শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

মাঝেরহাট ব্রিজ ও নীল-সাদা ধ্বংসস্তূপ ~ কাজল মল্লিক



সম্প্রতি মাঝেরহাট ব্রিজের ভেঙে পড়া বাস্তবের ট্র্যাজেডির পাশাপাশি গুরুত্ত্বপূর্ণ প্রতীকী মূল্য বহন করে | কয়েক বছর ধরে যে একের পর এক সেতু ও উড়ালপুল ভেঙে পড়ছে, এবং ব্রিজের তলা দিয়ে বা ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় শহরবাসীর যে হঠাৎ করে সেসব কথা মনে পরে যাচ্ছে ও সে প্রযুক্তির কিছু না বুঝেও অসহায়ভাবে ব্রিজের শরীরের দিকে তাকাচ্ছে এ যাত্রা বেঁচে যাবে কিনা বোঝার জন্য এই ব্যাপারটা এই সময়ের একটি যুগচিহ্ন মাত্র, একটি শক্তিশালী যুগচিহ্ন | 

বস্তুতঃ, রাজ্যের বর্তমান শাসনব্যবস্থায় প্রায় সবকিছুই ভেঙে পড়েছে | অন্য সবকিছু ভেঙে পড়ার দৃশ্য যদিও ব্রিজের মতো অতটা নাটকীয় ও ট্র্যাজেডি অতটা অকস্মাৎ ও তাৎক্ষণিক নয়, সেসব ভেঙে পড়া অনেক ক্ষেত্রেই উপড়ে আনার চেষ্টা করছে আরো অনেক গভীর শিকড়, তাদের অভিঘাত আরো অনেক গভীরে নিহিত |

এই সরকার আসার পরে প্রথমেই যেটা ভেঙে পড়েছে সেটা গণতন্ত্র | গণতন্ত্র শব্দটা বড়, তাই একটু ভেঙে বোঝা দরকার | একদিকে গেছে সরকার ও তার প্রধানকে প্রশ্ন করার অধিকার | খবরে আসা কিছু উদাহরণ সবারই মনে আছে, ডাক্তার শ্যামাপদ গড়াই দিয়ে শুরু, তারপর সারের দাম বাড়ছে কেন জিগেস করে কৃষক শিলাদিত্য, পার্ক স্ট্রিটকাণ্ডে কিছু একটা অপরাধ হয়েছে বলে মনে হয় শুধু এইটুকু বলার জন্য পুলিশ অফিসার দময়ন্তী সেন, রাস্তাঘাটে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে প্রশ্ন করে প্রেসিডেন্সির ওই ছাত্রী, ডেঙ্গু-কে অজানা জ্বর লিখতে না চেয়ে ডাক্তার অরুণাচল দত্তচৌধুরী, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি | এছাড়া খবরের বাইরে থাকা অসংখ্য ঘটনা ঘটে চলেছে প্রতিনিয়ত যেখানে বিরোধী রাজনীতি করার "অপরাধে" হুমকি প্রলোভন আক্রমণ ও মিথ্যা মামলার সামনে পড়তে হচ্ছে অসংখ্য রাজ্যবাসীকে |

গণতন্ত্র ভেঙে পড়ার আরেকটি সহজবোধ্য দিক হচ্ছে নির্বাচন উঠে যাওয়া | কোথাও কোথাও সরাসরি, যেমন ইস্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় অফিসের বিভিন্ন কমিটি ইত্যাদি | নির্বাচন উঠিয়ে দাও বা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দাও আর ততদিন দলীয় লুটের রাজত্ব বজায় রাখো | আর বড় নির্বাচনগুলো, বিধানসভা পৌরসভা পঞ্চায়েত, যেগুলো আক্ষরিকভাবে উঠিয়ে দেওয়া মুশকিল, সেগুলো কার্যত উঠিয়ে দাও | প্রথমে ভয় দেখাও যাতে লোকে বিরোধীদলের প্রার্থী হতে না চায়, তাতে যাদের বাগে আনা যাবেনা তাদের দলীয় কর্মী তথা গুন্ডা দিয়ে মনোনয়ন জমা দিতে বাধা দাও (পুলিশ ঠুঁটো জগন্নাথ, সুতরাং কিছু বলবে না বা গুন্ডাদেরই সাহায্য করবে), তাতেও না হলে ভয় দেখিয়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করাও | এরপর তো নির্বাচনের দিন তাণ্ডব আছেই - হাতে বালা গলায় মালা কোমরে বন্দুক মুখে শাসানি নিয়ে নেতা থেকে ক্যাডার সবাই নেমে পড়বে | আর যাদের নামার কথা অর্থাৎ পুলিশ তাদের দেখা যাবেনা! এরপর নির্বাচন কমিশনকে নালিশ জানালে তারা সাকুল্যে আড়াইখানা বুথে পুনর্নির্বাচন করবে যেগুলোয় আবার সেরকম গোলমাল হয়নি! আর যেহেতু বড় দেশ, তাই এই সবকিছুর পরও কতিপয় বিরোধী প্রার্থী জিতবে | তাদের জন্য শেষ অস্ত্রটি ছাড়া হবে - যারা এতো বাধাবিপত্তি পেরিয়ে ঝুঁকি নিয়ে এই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ভোটে জিতলো, কোনো এক আশ্চর্য কারণে তারা ভোটের দু-চারদিন পরেই "উন্নয়নে" মুগ্ধ হয়ে দল পাল্টে তৃণমূলে যোগ দেবে !

দ্বিতীয় যেটা এই সরকারের আমলে উঠে গেছে সেটা প্রশাসন | আগের অংশেই পরিষ্কার, ভোটের সময় বা অন্য যেকোনো সময়, তৃণমূলের গুন্ডারা যাই করুক, পুলিশ কিছু বলবেনা, এটাই দস্তুর | অন্যান্য "স্বাধীন" কমিশন ফমিশন যা আছে - নির্বাচন মানবাধিকার মহিলা ইত্যাদি - যাদের আদতে সরকার বেআইনি বেপরোয়া কিছু করছে কিনা এটাই দেখার কাজ, সেখানে সব পেটোয়া লোক বসানো আছে, তারা সব দেখেশুনে বলবে কিছু হয়নি |

এরপর যেটা ভেঙে পড়েছে সেটার গুরুত্ত্ব আরও অনেক ব্যাপক, শিকড় অনেক গভীরে | সেটা মূল্যবোধ | আমাদের সমাজে আর যাই হোক কিছু সাধারণ মূল্যবোধ টিকে ছিল, যেমন চুরি করা খারাপ, লোক ঠকানো খারাপ, মিথ্যে কথা বলা খারাপ ইত্যাদি | তৃণমূলের কল্যাণে এখন সেসব উঠে গেছে | তাই ক্যামেরার সামনে ঘুষ নিতে গিয়ে ধরা পরেও নেতারা – ডাক্তার অধ্যাপক থেকে ডকের মাফিয়া – হাসতে হাসতে ঘুরে বেড়াচ্ছে | প্রথমে বললো ভিডিও জাল, তারপর সেটা পরীক্ষা করে ঠিক প্রমাণ হওয়ায় বললো টাকা নিয়েছি ঠিকই, কিন্তু ও অনুদান, তারপর কিছু বলাও ছেড়ে দিলো, কারণ এই জমানায় ওসবে কিছু এসে যায়না | সারদা রোজ ভ্যালির টাকা কোথায় গেলো সে তদন্ত তো চলছে চলবে, পুলিশ প্রমাণ নষ্ট করতে সাহায্য করবে, বিজেপি নিজের স্বার্থে তৃণমূলকে হাতে রাখতে তদন্ত শেষ করতে দেবেনা, আর তার মধ্যে প্রান্তিক সর্বস্বান্ত মানুষের মিছিল বাষ্প হয়ে মিলিয়ে যাবে | আর "ইস্ট জর্জিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের" "ডক্টরেট"-এর হাত ধরে যে যাত্রার শুরু, সেখানে প্রতি পদে মিথ্যা বলাটাকে তো আর কোনো অন্যায় বলা যায়না | চুরি করা, লোক ঠকানো, মিথ্যে বলা এসব যে আগে ছিল না তা নয়, কিন্তু অপরাধীরা আগে অন্তত ধরা পড়লে বুক ফুলিয়ে ঘুরতো না, লজ্জায় মুখে অন্তত একটা কাপড় ঢাকা দিতো, এখন এই সমস্ত অপরাধীরাই – পাড়ার গুন্ডা চোর ডাকাত – ক্ষমতায়, সেই কাপড়টা উঠে গেছে, কারণ সাধারণ মূল্যবোধ ভেঙে গেছে | এই মূল্যবোধ ভেঙে যাওয়ার আরও অনেক দিক আছে, কয়েকটা কিঞ্চিৎ সূক্ষ্ম, যেমন নির্লজ্জ আত্মপ্রচার, ইত্যাদি | দিকে দিকে অনুপ্রেরণার হোর্ডিং আর ছবি, এমনকি রবীন্দ্র সদন  নন্দনের সামনেও বিশাল ফলক, নবরূপে চত্বরের উন্মোচন করলেন মুখ্যমন্ত্রী, ইত্যাদি আরো অসংখ্য উদাহরণ | এই পাগলের মতো আত্মপ্রচারে মনের যা ক্ষতি আর দৃশ্যের যা দূষণ হয়, সেটা বোঝা শাসকদলের নেতানেত্রীদের মানসিক ক্ষমতার অনেক যোজন ওপর দিয়ে যায়, বলাই বাহুল্য, কিন্তু প্রতিদিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে হয় রাজ্যবাসীকে | সৌভাগ্যবশতঃ আর সব গেলেও অন্তত হিউমার-নামক বস্তুটি এখনো বাঙালিকে ছেড়ে যায়নি, তাই এই সব ব্যাপার নিয়ে সামান্য কৌতুক রচনাই বাঙালির বাঁচার উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও সে-ব্যাপারে হিসেবে সামান্য গোলমাল হলে অধ্যাপক অম্বিকেশ মহাপাত্রর হালও হতে পারে! উদাহরণ আরো অসংখ্য দেওয়া যায়, তালিকা দিতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে, তার প্রয়োজন নেই, বুদ্ধিমান পাঠক বুঝে নেবেন |

আমাদের চোখের সামনেই ভেঙে পড়লো আমাদের রুচি, জ্ঞান ও নান্দনিকতার বিচার | এটা মূল্যবোধের সঙ্গেও যুক্ত | যে যার পছন্দ মতো গান শুনবে, বই পড়বে, সেটা আরেকজনের পছন্দ হোক বা না হোক, এটা চিরকালই ছিল | কিন্তু ভুল তথ্য, ভুল ও কদর্য ভাষা-ব্যবহার, বাছাই-করা রদ্দি সংস্কৃতির এমন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় মহোৎসব আগে কখনো হয়েছে বলে মনে হয় না (সিদ্ধার্থ রায়ের আমল দেখিনি তবে শুনেছি সেও এক ভয়ঙ্কর সময় ছিল, যাঁরা দেখেছেন তাঁরা বলতে পারবেন বর্তমান সময়ের সঙ্গে কতটা  তুলনীয়) | ডহরবাবু দিয়ে শুরু, তারপর তো তালিকা দিয়ে শেষ করা যাবে না, সঙ্গে আবার সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে বহুল প্রচারিত সব কবিতাও আছে | যেন অশিক্ষা অজ্ঞানতা অপসংস্কৃতির একটা মহোৎসব চলছে | যে কোনো জিনিসে উৎকর্ষের জন্য যে পরিশ্রম করতে হয়, এই সাধারণ মূল্যবোধটাই ধাক্কা খেয়েছে | প্রায় এই জায়গায় পৌঁছেছে বাংলার সংস্কৃতি যেন সরকারের নেতা নেত্রীরা বলতে চাইছেন জানার থেকে না-জানা ভালো, বোঝার থেকে না-বোঝা ভালো, ঠিক ভাষার থেকে ভুল ভাষা এমন কি খিস্তি-গালাগালিও ভালো, ইত্যাদি | যতক্ষণ ভয় দেখিয়ে, মিথ্যা প্রচার করে, গুন্ডা লেলিয়ে ভোটে জেতা যাবে ততক্ষণ এটাই চলবে | ইতিহাসে লিখে রাখার মতো তলানিতে এসে পৌঁছেছি আমরা!

ক্ষমতার লোভে একেবারে দায়িত্ত্ব নিয়ে ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে রাজ্যের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি | তোষণের নির্লজ্জ ও হাস্যকর সব পদক্ষেপ করা হচ্ছে, সিদ্দিকুল্লা থেকে ইদ্রিস আলী - মৌলবাদীদের সচেতনভাবে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, ভারতের উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তিন তালাক তুলে দেওয়ার প্রতিবাদ করা হয়েছে সম্ভবত একমাত্র তৃণমূল নেতাদের থেকে | আবার মাঝে মাঝে উল্টোপক্ষর জন্য হনুমান জয়ন্তী, ব্রাহ্মণ ভোজন ইত্যাদি | পুরো পরিবেশটার মধ্যে ধর্ম ও ধর্মচিহ্নের দৃষ্টিকটু বাড়াবাড়ি ও উস্কানি | এই রাস্তায় তৃণমূলের দোসর জুটেছে বিজেপি, কখনো তৃণমূল আগুন জালে বিজেপি হাওয়া দেয়, কখনো উল্টোটা | মানুষের বিরুদ্ধে অমার্জনীয় অপরাধ করে চলেছে নিজেদের ক্ষমতার দৌড় আরেকটু দীর্ঘায়িত করার স্বার্থে |

এই যখন অবস্থা, যে দেশে গণতন্ত্র ভেঙে পড়েছে, প্রশাসন ভেঙে পড়েছে, মূল্যবোধ ও রুচি ভেঙে পড়েছে, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নড়বড় করছে, যে দেশে জোরে চেঁচিয়ে মিথ্যা বলে দিনকে রাত ও তিলকে তাল করাটাই দস্তুর, যে দেশে এমনকি পুলিশ অফিসারের অপরাধকে অপরাধ বলা বা ডাক্তারের ডেঙ্গুকে ডেঙ্গু বলার অধিকারটাও ভেঙে পড়েছে, সে-দেশে একটা সেতু ভেঙে পড়াটা আর বেশি কী? যেকোনো সভ্য সমাজে চুরির ফলে, অবহেলায় একটা উড়ালপুল ভেঙে এতো ক্ষয়ক্ষতি একটা জাতীয় লজ্জার কারণ হতো, সরকার ও নেতাদের দীর্ঘদিন জবাবদিহি করতে হতো, কিন্তু আজকের বাংলায় এটা একটা প্রতীকমাত্র, সমাজের যা কিছু গুরুত্ত্বপূর্ণ সব ভেঙে পড়ার একটা প্রতীক | আমরা এখন একটা ধংসস্তূপের তলাতেই বাস করছি, নীল সাদা রং করা একটা ধংসস্তূপ, আর সেই ধ্বংসস্তূপের ওপরে দাঁড়িয়ে নৃত্য করছে কিছু রাজনৈতিক ভূত |

---------------------------------------------

স্বেচ্ছাচারী, অত্যাচারী, দুর্নীতিগ্রস্ত শাসককূল ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়েই চেয়েছে গল্পটা এখানেই শেষ হোক, কারণ তাদের কোনো নৈতিকতাবোধ বা জনদরদ নেই | তারা আরো চুরি করে আরো মানুষ মেরে আইনের চোখ এড়িয়ে দীর্ঘজীবন লাভ করতে চায়, কেউ কেউ হয়তো অমরও হতে চায়! কিন্তু এখানেই ইতিহাসের মজা, গল্পটা কখনোই এখানে শেষ হয় নি ! এবং এক্ষেত্রেও হবে না | যতজনকে রাষ্ট্র মারতে চাইবে, ধরতে চাইবে তাদের একটা অংশ প্রতিবাদের নিশানে রূপান্তরিত হবে | অম্বিকেশ মহাপাত্র বা কানহাইয়া কুমাররা একা নয়, তাদের পেছনে মিছিল আছে | জনতা এমনিতে হাড়হাভাতে, রাজনৈতিক গুন্ডারা দেখে ভাবে টোকা দিলেই পরে যাবে, পরে যায়ও অনেকদিন | তারপর যেদিন রুখে দাঁড়ায় সেদিন কেষ্ট হাকিম মদন মেয়র থেকে শুরু করে কোনো দাদা দিদি পার পায় না, সে তার ছাতি ছাপ্পান্ন ইঞ্চি হোক, আর ডিগ্রি ইস্ট জর্জিয়ার হোক | এখানেও সেদিন এলো বলে !

মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৮

খান আব্দুল গাফফার খান ~ শিবানন্দ পাল

খান আব্দুল গাফফার খান।
নামটা বর্তমানে খুব একটা পরিচিত নাম নয়। 
৩১ শে আগস্ট, ১৯৩৪ বোলপুর স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সাত সকালে যাত্রীদের কৌতূহল ছিল গুরুদেব কি শান্তিনিকেতন ছেড়ে চলে যাচ্ছেন? কিন্তু তখন কলকাতা যাবার কোনও ট্রেন ছিল না। ট্রেন তো চলে গেলো। তাহলে? জানা গেল, তিনি একজন অতিথিকে রিসিভ করতে এসেছেন। 
কে সেই মান্যগণ্য অতিথি! যার জন্যে স্বয়ং গুরুদেব নিজে উপস্থিত স্টেশনে? 
বর্ধমানের দিক থেকে একটি ট্রেন এসে বোলপুরে থামল। দেখা গেল রেলগাড়ির একটি তৃতীয় শ্রেনির কামরা থেকে নামছেন এক দীর্ঘদেহী বলিষ্ঠ পাঠান যুবক। তাঁকে দেখা মাত্র রবীন্দ্রনাথ এগিয়ে গেলেন, ৪৪ বছর বয়স্ক যুবক নত হবার চেষ্টা করতেই ৭৩ বছরের কবিগুরু তাঁকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। 
খান যুবক না হলেও এমন কিছু মধ্যবয়স্ক নন তিনি। কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথের চেয়েও দু বছরের ছোট। সেদিনের ওই মানুষটিই হলেন খান আব্দুল গাফফার খান। 
সর্বত্যাগী ফকির, খুব সাধারণ একজন মানুষ হিসেবে রয়ে গিয়েছেন ইতিহাসের পাতায়। স্বাধীনতা আন্দোলনের সেই দিনগুলিতে ভারতের মানুষ তাঁকে চিনতেন 'সীমান্ত গান্ধী' হিসেবে। এই মানুষটি শান্তিনিকেতনের কথা শুনেছিলেন গান্ধিজির কাছে। শুনেছিলেন কবিগুরু বোলপুরের কাছে একটি গ্রামে গরীব মানুষের উন্নয়নের জন্যে একটি সংগঠন ও একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। পেশোয়ার থেকে তাই বড়ো পুত্র আব্দুল গনিকে পাঠিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে লেখাপড়া শিখতে। পুত্রের মাধ্যমে তাঁর সাথে রবীন্দ্রনাথের যোগসূত্র। ১৯৩৪ সালে হাজারিবাগ জেল থেকে মুক্তি পেতেই তিনি বাংলায় আসতে চেয়েছেন। তাঁর আন্তরিক ইচ্ছে কবিগুরুর সাথে একটিবার দেখা করার। 
প্রথমে পাটনা গিয়েছিলেন বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদের কাছে। তখন তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামী একজন কংগ্রেস কর্মী। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। পাটনা থেকে শান্তিনিকেতনে খবর পাঠালেন- খান আবদুল গাফফার খান দেখা করতে চান রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে। তাঁর আগ্রহ শ্রীনিকেতন সম্পর্কেও। 
স্টেশন থেকে কবিগুরু তাঁকে প্রথমে নিয়ে এলেন বিশ্বভারতীর লাইব্রেরী প্রাঙ্গণে। সেখানে সমবেত আশ্রমিক, ছাত্রছাত্রী ও অন্যান্যদের সামনে 'অতিথি'র পরিচয় করিয়ে বললেন, খান সাহেবের শান্তিনিকেতন সফর আশ্রমবাসীদের জীবনে স্মরণীয় ঘটনা। তিনি যখন কারান্তারালে গিয়েছেন, পুত্রকে পাঠিয়েছেন এখানে লেখাপড়া শেখার জন্য। এতেই প্রমাণ মেলে বিশ্বভারতীর প্রতি তাঁর কতখানি আস্থা ও মমত্ববোধ আছে। তাঁর অনুভুতি আমাদের স্পর্শ করেছে। 
গাফফার খান একদিনের বেশি শান্তিনিকেতনে থাকতে পারেন নি। একদিনেই তিনি শান্তিনিকেতন-শ্রীনিকেতনের প্রতিটি বিভাগ ঘুরেছেন দেখেছেন, নিজের চোখে। পরের দিন শান্তিনিকেতন ত্যাগের আগে সকালে উদয়ন প্রাঙ্গণে কবি তাঁর সংবর্ধনার আয়োজন করেন। সেখানে বাংলা হরফে লেখা তাঁর ভাষণ কবি উর্দুতে পাঠ করেছিলেন। "থোরেসে অরসেকে লিয়ে অপ হামারে ইহা তসরিফ লায়ে হৈ ...।"
নিজের হাতে খসড়া করা সেই ভাষণে কবি বলেছিলেন, "অল্পক্ষণের জন্যে আপনি আমাদের মধ্যে এসেছেন। কিন্তু সেই সৌভাগ্যকে আমি অল্প বলে মনে করিনে। আমার নিবেদন এই যে, আমার এ কথাকে আপনি অত্যুক্তি বলে মনে করবেন না যে আপনার দর্শন আমাদের হৃদয়ের মধ্যে নতুন শাক্তি সঞ্চার করেছে। প্রেমের উপদেশ মুখে বলে ফল হয় না, যারা প্রেমিক তাদের সঙ্গই প্রেমের স্পর্শমান। তার স্পর্শে আমাদের অন্তরে যেটুকু ভালবাসা আছে তাঁর মুল্য বেড়ে যায়। 
অল্পক্ষণের জন্যে আপনাকে পেয়েছি কিন্তু এই ঘটনাকে ক্ষণের মাপ দিয়ে পরিমাপ কড়া যায় না। যে মহাপুরুষের হৃদয় সকল মানুষের জন্য, সকল দেশেই যাঁদের দেশ তাঁরা যে কালকে উপস্থিত মতো অধিকার করেন, তাঁকে অতিক্রম করেন, তাঁরা সকল কালের। এখানে আপনার ক্ষণিক উপস্থিতি আশ্রমের হৃদয়ে স্থায়ী হয়ে রইলো"। 
সংবর্ধনার উত্তরে গাফফার খান সেদিন বলেছিলেন, "গুরুদেব" তাঁকে যে আন্তরিক সংবর্ধনা জানিয়েছেন, তাতে তিনি অভিভুত। এখানে আশার আগে যা শুনেছিলেন, নিজের চোখে দেখে মনে হচ্ছে তাঁর চেয়েও মহৎ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। কবি এখনে যে আদর্শ অনুসরন করেছেন, তাঁর ভিত্তিতে ভারত উন্নতির পথ খুঁজে পাবে। ধর্মের অপবাখ্যার মধ্য দিয়েই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, এর জন্যই ভারতের জনগনের আশা আখাঙ্খার পূর্ণতায় বাধা আসছে। 
গাফফার খান শান্তিনিকেতন থেকে চলে যাবার পর রবীন্দ্রনাথ একটি পত্রে তাঁর সম্পর্কে গান্ধিজিকে লিখেছিলেন- 'এক অকপট সরলতার' মানুষ। রবীন্দ্র প্রয়াণের খবর পেয়ে এই মানুষটি পেশোয়ার থেকে কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে জানিয়েছিলেন, 
 Peshaar 12th Aug. 1941
Dear Mr. Tagore,
 I am deeply grieved to hear of the sad demise of Gurudev. In him India has truly lost the greatest philosopher, poet and a nationalist. I heartily condole with you in your sad bereavement. May God bless his soul and give strength in your preasent trial. 
Yours sincerely, 
Abdul Ghaffar Khan
পঁইত্রিশ বছর পর গাফফার খান আবার শান্তিনিকেতন এসেছিলেন। তখন তাঁর বয়স ৭৯। ক্লান্তিময় বার্ধক্য জাঁকিয়ে বসেছে শরীরে। পাকিস্থান সৃষ্টির ১৭ বছরের মধ্যে ১৫ বছর কেটেছে তাঁর কারাগারে। তিনি 'হিন্দু ও বিশ্বাসঘাতক' এই ছিল তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ। অধিকাংশ সময় নির্জন কারাগার, নয়ত নজরবন্দি। ১৯৬৪ সালে স্বেছা নির্বাসন বেছে নিয়েছিলেন আফগানিস্থানের একটি ছোট গ্রাম জালালাবাদে।স্থির করেছিলেন সেখানেই বাকি জীবন কাটাবেন রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধিজির জীবন দর্শন সম্বল করে। 
১৯৬৯ সালে গান্ধি জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন কমিটির সভাপতি জয়প্রকাশ নারায়ণ তাঁকে ভারতে আসার আমন্ত্রণ জানান।তিনি সে অনুরোধ অগ্রাহ্য করতে পারেন না। স্বাধীনতা প্রাপ্তির বাইশ বছর পর বিপর্যস্ত স্বপ্ন ও আদর্শ আর ভাঙা মন নিয়ে তিনি ভারতের মাটিতে পা রেখেছিলেন। দিল্লিতে নেহেরু কন্যা প্রিয় ইন্দুকে বলেছিলেন তাঁকে যেন শান্তিনিকেতন যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়। 
শান্তিনিকেতন কেন?
মৃদু হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, কেন জানো? ১৯৩৪ সালে প্রথম যখন যাই, গুরুদেবের কাছ থেকে স্নেহ ভালবাসা পাবার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। 
১৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৯। আগের মতোই রেলের একটি তৃতীয় শ্রেনির কোচ মধ্যরাত্রে বোলপুর স্টেশনে এসেছিল তাঁকে নিয়ে। বাকি রাত সেটি সাইডিং-এ রেখে দেওয়া হয়। গাফফার খান সেখানেই ছিলেন। পরদিন ১৫ ডিসেম্বর সকাল আটটায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী অজয় মুখার্জি তাঁকে সেখান থেকে নিয়ে যান শান্তিনিকেতনে। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় উদয়নের সেই ঘরে, যে ঘরে ৩৫ বছর আগে রবীন্দ্রসান্নিধ্যে কেটে ছিল তাঁর একটি দিন।
তারপর তাঁকে বিশ্বভারতীর আম্রকুঞ্জে চিরাচরিত ধারায় সংবর্ধনা দেওয়া হয়। 
উত্তরে সেদিনও বলেছিলেন, ৩৫ বছর আগে আমি যখন প্রথম এখানে এসেছিলাম গুরুদেবের যে স্নেহ, ভালবাসা পেয়েছি তা আমার অন্তরে আজও বিরাজমান।
তিনি আশ্রমিকদের হোস্টেল, কলাভবন, বিচিত্রা দেখেন। বিচিত্রায় একটি কাঠ খোদাই মানবমূর্তির সামনে দাঁড়ালে তাঁর চোখ থেকে জল গড়িয়ে নামে। বারবার চোখ কচলে মূর্তিটি পরখ করেন। এ মূর্তি যে গড়েছেন তাঁর পুত্র নন্দলাল শিষ আবদুল গনি। 
তিনি ঘুরলেন শ্রীনিকেতন। বহু মানুষ উপস্থিত হয়েছিলেন তাঁকে দেখতে। ছোট একটি বক্তৃতাও দেন। ফেরার পথে উপাচার্য কালিদাস ভট্টাচার্যর কাছে সাঁওতাল পল্লী দেখাবার অনুরোধ করলেন। 
তাঁকে নিয়ে যাওয়া হোল ভুবনডাঙ্গায়। সাঁওতালদের সাথে গাফফার খান মিলিত হলেন। জানতে চাইলেন, স্বাধীনতার আগে যেমন আপনাদের দিন কাটত, তাঁর কি কোনও পরিবর্তন হয়েছে? স্বাধীনতা কি আপনাদের জীবনের স্বাদ বদলে দিতে পেরেছে? 
দোভাষীর মাধ্যমে তিনি যে জবাব পেয়েছিলেন তাতে তাঁর মুখের হাসি মিলিয়ে গিয়েছিলো। হায় গুরুদেব! হায় স্বাধীনতা! 
বুক ভরা আক্ষেপে শুধু এক টুকরো শান্তি ছিল তাঁর শান্তিনিকেতন সফর। ১৯৮৮-র ২০ জানুয়ারি তিনি প্রয়াত হন।


বুধবার, ২৯ আগস্ট, ২০১৮

তারপর কি হোল ~ আর্কাদি গাইদার

'তারপর একদম অন্তিমলগ্নে এসে ওরা মরিয়া হয়ে উঠলো। আর মরিয়া হলেই মানুষ হিংস্র হয়ে ওঠে। টিক্কা খানের তত্ত্বাবধানে শুরু হলো 'অপারেশন সার্চলাইট'। বেছে বেছে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চলচ্চিত্রকারদের তালিকা বানানো হলো। সিদ্ধান্ত হলো, একসাথ এদের সবাইকে নিকেশ করতে হবে। বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মকে যেন বুদ্ধির চর্চা করানো, প্রশ্ন করা শেখানো, ভাবানোর জন্যে কেউ না থাকে। যারা ভাবতে পারে না, প্রশ্ন করতে পারে না, তারা বাধ্য, অনুগত প্রজা হয়ে থাকবে।'

'তারপর কি হলো?'

'তারপর ওরা রাতের বেলায় অন্ধকারে এলো। সরকারি উর্দি পড়া এক দল আর উর্দি ছাড়া তাদের চ্যালাচামুন্ডারা। ঘরে ঘরে ঢুকে তালিকা মিলিয়ে শুরু করলো ধরপাকড়। চোখে কাপড় বেধে, পিছমোড় করে হাত বেধে, একে একে নিয়ে যাওয়া হলো রায়েরবাজার, মিরপুর, রাখালপাড়া, মহম্মদপুরের টর্চার ক্যাম্পে।'

'কাদের নিয়ে গেলো?'

'দেশদ্রোহীদের। তখন তো দেশ মানে পাকিস্তান। তাই যারা পাকিস্তান বিরোধী তারাই তো দেশদ্রোহী। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রফেসর হুমায়ুন কবীর, জ্যোর্তিময় গুহঠাকুরতা, গোবিন্দচন্দ্র দেব, মুনীর চৌধুরী, আনোয়ার পাশা, রশিদুল হাসান, সিরাজুল হক খান। ছিলেন সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং চলচ্চিত্রকার জাহির রায়হান। ছিলেন সংগীতশিল্পী আলতাফ মেহমুদ। ছিলেন ট্রেড ইউনিয়ন কর্মী, আইনজীবি এবং ছত্তিসগড়ে দীর্ঘদিন মানবাধিকার আন্দোলনের নেত্রী সুধা ভরদ্বাজ।'

'ছত্তিসগড়? দাঁড়াও দাঁড়াও, আমরা তো অপারেশন সার্চলাইট..'

'ছিলেন দলিত আন্দোলনের কর্মী প্রফেসর আনন্দ তেলতুমড়ে। ছিলেন কবি ভারভারা রাও। আরও ছিলেন সাংবাদিক গৌতম নভলাখা। যিনি গত একবছর ধরে অনুসন্ধান করে একের পর এক লেখায় রাফায়েল স্ক্যামের তথ্য জনগণের সামনে তুলে ধরেছেন।'

'রাফায়েল স্ক্যাম? দাদু, তুমি কিসব বলছো?'

'এখানে শেষ না। তারপরে ছিলেন উত্তরবাংলার চা বাগানের চা শ্রমিক সমন পাঠক। ছিলেন উত্তর ৩৪ পরগনার শ্রমিক নেতা আহমেদ আলি খান..'

'আরে দাঁড়াও তো। বাংলাদেশ থেকে কোথায় চলে এলে! তোমার বয়সের সাথে সাথে মাথাটা গেছে! সব গুলিয়ে ফেলছো।'

'গুলিয়ে ফেলছি? না না। গোলাচ্ছি না। কিচ্ছু গোলাচ্ছি না।'

রবিবার, ২৬ আগস্ট, ২০১৮

একটি অবাস্তব, কষ্টকল্পিত, তৃতীয় শ্রেণীর, মেলোড্রামাটিক গপ্পো ~ বিষাণ বসু


ডিসক্লেইমার -

১. লেখাটা সাইজে বড়ো। অন্তত ফেসবুকের আন্দাজে। মাঝপথে গালি দেবেন না।

২. শিরোনামের প্রতিটি বিশেষণ সত্যি। কোনো বিনয়ঘটিত নয়।

৩. লেখাটি প্রমথনাথ বিশীর একখানি ছোটোগল্প দ্বারা অনুপ্রাণিত। না, অনুপ্রাণিত নয়, একেবারে নির্লজ্জভাবে ঝেড়ে দেওয়া। যাঁরা গল্পটি পড়েছেন, তাঁরা জানেন। বাকিরা দুধের স্বাদ ঘোল নয়, পিটুলিগোলা জলে মেটানোর ব্যর্থ প্রয়াসে ব্রতী হোন।

৪. বাংলা সিরিয়াল বন্ধের মতো একটি জাতীয় ক্রাইসিসের হাত থেকে আমাদের বাঁচানোর জন্যে আমরা মহান নেত্রীর প্রতি চিরঋণী রইলাম। মালদার গণি খান ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ছাত্রছাত্রীরা, অনশনরত ডাক্তারেরাও একদিন নেকনজর পাবেন, এই আশা নিয়ে আসুন, সিরিয়াল দেখি।

আর, ও হ্যাঁ, গল্প শুরু করি।

তিন বন্ধু।

একজন শিক্ষক, আরেকজন ডাক্তার। তৃতীয়জন সাধারণত টিভি সিরিয়ালে, আর মাঝেমধ্যে সিনেমার পার্শ্বচরিত্রে অভিনয় করে থাকেন।

সেই স্কুলজীবনের পরে দেখা হচ্ছে আজ। এর মধ্যে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়েছে। উন্নয়নের জোয়ারে রাজ্য ভেসে গিয়ে সারা দেশ ভাসবো ভাসবো করছে। পাহাড়-জঙ্গলমহল ছেড়ে খাস কলকাতা শহরও হাসছে।

ঘনঘোর বাম আমলে কবি জানিয়েছিলেন, "সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো আনন্দের সময় নয়…", কিন্তু, এখন দিন বদলেছে। উজ্জ্বল এই সময়ে, তিন বাল্যবন্ধু ঠিক করেছিলেন, যে, তাঁরা দেখা করবেন, ছেলেবেলার মতো হইহুল্লোড় করবেন, অন্তত একটিদিনের জন্যে।

