শুক্রবার, ৭ জুন, ২০২৪

ইমনকল্যান ~ বিমোচন ভট্টাচার্য

একটা গল্প লিখি আজ। গল্পই। লিখবো ভেবেছি অনেক দিন। লিখে উঠতে পারি নি। আজ লিখেই ফেলি।

এক ভদ্রলোক, তার নাম দিলাম সুদীপ। সুদীপ ব্যানার্জী। একটি প্রাইভেট ব্যাঙ্কে চাকরী করেন। বনেদী বাড়ির ছেলে। সুদর্শন। ভাল গান করেন। বিন্দাস, প্রাণোচ্ছল মানুষ। দু মিনিটে আপনাকে তুই বলতে শুরু করে দেবেন আর আপনি তাতে খুশীই হবেন। স্ত্রীও ডাকসাইটে সুন্দরী। এক ছেলে, এক মেয়ে। মেয়েটির বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলেটি বি ই কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছে।
সুদীপবাবুর সমস্যা এই ছেলেকে নিয়েই।

ছেলে ছোট থেকেই সব ইন্সট্রুমেন্ট বাজাতে পারে। সুদীপবাবু নাম রেখেছিলেন ইমনকল্যান। তো ইমন কিছুতেই চাকরী করবেনা। সে মিউজিক ডাইরেক্টর হতে চায়। কিন্তু চাইলেই তো আর হওয়া যায় না। নিজেই গান লিখে, সুর দিয়ে ইমন গান করে। বাবা, মা দিদি আত্মীয়স্বজন প্রশংসা করে। কিন্তু একটা এন্ট্রি তো চাই? হয় না। সুদীপবাবু কিন্তু এনকারেজই করেছেন ছেলেকে।
একদিন হঠাৎ এক বন্ধুর সাহায্যে ইমনের যোগাযোগ হয় এক বিখ্যাত সুরকারের সংগে। আমরা তার নাম দিলাম ইন্দ্রজ্যোতি মিত্র। ক্যারিস্ম্যাটিক চরিত্র। এক বিখ্যাত সুরকারের সংগে সংগীতজীবন শুরু করেন। কথা বলা শুরু করলে আর কাউকে কথা বলতে দেন না। অনর্গল কথা বলতে পারেন। বীটোফেন থেকে সুমন। বব ডিলান থেকে অনুপম সবাই কি নোট কোন গানে লাগিয়েছেন সব মুখে মুখে বলে দেন। ইমনকে তাঁর পছন্দ হয়।বলেন - লেগে পড় আমার সাথে। তবে পয়সা কড়ি পাবে না কিন্তু। সুদীপবাবু আর তাঁর স্ত্রী খুব খুশী। ইমনতো আরো খুশী।
বেশ কিছুদিন কেটে যায় এর মধ্যে। দু একটা প্রোগ্রামে ইমন গীটার বাজায়। দু একটা সিনেমায় সহকারী হিসেবে ইমনের নাম বেরোয়।

ইন্দ্রবাবু এরপর তাঁর কেরিয়ারের সব চেয়ে বড় ব্রেক পান। বিখ্যাত চিত্র পরিচালক মনিপর্ণা দাসগুপ্ত তার একটা ছবিতে ইন্দ্রজ্যোতিকে ডাকেন সুর করার জন্যে। ইন্দ্র খুব খুশী হলেন। ইমনকে বললেন- তুই তো খুবই লাকীরে আমার জীবনে। কাল মনিদির বাড়ি যাব। তুইও চল আমার সাথে।
ইমন বাড়ি ফিরলো মিষ্টি নিয়ে। সবাই খুব খুশী। সুদীপবাবু একান্তে স্ত্রীকে বললেন - বাবুর মুখটা দেখেছো? মনে হচ্ছে যেন হাতে করে চাঁদ ধরেছে।
নির্দিষ্ট দিনে ইন্দ্রজ্যোতির সংগে ট্যাক্সি করে ইমন পৌঁছলো মনিপর্ণার "আলিশান" বাংলো বাড়িতে। ঢুকতেই মনিপর্ণা জিজ্ঞেস করলেন - এই বাচ্ছা ছেলেটা কে রে ইন্দ্র? ভারি মিষ্টি দেখতে তো! ইন্দ্র উত্তর দিলেন - আমার সংগে কাজ করছে দিদি। মনিপর্ণা বললেন - বাহ।

দুজনে স্ক্রিপ্ট নিয়ে পড়লেন। ইমনের দিকে নজরই নেই দুজনেরই। মুগ্ধ হয়ে দেখছিল ইমন মনিপর্ণাকে। পরচুলা পরেন। তবে খুব মন দিয়ে লক্ষ না করলে বোঝা যায় না। যখন অভিনয় করতেন তখন যা গ্লামার ছিল এখন যেন তার চেয়ে অনেক বেশী গ্লামারাস।

ওদের কথাবার্তা শেষ হলে মনিপর্ণা একটা গানের সিকোয়েন্স বললেন ইন্দ্রকে। বললেন - পরে যেদিন আসবি গানটা করে নিয়ে আসিস। । আমি শ্রীকে বলে দিচ্ছি তোকে গানটা লিখে মেল করে দিতে। আসার সময় ইমনের গাল টিপে মনিপর্ণা বললেন - পরের দিন এস ইন্দ্রর সংগে।তোমার সংগে তো কথাই বলা হল না।

গানটা পাঠিয়ে দিলেন শ্রী। ইন্দ্র পড়লেন গানটি নিয়ে। গানটির সুর দিলেন ইন্দ্র। কেন জানি না গানটা পছন্দ হল না ইমনের। কথা গুলো মুখস্থ হয়ে গেছিল ইমনের। দু দিনের মধ্যে নিজেই একটা সুর করে ফেললো গানটার। ইন্দ্রদাকে অবশ্য সে কথা বললো না।

আবার একদিন মনিপর্ণার বাড়ি গেল ওরা।। সেদিন ওখানে আরো অনেক মানুষ। অনেককেই চেনে ইমন। ইন্দ্রদা গানটি শোনালেন। গীতিকার শ্রীও ছিলেন সেখানে। মনিপর্ণা কিছুক্ষন চুপ করে থেকে তারপর বললেন - এ কি সুর করেছিস ইন্দ্র!!

ছ্যা ছ্যা। তুই আবার বড় বড় কথা বলিস এর সংগে কাজ করেছিস, ওর সংগে কাজ করেছিস! তুই তো সিচুয়েশনটাই বুঝিস নি। দুর, তোর দ্বারা হবে না। খুব খারাপ লাগছিল ইমনের ইন্দ্রদার জন্যে। মুখ চুন করে বসে আছেন। অনেক ভেবে ইমন বললো - আমি একটা সুর করেছি ম্যাডাম এই গানটার। ইন্দ্রদা জানেন না। ইন্দ্রদা বললে আর আপনি শুনতে চাইলে শোনাতে পারি। ইন্দ্রদা চোখের ইশারায় বারণ করলেন গাইতে কিন্তু তার আগেই মনিপর্না বললেন- ইন্দ্র আবার কি বলবে! গাও তো তুমি। তাও ইন্দ্রদার দিকে তাকালো আবার ইমন। ইন্দ্রদা ইশারায় বললেন গাইতে তবে ইন্দ্রদা যে পছন্দ করলেন না ব্যাপারটা সেটা তার মুখ দেখেই বোঝা গেল।
গীটারটা নিয়ে চোখ বন্ধ করে গাইলো ইমন গানটা। গান শেষ হলে হাততালির শব্দে চোখ খুললো ইমন। সবাই হাততালি দিচ্ছে। মনিপর্ণা এসে জড়িয়ে ধরলেন ইমনকে - বললেন- তুই তো জিনিয়াস রে বাবু। একেবারে এইটাই আমি চাইছিলাম। এই ইন্দ্র, এইটাই নিলাম। টাইটেল কার্ডে ওর নাম দিবি।

ওঁর বাড়ি থেকে বেরিয়ে নিজের বাড়ি আসা পর্যন্ত একটাও কথা বলেনি ইন্দ্র ইমনের সংগে। ইমন দু বার চেষ্টা করেছে কথা বলতে ইন্দ্র উত্তর দেয় নি।
নিজের বাড়ি ঢুকে প্রথমেই ইমনকে বললো - গীটার নিয়ে গানটা আর একবার কর, আমি রেকর্ড করবো। গাইলো ইমন।শেষ হলে রেকর্ডার বন্ধ করে ইন্দ্র বললো - তুই কি ভেবেছিস রে শুয়োরের বাচ্ছা। তুই ইন্দ্রজ্যোতি মিত্রর চেয়েও বড় মিউজিক ডিরেক্টর হয়ে গেছিস। শোন বোকা**, কাল থেকে এ বাড়ির ত্রিসীমায় আসবি না। এলে গাঁড়ে তিনটে লাথি মেরে বের করে দেব তোকে। ইমন বললো বাপ তুলছো কেন? আমি তো তোমার কাছে ক্ষমা চাইছিলাম ট্যাক্সিতে। তেড়ে এল ইন্দ্র - বেশ করেছি তোর বাপ তুলেছি।বেরো শুয়োরের বাচ্চা আমার বাড়ি থেকে।

ইমন বেরিয়ে এল ইন্দ্রর বাড়ি থেকে। মনে হচ্ছিল সুইসাইড করে। কানদুটো দিয়ে আগুন বেরোচ্ছিল ইমনের। বাড়ি ফিরেই গীটারটা আছড়ে ভেঙ্গে ফেললো ইমন। সুদীপবাবু,ওঁর স্ত্রী ছুটে এলেন। ছুটে গিয়ে নিজের ঘরের দরজা বন্ধ করে দিল ইমন।

দুদিন পর বাবা মা কে সব বললো ইমন কিন্তু বাড়ি থেকে বেরনো বন্ধ করে দিল। কিছুদিন পর মানসিক রোগী হয়ে গেল ইমন। ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলেন সুদীপবাবু। কাউন্সিলিং হল। বছর খানেক পর একটু নর্মাল হল ইমন। ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করেছিল ভাল ভাবেই। চাকরী পেল একটা ভাল কোম্পানীতে। ব্যাঙ্গালোরে পোস্টিং হল। সুদীপবাবুরা একটু নিশ্চিন্ত হলেন। কিছুদিন ছেলের কাছে থেকে ফিরে এলেন কলকাতায়।
ইতিমধ্যে সেই বাংলা ছবিটা রিলিজ করেছে। সেই গানটা মানুষের মুখে মুখে ফিরছে। না কোথাও ইমনের নাম নেই।

একদিন একটা বাঙ্গলা চ্যানেল দেখছিল ইমন। সেখানে ইন্দ্রজ্যোতি বলছিল সেই গানটি নির্মানের নেপথ্য কাহিনী।বলছিল- মনিদি তো প্রথম শুনেই রিজেক্ট করে দিয়েছিল গানটা। একটা জেদ চেপে গেল জানেন, পনেরো দিন ধরে রাতদিন এক করে গানটি তৈরী করেছি। গানটি গাইলো ইন্দ্র। নোট বাই নোট ইমনের সুর দেওয়া গানটিই রেখেছে সে। ইমনের এক বন্ধু ছিল ঘরে। পরে সে বলে - গানটি শেষ হবার সাথে সাথে একটু আসছি বলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায় ইমন। তারপর তেরো তলার ছাদ থেকে লাফ মারে ইমন। স্পট ডেড।
বিষাদ প্রতিমা হয়ে বেঁচে আছেন সুদীপবাবু সস্ত্রীক। আর ইন্দ্রজ্যোতি মিত্র। এখনো অনর্গল কথা বলে যাচ্ছেন। বীটোফেন থেকে সুমন। বব ডিলান থেকে অনুপম।
বলেই চলেছেন......।

রবিবার, ২ জুন, ২০২৪

এবারের ভোট এবং আমার মা ~ সুমিত চট্টোপাধ্যায়

মাকে নিয়ে আর কখনো ভোট দিতে যাব না। এই আমি নাক মুলছি, কান মুলছি।

অন্যান্যবার একাই যায়। 
এবার বাতের ব্যথা বেড়েছে। ফ্যামিলি ব্যারাম। দিদার ছিল। দিদিমা অবশ্য বেশ মোটাসোটা ছিল, মা ছিল রোগা প্যাংলা। কিন্তু বছর চার পাঁচ হল মাও বেশ মুটিয়ে গেছে ফলে ডায়াবেটিস ধরেছে, আর বংশগত বাতের ব্যথাও বেড়ে গেছে। তাই এবার মাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হলো।  
পই পই করে বলে রাখলাম- বাড়িতে বাজে বকো ঠিক আছে, কিন্তু ওইখানে গিয়ে মুখ বুজে থাকবে। 

মা ভীষণ জোরে মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। তখনই সন্দেহ হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হয়নি।

গাড়ি করে গেলাম।
যদিও খুব দূরে বুথ নয়, তবুও।
কাছাকাছি যেতে সিআরপিএফ আটকে দিল। 
মা গাড়ি থেকে নেমে এক গাল হেসে তাকে বললো- ভালো আছো তো? বাড়িতে সবাই ভালো? 
আমি চমকে গেলাম। 
মা একে চেনে ?
এখন আমি আর পাড়ায় থাকি না। কিন্তু এইসব আর্মির লোক তো শুনেছি অন্য রাজ্য থেকে আসে। বেশিরভাগই বিহার ইউপি। 
আর্মি ছেলেটি অবশ্য অল্প হেসে বলল- সব ঠিকঠাক হায়, আপ আগে বাড়িয়ে।

ঢোকার মুখে মাকে জিজ্ঞাসা করলাম- কি ব্যাপার, তুমি একে চেনো নাকি? 
আরে, এই ছেলেটাই তো আগের বছর ছিল। এই একই পোশাক পরে।
তোমার মুন্ডু। এটাই এদের পোশাক। আগের বছর অন্য ছেলে ছিল। সেই জন্য তোমার মনে হচ্ছে একই ছেলে। 
মা দমে যাওয়ার পাত্র নয়। বলল- তোর মুন্ডু। 

লোকাল একটা স্কুলে ভোট দিতে হয়। 

সারা জীবন সেখানেই ভোট দিয়ে আসছি। মা ওই স্কুলে কিছুদিন পড়াশোনাও করেছে। নতুন রং হয়েছে। সিঁড়িগুলোর ধাপে ধাপে অ্যালজেবরার সব ফর্মুলা লেখা আছে। এ প্লাস বি হোল স্কয়ার ইত্যাদি ইত্যাদি। 
মা পাড়া কাঁপিয়ে ওইদিকে আঙুল তুলে চেঁচিয়ে উঠলো- দেখলি এদের এতদিনে বুদ্ধি হয়েছে!

কেন, কি হয়েছে? 
আমি যখন ছাত্রী ছিলাম তখন এসব লেখা থাকলে অংকে কি ফেল করতাম! 
তা বটে। 
মাকে বললাম এখন এরকম অনেক লেখা থাকে। 
ডেকাথেলন বলে একটা দোকান আছে- খেলাধুলার জিনিসপত্র বিক্রি হয়।  সেখানে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলে ধাপে ধাপে লেখা থাকে তোমার কত ক্যালরি খরচা হলো। 
মা দরাজ হয়ে সার্টিফিকেট দিল -যাই বল, এখনকার যুগই ভালো। 

আমি বেশি কথা না বাড়িয়ে মাথা নাড়ালাম ।

ঘরে ঢোকার আগে আমাদেরকে আটকে দেওয়া হলো। আর্মি ছেলেটি বলল- স্যারেরা টিফিন খাচ্ছেন। একটু ওয়েট করিয়ে।
মাকে একটা চেয়ারে বসালাম।
মা বললো -বাবু ,পা সামলে দাঁড়া।
এই মরেছে, পা সামলে দাঁড়াবো কেন। পা-তো ঠিকই আছে ,সেই জন্যই তো দাঁড়াতে পাচ্ছি। 

আরে না সেজন্যে না। পেপার পড়িস না? এই মিলিটারি ছেলেগুলো মাঝেমধ্যেই বন্দুক পরিষ্কার করতে গিয়ে দুমদাম গুলি চালিয়ে ফেলে। এরা দেখ বন্দুকের মুখ নিচের দিকে করে এদিক-ওদিক ঘুরছে । ফট করে কিছু হয়ে গেলে তোর পায়ে গুলি লেগে যাবে। 
অনবদ্য অবজারভেশন। 
তুমি এত কথা বোলোনা তো -একটু রাগত কন্ঠে বললাম, তবে সত্যি বলতে কি একটু একটু ভয় হল। বন্দুকগুলো সত্যিই নিচের দিকে মুখ করা। জুতোর মধ্যেই আঙুলগুলো গুটিয়ে নিলাম। 

খানিকক্ষণ পরে হঠাৎ একটা বিকট রিংটোন বেজে উঠলো- দমাদাম মস্ত কালান্দার। 
কে রে ভাই?
আর কে রে ভাই। 
মা শত ব্যস্ত হয়ে ব্যাগ হাটকাতে শুরু করলো- ওই, নিশ্চয়ই মানি ফোন করেছে। মানি মানে আমার বোন।
আর্মি লোকটা ছুটে এলো। আরে মাজি, আপ ফোন লেকে কিউ ভোট দেনে আয়ে? 
কেন আনব না, আমার ছেলেও তো এনেছে। 

মিলিটারি  কটমট করে আমার দিকে তাকালো। 
আপনি ফোন এনেছেন? 
দেখো কান্ড। 
ফোনটা সাইলেন্ট করে হিপ পকেটে রেখেছি। কি কুক্ষণে মাকে বলতে গেছিলাম।
আমি আমতা আমতা করে বললাম- ইয়ে মানে না, মানে এরোপ্লেন মোডে রেখেছি। 
মা মিলিটারিটার দিকে কটমটতরো করে তাকালো। 
আরে ভাই হামারা বেটা ডক্টর হে, উসকো তো মোবাইল রাখনা জরুরি হে।
আমি বলে উঠতে যাচ্ছিলাম- আরে ঠিক আছে গালতি হো গেয়া, ছোড় দিজিয়ে। তবে দেখলাম মায়ের বলাতে পুলিশটা থুড়ি মিলিটারি টা একটু শান্ত হল- ও আপ ডক্টর হ্যায় , ঠিক হ্যাঁয় ফোন রাখিয়ে, লেকিন ইস্তেমাল মত করিয়ে। 
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানিয়ে মায়ের ফোনটাকেও সুইচ অফ করলাম।

অবশেষে শান্তি। কিন্তু বেশিক্ষণ টিকলো না।

খানিকক্ষণের মধ্যেই মা অস্থির হয়ে উঠলো, বাবু দেখ তো এরা কি খাচ্ছে? এতক্ষণ ধরে কি খাচ্ছে এরা? 
আমি বুদ্ধি খাটিয়ে বললাম- নিশ্চয়ই স্যান্ডউইচ টাইপের কিছু খাচ্ছে। 
মা মাথা নাড়িয়ে বলল- হতেই পারে না। এত সময় লাগছে, নিশ্চয়ই মুড়ি খাচ্ছে। বাঙালি এই মুড়ি খেয়েই মরল। 
আর্মির পাহারাদারও মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো - হা, ইয়ে লোগ মুড়ি খা রাহা হে। 
মা গর্বে ফেটে পড়লো। 
দেখলি?
আমিও মিন মিন করে হাসার চেষ্টা করলাম। 

যাইহোক একটু পরে খাওয়া-দাওয়া শেষ হল। মাকে বলা হলো ভেতরে যেতে। 
আমাকে এলাও করা হলো।

মা গিয়েই  চেঁচিয়ে উঠলো -আরে হারু! তোমায় দেখতে পাই না কেন? তোমার বউ কেমন আছে? বাচ্চা কোন ক্লাসে উঠলো? 
হারু আমাদের পাড়ার ছেলে। ভালো নাম অনুসূয়ক মিত্র। আমাদের থেকে অনেকটাই ছোট। গত বছর বিয়ে করেছে। এখনো বাচ্চা হয়নি ফলে ক্লাসে ওঠার কোন প্রশ্নই নাই। ডেডিকেটেড পার্টি ওয়ার্কার। সে এজেন্ট হয়ে বসেছে। মা তাকে দেখে হল্লা জুড়ে দিয়েছে। 
হারু বেচারা তো মুখ লুকোতে পারলে বাঁচে। 
আমি পেছন থেকে ধমক দেয়ার চেষ্টা করলাম- আরে কি করছো? এখানে এসব বলতে নেই।
 
মা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে বলল- চেনা লোকের সঙ্গে কথা বলবো না! এই জন্যই এখনকার যুগ আমার ভালো লাগেনা।
 
আহা কথা বলবে না কেন? কিন্তু এইখানে বেশি কথা না বলাই ভালো। তোমায় তো বারণ করলাম। তুমি সেই বকবক করেই যাচ্ছ। 
মা একটু ব্যাকফুটে চলে গেল- বলল তোকে আমার সঙ্গে আনলাম বলে এরকম করে বলছিস? পাঁচ বছর পরে হয়তো আমি থাকবোই না, দেখবি তখন মন খারাপ লাগবে। 

সেন্টু খেয়ে গেলাম। 

প্রিসাইডিং অফিসার গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠলো- আপনাদের মা ছেলের কথাবার্তা শেষ করে যদি একটু দয়া করে ভোট টা দেন তাহলে আমরা তাড়াতাড়ি বাড়ি যেতে পারবো। 

নিশ্চয়ই- মা মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। আপনার বাড়ি কোথায় ?

এই খেয়েছে। 

আমি বললাম- আরে, তুমি আগে ভোটটা দাও তো। তারপর বকবক করবে। যাও -আঙুলে কালি দিয়ে ওইখানে ভোট দাও। দুটো ঘেরা জায়গা আছে, দুটো জায়গাতেই ভোট দেবে।।

ডাবল ভোট কেন দেবো?! ভোট তো একটাই দিতে হয় জানি- মা খুব আপত্তি জানালো। 
আরে বাবা, আমাদের এখানে বিধানসভা, লোকসভা দুটো ভোটই হচ্ছে সেই জন্য দুটো ভোট দিতে হবে। 
সারা ভারতে একটা ভোট হচ্ছে আর আমাদের এখানে দুটো ভোট হচ্ছে, মা যেন আকাশ থেকে পড়ল। 
হচ্ছে তো।
আমাদের জায়গাটা তার মানে বেশ বিখ্যাত বল? তোর বাবা ভালো জায়গাতেই জমি কিনে বাড়ি বানিয়েছিল, কি বল।
আমি বললাম - সে আর বলতে।
আমার বাবা বেশ বুদ্ধিমান লোক ছিল সেটা অস্বীকার করার কিছু নেই তবে বাবা যে একটা ব্যাপারে মোক্ষম গন্ডগোল করে ফেলেছিল সেকথা এখন আর ভেবে লাভ নেই।

যাই হোক। 
ঘেরা জায়গায় মাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো। 
এবারেও একটু আপত্তি জানাচ্ছিল - আঙুলে নাকি বেশি কালি দেওয়া হয় গেছে। 
তাতে কালি লাগানোর লোকটা ভয়ানক চটে গেল। কি বলছেন !! খামোকা বেশি কালি লাগাতে যাব কেন! আমাদের কি এক্সট্রা কালি আছে নাকি? 
যাই হোক ঘেরাটোপের আড়ালে মা গেল, আর গেল তো গেলই। কোন সাড়া শব্দ নেই। না মায়ের না মেশিনের। 
আমি প্রিসাইডিং অফিসারের দিকে তাকালাম, প্রিসাইডিং অফিসার আমার দিকে তাকালো। 

তারপর নীরব সম্মতি নিয়ে গলা তুলে বললাম- মা বোতাম টিপেছ? 

কি করে টিপবো? 
মায়ের বিরক্তভরা গলা ভেসে এলো- কিছু দেখা যাচ্ছে না। ভয়ানক অন্ধকার। শুধু একটা প্লাস্টিকের কৌটো দেখতে পাচ্ছি। 
ওটা ভি ভি প্যাট। ওটাতে কিছু করতে হবে না মাসিমা- অফিসার আর্তনাদ করে উঠলো।
 
আমি বললাম- ওখানে কি একটু আলোর ব্যবস্থা করা যায়? বয়স্ক মানুষ বুঝতেই পারছেন। 
অফিসারের এতক্ষণে ধৈর্যচুতি হয়ে গেছে। 
দাঁতমুখ খিচিয়ে বলল- এর থেকে অনেক বয়স্ক লোক ভোট দিয়ে চলে গেছে শুধু আপনার মায়েরই দেখছি যত রাজ্যের অসুবিধা। 
বাকবিতন্ডা বেশি বাড়ার আগেই ট্যাঁ করে শব্দটা ভেসে এলো। 
আমরা হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। 
মা বেরিয়ে এসে একগাল হেসে বললো- অনেকক্ষণ থাকলে অন্ধকার সয়ে যায় তো, সেই জন্য দিতে পারলাম। এবার এই কি পাশেরটায় যাব?
 
মা আস্তে আস্তে বের হতে লাগলো। 
আমি আমার ভোটটা দিলাম। দেওয়ার সময় চোখে পড়ল প্রিসাইডিং অফিসার আর তার সহযোগী আমার মায়ের দিকে তাকিয়ে নীরবে নমস্কার করছে আর ফিকফিক করে হাসছে।
একটু লজ্জা লজ্জা করছিল আবার একটু রাগও হচ্ছিল। ভাবলাম দু-এক কথা শুনিয়ে দিই। কিন্তু বাবার একটা কথা মনে পড়ে গেল। বাবা অনেকদিন আগে প্রিসাইডিং অফিসার হয়েছিল। তখন বলেছিল- এদের নাকি অনেক ক্ষমতা, চাইলে এরেস্ট করে দিতে পারে। 
ফলে কথা না বাড়িয়ে বেরিয়ে এলাম।
মায়ের অবশ্য কোন বিকার নেই।
বাইরে বেরিয়ে দেখি মা আবার মিলিটারিটাকে নিয়ে পড়েছে- এই, আমার ফোনটা চালু করে দেবে?

বৃহস্পতিবার, ৩০ মে, ২০২৪

ভোটার কালি ~ অমিতাভ প্রামাণিক

ভোটের বাজারে আমি কেমিস্ট্রি ছুঁড়ছি না মানে ভাববেন না, ভোটের নিজস্ব কোনো কেমিস্ট্রি নেই। অবশ্যই আছে এবং সেই রসায়ন বেশ রসসিক্ত।
আপনি যখন আপনার মহামূল্যবান ভোটটি কোনো প্রার্থীকে দান করতে বুথে ঢোকেন, তখন আপনার আঙুলের মাথায় কেউ একজন আলতো করে একটা তুলি বুলিয়ে দেয়। সেই জায়গাটায় কিছুক্ষণ পরে কালো দাগ হয়ে যায়। এই কালো দাগ থাকে যতক্ষণ না ওই জায়গার চামড়াটা খসে পড়ে ভেতর থেকে নতুন চামড়া গজায়। নখের ওপর অবশ্য দাগটা তার আগেই উঠে যায়। এই দাগটা কী? মহামূল্যবান রুপো। যা থেকে আমাদের কারেন্সির নাম রুপিয়া। যে তার রূপের জন্য বিখ্যাত।
ভোটকেন্দ্রের শিশিতে যে তুলি ডুবিয়ে আপনার আঙুলে লাগিয়ে দিয়েছে, তাতে যে বস্তুটা থাকে, তা এক 'গোপন' ফর্মুলা, যা তৈরি করে দিয়েছে ন্যাশনাল ফিজিক্যাল ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা। সারা ভারতে মাত্র একটা কোম্পানি তা প্রস্তুত করে এবং যেখানে যত ইলেকশন হয় – লোকসভা, বিধানসভা, কর্পোরেশন, পঞ্চায়েত, এনিথিং – যেখানে আঙুলে এই ছাপ দেওয়া হয়, তার সমস্ত কালি সেখান থেকে যায়। তারাই একমাত্র জানে ওটাতে হুবহু কী আছে। তবে এটা জানা যে ওর মধ্যে আছে একটা বেগুনি রং আর সিলভার নাইট্রেট, বাকিটা জল আর কিঞ্চিৎ আইসোপ্রোপাইল অ্যালকোহল। রং থাকে যাতে আঙুলে যে লাগানো হ'ল কিছু তা বোঝা যায়। সেটা জলে গোলা থাকে। অ্যালকোহল দেওয়া হয় জলটা তাড়াতাড়ি উবে যাওয়ার জন্য। তবে আসলি কেমিস্ট্রিটা হচ্ছে ওই সিলভার নাইট্রেটের। সূর্যের আলো পেলেই ওটা বিজারিত হয়ে তৈরি করে পাতলা সিলভারের 'ফিল্ম' যা চামড়ার সঙ্গে সেঁটে থাকে। প্রতি ১০০ মিলিলিটার দ্রবণে ১০ থেকে ১৮ গ্রাম সিলভার নাইট্রেট থাকে। বুথে ভোটারের সংখ্যার ওপর এই শিশির সাইজ নির্ভর করে। কোথাও খুদে ৫ এম এল, কোথাও ৭.৫, কোথাও ১০, ২০ বা ৫০ এম এল। একটা ৫ মিলিলিটার শিশির কালি থেকে তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো ভোটারের 'উঙ্গলি কালা' করা যায়।
যে কোম্পানিটা এই কালি তৈরি করে, সেটা আমাদের ব্যাঙ্গালোরের প্রতিবেশী শহর মহীশূরে অবস্থিত, তার নাম মাইসোর পেন্টস অ্যান্ড বার্নিশ লিমিটেড। আগে এর নাম ছিল মাইসোর ল্যাক অ্যান্ড পেন্টস। রং ও লাক্ষা তৈরির জন্য ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে এই কোম্পানির প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মহীশূরের রাজা চতুর্থ ওয়াড়িয়ার, যিনি তার আগে ব্যাঙ্গালোরে জমি দান করেছিলেন ইন্ডিয়ান ইনস্টিট্যুট অভ সায়েন্স প্রতিষ্ঠার জন্যও। দশ বছর পরে দেশ স্বাধীন হলে এটি একটি পাব্লিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হয়। এখন এই কোম্পানি কর্ণাটক রাজ্য সরকারের অধীনে পরিচালিত। প্রথম যে লোকসভা নির্বাচন হয়েছিল, তখন থেকেই আঙুলে কালি লাগানোর ব্যবস্থা চালু হয় এবং সেই কাজের জন্য সারা দেশের ভোটারদের আঙুলে লাগানোর কালি সরবরাহের দায়িত্ব পড়ে এই কোম্পানির ঘাড়ে। প্রথম সাধারণ নির্বাচনে প্রায় চার লক্ষ শিশি অর্ডার হয়েছিল, তার দাম ছিল সওয়া দু' লক্ষ টাকার কিছু বেশি। সেদিন থেকে আজ অবধি তারা এই গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছে।
এবারের ৭ দফা লোকসভা নির্বাচনের জন্য এই কোম্পানিতে ইলেকশন কমিশন থেকে অর্ডার গেছে ২৬ লক্ষ ৫৫ হাজার শিশি কালি সরবরাহের, যার মোট দাম ৫৫ কোটি টাকা। সোনারুপোর দাম বাড়ছে মানে সিলভার নাইট্রেটের দাম বাড়ছে, ফলে ভোটের কালির দামও বাড়ছে। একটা ১০ এম এল শিশির দাম এখন ১৭৬ টাকা। আপনি আপনার মহামূল্যবান ভোট দিয়ে এলেন, আপনার হাতে যে কালি লাগানো হ'ল তার দাম প্রায় আটানা! কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর মহম্মদ ইরফান জানিয়েছেন, এ বারের অর্ডারটাই সবচেয়ে বড় অর্ডার। স্বাভাবিক। মা ষষ্ঠীর কৃপা কম নয় আমাদের দেশের ওপর।
১৪০ কোটি জনগণের দেশে ৯৭ কোটির ওপর ভোটার, তাদের হাতের আঙুলে কালি লাগানো হয় কেবলমাত্র ইলেকশন কমিশন পরিচালিত ভোটের সময়। আইনবলে এর আর অন্য কোনো ব্যবহার নেই, একমাত্র ব্যতিক্রম হয়েছিল আপৎকালীন কোভিডের টিকা দেওয়ার বেলায়।
ভাবছেন, এর আর তেমন গুরুত্ব কী! এ তো যে-কেউ করতে পারে। আজ্ঞে না। ২৫টারও বেশি দেশ থেকে অর্ডার পায় মাইসোর পেন্টস অ্যান্ড বার্নিশ লিমিটেড সেই দেশে ভোটের সময় এই কালি ব্যবহারের জন্য। ক্যানাডা, ঘানা, নাইজেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা, নেপাল, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, কাম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ইত্যাদি দেশগুলো তাদের নির্বাচনের কালির জন্য এই ক্ষুদ্র কোম্পানির সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।

বুধবার, ২৯ মে, ২০২৪

মার্কড সেফ ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

ঝড় উঠেছে কাকদ্বীপেতে সেফ আছে কেউ মাদ্রাজে
ব্যাঙ্গালোরে সেফ আছে কেউ বলছে নিছক আন্দাজে।
ঝড় উঠেছে সোদরবনে সেফ আছে কেউ দিল্লিতে
সেফ আছে কেউ বনগাঁ,টালায় ইলেক্ট্রিকের বিল দিতে।
ফুঁসছে সাগর সাগরদ্বীপে সেফ আছে কেউ আসানসোল
সেফ আছে সেই আনন্দতে প্যাদাচ্ছে কেউ মাটন রোল।
ঘর ভেঙ্গেছে ভীষণ ঝড়ে ফ্রেদারগঞ্জ,মেদিনীপুর
সেফ আছে কেউ ব্যারাকপুরে সেখান থেকে অনেক দূর।
ঝড়ের দাপট বাংলাদেশে, খেপুপাড়া সাতক্ষীরায়
ঢাকায় বসে কেউ বলেছে সেফ আছি ভাই বারান্দায়।
এমনি করে মার্কড সেফএর ঝড় উঠেছে নেটপাড়ায়
বাধ ভেঙ্গেছে, ঘর ভেঙ্গেছে সব আনসেফ এ বর্ষায়।।

টিবির ওষুধ নাই ~ ডাঃ বিষাণ বসু

টিবি-ফিবি, মানে সাধুভাষায় যাকে যক্ষ্মা বলে, সেসব নিয়ে আজকাল আর কেউ কথা বলে না।
স্বাস্থ্য নিয়ে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্তরা যখন কথা বলেন - বিশেষ করে এই শ্রেণীটির কথা বলছি, কেননা এঁদের একটা ভয়েস থাকে, অন্তত থাকাটা সম্ভবপর, থাকাটা নিদেনপক্ষে উচিত, যেটা ক্ষমতার উপরমহলের কর্ণগোচর হওয়ার সম্ভাবনা থাকে - তো এঁরা যদি অসুখ-বিসুখ নিয়ে কথা বলেন, তা, ইদানীং, শুধুই হাইটেক চিকিৎসা নিয়ে। অর্থাৎ আলোচনা বলতে শুধুই অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট, ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি, ক্যানসারের নিত্যনতুন চিকিৎসা এসব নিয়ে। নিতান্তই যদি তা না হয়, তাহলে সুস্থ থাকতে হলে অ্যাভোকাডো নাকি অ্যাসপারাগাস কোনটা বেশি করে খাওয়া উচিত, এসব গুরুগম্ভীর আলোচনা। বলাই বাহুল্য, টিবি বলে যে একটা অসুখ রয়েছে, দেশের কয়েক লক্ষ নাগরিক যে সে অসুখে ভুগছেন এবং এঁদের মধ্যে বেশ কয়েক হাজার মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট টিবিতে ভুগছেন, যাঁদের প্রচলিত কোনও ওষুধেই কাজ হচ্ছে না - সে নিয়ে জনগণ, মানে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত সেভাবে বিচলিত নন।
কেননা, এঁদের চোখে টিবি গরীবের অসুখ। মানে, গরীবের অসুখ বলেই সচেতনভাবে এঁরা প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যান, এমন নয়। কিন্তু দেশের 'অগ্রগতি'-র অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো - দারিদ্র্য নিশ্চিহ্ন না হলেও আমাদের চোখের সামনে থেকে দরিদ্রদের হাপিস করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এবং সেই সঙ্গে দরিদ্রদের সমস্যাগুলো নিয়ে আমাদের ভাবনাচিন্তার অভ্যেস - যৎকিঞ্চিত হলেও কিছুটা তো ছিল - তা-ও অন্তর্হিত।
টিবি বিষয়ে এমন ভাবনার দুরকম সমস্যা। প্রথমত, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত সমাজ কোনও সমস্যাকে গুরুত্বহীন মনে করলে সরকারের চাড় থাকে না সে সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়ার, কেননা, আগেই বলেছি, শ্রেণী হিসেবে এঁদের কিঞ্চিৎ গলার জোর থাকে (ঠিক একারণেই, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা ছেড়ে কর্পোরেট হাসপাতালমুখী হওয়ার সঙ্গে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিষয়ে সরকারের অবহেলাকে যোগ করে দেখা সম্ভব)। আর দ্বিতীয়ত, সংক্রামক ব্যধি আর্থসামাজিক বিভাজন মেনে চলে না। টিবি এক্সক্লুসিভলি গরীবের অসুখ, এমন নয়। তদুপরি, আজ যা গরীব-গুর্বোদের অসুখ, কাল তা আপনার সন্তান বা বৃদ্ধ মাতাপিতাকেও আক্রান্ত করতে পারে। করছেও। দেশের যক্ষ্মা-আক্রান্তদের মধ্যে মধ্যবিত্ত-উচ্চমধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্তের সংখ্যা কিছু কম নয়। যক্ষ্মায় যদি রাশ টানা না যায়, তাহলে সংখ্যাটা ভবিষ্যতে বাড়বে।
আরও এক সমস্যা, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে ওষুধ আবিষ্কারের গবেষণা যে পথে চলছে, তাতে অসুখ সারিয়ে দেওয়ার ওষুধ আবিষ্কারের ক্ষেত্রে কোম্পানির উৎসাহ কম - কেননা, অসুখ সেরে গেলে ওষুধ খাওয়া বন্ধ, কোম্পানির লাভও কম। তার চাইতে সেসব ওষুধ আবিষ্কারে লাভ, যাতে আজীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হয় - হাইপারটেনশন, ডায়াবেটিস ইত্যাদি - এমনকি ক্যানসারের যেসব নিত্যনতুন ওষুধ বাজারে আসছে, সেগুলিও অসুখ সারায় না, অসুখ নিয়ন্ত্রণে রাখে মাত্র। অতএব বলাই বাহুল্য, যক্ষ্মার মতো উপেক্ষিত অসুখের ভাগ্যে নতুন ওষুধ জোটেনি।
অর্থাৎ, যক্ষ্মার মতো দীর্ঘমেয়াদি ও জটিল অসুখের ক্ষেত্রে পুরনো ওষুধগুলোই ভরসা। যদি জীবাণু সেসব ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-ক্ষমতা গজিয়ে ফেলে, তাহলে অন্যান্য কিছু অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে চিকিৎসার সুযোগ থাকে বটে, কিন্তু সে চিকিৎসা অত্যন্ত জটিল, সারিয়ে তোলা খুবই কঠিন।
এমতাবস্থায়, প্রাথমিক পর্যায়েই রোগ নির্ণয় করে চটজলদি ওষুধ খাইয়ে অসুখ সারিয়ে তোলা, বাকি সব অসুখের ক্ষেত্রে একথা একইভাবে সত্য হলেও যক্ষ্মার ক্ষেত্রে কথাটা আরও একটু বেশি করে সত্য।
কিন্তু মুশকিল হলো, যক্ষ্মার ওষুধটিই আপাতত অমিল।
হ্যাঁ, ঠিকই শুনেছেন, টিবি-র ওষুধ আপাতত পাওয়া যাচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালে এবং বাইরের দোকানে - দুজায়গায়ই ওষুধের জোগান অনিয়মিত।
কিন্তু এই খবরটুকু আপনি জানেন না, তাই না?
ভোটের তুমুল হইহল্লার বাজারে আমার দুটি ভাই Anirban Datta আর Smaran Mazumder এমন অপ্রিয় এবং পলিটিকালি ইনকারেক্ট বিষয় নিয়ে গান বেঁধেছে, আপনাদের জানানোর জন্য। তবুও আপনি জানবেন না?
"গণতন্ত্রে আর নাই রক্ষা
যাদের বুকের ভেতর যক্ষ্মা!
নখে কালির দাগ যাদের
ওষুধ মিলছে না যে তাদের..."
একটু মনে করিয়ে দিই, যক্ষ্মা অত্যন্ত জটিল গোত্রের সংক্রামক ব্যাধি। যার চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি। অন্তত মাসছয়েক ওষুধ খেতে হয়। অনিয়মিত ওষুধ খেলে জীবাণু সাধারণ ওষুধগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ-ক্ষমতা তৈরি করে ফেলে - তারপর আর ওষুধ খেলেও সহজে অসুখ সারতে চায় না। এবং সেই ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণু যদি বাজারে বহুল হারে ছড়িয়ে পড়তে থাকে, তাহলে যক্ষ্মা প্রকৃতপ্রস্তাবেই মহামারীর আকার নেবে। নগর পুড়িলে দেবালয়ই রক্ষা পায় না, তো আপনি কোন হরিদাস পাল!!
"গণতন্ত্রকে খায় ঘুষ
আর টিবি খায় ফুসফুস
প্রজার গর্বভরা বুকে
রক্ত ছলকে ওঠে মুখে..."
ভোটের বাজারে সান্ধ্য গলাবাজি থেকে হাতাহাতি, সবই তো দেখছেন। তবু...
"আসবে রাজা যাবে রাজা
নিয়ম বলে তা-ই।
শুধু জানল না কেউ
হাসপাতালে টিবি-র ওষুধ নাই।"
জানুন এবং জানান। গানটির লিঙ্ক রইল টিবির ওষুধ নাই। নিজে শুনুন এবং অপরকে শোনান।
পুনঃ- বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিবি-কে কাবু করার জন্য লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন ২০৩০ সাল। আমাদের দেশ অবশ্য ভাবনাচিন্তায় অনেক এগিয়ে। সরকার জানিয়েছেন, ২০২৫-এর মধ্যেই তাঁরা টিবি-কে ঘায়েল করে ফেলবেন। ওষুধ তো অমিল। তাহলে? যাক গে, সরকার যখন ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয়ই ভালো কিছু ভেবেই করেছেন, তাই না?

সোমবার, ২৭ মে, ২০২৪

হান্স, গল্প ও সত্যি ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আট বছরের ছোট ছেলে হান্স এর গল্প। পুরোনো গল্প। বিদেশি গল্প। হান্স এর বাড়ি ছিল হল্যান্ড এর হার্লেমে। নদী/সাগর বাঁধের ধারে ছোট্ট শহর। এক সন্ধ্যের সময়ে বন্ধুর বাড়ি থেকে ঘরে ফিরছিল হান্স নির্জন বাঁধের পাশ দিয়ে। জল পড়ার আওয়াজ শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেল যে বাঁধের দেওয়ালের গায়ে একটা ছোট ফুটো হয়েছে। তাই দিয়ে জল পড়ছে। আর কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে হান্স ওই ফুটোতে নিজের আঙ্গুলটা ঢুকিয়ে দিল। ব্যাস, অমনি জল পড়া বন্ধ। এভাবেই দাঁড়িয়ে ছিল হান্স সারারাত। কারণ সরে গেলেই জলের তোড়ে ফুটোটা বড় হয়ে যাবে, বাঁধ ভেঙে পড়বে আর ভেসে যাবে গোটা শহর। 

এটা গল্প ছিল। সত্যি ঘটনা নয়। আজকে আবার এই পুরোনো গল্পটা শোনানোর কারণ আছে। পৃথিবীর নানা প্রান্তে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক (এবং আজকাল মানব সৃষ্ট) দুর্যোগ বা বড় মাপের বিপর্যয়ের মোকাবিলা করার চর্চাও জনস্বাস্থ্য বিজ্ঞানের একটা অন্যতম বিষয়। দেখা গেছে যত দ্রুত ওই বিপর্যয় পীড়িত মানুষগুলির পাশে দাঁড়ানো যায়, তত মঙ্গল। তাই রেপিড রেসপন্স টিম তৈরি হয়। 

এসব আধুনিক ব্যবস্থা তৈরি হওয়ার আগেও বিপর্যয় ছিল, মানুষ তার মোকাবিলাও করেছে। হান্স তারই উদাহরণ। দেখা গেছে যে যেসব সমাজে বা গোষ্ঠীতে সামাজিক মেলামেশা বা বন্ধন বেশি তারা তত ভালভাবে ওই বিপর্যয়ের মোকাবিলা করতে পেরেছে একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়ে। এই অভ্যেস ভুলে গিয়ে আমরা সামাজিক ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে এক একটা পরিবার নিঃসঙ্গ দ্বীপের মতো বসবাস করতে শুরু করেছি। 

কিন্তু এই নিয়মের ব্যতিক্রম আছে। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার রায়দিঘির বহু মানুষ দেখেছেন। ঝরে বন্যায় আইলায় আম্পানে বিধ্বস্ত মানুষ গুলো দেখেছে এক প্রৌঢ়কে। ঈষৎ মোটাসোটা কালোকুলো চেহারা, ধুতিটা হাঁটুর ওপরে। লেগে গেছেন ত্রাণের কাজে। 

হ্যান্স এর গল্পে ফিরে আসি। এক যাজক সারা রাত অসুস্থ বন্ধুর সেবা করে নিজের বাড়ি ফেরার পথে ভোর বেলায় একটা গোঙানির আওয়াজ শুনে এগিয়ে গিয়ে ছোট্ট হান্স কে আবিষ্কার করেন। ঠান্ডায়, ব্যাথায় ভয়ে যন্ত্রণাকাতর হান্সকে।তারপরে আরো অনেক লোক ডেকে নিয়ে আসেন ওই যাজক। হান্স ছাড়া পায়। বাঁধের মেরামতি হয়। হান্স হয়ে যায় জাতীয় হিরো।

আমার গল্পের হিরো সেই প্রৌঢ় কখনো হিরো কখোনো জিরো। চিত্রাভিনেত্রীর কাছে নির্বাচনে হার। তবুও মানুষটা ঘরে বসে থাকেন নি। যেকোনো বিপর্যয়ে সবার আগে ঘটনাস্থলে। রেপিড রেসপন্স টিম। কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন, উনি নাকি ঝড়ের আগেই পৌঁছে যান। মানুষটাকে আবার দেখতে পাচ্ছি প্রচারের আলোয়।  রেমাল আছড়ে পড়ার এপিসেন্টারে।

উনি ভোটে জিতুন বা হারুন তাতে আমার কিস্যু এসে যায় না। শুধু জানি আমাদের হান্স বেঁচে আছেন। রায়দিঘির মানুষের দুঃখ দুর্দশা দূর করার জন্য দেওয়া বাঁধের ফাটলে সারারাত হাত ঢুকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আমাদের নিজেদের হান্স। আমাদের প্রেরণা হয়ে, মিথ হয়ে, উপকথার নায়ক হয়ে বেঁচে থাকুন হান্স। সেলাম।


বুধবার, ৮ মে, ২০২৪

রবীন্দ্রনাথ , বুর্জোয়া কবি ; এবং... ~ রাজদীপ বিশ্বাস রুদ্র

ফি বছর ২৫ শে বৈশাখ এলেই একটি অভিযোগ খুব উঠতে দেখি ইদানীং ― " কমিউনিস্টরা তো রবীন্দ্রনাথকে বুর্জোয়া কবি বলেছিলো "! অভিযোগটি মূলত আসে তাদের দিক থেকে যারা স্কুল সিলেবাস থেকে রবীন্দ্রনাথ এবং ডারউইনকে ছেঁটে ফেলেছে। অভিযোগের উত্তরে বামপন্থীরা যুক্তি দেন - ওই মূল্যায়ন সিপিআই নেতা, প্রাবন্ধিক ভবানী সেনের ব্যক্তি মূল্যায়ন। ভবানী সেনের ব্যক্তি মূল্যায়ন কমিউনিস্ট পার্টির দলগত মূল্যায়ন ছিল না। মজা হলো, পক্ষ এবং বিপক্ষের লোকজন যদি একটু তথ্যনিষ্ঠ হতেন, যদি তারা জানতে চেষ্টা করতেন নিজের শ্রেণী অবস্থান সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের আত্ম মতামতটি ঠিক কি ছিল, তাহলে তারা একটি আশ্চর্য তথ্যের খোঁজ পেতে পারতেন। তারা দেখতে পেতেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজেকে বলতেন - " জাত - বুর্জোয়া "!  

সাহিত্যকে শ্রেণী দৃষ্টিতে বিচার করার বিষয়টি রবীন্দ্রনাথের পছন্দ ছিল না। সাহিত্য বিচারে ভাব এবং অন্তরের সম্পদকেই রবীন্দ্রনাথ বিবেচ্য মনে করতেন। সেই প্রসঙ্গেই ১৭.০৩.১৯৩৯ এর চিঠিতে অমিয় চক্রবর্তীকে তিনি লিখছেন - ময়মনসিংহগীতিকা পড়ে তিনি খুবই আনন্দ পেয়েছেন। শ্রেণী বিচারে ময়মনসিংহগীতিকা হয়ত প্রলেতারিয়েত। আর তিনি নিজে জাত - বুর্জোয়া। তাতে গ্রন্থটির রসাস্বাদনে তার কোন অসুবিধা হয়নি। স্পষ্টতই বোঝা যায়, নিজের শ্রেণী অবস্থান সম্পর্কে কতটা অকপট ছিলেন, কতটা স্বচ্ছ ধারণা রাখতেন রবীন্দ্রনাথ। 

বুর্জোয়া শব্দটি যে গালাগালি নয়, ওইটি যে একটি শ্রেণীগত অবস্থানবাচক শব্দ, তা তথাকথিত রবীন্দ্র অনুরাগী দক্ষিনপন্থীরা না বুঝলেও, রবীন্দ্রনাথ বুঝতেন। নিজের সম্পর্কে " জাত বুর্জোয়া " বিশেষণ ব্যবহারে তাই কোনও কুন্ঠা ছিল না তার। নিজের শ্রেণীগত অবস্থান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন বলেই হয়ত তার পক্ষে শ্রেণীগত অবস্থানের উর্ধ্বে ওঠার প্রচেষ্টা সম্ভব হয়েছিল। তার কৃষি সমবায় গঠনের প্রচেষ্টা, সোভিয়েত প্রীতি, সোভিয়েত ব্যবস্থার প্রতি তার অকুন্ঠ সমর্থন মোটেই কাকতালীয় নয়।

রবীন্দ্রনাথকে " বুর্জোয়া কবি " বললে কি তার সৃষ্টিকে অপমান করা হয়? মোটেই না। বরং উল্টো। লেনিন প্রলেতারিয় সংস্কৃতি প্রসঙ্গে লিখেছেন - প্রলেতারিয় সংস্কৃতি আকাশ থেকে পড়বে না, বাতাস থেকেও তৈরী হবে না। বুর্জোয়া সংস্কৃতির যা কিছু বৈপ্লবিক,যা কিছু মহান, তার প্রকৃত উত্তরসূরি হয়ে উঠতে হবে প্রলেতারিয়েতকে। একমাত্র এভাবেই প্রলেতারিয়েতের পক্ষে নিজস্ব সংস্কৃতির নির্মান সম্ভব। 

সোভিয়েতে  পুশকিন, গোগোল, টলস্টয়, চেকভ বর্জিত হননি। তারাও সামন্ত অথবা বুর্জোয়াই ছিলেন। কেউই প্রলেতারিয়েত বা কমিউনিস্ট ছিলেন না। তাদের শ্রেণীগত অবস্থান গোপন না করেই সোভিয়েত কমিউনিস্টরা তাদের সৃষ্টিকে ধারণ করেছেন। তাদের সাহিত্যগত ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হয়েই তারপর নির্মিত হয়েছে - সোভিয়েত সাহিত্য।

ছবি : অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা রবীন্দ্রনাথের চিঠিটি।

শনিবার, ৪ মে, ২০২৪

পাউন্ড ফর পাউন্ড ~ ডঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

নিউইয়র্ক হারলেম এর ১৫ বছরের কৃষ্ণাঙ্গ বাচ্চা ছেলেটা বন্ধুর বার্থ সার্টিফিকেট চুরি করেছিল। বয়েস কমানোর জন্য নয়। বাড়ানোর জন্য। না হলে বক্সিং টুর্নামেন্ট এ নামার অনুমতি পাচ্ছিল না। রাতারাতি ওয়াকার স্মিথ জুনিয়ার হয়ে গেল রে রবিনসন। 

ওয়াটারটাউন নিউইয়র্কে ম্যাচ চলার সময়ে দর্শক আসন থেকে এক মহিলা বলে ফেললেন, কী মিষ্টি ছেলে, চিনির মতো মিষ্টি। ব্যাস। নামের সাথে জুড়ে গেল শব্দটা, সুগার। অন্য বক্সাররা, তাদের ট্রেনাররা আর ক্রীড়া সাংবাদিকরা একবাক্যে মেনে নিয়েছেন যে এই পৃথিবী নামক গ্রহটিতে জন্ম নেওয়া সর্বকালের সেরা বক্সার সেই পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চির ছেলেটি। নাম সুগার রে রবিনসন। 

গড়পড়তা আমেরিকানদের তুলনায় ছোটখাটো শরীর দিয়েছিল প্রকৃতি। অসম্ভব পরিশ্রম, অতুলনীয় ডেডিকেশন, মনের জোর এগুলো দিয়ে সেই অসুবিধে অতিক্রম করেছিল রবিনসন।

১৯৯৯ সালে রবিনসন "শতাব্দীর সেরা ওয়েলটারওয়েট বক্সার"; "শতাব্দীর সেরা মিডলওয়েট বক্সার" আর "শতাব্দীর সেরা ফাইটার" আখ্যা পান এসসিয়েটেড প্রেস এর কাছ থেকে। ২০০৭ সালে ইএসপিএন এর"সর্বকালের সেরা পঞ্চাশ জন বক্সার" এর যে তালিকা প্রকাশ করে তাতে প্রথম নাম ছিল রবিনসন এর। 

মহম্মদ আলি এর নাম বেশি বিখ্যাত। তিনি গ্রেটেস্ট বলে পরিচিত। তিনি তাঁর প্রতিভার জোরে বিখ্যাত হয়েছেন। তাঁকে ছোট করার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু আলী আর রবিনসন এর তুলনার প্রশ্ন মনে আসতেই পারে। এরা দুজনে কোনোদিন একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করেন নি। কারণ বক্সিং এর নিয়ম। বক্সারের দৈহিক ওজন অনুযায়ী কতোগুলো বিভাগ তৈরি হয়।  ছয় ফুট তিন ইঞ্চি লম্বা আলী ছিলেন হেভিওয়েট বিভাগের খেলোয়াড়। 

রবিনসন এর দক্ষতা ও প্রতিভায় মুগ্ধ ক্রীড়া সাংবাদিকরা একটা শব্দবন্ধ আবিষ্কার করে ফেলেন তাকে অন্য বিভাগের বক্সারদের সাথে তুলনা করার জন্য "pound for pound"  (ও দেশে ওজন মাপা হয় পাউন্ড দিয়ে)।

মহম্মদ আলী, জো লুই, সুগার রে লিওনার্দ এর মতো বিখ্যাত বক্সাররা একবাক্যে মেনে নিয়েছেন যে বক্সিং খেলাটার ফেয়ার প্লে স্পিরিট মানতে গিয়ে হেভিওয়েট এর সাথে ওয়েলটার ওয়েট এর লড়াই চলে না ঠিকই তবে "পাউন্ড ফর পাউন্ড" নীতি মানলে ওই সুগার রে রবিনসনই হলেন ক্রীড়া ইতিহাসের সর্বকালের সেরা মুষ্টিযোদ্ধা। পাউন্ড ফর পাউন্ড হল লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির একটা কনসেপ্ট বা ধারণা। সমানুপাতিক প্রতিদ্দ্বন্দিতা। 

বক্সিং ফেয়ার প্লে নিয়ম অনুযায়ী কোনোদিনই ১০০ পাউন্ড ওজনের কোনো বক্সার কে বলা হবে না, বাদবাকি নিয়মকানুন তো একই, তাই তুমি ভাই ২০০ পাউন্ড ওজনের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে নেমে যাও। ভাই রবিনসন, একটু নামো তো দেখি মহম্মদ আলীর বিরুদ্ধে। কারণ ওটা ফেয়ার প্লে নয়। 

ঠিক তেমনভাবে মাধ্যমিক মেধা তালিকায় যারা স্থান করে নিয়েছে তাদের মেধা বুদ্ধি পরিশ্রমকে কোনোমতেই ছোট করা যায় না। কিন্তু এই সেরার সেরাদের সাথে মেধাতালিকায় যারা জায়গা পায় নি তাদের তুলনা করার প্রশ্নটা অনায়াসে চলে আসে। আমরা হামেশাই করে থাকি। এবং করে থাকি অনায়াসে ভুলে যে এই প্রতিযোগিতায় কোনো লেভেল প্লেইং ফিল্ড ছিল না। ছিল না কোনো "pound for pound" নিয়ম। ১০ জন গৃহ শিক্ষক সহ সারাদিন মুখ গুঁজে পড়াশোনা করার সুবিধে পাওয়া ছাত্র/ছাত্রীর সাথে বাবা হারা সংসারে মায়ের মুদির দোকান চালানো সামান্য রোজগারে বা কমিউনিস্ট পার্টির হোলটাইমারের সামান্য  রোজগারে বড় হয়ে ওঠা বা কোনো গৃহ শিক্ষক এর সাহায্য ছাড়াই পরীক্ষা প্রস্তুতি নেয়া কোন এক ছাত্র/ছাত্রীর সাথে তুলনা আমরাই করে থাকি। 

জীবনতো আর বক্সিং রিং নয়, ফেয়ার প্লে আইন খাটে না। ফেদারওয়েট এর বিরুদ্ধে অনায়াসে নেমে যায় হেভিওয়েট। আমরা হটাৎ চমকে যাই যদি দেখি সুগার রে রবিনসনের মতো কোনো চ্যাম্পিয়ন চলে আসে। ওই পার্টি হোল  টাইমার উমেশ প্রসাদ এর ছেলেটার কথাই ধরা যাক।  বালুরঘাট হাই স্কুলের ছাত্র উদয়ন প্রসাদ বাবা মা ভালোবেসে যার ডাকনাম দিয়েছেন লেনিন। মাধ্যমিকে তৃতীয় স্থান পাওয়া লেনিন। ভারী মিষ্টি চেহারার ছেলে ঠিক যেমনটি ছিলেন সুগার রে রবিনসন। অভাব অনটনের সাথে লড়াই করে বড় হওয়া উদয়ন/লেনিন।

ওকে এই অসম প্রতিযোগিতায় নামতে হয়েছে বলে দুঃখ করার কোনো জায়গা নেই। আবারো বলি যে জীবন এর খেলায় বক্সিং এর কোনো নিয়ম চলে না। রিংয়ে নেমে যেতে হয়। তারপরে পাঞ্চ আর জ্যাব আর হুক। নানা ঘুষিতে অনায়েসেই হেভিওয়েটরা বিপর্যস্ত করার চেষ্টা করে ফেদারওয়েটকে। আমরা খালি দর্শক আসনে বসে দেখে যাই কি ভাবে অসম্ভব পরিশ্রম, অতুলনীয় ডেডিকেশন, মনের জোর দিয়ে লড়াই চালিয়ে যায় একের পর এক ফেদারওয়েট। ঘুঁষি খেয়ে মাটিতে পরে গিয়েও নক আউট হয়ে যায় না।  আবার উঠে দাঁড়ায় লড়াই এর আঙিনায়। অদৃশ্য রেফারি বারবার গুনে যান এক, দুই, তিন, চার .....

মুখের কষ বেয়ে বয়ে আসা রক্তধারাকে গ্লাভসের উলটো পিঠে মুছে নিয়ে লঘু পায়ে ঘুরে ঘুরে নেচে নেচে  লড়াই দেয় ছিপছিপে চেহারার  আমাদের রবিনসন উদয়ন/লেনিন

সুধী দর্শকমন্ডলী, যারা রিং এর চারপাশে বসে আছেন, দিল থামকে বৈঠিয়ে জনাব। পিকচার আভি বাকি হ্যায়। আরো হাজারো উদয়নের লড়াই এখনো বাকি। পৃথিবী একদিন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে, হবেই। করে ছাড়বো আমরা। পাউন্ড ফর পাউন্ড। উদয়ন/লেনিন এর কাছে, লেনিনদের কাছে আমাদের অঙ্গীকার। "পাউন্ড ফর পাউন্ড"

বুধবার, ১ মে, ২০২৪

পয়লা মে এবং গোপালবাবুর গপ্পো ~ ইন্দ্রনীল সুমন

গোপালবাবু কোমরের বেল্টের চামড়া উঠে গেলে জামা গুঁজে পরেন না, বলেন গরম লাগে... গোপালবাবু মাসের সতেরো তারিখের পরে মেট্রো থেকে নেমে রিক্সা নেন না, হেঁটে আসেন, কোলেস্টেরলটা ঐ সময় একটু বেশীর দিকে থাকে, গোপালবাবু মাঝারি সাইজের লাইলেনটিকাকে চারপিস করতে বলে মাছকাটার লোকের কাছে ঝামটা খান, গোপালবাবু বসের ছেলের স্কুলপ্রজেক্টের খাতা রেডি করে দেন ছুটির পরে... ফ্রিতে, গোপালবাবু অফিস ফেরতা তিনদিন টিউশন করেন, আরও দুটো বাড়ানোর চেষ্টায় আছেন, গোপালবাবু সকাল আটটা কুড়ির মেট্রো ধরেন, অফিস ছাড়েন সন্ধ্যা সাতটায়, গোপালবাবু "শ্রমিক" নন, গোপালবাবু অফিসের দুই নম্বর, মালিকের পরেই, গোপালবাবুর ইচ্ছা হয় অফিস যাওয়ার আগে একটু বাগান করার...ইচ্ছা হয় অফিসের পরে বাড়ি ফিরে ছেলেকে দুটো বিপরীতমুখী ট্রেন আর প্লাটফর্মের অঙ্ক বোঝাতে বোঝাতে ছোটোবেলায় দেখা বৃষ্টি ভেজা খুর্দা রোড স্টেশনের ছবি আঁকতে... গোপালবাবুর বিবাহবার্ষিকীর ভোরে অফিসট্যুরে যেতে ইচ্ছা করে না... গোপালবাবু কলেজজীবনে হে মার্কেটের নাম শুনেছিলেন কি না মনে করতে পারেন না... গোপালবাবু "শ্রমিক" নন, গোপালবাবু অফিসের দু-নম্বর...

রবিবার, ২৮ এপ্রিল, ২০২৪

কাঙাল হরিনাথ ~ নবশ্রী চক্রবর্তী বিশ্বাস

গ্রীষ্মের অপরাহ্ন। গ্রামের কচিকাচার দল বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে গৃহে ফিরছিল। পথ প্রায় জনশূন্য ছিল এতক্ষণ। এখন শিশুদের কলকাকলিতে পথ-ঘাট-পুকুরের যেনো তন্দ্রাভঙ্গ হল। শিশুদিগের মুখে এক অপূর্ব আহ্লাদ! গ্রীষ্মের প্রখর দাবদাহও সেই উত্তেজনায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলতে পারেনি। তাদের গ্রীষ্ম-অবকাশের সূচনা হয়েছে যে! সেই আনন্দই তাদের চোখেমুখে প্রতীয়মান। পথপার্শ্বে চণ্ডীমণ্ডপের দক্ষিণের একটি কক্ষ থেকে কোলাহলের শব্দ শুনে কিছু শিশু থমকে দাঁড়ালো, বাকি শিশুরা নিজ নিজ বাড়ীর পথ ধরলো। 

      দুটি শিশু কোলাহলের শব্দ অনুসরণ করে খুব ধীরে পদসঞ্চারণ করে কক্ষের গবাক্ষের সমীপে এসে স্থির হয়ে দাঁড়ালো। তন্মধ্যে একজন শিশু কৌতুহলবশতঃ উকিঝুঁকি দিতে উদ্যত হ'লে কক্ষের অন্দর থেকে এক যুবক কণ্ঠ ভেসে এলো। যুবকটি দৃপ্তকণ্ঠে বলে উঠলো, "একটা বাউলগানের দল করলে কেমন হয়! তোমরা কি বলো!" কথাটা শেষ হতেই ঘরে এক নিস্তব্ধতার পরিবেশ সৃষ্টি হল। আরেক যুবক উত্তর দিলো, "কথাটা মন্দ বলোনি অক্ষয়। এইতো প্রাতঃকালে কালিগঙ্গা থেকে এক বাউল এসেছিলেন। শুনেছি তাঁর অনেক শিষ্য। কি যেন নাম!" পাশ থেকে আরেক যুবক উত্তর করলেন, "লালন ফকির! কি ভারী সুন্দর একখানি গান শোনালে গো!" যুবকটি সম্মতি জানিয়ে আবার বলতে শুরু করলো, "তিনি পারলে, আমরাও পারবো।" অক্ষয় বললো, "ঠিক! আজই, এখন থেকেই আমরা বাউল দল তৈরী করবো।" অপেক্ষাকৃত এক বয়স্ক ব্যক্তি বললে, "কাজটি সহজ নয় অক্ষয়। নতুন গান বাঁধতে হবে যে!" অক্ষয় বললো, "হলে হবে, আমরা ভয় করবো না। একটা কলম আর কাগজ নিয়ে আয় জলদা! আর যা যা বলছি, কাগজে লিখেনে।" জলদা নামের যুবকটি বাধ্য ছেলের মত একটা কাগজ ও কলম নিয়ে লিখতে বসে গেলো। অক্ষয় বলতে শুরু করলো -
  
"ভাব মন দিবানিশি, অবিনাশি,
                  সত্য- পথের সেই ভাবনা।
যে পথে চোর ডাকাতে, কোন মতে,
                  ছোঁবে না রে সোনা দানা । ....... "

    গানটির অনেক কলি লেখা হ'লে, অক্ষয় থামলো। মধ্যবয়সী পুরুষটি বললেন, "এতে তো হবেনা। বাউল গানের নিয়ম হলো গানের শেষে ভণিতা দিতে হবে।" তার সামনে বসা যুবকটি বললো, "আপনি পণ্ডিত মানুষ, আমাদের এইটুকু ত্রুটি নয় মার্জনা করলেন!" অক্ষয় বললো, "না লিখছি যখন, নিয়ম মেনেই লিখবো।" উত্তেজিত হয়ে জলদা বললো, "এতো চিন্তার কি আছে ভাই! চল না কাঙালের কাছে যাই। তিনিই সুন্দর ভনিতা লিখে দেবেন।" অক্ষয় বলল, "না জলদা, আমিই ভণিতা লিখবো। তাঁকে আমি অবাক করে দিতে চাই।" জলদা আবার কলম ধরল, অক্ষয় বলতে লাগলো -
    
     "ফিকিরচাঁদ ফকির কয় তাই, কি কর ভাই,
                                          মিছামিছি পর ভাবনা ।
        চল যাই সত্য পথে, কোন মতে,
                                           এ যাতনা আর রবে না।"
     
    গানের ভণিতা সমাপ্ত হলো। সকলে সমস্বরে বললো, ঠিক, এই ফিকিরচাঁদ নামটাই সঠিক। জলদা বললো, "আমাদের তো ধম্ম ভাব নেই এক চিলতে। ফিকিরে সময় কাটাবো, এটাই মুখ্য উদ্দেশ্য।" 

      গানের সুর দিলেন আরেক যুবক। সুর শেষ হতেই জলদা বললো, "চল হে, একবার কাঙালকে শুনিয়ে আসি।" এই বলে যুবকগুলি দল বেঁধে সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে অনতিদূরে পার্শ্ববর্তী এক ছোট কুটিরের উদ্দেশ্যে চললো। শিশুগুলি নিঃশব্দে এতক্ষণ তাদের কথা শুনছিল। তারা এখন যুবকদলটিকে অনুসরণ করতে লাগলো। তারা ভাবলো, এবার বুঝি খুব আমোদ হবে। উত্তেজনায় যুবকদলের কেউ শিশুগুলিকে খেয়াল করলো না। যুবকদল সেই ছোট কুটিরে প্রবেশ করলো। কুটিরের একটি কক্ষে এক মধ্যবয়সী মানুষ, একটি কাষ্ঠনির্মিত ভগ্ন আরামকেদারায় বসে কি যেন লিখছেন। তার গাত্রে ছিন্ন- পরিচ্ছন্ন -শুভ্রবস্ত্র, কেশ রুক্ষ, চোখ দুখানি আয়ত - উজ্জ্বল, মুখখানি জীবনযুদ্ধে কিছুটা ম্লান হলেও, জীবনীশক্তিতে ভরপুর। যুবকের দল একে একে এসে নিঃশব্দে তার সম্মুখে এসে দাঁড়ালো। তাঁর ছোট কুটিরের কক্ষে আর স্থান সংকুলান হয়না! এদিকে মানুষটির কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। তিনি লিখেই চলেছেন আপনমনে। হঠাৎ যুবকদলের মধ্যে কারো কারো ধৈর্য্যচ্যুতি ঘটলো। তাদের মধ্যে মৃদুস্বরে বাক্যালাপ শুরু হ'লে, সেই শব্দেই মানুষটি লেখা ছেড়ে যুবকদলের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। তাদের দেখে তিনি যারপরনাই তৃপ্তি পেলেন। সেই তৃপ্তি তাঁর ব্যবহারে ও কণ্ঠস্বরে প্রকাশ পেল । তিনি যুবকদের সোৎসাহে বললেন, "আরে তোরা! কি ব্যাপার! কোনো সংবাদ আছে নাকি! একেবারে দল বেঁধে!" জলদা বললো, "আছেই তো ! তাই তো এলাম। আমরা বাউলগান লিখেছি। সুর করেছি। আপনাকে শোনাতে এলাম। আপনি যদি রাজী হন, তো কাল থেকেই আমরা এই গান গেয়ে গ্রামের পথে পথে ঘুরবো।" মানুষটি হাতের কাগজটা রেখে এসে বললো, "শোনা দেখি!" তাঁর উৎসাহ দেখে যুবকদল ততোধিক উৎসাহে গান ধরলো। গান গাইতে গাইতে তারা নাচতে লাগলো। মানুষটিও তাদের সাথে যোগ দিলো। মনে হলো, কিছু বাউল মনের আনন্দে গান গাইছে আর নাচছে। শিশুর দল বড়ই আমোদ অনুভব করলো। নাচ-গান সমাপ্ত হলে শিশুর দল স্ব স্ব বাড়ীর উদ্দেশ্যে ধাবিত হল। পথে যাদের সাথেই দেখা হলো, তাদেরই বললো, "কাল এখান দিয়ে বাউল গানের দল যাবে গো।" সকলেই উৎসাহিত!

     এদিকে কক্ষ মধ্যে শোরগোল পরে গেল। যুবকের দল উত্তেজনায় ফুটতে লাগল। কাঙাল বললেন, "দ্যাখ, একটা গানে তো আর বাউলের দল হয় না। তাই ভাবছি আমিও একটা লিখবো। অক্ষয় কলম ধর!" তিনি বলতে লাগলেন -
  
    "আমি কোরব এ রাখালী কতকাল ।
      পালের ছটা গরু ছুটে,
                         করছে আমার হাল বেহাল ।
     আমি, গাদা করে নাদা পুরে রে,
    কত যত্ন ক'রে খোল বিচালী খেতে দিই ঘরে ;.....,"

     এই দুটি গান সম্বল করে পরের দিন যুবকদল সন্ধ্যাকালে বাউলের পোশাকে ও সজ্জায় সুসজ্জিত হয়ে খোল করতাল নিয়ে গ্রামের পথে বেরোলো। তাদের নগ্নপদ, গেরুয়া বসন, কারো মুখে কৃত্রিম দাড়ি, কিন্তু মুখে সকলের অনাবিল হাসি। গ্রামের মেঠো পথ ধরে "ফিকিরচাঁদ ফকিরের" দল গান গাইতে গাইতে চললো। বাউলের দলের সম্মুখে চললেন কাঙাল। তাঁকে অনুসরণ করলেন তাঁর স্নেহধন্য যুবকরা। পথের দুই ধারে মানুষের ঢল নামলো। এইভাবে একদিন-দুইদিন-তিনদিন করে প্রায় প্রতিদিনই বাউলের দল বের হয়ে গ্রামের পথে পথে গান গেয়ে বেড়ায়। ধীরে ধীরে গানের সংখ্যা বাড়তে লাগলো, সেই সাথে গানের জনপ্রিয়তা ছড়িয়ে পড়লো গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। আবালবৃদ্ধবনিতার মুখে মুখে ফিরতে শুরু করলো এইসব গান। এই ছোটো পরিসরে রইলো সেই ফিকিরচাঁদ ফকির দলের প্রধান কান্ডারী কাঙালের সংক্ষিপ্ত জীবনী। 
       
     ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে অবিভক্ত বাংলার কুষ্টিয়া জেলার কুমারখালির অন্তর্গত কুন্ডুপাড়া গ্রামে এক তিলি পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রকৃত নাম হরিনাথ মজুমদার৷ যিনি সমধিক পরিচিত ছিলেন 'কাঙাল হরিনাথ' নামে৷ তাঁর পিতার নাম হরচন্দ্র (মতান্তরে হলধর) মজুমদার ও মাতার নাম কমলিনী দেবী। 
 
       বাল্যকালেই তাঁর পিতৃমাতৃ বিয়োগ ঘটে। শৈশবে
কিছুকাল কৃষ্ণনাথ মজুমদারের ইংরেজী বিদ্যালয়ে বিদ্যালাভের সুযোগ ঘটেছিল তাঁর৷ কিন্তু নিদারুণ অর্থকষ্টে তিনি তাঁর বিদ্যাচর্চা সমাপ্ত করতে পারেননি। তিনি তাঁর জীবনীতে লিখেছিলেন, পিতাকে দাহ করে ফিরে পরনের বস্ত্রটুকু পরিবর্তনের মত বস্ত্র ও ভক্ষণের নিমিত্ত সামান্য হবিষান্নটুকুও তাঁর গৃহে ছিল না। শৈশবকালে পিতৃবিয়োগের ফলে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পড়াশোনা শেষ না করতে পারার যন্ত্রণা তিনি আজীবন বয়ে বেরিয়েছেন!
এই সময় ব্রাহ্মসমাজের প্রধান আচার্য্যদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর কুমারখালি প্রদেশে ব্রাহ্মধর্ম প্রচারের জন্য পণ্ডিত দয়ালচাঁদ শিরোমণি মহাশয়কে প্রেরণ করেছিলেন। হরিনাথ, শিরোমণি মহাশয়ের নিকট কিছু ব্যাকরণ পাঠ করতে লাগলেন এবং তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা ও তৎকালে প্রকাশিত ব্রাহ্মধর্মে কিছু গ্রন্থ অধ্যয়ণ করেছিলেন।

       শৈশবের সেই দুর্বিষহ অভাবই তাঁর জীবনে পরমপাথেয় হয়ে দাড়িয়েছিল৷ ১৮৫৫ খ্রীষ্টাব্দে তিনি  গ্রামে একটি মাতৃভাষার বিদ্যালয় (ভার্নাকুলার স্কুল) প্রতিষ্ঠা করেন। এই ব্যাপারে তিনি পাশে পেয়েছিলেন গোপাল কুণ্ডু, যাদব কুণ্ডু, গোপাল সান্যাল প্রমুখ বন্ধুদের৷ সেই বিদ্যালয়ে তিনি কিছুদিন অবৈতনিক শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করেন। তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভাবলে ইংরেজী শিক্ষার পদ্ধতি অনুসরণ করে গুরুমহাশয়ের পাঠশালায় সাহিত্য, ব্যাকরণ, ভূগোল, ইতিহাস, অঙ্ক প্রভৃতি শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে তাঁর মাসিক বেতন হয় কুড়ি টাকা। কিন্তু এর থেকে পনের টাকা গ্রহণ করে বাকী অর্থটুকু তিনি অন্যান্য শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। 

       নারী শিক্ষার প্রসারের ক্ষেত্রেও তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তৎকালীন সময়ে বাংলা তথা ভারতবর্ষে নারীদের অবস্থা খুবই শোচনীয় ছিল। যে ক'জন উদারমনস্ক ও সাহসী ব্যাক্তিত্ব এই বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, তাঁদের মধ্যে একজন হলেন কাঙাল হরিনাথ। অর্থ ব্যতীত আর অন্য কোন বিষয়ে অপ্রতুলতা বিধাতা তাঁর মধ্যে দেননি। ১৮৫৬ খ্রিস্টাব্দে কাঙাল হরিনাথের সহায়তায় কৃষ্ণনাথ মজুমদার একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন কুমারখালিতে।
 
     তাঁর যে সকল বিষয় অধীত ছিল না, তা গৃহে তাঁর বাল্যবন্ধু মথুরামোহন মৈত্র (সাহিত্য ক্ষেত্রে সুপ্রতিষ্ঠিত শ্রীযুক্ত অক্ষয়কুমার মৈত্রের পিতা) মহাশয়ের নিকট শিক্ষা ও অভ্যাস ক'রে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করতে লাগলেন। যারা বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পেরে অসামাজিক কাজকর্মে নিযুক্ত হয়ে পড়েছিল, সেই সমস্ত ছাত্রদের নিয়ে তিনি নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করেন। এই নৈশ বিদ্যালয়ে পড়ে অনেক শিক্ষার্থী ইংরেজী বিদ্যালয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় সম্মানের সাথে উত্তীর্ণ হয়েছিল।

    তিনি আজীবন দুর্বিষহ দারিদ্রের সাথে লড়াই করেছেন। অর্থ উপার্জনের জন্য কুমারখালিতে তিনি কিছুদিন নীলকর সাহেবদের অধীনে চাকরী করেন। কিন্তু নীলকর সাহেবদের নীল কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার সন্দর্শণে তিনি এই চাকরি পরিত্যাগ করে সাংবাদিকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। তাঁর বাল্যবন্ধু মথুরানাথ হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকাতে লেখা শুরু করেন। তাই দেখে হরিনাথও হাতে কলম তুলে নেন। কাঙাল হরিনাথ তার আত্মজীবনীতে বলেছেন, "সাধ্য ততদূর না থাকুক, প্রজার প্রতি নীলকরদের অত্যাচার যাতে নিবারিত হয়়, তার উপায় চিন্তাকরণ আমার ও মথুরের নিত্যব্রত ছিল।" তার তথ্য-ঋদ্ধ লেখনীতে মূর্ত হয়ে উঠত কৃষকদের অসহায় পরিস্থিতি ও নির্যাতিত-লাঞ্ছনা -বঞ্চনা-যন্ত্রণাময় জীবন। প্রথমদিকে তিনি সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাতে লেখালেখি শুরু করেন। তারপর ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে কুমারখালিতে গ্রামবার্তা প্রকাশিকা নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর আত্মজীবন চরিতে লিখেছেন, "ঘরে নেই এক কড়া, তবু নাচে নায় পাড়া। আমার ইচ্ছা হলো এইসময় একখানি সংবাদপত্র প্রচার করে গ্রামবাসী প্রজারা যেরূপে অত্যাচারিত হচ্ছে, তা গভর্নমেন্টের কর্ণগোচর করলে অবশ্যই তার প্রতিকার এবং তাদের নানা প্রকার উপকার সাধিত হবে। সেই ইচ্ছাতেই গ্রাম ও পল্লীবাসী প্রজার অবস্থা প্রকাশ করব বলে পত্রিকার নাম গ্রামবার্তা প্রকাশিকা রেখেছি।"

এর পাশাপাশি কবি ঈশ্বরগুপ্তের সংবাদ প্রভাকর পত্রিকাতে তিনি  প্রবন্ধ লেখা শুরু করেন। তাঁর গ্রামবার্তা প্রকাশিকা কলকাতার গিরিশচন্দ্র বিদ্যারত্ন  এর যন্ত্রে মুদ্রিত হত, কিন্তু প্রকাশিত হতো কুমারখালী থেকে (বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসের উপাদান -কাঙাল কুঠির ও এম এন প্রেস)।

  সংবাদপত্রের আদিযুগে একজন দরিদ্র অসহায় দীনহীন কাঙ্গাল, অতুলপ্রতিভা ও ঐশীশক্তিবলে দেশের জন্য এইরূপ বহুব্যয় সংবাদপত্রের প্রচারে ব্রতী হলেন। বিশেষত তখন নিজের বা মফস্বলের কোথাও মুদ্রাযন্ত্র ছিল না। কলকাতায় যাতায়াতের সুবিধা ছিল না, কারণ পূর্ববঙ্গের রেলপথ তখনো খোলা হয়নি। এই সময়ে কলকাতায় সংবাদপত্র মুদ্রিত করে প্রকাশ করা অসম্ভব সাহসের পরিচয়। তখন সাধারণ মানুষের সংবাদপত্র পড়ার অভ্যাস গঠিত হয় নি। সংবাদপত্রের মূল্য অত্যধিক থাকায় ধনী ভিন্ন সাধারণের তা গ্রহণ করার সামর্থ ছিলনা। সেই কারণে সংবাদপত্রের কথা সাধারণ মানুষ পরীজ্ঞাত ছিল না। কাঙাল হরিনাথ ঈশ্বরের উপর নির্ভর করে এই দুরূহ কাজে হস্তক্ষেপ করিলেন। এই দুরূহ কার্য সম্পন্ন করার জন্য তিনি নিজের বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পরিত্যাগ করেন। বিদ্যালয়ের প্রাপ্য বেতন তার সংসারযাত্রা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন ছিল। পত্রিকায়  সেই উপায় হয় না, যার দ্বারা তিনি সংসারকার্য নির্বাহ করতে পারেন। সুতরাং অতিকষ্টে সংসারের ব্যয় নির্বাহ হতে লাগলো। তিনিই নিজেই ছিলেন একাধারে লেখক, সম্পাদক, পত্রিকা বিলিকারক এবং মূল্য আদায়কারী অর্থ সংগ্রাহক। তাঁর জীবনযন্ত্রণা তিনি লিখে গেছেন তাঁর আত্মজীবনীতে, "এই দিন চৈত্রমাসের দুপ্রহরের রৌদ্রের সময় পদ্মার  তীরস্থ তাপিত বালুকাময়ী চড়া অতিক্রম করতে পিপাসায় শুষ্ককণ্ঠ ও রৌদ্রতাপে তাপিত হয়ে যে অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করেছিলাম, যদি গ্রামবার্তার প্রতি প্রেমানুরাগ সঞ্চিত না থাকতো, তবে তা তৎক্ষণাৎ প্রাণত্যাগের কারণ হত।"

     ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে কুমারখালিতে তিনি নিজস্ব পত্রিকা ছাপানোর জন্য ছাপাখানা প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮ বছর ধরে রাজশাহীর রানী স্বর্ণকুমারী দেবী এই ছাপাখানার জন্য অর্থ বিনিয়োগ করেন। হরিনাথ তাঁর গ্রামের মানুষদের অসহায়তা, দারিদ্র্য প্রতিকারের চিন্তা থেকেই এই কার্যে ব্রতী হন ('কাঙাল হরিনাথ ও ' গ্রামবার্তা প্রকাশিকা', কাঙাল হরিনাথ মজুমদার স্মারকগ্রন্থ - আবুল আহসান চৌধুরী, বাংলা একাডেমী, ১৯৯৮)।

কাঙাল হরিনাথের ছাপাখানা

      গ্রামবার্তা দ্বারা এ দেশের প্রভূত উপকার সাধিত হয়। এটা যে শুধুমাত্র জমিদারের মহাজনের এবং নীলকুঠির অত্যাচার নিবারণ সাধন করেছিল তাই নয়, প্রজার প্রতি রাজার কর্তব্য সম্পর্কে যে সকল প্রবন্ধ প্রকাশিত হতো, তদনুসারে কার্য করতে ইংরাজ সরকারেরও যথেষ্ট প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। বাংলা সংবাদপত্রের অনুবাদক মিঃ রবিনসন সাহেব স্বয়ং "গ্রামবার্তা" গ্রহণ করেছিলেন এবং সরকারের গোচরার্থে গ্রামবার্তা থেকে যে অনুবাদ হত, তাতে গ্রামবাসীর বিশেষ উপকার হয়েছিল। এতে করে গ্রামের নদী খাল প্রভৃতি পয়ঃপ্রণালী সংস্কারপূর্বক জলকষ্ট নিবারণ, গো-ধন রক্ষা, পুলিশ বিভাগের সংস্কার ব্যবস্থা ইত্যাদি। তৎকালে "সোমপ্রকাশ"ও "গ্রামবার্তা" ই উচ্চশ্রেণীর সাময়িক পত্র ছিল।

   কাঙাল হরিনাথ যখন বাংলা সাহিত্যের সেবায় নিযুক্ত ছিলেন, সেই সময় বাংলা সাহিত্যে উপন্যাস গ্রন্থের অভাব ছিল। তখন বাহারদানেশ, চাহারদরবেশ, বিদ্যাসুন্দর, কামিনীকুমার ইত্যাদি গ্রন্থই উপন্যাসের স্থান গ্রহণ করেছিল। উপন্যাস সৃষ্টির আদিযুগে হরিনাথ "বিজয়বসন্ত" (রচনাকাল- ১৮৫৯ খ্রীষ্টাব্দ) নামক এক উপন্যাস রচনা করে বাংলার সাহিত্যজগৎকে সমৃদ্ধ করেছিলেন। তিনি ইংরেজী ভাষা জানতেন না। এদিকে তৎকালীন ইংরেজীশিক্ষায় শিক্ষিত যুবকশ্রেণী বাংলার তৎকালীন  উপন্যাসসমগ্রকে উচ্চ আসনে স্থান দিতেন না। কিন্তু হরিনাথের "বিজয়বসন্ত" মৌলিকতা, মধুরতা, এবং প্রকৃত কাব্যগুনে মাতৃভাষার যথেষ্ট গৌরব বৃদ্ধি করে বহুজনের সমাদর লাভ করে।

তাঁর স্মৃতিতে নির্মিত সংগ্রহশালা
     
       তিনি আরো অনেক গ্রন্থ রচনায় বাংলাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিলেন ৷ তার মধ্যে চারুচরিত্র (১৮৬৩), কবিতা কৌমুদী (১৮৬৬), কবিকল্প (১৮৭০), অক্রুর সংবাদ, চিত্তচপলা (১৮৭৬), ব্রহ্মান্ডবেদ প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য৷

   তাঁর প্রতিভা সর্বতোমুখী ছিল৷ তিনি ছিলেন স্বভাব কবি৷ সেই সময় কুমারখালিতে কীর্তনের বড় ধুম ছিল। অনেকেই সুললিত পদ রচনা করে বিগ্রহের পর্ব উপলক্ষে গান করতেন। হরিনাথের পদগুলি মহাজন বিরচিত পদাবলী অপেক্ষা কোন অংশে নিকৃষ্ট ছিল না। তাঁর রচিত পদ তিনি নিজেই স্বকন্ঠে গেয়ে সমবেত শ্রোতৃমন্ডলীকে মুগ্ধ করে রাখতেন। এইরূপে তিনি পূর্ববঙ্গের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার নিকটে তার বাউল সংগীতের দ্বারাই অসামান্য লোক বলে পরিচিত হয়েছিলেন। এই বাউল সংগীতের সহজ সরল প্রাণস্পর্শী কথা ও সুরে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সর্বশ্রেণীর মানুষ উদ্বেলিত হতেন। অল্পদিনের মধ্যেই বাউলসংগীতের মধুর সুর হাটে- ঘাটে- মাঠে- নৌপথে সর্বত্রই শ্রুত হতে লাগলো -

 "হরি দিন গেলো সন্ধ্যা হলো পার করো আমারে।
 তুমি পাড়ের কর্তা জেনে বার্তা ডাকি হে তোমারে।।"
 

      তিনি সাধক লালন ফকিরের একান্ত অনুরাগী ছিলেন। তিনি ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে একটি বাউল সংগীতের দল গঠন করেন। দলটি "কাঙাল ফকিরচাঁদের দল" বলে পরিচিত। তাঁর শিষ্যগণের মধ্যে ছিলেন অক্ষয়কুমার মৈত্র, দীনেন্দ্রনাথ রায়, জলধর সেন প্রমুখ বাংলার বিশেষ ব্যক্তিত্বরা। ১৮৯৬ খ্রিস্টাব্দে এই মহাপ্রাণের জীবনাবসান ঘটে। তিনি আমৃত্যু বঙ্গদেশের শিক্ষার প্রসার ও সর্বপ্রকার শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন। বাঙালির অত্যন্ত কাছের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও আজ তিনি প্রায় প্রচারের আড়ালে। বাংলার সাহিত্য, সংস্কৃতি, সঙ্গীত, সংবাদিকতা ও মননে যে সুগভীর ছাপ তিনি রেখে গেছেন তা অনস্বীকার্য।

তথ্যসূত্র :
(১) কাঙাল হরিনাথ - শ্রী জলধর সেন।
(২) কাঙাল হরিনাথ মজুমদার জীবন সাহিত্য ও সমকাল - ডঃ অশোক চট্টোপাধ্যায়।
(৩) কাঙাল হরিনাথ ( গ্রামীণ মনীষার প্রতিকৃতি) - আবুল আহসান চৌধুরী।
(৪)বাংলা সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসের উপাদান -কাঙাল কুঠির ও এম এন প্রেস।
(কলকাতা কথকথা পত্রিকায় প্রকাশিত)

মঙ্গলবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৪

মোটা মাথার বোকা প্রশ্ন ~ নীলাঞ্জন মিশ্র

আমি অর্থনীতিবিদ নই। অর্থনীতির কিছু বুঝিও না। আর বুঝি না বলেই বোকা মাথায় কিছু সোজাসাপ্টা প্রশ্ন আসে। সেইসব প্রশ্নদের এক জায়গায় করার জন্যই এই লেখা।
আজকের লেখার বিষয় ব্যাংক কর্মী। ব্যাঙ্কে যখন প্রথম কম্পিউটার এল তখন বলা হয়েছিল যে এর ফলে দশজন লোকের কাজ একটা মেশিন করবে। ফলে, কর্মীদের ওপর কাজের চাপ কমবে। ভাল কথা। কিন্তু আদতে সেটা হল কি? ব্যংকিং সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত লোকজনের ওপর কাজের চাপ কমল কি?
আজকের দিনে যে কোনও ব্যাংক কর্মীকে জিজ্ঞেস করলেই উত্তরটা পেয়ে যাবেন। বেসরকারি ব্যাংকের কথা তো ছেড়েই দিন, এমনকি সরকারি ব্যাংকেও আর দশটা পাঁচটার কাজ করলে এখন চলে না। সব জায়গাতেই দিনে আট ঘন্টার অনেক বেশি কাজ করতে হয়।
কিন্তু কেন? কম্পিউটার এসে না কাজের চাপ কমানোর কথা ছিল? তাহলে?
আসলে কম্পিউটার কাজের চাপ কমায় নি, কমিয়েছে কর্মীর সংখ্যা। আর সাথে সাথে বাড়িয়েছে একজন মানুষ কতটা কাজ করবেন সেই প্রত্যাশা। আগে যদি একজন কর্মী গড়ে দিনে দশজন গ্রাহককে সামলাতেন, এখন তাঁকে সামলাতে হয় একশজনকে।
আপনি বলবেন, সে তো হবেই। গ্রাহকসংখ্যা বাড়ছে, কাজের চাপ তো বাড়বেই। সেই জন্যই তো কম্পিউটার আনা।
আমার মোটা মাথা বলে, কর্মীর সংখ্যা না কমালে, কম্পিউটারের সাহায্যে সহজেই এই বাড়তি গ্রাহকদের চাপ সামলানো যেত। তাতে কর্মীদের ওপর কাজের চাপও এইভাবে বাড়ত না।
অর্থনীতিবিদরা বলবেন, কর্মীসংকোচন না করলে ব্যাংক চলবে কি করে? কি করে কম্পিটিশনে টিঁকে থাকবে? সেইজন্যই তো আর্থিক সমস্যায় পড়লেই যে কোনও সংস্থার প্রথম পদক্ষেপই হয় কর্মী ছাঁটাই। সহজেই যেন কেমন করে কালকের দক্ষ কর্মীরা আজ বাড়তি হয়ে যান। যাকে সংবাদপত্রের সুন্দর ভাষায় বলে, "বাড়তি মেদ ঝরিয়ে নতুন উড়ানের জন্য তৈরী এক্স ওয়াই জেড সংস্থা।"
আচ্ছা, তর্কের খাতিরে না হয় তাও মেনে নিলাম। আর্থিক মজবুতির জন্য এইসব "বাড়তি" কর্মীদের ছাঁটাই না করে কোনও উপায় নেই। তাহলে, এই কর্মীসংকোচের পর এখন তো ব্যাংকগুলোর লাভের মুখ দেখা উচিৎ? তা না হয়ে এখনও কেন ধুঁকে চলেছে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক? কেন উত্তরোত্তর খারাপ হয়ে চলেছে তাদের আর্থিক অবস্থা?
ঠিক কতটা খারাপ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর স্বাস্হ্য? বেশ খারাপ। শুধু গত ত্রৈমাসিকেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির মিলিত ক্ষতির পরিমাণ ১.৫ বিলিয়ন ডলার। কতগুলো শূন্য যেন? এর মধ্যে ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ারই ক্ষতির পরিমাণ পাঁচ হাজার কোটি টাকা।
কোথায় যাচ্ছে এত এত টাকা? যাচ্ছে অনাদায়ী ঋণে, যাকে বলা হয় নন-পারফর্মিং অ্যাসেট। এই মুহুর্তে আমাদের রাস্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলির অনাদায়ী ঋণের পরিমাণ চার লক্ষ কোটি টাকা। হ্যাঁ, ঠিকই পড়েছেন। চার লক্ষ কোটি। সংখ্যাটা কত বড়। একটু তুলনা করলে বুঝতে সুবিধে হবে। ইন্ডিয়ার স্বাস্থ্যখাতে বাজেট হল ষাট হাজার কোটি। অর্থাৎ, এই অনাদায়ী ঋণ দিয়ে ভারতের মত সাতটি দেশের স্বাস্হ্য বাজেট চালানো যায়। আরেকটা ছোট তথ্য। এই বছরের উনিশে ফেব্রুয়ারি ইটালিকে পেছনে ফেলে অনাদায়ী ঋণের অনুপাতে ভারত উঠে এসেছে বিশ্বের এক নম্বরে।
মজার কথা হল, এই অনাদায়ী ঋণের বোঝার পুরোটাই প্রায় রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর কাঁধে। প্রাইভেট ব্যাংকগুলির অনাদায়ী ঋণের পরিমান দশ ভাগের এক ভাগ, অর্থাৎ চল্লিশ হাজার কোটি।
তাহলে কি দেখলাম? একদিকে বাড়ল বেকারি, বাড়ল কর্মীদের ওপর কাজের চাপ, অন্যদিকে ব্যাংকগুলো সম্মুখীন হল এক বিশাল পরিমান আর্থিক ক্ষতির।
কি হল আসলে? কোন ঝণখেলাপি পিঁপড়ে খেয়ে গেল
লাভের গুড়, আমার আপনার কষ্টার্জিত টাকা?
এ লেখার শুরুতেই বলেছি, আমি অর্থনীতি বুঝি না। তাই কত টাকা কোথায় গেল বুঝতে আমার ভরসা গুগুল। কোন ঋণখেলাপি আমার কত টাকা খেয়ে গেল সেটা গুগুল করতে গিয়ে আরেকটা মজার জিনিষ পেলাম। জানলাম, রাজ্যসভায় এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রকের ছোটমন্ত্রী শিবপ্রসাদ শুক্লা গত বছর জুলাই মাসে জানিয়েছেন, রিজার্ভ ব্যাংকের হিসেব অনুযায়ী ভারতবর্ষের ব্যাংকিং সেক্টরে মোট ঋণখেলাপের পরিমান মার্চ ২০১৪তে আড়াই লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে ৩১শে মার্চ ২০১৮-তে হয়ে দাঁড়িয়েছে নয় লক্ষ বাষট্টি হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ ভারতের শিক্ষা বাজেটের দশগুন ও প্রতিরক্ষা বাজেটের প্রায় তিনগুন।
মন্ত্রীমশাই আরও জানিয়েছেন, এই ঋণখেলাপি টাকার নব্বই শতাংশই গেছে বড় কর্পোরেটদের ঘরে।
তা কাদের ঘরে গেল এই টাকা? গুগল করে জানতে পারলাম, আরবিআই এই তথ্য প্রকাশে অনিচ্ছুক। তবে গোপন কথাটি তো আর সবসময় গোপন থাকে না। ক্রেডিট সুইস বলে একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক পরামর্শদাতা সংস্হার দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, ২০১৫-র মার্চ অব্দি শুধু অনিল আম্বানিরই ঋণখেলাপের পরিমাণ সওয়া লক্ষ কোটি টাকা। আদানি, এসার ও বেদান্ত গ্রুপের প্রত্যেকের ঋণখেলাপের অংক কমবেশি এক লক্ষ কোটির ঘরে। আবার একটু হিসেবের সুবিধের জন্য জানিয়ে রাখি, ভারতবর্ষের শিক্ষাখাতে ২০১৯ সালের বাজেট হল কমবেশি নব্বই হাজার কোটি টাকা।
এ পর্যন্ত পড়ে কেউ বলতেই পারেন, আহা রে, বাছাদের ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে। নচেৎ কি আর এরা ধারদেনা বাকি রাখত? সে হয়ত যাচ্ছে, কিন্তু অক্সফ্যামের দেওয়া হিসেব কিন্তু অন্য কথা বলছে. এই আন্তর্জাতিক সংস্থাটির দেওয়া হিসেব অনুযায়ী ২০১৬ সালের উৎপাদিত সম্পদের ৫৮ শতাংশ গেছিল ভারতবর্ষের ধনীতম এক শতাংশের হাতে। ২০১৭ সালে সেটাই বেড়ে দাঁড়িয়েছে তিয়াত্তর শতাংশে। অর্থাৎ, ভারতবর্ষে ২০১৭ সালে যদি ১০০ টাকার সম্পদ উৎপাদন হয়ে থাকে, তার মধ্যে তিয়াত্তর টাকাই ঢুকেছে একজনের পকেটে। আর দরিদ্রতম পঞ্চাশজন একসাথে পেয়েছে এক টাকা, গড়ে দু পয়সা।
এই যে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অসাম্য, তা কিন্তু শুধু ভারতের সমস্যা নয়, তা ঘটে চলেছে বিশ্বের কমবেশি সর্বত্র। কিন্তু আবারও আমার মোটা মাথায় খচখচ করতে থাকে, এভাবে কি চলতে পারে? কতদিন দাঁড়িয়ে থাকবে এরকম মাথা ভারী পা রোগা কাঠামো?
লেখাটা শুরু করেছিলাম ব্যাংক কর্মীদের দিয়ে, কিন্তু আসলে এই সমস্যাটা আমার আপনার সবার। একটু ভেবে বলুন তো, আজকের দিনে কোন পেশাটা আছে, যেখানে আট ঘন্টা কাজ করলে চলে? আমাদের আগের প্রজন্ম তাঁদের অফিসে যা সময় দিতেন, আমাদের সবাইকে কেন দিতে হচ্ছে তার থেকে অনেক অনেক বেশি? যন্ত্র এসে তো আমাদের জীবনকে আরও সহজ করে দেওয়ার কথা ছিল, তাই না? তাহলে আমরা চারপাশে সবাই ছুটছি কেন? ছুটছি, কেন না, আমাদের বোঝানো হয়েছে সারভাইভ্যাল অফ দা ফিটেস্ট। থ্রি ইডিয়টস সিনেমার ভাইরাসের মত আমাদের সর্বক্ষণ বোঝানো হচ্ছে, জীবন হচ্ছে একটা রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। এখানে আরাম করতে হবে নিক্তি মেপে, যার পারিভাষিক নাম, ওয়ার্ক-লাইফ ব্যলান্স। আসলে কিন্তু সেই ভারসাম্য থাকছে না। কর্মী কমছে, মাথাপিছু কাজ বাড়ছে। আট ঘন্টার কাজ গিয়ে দাঁড়াচ্ছে দশ বা বারো ঘন্টায়। কখনও আরো বেশি। কিছু বলার উপায় নেই। কেন না তোমার অফিসের বাইরেই অপেক্ষা করছে দশ হাজার চাকরিপ্রার্থী, তোমার ওই একটা চেয়ারের জন্য। গত বছরের একটা খবরে দেখলাম, বাষট্টিটি পিয়নের পোস্টের জন্য ইউপিতে জমা পড়েছে তিরানব্বই হাজার অ্যাপ্লিকেশন। তার মধ্যে প্রায় চারহাজার জন পিএইচডি ডিগ্রিধারী।
এর ফল গিয়ে দাঁড়াচ্ছে নির্মমতায়, হিংসায়। আমাদের বোঝানো সহজ হচ্ছে যে আমার এই চাকরির সংকটের জন্য দায়ী আমার পড়শি। সে আছে, তাই চাপ বাড়ছে, তাই আমি চাকরি পাচ্ছি না। হতাশা বাড়ছে, বাড়ছে রাগ। মাথার ওপর বসে থাকা লোকেরা এই রাগটার খবর রাখেন না, এমন নয়। তারা জানেন, ওই নীচের তলার দুপয়সা ওয়ালা পঞ্চাশজন যদি একজোট হয়, তাহলে ওই তিয়াত্তরটাকা ওয়ালা একজনের সমূহ বিপদ। তাই ক্রমাগত বিভিন্ন ইস্যুতে ঝগড়া লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে- ধর্মে ধর্মে, ভাষায়-ভাষায়, গায়ের রঙ-এ, আর নাগরিকে নাগরিকে। বোঝানো হচ্ছে, যত সমস্যার মূলে ওই মেক্সিকানরা, অতএব দেয়াল তোলো।
আমরা ভুলে যাচ্ছি, আসলে আমাদের কি প্রাপ্য ছিল। সাতমহলা বাড়ির ব্যালকনি থেকে মালিক ছুঁড়ে দিচ্ছে অর্ধভুক্ত মাংসের হাড়, আর নীচে দাঁড়িয়ে আমরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করছি কে কত উঁচুতে লাফ দিয়ে ওই ছুঁড়ে দেওয়া উচ্ছিষ্ট লুফে নিতে পারব। যে আজকে মাংসের টুকরোটা পাচ্ছে, কাল সে লাফাতে পারছে আরেকটু বেশি। আর যে পারছে না, সে অক্ষম আক্রোশে কামড়ে ধরছে পাশের জনের ঘাড়।
যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নেই যে সার্ভাইভ্যাল অফ দ্যা ফিটেস্ট, জীবনে প্রতিযোগিতা করেই টিঁকে থাকতে হবে, কিন্তু নিরপেক্ষ প্রতিযোগিতার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পাওয়া যাচ্ছে কি? প্রাইভেট এয়ারলাইন্স জেট এয়ারওয়েজ প্রতিযোগিতায় হেরে গিয়ে দশহাজার কোটি টাকা দেনার দায়ে বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে এসবিআই ও অন্যান্য সরকারি ব্যাংক শুধু সেই ঋণ মুকুবই করছে না, উপরন্তু আরও দেড় হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার বন্দোবস্ত করছে। অন্যদিকে সরকারি বিএসএনএল ছাঁটাই করতে চলেছে তাদের পঞ্চান্ন হাজার কর্মীকে। একদিকে রাফায়েল ডিল পাচ্ছে দেনায় ডুবে থাকা অনিল আম্বানি, অন্যদিকে সরকারি সংস্থা হিন্দুস্তান এরোনটিক্স লিমিটেড (হ্যাল) চলে যাচ্ছে চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে। ইতিহাসে প্রথমবার কর্মীদের বেতন দেওয়ার জন্য অন্যতম ধনী ও সফল সরকারি সংস্থা হ্যালকে বাজার থেকে ধার করতে হচ্ছে হাজার কোটি টাকা।
কিন্তু কেন হ্যালের এই অবস্থা? কি করে পৌঁছল ক্যাশ রিচ হ্যাল এমন অবস্থায়?

সোমবার, ২২ এপ্রিল, ২০২৪

লাল ফিতার ফাঁস ও কয়টা নিঝুম স্কুলবাড়ি ~ বিহঙ্গ দত্ত

২০১৫-১৬ সালে তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত সরকারের আমলে এসএসসি-র সবচেয়ে বড় এক্সামটা সংগঠিত হয়। তিনটে পার্টে শিক্ষক নিয়োগ করার কথা হয়েছিল। 

১) পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পোস্ট ফর ইলেভেন টুয়েলভ 
২) অনার্স গ্র্যাজুয়েট পোস্ট ফর নাইন টেন 
৩) প্লেন গ্র্যাজুয়েট পোস্ট ফর আপার প্রাইমারি 


এর মধ্যে আপার প্রাইমারির রেজাল্ট এখনও বের করতে পারেনি রাজ্য সরকার। আশা রাখছি ২০৫০-র মধ্যে স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে যাবে। 

কিন্তু বাকি দুইটো প্যানেলের রিক্রুটমেন্ট হয়। একজন পরীক্ষার্থী হিসাবে আমিও ছিলাম অগুন্তি চাকুরিপ্রার্থীর ভিড়ে। নম্বর নেহাত মন্দ পাই নাই। কিন্তু ইন্টারভিউতে ডাক আসেনি। যাদের এসেছিল তাদের মধ্যে মুড়ি মিছরি বাছতে বসা আমার কম্ম না। কিন্তু কানাঘুষায় শুনি বেশিরভাগই ১০০% উত্তর করে এসেছে। প্রশ্নটা ঠিক ১০০% করে আসার মত ইজি ছিল না। কিংবা হয়তো ছিল। মধ্যমেধার মানুষ আমরা। এ বিপুলা পৃথিবীর কতটুকুই বা জানি? 

 যাই হোক, রিক্রুটমেন্ট হল। তখন তৃণমূলের দ্বিতীয় টার্ম। বিরোধীপক্ষ পর্যুদস্ত। বিজয়রথ চলতে থাকল। আবারও কানাঘুষায় শোনা গেল দরদাম করা উচিত না। কেননা এ হল লাইফ সেটলমেন্ট। বাঁধা দামে বাঁধা চাকরি হচ্ছে। স্ল্যাব নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে। সঠিক মূল্যে সঠিক জিনিস কিনে সর্বমোট (গ্রূপ সি, গ্রূপ ডি চাকুরিজীবী ধরে) ২৫০০০ মতো নিয়োগ হল। কেউ বা ঘরের কাছে। কেউ বা একটু ব্যাজার মুখে খানিকটা দূরে। আমরা বসে রইলাম আরেকবারের আশায়। আমাদের থেকেও মরিয়া ছিল অনেকে। তারা কোর্টে গেল। এরপরের ইতিহাস আপনারা গত আটবছরের ব্রেকিং নিউজে দেখে আসছেন। আলাদা করে বলার কিছু নেই। 


আজ আটবছর পার হয়েছে। আবারও একটা ঐতিহাসিক রায় এসেছে। আগেও অনেকগুলা এসেছিল। এই রায়দান কিছুটা বিশেষ কেননা এখানে কোর্টও আমার জায়গায় নেমে এসেছে। মুড়ি মিছরি বাছেনি। এর আগে এই রায় একবার সুপ্রিম কোর্টে গেছিল। ফিরে এসেছে। আজ আবার বছর ঘুরে ফিরে এল একই গেরোয়। তাদের হাতে তিনটে অপশন ছিল। 

১) যেরকম চলছে সেরকম চলতে দেওয়া 
২) যোগ্য অযোগ্য প্রার্থী বাছা 
৩) পুরা প্যানেল ক্যানসেল করা 

১ আর ৩ নং অপশন গ্রহণ করা  এক মিনিটের কাজ। ২ নং কাজই কঠিন। কিন্তু সেই কাজটি করানোর জন্যই লোকে কোর্টে যায়। 
আজ বিজেপির কোনও নেতার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করুন যে কী করা উচিত? বলবে প্যানেল আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্থ। সবকটারে ধরে ক্যান্সেল করা। 
তৃণমূলের নেতার কাছে যান। সোজা বলবে আমরা সততার প্রতীক। যেমন চলছে সেটাকেই স্বীকৃতি দেওয়া। 
সাধারণ মানুষের কাছে যান। যেটা শুনতে পাবেন সেটা হল যোগ্য প্রার্থীদের চাকরি হোক। তাই নিয়েই আট বছরের লড়াই। 

কিন্তু কমিশন সেটা করতে দেবে না। কমিশন নিজেদের দায় এড়াবে। ঘোরাবে। যোগ্য প্রার্থীদের টেনে নামাবে অযোগ্যদের পাঁকে। ওএমআর বের না করার জন্য জান লাগিয়ে দেবে। কেননা নিজেদের মুখ পোড়াবার চাইতে, জেলের ঘানি টানার চাইতে হাজার হাজার চাকুরিজীবীকে যূপকাষ্টে তোলা অনেক বেশি সহজ। 

এত শত ঢাকাচাপা দেওয়ার পরেও ৫৫৭৩ জনের ঘাপলা ঢাকা যায়নি। তারা কেউ ফাঁকা ওএমআর দিয়ে চাকরি পেয়েছে। কেউ মেয়াদ উত্তীর্ণ প্যানেল লিস্ট থেকে সুপার নিউম্যারিক্যালি ডাক পেয়েছে। কেউ বা দারুণ বুদ্ধি খাটিয়ে পেছনের র‍্যাঙ্ক থেকে লং জাম্প মেরে ঢুকেছে মেইন লিস্টে। এদের টাকা ফেরত দিতে হবে চাকুরিজীবনের। একশোবার ভালো হয়েছে। 

কিন্তু বাকিদের অভিযোগ কি প্রমাণিত? যদি তর্কের খাতিরে ধরে নিই যে আরও ২০০০০ র মধ্যে ১৫০০০ ই অযোগ্য এবং ঘুরপথে ঢুকেছে তারপরেও বাকি পাঁচ হাজারকে কেন এই নরক যন্ত্রণা সহ্য করতে হবে? কেন তাদের বারবার দেখে যেতে হবে স্টে অর্ডার পড়ল কিনা? তাদের সততার দাম নেই? সমাজের চোখে তারা যে নিচু হয়ে গেল এই মুহুর্ত থেকে এর কোনও দাম নেই? 

এই প্রত্যেকটা চাকুরিপ্রার্থীর সততাকে বেচেছে কমিশন। তাদের দাঁওয়ে রেখে অযোগ্যদের আড়াল করার চেষ্টা করে গেছে এবং যাচ্ছে। 
এবং আপনি! মহামান্য হাইকোর্ট! আপনারা এতদিন সময় পেয়েও সবরকম তদন্তের স্বাধীনতা পেয়েও এই কতিপয় সৎ চাকুরিজীবীকে সিকিওর করতে পারেননি। অতটা চাপই দিতে পারেননি কমিশনকে। 

এই সব লেখার পর একটু থামতে হল। খানিক মনোবল জোগাতে লাগে। কেননা বাকি গল্পটা বড্ড করুণ। এই রায়ে আবার স্টে অর্ডার পড়বে। তারপর আবার একটা দুটো। শেষ অব্দি হয়তো চাকরি যাবে অনেকের। কিংবা কয়েকজনের। লাল ফিতার ফাঁস আরও কড়া হয়ে বেড়ি পড়াবে স্কুলশিক্ষাকে। গান্ধীমূর্তির পাদদেশের চাকুরিপ্রার্থীরা কাঁদছিলেন এক অদ্ভুত প্রতিহিংসায়। তারা জ্বলেছেন এতদিন। আজ জ্বলতে দেখছেন তাদের ভাত মারা সেইসব অযোগ্যদের। কিন্তু তারপর? বারকয়েক সাংবাদিকরা এই প্রশ্নটা করায় এক মুহূর্তে শূন্যতা নামল চোখে। প্যানেল ক্যানসেল হচ্ছে। প্যানেল ক্যানসেল? না, এতদিন যে ওএমআর পাওয়া যায়নি সেটাকে নাকি খুঁজা আনার ব্যবস্থা হচ্ছে। তাহলে এতদিন হয়নি কেন? এই রায় দিতে হল কেন? 
এরপর? এদের আর সেই বয়স নেই। সেই খাটার ক্ষমতা নেই। সেই যোগ্যরা যাবে কোথায় যারা বসে আছে? অপেক্ষা করবে আর একটা ন্যায় বিচারের? আরও কোনও ধর্ণামঞ্চে? 

আর বসে থাকবে কিছু আধফোটা মুখ। নিঝুম স্কুলবাড়িতে বিকালের ছায়া দীর্ঘ হয়ে আসবে। শিক্ষক নেই। শিক্ষক নেই বলে ছাত্র নেই। ছাত্র নেই বলে শিক্ষক নেই। এই ক্রমান্বয়ী লুপে কতগুলো পরিবারের রমেশ, আলতাফ, রাবেয়া, রোকসানারা মোট বাঁধবে পরিযায়ী হওয়ার জন্য। ফেলে রেখে যাবে পেন-পেন্সিল, পড়াশুনার বইপত্র, ঘরের আঙিনা আর প্রিয় বাংলাকে।

শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৪

পাগলা দাদু ~ রজত শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

"ইরিব্বাবা, ইরিব্বাবা," 
বলেই দাদু লাফ মারেন; 
তারপরেতেই চুলকে কনুই 
ফোঁশফোঁশিয়ে হাঁফ ছাড়েন!

ওমনি আবার ডাইনে ঘুরে 
চমকে ওঠেন কাক দেখে,
তাইতে কেমন তৃপ্ত হয়ে 
ঘুমিয়ে পড়েন নাক ডেকে!

ঘন্টা পাঁচেক ঘুমিয়ে নিয়ে 
ওঠেন হঠাৎ খাট ছেড়ে,
আনিয়ে খাবার গিলতে থাকেন 
গপ-গপিয়ে, পাত পেড়ে;

খাবার খেয়েই ঢেঁকুড় তুলে, 
বাহান্ন বার কান মলে,
ধর্মতলার রাস্তা ধরে 
হন-হনিয়ে যান চলে।

ওই যেখানে সবাই বসে 
ধর্ণা দিয়ে গান শোনে,
সেই সেখানে গিয়েই দাদু 
মুণ্ডু নাচান আনমনে;

ওমনি হঠাৎ সামনে ঝুঁকে 
উলটো হাতে কান ঘষে
এদিক সেদিক তাকিয়ে নিয়ে
দিদির পাশে যান বসে।

এ সব দেখে ভাইরা শুধোয়, 
"কি দাদু, কি ধান্দাটা?"
ক্লান্ত হেসে বলেন দাদু, 
"জানিস, আমি মান্ধাতা?

হাজার হাজার বছর ধরে 
শুনছি তোদের গুলতানি,
সবাই তোরা পানসে গরু, 
যতই সাজিস মুলতানী!

দাদার কথায়, দিদির কথায়, 
লাফিয়ে বেড়াস দিগ্‌বিদিক,
মারবে তোদের ভোজপুরী ল্যাং, 
ঠেকেই তোরা শিখবি ঠিক!

ক্যান্‌ রে তোরা দুচোখ বুজে 
ওদের কথায় চলতে চাস?
ভাবনা নিজের চুলোয় দিয়ে 
ওদের কথাই বলতে যাস?

এই দুনিয়ায় প্রশ্ন কত, 
আর কবে ভাই খুঁজবি রে?
কিছুই তোরা জানিস নে ভাই, 
আর কবে ফের বুঝবি রে?

জানিস কেন সর্ষে ইলিশ 
ভাপিয়ে খেলে ভাল্লাগে?
জানিস তোরা টক কেন কুল? 
লঙ্কা কেন ঝাল লাগে?

কক্ষণও কি দেখিস ভেবে, 
পায়রা কেন উড়তে চায়?
পতঙ্গরা আগুন দেখে 
বৃথাই কেন পুড়তে যায়?

হঠাৎ কেন ব্যর্থ প্রেমিক 
পদ্য লেখে শ্বাস ফেলে?
মুখটা কেন পেঁচিয়ে ওঠে 
চুন মাখিয়ে ঘাস খেলে?"

এই না বলে হঠাৎ দাদু 
থমকে গিয়ে, নোখ খুঁটে,
ফ্যাল-ফ্যালিয়ে তাকিয়ে দেখেন 
চতুর্দিকে, চোখ ফুটে;

ওমনি আবার 'ডুম-ডুমা-ডুম' 
বাজিয়ে নিয়ে ড্রামখানা
মালকোঁচাটা বাগিয়ে ধরে 
যান পালিয়ে নামখানা!!

বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৪

পিটার হিগ্স ও ঈশ্বর কণা ~ অরিজিৎ গুহ

২০১২ সালের জুলাই মাসে সার্ন ঘোষণা করল প্রায় ৫০ বছর আগে যা ছিল অপ্রমাণিত তত্ত্ব, অথচ যা মিলিয়ে দিয়েছিল মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র কণিকাদের পারিবারিক কুণ্ডলী, তা এখন পরীক্ষালব্ধ বাস্তব। আবিষ্কার হয়েছে " হিগস বোসন " যার ডাকনাম " গড পার্টিকল"। বাংলা সংবাদ মাধ্যমে উল্কার গতিতে ছড়িয়ে গেল খবর " ঈশ্বর কণা আবিষ্কৃত"। সেই সূত্র ধরে, মনের মাধুরী মিশিয়ে চর্চা চলতে লাগল এ নাকি ঈশ্বরের অস্তিত্বের প্রমাণ। বিশ্বাসী মানুষ খবর কাগজ পড়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন " যাক! তিনি আছেন। বিজ্ঞানকে পর্যন্ত তাঁকে স্বীকার করতেই হল।" রঙ্গে ভরা বঙ্গদেশে অনুচ্চারিতই রয়ে গেল যে " ঈশ্বর কণা" নিছকই নাম, " হতচ্ছাড়া" ( Goddamn) কে সাজিয়ে গুছিয়ে পেশ করা বৈ কিছু নয়।
যার দৌলতে " ঈশ্বর কণা " কটাদিন বাঙালির মনোজগতে তুফান তুলল সেই পিটার হিগস মারা গেলেন গত পরশু। বাংলা সংবাদমাধ্যমে কোন খবর আছে " ঈশ্বরের" আবিষ্কারককে নিয়ে? থাকার কথাও নয়। এখন তো আর " সেনসেশন " তৈরি হবে না।
যাইহোক, পিটার হিগস এবং তাঁর আবিষ্কার নিয়ে সহজ ভাষায় লিখেছেন অরিজিৎ গুহ। নিচে দিলাম লেখাটা।
~ শুভ্রদীপ ঘোষ 
******"************************************************



আত্মবিশ্বাস শব্দটার সাথে জড়িয়ে থাকে একটা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ মনোভাব। আত্মবিশ্বাস না থাকলে সুন্দর কোনো কিছুই গড়ে ওঠা সম্ভব নয়। পল ডিরাক যখন কোয়ান্টাম তত্ত্বের সাথে প্রথমবার বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদ যুক্ত করলেন, তখন তাঁর ইকুয়েশনের সলিউশনে একটা অদ্ভুত ফলাফল এসেছিল। দ্বিঘাত সমীকরণে x এর যেমন পজিটিভ এবং নেগেটিভ দুখানা মাণ বেরোয়, অনেকটা সেরকমই। সমীকরণটায় ইলেকট্রনের দুখানা চার্জ বেরিয়েছিল। একটা নেগেটিভ এবং একখানা পজিটিভ। নেগেটিভ চার্জ নিয়ে কারো মাথাব্যথা ছিল না। কারণ ইলেকট্রনের চার্জ নেগেটিভ হবে সেটাই তো স্বাভাবিক। চিন্তার কারণ ঘটিয়েছিল পজিটিভ চার্জখানা নিয়ে। ইলেকট্রন কী করে পজিটিভ চার্জের হয়! অদ্ভুত ব্যাপার! ডিরাক নিজেও প্রথমে ঘাবড়ে গেছিলেন। ভেবেছিলেন এটা পজিটিভ প্রোটনেরই হয়ত কোনো প্রকারভেদ হবে। আবার অংক কষা শুরু করেছিলেন। পরে স্থির প্রত্যয় হয়ে ঘোষণা করেন, আমার সমীকরণ পুরোপুরি ঠিক। একফোঁটা কোনো ভুল নেই।

কিছুকাল পরে কার্ল অ্যান্ডারসন ইলেকট্রনের অ্যান্টি পার্টিকল পজিটিভ চার্জের পজিট্রন আবিষ্কার করেন ক্লাউড চেম্বারে কসমিক রে নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে। ডিরাক বললেন My equations are more powerful than me. আত্মবিশ্বাস। আমিই ঠিক। এই আত্মবিশ্বাসের ফলে পাওয়া গেছিল সুন্দর একটি তত্ত্ব। অ্যান্টি পার্টিকল এর তত্ত্ব।
১৯৯৮ থেকে ২০০৮ এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের জেনেভা শহরে ইউরোপিয়ান অর্গানাইজেশন ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চ বা সার্নের তত্ত্বাবধানে নয় বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট ২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটার বা পার্টিকল কোলাইডার তৈরি করা হল মহাবিশ্বের কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য যার নাম লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার। যেসব প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হচ্ছিল তার মধ্যে ছিল কণা পদার্থবিজ্ঞানের এখনো অব্দি সব থেকে সর্বজনগ্রাহ্য মত স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল এর মান্যতা নির্ধারণ এবং স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলের সম্প্রসারিত মতবাদ সুপারসিমেট্রির সন্ধান, স্ট্রিং থিওরিতে বর্ণিত অতিরিক্ত মাত্রার সন্ধান, ডার্ক ম্যাটার যা ধরে আছে মহাবিশ্বের ৭৮ শতাংশ ভর সেই ডার্ক ম্যাটারের সন্ধান, গ্র্যাণ্ড ইউনিফাইড তত্ত্ব ইত্যাদি। তবে সব থেকে বড় যে প্রশ্নের উত্তরটা খোঁজা হচ্ছিল সেটা হচ্ছে পদার্থের ভর সংক্রান্ত।


কণা পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল আসলে পর্যায় সারণির মৌলের মত প্রাথমিক কণার একটা পর্যায় সারণি। এই পর্যায় সারণির প্রায় প্রতিটা কণাই নয়ের দশক নাগাদ পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটারে আবিষ্কৃত হয়ে যায়। বাকি ছিল একখানা কণার আবিষ্কার। সেই কণাটা আবিষ্কৃত হলেই এক বিরাট বড় মৌলিক প্রশ্নের উত্তর পাওয়া হয়ে যেত পদার্থবিদদের। প্রশ্নটা কী ছিল! একটু দেখে নেওয়া যাক।
ধরা যাক ইলেকট্রন। এটা একটা প্রাথমিক কণা এবং স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলে যে পর্যায় সারণি করা হয়েছে সেখানে এর স্থান রয়েছে লেপটন কণাদের শ্রেণীতে। বাকি লেপটন কণারা হচ্ছে মিউয়ন আর টাউ। এরা খুব হাল্কা কণা। এবার রিচার্ড ফেইনম্যান কোয়াণ্টাম তত্ত্বের মধ্যে ফিল্ড থিওরি বলে একটা তত্ত্ব এনেছিলেন যেখানে উনি দেখিয়েছিলেন প্রতিটি কণার সাথে যুক্ত থাকে একটা করে সেই কণার ফিল্ড। ফিল্ড মানে হচ্ছে যেখানে সেই কণাটার উপস্থিতি বোঝা যায়। 'পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাঙ খোড়া করে দেবে বলেছে পাড়ার দাদারা'- এই গানের মধ্যে দিয়ে অঞ্জন দত্ত পাড়ার দাদাদের ফিল্ড বুঝিয়ে দিয়েছেন। ওই পাড়াটাই হচ্ছে দাদাদের ফিল্ড। ওখানে দাদারা শক্তিশালী। সেরকমই কণাগুলোরও একেকটা ফিল্ড রয়েছে এবং এই ফিল্ডের ফ্লাকচুয়েশনই কণার অস্তিত্ত্ব প্রকাশ করে। এই ফিল্ডের মধ্যে কণাটা শক্তিশালী।

কণার অস্তিত্ত্ব তো প্রকাশ হল, কিন্তু কণা সাবালক হল কিনা কী করে বোঝা যাবে! অর্থাৎ কণাটা ভর পেল কিনা সেটা কোথা থেকে জানা যাবে! এই নিয়ে বিজ্ঞানীরা পড়লেন দ্বিধায়। তাঁরা প্রস্তাব করলেন কণাগুলো জন্ম নেওয়ার সাথে সাথে একটা চ্যাটচ্যাটে আঠালো ফিল্ড যা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র, সেই ফিল্ডের মধ্যে দিয়ে যায়। এবার সেই আঠালো চ্যাটচ্যাটে ফিল্ডের সাথে অন্য কণার ফিল্ডের মিথষ্ক্রিয়া বা ইন্টার্যাকশন যখন হয় তখন কণাগুলো এমন ভাব করে যেন সুইমিং পুলের মধ্যে কণাগুলো সাঁতার কেটে জল ঠেলে এগিয়ে যাচ্ছে। এই সাঁতার কাটার ফলেই কণাগুলো তার ভর পাচ্ছে। ওই সুইমিং পুলটা হচ্ছে সেই আঠালো চ্যাটচ্যাটে ফিল্ড। রাশিয়ান পদার্থবিদ লেভ ল্যাণ্ডাউ এর নিম্ন তাপমাত্রায় অতিপরিবাহিতার একখানা তত্ত্ব থেকে এই চ্যাটচ্যাটে আঠালো ফিল্ডের তত্ত্ব বিজ্ঞানীরা নিয়ে আসেন। এই যে কণাগুলোর এই ফিল্ডের সাথে মিথষ্ক্রিয়া বা সাঁতার কাটার এই পদ্ধতি, সেই সংক্রান্ত কয়েকখানা পেপার ১৯৬২-৬৪ এর মধ্যে পরপর কয়েকজন বিজ্ঞানী প্রকাশ করেন। তাঁদের প্রত্যেকের নামের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী এই মিথষ্ক্রিয়ার নাম রাখা হয় ABEGHHK'tH mechanism. যথাক্রমে Philip Anderson, Robert Brout, Francoise Englart, Gerald Guralnik, CR Hagen, Peter Higgs, Tom Kibble, Gerard tHooft এদের আদ্যাক্ষর অনুসারে। তবে এদের মধ্যে খুব স্পষ্টভাবে পিটার হিগস তাঁর পেপারে এই ফিল্ড সংক্রান্ত যে একটি কণা রয়েছে তার উল্লেখ করেন। স্বাভাবিক। ফিল্ড থাকলে সেই ফিল্ডের একটা কণাও থাকবে। সেই জন্য পরবর্তীকালে এই মেকানিজম হিগস মেকানিজম আর হিগস ফিল্ড সংক্রান্ত কণাটাকে হিগস কণা বলে উল্লেখ করা হতে থাকে। স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলের বাকি বল বা ফোর্স পরিবাহী কণাগুলো যেগুলো বোসন কণা তার সাথে এই কণাটার একটা পার্থক্য হচ্ছে বাকি ফোর্স ক্যারিয়ার কণাগুলোর ফিল্ডের একটা অভিমুখ আছে, যেহেতু ফোর্স বা বলের অভিমুখ থাকে, তাই বাকি ফোর্স ক্যারিয়ার কণাগুলো হচ্ছে ভেক্টার বোসন বা গেজ বোসন আর এই কণাটার কোনো অভিমুখ নেই তাই একে বলা হয় স্কেলার বোসন। এবং এই কণাটাই সব কণাদের ভর যোগাচ্ছে। এলএইচসি তে যদি এই কণা আবিষ্কার করা যায় তাহলে পদার্থের ভর সংক্রান্ত একটা মৌলিক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যাবে।
যখন এলএইচসি তৈরি হচ্ছে ততদিনে স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল নিয়ে গবেষণা করে বেশ কয়েকজন নোবেল পেয়ে গেছেন। তার কারণ আগেই উল্লেখ করেছি বাকি কণাগুলো পার্টিকল অ্যাক্সিলারেটারে আবিষ্কৃত হয়ে গেছে। যারা যারা এইসব কণা সংক্রান্ত তত্ত্ব দিয়েছিলেন তাঁরা এবং যারা কণাগুলোর আবিষ্কারে জড়িত ছিলেন, প্রত্যেকেই নোবেল পেয়ে গেছেন। সেই সময়ে পদার্থবিদদের মধ্যে একটা বিকল্প তত্ত্বও উঠে এসেছিল যা হচ্ছে হিগস মেকানিজম এবং হিগস বোসন ছাড়া পার্টিকল ফিজিক্স এর ইলেকট্রোউইক তত্ত্ব। এখানে বলা হয়েছিল কণাগুলোর কোয়ান্টাম ফিল্ডের যে গতিশক্তি সেখান থেকেই কণাগুলো নিজস্ব শক্তি থেকে ভর সৃষ্টি করে।এবং এই সংক্রান্ত ম্যাথামেটিক্সও বিকশিত হচ্ছিল ১৯৯০ থেকেই। সহজেই বোঝা যায় এই তত্ত্ব বিকশিত হলে স্ট্যাণ্ডার্ড মডেলকে নিয়ে আবার নতুন করে ভাবতে হত এবং হিগস মেকানিজম বা হিগস ফিল্ডের আর কোনো অস্তিত্ত্বই থাকত না।
১৯৯৮ সালে এই বিকল্প তত্ত্ব নিয়েই সার্নে বক্তৃতা দিতে গেছিলেন বিকল্প তত্ত্বের উদ্ভাবক কানাডার পদার্থবিদ John W Moffat. সেই বক্তৃতার নাম ছিল Electroweak Model without a Higgs Particle. স্পষ্টতই সেই সময়ের প্রেক্ষিতে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এত বড় একটা প্রোজেক্ট হচ্ছে, তার আগে এমন একখানা বক্তৃতা যে বক্তৃতা পুরো প্রজেক্টটা সম্পর্কেই অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে।

সেই বক্তৃতার ঠিক আগে আগেই এই এলএইচসি প্রজেক্ট লঞ্চ হল। একজন সাংবাদিক তৎকালীন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত প্রফেসার পিটার হিগস কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন এই যে একটা নয় বিলিয়ন ডলারের প্রজেক্ট যেখানে আপনার নামে একখানা কণা আবিষ্কারের সম্ভাবনা রয়েছে, আপনি কি বিশ্বাস করেন এতে হিগস বোসন পাওয়া সম্ভব হবে? পিটার হিগস এর জবাব ছিল I am 96 percent certain that they will discover the particle.

Moffat এর বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর সার্নের থিওরেটিকাল ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের দ্বিতীয় তলের সেমিনার রুম স্তব্ধ হয়ে গেছিল। এসব কি তত্ত্ব শুনছে ফিজিক্স কমিউনিটি! এই তত্ত্বের ঠিক হওয়া মানে নয় বিলিয়ন ডলার জলে চলে যাবে। সরকারের থেকে ভবিষ্যতে আর কোনো ফাণ্ড পাওয়া সম্ভব হবে না। পার্টিকল ফিজিক্স এর গবেষণা থমকে যাবে! কিন্তু ফিজিক্স তো এভাবে চলে না! সেমিনার রুমের এক বিজ্ঞানীর প্রশ্নের জবাবে Moffat বলেছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীতে যদি মিকেলসন মর্লি ইথার কে নস্যাৎ না করতেন তাহলে আইনস্টাইন এর রিলেটিভিটির জন্ম হত? সাইন্স আসলে কোনো কণা পেলাম কি পেলাম না তার ওপর নির্ভর করে থাকে না। এত বড় প্রোজেক্ট যদি ফেলও করে তাহলেও সাইন্স এগিয়ে যাবে।

অবশেষে ২০১৩ তে সার্নের এলএইচসিতে আবিষ্কৃত হয়েছিল হিগস কণা। পূর্ণতা পেয়েছিল স্ট্যাণ্ডার্ড মডেল। পিটার হিগস এর আত্মবিশ্বাস 'আমিই ঠিক' প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল।
গতকাল ৯ই এপ্রিল চলে গেলেন ২০১৩ র নোবেল প্রাইজ বিজয়ী পিটার হিগস। তিনি নিজে অবশ্য হিগস বোসন এর আবিষ্কারে পুরোপুরি নিজেকে কখনই কৃতিত্ব দেন নি। হিগস মেকানিজম এর পেপারের বাকি বিজ্ঞানীদের কথাও সব সময়ে বলে গেছেন। নিজেকে অন্তরালে রাখতেই পছন্দ করতেন এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন এই প্রফেসার।