মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

জে এন ইউ ~ পরিচয় পাত্র

নিজস্ব সংবাদদাতাঃ রতন টাটার পরেই এক বিশেষ টুইট ঘোষণায় জেএনইউয়ের ছাত্রদের নিয়োগ করতে অস্বীকার করেন অ্যাপল আবিষ্কর্তা স্টিভ জোবস। জোবসের এই ঘোষণার পরে সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁকে বিরাট হিন্দু বলে দাবী করেন আদিত্যনাথ এবং (বিজয়)বর্গী। এইসময় জোবসের বায়োলজিক্যাল পিতা মধ্যপ্রাচ্যের লোক এই তথ্য উপস্থিত সাংবাদিকরা জানানোয় বর্গীরা উদাসীন হয়ে পড়েন। এরপর তাঁদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটিতে যত্রতত্র ফ্রি সেক্সের কুফল সম্পর্কে আলোচনা করতে দেখা যায়।

মার্ক জুকারবার্গ ঘোষণা করেন দেশভক্তিহীনদের ফেসবুক প্রোফাইল গায়েব করে দেওয়া হবে। পরীক্ষামূলকভাবে শুরুতেই উমর খালেদ এবং ধ্রুপদী ঘোষের প্রোফাইল গায়েব করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর এই উষ্মার কারণ ফ্রী বেসিকসের ট্রাইতে পরাজিত হওয়া কিনা তা জানতে চাইলে জুকারবার্গ হাত তুলে বলেন, "থাক, আর গভীরে যাওয়ার দরকার নেই"। 

মানবসম্পদোন্নয়নমন্ত্রী একটি প্রেস রিলিজে জানিয়েছেন আলোচ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের পাঠ্য তালিকায় 'তারাপীঠের বামাবতার' এবং সাহিত্য বিভাগে দেশের প্রথম এবং একমাত্র সচিত্র ইন্দ্রজাল কমিক্স 'বাল নরেন্দ্র' বইদুটি যোগ করা হবে।

ওয়েটলিস্টেড মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী থেকে আরএসি (রিজার্ভেশন এগেনস্ট ক্যানসেলেশন) মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী পদে প্রোমোশনপ্রাপ্ত মধু কিশওয়ার তাঁর আকস্মিক পদোন্নতির জন্য বর্তমান মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। বর্তমান মন্ত্রী তাঁর পদের উপযুক্ত কিনা জানতে চাওয়া হলে দৃশ্যত উত্তেজিত মধু বলেন "কালে কালে কত হল কাল কাল রাতি/মোগল পাঠান হদ্দ হল ফার্সি পড়ে তাঁতি"।

আবিশ্ব বিভিন্ন নেতা দিল্লির সংগ্রামী উকিল, পুলিশ এবং এবিভিপিকে অভিনন্দন জানান। এক তারবার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এদের চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ আইভি লীগ ইউনিভার্সিটি উকিল-পুলিশের বিরুদ্ধে গিয়ে জেএনইউকে সমর্থন করেছে জানায় উত্তেজিত ট্রাম্প বলেন তিনি ক্ষমতায় এসে কলাম্বিয়া, শিকাগো সহ এইসব ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দেবেন। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে (বিজয়)বর্গী বলেন ইউনিভার্সিটি ভাল নহে, সেখানে সকলে সেক্স করে, ইউনিভার্সিটি না থাকিলে জোবস এবং তাহার আপেল কেহই থাকিত না।

অ্যান্টার্কটিকা সফররত প্রধানমন্ত্রী স্বল্পকালীন ভারত সফরে এলে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সাংবাদিকরা তাঁকে ছেঁকে ধরলেও তিনি তাঁর পূর্বসূরির মত মৌনব্রত অবলম্বন করেন। তাঁর সঙ্গে দফায় দফায় অন্য মন্ত্রীদের বৈঠক হয়। পরে এক প্রকাশ্য জনসভায় প্রধানমন্ত্রী জানান জরুরি অবস্থার স্মৃতিবিজড়িত ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্ট থাকুক এটা তিনি চান না। যেহেতু জরুরি অবস্থার আরেক স্মৃতি বাজপেয়ীজির স্মৃতি লোপ পেয়েছে তাই এয়ারপোর্টের নাম বদলালেই জরুরি অবস্থা স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন ২০১৯ এর নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় ফিরলেই ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নাম বদলে দেওয়া হবে।

২০১৯ এ তাঁরা ক্ষমতায় ফিরবেন কিনা এই প্রশ্ন তোলায় প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। এইসময় দৃশ্যতই ঘর্মাক্ত প্রধানমন্ত্রীকে গলায় জড়ানো জাতীয় পতাকায় ঘাম মুছতে দেখা যায়। এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য ইশারা করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আবেগঘন কণ্ঠে 'একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি' গানটি পরিবেশন করেন। 

যোগগুরু রামদেব জানিয়েছেন সমকামিতার মতই সোশ্যাল সায়েন্স এবং সামগ্রিকভাবে ইউনিভার্সিটি একটি রোগ। এই রোগের উপশম কিভাবে হতে পারে জানতে চাওয়া হলে তিনি সর্বসমক্ষে তাঁর বিখ্যাত গেরুয়া লুঙ্গিটি পরে শীর্ষাসন করেন।

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

পেট্রোল - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা বড় বড় পাথরের টুকরোর আড়ালে দু চার জন করে সৈনিক বসে আছে চারিদিকে চোখ ধাঁধানো সাদা। বরফের পুরু আস্তরন সব কিছুর ওপর। এই ধপধপে সাদার ওপর সূর্‍্যের রোদ পড়লে সেদিকে খালি চোখে তাকানো মুশকিল। তাই সব ফৌজির মুখেই, কপাল থেকে গাল পর্যন্ত বিশাল বড় আর  মোটা কালো চশমায় ঢাকা। একে সকলেই সাদা হাই অল্টিচিউড ফৌজি উর্দী পরে আছে। মাইনাস চল্লিস কি পঞ্চাশ ডিগ্রিতে দাড়ি গোঁফ কামানোর প্রশ্নও ওঠেনা। তার ওপর মুখের আধখানা ঢাকা বিশেষ ভাবে তৈরি রোদ চশমায়। কাজেই সকলকেই কেমন এক রকম দেখতে লাগছে। তবুও ফৌজিরা নিজেদের চিনে নেয় কোনো ভাবে। ওই যে লোকটা একবালতি বরফ নিয়ে অল্প লেংচে লেংচে আসছে গরম করে খাবার জল তৈরি করবে বলে, ও হলো হাবিলদার রামদত। অনেক উঁচু থেকে দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে পড়ে গিয়েছিল। সে আঘাত এখনো সারেনি হয়ত। তাই চলার সময় খুব ভাল করে নজর করলে ওকে হালকা ল্যাংচাতে দেখা যায়। সামনে প্যাকিং বাক্সর ওপর বসে থাকা লেফটেন্যান্ট চেঁচিয়ে রামদতকে চা চাপাতে বললেন। ইনিই বোধহয় এ চৌকির কম্যান্ডার। এ জায়গাটা বোধহয় পাকিস্তানি ফৌজের সরাসরি গুলির পাল্লার বাইরে। কারন এখানে লোকজন বাংকার বা পরিখার মধ্যে ঢুকে বসে নেই। বরং বেশ নিরাপদেই ঘুরছে। লেফটেন্যান্টের উর্দীতে নামের ট্যাগটা পড়া যাচ্ছে। রাজীব পান্ডে। আইডি আর ট্যাগ খুঁটিয়ে দেখে লেফটেন্যান্ট তাকালেন সামনের দিকে -

শুক্রবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

মনে পড়ে? ~ সুশোভন পাত্র

ডিয়ার ম্যাডাম, অজিত লোহার কে মনে পড়ে? পড়ন্ত বিকেলে, লোডশেডিং'র অন্ধকারে, অজ গাঁয়ের হাসপাতালে যখন আনা হয়েছিল নিথর দেহটা, তখনও অবশ্য আপনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথই গ্রহণ করেননি। বিজয়োল্লাসে আপনার দুষ্টু, দামাল ভাইরা স্রেফ পিটিয়ে খুন করলো অজিত লোহার কে। আপনার মনে আছে বর্ধমানের পূর্ণিমা ঘড়ুই কে? কিম্বা গড়বেতার জিতেন নন্দী কে? 

জানেন ম্যাডাম, মধ্যমকুমারির জঙ্গলে সালকু সরেনের মরদেহটা যখন পাওয়া গেলো তখন তাঁর গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ। সবার চোখের সামনে লাশটার শরীরের চামড়া পচে গলে যাচ্ছে, পোকাতে কুরে কুরে খাচ্ছে সারা দেহ, চোখ গুলো ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসছে, চারিদিকে দুর্গন্ধ। অথচ মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, মৃতদেহ সৎকারে সাহস করছে না ধরমপুর গ্রামের কেউ! আপনার মনে পড়ে ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের কথা? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা। ২০০১-১১ দশ বছরেই জঙ্গলমহলে ২৩ ব্লকে মাওবাদীদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন ২৭৫ জন। আর আপনি বলেছিলেন "মাউ-ফাউ কিছুই নেই"। গত পাঁচ বছরে অজিত লোহারদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৫। সর্বশেষ সংযোজন উচিতপুর গ্রামের শীর্ণকায়,এই স্বপন মালিক। আপনার কাছে দু-মুঠো চাল-ডাল চাইতে গিয়ে গুলি-বোমা আর রক্তে মাখা হয়ে মরলো যে। 

আজ লাল পতাকায় মোড়া স্বপন মালিকের নিশ্চল দেহটা যখন বর্ধমান মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে শেষ বারের মত বেরোল আপনি তখন নেতাজী ইন্ডোরে দলের কেষ্ট বিষ্টু-দের সাথে আপকামিং 'অল ইম্পরট্যান্ট ইলেকশনের' রণকৌশল তৈরিতে ব্যস্ত। আপনি এখন মুখ্যমন্ত্রী, সর্বময়ী নেত্রী। আপনি ব্যানার, আপনিই পোস্টার। আপনি বিজ্ঞাপন, আপনিই সরকার। আপনিই মালিক। আপনি রাখলে রাখবেন। মারলে মারবেন। শুধু বলে দিন এই স্বপন মালিকের লাশের সাইজটা কেমন? সুদীপ্তর মতই 'ছোট্ট'? সৈফুদ্দিনের মতই 'তুচ্ছ'? না প্রদীপ তা-কমল গায়েনের মত 'বিক্ষিপ্ত'? 

৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯। ম্যাডাম, আপনি তখনও আঁতুড় ঘরে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনবিরোধী খাদ্যনীতির বিরুদ্ধে বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিনেই ১৫ দফা মুলতুবি প্রস্তাব জমা পড়ে ১১ টি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। স্পিকার শঙ্করদাস ব্যানার্জি বিবেচনা প্রস্তাব দিলেও পরে তা অস্বীকার করেন। ২৫'ই জুন রাজ্যব্যাপী ধর্মঘট ও হরতালের পর বামপন্থী দলগুলি ২০'ই অগাস্ট থেকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভাবে খাদ্যের দাবীতে গনআন্দোলনের ঘোষণা করে। আতঙ্কিত সরকারের আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় প্রমোদ দাসগুপ্ত, হরেকৃষ্ণ কোঙার, হেমন্ত বসু,  জ্যোতি বসুর নামে।  নিরঞ্জন সেন, গণেশ ঘোষ, বিনয় চৌধুরী, গীতা মুখার্জি, প্রশান্ত শূর সহ ২৭ অগাস্ট অবধি রাজ্য জুড়ে মোট গ্রেপ্তার হন, ৭০,০০০। ৩১'শে অগাস্ট খাদ্য-মন্ত্রীর অপসারণ ও খাদ্যের দাবীতে শহীদ মিনার ময়দানে ৩ লক্ষ মানুষের ব্যাপক জমায়েতের মহাকরণ মুখী অভিযানে গুলি চালায় পুলিশ। আহত সহস্রাধিক। ১৩০ জন আশঙ্কাজনক। পরে শহীদ ৮০ জন। ১'লা সেপ্টেম্বর পুলিশের এই হিংস্র তাণ্ডবের বিরুদ্ধে আবার গুলি চালায় পুলিশ। নিহত আরও ৮। আহত ৭৭। জারি হয় ১৪৪ ধারা। ২১'শে সেপ্টেম্বর খাদ্য আন্দোলন  শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বিধানসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করতে অস্বীকার করে কংগ্রেস। বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ও। হতাহতের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন পুলিশ-মন্ত্রী কালি মুখার্জি। 

কেমন লাগবে বলুন, যদি স্পার্টাকাসের জন্য দু মিনিট নীরবতা পালন করতেন জুলিয়াস সিজার? সিপাহী বিদ্রোহের শহীদ মঙ্গল পাণ্ডের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধায় নিজের রত্নখচিত বহুমূল্য মুকুট থেকে রানী ভিক্টোরিয়া খুলে ফেলতেন বেশ কিছু মরকতমণি? হিরোশিমা-নাগাসাকির পরমাণু বোমার জন্য শোকপ্রস্তাব এনে নীরবে অশ্রু ঝরাতেন মার্কিন কংগ্রেসের সনেট বৃন্দ? 

তাই ম্যাডাম, আপনি স্বপন মালিকদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করবেন না। খবরদার করবেন না। ওঁদের জীবনের মূল্য যখন লাল ঝাণ্ডা, অধিকার আদায়ের রং যখন লাল ঝাণ্ডা, ন্যায্য চাল-ডালের ছিনিয়ে নেওয়ার রং যখন লাল ঝাণ্ডা, শহীদের রক্তে ভেজা যে লাল ঝাণ্ডা তখন আপনি দুঃখ প্রকাশ করে ওঁদের অসম্মান করবেন না। লালঝাণ্ডার অপমান করবেন না। ইতিহাসই ওঁদের মনে রাখবে। ইতিহাসই ওঁদের বাঁচিয়ে রাখবে। আর মানুষ আপনার বিচার করবে।করবেই ...

অথ রেশন কথা ~ অনামিকা

চাইলে রেশন মরতে হবে, বুঝিয়ে দিল রায়না
নেহাত ছোট্ট দুর্ঘটনা বুঝতে কেউই চায় না।

ভোট এসেছে, গদির দখল রাখতে হলে আজ যে
ভরসা নিছক বোমা-বুলেট, জিগির সারা রাজ্যে।
সবাই নাকি জোট বেঁধেছে, বুঝছে না তো বোকারা
অবাধ্যদের মরতে হবেই, যেমন মরে পোকারা।
বাঁচতে হলে ভক্তিতে নয়, শুদ্ধ ভয়েই কাঁপো।
কলেজমোড়ে পাড়ায় ঘোরে হাজারটা গেস্টাপো।

চাকরি চাওয়া খাবার খোঁজা, ফালতু এ'সব বায়না।
উন্নয়নের রক্তধারায় ভিজতে থাকুক রায়না।

মৃত্যুশীতল গ্রামবাংলার অশ্রু পরুক চলকে।  
সাধ্যটি কার সামলাবে এই ডালকুত্তার দলকে?
একটা কণ্ঠ মানুক সবাই, একটা থাকুক পার্টি,
উঁচিয়ে আঙুল নির্দেশ দেয় মহিলা হিটলারটি।
নিজেও তবু কাঁপছে রানী নিজের ভেতর আজ।
নিজের ধ্বংসআভাস সে ঠিক পেয়েছে আন্দাজ।

রাক্ষসীরূপ দেখছে রাণী, সামনে ধরে আয়না।
কাঁদছে শোকে… ফুঁসছে ক্রোধে, প্রতিবাদের রায়না।

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬

একবগ্‌গা - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

বাবুসোনা ইশকুলে রোজ মার খেতো। মার বলে মার? সাধু স্যারের খেজুর ছড়ির মার, হেডস্যারের ডাস্টারের বাড়ি, লক্ষিকান্ত স্যারের কানমোলা, এমনকি রামচন্দ্র স্যারের মত ভালমানুষ লোকের কাছেও চড়-থাপ্পড় জুটিয়ে নিত কিছুনা কিছু করে। কিন্তু এত মার পড়া সত্ত্বেও বাবুসোনা একটা দিনের জন্যেও বদমায়েশি বন্ধ করেনি। মার খেয়েও বসে পড়তনা, মার এড়াতে চেষ্টা করতনা। চোখে চোখ রেখে শাস্তি নিতো প্রতিবার। ক্লাস সিক্সে উঠে দুজনের আলাদা আলাদা ইশকুল হয়ে গেল। মাঝের ক বছর আর তার দেখা পাইনি। শেষে উচ্চমাধ্যমিকের সময় আবার দুজনে একই ইশকুলে একই ক্লাসে এসে বসলুম। তখন অবিশ্যি বয়স অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু কদিন যেতেই বুঝলুম, বাবুসোনা বদলায়নি। নিয়ম না মানায় সিদ্ধহস্ত বাবুসোনা নিয়ম করে কিছুনা কিছু করে বসত যাতে গোটা ইশকুলে হুলুস্থুলু । হাজার শাস্তি পেয়েও সে শুধরোয়নি। এরকম একবগগা ছেলে খুব কমই দেখেছি।  

সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৬

নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য ~ পুরন্দর ভাট

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ফাইল প্রকাশ হওয়ার পর সেই নিয়ে অনেকের মতো আমারও কৌতুহল ছিলো। গত দু দিন ধরে মোটামুটি গোটা পঞ্চাশেক প্রকাশিত নথি ঘেঁটে দেখলাম। প্রচুর সময় গেলো কিন্তু সুভাষ বসু আমার মত কিঞ্চিত মানুষের কাছে এইটুকু সময় এবং মনোযোগ অবশ্যই দাবি করেন। জানি না যারা এই ফাইল প্রকাশ করে সুভাষ বসুকে নিজেদের লোক দেখানোয় সবচেয়ে উত্সাহী সেই দেশপ্রেমিকরা আদেও একটিও ফাইল পড়ে দেখেছে কিনা।

ফাইলগুলো দেখে যা বুঝলাম তা হলো প্রায় ৯৯%-ই অত্যন্ত সাধারণ ফাইল। এগুলো এতদিন সিক্রেট নথি হিসেবে লোকানো থাকার ব্যাখ্যা একটাই তা হলো বেশিরভাগ নথিতেই বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে কিছু যোগাযোগের রেকর্ড রয়েছে এবং কুটনৈতিক নিয়ম মেনে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। কোনো ফাইলেই গোপন কোনো ষড়যন্ত্রের হদিস এখনো অবধি নেই। ফাইলগুলি পড়তে পড়তে বার বার যেটা মনে হচ্ছিলো যে নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য ভেদ করতে এতো মানুষ এতো সময় ব্যয় করেছে যে গোটা বিষয়টা অপচয় বলেই মনে হয়। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী, বিশেষ করে নেহেরুর লেখা গুচ্ছ চিঠি আর তত্পরতা দেখে সত্যি যে কারুর মনে হবে যে সদ্য স্বাধীন হওয়া দরিদ্র্য এক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কি এইরকম একটা বিষয় নিয়ে এতোখানি সময় ও মনোযোগ ব্যয় করা সাজে? সুভাষ বসুর অন্তর্ধানের পেছনে নেহরুর কিছু ষড়যন্ত্র আছে এই অভিযোগ অসত্য প্রমান করতেই বোধয় উনি এতখানি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা আর যত্ন নিয়েছিলেন রহস্যের সমাধান করতে। আরো আশ্চর্য্যের বিষয় হলো যে যখনই বিষয়টার একটা নিষ্পত্তি করে নেতাজীর স্মৃতিকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার তখনই একাধিক জন মামলা মোকদ্দমা করে ফের বিষয়টাকে ঘেঁটে দিয়েছে এবং পাছে নেতাজীর অপমান হয় এই ভয়ে সরকারও এইসমস্ত গুচ্ছের মামলা মোকদ্দমাকে গুরুত্ব দিয়ে অভিনিবেশ করেছে। সমস্তটা দেখে এটাই বার বার মনে হচ্ছিলো যে দেশের এতো সমস্যা যেখানে সরকারের মনোযোগ পায় না সেইখানে এই বিষয় নিয়ে এতখানি সময় দেওয়া বোধয় বাহুল্য।

যাই হোক, আনন্দবাজার এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে দেখলাম নেহরুর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলিকে লেখা একটা চিঠি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্ঠি হয়েছে। চিঠিতে নেহেরু নেতাজীকে "যুদ্ধ অপরাধী" বলে সম্মোধন করেছেন। চিঠির বয়ানটি হলো :

"Dear Mr Attlee,
I understand from reliable sources that Subhas Chandra Bose, your war criminal, has been allowed to enter Russian territory by Stalin. This is a clear treachery and betrayal of faith by the Russians as Russia has been an ally of the British-Americans, which she should not have done. Please take note of it and do what you consider proper and fit."
Your's Sincerely,
Jawaharlal Nehru

কংগ্রেস বলেছে এইরম কোনো চিঠি নেহেরু লেখেননি। আমি ফাইল ঘেঁটে এই চিঠি তিন জায়গায় পেলাম। এই তিন জায়গা বাদ দিয়ে এই চিঠি আর কোথাও নেই। আপনারা খুঁজে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারেন অথবা আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন।

১. এই চিঠির প্রথম উল্লেখ রয়েছে শ্রী রুদ্রজ্যোতি ভট্টাচার্য্যের ১৯৯২ সালে করা কলকাতা হাই কোর্টে একটি পিটিশনে (লিংক: http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html…)। সেই সময় নেতাজীকে মরনোত্তর ভারত রত্ন দেওয়ার কথা উঠেছিলো সরকার থেকে আর তা ঠ্যাকাতে বেশ কিছু মামলা হয় যার মধ্যে এইটি একটি। এই পিটিশনে কিন্তু সরাসরি বলা হয়নি যে নেহেরু এরকম কোনো চিঠি দিয়েছিলেন। যা বলা হয়েছে তা হলো ১৯৭০-এ গঠিত খোসলা কমিশন, যার কাজ ছিলো নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যভেদ, সেই কমিশনের সামনে নেহরুর ব্যক্তিগত স্টেনোগ্রাফার শ্যামলাল জৈন এইরম একটা চিঠি টাইপ করার কথা বলেছেন। যে বয়ানটা ওপরে দিলাম নেহেরু সেই বয়ানটি একটি প্যাডে হাথে লিখে শ্যামলালকে দেন এবং তিনি সেটা টাইপ করে নেহরুকে ফেরৎ দেন। নেহেরু তারপর সেই চিঠি নিয়ে কি করেছিলেন শ্যামলাল জানেন না। শ্যামলাল কিন্তু এই বয়ান স্মৃতি থেকে বলেছেন খোসলা কমিশনের কাছে, তাঁর কাছে সেই চিঠির কোনো প্রমাণ নেই। যদি ধরেও নি যে শ্যামলাল সত্যি বলেছেন তবুও ১৯৪৫-এ লেখা একটি চিঠি হুবহু ১৯৭০-এ এসে স্মৃতি থেকে আওড়ানো সোজা কথা না। কিছু শব্দের এদিক ওদিক যে হবেনা কেউই হলপ করে বলতে পারে না। যেটা আশ্চর্য্যের বিষয় তা হলো রুদ্রবাবু কোথা থেকে শ্যামলালের বয়ানের কথা জানলেন সেটা রহস্যময়। খোসলা কমিশনের রিপোর্টের মধ্যে শ্যামলালের বয়ানের কোনো উল্লেখ নেই। এই হলো খোসলা কমিশনের রিপোর্টের লিংক : http://subhaschandrabose.org/report-one-man-commission-inqu

২. দ্বিতীয়বার এই চিঠির উল্লেখ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে লেখা নেতাজীর ভাই সুরেশ চন্দ্র বসুর ছেলে প্রদীপ বসুর ৯৮ সালের একটি চিঠিতে (লিংক: http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html… , পৃষ্ঠা - ১১২)। প্রদীপ বসুও সেই খোসলা কমিশনকে দেওয়া শ্যামলাল জৈনের বয়ানকেই তুলে দিয়েছেন চিঠিতে কিন্তু তিনিও শ্যামলাল জৈনের বয়ানের কোনো রেফারেন্স দেননি, খোসলা কমিশনের রিপোর্টে ওই বয়ান কেনো নেই তাও লেখেননি।

৩. তৃতীয়বার এই চিঠির উল্লেখ রয়েছে আবার শ্রী রুদ্রজ্যোতি ভট্টাচার্য্যের করা ২০১৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টে একটি পিটিশনে। নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের কি কিনারা হলো তা জানতে চেয়ে সেই পিটিশন। এখানেও সেই শ্যামলাল জৈনের বয়ানকেই উধৃত করা হয়েছে যদিও শ্যামলাল জৈনের ওই বয়ান কোথায় পাওয়া গেছে তার কোনো উল্লেখ এখানেও নেই। (লিংক : http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html… ) যেটা আশ্চর্য্যের বিষয় তা হলো শ্যামলাল জৈনের ওই বয়ান কিন্তু আদেও গোপন কিছু নয়। যেহেতু হাই কোর্টের পিটিশন তাই সেটা পাবলিক ডকুমেন্ট এবং সেই ডকুমেন্টে শ্যামলালের বয়ানের উল্লেখ থাকবে। একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম যে যা সন্দেহ করেছিলাম তাই, এই পিটিশন নিচের দেওয়া India Kanoon ওয়েবসাইটে রয়েছে আর তাতে ওই শ্যামলালের তথাকথিত বয়ানও রয়েছে। অর্থাৎ নেহেরু সত্যি শ্যামলালকে এরকম বলেছেন কিনা জানা নেই আর শ্যামলালও এরকম কোনো কথা খোসলা কমিশনের কাছে বলেছেন কিনা তাও পরিষ্কার না কিন্তু এই তথাকহিত বয়ান পাবলিক ডকুমেন্টের মধ্যেই ছিলো, তার জন্যে ফাইল প্রকাশের প্রয়োজন ছিলো না। লিংক : http://indiankanoon.org/doc/176710997/

নেহেরু সুভাষ বসুকে যুদ্ধ অপরাধী বলেছেন এর কোনো সরাসরি প্রমাণই প্রকাশিত ফাইলে নেই, উল্টে যা আছে তা হলো সুরেশ চন্দ্র বসুর এক প্রশ্নের জবাবে নেহরুর চিঠি যাতে উনি লিখেছেন যে নেতাজীকে যুদ্ধ অপরাধী বলবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং অন্য কোনো দেশ যদি তা মনেও করে তাদের হাতে নেতাজীকে খুঁজে পাওয়া গেলে তুলে দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। নেহেরু গঠিত শাহ নওয়াজ কমিশনে সুভাষ বসুর দাদা সুরেশ চন্দ্র বসু একজন সদস্য ছিলেন এবং সেই কমিশনের কাজ শুরুর আগে তিনি নেহেরুকে প্রশ্ন করেছিলেন যে নেতাজীকে যদি জীবিত খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে ভারত সরকার তাকে যুদ্ধ অপরাধী বলে ধরবে কিনা। তার উত্তরে নেহেরু ওই চিঠি লেখেন। লিংক : http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html… পৃষ্ঠা ১৩০।

উপরন্তু, ভারত সরকার একাধিকবার জাতিসংঘ এবং মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি লিখেছে জানতে চেয়ে যে আদেও যুদ্ধ অপরাধীর তালিকায় সুভাষ বসুর নাম আছে কিনা এবং প্রত্যেকবারই তারা জানিয়েছে যে এরকম কোনো তালিকায় সুভাষ বসুর নাম নেই। এইসবও বেশ কয়েকটা ফাইলে আছে। এমন কি ফাইলের মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক চিঠিপত্রও ফাইলগুলির মধ্যে রয়েছে যেগুলো সুভাষ বোস বেঁচে থাকতে লেখা। সেগুলোয় তাদের মধ্যে আলোচনা দেখা যাচ্ছে যেখানে তারা বলছেন যে কোনো আইনেই সুভাষ বসুকে যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে ধরা যাবে না, ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরোধিতা করবার কনস্পিরাসির কেস দেওয়া যেতে পারে কিন্তু সেরকম কোনো কেসের ট্রায়াল মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে সেই নিয়ে তারা চিন্তিত।

অমর্ত্য সেন যে মন্তব্য করেছেন তার সাথে একমত। নেতাজীকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ব্যবহার করা বন্ধ করা হোক, দিন কে দিন মানুষের বিরক্তিই এতে বাড়বে আর সেই বিরক্তির ভাগীদার অকারণে নেতাজীকে হতে হবে। তাঁর কাজকম্ম, আদর্শ নিয়ে আলোচনা হলে সেটা অনেক বেশি লাভজনক।

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬

ইউ.এফ.ও, নোবেল ও টেনিদা ~ আশিস দাস

চাটুজ্যেদের রোয়াকে একলা বসে সামনের ত্রিফলাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হঠাৎ কেমন একটা ভাব চলে এল। সবে বেশ মেজাজে রঙ দে তু মোহে গেরুয়া গানটা শুরু করতে যাব মাথায় খটাং করে এক গাঁট্টা! "কে বে" বলে চিৎকার করে পিছন ঘুরেই দেখি তিনি। কে আবার? সেই আদি ও অকৃত্রিম টেনি মুখুজ্জে।
রোয়াকে বসে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল, "এটা গান হচ্ছে? মনে হচ্ছে তো গলায় দুটো কোলাব্যাং ঢুকে হানি সিং এর গানের তালে ডিস্কো নাচছে!"
আমার মাথাটা গেল গরম হয়ে। মনে হল বলি,"এসব সূক্ষ কলার তুমি কি বুঝবে? সারাদিন শোন তো পাগলু আর খোকাবাবু!" তবে কিনা আগের গাঁট্টায় তো পেটের পিলে অব্দি চমকে উঠে এক্সকিউস মি বলে উঠেছিল তাই হালকা চেপে গেলাম।
টেনিদা জিগেস করল, "হাবুল আর ক্যাবলা বাছাধনেরা গেল কই?"
আমি ব্যাজার মুখে বললাম,"দুজনেই বেড়াতে গেছে, তাও আবার বিদেশ। হাবুল নেপাল আর ক্যাবলা সিঙ্গাপুর-ব্যাঙ্কক।"
টেনিদা নাকমুখ কুঁচকে বলল, "সবকটাকে মোদীরোগে ধরল নাকি? যাকগে যাক। তুই তো আছিস, তুই আমার সেরা চ্যালা রে প্যালা।"
আমি খুশি হয়ে বললাম," তাতো বটেই। কিন্তু ওরা কি বিশ্বাসঘাতক ভাবো একবার তুমি!"
টেনিদা ভাবুক মুখ করে বললো,"হ্যাঁ, তাও গেল কোথায়? না নেপাল আর সিঙ্গাপুর। তাও যদি ইকিয়াং টুচিস্কি তে যেত না হয় বুঝতাম।"
গল্পের গন্ধ পেয়ে আমি টেনিদার দিকে সরে বসলাম। নিরীহভাবে বললাম, "সেটা কোথায় গো টেনিদা? চীন না আফ্রিকা?"
কিন্তু টেনিদা তো আর দেশের জনগণ নয় যে নেতা থেকে জুকারবার্গ সবাই বোকা বানিয়ে চলে যাবে! সঙ্গে সঙ্গে বলে, "অত সোজা নয় বাবা প্যালারাম বাঁড়ুজ্জে। ফ্রিতে গপ্প শোনার মতলব? বড় রাস্তার লেবানিজ রোলের দোকানটা থেকে চটপট ঘুরে এস একবার দেখি।"
ব্যাজার মুখে চিকেন র‍্যাপটা নিয়ে ফিরতেই ছোঁ মেরে নিয়ে গপ গপ করে তিন কামড়ে গোটাটা সাবাড় করে দিয়ে হাতটা আমার জিন্সেই মুছে শুরু করল টেনিদা," সেবার যখন নোবেল চুরি গেল রবীন্দ্রনাথের, সিবিআই তো অনেক খুঁজেও কিছুই করতে পারলো না। সবরকম চেষ্টার পর শেষে মুখ্যমন্ত্রী আমায় ডেকে বললেন, 'টেনি, দেখো গত ৩৪ মাস ধরে নোবেল পাওয়া যাচ্ছেনা। এর পিছনে সিপিয়েমের চক্রান্ত আছে আমি জানি, সব সাজানো ঘটনা। কিন্তু প্রমাণ পাচ্ছিনা। তোমাকেই নোবেলটা খুজে আনতে হবে, আমি তোমাকে নোবেলশ্রী উপাধি দেব।'
বার খেয়েই হোক আর কৌতুহলেই হোক আমি রাজী তো হয়ে গেলাম। কিন্তু খুজি কোথায়? ব্যাপারটা ভীষণ পুঁদিচ্চেরি হয়ে উঠছে দেখে একদিন মেট্রো করে ময়দান গেলাম ব্রেনটা ফ্রেশ করে নিতে একটু। তো ময়দানে শুয়ে শুয়ে খুব ভাবছি খুব ভাবছি। রাত হয়ে গেছে আশপাশে কেউ নেই বুঝলি! হঠাৎ দেখি আকাশে চাকতি মতো কি একটা জ্বলজ্বল করছে। প্রথমটায় ভাবলুম হয়তো এই বিশ্ববাংলা টাংলার জন্য ফানুস উড়িয়েছে হয়তো। কিন্তু একটু বাদেই সেটা মাঠে নেমে এল। দেখি সেটা একটা ইউ.এফ.ও-"
আমি খাবি খাওয়া কাতলার মত ঢোঁক গিলে আঁতকে উঠলাম, "কি! ময়দানে ইউ.এফ.ও!!"
দাঁত খিঁচিয়ে টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল, "কেন শুনি? ওগুলো কি শুধু নিউ ইয়র্ক আর এল.এ তেই নামতে পারে? বঙ্কুবাবুর বন্ধু পড়িস নি? বাংলায় এত শিল্প আসছে আর একটা এলিয়েন এলেই দোষ?"
আমি মনে মনে ভাবলাম "ঢপ তো এবার স্মৃতি ইরানির লেভেলে যাচ্ছে মাইরি!" কিন্তু টেনিদার চোখে (মোদি প্রধানমন্ত্রী হবার পর আডবানির চোখের মত) হিংস্র আগুন দেখে থেমে গেলাম। বরং বললাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ তাতো বটেই। তাছাড়া এলিয়েন তুমি ছাড়া আর কার কাছেই বা আসবে?"
টেনিদা বলল, "লাস্ট ওয়ার্নিং প্যালা। আর একবার কুরুবকের মত বকবক করলে এক চড়ে তোর কান-"
"কানহা রিসার্ভ ফরেস্টে বাঘের মুখে গিয়ে পড়বে", শেষ করলাম আমি।
বদরাগী হলেও টেনিদা গুনের কদর করে। তাই খুশি হয়ে বললো,"এটা বেশ নতুন দিলি তো, আচ্ছা গপ্প শোন। তো ইউ.এফ.ও থেকে কটা লিকলিকে চেহারার পিঁপড়ের মত দেখতে লোক এসে প্রথমে বলে 'ইস্টাকু হুপিয়াকু চিং?' আমি তো বললাম, 'যা বলবে বাংলায় বল বাপু'। তখন কি একটা মাথার নব ঘোরালো আর বলতে শুরু করল, 'মহাশয়, আপনার শুভ নাম কি ভজহরি মুখার্জী?' আমি বললুম, 'হ্যাঁ'। ব্যাস কি একটা লেসার মত তাক করল আমার দিকে আর আমি পুরো ফ্ল্যাট। জ্ঞান আসতে দেখি আমি বন্দি। বাইরে আকাশে দেখা যাচ্ছে কিন্ত কি আশ্চর্য! আকাশের রঙ নীল সাদা ডোরা কাটা! সে যাই হোক খানিকবাদে আমাকে ওরা নিয়ে গেল ওদের রাজার কাছে। সে বললো, 'মহাশয় শুনুন। আমাদিগের গ্রহের নাম ইকিয়াং টুচিস্কি। আমরা অতীব নিরীহ প্রাণী, আমরাও রবীন্দ্রনাথ পড়িয়া থাকি। কয়েক বৎসর পূর্বে আমাদিগের জ্যোতিষী ভবিষ্যৎবাণী করিয়াছিলেন যে আপনাদিগের গ্রহে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঘোর দুর্দিন আসিতেছে। রাস্তার মোড়ে হিসি করা প্রৌঢ় হইতে গাছের আড়ালে কিসি করা যুগল সকল ব্যক্তিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিতে বাধ্য করা হইবে। অতএব প্রতিবাদস্বরুপ আমরা নোবেল হরণ করিয়া লইয়া আসি। আপনাকেও আমরা যাইতে দিতে পারিবনা, আপনাকে আজীবন বন্দি থাকিতে হইবে।'
আমি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলাম। তারপর হঠাৎ মাথায় একটা সাংঘাতিক বুদ্ধি খেলে গেল। আমি বললাম, 'দেখুন স্যার আমি কিন্তু শিল্পী মানুষ, এখানে আমার শিল্পসাধনা করতে পারব তো?' ওরা খুশি মনে সায় দিল। আমিও একটু পর থেকে কাজ শুরু করলাম, একটা হতে না হতেই খেল খতম। চেয়ে দেখি মেঝেতে পড়ে সব ব্যাটা চিঁ চিঁ করছে! কেউ কান চেপে বসে, কেউ মাথার চুল ছিঁড়ছে। ব্যাস আর আমাকে পায় কে। বললুল,'দেখুন স্যার এখানে আমাকে রাখলে কিন্তু এই রকমই চলবে সারাদিন।' ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে সেই রাতেই ব্যাটারা আমাকে ময়দানে নামিয়ে দিয়ে গেল! নোবেলটাও চাইলে দিয়েই দিত, কিন্তু ভাবলাম যা খিল্লি হচ্ছে বুড়োকে নিয়ে ওটা অন্যগ্রহেই থাক।"
আমি কৌতুহল চাপতে না পেরে বলেই ফেললুম, "কিন্তু কি করলে তুমি ওদের?যার এত ক্ষমতা?"
টেনিদা কেজরিওয়ালের মত হালকা হাসি দিয়ে বলল, "আরে বোকা যখন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গেছিলাম তখন উনি ওনার লেখা কবিতার ২টো বই গিফট দিয়েছিলেন তো! সেটারই একটা মুখস্ত করে ঝেড়ে দিয়েছিলাম! হু হু বাওয়া, এ হল টেনি শর্মা! আমার সাথে পাঙ্গা!"

রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬

উন্নয়নের জোয়ার ~ সুশোভন পাত্র

আদর করে প্রেমিকার নাম রাখল সে 'রাজকন্যে'। কিম্বা ধরুন 'ডার্লিং'। নিদেনপক্ষে 'সোনা','রূপা'। এর নিচে জাস্ট আর নামা যায় না। প্রেমিকের নাম আর যাই হোক 'লোহা-লক্কড়' তো হতে পারে না। বিয়ের পর নববধূর নবীকরণ। নতুন নাম 'সুইট বাবি'। কাউন্টার পার্টের তুমুল জবাব ওয়ান অ্যান্ড অনলি আমার 'হাবি'। কনটেম্পোরারি সময়ে, জীব প্রেমের ঈশ্বর সেবাতে মানুষ যখন পোষা কুকুরের নাম রাখে 'পেপসি' কিম্বা 'পোস্ত', তখন প্রেম রাখতে, প্রেমে থাকতে মানুষ স্বাভাবিক কারণেই 'নামকরণে' ব্যস্ত। আর নামকরণ শুধু নামকরণই নয়। নামকরণ তো আর্ট। উপরন্তু এ রাজ্যে নামকরণ আবার উন্নয়নেরও পার্ট। ঐ যে যেমন চার মাসেই দিদিমণির ৯৯% কাজ –আগের প্রকল্পের নতুন নামকরণে কিসেরই বা লাজ ?
আমেরিকায় এখন বাচ্চাদের নামা রাখা হচ্ছে বন্দুকের থিমে। পিস্তল, ট্রিগার, শুটার। 'শর্ট অ্যান্ড প্রিসাইস'। যেমন ধরুন ইউপিএ-১ সরকারের 'কমন মিনিমাম প্রোগ্রামের' অংশ 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনার' নতুন নাম পড়ল 'কন্যাশ্রী'। 'শর্ট অ্যান্ড প্রিসাইস'। ২০১৩-১৪ এ রাজ্যে কনাশ্রী প্রকল্পে মোট আবেদনপত্র জমা পড়েছে ১৯.৮৮ লক্ষ। মঞ্জুর হয়েছে ১৮.৩ লক্ষ। আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে ১০,২৮৬। হল তো, ৯৯% কাজ? 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনা'য় যেখানে চতুর্থ শ্রেণীর কন্যা শিশুরা পেত ৫০০ টাকা আর নবম-দশম শ্রেণীর কন্যা শিশুরা ১০০০ টাকা, সেখানে এখন সবাই হাতে পরার বালা পায়, কেউ আবার সাইকেলও পায়। সে সাইকেল বিক্রি করতে OLX –এ বিজ্ঞাপনও পড়ে। এটাই তো উন্নয়ন যজ্ঞ। সাবড়াকোনের সালমা খাতুনের সাইকেল চালাচ্ছে মনিপুরের ইয়াইফাবা প্যাংগাম্বম। 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনার' মোট খরচের ১০% পণপ্রথা ও শিশু বিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি তে তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের থেকে খরচা হবার কথা ছিল। এখন ১০%'র বেশী হয়। সচেতনতা বাড়াতে নয়। গজলের জলসা বসাতে। হল, শিল্পও হল। সিঙ্গুর না হোক। গুলাম আলি তো হল।
বাঙালি তো আবার ডাকনাম ছাড়া কাজ চলে না। বিখ্যাত কিছু ডাক নাম যেমন পচা, ক্যাবলা, নন্টে ফন্টে, গাবলু , হাবলু এবং 'আনন্দধারা'। ১৯৯৯'র 'স্বর্ণজয়ন্তী গ্রাম স্ব-রোজগার যোজনা'র বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০১০ কেন্দ্রীয় সরকার নাম দিল, 'ন্যাশনাল লাইভলিহুড মিশন'। বাংলার কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে বিশ্বাসী আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর আবার ঐ শক্ত নাম পছন্দ হল না, নাম রাখলেন 'আনন্দধারা'। আগে রাজ্যের সব জেলায় যে প্রকল্প চালু ছিল। পরিসংখ্যানে দেশের মধ্যে ছিল প্রথম সারির এখন তা সর্বসাকুল্যে চালু আছে ২৪ টি ব্লকে। কিন্তু তাতে কি ? নাম তো বদল হল। অতএব, আবার উন্নয়ন হল।
বাচ্চা ছেলের নাম 'গুগল'। গুগলের গার্লফ্রেন্ড 'কিউটি পাই'। ঠিক যেমন কন্যাশ্রীর সুরে সুরে মিলিয়ে 'বেকার ভাতা' আর' যুব উৎসাহ প্রকল্পের' নতুন নাম 'যুবশ্রী'। ২০১০'র বাজেটে এই প্রকল্পের  আর্থিক বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছিলো। আর নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঐ প্রকল্পের সুবিধা পাবার শর্ত হিসেবে 'সম্পূর্ণ বেকার' শব্দবন্ধ কে বদলে দিয়ে শুধু 'বেকার' করেছেন। আফটার অল তোলাবাজরা তো আর 'সম্পূর্ণ বেকার' না। উন্নয়নের দ্রবণ, আদিবাসী তপশিলি দরিদ্র বেকার থেকে শুরু করে তোলবাজ হয়ে সাম্বিয়া সোহরাব, সবার জন্যই তো হোমজিনিয়াস হওয়া উচিত। সুতরাং তোলাবাজরাও পয়সা পেল। হল,আবার 'পরিবর্তন' হল।    
২০০৬ সাল থেকেই বৃষ্টির জল ধরে রেখে, সেচের মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় ৭২% জমিতে চাষ যোগ্য জল পৌঁছে দেওয়া গিয়েছিলো। এখন কত শতাংশ জমি সেচের আওতায়? সরকারী তথ্য কি বলে? জানেন? ছাড়ুন তো। এই প্রকল্পেরও নতুন নাম তো পড়েছে। 'জল ধর জল ভর'। নাম যখন  নতুন,তখন নিশ্চয় উন্নয়নও হয়েছে। ৯৯% জমিতেই সেচের জলও পৌঁছে গেছে। আগের 'স্বনির্ভর গোষ্ঠীর' উন্নয়নও হয়েছে, "আত্মমর্যাদা"। প্রতি ব্যক্তির ঋণ পিছু প্রকল্পেরও উন্নয়ন আজ "আত্মসম্মান"।
আসলে কি জানেন, হিজিবিজ্‌বিজ্‌ বলল, 'একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, আর ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু- কিন্তু যেই বাড়ির নাম দিয়েছে 'নবান্ন', অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে...

বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬

ঋণ নিয়ে ডাহা মিথ্যা ~ পুরন্দর ভাট

• তৃণমূলীরা বারবার প্রচার করে, বামফ্রন্ট সরকার ১লক্ষ ৯২হাজার কোটি টাকা ঋণ করে গেছে। বাস্তবে সেই ঋণ স্বাধীনতা প্রপ্তির সময় থেকে ২০১১ সালের ১১ই মে পর্যন্ত সময়ে করা। বাজার থেকে করা ঋণের পরিমাণ তুলনায় কমই ছিল।

• বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে স্বল্পসঞ্চয়ে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল। চিটফান্ডগুলির রমরমা ঠেকাতে তা কাজে এসেছিল। অথচ, কেন্দ্রীয় সরকারের বিচিত্র একতরফা আইন অনুসারে রাজ্যে যত অর্থ স্বল্পসঞ্চয়ে সংগৃহীত হতো, তার একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে রাজ্য সরকারকে নিতে হয়। সেই কারণে, কেন্দ্রীয় আইন অনুসারে ৭৯হাজার কোটি টাকা ঋণ হয় কেন্দ্রের কাছে। এই ঋণ বাজার থেকে করা ঋণ নয়।

• কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা খাতের বরাদ্দের ৭০শতাংশ রাজ্য সরকারকে নিতে হতো ঋণ হিসাবে। সেই ঋণের পরিমাণ বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে ছিল ১২হাজার ৩০০কোটি টাকা।

• নাবার্ডসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাহায্য থেকে রাজ্যের ৩৪বছরে ঋণ দাঁড়ায় ৮হাজার ৫০০কোটি টাকা।

• পি এফ তহবিলে ঋণের পরিমাণ বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে ছিল ৮হাজার কোটি টাকা।

• কেন্দ্রীয় সরকার আর্থিক বছরের শেষ লগ্নে টাকা পাঠানোয় কখনও কখনও টাকা খরচ করা যায় না। খরচ না হওয়া ওই টাকা পরের আর্থিক বছরের ধারের তালিকায় ঢুকে পড়তো। এমন ১২হাজার কোটি টাকাও চৌত্রিশ বছরে ঋণের তালিকায় রয়েছে।

• এইসব নিয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১লক্ষ ৯২হাজার কোটি টাকা।  তার মধ্যে বাজার থেকে ধারের পরিমাণ ৭২হাজার কোটি টাকা।

• তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রশ্ন ছিল ঋণভারে জর্জরিত অর্থনীতির সাহায্যে কি কোনো উন্নতি করা সম্ভব? রাজ্যের বহুল প্রচারিত একটি সংবাদপত্র সেদিন তাদের  প্রতিবেদনে লিখেছিল, ''সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বৈঠকে রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন রাজ্যের এক টাকা আয়ের ৯৪ পয়সাই চলে যায় বেতন পেনশন, সুদ ইত্যাদি যোজনা বহির্ভূত খরচ মেটাতে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ৬ পয়সায় কি উন্নয়ন সম্ভব? (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ অক্টোবর, ২০১১)

• সত্যিই কি এক টাকা আয়ের ৯৪ পয়সাই চলে যায় বেতন, পেনশন, সুদ ইত্যাদি যোজনা বহির্ভূত খরচ মেটাতে? ডাহা মিথ্যা কথা।  তৃণমূল রাজ্য সরকারেরই তথ্য বলছে, ২০১৪-১৫ আর্থিক বর্ষে  ঋণ, বেতন, পেনশন বাবদ রাজ্য সরকারের খরচ হয়েছে মোট  ৭৪ হাজার ৮৮৮ কোটির সামান্য বেশি। সেখানে  ২০১৪-১৫ আর্থিক বর্ষে রাজ্য সরকারের  মোট আয় ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। (সূত্র : বাজেট অ্যাট এ গ্লান্স ২০১৫-১৬, পৃ: ১ ও পৃ: ১৩) অর্থাৎ, বেতন, পেনশন, সুদ এই তিনটি খাতে রাজ্য সরকারের খরচের পরিমাণ আয়ের ৫৮ শতাংশ, মমতা ব্যানার্জি কথিত ৯৪ শতাংশ নয়।

• বর্তমানে ধার করার হিসেবে তৃণমূল-শাসিত পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে 'এক নম্বর'। বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নেবার সময় (২০১১ সালের ১১ মে) সব মিলিয়ে (স্বাধীনতার পর কংগ্রেসী আমলের ঋণসহ) রাজ্যের পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের বাজেটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। সরকারি তথ্যই জানিয়ে দিচ্ছে মমতা ব্যানার্জির সরকার পাঁচ বছরে রাজ্যবাসীর মাথায় অতিরিক্ত ১ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ চাপানোর ব্যবস্থা করেছে। সবটাই বাজার থেকে নেওয়া ধার।

• ২০১১সালের ২০শে মে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমতায় আসার প্রথম ১০মাসে নতুন সরকার বাজার থেকে ধার করেছিলো ১৭হাজার ৫০০কোটি টাকা। ২০১২-১৩আর্থিক বছরে রাজ্য ধার করে প্রায় ২১হাজার কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ আর্থিক বছরে  বাজার থেকে মমতা ব্যানার্জির সরকারের ধারের পরিমাণ ছিলো ২১হাজার ৫৫৬কোটি ৪২লক্ষ টাকা। ২০১৪-১৫-তে বাজার থেকে রাজ্য সরকার ধার নিয়েছিল ২১হাজার ৯০০কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ আর্থিক বর্ষের প্রথম মাসে, অর্থাৎ ২০১৫-র এপ্রিলে, রাজ্য সরকার ১০০০কোটি টাকা ধার করে। তারপর প্রায় প্রতিমাসেই ধার।

• ১৯৪৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত রাজ্য সরকার  গড়ে প্রতি বছর ঋণ নিয়েছিল  ৫ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরে বছরে গড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে।

ঋণের টাকা কোথায় গেল?

• লক্ষাধিক কোটি টাকা রাজ্য সরকার ধার করলেও কাজ কী করলো? প্রশ্ন সেটাই। নতুন কোনো স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি হয়নি বলেই চলে। শুধু শিলান্যাস হচ্ছে। বামফ্রন্টের আমলে তৈরি সরকারী বাড়ি, হাসপাতাল, সেতুতে নীল-সাদা রঙ চাপিয়ে পাথরে মন্ত্রী-নেতাদের নাম খোদাই চলছে। রেগার মজুরি দেওয়া হয়নি। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি বন্ধ হবার মুখে, উন্নয়নমূলক কাজে টাকা নেই। টাকা ঢালা হচ্ছে  সরকারী মেলা, মোচ্ছব আর উৎসবের নামে  এবং চক্ষু লজ্জাহীন সরকারী প্রচারে।  মুখ্যমন্ত্রীর জেলা সফর ঘিরে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

• পরিকল্পনা বহির্ভূত খরচে রাশ না টানার ফলেই প্রতি মাসে নিয়ম করে বাজার থেকে টাকা ধার করছে রাজ্য সরকার। ২০১৪-১৫সালের রাজ্য বাজেটে পরিকল্পনা উন্নয়ন খাতে সরকার ৪২হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। আর উলটোদিকে পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে রাজ্য সরকারের ব্যয় বরাদ্দ ১লক্ষ ১৪হাজার ৩১৯কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে খরচ করার মধ্য দিয়েই বেহিসাবি খরচে কোনো লাগাম নেই।

• সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক শতাংশ মহার্ঘ ভাতা বাবদ মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ ২৫ কোটি টাকা বা বছরে ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এর জন্য বছরে ১৬ হাজার ২০০ কো‍‌টি টাকা সরকারের হাতে রয়ে গেছে। বর্তমানে বকেয়া ৫৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে ২০১২ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত সাশ্রয়ের পরিমাণ ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এত টাকা কোথায় নয়ছয় করলো তৃণমূল সরকার?

চর্বিতচর্বণ ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

" আমার বর না ... বিছানায় পড়লেই বাঘ ! "

উঁহু উঁহু, আঁতকে উঠবেন না, নীল ছবিজনিত কোন দৃশ্যকল্প বা আলোচনা নয়, এ এক গভীর সমস্যা। এবং উপরোক্ত মন্তব্যটি নেহাতই বাস্তব।
এ সমস্যা যে কী নিদারুণ তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবেন না ...রাতের বেলা ঘুমের মাঝে কী ভয়ানক আতঙ্কে চমকে চমকে উঠতে হয় বা হঠাৎ মনে হয় বুঝি অনেকগুলো বাঘ ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ...এই ঝাঁপিয়ে পড়লো বলে! ভয়ে শিঁটকে গিয়ে সঙ্গীকে ঠেলে তুলে দিতে হয় , যাক্‌ বাবা ...কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্তি। সবে চোখ বুঁজে এসেছে , এমন সম, আবার আবার "ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে " ...ঘুমের দফারফা ।

আরে হ্যাঁ রে বাবা, নাক ডাকার কথাই বলছি। বিভিন্ন স্টাইলের নাক ডাকা আছে , বেশীরভাগই অবশ্য গোদা টাইপ "ঘোঁঊঊঊঊঊঊ " করে এক ভয়ানক চিক্কুর ছেড়ে পর মুহূর্তেই "ভা ভা ভা ভা ঘঁতঘঁতঘঁত হুঁ হুঁ হুঁ " । কিছু ওস্তাদ ডাকিয়েও আছেন । প্রথমে মিঠে তান ধরেন, তারপর আস্তে আস্তে ক্রমশঃ উচ্চকিত হয় স্বর...ঠমক-গমক শুনে বাচ্চারা রাত-বিরেতে ভয়ে চিল্লিয়ে ওঠে। ঠাট্টা - মস্করা করছিনা মশাইরা, জানি নাকের গঠনজনিত কারণে বা ঘুমের সময় মুখের ভেতরের মাংসপেশি শিথিল হয়ে পড়ায় শ্বাস প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়ায় বা এরকম আরো একশো আটটি কারণে মানুষ নাক ডাকে বা ডাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু তার ফলে অন্য মানুষের যে জীবনমরণ সমস্যা উপস্থিত হতে পারে তার কথাই বলছি আর কী। সম্মানহানিও হতে পারে। বিশ্বাস না হলে স্বচক্ষে দ্যাখা বা স্ব কর্ণে শোনা দু- একটি ঘটনার উল্লেখ করছি । সঙ্গত কারণেই নাম গোপন রাখতে হচ্ছে ...

'ক' বাবু বাবা হয়েছেন খুব বেশীদিন নয়, কন্যাটির সবেমাত্র আধো বুলি ফুটেছে মুখে । শ্রীমতি 'ক' যেখানে পারছেন সেখানেই এই ক্ষণজন্মা কন্যাটির নানাবিধ গুণপনা ব্যক্ত করছেন এবং বিস্ময়ের অতলে গিয়ে ভাবছেন '' এ মেয়ে বড় হয়ে আইনস্টাইন না হয়ে যায়না '' । তা এরকমই এক সময়ে 'ক' পরিবার নিমন্ত্রণ রক্ষায় এক সান্ধ্যবাসরে উপস্থিত। 'ক' গিন্নী হাসি হাসি মুখে বেড়াল দেখিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করছেন " বল তো সোনা ওটা কী " ...মেয়েও ঝট্‌পট্‌ জবাব দিচ্ছে । আচমকা কছেই কোথাও গভীর, গম্ভীর এক হাম্বারব শোনা যায় এবং খুকি হাততালি দিয়ে বলে ওঠে , "বাবা ডাকছে , বাবা ডাকছে, বাবা আত্তিবেলায় এইলোম কয়ে ডাকে " । তারপরের ঘটনা আর নাই বা বললাম, সহজেই অনুমেয় ।

পতিব্রতা ভার্‌তীয় নারীরা মানিয়ে গুছিয়ে নেন ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে। গর্জনের সঙ্গে ঘর করতে প্রথম প্রথম অসুবিধে হলেও ( আমার এক বন্ধু তো এক রাতে ' চীঁচঁঈঈঈঈ হোয়াও হোয়াও হোয়াও ঘ্যাস ঘ্যাস ঘ্যাস ' এরকম আওয়াজ শুনে ভেবেছিল ঘুমের মধ্যে বুঝি বা তার বরের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে , অন্তিম সময় উপস্থিত ...তাকে জাগানোর চেষ্টায় বিছানায় জল-টল ঢেলে একাক্কার কান্ড! ) । একেকজন অভ্যস্ত হয়ে যান এমনই যে একসময় ওই বীভৎস আওয়াজ না হলে তাঁদের ঘুমই আসতে চায়না। অনেকে ' শব্দই ব্রহ্ম ' এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে যাহোক একটা রফা করে নেন নিজের সঙ্গে বা নিজের নিদ্রাজনিত শান্তির সঙ্গে। বাকিরা গুম্‌রে মরেন এবং ক্যানো বিয়ের আগে একবার ঘুমিয়ে দ্যাখেননি হবু বরের সঙ্গে ( মাইন্ড ইট্‌, ঘুমিয়ে বলা হয়েছে ) সেই ভেবে কপাল চাপড়াতে থাকেন।

এতক্ষণ ধৈর্য ধরে পড়ার পর (যদি আদৌ এতটা পড়ে থাকেন কেউ ) কোন পুরুষ পাঠক আমায় একচোখো ভেবে হয়তো মনে মনে একচোট খিস্তিই দিয়ে ফেলেছেন আর ভাবছেন " বললেই হল , মেয়েরা নাক ডাকে না নাকি !" অবশ্যই ডাকে। এবং সময়ে সময়ে তা অতীব ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে সামান্য একটি ঘটনার উল্লেখ করছি ।

দিল্লী চলেছি , রাজধানী থ্রী টায়ার এসি কামরা। প্রায় সকলেই খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়েছে, ইতিউতি দু-একটা রিডিং ল্যাম্প ছাড়া সব বড় আলোই প্রায় নেভানো। নাইট বাল্‌ব গুলোর আলো-ছায়ায় বেশ একটা মায়াময় আবহাওয়া। হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে, ট্রেনের আওয়াজ কে ছাপিয়ে এক হৃদয়-বিদারক আর্তনাদ "আআআআআআউঁঁউঁউঁউঁ ওঃওঃওঃ"। সে যে কী পৈশাচিক লিখে বোঝানোর ক্ষমতা নেই আমার !! আশপাশের প্রায় সকলেই প্রচন্ড আতঙ্কে ঘুম ভেঙ্গে কাঠের মত শক্ত হয়ে শুয়ে আছে বেশ বুঝতে পারছি ... আমার উল্টোদিকের বার্থে এক অবাঙালী ভদ্রলোক ছিলেন , তিনি নামতে যেতেই তাঁর স্ত্রী শক্ত ভাবে চাপা কন্ঠস্বরে বললেন, "আরে রহ্‌নে দো জী, উঠো মৎ"। আমি নিজেও ঘুম ভেঙ্গে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময়ে আচম্বিতে আবার সেই চীৎকার! এবার অনেকেই বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। শব্দের উৎস স্থল দু-তিনটি বার্থের পরে একটি সাইড-আপার বার্থ। দুজন ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন, যদি ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে কিছু উপকার হয় ...কারণ ওই আর্তনাদ বা নাক-নিনাদের মধ্যে ট্রেনে অন্য সহযাত্রীদের ঘুমানো অসম্ভব। কিন্তু পরক্ষনেই জানা গেল যে উনি একজন ভদ্রমহিলা। ' ও দিদি , ও দিদি , ও ভাবীজি , ম্যাডাম ম্যাডাম করে হাঁকডাঁক করেও তার ঘুম ভাঙ্গানো গেলনা। কামরার সকলেই প্রচন্ড বিরক্ত । তারমধ্যে দ্যাখা গেল মহিলার সঙ্গী কেউ-ই নেই যিনি তাঁকে সজোরে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে একটু সাহায্য করতে পারেন । মহিলার ঠিক নীচের বার্থের ভদ্রলোক সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে লাগলেন যে এই ধরণের মানুষের ট্রেনে উঠে ঘুমানো প্রায় একটা পানিশেব্‌ল ক্রাইমের মধ্যে পড়ে। যাইহোক , উপায়ান্তর না থাকায় কোনক্রমে রাত টা কাটলো ।
সকালবেলায় আর কেউ-ই ব্যাপারটা নিয়ে ঘাঁটালোনা ; কারণ সত্যি কথা বলতে কী সারারাত প্রায় জেগে থাকা আমরা , মানে ভদ্রমহিলার আশপাশের যাত্রীরা সকালের দিকে প্রায় সক্কলেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে ছিলাম। ওদিকে ট্রেন রাইট টাইম যাকে বলে । বেলা দশটায় দিল্লী।

যাইহোক , ভালোয় ভালোয় পৌঁছে ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নামতে একটু দেরি হচ্ছিল আমার, হঠাৎ দেখি যে ভদ্রলোক গতরাত্রে ভদ্রমহিলার বাপান্ত করছিলেন তিনি হাঁচোড়পাঁচোড় করে তিনখানা মস্ত স্যুট্‌কেস টেনে নামাতে গলদঘর্ম হচ্ছেন এবং মহিলাকে বলছেন "আরে তুমি আগে নামো তো, যত্ত গন্ধমাদন বয়ে নিয়ে এসোছো"! অপার বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকাতেই চোখাচুখি হয়ে গেল। যে মিনতি ভরা দৃষ্টিতে তিনি করুণ ভাবে আমার দিকে তাকালেন তাতে বোধহয় পাষাণও গলে জল শুধু না...একেবারে বাষ্পীভূত হয়ে হাইড্রোজেন -অক্সিজেনে পরিণত হবে! যা বোঝার বুঝে নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে নেমে গেলাম তাঁদের পাশ দিয়ে। শুধু ভাবলাম কী সাংঘাতিক এই নাক-নিনাদ ...!

যার জ্বালা সেই বোঝে ।

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৬

টেনিদার জঙ্গিদমন ~ আশিস দাস

চাটুজ্জদের রোয়াকে আমরা তিন জন বসেছিলাম। পাঠানকোটে জঙ্গিহামলা নিয়ে জোর তর্ক হচ্ছিল। হঠাৎ পিঠে জোর চাপড় খেয়ে চমকে তাকিয়ে দেখি স্বয়ং টেনিদা দাঁড়িয়ে। রোয়াকে পা ছড়িয়ে বসেই বললো, "খুব জঙ্গি নিয়ে ভাটাচ্ছিস দেখছি? নিজেদের কি অর্ণব গোস্বামী ভেবেছিস? যুদ্ধের আর আসল জঙ্গিদের খবর পেতে চাইলে আমাকে বল।"
হাবুল সেন বলে উঠল, "তুমি তো ক্যামোফ্লেজ কইর‍্যা জাপানি মারছিলা, জঙ্গির খবর তোমার কাছে আসে ক্যামনে শুনি সেডা?"
টেনিদা বলে, "হু হু বাওয়া আমি পাগল না মদন মিত্র? এসব সিক্রেট খবর অমনি অমনি হয়? যা প্যালা মোড়ের মাথার কেএফসি থেকে একটা জেঙ্গার বার্গার নিয়ে আয় দেখি।"
আমি জানতাম, সকালে উঠেই আনন্দবাজারে প্রথম পাতায় দিদির মুখ দেখা মানেই দিনটা অশুভ। কি আর করা, গচ্চা গেল ১৫০ টাকা।
বার্গারে মস্ত একটা কামড় দিয়ে টেনিদা শুরু করল, "জানিস তো আমার ছাতি ৫৬ ইঞ্চি-"
বেরসিক ক্যাবলাটা সাথে সাথে বলে কিনা, "ডাহা মিথ্যে, এই তো সেদিন পাড়ার নাটকে ড্রেস বানানোর সময় ৪২ মাপল দেখলাম"।
টেনিদা উদুম ক্ষেপে গিয়ে বললো, "শাট আপ ক্যাবলা, আর একবার বাজে বকবক করলে এক ঘুষিতে তোর নাক-"
"নাগপুরে চলে যাবে", কমপ্লিট করলাম আমি।
হাবুল সেন জুড়ে দিল, "আর মোহন ভাগবত সেডা লইয়্যা লোফ্যালুফি খেলবে। তুমি থাইম্যো না টেনিদা, ক্যাবলাডা পোলাপান। রামদেবের মত ইগনোর কর ওডাকে।"
নাকমুখ কুঁচকে টেনিদা বলল, "আর বেশি বকলে জলপান করে ফেলব একদম। সব ব্যাপারে চেতন ভগতের মত ফোড়ন কাটা বেরিয়ে যাবে তখন। যাই হোক ৫৬ ইঞ্চি ছাতি নিয়ে তখন আর্মিতে পোস্টেড আমি। তখন তো যা দিন গেছে, উঠতে জঙ্গি মারছি, বসতে জঙ্গি মারছি, ফেসবুকেও জঙ্গি মারছি-"
"ফেসবুকে? সে আবার কেমন?" - আমি আর থাকতে না পেরে বললাম।
টেনিদা ফিচকে হেসে বললো," আরে মেয়েদের ফেক প্রোফাইল বানিয়ে জঙ্গিগুলোকে রিকোয়েস্ট পাঠাতাম, ব্যাটারা ফ্রেন্ড হয়ে চ্যাট শুরু করত। কিছুদিন বাদেই হ্যাপি নিউ ইয়ার, কিক, চাঁদের পাহাড় এসব সিনেমার ডাউনলোড লিঙ্ক পাঠাতাম। ব্যাস আর যায় কোথা, ব্যাটারা নিজেরাই সুইসাইড করে মরতো।"
ক্যাবলা বললো," বেড়ে বুদ্ধি তো"।
টেনিদা হেভি খুশি হয়ে বললো,"হু হু বাওয়া, পটলডাঙার টেনি মুখুজ্যের ব্রেন এটা। তারপর শোন। একটা জঙ্গি ঘাঁটি আমাদের পাশের পাহাড়ে অনেকদিন ধরে রয়েছে। ব্যাটারা আমাদের ওয়্যারলেস ট্যাপ করে শোনে সারাদিন আর মাঝে মাঝেই নিচের গ্রামে হামলা চালায়। কর্নেল জবরদস্ত সিং একদিন আমাকে ডেকে বলে, ক্যাপ্টেন টেনি আপহি হামারে ভরোসা হো, কুছ করো আপ। আমি তো বার খেয়ে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু কি করা যায় বুঝতে পারলাম না। ব্যাটারা রাত জেগে আমাদের ওয়্যারলেস ট্যাপ করে আর পাহারা দেয়। আচমকা হামলাও করা যাবেনা। তার উপর ওদের ডেরা এমন একটা গুহার আড়ালে যে আমাদের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেবে বেশি পাঁয়তাড়া করলে। কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল রেডিওটার দিকে। দেখেই চট করে মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। সেই রাতেই ১০ জন সেনাকে নিয়ে আমি হামলা করলাম ওদের ডেরায়। ব্যাস সবাই ডেড। মিশন সাক্সেসফুল যাকে বলে।"
সবাই সমস্বরে বললাম, "কি করে হল? রাত জেগে পাহারা দিত যে ওরা?"
টেনিদা বললো,"ওই যে রেডিও।"
আমি বললাম,"তাতে কি?"
টেনিদা ধ্যানগম্ভীর বুদ্ধের মত হেসে বললো, "আরে রেডিও তে মোদিজির মনকি বাত চালিয়ে ওয়্যারলেসের সামনে লাগিয়ে গেছিলাম। ব্যাটারা ওয়্যারলেস ট্যাপ করে ওই শুনে শুনে বোর হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তো! পাহারা আর দেবে কে? আমাকে তো পরমবীর চক্র দিয়েই দিত। নেহাত দাদরি হল, তাই ফিরিয়ে দিলাম ওটা দেবার আগেই। বুঝলি?  এ হল সত্যিকার জঙ্গি মারার গল্প।এই এই.. ক্যাবলা ক্যুইক, কোয়ালিটি ওয়ালশের গাড়ি যাচ্ছে একটা"।

রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৬

বাঘ ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

আমি বাঘকে ভয় পাই না। কখনোই পেতাম না।
শীতের ছুটিতে বাবা চিড়িয়াখানায় নিয়ে গেছিল, দেখিয়েছিল কেমন করে অসহায়ভাবে খাঁচায় বন্দী হয়েও পশুটা রাজকীয় ভঙ্গীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাইরে লোকেরা চেঁচামেচি করছে, কেউ কেউ ঢিল ছোঁড়ার চেষ্টা করছে, হাততালি দিয়ে, শিস দিয়ে বিরক্ত করছে। বাঘটা পাত্তাও দিচ্ছে না। একবার একটু গা-ঝাড়া দিতেই সবাই হূরমুড়িয়ে পালালো।
বাবা বলেছিল, "দেখেছিস! সত্যিকারের সাহসী যারা, পরিস্থিতিও তাদের চরিত্র বদলাতে পারে না! অন্যায় কৌশলে ওকে বন্ধ করে রেখেছে, কিন্তু ওর সাহস, ওর তেজ কমাতে পেরেছে কী? বরং খাঁচার বাইরে, নিরাপদে থাকা লোকেরা ওকে এতদূর থেকে দেখেও ভয় পাচ্ছে!" 
আমার বাবার খুব সাহস। বাবার বন্ধুরা বাবাকে বলে 'বাঘের বাচ্চা!'
আর আমি তো তারই ছেলে, আমি কেন বাঘকে ভয় পাব!
বাবার একটা বুলেট মোটরবাইক আছে। আমাকে সামনে বসিয়ে যখন সেটা চালিয়ে ভটভট করে বড় রাস্তা দিয়ে যায়, লোকেরা রাস্তা ছেড়ে দেয়। কেউ ভয়ে, কেউ সম্ভ্রমে।
বাবার নাম বিপ্লব, অনেকে ডাকে বুলেট বিপ্লব বলে।
আমাদের স্কুলে মিস সকলের নামের মানে জেনে আসতে বলেছিলেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "বাবা, বিপ্লব মানে কি?"
একটু হেসেছিল বাবা, তারপর বলেছিল, "তোকে এবার থেকে ক্লাবে নিয়ে যাব।"
শুনে মা খুশী হয়নি, "আবার ওকে টানছ কেন..."
বাবা শুনেও শোনেনি।
আমি ভেবেছিলাম, বিপ্লব মানে ক্লাব।
রাত্তিরে বাবার পাশে শুয়ে বাবার বুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলাম। একটা কাটা দাগ আছে বাবার বুকে, আগেও দেখেছি, কিন্তু প্রশ্ন করিনি। সেদিন জানতে চাইলাম, "বাবা, এই দাগটা কিসের?"
একটু হেসে বাবা বলেছিল "ওটা একটা বাঘের থাবার দাগ।"
-"তোমাকে বাঘে থাবা মেরেছিল?"
-"না, মারতে পারেনি। চেষ্টা করেছিল।"
-"তারপর! বাঘটার কি হলো?"
-"আর কী, এমন তাড়া করলাম, পালিয়ে গেল আমার ভয়ে!"
-"বাবা, পুরো গল্পটা বলো, আমি শুনবো!"
-"আজ নয়, আর একদিন বলব, কেমন?"
আমি ভেবে নিলাম, বিপ্লব মানে বাঘ।
বাবা খুব মোটা সোটা ছিল না, কিন্তু হাতদুটো ছিল লোহার মতো শক্ত, আর পরিশ্রম করতে পারতো খুব। যখন রাস্তার মাঝখান দিয়ে বুলেট বাইক চালিয়ে যেত, সামনে বসে আমি বাবার শক্ত হাতদুটো ধরে থাকতাম। গাড়ি যতোই জোরে যাক না কেন, আমার ভয় করতো না। সেদিনও ঐভাবেই ক্লাবে নিয়ে গেল বাবা। যেতে যেতে আমার মনে হল, বিপ্লব মানে নিশ্চয়ই ভরসা, সাহস!
আমি ভাবতাম ক্লাবে দোলনা থাকে, ছোটরা খেলাধুলো করে, বড়রা গান গায়, খাওয়াদাওয়া হয়। কিন্তু এই ক্লাবে দেখি সবাই অনেক বড়, খুব গম্ভীর আলোচনা করছে। এক একজন করে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বলছে, আর সকলে হাততালি দিচ্ছে। আমার বাবাও কিছুক্ষণ কথা বললো, সবাই খুব হাততালি দিল। তারপর বললো, 'ইঙ্কলাব জিন্দাবাদ'। আমিও বললুম তাদের সঙ্গে।  দু'জন কাকু সেটা দেখে আমার গাল টিপে আদর করে বললো, হবে না! বাঘের বাচ্চা তো!
ফেরার সময় বাবাকে বললাম, "বাবা, ক্লাবের মধ্যে বলে ইন ক্লাব বলতে হয়, তাই না?"
বাবা হা-হা করে হেসে বললো, "আরে না না, কথাটা ইনকিলাব জিন্দাবাদ, তার মানে বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক!'
ভালো লাগলো যে এতজন কাকু চাইছেন আমার বাবা দীর্ঘজীবি হোন! বিপ্লব মানে তাহলে দীর্ঘজীবি!
তার কয়েকদিন পরেই শুনলাম "অবরোধ অবরোধ"। ভোরবেলা বাবা বেরিয়ে গেল। মা ফুঁপিয়ে কাঁদছিল আর গজগজ করছিল। সারাদিন কেটে গেল, বাবা ফিরলো না। সন্ধ্যেবেলা দু'জন কাকু এসে মা-কে কীসব বলল, মা তাড়াতাড়ি শাড়ি বদলে, একটা ব্যাগ নিয়ে, আমাকে ঘরের পোশাকে নিয়েই কাকুদের সংগে একটা গাড়িতে উঠে চলল। আমি কিছু বুঝতে না পেরে চললাম চুপচাপ। মা মুখে শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর একজন কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম, "আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
-"তোমার বাবাকে দেখতে।"
-"বাবা কোথায়? কী হয়েছে বাবার?"
-"কিছু খারাপ লোক তোমার বাবাকে মেরেছে, বাবা হাসপাতালে ভর্তি।"
-"কেন! আমার বাবাকে অন্যরা মারবে কেন!"
-"তোমার বাবা তো ভাল লোক, তাই খারাপ লোকেরা বাবাকে ভয় পায়। সেই ভয় থেকেই মারে। তোমার বাবা মানুষের ওপর অত্যাচার মেনে নেয় না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। তাই খারাপ লোকেরা বাবাকে ভয় পায়। "
-"খারাপ লোকেদের পুলিশ ধরে না কেন? কেন তারা অন্যায় করবে?"
-"পুলিশও যে তাদের কথা শুনে চলে! তারাই যে দেশ চালায়, আতি তাদের অনেক ক্ষমতা! তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহস লাগে, আর সেই সাহস সকলের থাকে না। তোমার বাবার আছে।"
-"হ্যাঁ, বাবার খুব সাহস। জানো কাকু, একবার বাবা একটা বাঘের সংগে লড়াই করেছিল, বুকে কাটা দাগ আছে!"
-"বাঘ নয়, ওই খারাপ লোকেরাই আগে একবার বাবাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, পারেনি। ওটা তারই দাগ। বাঘ তো সাহসী, আড়ালে লুকিয়ে মারে ভিতুরা। তোমার বাবার মতো যারা প্রতিবাদ করে, তাদের মারার চেষ্টা করে।"
-"কাকু, বিপ্লব মানে কি প্রতিবাদ?"
কাকু হাসলো। "ঠিক বলেছ। বিপ্লব মানে প্রতিবাদের লড়াই। একে চেপে রাখা যায় না।"
হাসপাতালে মাথায়, হাতে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা বাবাকে শুয়ে থাকতে দেখে কেমন অচেনা লাগছিল, সারা গা কাঁপছিল আমার রাগে, অসহায়তায়। বাবা ইশারায় আমাকে কাছে ডাকল, মাথায় হাত রেখে ধীরে ধীরে, কেটে কেটে বলল, "ভয় পাসনা, আমি সেরে উঠব শিগগির! পড়াশোনা করবি, মায়ের খেয়াল রাখবি, কেমন?"
আমার বলতে ইচ্ছে করল, "ইনকিলাব জিন্দাবাদ!" কিন্তু গলায় কী যেন আটকালো, তাই বলতে পারলাম না। 
মনে পড়লো খাঁচায় বন্দী সেই অসহায় বাঘটার কথা। কৌশলে বন্দী করে রেখে সক্কলে মজা দেখছে আর টিটকিরি দিচ্ছে। যদি একবার বাবা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে...
বিপ্লব দীর্ঘজীবি হবে। হবেই!!

মঙ্গলবার, ২৯ ডিসেম্বর, ২০১৫

ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ‘ফ্লপ শো’ ~ সুশোভন পাত্র

​এবং, অবধারিত ও অনিবার্য কারণেই, অন্যান্য অনেকবারেই মতই আরও একবার, ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে 'ফ্লপ শো' উপহার দিল, সি পি আই এম। ব্রিগেড সমাবেশ থেকে 'ক্যাডার'দের কোনরকম বার্তা দিতেই সম্পূর্ণ ব্যর্থ সি পি আই এম'র 'পক্ককেশ' নেতারা। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, চিট-ফান্ডে প্রতারিত মানুষদের টাকা ফেরৎ, দোষীদের শাস্তি, আয়করের আওতায় না পড়া প্রত্যেকের জন্য দু-টাকা কেজি দরে চাল, ফসলের দাম না পেয়ে কৃষকদের লাগাতার আত্মহত্যা, একশো দিনের কাজের নিয়মিতকরণ, বকেয়া মেটানো, অর্ধাহার-অনাহার-অপুষ্টি ও বিনা চিকিৎসায় চা বাগান শ্রমিকদের মৃত্যুমিছিল, এসএসসি-টেটে নিয়মিত ও স্বচ্ছ নিয়োগ, সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-শালবনী-রঘুনাথপুর-নয়াচরে শিল্প, নারী সুরক্ষা --এসব আবার কোন বার্তা নাকি? 'পক্ককেশে'র আবার নেতা হয় নাকি? ঝিন-চ্যাকের যুগে কেউ আবার শহীদ স্মরণ করে নাকি? যত সব আহাম্মক!
বার্তা হবে, 'পাগলু' ড্যান্সের মত। বার্তা হবে, আগের রাতে যুবভারতী ভাড়া করে,খিচুড়ি মাংসের মত। বার্তা চুইয়ে পড়বে মদের বোতলের গা বেয়ে। বার্তা দুলে উঠবে ঝিঙ্কু-মামনিদের কোমরের তালে। শহীদ স্মরণ হবে কনটেম্পোরারি স্টাইলে, মহাগুরুর ডায়লগে, "শালা মারবো এখানে, লাশ পড়বে শশ্মানে..."। নেতা হবে নায়ক দেবের মত; মঞ্চে উঠে মাসেল ফুলিয়ে বলবে--"থোড়া সা করলো রোমান্স।" নেতা হবে মালদহের ইংরেজবাজার পঞ্চায়েত সমিতির তৃনমূলের সভাপতির মত। যিনি তাঁর গাড়িতে ধাক্কা মারার অপরাধে সাইকেল আরোহীর উপর তৎক্ষণাৎ গুলি চালাতে পারবেন। সাংসদ হবে, মুনমুন সেনের মত, যিনি বাঁকুড়ার গরমে ভোটের প্রচারের জন্য নতুন 'সানস ক্রিম' খুঁজবেন। মঞ্চের ঘোষক হবেন কুনাল ঘোষের মত। যিনি আর্থিক নয়-ছয়ের কারণে জেলের ঘানি টানতে পারবেন। শুধু পরিবারতন্ত্রের জোরেই প্রধান বক্তা হবেন 'কচি' ভাইপো। তাহলেই আর চুল পাকবে না। 'পক্ককেশ'ও থাকবে না।
শিল্পমন্ত্রীর দিব্যচক্ষু'র অবসারভেশেন, পিছন থেকে ব্রিগেড মাঠ ছিল খালি। আমি তো বলি, সাইড থেকে আরও খালি। মঞ্চের কাছে তো একেবারেই খালি। প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় যেসব 'বার্ড আই ভিউ'-টিউ আপনার দেখেছেন, সেগুলির প্রায় সবই আসলে 'আই অয়াশ'। নিজদের সোশ্যাল মিডিয়া টিমের পিছনে লেভির এক পয়সা খরচা করতে না পারা, একটা রাজনৈতিক দলের কর্মীদের এইরূপ উদ্যোগ আসলে 'ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর' উৎকৃষ্ট উদাহরণ। 'সাইন্টিফিক রিগিং' ও ফটোশপীয় নিপুণতার চরম নমুনা। দুর্ভাগ্য যে, এই 'নিবেদিতপ্রাণ' টাইপের কর্মীগুলো 'গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার' অভাবে প্লেনামের ব্যর্থতা নিয়ে গবেষণা না করে, 'কালীঘাট কেন্দ্রিকতার' অবসানে অযথা 'জান কবুল' করছেন।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, "চাইলে রাস্তায় ঘোরাফেরা করা মানুষদের নিয়ে দু-পাঁচ লাখের একটা সমাবেশ করাই যায়।" আসলে 'চাইলেই' সপ্তাহে একটা-দেড়টা ব্রিগেড করতে অভ্যস্ত দিলীপ বাবুর সংখ্যাতত্ত্বে অযথা উদার হয়ে 'লক্ষ'-এ পৌঁছে গেছেন। বাস্তবে ওটা মেরেকেটে দু-পাঁচ শ বেশী না। 'পৃথিবীর বৃহত্তম রাজনৈতিক' দলের কেন্দ্রীয় সমাবেশে, নরেন্দ্র মোদী কে ডেকে, আড়াআড়ি মঞ্চ বেঁধেও, ব্রিগেড ভরাতে না পেরে, ক্ষুরধার মস্তিষ্কের রাজনীতিবিদ রাহুল সিনহার মত বাংলার মানুষ কে 'দিদিভাই-মোদীভাই 'র 'লাড্ডু' খাওয়ানোর সাহসিকতা সি পি আই এমের নেতারা আর দেখাতে পারলেন কই বলুন?
যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের রাজনীতি সচেতন এবং কলকাতার রাস্তাঘাট সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা 'উন্মাদ' 'হার্মাদ', চেয়ার মোছা কবি এবং উভচর --সবাই জানেন এসপ্লেনেড, রানী রাশমনি রোডের চৌমাথা বা সিইএসসি চত্বরের ধারণ ক্ষমতা ব্রিগেডের থেকে কয়েকশ গুন বেশী। স্বাভাবিক কারণেই কেন্দ্রীয় সমাবেশ করে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড ভরানোর থেকে এসপ্লেনেড, রানী রাশমনি রোডের চৌমাথা বা সিইএসসি চত্বর ভরানো আসলে অনেক কঠিন। আর এই কঠিন কাজটাই দীর্ঘদিন ধরে অবলীলায় করে আসছেন জননেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাই ব্রিগেডে সমাবেশ করার মধ্যে কোন বীরত্বেই তো নেইই, বরং রাস্তাঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মিছিল মিটিং করলেই, পুলিশে হেসেখেলে ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে পারে, যানজটের সমস্যা এড়ানো যায়, অফিস ফেরৎ মানুষদের সুবিধা হয়, অ্যাম্বুলেন্স কে ভিড়ে আটকে থাকতে হয় না, স্কুল ফেরৎ পড়ুয়াদের ভোগান্তিও হয় না। কারণ সেদিন কলকাতায় গাড়ি-ঘোড়া তো আর রাস্তায় চলে না, চলে, ব্রিগেড গ্রাউন্ডের নাক বরাবর।
তাই ডিগবাজি স্পেশালিষ্ট পঞ্চায়েত মন্ত্রী ঠিকই বলেছেন যে "কাল ব্রিগেডের থেকে চিড়িয়াখানাতে ভিড় ছিল বেশী"। কারণ, উনি জানেন, ২১ শে জুলাই'র সমাবেশে, রাস্তা বয়ে এসে, বৃষ্টি মাথায় বসে, মঞ্চে, সরীসৃপ, গিরগিটি, পাগলু-ছাগলু, চোর, ডাকাত ও উন্মাদদের দেখার থেকে চিড়িয়াখানায় কিছু বড় জন্তু জানোয়ার দেখার অভ্যাস করা ভালো। অনেক ভালো..


সোমবার, ২৮ ডিসেম্বর, ২০১৫

ব্রিগেড ~ আশুতোষ ভট্টাচার্যী

​গতকাল যারা ব্রিগেডে এসেছে দিনবদলের লক্ষ্যে
তৃণমূল ভাবে একি জ্বালাতন, একা রামে নেই রক্ষে
সাথে ইয়েচুরি, সূর্যকান্ত ভাষণ দিচ্ছে সেলিমে
দিদি বললেন , মিথ্যুক এরা এসব দেখেছি ফিলিমে;
সাইকেল বিলি করেছি আমরা মঞ্চ, টঞ্চ খাটিয়ে
সিপিএম তার সিম্পাথি নেই! ক্যাডার এনেছে হাঁটিয়ে!
যারা এসেছেন, তাঁদের মেয়েরা বালা, চুড়ি কিছু পায়নি?
সত্যি বলুক, দুটাকা কিলোর বিপিএল চাল খায়নি?
ক্লাবে শুধু শুধু অনুদান দেওয়া, ঘুমোচ্ছে নাকি অন্ধ
ব্রিগেডে মিটিং জেনেশুনে সব, রাস্তা করেনি বন্ধ!
সব দেখেশুনে জনতার মন দিদি ভয়ানক রুষ্ট
কেউ বলে এতো গোষ্ঠীদন্ধ বিরোধী মদতপুষ্ট;
চুলকিয়ে দাড়ি পার্থ বলেন মিডিয়ার ষড়যন্ত্র
তিল থেকে তাল এদের বানানো, জনগণ বিভ্রান্ত।
পুলিশ বলেছে 'বলা তো বারণ',কত লোক ছিল গুনিনি
মিটিং এ সেদিন আধখানা মাঠ ভর্তি হয়েছে শুনিনি!
যেসব মানুষ এসেছে ব্রিগেডে, মিলিয়েছে পা মিছিলে
বলে কমরেড, ব্যারিকেড গড়, ভেবে দ্যাখ তুমি কি ছিলে;
কমিশন যদি আশ্বাস দেয়, ভোট হয় যদি অবাধে
আবার ফিরবে সিপিএম দ্যাখো পরিনত হব প্রবাদে।।


মঙ্গলবার, ২২ ডিসেম্বর, ২০১৫

সার্কাসের মজা ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

মজাটা হচ্ছে,
সবাই বোঝে সার্কাস চলছে

তবু টিকিট কেটে
(পড়ুন, সংগঠনের চাঁদা দিয়ে)
সে সার্কাস দেখতেও ঢুকছে সবাই।

মজাটা ডবল হয়ে ফিরছে
যখন ক্লাউন দেখা দিচ্ছে রিং মাস্টারের বেশে…
চমকে উঠছে চাবুক

ক্ষুধার্ত বাঘের পাতে
ঢালা হচ্ছে
দু'টাকা কিলোর আফিম মেশানো চাল

কাকপ্রসন্ন ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

​কাক এক্কে কাক
আমার মাথায় টাক,
তোর তাতে কী, মুখ্যু ঢেঁকি? যেমন আছিস থাক!
কাক দু'গুনে তুলি,
মেলাচ্ছি wrong গুলি,
ধান্দা উঁচা আমার রহে, কাণ্ড হোক, বা মূলই!
তিন কাক্কে তিনু
লোভী আগেই ছিনু,
মওকা পেলাম, টেক্কা গোলাম, কেমনে ছাড়িনু!
চার কাক্কে চাঁই,
বাড়ছে টাকার খাঁই!
লাভের গুড়ে বালি, তবু জুটলো সিবিয়াই!
পাঁচ কাক্কে পাড়ি,
গোটাবো পাততাড়ি।
কপাল ঠুকে নেপাল যাবো, আর কামাবো দাড়ি।
ছয় কাক্কে ছক,
সব ব্যাটা বুড়বক,
জানিস, আমি স্যাণ্ডো করি? (আসলে নাটক!)
সাত কাক্কে থাম,
সুবা সে অব শাম
এখানে ফ্ল্যাট, ওখানে ফ্ল্যাট অনেক তো কিনলাম!
আট কাক্কে আঁটি
প্যাল্যান সবই মাটি!
বাজেয়াপ্ত হচ্ছে সবই, ভিটে মাটি চাঁটি!
নয় কাক্কে নো,
নইকো প্রসন্ন,
জেলখানায় কি ডাকাত থাকে! চোরেদের জন্য!
দশ কাক্কে দুশশশ
স্বপ্ন মহল ফুসসস!
পেপ্সি, না না, লপসি খেয়ে চালাচ্ছি দুরমুশ!!

বুধবার, ২ ডিসেম্বর, ২০১৫

অনুদান ~ আশুতোষ ভট্টাচার্যী

এটা কোন ক্লাব? যুবক সংঘ! গত ভোটে খুব খেটেছে
দেওয়াল লিখেছে,মিটিং করেছে, মিছিলে খানিক হেঁটেছে;
এদের তো চিনি, বলাকা স্পোর্টিং একশো তরুণ তুর্কি
যেটুকু সাধ্য তাতেই বিলোয় নাড়ু, বাতাসা কি মুড়কি;
ওই কোনে দ্যাখো ঝিকিমিকি ক্লাব, ওদের নিবাস কালনা
গতবার ভোটে লাঞ্চের মেনু পোলাও ডিমের ডালনা;
এবার বুঝেছি তোমরা এসেছ সুভাষ ক্লাবের তরফে
পার্টি অফিসে তোমাদের নাম লেখা আছে গোটা হরফে!
রানাঘাট থেকে এসেছেন যারা বাংলা কিশোরে বাহিনী
ষ্টেজে উঠে এস, বলনা একটু মহান রিগিং কাহিনী;
মঞ্চে আসুক ক্ষুদিরাম ক্লাব দেশের গর্ব তোমরা
তোমরা অ্যাসেট যেকোনো দলের পার্টির প্রানভোমরা;
নবারুণ ক্লাব অ্যাকটিভ খুব রক্তদানের ক্যাম্পে
জলসা হয়েছে সারারাত জুড়ে, নায়িকা হেঁটেছে র‍্যাম্পে;
হাসি হাসি মুখে দুর্জয় ক্লাব, ছেলেগুলো ভারী দস্যি
ছাপ্পা ভোট কি বুথ ক্যাপচার ওদের কাছে তো নস্যি;
ভুলেই গিয়েছি পতাকা সংঘ, বোমা, পিস্তল, পটকা
বিরোধী শূন্য কাটোয়া, কালনা যদি মনে লাগে খটকা;
ধুনুচি সংঘ পূজো, টুজো করে, বলুন কাদের স্বার্থে
বিরোধীরা বলে এসব হচ্ছে, জনগণেশের অর্থে;
এই নাও তুমি উন্নতি কর, শুধু এক লাখ তঙ্কা
নিন্দুকে বলে পিকনিক হবে, বৃথা করে কেন শঙ্কা?
এই নাও তুমি দুই লাখ টাকা, কেটেছে দুঃখে, অভাবে
পাড়াপড়শিরা কন্ট্রোলে থাক তোমার নম্র স্বভাবে;
বস চুপ করে মন দিয়ে শোন কেউ করবেনা ঝগড়া
ক্লাব শিল্পের জোয়ার আসুক দিনহাটা থেকে মগরা;
মন দিয়ে সব প্র্যাকটিস কর, তাস, ডাংগুলি, ক্যারামে
টিভি, ফ্যান দেব এসি দিতে পারি সিণ্ডিকেটের ব্যারামে;
পরে হবে ডিএ আসছে বছর, গরিবের মুখে অন্ন
ক্লাব কালচার দেশের গর্ব, পেয়েছে যৎসামান্য।। 

---- সব ক্লাব ও চরিত্র কাল্পনিক।

আমাদেরই বাংলা রে ~ অমিতাভ প্রামাণিক

কোন দেশেতে গরুর কথা
সকল গরুর চাইতে হাসির?
কোন দেশেতে চলতে গেলেই
দলতে হয় রে নোংরা মাসির?
ট্যাঁক ফাঁকা, তাও দেদার টাকা
ক্লাবের মাথায় ঢালে রে।
সে আমাদের বাংলাদেশ,
আমাদেরই বাংলা রে...

শনিবার, ২৮ নভেম্বর, ২০১৫

ধর্ম ~ ইমতিয়াজ প্যাভেল

ধর্ম তুমি কোথায় থাকো
চুল, ত্বক না গোঁফের তলে ?
সত্যি তুমি থাকছো কোথায়
টাক, টিকি না দুই বগলে ?
ধর্ম তোমার কোথায় নিবাস
বোরখায় না লাল সিঁদুরে ?
ধর্ম কাকে দিচ্ছো মদত
মৌলবি না জাত হিঁদুরে ?
ধর্ম তুমি থাকছ কোথায়
চুল দাড়ি না পৈতে গিঁটে ?
কোথায় তোমার আসল ঘাটি
মক্কায় না তারার পিঠে ?
ধর্ম তুমি কোথায় ঘোরো
বাবরিতে না রাম-দুয়ারে ?
ভাসছো নাকি শুনতে পেলাম
রাজনীতি আর ক্রোধ জোয়ারে।
ধর্ম তুমি তৃপ্ত কিসে,
কুরবানি না বলিদানে ?
কখন তুমি নাড়াও মাথা
আজান নাকি গীতার গানে ?
ধর্ম নাকি আড্ডা মারো
ব্লাডব্যাঙ্ক আর হোটেলগুলোয় ,
আড্ডা নাকি মারছ শুনি
কবরখানায় শ্মশান চুলোয় ;
ধর্ম তোমার ইচ্ছেটা কি
বিচ্ছেদ আর রক্তমাখা
স্রষ্টার সব সৃষ্টিকে কি
ধন্দ দিয়ে সরিয়ে রাখা ?

আবোলতাবোল ~ আশিস দাস

বেজায় গরম। গাছতলায় দিব্যি ছায়ার মধ্যে শুয়ে আছি, তবু বোঁটকা গন্ধে অস্থির। ঘাসের উপর নোংরা পুরনো গেরুয়া চাড্ডিটা পড়ে ছিল; ফেলে দেবার জন্য সেটা যেই তুলতে গেছি অমনি চাড্ডিটা বলল, 'হাম্বা'! কি আপদ! চাড্ডিটা খামোকা হাম্বা করে কেন?
চেয়ে দেখি চাড্ডি তো আর চাড্ডি নেই, দিব্যি মোটা সোটা সাদা ধপধপে একটা গরু শিং উঁচিয়ে আমার দিকে প্যাট প্যাট করে তাকিয়ে আছে আর মোবাইল থেকে স্ন্যাপডিল আন-ইনস্টল করছে।
আমি বললাম, 'কি মুশকিল! ছিল চাড্ডি, হয়ে গেল একটা গরু।'
অমনি গরুটা বলে উঠল, 'গরু নই গরু নই, আমি গোমাতা। তাছাড়া মুশকিল আবার কি? ছিল আমির খান আর শাহরুখ খান, হয়ে গেল ঘোর শয়তান দেশদ্রোহী; ছিল দাঙ্গার মুখ, হয়ে গেল প্রধানমন্ত্রী। এতো হামেশাই হচ্ছে।'
আমি খানিক ভেবে বললাম, 'তাহলে এখন তোমায় কি বলে ডাকব? তুমি তো সত্যিকারের গরু, থুড়ি গোমাতা নও, আসলে তুমি হচ্ছ চাড্ডি।'
গরু বলল, 'গোমাতা বলতে পার, চাড্ডিও বলতে পার, অনুপম খেরও বলতে পার'। আমি বললাম, 'অনুপম খের কেন?'
শুনে গরুটা বলল, 'তাও জানোনা?' বলে এক চোখ বুজে ফ্যাচ ফ্যাচ করে বিশ্রী রকম হাসতে লাগল। আমি ভারী অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম। মনে হল ওই অনুপম খেরের কথাটা নিশ্চয় আমার বোঝা উচিত ছিল। তাই থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি বলে ফেললাম, 'ও হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি'।
গরুটা খুশি হয়ে বলল, 'হ্যাঁ, এতো বোঝাই যাচ্ছে- চাড্ডীর দ, খের-এর তালব্য শ, অনুপমের প, আর গোমাতার ম- হল দেশপ্রেমী। কেমন, হল তো?'
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না, কিন্তু পাছে গরুটা আবার সেই রকম বিশ্রী করে হেসে ওঠে, তাই সঙ্গে সঙ্গে হুঁ হুঁ করে গেলাম। তারপর গরুটা খানিকক্ষণ আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বলে উঠল, 'এই দেশে বোঁটকা গন্ধ লাগে তো পাকিস্তান গেলেই পার'। আমি বললাম, 'বলা ভারী সহজ, কিন্তু বললেই তো আর যাওয়া যায়না?'
গরু বলল, 'কেন? সে আর মুশকিল কি?'
আমি বললাম, 'কি করে যেতে হয় তুমি জানো?'
গরু একগাল হেসে বলল, 'তা আর জানিনে, গুজরাত, ইনটলারেন্স, বিফ ব্যান, দাদরি- ব্যাস। সিধে রাস্তা, সওয়া একঘন্টার পথ, গেলেই হল'।
আমি বললাম, 'তাহলে রাস্তাটা আমায় বাতলে দিতে পার?'
শুনে গরুটা হঠাৎ কেমন গম্ভীর হয়ে গেল। তারপর মাথা নেড়ে বলল, 'উহুঁ, সে আমার কর্ম নয়। আমার মোদীকাকা যদি থাকত, ঠিক ঠিক বাতলে দিতে পারত'।
আমি বললাম, 'মোদীকাকা কে? তিনি থাকেন কোথায়?'
গরু বলল, ' মোদীকাকা আবার কোথায় থাকবে? প্লেনেই থাকে; তবে মাঝে মাঝে হিমালয়ের চূড়ায় বসে ধ্যান-ও করে '।
আমি বললাম, 'কোথায় তার সাথে দেখা হয়?'
গরু খুব জোরে জোরে শিং নেড়ে বলল, 'সেটি হচ্ছে না, সে হবার জো নেই'।
আমি বললাম, 'কি রকম?'
গরু বলল, 'সে কিরকম জানো? মনে কর তুমি যখন যাবে দিল্লিতে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে, তখন তিনি থাকবেন ম্যাডিসন স্ক্যোয়ার। যদি ম্যাডিসন স্ক্যোয়ার যাও তাহলে শুনবে তিনি আছেন মারিয়ানা খাতের তলায়। আবার সেখানে গেলে দেখবে তিনি গেলেন আদানির প্রাইভেট জেটে। কিছুতেই দেখা হবার জো নেই'।
আমি বললাম, 'তাহলে তোমরা কি করে দেখা কর?'
গরু বলল, 'সে অনেক হাঙ্গামা। আগে হিসেব করে দেখতে হবে ক্যামেরা কোথায় নেই; তারপর হিসেব করে দেখতে হবে আডবানি আর অমিত শাহ এখন কোথায় থাকতে পারে; তারপর দেখতে হবে আদানি আর আম্বানি এখন কোথায় আছে।তারপর দেখতে হবে সেই হিসেব মত যখন সেখানে গিয়ে পৌঁছবে তখন মোদীকাকা কোথায় থাকবে। তারপর দেখতে হবে-'
আমি তাড়াতাড়ি বাধা দিয়ে বললাম, 'সে কিরকম হিসেব?'
গরু বলল, 'সে ভারী শক্ত। দেখবে কিরকম?' এই বলে সে একটা ত্রিশূল দিয়ে ঘাসের উপর একটা লম্বা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর মোদীকাকা'। বলেই খানিকক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ করে বসে রইল।
তারপর আবার ঠিক তেমনি একখানা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর তুমি', বলে ঘাড় বেঁকিয়ে চুপ করে বসে রইল।
তারপর হঠাৎ আবার একটা আঁচড় কেটে বলল, 'এই মনে কর পহেলাজ নিহালনি'। এমনি করে খানিকক্ষণ কি ভাবে আর একটা করে লম্বা আঁচড় কাটে, আর বলে, 'এই মনে কর বিহার বিধানসভা' – 'এই মনে কর যশোদাবেন পাসপোর্ট অফিস যাচ্ছে' – 'এই মনে কর জেমস বন্ড চুমু খাচ্ছে, ও না না ওটা তো সেন্সরড-'
এইরকম শুনতে শুনতে শেষটায় আমার কেমন রাগ ধরে গেল। আমি বললাম, 'দুর ছাই কিসব আবোল তাবোল বকছে, একটুও ভালো লাগেনা'।
অমনি গরুটা শিং বাগিয়ে জোরে একটা ঢুঁ মেরে বলল, 'তুই বেটা নিশ্চয় পাকিস্তানি! দেশদ্রোহী কোথাকার, যা দেশ ছেড়ে বেরিয়ে যা'।

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর, ২০১৫

মহাভারতের মর্মস্থল - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

মহাভারত? সেরেচে! চাটুজ্জ্যের পো তো আর কালী সিঙ্গী নয় যে বাংলায় মহাভারত লিখে সাড়া ফেলে দেবে। অথবা নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়িও নয় যে মহাভারতের অজানা সব গপ্প টপ্প শোনাবে। তার ওপর আমার বিদ্যেবুদ্ধির দৌড়ে, মহাভারত যদি লিখেও ফেলি, সেটা সাকুল্লে দেড় পাতাতেই শেষ হবে। তবুও মহাভারত ধরে কেন টানাটানি করছি তার কারনটা খুলে কই। ছোটোবেলায় স্কুলে পড়তে আমার বাবা একখানা অক্সফোর্ডের ম্যাপবই কিনে দিয়েছিলো বইমেলা থেকেআমার ভূগোলের বিদ্যে মন্দ নয়অন্ততঃ আমার নিজের হিসেবে আফ্রিকায় নেকড়ে বা চায়নার হায়নার মত আমার ভুগোল জ্ঞান, মন্দার বোসের সঙ্গে খানিকটা তুলনা করা যেতে পারে। তা সেই ম্যাপবই নিয়ে আমি খুব জমে গেলুম। আমাদের ছোটবেলায় অমন রঙচঙে বই খুব একটা বেশি ছিলোনা। প্রায়ই উলটে পালটে দেখতাম। এই করে করে মানচিত্র দেখাটা কেমন একটা নেশার মত দাঁড়িয়ে গেল। যা কিছুই পড়িনা কেন, ম্যাপবইতে সেই জায়গা খুঁজে বের করা চাই। তখন আমি বোধহয় ক্লাস সিক্স, নিজের চোখে বেশ ডেঁপো গোছের মিচকেঅন্যের চোখে হাবুলচাঁদ অবস্থাভেদে উল্টোটা। বই পত্র হাতের গোড়ায় যা পাই তাই পড়ি। খুব সম্ভবত শুকতারা পত্রিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত একটা লেখায় পেলাম ১৯৪১ সালে সোভিয়েত-জার্মান যুদ্ধের একেবারে শুরুতে ব্রেস্ত দুর্গের লড়াইয়ের কথা। সে লড়াই নিয়ে একখানা আস্ত লেখার ইচ্ছে রইলো, তাই এখানে ভ্যানতাড়া না করে সংক্ষেপে সারি। ম্যাপে দেখলাম ব্রেস্ত শহর সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেকটা ভেতরে। তাহলে লেখায় সীমান্ত শহর বলা হলো কেন? সমাধান পেলাম, ধুলো ভর্তি বইয়ের তাক ঘেঁটে বের করা ১৯৩৯ সালের আর একখানা অক্সফোর্ড অ্যাটলাস ম্যাপবইতে। একই বই। কিন্তু একি? দেশ গুলো সব অন্যরকম যে! সীমানাগুলো নতুন মানচিত্রে অনেকটা এদিক ওদিক সরে গেছে। ইয়োরোপের যুদ্ধের আগের মানচিত্র দেখে কেমন ঘোর লেগে গেল। কি মনে হলো, পাতা উলটে ভারতের মানচিত্র দেখতে গেলাম। গোলাপী রঙ দিয়ে ভারতের অবস্থান বোঝানো রয়েছে বইতে। আর সে ভারতবর্ষ পশ্চিমে কোহাট-বান্ন থেকে পূবে আরাকান পর্য্যন্ত বিস্তৃত। নতুন মানচিত্রে দেখলাম সেই ভূভাগের পূবদিকের নাম বাংলাদেশ, পশ্চিমদিকের নাম পাকিস্তান আর বাকিটুকু ? মনে মনে নাম দিয়েছিলাম বাকিস্থান।

মঙ্গলবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৫

চা বাগানের "ওরা " ~ অবিন দত্তগুপ্ত

শীতের সকালে , ধোঁয়া ওঠা এক কাপ চায়ে চুমুক না দিলে , ঠিক দিন শুরু হয় না । কি বলেন ? আমার তো হয়ই না । দার্জিলিং চা হলে তো কথাই নেই , গন্ধই আলাদা ।ডুয়ার্স বেড়াতে গিয়ে বীরপাড়া চা বাগানে , অস্তগামি সূর্যের রাঙা আলোয় তোলা সেল্ফি মনে আছে ? আর আশেপাশের লোকগুলো ? সকাল সকাল সেজে গুজে ,খোপায় ফুল লাগিয়ে , মলিন শাড়ী পরে যারা চা পাতা তুলতে যেতো ? জানি মনে আছে । মনে করে দেখুন , ওদের সাথে দাঁড়িয়ে , ওদের মতো করে আপনি চা পাতা তুলেছিলেন (ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে ...মিষ্টি হেসে ) , গুনে গুনে দুটো । একটা প্রোফাইল অন্যটা কভার । ডুয়ার্সের মমতাশঙ্কর বা দীপঙ্কর দে তো তখন আপনি । মনে পড়ে ?
যেটা মনে পড়ে না ,সেটা মনে পড়িয়ে দিতেই এই গৌরচন্দ্রিকা ।আপনার মনে পড়ে না,যারা চা শ্রমিক ,তাদের দিন মজুরি ঠিক কতো ? খুব কম , ওদের মাসের টাকায় , আপনার দিন গুজরান । আপনার মনে পড়ে কি , ওদের মজুরি বাড়ানোর দাবিতে , বছর খানেক আগে , সমস্ত চা বাগানের "ওরা " , আপনার আমার শহরের উদ্যেশ্যে লং মার্চ করেছিল ? হাঁপ ছাড়ুন , ওরা পৌছাতে পারেনি । যাদের হারানোর কিস্যু নাই , তারা রাজপথে হানা দিলে রাজধানীর কি ভয়ংকর অবস্থা হয় ,তা তো আপনারা নবান্ন অভিযানে দেখেছিলেন । চাষি -খেতমজুররা দেখিয়েছিল । দায়িত্ব নিয়ে বলছি ,ওটা ট্রেলার ছিল । চা বাগানের শ্রমিকরা পৌঁছালে পুরো সিনেমাটা দেখতে পেতেন । যাই হোক , চা শ্রমিকদের মাইনে কিছুটা বাড়ে , এবং ওরা সে যাত্রা , শহরকে রেহাই দেয় । যাদের কিচ্ছু নাই , কিছুটা জিতে নেওয়াও তাদের কাছে বিশাল জিত । শ্রমিক ইউনিয়ানগুলির যৌথ লড়াইতে , ওরা একটা লড়াই জিতেছিল । যুদ্ধ কিন্তু তখনো চলছে ।
তারপর আচ্ছেদিনের আগমনের সাথে সাথে , জিনিসপত্রের দাম বাড়ল । মজুরি আর বাড়ল না , যে যৎসামান্য রেশন পেয়ে ওদের বাচ্চারা বুড়োরা দুর্ধর্ষ ভাবে বেঁচে থাকত সেটা বন্ধ হয়ে গেল । অনাহারে প্রথম যে চা শ্রমিক মারা গেলেন , তার নাম আপনার মনে নেই । মালবাজারে মুখ্যমন্ত্রী উন্নয়নে সামিল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে ,আইফোন হাতে পোজ দিয়ে ফটো তুলেছিলেন । অসামান্য সেই ছবি আপনার মনে আছে । কিন্তু মনে নেই , যে ওই জায়গার থেকে মাত্র ২০-৩০ কিলোমিটার দূরে না খেয়ে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে একের পর এক মানুষ । মুখ্যমন্ত্রী জানতেন , উনি যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি । মিডিয়া বুম-ও ওনাকে ছাড়ার প্রয়োজন বোধ করেন নি । অতএব আপনার মনে রাখাকে আর দোষ দি কী করে বলুন ?
মনে রাখবেন , আজকে নিয়ে গত এক মাসে , ২৯ জন চাশ্রমিক অনাহারে মারা গেছেন । একমাত্র সি আই টি ইউ ছাড়া কেউ পাশে দাড়ায়নি । মনে রাখবেন তো বললাম , কিন্তু জানি মানুষ লেখার থেকে ছবি মনে রাখে বেশী । বীভৎস ছবি , অনাহার ক্লিষ্ট মানুষের ছবি , মানুষ মনে রাখে , বহুদিন পরে রমান্টিসাইজ করে । তাই আপনাদের ছবি দিচ্ছি । অনাহারে মাটির সাথে মিশে যাওয়া মানুষের ছবি দিচ্ছি । দেখুন , মনে রাখুন , আর প্রার্থনা করুণ মরলে যেন এরা সবাই মরে । কারণ একটা প্রজন্ম বেঁচে গেলেও , তাদের সামনে আপনাকে আমাকে জবাবদীহি করতে হবে । দেখুন ,
পুনশ্চ : আপনার পাড়ার ক্লাবে ২ লক্ষ টাকা ঢুকেছে ,আশা রাখি । 



 
 

সিনেমার নামঃ- দেওয়া-নেওয়া বা প্রেমপূজারী ~ অনামিকা

​হাপ্প্যান্ট কেঁদে বলে, প্রিয়তম তিনো
গলাগলি ভাব ছিল এই সেই দিনও।
কালিঘাট টালিঘরে নিয়ে দলবল
মাসিমা মালপো খামু, বলেছে অটল।
তারপরে যা ঘটল, কী যে বলি আর,
আমি সেন্ট্রালে, আর তুই সেকুলার।



তিনো বলে হাপ্প্যান্ট, তবে বলি শোনো,
নিজের ধান্দা ছাড়া চলিনি কখনও।
তবুও আশায় থাকি। ভুলে যাস তোরা
নরেনকে পাঠিয়েছি গোলাপের তোড়া।
তোদেরই তো ঘাড়ে চেপে রেলে কয়লায়
করেছি দেদার চুরি… মন যত চায়।
ট্রাপিজের এ' খেলায় ঠিক দড়ি ছুঁয়ে
পৌঁছে গিয়েছি সোজা 'ইউপিএ টু'এ
তারপর মাও-খাও-সারদার তেজে
পেয়ে গেছি নবান্ন। ইতিহাস সে' যে।
কেজরি ও লালুভুলু আরও কত শত
রয়েছে চেয়ার-লোভী ঠিক আমার মত।
গ্রুপ ফটো তোলা হল সে'গুলোর সাথে।
দেখিস পিএম হবো, নেক্সট চান্সটাতে।


হাপ্প্যান্ট কয়, কেস সোজা নয় ভাই
তোর সারদার পিছে মোর সিবিআই।
চেন বাঁধা সে কুকুর হাঁকে ডাকে জোরে
বললেই খ্যাঁক করে কামড়াবে তোরে।
তিনো বলে বৃথা কেন এত খ্যাঁচখ্যাঁচ
সোজা ও সরল এই গট আপের ম্যাচ।
উপরে কুস্তি আর তলে তলে প্রেম।
কী করবে নীতিহীন গাধা ছিপিয়েম?
তোর আছে গরুপূজা। বিপরীতে আমি
অভিনয়ে করে যাই সেকু-ভণ্ডামি।
এই ভাবে দুই স্থায়ী প্রেমিক প্রেমিকা
ভাগ যোগ হিংসার নিয়ে নিল ঠিকা।

বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০১৫

ভালবাসলে ঠিকই মরে যেত একদিন - শুভাশিষ আচার্য্য

ভালবাসলে ঠিকই মরে যেত একদিন
মায়ার এই সংসারকে বলে দিত বাই।
এখন খুব চিন্তা হয় কি হবে?  কি বলে
কাগজ দেখি? টিভি  খোলোতো ! হ্যাঁ হ্যাঁ এটা চাই......  
হত্যা দেখি টি আর পিতে  তুঙ্গভদ্রা,    
ঝালমুড়ির মতন দেখি খুন করা গুলো,
টাইম-পাস,জনচেতনা,বাইট বিলাস-
সব ত হল! সব ত হবে ! ওরা কি বলল?

“বস, মেরেছি। খুন হয়েছে একগুঁয়েটার,
রাতটা গেলে সব মিলিয়ে খান পঁচিশেক.
কিন্তু গুরু কি কিচাইন রক্ত কোথায়?
যতই মারি, চাক্কু, ছুরি, আগুন বেরোয়
নলি কাটলে মাথা কাটলে আগুন বেরোয়
দেশটারে না জাগায়ে দ্যায় অ্যাত্ত আলো...”

ভালবাসলে ঠিকই মরে যেত একদিন
মায়ার এই সংসারকে বলে দিত বাই।
হত্যা করা হয়েছে তাই আলোর উৎস
মরে যাবার আর কোনই পথ খোলা নাই।

শুক্রবার, ৩০ অক্টোবর, ২০১৫

হাসির সপ্তক ~ অরুনাচল দত্তচৌধুরী

হাসির সপ্তক
--------------------

১)
ট্যাব-এ ছবি তোলা হবে, হয়েছে হুকুম
হাসিমুখে পোজ দাও
চা বাগান, ভুলে যাও খিদে মরসুম

মরে গেছো? মরে যেতে পারো।
উড়োকথা শোননি কি?
শোননি কি হাসছে পাহাড়ও…

২)
জাতপাতই সত্য শুধু,
বাকি সবই ভান
ভাগ্যিস ছিল পাকিস্তান
উবে গেছে ডিজিটাল ইন্ডিয়া অছিলা

পতনের যাত্রাপথে
হেসে ওঠে উন্নয়নশিলা

৩)
লুকোই না, লুকিয়ে কী লাভ
হাসি দিয়ে মুছেছি বিলাপ

আমনধানের মাঠে  জড়ো হয় তুষ
জল নেই অজুহাতে
বিষ খায় অভাবী মানুষ

৪)
বলব না, শুনব না, ওই দৃশ্য দেখব না চোখে
এমনকি ভাবব না, কারা খুবলে খেয়ে নিল তোকে।

মেয়ে,
তোর মৃতদেহ চিবোতে চিবোতে
মুচকি ঠোঁটে তর্ক করব সান্ধ্য টক শোতে।

৫)
অনাহার মেঘ নেই,
হেথা শুধু মিঠে কড়া রোদ।
একপ্লেটে বিফ খায় বিকাশ-সুবোধ।

কেন, শুধু গরু কেন?

অকারণ এই সব জেরা।
আপাতত বেঁচে গেছে
ভীতু আর বোকা শুওরেরা।

৬)
দানাপানি খুদকুঁড়ো নিশ্চয়তা পেলে
পায়রারা রোজ হাসে সকালে বিকেলে
কবুতরশাস্ত্র আজও পুরনো রকম
ক্ষমতার খোপে বসে অবিরত বকম বকম

৭)
হাসিমুখে বাধ্য বাঁচো,
না বাঁচলে সব কিছু মাটি
আহারে বাহারে নাও সমস্ত মজাটি

খাদ্য উৎসব হোক
জল-উৎসব বোতলে বোতলে
সব পাবে,
ভাগ্যবলে বেঁচে আছো বলে।

গরুর কবিতা ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য


একটি গরু দুগ্ধ দেয়
গোয়ালা তাতে জল মেশায়;
একটি গরু দুইটি শিং
ক্যানিং থেকে দার্জিলিং;
একটা গরু চারটি পদ
হোয়াংহো কি সিন্ধু নদ-
একটি গরু একটি নাক
দ্বন্দ্ব বিভেদ নিপাত যাক;
একটি গরু একটি লেজ
কালো গরুর ভীষণ তেজ;
গরুও ফেলে মাথার ঘাম
ঘণ্টা, উলু, লাল সেলাম;
গরুর অতীত বর্তমান
কে হিন্দু কে মুসলমান;
গরুর তবু বুদ্ধি বেশ
ছোট্ট বড় নির্বিশেষ;
গরুর গোবর ষাঁড়ের নয়
হিংসা, বিভেদ, যুদ্ধজয়-
গরুর কষ্ট, গরুর ক্লেশ
ভারতবর্ষ আজব দেশ।।

রবিবার, ২৫ অক্টোবর, ২০১৫

এক সন্ধ্যের গল্প (উদ্ভুট্টে সিরিজ) - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

( লিখছি তো উদ্ভুট্টে সিরিজ, তাহলে উদ্ভট লিখবোনা কেন? )

শীতের বিকেল বড্ড তাড়াতাড়ি শেষ হয়। আর চায়ের তেষ্টাও পায় বেশী। ১৮৯৪ শকাব্দ শেষ হয়ে আসছে, আর মাত্র কয়েক দিন, তার পরেই ১৮৯৫ শকাব্দ শুরু হবে। কিন্তু আজকাল ভারতে সরকারি শকাব্দ কেউই আর মনে রাখেনা। সাল জিজ্ঞেস করলে ১০০ জনে ১০০ জন ভারতীয়ই বলবে এটা ১৯৭২ সাল, মানে ১৯৭২ খ্রীষ্টাব্দ। আহমেদাবাদের উপকণ্ঠের এই নতুন মহল্লায় সব বাড়ির বাসিন্দারাই বাড়ির সঙ্গে একটু করে বাগান রেখেছেন। শেষ বিকেলের ঝিরি ঝিরি ঠান্ডা হাওয়া আসছে জানলা দিয়ে। গায়ে কাজকরা কাশ্মিরি শালটা ভাল করে জড়িয়ে তাকিয়ায় হেলান দিয়ে বসলেন অধ্যাপক। সামনে চশমা চোখে নবীন ছাত্রটিকে তাঁর বেশ পছন্দ। তার প্রশ্নের শেষ নেই খুঁটিয়ে জানতে চায় সব কিছু

বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৫

দলিতদের শিক্ষা ও আর এস এস ~ পুরন্দর ভাট

কাল ফরিদাবাদে দুটি দলিত শিশুর গায়ে পেট্রল ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে জ্যান্ত পুড়িয়ে মেরেছে রাজপূতরা। রাজস্থানের রাজপূতরা এককালে মৃগয়া করতে গিয়ে হরিন, বরাহ শিকার করার সঙ্গে সঙ্গে ভিল উপজাতির মানুষদেরও "শিকার" করতো বলে শোনা যায়। সেই ক্ষাত্রতেজ বোধয় জাগ্রত হয়ে উঠেছিলো ফের, তাই দুটি শিশুকে জ্যান্ত জ্বালিয়ে দিলো। আসলে দলিতদেরই দোষ। খবরের খুটিনাটি পড়ে যা বুঝলাম যে মাস কয়েক আগে এক রাজপূতের মোবাইল ফোনটি ফসকে নর্দমায় পড়ে যায়। রাজপূতের মোবাইল নর্দমায় পড়ে গেলে দলিতদের তো ডিউটি সেটা উদ্ধার করে দেওয়া, হিন্দু শাস্ত্রমতে তো সেটাই সঠিক। দলিত উপস্থিত থাকতে রাজপূত ক্ষত্রিয় নর্দমায় হাত দেবে!! এরকম ঘটনা রাম রাজ্যে কখনো ঘটতেই পারে না। অগত্যা কয়েকজন দলিতকে "অনুরোধ" করা হয় নর্দমায় নামতে, বোধয় টাকা পয়সা দিতেও অরাজি ছিলো না তবুও দলিতদের সকলে নর্দমায় নামতে অস্বীকার করে দেয়। কি আস্পর্ধা ভাবা যায়!! দলিতদের শিক্ষা দিতে এক দল রাজপূত চড়াও হয় দলিত বস্তিতে। কিন্তু কোনো অজ্ঞাত কারণে দলিতরা মাথা নোয়াবে না ঠিক করে, রুখে দাঁড়ায় রাজপূতদের গুন্ডাবাহিনীর বিরুদ্ধে, বাড়ির মেয়েরাও হেঁসো আর বঁটি নিয়ে বেরিয়ে আসে এবং গণপিটুনিতে তিনজন রাজপূত গুন্ডার অকাল মৃত্যু ঘটে। পুলিশ এগারো জন দলিতের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ দায়ের করে এবং গ্রেফতার করে। কিন্তু রাজরক্ত কি এতে শান্ত হতে পারে? তা ছাড়া আসল অপরাধের জন্যে তো কোনো শাস্তিই হলো না - নর্দমা থেকে মোবাইল তুলে দেওয়ার "অনুরোধ" উপেক্ষা করেছে দলিতরা। আর ঠিক মতো সায়েস্তা না করা গেলে যদি দিকে দিকে দলিতরা এরকম সাহসী হয়ে ওঠে? তাহলে? নাহ এ বরদাস্ত করা যায় না। তাই রাতের অন্ধকারে লুকিয়ে, দলিত বস্তিতে আক্রমন করে, শিশুদের হত্যা করে নিজের ক্ষাত্রশক্তির প্রমান দেওয়ার খুব প্রয়োজন ছিলো। এরকম আক্রমন যে হতে পারে তা দলিতরা সন্দেহ করেছিলো এবং সেই অনুযায়ী পুলিশী পাহাড়া চেয়েছিলো আগেই, দলিত বস্তির ওপর কড়া নজর রাখার কথা ছিলো পুলিশের। কিন্তু রাজপূতরা দলিতদের হাতে অপমানের বদলা নেবে আর তাতে পুলিশ বাধা দেবে, এতো বড় অনর্থ কখনো হিন্দু হৃদয় সম্রাটের রাজত্বে হতে পারে? রাম রাম!


হরিয়ানা এবং তার সংলগ্ন পশ্চিম উত্তর প্রদেশ, ও উত্তর রাজস্থানে, দলিতদের ওপর নানা রকমের অত্যাচারের ঘটনা গত এক বছর ধরে হু হু করে বেড়েছে। খুবই স্বাভাবিক, দেশব্যাপী বর্ণ হিন্দুর ক্ষমতার পুনর্জাগরণ চলছে, সেখানে এরকমই হবে। কোথাও মুসলমান তো কোথাও দলিতদের এই ক্ষমতার বলি হতে হবে। হরিয়ানায় মুসলমান ৫%-এরও কম, তাদেরকে মেরে খুব একটা শক্তিপ্রদর্শন হবে না, বরং দলিত মারলে বর্ণ হিন্দুদের বেশ এককাট্টা করা যাবে। সোনেপাতে তিন চার মাস আগেই একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেলো। দলিত বস্তির কতগুলি শিশু ক্রিকেট খেলতে খেলতে বল গিয়ে পড়ে আরএসএসের জেলা দফতরের ভেতর। সেখান থেকে বল আনতে গেলে একটি শিশুকে মেরে খোঁড়া করে দেয় হিন্দু বীরেরা। শিশুটির মা বাবা ঘটনাটি নিয়ে দফতরে অভিযোগ জানাতে এলে বেদম মারা হয় তাদের, শিশুটির বাবা দুটি হাতের একাধিক জায়গায় হাঁড় ভাঙ্গে। সেখানেই থেমে থাকেনি, এরপর আরেসএসের দফতর থেকে ৪০-৫০ জনের বাহিনী দলিত বস্তিটিকে আক্রমন করে, যথেচ্ছ মারা হয় লাঠি, হকি স্টিক, শাবল দিয়ে। ১০ জনেরও বেশি দলিত হাসপাতালে ভর্তি হোন মারের চোটে। এরপর তারা পুলিশে অভিযোগ জানাতে গেলে পুলিশ তাদেরকে আরএসএসের সাথে মিমাংসা করে নিতে চাপ দেয়। বস্তির পাশেই একটি দোকানে লাগানো সিসিটিভি ক্যামেরায় আরেসএসের হনুমানদের তান্ডবের ফুটেজ থাকা সত্বেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেওয়া হয়নি। পুলিশকে জিজ্ঞেস করলে তারা জানায় যে বস্তিবাসীরা আরএসএসের সাথে নিজেরাই মিটমাট করে নিয়েছে কিন্তু বস্তিবাসীরা স্পষ্ট বলে যে পুলিশের চাপে পড়েই তারা বাধ্য হয়েছেন। 
এখন এরকমই চলবে, কথায় কথায় মুসলমান ও দলিতদের মারধোর খুন করা হবে। আমার তো মনে হয় খুব শীঘ্রই এই তালিকায় খৃষ্ঠান আদিবাসীরাও সামিল হবেন। 
একটু ভেবে দেখুন তো যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার আগের দশ বছর কি নিয়ে মানুষ চিন্তিত ছিলো? কি নিয়ে সংবাদপত্রগুলো খবর করতো? মনে পড়ে? চাষী আত্মহত্যা, বেসরকারিকরণ, জমি অধিগ্রহণ, খাদ্যের অধিকার, অরণ্যের অধিকার, কেন্দ্র সরকার এবং বিভিন্ন রাজ্য সরকারগুলোর চুরি জোচ্চুরি, মূল্যবৃদ্ধি এসবগুলোই আলোচ্য বিষয় ছিলো তাই না? গত এক দের বছর ধরে তার জায়গা নিয়েছে গোমাংশ, লাভ জিহাদ, ধর্মান্তকরণ, মুক্তমনাদের হত্যা। 
প্রশ্ন হচ্ছে যে আগে যে বিষয়গুলো নিয়ে মাথা ঘামাতাম সেগুলো কি আর নেই? 
চাষী আত্মহত্যা বন্ধ? বরং উল্টে আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। পাঞ্জাবে তুলা চাষ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে এই বছর, আত্মহত্যার মহামারী লাগতে চলেছে আগামী কয়েকদিনের ভেতর। একই অবস্থা মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, অন্ধ্রে। 
অথবা মূল্যবৃদ্ধি? পেঁয়াজের দাম কমতে না কমতেই হু হু করে বাড়ছে ডালের দাম। সবজির দামও কমার নাম গন্ধ নেই। 
ভ্রষ্টাচার? কেন্দ্র সরকারের সবে এক বছর হয়েছে, প্রথম ৫ বছর তো কংগ্রেসের চুরিও ধরা পড়েনি। কিন্তু মধ্যপ্রদেশে একের পর এক কান্ড বেরিয়ে চলেছে। ব্যাপাম কেলেঙ্কারীর পর এখন বেরোচ্ছে চাষীদের ঋণ নিয়ে বিশাল কেলেঙ্কারী। 
জমি অধিগ্রহণ আইন কেন্দ্র সংসদে ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হলেও রাজ্যগুলো তাদের আইন বদলাতে শুরু করে দিয়েছে। জমি রাজ্যের আওতায় পড়ে তাই রাজ্যে আইন বদলেই জমি লুঠ করা যায়। দেশের ৭-৮ টি বড় রাজ্য বিজেপির শাসনে, তারা জমির আইন বদলে পুঁজিপতিদের সুবিধে করে দেবে। বাকি রাজ্য থেকে শিল্পপতিরা চলে যেতে থাকবে ওই রাজ্যগুলিতে আর তাই বাকি রাজ্যগুলিও এরপর বাধ্য হবে তাদের জমির আইন বদলাতে। কে কতো পুঁজিপতিদের হয়ে জমি লুঠ করতে পারে তার অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুরু হবে রাজ্যগুলোর মধ্যে। হবে কি হয়ে গেছে। 
শ্রম আইন বদলানোর পরিকল্পনা চলছে, চালু হতে চলেছে ইচ্ছে খুশি মতো "হায়ার এন্ড ফায়ার", চাকরির সুরক্ষা, শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর ক্ষমতা সবই খর্ব হবে। তারই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেসরকারীকরণ চলছে, রেলকে বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা পাকা, লাইনে আছে স্টেট ব্যাংক এবং এলআইসি। 
এবং এরই সঙ্গে জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলোয় লাল বাতি জ্বালানো শুরু হয়েছে। প্রথম ইউপিএ সরকার অনেক ভুল কাজ করলেও নতুন বেশ কয়েকটি জনকল্যাণ প্রকল্প শুরু করেছিলো। যেমন ১০০ দিনের কাজ, গ্রাম সডক যোজনা, ইন্দিরা আওয়াস যোজনা, জাতীয় গ্রামীন স্বাস্থ্য মিশন প্রভৃতি। তারই সঙ্গে বাজপেয়ীর আমলে শুরু হওয়া সর্ব শিক্ষা অভিযানে বরাদ্দ টাকা বাড়ানো হয়েছিলো অনেকটাই, কেন্দ্রীয় সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণাগারগুলোতেও টাকা বরাদ্দ বেড়েছিলো অনেকখানি। কিন্তু এই সরকার শুরু থেকেই সব রকম জনকল্যাণ প্রকল্পে টাকা ছাঁটাই করার প্রতিজ্ঞা করেছে। আইআইটি, এনআইটি গুলোর পড়াশুনোর সমস্ত খরচ ছাত্র ছাত্রীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে যার ফলে এসব কলেজে পড়বার খরচ ৪ বছরে ৮-১০ লক্ষ টাকায় গিয়ে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রগুলোতে কয়েকশো কোটি টাকা খরচ কমিয়েছে সরকার। এসব জায়গার সায়েন্টিস্টরা আশংকায় ভুগছেন ভবিষ্যত সম্পর্কে। আজকেই তার ওপর ঘোষণা করেছে যে নেট-জেআরএফ বাদ দিয়ে আর কোনো স্কলারশিপ সরকার দেবেনা। এর ফলে দেশের বিভিন্ন কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বহু ছাত্র ছাত্রী বিপদের মুখে, কারণ খুব কম ছাত্র ছাত্রীই জেআরএফ পান। ইউপিএ আমলে নিয়ম চালু হয়েছিলো যে নেট-জেআরএফ না থাকলেও পিএচডি ছাত্র ছাত্রীদের মাসে ৫ হাজার টাকা স্কলারশিপ দেওয়া হবে। সেই ব্যবস্থা উঠে গেলো। অনেক কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়তে এর পাশাপাশি ছিলো মেরিট কাম মিনস স্কলারশিপ, অর্থাৎ গরিব ঘরের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের কিছু মাসোহারা দেওয়া হতো যাতে হোস্টেলে থেকে পড়তে তাদের অর্থকষ্ট না হয়। উঠে যাবে তাও। উচ্চশিক্ষায় খরচ কমিয়ে এই টাকা যদি প্রাথমিক শিক্ষায় দিতো তাহলেও একটা কথা ছিলো কিন্তু বাজপেয়ীর তৈরী সর্ব শিক্ষা অভিযানের টাকাও কমানো হচ্ছে। এমনকি হাত পড়েছে মিড ডে মিলেও! কেন্দ্র বাজেটে শিক্ষা খাতে খরচ মোট খরচের শতাংশ হিসেবেই কমিয়ে দিয়েছে সরকার, এর আগে এই কাজ আর কোনো সরকার বোধয় করেনি, এরাই প্রথম। সরকারের উদ্দেশ্য খুবই স্পষ্ট, শিক্ষাকে সরকারের ঘাড় থেকে নামিয়ে বেসরকারী হাতে তুলে দেওয়া। পাল্লা দিয়ে কমেছে স্বাস্থ্যক্ষেত্রে খরচ। গত বাজেটে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিশু ও নারীর পুষ্টির পরিকল্পনাগুলো। অবস্থা এতোই শোচনীয় যে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী মানেকা গান্ধী প্রতিবাদে সরব হয়েছেন, থাকতে না পেরে। কিন্তু মানেকা হয়তো জানেন না যে এই কাজগুলো করার জন্যই এই সরকার এসেছে। পুঁজিপতিরা তাদের ভাঁড়ার খুলে টাকা ঢেলেছিলো এদের নির্বাচনী প্রচারে। দেশে উচ্চবর্ণ ও ধনী যারা (বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দুটো সমার্থক) তাদের একনায়কতন্ত্র চলছে। গণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র আর এই দেশে নেই। মুশকিল হলো ভোটে গরিব মানুষের ভোটটাও প্রয়োজন হয়, শুধু তো আর শাইনিং ইন্ডিয়ানদের ভোটে জেতা যায় না। তাই কখনো ধর্ম আর কখনো জাতের নামে চলছে মেরুকরণ। 
এই বিষবৃক্ষকে শেষ করতে হলে শুধুমাত্র ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললে হবেনা, শুধুমাত্র সংবেদনশীলতার কথা বা বহুত্ববাদের কথা বললে চলবে না। কয়েকটা ডালপালা কাটলেই বিষবৃক্ষ মরে না, ফের ডালপালা গজিয়ে যায়। যদি এই বিষবৃক্ষকে শেষ করতে হয় তাহলে তার জল ও সারের যোগান আটকাতে হবে। যে পুঁজিপতি এবং ব্যবসায়ীরা এই বিষবৃক্ষকে জল ও সার দিয়ে লালন পালন করছে লড়তে হবে তাদের বিরুদ্ধে, তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে। ধর্মনিরপেক্ষতার লড়াই, দলিতদের লড়াইকে মেলাতে হবে জমির অধিকারের লড়াই, বেসরকারিকরণের বিরুদ্ধে লড়াই, জনকল্যাণ প্রকল্পে বরাদ্দ কমানোর বিরুদ্ধে লড়াই, ছাত্র ছাত্রীদের স্কলারশিপ কমানোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে। তা যদি করা না যায় এই বিষবৃক্ষকে ধ্বংশ করা অসম্ভব।

সোমবার, ৫ অক্টোবর, ২০১৫

আব্বুলিশ ~ অনামিকা মিত্র

মরতে থাকিস প্রাণের ভয়ে
তবুও তোরা কী সংশয়ে
ইভিএমএর বোতাম ছুঁতে
ভিড় করে যাস পাড়ার বুথে?

ডেমোক্রেসির কারখানাতে
ব্যস্ত আমরা ভোট বানাতে।
গণতন্ত্রের পিণ্ডি চটকে
বাগে আনব সবার ভোটকে।

কমিশনটা পোষ্য চাকর
খুব প্রতিবাদ করবি? তা' কর।
শিডিউলড সবই, ঘটবে কী কী।
ওর যা' করার করবে ঠিকই

অবাধ্য সব সাংবাদিককে
রামপিটুনির দিলাম শিক্ষে।
সবটাই খুব ভদ্র শালীন
চ্যানেল চেঁচাক, সান্ধ্যকালীন।

জয় শাঁওলির শ্রীমুখ বন্ধ
বিদ্দজ্জন… দেখেও অন্ধ
ঘাড়ের ওপর বসল ডাইনি।
খুব পস্তায়… এমন চাইনি।

ভার্টিব্রেট দু'একখানার
জন্য ধার্য বুলেট দানার
হিসেব না হয় রাখবে পুলিশ
খেলবি না আর? কী, আব্বুলিশ?