শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০১৯

ইস্কনকে ৭০০ একর জমি ~ মধুশ্রী বন্দোপাধ্যায়

এটা করবেন না, প্লিজ। একটা ধর্ম নিরপেক্ষ দেশে এটা করবেন না। এটা করা যায় না। এখনো আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় লেখা আছে, ভারত এক ধর্মনিরপেক্ষ দেশ।

নিজেদের ক্ষুদ্র স্বার্থে এটা করবেন না। 
এখনো এই দেশের অধিকাংশ মানুষ বুঝে, না বুঝে মেনে চলেন সোয়া দুই হাজার বছর আগের অশোকের শিলালিপির মহান সত্যকে। সভ্যতার প্রথম দার্শনিক পদক্ষেপকে।
There should not be honour of one's own (religious) sect and condemnation of others without any grounds — Ashoka, Rock Edicts XII, about 250 BCE.

সেই দেশের এক নাগরিকের, সেই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারীর অনুরোধ - এটা করবেন না।

কোন প্রয়োজন নেই শ্মশান-ব্রাহ্মণদের ভাতা দেবার। ওদের প্রতি কিন্তু কোন অসূয়া নেই। তবে প্রশ্ন, কেন এক সেক্যুলার দেশে ওরা সরকারি ভাতা পাবেন। কি ভিত্তিতে এই সরকারি বদান্যতা ঠিক হলো! ওদের থেকে গরিব মানুষ কি নেই এই রাজ্যে, এই শহরে! 

কেন ধর্মের ভিত্তিতে, বর্ণের ভিত্তিতে একবিংশ শতকে এই কলকাতা শহরে গুটিকয় মানুষ সরকারি ভাতা পাবেন! শুধু তারা হিন্দু ব্রাহ্মণ বলে!
যেই রকম অনিষ্ট হয়েছে মৌলবী ও মুয়াজ্জিনদের ভাতা দিয়ে, ঠিক তেমনই অমঙ্গল হবে এই শ্মশান ব্রাহ্মণদের ভাতায়। 

এই ক্ষতি একদিনে বোঝা যাবে না, এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি। যেমন বোঝা যায় নি মৌলবীদের ভাতায় ও অন্য বহু অনুষাঙ্গিকে।

এতে মানুষের সাথে মানুষের ব্যবধান শুধু বাড়বে, কমবে না।

ইস্কনের প্রেক্ষাপট অনেকের জানা; ওদের নিজেদের ধর্ম প্রচারের যথেষ্ট অর্থ আছে। সেই ইস্কনে গিয়ে ঘোষণা হলো সরকার ওদের ৭০০ একর জমি দেবে। কেন? ওরা ধর্ম প্রচার করছেন দীর্ঘদিন ধরে। অসুবিধা তো হয় নি। কেন ওরা সরকারি জমির সুবিধা পাবে! 

বরং সেই জমিতে শিল্প হলে বহু মানুষের দীর্ঘমেয়াদি লাভ হবে। সরকারি প্রচেষ্টা ফলপ্রসূ হবে।

ওদের জমি দিলে আরো যত হিন্দু, মুসলমান, শিখ, বিভিন্ন আদিবাসী উপগোষ্ঠী আছে - তারা কেন পাবে না?  এই দাবি আজকে না হলেও কালকে যে উঠবে। 

সবচাইতে বড় কথা সরকারের কাজ কি? ধর্মের ভিত্তিতে জমি, ভাতা দেওয়া নাকি রাজ্যের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন করা!

ধর্মের ভিত্তিতে ভোট চাইবার বদ অভ্যাস অনেকদিনের, তবু দুঃখের সাথে বলি, স্বাধীনতা পরবর্তী কালে এই রাজ্যে এ জিনিস আগে দেখি নি। ধর্মের, তার বর্ণের, তার মুরুব্বিদের সরকারি ভাতা আসলে দীর্ঘদিনের বিভেদের শক্তির সরাসরি সরকারি বিধিবদ্ধ তোষণ। এর সাথে সাধারণ মানুষের, তাদের ধর্মাচারণের সম্পর্ক নেই।

আর, একটা ভুল দিয়ে আগের ভুলকে শুদ্ধ করা যায় না। 

ইস্কনে ৭০০ একর জমি ও কলকাতা শহরে শ্মশান-ব্রাহ্মণদের ভাতা দিয়ে রামের বিরুদ্ধে লড়াই চলে না। ধর্ম দিয়ে ধর্মের লড়াই হয়েছে মধ্য যুগে, ক্রুসেডে। কংগ্রেস সেই নরম হিন্দুত্ব প্রচেষ্টা নিয়েছে, হেরে ভুড্ডু হয়ে গেছে।

সে পথ পরিত্যক্ত। 

বড় বড় বক্তৃতায় গাল  ভরবে না, ভাতাতে খাঁই মিটবে না, জমিতে অসন্তোষ প্রশমিত হবে না, ভাষার আবেগ কাজ করবে না।

মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের অসম্মানের প্রচেষ্টার লড়াই দীর্ঘমেয়াদি। 

তার জন্য দরকার ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, রাজ্য ব্যতিরেকে মানুষকে একজোট করা, মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান করা।

আম্বেদকর  বলেছিলেন,  Democracy is not merely a form of government. .. It is essentially an attitude of respect and reverence towards fellow men.

সেই সম্মান হারিয়ে যাচ্ছে। সেই মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। তাকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব সকলের। 


সোমবার, ১ জুলাই, ২০১৯

চিকিৎসক দিবস ~ ড: রেজাউল করীম

আজ চিকিৎসক দিবস। চিকিৎসকদের উপর লাগাতর নিগ্রহের বিরুদ্ধে আজকের দিন পালন করা হচ্ছে। গতকাল একজন সাংবাদিকের কাছে শুনলাম, কলকাতার হাসপাতালে নিরাপত্তা বাড়ানো হচ্ছে। শুনে ভালই লাগছে,  তবে আশঙ্কা আছে ষোল আনা। সেই অধুনা বিখ্যাত সভার পর ও প্রায় তিনটি ভাঙচুরের ঘটনা এই এত দূরে থেকেও আমি জানতে পারলাম, জানিনা হয়তো আরো বেশি ঘটেছে। যাক, আশা করি অবস্থার পরিবর্তন হবে। সারা দেশে চিকিৎসকদের সম্প্রদায় হিসেবে আক্রমনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে। যে পারস্পরিক ঘৃণা সম্প্রদায়ে সম্প্রদায়ে ছড়িয়ে পড়ছে, তা কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। মানুষের অসহায়তা, ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে প্রতিদিন আর সে তার সব দুর্ভাগ্যের কারণ হিসেবে একটা অদৃশ্য প্রতিপক্ষ খাড়া করে সুখ খোঁজার চেষ্টা করছে। আমার দুর্ভাগ্যের জন্য আমি দায়ী নই, রাম-শ্যাম-হাসিম শেখরা দায়ী।
অনেক দুর্ভাগ্যের ইতিহাস রচিত হয়েছে পৃথিবীতে। আরো হবে কেননা অন্ধ ক্রোধ তার লেলিহান আগুনে সবাইকে জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য তৈরী হয়ে আছে। সেসব কথা কার্পেটের তলায় ঠেলে দিয়ে বরং ভাল ডাক্তার হওয়ার চেষ্টা করা যাক। দেশ, জাতি, পৃথিবী, জল-সঙ্কট, ধর্মীয় উন্মাদনা নিয়ে বাকিরা মাথা ঘামাক, আমরা ডাক্তার, ওগুলো নিয়ে বিশ্ব মাথা খুঁড়লেও আমাদের দরকার নেই!!!!

যাঁর জন্মদিন আজ পালন করছি, তিনি তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। ওয়েলিংটন থেকে রাইটার্স যেতেন। সকালে বেলা হাতে গোনা কয়েকটি রোগী দেখতেন। আগে থেকে নাম লেখাতে হতো। একটা লোক রোজ এসে দাঁড়িয়ে থাকে, নাম লেখানো নেই, তাই দেখাতে পারে না। রায়বাবু দু চারদিন লোকটিকে খেয়াল করে শেষে একদিন বিরক্ত হয়ে ডেকে পাঠালেন।"কিহে, রোজ রোজ এসে দাঁড়িয়ে থাকো! ব্যাপার কি?:
-আজ্ঞে, আপনাকে দিয়ে চিকিচ্চে করাতে চাই।
-তা রোগীটি কে হে?
-আজ্ঞে, আমি।
বিধানবাবু, একবার তাকিয়ে ভাল করে দেখলেন তাকে তারপর বললেনঃ না হে, এ রোগ সারার নয়। তাছাড়া, আমার আজ সময় ও নেই। তুমি বরং কাল এসো গিয়ে।
পরদিন লোকটি আসতেই তার হাতে একটা চিঠি দিয়ে বললেনঃ এটা নিয়ে রাইটার্সে যাও, আমার সেক্রেটারির সাথে দেখা করো। দারিদ্র কি আর ওষুধ দিয়ে সারে?
 এই গল্পটি আমি তাঁর একজন রোগীর কাছে আজ থেকে ত্রিশ বছর আগে শুনেছিলাম। তবে, ঘটনাটা মনে হয় বানানো নয়, কারণ বিমল মিত্র  মহাশয় ও প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনা লিখেছেন।
এ দেশের বেশির ভাগ মানুষের মূল যে সব মারণ রোগ নিয়ে  চিন্তা করার দরকার, আর সরকার যে সব রোগের জন্য পয়সা খরচা করতে চান, তার মধ্যে দুস্তর ব্যবধান। সরকার অপুষ্ট, নিরক্ত, অভুক্ত মানুষের কাছে চাকচিক্য খচিত নীল সাদা বাড়ি দিয়েছেন, তাতে ঘুঘু চরলেও কিছু যায় আসে না, ভোটের হিসেব আর মানুষের দুর্দশা দূর করা পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক। যে সীমাহীন শৈথিল্য টিকাকরণ কর্মসূচিতে দেখানো হচ্ছে, সব শিশুঘাতী মারণরোগ ফিরে আসলেও অবাক হবো না। 
এক পুরোপুরি নিরাপত্তাহীন জাতির চিকিৎসকের নিরাপত্তার জন্য ঢাল, তলোয়ারহীন কয়েকটা সেপাই আর যারা লুটেপুটে দেশটাকে ছিবড়ে করে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে ছিনিমিনি খেলছে, তাদের জন্য কমাণ্ডো!!!

তবু, চিকিৎসক দিবস এসেছে। সবাই মিলে তাকে সফল করতে হবে। গুরুদেব বলেছেনঃ
"আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।
 তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে ॥" 
মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও কি অট্টালিকা বানাই না!  তাই, কি বলে, আজকের এই পুণ্যলগ্নে যে ভালবাসার রস ফেসবুক আর হোয়াটসাপ বাহিত অমৃতের চাঙড় নিয়ে আসছে, তাকে স্বাগত জানিয়ে শুরু হোক আজকের দিন।

বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯

পুকুর-চোর ~ অরুণাচল দত্তচৌধুরী

বাংলার  তাল-পুকুরে
সিপিএম ডাল-কুকুরে
সে কি বাস করলে তাড়া,
বলি থাম একটু দাড়া।

তোমাদের সবার চেনা
চিটফান্ড গাছ আছে না
হোথাতে আস্তে গিয়ে
বিকট এক চিত্র নিয়ে
দুই কোটি যেই বেচেছি
কী বিকট চেঁচামেচি 

সততার প্রতীক ওড়ে
পঁচিশ আর পচাত্তরে
আমি চোর? সব্বাই চোর।
কী উপায়? প্রশান্ত্-কিশোর!

অ্যাডভাইস উচ্চ ফি'তে
কিনে, হয় মেনেই নিতে।
রটালাম... কাটমানি খায়
ওরা সব নীচের তলায়,
পুর আর পঞ্চায়েতে।
শুনে সব উঠল তেতে।

ভোটার তো ভারি নচ্ছার
ধুমাধুম গোটা দুচ্চার
দিতে চায় কিল ও ঘুষি
একদম জোরসে ঠুসি।
মানি আর নাই বা মানি
আমি তো চুরির রাণী। 
কী ভাবে ভাইপোটাকে
বাঁচাব? চিন্তা থাকে...

ব্রাত্যর ফালতু বকা
ডোন্ট মাইন্ড... সুজন সখা
দরকার মান্নানেরও!
এসো আজ, এদিক ফেরো...

তোমাদের অফিস-টফিস
ফেরাব। চাইছ ক'পিস?

সেকি ভাই যায় রে ভুলা-
ভোটারের পিটুনিগুলা!
কি বলিস ফের হপ্তা!
তৌবা-নাক খপ্তা…!

সোমবার, ২৪ জুন, ২০১৯

বিপ্লবী গণেশ ঘোষ ~ অরিজিৎ গুহ

কলকাতার কুখ্যাত পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্ট। প্রচুর স্বদেশী আন্দোলনের বিপ্লবীদের হত্যা এবং তাঁদের ওপর বীভৎস অত্যাচারের এক মূর্ত প্রতীক। এই চার্লস টেগার্টের ওপর ১৯৩০ সালে ডালহৌসি স্কোয়ারে আক্রমণ চালাল বিপ্লবীদের একটি গোষ্ঠী। তার গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করা হল। অত্যাচারী পুলিশ কমিশনার হলেও যে গুণটা তাঁর ছিল, সেটা হচ্ছে মস্ত ডাকাবুকো ছিলেন উনি। এর আগেও বহুবার তাঁর ওপর আক্রমণ হয়েছে, কিন্তু কোনোবারই ভয় পেয়ে নিজের দায়িত্ব হতে সরে আসেন নি। ওড়িশার বালাসোরে বাঘা যতীনের গ্রুপের সাথে সরাসরি অ্যাকশন করেছেন। 
  ডালহৌসি স্কোয়ারে তাঁর গাড়িতে বোমা নিক্ষেপ করার পরও তিনি প্রাণে বেঁচে যান এবং যে বোমা ছুড়েছিল সেই তরুণ বিপ্লবী অনুজা সেনকে গুলি করতে সক্ষম হন। ধাওয়া করে ধরে ফেলা হয় আরেক তরুণ বিপ্লবী দীনেশ মজুমদারকে। এরপরই সারা কলকাতা জুড়ে শুরু হয় ধরপাকড়। মহামান্য ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ কমিশনারের গাড়িতে বোমা মারার অপরাধ কম অপরাধ নয়। সেই সূত্রেই গ্রেপ্তার হন মেডিকাল কলেজের ডাক্তার নারায়ণ রায়। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেল বোমা তৈরি করার মশলা, বোমা বানানোর নক্সা। ক্যালকাটা বম্ব কেসে গ্রেপ্তার হলেন ডক্টর নারায়ণ রায়। প্রথমে আলিপুর জেলে এরপর সেখান থেকে পাঠানো হল বোম্বের যারবেদা জেলে। সেখান থেকে কয়েক বছর পর আবার নিয়ে আসা হল আলিপুর জেলে। এবার আরো বড় প্রোমোশন দিয়ে পাঠানো হবে আন্দামানের সেলুলার জেলে। তারই প্রস্তুতি হিসেবে ১৯৩৩ সালে দ্বিতীয়বার স্থানান্তরিত করা হল আলিপুর জেলে। বোম্বের যারবেদা জেলে নারায়ণ রায়কে রাখা হয়েছিল এক নির্জন কক্ষে। সেখানেই সারাদিন ধরে পড়াশোনা করতেন। সেখানেই শেষ করলেন মার্ক্সের ক্যাপিটাল আর লেনিন রচনাসমগ্র। এরপর যখন আলিপুর জেলে স্থানান্তরিত করা হল তখন যে কদিন ছিলেন সেই কদিনের মধ্যেই জেলে তৈরি করে ফেললেন মার্ক্সিস্ট স্টাডি গ্রুপ। ইতিমধ্যে সেখানে নিয়ে আসা হয়েছে হাজারিবাগ জেল থেকে সতীশ পাকড়াশী আর বোম্বের রত্নগিরি জেল থেকে নিরঞ্জন সেনকে। এই দুজনকেও পাঠানো হবে আন্দামানের সেলুলার জেলে। আলিপুর জেলে বসেই তিনজনে মিলে ঠিক করে ফেললেন আন্দামানে প্রচুর মার্ক্সিস্ট সাহিত্য নিয়ে যাওয়া হবে। সেরকম ব্যবস্থা করেই দু ট্রাঙ্ক ভর্তি বই নিয়ে তিনজনে মিলে চড়ে বসলেন আন্দামানগামী জাহাজে।
    সেলুলার জেলে এসে ছোট্ট একটা গ্রুপ নিয়ে নারায়ণ রায়রা তৈরি করলেন মার্ক্সিস্ট স্টাডি সার্কেল। প্রতিদিন নিয়ম করে সেখানে বিপ্লবী তৈরি করার পাঠচক্র বসতে থাকল। আস্তে আস্তে সেই গ্রুও বড় হতে শুরু করল। তাঁরা নিজেরা একটা হাতে লেখা পত্রিকাও বের করলেন। স্টাডি সার্কেলের অধ্যক্ষ হয়ে উঠলেন নারায়ণ রায়।
    সেলুলার জেলে আসার পর থেকেই নারায়ণ রায় দেখতেন দু তিনজনের একটা ছোট্ট গ্রুপ তারা নিজেদের মতই থাকত। খুব একটা নারায়ণ রায়দের কাছে ঘেঁষত না। ওদের মধ্যে একটা লম্বা কালো মত ছেলে নারায়ণ রায়কে আকৃষ্ট করল। দূর থেকে ছেলেটা ওদের স্টাডি সার্কেলকে লক্ষ্য করত, কিন্তু কখনো কাছে আসত না। ওদের আসলে নিজেদের অন্য মত ছিল। ওই গ্রুপের বক্তব্য ছিল মসি চালনার থেকে অসি চালনাই আসল কাজ। অর্থাৎ পড়াশোনা করার থেকে হাতে তরোয়াল তুলে নেওয়াটাই সঠিক পদক্ষেপ। নারায়ণ রায় বুঝতে পেরেছিলেন ছেলেটি কঞ্চি নয়। শক্ত বাঁশ। কঞ্চিকে সহজে নোয়ানো যায়। বাঁশকে নোয়ানো সহজ নয়, কিন্তু একবার নোয়াতে পারলে শক্তিশালি অস্ত্র তৈরি হবে।
   এই ঘটনার আগে একটু পূর্বকথন রয়েছে। ব্রিটিশ সরকারকে জোরদার ধাক্কা দেওয়ার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম শহরে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল বিপ্লবীর চট্টগ্রামের অস্ত্রাগার লুন্ঠন ইতিহাসের এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। ব্রিটিশ সামরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মত পরিস্থিতি যে একদল অকুতোভয় বিপ্লবী সৃষ্টি করতে পারে সেটা ভারতবাসী জেনে গেছে। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন এক নতুন আদর্শের জন্ম দিয়েছে। যদিও সেই অপারেশনের প্রত্যেকেই ধরা পড়েছে এবং বিচারে সবাইকে সেলুলার জেলে কারাবন্দী করা হয়েছে নারায়ণ রায়রা জেলে এসে পৌঁছানোর বছর খানেক আগেই। চট্টগ্রামের সেই গ্রুপটাই নিজেদের আলাদা করে রাখত বাকিদের থেকে। তারা তখনো চট্টগ্রামের ধাঁচে বৃহৎ পরিকল্পনা রচনা করতে সচেষ্ট ছিলেন। যদিও তাদের মধ্যে রণধীর দাশগুপ্ত ও আনন্দ গুপ্ত ইতিমধ্যেই স্টাডি সার্কেলে নাম লিখিয়েছিলেন। 
   সেই কালো লম্বা মত ছেলেটা অবশ্য মাঝেমাঝে নারায়ণ রায়দের স্টাডি সার্কেলের ছেলেদের সাথে রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা করত। কখনো কখনো ঐক্যমতে পৌঁছাত, কখনো বা আবার তাদের মতের সাথে বিরুদ্ধমত প্রকাশ করত। আস্তে আস্তে স্টাডি সার্কেলের গ্রুপের সাথে বন্ধুত্ব বাড়তে লাগল। ঘনিষ্ঠ হতে শুরু করল নারায়ণ রায়েরও। ইতিমধ্যে কলকাতার আলিপুর জেল থেকে গোপনে আব্দুল হালিম যোগাযোগ করতে সমর্থ হয়েছেন সেলুলার জেলের নারায়ণ রায় সতীশ পাকড়াশীদের সাথে। আব্দুল হালিম তখন কলকাতা জেলার ট্রেড ইউনিয়ন নেতা। গাড়োয়ান আর মেথরদের ধর্মঘটে নেতৃত্ব দিয়ে জেলে গেছেন। আব্দুল হালিম ওঁদের সাথে যোগাযোগ করে জানালেন এবার সরাসরি আন্দামান জেলে কমিউনিস্ট পার্টির প্রচারের কাজ করতে হবে। কারণ সারা দেশজুড়ে ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনে জোয়ার এসেছে। পার্টি এই সুযোগকে কাজে লাগাতে চাইছে। এর জন্য জেলে তৈরি হল কমিউনিস্ট কনসলিডেশন। নারায়ণ রায় সরাসরি ছেলেটিকে বললেন কমিউনিস্ট কনসলিডেশনে জয়েন করতে। 
   দু বার ভাবে নি সেই ছেলেটি কমিউনিস্ট গ্রুপে জয়েন করতে। কারণ আর আগেই চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের সেনানীরা প্রায় প্রত্যেকেই নারায়ণ রায়দের সংস্পর্শে এসে কমিউনিস্ট হয়ে গেছে। বাকি ছিল তাদের কমান্ডার ইন চিফই একমাত্র। নারায়ণ রায়ের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে সেলুলার জেলেই কমিউনিস্ট পার্টিতে হাতেখড়ি হল সেই লম্বা কালো মত ছেলেটির। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের কমান্ডার ইন চিফ গণেশ ঘোষের।
   ১৯৩৭-৩৮ এ প্রবল জনবিক্ষোভের চাপে আন্দামানে বন্দী সব বিপ্লবীদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাধ্য হল ব্রিটিশ সরকার। গণেশ ঘোষকে প্রথমে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে পরে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়। ৪৬ সালের ভয়ঙ্কর দাঙ্গার পরপরই মুক্তি পান গণেশ ঘোষ। ডেকার্স লেনের কমিউনিস্ট পার্টির অফিসে সংবর্ধনা দেওয়া হল তাঁকে। সেদিনই তিনি ঘোষণা করলেন তিনি পার্টির সর্বক্ষণের কর্মী হয়ে কাজ করতে চান। 
    ৪৮ এ পার্টি যখন বে আইনি ঘোষিত হল তখন গণেশ ঘোষকে চলে যেতে হল আন্ডারগ্রাউন্ডে। সেই সময়ে যারা তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন তাঁদের কথানুযায়ী চট্টগ্রাম বিপ্লবের একফোঁটা আভিজাত্যবোধ তাঁর মধ্যে ছিল না। মনে রাখতে হবে দেশ তখন সবেমাত্র স্বাধীন হয়েছে। যারা ব্রিটিশ পুলিশ দ্বারা একদিনের জন্যও জেলবন্দী হয়েছে তারাও তখন সমাজের চোখে হিরো। সেই জায়গায় চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের কমান্ডার ইন চিফকে মানুষ মাথায় করে রাখত। সারা জীবন কংগ্রেস সরকারের দয়া দাক্ষিণ্যে আরামের জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু সেই জীবন না বেছে তিনি বেছে নিয়েছিলেন চিরাচরিত বিপ্লবী জীবন। পার্টির নির্দেশে ঘুরেছেন জেলায় জেলায়। আন্দামানের বন্দী হিসেবে যখন ভারত সরকার তাঁকে পেনশন আর স্বাধীনতা সংগ্রামীর তাম্রপত্র দিতে চান, ভারত সরকারকে বিনয়ের সাথে উনি জানান, 'আমার পেনশন আর সরকারী স্বীকৃতির দরকার নেই। আমার পার্টি সিপিআই(এম) ই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আমাকে দেখবে।'

গনেশ ঘোষকে গণেশ ঘোষ করার পিছনে যেমন মাস্টারদা রয়েছেন, ঠিক তেমনই ডাক্তার নারায়ণ রায়দের মত শিক্ষকরাও রয়েছেন। নারায়ণ রায়ের গল্প আবার পরে কোন একদিন বলা যাবে নাহয়।

ঠিক দুদিন আগে ২২শে জুন চলে গেল এই মহান বিপ্লবীর জন্মদিন।

মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯

আন্দোলনের চাওয়া-পাওয়া : চিকিৎসক-সংবাদমাধ্যম দ্বৈরথ ~ বিষাণ বসু

গতকাল কারা জিতলেন, আর কারা হারলেন, সেই বিচার করা মুশকিল। কিন্তু, যে লড়াইটা চিকিৎসক বনাম প্রশাসন ছিল, যে লড়াইটা একইসাথে চিকিৎসাপ্রার্থীরও হওয়ার কথা ছিল, প্রশাসনের বিরুদ্ধে - সেই লড়াইটা ঘুরে যাচ্ছিল চিকিৎসক বনাম রোগীপরিজন তথা আমজনতায়। আপাতত, তা হতে পারল না।

বৃহস্পতিবার যে মুখ্যমন্ত্রী চূড়ান্ত তাচ্ছিল্য ও বিরক্তির সুরে কথা বলেছিলেন, তাঁরই সুর বদলে গেল সোমবার। আন্দোলনকারীদের পক্ষে এ এক বড় জয়। আবার, প্রয়োজনমত, এবং জরুরী পরিস্থিতিতে, যিনি নমনীয়তা দেখাতে পারেন, তাঁর, অর্থাৎ মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর ম্যাচিওরিটিও প্রশংসনীয়। সেক্ষেত্রে, একপাক্ষিক জয়ের প্রশ্ন নেই।

জুনিয়র ডাক্তারেরা নিজেদের দাবীদাওয়া তুলে ধরেছেন। সেজন্যে তাঁদেরকে টুপি খুলে কুর্নিশ।  আবার অনেক কিছু তুলে ধরতে পারেন নি। নিরাপত্তার প্রশ্নটি গুরুত্ব পেয়েছে, কিন্তু ঠিক কোন পথে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান আসতে পারে, সেটি আলোচনায় আসে নি। পরিকাঠামোর উন্নতি, পর্যাপ্ত ডাক্তার-নার্স-স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়োগ - এসব না হলে জুনিয়র ডাক্তারদের অমানুষিক চাপ নিয়েই কাজ করে চলতে হবে, চাপের মধ্যে তাঁরা ধৈর্য হারাতেই থাকবেন, মৃত রোগীর পরিজনের পিঠে হাত দিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার সময়-সুযোগ বা মানসিকতা কোনোটাই থাকবে না। অন্যদিকে পরিকাঠামোহীন পরিস্থিতিতে ঘনিষ্ঠজনের মৃত্যু হলে, পরিজন ক্ষুব্ধ হবেন - এবং ভাববেন, অমুক ডাক্তার দৌড়ে এলেই রোগীর প্রাণ বাঁচত।

দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের প্রশ্ন না ওঠায় মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে দাবীদাওয়াগুলো মেনে নিতে অসুবিধে হয়নি। কোলাপ্সেবেল গেট লাগানো বা পাব্লিক রিলেশন্স অফিসার - কোনোটাতেই প্রশাসনের আপত্তি থাকার কথা নয়। অর্থাৎ, আমাদের এখানে সবই ছিল, শুধু বোঝানোর অসুবিধে - এই বার্তা দেওয়া গেলে প্রশাসন খুশীই হতে পারেন। একটু-আধটু অভিযোগ থাকলে, আসতে পারবেন গ্রীভান্স সেলে। তিনটি ভাষায় জ্বলজ্বল করবে সেই অভিযোগ জানানোর কাউন্টার।

চিকিৎসার খরচ নিয়ে আলোচনা হলেই, অনেকেই বলেন, এত ভাঙচুর সরকারি হাসপাতালে - যেখানে সবই মেলে বিনামূল্যে - অর্থাৎ, চিকিৎসার খরচ মানুষ মেনেই নেন, কিন্তু চিকিৎসা না পেলে ক্ষোভ হবেই, সেইখানে খরচের প্রশ্ন ওঠে না। এইখানে কিছুটা অতিসরলীকরণ আছে। 

চিকিৎসার ক্ষেত্রে যে সুস্পষ্ট শ্রেণীবিভাজন, তা দুদশক আগেও তেমনভাবে ছিল না। মোটামুটিভাবে, মধ্যবিত্ত বা তার উপরের শ্রেণীর জন্যে বেসরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠান - এর নীচে থাকলে সরকারি। হিসেব খুব সরল। এইখানে, সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে, এবং সেখানে চিকিৎসা পেতে যাঁরা আসেন, তাঁদেরকে সেকেন্ড ক্লাস হিসেবে ভাবার খেলা আছে। দুর্বল পরিকাঠামোর সুবাদে স্বজন-হারানো পরিজনের মধ্যে একটা বাড়তি হতাশা রয়ে যায় - যদি টাকার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এমনভাবে….. 

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী বা তাঁর নেক্সট-ইন-কম্যান্ড ভাইপো বা তাঁদের মেজসেজ নেতারা - চিকিৎসা করাতে কেউই সরকারি পরিকাঠামোর মুখাপেক্ষী নন। সরকারি পরিকাঠামোর উন্নয়নের জন্যে, বেশী কিছু নয়, স্রেফ একটি নিয়মই যথেষ্ট - সরকারী আধিকারিক ও নেতানেত্রী, এঁদের চিকিৎসা, বাধ্যতামূলকভাবেই, হতে হবে সরকারি স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানে।       

সরকার স্বাস্থ্যখাতে ব্যয় করেন যৎসামান্য - যেটুকু করেন, তারও বড় অংশ সাইফনিং হয়ে যেতে চলেছে বীমাব্যবসায়ী ও বেসরকারি স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের হাতে - সে প্রকল্পের নাম স্বাস্থ্যসাথী বা আয়ুষ্মান ভারত যা-ই হোক না কেন। এর পর পরিকাঠামো উন্নয়নের প্রশ্নটি আরো দূরে সরে যাবে।

গতকালকের আলোচনায় এইসব প্রসঙ্গ ওঠেনি। জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে এই ম্যাচিওরিটি বা সমস্যার মূলে পৌঁছে যাওয়া সবসময় সম্ভব নয়। সেই পরিণতিবোধ তো অভিজ্ঞতার সাথে আসে। তবু, মুখ্যমন্ত্রীর খাসতালুকে ঝানু আমলা-পুলিশ শীর্ষকর্তাদের সামনে বসে, অবচেতনে মিডিয়ার ক্যামেরা - এই অ্যাওয়ে ম্যাচে তাঁদের পারফর্ম্যান্স প্রশংসনীয়।      

অন্তত আরো একটি ক্ষেত্রে জুনিয়র ভাইবোনেদের এই ম্যাচিওরিটির অভাব স্পষ্ট। চিকিৎসক-প্রশাসনের এই দ্বৈরথ - অন্তত আংশিকভাবে চিকিৎসক-সাংবাদিকের দ্বৈরথে পর্যবসিত হচ্ছে। আন্দোলন চলাকালীন জুনিয়র ডাক্তারদের এক বড় অংশ সাংবাদিকদের সাথে বিবাদে জড়িয়েছেন। গতকালকের পর, বেশ কিছু সাংবাদিক, সোশ্যাল মিডিয়ায় গায়ের ঝাল উগড়ে দিচ্ছেন - চিকিৎসকেরাও ছেড়ে কথা বলছেন না।

এই পরিস্থিতি দুর্ভাগ্যজনক। কেননা, সংবাদমাধ্যমের  অন্তত একাংশ পাশে না থাকলে এই আন্দোলন সমাজের একটা বড় অংশকে যেভাবে পাশে পেয়েছে, তা সম্ভব হত না - শুক্রবারের মিছিল মহামিছিলে পরিণত হওয়া বা মুখ্যমন্ত্রীর সুর নরম, কোনোটাই এমনভাবে হতে পারত না। ইলেকট্রনিক মিডিয়াশাসিত এই সময়ে, যেকোনো আন্দোলনেই মিডিয়ার সদর্থক সহযোগিতা জরুরী। পরবর্তীকালেও, আর কিছু নয়, স্রেফ নিরাপত্তার কথা ভাবলেও, মিডিয়ার সহযোগিতা খুব গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর।

যেকোনো ঘটনার প্রেক্ষিতেই, শাশ্বত নিরপেক্ষ সত্য বলে তো কিছু হয় না। রোগী মারা গেলে পরিজন ক্ষুব্ধ ও ক্রুদ্ধ হন। তাঁর মনে হয়, চিকিৎসক যদি আরেকটু চেষ্টা করতেন, যদি দৌড়ে আসতেন। চিকিৎসক হয়ত জানেন - সম্ভবত নির্ভুলভাবেই জানেন - এই রোগীকে এই পরিকাঠামোয় বাঁচানো সম্ভব ছিল না। মিডিয়া ঠিক কোন দৃষ্টিকোণ থেকে কথাটা জানাবেন, সেইটা তাঁর স্বাধীনতা। সেকথা চিকিৎসকের পছন্দ না-ই হতে পারে, কিন্তু সেই গণতান্ত্রিক অধিকার মেনে নিতেই হয়। এর মধ্যে কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার প্রশ্ন আসে না।

দ্বিতীয়ত, সংবাদ পরিবেশক বা মাঠেঘাটে খবর সংগ্রহ করা সাংবাদিক, দুজনেই বেতনভুক কর্মচারী মাত্র। মালিকের, এমনকি মুখ্য সম্পাদকের তুল্য স্বাধীনতা তাঁদের কারোরই নেই। ঠিক যেমনভাবে, সিনিয়র ডাক্তারের ভাবনার অনুসারেই চিকিৎসা হয়, যেখানে সেই চিকিৎসা অপছন্দ হলেও জুনিয়র ডাক্তারবাবুকে সিনিয়রের চিকিৎসাভাবনাই কার্যকরী করতে হয় (এমার্জেন্সি পরিস্থিতির প্রশ্ন আলাদা) - সাংবাদিকের ক্ষেত্রেই তা-ই।

তৃতীয়ত, অন্তত দুতিনজন সাংবাদিককে চিনি, যাঁদের মেধা ও পড়াশোনার ব্যাপ্তি আমাকে নিয়ত ঈর্ষান্বিত করে। কাজেই, স্রেফ জয়েন্টে চান্স পান নি বলেই এইসব ফ্রাস্টু পাব্লিক ডাক্তারদের পেছনে কাঠি করছে - এবম্বিধ উন্নাসিকতা হাস্যকর।    

প্লাস, এইটুকু মাথায় রাখতে হবে, অসামরিক পেশার মধ্যে বিশ্বে সবচাইতে ঝুঁকিপূর্ণ পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা স্বীকৃত। যেকোনো উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতেই সাংবাদিকেরা মারধর খেয়ে থাকেন - খিস্তিহীন দিন, সম্ভবত, ছুটিছাটা বাদ দিলে, দেখেনই না। এরাজ্যের চিকিৎসকরা অন্তত এই পরিস্থিতির সাথে নিজেদের রিলেট করতে পারবেন। এই অবস্থায়, দুপক্ষের মধ্যে বিবাদ নয়, সহমর্মিতার বোধই প্রত্যাশিত।    

অন্যদিকে, যেসব সাংবাদিক বন্ধুরা, গতকালকের জুনিয়র ডাক্তারদের নম্রসুরে কথা বলাকে নিয়ে খিল্লি করছেন, শ্লেষাত্মক মন্তব্য ছুঁড়ে দিচ্ছেন, এমনকি গালিও পাড়ছেন, তাঁদেরকে শুধু একটিই কথা বলার রইল।

অন্তত এই রাজ্যে, ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়, রাজনীতির নেতাদের যেটুকু ইন্টারভিউ সম্প্রচারিত হতে দেখি, সেখানে সাক্ষাতকার যিনি নিচ্ছেন, তাঁকে গদগদ বাদ দিয়ে অন্য কোনো বিশেষণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। বিবিসির হার্ড টক তো ছেড়েই দিন, করণ থাপারের ঢঙে ইন্টারভিউ করার কথা এই রাজ্যে কেউ কল্পনা করতে পারেন?? মুখ্যমন্ত্রীর কথা বাদই দিন, এমনকি মেজসেজ নেতাদের সাক্ষাৎকার নিতে গেলেও?

গতকাল কিন্তু এক জুনিয়র ডাক্তার বলতে পেরেছে, উইথ ডিউ রেসপেক্ট, ম্যাডাম, আমরা কিন্তু সারনেম দেখে চিকিৎসা করি না।

আপনারা পারবেন? পেরেছেন? উইথ ডিউ রেসপেক্ট-ই প্রশ্নটা করলাম।

রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৯

জুনিয়ার ডাক্তারদের ধর্মঘট ~ পুণ্যব্রত গুণ

এক সর্বভারতীয় নিউজ পোর্টাল আমার এই লেখা ছাপানোর সাহস করে উঠতে পারেনি।

11 ই জুন থেকে জুনিয়র ডাক্তাররা ধর্মঘটে। 12 ই জুন সারা রাজ্যে সিনিয়র ডাক্তার রা সরকারি বেসরকারি হাসপাতালের আউটডোর এবং প্রাইভেট চেম্বার বন্ধ রেখেছেন 12 ঘন্টার জন্য। 14 ই জুন নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজ থেকে ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ অবধি পথ চলেছেন প্রায় 10000 সিনিয়র ডাক্তার শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী এবং সাধারণ মানুষ। ওই দিনই ডাক্তাররা হরতাল করেছেন নয়াদিল্লি এ আই আই এম এস এ, চন্ডিগড় এ পি জি আই তে। বিক্ষোভ প্রদর্শিত হয়েছে মহারাষ্ট্রে বিহারে ত্রিপুরায় এমনকি পাকিস্তান ও নেপালে। আগামীকাল 17 ই জুন সকাল ছয়টা থেকে থেকে 18 ই জুন সকাল ছয়টা অবধি সারাদেশে ডাক্তারদের জরুরী পরিষেবা ছাড়া সমস্ত রকম কাজ বন্ধের ডাক দিয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ ডাক্তারদের সংগঠন আই এম এ।

এত কিছুর দরকার ছিল না। 10 তারিখ রাতে 85 বছর বয়স্ক 1 স্ট্রোকের রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দুই লরি ভরে প্রায় 200 লোক হামলা করে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে জুনিয়র ডাক্তারদের উপর। দুজন জুনিয়র ডাক্তার আহত হন, ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায় এবং ডাক্তার যশ টেকওয়ানি। জুনিয়ার ডাক্তাররা কাজ বন্ধ করে দেন, ইমারজেন্সির সামনে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন, তাদের দাবি মুখ্যমন্ত্রী আসুন এসে অপরাধীদের শাস্তি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিন, ডাক্তারদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করা্র প্রতিশ্রুতি দিন।

এগিয়ে এলেন সিনিয়র ডাক্তার রা। হিংসার ঘটনা এই তো প্রথম নয়। 2017 ফেব্রুয়ারীতে টাউনহল খাপ পঞ্চায়েত বসিয়ে বেসরকারি হাসপাতালের ম্যানেজমেন্ট কে তুলোধোনা করার পর রাজ্যে 1 নতুন ক্লিনিক্যাল এস্তব্লিশমেন্ট অ্যাক্ট চালু হয়েছিল। বলা হয়েছিল বেসরকারি হাসপাতাল গুলি র রোগী শোষণ বন্ধ করার জন্য, সেগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নাকি এই আইন। কিন্তু আইনের বলে যে রেগুলেটরি কমিশন তৈরি হলো তার শীর্ষে রইলেন বেসরকারি হাসপাতালে র ডাক্তাররা। আর বেসরকারি হাসপাতাল কে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে কমিশন ভিক্টিমাইজ করতে লাগলো ব্যক্তি ডাক্তারদের। পাশাপাশি ডাক্তার ও চিকিৎসা কর্মীদের ওপর আক্রমণের ঘটনা কয়েকগুণ বেড়ে গেল। ডাক্তারদের যুক্ত মঞ্চ জয়েন্ট প্লাটফর্ম অফ ডক্টর স পরিসংখ্যান বলে গত আড়াই বছরে হিংসার ঘটনা ঘটেছে প্রায় 235 টি। এর মধ্যে অধিকাংশই কিন্তু সরকারি হাসপাতালে। সরকারি হাসপাতালে চকচকে নীল সাদা রং হয়েছে, ভেতরে যথেষ্ট সংখ্যায় ডাক্তার নেই, চিকিৎসা কর্মী নেই, যন্ত্রপাতি নেই। সরকারের প্রচার আছে সরকারি হাসপাতাল এ বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়া যায়। পরিকাঠামোর অভাবে মানুষ যখন চিকিৎসা পান না স্বভাবতই তারা ক্ষুব্ধ হন। ক্ষোভের কারণ সরকার কিন্তু সরকারকে তো হাতের সামনে পাওয়া যায় না। হাতের সামনে যাদের পাওয়া যায় সেই ডাক্তার নার্স আর চিকিৎসা কর্মীদের ওপর ক্ষোভ উগরে দেন তারা। হিংসার ঘটনা গুলো বিশ্লেষণ করে আমরা দেখেছি অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগীর পরিজনের ক্ষোভের সুযোগ নিয়ে হামলা চালায় শাসকদলের আশ্রয়ে থাকা দুষ্কৃতীরা। আলিপুরদুয়ার এবং কলকাতার দুটি ঘটনায় দেখা গেছে পুলিশ অফিসার ডাক্তার কে আক্রমণ করছেন। 2009 থেকে এই ধরনের আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য রাজ্যে একটা আইন আছে। অথচ 235 এর মধ্যে মাত্র 5 টি তে অপরাধী কে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তাও জামিনযোগ্য ধারায় মামলা করায় তারা ছাড়া পেয়ে যায়। সিএমআরআই হাসপাতালে ডাক্তার পেটানো য় অভিযুক্ত যাদবপুর থানার ওসি পুলক দত্তের বিরুদ্ধে এফ আই আর ই দায়ের করা যায়নি। অন্য রাজ্য থেকে আসা প্রশিক্ষণার্থী ডাক্তার কে পুলিশের সর্বোচ্চ স্তর থেকে ভয় দেখানো হয়েছে।

মুখ্যমন্ত্রী এলেন না। তিনি গেলেন নীলরতন সরকার হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যেই বিদ্যাসাগর কলেজে বিদ্যাসাগরের মূর্তির পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে আর বাইপাসের ধারে আইটিসি র হোটেল উদ্বোধন করতে। মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে হাসপাতলে এলেন দুই প্রতিমন্ত্রী। আন্দোলনরত জুনিয়ার ডাক্তাররা সন্তুষ্ট হল না, কেননা মুখ্যমন্ত্রী তো কেবল মুখ্যমন্ত্রী নন, তিনি রাজ্যের স্বাস্থ্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও।

নীলরতন সরকারের জুনিয়র ডাক্তারদের সমর্থনে কাজ বন্ধ করলেন বাংলার সমস্ত মেডিকেল কলেজের ছাত্র ডাক্তাররা। তবু সরকারের টনক নড়লো না।

সিনিয়র ডাক্তারদের রাজ্যব্যাপী আউটডোর ধর্মঘটে ও মুখ্যমন্ত্রীর টনক নড়লো না। 13 তারিখ এন আর এস হাসপাতালে না গিয়ে তিনি বাড়ি থেকে নবান্ন যাওয়ার পথে গেলেন এসএসকেএম-এ। জুনিয়র ডাক্তারদের ভয় দেখালেন-কাজে যোগ না দিলে ইন্টার্নশিপ ইনকমপ্লিট থেকে যাবে, চার ঘন্টার মধ্যে কাজে যোগ না দিলে হোস্টেল ছেড়ে দিতে হবে, পরিষেবা চালু রাখার জন্য প্রয়োগ করা হবে এসেনশিয়াল সার্ভিসেস মেনটেনেন্স অ্যাক্ট বা এসমা। তিনি বললেন বহিরাগতরা আন্দোলন করছে। ডাক্তাররা সাম্প্রদায়িক, রোগীর পদবি দেখে তারা চিকিৎসা করে।

মুখ্যমন্ত্রী ভুলে গেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ডাক্তার ও মেডিকেল ছাত্রদের সংগ্রামের ইতিহাসের কথা। স্বাধীনতা সংগ্রামে, স্বাধীনতার পর নানা গণআন্দোলনে, আশির দশকের অল বেঙ্গল জুনিয়র ডাক্তার আন্দোলনের ঐতিহ্য যাদের, তাদের কি এসমার ভয় দেখিয়ে বিরত করা যায়!?

রাজ্যে ডাক্তারি পাঠক্রমে ভর্তির জন্য এখন জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষা নেই, সারাদেশে অভিন্ন প্রবেশিকা পরীক্ষা নিট। সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অন্য রাজ্যের ছাত্র-ছাত্রী বাংলায় আসতে পারেন, বাংলার ছাত্র ছাত্রী অন্য রাজ্যে পড়তে যেতে পারেন। আর দেশে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার অধিকার তো আমাদের সংবিধান স্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

ডাক্তারি পাশ করার পর পেশার শুরুতে ডাক্তারদের হিপোক্রেটিক ওথ নিতে হয়। জাতি ধর্ম বর্ন শ্রেণি নির্বিশেষে সমস্ত মানুষকে সমান চিকিৎসা দেওয়ার শপথ।

মুখ্যমন্ত্রীর এসএসকেএম ভ্রমণের ফল ফলল অবিলম্বে। আন্দোলনরত ডাক্তাররা ইমারজেন্সি ছেড়ে একাডেমিক বিল্ডিং এর ঢুকলেন, সাধারণ সভা করলেন, বেরিয়ে এসে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করলেন একাডেমিক বিল্ডিং এর সামনে। বিক্ষোভে এবার যোগ দিলেন বিভিন্ন বিভাগের প্রধানসহ শিক্ষকেরা, যোগ দিলেন কর্তব্যরত নার্স এবং নার্সিং ছাত্রীরা। অন্যান্য কলেজেও আন্দোলন তীব্রতর হলো। নতুন দাবি ডাক্তারি পেশা কে অপমান করার জন্য মুখ্যমন্ত্রী কে ক্ষমা চাইতে হবে।

13 তারিখ রাতে পদত্যাগপত্র পেশ করলেন এন আর এস মেডিকেল কলেজের প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপাল। তারপর পদত্যাগের জোয়ার নামল, এসএসকেএম, মেডিকেল কলেজ, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ, আর জি কর, নর্থ বেঙ্গল, মালদা, মুর্শিদাবাদ...

আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তারদের পাশে আছি এই বার্তা দিতে সিনিয়র ডাক্তারদের যুক্ত মঞ্চ 14 তারিখ সকাল 11 টা থেকে এন আর এস এ অবস্থানের ডাক দিয়েছিল, বিকেল সাড়ে চারটে মিছিলে র।১৯৮৩র অল বেঙ্গল জুনিয়র ডাক্তার ফেডারেশনের আন্দোলনের সময় আমি সদ্য ইন্টার্ন। তারপর অনেক গণ আন্দোলন দেখেছি, কিছুতে অংশ নিয়েছি। 2007 এর নন্দীগ্রাম হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতার মিছিলের সঙ্গে তুলনীয় 14 ই জুন এর মিছিল। মিছিলের শুরু যখন ন্যাশনালে পৌঁছে গেছে শেষ তখনো এন আর এস থেকে বেরোতে পারেনি। শিল্পী সাহিত্যিক বুদ্ধিজীবী মানবাধিকার কর্মী সাধারণ মানুষ দলে দলে যোগ দিয়েছেন সিনিয়র ডাক্তার জুনিয়র ডাক্তারদের এই মিছিলে।

সেদিন বিকেলে নতুন উদ্যোগ শুরু হল সরকারের তরফে। 5 জন ডাক্তার যারা আন্দোলনের মঞ্চে আসেন নি মিছিলে পথ হাঁটেননি তারা নবান্নে গেলেন মধ্যস্থতার জন্য। বার্তা পাঠানো হলো মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থিতিতে মুখ্যমন্ত্রী জুনিয়র ডাক্তারদের 4 জন প্রতিনিধির সঙ্গে বসবেন। এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন এন আর এস এর জুনিয়া্র ডাক্তাররা। তাদের পক্ষে শেষ বার্তা সমস্যার সমাধান করতে তারা রাজি আছে কিন্তু তারা নবান্নে যাবে না। মুখ্যমন্ত্রী যদি এন আর এস এ আসতে রাজি না হন তাহলে সমঝোতা বৈঠক হোক নিরপেক্ষ কোন জায়গায়।

সিনিয়র ডাক্তার রা সমস্যার সমাধান চান কেননা রোগীর চিকিৎসা করা রোগীর যন্ত্রণা কমানো জীবন বাঁচানো আমাদের পেশা। পেশার স্বার্থে ই সমস্যা সমাধান হওয়া জরুরী।

সেভ দ্য সেভিয়ার। ডাক্তার রোগী বাঁচাবেন কিন্তু হামলার হাত থেকে ডাক্তার কে বাচাবেন কে?

আগামীকালের আই এম এর ডাকা ধর্মঘটের লক্ষ্য সারা দেশব্যাপী ডাক্তারের উপর হামলা বন্ধ করার জন্য একটা আইন। কেমন করে তা সম্ভব তা আমার জানা নেই। কেননা স্বাস্থ্য ও স্বরাষ্ট্র দুটিই রাজ্যের বিষয়, তাতে কেন্দ্রীয় আইন সম্ভব কিনা তা আইন বিশেষজ্ঞরা বলতে পারবেন।

 তবু পশ্চিমবাংলার ডাক্তারদের সর্ববৃহৎ সংগঠন ওয়েস্ট বেঙ্গল ডক্টর ফোরাম আই এম এ র উদ্যোগকে স্বাগত জানায়।

কিন্তু আই এম এর জাতীয় সভাপতি ডাক্তার শান্তনু সেনের ভূমিকা নিন্দনীয়। তিনি আবার রাজ্য আই এম এর সম্পাদক ও বটেন, রাজ্যের শাসক দলের রাজ্যসভার সাংসদ ও। রাজ্যে 2009 থেকে ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেয়ার সার্ভিস পারসন এন্ড মেডিকেয়ার ইনস্টিটিউটস প্রিভেনশন অফ ভায়োলেন্স এক্ট আছে। শান্তনু বাবু নিজের রাজ্যে নিজের দলের প্রশাসনকে প্রভাবিত করতে পারেননি ২৩৫ টি ঘটনায় এই আইন প্রয়োগ করার জন্য। যদি পারতেন তাহলে হয়তো এন আর এস এর ঘটনা নাও ঘটতে পারতো।

রাজ্য আই এম এর সভাপতি আবার রাজ্য মেডিকেল কাউন্সিল এর সভাপতি ও। তৃণমূলের মন্ত্রী ডাক্তার নির্মল মাজি ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিল সভাপতি হিসেবে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছেন কাজে যোগ না দিলে ইন্টার্নদের রেজিস্ট্রেশন দেওয়া হবে না। নির্মল বাবুর এই এক্তিয়ার আছে কিনা তা অবশ্য আইন বিশারদরা বলতে পারবেন। কেননা গত বছর ওয়েস্ট বেঙ্গল মেডিকেল কাউন্সিল এর নির্বাচনে ব্যাপক দুর্নীতি হওয়ায় হাই কোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়।

সম্মানজনক সমাধান ছাড়া ডাক্তারদের আন্দোলনের পথ থেকে সরানো যাবে না। তারা আন্দোলন করবেন সমস্ত জরুরী পরিষেবা বজায় রেখেই। যদি আউটডোর বন্ধ করতে হয় তাহলে শুরু হবে প্যারালাল আউট ডোর। আর মুখ্যমন্ত্রী যদি ভাবেন দমন-পীড়ন করে জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন ভাঙবেন তাহলে সিনিয়র ডাক্তাররা অভূতপূর্ব প্রত্যাঘাত করবেন। প্রায় 900 শিক্ষক চিকিৎসকের পদত্যাগ থেকে রাজ্য প্রশাসনের শিক্ষা নেওয়া উচিত।

শনিবার, ১৫ জুন, ২০১৯

আপনাকেই চাই এনআরএসে ~ সঙ্গীতা বন্দোপাধ্যায়

কেন? কেন? কেন? কেন সর্বত্র আপনাকে যেতে হবে না? যেতে তো হবেই। আপনি ছাড়া কিছু হবে না এ রাজ্যে। আপনাকেই যেতে হবে প্রত্যেক জায়গায়। যখন প্রতিটা ব্যানারে, ফেস্টুনে, পোস্টারে, কাটআউটে নিজের ছবি ঠুসে ঠুসে দিয়েছিলেন তখন মনে হয়নি যে এত "আমি", "আমি", " আমি" করতে নেই? নিজের ডিকটেটর চেহারাটা এরকম করে হাজার বার করে ছাপিয়ে মানুষের চোখে ঘেন্না ধরিয়ে দিতে নেই? তখন মনে হয়নি যখন সব দুর্গাপুজোর সব প্যান্ডেল আপনার বিশাল বিশাল কাটআউট গুলোকে নিয়ে বিসদৃশসম দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হয়েছে? তখন মনে হয়নি যখন কোন ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, কোন নজরুল জয়ন্তী, কোন রবীন্দ্র জয়ন্তী, কোন উৎসব, কোন শোকসভা, কোন আনন্দ, কোন বিষাদ আপনাকে ছাড়া, আপনার বিপুল সংখ্যক ছবির বিজ্ঞাপন ছাড়া সম্পন্ন হয়নি? নয় নয় করে তো 8/9 বছর ভোগ করলেন আমাদের। তৃণমূল স্তর থেকে উঠে এসে এ রাজ্যে পরিবারতন্ত্র, রাজতন্ত্র চালু করে ফেলেছেন। আপনার ভাইপো তো আমাদের রাজপুত্র। এখন আপনি ছাড়া তো আমরা কাউকে চিনি না। কে আপনার মন্ত্রীসান্ত্রী? কাউকে গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। আপনিই আসবেন। আপনাকে চাই।


মঙ্গলবার, ১১ জুন, ২০১৯

এনআরএস......তারপর.... ~ বিষাণ বসু

মধ্য ও উত্তর কলকাতার অনেকটা জায়গা জুড়ে, এই যেমন ধরুন মেডিকেল কলেজের সামনের ফুটপাথে, সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের বেশ কিছু অংশে, আজ হকার নেই তেমন। পুলিশ বসতে দেননি তাঁদের।

কেন?

বাঃ!! কিছুই খবর রাখেন না দেখছি। এটুকুও জানেন না, স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আজ বিদ্যাসাগরের মূর্তির আবরণ উন্মোচন করবেন। ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আমরা যেমন করে পারি, গুজরাটিরা পারবে না, শিওরলি। এগিয়ে বাংলা!!

বাই দ্য ওয়ে, মুখ্যমন্ত্রীর পক্ষে হাজারো রাজকার্যের মাঝে  এত তুচ্ছ দিকে নজর দেওয়া সম্ভব নয় জানি, তবুও বলা যায়, ওই রাস্তার থেকে আর একটু এগোলেই জানতে পারবেন, গত রাত্রে কিছু শ্রদ্ধাশীল তাজা ছেলে লরিতে করে এসে, নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে ভাঙচুর চালিয়ে গেল। বেধড়ক মেরে গেল জুনিয়র ডাক্তারদের। নার্সদের গায়েও হাত পড়েছে। পালিয়ে না বাঁচলে, আরো…….

বেশ কয়েকজন আহত। তার মধ্যে, একজন জুনিয়র ডাক্তারের খুলির বেশ কিছু অংশ ভেঙে মস্তিষ্কের মধ্যে ঢুকে গিয়েছে। আইটিইউ-তে ভর্তি সে। খিঁচুনি হচ্ছে। প্রায় কোমায়।

এই রাজ্যে চিকিৎসক নিগ্রহের লাগাতার ঘটনাক্রমের আপাতত চূড়ান্ত সাফল্য এইটিই। থুতু ছেটানো, গু দিয়ে স্নান করানো থেকে শুরু করে চড়থাপ্পড় কিলঘুঁষি - সেসব এখন অতীত - লরিতে চেপে দেড়শো-দুশোজন এসে ভাঙচুর ও সশস্ত্র আক্রমণ - আশা করা যায়, নতুন ট্রেন্ড এইটাই। এবং পরবর্তীকালে, এই লাইনে যাঁরা হাত পাকাতে চাইবেন, তাঁদের এই বেসিক জায়গা থেকেই শুরু করতে হবে।   

বিদ্যাসাগর মহাশয়ের মুণ্ডুখানা, থুড়ি তাঁর মূর্তির মুণ্ডুখানা মাটিতে গড়াগড়ি যাওয়ায়, দোষারোপের বন্যা বয়ে গিয়েছিল। দুইদল আঙুল তুলেছিলেন পরস্পরের দিকে।       

কর্তব্যরত জুনিয়র ডাক্তারের মুণ্ডু ভাঙার পরেও, না এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নেই, কোনো দলই জোর গলায় এর প্রতিবাদ করে উঠতে পারেন নি। 

রাজ্যের রাজনীতি, মিডিয়া জানিয়েছে, আপাতত দ্বিদলীয়। না, এই দুই দলের কেউই এমনকি মৃদু গলায়ও এই ঘটনায় প্রতিবাদ জানান নি।

এও জেনেছি, সদ্যসমাপ্ত লোকসভা নির্বাচনে এরাজ্য থেকে নির্বাচিত সাংসদদের একটা বড় অংশ পেশায় চিকিৎসক। নাঃ, সেই সাংসদ-চিকিৎসকদেরও কেউ এই নিয়ে মুখ খুলেছেন, এমন খবর নেই।

চিকিৎসকদের সর্ববৃহৎ সংগঠন, যাঁর রাজ্যের হর্তাকর্তা এখন জাতীয়স্তরের সর্বোচ্চপদে আসীন, তাঁরাও টুঁ শব্দটি করেননি।      

তাহলে চিকিৎসকেরা কী করবেন?

প্রতিবাদ? 

রাস্তায় নামা?? কাজ বন্ধ??? ক্ষোভে ফেটে পড়বেন????

না, টেনশন করবেন না।

তেমন কিছুই হবে না। কেননা, চিকিৎসকেরা আইনজীবী নন, যে, কোর্ট অচল করে দেবেন (বিচারালয় তো অত্যাবশ্যক পরিষেবা নয়, স্রেফ বড়লোকের লাক্সারি)। ওই কিছু প্রতিবাদ, কালো ব্যাজ, প্রোফাইল পিকচার কালো করে রাখা...   

আমরা মেনে নিতে নিতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি।

আমরা মেনে নিয়েছি, চিকিৎসার এক এবং একমাত্র দায় আমাদের। অতএব, পরিকাঠামোহীন, স্বাস্থ্যকর্মীহীন প্রতিশ্রুতিতেও প্রতিবাদ করিনি।

আমরা বিশ্বাস করে নিয়েছি, সঠিক ব্যবস্থা, উপযুক্ত পরিকাঠামো থাকলে মানুষ অমর। অতএব, যেকোনো মানুষের যেকোনো পর্যায়েই অসুখ সারিয়ে দেওয়ার চিকিৎসা করা যেতে পারে। চিকিৎসা ছেড়ে  স্রেফ শুশ্রূষার পরামর্শ দেওয়ার কথা ভাবাও পাপ। (গতকাল, যাঁর মৃত্যুতে এত ভাঙচুর, তাঁর বয়স পঁচাশি।)

আবার, সবকিছুকেই অগভীর চোখে দেখতে দেখতে আমরা এমনই অগভীর ভাবনায় অভ্যস্ত হয়েছি, যে, হাসপাতালে হবু ডাক্তারদের মার্শাল আর্ট ট্রেনিং দেওয়ার ব্যবস্থা দেখলে, সেই ভাঁড়ামোকে সমর্থন করি। বলি, চিকিৎসক নিগ্রহের ক্ষেত্রেও পালটা মারই একমাত্র পথ। (মার্শাল আর্ট ট্রেনিং-এর ভাবনা যাঁর উর্বর মস্তিষ্কপ্রসূত, তিনি একারণে পুরস্কার-টুরস্কারও পেয়ে যান।) 

আমরা মেনে নিয়েছি, আমাদের কাজের কোনো টাইম নেই, আমরা পরিবারহীন, আমাদের ডিউটি আওয়ার্স বলে কিছু হতে নেই, সেই ডিউটির শেষেও আমাদের অজস্র ফোন আসবে এবং সেইসব ফোনে যথোপযুক্ত সময় না দেওয়াও দায়িত্বচ্যুতি। অতএব, হোর্ডিং-এ তোমার ছুটি আমার নয় দেখলে আমরা গৌরববোধ করি। 

আমরা মেনে নিয়েছি, চিকিৎসা পয়সা দিয়েই কিনতে হয়। না পারলে সরকারি হাসপাতাল। এই বার্তার মধ্যেই যে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করে রাখার ভাবনা রয়ে গিয়েছে, এমনটা তলিয়ে দেখিনি। আর, যারা বাধ্যত সেই সেকন্ড ক্লাস পরিষেবা নিতে যাচ্ছেন, তাঁদের ভেতরের ক্ষোভের লাভা যেদিন আগ্নেয়গিরির উদগীরণ হয়ে বেরোচ্ছে, তখন, আবারও ভেবে দেখছি না। ভাবনার এই প্যারাডাইম থেকে বেরোতেই পারছি না, যে, আধুনিক ও উন্নত মানেই ব্যয়বহুল। একবারও বলতে পারছি না, ইয়েস, দেয়ার মাস্ট বি অ্যান অল্টারনেটিভ।    

আমরা বিশ্বাস করে নিয়েছি, এক হাতে তালি বাজে না। মেনে নিয়েছি, নিশ্চয়ই কোনো গণ্ডগোল ছিল, নাহলে…..কই, পাশের বেডের পার্টি তো কিছু ঝামেলা করেনি ইত্যাদি ইত্যাদি….অতএব, একেবারে নিজের দোরগোড়ায় অশান্তি না পৌঁছালে…..আর তাছাড়া, জানেনই তো, রোগীর প্রতি দায়বদ্ধতা ইত্যাদি প্রভৃতি। 

আর প্রতিবাদ ব্যাপারটা আমাদের তেমন একটা আসেও না। কর্পোরেট হাসপাতালে আমাদেরই কোনো বন্ধুকে অযৌক্তিক সরিয়ে দিলে, সেই পোস্টে নিজে জয়েন করতে আমাদের বাধে না। মার্কেটিং-এর চাপের সামনে মাথা নোয়াতেও অস্বস্তি হয় না। সরকারি হাসপাতালে ট্রান্সফারের ভয়, আর বেসরকারিতে জায়গাটা হারানোর ভয় - শিরদাঁড়া হারিয়েছি কবেই!! কিন্তু, খবরদার, এসব বলা চলবে না একদম!! ওসব পলিটিক্স আমাদের কম্মো নয়….জানেনই তো, আমরা একটু বেটার আপনার চেয়ে…..

