বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০০৯

পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচনের প্রেক্ষিত ও আমাদের কর্তব্য ~ নিরুপম সেন



আসন্ন লোকসভা নির্বাচন, এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগ্রাম। দেশ ও রাজ্যের সামগ্রিক বিষয়গুলি বিশ্লেষণের প্রেক্ষিতেই বামফ্রন্ট নির্দিষ্ট স্লোগানকে সামনে রেখে এই সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছে।

 ৫০ শতাংশের বেশি মানুষের ধারাবাহিক সমর্থন বামফ্রন্টের প্রতি

বিগত কয়েক দশক বামফ্রন্ট পশ্চিমবঙ্গে সরকার পরিচালনা করছে। এই সময়কালে বহুবার বিবিধ আক্রমণের মুখোমুখি হয়েছে বামফ্রন্ট। বামফ্রন্টের নেতা-কর্মীরা অপরিসীম ধৈর্য, অধ্যাবসায়, বীরত্ব এবং অসীম সাহসিকতার সঙ্গে সেই আক্রমণকে মোকাবিলা করার মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষের ব্যাপকতর অংশের সমর্থনকে বামফ্রন্টের পক্ষে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছেন। ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে একটি অঙ্গরাজ্যে একাদিক্রমে প্রায় ৫০ শতাংশ অথবা তার বেশি জনসমর্থন নিয়ে এভাবে সরকার পরিচালনার অধিকার আর কোন রাজ্যে, অন্য কোন রাজনৈতিক দল বা ফ্রন্টকে জনগণ দেয়নি। শুধু তাই নয়, পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকার এবং বামফ্রন্টের দলগুলি মানুষের চেতনাকে এমন একটি পর্যায়ে উন্নীত করতে পেরেছে, যে কারণে মানুষের ভোটদানের অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও আমাদের রাজ্য, যে-কোন রাজ্যের তুলনায় অনেক এগিয়ে।

রাজনৈতিক, গণতান্ত্রিক চেতনার বিকাশের ফলেই এই উত্তরণ। আমাদের রাজ্যে যে-কোন নির্বাচনেই ৮০ শতাংশের নিচে ভোটদানের হার থাকে না। এ-রাজ্যে মোট ভোটারের কখনো ৮৫ শতাংশ, কখনো ৯০ শতাংশ, এমনকি ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত মানুষ স্ব-স্ব ভোটাধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। এই যে বিপুল সংখ্যক মানুষ তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তার ৫০ শতাংশ বা তার বেশি শতাংশ মানুষের সমর্থনে বামফ্রন্ট এ-রাজ্যে বিগত ৩২ বছর ধরে বিভিন্ন নির্বাচনী সংগ্রামে জয়লাভ করে আসছে। এমনকি বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনেও। যে নির্বাচনকে ঘিরে সারা রাজ্যে, সারা দেশজুড়ে এমন প্রচার তীব্রভাবে তোলা হয়েছে যে, পশ্চিমবাংলার বামফ্রন্ট সরকার গণভিত্তি হারিয়েছে। পঞ্চায়েত নির্বাচনের আগে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সমস্তরকমভাবে তীব্র আক্রমণ নামিয়ে আনা হয়, তীব্র কুৎসা, তীব্র অপপ্রচার। বামফ্রন্টের মধ্যেও কিছুটা অনৈক্যের বাতাবরণ সৃষ্টি হয়। এইরকম তীব্র আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়েও মানুষ যেমন রেকর্ড হারে ভোট দিয়েছেন, তেমনই প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশের বেশি ভোট বামফ্রন্টের অনুকূলেই এসেছে।

 বামফ্রন্ট থেকে গরিব মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে হীন, ভয়ঙ্কর, বহুমুখী অপপ্রচার

এতো বহুমুখী আক্রমণ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আগে কখনও সংগঠিত হয়নি। আগেও বহু আক্রমণের মুখোমুখি সি পি আই (এম) তথা বামফ্রন্ট হয়েছে। শারীরিকভাবে আমাদের নিশ্চিহ্নকরণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই সময়কালে যেভাবে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে আক্রমণগুলি নামিয়ে আনা হয়েছে ও হচ্ছে, সেই আক্রমণের মূল লক্ষ্য হলো বামফ্রন্ট এবং তার নেতৃত্বে যেহেতু সি পি আই (এম), সুতরাং সি পি আই (এম) থেকে গরিব মানুষকে বিচ্ছিন্ন করা। এবং এর জন্য সমস্তরকম হীন ও ঘৃণ্য কৌশল, সমস্তরকম মিথ্যাচার অবলম্বন করা হচ্ছে।

শুধু বামফ্রন্টের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে এই কাজ করা হচ্ছে তাই নয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মিথ্যাচার, হীন-ঘৃণ্য কৌশল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য আমাদের রাজ্যের প্রচার মাধ্যমগুলির একটি বড় অংশ বেনজিরভাবে নেমে পড়েছে। এবং সে প্রচার দেশজুড়ে, পৃথিবীজুড়ে করা হচ্ছে। এমনকি আগে কখনও ঘটেনি। এইরকম এক ভয়ঙ্কর আক্রমণের মুখে দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট এই নির্বাচনী সংগ্রামকে পরিচালনা করছে।

 এই হীন প্রচার দোদুল্যমান একটা অংশকে কিছুটা হলেও প্রভাবিত করছে

পঞ্চায়েত নির্বাচনের পরে আমাদের রাজ্যে উপনির্বাচন হয়েছে। তাতে মিশ্র ফলাফল হয়েছে। কিন্তু এতদ্‌সত্ত্বেও এমনভাবে প্রচার করা হয়েছে যে, ‘বামফ্রন্টের বড় বিপর্যয় হয়েছে’। এরমধ্যে, পুরুলিয়ার পারা বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে বিগত নির্বাচনে বামফ্রন্টের পক্ষে যে সমর্থন ছিলো তার থেকে এবার সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা ঠিক যে, নন্দীগ্রামে আমরা পরাজিত হয়েছি। দক্ষিণ ২৪ পরগণার বিষ্ণুপুর পশ্চিমে আমাদের পরাজয় ঘটেছে। ২০০৬-এর নির্বাচনে বামফ্রন্টের পক্ষে এই আসনে ছিল ৪৪ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস ও তৃণমূলের যুক্ত ভোট ছিল ৫২ শতাংশের কিছু বেশি। উপনির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফল থেকে একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, কিছু মানুষকে ওরা আমাদের দিক থেকে সরিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছে। একটা দোদুল্যমান অংশ যাঁরা গত নির্বাচনে আমাদের সমর্থন করেছিলেন, তাঁদের একটা অংশ বর্তমানের যে ঘটনাবলী এবং তার ভিত্তিতে যে তীব্র হীন অপপ্রচার, তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন এবং বামফ্রন্টের বিপক্ষে গেছেন। এটাকে নিয়েও তীব্র প্রচার হচ্ছে যে, বামফ্রন্টের ভিত টলে গেছে।

 সমস্ত ধ্বংসাত্মক শক্তি বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে একজোট হয়েছে

সারা রাজ্য জুড়ে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে অতিদক্ষিণ থেকে অতিবাম—সমস্ত শক্তিকে জোটবদ্ধ করার এক ভয়ঙ্কর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এই সময়কালের মধ্যে যে যে আন্দোলন সংগঠিত হয়েছে, সে সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে, নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে, লালগড়ের ক্ষেত্রে, গোর্খাল্যান্ডের প্রশ্নে, গ্রেটার কোচবিহারের প্রশ্নে—যে-কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী, বিভেদকামী, ধ্বংসাত্মক আন্দোলন—সমস্ত আন্দোলনেই বামফ্রন্টের বিরোধী শক্তি যুক্ত। কোথাও পরোক্ষভাবে মদত, কোথাও প্রত্যক্ষ মদত। এই সামগ্রিক পরিস্থিতির পটভূমিতে দাঁড়িয়েই আমরা এই নির্বাচনী সংগ্রামে শামিল।


 বিরোধীদের প্রচারে অনুপস্থিত রাজনীতি, শুধুই তীব্র ভিত্তিহীন কুৎসা, অগ্রগতির অন্ধ বিরোধিতা

এবারে বিরোধীদের প্রচারের ধরণটা এমন যে, যেখানে রাজনীতি অনুপস্থিত। তাদের প্রচারের একমাত্র অভিমুখ হলো, বামফ্রন্ট এবং তার নেতৃত্বে থাকা সি পি আই (এম)-র বিরুদ্ধে কুৎসা। কোন নীতিগত প্রশ্নে আক্রমণ নয়, সে সর্বভারতীয় প্রশ্নে হোক বা রাজ্যের প্রশ্নে হোক। এদের কোন বিকল্প কর্মসূচী নেই। এ রাজ্যে বামফ্রন্ট যা কিছু করবে, ওদের তারই বিরোধিতা করতে হবে এবং সমস্ত আক্রমণ বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীভূত করতে হবে। বিরোধী শক্তি, ধ্বংসাত্মক শক্তি বামফ্রন্টের সমস্তরকম উন্নয়নমূলক পদক্ষেপের অদ্ভুতভাবে বিরোধিতা করছে, যার পিছনে কোন যুক্তি কাজ করে না।


কলকাতাতে ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো করিডরের শিলান্যাস হলো। সে সম্পর্কে বিরোধী নেত্রী বললেন, ‘‘একটা শহরে আবার ক’টা মেট্রো হয়! এসব ধাপ্পা।’’ এটা যে একজন নেতা বা নেত্রী বলতে পারেন এটাই আশ্চর্যের! একটা শহরে যে একাধিক রেললাইন হতে পারে এবং সেটাই যে পৃথিবীর বেশিরভাগ বড় শহরে আছে এটাও তাঁর অজানা! অদ্ভুত কথা।


সমস্ত বিষয়ে ভিত্তিহীনভাবে বামফ্রন্টকে আক্রমণ করতে হবে এটাই বিরোধীদের মূল লক্ষ্য! কংগ্রেস একদিকে বলছে উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হবে না, আর যিনি উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি বাধা দিচ্ছেন তাঁর সঙ্গেই নির্বাচনী আঁতাত করছে।
জাতীয় কংগ্রেস একথা বলে যে, সারা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তারা নাকি বদ্ধপরিকর। কোথায় গেল তাদের নীতি? কোথায় গেল তাদের আদর্শ? আমরা দেখলাম, সিঙ্গুরের টাটা মোটরসের জন্য যে সর্বদলীয় সভা হলো, প্রদেশ কংগ্রেসের তৎকালীন সভাপতি প্রিয়রঞ্জন দাশমুন্সীর দাবি মতো এ-সভা ডাকা হয়, সেই সভাতে কংগ্রেস গিয়ে তৃণমূলের পক্ষে বক্তব্য রেখে এলো—শিল্পায়নের বিরুদ্ধে, উন্নয়নের বিরুদ্ধে। এরা আবার উন্নয়নের কথা বলে! এই কংগ্রেস, তীব্র উন্নয়নবিরোধী, প্রগতির বিরোধী, অগ্রগতির বিরোধী, তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে ওরা এখন নীতি-নৈতিকতাহীন নির্বাচনী জোট করেছে।


 যুক্তি-আদর্শহীন একটি রাজনৈতিক দলকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সামনে আনা হচ্ছে


যুক্তিহীন, পুরোপুরি বাস্তবতাবর্জিত, কোন রাজনৈতিক মতবাদের অস্তিত্ব নেই, মস্তিষ্কের কোন স্থিরতা নেই, এইরকম এক নেত্রী ও এইরকম একটা দলকে সামনে নিয়ে আসার সবরকম চেষ্টা হচ্ছে, বামফ্রন্টের বিরেধিতায়। এমন একটা দিন নেই যেদিন বামফ্রন্টের কোন নেতা বা কর্মী খুন হচ্ছেন না। গ্রামাঞ্চলে গরিব মানুষের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। আদিবাসী নেতা-কর্মীদের ওপর, তাঁদের পরিবারের ওপর আক্রমণ হচ্ছে, গ্রামের গরিব কৃষক পরিবারের ওপর আক্রমণ হচ্ছে। এসমস্ত নারকীয়, নৃশংস আক্রমণ, খুনের ঘটনা সংবাদমাধ্যম সামনে আনছে না। একান্তই প্রচার করতে হলে অত্যন্ত গুরুত্বহীনভাবে প্রচার করছে কিংবা বিকৃতভাবে প্রচার করছে, মিথ্যার মোড়কে প্রচার করছে। মাইন বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রীকে খুনের চেষ্টা—কোন বিরোধী দলের পক্ষ থেকে সৌজন্যের খাতিরেও কোনো উদ্বেগ প্রকাশ করা হলো না। কিন্তু দুষ্কৃতীদের খোঁজে তল্লাশি চালানোর বিরুদ্ধে সকলে একযোগে পথে নেমে পড়লেন!

বামফ্রন্টের কর্মী-নেতারা খুন হলে তাঁদের আত্মীয়-পরিজন গ্রামের মানুষ শোকাহত হয় না? কান্নায় ভেঙে পড়ে না? সন্তানরা বেদনায় হাহাকার করে না? বাড়ি পুড়িয়ে দিয়ে তাঁদের নিঃস্ব করলে কারো কষ্ট হয় না? এমন এক একপেশে প্রচার করা হচ্ছে যে, বামফ্রন্টের কর্মী-নেতা, সি পি আই (এম)-র নেতা-কর্মীদের খুন হওয়াটাই স্বাভাবিক, এটা খবরের কোন বিষয়ই নয়। কেন এই আক্রমণ? এ কি কেবল সি পি আই(এম)’র বিরুদ্ধে? এ বিষয়টিই মানুষের উপলব্ধিতে আনতে হবে।


 কোন নীতিতে দেশ চলবে তা নির্ধারণের জন্যই লোকসভা নির্বাচন

লোকসভা নির্বাচন কোন স্থানীয় ইস্যুতে হয় না। সামগ্রিকভাবে দেশ কোন পথ ধরে চলবে, কোন নীতিতে দেশ পরিচালিত হবে তারই লক্ষ্যে এই নির্বাচন। যে পথে এই দেশকে গত পাঁচ বছর ধরে চালানো হয়েছে, সেই পথেই দেশকে চলতে দেওয়া হবে কি হবে না—এই প্রশ্নেই এই নির্বাচন। গত লোকসভা নির্বাচনের পরে ভারতের রাজনীতিতে যে শক্তির বিন্যাস ঘটেছিল তাতে বামপন্থীরা বর্ধিত ভূমিকা পালন করতে পেরেছে, যার মূল উৎস ছিল পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা ও কেরালায় বামপন্থীদের শক্তিবৃদ্ধি। আমরা এমন একটা শক্তি অর্জন করেছিলাম যা কেন্দ্রে নীতি গ্রহণের প্রশ্নে বামপন্থীদের হস্তক্ষেপ করার একটা সম্ভাবনা, একটা সুযোগ করে দিয়েছিল। এবং গোটা ভারতের রাজনীতিতে এই প্রথম, বামপন্থীদের ভূমিকার কারণেই অর্থনৈতিক মত ও পথকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল। এন ডি এ এবং তারপরে ইউ পি এ সরকারের গৃহীত নীতিগুলির জনবিরোধী, ভয়াবহ চেহারা ও ভয়াবহ পরিণতির চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরে তার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বামপন্থীরা এই সময়কালের মধ্যে একটা ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে। ভারতের রাজনীতিতে বামপন্থীদের এই অবদানের দিকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর এই অবদানের জন্যই কেন্দ্রীয় সরকার জনবিরোধী নীতিগুলির বাস্তবায়নে পুরোপুরি সফল হলে যে ভয়ানক বিপর্যয় ঘটতে পারতো, তার থেকে ভারতের মানুষকে কিছুটা পরিমাণে হলেও রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে। বামপন্থীদের এই অন্যতম প্রধান ভূমিকার কথা মানুষের উপলব্ধির মধ্যে নিয়ে যেতে হবে। বামপন্থীদের এই ভূমিকার কারণেই এবং যেহেতু পশ্চিমবঙ্গ বামপন্থীদের সবচেয়ে শক্তিশালী ঘাঁটি, সেহেতু এ-রাজ্যের ওপর, বামফ্রন্ট সরকারের ওপর সমস্ত আক্রমণ শাণিত করে বামশক্তিকে দুর্বল করার চেষ্টা চলছে। যাতে সারা দেশজুড়ে জনবিরোধী, দেশবিরোধী নীতিগুলি অবাধে কার্যকরী করতে পারা যায়।


 এ-রাজ্যসহ সারাদেশে বামপন্থীরা এ সময়কালে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছে


বর্তমান সময়ে আমরা যখন বলছি যে, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিই প্রধান লক্ষ্য, তখন কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত নীতিতে কর্মসংস্থান হ্রাসই হয়ে দাঁড়ালো মূল লক্ষ্য। পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার দুটি কাজ করছে, এক : সর্বভারতীয় প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির বিরুদ্ধে লড়াই, মতাদর্শগত লড়াই, অর্থনৈতিক নীতিকে পরিবর্তনের লড়াই ; আর দুই : এরকম একটা অবস্থায় দাঁড়িয়ে যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে কর্মসংস্থান হ্রাস ও কর্মচ্যুতি ঘটছে তার বিপ্রতীপে এ-রাজ্যে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লড়াই জারি। এ-রাজ্যে যাতে আমরা এই বিকল্প পথে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি না ঘটাতে পারি তার জন্যই গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে, নানানভাবে আক্রমণ নামিয়ে আনা হচ্ছে।

আমরা বারংবার বলি যে, বেশিরভাগ মানুষের আয় যদি বৃদ্ধি না পায় তাহলে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত হবে না। আর অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত না হলে দেশীয় শিল্প তার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে না। অন্য দেশের ওপর তাকে নির্ভর করতে হবে। সুতরাং এমন নীতি গ্রহণ করতে হবে, যে-নীতি দেশের বেশিরভাগ মানুষের আয় বৃদ্ধিতে সাহায্য করবে। অভ্যন্তরীণ বাজারকে প্রসারিত করবে। যার ওপরে ভিত্তি করে এখানে শিল্প গড়ে উঠবে, হাজার-হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হবে। ওরা এরই বিরুদ্ধে যাবতীয় নীতি গ্রহণ করছে।


 কেন্দ্রীয় সরকার গৃহীত উদার অর্থনীতির ফলেই আজ তীব্র সঙ্কট

১৯৯১ সালে কেন্দ্রে কংগ্রেসের নরসিংহ রাও-এর সরকার, যে সরকারে অর্থমন্ত্রী ছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, নয়া উদার অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণ করার পর থেকে বিগত ১৫-১৬ বছর ধরে দেশে তা প্রয়োগ হয়ে চলেছে। তা যে এরকম একটা সর্বনাশা পথে যেতে বাধ্য, যা আমরা বামপন্থীরা বারবার বলেছিলাম, তীব্র প্রতিবাদে শামিল হয়েছিলাম—তা যে কতখানি সঠিক তা আজকে মানুষ নিজের অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারছেন। বর্তমানে উদার অর্থনৈতিক নীতিতে বিশ্বজোড়া সঙ্কট। আমেরিকার লেম্যান ব্রাদার্স-এর মতো নামকরা ব্যাঙ্ক এবং আরও অনেক ব্যাঙ্কে রাতারাতি লালবাতি জ্বলে গেল। ব্যাঙ্ক ফেল করার প্রধান কারণ হলো, ব্যাঙ্ক যাদের টাকা ধার দিয়েছে, তারা সে টাকা শোধ করতে পারেনি বা করেনি। ব্যাঙ্কের হাতে যে বিপুল টাকা জমেছিল সে টাকা ব্যাঙ্ক বেপরোয়াভাবে ঋণ দিয়েছে। তাড়াতাড়ি বেশি মুনাফার লক্ষ্যে মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের টাকা ফাটকাবাজিতে বিনিয়োগ করেছে। বেশিরভাগ মানুষ যেহেতু গরিব, বাজারের বাইরে তাই অল্প সংখ্যক মানুষ, যারা ধনী, তাদের ভোগের চাহিদা আরও বাড়িয়ে একটা কৃত্রিম বাজার তৈরি করার লক্ষ্যে ঋণ দেওয়া, আর এর মধ্যে দিয়ে ব্যাঙ্কের মুনাফা বৃদ্ধি করার চেষ্টা মানুষকে বেশি বেশি করে ঋণ নিতে উৎসাহিত করা। ধার করে ভোগ করার নীতি। উদার অর্থনৈতিক নীতির মূল কথাই হলো, ব্যাঙ্কগুলি থেকে সরকারী নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়া এবং ব্যাঙ্কের খুশিমতো তাকে ব্যবসা করতে দেওয়া। সাধারণভাবে আমরা জানি, সাধারণ মানুষের টাকা ব্যাঙ্ক জমা রাখে এবং কোনো উদ্যোগে—চাষের কাজে, শিল্পের কাজে, অন্য কাজে ধার দিয়ে সে টাকা খাটায়। আমানতকারীকে যে সুদ দেওয়া হয় ঋণগ্রহীতাকে তার থেকে বেশি সুদ ব্যাঙ্ককে দিতে হয়— এভাবেই ব্যাঙ্ক ব্যবসা করে। সুতরাং ব্যাঙ্কের টাকা বিনিয়োগ হবে উৎপাদনে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম।