বেশ কথা। কিন্তু, দেখা করা যায় কোথায়? কারোর বাড়িতে হলে চলবে না, কেননা, বৌ-ছেলেমেয়ের সামনে কৈশোরে ফিরে যাওয়াটা একটু মুশকিলের। অতএব, শপিং মল। আইডিয়াটি অভিনেতা-বন্ধুরই। তাছাড়া, বিগত এক-দুইদশকে বাঙালীজীবনে আধুনিকতার মহৎ প্রসার ঘটার দরুণ, সামনে একটু গেলাস না থাকলে বন্ধুরা আড্ডা মারতে পারেননা, অথবা সুরাহীন আবহে কথাবার্তা বলতে থাকলেও তা আড্ডা বলে মেনে নিতে পারেন না। কাজেই, একটি শপিং মলের বারেই মিলিত হচ্ছেন আজ সেই তিন বন্ধু।

প্রথমেই একটু খটাখটি হয়ে যাচ্ছিলো। ডাক্তার বা অভিনেতা, নিজের পয়সায় মদ্যপানের অভ্যেস এঁদের থাকে না বললেই চলে। কাজেই, বিল কে মেটাবে, শুরুতেই এই আলোচনায় গেট টুগেদার প্রায় ভেস্তে যাওয়ার যোগাড়। শেষ পর্যন্ত, সমান শেয়ারের সমাধানসূত্রে সবাই সম্মত হয়েছেন।

হ্যাঁ, আসুন, আলাপ করিয়ে দিই।

ওই যে, আটপৌরে পোশাকে, একটু সঙ্কুচিত, আসছেন বরুণ। স্কুলশিক্ষক। বিগত পঞ্চায়েতে গণতন্ত্রের অবাধ উৎসবের হ্যাংওভার কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তারপর থেকেই রাত্রে ঘুম হয়না ভালো, মাঝেমধ্যেই চমকে চমকে ওঠেন। রামদেব-সদগুরু ইত্যাদি অনেক করেছেন, তাও স্ট্রেস কাটছেনা। তাছাড়া, যেকোনো সরকারি কর্মচারীর মতোই, তিনিও সুখী মানুষ নন। 

বরুণের ডানদিকে তরুণ। পেশায় চিকিৎসক। স্যুটবুট পরিহিত। হাসপাতাল থেকে সোজা আসছেন। কাজেই, পুরোদস্তুর ফর্মাল পোষাকে। বরুণের চাইতে বছরপাঁচেকের বড়ো দেখতে লাগছে তরুণকে, যদিও দুজনে সেই নার্সারি থেকেই সহপাঠী।

আর, ওই যে অরুণ। অভিনেতা। আলাপ করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই, আশাকরি। যুগপুরুষ আশারাম সিরিয়ালে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেন। তাছাড়াও সন্ধ্যের দিকে টিভির বিতর্কসভায় প্রায়শই হাজির থাকেন। আজ পরণে জিন্স-টিশার্ট। চোখে সানগ্লাস। সানগ্লাসের ওপার থেকেই নজর রাখছেন, সবাই তাঁকে চিনতে পারছেন তো!!

আমি বুঝতে পারছি, আপনি উশখুশ করছেন। ভাবছেন, আজ আমি আর কতোক্ষণ হ্যাজাবো। অথবা, আপনি অলরেডি লাইক দিয়ে পরের পোস্ট চলেই গ্যাছেন।

তাই, চলুন, একটু ফার্স্ট ফরোয়ার্ড করে এগিয়েই যাই।

আপাতত, এখন তিনজনেরই নেশার পারদ চড়েছে। সামান্য কথাতেই বেশী হেসে উঠছেন প্রত্যেকেই। তাঁদের কথোপকথন যদি তাঁদের মুখের ভাষায় দিতে যাই, তাহলে আমার বর্তমান ফ্রেন্ডলিস্টের আদ্ধেক বন্ধুবান্ধবী আমার লেখা পড়া ছেড়ে দেবেন। কাজেই, প্লীজ, একটু এডিটেড ভার্সানেই খুশী থাকুন।

তিনজনের মধ্যে বরুণের মুখের হাসিটা যেন ততো উজ্জ্বল নয়। সে একটু যেন সঙ্কুচিত। বন্ধুদের চোখ এড়ায় না সেটা। তাদের বিস্তর চাপাচাপিতে, নাকি সুরার নেশায়, অবশেষে, সে মুখ খোলে।

"শোন, একটা বড়ো আঘাত পেয়েছি। না, তোরা যেমন ভাবছিস, তেমন কিছু নয়। প্রেমটেম কিছু নয়। বরুণাকে আমি এখনও তেমনই ভালোবাসি, যেমন বাসতাম প্রথম আলাপের সময়। ছেলেটাও আমার চোখের মণি। কাজেই…..

"আসলে, হয়তো, আমারই ভুল। পড়ানোটাকে আমি কখনোই চাকরি ভাবিনি। ভাবতাম, আমরা, মানে শিক্ষকেরা জাতির মেরুদন্ড। ভাবতাম, সমাজে আমাদের রোল একটা আলাদা ধরণের। আমাদের দায়িত্ব অনেক।

"কিন্তু……

"একদিন, একটা বিয়েবাড়িতে গিয়ে আমার ধারণা বদলে গ্যাছে। আর, সেই বদলটার সাথে কিছুতেই মানিয়ে নিতে পারছিনা।

"বিয়েবাড়ি। পাশের টেবিলের আলোচনা কানে আসছিলো। জানিসই তো, মফস্বলের একটি স্কুলে আমি পড়াই।

"প্রথমজন বললো, জানিস তো, অমুক গ্রামের মাস্টারটা বিষ খেয়েছে। আমি বুঝলাম, রমেশের কথা হচ্ছে। হ্যাঁ, রমেশ। পাশের গ্রামের স্কুলে পড়ায়। একই সাথে জয়েন করেছিলাম চাকরিতে। খুব ঘনিষ্ঠতা না থাকলেও বেশ ভালোভাবেই চিনতাম। পঞ্চায়েত ভোটের ডিউটি পরবর্তী চাপ-অপমান অসহ্য হওয়ায় রমেশ বিষ খেয়েছে শুনেছিলাম। কাজেই, বলতে লজ্জা নেই, একটু কান পেতেই আলোচনা শুনছিলাম।

"একজন, শুনি, বলছে, শালা টিচারটা মরেছে, বেশ হয়েছে। কোনো কম্মের নয়। আমার ভাইটা টেট-এর জন্যে দশ লাখ লাগিয়ে বসে আছে। চাকরিটা হচ্ছে না। এরকম দুদশটা মরলে যদি কিছু হয়। না, রমেশ এখনো মারা যায়নি। কিন্তু, এমন শুভেচ্ছা বর্ষণে চমৎকৃত হলাম 

"পাশের লোকটা সেই সুরেই বললো, আরে, এই সব টিচারগুলোই হারামী। ইস্কুলে পড়ায় না, পরীক্ষায় নম্বর দেয়না, খালি টিউশনির ধান্দা। জানোয়ার একটা। ওই যে একটা মাল মরলো না ভোটের বাজারে রেললাইনের ধারে, ওইরকম করে শালারা ইঁদুরের মতো মরলে তবে ঠিক হয়।"

"আরেকজন বললো, আমাদের সময় যেসব টিচার ছিলেন, দেবতুল্য মানুষ সব। এগুলো তো শিক্ষক নামের কলঙ্ক। পড়ানোর নাম নেই, কাজে নিষ্ঠা নেই, খালি পয়সার নেশা আর ডিএ বাড়ানোর আন্দোলন। অপদার্থ সব।"

"দ্যাখ, আগেই বললাম, রমেশকে আমি চিনি বহুবছর। ছাত্র-অন্তপ্রাণ। স্কুল আর ছাত্র, এর বাইরে ভাবতেই পারতোনা। সিধে মেরুদন্ড। কোনো রাজনৈতিক নেতাকেই তোয়াক্কা করতো না। স্কুলের পরেও বস্তিতে গিয়ে গরীব বাচ্চাদের পড়াতো নিয়মিত।

"ভাব একবার, তাকে নিয়ে এমন কথা!!! এই অবস্থাতেও, তাকে নিয়ে এই অনর্গল বাজে কথায়, কেউ এতোটুকু প্রতিবাদ করছে না!! তাহলে, আমার পেছনে কী বলবে?"

অনেকক্ষণ ধরে কথা বলে, বরুণ একটু থামতেই, নাকি থামার আগেই, কথা শুরু করে তরুণ।

"আরে, ছাড়। তোর তো অন্য লোকের গল্প। আমার নিজের অভিজ্ঞতা শোন।

"খুড়তুতো-জ্যেঠতুতো-পিসতুতো ভাইয়েরা সবাই মিলে গ্রুপ পিকনিক। হইহই ব্যাপার। আমবাগানে। পুকুরের পাড়ে।

" যেমন হয়, ছুটির দিনে আরো অনেক পার্টি একই ভেনুতে হইচই করছে, বাচ্চারা খেলছে।

"আমরা ভাইয়েরা, যেমন হয়, বোতল খুলে বসেছি। আর, যেমন হয়, সাড়ে এগারোটার মধ্যেই আমি আউট। একটু নাটক করার জন্যে, অরুণ, জানিসই তো, শুধু তুইই নোস, আমারও নাম আছে।

"তা সেইদিন, নৌটঙ্কি করার জন্যে, গিয়ে দাঁড়িয়েছি এক্কেবারে পুকুরের পাড়ে। আর, একেবারে শোলের ধর্মেন্দ্রর স্টাইলে বলতে শুরু করেছি, গাঁওয়ালোঁ, আজ এইখানে আমি যদি পুকুরে পড়ে যাই, তাহলে, দেশ হারাবে এক উদীয়মান প্রতিশ্রুতিবান ডাক্তারকে।

"কথা শেষ হওয়ার আগেই, মাইরি, বললে বিশ্বাস করবি না, দৌড়ে এলো একটা অপরিচিত ছেলে। বোধহয় অন্য কোনো পিকনিক পার্টি থেকেই। মুখে খিস্তি। খানকির ছেলে ডাক্তার, শালা তোদের মরাই ভালো। বলে এক ধাক্কায় আমাকে ফেলে দিলো পুকুরের মধ্যে। 

"সত্যি বলছি, মেজদা টাইম করে ঝাঁপিয়ে না বাঁচালে আমি এতোদিনে ছবি বিশ্বাস হয়ে যেতাম।

" আরো খারাপ লাগে ভাবলে, ছেলেটাকে কেউ তেমন করে কিছু করলো না। অনেকেই বললো, ছেলেটি নাকি পরিষ্কার মনের। অন্যের বিপদে আপদে ঝঁপিয়ে পড়া নাকি ওর অভ্যেস। অসুস্থ মানুষের জন্যে টাটা ভেলোর দৌড়ানোয় ওর জুড়ি মেলা ভার। ভীষণ পরোপকারী নাকি ছেলেটি। এখানকার ডাক্তারদের চেহারা জানতে ওর কিছু বাকি নেই। আজ একটু মালফাল খেয়ে হয়তো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছে, কিন্তু ইত্যাদি ইত্যাদি।"

গল্প বলতে বলতে, তরুণ শিউরে উঠলো।

দুজনের কথার শেষে, একটু অবশ্যম্ভাবী নীরবতা।

অরুণ গলাখাঁকারি দেয়। কথা শুরু করে।

"আমি তোদের দুজনেরই মানসিক সিচ্যুয়েশান বুঝি। এও বুঝি, তোরা মানুষের উপর বিশ্বাস হারাচ্ছিস। কিন্তু, দ্যাখ, বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ।"

অরুণের এই উচ্চাঙ্গের বাণী-কন্ঠস্বর-বাচনভঙ্গির সাথে, সান্ধ্য টিভির সুবাদে, কেউই অপরিচিত নয়। তাই, দুজনের কেউই, বিদ্যাসাগরের ব্যাপারটা শুধরোতে যায় না। তাছাড়া, আশেপাশের টেবিল থেকে, বেশ কয়েকটি উৎসুক মুখ উঁকিঝুঁকি মারছে, সেইটাও ব্যাপার।

ঈষৎ জড়ানো গলায়, অরুণ চালিয়ে যায় - 

"না, অভিজ্ঞতাটা সরাসরি আমার নয়। তবে আমি সেখানে ছিলাম। ঘটনাটা তোদেরও মনে থাকতে পারে, কেননা মিডিয়া খুব কভার করেছিলো।

"হ্যাঁ, আমি বুবুদা আর পর্ণাদির ঘটনাটা বলছি। জানিসই তো, বুবুদা-পর্ণাদির মধ্যে একটা ইন্টুসিন্টু ছিলো। তার কতোটা সত্যি, আর কতোটা সিনেমার পাবলিসিটির জন্যে, আমিও জানি না পুরোপুরি।

"তা সেইসময় জয়তু বাবা শিবনাথ বইয়ের শ্যুটিং চলছে। সেই হিট গানটা। ড্রিম সিকোয়েন্স। আইটেম নাম্বার টাইপের। বল বল বলরে কোকিল, তুইই হবি আমার উকিল। চারবারেও শট ওকে হয়নি। বুবুদার মটকা গরম। পর্ণাদির সাথে জোর খ্যাঁচাখেঁচি লেগে গ্যাছে। প্রায় কাঁচা খিস্তাখিস্তির যোগাড়। জানিসই তো, পর্ণাদি রাগলে পুরো কর্পোরেশনের ড্রেন।

"এইসব ঝগড়া-ঝামের সময়, কী করে কেউই দ্যাখেনি ঠিক, বুবুদা গ্যাছে লেকের মধ্যে পড়ে। অমনি, কী বলবো মাইরি, শ্যুটিং দেখতে আসা পাব্লিক, মিডিয়ার লোক সব্বাই মিলে জলে ঝাঁপ দিয়েছে। সে কী সীন, বলে বোঝাতে পারবোনা।

"মিডিয়ার মধ্যে যারা ঝাঁপিয়েছে, তাদের মধ্যে তিনজন আবার সাঁতার জানতো না। পিওর আবেগের বশে ঝাঁপিয়েছে। মিডিয়ার মাল তো জানিস, ঝাঁপাবে আগে, তলিয়ে দেখবে পরে। দুজন আবার ক্যামেরা নিয়েই ঝাঁপিয়েছে। সে এক কেলো মাইরি।

"এদিকে, বুবুদা তো ডুবসাঁতারে এক্সপার্ট। ও তো এইসব সীন দেখে ডুব দিয়ে উল্টোপারে উঠেছে। কিন্তু, বাকি মালগুলো সব জলটল খেয়ে একাকার।

" তো সেইদিন দেখলাম, মানুষের আবেগ ভালোবাসা কী জিনিস। আর, একটা বড়ো শিক্ষা পেলাম। তুমি যদি মানুষের জন্যে কাজ করো, মানুষের কাছে থাকো, মানুষের পাশে থাকো, মানুষও তোমাকে ভালোবাসবে। তোমার জন্যে জান লড়িয়ে দেবে।

"ওইটাই বড়ো ব্যাপার ভাই। মানুষের ভালোবাসা পাওয়া।"

এরপরে আর কথা চলে না।

সন্ধ্যে গড়িয়ে রাতও বাড়ছে। 

অরুণকে চিনতে পেরে, তার এই অনির্বচনীয় কাহিনী শুনে, টেবিলের চারপাশে বেশকিছু সুবেশ-সুবেশার ভিড়ও জমেছে। রেস্তোরাঁর পেপার-ন্যাপকিন বাড়িয়েও দিচ্ছে কয়েকজন, সইয়ের আশায়। লাজুক মুখে অরুণ ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।

তরুণ আর বরুণ বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়। বাইরে তখন নীলসাদা আলোয় ধোয়া এক উন্নততর রাত্রি। হোর্ডিং-প্ল্যাকার্ড অথবা মানুষের মুখ, সব্বার মুখে হাসি ছাড়া অন্যকিছুই দৃশ্যমান নয়।

বাড়ির পথে যেতে যেতে, দুজনের মনেই ঘুরতে থাকে অরুণের কথাগুলো।

আর, হঠাৎই মনে হয়, যাঃ, একদম ভুল হয়ে গিয়েছে দুজনেরই। জিজ্ঞেস করা হলো না তো, ঠিক কী করলে মানুষের পাশে থাকা হয়!! ঠিক কেমনভাবে মানুষের ভালোবাসা পাওয়া যায়!!!

অভিনয়, শুধু অভিনয় আর জৌলুশই কি সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর একমাত্র পথ?

শুক্রবার, ১০ আগস্ট, ২০১৮

অসুস্থ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ~ বিষান বসু

তিনটে ঘটনা। গত এক সপ্তাহের মধ্যেই।

১. কলকাতা থেকে চারশো কিলোমিটার দূরে। উত্তর দিনাজপুরের হেমতাবাদ। প্রাইমারী হেলথ সেন্টার। ডাক্তার আছেন। আর বিশেষ কিছু নেই। হার্ট এট্যাকের জটিল রোগীর চিকিৎসা সম্ভব কিনা সেখানে, বুঝতে ডাক্তারি পড়তে হয় না। এমন এক রোগী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এলে, চিকিৎসক রেফার করেন সরকারি সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালে। রোগী সেইখানে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। পরিজন চড়াও হন চিকিৎসকের উপর। নৃশংস মার। লাথিঘুঁষি। এমনকি, ধাতব টেবিল দিয়েও। ডাক্তারবাবু, নিজেই, সুপারস্পেশ্যালিটি হাসপাতালে ভর্তি।

২. খাস কলকাতা। ঢাকুরিয়া আমরি হাসপাতাল। ক্রনিক এলকোহলিক এক যুবক। বয়স কুড়ির কোঠায়। অত্যধিক মদ্যপানজনিত প্যানক্রিয়াটাইটিস। সাথে মাল্টি-অরগ্যান ফেইলিওর। অনেক চিকিৎসার শেষে রোগীর মৃত্যু। পরিজন বিক্ষুব্ধ। ডাক্তাররা খুনী। গ্রেফতার চাই, সম্ভব হলে যাবজ্জীবন বা ফাঁসি। প্রকাশ্য রাজনৈতিক মদতে চলতে থাকে অবরোধ। চিকিৎসকেরা হাসপাতাল থেকে বেরোতে পারেন না অনেক রাত্রি অবধি। পুলিশ-র‍্যাফ নীরব দর্শক।

৩. ভার্চুয়াল দুনিয়া। ফেসবুকে। একটি ছবি। ঝাঁচকচকে এক করিডোর। বসার জায়গা। কেউ বসে নেই অবশ্য। জনশূন্য সেই সুদর্শন করিডোরের নীচে ক্যাপশন। না, বিদেশ নয়, এয়ারপোর্টও নয়। বনগাঁর সরকারি হাসপাতালের ছবি এটি। একজন আবার অত্যুৎসাহী হয়ে, শঙখ ঘোষের লাইন বদলে, লিখে ফেলেন, "দেখ খুলে তোর ত্রিনয়ন/ রাস্তাঘাটে, হাসপাতালে, দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন"। অবশ্য, উন্নয়ন যে রাস্তাঘাট পার হয়ে হাসপাতালে ঢুকে পড়েছে, এই নিয়ে, বোধ হয়, সরকারি-বেসরকারি চিকিৎসকেরা দ্বিমত হবেন না। কিন্তু, থাক সে কথা।

তিনটে ঘটনা। আপাতবিচ্ছিন্ন। যোগসূত্রহীন।

কিন্তু, আসুন না, একটু গভীরে যাই।

শুধু ঝাঁচকচকে করিডোর দিয়ে হাসপাতাল হয় না। হলে ভালো হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু, না হলেও চলে। আসল কথা, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। তার ব্যবস্থা কতোটুকু?

চকচকে সুপারস্পেশ্যালিটির গল্পের পর অনেক বছর পার হলো। সুপারস্পেশ্যালিস্ট মিললো কি? ডাক্তার ছাড়াই অত্যাধুনিক চিকিৎসা!! উন্নয়নে বিশ্বাসী হলেও, এতোটা হজম হবে কি?

কিন্তু, ডাক্তার নেই কেন?

উলটো প্রশ্ন করি? ডাক্তার থাকবে কেন?

সরকারি চাকরিতে সুযোগসুবিধা, এখন, নামমাত্র। থাকার ব্যবস্থা প্রায় নেই। হাসপাতালের পরিকাঠামো নড়বড়ে। বিল্ডিং নয়, বাকি যন্ত্রপাতি-ওষুধ এইসবের কথা বলছি। যন্ত্র থাকলেও টেকনিশিয়ান নেই। আর নিরাপত্তা? হাসাবেন না, প্লীজ।

মাইনে? মহারাষ্ট্র সরকার, প্রত্যন্ত এলাকায় ডাক্তার নিয়োগের জন্যে মাসিক তিন লক্ষ টাকা পর্যন্ত বেতন ধার্য করেছেন। এখানে, মেরেকেটে পঞ্চাশ হাজার। এমডি-ডিএম করার শেষে এই মাসমাইনেতে ডাক্তার পাওয়া তো স্রেফ আকাশকুসুম।

এরপরেও ডাক্তাররা সরকারি চাকরি করতে চাইতেন। কেননা, অনেকেই, সাধারণ মানুষের কথা ভেবে, সনাতন আদর্শে উদবুদ্ধ হয়ে ডাক্তারিটা করতে চাইতেন। আর, এখনো চান। হ্যাঁ, বিশ্বাস করুন, লাখ-লাখ টাকা উপার্জনের লোভে, বা হীরের চচ্চড়ি খাওয়ার আশায় সবাই এলাইনে আসেন না। কিন্তু, বর্তমানে, স্বাস্থ্যআমলাদের আশ্চর্য তুঘলকি সিদ্ধান্তে, সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারি কঠিন হয়ে উঠেছে। সাথে সাথে রয়েছে কিছু লুম্পেননেতার দাদাগিরি। সম্মান আর সরকারি ডাক্তারি, প্রায় পরস্পরবিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

আর, সরকারি চাকরিতে উচ্চশিক্ষার যে সুযোগ বা অধিকার ছিলো, সরকারবাহাদুর তার সঙ্কুচনে চেষ্টার ত্রুটি রাখছেন না। তারসাথে, চাকরি ছাড়তে চাইলে আবেদন প্রত্যাখ্যান, সঙ্গে এতোবছর চাকরির সুযোগসুবিধে হারানো।

অতএব, সরকার বিজ্ঞাপন দিয়েও ডাক্তার পাচ্ছেন না।

সমস্যাটা, বা অসন্তোষের কারণ, সরকার জানেন না, এমন নয়। কিন্তু, তাঁরা ভোট চান, ভোটের জন্য অর্থ চান। সমাধান নয়।

প্রথম, ভোট। ডাক্তারেরা সংখ্যায় হাতেগোনা। ভোটের হিসেবে তাঁদের না আনলেও চলে। কিন্তু, স্বাস্থ্যপরিষেবায় সরকার সচেষ্ট নন, এই বার্তা গেলে, ভোটের রাজনীতিতে বিপদ আছে। তাই, চকচকে বিল্ডিং, নিত্যনতুন শিলান্যাস। সাথে ফাটা রেকর্ড। চেষ্টা করেও ডাক্তার পাওয়া যাচ্ছে না। মিডিয়াও এই মেসেজই প্রচার করে চলেছে। স্বভাবতই, মানুষের কাছে বার্তা যাচ্ছে, সরকার চাইলেও, ডাক্তারদের অনুৎসাহের কারণেই সদিচ্ছা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ক্ষোভের অভিমুখ সেই চিকিৎসকের প্রতি।

দ্বিতীয়ত, পার্টি ফান্ড। ভোটের খরচ। না, এখানে হিসেবটা ততোখানি সরলরৈখিক নয়। বোঝানোর চেষ্টা করি তাও। মানুষের অসুখবিসুখ তো হবেই। হাসপাতালে যেতে হবেই। বিশেষত, এমন দেশ, যেখানে প্রিভেনটিভ মেডিসিন বা রোগপ্রতিরোধে সরকারি উদ্যোগ প্রায় নেই। তা, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে বলে মানুষ চিকিৎসা চাইবেন না, এমন তো নয়। অতএব, লাভ কার? আজ্ঞে হ্যাঁ, বেসরকারী স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের।

সব বেসরকারী পরিকাঠামো একই নয়। মফস্বল বা ছোটো শহরে বেশ কিছু ছোটো নার্সিং হোম আছে, যেখানে সাধ্যের মধ্যে সুচিকিৎসার বন্দোবস্ত ছিলো, বা এখনও আছে। ক্লিনিক্যাল এস্টাব্লিশমেন্ট আইনের প্যাঁচে ফেলে তাদের নাভিশ্বাস তোলার ব্যবস্থা হলো। অনেকেই ব্যবসা গুটিয়েছেন। আবার, কিছু বৃহৎ বেসরকারী স্বাস্থ্য-কনগ্লোমারেট, জেলায় ব্যবসা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে, অধিগ্রহণের চেষ্টাও করছেন। কলকাতা শহরে চিকিৎসাব্যবস্থা, এখন, প্রায় পুরোপুরিই, কর্পোরেট দখলে। আগামী এক দশকে, জেলা শহরেও এই চিত্রই দেখা যাবে।

কাজেই, শেষ পর্যন্ত, জয় হোক কর্পোরেটের। এঁদের অশ্বমেধের ঘোড়া আটকায়, এমন বুকের পাটা কার!!

একটু ভেবে দেখুন, দশ বছর আগেও, বাবা-কাকা অসুস্থ হলে, আপনি ছুটতেন অমুক ডাক্তারবাবুর কাছে। রোগ জটিল হলে, অমুক নামী ডাক্তারের চেম্বারে। এখন কিন্তু, আপনি আর ডাক্তারের নাম খোঁজেন না, আপনি যান নামী হাসপাতালে। পার্থক্যটা কিন্তু অনেক।

হাসপাতালের শীতাতপনিয়ন্ত্রিত চেম্বারে যে ডাক্তারবাবু আপনাকে দেখলেন, তিনিও জানেন, আপনি মোটেই তাঁর কাছে আসেন নি, এসেছেন সেই হাসপাতালের ভরসায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর কাছে আপনার সেই রোগীকে পাঠিয়েছেন মাত্র। তিনি যদি রোগীপরিজনকে সন্তুষ্ট ক্রেতা হিসেবে সার্ভিস না দিতে পারেন, তারসাথে হাসপাতালকে যথেষ্ট ব্যবসা দিতে না পারেন, তাহলে কিন্তু পরের বার, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীকে পাঠাবেন, একই হাসপাতালে, পাশের চেম্বারে অপেক্ষারত ডাক্তারের কাছে। আবার, কোনো ডাক্তারবাবু, যদি নিজগুণে রোগীদের কাছে পছন্দের হয়ে ওঠেন, তাহলে কর্তৃপক্ষ, সচেতনভাবেই, রোগীদের অন্য ডাক্তারের কাছে পাঠাতে থাকেন। হ্যাঁ, ডাক্তারকে ইনসিকিওর রাখা বা ডাক্তারকে কখনোই হাসপাতালের ব্র‍্যান্ডের চেয়ে বড়ো হতে না দেওয়া, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের প্রায় ঘোষিত নীতির মধ্যেই পড়ে।

মনে রাখবেন, এই কর্পোরেট হাসপাতালগুলিতে সবচেয়ে আদরের কর্মী কিন্তু কোনো ডাক্তার নন। এঁদের নয়নের মণি মার্কেটিং স্টাফ। অর্থাৎ, যাঁরা হাসপাতালে রোগীর জোগান অব্যাহত রাখেন। মার্কেটিং-এর অনেকেই ডাক্তারদের চাইতে অনেকটাই বেশী আয়ও করে থাকেন।

কিন্তু, সরকারের ভূমিকা এখানে কী?

এখনো বলে দিতে হবে? নাঃ, আপনি দেখছি একেবারেই নাদান!

এক, ডাক্তাররা যদি সরকারি চাকরিতে না যান, তাহলে যাবেন কোথায়? আইনের মারপ্যাঁচে ছোটো চেম্বারের দিন শেষ। অতএব, কর্পোরেট। দেশে ডাক্তারের ঘাটতি থাকলেও, কর্পোরেট ম্যানেজমেন্টের সামনে চাহিদার তুলনায় ডাক্তারের জোগান বেশী, মানে যেমনটি তাঁরা চান। ইনিসিকিওর ডাক্তারদের একাংশ আপোস করতে রাজিও থাকেন। কর্পোরেট ব্যবসার রমরমা এভাবেই।

দুই, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটি ভেঙে পড়তে দিয়ে কর্পোরেট হাসপাতালে রোগীর জোগান নিশ্চিত করা।

আর, এর পরে, সরকারবাহাদুর যদি হাসপাতাল চালাতে অপারগ হয়ে, পাব্লিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ করার কথা বলেন, তাহলে তো সোনায় সোহাগা। টেনশন করবেন না, সুখের সেইদিন আর বেশী দূরে নয়।

এতো প্রাপ্তির শেষে, কর্পোরেট স্বাস্থ্যব্যবসায়ীরা যদি খুদকুঁড়ো ভরে দেন দলীয় তহবিলে, তাতে আর আশ্চর্যের কী আছে!!

হ্যাঁ, এরপরেও কর্পোরেট হাসপাতালে বিল দেখে অবস্থান-বিক্ষোভ চলবে। মিডিয়া ডেকে ক্যামেরার সামনে বেসরকারী হাসপাতালের কর্তাদের চমকানো চলবে। কেননা, পাছে চিকিৎসাব্যয়ে ঘটিবাটিবেচা মানুষের ক্ষোভ সরকারের পানে ধেয়ে আসে, সেই সম্ভাবনাটি অঙ্কুরেই বিনাশ করা। প্লাস, রুটিন ভেট আসার মাঝে এইটুকু ব্ল্যাকমেইলিং না হলে প্রয়োজন-অপ্রয়োজনে হাতখরচা আসবে কোত্থেকে!

আপনি হয়তো অতো ভেবে দেখেন না। খামোখা অতো ভাবতে আপনার বয়েই গ্যাছে।

কিন্তু, যদি একবার ভেবে দ্যাখেন।

সরকারি হাসপাতালে ডাক্তার প্যাঁদানোতে নির্বিকার থেকে, আপনি কিন্তু সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাটিকেই ভেঙে পড়তে দিচ্ছেন।

আর, অন্যদিকে, কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কিন্তু লোকসানে চলে না। রাজনৈতিক দলের কাছে তোলা পৌঁছানো বা ভাঙচুরের পর মেরামতি, ঘুরপথে খরচ জোগান পরের রোগীরাই।

কেমন হবে, সেই পরের রোগীটি আপনাকেই হতে হয়?

রাজনীতির কারবারি আর স্বাস্থ্যব্যবসায়ী, তাঁদের কিন্তু সেটিং হয়েই আছে।

আপনার?

মঙ্গলবার, ৭ আগস্ট, ২০১৮

চা বাগানে ধর্মঘট ~ আর্কাদি গাইদার

বীরপাড়া টি এস্টেট: ৩২(৪৭)
গাংগুরাম টি এস্টেট: ২৩(৪৮)
ডিমডিমা টি এস্টেট: ৩৩(৫১)
মধু টী গার্ডেন: ৩৪(৫০)
রেড ব্যাংক টি গার্ডেন: ৩০(৫২)

প্রথম সংখ্যাটা হলো এই বাগানগুলোতে অভুক্ত থেকে অপুষ্টিতে কতজন চা শ্রমিক মারা গেছেন। ব্র‍্যাকেটে গড় বয়স। এগুলো স্রেফ কয়েকটা বাগানের হিসেব। 

২৭৩ - এটা হলো উত্তরবাংলার টি এস্টেটের সংখ্যা।

৩৫১ - মূখ্যমন্ত্রী যে হুংকার দিয়েছেন উনি এক্ষুনি আসামে চলে যাবেন বাঙালীদের রক্ষা করতে, এই সংখ্যাটা সেই আসামের চা বাগানের নির্ধারিত দৈনিক মজুরী।

১৫৯ - এই সংখ্যাটা রাজ্যের একজন  চা শ্রমিকের দৈনিক মজুরী।

১৭২ - লাগাতার আন্দোলনের পর রাজ্য সরকার মধ্যস্থতা করে এই সংখ্যাটা দৈনিক মজুরী নির্ধারিত করেছে।

২৩৯ - শ্রমিকরা যে দৈনিক মজুরীর দাবিতে আন্দোলন করছে।

২৪,০০,০০,০০০ - চা শ্রমিকদের ন্যায্য প্রফিডেন্ট ফান্ডের মূল্য যা সামগ্রিক ভাবে ৫৫ টা চা বাগানের মালিকরা ফাঁকি দিয়েছে।

২০১৬ - এটা হলো সেই সাল যবে থেকে সমস্ত চা বাগানে সরকারি রেশন ব্যাবস্থা বন্ধ।

৪ - এটা হলো তত বছরের সংখ্যা যত বছর ধরে বাগানগুলোয় গ্র‍্যাচুইটি বন্ধ।

৪ - এটা হলো উত্তরবাংলার সমস্ত চা বাগানের থেকে ধর্মঘটে সামিল হওয়া শ্রমিকদের লাখে সংখ্যা।

১৩ -  সরকার এত টাকা দৈনিক মজুরী বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

 ৮৫০০ - মূখ্যমন্ত্রীর পুরনো মাইনে।

২৭,০০১ - বিধানসভায় বিল পাশ করিয়ে মাইনে বাড়ানোর পরে মূখ্যমন্ত্রীর নতুন মাইনে।

০ - এখনো অবধি টিভি চ্যানেলে এত মিনিটের কভারেজ দেওয়া হয়েছে এই ধর্মঘটকে।

০ - এখনো অবধি চা শ্রমিকদের নিয়ে কলকাতায় বিকেলের চায়ে চুমুক দিতে দিতে এত মিনিট কেউ মাথা ঘামিয়েছেন।

ওহা! ওস্তাদ তাজ বলিয়ে ~ তাপস দাস

তাজমহলের সামনে ওস্তাদ জাকির হুসেন বলতেন-"ওহা! ওস্তাদ ওহা! তাজ বলিয়ে।" বাড়িতে আপ্যায়ন মানেই চা। চা মানেই বাগান। রোমান্টিক আনাগোনা । বাগান মানেই কুলি কামিন। সাগিনা মাহাতো। চা বাগান মানেই লক আউট। গলা চিরে চিৎকার- " দিনু পরছ্ । দিনু পরছ্ । হুনদই ন। হুনদই ন। মিনিমাম ওয়েজ দিনু পরছ্।

সারে চার লক্ষ শ্রমিক। প্রায় কুড়ি থেকে পঁচিশ লক্ষ পেটের পরিবার। ২৭৮টি বাগান। উত্তরবঙ্গ। ২০১৬ সালে গত ১০০ বছর থেকে চলতে থাকা রেশন বন্ধ করেছে সরকার। এমন কোন বাগান নেই যেখানে বিদ্যুৎ. লকড়ি, বিজলি,স্বাস্থ্য শিক্ষা কোনটার দায়িত্ব পালন করছে সরকার । ২০১৪ সালে শেষ ত্রিপাক্ষিক চুক্তি অনুযায়ী ১৩২ টাকা দৈনিক মজুরি। মাজাক আর কি! ১৭ তে চুক্তি শেষ। শ্রমিকেরা মেনে নেয় নি। ২০১৪ সালে থেকে চলছে জয়েন্ট ফোরামের নেতৃত্বে আন্দোলন । ২০১৮ সালে ২৩ শে জুলাই থেকে ছিল শ্রমিকদের ঘোষিত বাগান ধর্মঘট। শ্রমিকেরা থেমে যায়। সরকার অনুরোধ করে। শ্রমিক সরকারকে সময় দেয় ৩০শে জুলাই পর্যন্ত। রাজ্যে যে উন্নয়নের সরকার চলছে, মিটিং হবে উত্তর কন্যায়।

৬ই আগস্ট। আজ ছিল ত্রিপাক্ষিক বৈঠক, শিলিগুড়ির সাধের উত্তর কন্যায়। নজিরবিহীন ভাবে এই প্রথমবার কোন সরকার শ্রমিকদের সাথে কোন আলোচনা না করে করেই একতরফা ১৭২ টাকা দৈনিক মজুরি ঘোষণা করে, কোন রকম আলোচনা, সৌজন্য না দেখিয়েই, একতরফা ভাবে ত্রিপাক্ষিক সভা ভেঙ্গে চলে যায়। অতীতে যা কখনও হয়নি, কোন সরকারের আমলে। 

তাহলে এবার শ্রমিকেরা কী করবে ? জয়েন্ট ফোরাম কী করবে? ঘরে ফিরবে ? সহ্যের একটা সীমা থাকে।

না। উত্তর কন্যায় অবস্থান চলছে। চলবে। চলবে যতক্ষণ পর্যন্ত, সরকার আবার ত্রিপাক্ষিক সভা পুনরায় ডেকে শ্রমিকদের সাথে আলোচনায় বসা পর্যন্ত। ততক্ষণ পর্যন্ত । অনির্দিষ্ট কালের জন্য। পেটের টানে লাগাতার আন্দোলন।

বাগানে বাগানে ধর্মঘট।

বাগানের হাজারে হাজারে কুলি কামিন, শ্রমিক মার্চ করবে উত্তর কন্যা শিলিগুড়ির দিকে।

বাকিটা ইতিহাস বলবে। খালি পেট থেকে দলা পাকানো বেরিয়ে আসা স্লোগান বলবে।

P. S উত্তরকন্যার গেট বন্ধ করে দিয়ে খাবার জল সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে পুলিশ। ভিতরে আটকে রয়েছে ত্রিপাক্ষিক বৈঠকে গিয়ে অবস্থান শুরু করা চা শ্রমিক নেতৃত্ব। পুরো ফ্যাসিস্ট কায়দায় আটকে ফেলা হল সব নেতৃত্বকে। কাউকে বার হতে দেওয়া হচ্ছেনা। খাবার, জল সরবরাহের ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। জীবন জীবিকার যুদ্ধে চা শ্রমিকদের পক্ষ নিন। রুটি রুজির লড়াইয়ের পক্ষ নিন।

প্রশ্ন কোরোনা ~ আর্যতীর্থ

( আবার রোগীর মৃত্যুতে তান্ডব রায়গঞ্জের হেমতাবাদ প্রাথমিক সাস্থ্যকেন্দ্রে!)




ও কেন মারেনি প্রশ্ন কোরোনা, সিলেবাসে মার ছিলো না,
রোগী দেখে রোজ গাল খেতে হবে, এই জ্ঞান তার ছিলোনা।
অথচ এ দেশে সবচেয়ে যদি অকুলান কোনো পেশা হয়,
সেটা ডাক্তার, দিন চলে যায় জীবন ও জীবিকা মেশানোয়।

অদ্ভূত দেখো, কোটি মামলার যেখানে পাহাড় জমেছে,
সেখানে উকিলি স্ট্রাইকের চোটে কেজো দিনগুলো কমেছে
মৌন সেখানে সব আদালত, লাভ নেই ফরিয়াদে,
মুখরতা শুধু ফিরে আসে ঠোঁটে ডাক্তারী প্রতিবাদে।

এক ডাক্তারে রোগী সামলায় এগারো হাজার করে,
( উচিত হাজারে একজন থাকা , 'হু' য়ের হিসেব ধরে।)
ক্লান্তিতে চোখ জুড়িয়ে আসলে, বিশ্রাম নেওয়া মানা,
পান থেকে চুন খসলে কি হবে বহুকাল থেকে জানা।

ডাক্তার ধরে ফেসবুকে যারা গণপিটুনির পক্ষে,
অসুখবিসুখে তারা যায় কোথা জিজ্ঞেস করি লোককে।
পুজোপার্বণ ঝঞ্ঝাবাদল বাছো না যে কোনোদিন,
রোজ থেকে যায় স্টেথোদের কাছে কিছু জীবনের ঋণ।

আপনারা, যাঁরা ডাক্তার মেরে ফেরেন বীরের মতো,
কালিদাস হয়ে নিজেদেরই দেন আগামীকালের ক্ষত।
চিকিৎসা হলে ওষুধই কেবল হয়ে যেতো নেটে তবে, 
বাড়তি যেটুকু , এখন ভাগ্যে ক্রমে অকুলান হবে।

যাকে আজ তুমি দিলে বেধড়ক , সত্যি বা ফেসবুকে 
সে ছাড়াও আরো হাজার বৈদ্য খোলসে পড়লো ঢুকে।
যত বড় হও অমুক তমুক অথবা নেতার শিষ্য,
ইচ্ছেবিহীন চিকিৎসা জেনো ভিখারীর মতো নিঃস্ব।

ও কেন মারেনি প্রশ্ন কোরো না, সিলেবাসে সে তা শেখে নি,
অশ্রু বাঁচিও তাদের জন্য, আগামীকে যারা দেখেনি।

শনিবার, ৪ আগস্ট, ২০১৮

কিসান সভার সংসদ অভিযান ~ সুশোভন পাত্র

৩০ মিনিটে কি হয়? ৩০ মিনিটে এদেশে ডমিনোসের চিজ বার্স্ট পিৎজার হোম ডেলিভারি হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে আইপিএল'র পাওয়ার-প্লে তে 'মনোরঞ্জন কা বাপ' খোঁজা হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে অ্যামাজন-মিন্ত্রা'র ফ্ল্যাশ সেলে ব্র্যান্ডেড পণ্যে ছাড় দেওয়া হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে নিয়ম করে ইষ্টিকুটুমের ন্যাকামি পরিবেশন করা হয়। ৩০ মিনিটে এদেশে 'মন কি বাতে' গল্প দাদুর আসর জমানো হয়। আর প্রতি ৩০ মিনিটে, এদেশে একজন কৃষক কে আত্মহত্যা করতে হয়¹। 

এই যে আপনি-আমি, প্রতিদিন ডিজিটাল ইন্ডিয়া-বুলেট ট্রেনের গল্প শুনি, ছিমছাম ক্যান্ডেল লাইটে ডিনার সারি; এই যে আপনি-আমি নগর সভ্যতার ভিড় করা ইমারতে আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন দেখি, ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা শপিং মলে 'উন্নয়ন' খুঁজি, হ্যালোজেনের নিয়ন আলোয় ভিজে বিশ্বায়নের ইঁদুর দৌড়ে মাতি; ঠিক সেই হ্যালোজেনের ঘুপচি কোণের অন্ধকারেই বাস করে আরেকটা 'ইন্ডিয়া'। যে 'ইন্ডিয়া'র কৃষক'দের আজও 'মাইক্রো ফাইনান্সের' চক্রব্যূহে 'বউ বন্দক রেখে' ব্যাঙ্কে ঋণ নিতে হয়²। যে 'ইন্ডিয়া'র দলিত বৌ'দের আজও পানীয় জল জোগাড় করতে 'বেশ্যা' বৃত্তি করতে হয়³। আর যে 'ইন্ডিয়া' তে ১৯৯৫-২০১৩ অবধি ২,৯৬,৪৬৬ জন কৃষক কে ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করতে হয়। 

এই ২,৯৬,৪৬৬ কৃষকের লাশ দিয়ে, ইডেন গার্ডেনস ৪.৫বার কানায় কানায় ভরিয়ে দেওয়া যায়। এই ২,৯৬,৪৬৬ কৃষকের লাশ দিয়ে ভারতবর্ষের প্রমাণ মাপের ট্রেন কে ২০০বার রিজার্ভড করা যায়। এই ২,৯৬,৪৬৬ কৃষকের লাশে ভারতবর্ষের সর্বোচ্চ ধারণ ক্ষমতার এয়ারবাস কে ৬০০বার টেক-অফ করানো যায়⁴। অবশ্য বিজেপি সাংসদ গোপাল শেট্টি'রা বলেন, কৃষকের আত্মহত্যা স্রেফ নাকি 'ফ্যাশান'⁵! 

গোপাল শেট্টি'দের রিং-মাস্টার নরেন্দ্র মোদী ২০১৪'র নির্বাচনী প্রচারে বাড়ি বয়ে বলে গিয়েছিলেন, ক্ষমতায় এলে কৃষক'দের আত্মহত্যার মিছিল থামিয়ে দেবেন। ২০০৬ থেকে নর্থ ব্লকের ডাস্টবিনে পড়ে থাকা স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ কার্যকরী করবেন। শুধু বলেননি ওনার কাছে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি গুলো আসলে চুইংগামের মত। 'যো চাবায়া অর ফেক দিয়া'। তাই গত সাড়ে চার বছরে অক্লান্ত বিদেশ সফরের মাঝে যে নরেন্দ্র মোদী কৃষক'দের জীবন যন্ত্রণার চার আনারও হিসেব রাখার ফুরসৎ পাননি; সেই নরেন্দ্র মোদীই আজ ২০১৯'র নির্বাচনী দামামা বাজতেই খরিফ শস্যের ন্যূনতম সহায়ক মূল্য(MSP) বাড়ানোর আইওয়াশে বলছেন "প্রতিশ্রুতি পূরণ করে, MSP বৃদ্ধি তে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে বিজেপি⁶।" 

ডিয়ার নরেন্দ্র মোদী, আপনি কি জানেন না যে, স্বামীনাথন কমিশন রিপোর্টে বলেছিল শুধুমাত্র সার, বীজ, কীটনাশক, বিদ্যুৎ, ডিজেল ইত্যাদির মোট ব্যয়(A2) এবং কৃষক পরিবারের মোট শ্রম(FL) যুক্ত করে ফসলের উৎপাদন খরচা নির্ধারণের মান্ধাতার আমলের যে ফর্মুলা সিএসিপি ব্যবহার করে তা যথেষ্ট নয়? আপনি কি জানেন না যে, এই ফর্মুলার সাথে জমির খাজনা লিজ এবং ঋণের খরচ যোগ করে উৎপাদন খরচা(C2) নির্ধারণ এবং তার উপর ৫০% লাভ রেখে MSP ধার্য করার কথা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলা হয়েছিল ঐ রিপোর্টেই? আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই, A2+FL ফর্মুলায় ধানের উৎপাদন মূল্য ১,১৬৬টাকা/কুইন্টাল। যার উপর ৫০% লাভে MSP দাঁড়ায় ১৭৫০টাকা/কুইন্টাল। আর স্বামীনাথন কমিশনের(C2) ফর্মুলায় উৎপাদন মূল্যের উপর ৫০% লাভে MSP হওয়া উচিৎ ২৩৪০টাকা/কুইন্টাল। জনাব প্রধানমন্ত্রী, তাহলে পাটিগণিতের ঠিক কোন নিয়মে 'প্রতিশ্রুতি পূরণ' হল একটু বলবেন? বাস্তবে যখন দেশের মাত্র ৬% কৃষকের সরকার ঘোষিত MSP নসিব হয় তখন শুধু ঘোষণায় ঠিক কার লাভ হল একটু বলবেন? আর আজ আপনার ১৩% MSP বৃদ্ধি যদি 'ঐতিহাসিক পদক্ষেপ' হয়, তাহলে ২০০৮ ইউপিএ'র ৬৫% MSP বৃদ্ধির গিমিকটা ঠিক কি পদক্ষেপ ছিল একটু বলবেন⁷ ⁸?

গত চার বছরে ভারতবর্ষে কৃষিজ ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ১.৮৬%। কৃষক'দের আয় বৃদ্ধির হার .৪৪%। ২০বছর আগে এনডিএ'র সময়েও মুখ থুবড়ে পড়েছিল গ্রামীণ অর্থনীতি। ১৯৯৮-২০০৪ কৃষিজ ক্ষেত্রে বৃদ্ধির হার ছিল ১.৭৬% আর কৃষক'দের আয় বৃদ্ধির হার .৫৫%⁹। আন্তর্জাতিক সংস্থা OECD বলেছে, পৃথিবীর যে মাত্র ৩টি দেশে কৃষিকাজ লোকসানে চলছে তার অন্যতম ভারত¹⁰। বিজেপির ক্ষমতায়নের সাথে গ্রামীণ অর্থনীতির ধসের পুনরাবৃত্তি নেহাত কাকতালীয় নয়। আসলে, ধর্মের জিগিরের আড়ালে পেট্রোল-ডিজেলের দাম বাড়ানোর কারিগর সেদিন অটল বিহারি বাজপেয়ীও ছিলেন আজ নরেন্দ্র মোদীও আছেন। কৃষিতে বিদেশি বিনিয়োগের রাস্তা পরিষ্কার করে কৃষক'দের চিতা সেদিন লালকৃষ্ণ আদবানিও সাজাতেন আজ অমিত শাহও সাজান। কিন্তু নরেন্দ্র মোদীর দুর্ভাগ্য যে সেই চিতার আগুনই দাবানল হচ্ছে আজ। ২০১৪'তে যেখানে কৃষক বিক্ষোভের সংখ্যা ছিল ৬২৮, ২০১৬ তে সেটা ৮গুন বেড়ে ৪,৮৩৭⁹ ¹¹। আর তাই ভয় পেয়েই দশলাখি স্যুটের প্রধানমন্ত্রী এখন কৃষক'দের সান্তাক্লজ সেজে রাজ্যে রাজ্যে ছুটে বেড়াচ্ছেন ভোট ভিক্ষা করতে। 

ছুটুন প্রধানমন্ত্রী, ছুটুন। আপনি কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী ছুটুন। আম্বানি-আদানি'দের চার্টার্ড বিমানে চেপে কৃষক দরদী সাজুন। প্রতিশ্রুতির প্যান্ডোরার বক্স হাতে নিয়ে ধাপ্পাবাজি করুন। আধপেটা খেয়ে থাকা ভারতবর্ষের চাষা গুলোর মধ্যে জাতপাতের ঘৃণা ছড়ানোর চেষ্টা করুন, ধর্মের বিষে শ্রমিক ঐক্য হিন্দু-মুসলিমে ভাঙ্গার চেষ্টা করুন। কারণ ঘৃণাই আপনার রাজনীতির ইউএসপি। ভাঙাই আপনার রাজনীতির কৌশল। আপনি বিলক্ষণ জানেন, যেদিন দেশের বঞ্চিত চাষা গুলো একসাথে বলবে 'কৃষক' আমার 'জাতি' আর 'চাষ'ই আমার 'ধর্ম', যেদিন শ্রমিকরা হিন্দু-মুসলিম ভুলে একসাথে তাঁদের রক্ত-ঘামের হিসেব কষবে, ঠিক সেদিনই আপনাদের সুবিধাবাদী রাজনীতির ভ্যালিডিটিও শেষ হয়ে যাবে। 
আর ভাঙ্গা-গড়ার এই লড়াইয়ে, আপনার 'শ্রেণীশত্রু' হিসেবে বিপক্ষে থাকবো আমরা। ঘৃণা ছড়ানোর কাজটা আপনি করুন ভালোবাসা দিয়ে বঞ্চিত কৃষক-শ্রমিক ঐক্য গড়ে তুলব আমরা। বছর বছর বিগ-বিজনেস হাউসের কর্পোরেট ট্যাক্স ছাড় দেওয়া গেলে দেশের কৃষক'দের ঋণ মকুব করা যাবে না কেন- ৯'ই আগস্ট জবাব চাইবো আমরা। ৫'ই সেপ্টেম্বর দিল্লীর রাজপথ শ্রমিক'দের রক্তভেজা লাল পতাকায় মুড়িয়ে দিয়ে শ্রমের ন্যায্য মূল্য চাইবো আমরা। ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী, জাতের নয়; ভাতের লড়াইয়ে, হকের লড়াইয়ে আপনার নিশ্চিন্ত ঘুম উড়িয়ে দেব আমরা।











শুক্রবার, ৩ আগস্ট, ২০১৮

মহাকালের প্রহেলিকা - ইতিহাসের নিষ্ঠুরতা ~ দীপক সেন


সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই সরাইঘাটের * শেষ যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন । যারা এইসব কথা বলছিলেন, তাদের অনেককেই এন আর সি র দ্বিতীয় খসড়া প্রকাশ হওয়ার পর মিষ্টিমুখ করতে দেখলাম। আমি তো ইতিহাসের ছাত্র নই, অত শত বুঝি না, বোধহয় ওরা বিজয়োৎসব করছেন। কিন্তু এন আর সি তো "লিস্ট অফ ইনক্লুশন" " লিস্ট অফ এক্সুলশন" নয়।  তাদের নাম থাকার আনন্দে উল্লাস না চল্লিশ লক্ষ নাম বাদ পড়ায় উল্লাস। আমি অত শত বুঝি না, শুধু ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে দেখি সব কিছু আর ক্ষুধিত পাষানের মেহের আলীকে মনে করি। 
         এই চল্লিশ লক্ষের মধ্যে কয়েক লক্ষ নাম আবার অন্তর্ভুক্ত হবে নিশ্চিত, কয়েক লক্ষের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে না। কেননা তাদের হাতে কোন কাগজের নথি নেই, আছে শরীরে পতিত জমি আবাদ করার সোঁদা গন্ধ। কয়েক সহস্র " বিদেশী " কে সনাক্ত করা যাবে যারা অর্থনীতির নিয়ম মেনে কাঁটাতার অতিক্রম করেছিলেন বাঁচার সংগ্রামে।
              আবহমান কালের প্রব্রাজনেই মানব সভ্যতা বিকশিত হয়েছিল বা হচ্ছে।আফ্রিকার ঘন জঙ্গলে থেকে হোমোসেমিন্স নামে যে প্রজাতি জন্ম নিয়েছিল বিবর্তনের সূত্র মেনে সময়ের স্রোতে ভাসতে ভাসতে এই প্রজাতি ভিন্ন ভিন্ন ভৌগালিক পরিবেশে বর্ধিত বিকশিত হয়েছে। গড়ে উঠেছে সমাজ দেশ রাষ্ট্র। সমাজ দিয়েছে অনুশাসন রাষ্ট্র দিয়েছে শাসন, সমাজ বানিয়েছে নিয়ম রাষ্ট্র বানিয়েছে আইন।
        কিন্তু এত সব আয়োজন তো মানবতার স্বার্থে। কিন্তু মানবতাকে অস্বীকার করে যদি কোন সমাজ বা রাষ্ট্র,তবে সমাজবিজ্ঞানের নিয়মে ঝড় উঠে তারপর আবার শান্ত হয়। নির্মল আকাশে আবার শুকতারা ধ্রুবতারা উজ্বল আলো দেয়। এমনি বহমান সভ্যতার এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে ভাবছি এই উল্লাসের ঝড় বড় ক্ষণস্থায়ী। 
       অভিজিৎ নীলোৎপলের মর্মান্তিক মৃত্যুতে যাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, হীমা দাসের গৌরবে যাদের বক্ষ স্ফীত হয়, পতিত জমি আবাদ করতে যাদের শরীর ঘর্মাক্ত হয়, শুধু কাগজের  নথির জন্য তাদের আবেগ ভালোবাসা মাটির মাকে সম্মান করা কোন স্বীকৃতি পাবে না? হে মহাভারত ভুলিও না অর্জুন তোমার একমাত্র বীর নয় একলব্যকে যতই ব্রাত্য কর স্বমহিমায় সে ভাস্বর। হে অর্জুন জননী কুন্তি তুমি কর্ণ কে যতই জলে ভাসাও নিয়তি তাকে ডেকে আনবেই, তোমার অর্জুনকে সে প্রত্যাহ্বান জানাবে , আবার তাচ্ছিল্যে তার প্রাণ ভিক্ষা দেবে। ইতিহাস শুধু বিজয়ীকে মনে রাখে না, ব্রাত্য একলব্যকেও সম্মান করে মনে রাখে।
           চল্লিশ লক্ষকে ব্রাত্য করার আনন্দে যদি কেউ মিস্টি মুখ করে থাক তবে তুমি রবীন্দ্রনাথের "গোরা" পড়নি, কেননা আমাদের আত্মপরিচয় বা জন্মপরিচয়ের ফানুশ  কখন চুপসে যাবে কেউ জানি না। যাদের কে শত্রু পক্ষে ঠেলে দিয়ে অস্ত্রে  শান দিচ্ছ ,যেদিন জানবে সে তোমার জ্ঞাতি গোষ্ঠী সেদিন কি করবে? গ্রীক মহাকাব্যের ট্র‍্যাজিক নায়কদের মত কৃপা ধন্য হবে। ওঅদিপাউসকে ভুলে যেওনা, ভুলে যেও না আউরঙ্গজেবের ছেলে মহম্মদকে। 
      সরাইঘাটের শেষ যুদ্ধের কথা বলছিলে না, তবে শোনো- মহম্মদ আলী জিন্না, কায়েদ ই আজম জিন্নার দুহিতা কোনদিন পাক সীমান্তের ওপারে পা রাখেননি, নেতাজী কন্যা এ দেশের নাগরিকত্ব নেননি। ভায়া, মহাকালের প্রহেলিকাকে মনে রেখ, ইতিহাসের নিষ্ঠুরতাকে মনে রেখ। সামলে চল ভায়া।
* সরাইঘাটের যুদ্ধ--১৬৬৯ সালে মুঘল সেনাপতি রাজা রাম সিংহের সঙ্গে অহম রাজের সেনাপতি লাচিত বড়ফুকনের যুদ্ধ।
------------------------------------
লেখাটি অসম থেকে পাঠিয়েছেন দীপক সেন গুপ্ত।
১/০৮/২০১৮

অসম সমস্যা ~ শান্তনু দত্তচৌধুরী


   অসম ১৮২৬ সালে অহম রাজা ও আরাকান রাজা দের হাত থেকে ব্রিটিশ শাসনে আসে।তার আগের ইতিহাসে যাচ্ছিনা।ইংরেজরা প্রথমে এই রাজ্যটি বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মধ্যে রেখেছিল।ওই সময় থেকে সরকারি কাজে নিয়োগের জন্য পূর্ববঙ্গ থেকে শিক্ষিত বাঙালিদের(মূলত: হিন্দু)  আনা শুরু হয়।
        চা বাগান পত্তন হওয়ার পর ক্লারিকাল সার্ভিসের ক্ষেত্রেও একই ধারা বজায় থাকে।অপর দিকে অসমের রেভিনিউ বাড়ানোর জন্য কৃষি উৎপাদন বাড়াতে পূর্ব বাংলার কৃষকদের (মূলত:মুসলমান)নিয়ে এসে এককালীন ২ টাকা খোরাকি ভাতা দিয়ে বসানো শুরু হয়।অহম ও অন্য জনজাতি- গুলি অনগ্রসর জুম প্রথায় চাষ করতো।অসমের কৃষিকাজ  ও কৃষির বিকাশে এই বঙ্গভাষী কৃষকদের বিশেষ অবদান আছে।এইভাবে অসমে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে।চা বাগানের শ্রমিকের কাজে নিয়ে আসা হয় বিহার(ঝাড়খন্ড),মধ্যপ্রদেশ
(ছত্রিশগড় ) থেকে আদিবাসীদের।
           ১৮৩৮ সালে ইংরেজির সঙ্গে বাংলা ভাষাকেও অসমে অফিসিয়াল ল্যাংগুয়েজ করা হয়।
            ১৮৭৩ সালে অসমকে পৃথক প্রদেশ করা হয়।এই সঙ্গে বাংলাভাষী শ্রীহট্ট জেলাকে অসমের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়।বাংলা ও অসমের মধ্যে গভীর আদান প্রদান গড়ে ওঠে। অহম সমাজের মধ্য থেকে এই সময় আনন্দরাম ঢেকিয়াল ফুকন,হেমচন্দ্র বড়ুয়া,গনাভিরাম বড়ুয়ার মতন সংস্কারকরা বেরিয়ে আসেন।তাঁদের চেষ্টায় অসমিয়া ভাষাকে এই সময় অসমের অফিসিয়াল ল্যাংগুয়েজ হিসাবে ঘোষণা করা হয়।পরবর্তী সময়ে বিংশ শতকে অসমিয়া ভাষার বিকাশে স্যার আশুতোষ মুখার্জি ও ভাষাচার্য্য সুনীতি কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রভূত সহায়তা করেন।
           ১৮৮৫ সালে জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হবার পর স্বাধীনতা আন্দোলনে ক্রমশ অসমের জনসাধারণও অংশগ্রহণ করতে থাকে।১৯২১ সালের অসহযোগ আন্দোলন ও বিশেষ করে ১৯৪২ এর আগস্ট আন্দোলনে অসমের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। শহিদ কনকলতা বড়ুয়া ও ভৃগুমনি ফুকনের বীরত্বগাথার কাহিনী সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।কুশল কোনোয়ারের ফাঁসি হয়।দেশ যখন স্বাধীন হয় তখন অসমে কংগ্রেস ছিল প্রধান রাজনৈতিক দল।কিন্তু কংগ্রেসের ভিতরে ও বাইরে গড়ে উঠছিল তীব্র অসমীয়া জাত্যাভিমানি শক্তি,যারা মনে করতো এবং এখনো মনে করে বাঙালি ও বাংলা ভাষা অসমীয়া ভাষা ও সংস্কৃতিকে গ্রাস করে নেবে।

              এই উগ্র অসমীয়া শক্তির চাপে স্বাধীনতা ও দেশভাগের সময় ১৯৪৭ এর অক্টোবরে  অসমের মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদোলুই এক ছাত্র সমাবেশে বলেন 'নিঃসন্দেহে অসম অসমিয়াদের জন্য'।মুখ্যমন্ত্রীর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন 'অসম যদি হয় অসমিয়াদের জন্য তাহলে ভারতবর্ষটা কাদের জন্য'? 
            ৭ মে,১৯৪৯ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বরদলুই প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে চিঠি দিয়ে বলেন 'পূর্ববঙ্গ থেকে আগত বাঙালি উদ্বাস্তুদের অসমে পুনর্বাসন দিলে রাজ্যে জমির উপর চাপ বাড়বে'।১৮ মে এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী নেহরু জানান অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় অসমে জমি অনুযায়ী জনসংখ্যার ঘনত্ব কম।তাই এখানেই অসমের সীমান্তবর্তী পূর্ববঙ্গের মানুষরা আসলে তাদের পুনর্বাসন দিতে হবে।জমি বন্টনের ক্ষেত্রেও কেন্দ্র সরকার জানিয়ে দেয় স্থানীয় মানুষজন ও উদ্বাস্তুদের মধ্যে উদ্বৃত্ত খাস জমি ৫০:৫০ হারে বিলি করতে হবে।সমস্ত ক্ষেত্রেই পন্ডিত নেহরুর উদ্বাস্তুদের পক্ষে গৃহীত কড়া মনোভাব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার প্যাটেল সমর্থন করেন।উদ্বাস্তু সরকারি কর্মচারীদের অসম সরকারে চাকরি দিলে স্থানীয়রা চাকরি পাবেনা শ্রী বরদলুই -এর এই বক্তব্যও নেহরু গ্রহণ করেননি।তাঁর যুক্তি ছিল এই কর্মচারীরা দেশভাগের জন্য যেখানে যাবেন সেই রাজ্যেই চাকরি পাবেন এটাই প্রতিশ্রুতি।আর তাদের সংখ্যাও খুব বেশি নয়।যাই হোক এ সম্পর্কিত চিঠিপত্র প্রয়োজনে সবিস্তারে দেওয়া যাবে। 

                 হতাশ অসমীয়া উগ্রপন্থীরা প্রথম ১৯৫০ সালে বাঙালিদের ওপর প্রবল আক্রমন চালায়।কয়েক হাজার বাঙালি ব্রম্ভপুত্র উপত্বকা ছেড়ে পশ্চিম বাংলা ও বরাক উপত্যকায় আশ্রয় গ্রহণ করে।আবারও ১৯৬০সালে অসমীয়া জাত্যাভিমানি শক্তি বাঙালিদের ওপর আক্রমণ শুরু করে।এদের চাপে অসম সরকার ১৯৬১ সালে বিধানসভায় রাজ্যভাষা বিল পাস করে যাতে অসমিয়াকে রাজ্যের একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

            এরই বিরুদ্ধে বাংলাভাষীদের তীব্র প্রতিবাদ আন্দোলনের ওপর ১৯ মে,১৯৬১ অসম রাইফেলস এর গুলি চালনা যার ফলে ১১ জন শহীদ হন।এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে প্রতিবাদ  হয়।এই গুলিচালনা সরকারের নীতি নয় বলা সত্বেও অসমের বিমলাপ্রসাদ চালিহার মন্ত্রিসভা তীব্র নিন্দার সম্মুক্ষীন হয়।সারা দেশে এর প্রভাব পড়ে।ওই সময়ে দুর্গাপুরে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস অধিবেশনে পন্ডিত নেহরু সহ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ কাছাড়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নীরবতা পালন করেন।কেন্দ্র সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী অসমে যান। তিনি অসম সরকারকে জানান বরাক উপত্বকার জন্য বাংলাকে সরকারি ভাষা হিসেবে মেনে নিতে হবে।ফলে নূতন অধ্যাদেশ জারি করে বাংলা ভাষাকে বরাক উপত্যকার তিন জেলার প্রধান সরকারি ভাষা করা হয় যা এখনও জারি আছে।

             ১৯৭৭ সালে কংগ্রেস সারা দেশের মতন অসমেও ক্ষমতা হারায়।ক্ষমতায় আসে জনতা পার্টি।যার মধ্যে ছিল জনসংঘ(বিজেপি), সোসালিস্ট প্রভৃতি দল।এতদিনে অসমীয়া জাত্যাভিমানি শক্তি সম্পূর্ণ নিজেদের একটি সংগঠন পেলো।এই জনতা দলের জঠরেই জন্ম নিল অল অসম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন(আসু) এবং অসম গণ পরিষদ(অগপ)। এবং এদের নেতৃত্বে শুরু হল নতুন করে 'বঙ্গাল খ্যাদা'।ইন্ডিয়ান অয়েল-এর নবীন ইঞ্জিনিয়ার রবি মিত্রকে হত্যা করা হল।শুরু হল চূড়ান্ত অরাজক অবস্থা।

              জনতা দলের শিথিল শাসনে আসু ও অগপ'র লাগাতর আক্রমণে বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের ওপর বিপর্যয় নেমে আসে।সকলেই নাকি অনুপ্রবেশকারী।এই প্রচার এখনো চলছে।১৯৮৩ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অসমের 'নেলি'তে এক ভয়াবহ আক্রমণে দুই সহস্রাধিক সংখ্যালঘুকে হত্যা করা হয়।তখন ওখানে রাষ্ট্রপতির শাসন ছিল।আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের আগে বাঙালিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করার জন্য এই হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করা হয়।কিন্তু তা সত্বেও ১৯৮৩'র নির্বাচনে কংগ্রেস জয়লাভ করে।হিতেস্বর সাইকিয়া মুখ্যমন্ত্রী হন।এই সুদক্ষ প্রশাসক ও সংগঠক এই অসমিয়া শভিনিস্টদের আতঙ্কের কারণ হয়ে ওঠেন।

             অসমে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার জন্য অত্যন্ত উদার মনোভাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধি ১৯৮৬ সালে আসু'র সঙ্গে অসম চুক্তি সম্পাদন করেন।নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরা হয়।নতুন করে ১৯৮৬ তে নির্বাচন করার জন্য সাইকিয়া পদত্যাগ করেন।অগপ ক্ষমতায় আসে।কিন্তু এই সরকার তথাকথিত বিদেশি চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হয়।১৯৯১ সালে পুনরায় নির্বাচনে হিতেস্বর সাইকিয়ার নেতৃত্বে কংগ্রেস ক্ষমতায় আসে।১৯৯৬ সালে তাঁর মৃত্যু দেশের পক্ষে এক বিরাট ক্ষতি।তিনি কঠোর ভাবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ দিয়ে অহম প্রাদেশিকতা ও সাম্প্রদায়িকতাকে পর্যুদস্ত করেছিলেন।পরবর্তী কংগ্রেসী মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈও অসমে শান্তি শৃঙ্খলা ও ধর্মীয় - ভাষিক সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বজায় রেখেছিলেন।তাঁদের শাসনামলেই শিলচরে 
অসম কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ,মেডিক্যাল কলেজ ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি স্থাপিত হয়।
           ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে নরেন্দ্র মোদি প্রচার চালান ক্ষমতায় এলে তাঁরা সব বিদেশিকে (পড়ুন মুসলমান) বিতারণ করবেন, ছিটমহল বিনিময় হতে দেবেন না ইত্যাদি।বিজেপি ভালো ফল করে।ক্ষমতায় এসে কিন্তু মোদিকে ছিটমহল বিনিময় করতে হয়েছে।২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে অসমে বিজেপি,অগপ ও বোরো উগ্রপন্থীদের রামধনু জোট ক্ষমতায় এসেছে।বদরুদ্দীন আজমলের ইউডিএফ বাঙালি মুসলমানদের দল।এরা বহু আসনে প্রার্থী দেয়। কংগ্রেসের সঙ্গে ভোট বিভাজনের ফলে ওই বিজেপি জোট জয়লাভ করে।বাঙালি হিন্দুদের এক বড় অংশ বিজেপির প্রতি মোহগ্রস্থ হয়ে ওই রামধনু জোটকে ভোট দেয়।তারা ভেবেছিল নাগরিকত্বের প্রশ্নে হিন্দু বলে তারা রক্ষা পাবে। কিন্তু পরিস্থিতি ভয়াবহ।সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে যে নাগরিক পঞ্জিকরণের কাজ চলছে তার প্রাথমিক তালিকায় তিনপুরুষের বাসিন্দাদের নামও বাদ পড়েছে।অসমীয়া জাত্যাভিমানীদের মতে বাংলাভাষী মানেই অনুপ্রবেশকারী এবং বাংলাদেশি।এদের মতে ১৯৭১ সালকে যে ভিত্তিবর্ষ ধরা হয়েছে তা আইন নয়,একটি গেজেট নোটিফিকেশন মাত্র।সংবিধান যেদিন গৃহীত হয়েছে সেদিন (১৯৪৯ এর ২৬ নভেম্বর)যারা এই ভূখণ্ডে ছিলেন তারা বা তাদের বংশধররা নাগরিক, এটাই আইন। 
            কার্যত নাগরিক পঞ্জিকরণ আদৌ ১৯৭১ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরে হচ্ছে না।জমির দলিল,পূর্বপুরুষের ১৯৫১ সালের ভোটের লিস্টে নাম আছে কি না, আবেদনকারী প্রকৃতই বংশধর কি না,বার্থ সার্টিফিকেট(সেটিও আবার জন্মানো মাত্র সংগৃহিত হতে হবে,পরে সংগৃহিত হলে হবে না) এরকম নানা শর্তাবলী।

            এখন মোদি সরকার আরএসএস এর পরামর্শে ভারতের নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫ (সংশোধনী)বিল এনে বাঙালিদের মধ্যে ধর্মীয় বিভাজনের কৌশল এনেছে।এই বিলে বলা হয়েছে ২০১৪ সালের আগে প্রতিবেশী দেশগুলি অর্থাৎ শ্রীলঙ্কা,বাংলাদেশ,পাকিস্তান, আফগানিস্তান,মায়ানমার থেকে ধর্মীয় ও সামাজিক হিংসার কারণে যেসব হিন্দু , বৌদ্ধ , শিখ,জৈন, খৃস্টান ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে তারা নাগরিকত্ব পাবে ,কিন্তু কোনো মুসলমান পাবেনা।প্রথমত এই আইন রাষ্ট্রপুঞ্জের মানবাধিকার নীতির পরিপন্থী ,দ্বিতীয়ত ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব ভারতীয় সংবিধান বিরোধী।

               এবার বিজেপির জোটসঙ্গী অগপ , বোরো ও অন্যান্য গোষ্ঠী জানিয়ে দিয়েছে ধর্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব দেবার চেষ্টা হলে তারা জোট ত্যাগ করবে।মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়ালও বলেছেন তিনিও এই বিল মানবেননা ও প্রয়োজনে পদত্যাগ করবেন।এদের বক্তব্য, এই বিল এর দ্বারা অনুপ্রবেশকারী হিন্দু বাঙালিদের নাগরিকত্ব ও বৈধতা দেওয়া হবে।এর ফলে অসমীয়ারা চিরতরে সংখ্যালঘু হয়ে যাবে।

            এই পরিস্থিতিতে ত্রিপুরার রাজ্যপাল তথাগত রায় অসমের বাঙালিদের ভাষাভিত্তিক পরিচয় পাল্টে অসমীয়া হবার পরামর্শ দিয়েছেন। এরকম পরামর্শ পাকিস্তানি শাসকরা বাংলাদেশে বঙ্গভাষীদের দিয়ে বলেছিল তোমরা উর্দু ভাষাকে তোমাদের মাতৃভাষা বলে গ্রহণ কর।
           এবার অসম সরকার ২৫ বৈশাখ কবিগুরুর জন্মদিনে স্কুল ,কলেজে ছুটি দেয়নিIগত বছরও এই সিধ্যান্ত নিয়ে পরে তা বাতিল করেছিল।রাজ্যের এক মন্ত্রী বলেছেন রবীন্দ্রনাথ বাঙালি কবি , অসমে তার জন্মদিন কেন পালন করা হবে ?কোনও দেশের কোনও সরকার তাদের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টাকে এমনভাবে অপমান করেনি।
           অবস্থা এমন যে, ভাষা আন্দোলনের ধাত্রীভূমি শিলচরের বিজেপি বিধায়ক 
দিলীপ পাল 'দমবন্ধ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে' রাজ্যের ডেপুটি স্পিকার পদ ছেড়েছেন।
         নাগরিক পঞ্জিকরণের দ্বিতীয় তালিকা প্রকাশিত হবার পর দেখা যাচ্ছে ৪০ লক্ষ মানুষের নাম বাদ গিয়েছে।সকলেই বাঙালি।এদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমান উভয় ধর্মের মানুষই রয়েছেন। আসু ও গণ সংগ্রাম পরিষদ এর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে মিষ্টি বিতরণ করেছে।
           যাদের নাম বাদ গেল তাঁরা কোথায় যাবেন? বাংলাদেশ এদের গ্রহণ করবে? এর উত্তর হচ্ছে ' না'। এরা কি তাহলে রাষ্ট্রহীন হয়ে থাকবেন?
            বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা বলছেন এই  পঞ্জিকরণ সুপ্রিম কোর্টের তত্বাবধানে হয়েছে।তাদের কিছু করার নেই।কথাটি বাস্তবে সঠিক নয়।কাজটি করেছে রাজ্য সরকারি কর্মী ও আধিকারিকরা।প্রতীক হাজেলা যিনি এই পঞ্জিকরণের মূল দায়িত্বপ্রাপ্ত সেন্ট্রাল ক্যাডারের IAS অফিসার, তিনি কি প্রতিটি case নিজে verify করেছেন?
          আর বিজেপির স্থানীয় নেতা দিলীপ ঘোষ আস্ফালন করে বলেছেন তাঁরা নাকি এই বঙ্গেও পঞ্জিকরণ করবেন ও সবাইকে  মেরে বার করে দেবেন।এই দলটি ৪ বছর হলো ক্ষমতায় এসে ভাষা, ধৰ্ম , বর্ণের ভিত্তিতে দেশ জুড়ে বিভাজন সৃষ্টি করেছে।একটি শান্তিপূর্ণ স্থিতিশীল দেশকে অস্থিতিশীল বিবাদ ও সংঘাতের লিলাভূমিতে পরিণত করেছে।

          ১৭৫৭ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ক্ষমতায় এসে এই কাজটিই করেছিল।
         The welfare state
          has become a
          plunderous  state
         --.ঐতিহাসিক স্পিয়ার।

মঙ্গলবার, ৩১ জুলাই, ২০১৮

আসামে এন আর সি ~ আর্কাদি গাইদার

১৯৭১ সালে আমার বাবা এবং মা'র প্রথম একে অপরের সাথে আলাপ, সুবোধ মল্লিক স্কোয়ারে ছাত্র ফেডারেশনের মিটিংএ। মা কথা বলতো বাঙাল ভাষায় (হ্যা আমি সেই প্রজন্মের ব্যাক্তি যাদের ছোটবেলায় বাংলা আর বাঙাল দুটো আলাদা ভাষা ছিলো), বাবা কথা বলতো এক অদ্ভুত বাংলামিশ্রিত হিন্দিতে। 

মা'র বাবা, মানে আমার দাদুর পরিবার, যাদের দেশ ফরিদপুর, আর বাবা'র বাবা, মানে আমার ঠাকুর্দার পরিবার, যাদের দেশ বরিশাল, কেউ সেই অর্থে ঘটি হারানো উদ্বাস্তু না। পার্টিশনের বহু আগে থেকেই এদের ওপারে দেশের বাড়ি আর এপারে কলকাতার বাড়ি (ওই যাকে আজকাল কায়দা করে townhouse  বলে) ছিলো। পার্টিশনের সময় ঠাকুর্দারা এইপারেই থাকতো - পার্ক সার্কাসে। বাবারা স্কুলে পড়াকালীন ঠাকুরদা এবং ঠাকুমা দুজনেই মারা যাওয়ায়, বাবা এবং জ্যেঠুর খাওয়ার জোগানোর এবং গার্জেনগিরি করবার দায়িত্ব নিয়েছিলো পার্ক সার্কাসের পার্টির কমিউনের লোকজন। তিনবেলা খাওয়া, পড়া দেখিয়ে দেওয়া (এবং বলতে বাধা নেই পড়াশুনোয় বিশেষ ধ্যাড়ানো) এসব হতো দিলখুশা স্ট্রিটের পার্টি কমিউনে - যেখানে বসবাস করা অধিকাংশ কমিউনিষ্ট পার্টির নেতা অবাঙালী মুসলমান - শ্রমিক শ্রেনির সদস্য। তাদের মুখের ভাষাই বাবা শিখে ছিলো। 
আর দাদুরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঠিক আগে বার্মায় থাকতো। জাপানিরা আক্রমন করবার পর ব্রিটিশরা বার্মায় বসবাসকারী ইন্ডিয়ান সাবজেক্টদেরকে মিলিটারি গার্ড দিয়ে একটা দুমাসের লং মার্চ করিয়ে ইম্ফল দিয়ে ভারতে প্রবেশ করিয়েছিলো। দাদুরা এসে তাদের যাদবপুরের বাড়িতে ঘাটি গেড়েছিলো।

৮ বছর প্রেম করবার পরে ১৯৭৯ এ আমার বাবা এবং মা বিয়ে করে। তার ঠিক দুবছর আগে, অর্থাৎ ১৯৭৭ সালে ভয়েজার স্পেস মিশনের সূচনা হয়। ভয়েজার ১ এবং ২, দুই মহাকাশযান সৌরজগত পরিক্রমা করতে পাড়ি দেয়। তাদের পেটে ভরে দেওয়া হয় সোনার ফোনোগ্রাফ রেকর্ড - ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড। এই রেকর্ডে ধরা থাকে মানবসভ্যতার ইতিহাসের গান, কথা, ছবি, পৃথিবীর বিভিন্ন রকম শব্দ, আর সৌরজগতের ম্যাপ। উদ্দেশ্য - যদি কোন ভীনগ্রহের সভ্যতা বা ভবিষ্যতের  টাইম ট্র‍্যাভেল করা মানবসভ্যতার হাতে এটা পড়ে, তাহলে একটা ক্যাপসুলের মধ্যে দিয়ে তারা জানতে পারবে আমাদের কিছুটা ইতিহাস, চিনতে পারবে আমাদেরকে। ২০১২ সালে ভয়েজার ১ এবং ২ সৌরজগতের সীমানা অতিক্রম করে অন্তরীক্ষে প্রবেশ করে। এই সময়কালের মধ্যে সোভিয়েত ধ্বসে পড়ে, ইউরোপে একের পর এক নতুন দেশের সৃষ্টি হয়, গোটা পৃথিবীর এক কোনা থেকে অন্য কোনায় দলে দলে মানুষ পাড়ি দেয়। ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড ভেসে চলে নিকষ কালো মহাশূন্যে, বন্ধুর খোজে।

আমি বাঙাল ভাষায় কথা বলিনা৷ 'পরিষ্কার বাংলায়' কথা বলি। আমি যেখানে থাকি, সেখানে এখনো আশেপাশে বাঙালভাষা টুকটাক শোনা যায়। একদিন যাবে না। সেই হারিয়ে যাওয়ার দুঃখের চেয়েও বড় আরেকটা দুঃখ আমায় চেপে ধরেছে। হেরে যাওয়ার দুঃখ। ওই বাঙাল ভাষার মতনই আরেকটি মূল্যবান ভাষা আমাকে উত্তরাধিকার সূত্রে দেওয়া হয়েছিলো। প্রতিবাদের ভাষা। প্রতিবাদের সঠিক ভাষা হয় জানেন তো? আমার বাবা মা জানতো। তারা এই শহরের বুকে ভিয়েতনামের জন্যে মিছিল করেছিলো, বাংলাদেশের জন্যে চাঁদা তুলেছিলো। জোন বায়েজরা জানতো। তারা বাংলাদেশের জন্যে নিউ ইয়র্কে কনসার্ট করে গেয়েছিলো। তাদের ভাবতে হয়নি, আমরা আমেরিকান কিনা, আমরা বাঙালী কিনা, আমরা ভিয়েতনামিজ কিনা। তারা ভেবেছিলো, আমরা এই পৃথিবীর মানুষ, তোমাদের তৈরি করা ২০০ বছরের কৃত্রিম কাঁটাতারে আমাদের বয়ে গেছে, আমরা মানুষ! 

আমাদের দেখলে কি ভাবতো তারা! আসামে ৪০ লাখ লোক নাগরিকত্ব থেকে বাদ পড়েছে বলে প্রতিবাদ সংগঠিত করবার জন্যে প্রচার করতে হচ্ছে বাঙালীরা আক্রান্ত? ওই ৪০ লাখের মধ্যে যে উত্তর ভারতীয় শ্রমিক, পাহাড়ি উপজাতির চা বাগানের শ্রমিকরা আছে, তাদের ব্যাপারে এই শহর নির্বিকার থাকবে? 'বাঙালী' আক্রান্ত না হয়ে শুধু মানুষ আক্রান্ত হলে আমাদের কিছু করবার নেই? আবার এও বলতে হচ্ছে, ওই ৪০ লাখের মধ্যে হিন্দুও আছে! মানে বাঙালী হিন্দু আক্রান্ত না হলে এই শহরের লোক জাগবে না? তাহলে আর প্রতিবাদ করে লাভ কি? আমরা তো এমনিতেই হেরে গেছি। হেরে ভুত হয়ে গেছি। 

আমরা হেরে গেছি কারন আমাদের মধ্যে কেউ নেই যে সামনের লোকটার কলার ধরে বলবে বাঙালী, অসমীয়া, বিহারী, হিন্দু, মুসলমান এসব দিয়ে কিচ্ছু যায় আসেনা, চোখ খুলে দেখো, কতগুলো অসহায় মানুষকে ধরে বেঁধে বাস্তহারা করে, শিকড় ছিড়ে ডিটেনশনে ক্যাম্পে পাঠানোর বন্দোবস্ত পাকা হচ্ছে। এইটাই যথেষ্ট জ্বলে ওঠবার জন্যে! আমরা হেরে গেছি কারন আমাদের মধ্যে কেউ নেই আঙুল তুলে বলবার জন্যে যে তোমাদের এই অসমীয়া বনাম বাঙালী, হিন্দু বনাম মুসলমান, অধিবাসী বনাম অনুপ্রবেশকারীর এই মনভুলানো খেলা আমরা খেলবো না, তোমাদের ছুড়ে দেওয়া রুটির টুকরো নিয়ে আমরা নিজেদের মধ্যে কুকুরের মতন মারামারি করবো না, আমাদের বোকা বানানো বন্ধ করো! আমরা হেরে গেছি কারন আমরা কেউ বুক ঠুকে বলছিনা যে এই পৃথিবীর প্রত্যেকটা মানুষ অভিবাসী আর সেই প্রত্যেকটা মানুষই অধিবাসী। আমরা হেরে গেছি কারন আমাদের মধ্যে একটা চ্যাপলিন নেই যে চেঁচিয়ে বলবে তোমাদের বিশ্বায়ন মেকি, মিথ্যে, তোমরা কথা রাখোনি, তোমাদের বিশ্বায়ন মানে শুধু বহুজাতিক পুঁজির অবাধ বিচরণক্ষেত্র তৈরি করা, আর শ্রমের বিচরণের স্বাধীনতা কেড়ে নিয়ে শ্রমিকদের একে অপরের শত্রু বানিয়ে ছোট ছোট খুপড়িতে বন্দী করে ফেলা। আমি হেরে গেছি কারন ওরা আমাকে শিখিয়ে দিতে পেরেছে আমি বাঙালী হিন্দু, আর পাশের লোকটা অসমীয়া হিন্দু, আর সামনের লোকটা বিহারী মুসলমান, আর আমরা এরকম ভাগ হতে হতে প্রত্যেকে একা দাঁড়িয়ে আছি, নিজেরটুকু রক্ষা করবার জন্যে, আর ওদের শেখানো ভাষাতেই আমি আজকে বলছি 'বাঙালী নিজেকে বাচাও', আমি ভুলে গেছি আমার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া ভাষা, যেই ভাষা শিখিয়েছিলো - আমরা মানুষ, এটুকুই যথেষ্ট।

২০২৫ সাল নাগাদ ভয়েজার ১ এবং ২ এর বিদ্যুৎ যোগান দেওয়া ব্যাটারী আর জ্বালানি আস্তে আস্তে শেষ হয়ে যাবে। একে একে আলো নিভে যাবে, মেশিন বন্ধ হয়ে যাবে, পৃথিবীতে পাঠাতে থাকা রেডিয়ো বার্তাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। অন্ধকার, নিঃশব্দ, নিঃসঙ্গ মহাকাশে ভূতের মতন ভেসে বেড়াবে দুটো মহাকাশযান। তাদের পেটে লুকিয়ে থাকবে ভয়েজার গোল্ডেন রেকর্ড। যার মধ্যে থাকবে আমাদের কিছু কথা, কিছু গান, কিছু শব্দ, কিছু ছবি। মানবসভ্যতার ভাষা হিসেবে।

রবিবার, ২৯ জুলাই, ২০১৮

কল্পনা দত্ত ~ চন্দন দাস

''ধরা পড়ার পর মাস্টারদা, ফুটুদা আর আমাকে নিয়ে নতুন করে মামলা শুরু হয়েছিল। আমরা কাঠগড়ায় একসঙ্গে দাঁড়াতাম। সেইসময় একদিন ফুটুদা বলেছিলেন, তোকে ভালো লাগে। যদি ফিরে আসি, আমার জন্য অপেক্ষা করবি? আমার মৌনতায় হয়তো সম্মতি ছিল। কারন এর প্রায় দশ বছর পরে যখন জোশী(পিসি জোশী) আমাকে প্রোপোজ করে তখন আমি বলেছিলাম আমি যে তারকেশ্বর দস্তিদারকে কথা দিয়েছি।''
                                          -----'চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমনকারীদের স্মৃতিকথা', লেখিকা-কল্পনা দত্ত, পৃষ্ঠা ১২১।

'ফুটুদা' ফিরে আসেননি। ১৯৩৩-এ একইসঙ্গে মাস্টারদা সূর্য সেন এবং ফুটুদা, অর্থাৎ তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির হুকুম হয়েছিল। দিনটি ছিল ১৪ই আগস্ট। 
কে জানতো, তার ঠিক চোদ্দ বছর পর চট্টগ্রামে পা রাখতে পাসপোর্টের প্রয়োজন শুরু হবে? কে জানতো একটা জঘন্য বেইমানীর কাঁটাতার লক্ষ কোটি বছরের জন্য পেতে দেওয়া হবে সংগ্রামী, আত্মত্যাগী একটি জাতির বুকে? কে জানতো স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে একা 'দখল' করার উদ্যোগ শুরু হবে একটি দলের পক্ষ থেকে? কে জানতো শাসক আর রাষ্ট্রের সব দখলের ধারাবাহিকতা বজায় থাকতেও, স্বাধীনতার সত্তর বছর পরেও রুখে দাঁড়াবে কল্পনা দত্ত, তারকেশ্বর দস্তিদাররা?
আজও লড়াই আছে। কারন শোষণ আছে। কাঠগড়া আছে, শোষিতের জন্য। তবু স্বাধীন, সার্বভৌম, হেমন্তের আকাশের মত স্বপ্ন আছে আজও। আর আছে আজও, তাকে ধারন করার দুর্জয়, অনবদ্য হৃদয়। সেই হৃদয়ের দুটি প্রকোষ্ট — একটির নাম ফুটুদা। আর একটি সূর্য সেনের বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি তারকেশ্বর দস্তিদার। কিন্তু দুই প্রকোষ্ঠের মাঝে কোনও দেওয়াল নেই। কোনদিন ছিল না। 
কাঠগড়ার সেই কয়েকমুহুর্তের বিবরণই তার প্রমাণ।
কল্পনা দত্তের 'শাস্তি' হয়েছিল যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরের। রায়ে স্পেশ্যাল ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি বলেছিলেন,''মেয়ে বলে এবং কম বয়স বলেই প্রাণদন্ডে দন্ডিত করা গেলো না।'' তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজের চিঠি এবং লক্ষ মানুষের আবেগ, প্রতিবাদের মুখে কল্পনা দত্তের আন্দামানের কারাগারে পাঠানো রদ করতে বাধ্য হয় ব্রিটিশ শাসকরা। তবে ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৯ — দেশের বিভিন্ন জেলে তাঁকে দিন কাটাতে হয়েছিল। রাজশাহীর জেলে বসে মাস্টারদা এবং তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির খবর পেয়েছিলেন। কল্পনা দত্তের কথায়,''মাস্টারদার ফাঁসি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না, তবু প্রতিজ্ঞা করেছিলাম রাজশাহী জেলে বসে: 'তোমার আদর্শ বহন করে নিয়ে আমরা চলব।'
সেই আদর্শের স্রোত চট্টগ্রাম যুব বিদ্রোহের সেনানী, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, অনন্ত সিংহ, গণেশ ঘোষদের সহযোদ্ধা কল্পনা দত্ত খুঁজে পেয়েছিলেন কমিউনিস্টদের মধ্যে।
আর 'ফুটুদা'? সেই কথা দেওয়া? কল্পনা দত্ত জানিয়েছেন,''দুর্ভিক্ষের পরে বোম্বেতে একটা কনফারেন্স হয়েছিল। সালটা সম্ভবত ১৯৪৩। আমি চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে সেই কনফারেন্সে যোগ দিয়েছিলাম। সেখানেই জোশী আমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। আমি বললাম আই হ্যাভ প্রমিসিড্‌ তারকেশ্বর দস্তিদার। জোশী বলল, তুমি জানো না ওর ফাঁসি হয়ে গেছে। ও তো আর কোনদিন আসবে না।.....তাও আমি দোনামোনা করছিলাম। বিটি(বিটি রণদিভে), ডক(ড: গঙ্গাধর অধিকারী) এরা ইনসিস্ট করাতে বিয়ে করলাম।'' তারপরও ১৯৯৫-র ৮ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কমরেড কল্পনা দত্ত বেঁচে ছিলেন। সব লড়াইয়ে 'ফুটুদা'-র ঐতিহ্য, আত্মত্যাগের শিক্ষা তাঁর পাথেয় ছিল।
এবারে পাঠকের একটি প্রশ্ন সম্ভবত অবধারিত। আপনি মশাই, কল্পনা জোশী(দত্ত)-র ওই বইটির বিষয়ে এত কথা লিখছেন কেন? বইটির বিজ্ঞাপনে কাজ কী? পাঠকদের জানাই, বইটি বর্তমান বাজারে প্রায় দুর্লভ। একটি কপি জোগাড় করতে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়। স্বাধীনোত্তর ভারতের বড় দোষ — স্বাধীনতা সংগ্রামের সংগ্রামী ধারার বই, প্রবন্ধ, চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন কখনও প্রয়োজনিয় মাত্রায় পৌঁছোয় না। শাসকের ভয় — যদি গুটিকয় মানুষের দারুন অবদানের যে ভাবমূর্তি তিলেতিলে, প্রবল বিজ্ঞাপনের সৌজন্যে গড়ে তোলা হয়েছে, তা যদি প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়ে যায়। কল্পনা দত্ত, গণেশ ঘোষ, সতীশ পাকড়াশি, সুবেধ সেনরা কেন তেভাগা-তেলেঙ্গানায় জড়িয়ে পড়েছিলেন, কেন স্বাধীনতার পরে তাঁরা কমিউনিস্ট-জীবন বেছে নিয়েছিলেন — এ' সব প্রশ্ন বড় বিপজ্জনক। 
তার চেয়ে সোজা কী? এমন বাজার গড়ে তোলো যেখানে অনেক, অনেক, অনেক সহজে পাওয়া যায় মমতা ব্যানার্জির বই — তা সে 'উপলব্ধি'-ই হোক কিংবা 'কথাঞ্জলী'। কিংবা সাভারকার। চেনেন তো এই মানুষটিকে? পুরো নাম বিনায়ক দামোদর সাভারকার। কল্পনা দত্ত কিংবা সূর্য সেনের কথা বেমালুম ভুলে গেলেও রাষ্ট্র একটি আস্ত বিমানবন্দর 'বীর সাভারকার'-র নামঙ্কিত করেছে। সেটি আন্দামানে। সেখানেই সেলুলার জেল। সেখানে কল্পনা দত্তের নির্বাসন আটকাতে উদ্যোগ নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দীনবন্ধু অ্যান্ড্রুজ। আর সেই জেল থেকেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদকে চিঠি লিখেছিলেন ভারতে 'হিন্দুত্বের' প্রণেতা সাভারকার। কী ছিল তাতে? ঐতিহাসিক এ জি নুরানী তাঁর 'সাভারকার ও হিন্দুত্ব' বইয়ে লিখছেন,''আন্দামানের রাজধানী পোর্টব্লেয়ারে ১৯১১-র ৪ঠা জুলাই সাভারকারকে আনা হয়। কিন্তু বছর কাটতে না কাটতেই তিনি 'ক্ষমার জন্য আবেদনপত্র' জমা দিলেন।...১৯১৩-র ১৪ই নভেম্বরের আরেকটি আবেদনপত্রে এটির উল্লেখ রবেছে। গভর্নর জেনারেলের কার্যনির্বাহী পরিষদের হোমমেম্বার রেগিনাল্ড দ্রাভকের উদ্দেশ্যে লিখিত ১৯১৩ সালের এই আবেদনপত্রটি 'মহামান্য' সম্বোধনে তাঁকে '১৯১১ সালে ক্ষমার জন্য আমি যে আবেদনপত্রটি পাঠিয়েছিলাম' সেটির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিল।'' 
ব্রিটিশ শাসকের কাছে সাভারকার আরও কী শপথ করেছিলেন? তিনি লিখেছিলেন,''সরকার যেমনভাবে চাইবেন ঠিক সেই শক্তিতে তাদের হয়ে কাজ করবো। যেহেতু এ আমার বিবেকের উচ্চারণ সেকারণে আমার ভবিষ্যৎ আচরণও তেমনই হবে আশা রাখি। আমাকে জেলে রাখলে কিছুই পাওয়া যাবে না। সে তুলায় অন্য ক্ষেত্রে হয়ত কিছু হতে পারে। পরমশক্তিধরের পক্ষেই সদয়তার মহত্ব দেখানো সম্ভব। কাজেই অনুতপ্ত পুত্র তার পিতৃমাতৃসদৃশ সরকারের দরজা ছাড়া আর কোথায় ফিরে আসতে পারে?''
আহা! স্বাধীনতার যোদ্ধার কী করুণ আবেদন 'পিতৃমাতৃসদৃশ', 'পরমশক্তিধর' ব্রিটিশ সরকারের কাছে।
তবু স্বাধীনতার সত্তর বছরে সাভারকারের দর্শনকেই ছড়িবে দেওয়া হয়েছে দেশজুড়ে। ছড়িয়েছেন তাঁরাই, যাঁরা সূর্য সেনদের দৃষ্টিভঙ্গী, লড়াইয়ের ইতিহাসের প্রকাশ সুকৌশলে আটকেছেন।
তারা নির্দিষ্ট কোনও দল নয়। দলে ভাগ হয়ে আছেন। কিন্তু আদপে শাসক এবং শোষক। মমতা ব্যানার্জি তাদেরই উপাদান।

শনিবার, ২৮ জুলাই, ২০১৮

ডাক্তারি শিক্ষার খরচ ও গ্রামের পোস্টিং ~ ডা: বিষান বসু

কিছু কিছু যুক্তি এমন আজব হয়, যাতে স্তম্ভিত হয়ে যাওয়া ছাড়া পথ থাকে না। পালটা যুক্তি ঠিক কোন জায়গা থেকে শুরু করা যেতে পারে, সেই নিয়েই কনফিউশন। 

সদ্য পাশকরা ডাক্তারবাবুদের বন্ডে বেঁধে গ্রামীণ স্বাস্থ্যপরিষেবায় পাঠানো ও তজ্জনিত জটিলতা নিয়ে আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত অমিতাভবাবুর লেখাটিও সেই জাতের।

আপাত যুক্তিসমূহ সহজপাচ্য। ডাক্তারদের পড়াতে সরকারের খরচ, গ্রামে ডাক্তার না গেলে ক্ষতিপূরণ, আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ডাক্তারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুযোগ, অস্বচ্ছল চিকিৎসকদের গ্রামে যেতে বাধ্য হওয়া, তজ্জনিত আর্থিক ক্ষতি, সেই ক্ষতির ক্ষতিপূরণের রাস্তা, স্বচ্ছল-অস্বচ্ছলের বেছে নেওয়ার সুযোগের অসাম্য, গ্রাম-শহরের অসাম্য - সলমাজরির কাজের নিপুণতায় সাজিয়েছেন তিনি।

পড়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম।

আমার তরফে সামান্য কিছু প্রশ্ন। 

আপনারাও ভাবুন। 

অমিতাভবাবুর কাছে পৌঁছোনোর সুযোগ আমার নেই, কেউ, পারলে, প্রশ্নগুলো ওনার কাছে পৌঁছে দেবেন, প্লীজ।

খবরের কাগজে উত্তর পাঠানো যেতো। পাঠালাম না, কেননা আগের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, তাঁরা বক্তব্য ছাপাতে যতোখানি আগ্রহী, উত্তর প্রকাশে তার ভগ্নাংশও নন।

প্রথমত, একটু সরকারবাহাদুরকে প্রশ্ন করবেন, একজন ডাক্তার তৈরী করতে সরকারের খরচ ঠিক কতোটা? সরকার একটা শ্বেতপত্র প্রকাশ করবেন, প্লীজ? প্রায়ই শুনছি, এই খরচ প্রায় তিরিশ-চল্লিশ লক্ষ। কিন্তু, কিভাবে হিসেবটা হলো, সেইটা তো পরিষ্কার হওয়া দরকার। মেডিকেল কলেজের, যেহেতু, পুরো, হ্যাঁ পুরো পরিকাঠামোই রোগিদের চিকিৎসার কাজে ব্যবহৃত হয়, সেহেতু, হিসেবটা অতোটা সহজ নয়। আর, সরকারি চাকুরিরত যে ডাক্তারবাবুরা শুধুমাত্র রোগির চিকিৎসা করেন, তাঁদের সাথে মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক-শিক্ষকদের (যাঁরা চিকিৎসার সাথে সাথে ছাত্রদেরও পড়ান, পরীক্ষা নেন) বেতনক্রম কিছু ভিন্ন নয়। কাজেই, চিকিৎসক-শিক্ষক নিয়োগের পেছনে সরকারের বাড়তি খরচের কথাটা ঠিক নয়।

তাই হিসেবটা ভেবেচিন্তে করুন। যেমন ধরুন, সাধারণ একটা ইক্যুয়েশন ।

(একটা মেডিকেল কলেজ চালাতে সরকারের বার্ষিক খরচ - সমান সুযোগসুবিধের সমান বেড সংখ্যার সমসংখ্যক রোগীর চিকিৎসা হওয়া একটি সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতাল চালানোর বার্ষিক খরচ) ÷ সেই মেডিকেল কলেজে ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা = ডাক্তারি ছাত্রের পেছনে সরকারের বার্ষিক লগ্নি

হ্যাঁ, লগ্নিই। কেননা, সরকার সেই খরচের কথা ফলাও করে বলেন, উশুল করার চেষ্টাও করেন, সাধ্যমত।

পাশাপাশি, একজন ইঞ্জিনিয়ার তৈরিতে, বা একজন সায়েন্স বা যেকোনো শাখার গ্রাজুয়েট তৈরিতে সরকারের খরচ কতো জানাবেন। না, তাঁদের কাছ থেকে উশুল করার জন্যে নয়, শুধু একটা তুলনামূলক আলোচনার জন্যে।

আবার, ধরুন, ডাক্তারি ছাত্ররা যেমন করে ইন্টার্নশিপ করেন (তিনবছরের বন্ডের কথা না হয় তুললামই না), সামান্য টাকায়, হাতেকলমে কাজ শেখার জন্যে, তেমন করে এই বিপুল সংখ্যক ইঞ্জিনিয়ারও সরকারি ক্ষেত্রে কাজ শেখার জন্যে একবছর যদি কাজ করেন, হয়তো গ্রাম-মফস্বলের চেহারাটাই বদলে যেতে পারে। আর, তাহলে, কে জানে, হয়তো ডাক্তাররাও গ্রামে যেতে তেমন করে আপত্তি করবেন না।

দ্বিতীয়ত, ডাক্তারদের গ্রামে যাওয়ার ব্যাপারে অনীহাকে অমিতাভবাবু দেখতে চেয়েছেন মূলত আর্থিক ক্ষতির দৃষ্টিকোণ থেকে। আর ভাবতে চেয়েছেন, সেই আর্থিক ক্ষতির ক্ষতিপূরণের উপায় কী হতে পারে।

কিন্তু, আমার মনে হয়, ব্যাপারটা ঠিক তেমন নয়। 

গ্রামে না যাওয়ার পেছনে আর্থিক ক্ষতি কিন্তু ফ্যাক্টর নয়। কেননা, কর্পোরেটে চাকরির তুলনায় মফস্বলে প্রতিষ্ঠিত প্রাইভেট প্র‍্যাক্টিসের আয়, কোনোভাবেই, কম নয়। সত্যি বলতে কি, ছোটো শহরে অনেক সার্জেনের আয় কর্পোরেট হাসপাতালের অবেক সিনিয়র কনসাল্ট্যান্টকেই লজ্জা দিতে পারে।

প্রশ্নটা, কাজেই, আর্থিক ক্ষতির নয়।

প্রশ্নটা পরিকাঠামোর, ব্যক্তিগত স্বাচ্ছন্দ্যের।

এবার ধরুন, একটি সবদিক থেকে পিছিয়ে থাকা জায়গার হাসপাতালটি হঠাৎ করে একেবারে আন্তর্জাতিক মানের হয়ে উঠবে, এমন তো নয়। হাসপাতালটিকে উন্নত করার পাশাপাশি জায়গাটারও উন্নতি দরকার। যেমন, ভালো স্কুলকলেজ, থাকার স্বাচ্ছন্দ্য, যাতায়াতের সুযোগসুবিধে ইত্যাদি ইত্যাদি।

তা অমিতাভবাবু যখন আর্থিক ইন্সেন্টিভের সর্বময় ক্ষমতায় বিশ্বাস রাখেন, তখন তিনি নিশ্চয়ই চুঁইয়ে আসা বিকাশের তত্ত্বেও আস্থাবান।

শুধু সরকারের মুখাপেক্ষী থাকলে চলবে?

আসুন না, বেসরকারী কোম্পানীরাও তাঁদের অফিস একটু কলকাতার বাইরে শুরু করুন। যেমন ধরুন, আইটি সেক্টর। তাঁদের কাজ তো বিশ্বব্যাপী। অফিস পুরুলিয়ায় হলে অসুবিধে তো কিছু নেই। বা, আনন্দবাজারসহ অন্যান্য সংবাদপত্রের অফিস। চাঁদনি চকের মতো ঘিঞ্জি জায়গায় পার্কিং-এর চাপ ইত্যকার অসুবিধের কথা ভাবতে হবে না, ধরুন, রামপুরহাটের একটু বাইরে অফিসটা শিফট করলে।

ভেবে দেখুন না একবার।

বড়ো বড়ো অফিস থাকলে, জায়গাটারও উন্নতি হবে। ডাক্তারবাবুরাও যেতে গাঁইগুঁই করবেন না। সরকারকেও বন্ডে বেঁধে ডাক্তার পাঠাতে হবে না।

আপনারা সবাই ভাবুন। অমিতাভবাবু আপনিও।