শুধু একটু ক্ষমতার গায়ে গায়ে থাকতে পারলে….একটু মার্কেটিং-এর দুচারটে ছেলেকে কব্জা করতে পারলে….আর ওই একটু কনফারেন্স-টনফারেন্স…. 

না, বিশ্বাস করুন, এগুলো একটুও ধান ভানতে শিবের গীত নয়….  

আসলে, সাধারণ মানুষের থেকে কবে যেন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছি, কবে যেন পুরো পেশাটাই চূড়ান্ত অবিশ্বাসের পাত্র হয়ে গিয়েছে, আমরা ধরতেই পারিনি…

যিনি এই নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজেই কুকুর মারার ঘটনায় বলেছিলেন, যে, সেইসব ডাক্তারদেরও পিটিয়ে মারা উচিত, খেয়াল করে দেখেছিলেন একবার, ঠিক কত লাইক পড়েছিল সেই পোস্টে!!!! মনে রাখুন, আইটিইউ-তে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়া আমাদের ভাইয়ের ব্যাপারে তাঁর নীরব থাকাটাও একটা স্টেটমেন্ট - উচ্চকিত স্টেটমেন্ট - এবং এই স্টেটমেন্টে লাইকের সংখ্যা অগুন্তি।

একটু দাঁড়ান। কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে ভাবুন। আমরা যাঁদের চিকিৎসা করি, তাঁদের আর আমাদের মধ্যেকার সেতুখানা সারাই না করলেই নয়। আর মনে রাখুন, এই সেতুর ইঁটকাঠ প্রতিনিয়ত খুলে নিচ্ছেন রাজনীতির কারবারিরা। 

মনে রাখুন, আমার আর আপনার মধ্যে অবিশ্বাস জিইয়ে না রাখলে, রাজনীতিকদের প্রতি বিশ্বাস বজায় রাখা মুশকিল হয়ে যাবে আপনার পক্ষে।

হাত পেতে ঘুষ নেওয়া রাজনীতিকটি আপনার কল্যাণে ব্রতী, এই বিশ্বাস তো টিকতেই পারে না, যদি না আপনি বিশ্বাস করেন, যে, আপনাকে সারিয়ে তুলছেন যিনি, তিনি আসলে সেটা করছেন স্রেফ পয়সার লোভে।    

অতএব…..অতএব…..

এই চক্রব্যূহ থেকে মুক্তি নেই। 

সরকারের কাছে গিয়ে বলাই যায়, নিরাপত্তা জোরদার করুন। হ্যাঁ, করলে কিছু কাজ হতে পারে। কিন্তু, সে তো আপাত কার্পেট বিছিয়ে গর্তগুলো চাপা দেওয়া - কার্পেটের তলায় অবিশ্বাসের মূষিক তো কাঠামো ভঙ্গুর করেই চলেছে, চলবেও।

আর, তাছাড়া, কোনো রাজনৈতিক দলই কি চায় এই অশান্তি মেটাতে? ওই যে বললাম, এই অবিশ্বাস মিটে গেলে….অবিশ্বাস যদি অন্য সত্যের সন্ধানে ব্রতী হয়….অত বড় ঝুঁকি নেবেন কে!!!!

কয়েক ঘন্টার মধ্যে লরি ভাড়া করে শতাধিক মানুষ জোগাড় করে এনে সশস্ত্র আক্রমণ - প্লীজ, এইটার পেছনে সচেতন রাজনৈতিক মদত নেই, একথা বিশ্বাস করতে বলবেন না!! আর, এই ডেলিবারেট আক্রমণকে তবে-ডাক্তারদেরও-আরো -মানবিক-হতে-হবে টাইপের বাঁধা বুলি দিয়ে মোলায়েম করার চেষ্টা করবেন না - যেটা প্রায় এই আক্রমণের জাস্টিফিকেশানের সমান।    

সব মিলিয়ে…..

জানি না, পথ কী….পরবর্তী পদক্ষেপ কী……

".................তখনও সে
দূর দেশে দূর কালে দূর পৃথিবীকে ডেকে বলে :
এত যদি ব্যূহ চক্র তীর তীরন্দাজ, তবে কেন
শরীর দিয়েছ শুধু, বর্মখানি ভুলে গেছ দিতে !"

(শঙখ ঘোষ)

ভাই, শুধু তুই সুস্থ হয়ে ওঠ তাড়াতাড়ি……

Beloved Country ~ সমুদ্র সেনগুপ্ত

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। এদেশের সবাই অমর। কারুর মারা যাওয়ার কথা নয়। কেউ মারা গেলেই তার কারণ "চিকিৎসার গাফিলতি", বিনা চিকিৎসায় মারা যান সবাই।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। এদেশে মৃত্যুপথ যাত্রীকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা হিসেবে কোনও চিকিৎসা করা যাবে না। কারণ তাহলেই শিক্ষিত পেশেন্ট পার্টি বলবে ডাক্তার ইনজেকশন দিয়ে আমার বাবা/মা/স্বামী/ স্ত্রী/ ছেলে/ মেয়ে কে মেরে ফেললো।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। এখানে ডাক্তাররাই কেবল ডাক্তারিটা জানে না। বাকি সবাই, উকিল, শিক্ষক, সাংবাদিক, দোকানদার, ভ্যান চালক,  সবাই জন্ম থেকে মায়ের পেট থেকে পড়েই ডাক্তারিটা শিখে যায় আর দারুন জানেন। তারাই অক্লেশে বলে দিতে পারেন কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। সবাই জানে যে ডাক্তার মানেই চোর, কাটমানি খাওয়া, অপ্রয়োজনে পেট কেটে ফেলা একটা লোভী লোক। অধচ মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিক এর মেধা তালিকাভুক্ত বহু ছেলে মেয়ে এখনও ডাক্তার হতে চায়। বাবা মা রা অনেকেই চান তাদের ছেলে মেয়ে ডাক্তার হোক।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। কেউ মারা গেলে তার বাড়ির লোকের নৈতিক অধিকারের মধ্যে পরে নিজেই অভিযোগকারী, উকিল, পুলিশ, বিচারক এমনকি জল্লাদ , মানে অল ইন ওয়ান হয়ে সেই ডাক্তারকে ধরে ঠেঙানোর।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। ডাক্তার ঠেঙালে শাস্তি হয় না। বাহবা পাওয়া যায়। পুলিশ এসে  তাকে ধরার বদলে তার আচরণের সপক্ষে যুক্তি খাড়া করে। শোকের মাথায়, দুঃখের মাথায়, গরম মাথায় ওসব হয়ে যায় বলে।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। এ দেশে এনাটমি ফিজিওলজি, মেডিসিন সার্জারির সাথে হবু ডাক্তাররা পেশেন্ট পার্টির আক্রমনের হাত থেকে বাঁচতে সরকারি ব্যবস্থাপনায় চৈনিক মার্শাল আর্ট শেখে, খোঁজ নেয় সহজে কিভাবে রিভলবারের লাইসেন্স পাওয়া যাবে। 

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। রাজনৈতিক কর্মী খুন হলে রাস্তা অবরোধ হয়। নেতা মন্ত্রী বুদ্ধিজীবীরা ভিড় জমায় তাদের বাড়িতে। কিন্তু মাথায় আঘাত লেগে মৃত্যু পথ যাত্রী এন আর এস মেডিক্যাল কলেজের ডাক্তার কে দেখতে যাওয়ার সময় টুকু পান না ওইসব নামি দামি লোক।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। কুকুর কে থেঁতলে মারলে মোমবাতি মিছিলে সবাই হাঁটে আর ডাক্তার কে মারলে মিছিলে হাঁটার লোক সেই গুটিকয়  ডাক্তার।

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। হামলাবাজ সমাজবিরোধীদের ছোঁড়া ইটের গায়ে বাচ্চা ডাক্তারের খুলিতে তুবড়ে টোল পরে যাওয়ার খবর পড়ে আমাদের কান্না আসে না, রাগ হয় না। আনন্দ হয়। মজা পাই আমরা। মুচকি হাসিতে আমাদের গালে টোল পরে। 

এ এক দারুন দেশে বাস করি আমরা। সত্যিই দারুন দেশ।

বুধবার, ৫ জুন, ২০১৯

কমরেড কৃষ্ণা দেশাই ~ অরিজিৎ গুহ

আজ থেকে ঠিক পঞ্চাশ বছর আগে আজকের দিনে অধুনা মুম্বাই তৎকালীন বোম্বের প্যারেলে ঝেপে বৃষ্টি নেমেছিল। সকাল থেকে বৃষ্টি হওয়ার পর রাতের দিকে একটু ধরেছিল। তাও ঝিরঝিরে বৃষ্টি হয়েই চলেছিল। দেশাই জি কাজ সেরে বাড়ি ফিরে সবে রাতের খাবার খেতে বসবেন সেই সময়ে ডেকে উঠল প্রকাশ। খুব জরুরী দরকার আছে নাকি। স্ত্রী কে 'একটু আসছি' বলে প্রকাশের সাথে বেরিয়ে হাজির হলেন খোলা মাঠের সামনে মিলের গিরনি কামগর ইউনিয়ন অফিসের সামনে। খোলা মাঠের সামনে তখনো হাল্কা ঝিরিঝিরি করে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। চারিদিকটা ঢেকে রয়েছে অন্ধকারের চাদরে। হয়ত লোডশেডিং হয়েছে। মাঠের একদিকে রাস্তা, সেই রাস্তার ধারেই রাইস মিলের ইউনিয়ন অফিস। ইউনিয়ন অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে দেশাই জি'র সাথে তখন পরেরদিনের একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রোগ্রাম নিয়ে আলোচনা করছিল প্রকাশ আর কার্ণিক। হঠাৎ একজন মানসিক প্রতিবন্ধী লোক দেশাই জি কে বলল আপনাকে কিছু মজদুর ডাকছে ওই দিকটায়। বলে রাস্তার উল্টোদিকে দেখিয়ে দিল। দেশাই জি একটু অবাক হলেন। ওরা এখানে আসছে না কেন! প্রকাশকে বললেন, দেখো তো একটু কে ডাকছে। প্রকাশ এগিয়ে যেতে দেখল কয়েকজন অল্পবয়সী যুবক একটা গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। প্রকাশ একটু দূর থেকেই হাক দিল কৌন হ্যায়? উলটো দিক থেকে জবাব এলো 'জয় ভারত'। প্রকাশ আরেকটু এগোতেই দেখতে পেল কয়েকজনের জামার নিচে গুপ্তি লোকানো। প্রমাদ গুণল প্রকাশ পাটকার। এর আগে ৬৭ র ইলেকশনের সময়ে দেশাই জি'র ওপর আক্রমণ হয়েছিল এই ছোরা নিয়েই। কোনোরকমে মাথার ওপর ব্রিফকেস উঁচিয়ে প্রাণে বেঁচেছিলেন সেবার। স্ত্রী পরিবারকে তারপর অনেকদিন রত্নাগিরির গ্রামের বাড়িতে রেখে এসেছিলেন। এবারও খবর আছে ওঁর ওপর আক্রমণ হতে পারে। চিৎকার করে দেশাই জি'কে সতর্ক করতেই ধারালো অস্ত্রের আঘাত নেমে এলো প্রকাশের ওপর। মাটিতে লুটিয়ে পড়ল প্রকাশ। দৌড়ে ধাওয়া করল এরপর দেশাই জি কে। দেশাই জি ততক্ষণে দৌড়াতে শুরু করেছেন। কিন্তু পারলেন না। ধরা পড়ে গেলেন আততায়ীদের হাতে।কুপিয়ে কুপিয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হল ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বোম্বের প্যারেলের নির্বাচিত বিধায়ক কৃষ্ণ দেশাই কে। খুন করে রাইস মিলের গিরনি কামগর ইউনিয়নের অফিস জ্বালিয়ে দেওয়া হল।  উল্লাসে মেতে উঠল যুবকের দল। অনেক টাকার কন্ট্র‍্যাক্ট ছিল যে! 

   মিলের ভোঁ বাজার সাথে সাথে লাইন দিয়ে বেরিয়ে আসছে মজদুররা। হাতে তাদের সেদিনই পাওয়া হপ্তার টাকা। ইউনিয়নের সাথে চুক্তিতে মিল মালিক বাধ্য হয়েছে হপ্তা বাড়াতে। তা নাহলেই স্ট্রাইক ডেকে বসত মজদুররা। খুব সমস্যা মিল মালিকদের। বোম্বের খানিদানি মিল মালিক ব্যবসাদাররা তাও সমঝে চলে ইউনিয়নবাজিকে, কিন্তু গুজরাটি বানিয়ারা কিছুতেই মানতে পারে না। বেওসা করতে এসে এইসব ইউনিয়নবাজি ফাজির মত ফালতু বাত নিয়ে সবার সরদর্দ হয়ে রয়েছে। কিছু করাও যাচ্ছে না। আগে যেখানে মুনাফা হত এত্তো এত্তো সেখানে এখন মুনাফার কত অংশ যে মজদুর পেমেন্টে চলে যাচ্ছে তার ঠিক নেই। মেঘাজি লোখান্ডে আর জ্যোতিরাও ফুলে যে বামপন্থী ট্রেড ইউনিয়নের বিজ পুতে গেছে মহারাষ্ট্রের বুকে সেই মহান আদর্শ সম্বল করে লাল ঝাণ্ডাওয়ালারা শ্রমিকদের হকের দাবী তুলেছে, শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে, আট ঘন্টার বেশি কাজ করানো যাবে না, বেশি কাজ করালে দিতে হবে ওভারটাইম, হপ্তার মাইনে হপ্তাতেই দিতে হবে, মাসিক মাইনে দিতে হবে মাসের পনেরো তারিখের মধ্যে এইসব নানা দাবী নিয়ে মুখর। বিভিন্ন ফ্যাকরা তুলে মিলে স্ট্রাইক ডাকছে, ম্যানেজারদের ঘেরাও করছে ঝাণ্ডাওয়ালারা। মালিকরা সব পার্টির কাছে ঘুরে এসেছে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। কাংগ্রেস পার্টি বলে দিয়েছে যা করার মিল মালিকরা করুক, পার্টি ওদের সাথে আছে। লাল ঝাণ্ডাওয়ালাদের শেষ করতে যা যা লাগে সব সাহায্য করবে পার্টি। কিন্তু নিজেরা এগিয়ে এসে কিছু করবে না। তবে হ্যাঁ, ভরোসা দিয়েছে একমাত্র বালাসাহেব জি। উনি বলে দিয়েছেন ওনার ছেলেদের দিয়ে সব কটা মজদুর লিডারকে টাইট দিয়ে দেবেন। 'কমিউনিস্টদের শেষ করার একটাও সুযোগ ছাড়া যাবে না'। কিন্তু এর জন্য খরচা আছে। বেশ ভালো পয়সা লাগবে এর জন্য। মিল মালিকরা ভেবে দেখল পয়সা তো এমনিই বেরিয়ে যাচ্ছে কত, যদি ইউনিয়নবাজি থেকে মুক্তি মিলবে তো আরো পয়সা খরচ করা যাবে। তাতে কি আছে। ভরোসা পেয়েছে মিল মালিকরা। বালাসাহেব জি'র বক্তব্যে, মারাঠি ও হিন্দু অস্মিতার গর্বে একের পর এক মারাঠি যুবক ভর্তি হচ্ছে বালাসাহেবের দলে। ইতিমধ্যে একটা আর্মি বানিয়ে ফেলেছে বালাসাহেব জি। নাম দিয়েছে শিব সৈনিক। দলের নাম শিব সেনা। 

    শুরু হল একের পর এক নেতাদের গুম করা। কাউকে ভয় দেখিয়ে, কাউকে একেবারে হাপিস করে, কাউকে ব্ল্যাকমেল করে চলল বালাসাহেব জি'র অপারেশন। প্যারেল ছিল সেই সময়ের লাল ঝাণ্ডার শক্তিশালী কেন্দ্র। সিপিআই এর স্ট্রংহোল্ড। পারোলের বিধায়কের ওপর টার্গেট করা হল। জানা ছিল কৃষ্ণ দেশাইকে সরিয়ে দিতে পারলে মজিদুরদের কোমর ভেঙে দেওয়া যাবে। ৬৭'র নির্বাচনী প্রচারে আক্রমণ করা হল একবার। কোনোমতে প্রাণে বাঁচলেন। নির্বাচনে জিতে আরো বেশি বেশি করে মজদুর আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন। একের পর এক মিল মালিকদের বাধ্য করলেন মজদুরদের সাথে সম্মানজনক শর্তে চুক্তি করতে। এরপরই ৭০ সালে ফাইনাল আঘাত নেমে এলো। কুপিয়ে কুপিয়ে যখন বিধায়ক জি'কে খুন করা হচ্ছে তার আগেই ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলন প্রায় শেষের মুখে পুরো মহারাষ্ট্র জুড়ে। মালিকদের চোখে হিরো হয়ে উঠলেন বালাসাহেব ঠাকরে। মহারাষ্ট্রের মত জায়গায় যার প্রাদেশিক রাজধানীর সাথে জড়িয়ে আছে নৌ বিদ্রোহের মত ঐতিহ্য সেখানে ট্রেড ইউনিয়ন মজদুর ঐক্য শক্তিশালী যে হবেই সেটা জানা কথাই ছিল। শ্রমিকদের হকের দাবী মেরে কেউ নিজদের পেট ভরাবে এটা অন্তত বি টি রণদিভে অহল্যা রঙ্গনেকারের রাজ্যে ভাবা যায় নি। কিন্তু বর্বর আক্রমণ, খুনের রাজনীতিকে পরাস্ত না করতে পারার ফল হাতে নাতে দিতে হয়েছে মজদুরদের। বোম্বের সেই সব মিলগুলোতে পরে উঠেছে মল, উঠেছে হাইরাইজ বিল্ডিং। মিলওয়ালারা সমস্ত কিছু বিক্রিবাট্টা করে নিজের পকেট ভরে চলে গেছে অন্য ব্যবসায়ে। কেঁদে মরেছে শ্রমিকরা। কারণ ওদের হয়ে বলার জন্য তখন কেউ আর নেই।

    কৃষ্ণ দেশাইকে খুন করার পিছনে প্রচ্ছন্ন মদত ছিল কংগ্রেসেরও। শারদ পাওয়ার তখন কংগ্রেসে। পরে মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী। ইতিমধ্যেই তার মালিকানায় রয়েছে প্রচুর সুগার মিল আখের ক্ষেত আরো অন্য অন্য ব্যবসা। তার ব্যবসারও ক্ষতি হচ্ছিল ওই ঝাণ্ডাওয়ালাদের জন্য। তাই তারও দরকার হয়ে পড়েছিল কমিউনিস্ট নিধন করার। বালাসাহেব ঠাকরে যখন কমিউনিস্ট ট্রেড ইউনিয়ানিস্টদের খতম করছেন তখন তিনি ইতিহাসের চাকা ঘোরার কথা বুঝতে পারেন নি। ১৯৭০ সালের ৫'ই জুন কৃষ্ণ দেশাইকে খুন করার পরে আজাদ ময়দানে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন লাল ঝাণ্ডাওয়ালাদের সব জায়গা থেকে শেষ করতে হবে। মুছে দিতে হবে নাম ও নিশান। we must not miss a single opportunity to massacre communists. পঞ্চাশ বছর পরে বালাসাহেবের নাতি আদিত্য ঠাকরে সেই আজাদ ময়দানেই সেই লাল ঝাণ্ডাওয়ালাদের কৃষক লং মার্চে সমবেদনা জানাতে বাধ্য হচ্ছে। আমি জানি কৃষকরা অনেক দূর থেকে পায়ে হেটে এসেছে। আমি ওদের দাবীর প্রতি সহানুভূতিশীল। 
   ১৯৭০ সালের ৫'ই জুন কৃষ্ণ দেশাই এর হত্যার সাথে সাথে বামপন্থীদের শেষ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ফিনিক্স পাখির গল্প হয়ত বালাসাহেবরা জানতেন না। আজাদ ময়দানেই কিষান লং মার্চ থেকে জন্ম হয়েছিল ফিনিক্স পাখির। আদিত্য ঠাকরে চেয়ে চেয়ে দেখেছিল সেই ফিনিক্স পাখির জন্মকে।

মঙ্গলবার, ৪ জুন, ২০১৯

শোচ লো ~ আর্যতীর্থ

দেখো ভাই, হিন্দিটা ভালো নেহি বোলতা,
বাংলার পিছু পিছু 'হ্যায়' দিয়ে চলতা।
ডায়ালগ কুছ কুছ মুখস্থ করকে,
মাঝে মাঝে ভিড় দেখে মুখ মেরা খোলতা।

শুনা হ্যায়  ইসবার বলেছেন সরকার
হিন্দী শিখনা নাকি সব স্কুলে দরকার।
তাই নিয়ে জনগণ গুস্সা যে বহুতই,
প্রদেশে প্রদেশে আভি যুদ্ধ কা লড়কার।

হম বোলে, কিঁউ খেপো ইতনি সি বাত মে,
উতনা রেগেছো যদি তারা গিনো ছাত মে।
ভেবেছো অগর ইয়ে লাগু যদি হয়ে যায়,
অন্যায় জ্যাদা হবে হিন্দী কি সাথ মে?

যো কুছ বোলেগা বং ,অহমিয়া ওড়িয়া 
 শুনকর প্রেমচান্দ ডোবে মাঝদরিয়া
মালয়ালী কন্নড় বোলা যেই  হিন্দী,
কানে হাত পুকারেগা 'কে বোলনে কো দিয়া?'

থোড়ে দিন ঘুরপাকে প্রাদেশিক জুবানে
লোকজন ভুলে যাবে কৌন কথা কি মানে
বহুত দুখ কি বাত হবে তবে ভাইলোগ
যদি ভাষা ভাস গয়া দিশাহীন কু-টানে।

যো কোই হিন্দী কো উঠা রহা মাচাতে,
বদলনা হোগা তার চিন্তার ধাঁচা-তে।
জুলম করকে কেউ সিলেবাসে ঢোকালে,
বকরি-টি ছাড়া হোগা ভুখা শের খাঁচাতে।

সহিবাত, এ লড়াই হিন্দী কো বাঁচাতে।


শনিবার, ১ জুন, ২০১৯

প্রলাপ ~ সংকলন সরকার

আমার বঙ্গবাসী বংবিচিপির কচি ও ধাড়ি ভাই ও বোনেরা। আম্নেরা ভিন্ন ভিন্ন তেনোমূলী পৌরসভা ভিন্ন ভিন্ন তেনোমূল নেতা ও চ্যালা সমেত আত্মস্থ করিয়া লিলসাদা উন্নয়ন হইতে গেরুয়া কালারে (ইং) বিকাশের নিমিত্ত এবং আসন্ন বিধানসভা দখল করিবার আনন্দে পকপকাপক্‌ লাটখাইবার প্রাক্কালে আমার অভিনন্দন সহকারে শুভেচ্চা ও বালোবাসা জানিবেন। একদা তেনোমূলী মণিরুল ইস্লামের অধুনা গেরুয়াকরণের মধ্যদিয়াই আমার অনন্ত কমি মাকু ও সেকুগিরির বৃত্ত যে সম্পুন্ন হইয়াছে তাহাতে আমার আর একবিন্দুমাত্র সন্দেহ অবশিষ্ট নাই। একদা তেনোমূল অধুনা গেরুয়া চাড্ডি পরিহিত মণিরুল ইস্লাম ও তাহার পদানুসরণকারী জোড়া ফুল হইতে বড়ফুলে আসা নেতা নেতৃবৃন্দ এবং তাহারদিগের ক্যাডার (ইং) বাহিনীগণ  আমার আপনার মতন প্রতিদিন রামসেবা করেন কিনা তা জানা না থাকিলেও, আমি জানি তিনি আমার আম্নার মতন গোসেবা অবশ্যই করেন। কিন্তু শুকরসেবা করেন কিনা তাহা জানা নাই। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য আমি 'উইকডেজ' (ইং) জুড়িয়া মুকপোড়া হনুমানের মতন প্রতি সান্ধ্যাহ্নিকে রামসেবারত অবস্থায় যতই ছোলা বাদাম খাই না কেন 'উইকেন্ডের' (ইং) রামসেবা মূলক সান্ধ্যাহ্নিকে সুযোগ মিলিলে সাধারণত ছোলা বাদ দিয়া ছাগসেবা গোসেবা এবং শুকরসেবা করিয়া থাকি, না, কুক্কুট বা মুরগীসেবা করিনা তাহা ব্যাঙ্গার্থে রামপাখি বলিয়া পরিচিত বলিয়া। (এ বিষয়ে আমার এতটাই গুমোর এবং এতটাই ভক্তি, যে রামচন্দ্রের পক্ষীরূপ বিশেষত মুরগীরূপ সবিশেষ অপছন্দের বটে। আশাকরি এ পার্সোনাল (ইং) গর্ব স্নেহান্ধে মার্জনীয় হইবে)। যাহা হউক বাজেকথা মাত্রই অশিষ্ট 'শিট' (ইং), তাহা বর্জন বা ত্যাগ করা উচিত, আশাকরি নিজগুণে আম্নারা আমার যাবতীয় বর্জ্যকথা ত্যাগ করিয়া এড়াইয়া চলিবেন। রামসেবক মণিরুল ঝ্যায়রাম ধ্বনি তুলিয়া গোসেবা করিতে করিতে মন্দির যে ওইখানেই বানাইবেন তাহাতে আপনারদিগের কিছুমাত্র সন্দেহ হয় কী? আমার তো হয় না! আসলে আমি এক ছদ্ম স্বদেশবাসী তথা অস্যার্থে আদত ভিনদেশী চীনা পাকিস্তানী বাংলাদেশী মাকু কমি সেকু এবং শিপিয়েম অর্থাৎ পরিণামে আজ ভোগের নুচি হইলেও অপ্রাসঙ্গিক নই। কারণ প্রসঙ্গ অবান্তর হইলেও আপামর কচি ও ধাড়ি ভাই ও বোনেদের মাঝে এ প্রসঙ্গ ঘন্টায় ৩৪ বার ফিরিয়া ফিরিয়া যখন আসে, অতয়েব ইহা আপাদমস্তক শিট (ইং) প্রসঙ্গ  হইলেও ২০১১ সনে তেনোমূল শিপিয়েম ক্যাডারগণ (ইং) ভোল বদলাইয়া শিপিয়েমের বি টিম (ইং) হইয়া আত্মপ্রকাশ করিয়াছিলো বলিয়া অবশ্যই প্রাসঙ্গিক। উক্ত সনে অত তেনো ক্যাডার (ইং) ভোটার (ইং) তো আর মঙ্গল গ্রহ হইতে খসিয়া পড়ে নাই। বিশেষ করিয়া উক্ত সনে বঙ্গ জুড়ে যখন ভোটিং মেশিনারি (ইং) শিপিয়েমেরই করতলগত ছিলো! পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আদতে পিতৃহারা ব্যাকুল মানুষের ঢল আকুল হইয়া একজন মাটির মা অনুসন্ধান করিতে উদ্যত ছিল! সে করুক, পাইলেই হইল, মাটির মা না পাইলেও কোনো এক মায়ের মেয়ে তো পাইল। সে দিদি হউক পিসি হউক, মেয়েরা মায়ের জাত। আকুলতার ঘোর কাটিতে পাঁচ সাত বছর সময় লাগিলেও জানা গেল মা হইলে হয়ত সকলকে গ্রীষ্মের দুপুরে দাওয়ায় শোয়াইয়া তালপাতার হাতপাখায় হাওয়া করিতেন, দিদি বা পিসি বলিয়া হয়ত ওই তালপাখাটি উল্টাইয়া রণচণ্ডী মূর্তি ধরিয়া তাহার ডাঁটি ব্যবহারপূর্বক বেশিরভাগ মাটির মানুষকে ধমকাইতেছেন, চমকাইতেছেন মধ্যে মধ্যে দুই দশ ঘা কষিয়াও কিছুতেই ক্ষান্ত হইতেছেন না! এদিকে তাহার স্নেহের বারিধারা অর্থানুকুল্য রূপে ক্লাবে (ইং) স্কুলে (ইং) সিন্ডিকেটে (ইং) ও বিভিন্ন অচলায়তনে খেয়ালখুশী মতন বহিয়া চলিতেছে, অথচ সচলায়তনে উচ্চবাচ্চ নাই দেখিয়া প্রতিদিন শত সহস্র সচল শকট বহনকারী মাঝেরহাট ব্রিজটি (ইং) লজ্জায় অপমানে অভিমানে মুহ্যমান মায়ের স্নেহের শোকে পাথর হইয়া মানুষ সহ মাটির উপর ব্রেকডাউন (ইং) করিল। এক্ষণে সেই মুকুল বাবুর হাতে তৈরি তেনোমূলের বি টিম (ইং) যদি বংবিচিপি হয় তাহাতে মাকু তেনো চাড্ডি বৃত্ত সম্পুর্ণ করে আদতে শিপিয়েমেরই নৈতিক জয় হইয়াছে বলিয়া অবশ্য প্রত্যয় হয়। ইহার দু'টি কারণ, ১) মার্ক্স বলিয়াছিলেন তেনো মণিরুল যদি গেরুয়া চাড্ডি হইতে পারে তাহা হইলে গর্বিত বংহেঁদুরা সর্বহারা হইবেই। ২) এখনো অবধি ভোটাধিকার প্রাপ্ত সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক বংভোটার বাম জমানায় জন্মাইয়াছেন। বাংলার উনি বলিয়াছেন বামেদের জমানায় জন্ম গ্রহণ করা অত্যন্ত খারাপ বিষয়। ফুল (ইং ??!) জমানায় জন্ম গ্রহণ করা নিপাতনে সিদ্ধ শুদ্ধ বেচারি ভোটারগণ সুদূর ২০২৯ সন হইতে ভোটাধিকার পাইবেন। কিন্তু তদ্দিন কী আর...?? যাউজ্ঞা! 

(বোঁদে খাইয়া পেট গরম হইয়াছে দিবা দ্বিপ্রহরে একা একা আড়াইশো বোঁদে খাওয়া আমার উচিত হয় নাই...  এই প্রলাপ ইত্যাদি দয়া করিয়া আপনারা সর্ব প্রকার শিট (ইং) জ্ঞানে ত্যাগ করিবেন। ধন্যবাদ।)

বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯

ডক্টর্স ডাইলেমা : হোসেন আলির গল্প ~ ড: বিষাণ বসু

চলতি শতকের প্রথম দশকের মাঝামাঝি। তখন মেডিকেল কলেজে। ছাত্র, অর্থাৎ পিজিটি, মানে পোস্ট-গ্র‍্যাজুয়েট ট্রেনি। ক্যানসারের চিকিৎসা বিষয়ে কিছুটা জানাচেনার চেষ্টা করছি। কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, এইসব। সেই সময়ে যাঁদের চিকিৎসার সাথে যুক্ত থেকেছি, তাঁদের কয়েকজনের কথা খুব মনে আছে। ক্যানসার এমনই এক অসুখ, যেখানে জেতার পাশাপাশি হারের সংখ্যা অনেক। আবার, তিনবছরের ছাত্রজীবনে এমন সংখ্যাও কম নয়, যেখানে জয় নাকি পরাজয় ঠিক কোনটা ঘটেছে, সেই খবর পাওয়ার সুযোগটুকুও ঘটেনি। 

আউটডোর ইনডোর রেডিয়েশন মেশিনের মধ্যে দিয়ে যে বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রত্যেকদিন চিকিৎসা পেতেন, তাঁদের মধ্যে অনেক মুখই স্মৃতিতে ফিরে আসে। বারবার। কিছু কিছু মুখ প্রায় হন্ট করতে থাকে। সে স্মৃতি কখনও আনন্দের, প্রায়শই বিষাদের।
 
যেমন ধরুন, হোসেন আলি। মুর্শিদাবাদের মানুষ। পরিস্থিতি এমনই, চিকিৎসা করানোর পক্ষে নিকটতম গন্তব্য কলকাতা। (তখনও বহরমপুরে মেডিকেল কলেজ চালু হয় নি।) কুচকুচে কালো গায়ের রঙ। তাগড়াই চেহারা। বয়স বছর পঞ্চাশেক। 

তাঁর সমস্যা, ইদানিং একটু ওজন কমেছে। রাত্রে জ্বরও আসে। গলায় আর বগলে কিছু কিছু ডেলা জাতীয় ফোলা। স্থানীয় ডাক্তারবাবু, সঙ্গত কারণেই, টিবি সন্দেহ করেছিলেন। কিন্তু, ছুঁচ ফুটিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেল, লিম্ফোমা। অগত্যা কলকাতা। ক্যানসার বিভাগ।

পরীক্ষানিরীক্ষায় দেখা গেল, অসুখ বেশ কিছুটা ছড়িয়েছে। পেটের ভেতরেও লিম্ফ নোড বেড়েছে। সব মিলিয়ে স্টেজ থ্রী। ক্যানসার কতখানি বেড়েছে, শরীরে কতোখানি ছড়িয়েছে, তার ভিত্তিতে অসুখের সারার সম্ভাবনা কতোখানি, সেই হিসেবনিকেশের অন্যতম এই স্টেজিং। সাধারণত চারটি ধাপ। হোসেনসাহেব আছেন তৃতীয় পর্যায়ে।

অসুখটি লিম্ফোমা। নন-হজকিন্স লিম্ফোমা। তার মধ্যেও হাই গ্রেড। অর্থাৎ, দ্রুত ডালপালা ছড়ানোর স্বভাব। কিন্তু, আবার অন্যদিকে, লিম্ফোমা চিকিৎসায় সাড়াও দেয় চটপট। সেইসময়, ওই স্বল্প অভিজ্ঞতাতেই দেখেছি, দুই কি তিন দফা কেমো দিতেই লিম্ফোমা স্রেফ উধাও হয়ে গিয়েছে। বেশ কিছুটা অ্যাডভান্সড স্টেজেও লিম্ফোমা কিউরেবল, অর্থাৎ নিরাময়যোগ্য, এমনই জেনেছি।

হোসেনসাহেবের গলা-বগলের ফোলা অনেকটাই কমে গেল প্রথম দফার কেমোথেরাপির পরে। কিন্তু, পরিস্থিতির আন্দাজ পাওয়া গেল দ্বিতীয় দফার পরে। ফোলা কমা তো দূরে থাক, তৃতীয় দফার কেমো নেওয়ার সময় দেখা গেল, ফোলা ফিরে এসেছে প্রথম দফার আগের পর্যায়ে। হোসেনসাহেব সচেতন মানুষ। বললেন, ফোলা প্রায় মিলিয়েই গিয়েছিল দ্বিতীয় কেমোর সপ্তাহখানেক বাদেই। কিন্তু, দুসপ্তাহ যেতে না যেতেই অসুখ বাড়তে শুরু করে।

তৃতীয় দফা, মানে থার্ড সাইকেলের পরেও পরিস্থিতি তাই। অসুখ যেটুকু কমার, দুসপ্তাহের মধ্যেই ফিরে আসছে বাড়তি গতিতে। স্যারেরা আলোচনায় বসলেন। সিদ্ধান্ত হল, অসুখ যেহেতু ফিরে আসছে দু'সপ্তাহের মাথায়, কেমোথেরাপির সাইকেলের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে আনা যাক। এমনিতে তিন সপ্তাহের মাথায় দেওয়া হয়, কিন্তু এক্ষেত্রে দুটি কেমো সাইকেলের ব্যবধান হোক, ওই দুসপ্তাহ। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এর নাম, ডোজ ডেনস (dose dense) থেরাপি।

কথাটা শুনতে সহজ লাগলেও বিষয়টা একটু জটিল। কেমোথেরাপির দুটি দফার মধ্যে ব্যবধানের পেছনে কিছু আপোষ রয়েছে। আমরা ভাবতে ভালোবাসি, যে, কেমোথেরাপির বিষে শুধু ক্যানসার কোষ ধ্বংস হচ্ছে আর বাকি সব সুস্থ কোষ থাকছে বহাল তবিয়তে। কিন্তু, এ শুধুই উইশফুল থিঙ্কিং। ক্যানসার কোষের পাশাপাশি অসংখ্য সুস্থ-সবল কোষও বেঘোরে মারা যাচ্ছে কেমোর উপদ্রবে। কোন কোষ? শরীরের যেসব অংশে কোষ বিভাজন ঘটে দ্রুত, ক্ষতিগ্রস্ত হয় তারাই। যেমন, অস্থিমজ্জা বা বোন ম্যারো, যেখানে রক্ত বা রক্তের বিভিন্ন উপাদান তৈরী হয়। যেমন, অন্ডকোষ বা ডিম্বাশয়, যেখানে প্রজননের জন্যে প্রয়োজনীয় কোষ বিভাজিত হয়। যেমন, অন্ত্র বা ইন্টেস্টাইনের ভিতরের অংশ, যেখানে প্রতিনিয়ত পুরোনো কোষ নষ্ট হয়ে নতুন কোষ তার জায়গা নেয়। মৃত কোষের জায়গা নেওয়ার জন্যে আসবে নতুন কোষ, শরীরের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ কিছুটা মেরামত হয়ে নিতে পারবে - শরীরের মধ্যেই বন্দোবস্ত মজুত, শুধু সেই বন্দোবস্ত কার্যকরী হওয়ার জন্যে সময় জরুরী। কিন্তু, দুই দফার মধ্যের ফাঁকে ক্যানসারটিও তো নিজেকে গুছিয়ে নেবে, সেইখানেও ক্ষতিগ্রস্ত অংশটি সেরেসুরে উঠতে চাইবে। তাহলে?? ওই আপোষ। একটু ফাঁক থাকুক, যাতে শরীরটা একটু গুছিয়ে নিতে পারে, অথচ ক্যানসারটি যাতে বেড়ে না যেতে পারে।

ডোজ ডেনস চিকিৎসা করতে গেলে এই ভারসাম্য রক্ষার খেলাটাই নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা। হোসেন আলির ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেওয়ার সাহস পাওয়া গেল, কারণ তাঁর সুঠাম স্বাস্থ্য। কিন্তু, রক্ত কমে গেলে, বিশেষত সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করার মূল অস্ত্র শ্বেত কণিকা কমে গেলে তো মুশকিল। বিশেষত, কলকাতা থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে মুর্শিদাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সমস্যায় পড়লে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সম্ভাবনা কম। অতএব, রক্ত বাড়ানোর ইঞ্জেকশনও জোড়া হল কেমোর পরের দিন। সেই সময়ে এই ইঞ্জেকশন বেশ দামী, হাসপাতালে পাওয়াও যায় না। হোসেনসাহেবের ছেলেকে বলা হল। খরচ শুনে ঘাবড়ে গেল সে। কিন্তু, বাবার চিকিৎসা। কোথা থেকে টাকার জোগাড় হল জানি না, কিন্তু, হোসেন আলির ইঞ্জেকশনের অভাব হল না।

চিকিৎসা একটু এগোতেই বোঝা গেল, হোসেন আলির ক্যানসারটি বড়ই বেয়াড়া প্রকৃতির। যে অসুখ আগে ফিরে আসছিল দু'সপ্তাহের মাথায়, এখন সেই ব্যবধান কমে দাঁড়ালো সাত কি দশদিনে। সত্যি বলতে কি, হোসেন আলির ক্যানসার যেন আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রকে ভেংচি কেটে বিদ্রুপ করতে থাকল। শরীরও ভাঙতে লাগলো দ্রুত। পেটের ভেতরের কিছু লিম্ফ নোড ফুলে স্নায়ুর উপর চাপ দিয়ে বিভিন্ন নিত্যনতুন উপসর্গের জন্ম দিতে থাকল।

বোঝা গেল, আর যাই হোক, এই পথে সমাধানের কোনো সম্ভাবনা নেই। অতএব, অন্য ভাবনা। শুরু হল, সেকেন্ড লাইন কেমোথেরাপি। এইখানে বলে রাখা ভালো, অন্তত সেই সময়ে, বেশীর ভাগ ক্যানসারের ক্ষেত্রে, দ্বিতীয় পর্যায়ের যে কেমোথেরাপি, মানে সেকেন্ড লাইন কেমোথেরাপি, তার ওষুধের কার্যকারিতা কম, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বেশী, বেশ দুর্মূল্য, এবং সেই ওষুধ সরকারি হাসপাতালে বিনেপয়সাতে পাওয়াও যেত না। দরিদ্র হোসেন আলির পক্ষে সেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া সহজ কাজ নয়। কিন্তু, হোসেন আলির ছেলের সিদ্ধান্ত, যে করেই হোক, বাবাকে সে সুস্থ করে তুলবেই। অতএব…….

ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম সমস্যা, একই রোগীকে বারবার দেখতে দেখতে, তার বাড়ির লোকের সাথে এটাসেটা গল্প করতে করতে কোনো এক সময় যেন তাদের সাথে একটা টান, একটা আন্তরিকতার সম্পর্ক তৈরী হয়ে যায় - সেই টান কাটিয়ে উঠে নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিতে মানুষটাকে বা তার রোগটাকে বিচার করা মুশকিল হয়ে যায়। একটা পরিবারের মধ্যের অংশ হিসেবে যে মানুষটা, তাঁকে শুধুমাত্র রোগী হিসেবে দেখে নির্মোক দৃষ্টিতে বৈজ্ঞানিকসুলভ নির্লিপ্তিতে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া, এ বড় কঠিন কাজ। অনেক ডাক্তারকেই এই বাঁধন উপেক্ষা করে পেশাদারের দৃষ্টিতে বিষয়টাকে দেখতে দেখেছি, তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়েও বিদ্যেটা রপ্ত করে উঠতে পারিনি।

মাসখানেক যেতে না যেতেই বুঝলাম, হোসেনসাহেবের পরিবারের পক্ষে এই খরচ টানা দুঃসহ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ওষুধের দাম, মুর্শিদাবাদ-কলকাতা দৌড়াদৌড়ি, বাবা ভর্তি থাকলেও সাথে আসা ছেলের তিনচারদিন কলকাতায় থাকাখাওয়ার বন্দোবস্ত করা, সব মিলিয়ে অসম্ভব হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অন্যদিকে, হোসেন আলিও চিকিৎসায় তেমন সাড়া দিচ্ছেন না। অসুখ যেটুকু নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে, শরীর ভাঙছে তার বহুগুণ দ্রুততায়। পেটাই চেহারা এখন সুদূর স্মৃতি। ওয়ার্ডের লাগোয়া শৌচালয়ে যেতে তাঁর সাহায্য লাগে, বেডে ফিরে হাঁফাতে থাকেন।  

ছেলের সাথে গল্প করতে গিয়ে জানলাম, বাবার অসুস্থতা-চিকিৎসার প্রয়োজনে, এগারো ক্লাসে পড়তে পড়তে তাকে পড়া ছেড়ে দিতে হয়েছে। মা আর দুই ভাইয়ের খাবার জোগানোর দায়িত্ব তার। গ্রামে যে কদিন থাকে, দিনমজুর খাটে। কলকাতায় বাবার চিকিৎসার জন্যে আসতে হলে রোজগার নেই। 

এমনই এক দফা কেমোর জন্যে হোসেন আলি শেষবার যখন ভর্তি হলেন, ছেলের পাংশুমুখ দেখে প্রশ্নের উত্তরে জানা গেল, ভিটেটুকু বন্ধক দিয়ে এই দফা আসা হয়েছে। পরের দফায় কী হবে, সেই নিয়ে আপাতত ছেলে দুশ্চিন্তায়।

কথাটা অনেক আগেই বলা উচিত ছিল হয়ত। কিন্তু, ওই যে, বেটার লেট দ্যান নেভার। ছেলেকে আলাদা নিয়ে গিয়ে বোঝালাম, দ্যাখো, বাবার তো কিছুই হওয়ার নেই। ভিটে বাঁধা দিয়ে মা আর ছোট দুই ভাইকে নিয়ে ভেসে যেয়ে লাভ কী!! বাবার আর কেমোর দরকার নেই। টাকাটা নিয়ে বাড়িতে যাও, জমিটা ছাড়িয়ে নাও। এই দফা বাবাকে স্যালাইন দিয়ে ছুটি করে দিচ্ছি।

খুব যে এককথায় রাজি হল, তা নয়। কিন্তু, পিতৃহীন অদূর ভবিষ্যতে মাথার উপর থেকে ছাদটুকুও চলে গেলে কী হতে পারে, সেইটুকু বোঝানো গেল। পইপই করে এও বলা হল, এইবারের ভিটে বাঁধা দেওয়ার টাকাটুকু যেন অক্ষত থাকে এবং বাড়ি পৌঁছেই টাকা ফেরত দিয়ে যেন জমির কাগজ ফিরিয়ে নেয়।

হোসেন আলির এত কথা জানার কথা নয়। কিন্তু, মানুষ বুঝতে পারে। বিশেষত, ক্যানসারের ডাক্তারের জীবনে এমন মুহূর্ত প্রায়শই আসে, যখন তিনি মুখে হাসি টেনে রোগীর সাথে আপাত স্বাভাবিকতার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেন, শুধু সেই কথোপকথনের সময়টুকুতে রোগীর চোখের দিকে তাকাতে পারেন না।

হোসেন আলিও বুঝতে পেরেছিলেন হয়ত।

যেকোনো হাসপাতালেই, মেডিকেল কলেজগুলোতে তো আরো বিশেষ করে, ক্যানসারের চিকিৎসা একটি দলগত প্রয়াস। কিন্তু, হোসেনসাহেবের কেমোথেরাপি চালানোর সময় বারবার আমিই সামনে থাকতাম, এজন্যেই হোক বা স্বভাবগত খেজুড়ে আলাপের অভ্যেসের জন্য এটাসেটা গল্প জুড়তাম বলেই হোক, হোসেন আলির সাথে আমার একটা বেশ আলাদা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।

সেইদিন ছুটির সময় সামনে যাচ্ছিলাম না। ছেলে এসে বলল, বাবা জিজ্ঞেস করছে, আমার ডাক্তারবাবু কোথায়? অগত্যা যেতেই হল। হোসেন আলি সহজভাবে জিজ্ঞেস করলেন, এর পরে আবার কবে কেমোর ডেট স্যার? আমতা আমতা করে বললাম, এখন তো অনেক কেমো হল। শরীরটাও দুর্বল। বাড়িতে খাবার ওষুধ দেওয়া হল। মাসখানেক মাসদেড়েকের মাথায় আরেকবার দেখে ঠিক করা যাবে।

হোসেন আলি চুপ করে রইলেন। তারপর আচমকাই নিজের দুটো হাতের মধ্যে আমার ডান হাতখানা নিয়ে বললেন, ডাক্তারবাবু, আপনি আমায় একেবারে ছেড়ে দিলেন!!!    

###################

এর বোধহয় বছরখানেক বাদের কথা।

প্রবল গরমে ঘামতে ঘামতে ভিড় আউটডোরে। রোগী দেখছি নাকি চালু ডাক্তারি ভাষায় পেশেন্ট ছাড়ছি, বলা মুশকিল।

হঠাৎ একটি ছেলে বলল, ডাক্তারবাবু চিনতে পারছেন? 

চেনা চেনা লাগলেও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। আমার চোখে অনিশ্চয়তা দেখে ছেলেটিই জিজ্ঞেস করল, হোসেন আলিকে মনে আছে, স্যার?

####################

হোসেন আলিকে মনে আছে!!!!!!

সেই শেষবারের "ডাক্তারবাবু, আপনি আমাকে একেবারে ছেড়ে দিলেন" এর পরে কতবার কত অদ্ভুত সময়ে হোসেন আলি আমাকে তাড়া করেছে, সে কি তাঁর ছেলে একটুও আন্দাজ করতে পারবে!!! 

ওই একটি বাক্যের মধ্যে ঠিক কোন কথাটায় শেষবার জোর দিয়েছিলেন হোসেন? 

ডাক্তারবাবু? মানে ডাক্তার হয়ে হাল ছেড়ে দেওয়াটা ভুল, এই কথাই কি ছিল সেই অমোঘ বাক্যে? ডাক্তার হলে কি চেষ্টা করে যাওয়া, করেই যাওয়াটা অনিবার্য ধর্ম? এমনকি চেষ্টা অসার জেনেও? সেই বৃথা চেষ্টার মূল্য চোকাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে একখানা আস্ত পরিবার, সেই পরিস্থিতিতেও?

নাকি হোসেনের জোর ছিল ওই "আপনি" শব্দেই? আর পাঁচজন হাল ছাড়লেও আপনি ছাড়বেন কেন? আপনার সাথে এত কথাবার্তা, এত গল্পগুজবের পরেও আপনি সেই হাল ছেড়ে দিলেন? নিশ্চিত মৃত্যুর হাতে আমাকে ফেলে দিলেন অসহায়? হোসেন কি এই প্রশ্নই করতে চেয়েছিলেন?  

নাকি জোর ছিল সেই "আমায়" শব্দটির উপর? অর্থাৎ, আমার পরিবারের স্বার্থ দেখতে গিয়ে আপনি আমার মৃত্যু ঠেকানোর চেষ্টা করলেন না? যেখানে আমি বনাম আমার পরিবারের স্বার্থের সংঘাত হয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্যাটা, সেইখানে আপনি, যিনি কিনা আমার চিকিৎসক, আপনি আমার পরিবারের কথাটা আগে ভাবলেন? নিজের রোগীর প্রতি আপনার দায়িত্ব তখন কোথায় গেল, ডাক্তারবাবু??      

###################

বলা বাহুল্য, এই ঘটনার পরে এক দশকেরও বেশী সময় পার হয়ে গেলেও হোসেন আলি আর তাঁর প্রশ্ন আমি ভুলতে পারিনি।

পরবর্তীকালে, ঝাঁচকচকে কর্পোরেট হাসপাতালের কেতাদুরস্ত বড় ডাক্তারবাবু আমাকে বুঝিয়েছিলেন, শোন, ডাক্তার হিসেবে তোর দায়বদ্ধতা উল্টোদিকের চেয়ারে বসে রোগীটির প্রতি, একমাত্র ও শুধুমাত্র সেই রোগীটির প্রতি।  

কিন্তু, সেই দায়বদ্ধতার সীমা কোনখানে? স্পষ্টতই নিষ্ফলা চিকিৎসার চেষ্টার ফলে একটা পরিবার ভেসে যেতে চলেছে, সেই অবস্থাতেও দায়বদ্ধতা সীমাবদ্ধ থাকবে এক এবং একমাত্র রোগীর প্রতিই?

চিকিৎসকের চেষ্টার সীমারেখাই বা কোথায় থাকবে? ঠিক কোনখানে বলা যাবে, ব্যাস, দিস ফার অ্যান্ড নো ফারদার? ঠিক ক'শতাংশ আশা থাকলে ব্যয়বহুল চিকিৎসার চেষ্টা যুক্তিযুক্ত? নাকি, চিকিৎসকের দায় চেষ্টা করে যাওয়ার? সেইখানে খরচের চিন্তার দায়িত্ব তাঁর নয়?

এমনকি, বৃহত্তর ক্ষেত্রের কথা যদি বলি, এই প্রশ্নের সাধারণীকরণ যদি করা যায়, তথাকথিত শেষ চেষ্টা বা হাল-না-ছাড়া যদি ব্যয়বহুল পথে মৃত্যুকে দীর্ঘায়িত করার পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে চিকিৎসক ঠিক কোন ভূমিকায় থাকবেন? চিকিৎসকের হাল না ছাড়ার অনিবার্য ফল হিসেবে যদি প্রায় যেকোনো মানুষের যেকোনো স্তরের অসুখই চিকিৎসাযোগ্য এই বার্তা ছড়ায়, তার পরেও চিকিৎসকের দায়িত্বটি ঠিক কেমন কেমন দাঁড়াতে পারে?   

মেডিকেল এথিক্স ব্যাপারটা অনেকদিনই মেডিকেল ল-য়ের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গিয়েছে। আর, মেডিকেল ল-এর সাথে ওতপ্রোত জড়িয়ে গিয়েছে ক্রেতা সুরক্ষা আইন। এই ঘন দ্রবণের মাঝখান থেকে মেডিকেল এথিক্সের দুধটুকু বেছে নেওয়া কতদূর সম্ভব?

মেডিকেল এথিক্সের ধারণার শুরুতে যে সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মর‍্যালিটির অবশ্যম্ভাবী যোগাযোগ ছিল, তার কতটুকু এই বাজার-শাসিত সমাজে প্রাসঙ্গিক? তার কতটুকু এই সময়ে প্রয়োগ করা সম্ভব?

হবু ডাক্তারদের জন্যে যে আসন্ন পাঠক্রম, সেইখানে গুরুত্ব পেতে চলেছে মেডিকেল এথিক্স এবং ডাক্তারবাবুদের কমিউনিকেশন স্কিল। কেমন দাঁড়াবে সেই এথিক্সের চেহারা? নিজের ভাবনাকে রোগী-পরিজনের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে কমিউনিকেশন স্কিল, নিঃসন্দেহে, জরুরী। কিন্তু, সেই ভাবনাটার চেহারা কী দাঁড়াবে? সেই ভাবনাটা ঠিক কী হওয়া উচিত? সেই দিকনির্দেশিকা চিকিৎসাশিক্ষার পাঠক্রম তৈরীর বড়বাবুদের মাথায় থাকবে তো? 

############################

হোসেন আলির কথা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিলাম। অবশ্য, তাঁকে নিয়ে আর বেশী কিছু বলারও নেই।

ছেলে জানায়, আমরা হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেওয়ার পরে, ঠিক ষোল দিনের মাথায় বাবা মারা যান। আমাদের কথায়, সে বাড়ি গিয়েই টাকা ফেরত দিয়ে ভিটের জমিটুকু ফিরিয়ে নেয়। না, মহাজন রাজি হয়নি সহজে। পঞ্চায়েতের মধ্যস্থতায় কাজ হয়। এই দফায় গ্রামেরই অন্য একজনকে ডাক্তার দেখাতে কলকাতায় আসা। মনে হয়েছে, যে ডাক্তারবাবুরা না বললে তার জমিটুকুও থাকত না, তাঁদের সাথে দেখা করার প্রয়োজন।

বেশী কিছু আমারও বলার ছিল না।

হোসেন আলির শেষ প্রশ্নটুকু থেকে আরো অনেক অনেক প্রশ্ন আমার মনে আসতে থাকে, আসতেই থাকে, সে হয়ত আমারই মনের ভুল।

লিখেছেন ড: বিষাণ বসু

বৃহস্পতিবার, ১৬ মে, ২০১৯

বিভাজনের রাজনীতি ~ ড: রেজাউল করীম

আনন্দবাজার একটা আবেগময় পোস্ট এডিটে  মমতা বন্দোপাধ্যায়কে জেতানোর আবেদন জানিয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে জেনে গিয়েছি, বিজেপি একটি মুসলিম বিরোধী, সাম্প্রদায়িক, ফ্যাসিবাদী দল। সেদিন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা লাগাতে ব্যর্থ, হতাশাগ্রস্ত হয়ে তারা বাঙালী-প্রাণপুরুষ বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভেঙেছে। এ বিষয়ে ও কোন মতভেদ নেই যে, অনেক, হয়ত শতাংশের বিচারে বেশি নয় তাঁরা তবুও অনেক, শিক্ষিত মানুষ "মোদি মোদি" বলে চিৎকারের মূল কারণ যেমন মমতা বন্দোপাধ্যায়ের প্রতি বিতৃষ্ণা, তেমনি বা তারচেয়ে বেশি সুপ্ত মুসলিম বিদ্বেষ । নরেন মোদির প্রচার তাঁদের অনেকের প্রাণে দোলা দিয়েছে,  "হাম পাঁচ, হামারা পঁচিশ" এই তত্বেও তাদের অগাধ বিশ্বাস। তারা এমন ও বিশ্বাস করেন যে, খুব শিগগিরই মুসলিম জনসংখ্যা হিন্দুকে ছাড়িয়ে যাবে। কোন তত্বগত ভিত্তি এর জন্য দরকার নেই, বিশ্বাস ই যথেষ্ট।  যুগে যুগে ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আবির্ভাবের যে সংকল্প শ্রীভগবানের মুখ থেকে নিঃসৃত হয়েছে সেই যুগবতারের আবির্ভাব হয়েছে। তিনি অপাপবিদ্ধ, তিনিই এই দেশের একমাত্র সমাধান-দুর্নীতি থেকে, বেরোজগারি থেকে, অর্থনৈতিক মন্দা থেকে এই পুণ্যভূমি তিনি রক্ষা করবেন! "ধন্য আশা কুহকিনী। তোমার মায়া অসার সংসার চক্র ঘোরে নিরবধি।"

অনেক উচ্চশিক্ষিত মানুষ আমার কাছে একান্তে স্বীকার করেছেন যে, মুসলিম জনসংখ্যার "স্ফীতি যথেষ্ট আশঙ্কার কারন"। ভাবনার জগতে  এই পরিবর্তন রীতিমতো স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে দুটি কারণে। প্রথম কারণ অবশ্যই মুসলিম সম্প্রদায়ের লুম্পেন অংশকে কোন রাখঢাক না রেখে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার। সব দলই এই অংশকে ব্যবহার করে, তৃণমূল এই ব্যাপারে নির্লজ্জ, দুকানকাটা। দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই , মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সংখ্যালঘু নীতি। তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য দরকার ছিল  শিক্ষার বিস্তার ও অর্থনৈতিক মানোন্নয়ন। তিনি সে পথে না গিয়ে মাদ্রাসা প্রীতি দেখাতে শুরু করলেন, শিক্ষিত মধ্যবিত্তের কর্মসংস্থানের কথা না ভেবে ইমামদের ভাতার ব্যবস্থা করলেন।  মুসলিমদের আলাদা বাজার , এমনকি আলাদা মেডিকেল কলেজ ঘোষনা করলেন। সাচ্চার রিপোর্টে দেখা যায়, মুসলিমদের মাত্র চার শতাংশ মাদ্রাসা শিক্ষায় আগ্রহী ও শতকরা তিরিশ ভাগ বেশি পয়সা খরচ করে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পাঠাতে আগ্রহী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কার  প্ররোচনায়  মাদ্রাসা ও ইমাম ভাতার কথা ভেবেছেন জানিনা। কিন্তু, আম ভদ্র হিন্দুর কাছে যে বার্তা পৌঁছালো তা খুব মর্মস্পর্শী- তাঁরা মুসলিম মানেই মাদ্রাসা, মুসলিম মানেই ইমাম ভাতা, মুসলিম মানেই ওবিসি এই ধারনায় আক্রান্ত হলেন। 

"নাচায় পুতুল যথা দক্ষ বাজিকরে/নাচাও তেমনি তুমি অর্বাচীন নরে" এই পংক্তিটি শুধু কথার কথা নয়। কবির সুমন বাবু একদিন আমাকে বলেছিলেন- মমতা বন্দোপাধ্যায় হলেন খনা। দুশো বছর পর তার নামে মন্দির তৈরী হবে। তাঁর সেই কথা সত্য হবে কিনা জানিনা তবে এই রাজ্যের দরিদ্র জনতা যে তাঁকে গ্রহন করেছিলেন তার প্রমান ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। কিন্তু তিনি সবাইকে হতাশ করেছেন ও বাংলায় বিভাজন তরান্বিত করতে তাঁর ইন্দ্রজাল কাজে লাগিয়েছেন। বিশেষতঃ সচেতন অসাম্প্রদায়িক মানুষের ভাবনার জগতে হিন্দু মুসলিম বিভাজন আরো বেশি গাঢ় হয়েছে মুখ্যমন্ত্রীর আচরণে। মুসলিম ভোটের জন্য পাগল হয়ে তিনি বিশেষ বিশেষ মহল্লায় বেশবাশে সচেতন যত্ন নিতে শুরু করলেন। গ্রামে গঞ্জে চাষী মুসলমান, যারা এ রাজ্যের মুসলমান জনসংখ্যার সিংহভাগ, তারা আর পাঁচজন বাঙালীর মত মাথায় ঘোমটা দেন। কিন্তু বিশেষ পোষাক পরে মুখ্যমন্ত্রী একটি নতুন ঘরাণার সাথে মুসলিম সম্প্রদায়ের একাত্মতা তৈরীর চেষ্টা করলেন। তাঁর ইন্দ্রজালে মুগ্ধ হল নিরক্ষর, অনভিজ্ঞ, সহজ সরল গ্রামীন মানুষগুলি।  ওয়াহাবি চেতনার সাথে যুক্ত এই বেশবাস গ্রহণযোগ্যতা পেতে শুরু করলো। যে ভাবে ওপার বাংলায় বাঙালী-মুসলিম, মুসলিম-বাঙালীতে রূপান্তরিত হয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী সেই পরম্পরা তৈরিতে বিশেষ উদ্যোগ নিলেন। একশ্রেণীর মুসলিমদের ভোট তিনি পেলেন কিন্তু বিভাজনও হল সম্পূর্ণ । 
এই অবস্থায় মুখ্যমন্ত্রী তাঁর স্বাভাবিক অভিনয় জারি রেখে বিজেপিকে হারাতে ভোট যাঞ্ছা  করছেন। এই সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির স্রষ্টা  তিনিই, খুব সচেতন ভাবে তিনি এই মহাযেজ্ঞ সম্পন্ন করেছেন। আর ফেরার কোন পথ বাকি নেই। সাম্প্রদায়িক পরিস্থিতির উন্নতির স্বার্থে তাঁর বিদায় প্রয়োজন, হয়ত সেটাই অবধারিতও।  আনন্দবাজার যতই আবেগময়, ওজস্বীতা দেখাক, বিভাজনের রাজনীতি ঢাকিসহ বিসর্জন ভবিতব্য। বাঙালী যেমন বিজেপি কে চিনতে ভুল করে নি, তাঁর বিভাজনের রাজনীতি সম্পর্কে ও সম্যক অবহিত।

ইভিএম কারচুপি ~ প্রতিভা সরকার

মোদীমুক্ত ভারতবর্ষের স্বপ্ন দেখছেন বুঝি ? ভেবেছেন জানমাল বাঁচিয়ে সন্তানের লেখাপড়া, কাজকামের পথ সুগম হবে ? চাষীশ্রমিক আত্মহত্যা না করে বিরাট মিছিলে নিজের দাবী বুঝে নেবে, এইরকম ভাবনা আপনার ? বেসরকারি করণ রুখে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থায় মসৃণ কাজ হবে,কর্পোরেটকে জলজঙ্গলজমি বেচা কমবে আর গরীবকে জাতধর্মখাদ্যের কারণে পিটিয়ে মারা হবে না, এইরকম খোয়াব দেখেন বুঝি, সাহেব ? দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে লাটে তোলা আর ঘোটালার বিরুদ্ধে লড়াকু মানুষগুলোকে গুলি করে মারা এই গডসের ভজনাকারী সরকার নিপাত যাক, এইরকম আপনার চাওয়া ?

সে গুড়ে কড়কড়ে বালি পড়ার সম্ভাবনাই বেশি।

শুনুন দাদাদিদি, ভাইবহেনরা, নির্বাচনের শেষ ভাগে দাঁড়িয়ে এখনো যদি জোট না বাঁধেন, যদি নোটায় ভোট দেবার কথা ভাবেন, শুধু খিল্লি ওড়ান বালনরেন্দ্রের ত্রেতাযুগে ইন্টারনেট আর ডিজিটাল ক্যামেরা ব্যবহার নিয়ে,সন্দেহভাজন অর্থলোভী, গদিলোভী দলত্যাগীদের বিরুদ্ধে হাতে হাত না মেলান, যদি প্রতিরোধ গড়ে না তোলেন, তবে আপনার জন্য থাকবে শুধু স্বপ্নের বুজকুড়ি আর ঘুম ভাঙার পর মুখে তেতো স্বাদ। 

আপনার মনে পড়ে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উড়োজাহাজ থেকে নামানো বিরাট বাক্স হাতে হাতে ভ্যানিশ হয়ে যাবার কথা ?  কী ছিল তাতে কেউ জানেনা এখনো, কিন্তু যে সৎ প্রশাসক হুজুরের হেলিকপ্টারে নিয়ম মাফিক তল্লাশি চালিয়েছিলেন ইতোমধ্যে তিনি ছাঁটাই হয়েছেন। 
পুরো রহস্য উপন্যাসের ধাঁচে নির্বাচনের এক একটি চ্যাপ্টার লেখা হচ্ছে বহুদিন ধরে। ফ্রন্টলাইনের মতো ইনভেস্টিগেটিভ জার্ণাল তথ্যপ্রমাণ দিয়ে ইভিএম লোপাট হবার কথা লিখেছে। একটা আধটা নয়, ২০ লাখ ইভিএম ভোটের আগেই উধাও হয়ে গেছে, আপনি জানেন ? মুম্বাই হাইকোর্টে পি আই এল করে এই তথ্য সামনে এসেছে, কিন্তু আমাদের কাছে তা হয়তো পৌঁছবে ভোটের পর। 

ইভিএমের কাজে নানা গড়বড়ির অভিযোগ বহু পুরনো। বিরোধী দলের এইসব অভিযোগে কান দেয়নি সব-দেখেও-কিছু-না-দেখা নির্বাচন কমিশন। এমনকি বিরোধীদের ন্যায্যতম দাবী, প্রত্যেক এসেম্বলি সেগমেন্টে ৫০% ভিভিপ্যাটের সঙ্গে ইভিএমের ফলাফল মিলিয়ে দেখার দাবীও কমিশন হাওয়ায় উড়িয়ে দিয়েছে। 

কিন্তু মুম্বাই হাইকোর্টে পি আই এল করে ঝুলি থেকে বেড়াল বার করে এনেছেন আর টি আই এক্টিভিস্ট বঙ্গসন্তান মনোরঞ্জন রায়। ইভিএম এবং ভিভিপ্যাট সংরক্ষণের দায়িত্ব যাদের সেই কেন্দ্রীয় এবং রাজ্য ইলেকশন কমিশনের হাঁড়ি হাটে ভেঙে দিয়েছেন। দেখা গেছে  ইভিএমের অর্ডার, সাপ্লাই, ডেলিভারি, তিনটে ধাপেই বিস্তর গোলযোগ। শুধু তাই নয়, এতে করে বিস্তর টাকা নয়ছয় করা হয়েছে, যার পরিমাণ ১১৬.৫৫ কোটি। পিএলআইতে পরিষ্কার দেখানো হয়েছে যতো ইভিএম, ভিভিপ্যাটের অর্ডার গেছে এসেছে তার থেকে বহুগুণ কম। ইলেকশন কমিশনের কাছে অর্ডারমাফিক যতো ইভিএম থাকার কথা, আছে তার থেকে ২০ লক্ষ কম। ম্যানুফ্যাকচারিং কম্পানি কিন্তু জানিয়েছে তারা ঠিকঠাক ডেলিভারি দিয়েছে। সে সংক্রান্ত কাগজপত্রও তৈরি আছে তাদের কাছে। 

তাহলে এই ইভিএমগুলি গেল কই ? গোটা নির্বাচনী সময় ধরে সেগুলোতে কারসাজি করা হচ্ছে নাকি ? জেতা নিয়ে সন্দেহ আছে এইরকম নির্বাচনী ক্ষেত্রে কোন বিশেষ দলকে জিতিয়ে দেবার জন্য ? 

আর কি বিপুল টাকাকড়ির নয়ছয় ! গত দশ বছরে, নির্বাচন কমিশন জানিয়েছিল, ইভিএম বাবদ খরচ হয়েছে ৫৩৬,০১,৭৫,৪৮৫ টাকা। যেই না আর টি আই করার পর চুলচেরা বিচার হলো, অমনি সেটা দাঁড়িয়ে গেল ৬৫২,৫৬,৪৪,০০০ টাকায়। কাকেশ্বর কুচকুচকে ডাকতে হবে নাকি ? 

ইলেকশন কমিশন আদালতে হলফনামা দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে কোনো ইভিএম সে স্ক্র‍্যাপ হিসেবেও বিক্রি করেনি কখনো। এই বাড়তি মেশিন কোথায়, বাড়তি টাকা কোন নেপোর পকেটে সে রহস্যের মীমাংসা কোনদিন হবে কিনা জানা নেই, ভোট ফুরোবার আগে তো নয়ই। মামলাটাই চলছিল এক বছরের বেশি সময় ধরে। 

স্বৈরাচারীর ভেক অনেক। 
গ্রাম নগর হাট বাজার বন্দরে তৈরি হও।

বুধবার, ১৫ মে, ২০১৯

বিদ্দ্বজ্জনদের বিবৃতি ~ ড: অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

ছিঃ সিপিএম, ছিঃ সিপিএম, ছিঃ সিপিএম
ছিঃ...
অ্যান্টেনাতে গোপন কাণ্ড বামাল ধরেছি।
আমরা যারা বিদ্দ্বজ্জন, চিন্তা-ভাবনা করি,
দেশের জন্য চিন্তাযুক্ত দিবস ও শর্বরী, 
ভাবতে ভাবতে ষড়যন্ত্র সবটা পরিষ্কার!
বিদ্যাসাগর মূর্তি ভাঙার দোষটা ধরিস কার?
ঘাসফুল না পদ্মও না, ধরেছি... শেম শেম.
তলায় তলায় কলকাঠিটা নাড়ল সিপিএম!

হাজার খানিক জঙ্গি ক্যাডার সাজিয়ে গেরুয়াতে
অমিত বাবুর মিছিলটাতে লাঠি ও রড হাতে
আর কয়েকটা গুন্ডা ছোঁড়া...ছদ্ম এসএফআই
ইট-পাটকেল, মূর্তি ভাঙার মাসতুতো সব ভাই...
বিদ্যাসাগর আর সিইউএ মজুত। বাধায় হামলা।
এ কাণ্ড সেই সিপিএমের... অতি সহজ মামলা।
এই সঙ্গেই প্রকাশ পেল, জানা উচিত সবার...
জ্ঞানেশ্বরী...  ভাঙচুর সেই প্রাচীন বিধানসভার,
তাণ্ডব সব সিপিএমের নিখুঁত ষড়যন্ত্র।
সিপিএমকে ঘায়েল করে বাঁচাও গণতন্ত্র!!!

ভুবনের মাসিগণের কুম্ভীরাশ্রু ~ ডঃ বিষাণ বসু

বিদ্যেসাগরের মাথা কাটা গ্যাছে। তাই নিয়ে জোর শোরগোল। আপামর বাঙালীর নাকি মাথা কাটা গ্যাছে। তা বেশ! কথায় বলে, মাথা নেই, তার মাথাব্যথা।
রামকৃষ্ণদেব নাকি ঈশ্বরচন্দ্রকে বলেছিলেন, তুমি তো বাবা এমনিতেই সিদ্ধ। সিদ্ধ হলে কী হয়। নরম হয়। তা, বাবা, তোমার মনটি তো গরীব-দুঃখীর দুখে কাঁদে, এমনই নরম। তুমি যদি সিদ্ধ না হও, তাহলে সিদ্ধপুরুষ কে!!
তা গদাধরবাবুর জানা ছিল না, শুধু সিদ্ধ হয়েই নরম হয় না, মাছ নরম হয় পচলে। এই যে বাঙালী ঝাঁকের কই নরম হয়েছে, মূর্তি ভাঙার শোকে একদম ভেঙে পড়েছে, তার মূলে ওই, পচন।
সে নরম আবার এমনই নরম, যে, একেবারে ন্যাতপেতে হয়ে আছে। হাড়-মাস-মাথা-শিরদাঁড়া আলাদা করাই মুশকিল, এক্কেরে জেলিফিশতুল্য। একটা পুরো জাতি চোদু গোপাল হয়ে বসে আছে। যাহা পায়, তাহা খায়, সে এমনকি এবিপি আনন্দ হলেও।
প্রতিবাদ থেকে পোতিবাদ হয়ে অভ্যেসটাই যখন বাদ হয়ে গেল, বিদ্যাসাগর মশাইকে এর মধ্যে টানাহেঁচড়া করা কেন!!!
শিক্ষাদীক্ষায় হইহই করে পেছনের দিকে এগিয়ে চলার সময়, এমনকি লেখাপড়ার মত একটা ব্যাপারের মধ্যে প্রাইভেট স্কুল এডুকেশন ব্যবস্থা লাগু করে সরকারি ইস্কুলগুলো লাটে তুলে দেওয়ার সময় বিদ্যেসাগরমশাইকে ফুলবেলপাতা দেওয়া হচ্ছিল। আজ মূর্তি ভাঙার মুহূর্তে হাহাকার করা তো আমাদেরই সাজে!!!!
দুচারটে ধর্ষণ-টর্ষণ খবরের কাগজের মাঝের পাতায় ছাপা হয়। রেপিস্টকে পালাতে সাহায্য করে দিব্যি ভোটে দাঁড়ানো যেতে পারে। বিদ্যেসাগরের মূর্তিতে ফুলবেলপাতা আমরা চড়াচ্ছিলাম। দায়িত্ব নিয়ে।
ধর্ম, না ধর্মাচরণকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডায় এনে ফেলে জাতিবিদ্বেষ-ধর্মবিদ্বেষকে যখন ভোটে কনভার্ট করার স্ট্র‍্যাটেজি সাজানো হচ্ছিল, তখনও বিশ্বাস করুন স্যার, আমরা কিন্তু কিচ্ছুটি বলিনি। শুধু আপনার মূর্তির পাদদেশে সাজানোর জন্য বেলপাতা বাছছিলাম। যে নবজাগরণের হাত ধরে দেশের জাতীয়তাবাদের সূচনা হয়েছিল, সেইসব "ভুলভাল" ইতিহাস ছেড়ে আমরা নতুনভাবে "জাতীয়তাবাদী" হচ্ছিলাম। আর বলছিলাম, ওরা যদি মহরমে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করে, তাহলে এরাই বা করবে না কেন, রামনবমীতে!!! বিদ্যাসাগর স্যার, বিশ্বাস করুন, আমরা কিন্তু "ওরা" নই, আবার "এরা"-ও নই, আমরা জাস্ট নিরপেক্ষ। আসলে ডমিন্যান্ট মেজরিটির হয়ে "নিরপেক্ষতা"-র অর্থ ঠিক কী, আমরা বুঝতে চাইনি। কেননা, আমাদের পেছনে অত দম কোথায়!!!
যাক গে সেসব কথা।
মোদ্দা ব্যাপারটা হল, বিদ্যাসাগরমশাই বেঁচে থাকতেই পালিয়েছিলেন। লোকটার, আর কিছু না থাক, দূরদৃষ্টি ছিল। তাঁর নামের কলেজটিতে বাছাই কিছু খিস্তি এবং পকেটে ইঁট নিয়ে যাঁরা শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছিলেন, সেইসব ক্ষুরধার বিদ্যার্থীদের মানসচক্ষে দেখতে পেয়েই তিনি সাঁওতাল পরগণায় পালিয়েছিলেন। সময় থাকতে থাকতেই। কাজেই, সেই খিস্তি ও ইঁটের প্রতিবাদে যাঁরা মিছিল থেকে হইহই করে বিদ্যাসাগর কলেজে সগৌরবে প্রবেশ করলেন, তাঁদের মুখোমুখি তাঁকে হতে হয় নি।
কাজেই, চোখের জল মুছুন। বিদ্যাসাগরমশাই তেমন একটা চোট পান নি। রিল্যাক্স।
বর্ণপরিচয় পড়েছেন তো? গল্পটল্পগুলো তো জানা আছে নিশ্চয়ই?
তা ভুবনের গল্পটা মনে পড়ে? পুরোনো গল্প। একটু বাসি হয়ে গিয়েছে। আজকাল চুরিটুরিতে শাস্তি তেমন একটা হয় না (ফাঁসির তো প্রশ্নই নেই)। একজন ভোটপ্রার্থী তো বুক ফুলিয়ে বলেইছেন, জেলে থাকাটাই ভোট পাওয়ার জন্যে তাঁর ইউএসপি। কিন্তু, কথাটা সেই নিয়ে নয়।
গল্পের শেষটা মনে করে দেখুন।
সাজাপ্রাপ্ত ভুবন তার সাজার আগের মুহূর্তে মাসিকে ডেকে পাঠায়। বলে, মাসিকে কানেকানে কিছু বলতে চায়। হ্যাঁ, সেই মাসি, যিনি কিনা ভুবনের ছোটখাটো অপরাধ দেখে চুপ থেকে, দেখেও না দেখার ভান করে মাধবকে দাগী অপরাধীতে পরিণত হতে সাহায্য করেছিলেন।
তা সেই মাসি ভুবনের মুখের কাছে কান নিয়ে আসতেই, ভুবন মাসির সেই কান কামড়ে কেটে নেয়। পরের কথাটুকু বর্ণপরিচয় থেকেই।
"পরে ভর্ৎসনা করিয়া কহিল, মাসি! তুমিই আমার এই ফাঁসির কারণ। যখন আমি প্রথম চুরি করিয়াছিলাম, তুমি জানিতে পারিয়াছিলে। সে সময়ে যদি তুমি শাসন ও নিবারণ করিতে, তাহা হইলে আমার এ দশা ঘটিত না। তাহা কর নাই, এজন্য তোমার এই পুরস্কার হইল।"
না, এইসব ঘটনা আর কিছু নয়। জাস্ট একটু একটু করে কানের কামড়। ভুবনরা বেড়েছে। বাড়ছে। অবাধে।
আমরা সবাই ভুবনের কানকাটা মাসি।  

শুক্রবার, ১০ মে, ২০১৯

শ্রমিকের জয়গান কান পেতে শোনো ওই ~ সুশোভন পাত্র

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন বাংলায় কমিউনিস্টদের খুঁজতে দূরবীন লাগবে। অমিত শাহর খোয়াবনামা কমিউনিস্ট মুক্ত দেশ গড়বেন। স্টুডিওর ইনফো-গ্রাফিক্সে অর্ণব গোস্বামীরা লিখে দিয়েছেন কমিউনিস্টরা শূন্য। পোষ্ট মর্ডানিস্ট তাত্ত্বিকরা গবেষণা করে জানিয়ে দিয়েছেন বিশ্বে কমিউনিজম ব্যর্থ। ঐ দোকানের মার্ক্স ভালো, সেই দোকানের এঙ্গেলস, কিম্বা দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ -এসব এখন অতীত। এখন নাকি পুঁজিবাদের তিন তলা বাড়ি, সবটাই শাড়ি। 
অথচ তুরস্কের মধ্য-পূর্বে পাহাড় ঘেরা টুনজেলি প্রভিন্স নতুন করে সেজে উঠেছে লাল ঝাণ্ডায়। সম্প্রতি নির্বাচনে সাক্ষরতার হারে এবং জীবনযাত্রার সূচকে তুরস্কের শীর্ষ শহর ডারসিম বেছে নিয়েছে কমিউনিস্টদেরই। তুরস্কের ইতিহাসে প্রথম। সেই তুরস্কে, যে তুরস্কের রাজনীতি তে ধর্মের আফিম আজ আকছার। সেই তুরস্কে, যে তুরস্কে বিগত ১৬ বছর ক্ষমতায় চরম দক্ষিণপন্থী তায়িপ এরদোগান। বদলে ফেলেছেন সংবিধান, বদলে ফেলেছেন নির্বাচনী ব্যবস্থা, নিষিদ্ধ কুর্দিসরা, সরকারের বিরুদ্ধে বলার জন্য খুন হয়েছেন সাংবাদিকরা, লগ্নি পুঁজির জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের জন্য দরজা। সেই তুরস্কেই বেপরোয়া মূল্যবৃদ্ধি আর বেকারত্বের বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছেন মানুষ। ২৫ বছর পর এরদোগানের পার্টি হেরেছে ইস্তানবুলে। হেরেছে রাজধানী শহর আঙ্কারাতে। 
প্যারিসের রাজপথ আজ স্তব্ধ প্রতিবাদে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রচারে আর্থিক উদারীকরণের নীতির বিরুদ্ধেই ঝড় তুলে ইমানুয়েল ম্যাক্রনের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন বামপন্থী প্রার্থী জ্যাঁ-লুক মেলেশোঁ। একলাফে ভোটের হার বেড়েছে ৮.৫%। মেলেশোঁ চেয়েছিলেন ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, সবার জন্য বিনামূল্যে স্বাস্থ্যপরিষেবা, কর্পোরেটদের আয়কর বৃদ্ধি। চেয়েছিলেন সমরাস্ত্র শিল্প এবং বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের জাতীয়করণ। 
আজ মোহন ভাগবতরা বলছেন 'কমিউনিস্টরা দেশের শত্রু, এঁদের উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার'। কমিউনিস্ট'দের উচিত শিক্ষা সেদিন গোয়েরিং'ও দিতে চেয়েছিলেন। হিটলারের জন্য মাইলের পর মাইল অস্বাস্থ্যকর জলাভূমি'টাকে বেড়া দিয়ে বেঁধে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানাবার মাস্টারস্ট্রোকটা যার মস্তিষ্ক প্রসূত ছিল, সেই হেরমান গোয়েরিং। আশি হাজার ক্লেদক্লিষ্ট বন্দীর সামনে বুখেনভাল্ড ক্যাম্পের উদ্বোধনী ভাষণে গোয়েরিং বলেছিলেন "উচিত শিক্ষা দিয়ে কমিউনিস্ট'দের সমাজের উপযুক্ত করেত এই সামান্য আয়োজন।" স্বপ্ন মুসোলিনিও দেখেছিলেন একার হাতেই কমিউনিস্টদের চিতা সাজানোর। সোভিয়েত পতনের উল্লাসে বিগলিত মার্গারেট থ্যাচারও সেদিন বলেছিলেন, 'There is no alternative to Capatalism'  
অথচ আজ ব্রিটেনেই থ্যাচারের কনজারভেটিভ পার্টির থেরিসা মে'র সরকার ঝুলছে সুতোর উপর। ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের কুর্সি দখলের লড়াইয়ের ফালক্রামে এখন লেবার পার্টির সোশ্যালিস্ট নেতা জেরেমি করবিন। যে ব্রিটেনে বেসরকারিকরণ কে 'সরকার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান' বলেছিলেন থ্যাচার; গ্যাস, ইলেকট্রিক এমনকি পানীয় জল সহ ৪৭ বিলিয়ন পাউন্ড রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি পুঁজিপতিদের বিলিয়ে দিয়েছিলেন থ্যাচার; ট্রেড ইউনিয়ন কে অর্থনীতির জন্য 'ক্ষতিকারক' হিসেবে দাগিয়ে দিয়েছিলেন থ্যাচার; সেই ব্রিটেনেই করবিনের হাত ধরে আজ রাজনীতির ন্যারেটিভে পুনর্জাতীয়করণের কথা। ট্রেড ইউনিয়নের প্রসারের কথা। ধনীদের উপর কর, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর কথা। কর্মসংস্থান, সামাজিক কর্মসূচীতে ব্যয়বরাদ্দ বৃদ্ধির কথা। 
ভালো নেই পুঁজিবাদের আঁতুড় ঘর আমেরিকাও। ২০০৮-র রিসেশেনের পর তুমুল বেড়েছে বেকারত্ব, ৮১% নাগরিকের কমেছে আয়। উগ্র দক্ষিণপন্থী ট্রাম্পের রিপাবলিকান সরকারের মহিলা বিদ্বেষ, বর্ণবিদ্বেষ, অভিবাসী বিরোধিতা, যুদ্ধ জিগির ছুঁড়ে ফেলে তাই বিকল্প খুঁজে নিচ্ছে আমেরিকার সাধারণ মানুষই। মধ্যবর্তী নির্বাচনে জয়জয়কার ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্ট'দের। লাতিনের মহিলা হিসেবে প্রথমবার জিতেছেন ভেরোনিকা এসকোবার, সিলভিয়া গার্সিয়া। আদি জনগোষ্ঠীর ডেব হালান্ডরা। জিতেছেন প্যালেস্তিনীয় উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান রাশিদা তালিব, কেনিয়ার রিফিউজি ক্যাম্পে বেড়ে ওঠা ইলহান ওমররা। টেক্সাস-মিশিগানের অলিতে  গলিতে তাঁরা বলছেন 'আমেরিকা কর্পোরেট লুটের শিকার। শ্রমজীবী মানুষ আর তাঁদের পায়ের তলায় থাকবে না।' আর এই বিকল্প পথের নেতৃত্বে বার্নি স্যান্ডারস। কি বিকল্প চান স্যান্ডারস? সরকারি স্বাস্থ্যবীমা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ফি মকুব, ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট-র অবসান, মহিলা-সংখ্যালঘুদের অধিকার, ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি, আর ধনীদের উপর চড়া হারে কর।
গর্ভাচেভ আর ইয়েলৎসিন দেখানো মুক্তবাজার অর্থনীতির রঙিন স্বপ্নে বুঁদ হয়ে তখন ভাঙ্গছে সোভিয়েত। জনৈক মিখাইল'র সেই সময়ের অভিজ্ঞতা তাঁর নোবেল জয়ী "সেকেন্ড-হ্যান্ড টাইমঃ দ্য লাস্ট অফ দ্য সোভিয়েতস" বইয়ে লিখেছেন বেলারুশিয়ান সাংবাদিকা স্বেতলানা অ্যালেক্সিভিচ -"সোভিয়েত ভাঙ্গার খুশিতে আমি মস্কোর হোয়াইট হাউসের সামনে মানব বন্ধনে হাত মিলিয়ে ছিলাম। কমিউনিজম আর যাতে কোনদিন ফিরে না আসে তার জন্য জীবন বাজি রেখেছিলাম। আমরা বলেছিলাম কমিউনিজম চিরকালের জন্য মৃত। তারপর কেটে গেছে ২৫টা বছর। আমার ছেলে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। কদিন আগে গিয়েছিলাম তার হোস্টেলে। দেখি ডেস্কের উপর পড়ে আছে মার্ক্সের দাস ক্যাপিটাল। আড়ি পেতে শুনলাম আমার ছেলে আলোচনা করছে কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো নিয়ে। নিজের চোখ, আর কান'কেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হয়েছিল নিজের হাতে যে মার্ক্স কে কফিন বন্দী করে এসেছিলাম সেই মার্ক্সই কি আবার ফিরে এলো?" 
হ্যাঁ, এলো। আসলে স্তালিনের নাম শুনলেই তেলে-বেগুনে জ্বলে আপনি উঠতেই পারেন, সোভিয়েতের প্রশংসায় 'অ্যানিম্যাল ফার্মের' অর্গাজমে স্বর্গসুখ আপনি পেতেই পারেন, বলিভিয়ার নিবিড় অরণ্যে ঐ দাড়িওয়ালা গ্ল্যামারাস ডাক্তার ছেলেটার মৃত্যুর প্রতি নিরাসক্ত আপনি থাকতেই পারেন, তীব্র শৈত্য প্রবাহে রেড আর্মির লং-মার্চ কিংবা পাভেল করচাগিনের ইস্পাত কঠিন লড়াই কে ব্যঙ্গ আপনি করতেই পারেন, এমনকি ভ্লাদিমির ইলিচ উলিয়ানভ লেনিনের দাড়ির থেকে রামদেবের দাড়িই আপনার বেশি পছন্দ হতেই পারে; কিন্তু গীতার 'শ্লোক' থেকে কোরানের 'সূরা' হয়ে বাইবেলের টেস্টামেন্ট -কোথাও এই ক্রমবর্ধমান বৈষম্যের অর্থনীতির বিশল্যকরণী খুঁজে আপনি পাবেন না। পুঁজিবাদী বাজারে হিন্দু-মুসলমানের ক্যালোরির আলাদা হিসাব কষতে আপনি পারবেন না। মুক্তবাজারের মুনাফা তে ব্রাহ্মণ-দলিত'র 'উদ্বৃত্ত শ্রমের' পার্থক্য করতে আপনি পারবেন না। ধর্মের বুলি কপচে দু'বেলা দু'মুঠো ভাতও জুটিয়ে আপনি দিতে পারবেন না। কারণ বাস্তব এটাই যে আপনার-আমার শ্রম আজ 'বাজারের পণ্য'। বাস্তব এটাই যে শ্রমের শোষণেই পৃথিবী জোড়া সম্পদের এই প্রবল বৈষম্য। আর বাস্তব এটাও যে ধর্মশাস্ত্র বা অ্যাডাম স্মিথের 'দি ওয়েলথ অফ নেশনশ'র পুঁজিবাদী মুক্ত বাজারে নয়; দাড়ি বুড়োর 'দাস ক্যাপিটাল'ই বন্দী আছে অর্থনীতির সাম্য।

সোমবার, ৬ মে, ২০১৯

ছবির গল্প, গল্পের ছবি ~ মিহিররঞ্জন মন্ডল

Joseph Goebbels
      ১৯৩৩ সাল। বিখ্যাত " লাইফ " ফটোগ্রাফার আলফ্রেড আইজেনেস্তাদ এসেছেন জেনিভায়, লিগ অফ নেশনস্- এর পঞ্চদশ অধিবেশন কভার করতে। শুনলেন হিটলারের  প্রধান প্রচার সচিব ড. গোয়েবেলস্ তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গো নিয়ে উঠেছেন জেনিভার কার্লটন হোটেলে। তক্ষুনি তিনি কার্লটন হোটেলে ছুটলেন ছবি তুলতে। ওখানে গিয়ে দেখলেন গোয়েবেলস্ হোটেলের বাগানে একটা চেয়ারে বসে আছেন। কয়েকজনের সঙ্গে হেসে কথা বলছেন। পিছনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি আর হিটলারের দোভাষী ড. পল স্কিমিট। দূর থেকে তাঁর কয়েকটি ছবি তুললেন আইজেনেস্তাদ। এরপর একেবারে কাছে এগিয়ে এলেন তিনি গোয়েবেলস্-এর কিছু ছবি তুলতে।
     গোয়েবেলস্ তখন পাশে কারও দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন। হঠাৎ আইজেনেস্তাদের দিকে তাঁর চোখ পড়ল। মুহূর্তে তাঁর মুখেরভাব পাল্টে গেল। দুচোখে ফুটে উঠল তীব্র ঘৃণা আর বিদ্বেষ। চেয়ারের হাতলটা শক্ত করে চেপে ধরলেন। এই ইহুদিটা কিনা তাঁর ছবি তুলছে! 
     আইজেনেস্তাদ এই মুহূর্তটির জন্যই যেন এতক্ষণ অপেক্ষা করছিলেন। এই সেই ছবিতোলার প্রকৃষ্ট সময়, ডিসাইসিভ মোমেন্ট। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ক্যামেরার শাটারে হাত পড়ল। টুক করে ছবিটি তিনি তুলে ফেললেন। গোয়েবেলস্- এর কিছুই করার নেই। কারণ লাইফ পত্রিকার অ্যাক্রেডিটেড ফটোগ্রাফার আইজেনেস্তাদ। তাই ছবি তিনি তুলতেই পারেন। 
    ছবিটি সম্পর্কে অনেকপরে আইজেনেস্তাদ বলেছিলেন- " ছবিটার ক্যাপশন হওয়া উচিত ছিল- ফ্রম গোয়েবেলস্ উইথ লাভ। "
    আইজেনেস্তাদ ছিলেন জার্মান- ইহুদি। নাৎসিদের অত্যাচারে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন ইউরোপে।  তখন দলেদলে জার্মান আর অস্ট্রিয়ান ইহুদিরা দেশ ছেড়ে চলে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন সুইৎজারল্যান্ড, সোভিয়েট ইউনিয়ন ও আমেরিকায়।
 চিত্র সাংবাদিক হিসাবে আইজেনেস্তাদ অনেক আগে থেকেই পরিচিত ছিলেন। নাৎসি নেতাদের উপর ছিল তাঁর প্রচন্ড ঘৃণা।
     জোসেফ গোয়েবেলস্ নিজে ছিলেন উচ্চশিক্ষিত। হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জার্মান ফিলসফিতে ডক্টরেট করেছিলেন। ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন রুগ্ন। একটা পা ছিল খোঁড়া। শৈশবে পোলিও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ফলে এমন হয়েছিল। গোয়েবেলস্ ছিলেন প্রচন্ড উচ্চাভিলাষী। কিন্তু শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথে বাধা সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু তাঁর প্রচন্ড ইহুূদি বিদ্বেষের জন্য তিনি হিটলারের নজরে পড়েছিলেন। হিটলার তাঁকে করেছিলেন তাঁর প্রধান প্রচারসচিব।
     নাৎসিদের প্রচার সচিব হিসাবে গোয়েবেলস্- এর বৈশিষ্ট হল জার্মান জাতির শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তাঁর মতবাদ, ইহুদিদের ধ্বংস ও কমিউনিজম বিরোধিতা। তাঁর মতে জনসাধারণকে প্রভাবিত করতে হলে দরকার হলে মিথ্যা বলতে হবে এবং তা বারবার। তাহলে একসময় মিথ্যাটাই তাদের কাছে সত্য বলে মনে হবে। জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিতে পারতেন গোয়েবেলস্। জার্মান যুবসম্প্রদায়কে উদ্বুদ্ধ করতেন এভাবেই। 
     গোয়েবেলস্ জার্মান গণমাধ্যমগুলি দখল করে নিয়েছিলেন। দেশের সমস্ত পত্রপত্রিকাকে বাধ্য করা হয়েছিল নাৎসি মতবাদ প্রচার করতে। সে সময় সবে রেডিও এসেছে। গোয়েবেলস্ রেডিও সম্প্রচারের উপর একচেটিয়া অধিকার কায়েম করেছিলেন। যুদ্ধের সময় শোনা যেত হিটলার আর গোয়েবেলস্- এর রণহুঙ্কার। মিথ্যা প্রচার করে দেশের প্রকৃত অবস্থা জার্মান জনসাধারণকে জানতে দেওয়া হত না। এমনকি জার্মানি যখন যুদ্ধে পিছু হটছে তখনও নাৎসিদের সপক্ষে ক্রমাগত প্রচার করে গেছেন গোয়েবেলস্।
     ১৯৪৫ সাল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের শেষের দিকে মিত্রশক্তি তখন ক্রমাগত বার্লিন শহরের বুকে বোমাবর্ষণ করে ছারখার করে দিচ্ছে। জার্মানির পরাজয় আসন্ন। রেড আর্মি এগিয়ে আসছে। গোয়েবেলস্ ঠিক করলেন সপরিবারে তিনি আত্মহত্যা করবেন। কিছুতেই শত্রুর হাতে ধরা দেবেন না। ১লা মে স্ত্রী মাগডা আর ছয়টি ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে প্রবেশ করলেন মাটির নীচে হিটলারের বাঙ্কারে।
     ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা কিছুই জানে না। কী হতে চলেছে তাদের কোন ধারনাই নেই। হেলগা- ১২, হেলডেগার্ড- ১১, হেলমুট- ৯, হোলডি- ৮, হেডুউইগ- ৬ এবং  হেইডা - ৪....... নিজেদের ফুলের মতো  এই শিশুদের মেরে ফেলার নির্দেশ দিলেন তাদের নিজের বাবা- মা। মরফিন আর সাইনাইড দিয়ে শিশুদের মেরে ফেলা হল। পরে আত্মহত্যা করলেন গোয়েবেলস্ আর মাগদা।
     এভাবেই শেষ হল হিটলারের প্রধান প্রচারসচিব গোয়েবেলস্- এর গোটা পরিবার।

বুধবার, ১ মে, ২০১৯

এটা একটা ভূতের গল্প ~ আর্কাদি গাইদার

May Day
গল্পজুড়ে অনেকগুলো ভূত। ১৮৮৬ সালে হে মার্কেটে আট ঘন্টা কাজের দাবীতে যে শ্রমিকরা ডাইনামাইট ছুড়েছিলো, এবং তারপর যাদের ফাঁসি হয়, সেই শ্রমিকদের ভূত, ডাইনামাইটের ভূত, ফাঁসির দড়ির ভূত। ঠিক ১৯ বছর পরে আবার সেই ডাইনামাইট ব্যাবহার হবে রাশিয়াতে। আবার ফাঁসির দড়িতে ঝুলবে বহু লোক।
ইউরোপের এক ছোট্ট শহর স্যারাএভোতে এক নৈরাজ্যবাদী গুলি চালাবে অস্ট্রিয়ান রাজকুমার ফার্ডিনান্ডকে লক্ষ্য করে। এইরকমভাবেই শুরু হবে বিংশ শতাব্দীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসের সমাপ্তিও ঘটবে ঠিক ৮০ বছর পরে, এই একই শহরে। ইউটোপিয়া চেয়েছিলো যারা, তাদের দিকে আঙ্গুল তুলে হাসবে গোটা বিশ্ব। ইউগোস্লাভিয়া ভেঙে টুকরো হবে। ইউটোপিয়ার শবদেহের ওপর মেমোরিয়াল স্টোনের মতন জেগে থাকবে সারাএভোর ভূত।

শতাব্দীর শুরুর দিকেই, জার্মানিতে একদিন ব্রাউনশার্টরা পিটিয়ে মারবে রোজা লাক্সেমবার্গ নামক এক শীর্ণকায় মহিলাকে। তারপর তার দেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হবে। ওয়াইমার রিপাব্লিকের ভূত আকাশে উড়তে উড়তে দেখবে, রাইখস্ট্যাগে আগুন লেগেছে। যে রাতে আগুন লাগবে, তার পরেরদিনই বিভিন্ন খবরের কাগজে খবর হবে, যদিও আগুন লাগবার আগেই প্রেসে কাগজ ছাপা হয়ে গেছে। সেই আগুনের ভূত আবার জ্বলবে গ্যেরনিকায়, যখন ফ্রাঙ্কোকে সাহায্য করতে হিটলার আর মুসোলিনির বিমান বাহিনী গোটা শহরটিকে বোমায় মুড়ে দেবে, আর স্পেনের আকাশে উড়ে বেড়াবে কমিউনিষ্ট আর রিপাব্লিকানদের পোড়া ভূত। তবুও সেই আগুনের ক্ষিদে মিটবে না, আউশউইতজের ফার্নেসে সে জ্বলতে থাকবে ধিকিধিকি করে। আর ফার্নেসের বাইরের ঘরে পড়ে থাকবে ডাই করে রাখা চুল, যা ইহুদিদের মাথা থেকে কেটে জড়ো করা হয়েছে। ঠিক এরকম চুলের পাহাড় পাওয়া যাবে ইস্ট পাকিস্তানের পাকিস্তানি আর্মি ব্যারাকগুলোর মধ্যে। আশেপাশের গ্রামের মহিলাদের তুলে আনবার পরে দিনের পর দিন ধর্ষণ করবার আগে তাদের চুল কেটে রাখা হবে, যাতে নিজেদের চুল ব্যাবহার করে ঝুলে পড়ে নিজেরা আত্মহত্যা না করতে পারে। 

গ্রীস, ইতালি আর ইউগোস্লোভিয়ার পার্টিজান ব্রিগেডের হাতে যে রাইফেল দেখা যেতো, ঠিক সেইরকম রাইফেল দেখতে পাওয়া যাবে তেলেঙ্গানার কৃষক রমণীদের হাতে। তাদের ট্রেনিং দেবেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান আর্মি থেকে পালিয়ে আসা মেজর জয়পাল সিং। তারপর নিজামের রাজাকার আর পটেলের সেনাবাহিনীর হাতে খুন হয়ে যাওয়ার পর সেই রাইফেলের ভূতগুলো ঘুমিয়ে থাকবে বেশ কিছুদিন, যতক্ষন না আবার ভিয়েতনামে আধপেটা খেয়ে থাকা চাষীরা তাদের হাতে তুলে নেয়।

জার্মানিতে, ফ্রান্সে দুই আর তিনের দশকে রাস্তা জুড়ে যে মিছিল আর ব্যারিকেড দেখা যেতো ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে সেই মিছিল আর ব্যারিকেডের ভুতগুলো এলোমেলো হয়ে ঘুরে বেড়াবে ১৯৬৮ অবধি, যখন আবার একদল ছাত্র তাদের জীবন্ত করে তুলবে বার্লিন আর প্যারিসের ইউনিভার্সিটিগুলোর মধ্যে। 
বার্লিনের দেওয়াল ভেঙে ফেলবার পর স্যুভেনির হিসেবে ইটগুলো সংগ্রহ করবে বহু কালেক্টর। দেওয়ালের ভূত দীর্ঘশ্বাস ফেলবে। ইটগুলোর ভূতেরা ছত্রাখান সেনাবাহিনীর মতন ছড়িয়ে পড়বে ইউরোপ থেকে সারা পৃথিবী। ইউটোপিয়ার ভুত হাসবে, কারন নিজের অদৃষ্ট সে বহুদিন আগে বুঝেছিলো, যখন তার দেহথেকে পচা গন্ধ বেরোতে শুরু করেছে। কিন্তু দিশেহারা ইটের ভূতগুলোও সবাই শেষ হয়ে যাবে না। 
এরকমই একটা ইট ছোড়া হবে পুলিশকে লক্ষ্য করে, আমেরিকার সিয়াটেল শহরে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সামিটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিলে। 

এরকম বহু ব্যারিকেড, মিছিল, ইট, বুলেট, দেওয়াল, আগুন, কবিতা গানের ভূত উড়ে বেড়াবে পৃথিবীর আকাশে। মাঝেমধ্যে উঁকিঝুকি মারতে থাকবে হাউড পার্কে, কুর্দিস্তান, শাহবাগ চত্বরে, বেগুসারাইতে।

তারপর অনেক অনেকদিন পরে কোন এক পয়লা মে'র আগের রাতে, নিজেদের বন্ধ দরজার পেছনে নিশ্চিন্তে ঘুমোবে সব রাষ্ট্রনেতা, মিলিটারি জেনারেল, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মালিক,  পাদ্রী, ইমাম, পুরোহিতরা। বাইরে নিকষ কালো অন্ধকার। হাওয়া বইবে মৃদু তালে। হয়তো চাঁদ ঢাকা পড়বে মেঘের আড়ালে।
তারপর খুব মন দিয়ে কান পাতলে শোনা যাবে, কারা যেন ফিসফিস করছে। রাস্তায়, গলিতে, ডকে, কারখানায়, জনমানবশূন্য নদীর তীরে আস্তে আস্তে বাড়তে থাকবে ভৌতিক সমাগম। ফিসফিসানির আওয়াজ তীব্রতর হবে। শোনা যাবে পায়ে পা মিলিয়ে কারা যেন মার্চ করছে। নিঃশ্বাস ফেলছে। গান গাইছে। কোন এক পয়লা মে'র আগের রাতে ভৌতিক কাগজে, ভৌতিক কালিতে পৃথিবীর প্রতিটা মহাদেশে, প্রতিটা শহরে, প্রতিটা গ্রামে দেওয়ালে দেওয়ালে সাঁটা হবে ভৌতিক পোস্টার। অশরীরী অক্ষরে কারা যেন তাতে লিখে যাবে - আজাদি।