বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

ধরনা মঞ্চ ~ ডাঃ বিষান বসু

"ধরনা মঞ্চ" আজ সন্ধের পর উঠে গেল, বঙ্গজীবনে এর তুল্য দুঃসংবাদ, সাম্প্রতিককালে, খুব একটা আসেনি।

রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ভাষণ নিয়ে বেশী কিছু বলার থাকে না, তাই বলছি না। নইলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘিরে-ধরলে-এক-সেকেন্ডে-বারোটা-বাজিয়ে-দেওয়া নিয়ে অনেক কথা বলা যেত। কিংবা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগমথিত ভাষণ। অথবা নব-আনন্দে উদ্ভাসিত প্রতিকুর-এর বক্তব্য পরিবেশন (যার ব্যাকগ্রাউন্ডে ফ্যাতাড়ুর সেই অবিস্মরণীয় লাইনগুলো সুর করে বাজালে দারুণ লাগত, ওই যে... "ছিলাম চোদু, হলাম সাধু/ হতেই দেখি আজব বাঁx/ হিপ পকেটে বুক পকেটে/ ফাকিং ফরেন নোটের তাড়া"), অথবা ঋতব্রতর কোটেশন-বহুল বক্তব্যের মাঝে মাননীয়ার "থাক থাক, এখন অতো সংস্কৃতি করতে হবে না, পয়েন্টে এসো"...  এর যেকোনোটিই আলাদা করে আস্ত একখানা লেখা দাবি করে, কিন্তু কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।



তবে যেটা বিশেষ করে নজর টানল, তা হলো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য পরিবেশন। কবীর সুমনকে হিসেবের মধ্যে ধরছি না - উনি দলীয় সাংসদ ছিলেন, সুতরাং সাংস্কৃতিক অতীতের পাশাপাশি ওঁর দলীয় আনুগত্যের দিকটাও থাকা প্রত্যাশিত। জয় গোস্বামীও নতুন করে অবাক করেন না। কবি হিসেবে তিনি যে মহান তা নিয়ে, অন্তত আমার মনে, সন্দেহের অবকাশই নেই, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান বাঁধা - কিন্তু একনিষ্ঠ চাটুকার হিসেবে তিনি আরও বড়মাপের কিনা সে নিয়ে তর্ক করাই যায়।

এঁদের মধ্যে সত্যিই চমকে দিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী। তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। সুতরাং তাঁর কথা যাকে বলে ইনসাইডার-এর কথা। রাখঢাক না করে তিনি স্পষ্ট জানালেন, তৃণমূল ঠিক করে নিয়েছে যে বিজেপিকে পঞ্চাশটা আসন দেবে (একে কি আসন-সমঝোতা বলা যাবে?) - অবশ্য বিজেপি যদি লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকে, তবেই। নইলে কিন্তু তাঁর দল (তৃণমূল) বিজেপি-কে তিরিশের নীচে নামিয়ে দেবে। সুতরাং... 

কিন্তু, যে যা-ই বলুক, সত্যিকারের শো-স্টপার ছিলেন আবুল বাশার। তাঁকে প্রতিভাবান বলে জানতাম, কিন্তু জিনিয়াস বলে বুঝিনি। 'সেদিন চৈত্রমাস' ছবির চিরঞ্জিৎ যেমন বলতেন - " আমি ভুল করেও ভুল করি না" - প্রায় তেমন করেই বাশার-সাহেব বললেন, 'আমি ভেবে দেখেছি, আমার খুব একটা ভুল হয় না'। মফস্বলে বসে তিনি ষোল বছর বয়সে (খুব সম্ভবত তাঁর নিজের ষোল বছর বয়স, জীবনানন্দের নয়) জীবনানন্দকে আবিষ্কার করেছিলেন (জীবনানন্দের পক্ষে এ এক মস্ত বড় সম্মান, নিঃসন্দেহে) - আর এমন করে আবিষ্কার করতে করতে অবশেষে... ইয়ে কাঁহা আ গ্যায়ে হাম... পৌঁছেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে, যিনি কবি হিসেবে অত্যুত্তম, গীতিকার হিসেবে অতুলনীয়া... বাশার-সাহেব জানালেন, মাননীয়া যখন থাকবেন না তখন বাংলার ঘরে ঘরে তাঁর লেখা গান বাজবে!

তো আশার কথা বাশার-মশাই-ই (অনুপ্রাস অনিচ্ছাকৃত) শোনালেন। বললেন, রবীন্দ্রনাথ যেমন, জীবনানন্দ যেমন, মাইকেল যেমন - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তেমনই - এ পৃথিবী একবারই পায় তারে, পায়নাকো আর! আর এইখানেই আকবর বাদশা, থুড়ি জয় গোস্বামী আবুল বাশার ও আমা-হেন হরিপদ কেরাণী এক হয়ে যায় - ধর্নামঞ্চের ভাষণ থেকে জানা গেল, পিতৃদেবের অনুপ্রেরণায় (অনুপ্রেরণা জোগাতে তখনও মাননীয়া জীবনে আসেননি, নিশ্চিত) জয়বাবু সাত বছর বয়স থেকে রাজনীতি-সচেতন সংবাদপত্র-পাঠক, কিন্তু তিনি মাননীয়ার মতো মুখ্যমন্ত্রী দেখেননি - বাশার-সাহেব কখনও ভুল করেন না, তিনি জানেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ইয়ে (মানে, অলৌকিক প্রতিভা) আর দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করবেন না - আর, এঁদের সঙ্গে একই অনুচ্ছেদে নিজের নামোচ্চারণে একটু আত্মপ্রচার হয়ে যাচ্ছে জানি, তবু বলি, মাননীয়ার সুস্থসবল জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করার পর আমিও আশায় আশায় আছি, যাতে মাননীয়ার মতো মুখ্যমন্ত্রী বাংলাকে আর না দেখতে হয় এবং এমন রাজনীতিক যেন বারবার না আসেন!

মোদ্দা কথা হলো, ষাট লক্ষ মানুষ এখনও বিচারাধীন। আজ নাকি সর্বোচ্চ আদালত সে নিয়ে যা বলার বলেছেন, কিন্তু তাতে এঁদের ভাগ্যবদলের আশা কিছু দেখতে পাইনি।

বামদলগুলো এই নাম-কাটা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে - কিন্তু টিভি দেখলে আপনি তার খবর পাবেন না। মাননীয়ার পুলিশ তৃণমূল-সাংসদ রাজীব কুমারকে স্যালুট ঠুকছে আর বাম-আন্দোলনকারীদের বেধড়ক ঠ্যাঙাচ্ছে, কেস দিচ্ছে - টিভি খুললে আপনি সেগুলোও জানতে পারবেন না।

জ্ঞানেশবাবু এদিক-ওদিক পুজো দিচ্ছেন, হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছেন - মাঝেমধ্যে আমলা চমকাচ্ছেন। টিভিতে সেসব থাকছে।

ধর্না উঠে গেল। আজ। নইলে ধর্না-বিষয়ক যাবতীয় আপডেট দু'বেলাই টিভিতে থাকছিল।

তবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে ধর্নামঞ্চে বাংলার সংস্কৃতিজগতের বিভিন্ন সেলিব্রিটি প্রতিদিন যেমন করে নিজেদের ন্যাংটো করে চলছিলেন, তা দেখতে পাওয়ার সুযোগ থেকে, আপাতত, আপামর বাঙালি বঞ্চিত হবেন।  

অবশ্য বাঙালি বলতে কে? মহুয়া মৈত্র তো বলেইছেন, তৃণমূল নামক অলীক কুনাট্যরঙ্গে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত হতে না পারলে আপনি বাঙালিই নন! সুতরাং...

সুতরাং, শূন্য ধর্নামঞ্চের বাঁশ খোলা দেখতে দেখতে গল্পের সেই পোস্টমাস্টারের মতোই ভাবুন - "পৃথিবীতে কে কাহার!"

(সঙ্গের ছবির শিল্পীর নাম বলাই বাহুল্য। ধর্নামঞ্চে উচ্চস্তরের সংস্কৃতিচর্চা চলছিল পুরো সময় জুড়েই। সেই চর্চার স্থায়ী ফসল হিসেবে এটি রইল।)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন