শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

বেলিফুলের সুবাস

রোদ তখনও মাঠের ওপর ট্যারচা হয়ে পড়ছে, পেছনের সাল গাছের নিচু ডালটার ওপর সে রোদ এক লাফে উঠে পড়লেই, এই নবম দশম শ্রেণীর কয়েকটি কিশোর সেদিনের মতো খেলা শেষ করে যে যার ঘরে ফিরে যাবে। দুপাশে সারি দিয়ে কমলা হলুদ রঙা কোয়ার্টার, সামনে একটা করে ফুল বাগান, হালকা বেলি ফুলের সুবাস। সেদিকে মন নেই রনির। চারিপাশে কোয়ার্টারগুলোর মাঝে কচি দেখে একটা খেলার মাঠ, সরস্বতী পুজো থেকে হাফ প্যাডেল সাইকেল শেখা, সবই এখানেই। আজকের খেলাটাও। রনির পায়ে ফুটবল, সামনে বুবুন। বাম পায়ের হালকা ভাজে বুবুন কেটে গেল, সামনে টুকুন। দুটো ছোট্ট ছোট্ট ডজ দিতেই টুকুন ধুলোয়, মাটিতে। সামনে অজয় আটকাতে আসতেই ওর দুপায়ের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়ে দিল রনি। সামনে ফাঁকা গোল। আর মাত্র একটা টাচ, ব্যাস! কিন্তু এটা কে? সামনে এটা কে! কাকে কাটাতে হবে! অনির সামনে ওরই বয়সী .... মেয়েটির নাম জানতে জানতেই আরো একটা বছর ঘুরে যাবে। নিশ্বাস যেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো। স্ট্যাচু হয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে রনি যেন কয়েক যুগ স্থির হয়ে থাকল। ওদিকে বল তো পরে থাকলো দুজনের মাঝখানে, শুধু রনির হৃদয় টা লাব ডাব করতে করতে তিনটে চারটে ড্রপ খেয়ে মেয়েটির জিম্মায় চলে গেল। 

আসলে ওই আরেকটু দূরের কোয়ার্টার গুলো থেকে মার্কেটে যেতে হলে শর্টকাট এই মাঠের মধ্যে দিয়েই। তাই আরো কয়েকবার এই মাঠেই দেখা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলনা। আর নাম ঠিকানাটাও জানা হচ্ছেনা, হলনা। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও ভরসা হয়না, যদি সবাই জেনে যায়। তারপর যদি ওদিক থেকে নাকচ হয়, তাহলে মুখ দেখাবার জায়গাটাও থাকবেনা। সাইকেল নিয়ে টই টই করে ঘুরেও আর তোমার দেখা নাই অবস্থা।

সেই পুজোতে ফাঁকা ফাঁকা মনমরা নবমীর দিন দুপুরে হঠাৎ সে! জিন্স পড়েছে বলে কেউ টিপ্পনী কাটলো, তাই ওদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল। এবার অনেক কসরত করে ঠিকানাটা আন্দাজ করা গেল, চার নাম্বার স্ট্রিটের দশ বা বারো নাম্বার কোয়ার্টার। আরো মাস কয়েক লাগলো নাম জানতে, পলি। ভালো নাম জানতে জানতে মাধ্যমিকের রেজাল্টও বেরিয়ে গেল। 

একই স্কুলের দুই শিফটে দুজনের ইলেভেন টুয়েলভ, তাও দেখা হয়না কোথাওই। টিউশনও আলাদা জায়গায়। দুবছরে অনেক লেবার দিয়ে বার চারেক দেখা হল, আর প্রত্যেকবারই দেখামাত্রই শ্বাস প্রশ্বাস পুরোপুরিই বন্ধ। এর মধ্যে অল্পবিস্তর নোট থেকে শুরু করে ক্লিফ রিচার্ডসএর ক্যাসেট বা আর্চিস কার্ড আদান প্রদান, প্রদানই মূলত। 

এগারো বারো শেষ। রনি চলল ইঞ্জিনিয়ার হতে সেই সুদূর দক্ষিণে, পলি চলল ডাক্তার হতে। দুজনেই নিজেদের শহর ছেড়ে নতুন জায়গায়। ভবিষ্যত গড়তে। রনির পুজোর ছুটি বলে কিছু নেই। চিঠিতে কার্ডে বলার চেষ্টা করেছে এই কয় মাসে, কিন্তু কোনই উত্তর নেই! সেমিস্টারের শেষে প্রায় ছয় মাস পরে ফিরেই ছুটলো পলির বাড়িতে, যা থাকে কপালে, বলেই দেবে, আর তো জমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা নিজের কাছে।

 অনেক চেষ্টা করেও রনি আর খুঁজে পেলনা পলিকে। ওরা এই কোয়ার্টার ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, অন্য কোয়ার্টারে নাকি অন্য শহরে, কেউই বলতে পারলোনা। বন্ধুদের মাধ্যমে কলেজে খোঁজ নিয়েও চেষ্টা কম করেনি রনি। কিন্তু যেন, হওয়ায় উবে গেছে পলি, কোত্থাও কিছুতেই দেখতে পাওয়া গেলনা। তারপর চার বছর ধরে প্রতিবার বাড়ি ফিরে চেষ্টা করে গেছে একবার যোগাযোগ করতে, কিন্তু দেখা হয়নি। বলাও হয়নি।



এইভাবেই রনি আর পলি, দুজনের রাস্তা  সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলল, কিন্তু আর একসাথে হলনা। তখনও অরকুট ফেসবুক মোবাইল আসেনি, এসব থাকলে কি আর এরকম দশা হত।

ইঞ্জিনিয়ারিং আর এমবিএ করে, প্রভাব প্রতিপত্তি আর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটে গেল সারা জীবন। শুধুই সামনের দিকে তাকিয়ে ছুটে চলা, পেছনে তাকানোর অবসর আর কই। অল্প বয়সেই মা বাবা কে হারানোর জন্যে, বিয়েটাও করা হয়ে উঠলনা। তবে রনি হয়ে উঠলো রনজয় দাশগুপ্ত।

পলিও জানতে পারেনি কোনোদিন। মনের মধ্যে একটা নরম স্মৃতিটুকু শুধু কাছ ছাড়া করেনি। পরীক্ষার পর পরীক্ষা, দিন রাত্তির খাটনি, নিরন্তর ঘাড় গুঁজে কাজ করতে করতে, কখন যে কিভাবে বিয়েটা না হয়ে গেলো, টিকলো না, তবে হয়ে উঠলো ডাঃ পৌলমী সেন।

পলি আর রনি একটু সুসময়ের খোঁজে জীবনের ঝড় ঝঞ্ঝা রোদ বৃষ্টি গুলো সইতে সইতে শুধুই সামনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেছে। মনে মনে হয়তো চেয়েছিল দুদণ্ড শান্তি। মুখোমুখি, কথা বলার, চেনার, চেয়ে থাকার!

আগামী কাল রনির বড় সার্জারী। এ্যানেসথেটিক চেক আপ আজ সকালেই। ডাক্তারের নামটা দেখেই পেটের ভিতরে ফুরফুরিয়ে কয়েকটা প্রজাপতি উড়তে থাকলো! দুজনের দেখাও হলো। বেলিফুলের সুবাস কি এতগুলো বছর পেরিয়ে ভেসে এলো? অন্তত সাইতিরিশ বছর পর! সার্জারির আগের দিন সন্ধ্যে বেলা কেবিনে বসে দুজনে কথা বলল! প্রাণ খুলে। পরের দিন রনির সার্জারীও হয়ে গেল। রনজয় দাশগুপ্ত কে সার্জারী করেছিলেন, না ডাঃ পৌলমী সেন নন, অন্য একজন ডাক্তার।

পুরোনো বন্ধুরা আলোচনা করছিল, শুধু জানা হলনা রনি আর পলি কি দুজনে দুজনকে সত্যি ভালবেসেছিল? দুজনে দুজনকে বলতে পেরেছিল? দুজনের কি দেখা হয়েছিল আর, সম্ভবই না।

কারণ, সেদিন হাসপাতালে ওদের দেখা তো হয়নি। পলি বহুবছর হল নেই, আর আজ থেকে রনিও নেই! তাই আজ আর জানার কোনো উপায়ও নেই! হায়রে কল্পনা, আর কল্পনা নিয়ে বাঁচা!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন