বুধবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৬

বাংলা নববর্ষ ~ রণজিৎ গুহ

১ বৈশাখ বাংলা নববর্ষ।  ১লা বৈশাখ নানা উৎসবের মধ্য দিয়ে নতুন বছরের সুচনাদিন হিসাবে পালিত হয় আসাম,  কেরল, মনিপুর, নেপাল, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাড়ু এবং ত্রিপুরাতেও। প্রতিবেশী বাংলাদেশেও যথেষ্ট উদ্যোগ উদ্দিপনায় ১ বৈশাখ উদযাপিত হয়।বিশ্বজুড়ে ১ বৈশাখ ১৪ এপ্রিল পালিত হলেও এবছর পশ্চিমবঙ্গে বাংলা নববর্ষ পালিত হবে ১৫ এপ্রিল। ১৪৩৩ বছর আগে রাজা শশাঙ্কর আমলে  বাংলা সন যখন প্রবর্তিত হয় তখন  ১লা বৈশাখ  হত  আজকের ইংরেজি ক্যালেন্ডার মতে ২১/২২ মার্চ। ২১শে মার্চ  দিনটি খুবই তাৎপর্য্যপুর্ণ।দিনটাকে বাসন্তী বিষুব বা মহাবিষুব বলে। ওইদিন সারা পৃথিবীতে দিনরাত্রি সমান সমান। ১২ ঘন্টা দিন ১২ ঘন্টা রাত।সূর্য ওইদিন ক্রান্তিবৃত্তের মহাবিষুব বিন্দুতে।  একই হিসাবে ১ মাঘ সেই সময়ে হতো ২১/২২ ডিসেম্বর।  এক ভুল হিসাবের খেসারত দিতে দিতে গড়িয়ে গড়িয়ে এখন ১ বৈশাখ  ১৫ এপ্রিলে এসে দাঁড়িয়েছে । 

Uploaded Image এই যেমন রবীন্দ্রনাথ জন্মেছিলেন বাংলা ১২৬৮ সালের ২৫ বৈশাখ।গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১৮৬১ সালের ৬ মে মধ্যরাতে। এখন ২৫ বৈশাখ পালিত হয় ৯ মে।৬০০ বছর পরে রবীন্দ্র জন্মোৎসব পালিত হবে একইসাথে  শিলচর ভাষা শহিদ দিবস ১৯ মে তারিখে ।আর ৯০০ বছর পরে ১ বৈশাখ পালিত হবে শ্রমিক দিবস ১ মে তারিখে।  এমনটা হল কেন?   আর্যভট্টের ছাত্র লাটদেব রচিত  চতুর্থ / পঞ্চম শতাব্দীর  প্রাচীন সূর্য্যসিদ্ধান্তানুযায়ী বাংলা সন তারিখ গননা হয়। সূর্যসিদ্ধান্ত অনুযায়ী পৃথিবীর একবার সুর্য্য প্রদক্ষিণে সময় লাগে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬ দিন।আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাবে সূর্য প্রদক্ষিণে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫.২৪২২ দিন।অর্থাৎ বাংলা পঞ্জিকায় একবছর প্রকৃত একবছরের চেয়ে ৩৬৫.২৫৮৭৫৬-৩৬৫.২৪২২=০.০১৬৫৫৬ দিন বা ২৩ মিনিট ৫০.৪৩৮৪ সেকেন্ড এগিয়ে চলছে। বাংলা সন ঐ প্রায় ২৪ মিনিট এগিয়ে থাকার ফলে মোটামুটি  প্রতি ৬০ বছরে ইংরেজি ক্যালেন্ডারে একদিন বেড়ে যায়।পড়শী বাংলাদেশে এই সহস্রাব্দের শুরুতেই  বাংলা ক্যালেন্ডার  সংস্কার করে আন্তর্জাতিক ভাবে মান্য গ্রেগরীয় ক্যালেন্ডারের সাথে সামঞ্জস্য রেখে প্রতি বছরে   ১৪ই এপ্রিলই ১লা বৈশাখ হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কিন্তু এ বঙ্গে এ সব নিয়ে কে মাথা ঘামায়?


১৯৫৩ সালে  জওহরলাল নেহরুর উদ্যোগে মেঘনাদ সাহা র সভাপতিত্বে 'ক্যালেণ্ডার রিফর্ম কমিটি' গঠিত হয়।  এই কমিটি প্রতিটি বাংলা  মাসের দিন সংখ্যা  নির্দিষ্ট ক'রে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়।  বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ও ভাদ্র প্রত্যেকটি ৩১ দিন; আশ্বিন, কার্তিক, অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন  প্রত্যেকটি ৩০ দিন; চৈত্র মাস ৩০ দিন, অধিবর্ষে ৩১ দিন। এবং গ্রেগরীয় নিয়মে ৪০০ বছরে ৯৭টা অধিবর্ষ বা লিপ ইয়ার।বৈজ্ঞানিক প্রস্তাবনা কার্যকরী করায় আমাদের প্রবল অনিহা। দশ বছর পর ১৯৬৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার   নির্ভুল পঞ্জিকা প্রণয়নের জন্য রাজ্য এলম্যানাক কমিটি  গঠন করেন। ওই বছর ২৯শে মে বিধানসভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী   বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করা হয়। সেই কমিটি ১৯৬৪ সালের ১৫ই জুন রিপোর্ট পেশ করে। তারপর কত সহনশীল  প্রগতিশীল প্রতিক্রিয়াশীল সরকার এলো গেলো।আজও সূর্যকে  পৃথিবীর প্রদক্ষিণ করার  সঠিক সময় নির্ধারণ করে পঞ্জিকা সংশোধন হলো না। পশ্চিমবঙ্গ সরকার  আজও অসংস্কৃত, অদৃকসিদ্ধ পঞ্জিকা অনুযায়ী ছুটির দিন ঘোষণা ক'রে চলেছে। আমাদের কীই-বা যায় আসে?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন