বুধবার, ১২ এপ্রিল, ২০১৭

রামনবমী , মহরম ও সেকুলারিজম ~ শ্যামাপ্রসাদ কুণ্ডু

আমার কিছু বন্ধু অনুযোগের সুরে আমাকে বলেছেন কেন আমি রামনবমীতে অস্ত্রহাতে মিছিলের নিন্দা করে কিছু লিখছি না। তারা সেকুলারিজম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। এ প্রশ্নও তুলেছেন যে মহরমের মিছিলে অস্ত্রহাতে যে উল্লাস দেখা যায় আমি তা সমর্থন করি কিনা। সন্দেহ নেই এসব প্রশ্ন সঙ্গত। আমি এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর জানি এমন দাবী করি না। জানিনা বলাই সঙ্গত। এইসব প্রশ্নের গভীরে ঢোকার আগে একটা সমীকরণের ব্যাপার বুঝে নেওয়া যাক। এক বন্ধুর বক্তব্যঃ মহরমে যদি অস্ত্র ব্যবহার সঙ্গত হয় তাহলে রামনবমীতে অস্ত্রহাতে মিছিল শোভাযাত্রা সঙ্গত কাজ। আপাত দৃষ্টিতে এই আংকিক যুক্তি অকাট্য। এ প্রসঙ্গে একটা গল্প মনে পড়ল। কার কাছে শুনেছিলাম মনে নেই। গল্পটা এইরকমঃ এক ভদ্রলোক রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাজারে যাচ্ছিলেন।স্কুলের কাছাকাছি এসে তিনি একটি চেনা ছেলেকে দেখতে পেলেন। মনে পড়ল সেদিন বার্ষিক ফল বেরোনোর কথা। ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন ,’ হ্যাঁরে গনশা, আজ রেজাল্ট বেরিয়েছে?’ সে কথার উত্তর না দিয়ে গনশা বলল,’ তোমাদের প্যালাও ফেল।‘ বল্বাহুল্য গনশা পরীক্ষায় পাশ করে নি কিন্তু প্যালাও ফেল হওয়াতে তার দুঃখ খানিক কমেছে।‘ এই ধরণের যুক্তি আমি খুব ভয় পাই। সেজন্য এসব বিষয়ে লিখতে সাহস করি না। আমরা খুশি হতাম প্যালা ও গনশা দুজনেই ভাল করে পড়াশোনা করে পাশ করলে।

গনশা ও প্যালাদের সংখ্যাধিক্যের দেশে খোলামনে আলোচনা করার বিপদ পদে পদে। একটা যুতসই নঙর্থক বিশেষণে দেগে দেবে গনশারা। এ বিপদ তো আছেই সারাজীবন মাথার উপর ঝুলে ডেমোক্লিশের তলোয়ারের মত। তবুও কথার ডালপালা গজাক। ভাই নিখিল চক্রবর্তী সেক্যুলারিজমের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছে। আমাদের সংবিধানের প্রস্তাবনায় সেক্যুলার কথাটা সংযোজিত করা আছে। এর প্রকৃত অর্থ কি এবং বাসবে কিভাবে এই নীতি পালিত হয় সে আলোচনায় পরের পর্বে আসব। আপাতত রামনবমী সবিনয়ে দুচারটি কথা বলতে চাই। আমার ভুল হলে সহৃদয় পাঠক/পাঠিকা সংশোধন করে দেবেন। কোনো এক চৈত্রমাসে নবমী তিথিতে মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রী রামচন্দ্র ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন। সে অনেক শতাব্দী আগেকার ধূসর অতীতের কথা। তিনি স্বয়ং বিষ্ণুর অবতার আর অবতারের জন্মবৃত্তান্ত রহস্যাবৃত হওয়াটাই স্বাভাবিক। মহারাজা দশরথের সন্তান কামনা পূর্ণ হচ্ছিল না। তাই ঋষির নির্দেশে তিনি যজ্ঞ করেন। এর পরের কাহিনী এই রামায়ন-মহাভারতের দেশের সকলেই জানেন।খুব স্বাভাবিক কারণেই সেই সময়ে প্রজারা খুশিতে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিলেন। তারপর গঙ্গাযমুনা দিয়ে কত যে জলস্রোত প্রবাহিত হয়ে গেছে তার ইয়ত্তা নেই কিন্তু প্রজন্মান্তরের মানুষের মনে রামসীতার কাহিনী পল্লবিত ও জীবন্ত রয়ে গেছে। আজও বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশ গড়, ঝারখন্ড এবং খোদ দিল্লীতে রামনবমী পালিত হয় আনন্দ, উল্লাশ ও নৃত্যগীতের সমারোহের মাধ্যমে। বাড়িতে বাড়িতে নানারকমের মিস্টান্ন তৈরি হয়, ভিয়েন বসে, অতিথির সমাগম হয়’ শোভাজাত্রা বার করা হয়, মেলা বসে গ্রামে গ্রামান্তরে। নতুন জামাকাপড় পরে বাচ্চারা আনন্দে মেতে ওঠে। রামের প্রশংসায় গীত রচনা হয়, গাওয়া হয় মহল্লায় মহল্লায়, গ্রামে গ্রামে। রামনবমী আসলে বিশ্বাসীদের কাছে এক অনন্ত খুশির উৎসব। বাঙালী হিন্দু ঐতিহ্যপরম্পরায় মাতৃপূজক। শক্তির উপাসক। চৈতন্য প্রভাবে ভক্তিরসে আপ্লুত হয়েছে কখনো। কিন্তু বাঙালী হিন্দু রামভক্ত নয় সেভাবে কোনোদিন। আমরা শিবের গাজন গাই ধান ভানতে, লাঠি খেলাও হয় কোথাও কোথাও কিন্তু রামভক্ত বলে বাঙ্গালীকে চিহ্নিত করা যাবে না। এ প্রসঙ্গ থাক। বলার কথা এই যে রামনবমী-র সঙ্গে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত মিছিল শোভাযাত্রা একেবারেই বে-মানান। ধর্মীয় আস্থা ও বিশ্বাসের ‘রাজনীতিকরণ’ ঘটলে তবেই এমন বিসদৃশ ব্যাপার ঘটতে পারে। এটা রাজনীতি-আরোপিত অস্মিতার বহিঃপ্রকাশ ছাড়া কিছুই নয়। বিপ্রতীপে মহরম একটি অতীব শোকাবহ ঘটনার বেদনার্ত স্মৃতি। শিয়া সম্প্রদায়ের নিষ্ঠাবান বিশ্বাসী মানুষেরা শোক পালন করেন নিজেকে কষ্ট দিয়ে। শোক পালনের সঙ্গেও অস্ত্র প্রদর্শন ও আস্ফালনের কোনো অরগানিক বা আবেগী সম্পর্ক নেই। এখন তো দেখতে পাই অনেকে মহরম পালন করেন ব্যন্ডপার্টী বাজিয়ে তুমুল উল্লাসের সঙ্গে। প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসীদের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু আমি বললেই বা কি হবে। কেউ কি শুনবেন বা ভাববেন? আমাদের হয়ে ভাবার ভাবনাটা যখন ধর্ম ব্যবসায়ী ও রাজনীতি ব্যবসায়ীদের হাতে আমরা স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায়, ভয়ে বা সম্ভ্রমে ছেড়ে দিই তখন এমনি হয়ে থাকে।

মহরম মাসটি শান্তির মাস হিসাবে চিহ্নিত। অনেকগুলি কথা বলার আছে কিন্তু আমি সে তথ্যের মধ্যে যাব না দুটো কারণে।প্রথমত আমি সব তথ্য জানি না। আবেগ তথ্য নির্ভর নয়। মানুষের ধর্মবিশ্বাস এবং আবেগ এমন এক দুর্জ্ঞেয় মানসভূমির উপর স্থিত যে যুক্তি সেখানে আঁচড় কাটতে পারে না। অনেকের সঙ্গে অনেকদুর পর্যন্ত কথা বলার পর এইরকম উত্তর শুনিঃ ‘ আপনি যা বলছেন তা ঠিক কথা কিন্তু আমি বিশ্বাস করি...’। খুব অসহায় লাগে তখন। এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত ও সজ্জন মানুষদেরও এইরকম কথা বলতে শুনি। আংটি পরা , মাদুলি বাবাদুলি বা ঠাকুমাদুলি পরা বা পৈতে প্রথার সমর্থকদের সঙ্গে যুক্তি তর্ক করে দেখেছি শেষ পর্যন্ত তারা বিশ্বাসের নীরেট পাঁচিল তুলে ‘ নো এন্ট্রি ‘ সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দিয়েছেন। খুব অসহায় বোধ করি। কপালে কতবার যে ঠোকা খেয়েছি তার ইয়ত্তা নাই। তরুণ তরুণী থেকে সব বয়সী বিশ্বাসীদের কাছ থেকেই একই রকম সমাদর(!) পেয়েছি। থেমে গেছি বন্ধুত্ব বজায় রাখার খাতিরে। এরা বেশিরভাগই ভাল মনের মানুষ। আমার দ্বিতীয় কারণ হল আমি একটি হিন্দু পরিবারে জন্মেছি। আমি ধর্ম বিশ্বাসী কিনা সে প্রশ্ন কেউ করে না। এটা আমার নির্বাচন নয় কিন্তু আমার এক ধরণের ID. ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে কিছু বলতে গেলেই একটা সমস্যা এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। আবার সেই NO ENTRY বোর্ড ঝোলানো। ‘বলি, তুমি কে হে আমাদের ধর্ম নিয়ে কথা বলার? কোরান হাদিস পড়েছো?’ যদি বলি পড়েছি প্রশ্ন আসেঃ ‘আরবিতে পড়েছো?’ না। আরবি জানি না। তাহলে চুপ করে থাকো। চুপ করে থাকি। আমি তো সংস্কৃতও জানি না এবং বেদ, গীতা, পুরান, উপনিষদ কিছুই সংস্কৃতে পড়ি নি। যারা রামনবমীতে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করার উস্কানিদাতা এবং মহরমে ঢাল তলোয়াল নিয়ে মিছিলের ফতোয়া দেন তারা সব পড়েছেন তো? বুঝেছেন তো? মুস্কিল খুব। এই প্রশ্ন করার অপরাধে আমাকে বিপদে পড়তে হতে পারে। কিন্তু প্যালা এবং গনশাদের কাছে প্রশ্নটাও তো করতে হবে। না হলে ওদের কি হবে? ফেলুদা হয়েই তো থাকতে হবে, তাই না? ঈশ্বর আল্লাহ বা গড-কে ঢাল এবং তলোয়ার হিসাবে ব্যবহার করলে আমার মত নীরেট বুদ্ধির মানুষ খুব মুস্কিলে পড়ে যায়।
 সেকুলারিজমের কথায় আসা যাক। শ্রী শ্রী রামকৃষ্ণ সুন্দর একটা কথা বলেছিলেনঃ যত মত তত পথ। আমি এই কথাটাই এখনকার প্রেক্ষিতে একটু প্যারাফ্রেজ করে ব্যবহার করার অনুমতি চেয়ে নিচ্ছি। এদেশেঃ যত দল তত রকম সেকুলারিজম। অন্যভাবেঃ যত বুদ্ধিমান মানুষ ততরকমের সেক্যুলার। সমস্যাটা একাধারে সেমান্টিক ও পেডাগজিক্যাল। পাঠক/পাঠিকাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারণ এই দুটি শব্দের আভিধানিক বাংলা প্রতিশব্দ আরো বেশি খটমট। কেন বলছি এই কথা সেটা বলি। আমাদের সংবিধানে SECULAR শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ধর্ম-নিরপেক্ষ অর্থে। কি অর্থ ধর্ম-নিরপেক্ষতার? রাষ্ট্রের কোনো ধর্ম থাকবে না অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা আনুগত্য দেখাবে না। ভাল কথা। সমস্যা এখানেও নয়। রাষ্ট্র তো একটি বিমূর্ত ধারণা। রাষ্ট্রের ইচ্ছা বা WILL ব্যক্ত ও প্রযুক্ত হয় বা প্রতিপালিত হয় সরকারের আইনকানুন ও দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় Governance বা State craft. বুঝতেই পারছেন ,সহৃদয় পাঠকপাঠিকা, সেমান্টিক ও পেডাগজিতে জড়িয়ে পড়ছে যুক্তি। কিন্তু এর সহজ ব্যাখ্যা দেবার ভাষা আমার জানা নেই। চেষ্টা করা যাক। এই সাংবিধানিক অর্থে আমাদের দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি সবাই ‘সেক্যুলার’। আমি কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরের সব দলগুলিকেই এই বৃত্তের মধ্যে ধরে নিচ্ছি। টেকনিক্যালি সবকটি দল( ধর্মভিত্তিক গোষ্ঠীগুলি বাদ দিয়ে ) সেক্যুলার বা আমাদের ভাষায় ধর্মনিরপেক্ষ। বি জে পি দলের সংবিধান খুলে দেখুন। মজাটা এবং সমস্যার জড়ও এইখানে। একটি শব্দ প্রয়োগের মাধ্যমেই অর্থপ্রাপ্ত হয়। এমনকি অভিধানেও একাধিক অর্থ দেওয়া থাকে। আমার এক ইংরাজী শিক্ষক বন্ধু দেবনাথ মৈত্রের সঙ্গে আজ প্রথম দুপুরে টেলিফোনে কথা হচ্ছিল BECAUSE শব্দটি Conjunction, adverb না preposition. ও কথা থাক। আমাদের প্যালা আর ওদের গনশা-র কাছে ‘সেক্যুলারিজম’ কথা বা অবধারণাটির মানে কি সেটা জানা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কাশ্মীরের ‘আজাদি’র সমর্থকদের সমর্থন করা সেক্যুলারিজম, তিনতালাকের বিরোধিতা করা ‘সেক্যুলারিজম’ নয় বা সকলের জন্য একই দেওয়ানী ও ব্যক্তিগত আইন প্রবর্তনের দাবী করা ‘সেক্যুলারিজম’ ইমাম ভাতা চালু করলে পুরোহিত ভাতাও দিতে হবে এই দাবী সেক্যুলার দাবী ইত্যাদি নানারকম প্রশ্ন উঠে আসে সামনে। এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে হবে নিরাবেগ সদর্থক যুক্তির মাধ্যমে। আইনের মধ্যে যদি কোনো বিশেষ ধর্মাবলম্বীদের প্রতি পক্ষপাত্মুলক কিছু থাকে সে আইন বদল করতে হবে। গীতা, মনুসমহিতা বা শরীয়তের প্রভাবে যদি রাষ্ট্রীয় আইন ও বিচার ব্যবস্থা পরিচালিত হয় সেই রাষ্ট্রকে প্রকৃত ‘সেক্যুলার’ রাষ্ট্রের আখ্যা দেওয়া যায় না। আমার তাই মনে হয়েছে আমাদের রাষ্ট্র সর্বধর্ম সমণ্বয়কারী রাষ্ট্র –প্রকৃত প্রস্তাবে সেক্যুলার নয়। ভারতীয় ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
ভাল লাগছে এই জেনে যে কিছু বন্ধু পড়ছেন কষ্ট করে এবং তাদের মতামত ব্যক্ত করছেন। এই বক্তব্যগুলি আমার কাছে খুব মুল্যবান। আমিও শিখছি। এটা অতি বিনয় নয়। এত কিছু জানার বোঝার আছে যে সবসময় তা নজরে পড়ে না। আন্তরিক ধন্যবাদ সকলকে।

আশঙ্কা করেছিলাম শব্দের ডালপালা বেরোবে ছড়িয়ে পড়ছে। প্রসঙ্গে আসা যাক। আমাদের সংবিধানে secular শব্দটি সংযুক্ত করা হয় সংবিধানের ৪২ তম সংশোধনীর মাধ্যমে। তার মানে এই নয় যে তার আগে আমাদের রাষ্ট্র সেক্যুলার ছিল না।১৯৪৭ সালে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ বিভাগ ঘটে।সে রক্তাক্ত ইতিহাসের ক্ষতচিহ্ন বেদনা এখনো আমাদের সামূহিক চেতনায় বহমান। খুব স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় সেই অস্থির টালমাটাল সময়ে ভারত রাষ্ট্রকে একটি হিন্দু রাষ্ট্র হিসাবে ঘোষণা করা যেত। হয়তো সেই সময়কার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সামূহিক আবেগের কাছে তা গ্রহণযোগ্যতাও লাভ করতো। কিন্তু আমাদের পরম সৌভাগ্য যে আমাদের সেই সময়কার জাতীয় নেতারা আজকের মত ক্ষীণদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলেন না। তাই তারা সংবিধানের প্রস্তাবনায় লিপিবদ্ধ না করেও মৌলিক অধিকার নির্দেশাত্মক নীতিমালার মাধ্যমে পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছিলেন আমাদের রাষ্ট্র থিওক্রাটিক নয় সেক্যুলার অর্থাৎ রাষ্ট্র কোনো বিশেষ ধর্মের পালন পোষণ করবে নাঃ সকল ধর্মাবলম্বী মানুষকে রাষ্ট্র সমান মর্যাদার সঙ্গে দেখবে। ছাড়াও আমার মতে যে কথাটি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ তা হল এই যে ধর্মবিশ্বাস পালন , অনুসরণ ইত্যাদি ব্যাপার একান্তই নাগরিকদের ব্যক্তিগত ব্যাপার। কেউ যদি এথেয়িস্ট বা নিরীশ্বরবাদী অথবা সংশয়বাদী , একেশ্বরবাদী বা দ্বৈতবাদী , অদ্বৈতবাদী বা বহুত্ববাদী হন সে তার একান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। স্বামী বিবেকানন্দ মায়াবতীতে অদ্বৈত আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন শেষের দিকে। না, এখানে আমি অন্য কোন ব্যক্তি নাম উদাহরণ হিসাবে উল্লেখ করবো না। বিপদ আছে খুব। ভক্তদের আমি খুব ভয় পাই। 

আরো একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আমাদের মনে রাখতে হবে।হিন্দু ধর্মশব্দ বা শব্দযুগল আমরা সচরাচর ব্যবহার করি বটে কিন্তু এটি কোনো কোডিফাইড ধর্ম হিসাবে গণ্য হয় না। মাঝে মাঝেই কিছু পরিমাণে হলেও হিন্ধু ধর্মকে কোডিফাই করার চেস্টা হয় নি এমন নয়। কিন্তু বৃহত্তর হিন্দু জীবনবোধ দ্বারা প্রভাবিত মানবগোষ্ঠীর কাছে তা গ্রাহ্য হয় নি। বিবেকানন্দ সহ অনেক এটি বর্ণনা করেছেন একটি জীবন দর্শন বা way of life. রূপে। অন্যান্য সেমেটিক অরগানাইজড ধর্মের মত এই হিন্দু ধর্মের একটিমাত্র সর্বজনমান্য ধর্মগ্রন্থ, একজন প্রফেট বা একজন মাত্র ঈশ্বর একটিমাত্র উপাসনালয় স্বীকৃত নয়। সুতরাং হিন্দুধর্ম রাষ্ট্রধর্ম রূপে গৃহীত হলে এদেশের ধর্ম সংকট আরো বেড়ে যেত। হিন্দু জীবন দর্শনের বৃহত্তর পরিধির মধ্যে একটা সামগ্রিক একাত্মকরণের প্রচেষ্টা যুগ পরম্পরায় চলে আসছে। বিরোধ হয়েছে, সংঘর্ষও হয়েছে আবার সমণ্বয়ের সাধনাও পাশাপাশি সমান্তরাল ভাবে চলেছে। মাঝে মাঝে কোডিফিকেশনের চেষ্টাও হয়েছে তবে সেটা গায়ের জোরে বা রাস্ট্রশক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে নয়। কেন আমাদের রাস্ট্রনেতারা সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণাটিকে বেছে নিয়েছেন সেটা বোঝার জন্যই এই কথাগুলি বলা। হিন্দুধর্মের তাত্বিক বা আধ্যাত্মিক ভিত্তিভূমি ব্যাখ্যা করার মত জ্ঞানবুদ্ধি আমার নেই। এখানে জন্মান্তরবাদ, জাতিভেদপ্রথা ইত্যাদি প্রসঙ্গ আমি তুলব না। এসব বিতর্কিত বিষয়ের অবতারণা এই আলোচনার পরিধির বাইরে। 
 
হিন্ধুধর্ম সেমিটিক রিলিজিওন থেকে চারিত্রে সম্পূর্ণ আলাদা। হিন্দুরা আত্মার পবিত্রতা (divinity of the soul)- বিশ্বাসী। হিন্দুর বিশ্ব দর্শন সেমিটিক রিলিজিওন-এর বিশ্ব দর্শন থেকে একেবারেই পৃথক। একজন প্রকৃত হিন্দুর কাছে কেউ অচ্ছুৎ নয়। বিশ্বের সকলেই তার নিকট আত্মীয় এবং অতিথিকে সে দেবতার মর্যাদা প্রদান করে। এমনকি দেবদেবীরাও হিন্দু জীবন দর্শনে বিশ্বাসীদের কাছে আত্মীয়- একেবারেঘরের মানুষ এতোটাই ঘরের মানুষ যে তাদের নিয়ে দিব্যি ঠাট্টাতামাশাও করা যায়। সেমিটিক রিলিজিওনে এমনটা কল্পনাও করা যায় না। 

প্রসঙ্গত দার্শনিক কবি রবীন্দ্রনাথেরভারততীর্থকবিতাটির প্রতি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই।হে মোর চিত্ত পুণ্য তীর্থে জাগো রে ধীরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে এইমহামানবের সাগরতীরেমিলিত হয়েছে পৃথিবীর সকল ধর্ম, জাতি, মত পথের মানুষ। মহাকবির ভাষায় ,’হেথায় আর্য হেথায় অনার্য হেথায় দ্রাবিড় চীন/ শক হুন দল পাঠান মোগল এক দেহে হল লীনহেথায় সবায় হবে মিলিবারে আনত শিরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে
রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের আত্মার স্বরূপ যথার্থ চিনেছিলেন। যেমন চিনেছিলেন ভারত-পথিক রাজা রামমোহন রায়, ভারতীয় নবজাগরণের প্রধান পুরোহিত বলে যাকে আমরা সশ্রদ্ধায় স্মরণ করি। এরা দুজনেই ব্রাহ্ম ছিলেন। কিন্তু ভারতাত্মার স্বরূপ চিনতে ভুল করেন নি এঁরা।ভারততীর্থকবিতায় রবীন্দ্রনাথ উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন এইভাবে-‘মা- অভিষেকে এস এস ত্বরা মঙ্গলঘট হয় নি যে ভরা/ সবার পরশে পবিত্র করা তীর্থ নীরে/ এই ভারতের মহামানবের সাগরতীরে। 

দুঃখের বিষয় মঙ্গলঘট এখনো ভরা হয় নি। আর কখনো হবে কিনা আমরা জানি না। ঢাল তলোয়ার আর লাঠি বন্দুক নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলেমঙ্গলঘটভরা হবে না। 
যে সমস্যকে কেন্দ্রে রেখে এই আলোচনা শুরু করেছিলাম তাহল রামনবমী, মহরম ও সেকুলারিজম। অস্ত্রহাতে রামনবমীর মিছিল এবং অস্ত্রহাতে মহরমের মিছিল একদিকে চলতে থাকুক আর অন্যদিকে রাষ্ট্র সেকুলারিজম প্রতিষ্ঠা করতে সচেষ্ট থাকুক তাহলেই একটা সমাধানের পথ আমরা খুঁজে পাব- এটা নেহাতই অতিসরলীক্রিত ধারণা। সেমিনারে সিম্পোসিয়ামে আলোচিত ও হাতালিত হতে পারে কিন্তু বাস্তবোচিত নয়। কেন নয় সেটা বুঝতে গেলে ইসলাম ধর্মের মুল কয়েকটি কথা বুঝতে চেষ্টা করতে হবে। পবিত্র কোরআন আল্লাহর পবিত্র বাণী ও নির্দেশ। মুসলিম মাত্রেই এই বিশ্বাসে অনড়। হাদিস বা হাদীথ আল্লাহর শেষ নবী হযরত মহম্মদের জীবনাচরণ ও উপদেশাবলীর সংকলন এবং শারিয়া বা শারীয়ত ইসলামিক আইন যা কোরানের নির্দেশ ও শিক্ষা অনুসারে রচিত। একজন বিশ্বাসী মুসলমানের জীবন এই তিনটি মূল আদর্শ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এখানে সেকুলারিজমের কোনো স্থান নেই। রবীন্দ্রনাথ বা কাজী নজরুল ইসলাম আবেগী উদারতায় হিন্দু মুসলিম ঐক্যের স্বপ্ন দেখতেই পারেন কিন্তু সেই কাজটা খুব সহজ নয় বাস্তবায়িত করা। শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব আইনের শাসনের আওতায় থেকে কিন্তু অরগানিক মিলন সম্ভব নয়। এই বাস্তব কথাটা আমাদের মানতে হবে। পছন্দ করি বা না করি। 
আর একটা কথা। ইদানীং সমাজে যে উগ্রতার প্রকাশ দেখা যাচ্ছে বিশেষ করে হিন্দুদের একাংশের মধ্যে তার পিছনে একটা পারসেপশানের ব্যাপার আছে। জওহরলাল নেহরুর আমল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত এদেশে সেকুলারিজমের নামে সংখ্যালঘু মুসলিম তোষণ করা হয়েছে এরকম একটা পারসেপশান বা বেদন বা কল্পমূর্তি বেশ কিছু মানুষের মধ্যে বদ্ধমূল হয়েছে। এদেশের মুসলিম ধর্মনেতারা এজন্য অনেকখানি দায়ী। তথাকথিত প্রগতিশীল ইন্টেলেকচুয়ালরাও এই ধারণা তৈরি করতে পরোক্ষে সাহায্য করেছেন। শাহবানু মামলা, কাশ্মীর নিয়ে এদের তাত্বিক অবস্থান , ইত্যাদি নানা বিষয়ে এদের অবস্থান ও কেন্দ্রীয় সরকারের দোদুল্যমানতা সবকিছু মিলে তালগোল পাকিয়ে এই পারসেপশান সৃষ্টি হয়েছে। যে কারণে অনেক সরল ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেও বলতে শুনি,’ না, বাপু এতখানি তোষণ ভাল নয়।‘ এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তিন তালাক ও বহুবিবাহের বিরুদ্ধে সংখ্যা গরিষ্ঠ মানুষের আপত্তি। শিক্ষিত ও সচেতন মুসলিমদের গরিষ্ঠ অংশ এসব সমর্থন করেন না কিন্তু প্রকাশ্যে তারা মত প্রকাশ করতে চান না। এক ধরণের ভয় কাজ করে। যুক্তি যেখানে শেষ হয় হিংসার শুরু সেখান থেকেই। এই যে সারা মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে নানারকম আতংকবাদী চক্র হিংসাত্মকো ধ্বংসাত্মক কাজ করে চলেছে তার বিরুদ্ধে মুসলিম ইন্টেলেকচ্যুয়াল বা সাধারণ শিক্ষিত মুসলিমদের বড় অংশ মুখ খোলেন না। এই কারণেও এমন একটা পারসেপশান তৈরি হয়েছে যে এরা বুঝি এসব সমর্থন করেন। ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় দেখবেন যে অধিকাংশ মুসলমান শান্তিপ্রিয় এবং তারা এসব মোটেই সমর্থন করেন না কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে ভয় পান। এই ভয় ভাঙ্গাতে পারেন মুসলিম সম্প্রদায়ের চিন্তাশীল মানুষরাই। হিন্দু বা অন্য কোনো ধর্মের লোকেরা এ বিষয়ে যত সমালোচনা করবেন ততই ভয়ের মানসিকতা , অপছন্দ ও হিংসার মানসিকতা আরো তীব্র হবে। আমি রাজনীতির নেতা ও ধর্মব্যবসায়ীদের উপর একেবারেই আস্থাশীল নই। তারা এই ভয়কে কাজে লাগিয়ে নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। এদেশের ইতিহাসে এর সবথেকে বড় উদাহরণ মহম্মদ আলি জিন্নাহ। আপাদমস্তক সেকুলার এই মানুষটি ক্ষমতার লোভ ও ইতিহাসের হাতছানি উপেক্ষা করতে না পেরে প্রতিষ্ঠা করে গেলেন এমন একটি ধর্ম ভিত্তিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের যার বিষময় ফল আজ পর্যন্ত এই উপমহাদেশের মানুষ ভোগ করে চলেছেন। দুটি গরীব ও উন্নয়শীল দেশ তার জাতীয় সম্পদের একটি মোটা অংশ ব্যয় করছে সেনাবাহিনী পোষার জন্য এবং গোলাবারুদ কেনার জন্য। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ মানুষের মঙ্গলের কাজে লাগানো যেত। 
আমাদের বেশিরভাগ মানুষের সেকুলারিজম skin-deep জানি না এর বাংলা কি কোরব। মীটিং, মিছিল, সেমিনার-সিম্পোসিয়াম, প্রবন্ধ কবিতায় আমরা বেশ অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু যেখানে ‘বাঘের ভয়’ সেখানে কিন্তু আমাদের সেকুলারিজমের ‘সন্ধ্যা’ নেমে আসে। এই দেখুন যারা গরু নিয়ে কথা বলতে বেশ উতসাহী তাদের কাছে শুয়োর ‘হারাম’। উচ্চারণ করতেই চাইবেন না। যারা গো-মাতার ভক্ত তাদের যদি বলেন প্রাচীন কালে আর্যরা গরুর মাংস খেত তেড়ে আসবেন তারা। অষ্টমীর সন্দিক্ষণে মোষ বলি দেবার রেওয়াজ আছে এবং তা হিন্দুরাই পালন করেন। রামায়ণ ও মহাভারতে দিগ্বিজয়ের শেষে বিজয়ী অশ ফিরে এলে তাকে বলি দেওয়া হোত ‘অশ্বমেধ’ যজ্ঞ করে। মেধ মানে তো বলি। সে মাংস কারা খেত?  কিন্তু কেউ শান্তভাবে শুনলে তবেই তো যুক্তির কথা বলা যায়!

আসুন আয়নায় মুখ দেখি নিজেদের। দেখা দরকার কে কোথায় দাঁড়িয়ে।সিংহাবলোকন । 
ইংরাজীতে একটা সুন্দর অর্থবহ শব্দ আছে panacea  যার অর্থ সর্বরোগহর একটি ওষুধ। সেকুলারিজম panacea নয়। রাষ্ট্রীয় আদর্শ আর বাস্তবের মানুষের বিশ্বাস ও আচরণ এক কদাচিত হয়। যেমন ‘মীটিং কা কাপড়া’ আলাদা তোলা থাকে তেমনি সেকুলারিজম ধারণাটি আমরা ব্যবহার করি তোলা জামা কাপড়ের মত। আমাদের জীবন চর্চায় ও চর্যায়, বিশ্বাসে ও আচরণে যতদিন না আমরা প্রকৃত সেকুলার হতে পারছি ততদিন নানা রূপে বিরোধের বীভৎস মুখ বারবার বেরিয়ে পড়বে। ভারতবর্ষ এক প্রাচীন উন্নত সভ্যতার ধারক বাহক ও উত্তরাধিকারী। এ দেশের  Ethos  (ইথোজ) বা মর্মচেতনায় উগ্র ধর্মান্ধতা নেই।ধর্মহীনতাও নেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে দলবদ্ধভাবে মানুষ এদেশে  এসেছে। সঙ্গে নিয়ে এসেছে নানান সভ্যতা, নানান কৃষ্টি । লুটেরারাও এসেছে। আবার লুটপাঠ করে অনেকে চলেও গেছে। বেশিরভাগই স্থায়ীভাবে এদেশের মাটিতে শিকড় গেড়েছে। বিভিন্ন সভ্যতা ও  ধর্মসংস্কৃতির মধ্যে মাঝে মাঝে লড়াই সংঘর্ষ হয়েছে আবার সমান্তরালভাবে একটা সমণ্বয়ের সাধনাও  নিরবচ্ছিন্নভাবে চলেছে। সব মিলিয়ে প্রায় চারশ বছরের মুসলমান শাসন বা পরবর্তী সময়ে একশো নব্বই বছরের ইংরেজ শাসনে এদেশের আপামর জনসাধারণ নিজেদের ঐতিহ্য ও ধর্ম সংস্কৃতি বজায় রাখতে  সক্ষম হয়েছে তার কারণ সনাতন ধর্মের বা হিন্দু জীবন দর্শনের অন্তর্নিহিত শক্তি ও আধ্যত্মিক সম্পদের বলে। যারা এই মূল ব্যাপারটা অনুধাবন করতে পারেন না তারাই হিন্ধু জীবন দর্শনকে আর একটি সেমিটিক রিলিজিওনের মত কোডিফাই করার ব্যর্থ চেষ্টা করেন। হিন্দু বা সনাতন দর্শনের শক্তি ও সামর্থ্য সম্পর্কে যাদের কোনো ধারণাই নেই তারাই এই জীবন দর্শনকে ‘হিন্দুয়ায়ন’ করার চেষ্টা করছেন। যদি এরা রাজনইতিক  শক্তির সহায়তায় এই মেটামরফসিস (metamorphosis) করে ফেলতে পারেন সেদিন ভারতবর্ষ আর ভারতবর্ষ থাকবে না। যেটুকু ইতিহাস বুঝি তাতে আমি নিশ্চিত এই অপচেষ্টা সফল হবে না। সতত প্রবহমানা নদীতে বাঁধ দেওয়া যায় না। 


এই আলোচনার উপসংহার টানা খুব কঠিন কাজ। আমার মনে হয়েছে কিছু কথা আছে যা আমাদের পীড়িত, ক্ষুব্ধ ও উদ্বেলিত করে কিন্তু সাহস করে বলতে চাই না। নানা ভদ্র শালীন কথার আড়ালে নিজেদের আসল চেহারা ঢেকে রাখি।অথচ বলা দরকার। আসুন নিজেদের প্রশ্ন করি আমাদের কতজনের খুব অন্তরঙ্গ ‘বিধর্মী’ বন্ধু আছে যাদের আনাগোনা আমাদের অন্দরমহল পর্যন্ত। আমাদের পড়শিকে কতটুকু চিনি আমরা? কতটুকুই বা চেনার চেষ্টা করি? 
নিজ নিজ ধর্মকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ধর্ম রূপে ভাবতে আমরা ভালবাসি। এতে আমি দোষ দেখি না কিন্তু অপরের ধর্ম ও জীবনদর্শন সম্পর্কে কিছু না জেনেবুঝে আলগা মন্তব্য করা থেকেই অনেক সমস্যার সৃষ্টি হয়।
অনেকের মুখেই শুনবেন ‘নেড়ে’,’মোছলমান’,’গরু খায়’,’একমাত্র জুতোয় সোজা’ –এই জাতীয় অবমাননাসুচক নিম্নরুচির মন্তব্য যা মানুষকে আহত করে। বিপ্রতীপে,’ কাফির’,’ হিদেন’,’পুতুল পুজক’,’ ‘মালাউন’ জাতীয় অপমানসূচক মন্তব্য। এমনকি তথাকথিত শিক্ষিত মানুষের মুখেও আমি এসব কথা শুনে থাকি। এখনো। বন্ধুত্ব হবে কি করে? বড়দিনের উৎসবে যোগ দিতে আমরা সানন্দে রাজী হই। ‘হ্যাপী ক্রিসমাস’ আনন্দের সঙ্গে বলি। মুসলিম দোকান গুলিতে বড়দিনের এবং নিউ ইয়ার’স এর কেক প্যাস্ট্রি বিক্রী হয় কিন্তু পুজোর ফুল বাতাসা প্রসাদ বিক্রি হয় না। সিমুই বিক্রী হয় হিন্দুর দোকানে, গরুর মাংস নয়। জবাই না বলির পাঁটা তা নিয়ে আমাদের মধ্যে তুলকালাম বেঁধে যায় । আমি একটা NSS Camp-এ যোগ দিতে গিয়ে এ সমস্যা ভোগ করেছি। রাশানালিটি কাজ করে না। অথচ ঐ ক্যাম্পে সকলেই ছিল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র।খুব বিষণ্ণ বোধ করি এসবে। তবুও এটা একটা বাস্তবতা। হিন্দুর পুজোয় যে পুতুলগুলি দেবদেবী রূপে আরাধিত এবং পূজিত হয় সেগুলি ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠা’র আগে এবং উৎসবের দিনক্ষণ পেরিয়ে যাবার পরে আবার পুতুল। কিন্তু ‘প্রাণ প্রতিষ্ঠার’ পরের সময়কালে এবং বিশ্বাসীর মানসভুমিতে তাঁরা দেবতা ও দেবী। এই ব্যাপারটা বুঝতে হবে এবং শ্রদ্ধা করতে হবে। ঠিক তেমনি বুঝতে হবে মহরম , ঈদ এবং হজ করা একজন মুসলমানের কাছে কতখানি মূল্যবান। বিশ্বাস এবং আবেগের সাথে যুক্তিতর্কের বিরোধ চিরন্তন। নানা সমস্যায় জর্জরিত মানুষের জীবন থেকে তাদের বিশ্বাস ও আবেগ জোর করে কেড়ে নেওয়া যাবে না। কত ভালই না হোত আমরা সকলেই যদি এইসব অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের রহস্যময় দুর্জ্ঞেয়তা থেকে মুক্ত হতে পারতাম! তা যখন হয় নি বা যতদিন না হচ্ছে ততদিন একে অপরের বিশ্বাস এবং আস্থাকে তাচ্ছিল্য ও ঘৃণা না করে বন্ধুর মত, সুপ্রতিবেশীর মত বোঝার চেষ্টা করা ভাল! একে অপরের উৎসবে শরীক হয়ে আনন্দ ভাগ করে নিতে পারতাম যদি খানিকটা বন্ধুত্ব বাড়ত! না, আমি রাজনৈতিক ইফতার বা রাজনৈতিক বিজয়া সম্মীলনীর কথা বলছি না। এসব ভন্ডামি তো হচ্ছেই। তাতে মনের দূরত্ব  কমল কই?
মাঠেঘাটে, চায়ের দোকানে, ট্রেনে বাসে নানান আড্ডায় একটা মুখরোচক আলোচনার বিষয় তিন তালাক এবং চারটি বিবাহ। মুসলিম শরীয়ত অনুমোদিত। কোডিফাইড সেমিটিক রিলিজিওনের একটি ইনট্রিনসিক বা মজ্জাগত সমস্যা হোল ধর্ম পুস্তকে যা লেখা আছে তা বদলানো যাবে না। কোরাআনের বাণী বা বাইবেলের বাণী ধ্রুব সত্য। অজর অক্ষয় অমর। অতএব অলঙ্ঘনীয়-sacrosanct
সমস্যার অন্যতম জড় এইখানে। মুস্কিল আরো আছে।বিভিন্ন পন্ডিত বিভিন্ন ব্যাখ্যা এনে হাজির করছেন। কার কথা শুনবেন? একই ধর্মের মধ্যে আবার নানা উপদল সম্পৃক্ত হয়ে আছে। শিয়া ও সুন্নির লড়াইতো একে অপরকে বিনাশ করার চেষ্টায় লিপ্ত। এক গোষ্ঠীর লোক অন্য গোষ্ঠীর মসজিদ ও  উপাসনালয় পর্যন্ত ধংস করে দিতে কুন্ঠিত হচ্ছে না। আলোচনায় এসব কথাও উঠে আসছে সমালোচনা ও হেয় করার মানসিকতা নিয়ে। বিরোধের ও অবিশ্বাসের ক্ষেত্র ক্রমেই বেড়ে চলেছে। 

পৃথিবীর অন্তত একুশটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে তিনতালাক বৈধ নয়। পাকিস্তানেও নয়। এক বিশেষ পরিস্থিতিতে চারটি বিয়ের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল ইসলাম ধর্মের জন্মের সূচনাকালে। অনেক অনেকদিন আগে থাকতেই সে পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। এই সব মান্ধাতার আমলের প্রথা যে এখনো টিকে আছে তার কারণ মুসলিম পুরুষদের কায়েমী স্বার্থ। 



তিস্তা ~ শুভদীপ দে

তিস্তা নদীতে একসময় না কি বজরা চলতো । গত বছর মোটামুটি এই সময়ে জলপাইগুড়ি গেছিলাম এক দিনের জন্য । বিকেলে হেঁটে হেঁটে তিস্তার খাত পার করার সময় দিব্যি যীশুখ্রিস্ট টাইপের ফিলিং হচ্ছিল । এত বড় নদী যীশুও হেঁটে পার করেন নি, আমি নিশ্চিত হয়ে বলতে পারি । একটাই শুধু ব্যাপার, তিস্তায় এক ফোঁটা জল ছিল না । না, সত্যিই, এক ফোঁটাও না । 
তিস্তাকে মেরে ফেললো কে ? এক কথায় বলতে গেলে 'উন্নয়ন' । দশ আনা মেরে ফেলেছে সিকিমের বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প । বাকি ছয় আনার জন্য দায়ী এরাজ্যের তিস্তা প্রকল্প । 
এখন পপুলার ধারণা হলো যে উন্নয়ন মানে সুন্দর নীল সাদা রং, জঙ্গল কেটে সাজানো বাগান আর গাছ কেটে রাস্তা । সেরকমই স্বাধীনতার পরপর দিয়ে উন্নয়নের ধারণা ছিল বড় বড় নদীবাঁধ, জঙ্গল কেটে চাষবাস । তো এই বাংলার শাসককুল ভাবলেন বঞ্চিত উত্তর বাংলার জন্য বড় কিছু করা যাউক । কি করা যাবে, কেন বড় ব্যারেজ । 
সেচ এর ইতিহাস সম্পর্কে যাদের একটু ধারণা আছে তারা জানবেন যে ট্রাডিশনালি কম বৃষ্টিপাতযুক্ত এলাকাতে খাল কেটে জল নিয়ে গিয়ে চাষবাস করতে হয় । যেসব অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় সেখানে পুকুরের জলে সেচই দস্তুর । উত্তরবঙ্গে কম বৃষ্টি হয়, এটা দিলীপ ঘোষের মত উচ্চশিক্ষিত লোকজনও দাবী করবেন না । কিন্তু ওই যাকে বলে উন্নয়ন করতে হবে । পুকুর টুকুর দিয়ে সেচ !! ম্যা গো !! পুকুর বুজিয়ে সেই জমিতে চাষবাস হোক, আর নতুন করে জমি অধিগ্রহণ করে সেই জমিতে ক্যানাল কাটা হোক । তবেই উন্নয়ন দেখা যাবে। প্রত্যেক গ্রামে তিনটে নতুন পুকুর কাটাতে হয়তো অনেক কম খরচ হতো, কিন্তু ঐটুকু উন্নয়ন তো দেখাই যাবে না ।
তাই ক্যানাল হলো, গজলডোবায় ব্যারেজ হল, আর তিস্তা নদী মরে গেল । জলপাইগুড়িতেই তিস্তার এই হাল, বাংলাদেশে কি হাল সেটা সহজেই অনুমেয় । তিস্তার নদীখাতের জলধারণ ক্ষমতাও এখন তলানিতে, ফি বছর তাই বন্যা হচ্ছে জলপাইগুড়িতে । তিস্তার অনেক গুলো শাখানদী উপনদী আছে দুই বাংলার উত্তরভাগে । তিস্তা মরে যাওয়ায় তারাও এক এক করে ঝিঙে তুলেছে । গোটা উত্তরবঙ্গের ভূগোল থেকে এক এক করে অনেকগুলো নদীকে মুছে দিয়েছে উন্নয়ন নামের দানব । উত্তরাখণ্ড এ প্রবল বিপর্যয় তো আমরা দেখেছি, এরপরে হয়তো সিকিম, তার পরেই উত্তরবঙ্গের টার্ন আসবে । 
নদী কারো বাপের সম্পত্তি নয়, চীন যেমন ব্রহ্মপুত্রের সব জল বাঁধ দিয়ে আটকে দিতে পারে না, সেটা তিস্তার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য । নদীকে তার নিজের মতো বইতে দেওয়া দরকার । সিকিমের বড় বড় ড্যাম গুলোকে বন্ধ করা হোক, গজলডোবার ব্যারেজ খুলে দেওয়া হোক । বৃষ্টিমুখর উত্তরবঙ্গে সেচের জন্য তিস্তার জলের দরকার নেই, বৃষ্টির জল ধরে রাখতে পারলে সেটা মোর দ্যান এনাফ । হ্যাঁ, এবং এটা বাংলাদেশের জন্যও সত্য । তাদের ক্ষেতে জল দেওয়ার জন্যও তিস্তা বা গঙ্গার জল খালে করে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই ।

সোমবার, ১০ এপ্রিল, ২০১৭

ইটালি - রোমে প্রথম দিন (১৮ই মে ২০১৬) - প্রদীপ্ত প্রতিম পাল

রোম-এর জন্য যখন Transavia এর টিকিট book  করলাম তখন সবচেয়ে যেটা ভাল লেগেছিল সেটা হল - যাওয়া আর আসার সময়সূচী। হল্যান্ডের রটারডাম থেকে সকাল ৭:০০ টায় বেরোনো আর ভেনিস থেকে রাত ১০:০০ টায় ওঠা। মানে যাওয়া ও আসার দিন দুটো কেই পূর্ণমাত্রায় পাওয়া। তবে ৭:০০ টায় প্লেন ধরা মানে ভোররাতে বেরোনো তাই রাত ৩:৩০ টেয় ট্যাক্সি বুক করে কিছুটা আশঙ্কায়  ছিলাম বই কি - ঠিক সময় পৌছতে পারব তো? কিন্তু এদেশে সেটা কোনো ব্যাপারই না। তাই ৪:০০ টায় বেরিয়ে আধঘন্টার মধ্যে এয়ারপোর্টে পৌছেও হাতে অজস্র সময়। তারপর মাত্র দু ঘন্টার যাত্রা শেষে পৌছে গেলাম রোমের Flumicino এয়ারপোর্টে। তবে এখান থেকে রোম শহর অনেক দুর। Terminal থেকে হাঁটতে-হাঁটতে স্টেশনে পৌছনোও নেহাত কম রাস্তা নয়। পরিষ্কার করে হলুদ সাইনে দিকনির্দেশ করা আছে - তাই ভাষার দুরত্ব থাকলেও চিন্তার কারণ নেই।  লিওনার্দো এক্সপ্রেসে ১৪ ইউরো করে দুজনের টিকিট কেটে উঠে পড়া গেল। পুরো ইটালিতে ১১ বছরের কম বয়েসী বাচ্ছার পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশনে টিকিট লাগে না - তাই শ্রীযুক্ত রীতংকর পাল "ব্যাম্বিনো" নিখরচায় ইটালি চষে ফেললেন।  বড়দের জন্য ১০০ মিনিটের মেট্রো টিকিট ১.৫০ আর ২৪ ঘন্টার টিকিটের খরচ পড়ে ৭ ইউরো - আনলিমিটেড যেকোনো লাইনে। রোমের মেট্রো কিছুটা অপরিচ্ছন্ন বটে তবে ৩-৪ মিনিট অন্তর গাড়ী আর শহরের সমস্ত দ্রষ্টব্যের কাছেই স্টেশন। এয়ারপোর্টে থেকে ট্রেনে ৪০ মিনিটের মধ্যে রোমা টার্মিনি স্টেশন আর সেখান থেকে ৫ মিনিটের হাঁটা দুরত্বে হোটেল ফিয়ামা পৌছতে বেশী কষ্ট করতে হয়নি। টার্মিনি স্টেশনের কাছাকাছি থাকার সুবিধে মেট্রো A, B লাইন এবং অগুন্তি বাস।  ইউরোপে সর্বত্রই ডবল বেড রুম নিয়েছি - আট বছরের ছেলের জন্য আলাদা করে চার্জ দিতে হয়নি। এক্সট্রা বালিস বা লেপ চাইলেই পাওয়া যায়। যাইহোক বাড়ী থেকে নিয়ে যাওয়া খাবার খেয়ে অল্প রেস্ট নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ইটালিতে নিজের ব্যাগ, ক্যামেরা সাবধান - প্রথম দিন মেট্রো স্টেশনে এস্কালেটরে নামবার সময় খেয়াল করেছিলাম পেছনের মহিলা আমার ব্যাকপ্যাকের চেন খুলছেন - ঘুরে দাঁড়াতে নির্লিপ্ত মুখ করে সরে গেলেন। আপাতদৃষ্টিতে কম সন্দেহভাজন মানুষই বিপজ্জনক।


প্রথম দিন - রোমকে গ্রেগরি পেক আর অড্রে হেপবার্ন জনপ্রিয় করে গেছেন রোমান হলিডের দৌলতে। মেট্রো ধরে স্পাগ্না স্টেশনে নেমে স্প্যানিস স্টেপ। পিয়াজ্জা ডি স্পাগ্না -র ফোয়ারা থেকে সোজা সিঁড়ি উঠে গেছে ওপরে ট্রিনিটা দেই মন্টি চার্চের দিকে। ১৭২৩-২৫ এ ফরাসি ডিপ্লোম্যাট বুরবঁ -স্প্যানিস এমব্যাসির অর্থানুকুল্যে তৈরি করে দেন স্বর্গের। সিঁড়ির নিচের ধাপে ও স্কোয়ারে লাইভ পারফর্মান্স হয়, তবে এখন রেনোভেশনের জন্য বন্ধ। সিঁড়ির ধাপে ধাপে মার্ক করা কোথায় বিখ্যাত হলিউড স্টারের (সোফিয়া লরেন, জিনা লোলো ব্রিজিদা) দাঁড়িয়ে ছবি তুলে গেছেন। ওপরে উঠে রোম শহরের ভিউ - এই প্রথম চর্মচক্ষুতে দেখলাম। এককালে মিশর, রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। সেখান থেকে আনা একটা ওবেলিক্স এখানে দাঁড়িয়ে। এমন ওবেলিক্স রোমের আরো অনেক চত্বরে (পিয়াজ্জা) দেখতে পেয়েছি। টিলার ওপরে চার্চ  - খুব বড়ো নয় তবে প্রাচীন (১৪৯৪)। কাঠের বেঞ্চ আর হাই অল্টার-এর মাঝে রেলিং এর বেড়াজাল। সিলিং ও পাশের ছোট অল্টার-এ পুরনো পেন্টিং দেখলাম। আর রয়েছে মার্বেলে তৈরি যীশুর মৃত্যু বা পিয়াতা।

এখান থেকে বেশ কিছুটা হেঁটে পিয়াজ্জা ডেল পোপোলো - বা পিপলস স্কোয়ার। এক সময় এখানে ফাঁসীও হয়েছে। চত্বরের একদিকে রোমের উত্তরের দরজা - শহরে ঢুকে মানুষ এখান থেকে প্রথম রোম দেখত। চত্বরের মাঝখানে ওবেলিক্স - দ্বিতীয় রামসেস এর আমলের - ওপরে সূক্ষ হায়ারোগ্লিফিক্সের inscriptionচত্বরের দুদিকে রোমান বীর আর জ্ঞানী মানুষের পাথরের মূর্তি। চতুর্থ দিকে চার্চ সান্তা মারিয়া দেল পোপোলো।  এবার ভিয়া দেল করসো ধরে হাঁটা - গন্তব্য প্যান্থিয়ন। তবে রোমের পথে পথে মনিমুক্ত ছড়িয়ে আছে - যেমন পুরনো ব্যারোক চার্চ, ফোয়ারা আবার অজস্র যুদ্ধের কাহিনী নিয়ে রোমান ওবেলিক্স পিয়াজ্জা কোলোনা বা দি মন্টেসিতোরিও। প্যান্থিয়নের আগে পথ ভুলেও কয়েকটা সৌধ দেখেছি - যেটা কোনোটা প্রিন্সেপ ঘাট কোনোটা রাজেন মল্লিকের বাড়ীর কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। প্যান্থিয়নে যখন পৌছলাম তখন ক্লান্তি চরমে উঠেছে, তবে এই সুপ্রাচীন অনবদ্য সৌধ দেখে মন ভরে গেল। ভিক্টোরিয়া মেমরিয়ালের মাঝের হল ঘরের মাপে ঘর - ডোমের ঠিক মাথার মাঝে একটা গোলাকার গর্তের মধ্যে দিয়ে সূর্যের আলো ভেতরে এসে পড়েছে।  ডোমের জ্যামিতিক কাজ ২০০০ বছর ধরে অবিকৃত - তেমনি সুন্দর আর রঙ্গীন মেঝের মার্বেল। আগে সুপ্রাচীন (এনসিয়েন্ট) রোমে দেবতার মন্দির হিসেবে ব্যবহার হলেও পরে ক্রিশ্চিয়ানরা চার্চে পরিবর্তন করে ফেলে। রেনেসাঁ যুগে সমাধি দেওয়ার জন্যও ব্যবহার করা হয়েছে - যেমন  শীল্পি রাফায়েল। বাইরের পোর্টিকোতে মোটা গ্রানাইটের থাম। প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে প্যান্থিয়ন দেখে বাইরে বেরিয়ে ক্ষিদে আর ক্লান্তি কাটাতে সামনের ফোয়ারার ধারে বসে বাড়ী থেকে আনা চিলিচিকেন আর চাউ দিয়ে পেট ভর্তি করে খাওয়া। দেহের ব্যাটারি রিচার্জ করে এগোলাম পিয়াজ্জা নাভোনা'র দিকে। চত্বরের মাঝে ওবেলিক্স আর ফোয়ারার মাঝখানে শ্বেত পাথরের সৌধ - Fountain of the Four Rivers - চারকোনে চারজন মানুষ চার মহাদেশের নদী সভ্যতার প্রতিভু। এদের মধ্যে অবশ্যই একটা আমাদের গঙ্গা (এশিয়া)। তাদের মাঝে সিংহ আর ঘোড়ার জল খাওয়া। পরের গন্তব্য Fountain of Trevi. এর সৌন্দর্য্য বিস্ময়কর, অপূর্ব। ফোয়ারার পাশে তিনটে স্তরে মানুষ বসে হাঁ করে সেই সৌন্দর্য্য দেখছে, তারপর উল্টোমুখে কাঁধের ওপর দিয়ে জলে পয়সা ছুঁড়ে দিয়ে বলছে আবার যেন এখানে ফিরে আসি। একটা প্রবাদও আছে তার সঙ্গে - প্রাচীন রোমে খুব জলকষ্ট ছিল। বাচ্চা একটি মেয়ে ১৩ কিলোমিটার দুরে মিষ্টি জলের উতস খুঁজে দিলে - অ্যাকোয়াডাক্টের মাধ্যমে সেই জল এখানে এনে ফেলা হয় আর সেই ছোট মেয়ের কথা মাথায় রেখে নাম দেওয়া হয় - অ্যাকোয়া ভার্গো। ইচ্ছে ছিল আর একবার এসে রাতের ট্রেভির সৌন্দর্য্য দেখে যাব। সে আর এযাত্রায় হলো না - যাইহোক এর টানে আবার রোম আসার ইচ্ছে রইল।




দ্বিতীয় দফায় আবার বেরোনো গেল বিকেল বেলায়। রোমে এসে এখনো কলোসিয়ামের মুখদর্শন করিনি ভাবতেও কি রকম লাগে। আর এই মে মাসে রাত ৯:০০টা পর্যন্ত দিনের আলো - সুতরাং চিন্তা কি? B-লাইনে কলসিয়াম মাত্র খানতিনেক স্টপেজ। স্টেশনের বাইরে বেরতেই সেই বিশাল স্ট্রাকচার - যা ছোটবেলা থেকে ইতিহাস বই এর পাতায় দেখে আসছি। তবে আজ ভেতরে ঢুকবো না, বাইরে থেকে দেখে রোমান ফোরামের রাস্তায় কিছুটা এগিয়ে পাহাড়ের ওপর রোমে ক্রিশ্চিয়ানদের প্রথম যুগের চার্চ (Palantine Hill) দেখে এগোলাম ইমানুয়েল ভিত্তোরিয়ানোর দিকে। আকারের জন্য একে টাইপরাইটার বলে। তখন শেষ বিকালের সূর্যাস্তের আলো সোনার মত সেই সৌধের ওপর পড়ছে। সময়টাকে স্মরনীয় করে রাখতে কিছুক্ষন বসে বসে সেই দৃশ্য দেখলাম। পেছনে প্রাচীন রোমের বাজার আর মিনার্ভা মন্দিরের ভগ্নাবশেষ আর সামনে সংঘবদ্ধ ইটালি'র প্রথম সম্রাট ভিক্টর ইমানুয়েল'র সম্মানে তৈরি সৌধ। টাইপরাইটারের দাঁড়ি গুলো ১৬ টা ইটালিয় শহরের প্রতিভু। মাথার ওপর ঘোড়ায় চড়া Unity Liberty'র প্রতীক। হেঁটে আবার ফিরে এলাম কলোসিয়াম চত্বরে। সন্ধের আলো একটা একটা করে জ্বলতে শুরু করেছে। হাতে ক্যামেরা নিয়ে ট্যুরিস্টরা অপেক্ষা করছে আর আছে স্বভাষী বাংলাদেশী হকার রা। অল্প পয়সার সেল্ফি স্টিক, LED টর্চ, রুমাল, স্কার্ফ - ট্যুরিস্টরা দর দাম করে কিনছেও। কিন্তু এই বেচে ক'পয়সা হয়? দেশ থেকে এতদূর এসে - পেটের ভাত জোটানোর জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম - সঞ্চয় তো অনেক দূরের কথা। পরে খবর নিয়ে জেনেছিলাম ইটালি বেআইনি অভিবাসী দের স্বর্গ। যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যএশিয়া, আফ্রিকা থেকে দলে দলে মানুষ এখানে আসছে - তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পথে রুটিরুজির টানে ঢুকছে দরিদ্র তৃতীয় বিশ্বের লোকও। ইটালির কলে কারখনায় অল্প পয়সার চাকরি - দেশ থেকে পরিবারকে এখানে আনবার সামর্থ্যও থাকেনা। ইটালিয়ান শ্রমজীবি মহিলা'রাও খুব কর্মপটু, সুতরাং একটু ভুলচুক হলে কাজ হারাতেও দেরি হবেনা।

রবিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৭

বন্ধ করো ~ ঊর্মি বসু



ছোট্টো হাতের মুঠোয় মানায়
টাটকা ফুলের তোড়া;
কে তুলে দেয় ওদের হাতে
খড়্গ-কৃপান-ছোরা?

ওদের হাতে দাওনা পুতুল,
রঙিন ছবির বই~
রাম-দা হাতে মিছিল করা
মানাচ্ছিল কই?

এমন তোমার ধর্ম খেলা
এমনি রাজনীতি,
শিশুর হাতে অস্ত্র দিয়ে
বাড়াতে চাও ভীতি।

ওরাই গাছের ছোট্টো চারা
সবুজ প্রাণের বানী--
বন্ধ করো চোখ রাঙানো
অযথা প্রাণহানি।

শুক্রবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৭

মিথ্যে যুগ ~ সমৃদ্ধ দত্ত

এই নিন শুনুন।

#  'স্বামী বিবেকান্দের স্বকণ্ঠের বাণী। অবশেষে খুঁজে পাওয়া গিয়েছে সেই মহান মনীষীর কণ্ঠস্বর। শিকাগোর ধর্মমহাসভার সেই কালজয়ী বক্তৃতাটি। ভালো লাগলে শেয়ার করুন।'
#  'আনন্দ সংবাদ। ভারতবাসী হিসাবে আমরা গর্বিত। ইউনিসেফ ভারতের জাতীয় সংগীত জনগণমনকে বিশ্বের সেরা জাতীয় সংগীতে ভূষিত করেছে। প্রথম পুরস্কার পেয়েছে আমাদের জাতীয় সংগীত। ভারত মাতা কি জয়। এখনই শেয়ার করুন। '
#  'ভ্যালেনটাইন ডে পালন করার উচ্ছ্বাসে যারা ভেসে যাচ্ছে, তারা কি একবারও মনে রাখতে পারে না যে আজ এই ১৪ ফেব্রয়ারিতে মহান বিপ্লবী ভগৎ সিং, সুখদেব আর রাজগুরুর ফাঁসি হয়েছিল? এই মহাপুরুষদের বলিদান দিবসকে যারা ভুলে গিয়েছে তাদের ধিক্কার জানান। প্রত্যেকে শেয়ার করুন। '
#  'পাকিস্তানকে সমর্থন করে চীন তিব্বতে ব্রহ্মপুত্র নদীর জল ভারতে আসা বন্ধ করে দিয়েছে। আপনাদের কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি এবার থেকে চীনের জিনিস কেউ কিনবেন না। চীন দেওয়ালিতে ৫৫ হাজার কোটি টাকার ব্যাবসা করে ভারতে। আর বছরে দেড় লক্ষ কোটি টাকা ভারত থেকে আয় করে। তাই বয়কট করুক চীনকে। যত পারেন শেয়ার করুন আর গর্বের সঙ্গে বলুন আপনি ভারতীয়। '
#যে কোনও অজানা কবিতার নীচে লেখা হয় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। যে কোনও অজানা কোটেশনের নীচে বলা হয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। 

'পোস্ট ট্রুথ' যুগে সকলকে স্বাগত। ২০১৬ সালের অক্সফোর্ড ডিকশনারির ওয়ার্ড অফ দ্য ইয়ার নির্বাচিত হয়েছে এই শব্দটি। 
পোস্ট ট্রুথ। 
আমাদের এই ফেসবুক, হোয়াটস অ্যাপ, ট্যুইটারের এই সময় অথবা যুগকে পশ্চিমি দেশগুলিতে নতুন নামকরণ করা হয়েছে পোস্ট ট্রুথ যুগ। অর্থাৎ সত্যের পরবর্তী যুগ। সোজা কথা মিথ্যার যুগ। অর্ধ সত্য, মিথ্যা, ভুল ইতিহাস, আসল ঘটনাকে বিকৃত করে পরিবেশন এবং উচ্চকিত কণ্ঠে বারংবার মিথ্যা সম্প্রচারের নামই হল পোস্ট ট্রুথ।

 হিটলার, মুসোলিনি এরকম করতেন। কিন্তু তখন প্রযুক্তি ছিল না। এই মারাত্মক শক্তিশালী সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। এক লহমায় এক নিমেষে কোটি কোটি মানুষের কাছে একটিমাত্র আঙুলের খোঁচায় শেয়ার করে অসত্য তথ্য প্রচার করার ভয়ংকর সুযোগটিই ছিল না। এখন আছে। তাই মানবসভ্যতার সবথেকে বিপজ্জনক একটি অধ্যায় উপস্থিত হয়েছে। সেটিই হল পোস্ট ট্রুথ যুগ। 

কাকে বলে পোস্ট ট্রুথ সিনড্রোম? আচমকাই দেখবেন এই সোশ্যাল মিডিয়ার হাত ধরে তথ্য দেওয়ার নাম করে অনবরত মিথ্যা সংবাদ ও ভুল তথ্য পরিবেশিত হয়ে চলেছে নিরন্তর। 

উপরে যে উদাহরণগুলি লেখা হয়েছে সেরকম মেসেজ বা পোস্ট হোয়াটস অ্যাপে কিংবা ফেসবুকে বিগত কয়েক বছর ধরে প্রায় সকলেই পেয়েছেন। এখনও চলছে। কিন্তু আমরা কেউই ওই মেসেজ নিজেরা তৈরি করিনি। সবথেকে উদ্বেগজনক বিষয় হল আমরা জানিও না কে মেসেজগুলির লেখক বা রচয়িতা। 

আমরা পেয়েছি। এবং পেয়েই চলেছি এরকম হাজারো ভুল তথ্য, মিথ্যা সংবাদ ও সম্পূর্ণ মনগড়া কাহিনির পরিসংখ্যান সংবলিত জ্ঞান। তার মানে হল আমাদের মধ্যেই বহু মানুষ এগুলি নিয়ম করে পেয়েই শেয়ারও করছেন। অর্থাৎ যে বা যারা এসব ভুল তথ্য ছড়ানোর পরিকল্পনা করেছিল তারা সফল। কারণ একবার পোস্ট হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলি লক্ষ কোটি শেয়ার হয়ে যাচ্ছে। 

এবার একটা বড় অংশ সেগুলি বিশ্বাস করছে এবং শেয়ারও করছে। আবার আর একটি অংশ বিরক্ত হচ্ছে, শেয়ার করছে না। কিন্তু, এই শেয়ার যারা করছে না তারা পালটা যুক্তি বা আসল সত্য অথবা প্রকৃত পরিসংখ্যানটা দেওয়ার মতো উদ্যোগ নিচ্ছে না এবং সেটা সম্ভবও হচ্ছে না। কারণ, প্রকৃত সত্য ও তথ্যের উৎস অর্থাৎ সোর্স গুটেনবার্গের বাইবেল থেকে আজ পর্যন্ত মেনে চলা হচ্ছে ছাপানো অক্ষরকে। 

সেটি বই হতে পারে। রিপোর্ট হতে পারে। এনসাইক্লোপিডিয়া কিংবা ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে থাকা কোনও গবেষণামূলক স্বীকৃত প্রামাণ্য নথি হতে পারে। অর্থাৎ এতদিন পর্যন্ত যে কোনও ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত প্রমাণিত সত্য তথা স্বীকৃত পরিসংখ্যানকেই ধ্রুবসত্য তথা রেফারেন্স হিসাবে মেনে নিয়েছি। 

এখন এই সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে সেটি হচ্ছে না। 
এখন সবটাই অনলাইন। গুগল সার্চ থেকে অসংখ্য ওয়েবসাইট। আর ঠিক এই সুযোগটাই নেওয়া হচ্ছে পোস্ট ট্রুথে। কারণ ইন্টারনেট দুনিয়ায় সবথেকে দ্রুত যা বাড়ছে সেটি হল 'ফেক নিউজ' ওয়েবসাইট। অর্থাৎ আস্ত মিথ্যা তথ্য দেওয়ার স্বীকৃত ওয়েবসাইট। মিথ্যা তথ্যের স্বীকৃত ওয়েবসাইট বলা হলে মনে হতে পারে এটা একটা অক্সিমোরন। অর্থাৎ সোনার পাথরবাটি টাইপ শুনতে। কিন্তু ঘটনা তাই। কারণ, এগুলো মোটেই ব্লক করা হয়নি। রমরম করে চলছে। পেজ খুলে গেলে কারও পক্ষেই বোঝা সম্ভব নয় যে ওই সাইট মিথ্যা সংবাদের ওয়েবসাইট। ফেক নিউজ ওয়েবসাইটই এখন সবথেকে বাণিজ্যিকভাবেও লাভজনক। 

সর্বাগ্রে এই পোস্ট ট্রুথ যুগের সুবিধা নিতে নেমে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলি। কেন গোটা দুনিয়ায় এখন পোস্ট ট্রুথ নিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে? কারণ দুটি ঘটনা। এবং দুটিই শিহরন জাগানো ।

প্রথমত ব্রেক্সিট। অর্থাৎ ব্রিটেন ইওরোপীয়ান ইউনিয়নে থাকবে কি না তা নিয়ে যখন গণভোট হয়েছিল তখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রবক্তারা ব্রিটেন জুড়ে যে প্রচারটি সবথেকে তুঙ্গে তুলেছিল সেটি হল ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার জন্য ব্রিটেনকে প্রতি সপ্তাহে ৩৫০ মিলিয়ন পাউন্ড আর্থিক গুণাগার দিতে হয়। 
ব্রিটেন যদি ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসে, তাহ঩লে ওই টাকা বেঁচে যাবে এবং সেই টাকা ব্যবহার করা হবে স্বাস্থ্য প঩রিষেবায়। এই প্রচারে গোটা ব্রিটেন উত্তাল হয়েছিল। স্বাভাবিকভাবেই যুব সম্প্রদায় এই আমাদের টাকায় বাকি ইউরোপকে পোষা হচ্ছে বার্তায় ক্ষেপে যায়। অথচ ঘটনা হল গোটা প্রচারটিই মিথ্যা ছিল। পরিসংখ্যানগত কারসাজি। কারণ, পরিবর্তে ব্রিটেন কত টাকা ইউনিয়ন থেকে ফেরত পায় সেটা বলা হয়নি। অথচ ওরকম একাধিক ভুল ও মিথ্যা প্রচারে ভর করেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে আসার সমর্থক দলগুলি জয়ী হয়ে গেল। ব্রেক্সিট জয়ী হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনকে ইস্তফা দিতে হয়। 

আর তারপরই পোস্ট ট্রুথের জয়ের সবথেকে বৃহত্তম উদাহরণ ডোনাল্ড ট্রাম্প। ট্রাম্প অসংখ্য মিথ্যা প্রচার করেছেন। তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ার সেনাবাহিনী লাগাতার ভুল পরিসংখ্যান, বিকৃত তথ্য, মনগড়া ইতিহাস ইত্যাদি প্রচার করে গিয়েছে। তার মধ্যে সবথেকে মারাত্মক হল বারাক ওবামাই নাকি আইএসআইএস নামক জঙ্গি সংগঠনটি গঠন করেছিলেন। তিনি এবং হিলারি ক্লিনটন ওই আইএসআইএস তৈরিতে গোপন সাহায্য করেছিলেন। এটি একটি ছোট্ট উদাহরণ। 
আমেরিকার ডিফেন্স, আমেরিকার চিকিৎসা পরিষেবা, অভিবাসন নীতি, আমেরিকার বাণিজ্য ইত্যাদি সম্পর্কে তাবৎ অসত্য প্রচার করে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা লাগাতার ছড়ানো হয়েছে যে আমেরিকা ভয়াবহ বিপদের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। বাঁচার জন্য ট্রাম্পকে দরকার। আমেরিকানের একাংশ ধরেই নিয়েছিলেন এসবই হল ট্রাম্পের অপরিণতমনস্ক আচরণ ও প্রশাসন সম্পর্কে অনভিজ্ঞতা। তাই তাঁরা পাত্তাই দেননি। কিন্তু বোঝা যায়নি বৃহৎ অংশের সেভাবে দেশ কাল সরকার ইতিহাসের খবর না রাখা শ্রেণি ও যুব সম্প্রদায় ওইসব প্রচারে বিশ্বাস করেছে। এবং দেশভক্তির আবেগে সাড়া দিয়ে তারা ঢেলে সমর্থন করেছে। পোস্ট ট্রুথ হল 

ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতায় আসার অন্যতম উপকরণ। এই দুটি ঘটনা প্রমাণ করছেযে কীভাবে রাজনৈতিক দল বা নেতাদের একটি কমন প্যাটার্ন গোটা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছে। তাই লক্ষ করলে দেখা যাবে গোটা বিশ্বেই একে একে গুরুত্বপূর্ণ গণতান্ত্রিক দেশগুলিকে অতি দক্ষিণপন্থী একনায়কসদৃশ নেতাদের আবির্ভাব হচ্ছে। এবং সেই নেতাটি দলের থেকে বড় হয়ে উঠছেন। তাঁদের দেখেই মানুষ সমর্থন করছেন। দল দেখে নয়। তাঁরাই নায়ক হয়ে উঠছেন। এই প্যাটার্নটি হল বিরোধীদের সম্পর্কে অসত্য প্রচার, লাগাতার সোশ্যাল মিডিয়ায় জাতীয়তাবাদ তথা দেশের সম্পর্কে অতি আবেগকে উসকে দেওয়া এবং ইতিহাসকে বিকৃত করে প্রচার করা। 

রাশিয়ায় ভ্লাদিমির পুতিন, আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, জাপানের শিনজো অ্যাবে, ভারতের নরেন্দ্র মোদি, ব্রিটেনের থেরেসা মে যেমন কমবেশি এরকমই একক ক্ষমতা সম্পন্ন লার্জার দ্যান পার্টি ইমেজ নিয়ে গদিতে বসেছেন, সেরকমই আগামীদিনে ফ্রান্সে আসতে চলেছেন অতি দক্ষিণপন্থী ফ্রাংকো ফিলোঁ অথবা মেরিন লে প্যন। এই যুগ মানুষকে স্বার্থপর দৈত্য হতে পাঠ দিচ্ছে। তাই স্লোগান তৈরি হচ্ছে আমেরিকা ফার্স্ট, ফ্রান্স ফার্স্ট, রাশিয়া ফার্স্ট। 

পোস্ট ট্রুথ প্রবণতার বৈশিষ্ট্য কী? এটি সত্যকে ঢেকে দেয় মিথ্যে দিয়ে। সততার থেকে বড় হয়ে ওঠে আবেগ। ব্যক্তিগত বিশ্লেষণের তাৎক্ষণিক প্রচার বা ব্যাখ্যা প্রমাণিত সত্য বা ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ঘটনাকে মিথ্যা প্রমাণ করার চেষ্টা করে। একজন বা দুজনের যুক্তিবাদী ও প্রমাণিত অভিমতকে চাপা দিয়ে দেয় অনেকের চিৎকার। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কোনও তথ্য শেয়ার করলে তার সোর্স কী জানানোর কোনও দায় থাকে না। মুহূর্তে সেটি আরও শেয়ার হয়ে যাবে। এর কারণ আধুনিক যুগটি ছাপানো জিনিস পড়া কমিয়ে দিয়েছে। সবথেকে বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নতুন প্রজন্ম। যাদের কোনও স্মৃতি বা অতীত নেই। সিলেবাসের বাইরের বই পড়া অধীত বিদ্যা বা অভিজ্ঞতা প্রায় নেই। তাই দেশভাগ, তিনটি যুদ্ধ, নকশাল আন্দোলন, ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থা কিংবা ১৯৯১ সালের উদার অর্থনীতি শুরু হওয়া, ১৯৯২ সালের বাবরি মসজিদ ভাঙা ইত্যাদি কোনও বিষয়েই কোনও অভিজ্ঞতাও নেই। স্মৃতিও নেই। তাই এই প্রজন্মের একটি বড় অংশের কাছে যে কোনও ঘটনাই যে কোনও আকারে পাঠিয়ে দিলেই তারা বিশ্বাস করবে। তবে সত্যির মতো দেখতে লাগতে হবে। মিথ্যাকে সত্যির মতো দেখতে তখনই মনে হয়, যখন কিছু পরিসংখ্যান কিংবা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য জুড়ে দেওয়া হবে। যেমন অমর্ত্য সেন খারাপ অর্থনীতিক। কারণ, তিনি তিনবার বিয়ে করেছেন। কিংবা মনমোহন সিং দুর্বল প্রধানমন্ত্রী। যেহেতু তিনি জোরে কথা বলেন না। 

পোস্ট ট্রুথ যুগের ধর্ম হল যেহেতু ইদানীং মানুষ বেশি পড়াশোনা করার সময় পায় না বা করেই না, তাই নিয়ম করে তাদের কাছে এমন তথ্য মোবাইলে প্রেরণ করা, যা কেউ ভেরিফাই করবে না। যাচাই করবে না। করার মতো উদ্যোগই দেখাবে না। মোবাইলে এসেছে, অনলাইনে দেখাচ্ছে? তার মানেই সঠিক,এভাবেই বিশ্বাস করে নেবে। সুবিধা হল মোবাইল যুগটি হল মুখোমুখি কমিউনিকেশন করে না। কেউ কাউকে দেখতে পায় না। সামনাসামনি কেউ প্রতিবাদ করে ভুল সংশোধনও করে দেয় না। হয় বিশ্বাস করবে। অথবা ইগনোর করবে। সুতরাং ওই ভুল ইনফরমেশনটির মৃত্যু হচ্ছে না। রয়ে যাচ্ছে। শেয়ার হচ্ছে। এভাবে ধীরে ধীরে একটি কম জানা, ভুল জানা, মিথ্যাকেই সত্য ধরে নেওয়া সমাজ তৈরি হয়ে যাচ্ছে আমাদের চারপাশে চোখের আড়ালে। যা সবথেকে বেশি সুবিধা করে দিচ্ছে রাজনীতিকে। সব রাজনৈতিক দলই ক্রমেই আরও বেশি করে নিজেদের সুবিধামতো নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী মনগড়া তথ্য নির্মাণ করে প্রচার করবে, পোস্ট করবে, শেয়ার করবে। আমরা সেই ফাঁদে পা দিয়ে নিজেদের অজ্ঞ ও মূর্খ একটি সমাজে পরিণত করে চলেছি। দুনিয়ার সব দেশেই রাজনৈতিক দলগুলি সেই পথেই হাঁটছে। কারণ, এটা প্রমাণিত যে আজ আমরা বেশি করে মোবাইল আর সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি। সংবাদপত্র, বই, গবেষণাপত্র, এনসাইক্লোপিডিয়া নয়। নতুন ও আগামী প্রজন্মের হাতের কাছে এসব প্রামাণ্য রেফারেন্স আগামীদিনে থাকবেও না। তাই আরও বেশি করে বিশ্বাস করা হবে মোবাইলে যা শেয়ার করা হচ্ছে তাই সত্যি। আমরা প্রামাণ্য স্বীকৃত তথ্য ছেড়ে আরও বেশি করে ঢুকে পড়ছি গুজব, জল্পনা, লোককথা, মিথ, আবেগ আর একতরফা কথিত কাহিনির মধ্যে। যা আধুনিকতার পরিপন্থী। 
লোকগীতির সিডির কভারে গানের লাইনের পাশে ব্র্যাকেটে লেখা থাকে দেখবেন (প্রচলিত)। অর্থাৎ কে লিখেছিলেন জানা যায় না। সেরকমই যে কোনও ঘটনা বা তথ্যের সোর্স আর আমাদের দরকার হবে না। প্রচলিত বলে বিশ্বাস করে নিলেই হবে। এভাবে ইতিহাসের বিকৃতি আর বদলে যাওয়া শুরু হয়। ফ্রেডরিখ নিটশে বলেছিলেন, ''প্রকৃত ঘটনা বলে কিছু হয় না, সবই আসলে ব্যাখ্যা।'' সম্ভবত রাজস্থান ও হরিয়ানা সরকার এই কোটেশনকে ধ্রুবপদ হিসাবে নিয়েছেন। তাই ওই দুই রাজ্যের বিজেপি 
সরকারের মন্ত্রিসভার বৈঠকে গত মাসে আলোচনা হয়েছে আগামীদিনে হলদিঘাটের যুদ্ধে মহারানা প্রতাপ জিতে গিয়েছিলেন বলে ইতিহাস বইতে লেখা হলে কেমন হয়? হলদিঘাটের যুদ্ধে আকবরের 
সেনাপতি মানসিংকে রাণা প্রতাপ হারিয়ে দিয়েছিলেন এরকমই সিলেবাস তৈরি করার ভাবনাচিন্তা চলছে ওই দুই রাজ্যে। পোস্ট ট্রুথ। সত্য, ত্রেতা, দ্বাপর আর কলিযুগ জানতাম। এই অজানা নতুন যুগের নাম তাহলে মিথ্যা যুগ?


বুধবার, ৫ এপ্রিল, ২০১৭

রাম কে নাম ~ কস্তূরী

আজকে যারা রামনবমীর দিনে অস্ত্র নিয়ে মিছিল করার হুমকি দিচ্ছে, রামের অজুহাত নিয়ে দাঙ্গা অশান্তি বাঁধাতে চাইছে তারা এই রামের নামে নয়ের দশকে সারা দেশ জুড়ে কী হিংসা আর বিভাজন করেছিল একবার ফিরে দেখুন। আনন্দ পটবর্ধনের তথ্যচিত্র 'রাম কে নাম' দেখুন। ইতিহাসকে জানুন। এই ছবি শেয়ার করুন কমবয়েসীদের সাথে যাদের নব্বই এর দশকের শুরুর দিকটা নিজের চোখে দেখা নেই। রুখে দিন ধর্মান্ধতার জিগির কে। এই ছবির শেষে অযোধ্যার প্রান্তিক খেটে খাওয়া দলিত মহিলা যে প্রশ্ন করেন, 'আমার অন্ন বাসস্থান নেই। আর এরা রামের বাড়ি নিয়ে জিগির তুলতে ব্যস্ত। রামের জিগিরের পেছনে আমি কেন দৌঁড়বো?' সেই প্রশ্নকে সামনে আনুন।

মঙ্গলবার, ৪ এপ্রিল, ২০১৭

রামনবমী ~ শ্রেয়সী রায়

আমার মা মোটা করে সিঁদুর পরেন এবং শাঁখা-পলা। আমার বাড়িতে দুপুরে এবং সন্ধ্যেয় শাঁখ বাজে; একটা নির্দিষ্ট বয়েসের পর আমায় দিয়ে এই কাজগুলো আর করানো যায়নি, তাতে হয়তো বাবা-মার মনখারাপ হয়েছে, কিন্তু কোন জোরালো আপত্তি করেন নি। 

আমার বয়েস যখন ৭/৮, আমাদের বাড়িতে প্রথমবার বেড়াতে আসেন মণি কাকু, বাবার কাজের সুবাদে বন্ধু, বাংলাদেশের মানুষ| নুরুদ্দিন আহ্মেদ মণি; প্রথম সন্ধ্যেয় আমাদের খাবার ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে তিনি হালকা ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করেন, খাবার ঘরে "বিধর্মী" কারু আসা নিয়ে মা-বাবার কোন অসুবিধে আছে কিনা। মা-কে অমন হা হা করে হেসে উঠতে দেখার অভ্যেস আমার ছিলোই, যদি-ও কাকু একটু অবাক-ই হয়েছিলেন। আর আমি বুঝে গেছিলাম মা পুজো দেন বটে, কিন্তু যাঁরা পুজো দেন না, তাঁদের নিয়ে মায়ের কোন-ই রাগ—দ্বেষ নেই। সেই ছোট থেকে তাই এটাকেই স্বাভাবিক বলে জেনে এসেছি।

বাবা আর আলম কাকুকে অবশ্যি বছরে এক বার আমি নিয়ম করে ঝগড়া করতে দেখেছি। বাবার অফিসের স্পোর্টস কম্পিটিশনের দিনে। দু'জনের একটা করে পা একসাথে বেঁধে যে "থ্রী লেগড রেস" হত, প্রতিবার দু'জনের জুটি তাতে থার্ড হতো এবং একে অপরকে দোষারোপ, ফার্স্ট না হতে পারায়। কিন্তু বছরের পর বছর তাঁদের অন্য কোন পার্টনার বেছে নিয়ে হাহুতাশ কম করার চেষ্টা করতে-ও দেখিনি।

"ছোটদের রামায়ণ" র‍‍্যাপিড রীডিং ক্লাশে ডি.জি স্যার এলে, বই-এর মলাটে ভারী সুন্দর করে ছবি এঁকে দিতেন রামায়ণের-ই কোন ঘটনার। ইলিয়ড, ওডিসি –র সাথে মহাকাব্য হিসেবে রামায়ণ-মহাভারতের নাম শিখেছি, পড়েছি বটে কিন্তু রামনবমী কাকে বলে জানার প্রয়োজন পড়েনি। পূর্ব ভারতের সংস্কৃতিতে রাম প্রায় নেই বললেই চলে।

হঠাৎ এই মধ্য তিরিশে এসে শুনলাম আমার শহরে নাকি রামনবমী হবে; বাসন্তীপুজোর মেলা টেলা নয়, একেবারে ক্ষাত্র্য ধর্ম মেনে তলোয়ার নিয়ে আরএসএসের শোভাযাত্রা। অস্ত্রের শোভা যে আসলে চিৎকৃত হুমকি, ক্ষমতার প্রদর্শন সে'কথা আলাদা করে বলার দরকার পড়েনা। আর এই মুহূর্তে গোটা দেশে যেভাবে একচ্ছত্র ভাবে হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তানী সংস্কার চারিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে তাতে এই উদ্যোগের অন্তর্নিহিত অর্থ নিয়ে-ও কোন সন্দেহের অবকাশ নেই। এ' নিতান্তই ক্ষমতার প্রদর্শন; প্ররোচনার ফাঁদ।

গর্ব করে এতদিন বলে এসেছি যে দাঙ্গা দেখিনি আমি, কারণ সম্প্রীতি দেখেছি; সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য প্রশাসনের উদ্যোগ দেখেছি। তার জন্য তোষণ লাগেনি, তার জন্য উস্কানি লাগেনি। কিন্তু সে অহঙ্কার আজ আর রাখা যাবে কিনা কে জানে। ব্যবস্থা আমাদের নিতে হবে। তৃণমূল সরকার যে কোন-ই বন্দোবস্ত নেবে না তা স্থির নিশ্চিত। তার প্রমাণ হলো মুকুল রায়ের ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে থেকে এই পুরো ঘটনায় নেতৃত্ব দেওয়া। দায় আমার-আপনার। কারণ দাঙ্গা হলে ক্ষতি আমার-আপনার; তৈরী থাকুন; প্ররোচনাকে আটকে দিয়ে, প্রতিহত করে। বাংলার উৎসব জুড়ে গান-ব্রতকথা-বাউল-আজান-মেলা থাক, তলোয়ার নয়; জহ্লাদের উল্লাসমঞ্চ হওয়া থেকে বাংলাকে আটকানোর ভার নিতেই হবে…

রবিবার, ২ এপ্রিল, ২০১৭

ডালের বড়া ~ কৃশানু


তখন ক্লাস সিক্স। বাড়ি মানে এক কামরা ভাড়ার ঘর, একটু দূরে রান্নাঘর, অনেক দূরে বাথরুম। মা রান্নাঘরে তরকারি কুটতে কুটতে আমায় ডেকে বলল, নতুন পেন্সিলবক্স, ডাকটিকিট, গল্পের বই আর কেনা যাবে না। বাবার চাকরি গ্যাছে। আর বাড়িভাড়ার টাকা যাতে দিতে না হয়, তাই আমরা বাড়ি বানাচ্ছি। নিজেদের।

আজ আমি ক্রোনি ক্যাপিটালিজম নিয়ে আপনাদের গল্প শোনাতে আসিনি। ট্রেড ইউনিয়নের কিছু নেতার বিশ্বাসঘাতকতা বা গোল্ডেন হ্যান্ডশেক নিয়েও নয়। শুধু এটুকুই জানানোর, দুই বোনের বিয়ে দিয়ে, বড় ভাই হিসেবে দীর্ঘদিন সংসার টেনে বাবার হাতে লাখ দুয়েক টাকা মাত্র ছিল। যা পোস্ট-অফিসের মান্থলি ইনকাম স্কিমে রেখে মাসের শেষ কিছু টাকা পাওয়া যেত। বাবা কিছু হাড়ভাংগা খাটুনির উটকো চাকরি করতেন মাস গেলে দু-হাজার টাকার জন্য। মানে যেসব লোকেরা ভিড়ে ঠাসা লোকাল ট্রেনে শ্রান্ত হয়ে নটার সময় বাড়ি ফেরেন, বা নারকেলবাগানের মোড়ে যে মানুষটি এসি২৩এ ছেড়ে দিয়ে ঘন্টায় একটা সি২৩ এর অপেক্ষা করেন, তাদের মতই।  মামা মাসিরা সাহায্য করতেন। আর চারদিকে দেনা। বাড়ির প্রোমোটার থেকে পাড়ার মুদির দোকান।

আমি আর বেশি পেন্সিলবক্স কিনিনি। ডাকটিকিট জমানোও বন্ধ করি। বই পড়া ছাড়তে হয়নি। মামার বাড়ির বিশাল লাইব্রেরী থেকে জুটে যেত। কিন্তু আমাদের লাইফস্টাইলে, যা এমনিতেই খুব উঁচু ছিল না, কিন্তু নিয়মিত ছিল, বড়সড় পরিবর্তন হয়। সুতো দিয়ে কেটে দুভাগ করে ডিম খাওয়া হত। মাসে একবার কেউ এলে মাংস। এই বিলাসিতাও বন্ধ হয়। একমাত্র আমি সপ্তাহে একটা ডিম পেতে থাকি, বাবা- মা ঝোল আলু। সে সংস্থান-ও রোজ হয় না। মাসতুতো দাদা এসে আমায় নতুন বাড়ির বাগানের গাছের ঢ্যাঁড়শ সেদ্ধ দিয়ে ভাত খেয়ে স্কুলে যেতে দেখে অবাক হয়ে যায়। নকাকার দেওয়া ক্রিম কালারের বারমুডা বা নৈনিতাল থেকে আনা সোয়েটার আমার নতুন জামা হয়। মামাতো দাদার জামাকাপড় এনে বাড়িতে পরি, বাইরেও। কিন্তু মধ্যবিত্ত স্কুলে যাওয়া বাড়ন্ত ছেলের প্রোটিনের ঘাটতি মিটবে কোথা দিয়ে? 

আমার মা বিভিন্ন মানুষ-এর ক্যারিকেচার করতে পারে খুব ভাল। মামির থেকে শেখা। আর সেই সংগে, মা-এর অতুলনীয় স্মৃতিশক্তির কারণে অজস্র প্রবাদ, শালকিয়ার বারোঘর ভাড়াটের অসংখ্য গল্প, বীরভুমের গল্প আমাকে ঘিরে থাকত। দাদু ঢাকা থেকে উদ্বাস্তু হয়ে শালকিয়ায় আসেন। বীরভূমে চালের ব্যবসা করে লাভের মুখ দেখেন। মায়ের জন্ম শেখানেই। তার পরপরই সেই ব্যবসা মার খায়। সর্বস্বান্ত হয়ে ফিরে আসেন শালকিয়া।
যা বলছিলাম, অসংখ্য মজার কথা মায়ের মুখে লেগেই থাকত। মধ্যবয়সে পয়সা ও চিকিৎসা-র অভাবে মায়ের শরীরে তখন থেকেই দানা বাঁধতে থাকে রোগ। কিন্তু কপালে ভাঁজ পড়লেও হাসিটি এখনো অটুট।

সেই মা আমাকে কারুর বাড়ির গল্প শোনাত। অতিথি আসায় খেতে দেওয়া হয়েছে। ডাইল আর ডাইলের বড়া। সেইদিনগুলোতেই গল্পটা বলা হত, যেদিন আমার পাতেও তাই। গল্পটা তাই আমি অসংখ্যবার শুনেছি। মধ্যবিত্ত স্কুলে যাওয়া বাড়ন্ত ছেলের প্রোটিন।

আজ আমার ইউরিক এসিড ধরা পড়েছে। মাংস খাই সপ্তাহে দুবার। গুডরিকের রোস্টেড চা। ব্রু গোল্ড কফি। ইউরিক এসিড সামলাবার জন্য স্ট্রবেরি খাই। কারণ আমার বাবা মা আমি - আমরা তিনজন কোনো একসময়ে ডারউইনের থিওরির ঠিক দিকের খোপে ঢুকে যেতে পেরেছি। জীবন আমাদের নিয়ে প্রচুর টানাটানি করলেও। তাই বাবা কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা লড়ে চাকরি যাবার দুই দশক বাদে কিছু টাকা পেয়েছে। ওই দিন অবধি বেঁচে থাকতে পেরেছে,  জেতার খবর এসেছে, যেদিন প্রত্যেকের প্রাপ্য অর্ধেক টাকা উকিল নিয়েছেন। কিন্তু বাবার বহু সহকর্মী সেই দিনটা দেখার অনেক আগেই মারা গিয়েছেন। ভেসে গ্যাছে তাদের সংসার, স্ত্রী ছেলে মেয়ে। আমরা কিন্তু ঢুকে পড়েছি সঠিক খোপে। আরো কিছুদিন সারভাইভ করছি। তাই আমার এখন দু-কামরার ফ্ল্যাট, দমদমে। এটাচড বাথ-ও আছে।
এই লেখা প্রায় শেষ। শুধু আর দুটো কথা বলব। 
এই কুড়ি বছরে মুসুর ডালের দাম বেড়েছে ৬০০ %, কিন্তু ডেইলি ওয়েজ বেড়েছে ৩০০%। মহার্ঘ হয়েছে ডাইল আর ডাইলের বড়া।

এই কুড়ি বছরে স্বল্পসঞ্চয় প্রকল্পে সুদের হার ১২% থেকে কমে হয়েছে ৭.৯%।  আমার যতদূর মনে পড়ে এক লাখ বিরানব্বই হাজার টাকা রেখে আমরা মাসে পেতাম ১৯২০ টাকা। আজকের দিনে হলে পাব ১৩০০ টাকা, কিছু এদিক ওদিক। আজকের দিনে একই পরিস্থিতে কোথায় যেত একটি পরিবার? কোথায় যেতাম আমরা? কোথায় যেতাম আমি?


শাসক ~ মন্দাক্রান্তা সেন

সাথী তোমাদের ক্ষত আমাদের বক্ষে এসে জ্বলে 
তোমাদের কালশিটে আমাদের চামড়ার তলে 
কে তোমাকে মারে সাথী ? চিনি চিনি তাদেরকে চিনি 
শাসক যে গুন্ডা পোষে, তাকে আমরা চিনে কি রাখিনি !

রক্ত গড়ায় পথে, মার্ খেয়ে ভেঙে যায় হাড় 
সামনে অনেকটা পথ, আপাতত দুর্গম পাহাড় 
তবু তাতে পা বাড়াই তোমাদের সঙ্গে আজ সাথী 
তোমার রক্তের কাছে নতজানু অঞ্জলি পাতি 

সাথী হে তোমাকে যারা মারে আজ রাস্তায় ফেলে 
সে পথে মিছিল যাবে শত পতাকার ডানা মেলে 

ওই পতাকার তলে আমরা আমরণ প্রত্যয়ী 
সেই দিন দূর নয় যেই দিন আমরাই জয়ী

শনিবার, ১ এপ্রিল, ২০১৭

আধার কার্ড ~ সুশোভন পাত্র

দুই ভাই আর এক বোন নিয়ে পাঁচ জনের সংসার। সম্বল বলতে মাথার উপর এক চিলতে ছাদ আর বিঘা খানেক জমি। কত্তা জমিতেই ঘাম ঝরিয়ে ফসল ফলান। চাষের খরচা বাদে 'সেভিংস'টুকু জমা হয় গিন্নীর কাছে। গিন্নী হলেন 'ব্যাঙ্ক'। সেই 'সেভিংস' থেকেই মাসকাবারি খরচা চলে, হেঁশেল ঠেলে ভাত জোটে, মেয়ের বিয়ের জন্য বিন্দু বিন্দু সিন্ধু জমে। সন্ধেবেলা জমা-খরচের হিসেব গিন্নী 'ব্যালেন্স শিটে' তুলে রাখে। 
সেই যে সেবার শহরে মাছের খুব 'ডিমান্ড' হল, বড় ভাইটা মাছ 'সাপ্লাই'র ব্যবসা ধরল। বোনের বিয়ের জমানো সিন্ধু থেকে হাজার পাঁচেক 'লোন' নেওয়ার সময় মা'কে বলেছিল -"ব্যবসা জমলেই  টাকাটা আমি ডবল করে ফেরত দেবো।" মেজ ভাইটাও গতরে খাটতে শহর গেলো। হাজার দুয়েক হাতে নিয়ে বাপের পা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা  করলো "রোজগার করে বিয়ের সব গয়না আমি শহর থেকেই গড়িয়ে দেবো।"    
হঠাৎ কি যে হল, 'ফাটকা পুঁজি' সব উবে গেলো। শহর জুড়ে 'রিসেশন' এলো। কত লোকের চাকরি গেলো। মাছের 'ডিমান্ড' কমে গেলো। লেমন-ব্রাদার্স শুকিয়ে গেলো। মেজ ভাইটা হারিয়ে গেলো। বড়ভাই'টা পথে বসলো। বোনের বিয়েটা 'জাতীয় অর্থনীতির' মত থমকে গেলো। আর গিন্নীর 'ব্যালেন্স শিটে' অনাদায়ী ঐ লোন গুলো  'নন পারফর্মিং আসেট' হয়েই পড়ে রইলো। বছর ঘুরে নতুন খাতায় পুরনো হিসেবে তুলতে গিয়ে, গিন্নী সেদিন 'নন পারফর্মিং আসেট' কে মাতৃ স্নেহে 'রাইট অফ' করে আঁচলের ডগা দিয়ে চোখের কোণা মুছল।         
গত দুই আর্থিক বছরে এরকম ১ লক্ষ ১৪  হাজার কোটি টাকার 'নন পারফর্মিং অ্যাসেট ' কে 'রাইট অফ' করেও বর্তমানে আমাদের দেশের ২৮টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে মোট 'নন পারফর্মিং অ্যাসেট' ৬,১৪, ৮৭২ কোটি টাকা ¹। গত দুই আর্থিক বছরে শতকরা বৃদ্ধি ১৩৫% ² । মায়ের কাছে লোন নিয়ে ফেরত দিতে না পারা বড়-মেজো ভাই'দের তালিকায় প্রথম নাম, রিলায়েন্স। তারপর ভেদান্ত-এসার-আদানি-ভিডিওকন; অ্যান্ড দা লিস্ট গোস অন ³ । অপত্য স্নেহে অন্ধ মা এখন সংসার চালাতে বৃহস্পতি-শনি নিরামিষ খাচ্ছে, চায়ে এক চামচ চিনি কম দিচ্ছে, আর সুযোগ পেলেই প্রভিডেন্ট ফান্ড আর ফিক্স ডিপোজিটে ইন্টারেস্ট রেট কমিয়ে দিচ্ছে। যদিও অঙ্কের হিসেবে ৬,১৪,৮৭২ কোটি টাকার এই 'নন পারফর্মিং আসেট' ২০১৭-১৮'র ঘোষিত ১০০ দিনের কাজ, তফসিলি জাতি উপজাতি উন্নয়ন, নারী কল্যাণ এবং গ্রামোন্নয়নের মত সামাজিক প্রকল্পের সম্মিলিত বাজেট বরাদ্দের দেড়গুণ; প্রতিরক্ষা এবং সড়ক ও পরিবহন উন্নয়নে খাতে বাজেট বরাদ্দের দ্বিগুণ; আর শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সম্মিলিত বাজেট বরাদ্দের পাঁচ গুন, তবুও গ্রাম সুদ্ধু লোকের মুখে প্রচার হয়েছে, 'আচ্ছে দিন' প্রায় নাকি এসেই গেছে ⁴ । 
কিন্তু গত দুবছরে দেশ জোড়া 'নন পারফর্মিং অ্যাসেট'র রেকর্ড মাত্রায় উল্লম্ফনের পরেও, সদ্য পাশ হওয়া ফিন্যান্স বিলে শুল্ক ও রাজস্ব আদায়, কর কাঠামো সংক্রান্ত নীতি পরিবর্তন করে অনাদায়ী এই বিপুল ঋণ আদায়ের বিষয়ে কোনও চেষ্টাই করেনি কেন্দ্রীয় সরকার। বরং রাজ্যসভা কে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, ঐ ফিন্যান্স বিলেই ৪০ খানা সংশোধনী এনে আধার কার্ড ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।  
সেই আধার কার্ড, যে আধার কার্ড সম্পর্কে ২০১৫'র অক্টোবরে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ বলেছিল "সরকারি পরিষেবা প্রদানের ক্ষেত্রে আধার কার্ড কোনোভাবেই বাধ্যতামূলক করা যায় না" ⁵ । সেই আধার কার্ড, যে আধার কার্ড সম্পর্কে ২০১০'এ বি.জে.পি সাংসদ যশবন্ত সিনহা'র নেতৃত্বাধীন "স্ট্যান্ডিং কমিটি অফ ফিন্যান্স " ৪৮ পাতার রিপোর্টে লিখেছিল, "আধার প্রচলন অপ্রয়োজনীয় এবং উদ্দেশ্যহীন" ⁶ । সেই আধার কার্ড, যে আধার কার্ড সম্পর্কে নরেন্দ্র মোদী ২০১৪'র ৮'ই এপ্রিল টুইটে করেছিলেন, "আধার দেশের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক। এটি অপরিণামদর্শী সরকারের একটি পলিটিক্যাল গিমিক" ⁷ ।
আধারের বায়োমেট্রিক এবং রেটিনা স্ক্যানের ডেটা সংগ্রহ করার বরাত আয়ারল্যান্ডের এসেনচার আর ফ্রান্সের মরফো সংস্থার ⁵  ⁸। এই দুই সংস্থাই আবার বিভিন্ন বিদেশী সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের উপদেষ্টা হিসেবেও নিযুক্ত। কেন্দ্রীয় সরকার কি নিশ্চিত করে বলতে পারে যে, অন্য দেশের গোয়েন্দা বিভাগের সাথে ডেটা বিনিময়ের মাধ্যমে এই বেসরকারি সংস্থাগুলি দেশের নিরাপত্তার সঙ্গে আপোষ করবে না? আধারের ডেটাবেস তত্ত্ববধান করে যে 'ন্যাশনাল ইনফরমেশন ইউটিলিটিস' তার ৫১% স্বত্ব বেসরকারি সংস্থার  ⁹। কেন্দ্রীয় সরকার কি নিশ্চিত করে বলতে পারে যে এই ডেটাবেস, বেসরকারি ঐ 'প্রফিট মেকিং' সংস্থা গর্হিত কোন কাজে ব্যবহার করবে না? কেন্দ্রীয় সরকার কি নিশ্চিত করে বলতে পারে আমি সরকারি বিরোধী অবস্থান নিলে আমারই 'পার্সোনাল এবং সেনসিটিভ' এই ডেটা  আমারই বিরুদ্ধে নজরদারি করতে ব্যবহার হবে না? যদি না পারে, তাহলে হঠাৎ কি এমন হল যে দুদিন আগের 'পলিটিক্যাল গিমিক' আজ 'অ্যাবসুলুট নেসেসিটি' তে বদলে গেলো? হঠাৎ কি হল যে রাজ্যসভা কে বাইপাস করে, নূন্যতম সাংবিধানিক সৌজন্য ছাড়াই রাতারাতি আধার বাধ্যতামূলক করতে হল ¹⁰ ? 
আপনার বাথরুমের পাশে হয়ত স্টার-জলসা। আর জীবন মানেই জি-বাংলা। 'ডার্টি পলিটিক্স' দেখলেই আপনি হয়ত রুমাল দিয়ে নাক চাপেন। বেসিক্যালি আপনি হয়ত 'অ্যাপলিটিক্যাল'। আপনার মনে হতেই পারে যে তিন তালাক আর অ্যান্টি রোমিও স্কোয়াডের চ্যাংড়ামিতে'ই আমার কি এসে গেলো? লক্ষ্ণৌর গালটি কাবাব বন্ধ হলে আমার সরষে ইলিশের বয়েই গেলো? কিন্তু এই যে আপনার আলোচনার পরিসরটা ক্রমশ  হিন্দু-মুসলিম-শিখ-ক্রিশ্চানে ভরে যাচ্ছে, এই যে চায়ের আড্ডা গুলো সব গরু-শুকর-গোবর-ঘুঁটে নিয়ে ব্যস্ত থাকছে, অফিসের টেবিলে টিকি-দাড়ি-হিজাব-ঘোমটা নিয়ে বিতর্কের ঝড় উঠছে, ঠিক সেই সুযোগেই আপনার নির্বাচিত সরকার আধার বাধ্যতামূলক করে আপনারই নিরাপত্তা বিকিয়ে দিচ্ছে, আপনারই বেডরুমে উঁকি মারতে পৃথিবীর বৃহত্তম 'সার্ভেলেন্স' ব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত খুঁড়ছে, আপনারই কষ্টার্জিত উপার্জন থেকে দেওয়া বড়লোক'দের অনাদায়ী ঋণ মকুবের ব্যবস্থা করছে; এসব কাকতালীয় নয়। একেবারেই নয়। বরং সুপরিকল্পিত। দেয়ার ইস অলওয়েজ অ্যা মেথড ইন ম্যাডনেস। অলওয়েজ…











তিন তালাক ~ মহম্মদ ইউসুফ হায়াত

মাস সাত আটেক আগের কথা । পরিচিত একজন সকাল সকাল এসে বলল, খুব বিপদে পড়েছে । বাড়িতে থাকা যাবেনা । কথায় কথায় জানা গেল রাগের মাথায় স্ত্রী'কে তিন তালাক বলে ফেলেছে । ফলে একঘরে আর থাকা যাবে না, তাই এখানে-ওখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে আশ্রয়ের খোঁজে । পেশায় রাজমিস্ত্রী, খুব কম পড়াশুনা জানা, দিন আনা দিন খাওয়া এক মানুষ আটকে পড়েছে চোদ্দশো বছরের পুরনো ধর্মীয় আইনের বেড়াজালে, যাকে শরিয়ৎ বলেই সবাই জানে । কিন্তু কী এই শরিয়ৎ? সব ধর্মের মতো ইসলাম ধর্মেও অজস্র নিয়ম কানুন, নির্দেশ, বিধি নিষেধ । এইগুলোই একসাথে শরিয়ৎ বলা হয় । কিন্তু অজস্র ভাগ-উপভাগের জন্য এই শরিয়তেও কিন্তু অজস্র বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায় । শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে বিভিন্নতা তো আছেই, তাছাড়াও এই দুই মূল ভাগের মধ্যেও অজস্র উপবিভাগ আছে । আমাদের দেশে যেহেতু সুন্নিদের প্রাধান্য বেশি, তাই সুন্নিদের নিয়েই আমরা আলোচনা করব । সুন্নিদের মধ্যে মূলতঃ চারটি ভাগ  । এই ভাগগুলি হল হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী, হাম্বলী । প্রতিটাই একেকটা স্কুল অফ জুরিসপ্রুডেন্স । হানাফীরা হল আবু হানিফার মত অনুসারী । যিনি অষ্টম শতাব্দীর তিনের দশক থেকে থেকে আটের দশক পর্যন্ত দীর্ঘসময় অধ্যয়ন ও গবেষণার মাধ্যমে শরীয়তের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাকার হয়ে ওঠেন । মজার ব্যাপার হল এই ব্যাখ্যা কিন্তু তখনই লিপিবদ্ধ হয়নি । হয়েছে অনেক পরে । সেই দ্বাদশ শতাব্দীতে । এতদিন এগুলো গুরু পরম্পরাতেই রক্ষিত হয়ে এসেছিল । পৃথিবীর অধিকাংশ মুসলমান এনারই ফলোয়ার । মজার ব্যাপার হল উপরোক্ত চার ব্যাখ্যাকার কিন্তু কেউ নিজেদের মধ্যে বিরোধীতায় নামেননি । বলেছিলেন সবারটাই ঠিক । যেটা হোক মেনে চললেই হবে । অথচ এদের অনুসারীদের মধ্যে রয়েছে ভীষণ রকমের গোঁয়ার্তুমি । তারা অন্য ব্যাখ্যাকারদের কথা সরাসরি নাকচ করে দেন ।

এবারে আসা যাক, কোরাণের নির্দেশের প্রসঙ্গে । কোরাণের সুরা বাকারাহ'র ২২৬ নং আয়াত থেকে ২৩০ নং আয়াত পর্যন্ত তালাকের পদ্ধতি বিবৃত আছে । একই সুরার ২৩১ থেকে ২৩৫ পর্যন্ত আয়াত এবং সুরা তালাকে আছে তালাক পরবর্তী নিয়মাবলী । সুরা বাকারাহ'র উল্লেখিত পদ্ধতি অনুযায়ী তালাক তিনবার বলতে হয় নির্দিষ্ট সময় অন্তর, একসাথে বলার নির্দেশ কিন্তু নেই । হানাফী  বাদে অন্যান্যরা সবাই এক সাথে তিন তালাক মানে না । কিন্তু হানাফী মতের অনুসারীদের বক্তব্য হল, বিচারে ফাঁসি হলে যেমন মৃত্যু হয়, তেমনি খুন করলেও মৃত্যু হয় । প্রথম ক্ষেত্রে মৃত্যুটা সমাজের চোখে বৈধ । আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে সমাজের চোখে মৃত্যুটা বৈধ না হলেও মৃত্যুটা কিন্তু হচ্ছেই । সেরকমই একবারে  তিন তালাক বললে হয়ত তালাকটা বৈধ ভাবে হচ্ছে না, কিন্তু বিয়েটাও আর টিকছে না ।

এবার কথা হল, এই আইনগুলো কি অনমনীয়? পরিবর্তন কি কোন মতেই সম্ভব নয়? সমাজের যে মুরুব্বিরা কথায় কথায় নবীর নির্দেশের উল্লেখ করেন, তাদের উচিত মোবাইল, গাড়ি, ইলেক্ট্রিক লাইট ব্যবহার না করা । এমনকী বিশাল বিশাল জনসভায় মাইক ব্যবহার করে ভাষণ দেওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত । কারণ নবীর আমলে এগুলো কিছুই ছিল না । যদি যুগের প্রয়োজনে নতুন জিনিস ব্যবহার করতে আপত্তি না থাকে, তাহলে সুযোগ থাকলে আইনের পরিবর্তন করতে দেবেন না কেন? কোরাণের ব্যাখ্যা চিরকাল এক থাকেনি । অনেকেই নিজের মতো নতুন করে ব্যাখ্যা করেছেন । কেই পুরনো ব্যাখ্যাতেই থেকে গেছেন, কেউ কেউ নতুন জিনিসকে সাদরে গ্রহণ করেছেন । সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ, পৃথিবীর অনেক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশেই আজ তিন তালাক অবলুপ্ত । পাশের বাংলাদেশ- পাকিস্তান তো আছেই । এমনকী সৌদি আরবেও আজ তিন তালাক  নিষিদ্ধ । তাহলে ভারতে হতে সমস্যা কোথায় ? সম্ভবতঃ সারা পৃথিবী জুড়েই সংখ্যালঘুদের মধ্যে অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়ার একটা আশঙ্কা কাজ করে , একটা নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে । ফলে মূল'কে আঁকড়ে ধরার একটা প্রবণতা দেখা যায়, সেখানে ন্যূনতম আঘাতকেও অস্তিত্বের সঙ্কট বলে মনে করে । তাই যতদিন দেশভাগ হয়নি, ততদিন কিন্তু ভারতে তিন তালাক  চালু ছিল । তারপর যখন দেশভাগ হয়ে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ পাকিস্তান-বাংলাদেশের জন্ম হল , সেখানে তিন তালাক নিষিদ্ধ করা সম্ভব হল , আর ভারত পড়ে থাকল সেই তিমিরেই । শাহবানু ঘটনার কিছুদিনের মধ্যেই আরিফ মহম্মদ খানের তৈরি খসড়া মুসলিম বিল আর দিনের আলো দেখল না । সমস্যা আরও গভীর হয়েছে, ভারতের মুসলমানদের চলে আসা কিছু ভারতীয় পরম্পরা । আরবে  বিয়ে ভাঙা এবং নতুন করে বিয়ে করা খুব স্বাভাবিক ঘটনা । কিন্তু ভারতের সমাজ ব্যবস্থায় বিবাহবিচ্ছিন্না মেয়েদের বিয়ে হওয়াটা খুব কঠিন । ফলে ভারতীয় তালাকপ্রাপ্তা মেয়েদের জীবনে নেমে আসে নিদারুণ অভিশাপ । যাঁরা তিন তালাককে সমর্থন করছেন , তাদের বাড়িতেও মেয়ে আছে , এমন দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা তাদের জীবনেও ঘটে যেতে পারে । তাই সমর্থন করার আগে তাদেরও বিষয়টা নিয়ে ভাবা উচিত । 

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তিন তালাক নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের অবস্থান কি সত্যিই বিশ্বাসযোগ্য, নাকি কুমীরের কান্না?? যে দলের সাংসদ দাদরীর আখলাক হত্যাকান্ডের নায়কের মৃত্যুতে শোকযাত্রায় শামিল হন, এবং তারই উপস্থিতিতে সেই মৃত ব্যাক্তির দেহ জাতীয় পতাকা মুড়ে আনঅফিসিয়ালি জাতীয় সম্মান জানান হয় । গুজরাট দাঙ্গায় যে দলের প্রত্যক্ষ মদদে ঘটে গিয়েছে বীভৎস সব নারী অত্যাচারের ঘটনা । সেই দলের প্রধানমন্ত্রীর মুখে সংখ্যালঘুদের জন্য দরদ উথলে উঠতে দেখলে সত্যিই বিশ্বাস হয় না । বর্তমান সরকার সংখ্যালঘু উন্নয়নের একের পর এক প্রকল্পে টাকার যোগান কমাচ্ছে, নাম কা ওয়াস্তে অনেক প্রকল্পকে খাতায় কলমে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে । তাই তিন তালাক নিয়ে এই সরকারের সদিচ্ছা কতটা আর কতটা সুড়সুড়ি দিয়ে কাজ হাসিলের চেষ্টা, তাই নিয়ে সন্দেহ জাগে ।

তারপরেও কি ভারতের মুসলমান সমাজ চুপচাপ বসে থাকবে? কোন সরকারের অপেক্ষায় না থেকে নিজেরা কবে উদ্যোগী হবে? কোন সরকারই চায় না কোন জনগোষ্ঠীর প্রগতিশীল অংশকে সেই গোষ্ঠীর মুখ হিসেবে তুলে ধরতে ।  কারন শাসকগোষ্ঠী জানে এই প্রগতিশীল শক্তিকে উৎসাহ দিলে এরা ভবিষ্যতে সরকারের বিরোধীতা করতে পিছপা হবে না । তাই মুসলমানদের প্রগতিশীল অংশকেই দায়িত্ব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে । কারন বাইরে থেকে কোন জিনিস চাপিয়ে দিলেও কাজ হয়না যতক্ষণ ভেতর থেকে সেই তাগিদটা না আসে । অস্পৃশ্যতা আজ বহুদিন হল বেআইনী , হিন্দু ব্যক্তিগত আইনেও সংস্কার আজ বহুদিন হয়ে গেল ।  কিন্তু সমস্যা এখনও অনেক জায়গাতেই রয়ে গেছে । 

অভিন্ন দেওয়ানী বিধি সমর্থন করতে সমস্যা নেই। কিন্তু এই অভিন্নতার সংজ্ঞা কে নির্ধারণ করে দেবে? আমরা চাইনা নাগপুরের ছাপাখানায় ছাপা 'অভিন্ন দেওয়ানী বিধি' । আমরা চাই ভারতের সব অংশের মানুষের প্রতিনিধিত্বে তৈরি এক অভিন্ন দেওয়ানী বিধি । আমাদের কাজটা শুরু হয় এখানেই । একথা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায় , মুসলমানদের মধ্যে একটা বিরাট অংশই কিন্তু মনে মনে তিন তালাক বিরোধী । জনে জনে জিজ্ঞেস করলে দেখা যাবে অধিকাংশই চাইছে না, তালাক প্রথা চলুক । কিন্তু এই ব্যক্তিগত মতগুলোই মাস লেভেলে গিয়ে পরিবর্তিত হয়ে  যাচ্ছে । কারণ ব্যাক্তিগত মতগুলো জানানোর একটা প্ল্যাটফর্ম দরকার ।  দরকার একটা বিতর্কের জায়গার । যাতে বাঁধের দরজাটা খুলে যায় । বিপুল জলরাশি ভাসিয়ে নিয়ে যায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ক্লেদ, শ্যাওলা, জঞ্জালগুলোকে । নতুন সেই স্বচ্ছ জলধারাতেই নতুন মুক্ত এক জীবনের সূত্রপাত হবে ।

বৃহস্পতিবার, ৩০ মার্চ, ২০১৭

অস্ট্রিয়া ভ্রমন - প্রদীপ্ত প্রতিম পাল


৯ই মে - ১৩ই মে

অস্ট্রিয়া বলতে আমি ও আমার ছেলের মনে যে দুটো ছবি চিরকাল জেগে থাকবে তা হল - ইনসব্রুক প্রাডলার স্ট্রাসে তে অল্টপ্রাডল হোটেল আর সালজবার্গ আরিবোনাস স্ট্রাসে তে হোটেল এরিনা। আর মনে থাকবে আশ মিটিয়ে সঙ্গ দেওয়া আল্পস্ কে। আছে ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে চলা ট্রাম, অমায়িক মানুষ, সবুজ কার্পেটে মোড়া country side আর কিলো কিলো অক্সিজেন।

ওরা ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়



- ওরা যে কি হারে সংখ্যায় বাড়ছে বাবা... ভাবা যায় না ...

- কে আবার বাড়লো এই সাত সকালে? পোকা? আরশুলো?

- উফ্‌ , তোমাদের মত লোকের ইগনোরেন্সেই এই হাল হয়েছে

- আমি? আমি আবার কি করলুম রে? আমি তো কাগজ পড়ছি

- ধুত , ওই কাগজই পড়ো আর চা ই খাও। অবসর জীবন......

- এত মাথা গরম করিস না তো। বোস এখানে। আজ তোর আপিসও নেই, তাড়াও নেই

- মেজাজটাই খাট্টা হয়ে গেল বাবা...

- খাট্টা? টক বলা যায় না?

- বুঝছোনা বাবা, সব শব্দে সেই জোরটা নেই। ভাষার ছুৎমার্গ থেকে বেরোও এবারে। আর মেজাজ খারাপ করে দিওনা তো, কাগজ পড়ো। আমি চট করে জামা কাপড় ছেড়ে একটু বাজার যাই

- বোস না, আজ তো রবিবার

- পাঁঠার দোকানে লাইন প্রতি সেকেন্ডে কি হারে বাড়ছে সেটা খেয়াল আছে তোমার? তার ওপর এই উটকো পাবলিকটা। নির্ঘাত জঙ্গী টঙ্গী হবে।

- জঙ্গী? বলিস কি রে?

- প্রথমটা বুঝিনি জানো। পার্কের মাঠে দৌড়ের পর আমি একটা বেঞ্চে ১০ মিনিট বসি। পরশু দিন দেখি একটা লোক বসে। বয়স্ক, সাদা পাজামা পাঞ্জাবি, ওই পঞ্চাশ পঞ্চান্ন বছর বয়স হবে, বেশ কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফ। চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা।

- সেটাই জঙ্গী? বোমা ছিল পকেটে?

- আঃ বাবা, ডাইল্যুট করো না তো, শুনতে ইচ্ছে না থাকে আমি চলে যাচ্ছি।

- আহা, চটিস কেন? বল বল। আমি আর কিছু বলছিনা।

- আমি পাশে বসতেই লোকটা এক গাল হেসে বললো ওম-শান্তি-শান্তি-শান্তি......

- ওম শান্তি বলা জঙ্গী? বজরং দল নাকি?

- বাবা ... প্লিজ ...

- আমি মুখে কুলুপ। বলে যা।

- আমি একটু দেঁতো হেসে উঠে এলাম...

- প্রশ্ন চলবে?

- চলতে পারে

- তার পর কি হলো?

- বলছি... গতকাল গিয়ে দেখি পাবলিক আবার বসে আছে। আমি তাকাইনি ভাল করে। কিন্তু বেঞ্চে বসতেই লোকটা আবার বলল লেট দ্য পিস বি উইথ ইউ।

- জেডাই নাইট নয় তো? স্টার ওয়ারে ...... না না, ওরকম করে তাকাস না। তুইও স্টার ওয়ার ফ্যান। জানি। তোকে ৬ বছর বয়সে দেখতে নিয়ে গেছিলাম।

- তুমি একটা ইয়ে বাবা...

- আগে বাঢ়ো জওয়ান

- আজও গিয়ে দেখি শয়তানটা বসে আছে। তখনো অবশ্য বুঝিনি লোকটা ইয়ে

- ঘটনাটা কি ঘটল?

- হারামজাদা আজ এক গাল হেসে বলে কিনা আস-সালাম আলাইকুম... ভেবে দেখো, লোকটা আসলে কি সেটা দুদিন বুঝিনি, এই আমাদের এলাকায়, পাড়ার মধ্যে ঢুকে বসে আছে। ডেঞ্জারাস ...

- আমি তো ডেঞ্জার কিছু দেখলুম না রে

- দেখলে না? ব্যাটা আসলে কি বুঝলে না? পাকিস্তানের স্পাই। আই-এস ও হতে পারে। কিম্বা তালিবান। ঘরশত্রু বিভিষন তো বটেই। ব্যাটা মির্জাফরের বংশ

- কিন্তু কথা থেকে ধরতে হলে, তোর "খাট্টা" শুনে তোকেও তো ইউপি কিম্বা বিহারি ভাবা যেতে পারে

- "খাট্টা" আর "আস-সালাম আলাইকুম" এক হলো তোমার কাছে? এই তোমাদের ইগনোরেন্সেই এরা এতটা বাড় বেড়েছে।

- প্রথম দিন লোকটা কি বলেছিল?

- বলল "ওম শান্তি শান্তি শান্তি", আর গত কাল বলেছিল  লেট দ্য পিস বি উইথ ইউ।

- দুটোর মানে কি কাছাকাছি?

- প্রায় একই মানে। একটা আমাদের সংস্কৃত, অন্যটা ইংরিজি

- আর আজ যেটা বলল?

- "আস-সালাম আলাইকুম"? কে জানে? দাঙ্গা-হাঙ্গামা - খুন খারাপি - জেহাদ - গাজী টাজী কিছু একটা হবে।

- অনেক ছোটো বেলায় শোনা যদিও , তবুও মনে আছে, আস-সালাম-আলাইকুম মানে হল তোমাদের শান্তি লাভ হোক।

- মানে?

- মানে কিছুই না, ভদ্রলোক তোকে তিন দিন তিন ভাষায় একই কথা বলেছেন। তুই শেষেরটার মানে জানতিস না বলে ওনাকে জঙ্গী......... ওই দেখো...... চললি কোথায়? আরে.........।

শুক্রবার, ২৪ মার্চ, ২০১৭

দেশপ্রেমিক ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

যদি দেশপ্রেমিক হাসে
বরফজলে নুন মিশিয়ে স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে
বাচাল কবি তীর্থে যাবে পর্বতে, সন্ন্যাসে
মুলতুবি হোক বিধানসভা তাণ্ডবে, উল্লাসে।।

যদি দেশপ্রেমিক পড়ে
হাজার পাতার থিসিস লিখুক গোমূত্রে, গোবরে
চাপাতি আর ত্রিশূল কোথায় চেঁচায় ঘুমের ঘোরে
ফলবে কথা বিজ্ঞজনের, অক্ষরে অক্ষরে।।

যদি দেশপ্রেমিক ছোটে
বসপা, সপা, কংগ্রেসি, আপ হারবে সবাই ভোটে
ডিমনি বুঝি এমনি হবে পাঁচশ, হাজার নোটে
ব্যাখ্যা সবই বেদেই আছে, পদ্ম হাজার ফোটে।।

যদি দেশপ্রেমিক কাঁদে
বিরোধী সব কৌটো নিয়ে হাজির প্রতিবাদে
মুর্গী, মাটন নিষেধ বলে রাজমা, চাউল রাঁধে
বলেন রাজা ঘুম আসেনা দেশের বোঝা কাঁধে।।

যদি দেশপ্রেমিক বলে
দেখবে জিও সিম দিচ্ছে নানান শপিং মলে
মাসি পিসি যাত্রা দেখে ভাসায় চোখের জলে
উন্নয়নের জোয়ার দেশে নোটবন্দীর ফলে।।

যদি দেশপ্রেমিক রাগে
সময়মত আইটি রিটার্ন ফাইল করিস আগে
বাঁদর ওঠে তেল মাখানো বাঁশের অগ্রভাগে
পুঁজির খোঁজে মন্ত্রী ছোটেন মস্কো থেকে প্রাগে।।

তুচ্ছ ভেবে দেশপ্রেমে করলে অবহেলা
টিকি , দাড়ির আসল নকল প্রণামী, চালকলা
দারিদ্র আর অর্থনীতির নানান গণ্ডগোলে
ধর্ম থাকুক, ত্রিশূল থাকুক, আগেই রাখি বলে।।

রবিবার, ১৯ মার্চ, ২০১৭

নির্বাচন'ই শেষ কথা নয় ~ সুশোভন পাত্র

১ কোটি ৮০ লক্ষ প্রাথমিক সদস্য। ৮৯,১০৪ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। ১ লক্ষ ৪৭ হাজার ৪০১টি বুথ কমিটি। ছটি মান্ডলিক কমিটির মাধ্যমে সৰ্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়। ৪০৩টি বিধানসভা কেন্দ্রে ৮,১৩৮ কিলোমিটার 'পরিবর্তন যাত্রা'। ৭৭টি মহিলা সম্মেলন। ৮৮টি যুব সম্মেলন। ১৪টি প্রাদেশিক বণিক সম্মেলন। ২০০টি অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায় ও দলিত সম্মেলন। ৭৫টি জেলাতে ৩,৫৬৪ কৃষক সভা। শেষ ৬ মাসে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ৩৪টি 'কমল মেলা।' ১,৬৪৯টি মোটর সাইকেল মিছিল। ২,৮০,২৬৭টি গ্রামসভা। ৮,৫৭৪টি পথ নাটিকা। অ্যাড এজেন্সির পরামর্শে রাজ্যের প্রথম সারির সমস্ত প্রিন্ট এবং ইলেক্ট্রনিক্স মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন। ভিডিও ভ্যানে সব বিধানসভা কেন্দ্রে মোট ৫৮ হাজার শো। ৭৫টি ভার্চুয়াল 'ভিডিও রথে'র মাধ্যমে শহরে শহরে 'মন কি বাত'। ৫,০৩১ জনের সোশ্যাল মিডিয়া টিম। চারটি ফেসবুক এবং একটি টুইটার হ্যান্ডল। ১০,৩৪৪ হোয়াটস অ্যাপ গ্ৰুপ। ক্যাবিনেট সহ প্রধানমন্ত্রীর হাই প্রোফাইল উপস্থিতি। ব্যক্তিগত অনুদান হিসেবে ১৬,৯১,৭২,৩১৫ টাকা অর্থ সংগ্রহ। 
এই সবটা মিলিয়ে একটা 'ইলেকশন ক্যাম্পেন'। বি.জে.পি'র 'ইলেকশন ক্যাম্পেন'। এই সবটা মিলিয়ে একটা নির্বাচনী রণনীতি। উত্তরপ্রদেশ নির্বাচনী রণনীতি।    
রাজপুত অধ্যুষিত হিরণওয়াড়া গ্রামে এস.পি'র প্রাপ্ত ভোট ৭, বি.এস.পি'র ১৪, আর বি.জে.পি'র ৭৯০। ব্রাহ্মণ ভূস্বামী সংখ্যাগুরু এবং গুরুত্বপূর্ণ দলিত উপস্থিতির ভাণ্ডডা গ্রামে এস.পি'র প্রাপ্ত ভোট ৯, বি.এস.পি'র ১৫৬, আর বি.জে.পি'র ৫৭০। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জালালাবাদ বি.জে.পি'র প্রাপ্ত ভোট ২৩, এস.পি'র ২৩১, বি.এস.পি'র ৪৫৩। ৩৫% যাদব জনসংখ্যার মেনপুরী বিধানসভায় আবার বিপুল ভোটে বিজিত এস.পি। গ্রামের পর গ্রাম, বিধানসভা পর বিধানসভা এই  একই বাঁধা ধরা 'প্যাটার্নের' প্রতিলিপি। সাধারণ মানুষের নির্বাচনী কড়চা'তে উঠে আসেনি ইশতেহারের অনুচ্ছেদ, পাত্তা পায়নি অর্থনীতির যুক্তি-তক্ক, ব্যালট বক্সে জমা পড়েনি ইস্যু ভিত্তিক মেরুকরণ। বরং ই.ভি.এমে কোথাও যুদ্ধ হয়েছে হিন্দু-মুসলিম'দের। কোথাও ব্রাহ্মণ-দলিত'দের। কোথাও আবার জাঠ-যাদব'দের ¹ ² । 
এই সবটা মিলিয়ে একটা ব্লু-প্রিন্ট। বি.জে.পি'র ব্লু-প্রিন্ট। এই সবটা মিলিয়ে একটা 'প্রোপাগান্ডা'। বি.জে.পি'র 'প্রোপাগান্ডা'। যার ক্যাসকেডিং এফেক্ট একটা নির্বাচনী জয়। বি.জে.পি'র উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনী জয়।  
ইরম শর্মিলা'র রাজনৈতিক দল 'প্রজা'র আহ্বায়ক এবং নির্বাচনী পদপ্রার্থী এরেন্দ্র লেইচম্ম। হাভার্ডের অর্থনীতির স্নাতকোত্তর ডিগ্রি আর ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্কের বিলাসী চাকরি; দুটোই ছেড়ে মাটির টানে ফিরেছিলেন মনিপুরের নির্বাচনী রাজনীতিতে। প্রচারের সময় ঘুরে বেড়িয়েছেন, সবার কথা শুনেছেন, নিজের কথা বলেছেন। সবশেষে  ১১ তারিখ প্রণামী বাক্সে দক্ষিণা জুটেছে ৫৭৩টি। প্রজা'র অন্য মহিলা পদপ্রার্থী মাইতেই মুসলিম নাজিমা বিবি। নিছকই প্রাণোচ্ছল সামাজিক কর্মী। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এক হাজার পারিবারিক নির্যাতনের শিকার মহিলার মামলা লড়ছেন, মনিপুরের দুঃস্থ নারী'দের জন্য গড়ে তুলছেন আস্ত একটা 'হোম'। অনলস নির্বাচনী প্রচারও করেছিলেন এই নাজিমা বিবি। সর্বসাকুল্যে ভোট জুটেছে ৩৩টি    ³ । 
২রা নভেম্বর, ২০০০ ম্যালম, মনিপুর। ভারতীয় সেনা নির্বিচার গুলি চালিয়ে হত্যা করল ১০ জন যুবক কে। পরের দিনই  প্রতিবাদী অনশন শুরু করেছিলেন ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তরুণী -ইরম শর্মিলা। আত্মত্যাগ আর দৃঢ়তার প্রতীক সেদিনের ইরম শর্মিলা ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছিলেন আফস্পা'র বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মুখ। মনিপুরের মানুষের চোখের মনি। বিশ্বের 'লৌহ মানবী' ⁴ । টানা ১৬ বছর পর অনশন ভেঙ্গে যেদিন ইরম শর্মিলা বলেছিলেন "আমিও বেঁচে থাকতে চাই। বিয়ে করতে চাই। ভালবাসতে চাই। কিন্তু সবার আগে নির্বাচনী রাজনীতি'তে এসে আফস্পা'র মত কালা আইনের নিরসন করতে চাই" -সেদিনই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল মনিপুর। নাগা, কুকিস, পাইতে, দেস উপজাতি অধ্যুষিত প্রবল চড়াইয়ের পার্বত্য এলাকা হোক বা মাইতেই হিন্দু সংখ্যাগুরু আপাত সমতল -গেঁয়ো যোগীকে ভিখ দেয়নি প্রবল পুরুষতান্ত্রিক মনিপুর ⁵। বি.জে.পি-কংগ্রেসের শক্তিশালী 'মেথডিক্যাল প্রোপাগান্ডার' কাছে ইরম শর্মিলা এবং তাঁর নির্বাচনী রাজনীতির আকাঙ্ক্ষা কে বাণের জলে ভাসিয়ে দিয়েছে মনিপুর। উত্তরপ্রদেশের পৌরাণিক হস্তিনাপুরে যেখানে বহুজন মুক্তি পার্টির 'দুর্যোধন'ও পেয়েছে ৮৫৩ ভোট ⁶, সেখানে ইরম ইরম শর্মিলা কে গুণে গুণে ৯০টা ভোটে দিয়েছে মনিপুর। 
আসলে এই নির্বাচনী রাজনীতি তে, টানা ১৬ বছর নাকে নল গুঁজে অনশন করে, আফস্পা'র মত কালা আইনের বিরুদ্ধে দাঁতে দাঁত চেপে লড়াই করে, ইরম শর্মিলা'ও হারতে পারে। আবার এই নির্বাচনী রাজনীতি তেই, ৯'র দশকে মেলোড্রামাটিক বাংলা সিনেমায় চোখের জলে ঘর ভাসিয়ে দেওয়া সন্ধ্যা রায় ড্যাং ড্যাং করে লোকসভায় অন্দরে পৌঁছে  গিয়ে নিশ্চিন্তে হাই তুলতে পারে। আর পারে বলেই যে দেশে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ ক্ষুধার্ত বাস করে ⁷, যে দেশে ২৭ কোটি মানুষ এখনও আনুষ্ঠানিক ভাবে দরিদ্র সীমার নিচে বাঁচে ⁸, যে দেশে প্রতি বছর ১৪,০০০  কৃষক ঋণের দায়ে আত্মহত্যা করে ⁹, যে দেশের ৩০% শিশু অপুষ্টিতে ভোগে ¹⁰, যে দেশে ৬০.৪ কোটির ঘরে শৌচাগার নেই ¹¹, যে দেশে ৭.৫ কোটির ঘরে পরিস্রুত পানীয় জলই নেই ¹², সেই দেশেরই সাধারণ মানুষই আবার বৃহত্তম গণতন্ত্রের মৌলিক অধিকার প্রয়োগ করে বেছে নেয় ৮২% কোটিপতি সাংসদ ভর্তি এক সংসদ কক্ষ। সেই দেশেরই সাধারণ মানুষই নিজের এবং দেশের নিরাপত্তার সমস্ত দায়িত্ব এমন সংসদ কক্ষের হাতে তুলে দিয়ে নিশ্চিন্তে পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়েন যে সংসদ কক্ষের শতকরা ৩৪%'র বিরুদ্ধে রয়েছে খুন, ধর্ষণ, কিডন্যাপিং কিম্বা দাঙ্গার মত ফৌজদারি মামলা ¹³ । 
আসলে নির্বাচনী রাজনীতি কোন ফ্লুক নয়, আবেগ কিম্বা আত্মত্যাগের প্রদর্শনী নয়। নির্বাচনী রাজনীতি আদর্শের ভারমাপক দাঁড়িপাল্লা কিম্বা ক্লাসিক্যাল 'শ্রেণী সংগ্রামের' আয়নায়ও নয়। বরং নির্বাচনী রাজনীতি একটা জটিল গাণিতিক বিজ্ঞান। নির্বাচনী রাজনীতি একটা কার্যকরী কৌশলের বাস্তবায়ন। নির্বাচনী রাজনীতি একটি সম্পূর্ণ সাংগঠনিক 'মেশিনারি'। নির্বাচনী রাজনীতি একটা 'প্রোপাগান্ডা'। শুধু ইরম শর্মিলার আত্মত্যাগ কিম্বা লেনিন-স্তালিন'র 'কি করিতে হইবে' দিয়ে এই নির্বাচনী রাজনীতি তে জয় নিশ্চিত হয় না। লোহা দিয়ে লোহা কাটতে ইউ মাস্ট হ্যাভে 'কাউন্টার প্রোপাগান্ডা'। ইউ মাস্ট হ্যাভে বেটার প্রোপাগান্ডা। এটাই নির্বাচনী রাজনীতি। টেক ইট, অর লিভ ইট।














শুক্রবার, ১০ মার্চ, ২০১৭

না মানে না ~ সঞ্জয় ঘোষ

এখন মধ্য দুপুর
পথের তিনটি কুকুর
দেখছে, হাসছে, চাটছে
ভাদ্র সোহাগে ভাসছে।

তোমার নেইতো বিচার
বোশেখ, ভাদ্র, আষাঢ়
সমান লোলুপ তুমি
সাজাও বধ্যভূমি।

গলিতে, গুদামে, ঝোপড়ায়
দুপুরে, রাত্রে, সন্ধ্যায়
নয়, নব্বই, উনিশ
সবই ভোগের জিনিষ!

কুরে কুরে খাও তার
মাংস, মজ্জা, হাড়
খোবলানো চোখদুটি
সাধ স্বপ্নের ছুটি!

আমারও তো কিছু ছিল
রঙিন খেলনাগুলো,
লাল ফিতে, ঘাস ভিজে
আকাশ সাজাবো নিজে!

আকাশে একটি মুখ
নিবিড় গোপন সুখ,
পুরুষ মানে তো প্রেমও!
আজ ভুলে গেছি সেও।

ভুলিনি, করিনি ক্ষমা
আমি নির্ভয়া, মনোরমা
তোমাকে বিঁধবো শেষে
অভিসম্পাতে, বিষে!
 
 
 
 
শিলাটা সরাও, লাগছে
ভীষণ বমি পাচ্ছে!
আমি তো বলছি 'না'
শুনতে পাচ্ছো না?

বাতাসে বাজছে 'না'
কেউ শুনতে পাচ্ছো না?

#NoMeansNO!

বুধবার, ৮ মার্চ, ২০১৭

বিরক্তিকর ~ নীলাঞ্জন গুহ মাজুমদার


- কি বিরক্তিকর দেখেছেন!

- কোন ব্যাপারটা বলছেন বলুন তো?
- আরে, এই যে আপনার চোখের সামনেই তো দেখছেন!
- চোখের সামনে তো দেখছি "হিংসা কোরো না, তোমারও হবে" লেখা আছে কালো ধোঁয়া ছাড়া ট্রাকটার পেছনে!
- আরে মোলো যা! আমি বলছি, ওই ওদের কথা! ওই যে দাড়িগুলো ঝুলছে, অদ্ভুতভাবে!
- ও আচ্ছা! হ্যাঁ, এই খাসিগুলো আসলে এখানেই ঘাস খেতে ছেড়ে রাখে। কিন্তু খাসির মাংস তো অত্যন্ত উপাদেয় জিনিস মশায়! বিরক্তিকর কেন হবে?!
- আপনি কি ইচ্ছে করে আমাকে হ্যাটা করছেন?!
- পাগল হয়েছেন! সেরকম কোনো ইচ্ছেই আমার নেই!
- তাহলে বুঝেও বুঝছেন না কেন?
- মাইরি বলছি, যেটুকু বললাম, তাছাড়া আর কিছু বুঝতে পারছি না বলেই বুঝছি না! আপনি বরং একটু খোলসা করে বললে সুবিধে হয়, নাহলে এখুনি আমার মাথা ধরে যাবার সম্ভাবনা!
- সামনের ওই মিনি ট্রাকগুলো দেখুন।
- দেখলাম।
- কি দেখলেন?
- বেশ কিছু লোক গাদাগাদি করে বসে আছে, আর লাফাতে লাফাতে গাড়িটা যাচ্ছে। ওইটেই বিরক্তিকর।
- কেন? আপনি তো ওই গাড়িতে বসে লাফাচ্ছেন না!
- আচ্ছা মুশকিল হল! আমি সেকথা বলছি না!
- তাহলে কি বলছেন?
- ওই ছাগলদাড়ি, লুঙ্গির উপর লম্বা ফতুয়া, মাথায় একই সাদা টুপি - জাস্ট অসহ্য!
- আপনার থেকে টাকা পয়সা নিয়েছে নাকি কেনার জন্যে?!
- আপনি মাইরি বেকার ঘোরাচ্ছেন ব্যাপারটা! আমার ওদেরকেই সহ্য হয় না!
- সেটা ঠিক! আমাদের থেকে পশুপাখিরা অনেক ভালো, এটা আমিও মানি।
- আপনি ওদের সঙ্গে আমাদের তুলনা করলেন?
- না, মানে, আমরা সবাই হোমো স্যাপিয়েন্স বলেই জানতাম!!
- আমি সেটা বলছি না আপনি ভালো করেই জানেন! ওদের এই অশিক্ষিত আচার-বিচার একেবারেই সহ্য হয় না! যেখানে সেখানে ভীড় করবে, রাস্তাঘাটে চলা যাবে না, নোংরা করবে! দেখুন না, কিভাবে অসভ্যের মত তাকিয়ে আছে এদিকে!
- এইটাই আপনার বিরক্তির কারণ?
- কেন, ভুল কিছু বললাম?
- আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করি?
- করুন...
- দুর্গাপুজোয় ভীড় হয় রাস্তায়। গোটা কলকাতা আর শহরতলি অচল হয়ে যায়। আপনার বিরক্তি লাগে তো?
- কিসের সঙ্গে তুলনা করছেন!! আশ্চর্য!
- শিবের মাথায় জল ঢালতে একগুচ্ছ লোক মাইলের পর মাইল রাস্তাঘাট নরক গুলজার করতে করতে তারকেশ্বর যায়। আশা করি তখনও আপনার বিরক্তি লাগে?
- আপনি বুঝছেনই না ব্যাপারটা।
- প্রশ্নের উত্তরটা দেবেন কি?
- এই প্রশ্নের কোনো উত্তর হয় নাকি!! অদ্ভুত সব মিনিংলেস প্রশ্ন আপনার! আপনি আসলে কোনদিকে বলুন তো?
...
...
- আসুন, আপনার নামার সময় হয়েছে...
- চলুন, আবার কাল দেখা হবে।
- অবশ্যই! যদি আপনার বিরক্তি না লাগে।
- কি যে বলেন! আপনার সঙ্গে বিরক্তি কেন লাগবে?!
- কাল আমি ছাগলদাড়ি, মাথায় টুপি, আর লুঙ্গির উপর ফতুয়া পরে আসব। তাই বললাম...