মহাভারত? সেরেচে! চাটুজ্জ্যের পো তো আর কালী সিঙ্গী নয় যে বাংলায় মহাভারত
লিখে সাড়া ফেলে দেবে। অথবা নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়িও নয় যে মহাভারতের অজানা সব গপ্প
টপ্প শোনাবে। তার ওপর আমার বিদ্যেবুদ্ধির দৌড়ে, মহাভারত যদি লিখেও ফেলি, সেটা
সাকুল্লে দেড় পাতাতেই শেষ হবে। তবুও মহাভারত ধরে কেন টানাটানি করছি তার কারনটা
খুলে কই। ছোটোবেলায় স্কুলে পড়তে আমার বাবা একখানা অক্সফোর্ডের ম্যাপবই কিনে
দিয়েছিলো বইমেলা থেকে। আমার ভূগোলের বিদ্যে মন্দ নয়। অন্ততঃ আমার নিজের হিসেবে। আফ্রিকায় নেকড়ে বা চায়নার হায়নার মত আমার ভুগোল জ্ঞান, মন্দার বোসের
সঙ্গে খানিকটা তুলনা করা যেতে পারে। তা সেই ম্যাপবই নিয়ে আমি খুব জমে গেলুম। আমাদের
ছোটবেলায় অমন রঙচঙে বই খুব একটা বেশি ছিলোনা। প্রায়ই উলটে পালটে দেখতাম। এই করে
করে মানচিত্র দেখাটা কেমন একটা নেশার মত দাঁড়িয়ে গেল। যা কিছুই পড়িনা কেন, ম্যাপবইতে
সেই জায়গা খুঁজে বের করা চাই। তখন আমি বোধহয় ক্লাস সিক্স, নিজের চোখে বেশ ডেঁপো
গোছের মিচকে। অন্যের চোখে হাবুলচাঁদ। অবস্থাভেদে উল্টোটা। বই পত্র হাতের গোড়ায় যা পাই তাই পড়ি। খুব সম্ভবত
শুকতারা পত্রিকায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সম্পর্কিত একটা লেখায় পেলাম ১৯৪১ সালে
সোভিয়েত-জার্মান যুদ্ধের একেবারে শুরুতে ব্রেস্ত দুর্গের লড়াইয়ের কথা। সে লড়াই
নিয়ে একখানা আস্ত লেখার ইচ্ছে রইলো, তাই এখানে ভ্যানতাড়া না করে সংক্ষেপে সারি।
ম্যাপে দেখলাম ব্রেস্ত শহর সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেকটা ভেতরে। তাহলে লেখায় সীমান্ত
শহর বলা হলো কেন? সমাধান পেলাম, ধুলো ভর্তি বইয়ের তাক ঘেঁটে বের করা ১৯৩৯ সালের আর
একখানা অক্সফোর্ড অ্যাটলাস ম্যাপবইতে। একই বই। কিন্তু একি? দেশ গুলো সব অন্যরকম
যে! সীমানাগুলো নতুন মানচিত্রে অনেকটা এদিক ওদিক সরে গেছে। ইয়োরোপের যুদ্ধের আগের মানচিত্র
দেখে কেমন ঘোর লেগে গেল। কি মনে হলো, পাতা উলটে ভারতের মানচিত্র দেখতে গেলাম। গোলাপী
রঙ দিয়ে ভারতের অবস্থান বোঝানো রয়েছে বইতে। আর সে ভারতবর্ষ পশ্চিমে কোহাট-বান্ন
থেকে পূবে আরাকান পর্য্যন্ত বিস্তৃত। নতুন মানচিত্রে দেখলাম সেই ভূভাগের পূবদিকের
নাম বাংলাদেশ, পশ্চিমদিকের নাম পাকিস্তান। আর বাকিটুকু ? মনে মনে নাম দিয়েছিলাম বাকিস্থান।
সরকারিভাবে সেই বাকিস্থানের নাম ভারত। কিছু কিছু রাজনৈতিক প্রবক্তারা
বৃহত্তর ভারত, অখন্ড ভারত ইত্যাদি ধুয়ো তুলে বাজার গরম করেন মাঝে মধ্যেই। আমি সে সব
থেকে বহু দূরে। তবে কিনা, হিন্দ বা হিন্দুস্থান বলতে বোঝাত হিন্দুকূশ পর্বতমালা
থেকে বাংলার পূর্বপ্রান্ত পর্য্যন্ত ভূভাগ কে। আজকের আফগানিস্থান থেকে সে ভূমি
বিস্তৃত ছিলো মনিপুর পর্য্যন্ত। আজকের রিপাবলিক অফ ইন্ডিয়া যদি ভারত হয়, তাহলে
পূব-পশ্চিমের বাকিগুলো নিয়ে সব শুদ্ধু ভূভাগকে কি বলি? আমার মোটা মাথায় মহাভারত
শব্দটাই এলো। যাই হোক, এবারে আসল কথায় আসি। ভনিতা অনেক হলো। এই মহাভারতের মর্মস্থল
বলি কোন জায়গা কে? আজ্ঞে, সেই মহাভারতের ইন্দ্রপ্রস্থ থেকে আজকের দিল্লি-আগ্রা, এই
ভূভাগের ক্ষমতার কেন্দ্র তো ওখানেই। ইসলামাবাদী ও ঢাকাইয়া এমনকি কাবুলীরাও আমার
কথায় চটতে পারেন। ঠিক আছে, নিদেন পক্ষে এইটুকু তো বলতেই পারি, গত ২০০০ বছরের মধ্যে
বেশিরভাগ সময়েই মহাভারতের রাজধানী ছিলো ওই অঞ্চলগুলোতেই। এবারে ইসলামাবাদী খুশ্, কাবুলী তর্ আর ঢাকাইয়ার
দিল-কলিজা ঠান্ডা।
দিল্লির সর্বাঙ্গে ধনদৌলতের ছড়াছড়ি। গরিব দেশ হলেও, রাজধানীর ঠাটবাট
বজায় রাখতে হয়।বিশেষ করে নয়াদিল্লির কিছু ব্যাপার স্যাপার দেখে তো চোখ ধাঁধিয়ে
যায়। চওড়া মসৃন রাস্তা। যেমন রাস্তা কলকাতায় এক রেড রোড ছাড়া আর নেই। রাস্তায় চলছে বাতানুকূল বাস ও হাজার
কিসিমের বিদেশি ঢাউস ঢাউস গাড়ি। একটা সময় দিল্লির জনপরিবহন ব্যবস্থা ছিলো
যন্ত্রনাদায়ক। কিন্তু এখন, বিশেষ
করে দিল্লি মেট্রো চালু হবার পর থেকে, দেশের সবচেয়ে ভাল জনপরিবহন ব্যবস্থা এই
দিল্লিতেই। দিল্লি মেট্রো একবার চড়ে দেখবেন। সত্যি দেখার মতো। গোটা ছয়েক লাইন। বেশ
কিছু স্টেশন দোতলা, সেখানে এক লাইন থেকে অন্য লাইনের গাড়ি বদল করা যায়। কনট প্লেস
থেকে ২৫ মিনিটে গাজিয়াবাদ যে এরোপ্লেন ছাড়াও পৌঁছনো যায়, সেটা মেট্রোতে উঠলে বোঝা
যায়। তিন মিনিট অন্তর ট্রেন। আর সেটা আক্ষরিক অর্থেই। আগেও দিল্লি দেখেছি, এখন ও দেখছি। নতুন বলতে
একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, স্বছলতা বোধহয় মানুষকে নিয়মানুবর্তি করে।
দিল্লি হলো দিলওয়ালা মানুষের শহর। অন্তত শহরের মানুষের দাবী সেরকমই।
তবে কিনা ট্রেন-বাস-এরোপ্লেন, যা থেকেই নামুন না কেন, পয়লা কদমে দিল্লি কিন্তু
বেজায় কাটখোট্টা আর বেরসিক। বিরক্ত মুখের জাট্, দশাসই হামবড়া পাঞ্জাবী, লাল চোখের
বিহারি, কাটখোট্টা রাজপুত, নাক উঁচু কাশ্মিরী, সংখ্যায় কম হলেও গম্ভীর দক্ষিনী, কিঞ্চিত
আত্মমগ্ন খাস পুরোনো দিল্লির খানদানি আদী মুসলিম বাসিন্দা, এমনকি দিল্লির
বাঙালিদের অনেকের মধ্যেও বাইরের লোকজন সম্পর্কে কেমন একটা নাক উঁচু, হতচ্ছেদ্দা
ভাব। অটো ওয়ালা, ট্যাক্সিওয়ালা, দিল্লি পুলিসের তাল ঢ্যাঙা জাট্ কনস্টেব্ল্
যাকেই দেখুন, মুরুব্বি মার্কা হাবভাব চোখে পড়বেই। তবে কিনা সেটা গেল প্রথম ধাক্কা। ধীরে ধীরে আপনি বুঝবেন,
প্রথম দেখাটাই সব না। দিল্লিওয়ালারা অনেকটা খোলা সমেত চিনেবাদামের মত। ওপরের
খোলাটা বেজায় কর্কশ,ছিবড়ে আর অখাদ্য। কিন্তু খোলা ছাড়িয়ে ভেতরে ঢুকলে পাবেন নিটোল,
ভুরভুরে, সুগন্ধী, সুস্বাদু দু-তিন দানা বাদাম। প্রথম দর্শনে আপনি দিল্লিওয়ালার কাছে নেহাতই
“বাহারওয়ালে”। কিন্তু বিশ্বাস করুন, সত্যিই দিলওয়ালার শহর দিল্লি। আপনাকে শুধু সেই
দিল্ পর্যন্ত্য পৌঁছতে হবে। তখন আপনি তার মেহমান্, দোস্ত। দিলখোলা আড্ডা বলুন,
রসিকতা বলুন, ছোলে-বাটুরে, আলু-দা-পারান্ঠে, নিহারি, কিমা-কলেজি, কাবাব কি বিয়ার
বা হুইস্কি সব কিছুই আপনার সঙ্গে তখন সে “মিল্-বাট্কে” নেবে। তবে হ্যাঁ, আমাদের
অ্যাংলো-বাংলা রসবোধের মাপকাঠিতে (এখনো যদি কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে) দিল্লির
রঙ্গরসিকতা কিঞ্চিত বেখাপ্পা-চাষাড়ে লাগতে পারে। যেমন আবার দিল্লিওয়ালার চোখে বাংলার লোকজন সব
নাকি মার্কা মারা গোমড়াথেরিয়াম। আর একটা কথা। চিনেবাদামের ঠোঙ্গায় কিন্তু বেশ কিছু পচা বাদাম বেরোয়। সে
কথা খেয়াল রাখবেন। পচা বাদাম দিয়ে, সমস্ত চিনেবাদামের স্বাদ মাপতে যাবেন না, এইটুকু
অনুরোধ।
লাল
কেল্লায় ঢোকার মুখে মীনা বাজার
দিল্লি বেশ চকচকে শহর। শহর ভর্তি চক। সে শাহজাহানাবাদের (পুরোনো
দিল্লি) চাঁদনি চক হোক, বা ল্যুটেন সাহেবের নয়াদিল্লির রাজীব চক, ইন্দিরা চক বা
মান্ডি হাউস চক। এই ল্যুটেন বাবুর নামের আসল উচ্চারনটি আমার জানা নেই। লুটিয়েন,
ল্যুটেন, লোটেন এমনকি লুচেন, লিচেন অবধি শুনেছি। এবং যেখানে পন্ডিতেরাই একমত নন
উচ্চারন নিয়ে, সেখানে আমার মত গেঁয়ো লোকে কি কইল তা নিয়ে নিশ্চই পাঠক মাথা ঘামাবেন
না। চকের পরেই আছেন বিখ্যাত মহাপুরুষ এবং মহানারীদের নামাঙ্কিত রাস্তা। দিল্লিতে
মনুষ্যবসবাসের নিশ্চিত প্রত্নতাত্বিক প্রমান পাওয়া যায় খ্রীষ্টের জন্মের প্রায় ৬০০
বছর আগে থেকে। তার আগেও নাকি এখানে লোকজন থাকত, তবে তার প্রত্নতাত্বিক প্রমান এখনো
পাওয়া যায়নি। দিল্লি মেট্রোর খোঁড়াখুড়ি আরও বাড়লে হয়ত বেরোবে। রাস্তায় নামলেই
দেখবেন এই ভারত তথা দিল্লির গত আড়াই হাজার বছরের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ মানুষজনের নাম
ধারন করে আছে দিল্লির রাস্তা ঘাট। ভাবি, আমাদের ইতিহাস যদি আধুনিক মার্কিনিদের মত
মাত্তর ৫০০ বছরের হতো, তাহলে দিল্লিতে অন্ততঃ ৬০% রাস্তা কমিয়ে ফেলতে হতো। কারন
রাস্তার নাম দেবার মত বিখ্যাত লোক কম পড়ত। নাম কম পড়ে বলেই বোধহয় মার্কিনি সায়েবরা নিজেদের শহরে নম্বর দিয়ে
রাস্তার নামকরন করেন। দিল্লির রাস্তায় বাবর, হুমায়ুন, আকবর জাহাঙ্গির আছেন। অশোক,
বিক্রমাদিত্য, হর্ষবর্ধন, পৃথ্বীরাজ চৌহান আছেন। ইব্রাহিম লোদী, মহম্মদ বিন তুঘলক
সমেত সুলতানেরা আছেন। শের শাহ আছেন। গান্ধী, সুভাষ, নেহেরুর কথা ছেড়েই দিচ্ছি।
ভারতের সব শহরেই তাঁরা আছেন। নতুন-দিল্লি ইষ্টিশনের উলটো দিকে সরকারি আবাসনের
পাশের এক সরু গলিতে “টেগোর” ও উপস্থিত। কোপারনিকাস, তলস্তয়,
বাহাদুর শাহ্ জাফর, কামাল আতা তুর্ক, মার্শাল টিটো, ম্যাক্স মুলার, আরুনা আসফ
আলী, লোকমান্য টিলক, ভগৎ সিং, হেডগেওয়ার, ঋষি অরবিন্দ, লালা লাজপত রাই, জাকির
হুসেন, কে নেই? ঔরঙ্গজেবের নামাঙ্কিত রাস্তার নাম সম্প্রতি বদল করে প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি
আবদুল কালামের নাম দেওয়া হয়েছে। এমন কি লোদি রোড থেকে নেহেরু স্টেডিয়ামের ধার
ঘেঁষে যে রাস্তা গেছে তার নাম পৌরানিক যুগের পিতামহ ভীষ্মের নামে। তর্কের খাতিরে
পৌরানিক কাহিনি যদি বাদও রাখি, তবুও দিল্লির গায়ে চিমটি কাটলে প্রতি চিমটিতে দু-ভল্যুমের
মোটকা ইতিহাস উঠে আসে। আর
দিল্লির রাস্তায় আধ বেলা চক্কর মারলেই সে সব ভল্যুম সমেত তাবৎ ইতিহাস আপনার মুখস্ত
হয়ে যায়। নাম জানলেই হলো। নামজাদা মানুষের নামেই ইতিহাস। আপনার আমার সুখ-দুঃখু
ইতিহাসে থাকেনা। সে সব ঘোর বাস্তব।
সব শহরেরই ভাগাভাগি আছে। কলকাতায় উত্তর দক্ষিন আছে। দিল্লিতেও নতুন
পুরোনো আছে। তার ওপরে আজকাল যমুনার হুই পারে উত্তর প্রদেশের নয়ডা কি গাজিয়াবাদ,
হেই পারে দক্ষিন দিকে হরিয়ানার গুড়গাঁও কি ফরিদাবাদ, সবই জাতীয় রাজধানী এলাকার (National Capital Region -
NCR) মধ্যে পড়ে। সব
জায়গায় মানুষের নিজের নিজের এলাকা সম্পর্কে গর্ব অহংকার। এই যেমন আমার হাওড়া নিয়ে
নাক উঁচু ভাব রয়েছে। যদিও হাওড়ার বিখ্যাত গলিঘুঁজিতে ঢুকলে সেই উঁচু নাক দু আঙুলে
টিপে হাঁটতে হয় দুর্গন্ধের চোটে। দিল্লিতে কি তেমন এলাকা নেই? কে বলেছে? গলিঘুঁজি
দুর্গন্ধ ভিড় সমেত গত চারশো বছরের ওপর একই ভাবে দাঁড়িয়ে আছে পুরোনো দিল্লির চাঁদনি
চক – দরিয়াগঞ্জ এলাকা। চাঁদনিচকের দোকানপাট কিঞ্চিত খানদানি। যেমন ধরুন ঘন্টেওয়ালা
হালওয়াইয়ের মিষ্টির দোকান। সে দোকানের সোহন হালওয়া, মিসরি মাওয়া, মোতিচুর লাড্ডু,
পেস্তা বরফি, পাতিসা এই সব মোটে ১৭৯০ সাল থেকে দিল্লির মানুষজন খেয়ে আসছেন। বাংলার
মিষ্টি গুরমে সম্প্রদায়ের অনেকের কাছে এই মিষ্টির লিস্টির কয়েকটা নাম বেশ অচেনা।
মিসরি মাওয়াকে, আমরা চিনি, কালাকাঁদ বলে। এক্কেরে পাড়ার মহাপ্রভু মিষ্টান্ন ভান্ডারের
“কলাকাঁদ” না হলেও অবাঙালি মিঠাইওয়ালার “কালাকান্দ” আর মিসরি পিঠোপিঠি মাসতুতো
ভাই। পাতিসা হলো মোটামুটি আমাদের শনপাপড়ি। একেবারে এক না হলেও, খুব কাছাকাছি। তবে বাকি
মিঠাই নিয়ে আপনি যাই বলুন, দিল্লির মিঠাই সাম্রাজ্যে কোহ-ই-নুর হয়ে বসে আছেন সোহন
হালওয়া।
সোহন হালওয়া দিল্লির লাড্ডু নয়, কিন্তু তবুও আপনি সোহন হালওয়া খেলেও
পস্তাবেন, না খেলেও পস্তাবেন। না খেলে পস্তাবেন কেন সেটা বের করা তো সোজা। দিল্লি
থেকে মধ্যপ্রাচ্য যে মিঠাই শাষন করে, সেটা না খেলে পস্তানো হয় বই কি। কিন্তু খেয়ে
পস্তাবেন এই কারনে, যে জীবনের এত গুলো দিন, এই প্রথম সোহন হালওয়া খাওয়ার দিন
পর্যন্ত, আপনি না জেনেই কি রসে বঞ্চিত ছিলেন। রস বলছি বটে, কিন্তু আমাদের পরিচিত
অন্য সব হালুয়ার মত সোহন হালওয়া রসালো বা নরম সরম নয়। মহাভারতের মর্মস্থলে, প্রবল
প্রতাপশালী মুঘল সাম্রায্যের কেন্দ্রস্থল, লাল কেল্লার থেকে ঢিল ছোঁড়া দুরত্বে
সৃষ্ট এই মিঠাই শক্তপোক্ত ও বিশাল আকারের। সোহন হালওয়া তৈরি হয় ময়দা, চিনি,
জাফরান, পেস্তা-বাদাম আর প্রচুর পরিমানে ঘি দিয়ে। বাদামী বর্ন ঘি চুপচুপে হালওয়ার
চাকতি দাঁতে কামড়ে কটাস করে ভাঙবেন। তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করবেন। বিশ্বাস করুন এক
খানা চাকতিতে হাজার দেড়েক কিলোক্যালোরি নিশ্চিতভাবেই পাওয়া যায়। সোহন হালওয়া এই
রকম শক্তিধর হবার জন্যেই হয়ত দিল্লির মিঠাইখানেওয়ালাদের আমি কখনো আমাদের মত “৫০ টা
রসগোল্লা খেইচি” বলে গর্ব করতে শুনিনি। ওই একটিই যথেষ্ট। হাইড্রোজেন বোমা এক গাদা
লাগে না।
চাঁদনি চক এক অদ্ভুত জায়গা। ওখানে ঠিক কি কি পাওয়া যায়, আর কি কি
পাওয়া যায়না, তা বোধহয় খাশ চাঁদনির বাসিন্দারাও গুছিয়ে বলতে পারবেন না। জামা কাপড়,
অলংকার, খাবার দাবার, মশলা এসব তো আছেই। কিন্তু তার আসে পাশে কিছু কিছু জায়গা বা
রাস্তা আছে, যে গুলোয় একই ধরনের বস্তু পাওয়া যায়। যেমন ধরুন আতরওয়ালা এবং সুগন্ধী
বিক্রেতাদের গলি। এনারাও সকলে প্রায় চারশো বছরের খানদানি বাসিন্দা এ অঞ্চলের। আর দেখবেন, এনাদের প্রায় সকলেরই পদবী গান্ধী। মোহনবাবুও এনাদের সম্প্রদায়ের মানুষ
ছিলেন। পৃথিবীর যে কোনো সুগন্ধী বলুন, যে কোনো ব্র্যান্ডের, এনারা আপনাকে সেটা তৈরি করে দেবেন এটা ওটা
মিলিয়ে। সময় নেবেন ১০-১৫ মিনিট। আর দাম? ১৫০-২০০ টাকার আশেপাশে। বিশ্বাস না হয়,
নিজে গিয়ে মিলিয়ে নিতে পারেন। তবে এই সব গলির মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত বোধহয়
পরাঠেওয়ালে গলি। এখানে কিছু পরোটার দোকান আছে। আলুর পরোটা, মুলোর পরোটা, ফুলকপির
পরোটা, মেথির পরোটা, আরো অনেক রকম পরোটা পাবেন এখানের দোকানে। সবই নিরামিশ। সঙ্গে আসবে আচার, দই, কখনো পনির বা সবজির চাট। চাট বলতে মনে পড়ে
গেল। দিল্লির চাটের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে, এরকম জায়গা ভুভারতে খুব কম আছে।
কলকাতার ফুচকা, আলুকাবলি, চুড়মুড়, পাপড়ি চাট হিসেবে রেখেই বলছি। চাঁদনি চকের ঠিক
পূব দিকে, দিল্লির সব চেয়ে বড় পর্যটন আকর্ষন লাল কেল্লা, আর লাল কেল্লায় ঢোকার
সবচেয়ে বড় ফটক লাহোরি দরওয়াজা।
সন্তান জন্মের পর, নাড়ির বন্ধন কাটলেই তো মা-সন্তান একে অপর কে পর করে
দেন না। পাঁচ হাজার বছরের সম্পর্ক কি আর খান চারেক যুদ্ধু, কাঁটা তার আর র্যাডক্লিফ
সাহেবের একটা কালির আঁচড়ে শেষ হয়ে যায়? লাহোরের দিকে মুখ করে থাকা লাল কেল্লার মুল
ফটকের নাম তাই আজও লাহোরি দরওয়াজা। কেল্লার আরো একটা ফটক আছে বটে, দক্ষিন দিকে,
তার নাম দিল্লি দরওয়াজা, কিন্তু লাহোরি দরওয়াজার জাঁকের সামনে সে ফটক নেহাতই
খিড়কি। ওই লাহোরী দরওয়াজার ওপরেই ১৫ই অগাস্ট সকাল বেলা আমাদের প্রধানমন্ত্রি
তেরঙ্গা ঝান্ডা তোলেন সেই ১৯৪৭ সাল থেকে। লাল কেল্লার ফটক দিয়ে ঢুকলেই মীনা বাজার।
মুঘল অন্দরমহলের বেগম ও অন্যান্য মহিলারা এখানে গয়নাগাটি কেনাকাটা করতেন। কেল্লা
সমেত আশপাশের এলাকা মুঘল বাদশা শাহজাহানের সময় তৈরি। তাই এর নাম ছিলো
শাহজাহানাবাদ। উত্তরের কাশ্মিরি গেট থেকে দক্ষিনের দিল্লি দরওয়াজা পর্যন্ত এলাকা,
যা আজকের পুরোনো দিল্লি, সেটাই সেদিনের শাহজাহানাবাদ। লাল কেল্লার ভেতরে আরো ঢুকলে
অতীতের খাজানার দরজা চিচিং ফাঁক বলে খুলে যেতে থাকে। সে নিয়ে লিখতে বসিনি
বিস্তারে। বেশী ইতিহাস কপচালে এ লেখার হালও আগের লেখার মতই হবে। লোকে পড়বেনা মোটে।
শুধু এই টুকু বলি, ১৮৫৭ সালে লাল কেল্লায় পশ্চিম ইয়োরোপের কিছু লোকজন ঢুকে সব কিছু
তছনছ করে। এই লোকেরাই তাদের ভাষার অভিধানে “Vandalism” বলে একখানা শব্দ আমদানী করেছে। ভ্যান্ডালরা রোম আক্রমন করে সব কিছু
ধ্বংস ও লুটপাট করে, সেই ঘটনার প্রেক্ষিতে, সেরকম ঘটনাকে বর্ননা করতে তারা এই শব্দ
ব্যবহার করে। আজ ভ্যান্ডালরা থাকলে, ১৮৫৭ র পর, তারা চরম হীনমন্যতার সঙ্গে নিজেদের
ভাষায় ব্রিটিসিজম শব্দটা ব্যবহার করত ধ্বংস ও লুটপাট বোঝাতে। কেল্লার ভেতরে, দেখবেন লাল কেল্লার আসল নকশা ও
ছবি রয়েছে। সে ছবির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়, কি ভাবে প্রায় ৭০% ইমারত ও
স্থাপত্যকে ১৮৫৭র পর ইংরেজ পল্টন ভেঙ্গে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছে। পড়ে আছে কেবল
নহবতখানা, দেওয়ান-ই-আম, দেওয়ান-ই-খাশ, শিশ্মহল, রঙমহল, শাহী হামাম, মোতী মসজিদের
মত কয়েকখানা হাতেগোনা কাঠামো। তাও সাজসজ্জা ছাড়াই, নেহাত ন্যাড়া অবস্থায়। আর আছে ইংরেজ পল্টনের থাকার জন্যে তৈরি
কিছু হাড়-কুচ্ছিত মিলিটারি
ব্যারাক। তবে কিনা দিল্লির ব্যাপার, কাজেই সে বাড়িতেও ইতিহাস জড়িয়ে। এই মিলিটারি
ব্যারাকেই তো বন্দি অবস্থায় বিচার হয়েছিলো আজাদ হিন্দ বাহিনির সৈনিকদের।
লাল কেল্লা থেকে বেরিয়ে দক্ষিন পশ্চিমে তাকালেই সামনের কিছু বাড়ি
ঘরদোর পেরিয়ে দেখা যায় সাদা রঙ্গের চুড়ো আর মিনারের মাথা। দিল্লির বিখ্যাত জামা
মসজিদ। এও শাহজাহানের আমলে তৈরি। জামা মসজিদের ভেতরে ঢুকলে হতবাক হয়ে যেতে হয় এর
বিশালত্বে। মসজিদের ঠিক দক্ষিনে ছোটো ফটকের উলটো দিকে একটা সরু গলির মুখ, “গলি
কাবাবিয়াঁ”। সেই গলির মুখে একটু দাঁড়ালেই মন উন্মনা হয়, জগতের নিত্য-অনিত্য নিয়ে ভাবনা আসে, দৈনন্দিন
চাওয়া পাওয়া অনেক অনেক পেছনে চলে যায়।
কারন নাকে আসছে অদ্ভুত মন “বাবরিয়া” করা এক সুগন্ধ। খাবারের। গন্ধেই মালুম
হয়, এ খাবার রোজ খেলে মানুষের ভাবনা চিন্তা নিশ্চিত ভাবেই তাজমহল সৃষ্টির উচ্চতায়
পৌঁছয়। গলি কাবাবিয়াঁয় ঢুকেই দিল্লির বিখ্যাত করিমস। ওই যে বললুম, দিল্লির গায়ে চিমটি
কাটলে প্রতি চিমটিতে দু ভল্যুমের ইতিহাস বেরিয়ে আসে, করিমসও সেই পরিধির বাইরে নয়।
করিমের কাহিনি একটু কই তাহলে। মুঘল হেঁসেলের পাকওয়ানদের কদর ছিলো বিশ্বজোড়া।
বাবরের সঙ্গে আনা মধ্য এশিয়ার কাবাবিয়ানা, আর ভারতের নিজস্ব ঘি মশলা সুগন্ধি
মিলিয়ে এনারা সৃষ্টি করেছেন খাদ্য জগতের তাজমহল। মুঘলাই খানা। সে খানার বিষয়ে আমি আর নতুন করে কি বলি বলুন? তবে ভারতে যদি মুঘলাই খানার সবচেয়ে খাঁটি জায়গা খুঁজতে হয়, তাহলে সেটা
অবশ্যই দিল্লির করিমস। কেন সেটা বলছি। এই করিমস যিনি স্থাপন করেন, হাজি করিমুদ্দিন,
এনারা পুরুষানুক্রমে ছিলেন মুঘল পাকশালের পাকওয়ান, রন্ধনশিল্পি। ইংরেজের সময়কার
চলতি শব্দ বাবুর্চি বলে এনাদের অপমান করতে পারছিনা। ১৮৫৭য় ইংরেজরা যখন লালকেল্লা
লুটপাট আর খুনখারাপি করছে, তখন করিমুদ্দিনের পরিবার কোনক্রমে প্রান বাঁচিয়ে কেল্লা
থেকে পালিয়ে গাজিয়াবাদের ফারুখনগরে আশ্রয় নেন পরিচয় গোপন রেখে। কিন্তু পরিবারের
মধ্যে রাজকীয় খানা তৈরির শিক্ষা ও ঐতিহ্য বজায় থাকে। প্রায় ৫৩ বছর পর, করিমুদ্দিন
আবার দিল্লি ফিরে আসেন ১৯১১ সালে যখন রাজধানী দিল্লিতে নিয়ে আসা হয়, ও ব্রিটিশ রাজার
সন্মানে “দিল্লি দরবার” ডাকা হয় লাল কেল্লায়। ব্রিটিশ রাজকীয়তা দেখে, করিম সাহেব
ঠিক করেন, দেশের সাধারন মানুষকে, ভারতীয় রাজকীয়তা কি বস্তু, তার স্বাদ মনে করানো
দরকার। সেই সময়েই তিনি খুলে বসেন বিশ্ববিখ্যাত “করিমস”। সেই থেকে আমাদের জিভ, মুঘল
রাজকীয় পাকশালার স্বাদ চাখছে। করিমের গপ্পটি অবশ্য করিমের নিজের তৈরি বলে অনেকেই দাবী করেন। সে
করুন। তবে কিনা তাতে করিমস্ এর সিরিপায়া, নহারির স্বাদের বদল হয়না। আর উমদা গপ্প আর
মুঘলাই খানার জুটি বেশ জমাটি।
১৯০৫ সালে, শ্বেতকায় শাসক ঠিক করলেন বাংলা নামে দেশটাকে ভেঙে দু টুকরো
করবেন। তা সে টুকরো করাও হলো। কিন্তু বাঙালী ভদ্দরনোকের বড্ড আঁতে লাগল সেই
ভাঙাভাঙি। তাঁরা বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নেমে পড়লেন। ইংরেজ দেখলো ব্যাপার ঠিক
সুবিধের নয়। ভদ্দরনোক-বুদ্ধিজিবী যা ভাবে, বাংলার তাবৎ লোকজন সেই রাস্তাতেই হাঁটে,
আর তাদের কথাতেই সায় দেয়। “সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে”। এই ২০১৫তেও। ওইটি বুঝেছিলেন
বলেই পশ্চিমবাংলাকে পকেটে পুরে রাখতে বর্তমান শাসকের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ইংরেজের
পকেট ভর্তি সোনার গিনি। খামোখা কিছু নেটিভ বুদ্ধিজিবীকে পকেটে ভরার জন্যে গিনি
ছড়িয়ে পকেট খালি করার কোনো বাসনা তাঁদের ছিলোনা। তেনারা তার বদলে ১৯১১ সালে
রাজধানী সরিয়ে নিয়ে চলে গেলেন সো-জা সেই দিল্লি। মুঘল বাদশাহীর অপসারনের পর,
দিল্লির গুরুত্ব কমে গিয়েছিলো। দিল্লি বলতে তখন অবশ্য পুরোনো দিল্লিই বটে। কিন্তু
নতুন প্রভুদের চাঁদনিচক – দরিয়াগঞ্জের ভিড়ভাট্টা পোষালো না। তেনারা ল্যুটেন সাহেবকে ডাকলেন নতুন শহরের পরিকল্পনা করতে। পুরোনো
দিল্লির দক্ষিন দিকে তৈরি করা হলো নতুন দিল্লি। নতুন দিল্লির উত্তর দিক চেনা
তুলনামুলকভাবে অনেক সোজা। প্যাঁচপয়জার নেই। সোজা সোজা চওড়া রাস্তা, উঁচু উঁচু
বাড়ি, চক, স্বকীয়তা নিয়ে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। হই হট্টগোল পুরোনো দিল্লির তুলনায়
কম। নতুন দিল্লি অনেক ধোপদুরস্থ, কেতাদুরস্থ আর নিয়মনিষ্ঠ-আনুষ্টানিক। ওই রাজধানীর
বহুবিধ আমলা এবং শয়ে শয়ে সরকারি দফতরের মতোই। প্রথমেই দাঁড়িয়ে আছে কনট প্লেস। একটা
অতিকায় গোল এলাকা, যার বাইরে দিয়ে আর ভেতর দিয়ে দু খানা চাকতির মত রাস্তা আছে। আর
আছে লম্বা লম্বা গোল গোল থাম ওয়ালা সাদা রঙের বাড়ি। ওই রাস্তাগুলোকে ঘিরে। বাইরের
রাস্তাটার নাম কনট সার্কাস, আর ভেতরের রাস্তা সমেত চকের নাম রাজীব চক। প্রয়াত
প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রির নামে।
রাজীব চক বলুন বা কনট প্লেস, দিল্লির দিল্ এ পৌঁছনোর উপায় এ চত্ত্বর
কে আদর করে সিপি (CP) বলে ডাকা। তা সিপি
কিঞ্চিত আদুরে জায়গা বটে। নাজুক নাজুক ঝকঝকে সাদা ঔপনিবেশিক থাম আর খড়খড়ি মার্কা
ঢাউস ঢাউস বাড়ি। দেখলেই কেমন যেন মন কেমন করে। বহুকাল আগে আমাদের ধর্মতলাটাও এমন
পারা ছিল বলে ছবিতে দেখেছি। চওড়া ফুটপাতে আরাম করে হাঁটা যায় এক আকাশ রোদেও, কারন
ফুটপাতের মাথার ওপর প্রশস্ত দালান। ফুটপাতগুলো পরিস্কার। ডালা সাজিয়ে কিছু
বিক্রেতাও আছেন। দাম কলকাতার ফুটপাতের অন্ততঃ তিনগুন। কোথায় যেন দেখলুম, কনট প্লেস
এলাকা, পৃথিবীর সবচেয়ে দামী ব্যাবসায়িক এলাকার তালিকায় চার নম্বরে। ফুটপাত ছাড়িয়ে
যে দোকানগুলো, সেখানে দুনিয়ার সব নামিদামী ব্র্যান্ড উপস্থিত। সব কিছুই পাবেন।
রেস্তোরাঁ থেকে জুতোর দোকান। কিন্তু এখানে মন খুলে কেনাকাটির সাধ্য গড়পরতা
মধ্যবিত্ত বাঙালীর নেই। রাজারহাটে দ্যুপ্লে, হোন্দা সিটি, পূজোয় সিঙ্গাপুর হিসেব
করেও মধ্যবিত্ত বাঙালির আয়ত্তের বাইরে বলেছি। বাকি বুঝে নিন। তবে রাস্তায় হাঁটতে
তো আর ট্যাক্সো দিতে হয় না। যত খুশি হাঁটুন, দেখুন দু চোখ ভরে। আর হাঁটতে হাঁটতে
খিদে পেলে? হ্যাঁ আমার আপনার যাবার মত দু খানা দুর্দান্ত জায়গা, এই কনট প্লেসেও
আছে বটে। প্রথম হলো নিরুলা’স (নাকি নারুলা?)। মার্কিনি চাটওয়ালা, মানে ওই যারা
বার্গার-পিৎজা-মুর্গিভাজা বিক্রি করে, আদের ভারতে পা রাখার আগের যুগেও দিল্লির
লোকজন খুব ভালো পিৎজা বার্গার খেয়ে এসেছেন এই নিরুলার দৌলতে। শুধু পিৎজা বার্গার
বলি কেন? ছোলে বাটুরে, রোল, আইসক্রিম আরো কত কি যে আছে, আর সব চেয়ে বড় কথা, দাম
সাধারনের সাধ্যের মধ্যেই। এখন নিরুলা উত্তর ভারতের একটা বড় রেস্তোরাঁ চেন। কিন্তু
১৯৩৪ সালে খোলা, এই কনট প্লেসের নিরুলাই তাদের প্রথম দোকান। এর পরে আসি দ্বিতীয়
রেস্তোরাঁর কথায়। ইনি খাঁটি দেশী, এবং পাঞ্জাব দা পুত্তর। রেস্তোরাঁর নাম
“কাকে-দা-হোটেল”। রেস্তোরাঁ বলছি বটে, কিন্তু ইনি যেন আমাদের সাবেক কালের সেই
“হোটেলে খাওয়া” ব্যাপারটার সঙ্গেই বেশী সম্পর্কিত।ছোট্ট ঘুপচি দোকান। সেখানে ঢোকার
জন্যে দিন রাত লাইন দিয়ে ফুটপাতে গাদা গুচ্ছের লোক দাঁড়িয়ে। ভেতরে দুজন বসার মত
টেবিলে ঠেলাঠেলি করে ৪ জনকে বসতে হয়। তবে হ্যাঁ, হুকুম করলেই খাবার হাজির। আর গরম
গরম। স্বাদ? করিমস্ যদি আপনাকে মুঘল হেঁসেলের ভেতরে নিয়ে যায়, তাহলে কাকে-দা
আপনাকে নিয়ে যাবে পাঞ্জাবীর পুরোনো বনেদি ঘরোয়া আঙিনায়। দুয়ের মধ্যে বিস্তর তফাত। করিমস এর
স্বাদ গন্ধ অনেক নম্র,
সুতার, অভিজাত, পোষাকি, মার্জিত। কাকে-দার বৈশিষ্ট তার দার্ঢ্য, তার দেশী ঘীয়ের তড়কা, তার কিমা-কলেজি কিম্বা
দাল-মাখানির টাটকা মালাই আর মাখনের ঘনত্ব। আপনি গুর্মে বা খুশখানেওয়ালা (খাদ্যরসিক) হয়ে দিল্লি এলে, এ দুটি স্থল
অবশ্যগম্য।
সিপির দক্ষিনে একদম সিধে যে রাস্তা সোজা চলে গেছে, সেই হল বিখ্যাত জন্পথ।
জনপথের সঙ্গে ৩০ ডিগ্রি কোন করে দক্ষিন-পশ্চিমে ও দক্ষিন-পূবে চলে গেছে আরো দুই
স্বনামধন্য রাস্তা, যথাক্রমে সংসদ মার্গ এবং কস্তুরবা গান্ধী মার্গ। সংসদ মার্গ না
হয় বোঝা গেল, নামেই পরিচয় এ রাস্তা ধরে গেলে ভারতীয় সংসদের গোল থামওয়ালা বাড়িতে
পৌঁছবেন। আর আরো দু কদম এগোলে পাবেন গোল গম্বুজওয়ালা গোলাপী পাথরের বিশাল একটা
বাড়ি। বর্তমানে সে বাড়ির বাসিন্দা কীর্ণাহারের মুখুজ্যেবাবু। ওই আমাদের
রাষ্ট্রপতিভবন। আর কস্তুরবা গান্ধীর রাস্তা ধরে নাক বরাবর গেলে পৌঁছে যাবেন
দিল্লির আর এক নামকরা স্থাপত্যে – ইন্ডিয়া গেট। এই ইন্ডিয়া গেট আর রাষ্ট্রপতি
ভবনকে সরল রেখায় যোগ করেছে “রাজপথ”। যে রাজপথে ২৬শে জানুয়ারি ভারতীয় ফৌজিরা কদমে কদম মিলিয়ে কুচকাওয়াজ করতে
করতে যায়। ইন্ডিয়া গেট থেকে আরো পূবে গেলে পুরানা কিলা। বর্তমান পুরানা কিলায় আপনি
যে কেল্লাটি দেখেন, সেটা শের শা সুরির তৈরি। তবে এখানেই শেষ নয়, কিছু পন্ডিতের মত,
একদম এইখানেই নাকি ছিলো পৌরানিক ইন্দ্রপ্রস্থ শহর, পান্ডবদের রাজধানী। সেক্ষেত্রে
এই কেল্লার সঙ্গে দিল্লিরও বয়স দাঁড়ায় হাজার পাঁচেক বছর। কেল্লার ভেতরে আর কিছু
দেখুন না দেখুন, কিতাবখানা বা লাইব্রেরিটি দেখতে ভুলবেন না। একটা আটকোনা , গোল
দোতলা বাড়ি। ২৪শে জানুয়ারি, ১৫৫৬ সালে মুঘল বাদশা হুমায়ুন এই পাঠাগারের সিঁড়ি
দিয়েই পড়ে গিয়ে মাথা ফাটান, আর সেই আঘাতের জন্যেই দুদিন পর ইহলোক ত্যাগ করেন। যার ফলে গদিতে বসেন ১৪ বছরের কিশোর জালালুদ্দিন
মহম্মদ। পুরানা কিলার উত্তরে প্রগতী ময়দান। দিল্লির তাবৎ বড় বড় মেলা বা প্রদর্শনী
এখানেই হয়। আর পূব দিকে যমুনা। পূব
দক্ষিনে দিল্লি চিড়িয়াঘরের ওপাশে হুমায়ুনের সমাধী। বড় সুন্দর শান্ত একটা জায়গা
রাজধানীর হট্টগোল এড়িয়ে। আর রাষ্ট্রপতি ভবনের পেছনে, পশ্চিমদিকে আরাবল্লীর উত্তরের
ভগ্নাংশ। জ্যামিতি কষে এতক্ষনে পাঠকের মাথায় অনেক ঘোরপ্যাঁচ
ঢুকিয়েছি। আপাতত জ্যামিতির এখানেই শেষ। তবে এই কস্তুরবা গান্ধী মার্গ,
বড়াখাম্বা রোড (কস্তুরবার আরো পূবে সিপি থেকে বেরোনো রাস্তা), কোপারনিকাস মার্গ (দুরদর্শনের
সদর দফতর) ইত্যাদি অঞ্চলে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের একটা করে ভবন বা সদন আছে। যেমন
ধরুন মহারাষ্ট্র ভবন, পাঞ্জাব ভবন, হরিয়ানা ভবন, হিমাচল ভবন এই সব। এনাদের ক্যান্টিনগুলো
কিন্তু সর্ব সাধারনের জন্যে খোলা, এবং ওই সব রাজ্যের আচ্ছে সে আচ্ছা খানা পাওয়া
যায় বেশ সস্তায়। আমার পরামর্শ নিলে, আপনি গোয়া, আসাম, কেরালা, উড়িষ্যা আর অন্ধ্র
এই কটা ক্যান্টিনে একটি বার করে পায়ের ধুলো দেবেন। আমাদের বঙ্গ ভবনও এ তল্লাটেই। সে
ক্যান্টিনেরও নামডাক ছিলো একসময় শুনেছি। এখন আমাদের নবান্নর যুগে সেখানে অন্নগ্রহন
করেন এরকম লোকের সংখ্যা কমতির দিকে।
কলকাতার দক্ষিন তিনটে ধারায় ভাগ করা। একটা পশ্চিম দিকে ডায়মন্ড হারবার
রোডের দু পাশ ধরে জোকার দিকে চলে গেছে, পূবে এক খানা গড়িয়াহাট যাদবপুর হয়ে গড়িয়া
আর এদের মাঝের একখানা আশুতোষ-শ্যামাপ্রসাদ টালিগঞ্জ হয়ে হরিদেবপুর। দিল্লির
দক্ষিনেও এরকম আছে। মাঝামাঝি ইষ্যৎ পশ্চিম ঘেঁষে অরবিন্দ মার্গ। ইন্ডিয়া গেট থেকে
শাহজাহান ও পৃথ্বীরাজ রোড ধরে এলেই অরবিন্দ মার্গে পৌঁছনো যায়। অরবিন্দ মার্গ ধরে
দক্ষিনে গেলে আপনি এক সময় পৌঁছে যাবেন কুতুব মিনার। যদিও অরবিন্দর নামাঙ্কিত
রাস্তা অনেক আগেই শেষ। এ অঞ্চলের নাম হলো মেহরৌলি। এও আর এক পুরোনো দিল্লি। বহু
পুরোনো। কুতুব ও তৎসংলগ্ন যা কিছু দেখবেন, সে হলো মুঘল যুগের আগে সুলতানি দিল্লির
ইতিহাস। কুতুব ছাড়াও এ অঞ্চলে আছে আরো একটা ভাঙাচোরা কেল্লা। আরো পুরোনো। কিলা রাই
পিথোরা। এই রাই পিথোরা কে জানেন? পৃথ্বিরাজ চৌহান। তাঁরই রাজধানী ছিল দিল্লির এই
মেহরৌলি। আলী সাহেবের অনেক গুলো ছদ্মনামের একখানা “রায় পিথৌরা”। আলী সাহেব দিল্লির
বড় বড় গুনমুগ্ধদের একজন। দিল্লিকে তাঁর বহু লেখায় পেয়েছি। অরবিন্দ মার্গ ধরে যদি আসেন, আধুনিক দিল্লির একটা
খুব মনজ্ঞ জায়গা আপনাকে দেখতে অনুরোধ করব। দিল্লি হাট। কুটির শিল্প ও হস্তশিল্পের
স্থায়ী প্রদর্শনী। কাপড়জামা, ঘর সাজানোর উপকরন, নকল গয়নাগাটি এই সবই বেশী, তবে
কিনা ভারতের সব কটি রাজ্যের একটি করে নিজস্ব পাকশালা এখানে উপস্থিত। সেখানে সেই
রাজ্যের “অথেন্টিক” খাবার দাবার পাবেন। বাংলাও আছেন। আমাদেরটা চালান বিজলী গ্রিল।
রাষ্ট্রপতি ভবনের একেবারে দক্ষিন-পশ্চিমের সর্দার প্যাটেল মার্গ ধরে
চলতে থাকলে প্রথমে পেরোবেন ধৌলা কুঁয়া এলাকা। তার পরে ৮ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে,
ভারতীয় বিমান বাহিনির এলাকা সুব্রত পার্কের গা দিয়ে এসে পড়বেন ইন্দিরা গান্ধী আন্তঃরাষ্ট্রীয়
হাওয়াই আডঢা, আর আরো দক্ষিনে গেলে মহিপালপুর বলে একদা এক গাঁ (এখন ঝাঁ চকচকে অথচ
ঘিঞ্জি বসতি) পেরিয়ে হরিয়ানার গুড়গাঁও। সেখানে যদি তিন খানা হাই রাইজ আবাসন দেখেন,
তো পাঁচখানা শপিং মল দেখবেন। ও নিয়ে আর কিছু বলতে চাইনা। তবে হ্যাঁ দিল্লিতে এসে
বুঝি, আড্ডা শুধু বাঙালিতেই মারে, এমন নয়। বাস এরোপ্লেন এদেরও ”আডঢা” হয়। আর সে সব
আড্ডা অতিকায় বিশাল ব্যাপার। বাঙালির আড্ডা তার কাছে তুচ্ছু। এবারে একেবারে পূবে যাই। ইন্ডিয়া গেটের দক্ষিন পূবে
জাকির হুসেন মার্গ ধরে, দিল্লি গলফ কোর্স ছাড়িয়ে এসে পড়বেন লালা লাজপত রাইয়ের
নামাঙ্কিত রাস্তায়। এই রাস্তাই আপনাকে নিয়ে যাবে এঁকে বেঁকে আরো দক্ষিনে। আপনি
লাজপত নগর পেরোবেন। সে জায়গায় তিনটি একদম খাঁটি বস্তু খুব সুলভে পাওয়া যায়। এক
শীতের পোষাক, দুই আফগানী খাবার আর তিন সর্দারজি। লাজপত নগর ছাড়িয়ে আপনি ঢুকলেন
গ্রেটার কৈলাস। এ এলাকা দিল্লির ধনী মানুষের আবাসস্থল। তবে ঠিক খানদানি আলিপুর নয়,
বরং কিছুটা আঙুল ফুলে কলাগাছ বলতে পারেন। গ্রেটার কৈলাসের আদরের নাম জিকে। আর আমার
এই ব্লগের মত তারও একটা দ্বিতীয় অধ্যায় আছে, সেটার ডাকনাম জিকে-২। কিন্তু আমার
উদ্দ্যেশ্য এই জিকে নিয়ে বলা নয়। আমার উদ্দেশ্য জিকের পর, নেহেরু প্লেস পেরিয়ে
আপনাকে নিয়ে পিকুদের বাড়ির দিকে নিয়ে যাওয়া। ওই যে যেখানে “পটি” নিয়ে দুশ্চিন্তায়
ভুগতেন পিকুর বাবা। চিত্তরঞ্জন পার্ক। দিল্লির চৌহদ্দির মধ্যে ছোট্ট ঢাকা-বিক্রমপুর,
কিম্বা খুলনা-চাটগাঁ কি সিলেট। পুর্ববঙ্গ থেকে দেশভাগের পরে চলে আসা বাঙালির
(শেষের “ই” বাদ) নিজস্ব এই সি-আর পার্ক। এখন অবশ্য আর তাকে কেউ উদ্বাস্তু এলাকা
বলে না। দিল্লির অন্যতম “পশ” এলাকা, আর সেটা দোকানপাটের পশরা দেখলেই মালুম হয়।
কিছুদিন আগে, যখন আমাদের এখানে বাজারে ইলিসের কিলো ১৫০০, দিল্লির এক বন্ধু ছবি
পাঠালো ইয়াব্বড় একখানা ইলিসের। সকালে কিনেছে। জিজ্ঞেস করলুম সুইস ব্যাঙ্ক দিল্লিতে
এটিএম খুলেছে কিনা। ব্যাটা বলে কিনা ৭৫০ টাকা কিলো, আর সি আর পার্ক যেতে আসতে নাকি
শ দেড়েক অটো ভাড়া দিয়েছে। শেষে তিন খানা স্মাইলি। গা জ্বালানে আর কাকে বলে?
লাল কেল্লায় প্রতিদিন সন্ধ্যেবেলা আলো আর শব্দের যুগলবন্দিতে ইতিহাস
ফিরে ফিরে আসে। আমি দু বার দেখেছি আজ পর্যন্ত। শুনেছি পুরানা কিলা আর কুতুবেও হয়
রোজ। কিন্তু কি জানি
কেন, লাল কেল্লার সঙ্গে আমার নাড়ির যোগ বোধহয় সবচেয়ে বেশী। দিওয়ান-ই-খাশের সামনের
ঘাসের জমিতে সবুজ সবুজ চেয়ারে বসে থাকতে থাকতে অন্ধকারের মধ্যে হঠাৎ গমগম করে ওঠে
অশরীরী কন্ঠস্বর। গায়ে কাঁটা দেয়, শুনে তাক লেগে যায়, যে এই দিল্লির তলায় চাপা পড়ে
আছে আরো ছ খানা দিল্লি। শাহজাহানের দিল্লি হলো সাত নম্বর। আর ল্যুটেন সাহেবের নতুন
দিল্লি আট। যমুনার ঐ পারে, পূব দিকে, ময়ুরবিহার পেরিয়ে নয়ডা, সে এলাকা উত্তর
প্রদেশ, এবং হাল আমলেই তৈরি। হরিয়ানার গুড়গাঁও-ফরিদাবাদও তাই। সে সব সমেত দিল্লির
আশপাশ এলাকা ধরলে, ল্যুটেনের দিল্লির পর এ হলো নয় নম্বর দিল্লি। সকলের স্বভাব
চরিত্র আলাদা। বিলাস-বৈভব, আনন্দ-উচ্ছাস, স্বপ্ন-হাসি-কান্না সব কিছুতেই পার্থক্য
আছে। পুরোনো দিল্লির সঙ্গে ল্যুটেনের নতুন দিল্লির দুরত্ব হয়ত এক কিলোমিটার,
কিন্তু তফাত বিস্তর। আবার ল্যুটেনের দিল্লির সঙ্গে নয়ডা-গুড়গাঁও-ফরিদাবাদের দুরত্ব
হয়ত ১০-১২ কিলোমিটার, কিন্তু তফাত আরো অনেক বেশী। ইন্দ্রপ্রস্থের একনম্বর দিল্লি,
কি মেহেরৌলির ছয় নম্বর দিল্লির গল্প কথা শুনেছি। কিছু কিছু হয়ত জানি। কিন্তু চোখের
সামনে জলজ্যান্ত সাত নম্বর দিল্লি দেখার পর আগের দিল্লির কথা মাথায় থাকেনা। লাল
কেল্লায় সন্ধ্যের অন্ধকারে যখন অন্দরমহলের বেগম ও অন্য মেয়েদের হাসি আর কলকাকলিতে
মিনা বাজারের বোবা, চারশ বছরের পুরোনো দেওয়ালগুলো জীবন্ত হতে থাকে, ঠিক তখন আপনি
অনুভব করবেন আপনার ধমনীতেও সেই ভারতীয়ত্বের অহংকার খেলা করে বেড়াচ্ছে। সেই বৈভব,
সেই দিল খোলা কল্পতরু মনোভাব, সেই বাদশাহী মেজাজ। যখন আপনি দিল্লিওয়ালা হয়ে ৫০
টাকার চাট খেয়ে ৫০ টাকা বখশিশ দেন, মনের খুশীর দাম দেন। যখন আপনি চাঁদনি চকের
রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনুভব করেন, এ রাস্তা আপনার চেনা, অনেক অনেক দিনের চেনা,
আপনি আগেও হেঁটেছেন কতবার, কত শতাব্দী ধরে হেঁটে আসছেন। যখন আপনি লাহোরী দরওয়াজার
ওপরে উড়তে থাকা তেরঙা ঝান্ডার দিকে আঙুল দেখিয়ে উৎকট গর্বে বলে ওঠেন, প্রতি বছর
১৫ই অগাস্ট ভারতীয় জনসাধারনের সর্বোচ্চ প্রতিনিধী হয়ে “আমাদের” প্রধানমন্ত্রি ঠিক
ঐখানে দাঁড়িয়ে পতাকা তোলেন। তখন এই সব কিছুর মধ্যে দিয়ে দিল্লি আপনার ভেতর ঢুকে
পড়ে। লাল কেল্লার ভেতরে পরতে পরতে জমে থাকা ইতিহাস ধুলো ঝেড়ে আপনার সামনে এসে
দাঁড়ায়। দিল্লি আপনার সামনে এসে দাঁড়ায়, সে দিল্লিতে বৈভব আছে, হিংসা আছে, অহংকার
আছে, খুন-জখম-রক্তের স্রোত আছে, প্রেম আছে, যৌনতা আছে, আবেগ আছে। আবেগ ছাড়া মানুষ
কিসের? সেই আবেগ, সেই অহংকার, আপনার মধ্যে প্রবেশ করলেই আপনি বোঝেন, দিল্লির দিল্
এ পৌঁছনোর রাস্তায় আপনি পা ফেলেছেন। প্রতিদিন ভারতের পূবের এক মুল্লুক থেকে নতুন
দিল্লি ইষ্টিশনে কিছু বিশ্বনিন্দুক প্রানী এসে নামে। তারা তখন সেই দিল্লিওয়ালা-আপনি
কে দেখে বলে আপনার মধ্যেও “বাইরের লোকজন সম্পর্কে কেমন একটা নাক উঁচু, হতচ্ছেদ্দা
ভাব”।
রাত সাড়ে তিনটের সময় সিমলা থেকে বাসে করে এসে দিল্লি পৌঁছেছি।
কাশ্মিরি গেটের বড় বাস স্ট্যান্ডে। সেটা দেওয়ালির রাত। তাবৎ উত্তর ভারতে
জনপরিসেবার কোনো অস্তিত্ব নেই। সবাই দেওয়ালি মানাচ্ছে। বাস থেকে গুচ্ছের মালপত্র
সমেত নেমে দেখি সামনে দু একটা ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। আমরা অনেক জন, তার ওপর মাল ও
অনেক। ছোটো গাড়িতে হবে না। প্রায় মিনিবাসের মত এক ঢাউস গাড়িতে উঠলাম। আমরা যাবো
মিন্টো রোড। এমনিতেই এত বড় গাড়ির ভাড়া বেশ বেশী হয়, তার ওপর দেওয়ালির পরের দিনের
ভোর। ড্রাইভার সাহেব কইলেন “তিন শও”। কাচ্চা-বাচ্চা-বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে রাত সাড়ে
তিনটেয় আর দরাদরি পোষালোনা। আস্তে করে বললুম “দো শো”। আগের সন্ধ্যেয়, বাস
স্ট্যান্ডে পৌঁছবার জন্যে দু কিলোমিটার রাস্তায় দেওয়ালির ধাক্কায় চারশ টাকার সঙ্গে
আরো একশ টাকা বখশিশ দিয়ে এসেছি সিমলায়। এক্ষেত্রে রাস্তা অনেক বেশী। আমি দুশো বলার
আগেই দেখি ড্রাইভার আমাদের মালপত্র তুলতে লেগেছে। একদম ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি ছুটল হু-হু করে। গন্তব্যে
পৌঁছে মালপত্র নামানো হলো। ড্রাইভার সাহেব কে একটা পাঁচশ টাকার সবজেটে নোট দিয়েছি।
তিনি সেটা পকেটে পুরে গাড়ির পেছন থেকে আমাদের বাক্স-প্যাঁটরা নামালেন। আমি প্রায়
নিশ্চিত ছিলুম, আরো কিছু বেশী নেবেই। অন্ততঃ দেওয়ালির বখশিশ তো চাইবেই। একবার
সন্দেহ হলো, কিছু ফেরত দেবে তো? পুরোটাই যদি চেয়ে বসে? কলকাতার ট্যাক্সিতে অনেক
সময়েই খুচরো থাকেনা, অথবা “বিশ-পঞ্চাশ টাকা বেশী চাই” হয়ে যায়, মাঝ রাতের সার্ভিস
বলে কথা। ওলা-উদেরেও ভাড়া তিন গুন হয়ে যায়। গাড়ির ভেতর কিছু আছে কিনা ভাল করে দেখে নিয়ে
ড্রাইভার সাহেব হড়াস করে দরজা বন্ধ করলেন। তার পর পকেটে হাত দিয়ে তিনটে একশ টাকার নোট বের করে রাত
জাগা চোখে এক গাল হেসে বললেন – “হ্যাপ্পি দিওয়ালি জি” তার পর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে
মুখ বাড়িয়ে বলল “দিল্লি ঘুমনা হ্যাঁয় তো ইয়াদ কিজিয়েগা”। আমরা দিল্লির লোক নই ভালোই বুঝেছিল। একটা পয়সাও
বেশী নেয়নি। ওই দেওয়ালির মাঝরাতেও। অবশ্য ইয়াদ করার জন্যে কোনো উপায়ও ছেড়ে যায়নি।
এখানেই তাকে অল্প ইয়াদ করলুম।
দিল্লির দিল্ এ পৌঁছনোর অপেক্ষা খালি। তার পর দিল্লি আপনার আপন। দিল্লি কেন? কলকাতা-হিল্লি-দিল্লি যেখানেই বলুন, মন ছুঁতে
পারলে, মর্মস্থল স্পর্স করতে পারলে, অনেক দুরের দেশও আপনই হয়। হয়েই যায়।
** অনেকেই ওপরের লেখায়
অনেক ভুল ত্রুটি খুঁজে পাবেন। সে ভুল আর যাই হোক ইচ্ছাকৃত নয়। যেমনটা জেনেছি,
তেমনটাই লিখেছি। যেটুকু ভুল জেনেছি, সেটা ভুলই থেকে যাবে
শুধরে না দিলে। পাঠক যদি বোঝেন কিছু ভুল আছে, দয়া করে ধরিয়ে দেবেন।
আমি খুব উপকৃত হবো। আমার পাঠককূলের সবচেয়ে বড় ভক্ত আমি নিজেই, কেননা সব ক্ষেত্রেই
দেখেছি আমার পাঠকরা আমার চেয়ে অনেক বেশী খবর রাখেন। কাজেই ভুল ত্রুটি ধরিয়ে দিলে,
আমি খুবই খুশি হবো। দিল্লির বাসিন্দে আমি কোনোকালেই ছিলাম না। যে টুকু দেখা, সে
টুকু নেহাতই পর্যটিকের দৃষ্টিতে, কাজেই পর্যটকের টকমিষ্টি অনুভুতি থাকবেই। স্থানীয়
লোকের গুল্পতাপ্পি গপ্প সমেত সেই গুলোই হয়ত কিছু উঠে এসেছে লেখায়। সে জন্যে ক্ষমা
চেয়ে রাখলুম।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন