রবিবার, ৮ নভেম্বর, ২০২৬

প্রহ্লাদ কর্মকার ~ কৌশিক মজুমদার

গ্রামীন কালীপুজো। প্রহ্লাদ কর্মকার। ১৯৩৮। তেলরং। 

Uploaded Image

শিল্পী প্রহ্লাদ কর্মকারের নাম আজ আর তেমন কোথাও শুনতে পাওয়া যায় না। অল্প যে কজন তাঁর নাম বলেন তাঁরাও ' শিল্পী প্রকাশ কর্মকারের বাবা ' এইভাবে পরিচয় দিয়ে থাকেন । কিন্তু স্বল্পায়ু এই শিল্পী তাঁর জীবদ্দশায় এমন এক বিরল সম্মানের অধিকারী হয়েছিলেন যা সেই সময়ে তো বটেই, এই সময়েও অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়। 
তৎকালীন স্বাধীনতাপূর্ব ভারতে তিরিশ ও চল্লিশের দশকে কলকাতার গভর্নমেন্ট আর্ট স্কুলের ( এখন গভর্নমেন্ট আর্ট কলেজ) শিল্প শিক্ষক ছিলেন শিল্পী প্রহ্লাদ কর্মকার। মূলত ওয়েস্টার্ন একাডেমিক রীতিতে, তেলরঙে ছবি আঁকায় অসামান্য দক্ষতা ছিল তাঁর। কাঁকুড়গাছিতে তৈরি করেছিলেন নিজস্ব স্টুডিও যেখানে পশ্চিমী একাডেমিক ঘরানায় ন্যুড স্টাডির ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু নিজস্ব ছবি আঁকার ক্ষেত্রে প্রহ্লাদ কর্মকার একাডেমিক রীতি থেকে কিছুটা সরে এসে ইম্প্রেশনিস্ট ধারায় কিছুটা ইম্প্যাস্টো টেকনিকে রং প্রয়োগ করে ছবি আঁকতে পছন্দ করতেন। ১৯৩৮ সালে আঁকা তেমনই একটা ছবিতে দেখতে পাওয়া যায় রাতের অন্ধকারে উজ্জ্বল হ্যাজাকের আলোয় খোলা উঠোনে কালী পুজোর দৃশ্য। ধুপধুনোর ধোঁয়ায় কিছুটা আবছা হয়ে আসা বিগ্রহ, জোরালো কৃত্রিম আলো, অন্ধকার এবং লোকজন মিলিয়ে একটি নাটকীয় ছবি। এই ছবির আলো আঁধারির পরিবেশের মধ্যে যেমন রয়েছেন রেমব্রান্ট তেমন আবার ট্রিটমেন্টের মধ্যে আছেন ইম্প্রেশনিস্ট শিল্পী এদুয়ার মানে। অথচ সামগ্রিক ভাবে ছবিটির মধ্যে ভীষণ রকমের স্থানীয়, বাঙালী আইডেন্টিটি বর্তমান রয়েছে। 

১৯৪৬ সালে আমেরিকার লস এঞ্জেলেসে যে আন্তর্জাতিক আর্ট বিয়েনাল অনুষ্ঠিত হয়, সেখানে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী হিসেবে এই কালী পুজোর ছবিটি পাঠিয়েছিলেন প্রহ্লাদ কর্মকার। লস এঞ্জেলেসে ছবিটি তৃতীয় স্থান অধিকার করে এবং ব্রোঞ্জ পদক লাভ করে। ওই একই প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন জগদ্বিখ্যাত ফরাসী চিত্রকর মাতিস। এই খবর কলকাতার আর্ট কলেজে এসে পৌঁছনোর পর তৎকালীন অধ্যক্ষ অতুল বসু আলাদা করে সভা ডেকে সবার সামনে ঘোষণা করেন। আজকের দিনে আধুনিক শিল্পের ইতিহাসে মাতিসের স্থান কোথায় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু এই অসামান্য কীর্তির জন্য যাঁকে নিয়ে আমাদের গর্ব করার কথা 'হে মোর দুর্ভাগা দেশে ' প্রহ্লাদ কর্মকার একটি বিস্মৃতপ্রায় নাম। কেউ খবর রাখে না তাঁর ছবির, যার অধিকাংশই দেশভাগের সময় ঘটে যাওয়া দাঙ্গায় আগুনে পুড়ে শেষ হয়ে গেছে। 

 এই ছবিই ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার এক বছর আগে লস এঞ্জেলেসে ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছিল , যেখানে স্বর্ণ পদক পেয়েছিল মাতিসের ছবি। 

লেখার সঙ্গে ছবিটা দিলাম।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন