে-আইনি অস্ত্রের পাহাড় জমছে তখন নন্দীগ্রামে। একদিনে সিপিএম'র ২৫টা পার্টি অফিসে আগুন জ্বলছে তখন নন্দীগ্রামে। নিয়ম করে শঙ্কর সামন্ত'দের লাশ পড়ছে তখন নন্দীগ্রামে। প্রশাসনের ডাকা সাত-সাতটা শান্তি বৈঠকে যোগ দিলো না তৃণমূল। ৯'ই ফেব্রুয়ারি  মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য হেড়িয়ার জনসভায় বলেছিলেন "মানুষ না চাইলে ক্যামিকাল হাব হবে না নন্দীগ্রামে। অধিগ্রহণ হবে না এক ইঞ্চি জমিও।" তবুও নন্দীগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে সিপিএম'র 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' দ্বিতীয়বর্ষ পূর্তির জনসভাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেদিন বলেছিলেনে "নন্দীগ্রামের গণহত্যার সিবিআই তদন্ত চাই।" মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবী মতই সিবিআই তদন্তও হয়েছিল। পেটোয়া আইপিএস দিয়ে তথ্যপ্রমাণ লোপাট করতে হয়নি, পুলিশ পাঠিয়ে তদন্তকারী সিবিআই অফিসারদের গ্রেপ্তার করতে হয়নি, প্রশাসন কে রাস্তায় বসিয়ে মেট্রো চ্যানেলে শামিয়ানা টাঙ্গিয়ে ধর্নার নামে রকবাজি করতে হয়নি। 
দিদি-মোদীর সেটিং-এ ঝুলিয়ে রেখে নয় বরং ২০১৪'তেই নন্দীগ্রামের ঘটনার চার্জশিট জমা দিয়েছিল সিবিআই। সিপিএম'র 'রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের' কোন নিদর্শনই খুঁজে পায়নি সিবিআই। তালপাটি খালে চিরুনি তল্লাশি চালিয়ে 'সিপিএম'র হার্মাদ বাহিনীর হাতে পা চিরে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া একটাও শিশুরও লাশ খুঁজে পায়নি সিবিআই। গোটা নন্দীগ্রাম ঘুরে একটাও 'স্তন কাটা মহিলা' খুঁজে পায়নি সিবিআই। 
'আমরা', 'ওরা' পার্থক্যটা চোখে পড়ছে? বছর দশ আগে, একটা স্টিং অপারেশনে, নন্দীগ্রামের সিপিআই'র প্রাক্তন বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের হাতে প্রায় জোর করেই গুঁজে দেওয়া হয় ১০,০০০ টাকা। বিধানসভায় স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনেন নারদা ঘুষ কাণ্ডের অন্যতম অভিযুক্ত 'পাঁচ লাখি' সৌগত রায়। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সেদিন পদত্যাগ করেন ইলিয়াস। বহিষ্কৃত হন পার্টি থেকেও। মানসিক অবসাদে আজ কোন রকমে বেঁচে আছেন ইলিয়াস। দু-বিঘা জমি বেঁচে চিকিৎসার খরচা চলে। বিধায়কের পেনশন চলে সংসার। পরে অবশ্য সিবিআই জানিয়েছিল ইলিয়াস নির্দোষ। আর ওদের সেই স্টিং অপারেশনর সাজানো সাংবাদিক শঙ্কুদেব পণ্ডা ও নাটের গুরু শুভেন্দু অধিকারী আজ চিট ফান্ডের আর্থিক তছরুপের দায়ে সিবিআই'র খাতায় অভিযুক্ত। জনাব শুভেন্দু বাবু জানলে দুঃখ পাবেন যে গত রোববার ইলিয়াসের ছেলেও এসেছিলেন ঐ ইনকিলাবি ব্রিগেডে।   
মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ৫কোটি টাকা দিয়ে সতেরোটা কমিশন গড়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।সিপিএম'র নেতাদের পিণ্ডি তর্পণের দিবাস্বপ্নে বিগলিত বুদ্ধিজীবীরা কমিশন'কেই দরাজ সার্টিফিকেট বিলিয়ে বলেছিলেন "এহি হ্যা রাইট চয়েস বেবি।" কিন্তু শত চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত জ্যোতি বসু, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তো দূরের কথা, একজন বামপন্থী নেতারও কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারেননি দিদিমণি। ৩৪ বছরের একটা দুর্নীতিও প্রমাণ করতে পারেননি দিদিমণি। আর আজ কান টানলে  মাথা আসার সূত্রে নিজেই পথে বসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। শাগরেদ আমলার কেঁচো খুড়তে কেউটে বেরিয়ে যাবার ভয়ে সিঁটকে গেছেন মুখ্যমন্ত্রী। লজ্জার মাথা খেয়ে নৈতিক জয়ের গল্প ফাঁদছেন মুখ্যমন্ত্রী। কথায় আছে, চোরের মায়ের বড় গলা। 
আর আমাদের মা ছিতামনি সরেন। যে ছিতামনি সন্তান কে শহীদ হতে দেখেও লাল ঝাণ্ডার রাজনীতি করেন। প্রবল অসুখ নিয়েও ব্রিগেড আসার জন্য শিশু সুলভ ঝোঁক ধরেন। বয়সের ভারে ন্যুজ হয়েও দেওয়াল জুড়ে কাস্তে-হাতুড়ি আঁকেন। এরকম অসংখ্য ছিতামনি-দেবলীনা-ইলিয়াসদের ঠিকানা এই লাল ঝাণ্ডা। যারা পেটে গামছা বেঁধে নিঃস্বার্থে রাজনীতি করেন। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পার্টির ডাইরেক্টিভস অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। যাদের কোনদিন কোনও স্টিং হয়নি। একটা ঘন্টাখানেক হয়নি। মিডিয়া ফুটেজ দেয়নি। এনারাই স্বচ্ছ রাজনীতির মুখ। আমাদের আদর্শ। আমাদের ভরসা। আমাদের নেতা। আর যে রাজনীতি, যে রাজনৈতিক দল ঘুষখোর ক্ষমতা লোভীদের দল চালানোর দায়িত্ব দেয়, দুর্নীতিবাজ'দের নেতা-মন্ত্রী বানিয়ে মাথায় তুলে নাচে, ফাঁদে পড়লে আঁচল দিয়ে আগলে রাখেন তাঁদের আমরা ঘেন্না করি। আমাদের গর্ব, আমাদের সাধ্যমত, আমরা সেই রাজনীতির বিরুদ্ধেই লড়াই করি।

দিদির Ten son ~ অনির্বান মাইতি

দিদির আমার দশটি ছেলে
করছিল দেশ জয়
একটি গেল হসপিটালে (মদন)
রইল বাকি নয়।

এখন দিদির নয়টি ছেলে
পেরোয় না চৌকাঠ
একটি খেলো CBI এ (রজত)
রইল বাকি আট।

আটটি ছেলে ভীষন রকম
করছিল উৎপাত
একটি হল বহিষ্কৃত (আরাবুল)
রইল বাকি সাত

সাত জনাতে হাপুসনয়ন
বুকের ভিতর ভয় 
একটি খেলো ঘুমের বড়ি (কুনাল)
রইল বাকি ছয়।

শেষ ছয়টির একটি ছেলে
আগাম না পেয়ে আঁচ
হঠাৎ করে অ্যারেস্ট হল (টুম্পাই)
রইল বাকি পাঁচ।

আজকে দিদির পাঁচটি ছেলের 
একটি পগার পার
নবান্নে আর বসবে না কাক (শুভাপ্রসন্ন)
রইল বাকি চার।

দিদি আমার কাঁদল আবার 
খোদার দয়া নাই 
হাসপাতালের বাছা আমার (মদন রিভিজিটেড) 
ধরল সিবিআই।

শেষকালে এই চারটে ছেলের 
ভয়েই কাটে দিন
একটি পেল ইডির নোটিস (শঙ্কুদেব)
রইল বাকি তিন 

বাদবাকি ওই তিন ছেলেরও 
কপাল হল ফুটো 
একটি গেলো পাল্টি খেয়ে (মুকুল)
আর তো বাকি দুটো :(  

আর বাকি দুই, খোদায় মালুম
বিশ্ব বোকাহাঁদা
গোলাপ কাঁটায় পাল ও গেল (তাপস)
রইল পালের গোদা।

শেষ ছেলেটি আগলে রেখে (রাজীব)
যেমন নয়নমনি
মেট্রো চ্যানেল অবস্থানে
গুমড়ে কাঁদেন উনি

.......

সোমবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯

তলব ~ আর্যতীর্থ

।তলব।

কে কাকে তলব করে বুঝে লাভ নেই 
আমরা তো শুয়ে আছি মাটি জাপটেই।
একে ধরে ওকে ধরে তাকে করে জেরা
সিরিয়াল হেন শুধু বাড়ে গল্পেরা।
পরোয়ানা নিয়ে চলে এত হইচই,
কেউ জানে গরীবের টাকা গেলো কই?
ফেরত পাবে না জানি, পায়না এ দেশে
তারিখ পে তারিখরা অনন্তে মেশে
 তদন্ত চালু থাকে ঠিক ইতিউতি,
কোন কোন গায়ে লেপা ঘুষের বিভূতি,
সে কথা নানান মুনি বলে নানামতে,
প্রলেপ পড়ে না তবু অভাবের ক্ষতে।
গিয়েছে কাদের টাকা , হারিয়েছে ভিড়ে,
যে আঁধারে কাল ছিলো আজও সে তিমিরে,
কেউ মরে গেছে ঝুলে, কেউ ফলিডলে,
 রাজনীতি সব ভুলে দাবা খেলে চলে..

কে কাকে তলব করে বয়ে গেছে ভারী
তুমি,আমি এলেবেলে আদার ব্যাপারী।

আর্যতীর্থ

সোমবার, ২৮ জানুয়ারি, ২০১৯

হিন্দু কোড বিল ~ শুভদীপ দে

ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের প্রথম অ্যাসিড টেস্টঃ হিন্দু কোড বিল।

স্বাধীনতার পর গণপরিষদের অন্যতম বড় টাস্ক ছিল হিন্দু বিবাহ ও সম্পত্তি আইনের কোডিফিকেশন, একীকরণ ও সংস্কার । বি এন রাউ এর করা খসড়া-র রিভিশনের ভার পড়ে সিলেক্ট কমিটির হাতে, যার মাথায় ছিলেন তৎকালীন আইনমন্ত্রী বাবাসাহেব আম্বেদকর । 

নতুন আইনের অন্যতম সূচীমুখ ছিল- স্বামী বা পিতার সম্পত্তিতে স্ত্রী ও কন্যার অধিকার, সেপারেটেড স্ত্রীর খোরপোষের অধিকার, বিবাহবিচ্ছেদ এর অধিকার,   সকল প্রকার ইন্টারকাস্ট বিবাহের অধিকার, সন্তান দত্তকের অধিকার, বহুবিবাহ নিষিদ্ধকরণ ইত্যাদি । 

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে হয়তো মনে হবে, এগুলো খুবই মিনিমাম দাবী, এটা তো সাধারণ অধিকার, এ নিয়ে এত মাতামাতির কী হল ? কিন্তু আজ থেকে সত্তর বছর আগে ব্যাপারটা মোটেই সহজ হয়নি । ব্রাহ্মন্যবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজপতিরা মেয়েদের এইটুকু অধিকার দিতেও রাজী হচ্ছিল না । পেছনে যুক্তি কী ছিল ? সতীদাহ, বিধবাবিবাহ থেকে শুরু করে শবরীমালা অবধি এদের যে দাবী, হিন্দু কোড বিলের ক্ষেত্রেও তাই ছিল- "ট্র্যাডিশন" । যদিও বাবাসাহেব প্রথমেই এদের সঙ্গে অফেন্স এ যাননি, বরং প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্র থেকে রেফারেন্স টেনে এনে দেখাতে চেয়েছিলেন যে শাস্ত্রে স্ত্রীকে পুরুষের দাসী বানানোর কথা বলা হয়নি । এইভাবে বাবাসাহেব আসলে রামমোহন বা বিদ্যাসাগরের পথই ফলো করছিলেন, তবে তাতে করে ব্রাহ্মন্যবাদীদের টলানো যায়না, যায়নি । 

বিলের প্রথম বিরোধিতা আসে গণপরিষদের তৎকালীন চেয়ারম্যান তথা পরবর্তীতে ভারতের রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের পক্ষ থেকে । যার যার ওনার সম্পর্কে খুব গ্রেট ফীলিং আছে, তাদের প্রণিধানের জন্য বলে রাখি- কংগ্রেসের যে লবি সুভাষ বসুকে দলছাড়া করিয়েছিলেন, বাবুজী ছিলেন সেই লবির সেনাপতি বিশেষ । হিন্দু কোড বিল নিয়ে তার বক্তব্য ছিলো, স্ত্রী অধিকার, সমানাধিকার এসব বিদেশী আইডিয়া, মুষ্টিমেয় কিছু লিবেরাল লোকজন এসব বিদেশী জিনিস ভারতের হিন্দুদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে । হায়, উনি সতীদাহ নিবারণের সময় থাকলেন না, থাকলে কী বলতেন শোনার ইচ্ছে ছিল । যাই হোক, শোনা যায় রাজেন্দ্রপ্রসাদ নেহরুকে এই নিয়ে একটি কড়া চিঠি লিখেছিলেন, সেটা পাঠানোর আগে কংগ্রেসে তার লবির অন্যতম সুহৃদ সর্দার প্যাটেলকে সেটা দেখিয়েছিলেন । প্যাটেলের মনে কী ছিল জানা নেই, তবে বাস্তববাদী পলিটিশিয়ান হিসেবে উনি প্রসাদকে বুদ্ধি দেন চেপে যেতে, কারণ গণপরিষদের মেয়াদ শেষ হচ্ছিল, ভারতের রাষ্ট্রপতি হিসেবে কংগ্রেসের মেজরিটি দক্ষিণপন্থী লবির পছন্দ ছিলেন প্রসাদ, ওদিকে নেহরুর পছন্দ ছিলেন রাজাগোপালাচারী । এই চিঠি নেহরুর কাছে পৌঁছলে তিনি প্রসাদের নামে ভেটো দিয়ে দিতেন, এবং কংগ্রেস ভাঙ্গনের দিকে চলে যেতো । বন্ধুর সুপরামর্শে বাবুজী সরাসরি বিরোধিতার পথ থেকে সরে আসেন । এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন ।

ঘরের চাড্ডীদের সামলে উঠতে পারলেও পিকচার এখনো অনেক বাকি ছিল । ধর্মশাস্ত্রে হাত পড়ছে, হিন্দু সংসারের বেসিক স্ট্রাকচার ভেঙ্গে দিতে চাইছে এই বিলেত ফেরত নেহরু আর আম্বেদকার, এইসব বক্তব্য দিয়ে গঠিত হল হিন্দু কোড বিল বিরোধী কমিটি । একে একে জুটলো ধর্মীয় গুরু,  পেটোয়া সাধু সন্ন্যাসী যারা নামে সন্ন্যাসী হলেও পুরোপুরি গার্হস্থ্য জীবনযাপন করেন । আজকের দিনেও এদের দেখতে পাবেন, আরএসএস আয়োজিত মঞ্চে এসে কখনো এরা রামমন্দির চায়, কখনো শবরীমালা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট আর পিনারাই বিজয়নের মুন্ডপাত করে ।  দ্বারকার শঙ্করাচার্য্য এই বিলের বিরুদ্ধে ফতোয়া গোছের দিলেন । ১৯৪৯ এর ১১ই ডিসেম্বর, দিল্লীর রামলীলা ময়দানে আরএসএস হিন্দু কোড বিলের বিরুদ্ধে সমাবেশ করলো, সেখানে বলা হল নারীর সম্পত্তি ও ডিভোর্সের অধিকার আসলে হিন্দুধর্মের ওপর পরমাণু বোমার আঘাত । নারী অধিকার পেলে হিন্দু সমাজ ধ্বংস হয়ে যাবে । একজন  নেহরুর ফাঁসিও চেয়েছিল । এক বক্তা বলেছিল "আম্বেদকর অস্পৃশ্য সমাজের লোক, হিন্দু ধর্ম নিয়ে বিধান দেওয়ার কোনো অধিকারই ওনার নেই" । এর পঞ্চাশ বছর পর আরেক শঙ্করাচার্য্য একই কথা বলবেন, তারও পনেরো বছর পর এই ভন্ড সাধুসন্ন্যাসীরা প্রধানমন্ত্রীর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান আলো করে বসে থেকে সরকারের মনোভাবের আবরণ উন্মোচন করবেন, অবশ্য ততোদিনে আমরা সহ্য করতে শিখে গেছি, থাক সে কথা । 
কোড বিল বিরোধী বিক্ষোভের মাথা ছিলেন আরেক ভন্ড সাধু, স্বামী কর্পাত্রি মহারাজ । তিনি আরএসএস ও অন্যান্য সংগঠনের উদ্যোগে দেশজুড়ে উস্কানি দিয়ে বেড়ালেন । দাঙ্গা হাঙ্গামার হুমকি দিলেন । দেশ ভেঙ্গে টুকরো করার হুমকি দিলেন । রাষ্ট্রপতির চেয়ার নিশ্চিত হওয়ার পর মাঠে নেমে পড়লেন বাবুজীও, বললেন তিনি এই বিলে সই করবেন না । এই জায়গায় পিনারাই বিজয়ন থাকলে হয়তো আরএসএস-জনসঙ্ঘ নেতাদের স্ত্রীদের দিয়ে ডিভোর্স করিয়ে নিতেন, জ্যোতি বসু থাকলে দলের লোকজন দিয়ে এসব ভন্ড সাধুদের তুলিয়ে হিমালয়ে দিয়ে আসতেন, কিন্তু নেহরুর ততোটা জোর তখনও ছিল না । শশী থারুরের মতো ওনারও লিবেরাল জহরকোটের আড়ালে ভোটব্যাঙ্ক নির্ভর পলিটিশিয়ানের কম্পমান হৃদয় ছিল । উনিও আর ভোটের আগে এই নিয়ে এগোলেন না । অপমানিত, ভগ্নহৃদয় হয়ে বাবাসাহেব আম্বেদকর পদত্যাগ করলেন । 

তবে নেহরু আর যাই হোক, শশী থারুর নন । নির্বাচনী প্রচারে বারবার করে হিন্দু কোড বিলের কথা উনি তুলেছিলেন দেশজুড়ে । সমর্থন চেয়েছিলেন, যাতে প্রথম পার্লামেন্ট এ বিল পাশ করা যায় । তার বিরুদ্ধে এলাহাবাদ আসনে জনসঙ্ঘ-রামরাজ্য পরিষদ- হিন্দু মহাসভা যৌথ প্রার্থী করেছিল কোড বিল বিরোধী হাঙ্গামার অন্যতম নায়ক প্রভুদত্ত ব্রহ্মচারীকে । সেই আসনে নেহরু বিপুল ভোটে জয়ী হন । দ্বিতীয় হয়েছিলেন কৃষক মজদুর প্রজা পার্টির প্রার্থী বংশীলাল । ব্রহ্মচারী ফুটে যান । 

প্রথম লোকসভায় হিন্দু কোড বিল চার খন্ডে ভাগ হয়ে পাশ হয় ।

বুধবার, ২৩ জানুয়ারি, ২০১৯

কাবাব রুটি ও পাহাড়ি চটির গপ্প ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

- যাব্বাবা, এ তো গলা ছিপি হয়ে যাবে গিলতে, রুটি গুলো হিমঠান্ডা, আর কাবাবও তথৈবচ
- কি করি বলুন তো? এই মাঝরাত্তিরে আমি কোত্থেকে পোলাও কালিয়া পাই?
- পোলাও কালিয়া কে চেয়েছে হে? এট্টু জল পেলেও ... শুকনো রুটি তো গিলতে পাচ্চিনা এই মাঝরাতে ...
- জল দিয়ে রুটি গিলবেন? এই ঠান্ডা পাহাড়ি দেশে যেখানে সেখানে জল খাওয়া কি ঠিক আপনার? আপনি শহুরে মানুষ...
- সে তোমাকে ভাবতে হবে না। কত ঘাটের জল খেয়ে হজম করে দিলুম
- সে করেছেন, বেশ করেছেন। এখন এখানে ওই নোংরা কুঁজোর জল খেয়ে যদি আপনার পেট খারাপ হয়, কলেরা হয় , তাহলে জবাবদিহি কে ...
- বড্ড বকবক করো হে ছোকরা ... থাক , আমার আর খেয়ে কাজ নেই, শুয়ে পড়ো দিকি।
- আপনি কিছু না খেলে যে উঠতে পারবেন না। কাল যে অনেক রাস্তা হাঁটা বাকি
- ও আমি ঠিক ...
- পারবেন না। আরে আমি আপনার গাইড। পাহাড়ে গাইডের কথা শোনার তো একটা নিয়ম আছে, না কি? 
- বেশ, হুকুম কিজিয়ে উস্তাদ
- আপনাকে খেতেই হবে
- কিছুতেই ওই লেড়ো বিস্কুট মার্কা খড়খড়ে রুটি আর জুতোর শুকতলা মার্কা কাবাব আমি খাবো না। ভুখ জিন্দা রহে।
- আপনি ... আপনি ... কি জেদি লোক রে বাবা... মহা মুশকিলে পড়লাম... একে গায়ে জ্বর, তার ওপরে বলছে খাবে না...
- খুব মুশকিলে পড়েছ, তাই না ভকৎরাম? আমি লোকটাই এরকম। জেদি, একগুঁয়ে। মুশকিলে ফেলি সবাইকে। ব্রিটিশ সরকারও আমাকে মুর্তিমান শীরঃপিড়া মনে করে।
- সে আর বলতে বোসবাবু? তারা এখন গোটা ভারত তোলপাড় করে আপনাকে খূঁজছে, কিন্তু ভাবতেও পারছেনা, সুভাষ বোস খাইবার পাস পেরিয়ে আফগানিস্থানের একটা অজ গাঁয়ে সরাইখানায় এক গাদা নোংরা পোশাক পরা গরীব পাঠানের মধ্যে গায়ে জ্বর নিয়ে শুয়ে আছে, আর তিন দিন অভুক্ত থেকেও বাচ্চা ছেলের মত জেদ করে খেতে চাইছেন না।
- রোটি তোড়ো, তুম ভি খাও, হাম ভি খায়েগা ভকৎরাম তলোয়ার। আমি জানি তুমি কিচ্ছু খাওনি, আমাকে ডাহা ঝুট বলেছ। 
- কি করে ধরলেন বোসবাবু? 
- ওসব ছাড়ো ছোকরা। একবার বেরিয়ে দেখো তো হে, যদি সরাইয়ের পাশে চায়ের দোকানটা খোলা থাকে...
- চা পেলে খাবেন তো? 
- তুম ভি খাওগে, হাম ভি
- আভি আয়া বোসবাবু

** ভকৎরাম তলওয়ারের স্মৃতিকথা থেকে সংগ্রহ করা একটা ছোট্ট ঘটনা। চা পাওয়া গিয়েছিল এবং দুজনে চায়ে ডুবিয়ে সে রাতে রুটি ভাগ করে খেয়েছিলেন।

সোমবার, ২১ জানুয়ারি, ২০১৯

ডাক্তার ~ ডা: বিষাণ বসু

দেখুন, গাঁড়লের মতো তর্ক করবেন না। বেসিক ব্যাপারটা বুঝুন।

প্রবল হাওয়ায় কি মোমবাতি জ্বলে? জ্বালিয়ে রাখা যায়? জ্বালানো সম্ভব?

তার জন্যে অনুকূল পরিবেশ লাগে।

প্রতিকূল অবস্থায় মোমবাতি জ্বালানোর কথা ভাবে, ওই আপনার মতো, গাণ্ডু। আর, আপনি যদি ভাবেন, মোমবাতি জ্বালাচ্ছেন না কেন বাকিরা, তাহলে তো আপনি একটা আস্ত…..নাঃ, থাক, লোকে আমাকেই খারাপ ভাববে।

অতএব, বাস্তবতাটা বুঝুন।

কুকুরশাবকের মৃত্যু হলে মোমবাতি জ্বালাতে সেলিব্রিটি জোটানো কঠিন নয়। কেননা, ওই যে বললাম, পরিবেশ অনুকূল।

কিন্তু, দার্জিলিং-এ ডাক্তারদিদির মাথায় আস্ত লোহার রড পড়লে…..ক্যালানের মতো কথা বলবেন না, প্লীজ…..ডাক্তার এবং সেই রিলেটেড যেকোনো ইস্যুতেই পরিবেশ যে প্রতিকূল,অ্যাদ্দিনে এটুকুও যদি না বোঝেন, তাহলে মেনটস ছাড়া আর কেউই আপনার দীমাগ কি বাত্তি জ্বালানোর দায়িত্ব নেবে না।

সুতরাং, ব্যাপারটা সিম্পল।

আরে বাবা, স্বয়ং পুলিশ লিখিত উত্তরে জানিয়ে দিয়েছেন, যে, ডাক্তারদের উপর আক্রমণের ঘটনার লিস্টি তাঁরা মেইনটেইন করেন না।

করবেনই বা কেন? আর কোনো কাজ নেই নাকি?!!

দার্জিলিং-এ ডাক্তারদিদির মাথায় রডের বাড়ি পড়লে মিডিয়ায়, প্রথম পাতায় সেই খবর নেই কেন, এমন প্রশ্নও অবান্তর। কেননা, সবাই জানে, কুকুর মানুষকে কামড়ালে খবর হয় না, মানুষ যদি কুকুরকে কামড়াতে যায়, খবর হয় সেইটাই।

কাজেই, ডাক্তার মার খেলে খবর হওয়ার প্রশ্নটাই বা আসছে কোত্থেকে!!

হ্যাঁ, খবর হবে তখনই, যদি সেই মার খেয়ে ডাক্তারেরা প্রতিবাদ করেন, পথে নামেন, কাজ বন্ধ করেন, মিছিল করেন। আরে বাবা, ডাক্তারদের এই হারামিপনার জন্যে মানুষের হয়রানির কথাটা তো তুলে ধরতে হবে!!

এর পরে, হাওয়া যে অনুকূল নয়, সেইটা বুঝতে কি হাওয়ামোরগ হতে হয় নাকি!! 

সেলিব্রিটিরা বিদ্বজ্জন কেন? আপনি তো আর বিদ্বজ্জন নন। তাঁরা বিদ্বজ্জন একারণেই, যে, তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তি, ইন্দ্রিয় আপনার-আমার থেকে এগিয়ে। 

কাজেই, এই এগিয়ে বাংলা-য়, তাঁরাও এগিয়ে। 

তাঁরা আলোর পথযাত্রি।

মোমবাতি জ্বেলে তাঁরা আলো দেখান।

যে অপদার্থ ডাক্তারদিদি ঝলমলে কাঞ্চনজঙ্ঘা ছেড়ে নারীর জঙ্ঘার মাঝখান থেকে সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখানোর চেষ্টা করেন, এবং সেইটাও পেরে ওঠেন না, তাঁর তো আলোর অধিকারই নেই।

কাজেই, দুঃখিত ম্যাডাম, আপনার জন্যে মোমবাতি নেই। আপনার জন্যে কালো ব্যাজ, মুখে কালো কাপড়, শোকমিছিল - না, কিচ্ছুটি নেই।

ছেলেবেলায় সমাজবন্ধুদের লিস্টটি পড়েছিলেন তো? হ্যাঁ, সমাজের গু পরিষ্কারের দায়িত্ব থাকা আপনি, মানে ডাক্তাররা, সমাজবন্ধু, মানে সমাজের বন্ধু। কিন্তু, সমাজও আপনার বন্ধু হবে, এমন কোনো গ্যারান্টি তো আপনাকে কেউ দেয় নি। মানে, আপনি বিরাট কোহলির ফ্যান যদি হন, তাহলেই কি আপনি আশা করবেন যে বিরাট-ও আপনার ফ্যান!!

মনে রাখবেন, আপনি, আপনি স্রেফ একটা দাস। ক্রীতদাস।

এই ট্যাক্সপেয়ারদের পয়সায় আপনি ডাক্তারি পড়েছেন।

হ্যাঁ, এই কথাটা আপনাকে মনে করিয়ে দেবেন সেই সব শুয়োরের বাচ্চারা, যাঁরা জীবনে ট্যাক্স দেন নি, দেন না। কিন্তু, আপনাকে চুপ থাকতে হবে, থাকতেই হবে।

কেননা, মনে রাখুন, এইট পাশ যে মন্ত্রী আপনার মাথার উপরে, তিনি ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়েছেন নিজের পয়সায়। যে বন্ধু ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখন স্টেটসে বসে দেশ এবং দশের হাল নিয়ে ভয়ানক চিন্তিত, তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়েছেন নিজের পয়সায়। এমনকি, যে দিগগজ বিদেশে পাড়ি জমানোর পাথেয় হিসেবে একটি পিএইচডি করছেন, তাঁর সেই রিসার্চ গ্র‍্যাণ্টের পয়সার একটুও ট্যাক্সপেয়ার্স মানি নয়।

নেতার ওয়ার্ল্ডট্যুর, কিম্বা মাটি উৎসবের ফান্ড। আকাশছোঁয়া রামের স্ট্যাচ্যু বা ইমাম ভাতা।

মনে রাখবেন, উপরের একটিতেও ট্যাক্সপেয়ার্স মানি খরচ হয় না, যেমন করে খরচ হয়, কিছু অপোগন্ডকে ডাক্তারি পড়াতে।

আর, যেহেতু আপনি এতো খরচ করেছেন এইসব চুথিয়াদের পেছনে, তারা পছন্দমতো সার্ভিস দিতে না পারলেই, মানে নব্বই বছরের বৃদ্ধকে টাট্টুঘোড়ার মতো চাঙা করতে না পারলেই বা আগেভাগে চেক-আপে না আসা প্রসূতি জটিল অবস্থায় হাসপাতালে এসে জাদুকাঠির ছোঁয়ায় সমস্যাহীন প্রসব না হলেই….আপনি ভাবেন…

শাল্লা….দুধকলা দিয়ে কালসাপ পুষেছি!!!

আর, সাপ দেখলে আপনি কী করেন!!

তবে কি, একটু রয়েসয়ে। সাপের ব্যাপারে একটু সাবধান।

সাপ কিন্তু ডাক্তার নয়।  

দুমদাম লোহার রড নিয়ে চড়াও হবেন না। আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না। 

দেশে আইনকানুন আছে। মানেকাজি আছেন।

গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরী মিডিয়া আছে।

সমাজসচেতন বিদ্বজ্জনেরা আছেন।

শনিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৯

সাবাস ~ অনামিকা

এখন থেকে কোথাও গেলে জানিয়ে যেও... কেমন!
ভিন পাড়াতে বন্ধুরা নেই... দাঁড়িয়ে আছে ডেমন।
এই বাংলার আলতো ছেলে, তুমি অরাজনীতি
এপাং-ওপাং ট্রামলাইনের সিনেমাটিক গীতি।
কড়ি কোমল প্রতিভাময়, জ্বলন্ত তরতাজা
ফুল রাইমএর মশাল তুমি, হাফ রাইমের রাজা।
কী অনায়াস অনভ্যস্ত ভাষার আঁকিবুঁকি 
সবাই লেখা নকল করি। ছন্দ থেকেও টুকি।

মধ্যবয়স পৌঁছে গেলে না খুঁজে ছলছুতো 
বঙ্গভাষী কলম আখের গুছিয়ে নেবেই দ্রুত।
এই রকমই নিয়ম যদি, কীসের তবে দেরি?
মঞ্চে ওঠো। কলমটাকে করতে থাকো ফেরি।
হাফ রাইমের ঈশ্বর হে, বেজায় মাথা চুলকে
সময় মতন করছ রিপু ঈশ্বরীয় ভুলকে।
সাবাস তোমায়, সার কথাটি ফেললে বুঝে আস্ত।
বাঁশ কিম্বা দূর্বা সবই দিনের শেষে ঘাস তো!

বৃহস্পতিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৯

মকর সংক্রান্তি ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

উত্তরায়ণ সংক্রান্তি  সমাগত, সে দিনে সকাল সকাল মকর স্নান করার জন্য মাতা যশোমতী বালক শ্রীকৃষ্ণকে উদ্দেশ্য করে সংক্রান্তির পূর্ব রাত্রে বলেছেন-
"আসিল যে পৌষ মাস শুনহ রাজন।
দ্বিদশ  নবম  দিন  দিল  দরশন ॥

সকালে স্নান শুনেই শ্রীকৃষ্ণের পেট গুড়গুড় শুরু হয়ে গেল, সেই ঠাণ্ডা জলে স্নান সে একমাত্র বহু কষ্টে সরস্বতী পুজোর দিন করে তাও যদি দেবী রুষ্ট হয়ে অঙ্কে ফেল করিয়ে দেন সেই ভয়ে, তাই কৃষ্ণ মাতা যশোমতীকে নানা অজুহাত দেওয়া শুরু করল। যশোমতী আবার এসব স্কুলে বহুদিন আগেই পড়াশুনো করেছেন, সুতরাং শ্রীকৃষ্ণের শরীর ভাল নেই, সর্দি লেগেছে। গা ম্যাজম্যাজ করছে বিশেষ পাত্তা পেল না। যশোমতী বললেন হ্যাঁ রে এই যে সারা দুপুর টোটো করে ঘুরে বেড়াস, বাঁশি বাজাস, ২০-২০ খেলিস তখন তো তবিয়ৎ আচ্ছা থাকে, যশোমতী বহুদিন মথুরায় ছিলেন তাই কথায় মাঝে মধ্যে হিন্দি শব্দ ঢুকে পড়ে।

শ্রীকৃষ্ণ শেষ চেষ্টা হিসেবে প্রস্তাব দিলেন গরম জলে স্নান করলে হবে না, শুনে যশোমতী যেন আকাশ থেকে পড়লেন, বললেন আরে এ স্নান গঙ্গাসাগরে করতে হবে, অনেক দূরের পথ, রাত থাকতে বেরতে হবে, শেলদা, ডায়মন্ড হারবার, নামখানা গঙ্গাসাগর। শ্রীকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করলেন আচ্ছা এ পথে কি তিব্বত ডোকালামও যাওয়া যায়? যশোমতী তখন কয়লার উনুনে রুটি ভাজছিলেন, বললেন সে আমি অত জানি না, দরকার হয় তো গুগুল ম্যাপ দেখে নে।

মোবাইল তখন চার্জে বসানো, শ্রীকৃষ্ণ দেখেন একগাদা মেসেজ, হোয়াটসএপে হ্যাপি মকর সংক্রান্তির ছবি, শুভেচ্ছা ভর্তি, একজন সাধু একগলা জলে দাড়িয়ে পুণ্যস্নান করছেন আর সূর্যপ্রনাম করছেন। শ্রীকৃষ্ণ মনে মনে ভাবলেন কারও পৌষ মাস কারও সর্বনাশ।তবে আগে স্নান না আগে সূর্যপ্রণাম এ নিয়ে তিনি ভয়ানক দ্বন্দে পড়ে গেলেন। উপায়, উপায় একটাই বেনিমাধব শীলের হাফ পঞ্জিকা, কিন্তু কাজের সময় কি সে হাতের কাছে পাওয়া যাবে?

 

যশোমতী পিঠে বানাবেন, নারকেল, খেজুর গুড়, চালের গুড়ো সব বাজার থেকে শ্রীকৃষ্ণকে দিয়ে আনিয়েছেন, বালক শ্রীকৃষ্ণর আজ ভারি মজা, রুটি তরকারি খেতে খেতে পেটে চড়া পড়ে গেছে, খাওয়াদাওয়াতে খানিক ভ্যারাইটি না হলে হয়, ইদানিং আবার অনলাইনের এক ফ্যাসান হয়েছে, সেদিন ধৃতরাষ্ট্র জ্যাঠার বাড়ি অনলাইনে আনা পাটিসাপটা দিয়েছিল জেঠি সে যে কি অখাদ্য যে না খেয়েছে কি বুঝবে। ওদিকে দুর্যোধন কানের কাছে ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে যাচ্ছে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে আমাদের হয়ে লড়াই করুন, সকাল বিকেল পাটিসাপটা পায়েস ফ্রি। শুনে কৃষ্ণ তো বলেই বসলেন তোরা খালি কখন অনলাইনে সেল লাগে সেই খোঁজ রাখ আর যত পুরনো এক্সপায়ার পিঠে , পায়েস খেয়ে দুহাত তুলে নাচ। আসিস সংক্রান্তির দিন, পেট ভরে পিঠে খেয়ে যাস।

শুনে গান্ধারী বললেন কি করি বল, এখন আর সেই নারকেল কোড়ানো, চাল গুড়ো করা, দুধ জাল দেওয়া, সরুচাকলি বানানো একহাতে পেরে উঠি না। তাই অগত্যা।

 

ওদিকে ভীষ্ম শরশয্যায়, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের দশম দিনে অর্জুনের শরাঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে রথ থেকে মাটিতে পড়ে যান, তিনি জানতেন মহর্ষি বশিষ্ঠের অভিশাপগ্রস্ত হয়ে ইহলোকে মনুষ্য হিসাবে কৃতকর্ম ভোগের জন্য জন্ম নিয়েছিলেন। হিসেবমত তাঁকে দেবলোকে ফিরে যাবার কথা, কিন্তু প্রবলেম হল দক্ষিনায়নের সময় দেবলোকে রাত্রি, সবকিছু বন্ধ থাকে, অনেকটা সেই স্কয়ান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোর মত, সুতরাং অপেক্ষাই যখন করতে হবে তিনি মনস্থ করেছিলেন পৃথিবীতে থাকবার। অন্তত কিচু চেনা মানুষজন দেখা যাবে, দু একটা সুখ দুঃখের কথা বলা যাবে আর দেবলোকের বাইরে সেই অন্ধকারে অপেক্ষা করবার কোন অর্থ হয় না, না সেখানে মোবাইল সিগন্যাল আছে না আছে ঘণ্টাখানেক সুমন।

ভোর হয় হয়, পৌষ সংক্রান্তি, উত্তরায়ণের প্রারম্ভ। সেই সাগরে হাজায় মানুষের সাথে শ্রীকৃষ্ণ ডুব দিলেন, তিনি ভুলেই গেছেন এ বিশ্ব সংসারের তিনিই স্রষ্টা, বিধাতা, নিয়ন্তা।

পিতামহ ভীষ্ম সদ্য শরীর ত্যাগ করেছেন চলেছেন দেবলোকের পথে।
 
যশোমতী আজ উঠোনে সকাল সকাল আলপনা দেবে, পিঠে বানাবে আর সেই আতপ চাল, নারকোল, গুড়ের গন্ধে ভেসে যাবে বিশ্ব চরাচর।

শুভ মকর সংক্রান্তি।

বুধবার, ১৬ জানুয়ারি, ২০১৯

কুকুর ~ ড: রেজাউল করীম

এক চাষার ব্যাটা একবার জাঁক করে বলেছিলেন- হেলে ধরতে পারে না, কেউটে ধরতে গেছে। ঘটনাচক্রে, উপমাটা মনে হল এই জন্যে যে, মহাজোটের কাণ্ডারী তো রাজ্য সামলাতেই ল্যাজেগোবরে, দেশ সামলাবেন কি করে? "পঞ্চাশ টাকা বেশী দামের পশু খুনে" দুজন অল্পবয়সী মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এদের অপরাধ খাটো করে দেখতে চাই না, কিন্তু এর জন্য ও কি তারাই দায়ী নয়, যারা শাসন ক্ষমতায় আসীন? এই অবুঝ মেয়েগুলো কিভাবে বুঝবে মানুষের চেয়ে গরু আর কুকুরের জীবনের দাম বেশী? অসংবেদনশীলতা তারা শিখেছে রাজনীতির কারবারিদের কাছে, যারা নিত্যদিন নতুন নতুন অবিমৃষ্যকারিতার ইতিহাস তৈরী করছে। যেদিন সুজেত জর্ডন ধর্ষিতা হন, সেদিন একজন বলেছিলেন সাজানো ঘটনা। অসংবেদনশীলতা নয়? যেদিন কাটোয়াই একজন মহিলা স্টেশনে ধর্ষিতা হয়ে ছিলেন সেদিন সেই একই ব্যক্তি বলেছিলেন- সিপিএম। অসংবেদনশীলতা নয়? এর পর নানা ঘটনায় দেখা গেছে প্রতিদিন কত অসংবেদনশীলতার ইতিহাস তৈরী হচ্ছে "দুষ্টু ছেলেদের" হাতে, হাতে হাতে লাল বাতাসা নিয়ে অপেক্ষমান উন্নয়নের হাতে! তারা প্রতিদিন এই অসংবেদনশীল পরিবেশে বেড়ে উঠছে, কি করে বুঝবে কুকুরছানা মরলে হাজতে যেতে হবে! এই তো কিছুদিন আগে একজন শিক্ষকের মৃতদেহ পাওয়া গেল, রেল লাইনের ধারে, নৃশংস ক্ষতচিহ্ন নিয়ে। কতজন গ্রেফতার হয়েছে? একজন পুলিশকে দিনদুপুরে খুন হতে হল। কতজন গ্রেফতার হয়েছে? উত্তরপ্রদেশে গরু খুনে গ্রেফতার হয় বলে যারা চিৎকারে আকাশ ভরিয়ে তোলেন তারা কুকুর খুনকে গুরুত্বপূর্ণ ভাবেন, মানুষ খুনে কেন পায় না বিচার বলতে পারবেন? কাল একজন যুবক "নানা হাসপাতালে ঠোক্কর খেয়ে হাত হারিয়েছে"(আবাপ)। অসংবেদনশীলতা নয়? কে দায়ী? আপনি দায়ী। কারন ভোটে নির্বাচিত হয়ে ও বেড বাড়াননি, ডাক্তার বাড়াননি, পরিকাঠামো উন্নয়ন করেননি। তার কি কোন শাস্তি আছে? না নেই, ক্ষমতার চাবিকাঠি আপনার হাতে। বিচার করতে গেলে জজের ও হাত কাঁপে। আমাদের মত ছাপোষা মানুষদের জীবনের কোন দাম নেই। যে কোন সময় নেই হয়ে যেতে পারি। যেমন অম্বিকেশের হয়েছিল। যেমন প্রেসিডেন্সির সেই ছাত্রীটিকে দেগে দেওয়া হয়েছিল, যেমন সেদিন শালবনির ডাক্তারদের দেগে দেওয়া হয়েছে। কেউ সিপিএম কেউ মাওবাদী।
কাল একজন ডাক্তার মারা গেছে। একটি ছোট্ট শিশুর হার্ট সচল করতে গিয়ে নিজের হার্ট স্তব্ধ হয়ে গেছে। তার আরো ১৯২ জন সাথী আক্রান্ত হয়েছে। প্রানে মেরে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে, একজনকে তো সপরিবারে। কেউ গ্রেফতার হয়েছে? কেন প্রতুল মাহাতো গ্রেফতার হয় নি? কেন পুলক দত্ত গ্রেফতার হয়নি? অসংবেদনশীলতা শুধু নয়, বিচারব্যবস্থা কে দুমড়ে মুচড়ে শেষ করে দেওয়া। আইনকে ইচ্ছামত বাঁকানো। 
এই ইতিহাসের মহাভারত রচনা করা যায় কিন্তু  পাহাড় প্রমান নির্বুদ্ধিতা আর অসৌজন্য ও অসংবেদনশীলতার ইতিহাস লাগে না, বুঝ মন যে জানে সন্ধান। আসল কথা হল গনতন্ত্রের নব নব সংজ্ঞা উদ্ভাবন করে নিজের সব পাপ কার্পেটের তলায় ঢুকিয়ে ফেলা। তারপর সন্ন্যাসী সেজে বসা। দেশের শাসক হয়ে বসার আগে আগে "সর্বজন হিতায়, সর্বজন হিতায়" নীতি নিজের জন্য প্রয়োগ করুন। আগে প্রমান করুন, হেলে ধরতে পারেন, কেউটে দূর অস্ত।

মঙ্গলবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯

কৃষক কেন দাম পায়না ~ অংশুমান মজুমদার

বিপ্লব সেনগুপ্ত বা দীপঙ্কর মুখার্জীর লেখায় বাজারের সমস্যা নিয়ে একটি গল্প পড়েছিলাম। গল্পটি ইংল্যান্ডের কয়লাখনি শ্রমিকের পরিবারে কথোপকথন। অনেকেই গল্পটা পড়েছেন, তবুও শীতের রাতে খনি শ্রমিকের পারিবারিক কথাবার্তায় আজকের চিত্রও ফুঁটে ওঠে।
শ্রমিকের ছেলে তার মা কে প্রশ্ন করে: বাড়িতে আজ ঘর গরম করার জন্য ফায়ার প্লেসে কয়লা দাওনি কেন?
মায়ের উত্তর: বাড়িতে কয়লা আর নেই।
ছেলের প্রশ্ন: তাহলে দোকান থেকে কয়লা কিনে আনো।

মায়ের উত্তর: কয়লা কিনতে তো টাকা লাগবে। কিন্তু আমাদের যে টাকা নেই।
ছেলের প্রশ্ন: টাকা নেই কেন?
মায়ের উত্তর: তোমার বাবাকে খনির মালিক বেতন দেননি এবং চাকরিটাই চলে গেছে। তাই আমাদের টাকা নেই।
ছেলের প্রশ্ন: বাবার চাকরি হারালো কেন?
মায়ের উত্তর : বাজারে কয়লার মজুদ বেশি হয়ে গেছে। সে জন্য খনির কাজ বন্ধ। ফলে তোমার বাবার চাকরি গেছে। চাকরি নেই, তাই হাতে টাকা নেই। টাকা নেই, তাই কয়লা কেনা যায়নি। বাজারে কয়লার পরিমাণ 'বেশি' হয়ে যাওয়ার কারণে আজ আমাদের ঘরে কয়লা 'নেই'।
গল্পটি পড়লে আজকে আনন্দবাজার পত্রিকার আট পাতায় প্রকাশিত '৫ পয়সা কেজি পেঁয়াজ, খাচ্ছে গরুতে' খবরের মিল খুঁজে পাওয়া যাবে।
খুচরো বাজারে পেঁয়াজের দাম আছে, অতি ফলনের খবর নেই, তবুও কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছে না!
বাজারে অবশ্য গরু আছে খবরেই প্রকাশ, আর আছে ফঁড়ে, যেটা খবরে নেই। তবে কৃষকদের উৎপাদিত ফসলের দাম সুনিশ্চিত করার প্রচেষ্টার মারাত্মক ঘাটতি যে আছে, সে কথা প্রকাশের প্রয়োজন হয় না।
দুর্দশার অন্য খবরও আছে। মহারাষ্ট্রের আখচাষীদের অল্প দামে তাঁদের কাছ থেকে আখ কিনে কারখানার মালিকরা চড়া দামে বিক্রি করে তার থেকে তৈরি হওয়া চিনি। মালিকপক্ষের কাছ থেকে বিক্রির সেই সামান্য টাকা তুলতেও কালঘাম ছুটে যায় কৃষকদের। বারবার অভিযোগ করেও কারখানার মালিকদের কাছথেকে বকেয়া না পেয়ে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে। শুক্রবার ক্ষুব্ধ চাষীরা ভাঙচুর চালায় সাতারার কৃষ্ণা চিনি কারখানায়।

মেল গ্যেজ বনাম পুরুষের মুগ্ধতা ~ উর্বা চৌধুরী

এই তো সেদিন গড়িয়াহাটের চারমাথা থেকে পার্কসার্কাসের সাতমাথায় যাব বলে অটোরিকশায় উঠেছি। পাশে যে মেয়েটি  বসেছিল, সে এক অপূর্ব সুন্দর মেয়ে। চোখ ফেরানো যায় না। তাও যদি বা আমার চোখ ফেরে, অটোচালকের চোখ তো মোটেই ফেরে না। ডানদিক-বামদিক যখন যে আয়না দিয়ে সম্ভব একজোড়া চোখ দেখে চলে। নিষ্পলক। মধ্যে মধ্যে মনে হচ্ছিল বলি, "ভাইয়া, সামনে দেখকে চালায়েঙ্গে!" কিন্তু বলতে আর পারি কই! অমন ব্যাকুল চাহনিকে কি আর ফিরত যেতে বলা যায়!

'মেল গ্যেজ' শব্দখানা ব্যবহার করতে হলে বড় নির্দয় লাগে নিজেকে। খুব বেশিদিন এ শব্দের অতিপ্রয়োগ চলছে তা নয়। ক'বছর হল। তাবলে পুরুষের চাহনি নিয়ে আমরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করিনি তা তো নয়! খারাপ ভাবে তাকানো, বিশ্রীভাবে তাকানো, লোলুপ চোখ, কামুক চোখ এসব তো বলতামই। 

আবার মুগ্ধ চোখের কদরও যে করিনি তেমনটা নয়! চাঁদ দেখতে গিয়ে তোমায় দেখে ফেলা চোখের জন্য আহ্লাদও নেহাত কম থাকে না। 

তেমনটাই ছিল অটোচালকের চোখে। হিমসিম খাওয়া মুগ্ধতা! নাচার মুগ্ধতা! পনেরো মিনিটের পথে যতক্ষণ পারা যায় ততক্ষণ তাকিয়ে থাকার মতো মুগ্ধতা!

মুগ্ধতাই তো! একই সমাজে বাঁচব। একই পৃথিবীতে বাঁচব। একই সঙ্গে বাঁচব! স্বস্তিতে বাঁচব! আনন্দে বাঁচব! তৃপ্তিতে বাঁচব! মুগ্ধ হব না! সে মুগ্ধতা প্রেমের হোক বা বাৎসল্যের, যৌনতার হোক বা স্নেহের, উচাটনের হোক বা আরামের, শেষতক, মুগ্ধতাই তো! 

তবে কোনোদিন সেই মুগ্ধতা যদি ঘুচবে, তবে এমনভাবে ঘুচবে যে, দেখার মানুষটি বেঁচে থেকেও মৃতের মতো বীভৎস ফ্যাকাসে হয়ে যাবে। ফ্যাটফ্যাটে হয়ে যাবে। সেদিন আর তার সে সৌভাগ্য থাকবে না, যে সৌভাগ্যে চাইলেই পলাশকে আগুন লাল রঙে দেখা যায়, শ্বেতকাঞ্চনের দিকে তাকালে আরাম পাওয়া যায়, স্থলপদ্মের হরেক রঙ খুঁজে পাওয়া যায়। 

সীলড্ বটল্। কীই বিস্ময়! আমার সহনাগরিক, আমাকে এমন একটি জড়বস্তুর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন, যার না আছে বুকের ধুকপুকানি, না আছে স্পর্শের রকমফের, না আছে চাহনির কোনো বার্তা, না আছে দেহের ভাষা, না আছে দাবি, না আছে ইচ্ছা, না আছে কোনো আগ্রহ। যৌন আবেদন! আছে! তাও তো নাই! 

আমার সহনাগরিক আমার মর্যাদা এমন মাটিতে মেশান যে, মাথা কুটে মরলেও তিনি আমার কাছ থেকে কণামাত্র মানবিক ছোঁয়াটুকুও আর পান না। আমাকে তিনি আস্ত একখানা জড়বস্তু বানিয়ে ছেড়ে দেন। 

শিক্ষক আকাশ থেকে পড়েন না। আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ও নির্দিষ্ট কোনো সামাজিক সংস্কৃতি থেকে কোনো সুইচ টিপে ভিন্ন হয়ে যায় না। 

টেলিভিশনে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু শিক্ষার্থীকে তাদের অধ্যাপক কনক সরকার প্রসঙ্গে বলতে শুনলাম, "যাদবপুরের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে..."!

মন খারাপ লাগছিল ভেবে যে, বাচ্চা বাচ্চা কিছু ছেলেমেয়ে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ নিয়ে গর্বের সঙ্গে প্রতিবাদ করতে গিয়ে থমকে যাচ্ছে। মন খারাপ লাগছিল ভেবে যে, তারা তাদের বিশ্ববিদ্যালয়েরও যে একটি গড়পড়তা বাস্তব ছবি রয়েছে, তা হুট্ করে দেখতে পেয়ে গিয়ে ধাক্কা খাচ্ছে। 

কিন্তু যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বাস্তবতার একটি বাস্তবতা এরকমই। 

সব প্রতিষ্ঠানেরই এমন এক একটি কান্না পেয়ে যাওয়ার মতো বাস্তবতা থাকে। সে বাস্তবতা সবটা নয়। তবে কিছুটা যেহেতু বটেই, তাই বারবার ফিরে যেতে হয় সেই অটোচালকটির কাছে, যাঁর মুগ্ধ চোখের ব্যাকুল চাহনিকে মোটেই ফিরত যেতে বলা যায় না। তিনি অন্তত জানেন, কামনার মানুষটির দিকে জড়ভ্রমে তাকাতে নাই। 

অধ্যাপক কনক সরকারের মতো বুরবকেরা নারীর মর্যাদাহানি করুন, ক্লেদে ডুবে থাকুন...তাই বলে ভাববেন না, নারীকে দেখার মতো মুগ্ধ পুরুষচোখের অভাব ঘটবে, ওটি আপনিই জুটে যাবে। নিত্যদিন!