কিন্তু উদার অর্থনৈতিক নীতিতে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ব্যবহার করে উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদিত সামগ্রী কেনার মানুষের সংখ্যা কমছে। যেভাবে অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারিত হওয়া প্রয়োজন তা হয়নি। ফলে নতুন প্রযুক্তিতে বিপুল পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগে যে উৎপাদন তা কেনার মানুষের সংখ্যা সীমিত। ফলে সম্পদের কেন্দ্রীভবন হচ্ছে। সেজন্য কল-কারখানাতে বিনিয়োগ আর তেমন লাভজনক মনে করলো না ব্যাঙ্কগুলি। ফলে বেসরকারী ব্যাঙ্কগুলি রিয়েল এস্টেট তৈরিতে, গাড়ি কিনতে, ভোগ-সামগ্রী কিনতে ঋণ দিতে আরম্ভ করলো কম সুদে। গৃহনির্মাণের জন্য কম সুদে ব্যাপকভাবে ঋণ দেওয়া শুরু হওয়ার ফলে বাড়ি তৈরির উপাদানগুলির, জমির দামও বাড়তে আরম্ভ করলো। ফলে যারা রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা বা তার উপাদান তৈরির ব্যবসা করে তাদের শেয়ারের দাম বাড়তে লাগলো। এর ফলে কিছু কলকারখানাও গড়ে উঠতে শুরু করলো। প্রথম দিকে সবাই উৎসাহিত। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি শেয়ারের ব্যবসায় নেমে কৃত্রিম চাহিদা সৃষ্টি করে শেয়ারের দাম চড়িয়ে দিলো। শেয়ার, ঋণপত্র কেনাবেচার ব্যবসাই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলির মূল লক্ষ্য দাঁড়ালো, শিল্পে কলে-কারখানায় বিনিয়োগ নয়। এমন সময় দেখা গেল যারা ঋণ নিয়েছে তারা ঋণ শোধ করতে পারছে না। রাতারাতি ঋণ আদায়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি মর্টগেজ সম্পত্তি বিক্রি করতে বাজারে নেমে পড়লো। একসময় অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছালো যখন সবাই বিক্রেতা, ক্রেতা কেউ নেই। ফলে এই সমস্ত সম্পত্তির দাম হু হু করে পড়তে থাকলো। ফলে ব্যাঙ্ক যে টাকা খাটিয়েছিল তা জলে গেল। ঋণ আদায় করা অসম্ভব হয়ে গেল। ফলে ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হয়ে গেল। আর এইসব ব্যাঙ্ককে বাঁচানোর জন্য সরকার এগিয়ে এলো। কিন্তু এর ফলে অনৈতিক ক্ষেত্রে এক মারাত্মক প্রতিক্রিয়া হলো।


ব্যাঙ্ক দেউলিয়া হওয়ার কারণে কল-কারখানাগুলির হাতেও পুঁজি অসম্ভব হ্রাস পেলো, নতুন করে অর্থ পাওয়ারও উপায় নেই। অন্যদিকে বাজার সম্প্রসারিত না হওয়ার কারণে ক্রয়ক্ষমতা বাড়েনি। ফলে উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। বিশাল সংখ্যক শ্রমিক-কর্মচারী ছাঁটাইও শুরু হলো। তিনের দশকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে যে ধরণের অর্থনৈতিক সঙ্কট হয়েছিল বর্তমানের অর্থনৈতিক সঙ্কট তার থেকেও অনেক ব্যাপক ও গভীর। ১৯৯১-এর পর থেকে সারা পৃথিবীতে বেকারী যে ব্যাপক হারে বেড়েছে তা অতীতে কখনও ঘটেনি। আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল(আই এম এফ) হিসেব করে বলেছে, যে এই সময়কালে ৬.১ শতাংশ বেকারিত্ব বেড়েছে, অন্যদিকে সারা পৃথিবীতে মোট উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে।


২০০৭-এ যেখানে ১৭ কোটি ৯০ লক্ষ মানুষ কাজ হারায়, সেখানে ২০০৯ সালের শুরুতেই ২৩ কোটি মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আমাদের দেশেও এর প্রভাব মারাত্মক। কেন্দ্রীয় সরকার নয়া উদার অর্থনৈতিক নীতি কায়েম করার সময় বলেছিল দেশে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করা হবে বিদেশের বাজারে। সস্তায় পণ্য উৎপাদন এবং তা বিদেশের বাজারে বিক্রি করার জন্য আমদানি-রপ্তানির ওপর যে সমস্ত বিধিনিষেধ ছিল, সেসব শিথিল করে দিয়ে বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। এরজন্য বিপুল সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হলো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হলো, আমদানি শুল্ক ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেওয়া হলো। দেশের অর্থনীতিকে রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হলো।


আমরা, বামপন্থীরা তীব্রভাবে বলেছিলাম — দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সম্প্রসারিত না করতে পারলে দেশের অর্থনীতিতে ভয়াবহ সঙ্কট সৃষ্টি হবে। রপ্তানির ক্ষেত্রে আমাদের মতো অনুন্নত দেশগুলির মধ্যে অস্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা হবে, আর ধনতান্ত্রিক দেশগুলি আমাদের আরও শোষণের সুযোগ পাবে। কিন্তু উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলি যাতে আমাদের দেশ থেকে সস্তায় কাঁচামাল পায়, আর তাদের দেশের উৎপাদিত উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পণ্য বিক্রি করা সম্ভব হয়, তারজন্য এদেশের বাজার উন্মুক্ত করে দেওয়া হলো। অল্প কিছু মানুষ, যাদের কেনার ক্ষমতা আছে তাদের ভোগ-বিলাস পণ্যের চাহিদা বাড়ানোর উদগ্র প্রচার চালানো হলো।

ধনতন্ত্র সম্পর্কে কার্ল মার্কস বলেছেন, ‘‘প্রয়োজনের তালিকা ফাঁপিয়ে তুলে, অমানবিক, অস্বাভাবিক, কৃত্রিম, বহুরূপী, বিবেকবর্জিত ক্ষুধাকে প্রণোদিত করে ধনতন্ত্র।’’ এর থেকে সত্য কথা আজকের এই মুহূর্তে আর কিছু হতে পারে না।

সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী এই নীতিসমূহের তীব্র বিরোধিতায় একমাত্র বামপন্থীরাই

আমাদের দেশের সরকার চেয়েছিল যে, দেশের ব্যাঙ্ক, বীমাক্ষেত্রকে বিদেশী বড় বড় কোম্পানি যাতে কিনে নিতে পারে তার জন্য আইন সংশোধন করতে। আমরা, বামপন্থীরা সংসদে সেই আইন প্রণয়নে বাধা দিয়েছিলাম। কেননা এটা হলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থা বহুজাতিক সংস্থার কব্‌জায় চলে যাবে। আর সেই অর্থ নিয়ে সারা পৃথিবীজুড়ে ফাটকাবাজি খেলবে। এতে দেশের মানুষের ভয়াবহ সর্বনাশ হবে। আমরা এই অপপ্রয়াস প্রতিহত করেছি। সংবাদমাধ্যমে আমাদের ‘রক্ষণশীল’ বলে তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। আর এখন খোদ রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নর বলছেন, ‘‘যে সঙ্কটে সারা ধনতান্ত্রিক দুনিয়া পড়েছে তার ততখানি প্রভাব এখনও ভারতে আসেনি, তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো এই যে, ভারতের আর্থিক ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ এখনও অনেক শক্তিশালী।’’ আর এ-জন্য যাদের প্রধান অবদান তা হলো বামপন্থীদের।


কেন্দ্রীয় সরকারের অর্থনৈতিক নীতির তীব্র বিরোধিতা আমরা বামপন্থীরা করছি, দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষায়। পেট্রোপণ্যের দাম বৃদ্ধির বিরোধিতা করলাম আমরা। কেন্দ্রীয় সরকার বললো, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে। বলা হলো, তেলের চাহিদা জোগানের তুলনায় বেড়েছে বলে দাম বাড়ছে। আপাতভাবে মানুষ একথা সত্যি ভাবতে পারেন। কিন্তু আসল চিত্র কি? অপরিশোধিত তেলের দাম একসময় বাড়তে বাড়তে ব্যারেল প্রতি ১৫০ ডলারে গিয়ে দাঁড়ালো। বর্তমানে সেই দাম নেমে ৫০ ডলারের নিচে দাঁড়িয়েছে। সুতরাং চাহিদা বেড়েছে বলে তেলের দাম বেড়েছে, একথা ঠিক নয়। আসলে তেলের বড় বড় কোম্পানি তেলের দাম নিয়ে ফাটকাবাজির মাধ্যমে বাড়িয়ে দিয়েছিল। দাম যখন অনেক বাড়লো তখন মজুত তেল বাজারে বিক্রি করলো এবং তাতে বিপুল পরিমাণে মুনাফা অর্জন করলো। অর্থাৎ বেশি মুনাফার জন্য ফাটকাবাজি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিলো।
ঠিক একইভাবে খাদ্যপণ্যের দামও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। আন্তর্জাতিক বাজারে গমের দাম হু হু করে বেড়ে গেলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ বললেন, ‘‘চীন আর ভারতের মানুষ বেশি খাচ্ছে বলে দাম বেড়ে যাচ্ছে।’’ সেই সময় কেন্দ্রীয় সরকার আমাদের দেশের খাদ্যসঙ্কট মেটানোর জন্য, আমাদের দেশের চাষীদের কাছ থেকে যে দামে ধান বা গম কিনেছিলো তার থেকে বেশি দাম দিয়ে অস্ট্রেলিয়া থেকে গম আমদানি করেছিল। আসলে আমাদের দেশে কয়েকটি বড় বড় ব্যবসাদার ধান-চাল গমের বাজার কব্‌জা করেছিল। আর আজ চাষীরা উৎপাদিত কৃষিপণ্যের দাম নেই বলে মাথায় হাত দিয়ে বসেছে। আসলে গোটা পৃথিবীর অর্থনীতিকে ফাটকাবাজরা নিয়ন্ত্রণ করছে।


পুঁজি বিনিয়োগ হচ্ছে ফাটকাবাজিতে, উৎপাদনে নয়

বিদেশী কোম্পানিগুলি আমাদের দেশের শেয়ার মার্কেটে এভাবে ১৮ বিলিয়ন ডলার অর্থ ফাটকাবাজিতে লগ্নী করেছে। আমরা এর তীব্র আপত্তি করেছিলাম। বলেছিলাম, ফাটকাবাজিতে নয়, বিদেশী পুঁজিকে শিল্পে, উৎপাদনে বিনিয়োগ করতে হবে। ফরেন ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট-এর মূল অভিমুখ হওয়া দরকার এটাই। যা নতুন প্রযুক্তি নিয়ে আসবে, উন্নত শিল্প তৈরি করবে। ফলে দেশে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু ফাটকাবাজিতে খাটানোর জন্য পুঁজি আমদানির তীব্র বিরোধিতায় আমরা। আর কেন্দ্রীয় সরকার ফাটকাবাজিতে পুঁজি আসাকেই প্রাধান্য দিলো। এখন সেই বিদেশী পুঁজি হঠাৎ করে তাদের কেনা শেয়ারবাজারে ছেড়ে দেওয়ায় শেয়ারের দাম হু হু করে পড়ে গেছে। বহু কোম্পানি প্রায় ডকে ওঠার মতন অবস্থা। এবং এভাবেই গোটা দেশের অর্থনীতি আজ বিপর্যস্ত এবং এরই ভয়াবহ পরিণতি আমরা লক্ষ্য করছি।


আমাদের দেশের মতো এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও ভয়ঙ্কর বিপর্যয় নেমে এসেছে। কেননা এদেশগুলির অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের ৪৭ শতাংশ বিদেশে রপ্তানি হয়। বিদেশে রপ্তানি যখন মার খেয়েছে তখন দেশগুলির অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিও বিপর্যন্ত হয়েছে। এখন সমীক্ষায় বলা হচ্ছে, ভারতে নতুন কর্মসংস্থান তো দূরের কথা, কেন্দ্রীয় সরকারের এই নীতির কারণে এবছর ১ কোটি মানুষ কাজ হারাবেন। যদিও যতখানি সঙ্কট হওয়ার কথা ছিল ততটা হয়নি, কেননা বিপর্যয়ের অপপ্রয়াসের কিছুটা বামপন্থীরা রুখে দিতে পেরেছিল।
কেন্দ্রীয় সরকার চেয়েছিল যে, রাজ্য সরকারী, কেন্দ্রীয় সরকারী, আধা সরকারী কর্মচারী যারা পেনশন ভোগ করেন তাঁদের পুরো টাকাটাই বেসরকারী সংস্থাকে দিয়ে দিতে, পেনশন ফান্ড ম্যানেজ-এর নামে। এই টাকা তারা শেয়ার বাজারে খাটাতো। আমেরিকাতে এই ব্যবস্থা করাতে কয়েক লক্ষ মানুষের পেনশনের টাকা হাওয়া হয়ে গেছে। আমরা এই অপপ্রয়াস প্রতিহত করেছি।
ইউ পি এ সরকারের এই ভয়ঙ্কর সর্বনাশা নীতির বিরুদ্ধে একমাত্র আমরা, বামপন্থীরাই সংসদে ভিতরে ও বাইরে অবিরাম লড়াই করেছি। লড়াই করেছি সাধারণ মানুষের স্বার্থকে রক্ষা করার জন্যই।


শুধু অর্থনীতিই নয়, ক্ষতিকারক প্রভাব দেশের রাজনৈতিক অবস্থানেও

কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত নীতির কারণেই শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতিই নয়, রাজনীতিও প্রভাবিত। আই এম এফ, বিশ্ব ব্যাঙ্ক শুধুমাত্র অর্থনৈতিক নীতিই নির্ধারণের হাতিয়ার নয়, দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণেরও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভারতের মতো দেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করাও উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশের লক্ষ্য। ভারতের বাজারকে দখল করার উদ্দেশ্য হলো পুঁজিবাদী দেশের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করতে হবে। এবং এজন্য দেশের রাজনীতিকেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।


দীর্ঘদিন ধরে আমেরিকাতে পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরির যন্ত্রপাতির বাজার নেই। কারণ খোদ আমেরিকাতে বিগত ২৩ বছরে কোন পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। সুতরাং ঐ যন্ত্রাংশ বিক্রির জন্য আমাদের মতো দেশের বাজার তাদের চাই এবং পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র তৈরি করাতে পারলে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়ামও বিক্রি করা যাবে। এজন্যই পারমাণবিক চুক্তি। এজন্য কতকগুলি শর্ত আরোপ করা হলো। ভারতের বিদেশনীতি কেমন হবে, কোন দেশের সঙ্গে কেমন সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে ভারত, তার জন্য চুক্তি; কোনরকম পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা যাবে না, সমস্ত গবেষণাগারে আমেরিকা নজরদারি করতে পারবে ইত্যাদি। কেন্দ্রীয় সরকার বললো, আমাদের দেশে বিদ্যুৎ-এর দারুণ সঙ্কটের প্রেক্ষিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ না হলে চলবে না, সুতরাং ঐ চুক্তি করতেই হবে। ৬০ বছরেরও বেশি দেশ স্বাধীন হয়েছে, আজও দেশের সকল মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি। কে দায়ী? আমরা, বামপন্থীরা একথা বলিনি যে, পারমাণবিক বিদ্যুৎ চাই না। বলেছিলাম, আমাদের মতো গরিব দেশে এখনও পর্যন্ত যে পরিমাণ কয়লার ভাণ্ডার মজুত আছে, সেই মজুত ভাণ্ডারকে নিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির বিপুল সুযোগ আছে। সে বিদ্যুৎ-এর দাম হবে সস্তা। আর ইতোমধ্যে আমাদের দেশে যে কাঁচামাল পাওয়া যায়, থোরিয়াম, গবেষণার মাধ্যমে তাকে ভিত্তি করে পরমাণু বিদ্যুৎ তৈরির পথে যেতে পারবো। এই চুক্তি আসলে আমেরিকার বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক স্বার্থকে রক্ষা করার জন্য।

আমেরিকা তো এভাবেই ইরাককে ধ্বংস করেছে। ইরানেও একই কাজ করছে। আফগানিস্তানে আগ্রাসন নামিয়ে এনেছে। আমাদের মতন বহু ধর্মাবলম্বী দেশে নিরপেক্ষতার আদর্শকে যেমন মেনে চলতে হবে, তেমনি এমন কোন পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক আঙিনায় নেওয়া উচিত হবে না যার দ্বারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মানসিকতা আহত হয়। আজ বিশ্বে মার্কিনী ভূমিকা সেই লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে, আর আমাদের দেশ তখন মার্কিনীদের রণনৈতিক মিত্র হতে চাইছে দেশের বৈদেশিক নীতির অভিমুখ মার্কিনীদের দিকে চালিত করা হচ্ছে। যারা মার্কিনী মদতে প্যালেস্তিনীয়দের উৎখাত আর জঘন্য হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে, ভারত সরকার সেই ইজরায়েলের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা বাড়াচ্ছে।

আজ সারাদেশে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ হচ্ছে। বহু সাধারণ মানুষ বিগত কয়েক বছরে এই আক্রমণে নিহত হয়েছেন। দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন মৌলবাদী শক্তি এই ধরণের ঘটনা ঘটাচ্ছে। একথা আজ ভাবার সময় এসেছে, আমাদের দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, কি বৈদেশিক ক্ষেত্রে, কি অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে, এই শক্তিকে উৎসাহিত করছে কিনা।

বামফ্রন্ট ও সংখ্যালঘু স্বার্থ


এখন পশ্চিমবঙ্গে আমাদের বিরুদ্ধে প্রচার করা হচ্ছে যে, বামফ্রন্ট সংখ্যালঘুদের স্বার্থ দেখে না। ভাবটা এই যে, সারা ভারতে সংখ্যালঘু মানুষ খুবই সুখে আর এরাজ্যে দারুণ অবহেলিত। সাচার কমিটির রিপোর্ট তো গোটা ভারতের প্রেক্ষিতে। সাচার কমিটিতে বলা আছে যে, গোটা ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ পশ্চাদ্পদ। এখানে একটি গুরুতর প্রশ্ন এই যে, দীর্ঘদিন ভারতে কোন দল শাসনক্ষমতায়? সে দল তো কংগ্রেস। কংগ্রেস আর তার থেকে জন্ম নেওয়া তৃণমূল বলুক যে, গোটা ভারতে এতদিন ধরে তারা সংখ্যালঘুদের জন্য কি করেছে?


ভারতের বামপন্থীরা ছাড়া আর কোনো রাজনৈতিক শক্তি নেই যারা ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শকে শুধু মুখে প্রচার করে না, বুকের রক্ত দিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রক্ষা করে। আমাদের রাজ্যে ৫০ শতাংশ মানুষ মুসলিম, তফসিলী জাতি ও আদিবাসী। এঁদের সিংহভাগই গ্রামের মানুষ। এঁরাই গ্রামের গরিব মানুষ। এরা এককালে ছিলেন জমিহারা। কেউ কেউ জমিদার-জোতদারদের লেঠেল। আজ গ্রামের সেই মানুষই রাজ্যের ভূমিসংস্কারের ফলে যে সবচেয়ে বেশি উপকৃত, এ-সত্য অস্বীকার করার কোন ক্ষেত্রই নেই। আজ গ্রামের ৮৪ শতাংশ জমি ক্ষুদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকের হাতে—একথার অর্থ হলো, এই ৮৪ শতাংশ জমির সিংহভাগ আছে মুসলিম, তফসিলী জাতি ও আদিবাসী মানুষের হাতে। এ বিষয়টি সাচার কমিটির রিপোর্টে প্রতিফলিত হয়নি।

আমরা আরও উন্নয়ন চাই। যেসব গ্রামে মুসলিম, তফসিলী জাতি, আদিবাসী মানুষ, পশ্চাদ্পদ মানুষ আছেন, সেখানে আরও উন্নয়ন করতে হবে। উন্নয়নের অর্থ হলো, সেই গ্রামে রাস্তা করতে হবে, স্কুল তৈরি করতে হবে, হাসপাতাল তৈরি করতে হবে; সেই এলাকাকে কেন্দ্র করে কলকারখানা গড়ে তুলতে হবে। আর কংগ্রেস-তৃণমূল তো এই উন্নয়নেরই বিরুদ্ধে। জমি যাবে তাই রাস্তা করা যাবে না, খাল কাটা যাবে না, কল-কারখানা স্কুল-কলেজ করা যাবে না, এমন কি বিদ্যুতের খুঁটিও পোতা যাবে না, এই দাবিতে বিক্ষোভ হচ্ছে।

লালগড়ে কিছু আদিবাসী মানুষকে ভুল বুঝিয়ে রাস্তা কাটানো হলো। তারমানে রাস্তা তো হয়েছে। সবচেয়ে পশ্চাদ্পদ এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার জন্য, উন্নয়নের গতিধারায় তাঁদের যুক্ত করার জন্য পিচের রাস্তা হয়েছিল। সেই রাস্তা কাটা হলো। সে রাস্তা দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আসছিল, আদিবাসী ডাক্তার ও নার্স তার মধ্যে ছিলেন। গোটা অ্যাম্বুলেন্সকে উড়িয়ে দেওয়া হলো, যাতে প্রত্যন্ত আদিবাসী এলাকায় আতঙ্কে কোন ডাক্তার বা নার্স আর চিকিৎসা করতে যেতে না পারেন। এরাই আবার বলছে, বামফ্রন্ট আদিবাসীদের জন্য কিছু করেনি। দাবি তোলা হয়েছে এলাকায় প্রশাসন, পুলিস কেউ থাকতে পারবে না—আর সেই দাবিকে সমর্থন জানানো হচ্ছে!

উন্নয়ন, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ওদের চোখে ‘অপরাধ’


বামফ্রন্ট সরকার জমি দিয়েছে গরিব কৃষককে। তার মধ্যে মুসলিম, তফসিলী জাতি, আদিবাসী মানুষ সবথেকে বেশি। আমরা পশ্চাদ্পদ এলাকা চিহ্নিত করে উন্নয়নের পরিকল্পনা করেছি। এজন্যই মুর্শিদাবাদে বিদ্যুৎ-কারখানা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে; সাগরদিঘিতে বিশাল কারখানা তৈরি হয়েছে; দক্ষিণ ২৪ পরগণার বুক চিরে প্রসারিত রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
আমরা শিল্পায়নে সঠিকভাবে উদ্যোগ নিয়েছি ব্যাপক কর্মসংস্থানের জন্য। হাজার হাজার মানুষের কাজ সৃষ্টির চেষ্টা করা কি অন্যায়? রাস্তা তৈরি করা, সম্প্রসারিত করা, গ্রামে গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া, নতুন নতুন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তৈরি করা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র তৈরি করা, যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত করা যদি ‘অপরাধ’ হয়, তাহলে সে ‘অপরাধ’ আমাদের করতে হবে। মানুষকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে, তাঁরা কোন্ পক্ষ অবলম্বন করবেন।

বক্রেশ্বরে ওরা বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানা তৈরিতে তীব্র বাধা দিয়েছিল। বামফ্রন্টের যুবরা এরজন্য রক্ত দিয়েছে। আজও ওরা বাধা দিচ্ছে, কারখানা করতে দেবো না বলছে। আর আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে উন্নয়নের স্বার্থে, ব্যাপক যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে কল-কারখানা করতেই হবে। মানুষকেই ঠিক করতে হবে যে, অসংখ্য যুবক-যুবতীর কর্মসংস্থানের জন্য শিল্পায়ন হবে, কি হবে না। দেশটা ফাটকাবাজদের হাতে তুলে দেওয়া হবে, না কি সঠিক নীতির রূপায়ণের ভিত্তিতে দেশের মানুষ নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবেন।

 সঙ্কটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা যাতে জাগ্রত না হয় সে-জন্য তৈরি করা হচ্ছে মানুষে মানুষে অনৈক্য

যদি বামপন্থীরা দুর্বল হয় তাহলে জনগণের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে, দেশের অগণিত বেকার যুবক-যুবতীদের স্বার্থে, গরিব মানুষের স্বার্থে যে লড়াই চলছে, তা শক্তিশালী হতে পারে না। স্বনির্ভর হয়ে এ-দেশ গড়ে ওঠার, ভারতের শিল্প বিকাশ, সারা বিশ্বে ভারতের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর যে লড়াই আমরা, বামপন্থীরা করছি, তা নির্ভর করছে বামপন্থীরা আরও বেশি শক্তি অর্জন করতে পারবে কিনা তার ওপর।


গোটা দেশকে একটা ভয়ঙ্কর বিপর্যয়ের পথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এবং যতো সঙ্কট বাড়ছে, মানুষ কাজ হারাচ্ছে, তত মানুষকে বিভেদের রাস্তায় নিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এ-এক ধরণের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। ক্রমবর্ধমান এই সঙ্কটের মোকাবিলা মানুষ করতে পারবে না, যদি নিজেদের মধ্যে অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হয়ে যায়, বিভক্ত হয়ে যায়।

মানুষের মধ্যে ধর্মকে কেন্দ্র করে বিভাজন তৈরি হচ্ছে, আদিবাসীদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে, আসামে ছোট ছোট উপজাতি গোষ্ঠী অন্তর্কলহে লিপ্ত। সবাই বলছে আলাদা রাজ্য চাই। আসামকে ভেঙে মণিপুর, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল হলো। সেখানে তারা শান্তিতে আছেন? অ-অসমীয়া মানুষ দলে দলে পশ্চিমবঙ্গে চলে আসছেন। কারণ তাদের কোন নিরাপত্তা নেই। বিহার ভেঙেছে, মধ্যপ্রদেশ ভেঙেছে—কি অবস্থা ঝাড়খণ্ডে, বিহারে, ছত্তিশগড়ে বসবাসকারী আদিবাসীদের। তারা কি স্বর্গরাজ্য বানিয়েছে? যে ঝাড়খণ্ডে কার্যত কোন সরকারই নেই—অরাজকতাই সেখানে আইন, তার সঙ্গে পশ্চিমবাংলার তিন জেলাকে যুক্ত করার দাবি তোলা হচ্ছে। এ কি আদিবাসীদের স্বার্থে ? আজ কংগ্রেস-তৃণমূল তাদেরই সঙ্গে জোট বেঁধেছে। মহারাষ্ট্রে বাঙালী, বিহারীদের তাড়ানোর স্লোগান তোলা হয়েছে, আক্রমণ করা হচ্ছে। এসব আমরা এ-রাজ্যে হতে দিতে পারি না।

 এরাজ্যে এক ভয়ঙ্কর শক্তিকে সামনে আনা হচ্ছে


এরাজ্যে যে শক্তি এর পক্ষে, তার ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আজ সমস্ত প্রতিক্রিয়ার শক্তি একত্রিত হয়েছে। মানুষের নিরাপত্তা থাকলে তবে তো উন্নয়ন! মানুষের ঐক্যই তো উন্নয়নের ভিত্তি। মানুষকে বিভাজিত করলে, মানুষে মানুষে অবিশ্বাস, অনৈক্য সৃষ্টি করলে উন্নয়ন হতে পারে না। এক ভয়ঙ্কর চক্রান্ত চলছে গোটা রাজ্য জুড়ে। গোর্খাদের বিচ্ছিন্ন করা, রাজবংশীদের বিচ্ছিন্নতাবাদী পথে নিয়ে যাওয়া, আদিবাসী বিকাশ মঞ্চ করে তাদের আলাদা করা, রাজ্যটাকে ভেঙে আরও টুকরো টুকরো করা। এই বিভেদ কি আমরা চাই!

বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে এই সর্বনাশা শক্তিকে এরাজ্যে সামনে আনা হচ্ছে। যে শক্তি মাওবাদীদের সঙ্গে, নকশালদের সঙ্গে, সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে, মুসলিম মৌলবাদীদের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে। যে শক্তি অন্যদিকে কংগ্রেসের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছে।

 গরিব মানুষের ঐক্যকে ভেঙে, বামফ্রন্ট থেকে দূরে সরানোর অবিরাম চক্রান্ত

এবারের লড়াই অত্যন্ত কঠিন, কেন না রাজনীতিটা অত্যন্ত জটিল হয়ে গেছে। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার একটা বিকল্প অভিমুখে, জনগণের স্বার্থকে একমাত্র বিবেচ্য হিসেবে গণ্য করে সমস্ত কর্মসূচী রূপায়িত ও বাস্তবায়িত করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকারের গৃহীত সাধারণ মানুষের স্বার্থবিরোধী নীতিগুলির কুপ্রভাব প্রতিনিয়ত এ-রাজ্যের ওপরও পড়ছে। যেমন, বি পি এল-এর তালিকা তৈরি সম্পর্কে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতি, যা নিয়ে গ্রামের মানুষের মধ্যে অনেক ক্ষোভ আছে। আমরা এটার বিরুদ্ধে, কিন্তু আমরা বাধ্য হচ্ছি এটা করতে। কেন্দ্রীয় সরকারকে আমরা বারবার বলেছি যে, যে দেশের ৭৭ ভাগ মানুষের আয় দৈনিক ২০ টাকারও কম সে-দেশে কোন্ মানুষ গরিব, আর কোন্ মানুষ ধনী, তা বাছতে যাওয়া অবাস্তব পরিকল্পনা। আমাদের দাবি, সমস্ত মানুষকেই সর্বজনীন গণবণ্টন ব্যবস্থার সুবিধায় আনতে হবে। কিন্তু এভাবেই গরিব মানুষকে ওরা বিভাজিত করতে চাইছে। অন্ত্যোদয় যোজনা, অন্নপূর্ণা যোজনা, ইন্দিরা আবাস যোজনা, আম্বেদকর যোজনা— এইসব ক্ষেত্রেও কোন না কোন ব্যক্তি বা পরিবারকে চিহ্নিত করতে হয় যে সুবিধাটা পাবে। এক গ্রামে হয়তো এমন ৫০টি পরিবার আছে, যাদের সবাইকেই এ সুবিধা দেওয়া উচিত। অথচ কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়মে দিতে হবে ৫ জনকে। ৫টি পরিবারকে চিহ্নিত করার ফলে ৪৫টি পরিবার বিরূপ হচ্ছে। যদি খুব বিবেচনাপ্রসূতও এই চিহ্নিতকরণ হয়, তবুও এ ক্ষোভ হবেই। এটাই তো চাইছে কেন্দ্রীয় সরকার। আমরা এই নীতির বিরোধী। একটি অঙ্গরাজ্যের সরকার হিসেবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই প্রকল্প এখানেও রূপায়িত করতে হবে, না হলে যেটুকু টাকা গরিব মানুষের কাজে লাগতো তাও ফেরত যাবে। আমরা বারবার বলেছি, প্রাপক নির্বাচনের কাজটি যথাযথভাবে করতে হবে। তবুও কিছু ত্রুটি থেকে যাচ্ছে একাজে। এর সুযোগই বিরোধীরা গ্রহণ করছে। এরকম একটা নির্বাচনী লড়াইয়ে এই বিচ্ছিন্ন বিষয়গুলিকেই সামনে এনে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।


মূল যে বিষয়, মানুষের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, আয় বৃদ্ধি, কেন্দ্রীয় সরকার তার জন্য কোন চেষ্টা করছে না। বামপন্থীদের চাপের জন্যই ইউ পি এ সরকার ১০০ দিনের কাজের ভিত্তিতে গ্রামাঞ্চলে কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা প্রকল্প চালু করতে বাধ্য হয়েছিলো।

 সন্ত্রাসের শক্তি কারা ?

এই সময়কালের মধ্যে আর একটি বিষয় বিবেচনায় রাখা দরকার। অনেক জায়গায় দেখা যাচ্ছে এই প্রতিক্রিয়াশীল, ধ্বংসাত্মক শক্তি কোথাও কোথাও খানিকটা মাথা তুলতে পেরেছে, সক্রিয় হয়েছে। তার অর্থ এই নয় যে, এরা সব নতুন করে তৈরি হচ্ছে। এরা ছিলো, সুপ্ত ছিলো। গত ৩২ বছরে প্রতিটি ভোটেই ৩৫-৪০ শতাংশ মানুষ তো বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে ৪-৫ শতাংশ মানুষ আজকের এই পরিস্থিতিতে নৈরাজ্য সৃষ্টিতে প্ররোচনা দিচ্ছে নানানভাবে। এই অংশকে নানানভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে, চাঙ্গা করা হচ্ছে। তাদের যেকোন অপরাধকে সমর্থন করা হচ্ছে। এটাই সমাজবিরোধী শক্তি। এর পাশাপাশি বামফ্রন্টের কর্মীদের কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতির কারণে গরিব মানুষের একাংশের মধ্যে যে বঞ্চনার মনোভাব আছে তাকেও বামফ্রন্ট বি‍‌রোধিতায় ব্যবহার করা হচ্ছে।

উন্নয়নের ধর্মই হলো যে, তা মানুষের চাহিদার ক্রমাগত বৃদ্ধি ঘটায়। উন্নয়নের কোন শেষ নেই। এই পথেই আজ গরিব মানুষের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই নানান চাহিদা বেড়েছে —এটাই বামপন্থীদের বড় পাওনা। মানুষের এই চাহিদাই তো আমরা বাড়াতে চেয়েছি এবং তা পেরেছি। এটাই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। সেই শর্তের ভিত্তিতেই বিগত ৩২ বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে গরিব মানুষকে উন্নয়নের প্রবাহে নিয়ে আসা গেছে, আত্মমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা গেছে। এরই ফলে মানুষের মধ্যে আরও চাহিদা বেড়েছে। বিরোধী দল মানুষের এই আত্মমর্যাদাকেই ধ্বংস করতে চায়। গোটা সমাজকে মেরুদণ্ডহীন, স্তাবকে পরিণত করতে চায়। এখান থেকেই ফ্যাসিবাদের উদ্ভব হয়। যে দলে কোন অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নেই, কোন সদস্যের কোন কথা বলার অধিকার নেই, সেই দল কখনও কোন দেশে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা দিতে পারে না। যে গণতন্ত্রকে বামফ্রন্ট প্রসারিত করেছে, বিকশিত করেছে, গরিব মানুষের যে অধিকারবোধ জাগ্রত হয়েছে তার মধ্যে দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের নীতিসমূহের বিরুদ্ধে যে অবিরাম লড়াই জারি আছে, তাকে দমন করার জন্যই বামফ্রন্টের শক্তি খর্ব করে এক ভয়ঙ্কর শক্তির ক্ষমতা বৃদ্ধি করার চেষ্টা চলছে। তবেই শাসক শ্রেণীর কার্যসিদ্ধ হবে। আর সেই লক্ষ্যেই এই নির্বাচনে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে সমস্ত রকম আক্রমণ শাণিত করা হচ্ছে।
আমাদের রাজ্যে অনেক সমস্যা আছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে একমাত্র বামফ্রন্টই পেরেছে এবং পারে গরিব মানুষের ঐক্যকে রক্ষা করে ক্রমে সেই লক্ষ্যে সংগ্রাম পরিচালিত করতে, অগ্রগতির পথে এগিয়ে যেতে এবং যারা বিভেদের রাজনীতি করছে তাদের পরাজিত করতে।

 এ-নির্বাচনে আমাদের মূল লক্ষ্য

লোকসভা নির্বাচন এক গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক লড়াই। এ-নির্বাচনে গোটা দেশের স্বার্থের প্রশ্ন যুক্ত, আর সেখানেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় থাকতেই হবে বামপন্থীদের। কংগ্রেস এবং বি জে পি উভয়েই জানে যে, কোন দলই এমন সংখ্যক আসন পাবে না যাতে তারা নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে সংসদে। এই নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আবার একটি কোয়ালিশন সরকার ভারতে ক্ষমতায় আসবে। এই কোয়ালিশন কেমন হবে, কি চরিত্র হবে, কি ভূমিকা পালন করবে এটাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

ইতোমধ্যে সারা দেশে রাজ্যে রাজ্যে দুই জোটই ভাঙতে শুরু করেছে। এ আই ডি এম কে, তেলুগু দেশম, বি জে ডি বি জে পি-র সঙ্গ ত্যাগ করেছে। এরা কংগ্রেসের সঙ্গেও নেই। বিহারে লালু যাদব-পাশোয়ান কংগ্রেস ছেড়েছেন। উত্তর প্রদেশে সমাজবাদী পার্টির সঙ্গে কংগ্রেসের সাম্প্রতিক মিতালীও সঙ্কটে। এর মধ্য দিয়ে দেশের মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটছে। মানুষ অন্য এক বিকল্পের সন্ধানে। না বি জে পি, না কংগ্রেস। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তে বামপন্থীদের দায়িত্ব অনেক বেশি। দেশকে ধর্মনিরপেক্ষতার পথে, স্বনির্ভরতার পথে, স্বাধীন বিদেশ নীতির পক্ষে, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করার মতো বিষয়গুলিকে সামনে রেখে আর ‍‌‍‍‍‌এক বিকল্প পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এই তৃতীয় শক্তির যে সরকার তৈরি হবে প্রধান চারটি স্তম্ভের উপর ভর করে। এই সরকারের প্রথম দৃষ্টিভঙ্গিই হবে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি ও আদর্শকে শুধু প্রতিশ্রুতিতেই নয়, বাস্তবে প্রয়োগ করা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক বিকাশ অবশ্যই চাই, তবে তা হবে স্ব-নির্ভর অর্থনীতির ভিত্তির উপরে। তৃতীয়ত, যতবড় শক্তিশালী দেশই হোক, তার সামনে নতশিরে নয় বরং মাথা উঁচু করে জোটনিরপেক্ষ বিদেশ নীতিকে অনুসরণ করা। চতুর্থত, দেশের ঐক্য ও সংহতি রক্ষার প্রশ্নে ভাষা, সংস্কৃতির মর্যাদাদানে যত্নবান এক সরকার। বামপন্থীদেরই এ কাজে এগিয়ে আসতে হবে। সমস্ত দেশপ্রেমিক শক্তিকে পাশে পেতে হবে। এবারের নির্বাচন সেই লক্ষ্যেই। তাই সমস্ত আক্রমণকে মোকাবিলা করে, সাধারণের প্ররোচনা এড়িয়ে মানুষের মধ্যে আমাদের পৌঁছাতে হবে। বামপন্থী শক্তির বিকাশে আমাদের রাজ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। তাই আক্রমণ হবে— আমাদেরও প্রস্তুত হতে হবে ঘরে ঘরে, পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে-গঞ্জে, বস্তিতে, স্কুলে, কলেজে সর্বত্রই।

বুধবার, ৮ এপ্রিল, ২০০৯

স্বপ্নভঙ্গ ~ শুভ

আসন্ন লোকসভা নির্বাচন ~ নিরুপম সেন

কিছুদিন আগে কাটোয়া তে ণিরুপম সেন একটি সভায় তাঁর মুল্যবান বক্তবয় রাখেন, ছুঁইয়ে যান রাজ্য রাজনীতি সহ কেন্দ্র সরকারের বিভিন্ন বিষয় প্রাঞ্জল ভাষায়, সেই বক্তবয়'র recording নিচে দেওয়া হোলঃ

১মঃ


২য়ঃ


৩য়ঃ


৪ঃ


৫ঃ


৬ঃ


৭মঃ


৮মঃ

মঙ্গলবার, ৭ এপ্রিল, ২০০৯

শুনতে পেলুম ~ অনামিকা

শুনতে পেলুম পোস্তা গিয়ে,
সুদীপ নাকি মস্ত ইয়ে?
সুদীপটাকেই প্রার্থী পেলে?
জানতে চাও সে কেমন ছেলে?
মন্দ নয় সে, পাত্র ভাল।
দল যদিও, হ্যাঁ, বদলালো!
রাজনীতি তার? বলছি মশাই...
ধন্য ছেলের অধ্যবসায়।
টাটার দেওয়া টংকা গুনে,
আজকে দিল্লি কালকে পুনে।
উনিশটিবার বিধানসভায়,
টাটাবাবুর কারখানা চায়।
মানুষ তো নয়, মগজটা তার
ধান্দাবাজির প্রবল জোয়ার!
সুদীপটা আজ কেবল ভোগে,
মন্ত্রী হবার স্বপ্নরোগে!
কিন্তু সুদীপ উচ্চঘর...
স্ক্যামবাবাদের বংশধর ।
এইতো এবার প্রার্থী পেলে,
এমন কি আর মন্দ ছেলে?

শব্দ কল্প দ্রুম ~ অনামিকা

ঠাস ঠাস দ্রুম দ্রুম শুনে লাগে খটকা।
ম্যাসকট, তাই বল, আমি ভাবি পটকা!
খ্যাঁশ খ্যাঁশ ঘ্যাঁচ ঘ্যাঁচ, গলা কাটে কই রে...
দুড়দাড় চুরমার তৃণমূল ওই রে!
শাঁই শাঁই পাইপগান, ভয়ে কান বন্ধ...
রাস্তা কাটছে, তাই রক্তের গন্ধ!
হুড় মুড় ধুপ ধাপ...ও কি শুনি ভাই রে!
মানুষের বডি পড়ে, যেওনাকো বাইরে।
গদি নেই কতকাল, কত ব্যথা বাজেরে!
ফটফট বুক ফাটে তাই মাঝে মাঝেরে!
হৈ হৈ মার মার বাপ বাপ চিৎকার!
ঘাসফুল ফোটাচ্ছে। সরে পড় এইবার!

পাকাপাকি ~ অনামিকা

আম পাকে বৈশাখে, কুল পাকে ফাগুনে।
এসইউসি পাকা হয় কংগ্রেসি আগুনে।
গোপালটা চিরপাকা, এই ব্রহ্মান্ডে...
সুশীলেরা পাকা হয়, ডামাডোল কান্ডে!
দিদি অভিনয়ে পাকা, পরে ছেঁড়া শাড়িটি।
সুমন পাকায় তার মেকি সেকুলারিটি!
পাকামি করতে গিয়ে, পাচ্ছেনা ভাল সিট।
কে বল তো? সুব্রত। মহাজোট মহা গিঁট!
ঝরণা সুমনা মরে, নাম ছিল খাতাতে।
সুপারি হয়েছে পাকা, বিপ্লবী আঁতাতে!
মিডিয়া গুজবে পাকে। তিল করে তালকে।
তৃণফুল পেকে গিয়ে, ঝরে পড়ে কালকে!

কেউ কি জানো ~ অনামিকা

কেউ কি জানো সদাই কেন কালিঘাটের দিদি,
জোটের ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখে হরেক রকম নিধি?
কেন সদাই অস্থিতে হিম মাখায় দিদির দাদা?
দিদির মাথায় মাঝে মাঝেই কেন বালিশ বাঁধা?
ধর্মনিরপেক্ষ গোলাপ, কেনই বা পায় মোদি?
স্বপ্নে কেন প্রলাপ বকে ক্ষমতাময় গদি?
দিদির শিল্পায়নের নীতি, কোন আকাশে ওড়ে?
ডলার পাঠায় আমেরিকা...কেন কোঁচড় ভরে?
বিধানসভা ভাঙ্গচুরেতে করেননি যা মান্য...
সে সংবিধান কেন মহান? তিনশত ছাপ্পান্ন?
কৃষির জন্য কেন দিদির কুমির চোখে জল?
ইলেকসনের জন্য কেন বন্দুক সম্বল?
মনমোহন নাচছে কেন, স্বদেশ বিক্রি করে?
এমন কেন ঘটছে তা কেউ বলতে পারো মোরে?

হুঁকোমুখো ~ অনামিকা

ফ্রেঞ্চকাট হ্যাংলা          বাড়ি তার বাংলা
মুখে তার হাসি নাই দেখেছ?
ক্ষমতার হদিশে পায় নাই গদি সে
কেউ কভু তার খোঁজ রেখেছ?

বাংলাকে ছারখার করে দিল দিদি তার
আর কোনও কাজ নাই এ ছাড়া।
তাইতো উপায় নাই ক্ষমতা সে পায় নাই
মিছে কথা বলে চলে বেচারা!


সুখ নাই চিত্তে ভোটে হবে জিততে
দেখবে না বাংলার স্বার্থ!
যেন তেন প্রকারেণ শিল্প না আসে যেন
সেটা দেখে হুঁকোমুখো পার্থ!

চুপ কর ~ অনামিকা

চুপ কর, শোন শোন বেয়াদব হোসনে।
ঠেকে গেছি ভোটারের ভয়ানক প্রশ্নে।
আটকাব উন্নতি, হোক খরা বন্যা।
তখতে বসতে হবে সার কথা শোন না!
সুশীলদা ভারী খুসি, মানুষেরা কাঁদলে,
ভাঙ্গচুর অবরোধ গুলি বোমা বাঁধলে!
গোপালের মনে সুখ, হিম হলে অস্থি।
তাই খুন করি। পোড়ে আদিবাসি বস্তি।
শিল্প কোথায় হবে? হলে হোক আকাশে।
মা মাটি মানুষ নীতি? বুঝবিনা, বাঁকা সে!
শিল্পটা আটকেছি। বয়ে গেছে রক্ত।
উস্কানি, লোক মারা, নয় তত শক্ত।
এবার নিজের জালে। কি যে করি...ধুত্তোর...
ভোটারের প্রশ্নের নেই কোনও উত্তর!
প্রশ্ন কঠিন নয়। নেহাত সহজ তো...
কোথা থেকে কাজ পাবে, বেকারের হস্ত?

জরুরী পাঠ ~ মন্দাক্রান্তা সেন

সবার মাথায় ছাদ চাই, চাই
রুটি-ভাত-তরকারি -
আর সেজনয় বামফ্রন্ট কেই
জেতানোটা দরকারি।

মানুষে মানুষে প্রাচীর গড়লে পরে
ঘাসফুল ধরা হাত উড়ে যাবে ঝড়ে।

রাবণ এসেছিল সন্ন্যাসী সেজে,
দশ মাথা নিয়ে নয় -
মুখোশের নাম 'মা-মাটি-মানুষ'
রেখো না'ক সংশয়।

মুখোশের আড়ালে রয়েছে হত্যাকারী
এই নির্বাচনে মোকাবিলা করো তার'ই।

শুনেছ কি বলে গেল দিদিমণি মমতা
তিনি'ই তো সুপ্রিমো, তিনি'ই তো ক্ষমতা
তিনি'ই তো সভাপতি, তিনি'ই সদস্য
তিনি'ই মালিক, আর বাকি সব পোষ্য।

তিনি বললেন, 'চোপ' -সবাই চুপ করলেন,
তিনি বললেন, দাঁড়াও -সবাই দাঁড়ালেন।
তার কাছে তো এটাই গণতন্ত্র :
ফ্যাসিবাদের মন্ত্র।

রবিবার, ৫ এপ্রিল, ২০০৯

রাগবেন না, উনি এইরকমই বলেন! ~ অনিকেত চক্রবর্তী

আকাশ থেকে পড়লেন বুলা চৌধুরী বললেন, ‘বলেছেন? উনি বলেছেন এমন কথা?’ একটু থেমে, ‘না না আপনি ভুল শুনেছেন এমন মিথ্যা কথা উনি বলতে পারবেন কী করে?’

বুলা চৌধুরীকে বলা গেল, না ভুল শোনেনি কেউই যারা দেখেছে শুক্রবার রাতে স্টার আনন্দ চ্যানেলে স্টুডিওয় বসে তৃণমূলনেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে টোটা রায়চৌধুরী প্রশ্ন করেছিলেন মমতাকে, আপনার ক্রীড়ানীতি কি? উনি তখন তা নিয়ে বলতে শুরু করেই কেন্দ্রে ১৯৯১ সালে ক্রীড়ামন্ত্রী থাকাকালীন তিনি কী কী করেছিলেন, তার আশ্চর্যজনক সব বিবরণ দিতে শুরু করেন, যা আগে তিনি বলেননি যেমন, তিনি নাকি গোটা দেশে ৪৬টা স্পোর্টস আকাদেমি গড়েছিলেন, সল্টলেক স্টেডিয়াম ও নেতাজী ইনডোর স্টেডিয়ামেও নাকি তার কন্ট্রিবিউশন আছে...ইত্যাদি ইত্যাদি এরপরই তিনি বলেছিলেন বুলা চৌধুরীকে নিয়ে তিনি বললেন, বুলা আমার কাছে এসেছিল আমি তখন ক্রীড়ামন্ত্রী আমাকে এসে বুলা বললো, ওর অর্জুন পুরস্কার চাই সেই ব্যবস্থা করতে হবে আমি তখন বুলাকে বললাম, নিশ্চয়ই অর্জুন পুরস্কার পাওয়ানোর ব্যবস্থা করবো কিন্তু তার আগে তোমাকে কমনওয়েলথ গেমস থেকে ৬টা সোনা আনতে হবে বুলা এরপরই কমনওয়েলথ গেমস থেকে ৬টা সোনা এনেছিল আমি কমিটমেন্টে বিশ্বাসী কথা রেখেছিলাম ওর অর্জুন পুরস্কার পাইয়ে দিয়েছিলাম...

বিবরণ শুনে বুলা চৌধুরী এবার ক্রুব্ধ কিন্তু অনৃতভাষিণী মমতা ব্যানার্জির এমন প্রচারের জবাব দিলেন আশ্চর্য ঠাণ্ডা মাথায় বললেন, ‘শুনুন, এমন মিথ্যা কথা বানাতে গিয়ে উনি খেয়াল রাখেননি যে আমি কোনোদিন কমনওয়েলথ গেমসে যাই-ই নি দুবার যাওয়ার সুযোগ এসেছিল ১৯৮১ আর ১৯৮৬ সালে ’৮১ সালে প্লেনে ওঠার আগে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় আর যেতে পারিনি আর ’৮৬ সালে রাজীব গান্ধী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী, কমনওয়েলথ গেমসে আমাদের দেশ কাউকে পাঠায়নি বয়কট হয়েছিল তাই যেতে পারিনি আর ৬টা সোনা আনার কথা যেটা উনি বলেছেন, সেটা আসলে ১৯৯১ সালের সাফ গেমসে ব্যক্তিগত কোনো আবদার নিয়ে যাইনি আমি সাফ গেমসে যাওয়ার আগে কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী হিসাবে মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকারে গিয়েছিলাম আমি অন্য ক্রীড়াবিদদের সঙ্গেই কোনো অর্জুন পুরস্কার চাওয়ার কথা ওঠেনি যেকথা উঠেছিলো, তাহলো, উনি বলেছিলেন, বুলা, একটা সোনা অন্তত আনা চাই আমি তাঁকে বলেছিলাম, একটা নয়, আরো বেশি সোনা আনার জন্যই জলে নামবো শেষপর্যন্ত আমি সাফ গেমস-এ ৬টা সোনা জিতি আমি অর্জুন পুরস্কার পাই কিন্তু সেটা ১৯৯০ সালের পুরস্কার এই হচ্ছে ইতিহাস উনি তো ক্রীড়ামন্ত্রী হয়েছিলেন ১৯৯১ সালে অথচ বেমালুম উনি বলে দিলেন যে আমি তাঁর কাছে অর্জুন পুরস্কার পাইয়ে দিতে বলতে গিয়েছিলাম আর উনি পাইয়ে দিয়েছেন...! জলে নেমে সাঁতার কি উনি কেটেছিলেন, না আমি? ছিঃ ছিঃ...’’

বলতে বলতে থেমে যান বুলা চৌধুরী তাঁকে আর বলা গেল না যে, রাগ করবেন না, মমতা এইরকমই শুক্রবার সন্ধ্যায় স্টার আনন্দ চ্যানেলে দু’ঘণ্টা ধরে বসে তিনি এমন সব মিথ্যা, এমন সব চটকদারি বক্তব্য ছেড়েছেন, যা দেখে স্টার আনন্দও বুঝেছে, এই মহিলার ভাবমূর্তি মেরামত করা কঠিন, খুব কঠিন... মমতার দাবি ও কথাবার্তা শুনে সঞ্চালক মশাই-ও হাসি ঠেলে সরাতে পারেননি নেহাত ক্যামেরা তাক করা আছে বলে মুচকি হাসি ঝোলাতে বাধ্য হয়েছেন সবসময় না হলে? হো হো হাসির ফোয়ারা ছুটে যেত স্টুডিওতে...

যেমন, ওই যে ওই কথাটা, মমতা যেমনবললেন, এই যে আপনারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন এখন, কথা বলেন সবসময় এটা কে করেছে? আমিই তো! শ্যাম পিত্রোদাকে ডেকে এনে অপটিক্যাল ফাইবার বসিয়েছিলাম সর্বত্র তারপরই তো মোবাইল ফোনের এমন প্রসার...

যেমন, মমতা বললেন, হাওড়া আর শিয়ালদহকে জুড়ে দিলাম আমিই আগে অনেক ঘুরপথে যেতে হতো আমি করলাম সরাসরি নর্থ থেকে সাউথে যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না আমিই তো নর্থ সাউথ জুড়লাম...

যেমন, মমতা বললেন, পাবলিককে ইনভলব্ করে যে উন্নয়ন, সেটাই হলো বিশ্বায়ন...

যেমন, মমতা বললেন, গড়িয়াহাটে ওটা ফ্লাইওভার হয়েছে? নিচটা অন্ধকার এমন ফ্লাইওভার দেখে আমার রবীন্দ্রনাথের ‘রাশিয়ার চিঠি’র কথা মনে পড়ে যায়...

বলেছেন মমতা এমন সব কথা কিন্তু ঘটনা কী? ধরা যাক গড়িয়াহাট ফ্লাইওভারের কথাই

আনন্দবাজার পত্রিকারই এক বিশেষ সংবাদদাতা দেবাশিস ভট্টাচার্য তাঁর পত্রিকায় মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে ২০০১-এর বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে ‘বিজয় কিংবা বিপর্যয়’ শিরোনামে একটা লেখা লিখেছিলেন তাতে তিনি যা লিখেছিলেন, গড়িয়াহাট উড়ালপুল নিয়ে মমতা ব্যানার্জির প্রশস্তিই ছিলো তখন যেমন, ওই লেখার শুরুতেই ছিলো ‘‘দু’হাজারের ডিসেম্বরে এক বিকেলে গাড়িতে গড়িয়াহাট মোড় পেরোচ্ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ...উড়ালপুল তৈরির দাপটে গড়িয়াহাট এখন যেমন সঙ্কীর্ণ, তেমনই দুর্গম ‘কবে শেষ হওয়ার কথা এই ফ্লাইওভার?’ গাড়িতে বসে কথা বলছিলেন মমতা ‘ঠিক আছে কাজ চলুক উদ্বোধন তো করবো আমরা ক্ষমতায় এসে... এই ফ্লাইওভার ওদের আমলে শুরু হলেও ফিতে কাটবো আমি’ হাসি ছড়িয়ে পড়লো নেত্রীর মুখে’’

মমতা তখন ভেবেই নিয়েছিলেন ২০০১-এর নির্বাচনে জিতবেন আর উনি মুখ্যমন্ত্রী হয়ে গড়িয়াহাট উড়ালপুলের ফিতে কাটবেন! সে যাক কিন্তু কথা হলো, তখন তো তিনি ‘নিচে অন্ধকার’ দেখেননি গড়িয়াহাটে! মনে পড়েনি ‘রাশিয়ার চিঠি’র কথা! আজ এসব কথা কেন?

একটাই কারণ ভাবমূর্তি রচনায় মিথ্যাভাষণ চালাতেই হবে তাঁকে এবং তিনি জানেন, যেসব মিডিয়া নতুন করে তাঁর ভাবমূর্তি রচনার দায়িত্ব নিয়েছে, তারা তাকে পালটা এমন কোনো প্রশ্ন করবে না, যা তাঁকে দ্বিচারিতার দায়ে ফেলতে পারে যেমন ধরুন, শুক্রবার সন্ধ্যায় স্টার আনন্দের স্টুডিওয় বসে মমতা ব্যানার্জির একটি দাবির কথা তিনি বলে দিলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বালকোকে বাঁচাতে আমিই সাহায্য করেছিলাম’ বুঝুন! বালকো কারখানার শ্রমিকরা কি শুনলেন সে কথা? কিংবা তাদের পরিবার পরিজন? লক্ষ্য করে দেখুন, মমতা এমন দাবি করার পরও সঞ্চালক তাঁকে এই প্রশ্নটা করলেন না যে, আপনি যখন রেলমন্ত্রী কেন্দ্রের এন ডি এ সরকারে, ২০০৪ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তারিখেই তো বাজপেয়ী সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বালকো-কে স্টারলাইট নামে একটি বেসরকারী সংস্থার কাছে মাত্র ৫০১ কোটি টাকায় বেচে দিয়েছিলেন তাহলে বালকোকে আপনি বাঁচালেন কোথায়?

এমন সব প্রশ্নের উত্তর মমতা দিতে গিয়ে বিপাকে পড়বেন বলেই, আনন্দবাজারের সাজানো গোছানো স্টুডিওয় সঞ্চালক এইসব প্রশ্ন করেননি কিংবা বালকো তথা রাষ্ট্রায়ত্ত ক্ষেত্রের বিলগ্নীকরণের যে নীতি, আনন্দবাজার সেই নীতি পছন্দ করে এবং মমতা ব্যানার্জি কেন্দ্রীয়মন্ত্রী থাকাকালীন ওই নীতি অনুসরণ করেন বলেই হয়তো ওই প্রশ্ন তোলেননি সঞ্চালক বিপদ আছে আরেকটা মজা দেখতে যদি প্রশ্নটা করাও হয়, আগেরদিনই টালা পার্কে প্রকাশ্যে মমতা ব্যানার্জি যেভাবে কিছু সংবাদমাধ্যমকে হুমকি দিয়েছেন, তেমন কিছু যদি বেরিয়ে আসে ওর মুখ থেকে ২০০১ সালের ৩০শে এপ্রিল গাইঘাটায় জনসভায় এই মমতাই তো বলেছিলেন, ‘কিছু পাইয়ে দিতে পারিনি বলেই কিছু কাগজ আমার বিরুদ্ধে লিখছে

নাহলে কত প্রশ্ন করার ছিলো তৃণমূলনেত্রীকে! ওই যে তিনি বললেন, আমরা সুর বদল করি না! তারপরই টিভি চ্যানেলে স্ক্রোল দেখাতে শুরু করলো মমতার সেই কথাটাই কিন্তু সত্যিই সুর বদল করে না তৃণমূল? প্রশ্ন হোক, এবারের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস বা বি জে পি তথা এন ডি এ সম্পর্কে কোনো কথা কেন নেই তৃণমূলের ৮৩ পাতার ইশ্তেহারে? কিন্তু ১৯৯৮ সালে কী ছিলো? সেবার তৃণমূলের ২৭ পাতার ইশ্তেহার ছিলো তাতে কংগ্রেসকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে কী লেখা হয়েছিল? পঞ্চম পৃষ্ঠায় লেখা হয়েছিলো, ‘‘যাঁদের (কংগ্রেস) সেই পবিত্র দায়িত্ব পালনের কথা ছিলো, গান্ধী নেহরু ইন্দিরার আদর্শের বুলি কপচেও তাঁরা ভয়ঙ্করভাবে আপসকামী...পরাধীন ভারতে কোম্পানি বাহাদুরের প্রসাদধন্য একশ্রেণীর বিশ্বাসঘাতকের মতো এঁরাও বাংলার মানুষের সঙ্গে নিরন্তর গদ্দারি করে চলেছেন’’

১৯৯৯ সালের তৃণমূলী ইশ্তেহারে কংগ্রেস দল সম্পর্কে কী লেখা হয়েছিলো? মমতা ব্যানার্জি লিখেছিলেন, ‘‘সি পি এমের সামান্য অনুগ্রহ লাভ করে দিবানিদ্রায় ডুবে থেকেছেন তথাকথিত প্রধান বিরোধী দল — কংগ্রেস নেতারা মানুষের সঙ্গে এরা বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন প্রতারণা করেছেন বিরোধীদলের মুখোশ পড়ে সি পি এমের অনুগ্রহ নিয়ে মানুষের প্রতিবাদকে বিক্রি করে দিয়েছেন এরা কী করেননি এই মুখোশধারীরা?’’ এরপরই যে তালিকা মমতা দিয়েছিলেন সেই ইশ্তেহারের চতুর্থ ও পঞ্চম পৃষ্ঠায়, তার জবাব দেওয়ার দায় কংগ্রেসেরই ছিলো

সেই ১৯৯৯ সালেরই ইশ্তেহারেও বি জে পি তথা এন ডি এ সম্পর্কে তৃণমূল নেত্রী অষ্টম ও নবম পৃষ্ঠায় যে লেখা লিখেছিলেন, তা-ও একবার দেখা যাক মমতা লিখেছিলেন, ‘‘...কেউ কেউ বলছেন বি জে পি অচ্ছ্যুৎ আমাদের বক্তব্য কোনো দলই অচ্ছ্যুৎ নয় নির্বাচন কমিশন যখন স্বীকৃতি দিয়েছে, মানুষও ভোট দেন, তখন অচ্ছ্যুৎ কেন? আর মসজিদ ভাঙা? বি জে পি যদি দোষী হয়, কংগ্রেসও দায় এড়াতে পারে না কেন্দ্রে তখন ক্ষমতায় ছিলেন নরসিমা রাও সরকার ...অটলবিহারী বাজপেয়ী মাত্র ১৩ মাস ক্ষমতায় ছিলেন...দেশে কোনো দাঙ্গা হয়নি সংখ্যালঘুরা নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত হননি...’’ এই ইশ্তেহারে সোনিয়া গান্ধীকে কটাক্ষ করেই মমতা লিখেছিলেন, ‘‘অটলবিহারী বাজপেয়ী এখন প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দেশের মধ্যে যোগ্যতম লিখিত ভাষণ পাঠ নয় (অর্থাৎ সোনিয়া গান্ধীর মত নয়), স্বতঃস্ফূর্ত দৃঢ়তায় তিনি দক্ষতার সঙ্গে দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন’’

এতসব কথা তখন এখন ‘ভালো বি জে পি’ আর ‘খারাপ কংগ্রেস’ কারো সম্পর্কেই কোনো কথা নেই এবার নির্বাচনী ইশ্তেহারে সুর বদল নয়? সুর বদল করেন না মমতা ব্যানার্জি? প্রশ্ন ওঠেনি উঠবে না তবে বলি, এসব জেনে রাগবেন না হাসি পাবে এবং হাসুন উনি তো এইরকমই বলেন দেখলেন না, উনি বললেন, ন্যানো কারখানাটা এখান থেকে যে গুজরাটে নিয়ে গেলো টাটারা, সেটা সি পি এম আর বি জে পি-র গেমপ্ল্যান!

হাসুন কমিক রিলিফ হিসাবে ভাবুন রাগবেন না প্লিজ

শুক্রবার, ৩ এপ্রিল, ২০০৯

নতুন কোরে ~ অনির্বাণ দত্ত

একটা সকাল ওঠা-নামার পর
একটা দুপুর একটু হাওয়ার খোঁজ,
সারাটা রাত দেওয়ালে চক্কর,
নতুন দিনে জাগছি আবার রোজ।

সিঁড়ির নীচে একটু আঁচড় কেটে
জমিয়ে রাখি স্রোতের কথা সব।
থামতে পেলেই আবোলতাবোল হেঁটে,
নতুন পাতায় নতুন অবয়ব।

একজানলা হলুদ ফুলের মুখে
কুলুপ এঁটে খুলছে সভাঘর।
বুদবুদিয়ে উঠছে কী সব বুকে,
নতুন কোনো নিযিদ্ধ প্রান্তর।

এখানে এই আবছায়া বিস্ময়,
কাঁপুনি সব তারাতে তিরতির
একটা এবার মরণ যদি হয়,
নতুন জীবন থাকছেতো সত্যি?

যাদবপুরের ফুলবাবু ~ অনামিকা

সব কাজ ঠিকঠাক নেই একদিনও ভুল…
গতকাল নকশাল, আজ সে’ই তৃনমুল!
চিরকাল ভাসাভাসি বিপ্লবী জোয়ারে,
আজ নেবে এন্ট্রান্স … শুয়োরের খোঁয়ারে!
ছিল কড়া নাস্তিক, আজ মানে ধর্ম…
বোঝা কি সহজ এই prophet এর কর্ম!
গতকাল দাড়িওলা … আজকে মাকুন্দ’র
ভক্তরা শিহরিত … আহারে কি সুন্দর …
গন্ধ ঢাকতে মদে মিশিয়েছে কপ্পুর…
এমন candidate … ধন্য যাদবপুর!

বৃহস্পতিবার, ২ এপ্রিল, ২০০৯

রঞ্জিত এবং ~ শময়িতা

সম্পাদক সমীপেষু,

এই লেখাটি ছাপানোর জণ্য অনুরোধ রইল।

ভারতের ফিল্ম ইতিহাসের অন্যতম সাড়া জাগানো ছবি ‘শোলে’ তে ভীরু, অর্থাৎ ধর্মেন্দ্র, গ্রামের জলের ট্যাঙ্কে উঠে আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিল এবং ততক্ষণ পর্যন্ত সেই হুমকি চালিয়ে যায় যতক্ষণ না পর্যন্ত বাসন্তী, অর্থাৎ হেমা মালিনী তাকে বিয়ে করতে রাজি হয়। সে দৃশ্য আমাদের সকলেরই মনে আছে। কিন্তু যেটা রহস্য সেটা হল শিলিগুড়ির রঞ্জিত সিংহর সেরকমই কোনো ইচ্ছে ছিল কিনা। গোটা ৩০ টি ঘন্টা তিনি শিলিগুড়ির ১২০ ফিট উঁচু ইলেক্ট্রিসিটি টাওয়ারের ওপর বসে থাকলেন। বিদ্যুত পর্ষদ ২৪ টি ঘন্টা বিদ্যুত সরবরাহ বন্ধ রাখতে বাধ্য হয় যেন তার কোনো ক্ষতি না হয়। শিলিগুড়ির বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে গোটা একটা দিন অন্ধকার থাকে মাননীয় রঞ্জিত বাবুর এই উদ্ভট মতিভ্রমের জন্য।

আমরা এখনো জানিনা রঞ্জিত বাবু কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী কিনা। ধরে নেওয়া যেতেই পারে যে এই কাজ তিনি নিজের দায়িত্বেই করেছেন। কিন্তু একটা প্রশ্ন থেকেই যায়। রঞ্জিত বাবু যদি রাজনীতি করতেন তবে তিনি কোন দলের সমর্থক হতেন?

প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা। ডেরেক ও ব্রায়েন হয়েতো এক ন্যানো সেকেন্ডের (কোনো দ্যর্থকতার উদ্দেশ্য ছিল না) মধ্যেই এই ক্যুইজটির উত্তর দিয়ে দেবেন। অবশ্যই তার নিজের দল। তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া আর কোন দল ১২০ ফিট উচ্চতা থেকে ঝাঁপ দেওয়ার (হুমকি) কথা ভাবতে পারে? তা সেক্ষেত্রে সাড়া পশ্চিম বাংলার মানুষ যতই অন্ধকারে ডুবে থাকুক না কেন। রজ্ঞিত মানসিকতার সাথে কি আশ্চর্য মিল।

আর সেটাই তৃণমূল কংগ্রেসের যাবতীয় শক্তির উৎস। রঞ্জিত সুলভ মানসিকতা। ভারতবর্ষ গনতান্ত্রিক দেশ। ফলে যে কোনো মানুষ যা ইচ্ছে তাই করতে পারে; হ্যাঁ, যা ইচ্ছে তাই। কেউ যদি মনে করে যে সে তার জীবন নিয়ে বিতশ্রদ্ধ তাহলে হে একটা গোটা শহর কে অন্ধকারে ডুবিয়ে রেখে ইলেক্ট্রিসিটি টাওয়ারে উঠে বসে থাকতে পারে। তাতে তার কোনো শাস্তি হয় না। উপরন্তু, দমকল বাহিনীর অফিসাররা তার সামনে নতজানু হয়ে প্রার্থনা করবেন যেন সে নেমে আসে।

একই রকম ভাবে কোনো রাজনৈতিক দল দিনের পর দিন একঘরে হতে হতে এবং জনগনের থেকে বিচ্ছিন্ন হতে থেকে বিতশ্রদ্ধ হয়ে সেই ‘জনগনের স্বার্থে’ যা খুশী তাই করতে পারে। এমনকি যে রাজ্যের বেকার সংখ্যা লক্ষাধিক, কোনো পার্টি চাইলেই সেই রাজ্য থেকেও দেশের প্রথিতযশা শিল্পপতি কে বিতাড়িত করে সেই রাজ্যের শিল্পায়ন কে স্তব্ধ করার চেষ্টা করতে পারে। কোনো দলের কেবলমাত্র গনতান্ত্রিক অধিকারের জ়োরে ১৫ দিন জুড়ে দেশের একটি ব্যস্ততম জাতীয় সড়ক আটকে রেখে লক্ষ লক্ষ মানুষ কে দুর্ভোগ এ ফেলতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই কোনো বলপ্রয়োগ করা যাবে না। তাহলেই মুখ্যমন্ত্রী ‘নরখাদক’, ‘হিটলার’ অথবা ‘নরেন্দ্র মোদী’ বলে রব উঠবে। বরঞ্চ মুখ্যমন্ত্রী কে করজোড়ে অগ্নিমাতা কে অনুরোধ করতে হবে যেন তিনি আলোচনায় বসেন। রঞ্জিত আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিল। আমরা নিশ্চই ভুলিনি যে আমাদের এই অগ্নিমাতাও বেশ কয়েক বছর আগে ঠিক এমন ভাবেই আত্মহত্যার হুমকি দিয়েছিলেন। প্রকাশ্য দিবালোকে, মাঝরাস্তায়, নিজের শাড়ি গলাতে পেঁচিয়ে। যদিও আদতে দুটি ঘটনাই সাধারণ মানুষের কাছে হাস্যকর, তবুও, এই অদ্ভুত আচরণের জন্য দুর্ভোগ পোহাতে হয়ে সাধারণ মানুষকেই।

অদ্ভুত ভাবে এই একই বৈশিষ্ট লক্ষ্য করা যায় মহারাষ্ট্রের নেতা রাজ ঠাকরের মধ্যেও। যদি তিনি মনে করেন যে মারাঠি রা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তাহলেই তিনি মহারাষ্ট্রের কোনো বিহারী বস্তি তে আগুন লাগিয়ে দিতে পারেন। অথবা, অন্য রাজ্য থেকে আসা মানুষদের দুর্ভোগে ফেলতে পারেন, কিংবা বিহারী ছাত্রদের বিহারী হওয়ার অপরাধে খুন করতে পারেন ‘মারাঠা আস্মিতা’ র নামে। যদিও মহারাষ্ট্রের সরকারি দপ্তরে মারাঠা কর্মচারী রা শতকরা ৮০%, তবুও রাজ ঠাকরে যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন। এবং নিশ্চিতভাবেই কেন্দ্রীয় বা রাজ্য সরকার তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করবে না যাতে তার ‘মারাঠা অস্মিতা’ জারী রাখার কাজ কিছুমাত্র ব্যহত হয়।

এবং কি আশ্চর্য মিল মমতা ব্যানার্জী এবং রাজ ঠাকরের মধ্যে। রাজ্যের প্রথম সারির বুদ্ধিজীবী রা সবসময়েই এদের সমর্থনে গলা ফাটান। ঠিক যেমন মমতা ব্যানার্জী সমর্থন পেয়েছিলেন শুভপ্রসন্ন (বিখ্যাত বায়স-শিল্পী), শাঁওলী মিত্র (অভিনেত্রী), অপর্ণা সেন (চিত্র পরিচালক ও অভিনেত্রী), সুনন্দ সান্যাল (তাঁর সুতীক্ষ্ণ গালিগালাজ বাদে তিনি বিখ্যাত আরেকটি কারনে, তিনি পুরো আন্দোলনে মমতা ব্যানার্জী বাদে একমাত্র পিএইচডি), রাজ ঠাকরেও ঠিক তেমনি সমর্থন পেয়েছেন দেশের অন্যতম খ্যাতনামা লেখিকা শোভা দের কাছ থেকে।

সমীকরণটা খুবই সহজ। কোনো একটি আন্দোলন শুরু কর। তারপর তাতে ‘মারাঠা আস্মিতা’ বা ‘কৃষি জমি বাঁচাও’ ধরনের একটা নাম দিয়ে দাও। এতে নিশ্চিত ভাবেই বেশ কিছু ‘self proclaimed’ বুদ্ধিজ়ীবীদের সমর্থন পাওয়া যাবে। সুতরাং সরকারের ওপর আরো চাপ সৃষ্টি করা যাবে এবং সরকারও কিছু করতে সাহস পাবে না। অতএব যা ইচ্ছে তাই করা সম্ভব হবে।

একই ছবি বিমল গুরুং এর ক্ষেত্রেও। যত কম ই জনসংখ্যা হোক না কেন, তিনি চান পৃথক রাজ্য, গোর্খাল্যান্ড। সেই দাবী তে তিনি পাহাড়ী অঞ্চলের সমস্ত সরকারী পরিষেবা বন্ধ করে দিতে পারেন। গাড়ীর নম্বর প্লেট বদলে ‘WB’ র জায়গাতে ‘GL’ লিখতে বাধ্য করাতে পারেন। সেই অঞ্চলের মানুষের পোশাকের ওপর বিধি জারী করতে পারেন। সরকারী বিদ্যুৎ যথেচ্ছ ভাবে ব্যবহার এবং অপচয় করতে পারেন। কিন্তু সরকার কোনো ভাবেই তাকে কিছু বলতে পারবে না। বললেই ‘এ সরকার ফ্যাসিস্ত সরকার’ ধ্বনি উঠবে।

এবং মাওবাদীরা! আমাদের বিপ্লবী সহযোদ্ধাগন। যদি তারা মনে করে যে এখনই প্রত্যন্ত গ্রামে উন্নয়নের প্রয়োজন নেই তাহলেই তারা একটি মেডিকেল ভ্যান উড়িয়ে দিতে পারে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের খুন করতে পারে। সরকার এক্ষেত্রেও কিছু বলতে পারবে না। বললেই তো সরকার বুর্জোয়া ও প্রতিক্রিয়াশীল।

শেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, জাভেদ খাঁন। কোনো মুসলমান যুবকের হিন্দু মেয়েকে বিবাহ অন্যায় এটা ভেবে নেওয়ার গনতান্ত্রিক অধিকার তার আছে। এবং সেই কারনে সেই যুবককে দিনের পর দিন হুমকি দেওয়ার অধিকারও তার আছে। তার পরে সেই যুবক আত্মহত্যা করলে সরকারের বিরুদ্ধে যুবকের পরিবারের ওপর ছাপ সৃষ্টি করার অভিযোগে মিছিলে পা মেলান তিনি। এবং তারপরে সেই যুবকের সুইসাইড নোটে জাভেদ খাঁন কে অভিযুক্ত করা হলে প্রশাসন নিশ্চয় তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। কেন? আহা, এটাই যে এদেশের গনতন্ত্র। এটাই মমতা অথবা রাজ, শুভপ্রসন্ন অথবা জাভেদ খাঁনের গনতন্ত্র।

আপনি কি আমার আপনার গনতন্ত্রের কথা ভাবছেন?...আপনি কি পাগল হলেন নাকি?

খবর এসেছে রঞ্জিতকে শেষ পর্যন্ত নামানো গেছে। যাক, ৪০ ঘন্টা পর যদি তার হুঁশ এসে থাকে তাহলে ভালই। সব ভাল যার শেষ ভাল।

শুধু একটা ছোট্ট প্রশ্ন। রঞ্জিত যদি সত্যিই তৃণমুল সমর্থক হতেন তাহলে কি তাকে এত সহজে নামানো যেত? ডেরেক ভাই এর কাছে এই উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম।

ধন্যবাদ সহ
শময়িতা চক্রবর্তী

আমাদের মহাজোট ~ অনামিকা

আমাদের মহাজোট দল ঝাঁকে ঝাঁকে,
ভোটের গাজন এলে, তারা জেগে থাকে
ভোট ঘোষণার পর, পড়ে যায় সাড়া
কাকে সিট, কাকে ইঁট...লাইন দিয়ে দাঁড়া!
কে বলেছে নীতি নেই? নীতি একটাই...
যেন তেন প্রকারেণ, গদি পাওয়া চাই
পশ্চিমবাংলাকে বাঁধো অবরোধে
মানুষ নাকাল হোক, কাঠফাটা রোদে
বাংলা টুকরো হোক, তাতে নেই ক্ষতি...
অনুরাধা প্রভাসের আছে সম্মতি
সাথে আছে ইদ্রিশ, আছে তসলিমা
বাঘ গরু একই ঘাটে...আহা কি মহিমা!
বিমল গুরুং ভাই লালগড়ে যায়!
সিপিএম খুন হবে আয়, জোটে আয়!
সংস্কৃতি ফ্রন্ট খোলা ভারি ...দিল খোস...
স্থবির কবীর আর সুশীল মুখোশ!
আমাদের মহাজোট, রোজই কমে বাড়ে
কারুর সে হাত ধরে কারও হাত ছাড়ে!
লাগাতার শয়তানি গোপালদাদার...
গিঁট তবু খুলছেনা, ভোটের ধাঁধার!
এই পোড়া বাংলায় ন্যূণতম কাজ...
হলে বাড়ে আমাদের কপালের ভাঁজ!
প্রণবটা কি ভীষণ বিভীষণ দাদা,
শিলান্যাসের নামে ছুঁড়ে দেয় কাদা!
যাই হোক নয়াচর রাস্তা বা সেতু...
ভাঙ্গবো, আগের ভোটে হেরেছি যেহেতু
এই ডুবো জাহাজের ক্যাপ্টেন নিমো
...কে জানিস? এই আমি... “তৃণ-সুপ্রিমো”!

বাঙালির Taste-ইং ~ অনির্বাণ মিত্র

(এটা নিছকই হালকা মেজাজে লেখা একটা স্মৃতিচারণ। কোনও গুরুগম্ভীর research work নয়। তাই ভুল-ত্রুটি-বিচ্যুতি পাঠক -পাঠিকা ক্ষমা করে দেবেন।)


বাঙালির খাওয়াদাওয়ার কী সাঙ্ঘাতিক পরিবর্তন হয়েছে হালে! এই বছর দশ-পনেরো আগেও আমরা কথায়-কথায় Pizza, Pasta, Pastry, Patty খাওয়ার কথা ভাবতে পারতাম না অত দোকানই ছিল না! আর এ সব খাবার ছিল যাকে বলে delicacy. ‘গামা সাহেবের কেক...’ বলে অঞ্জন দত্ত তো একটা গানই গেয়ে ফেললেন! সেই ‘M X D Gama’-র দোকান ছিল Hogg সাহেবের বাজারে, অর্থাত্‌ নিউ মার্কেটে ছেলেবেলায় খেয়েছি অফিস থেকে ফেরার পথে বাবা নিয়ে আসত বাবার হাতে ব্রাউন পেপারের কেকের ঠোঙা দেখলেই মনটা নেচে উঠত! আর সেসব কেকও ছিল দারুণ ভাল ময়দা, চিনি ডিম, ভ্যানিলা আর নানা এসেন্স মেশানো একটা সুগন্ধ থাকত সাধারণ কাপ কেকেও মুখে দিয়ে কামড় দিলেই মন ভরে যেত সেটা ছিল এক অন্য রকমের সাহেবি বনেদিয়ানা সেই Class’টাই যেন এখন আর নেই এখন পাড়ার মোড়ে-মোড়ে ব্যাঙের ছাতার মতো cake shop হয়েছে কিন্তু সেই ‘Cathleen’, ‘M X D Gama’-র কেকের মানের ধারেকাছেও যায় না আর ‘Nahoum’ তো বলাই বাহুল্য সেই দোকানের জিভে জল আনা ‘Rich Fruit Cake’ খাওয়ার সৌভাগ্য হত শুধু বড়দিনের সময় আরও ছিল Brownie, Cashew Cup, Cheese Patty আর হরেক রকমের Candy, Toffee দোকানে ঢুকলেই বনেদি কলকাতার হেরিটেজের একটা ছোঁয়া পাওয়া যেত ওয়েলিংটনের মোড়ে ‘Thacker’s বলে একটা দোকান ছিল, সেখানকার brownie আর cheese biscuit খুব ভাল ছিল এটা মনে আছে ‘Flurys’ ছিল আরও বড় ব্যাপার একবারই সেখানকার Chicken Patty খেতে পেয়েছিলাম গোল বলের মতো খোলসে ঠাসা মিহি করে কাটা চিকেন সঙ্গে চিজ় আর হালকা মশলা একটা খেয়েই পেট ভরে গিয়েছিল দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর জন্য ছিল ‘জলযোগ’ আর ‘Bijoligrill’-এর সস্তা প্যাস্ট্রি-প্যাটি তাও কিন্তু বেশ লাগত খেতে! ভিতরে অনেকটা করে ভাল পুর দেওয়া থাকত ‘ফ্লুরিজ়’ ছাড়া পার্ক স্ট্রিটের বাকি রেস্তোরাঁয় খাওয়াও ছিল অ্যাডভেঞ্চারের সমান মধ্যবিত্ত পরিবারে, রাতদিন দামী রেস্তোরাঁয় খাওয়ার মতো পয়সা ছিল না কালেভদ্রে বাইরে খেতে যাওয়া হত তার মধ্যেই অপেক্ষাকৃত সস্তা ছিল ‘Peiping’


এ তো গেল বিলিতি খাওয়াদাওয়া

মোঘলাই খানা বলতে বুঝতাম চাদনির ‘সিরাজ’-এর দোকানের রেজ়ালা আর কাবাব সঙ্গে নরমগরম তন্দুরি রুটি চাউমিন, যাকে আমরা ভারতীয় ছাঁচে ঢেলে প্রায় দিশি খাবার করে ফেলেছি, যা রাস্তায়-ঘাটে যেখানেসেখানে snacks হিসেবে পাওয়া যায়, তা আমরা ছোটবেলায় কিন্তু অন্যরূপে দেখেছি সেগুলো পাওয়া যেত ‘Chinese noodles’ লেখা কার্টনের মতো প্যাকেটে প্যাকেটের উপর চাইনিজ় হরফও থাকত দেখে ভক্তি হত, মনে হত authentic জিনিস খাচ্ছি! কখনও বাড়িতে ডিনারে চাউমিন হলে আমরা ভাবতাম, ‘যাক! আজকে একটা ভোজ হবে!’ ওটা ছিল প্রায় বড় রেস্তোরাঁর propriety. পরে ছোট-ছোট এক-দু’টাকারও প্যাকেট পাওয়া যেত মা সেদ্ধ করে, জল ঝরিয়ে, হালকা ভেজে, ডিম-পেঁয়াজ দিয়ে জলখাবারে করে দিত তা-ই কী তৃপ্তি করে খেতাম! সঙ্গে দেওয়া সয়াবিন ভাজা মনে হত যেন চিকেনের টুকরো সস্তায় পুষ্টি আর কী! আটের দশকের গোড়ার দিকে, যখন ক্লাস ওয়ানে পড়ি, তখন এল Maggi. সেই প্রথম দেখলাম যে noodles এত অল্প সময়ে রান্না করা যায় ‘দু মিনিটে’! বেশ একটা সাড়া পড়ে গিয়েছিল তখনকার মশলাটা ছিল আরও অনেক গুরুপাক স্বাদটা জিভে জল এনে দিত Maggi খাওয়ার পর রীতিমতো হাত চাটতে হত মশলাটা পুরো চেটে খাওয়ার জন্য!

খাঁটি দিশি খাবারদাবার বলতে ছিল সিঙাড়া-কচুরি-মিষ্টি রোল-ফ্রাই-কাটলেট ছিল একটু Hi-Fi ব্যাপার কারো বাড়ি খেতে গেলে কাচের প্লেটে পেঁয়াজ কুচি সহযোগে চপ বা কাটলেট আসছে দেখলেই সেই বাড়ির লোকের প্রতি ভক্তি বেড়ে যেত! সিঙাড়া-কচুরি ছিল ঘরের জিনিস যখনতখন যেখানেসেখানে পাওয়া যেত, খাওয়াও যেত এই সিঙাড়ারই কত রকম জাত ছিল বিভিন্ন দোকানে হলুদ আর বাদাম দেওয়া বাঙালি পুরওয়ালা হালকা সিঙাড়া, ঝাল পুর দেওয়া ময়দার মোটা খোলসওয়ালা একটু ভারি সিঙাড়া, নামকরা দোকানের ঘিয়ে ভাজা সিঙাড়া আর non-Bengali samosa jumbo size আর ভিতরে কালো গোলমরিচ দেওয়া পুর ধর্মতলার মোড়ে ‘ইন্দ্রমহল’-এ পাওয়া যেত সঙ্গে মিষ্টি চাটনি তখনই, যখন অন্য দোকানে সিঙাড়া পাওয়া যেত এক টাকায়, সেই সিঙাড়ার দাম ছিল পাঁচ টাকা কলেজ স্ট্রিটের কাছে, ‘পূরবি’ সিনেমা হলের থেকে এগিয়ে, রাস্তার মোড়ে একটা দোকানে একটু ছোট সাইজ়ের মিনি সিঙাড়া পাওয়া যেত নারকেলের পুর দেওয়া জিভে জল আনা স্বাদ মনে হত চার-পাঁচটা খেলেও মন ভরবে না আরও খাই সঙ্গে হালকা মিষ্টি, ঘন ক্ষীরের পাক দেওয়া প্যাঁড়া খেয়ে মুখ মিষ্টি করা হত মিষ্টি সিঙাড়ার চলও এখন অনেক কমে গিয়েছে আগে ভিতরে ক্ষীর থাকত, অল্প সুজি এখন যা দু’-একটা ছোটখাট দোকানে পাওয়া যায়, তা বেশির ভাগই সুজিসর্বস্ব চিনির ডেলা ক্ষীরটিরের বেশি বালাই নেই মিষ্টি ময়দা ভাজা খাচ্ছি মনে হবে !


এসব খানার সঙ্গে পানি বলতে ছিল Rallie Singh’র সিরাপ, লস্যি, কুলপি-ঠান্ডাই আর কলেজ স্ট্রিটের ‘প্যারামাউন্ট’-এর হরেক রকম প্রাণ জুড়নো শরবত দোকানে বসে ক্রিম শরবত খেতে-খেতে, কবে উত্তম কুমার ওই দোকানে এসেছিলেন, সেই খবরের কাগজের কাটিং দেখে একটা আলাদা রকমের নস্টাল্জিয়া বোধ করতাম আর দোকানের ব্যবহার, যাকে আমরা ‘সার্ভিস’ বলি, সেটাও ছিল বেশ আন্তরিক এক গেলাস শরবতে তেষ্টা মিটে গেলেও মন ভরত না দ্বিতীয় গেলাসের অর্ডার দিলেই কেমন একটা বাদশাহি মেজাজ এসে যেত! তখন Cold Drinks ব্যাপারটা ছিল অনেক পানের দোকান ঘেঁষা জিনিস একনকার মতো glorified হয়নি Cold Drinks Can, Pet Bottle তো দূরস্থান! Thums Up-এর বোতলের ছিপিতে থাকত নানা রকমের contest যেগুলো থেকে ছোট-ছোট কিন্তু দারুণ সব souvenir পাওয়া যেত যেমন mini thums up বোতল, ট্রে, bottle opener আর দারুণ মজার ‘Flicker’ ছোট মোটা বই হাতে নিয়ে ফুর-র-র করে পাতা ওল্টালে still ছবি moving হয়ে মিনি মুভি হয়ে যেত বেশির ভাগই ছিল গাভাস্কার আর কপিলের ছক্কা হঁIকানো পানীয়র মধ্যে আরও ছিল বাছুরের মুখ আঁকা বোতলে ফ্লেভার দেওয়া ঘন দুধ ‘Milkos’আর দারুণ সুস্বাদু ‘Fruit Plus’... এখনকার Fruity, Maaza টাইপের আর কি Goldspot, Limca তো ছিলই Pepsi-Cola রা তখনও আসেনি Thums Up-ই ছিল জাত কোলা একটা টক-টক কোলা, Campa Cola পাওয়া যেত Ice cream Sodaও ছিল একটি অতি উপাদেয় পানীয় আজকাল আর বিশেষ কেউ খায়টায় না দারুণ একটা rosy flavour দেওয়া থাকত আমার খুব aristocratic লাগত Alcoholic drink তো ছিল একেবারেই forbidden. বখাটে না হলে ভাবাই যেত না


মিষ্টির ঐতিহ্য আপেক্ষিকভাবে অবিকৃত থাকলেও মিষ্টির মান খানিকটা পড়ে গিয়েছে আর দাম বেড়ে গিয়েছে ভীষণ রকম স্পষ্ট মনে আছে পঁচিশ পয়সার রসগোল্লাও খেয়েছি! পঞ্চাশ পয়সার তো বটেই এক সময় এক টাকার রসগোল্লা ছিল স্পেশ্যাল জিনিস তার উপরে একেবারে extra special রাজভোগ আর ছিল গোলাপি রাজভোগ, একটু খাস্তা গোছের এখন আর পাওয়া যায় না বোধহয় কালো জামও কমে গিয়েছে ঘিয়ের মিষ্টির ব্যাপারটায় এখন ফাঁকিবাজি হয় সবচেয়ে বেশি আজকাল non-Bengali দোকানগুলো ‘Pure Ghee Sweets’ বলে branding করে, অথচ ওটা ছিল বাঙালি মিষ্টির পুরনো tradition. আমরা সেন্ট্রাল কলকাতায় থাকার সুবাদে অনেক পুরনো দোকানের দারুণ ভাল মিষ্টি খেতে পেয়েছি সেসব দোকানের জাতই ছিল আলাদা এখনকার কোনও ঝাঁ-চকচকে দোকান পারবেই না ওই রকম মিষ্টি তৈরি করতে ‘ভীম নাগ’-এর দেবভোগ্য সন্দেশ ছাড়াও ছিল অক্রুর দত্ত লেনের ‘চারু চন্দ্র’-র ঘি দেওয়া ছানার পোলাও আর চ্যাপটা মাতৃভোগ একদম divine! ভিতরে ক্ষীর আর কাজুবাদাম বাটা দেওয়া কামড় দিলেই পুচ করে ঘন রস বেরিয়ে মুখে গিয়ে একটা স্বর্গীর্য় অনুভূতি সৃষ্টি করত! তারপর ছিল বউবাজারের ‘নব গুঁই’-এর গোঁফচুর বড়, শুকনো বোঁদে বলা চলে লক্ষ্মী ঘিয়ের গন্ধে মাতোয়ারা ! চাপ-চাপ লাল দই তো ছিলই কোনও দালদা ফালদা নয়, একেবারে খাঁটি creamy দুধ থেকে বানানো Kaju Barfi টরফি তখন আমরা জানতামই না দরবেশ আর ক্ষীরের চপ ছাড়া লাড্ডুকে একটু খেলো মিষ্টি বলেই ধরা হত আজকাল তো লাড্ডু জাতে উঠে গিয়েছে !


বাইরের খাবার ছাড়াও, বাঙালির হেঁশেলো কিন্তু বদলে গিয়েছে অনেক পিঠে-পুলি, তালের বড়া, পাটিসাপটা, সরু চাকলি, এসব বোধহয় আমাদের ঠাকুমা-দিদিমাদের সঙ্গেই চলে গিয়েছে বহু দিন আগে এখন এসব করতে বললে মা-বউরা রেগে যান! এক্কেবারে out of syllabus! নারকেল নাড়ু, জিভেগজা তাও বিজয়া দশমী আর ভাইফোঁটার দৌলতে টিমটিম করে টিকে আছে লুচি-ছোলার ডাল, আলুর ছেঁচকি, এসবই বা বাড়িতে কত হয় আজকাল? এটা হল ready to eat আর রেস্তোরাঁর যুগ বাঙালির সময় নেই বাবু-বিবি দু’জনেই চাকরি করেন বলে অফিস থেকে ফেরার সময় পাড়ার দোকান থেকে রুটি কিনে আনলেই ল্যাঠা চুকে যায় অথবা ফোন করে অর্ডার দিলেই আছে Home Delivery বাড়িতে আটা-ময়দা মেখে, ময়েন দিয়ে, বেলে, সেঁকে রুটি করা হয়ে গিয়েছে totally impractical ব্যাপার ভাতটা মাইক্রোওভেনে হয়ে যায় তাই রক্ষা রান্নার লোক থাকলে বাড়ির রুটি খাওয়ার সৌভাগ্য হলেও হতে পারে তাও সেই ভালবেসে, যত্ন করে গড়া রুটির স্বাদ কোথায়? পেট ভরবে, মন ভরবে না আমার ঠাকুমার হাতে গড়া রুটির স্বাদ আমি এখনও ভুলতে পারিনি মাখার সময় দুধের সর আর ঘি দিতেন নরম হবে বলে কতক্ষণ ধরে যে আটা মাখতেন ভাবা যায় না রান্নাঘর যত hi-fi হচ্ছে, রান্না করার চল যেন ততই কমে যাচ্ছে! এটা একটা অদ্ভুত irony. আধুনিক মেয়েদের রান্না করতে বলা নারী স্বাধীনতার পক্ষে একটা বিশাল অন্তরায় এই নিয়ে কথা বলতে এলেই একেবারে মার-মার কাট-কাট রব পড়ে যাবে আর gender bias-এর clause-এ জেল-হেপাজত হয়ে যাওয়াটাও কিছু আশ্চর্যের নয় এর প্রভাবে এখন ছোট-ছোট ছেলেপুলেরাও Packed Food না হলে খাবার খেতে চায় না Choco Cornflakes, Chips, Macaroni ছাড়া পাতি জিনিস মুখে রোচে না আমরা ফিলিপ্স-এর এক টাকার টিফিন কেকের জায়গায় Farinni’র দু’ টাকার অরেঞ্জ বা চকোলেট কেক পেলে ধন্য হয়ে যেতাম আইসক্রিম বলত ছিল stick ice-cream সর্বসাকুল্যে তিনটি flavour - অরেঞ্জ, ম্যাঙ্গো, পাইন্যাপল cup ice-cream আরও দামি ছিল বলে সবসময় জুটত না বিয়েবাড়িতে শেষ পাতে ছিল মিষ্টি দই Dessert ব্যাপারটা জানতামই না, বুঝতামই না আর এখন ‘vanilla ice-cream with hot chocolate sauce’ হয়ে গিয়েছে একটা পাতি ব্যাপার Menu তে না থাকলে menu টা low profile মনে হয় দইটা হয়ে গিয়েছে গেঁয়ো আইটেম

সাধারণ ঘরের যত্নে বড় হয়েছি বলে ছোটখাটো জিনিসও ভাল লাগত, আর দামি জিনিসের সঙ্গে পরিচয় হওয়ারও সৌভাগ্য হত দু’টোর মধ্যে তফাতটা বুঝতাম অল্পেও মন ভরে যেত সবই ভাল লাগত আলাদা-আলাদাভাবে Lords-এর লাল সেলোফেন পেপারে মোড়া দশ পয়সার মিল্ক লজেন্স, কামর দিলে ভিতর থেকে milk cream বরিয়ে আসত, দামি পঞ্চাশ পয়সার Éclairs আর পাতি পাঁচ পয়সার হজমি গুলি এসব খেতেই কত মজা হত, যখন মা-বাবা দোকানে নিয়ে গিয়ে কিনে দিত আর দোকানদার কাচের বোয়ামে হাত ঢুকিয়ে বের করে ঠোঙায় ভরে দিত চিনির crystal দেওয়া sponge লজেন্স, ছোট-ছোট কৌটোয় ভরা মৌরি লজেন্সো দারুণ লাগত Cadbury চকোলেট ছিল বড়লোকি ব্যাপার special occasion ছাড়া পাওয়া যেত না একটা ছোটখাটো গিফ্ট আইটেমই ছিল বলা চলে! আর কোনও কোম্পানিই তখন চকোলেট তৈরি করত বলে মনে হয় না ‘Nestle’, ‘Amul’ এল অনেক পরে আর বিদেশি চকোলেটের তো প্রশ্নই ওঠে না


আজকাল এই অতি-রেস্তোরাঁবাজি, হেন cuisine, তেন cuisine আর অমুক delicacy, তমুক delicacy, এসবের চুড়ান্ত বাড়াবাড়ি দেখে অবাক লাগে সহজ, সাধারণ খাবারে আর আমাদের মন ভরে না বাঙালি খাবারের পুরনো ঐতিহ্যটাই বোধহয় অচল হয়ে যাচ্ছে অতি পরিচিত বাঙালি খাবার এখন delicacy হিসেবে মোটা টাকা দিয়ে দামি দোকানে খেতে হয় কারণ আমাদের staple আর general food habit অনেক বদলে গিয়েছে In fact একদমই বদলে গিয়েছে আমার মনে হয় আমরা বাঙালিরাই বোধহয় অনেক বদলে গিয়েছি আর সেই পুরো খাঁটি বাঙালি নই তাই আমাদের খাবারদাবারও আর ষোলো আনা বাঙালি মেজাজের নেই Tradition’টাই হারিয়ে গিয়েছে অন্যান্য অনেক পুরনো জিনিসের মতো...

সময় ~ সোমশুভ্র



ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। রাস্তায় সামনের গাড়িও ভাল করে দেখা যায় না। নীরাদের ট্যাক্সিটা ছুটে চলেছে বৃষ্টির মধ্যে দিয়ে। নীরা চুপ করে বসে আছে বাবা মা র মাঝখানে। আজ অনেকদিন পর সে বাড়ি ফিরছে তাই তার খুব আনন্দ, কিন্তু সেই খুশির মেঘকে ঢেকে দিয়েছে অন্য এক বড় আঘাত। শুভ্রকে খুব বেশি করে মনে পড়ছে তার। সেই পুরানোস্মৃতিগুলো আজ বারবার তার মনের আঙিনায় আসাযাওয়া করেই চলেছে। চোখের জল আটকাবার বৃথাই চেষ্টা করছে সে।


শুভ্রর সাথে নীরার প্রথম আলাপ ট্রেনে। নীরা তখন প্রথম বর্ষের ছাত্রী।বাবা মা ভাইএর সাথে পুরী বেরাতে গিয়েছিল। আলাপ হয় শুভ্রর পরিবারের সাথে।সাধারণ সহযাত্রীদের মধ্যে যেটুকু কথোপকথন হয়, সেরকমই কিছু হয়েছিল ২টো পরিবারের মধ্যে।তারও কম কথা হয়েছিল শুভ্র র নীরার মধ্যে।


সেই কথাগুলো আজও নীরার পরিষ্কার মনে আছে।সারাদিনের নানা কাজের মধ্যে,মনে পড়ত শুভ্র।তারপর র কোনো যোগাযোগ ছিলনা ওদের মধ্যে….একদিন প্রায় ৩মাস পরে হঠাত দেখা হয় গড়িয়াহাটের মোড়ে। কিছুক্ষণ ২জনই চুপ ।তারপর কথা বলতে বলতে কখন বিকেল থেকে অন্ধকার নেমে এসেছে, বুঝতেই পারেনি ২জনের কেউই।


সেই দিন থেকে নীরার পৃথিবীতে সাদর অর্ভথন‌্যা হয় শুভ্রর।দুজনের চোখে তখন একটা সুন্দর পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন।কেটে যায় ২বছর।কিছু ভাললাগা কিছু খারাপলাগা স্মৃতি জুড়ে যায় তাদের জীবনের সাথে।


শুভ্র চাকরি পায় ১টি আর্ন্তজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সঃস্থায়।নীরা তখনও কলেজে। কাজের চাপ কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি করে দুজনের মধ্যে। সকাল বেলার ফোনে কথাটা, এখন কাজের চাপের গ্রাসে চলে গেছে।কিন্তু রোজ রাতের বেলা ঘরে ফিরে শুভ্র নিয়ম করে ফোন করে নীরাকে।কাজের চাপ, দিনের দিন বেরেই চলেছে। আগে যেমন ইচ্ছে করত শুভ্রর ,বাড়ি গিয়ে নীরার কথা শুনতে ,এখন যেন সারাদিনের ক্লান্তি সেই ইচ্ছাটাকেও পিষে মেরে ফেলছে। কিন্তু নীরাকে সে কথা বোঝায় কার সাধ্য। অগত্যা রোজ “সময় নেই” বলে চলে মান অভিমানের পালা।র তার সাথে চলে সময়ের খোঁজ। নীরা দিনের পর দিন আরও বেশি করে একা হয়ে যায়।সারাদিনের প্রতীক্ষা তাকে অস্থির করে তোলে। মনের গভীরে অভিমানের মেঘ ক্রমশ ঘন থেকে ঘনতর হয়।তবে যার জন্য এই অভিমান তার কোনো ভ্রুক্ষেপনেই তাতে।কিম্বা উপলব্ধি করেও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে সুন্দর ভাবে,কারণ সে জানে নীরাকে বোঝানো বৃথা।র এত সময় কোথায়? মাঝেমাঝে নীরার অশ্রুমিশ্রিত কন্ঠ শুভ্রকে আত্মবিশ্লেষণের একটা সুযোগ করে দেয় মাত্র; সত্যি কি সে পালটে যাচ্ছে? নীরাকে সে আজও ভালবাসে; এটা সে নিজে বিশ্বাস করে ,নীরাও জানে সেটা জানে…….. তবে এখন ৩বছর কেটে যাওয়ার পর এই কথাটাই নীরাকে বোঝানোর জন্য সময় দিতে হবে?


মেনে নেওয়া র মানিয়ে নেওয়ার মধ্যে দিয়ে কোনো্রকমে বন্ধুর পথ দিয়ে চলছিল সর্ম্পকটা। নীরা কি করবে ভেবে পায়না! যত দিন যায় শুভ্র যেন অচেনা হয়ে যাচ্ছে তার কাছে। তার ছোটো ছোটো খুশি, আনন্দ, দুঃখ --- যেগুলোর সঠিক মূল্যায়ন একমাত্র শুভ্রর কাছে হত, আজ যে সেগুলোতে ধূলো পড়ে গেলেও শুভ্র একবার ফিরেও তাকায় না।সত্যি সময়ের এত অভাব? নাকি তার সাথে ইচ্ছারও অভাব!! এই প্রশ্ণ যতবার নীরার মনে আসে, দু চোখ ভরে আসে জলে। বেশি কিছুতো নয়, শুধু একটু সময়ই তো চেয়েছে সে --- খুব বড় অন্যায় করে ফেলেছে কি?


প্রায় ৪মাস পরে শুভ্র সাথে দেখা করার কথা ছিল নীরার।সকাল থেকে বৃষ্টি পরেই চলেছে,থামবার কোনো লক্ষণ নেই। নীরা কিছুটা উত্তেজিত। একটা ক্ষীণ আশঙ্কাও আছে, বৃষ্টি না আবার বারিয়ে দেয় তার প্রতীক্ষাকে।নীরার মোবাইল বেজে ওঠে। ওপাশে শুভ্রর কন্ঠ ভেসে ওঠে ”আজকে কি র বেরবে এই বৃষ্টির মধ্যে?” নীরার উত্তর” হ্যাঁ”। অগত্যা ঝিরঝিরে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে প্যাচপ্যাচে কাঁদায়, জল ডিঙিয়ে, প্যান্ট গুটিয়ে যেতে হবে, দেখা করতে নীরার সাথে। এভাবে অফিস যাওয়া - মানা যায় তবুও, কিন্তু ওর সাথে দেখা করার জন্য এতও ঝক্কি পোয়ানো…….. মনে মনে খুব বিরক্ত হয় শুভ্র।অনিচ্ছা সত্ত্বেও বেরতে হয়।মাঝে মাঝে নীরাকে খুব অবুঝ লাগে শুভ্রর। নীরা যেন দিনদিন কেমন বদলে যাচ্ছে। কথায় কথায় শুভ্রকে ভুল বোঝাটা যেন স্বভাবে দাড়িয়ে যাচ্ছে। অন্যমণস্ক ভাবে হাটছিল শুভ্র…….সামনের জল ভর্তি খন্দটা খেয়াল ই করেনি শুভ্র।টাল রাখতে না পেরে সোজা রাস্তায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের চেষ্টার পর আস্তে আস্তে দাঁড়ায় শুভ্র। পায়ে অসহ্য ব্যাথা। কোনরকমে খুড়িয়ে খুড়িয়ে বাড়ি ফেরে। বেশ অনেকটাই কেটে গেছে হাঁটুর কাছটায়। পা ধুয়ে কোনরকমে খাটে এসে বসে। নীরার জন্যই এইসব হল……..মারাত্মক রাগ হয়েছিল নীরার উপর।” একটা স্বার্থপর অবুঝ মেয়ে, কী হত আজ দেখা না করলে? কে জানে কতদিন ভুগতে হবে, এই ব্যাথা নিয়ে।”


প্রায় ২ঘন্টা হতে চলল নীরা অপেক্ষা করছে। ঝিরঝির করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে।বারবার রিঙ হয়েই “no answer” হয়ে যাচ্ছে শুভ্রর ফোন। নীরা অস্থির হয়ে ওঠে। ”শুভ্র কি তাহলে ভুলে গেল? না কি কিছু অঘটন ঘটল?” একরাশ আশঙ্কা ভীড় করে আসে নীরার মনে। বারবার ফোন করতেই থাকে সে। রিঙ হয়েই যাচ্ছে, হঠাতই ওপার থেকে ভেসে ওঠে শুভ্রর গলা। ”sorry, তুমি রাগ করলেও আমার কিছু করার নেই, আমি যেতে পারছিনা। রাস্তায় পড়ে গিয়ে পায়ে লেগেছে, হাঁটার ক্ষমতা নেই।” নীরা বলে “এতক্ষণ ফোন ধরছিলেনা,আমি খুব চিন্তা করছিলাম, কি করে পড়ে গেলে? একদম হাঁটতে পারছ না?” কর্কশ গলায় উত্তর আসে “ আমার বন্ধুরা দেখতে এসেছে আমাকে, ওদের সাথে কথা বলছিলাম। ফোন অন্যঘরে ছিল, শুনতে পায়নি।র আমার সত্যি হাঁটার ক্ষমতা নেই--- বিশ্বাস করার হলে কর ,নাহলে আমি কি করব বল? এই বৃষ্টি কাদায় না বেরলে, তোমার শান্তি হচ্ছিল না----- ভালবাসার প্রমান দিতে পারছিলাম না তোমাকে। এখন খুশি ...... র কিছু জানার আছে?” ফোন কেটে দিয়েছিল নীরা।দু চোখ ভেসে গেছিল জলে। চুপ করে দাড়িয়েছিল কিছুক্ষণ। মেনে নিয়েছিল তারই দোষ। কি আর করার আছে তার মেনে নেওয়া ছাড়া। বাড়ির দিকে বাস ধরার জন্য রাস্তা পার করে অন্যপাশে আসে।

প্রায় ১মাস কেটে গেছে।আজকে নীরাকে বাড়ি নিয়ে যাওয়া হবে হসপিটাল থেকে।বাস থেকে নামতেগিয়ে পা হড়কে পড়ে, মারাত্মক ভাবে যখম হয়েছিল সে। একে একে সবাই এসে দেখে গেছে তাকে, কিন্তু শুভ্র আসেনি। নীরার স্থির বিশ্বাস ছিল শুভ্র নিশ্চয় জানে না এইসব ।তাই আজ ফোন করেছিল শুভ্রকে ।ওপাশে শান্ত গলায় প্রশ্ণ”কেমন আছ?” নীরা মৃদু হেসে বলে “ভাল, তো্মার পায়ের ব্যাথা কেমন আছে?” শুভ্র “ ও ঠিক আছে? তো্মায় কবে ছাড়বে হসপিটাল থেকে?” নীরা অবাক , “তুমি জানতে? তাও একদিন ও এলে না?” শুভ্র” কি করব বল? এত কাজের চাপ ,একদম সময় পায়নি,তবে একটা ভাল খবর আছে তো্মার জন্য, বলত কি?” নীরা একটু থেমে বলে “জানিনা,তুমি বল?” শুভ্র” আমার onsite যাওয়া টা ফাইনাল হয়ে গেছে,পরের মাসেই। তুমি খুশি?” নীরা “হ্যাঁ, খুব খুশি। মা ডাকছে, আজ বাড়ি ফিরব।”

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০০৯

Brigade এবং... ~ শাক্যজিৎ

অতি সম্প্রতি কাগজে দেখলাম ব্রিগেডে জনসমাবেশ করে বামফ্রন্ট পরিবেশের কতটা ক্ষতি করেছে সে বিষয়ে পরিবেশবিদ সুভাষ দত্ত কলকাতা হাইকোর্ট কে পিটিসন দাখিল করেছেন। স্মরনে থাকতে পারে, এই ভদ্রলোকই ময়দানে বইমেলা করার বিরুদ্ধে কোর্টে গেছিলেন, এবং কোর্ট যখন বইমেলাকে নিষিদ্ধ করল, ইনি আনন্দাশ্রু চেপে রাখতে পারেননি।তখন এবং প্রতিক্ষেত্রেই এই ধরনের পরিবেশ নষ্ট হবার অভিযোগ বারেবারে করে গেছে আনন্দবাজার পত্রিকা। সুভাষ দত্ত-র সমর্থনের একটা বড়ো স্তম্ভ-ই ছিল এবং আছে এই কাগজটি।এক্ষেত্রে সুভাষবাবুকে সমর্থন জানিয়েছে রাজ্যের প্রধান বিরোধি দল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূলের ভূমিকা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। সুভাষবাবু আপাতদৃষ্টি তে তাঁর কর্তব্য করেছেন, তৃণমূল-ও তার বরাবরের উগ্র বাম-বিরোধিতা বজায় রেখেছে। আমাদের প্রশ্নটা আনন্দবাজারের ভূমিকা নিয়ে। মিছিল হলে তার অসুবিধেটা কোথায়? তার যে বিক্রী কমে, এমন ত নয়। তবুও তার এহেন মিছিল মিটিং সভা সমাবেশের বিরুদ্ধে গলা ফাটানো কেন? সুভাষবাবূই বা কেন বারবার এরকম কাজ করে যাচ্ছেন? প্রশ্ন টা হল, এই কার্যকলাপগুলো কি একটা বিশেষ ট্রেন্ড দেখাচ্ছে, যার মূল নিছক বামফ্রন্ট বিরোধীতা ছেড়ে অনেক গভীরে?কেন বারেবারে আনন্দবাজার বা ওই জাতীয় পত্র-পত্রিকাগুলো এমন কাজ করে আসছে?আমাদের কি এবার সাবধান হবার সময় এসেছে?

শুরু করা যাক অতীত থেকে। কারণ অতীত বিশ্লেষণ করলে, আমাদের বিশ্বাস আজকের এই কাজগুলোর একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। অতীতে আনন্দবাজার পত্রিকা কি করেছে? সকলেই জানেন এই কাগজটি নিজেকে বাঙ্গালী রুচি ও সংস্কৃতির একমাত্র ধারক ও বাহক হিসেবে মনে করে। কিন্তু তীব্র আন্টি-কম্যুনিস্ট ভাবধারায় অনুপ্রানিত হয়ে কোন সংস্কৃতি তুলে ধরেছে আমাদের সামনে? ধরা যাক ১৯৬২ সালের ভারত চীন সঙ্ঘর্ষের কথা। যুদ্ধোন্মাদনা জাগিয়ে তোলার জন্য, এবং উগ্র দেশপ্রেমের জোয়ারে মানুষকে ভাসিয়ে কম্যুনিস্টদের কচুকাটা করবার জন্য আনন্দবাজার উঠে পড়ে লেগেছিল। দেশ পত্রিকার পাতায় শিল্পির স্বাধীনতা বলে একটি কলাম খুলে বিভিন্ন শিল্পি সাহিত্যিক কে দিয়ে লেখাত, যে লেখার মুল প্রতিপাদ্য ছিল কিভাবে তারা একসময় সমাজতন্ত্রের দিকে আকৃষ্ট হয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে মানুষের স্বাধীন মতপ্রকাশের উপর গলা চেপে ধরা দেখে তারা সেই আদর্শ পরিত্যাগ করেন। এই কলামের নেতৃত্বে ছিলেন শ্রদ্ধেয় তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। দেশপ্রেমের সেই ঢক্কানিণাদে বিভ্রান্ত হয়েছিলেন অনেক বামপন্থী সাহিত্যিক-ও, যেমন নারায়ন গঙ্গোপাধ্যায় বা দীনেশ দাস। মনোজ বসু তাঁর চীন ঘুরে এলাম বই এর হাজার হাজার কপি তখন প্রকাশ্য রাস্তায় সহস্তে পোড়ান, অতীতে চীনার প্রতি ভাল ভাল কথা লেখার পাপের প্রায়শ্চিত্তস্বরুপ। তপন সিনহা বানালেন উগ্র দেশপ্রেমের ছবি আমার দেশ যাকে আনন্দবাজার আখ্যা দিল স্বাধীন গণতন্ত্রের দেশপ্রেমিক শিল্পির এক অনবদ্য সৃষ্টি হিসেবে। সত্যজিত রায় চীনার বিরুদ্ধে একটিও বিষোদ্গার না করায় ক্রুদ্ধ আনন্দবাজার তার সম্পাদকীয় তে প্রশ্ন তোলে জাতির এই সংকট কালে সত্যজিত নীরব কেন? স্থিতধী অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর মতপ্রকাশে ছিলেন অবিচল। একবার আনন্দবাজারের পাতায় অন্যরকম লেখার পরেই গৌরকিশোর ঘোষ ঝাপিয়ে পড়েন, ফতোয়া জারি করেন যে জাতির এই দুর্দিনে এখন ওসব কথা বলা চলবে না। সমরেশ বসু এবং প্রেমেন্দ্র মিত্র কে হিংস্র আক্রমণের মুখে পড়তে হয় চীনবিরোধী কথা না বলার জন্য।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রথম দিকটায় আনন্দবাজার ভিয়েতকং দের বলেছিল চীনের দালাল এবং মার্কিন সৈন্যবাহিনী কে আখ্যা দিয়েছিল সাম্যবাদের বিরুদ্ধে মুক্তির প্রাচীর হিসেবে। এবং মজার ব্যাপার, আজকের সুভাষ বাবু দের পূর্বসূরী এক সাহেব, পরিবেশবিদ জন উইলেট ভারত ভ্রমণে এসে দেশ পত্রিকার পাতায় চোখের জল ফেলেন ভিয়েতকং রা মাটির নিচে সুরঙ্গ কেটে কেমনভাবে মাটি আলগা করে ওখানকার গ্রামীণ পরিবেশ নষ্ট করে দিচ্ছে সে বিষয়ে। কল্লোল নাটকের বিরুদ্ধে প্রথম আক্রমণ আসে দেশ পত্রিকায় প্রমথনাথ বিশীর কলম থেকে, তিনি নাটকটিকে নিষিদ্ধ করার দাবী জানান। অঙ্গার নাটকের বিরুদ্ধেও অশ্লিলতার অভিযোগ এনেছিল আনন্দবাজার, কারণ সেখানে নাকি বস্তি অঞ্চলের মানুষের নোংরা ভাষা ব্যাবহার করা হয়। সংগ্রামী জনতার শিল্প সাহিত্যে নাটকে এরকম চিত্রায়ণ আনন্দবাজারের সহ্য হয় নি। তাদের প্রবর্তিত ড্রইংরুমের ভাববিলাস, পরকীয়া প্রেম আর নাগরিক হতাশার ট্রাডিশনের সংস্কৃতির বাইরে এ এমন সব নাটক, যা সমাজতান্ত্রিক বাস্তবতার আদর্শ কে সামনে নিয়ে আসে। তাই নিষিদ্ধ করার দাবী। পরে প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সি-সুব্রত মুখার্জী দের গুন্ডারা যখন মিনার্ভা তে কল্লোল এর শো ভাংচুর চালায়, সমস্ত শিল্পি-সাহিত্যিক প্রতিবাদে মুখর হলেও নীরব ছিল একমাত্র আনন্দবাজার পত্রিকা।

১৯৭২ সালে প্রবল রিগিং আর সন্ত্রাসের মাধ্যমে সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় ক্ষমতায় এলে উল্লাসে ফেটে পড়ে আনন্দবাজার লিখেছিল যে বাংলায় সবুজের বিপ্লব ঘটেছে। এই সবুজের দল নবজীবনের জোয়ার নিয়ে আসবে মরা বাংলায়। কি জোয়ার এনেছিল, তা বলাই বাহুল্য। তথ্যের খাতিরে শুধু এটুকুই বলা যাক, ৭২ থেকে ৭৭ কংগ্রেসী সন্ত্রাসে নিহত বামপন্থী কর্মী দের জন্য একটা লাইন-ও খরচ করা হয়নি এই পত্রিকায়। আগ্রহীজন, পুরোনো সংখ্যা লাইব্রেরি তে গিয়ে মিলিয়ে দেখতে পারেন আমার কথা। বাংলাদেশের যুদ্ধের জন্য টন টন চোখের জল ফেলা হয়েছিল, পত্রিকার পোষ্য কবি সাহিত্যিক রা যশোর রোডে গিয়ে ত্রাণ বিলিয়ে এসেছেন, এবং সে ছবি ছাপা হয়েছে প্রথম পাতায়। কিন্তু বরানগর বেলেঘাটা কাশীপুর এবং বাংলার সর্বত্র সিপিএম ও নক্সাল কর্মী খুনের একটি খবর-ও নয়।

পাঠক রা প্রশ্ন তুলতেই পারেন, আনন্দবাজারের এমন কম্যুনিস্ট বিরোধীতার কাহিনী এনে আমি কি এটাই প্রমাণ করতে চাইছি যে আজকেও মিছিলের বিরুদ্ধে আনন্দবাজার বা সুভাষ দত্ত এই কারণেই বলছেন কারন এটা বাম্ফ্রন্টের মিছিল? না, শুধুই বামফ্রন্ট নয়। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, আনন্দবাজার তৃণমূলের মিছিলের-ও বিরুদ্ধে। যে কোনো রাজনৈতিক সভা সমাবেশ মিছিলের-ই বিরুদ্ধে এই পত্রিকা টি। কখনো তার অজুহাত নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হওয়া, কখনো পরিবেশ। এক্ষেত্রেও আনন্দবাজার তার পুরনো বামবিরোধী ধারাটি বজায় রেখেছে। কেন বলছি এ কথা?

ভারতের ক্ষমতার কেন্দ্রে যে গোষ্ঠীটি বসে আছে সেটা মুলত জোতদার জমিদার দের একটা চক্র। এদের সমর্থনের ভিত্তি বড় পুঁজিপতি শ্রেণী রা। এই দুই শ্রেণীর আঁতাতের ফলে দিল্লী তে অধিষ্ঠান করে আছে সবচেয়ে পশ্চাদপদ বিজ্ঞানবিরোধী এক দল মুতসুদ্দী শ্রেণী। এদের টিকি বাঁধা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দরজায়। এদের-ই পদলেহনকারী কলকাতায় বসে থাকা বড় সংবাদপত্র গোষ্ঠীর লেখককূল, যাদের কাছে প্রগতিশীল সাহিত্য মানে পরকীয়া প্রেম। এদের আনুগত্য মূলত কংগ্রেসের প্রতি, শ্রেণীগতভাবে যে দল ক্যাপিটালিস্ট-ল্যান্ডলর্ড এবং মুতসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর এক দো-আঁশলা সংস্করণ। বাঙ্গালী জাতির হয়ত এটা দুর্ভাগ্যই বলতে হবে যে তারা সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র গোষ্ঠী, যেখানে বড় স্কেলের মুতসুদ্দি পুঁজি একটা জাতির সংস্কৃতির ঠিকাদারি নিয়ে বসে। রুপার্ট মারডখ যত বড় পুঁজিপতি-ই হন না কেন, তিনি মার্কিন দেশের সংস্কৃতি নিয়ন্ত্রন করেন, এরকম দাবি স্বয়ং মারডখ-ও করবেন না। যে কোনো দেশের সংবাদপত্র মালিকের ক্ষেত্রেই ব্যাপারটা সত্যি। বাংলায় কোন প্রতিস্পর্ধী শক্তিশালী ধারা না থাকার সুযোগে (লিটল ম্যাগাজিন সংস্কৃতি প্রতিস্পর্ধী হতে পারে, কিন্তু বৃহত পুঁজির সাথে পাল্লা দেবার সাধ্য তাদের এখনও নেই) এবং বামপন্থী আন্দোলনের শক্তিশালী ধারাটা (আইপিটিএ প্রমুখ) বিভিন্ন কারণে নির্জীব হয়ে যাবার কারণে বৃহত পুঁজি শূন্যস্থান পুরণ করে বসে। এদের চরিত্র মুলত মুতসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণীর, কারণ বিকাশের জন্য এরা বরাবর-ই সাম্রাজ্যবাদের উপর নির্ভরশীল। অতি সম্প্রতি রুপারট মারডখের স্টার গোষ্ঠীর সাথে আনন্দবাজারের গাঁটছড়া বাঁধা এটার একটা প্রমাণ। দেশীয় পুঁজির স্বাধীন বিকাশের পথে যদি আনন্দ গোষ্ঠীর বিকাশ ঘটত তাহলে কি হত সেটাও একটা বড় প্রশ্ন বটে। কিন্তু এরা বরাবর-ই কংগ্রেসের তল্পিবাহক ছিল, আর কংগ্রেসের শ্রেণিচরিত্র কারওর অজানা থাকার কথা নয়।

বরাবর-ই মুতসুদ্দি শ্রেণী নিজের দেশের শিল্প সংস্কৃতির স্বাধীন বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দিয়ে তার উপর সাম্রাজ্যবাদী সংস্কৃতির বোঝা চাপায়। এটা সে নিজের অস্তিত্ত রক্ষার খাতিরেই করে। আনন্দবাজার-ও তার ব্যাতিক্রম নয়। এরা মুখে দেশপ্রেমের কথা বলে, ন্যাশনাল ইন্টিগ্রেশনের কথা বলে। কিন্তু বিজেপি-কংগ্রেসের মতই, এদের কাছে ইন্টিগ্রেশন মানে পুঁজিপতি দের কাঁচামাল ও বাজারের ইন্টিগ্রেশন। প্রতিটা জাতির নিজের সাংস্কৃতিক বিকাশের ধারাটা রুদ্ধ করে দিয়ে তাদের এক-ই ছাঁচে আনতে হবে, যাতে কেউ মাথা তুলে দাঁড়াবার সুযোগ না পায়, নিজের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত করবার দাবি পর্যন্ত না তুলতে পারে।নাহলে ওই জমিদার জোতদার শ্রেণীর খুব অসুবিধে হয় দেশ চালাতে। দেশকে লুঠ করে সাম্রাজ্যবাদের হাতে কাঁচামাল তুলে দিতে। আর তাই, আমাদের সমস্ত উজ্জ্বল অতীত ভুলিয়ে দেবার খেলা, আমাদের সংগ্রামী ঐতিহ্য কে কালিমালিপ্ত করার প্রয়াস। যেখানে যেটুকু সংগ্রামী উপাদান লুকিয়ে আছে, বামপন্থী ধারা বেঁচে আছে, তাকে ভুলিয়ে দেবার প্রয়াস। এবং এই কাজটাই এই রাজ্যে ধূর্ততার সাথে করে চলেছে আনন্দবাজার।

একটু পড়াশোনা করলেই দেখা যাবে, কেমন ভাবে আমাদের উজ্জ্বল ঐতিহ্য কে আনন্দবাজার কালিমালিপ্ত করেছিল। দ্বারকানাথ ঠাকুরের জন্মের দ্বিশতবার্ষিকি উপলক্ষ্যে দেশ সংখ্যায় আলোচনার মুল বিষয় ছিল দ্বারকানাথের মদ্যপানে আসক্তি ও রাণি ভিক্টোরিয়ার সাথে তাঁর অবৈধ প্রণয়। দ্বারকানাথ যে একটা জাতির ইতিহাসে প্রগতিশীল বুর্জোয়া শ্রেণীর ভুমিকা সম্পন্ন করে গেছেন, আদি ব্রাম্ভসমাজ প্রতিষ্ঠায় তাঁর অবদান যে উদিয়মান বুর্জোয়ার ধর্মসংস্কারের এক উদাহরণ, সেসব বাদ দিয়ে বড় হয়ে উঠল তাঁর মদ্যাসক্তি! দেশ পত্রিকায় একটি বহুল প্রচারিত উপন্যাসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত কে আঁকা হল মদ্যপ ও প্রায় সমকামী হিসেবে। এদিকে তাঁর প্রচন্ড কবিপ্রতিভায় মাইকেল যে একটা ভাষার বিগ্রহ দান করে গেছেন, যা রাশিয়া তে করেছিলেন পুশকিন, যা একটা জাতির নবজাগরণ কে প্রাণপ্রতিষ্ঠা দিয়েছিল, সে বিষয়ে ওই মহান লেখক নীরব। ওই লেখক-ই অন্য একটি প্রবন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র কে বোম্বে ফিল্মের চিত্রনাট্যকার শ্রেণীর লেখক বললেন এবং বিচার করলেন যে মাইকেল এর কবিপ্রতিভা একটা কুসংস্কার মাত্র! গিরীশচন্দ্র ঘোষের মূল্যায়ন এরা করে দুটি মাত্রায়। এক মাত্রায় গিরীশ মাতাল ও নটী বিনোদিনী তাঁর রক্ষিতা। অন্যা ধরণের আলোচনায় প্রাধান্য পায় গিরীশের রামকৃষ্ণ ভক্তি এবং শ্রী চৈতন্য নাটক দেখতে এসে পরমহংসের ভর হওয়া। যেন ওই নাটকটা ছাড়া গিরীশ জীবনে কোনো নাটক লেখেন নি। একবার-ও বলা হয়না গিরীশের প্রচন্ড ব্রিটিশবিরোধী নাটকগুলোর কথা, যে কারণে ইংরেজ সরকার তাঁর পর পর তিন খানা নাটক নিষিদ্ধ করে দেয়। স্বামী বিবেকানন্দের ধর্মপ্রচার নিয়ে পাতার পর পাতা লেখা হয়, কিন্তু তাঁর সমাজতান্ত্রিক চিন্তাপ্রসূত লেখাগু্লো নিয়ে এরা নীরব। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী আলোচনা-য় দেশ এর পন্ডিত রঞ্জন চরিত্রের মধ্যে প্রকৃতির ছন্দ খুঁজে পান, যে প্রকৃতি মানুষের নিয়ম নীতির কারাগার ভেঙ্গে সুন্দরের জয় স্থাপিত করবে। অথচ সাধারণ মানুষ পড়লেও বুঝবে রবীন্দ্রনাথ পুঁজীবাদের কি অমোঘ মৃত্যুঘন্টা বাজিয়েছিলেন ওই নাটকে। এবং নাটকটা লেখা হয়েছিল রাশিয়া থেকে ফিরে এসে। সে বিষয়ে ওই পন্ডিতপ্রবরের কলম নীরব। এরাই দিনের পর দিন সুকান্ত ভট্টাচার্য কে বলে গেছে ইম্ম্যাচিওর কবি, যার কবিপ্রতিভা নাকি পাতে দেবার-ই যোগ্য নয়। নজরুল-ও তাই। এখন তো আবার এদেরি একদল ঐতিহাসিক উঠেপড়ে লেগেছেন এটা প্রমাণ করতে যে বাংলার নবজাগরণ ব্যাপারটাই ভুয়ো, উচচশ্রেণীর একদল বাঙ্গালীর ষড়যন্ত্র! এদের কাছে বিদ্যাসাগর ঔপনিবেশিক, কারণ তিনি সাঁওতাল পরগণায় দরিদ্র আদিবাসীদের নাকি মানুষ বলেই গণ্য করতেন না। এদেরি এক জাতভাই কয়েকবছর আগে বই লিখে প্রমাণ করে দিয়েছিলেন যে সিপাহি বিদ্রোহ আসলে একটা ভ্রান্ত কুসংস্কার মাত্র। বস্তুত তা ছিল একশ্রেণীর সামন্তপ্রভু দের মধ্যযুগ ফিরিয়ে আনবার জন্য ধর্মযুদ্ধ মাত্র। ব্যাস, আর কিছুই না! দেশ পত্রিকা বহুল প্রচার চালিয়েছিল সে বইয়ের। লজ্জার মাথা খেয়ে সেই ঐতিহাসিক আর এটুকু বলেন নি যে এহেন মধ্যযুগের বর্বরদের দমন করে ইংরেজ সরকার একটা মহৎ কাজ করেছিল!

তা বলে ত এটা নয় যে বঙ্কিম বা বিবেকানন্দের অব্জেক্টিভ বিচার হবে না! নিশ্চয় হবে। বঙ্কিমের ইতি আছে, নেতি আছে। প্রখর সাহিত্যদৃষ্টির পাশাপাশি প্রচন্ড মৌলবাদী বক্তব্য আছে। বিদ্যাসাগরের আছে, রবীন্দ্রনাথের আছে। প্রত্যেক যুগের সবচেয়ে অগ্রসর মানুষদের মধ্যে স্ববিরোধীতা লুকিয়ে থাকে। রামমোহন রায় সতীদাহ প্রথা রদের পাশাপাশি নীলকরদের বাংলায় নীল চাষের ইজারা দিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী-র পাশেই আছে প্রাচীন হিন্দু ধর্মের মহিমা কীর্তন করে সেই আর্য সমাজে ফিরে যাবার ডাক। সব দেশের সব কালের অগ্রসর আলোকপ্রাপ্ত মানুষের চরিত্রের মধ্যে একটা পিছুটান থাকে। টলস্টয়ের স্ববিরোধীতা লেনিনের ধৈর্যচ্যুতি ঘটিয়েছিল। মাও ল্যু সুনের উপর ক্ষেপে গেছিলেন। সবকিছুর-ই বিচার দরকার। কিন্তু কিভাবে? বঙ্কিম কে বোম্বে ফিল্মের চিত্রনাট্যকার বলে? রবীন্দ্রনাথের অন্য সব কিছু বাদ দিয়ে ভিক্টরিয়া ওকাম্পোর সাথে তাঁর প্রেম অথবা রাণু কে ভানুদাদা বা কাদম্বরী দেবির সাথে তিনি কি কি করেছিলেন শুধু তার রগরগে বিবরণ দিয়ে? মাইকেল কে সমকামী বলে? দেশ ও জাতির প্রতি এদের যে মহৎ কর্তব্য সেটা সবাই জানে বলে এড়িয়ে গিয়ে শুধু নেতির দিকগুলো বা চারিত্রিক অসংগতি তুলে ধরব, এই ধরণের কাজের পেছনে কি উদ্দেশ্য খেলা করে বুঝতে খুব অসুবিধে হয় কি?

শুধু আমাদের ঐতিহ্য? কবি শেলী-র জন্মের দ্বি-শতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে দেশ-এর বিশেষ সংখ্যায় শেলীর কি কি পরিচয় দেওয়া হল? শেলীর রোম্যান্টিকতা, প্রকৃতিপ্রেম, বিভিন্ন নারীদের সাথে তাঁর সম্পর্ক এসব। যেন শেলী মানেই এক নারীলোলুপ, মদ্যপ্রিয় ভবঘুরে। সুকৌশলে চেপে যাওয়া হল শেলীর বিপ্লবী দিকটা। শেলী যে নাস্তিকতার প্রয়োজনীয়তা নামের প্যাম্ফলেট প্রকাশের দায়ে অক্সফোর্ড থেকে বরখাস্ত হয়েছেন, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা সংগ্রামে যে অশক্ত শরীর নিয়েও ছুটে গেছেন, আগুনঝরানো ভাষণ দিয়েছেন ধর্ম ও বিপ্লব নিয়ে, ওড টু দা ওয়েস্ট উইন্ড কবিতায় সরাসরি ডাক দিয়েছেন বিপ্লবের, সে সব বিষয়ে আশ্চর্যভাবে চুপ দেশ পত্রিকা। মার্ক্স বলেছিলেন অষ্টাদশ শতকে বায়রন বেঁচে থাকলে হতেন এক অধঃপতিত বুর্জোয়া, আর জন্মবিদ্রোহী শেলী হতেন সমাজতন্ত্রের আগুয়ান সৈনিক। সেসব বিষয়ে কিন্তু দেশ পত্রিকার ওই পন্ডিত লক্ষ্যণীয়ভাবে নীরব!

এই হল আমাদের ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার বিষয়ে এদের মনোভাব। এদের হাতে বঙ্কিম আক্রান্ত, সুকান্ত আক্রান্ত, বিদ্যাসাগর, রামমোহন কেউ নিরাপদ নন। এই মুতসুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী, যাদের নিজেদের ঐতিহ্য-ই এখন তাদের অস্তিত্তের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ, চায় যেন তেন প্রকারে সেই ঐতিহ্য কে কালিমালিপ্ত করতে, আমাদের সংগ্রামী অতীত ভুলিয়ে দিয়ে একটা গোটা জাতিকে নিস্তেজ করে দিতে। আর সেই সংগ্রামী চরিত্র ভুলিয়ে দেওয়া, এবং আজকের মিছিল মিটিং এর প্রতি এদের যে বিষোদ্গার, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।

যেকোনো মিছিল, রাজনৈতিক মিটিং, পথসভার প্রতি এদের তীব্র অনীহা, কারণ তাতে সংগ্রামী মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধ রূপ ফুটে ওঠে। ৮ ফেব্রুয়ারি-র ব্রিগেডের পর এদের কাগজের হেডিং ছিল ব্রিগেড ঘিরে নাগরিক দুর্ভোগের ষোলো কলা পূর্ণ, উনুনে ঢালাও রান্না, পার্টি পুলিশ নিস্ক্রিয়। আর ছবি কি দেওয়া হল? সার সার গাড়ি দাঁড়িয়ে এসপ্ল্যানেডে, আর বাস ধরতে নাকাল জনতা। যানজট! মানুষের দুর্ভোগ! এসবের বাইরে আর কোনই ইস্যু নেই। একটা ছবি নেই মিছিলের, তাহলে তো মানুষের সংগ্রামী চেহারাটা ধরা পড়ে যাবে! প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এত মানুষ আসলেন, এক প্রতিবন্ধী যুবক পায়ে টানা সাইকেল চালিয়ে আসলেন, সে সব কোনো খবর দেওয়া যাবে না। তাহলে তো আনন্দবাজারের প্রচারিত নয়া জীবনবোধের হাওয়াবাজী ফেঁসে যাবে! কি দেখায় এই পত্রিকা? এদের শনিবারের বিশেষ সংখ্যায় খবর বেরত কলকাতা সাবালক হচ্ছে। কেন? নাইটক্লাব, ডিস্কথেক, তন্ত্র-মন্ত্রের উদযাপনে শহরের নিশিযাপন নাকি অনেক উত্তেজক এখন! যেন সব যুবক যুবতিদের এখন একটাই গন্তব্য, ডিস্ক! পাতার পর পাতায় শুধু সেসবের খবর, সুড়সুড়ি দেওয়া ছবি। এদের পত্রিকায় প্রকাশিত গল্প উপন্যাসেও দেখা যায় সেই একই অবক্ষয়ী মুল্যবোধের জয়জয়কার। অবৈধ প্রেম, হিন্দি ছবি মার্কা ভায়োলেন্স আর এদের মধ্যে যারা একটু নাকি চিন্তাশীল বলে খ্যাত, তাদের লেখায় দাম্পত্যের অখাদ্য থাবড়া-খাওয়ার যোগ্য মনস্তাত্তিক কচকচি। নাইটক্লাবে যাওয়া এক স্বল্প সংখ্যক তরুণের পাশাপাশি যে এক বিশাল সংখ্যায় মানুষ প্রতিদিন কারখানায় যাচ্ছে, কলম পিষছে, উদয়াস্ত জীবনসংগ্রামের মাঠে লড়াই করে চলেছে, সেসব লিখলে সে লেখা নাকি রাজনৈতিক ভাবে বায়াসড! আর অতদুরেই বা যাবার দরকার কি! যে ছেলে নাইটক্লাবে যায় দরকার পড়লে সেই অস্ত্র হাতে ব্যারিকেডে ছুটে যেতে পারে, কারন মানুষ আসলে সংগ্রামী। এরা সেই লড়াইটাই চেপে দেয়, তুলে ধরে শুধু তার নাইটক্লাব যাবার ছবি। আর এদেরি পেটোয়া শিল্পি-সাহিত্যিকরা প্রচার করেন যে কোনো প্রকার বাম বা ডানপন্থী শিবিরের অনুগত হওয়া নাকি উচিত নয়, তাহলে শিল্পের জীবনবোধ নাকি আহত হয় মতাদর্শের চাপে। অর্থাৎ রাজনীতির কাছাকাছি আসলে এনাদের সতীত্তে নিউমোনিয়া ধরে! উত্তর-গ্লোবালাইজেশন ভারতে যে সম্পন্ন মধ্যশ্রেণীর রমরমা এরা তাদের রাজনীতি ভুলিয়ে দেবার খেলায় নেমেছে। ব্রিগেডে দূষণ দেখিয়ে কি প্রচার হল? দেখ, রাজনীতি কতটা নোংরা, এর থেকে যত দূরে থাকা যায় ততই ভাল। খাও পিও অফিস কর পাব যাও, আর যদি সমাজ নিয়ে মাথা ঘামাতেই হয় তাহলে দলীয় রাজনীতি বর্জিত সুশীল সমাজের গলতায় ঢোকো। কারণ দলীয় রাজনীতি খারাপ লোকেদের জায়গা, শাইনিং ইন্ডিয়া সেখানে যাবে কেন? তাই এদেরি আশীর্বাদধন্য এক নাটক কলকাতার হ্যামলেট-এ কাকাতুয়ার মাথায় ঝুঁটি স্লোগান দিতে দিতে একদল মানুষ কলকাতার মিছিল সংস্কৃতি কে চুড়ান্ত অপমান করে বসে, অথবা উইঙ্কল টুইঙ্কল জাতীয় নাটকে সমস্ত রাজনৈতিক দলকে অধঃপতিত দেখিয়ে এক মহান অরাজনৈতিক আদর্শের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়। এরা সংরক্ষণ বিরোধী আন্দোলনে শামিল ছাত্রসমাজের সঙ্ঘবদ্ধ রূপ অক্লেশে দেখাতে পারে কাগজের প্রথম পাতায়, চীনার বিরূদ্ধে বিদ্রোহী তিব্বতি দের প্রতিবাদ আন্দোলনের ছবি ছাপতে পারে, কিন্তু খেটে খাওয়া শ্রমজীবি জনতার ছবি ছাপালে এদের হিক্কা ওঠে।

এই সূত্রেই গাঁথা এদের বইমেলা বিরোধীতা। ময়দানে বইমেলায় মফসসল থেকে মানুষ আসেন, হাতের কাছে পেয়ে যান অনেক বই। শুধু আনন্দের প্রভুদের নির্দেশিত বই-ই না, তার বাইরেও অসঙ্খ্য বই ও লিটল ম্যাগাজিন কাছে চলে আসে। কিন্তু এত মানুষের চেতনা যদি এরকমভাবে জাগরিত হয়, তাহলে এদের ধর্মে সইবে কেন? এর থেকে অনেক ভাল দিল্লী টাইপের কর্পোরেট অধ্যুষিত বইমেলা, যেখানে সাধারণে ঢুকতে ভয় পাবে। গ্রাম গঞ্জ মফসসলের মানুষের নাগালের বাইরে যেখানে শুধুই বিগ পাবলিশিং হাউসের একছত্র বাজার। পরিবেশ দূষণের অভি্যোগ তো একটা অজুহাত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আদি দেশগলো প্রতিদিন যে বিলিয়ন বিলিয়ন টন বর্জ্য ফেলে সমুদ্রের বুকে, কারখানার আবর্জনা থেকে শুরু করে আমাজন অরণ্য কেটে সাফ করে রাবার প্ল্যান্ট বসিয়ে, ক্যান ক্যান বিয়ারের টিন ফেলে, ব্রাজিলের মাইলের পর মাইল কফি ক্ষেতে বোমারু বিমান থেকে বোমা ফেলে জ্বালিয়ে দিয়ে, পরিত্যক্ত পারমাণবিক চুল্লি্র রেডিয়েশন থেকে, সে বিষয়ে সুভাষবাবুরা নীরব কেন? সেগুলো সম্বন্ধে যা খবরাখবর দেবার সেটাও তো পেতে হয় সেই ঘৃণ্য নন্দন দেশহিতৈষী বা প্যামফ্লেটগুলো থেকেই। সুভাষবাবু পারবেন, এগুলোর বর্তমান হালহকিকত সম্বন্ধে কোনো খবরাখবর দিতে?

ব্রাজিলের আমাজন অরণ্য সাফ করে রাবার প্লান্ট স্থাপন করে অরন্য উচ্ছেদ ও আদিবাসি নির্মূলের মার্কিন বিগ ক্যাপিটালিস্ট ভেনচারের বিরুদ্ধে যে আদিবাসি-শ্রমিক যৌথ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলনের নেতা সোসালিস্ট ওয়ার্কার পার্টির সদস্য চিকো মেন্দিস কে ১৯৮৮ সালে পূঁজিপতি দের ভাড়াটে গুন্ডারা হত্যা করে, এবং মেন্দিসকে তারপর থেকে গণ্য করা হয় সারা পৃথিবীতে পরিবেশরক্ষার আন্দোলনের প্রথম শহীদ হিসেবে। সেই চিকো মেন্দিসকে নিয়ে সুভাষবাবু বা আনন্দবাজার পত্রিকা ঠিক কতগুলো লাইনে খরচ করেছিল, এই হিসেবটা সুভাষবাবু যদি আমায় দেন, খুব ভাল হয় তাহলে। পরিবর্তে বইমেলায় বা ব্রিগেডে পরিবেশ দূষণ নিয়ে সুভাষবাবু বা আনন্দবাজার যা যা বলেছে এ পর্যন্ত, সব পরপর উনি চাইলে সাজিয়ে দেব আমি। কাগজের একপাশে থাকবে তারিখ, অন্যপাশে থাকবে সেই তারিখে কি কি সুভাষিতাবলি বর্ষিত হয়েছে, তার বিবরণ।

আসলে সরকারি উদ্যোগে যে কোন সুস্থ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই খোলা বাজারের ফেরিওয়ালাদের গায়ে ফোস্কা পড়ে। প্রতিবছর নন্দনে ফিল্মোতসব-এর সময় দেশ-এ সুচিন্তিত মতামত পড়ে, এভাবে সরকারী অর্থের নয়ছয় করে উতসব না করে বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলে মানুষের সুবিধে হয়, সরকারের দায় কমে, আর ফিল্মের গুণগত মান বাড়ে। বেসরকারি হাতে ছেড়ে দিলে যদি সবকিছুর গুণগত মান বাড়ত তাহলে জানতে ইচ্ছে করে ওদের আনন্দলোক সীরিয়াস ফিল্মের পত্রিকা না হয়ে ওরকম একটি ভীষণ বস্তু হয়ে উঠল কেন! দেশ-বিদেশের ভাল ফিল্ম সম্বন্ধে এক লাইন-ও না লিখে শুধু বলিউডের নায়িকাদের শরীরবর্ণনা কেন! বেসরকারি মালিকানাতে প্রকাশিত কতগুলো বাণিজ্যিক পত্রিকা তে গদার, কপোলা, ফেলিনি, বার্গম্যান, নিদেনপক্ষে শ্যাম বেনেগালের কোনো ছবি নিয়ে আলোচনা হয়?

সুভাষ দত্তরা আসলে তুচ্ছ, ভাড়াটে সৈন্য মাত্র। এরা যে দিকে সুবিধে পাবে সে দিকেই ঝুঁকবে। এর থেকে অনেক বেশি উদবেগের হল গোটা রাষ্ট্রব্যাবস্থা যেরকমভাবে এক এক করে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে, সেই বিষয়টা। প্রথমে মিছিলের ওপর নিষেধাজ্ঞা, তারপর ধর্মঘটের অধিকার, তারপর দেওয়াললিখন (মানে সাধারণ মানুষ দেওয়াল থেকে জানতে পারবে না কোন রাজনৈতিক দলের কোন প্রার্থী, মিটিং মিছিল ত আগেই নিষিদ্ধ। যাদের ক্ষমতা আছে তারা জানবে টিভি থেকে, যাদের নেই, তাদের আর রাজনীতি সচেতন হয়ে কি লাভ!), তারপর অতি সম্প্রতি জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি তে ছাত্রদের ভোটাভুটি নিষিদ্ধ করে দেওয়া, তারপর এখন কোপ পড়েছে ব্রিগেডে মিটিং এর ওপর। আর সবক্ষেত্রেই এই মিডিয়াগুলো ঢক্কানিনাদ তুঙ্গে তুলছে- ছাত্র রাজনীতি নোংরা, দেওয়াললিখন বর্বর দেশের কাজ, মিছিলে নাগরিক জীবন বিপর্যস্ত হয়। বড় ভয়ঙ্কর খেলায় নেমেছে এরা।একদিকে গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ, অন্যদিকে আমাদের সংগ্রামী অতীত ভুলিয়ে দিয়ে মতাদর্শগত দিক দিয়ে পঙ্গু করার প্রয়াস। এই কাজে এদের স্বাভাবিক মিত্র দিল্লীর জোতদার-জমিদার শ্রেণী ও তাদের পৃষ্ঠপোষক ইয়াঙ্কি মতবাদ, আর সবচেয়ে বড় শত্রু বামপন্থীরা। কারণ ইতিহাস সাক্ষী, কোনো দেশের ঐতিহ্য সংস্কৃতি সবচেয়ে নিরাপদ কম্যুনিস্টদের হাতে। আমাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান সংস্কৃতির মহত্তম ধারক ও বাহক এই কম্যুনিস্টদের উচ্ছেদ করলেই অতীতের বিযুক্তিকরণ সম্ভব। তাই চোরাগোপ্তা মার। মিছিলের ওপর চোখরাঙ্গানি। তাই সুহৃদ দত্তরা আক্রান্ত হন। লালগড় বান্দোয়ান জুড়ে বামপন্থী কর্মীদের খুন হতে হয়। রবীন্দ্রনাথ পুড়তে থাকেন, বিবেকানন্দকে নিয়ে আস্ফালন করার সাহস রাখে গৈরিক বাহিনী। বইমেলা আক্রান্ত হয়। আমাদের সমস্ত লড়াইয়ের ইতিহাস, সিপাহী বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, তীতুমীর, সন্ন্যাসী বিদ্রোহ, স্বাধীনতা আন্দোলন, সবের ওপরে কালি ছিটিয়ে চলে মুতসুদ্দিরা। আর শুদ্ধ পুঁজির দিবাস্বপ্নে ভরপুর খোলা হাওয়ার এই ফেরিওয়ালারা আরো একদিন, আরো একবার আমাদের সমস্ত নাগরিক অধিকার কেড়ে নিয়ে স্ট্রীপ করায়।

আমাদের সামনে দুটো রাস্তা, বরাবরের মতই। মেনে নেওয়া অথবা রুখে দাঁড়ানো। মেনে নিলে সুভাষ দত্ত দের খুব সুবিধে হয়, আমাদের ক্লান্ত রূগ্ন অবক্ষয়ী জীবনযাত্রার ডকুমেন্টেশন আর গ্লোরিফিকেশন, দুটোই সার্থক হয়। আর যদি উল্টো রাস্তা বেছে নিতে হয়, তাহলে দেশানন্দের সমান্তরাল সাংস্কৃতিক ধারা গড়ে তুলতে হবে। আমাদের আলোকপ্রাপ্ত অতীত যাতে কিছুতেই বৃহত পুঁজির হাতে হাইজ্যাক না হয়, নজর রাখতে হবে সেদিকে। ওরা যত মিছিল নিয়ে চেঁচাবে, আমরা তত বেশী মিছিল বার করব। তীতুমীর, লালন, নজরুল থেকে আইপিটিএ পর্যন্ত আমাদের সমস্ত মহত্তম পুর্বসাধকদের নাম স্লোগানের মত ছুঁড়ে দেব ওদের মুখের ওপর। দেওয়াল রাঙ্গিয়ে তুলব স্লোগান, পোস্টার আর গ্রাফিত্তি তে। রবীন্দ্রনাথ আমার, বঙ্কিম আমার, বিবেকানন্দ, ক্ষুদিরাম, সূর্য সেন সব আমার। এই ব্রিগেড, এই পরিবেশ, এই সবকিছুই আমাদের। একে রক্ষার দায়টাও আমাদের। আমরাই একে বাঁচাব। ব্রিগেডের আকাশ বাতাসে আগুন লাগিয়ে দেব লাল নিশানের রক্তে। চিকো মেন্দিসের হত্যাকারী আর তাদের ভাড়াটে পরিবেশবিদের সাধ্য হবে না ভবিষ্যতে পরিবেশের নাম মুখে আনতে!

আর যদি কিছুই না করে চুপচাপ সব মেনে নেই? সেটা তুলনামূলক সহজ রাস্তা। করতেই পারি। শুধু এক তথাকথিত অনামা লেখকের দুটি লাইন নিজেদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাইঃ আপনি যখন স্বপ্নে বিভোর কোল্ড ক্রীম তখন আপনার ত্বকের গভীরে কাজ করে। আপনি যখন সুপ্ত অচেতন শোষক কীট তখন আপনার সর্বাঙ্গ কুড়ে কুড়ে খেয়ে ফেলে। আমরা যখন আকাশের আনন্দে মগ্ন ফ্যাসীবাদ তখন নিঃশব্দে প্রবেশ করে।

রক্ত থামার পর ~ দেব সরকার

রক্ত থামার পর
নৈরাজ্যের ধান ছিটকে আসুক
এ দলীয় বুকে...
বেলমুড়ি স্বাক্ষ্য হয়ে থাক
কেরোসিনের দাহ্য নিয়তিতে,
ক্ষত সামলে চিহ্নিত আমি
প্রমাণ দেবো না -
কোনো গৃহবধুর কালো ঘা!
প্রমাণ দেবো না
কোনো আশৈশব জ্বলতে থাকা চারটে বছর!

আমার গর্ভের ভ্রূণ গর্ভে বাঁচেনা
আক্রমণ...
আক্রান্ত...
সাধুবাদের স্বপ্নে চান করি দুটো প্রাণ
আগুনে,
আগুনে...

ওদের কালো হাত প্রতিশ্রুতি দেবে!
ঈশ্বরের পতাকা ছেড়ে বলতে হবে -
"মোগো আশ্রয় শয়তানের ঘরে!"
না... না... কখনোই নয়...
হয়তো জীবনের সম্ভ্রান্ত ফুল ঝরে যাবে
ঝরণার মত নেবে যাবে রক্তিম ছায়াপথ,
তবুও শহীদ হতে চাই প্রতিদিন
কারণ -
পোড়া... পোড়া... আধপোড়া চামড়া ফেটে
চিতিয়ে ওঠা রক্তের রঙ -
"মোগো পতাকার সাথে মেলে..."

তাই চিরকাল বাঁচো তুমি আমার স্বরাজ
বামের প্রতিনিধি হয়ে...

প্রশ্নগুলো সহজ আর...