বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০১৫

বোকাদিন ~ তিতলী রায়চৌধুরী

​বোকা হয়ে জন্মেছি, বোকা দেশে বাস,
ভর্তুকি দিয়ে হয় বোকাদের চাষ।
ইস্কুলে ও কলেজে বোকা সিলেবাস,
কাগজে টিভিতে চলে বোকামির ক্লাস।
জনতার বুদ্ধি, সরকারি দাস,
শুধু এপ্রিল কেন, বোকা বারোমাস!

ভোট নিয়ে সরকার বানাচ্ছে বোকা;
ব্যাঙ্ক নেবে ই এম আই, দরজায় টোকা;
বাবাজী গুরুজী দেয় মাদুলির ধোঁকা;
চিটফান্ড নিয়ে যায় নোট থোকা থোকা;
চালে ডালে কেমিক্যাল, সবজিতে পোকা;
ছড়া লিখে কার্টুন এঁকে জেলে গিয়ে ঢোকা;
সব ঝেড়ে বড় হয় মন্ত্রীর খোকা;
জনগণ আজীবন বনে যায় বোকা!
পুনশ্চ,
বারোমাস বোকা হয়ে গুণছি মাসুল,
আর কেউ কী বানাবে এপ্রিল ফুল ?

শুক্রবার, ২৭ মার্চ, ২০১৫

হারজিৎ ~ মধুবনী ঘোষ

​সারা রাত জেগে শেষে এই পরিণতি ?
শিখরে ভিরাট ছিল অগতির গতি
কিন্তু অবুঝ প্রেম অনুশকা শর্মা
মনঃসংযোগ গেল সিডনি টু বর্মা
বজ্র আঁটুনি দিয়ে এই প্রেম বাঁধলে
কিউই পাখি রোস্ট করে খাওয়া যেত খাবলে
কিন্ত বিরাট প্রেম জব্বর গরমা
যত দোষ ওই শালা অনুশকা শর্মা
আমাদের খোকা যদি মন দিয়ে খেলত
নাক ও চোখের জল এভাবে কি ফেলত ?
গোদের ওপরে আরও আছে বিষফোঁড়া
বাংলাদেশেতে নাচে ইলিশের জোড়া
আজ যদি কোনভাবে জিততাম ফাইনাল
বুক হত চেতানো হাসি হত এক গাল
চিত্কার করতাম সিডনি টু বর্মা
আমাদের জিতিয়েছে অনুশকা শর্মা !!!!



বৃহস্পতিবার, ২৬ মার্চ, ২০১৫

করবী ~ অবিন দত্তগুপ্ত

​ মাটির দোতলা বাড়ি । দোতলার বাইরের রেলিঙটায়, ভিজে জামারা এলোমেলো হাওয়ায় জড়সড় । পেছনের ঘরের জানলাটার একটা পাট্‌ , সবসময় বন্ধ-ই থাকে । ছোট্ট ওমর জানে , মাঠে খেলতে নামলে ,আম্মি ওই অর্ধেক জানলাটা দিয়েই ওর উপর নজর রাখে । জানলাটা দিয়ে শুধু মাঠের বাঁ দিকটাই দেখা যায় । পড়া ফাঁকি দেওয়া দুপুরে , তাই ওমর রাইট হাফ । এমনিতে ,বাঁ পায়ের প্লেয়ার । মাঝমাঠ থেকে সত্যজিৎ একটা দারুণ থ্রু দিল । বল তাড়া করেও ধরতে পারল না ওমর । বলটা , মাঠের পাশের বটগাছ পেরিয়ে গেল । থ্রো-ইন । বলটা আনতে , বটগাছ পেরোতেই ওমর আরেকটা মাঠ দেখতে পেল । একদম একরকমের । সেই মাঠের-ও উত্তর দিকে ওর বাড়ি । সেই মাঠের-ও ডান পাশে একই রকমের বটগাছ । বলটা বটগাছের দিকে ছুটেই চলেছে । ওমর তাড়া করল । ধরতে পারল না । আবার বটগাছটা পেরলো , আবার একটা মাঠ দেখতে পেল । বল তাড়া করে সেটাকে পেরোতে , আরেকটা । তারপর আরেকটা,তারপর আরেকটা । সব একরকমের । বলটা গড়িয়েই চলেছে । "ওমর...ওমর, হতচ্ছাড়া ছেলে । পড়তে না বসে আবার মাঠে নেমেছিস ? এক্ষুনি ফিরে আয় । " আম্মির রাগী গলায় ভয় পেয়েই বোধহয় বলটা পেছন দিকে গড়াতে আরম্ভ করল । ওমর-ও পেছোতে লাগল পেরিয়ে আসা মাঠের পর মাঠ । বাস্তবের মাঠটায় পৌছতেই , একটা বিচ্ছিরি কড়া নাড়ার শব্দ । মোবাইল ঘড়ি বলেছে প্রায় ১১টা বাজে । বাইরে ভ্যাপসা গরম । ওমরের বাঘাযতীনের মেস-এ ফ্যান নেই । দরদর করে ঘামছে । অভ্যাসবসত বিছানার তলার মোটা লাঠিটা হাতে নিয়ে ওমর ছিট্‌কিনি খুললো । "রতন কাকু , তুমি ? "

বলেই খেয়াল হল দাঁত মাজা হয়নি । বাসি মুখে  কারো নাকের সামনে ফস্‌ফস্‌ করলেই , নাজিয়া পিট্টি দিত ছোটবেলায় । নাজিয়া , ওমরের আম্মি । 

 

                                                                                          ২

 

                         নাজিয়ার বয়স তখন ২০ । মেটে মেটে গায়ের রঙ । চোখ দুটোই কথা বলে । কিন্তু রতনের ভালো লাগত অর স্লোগান দেওয়ার ভঙ্গি । গলার শিরা ফুলিয়ে, আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে স্লোগান দিত নাজিয়া । রতন নাজিয়াকে ভালোবাসত । খোঁপায় মাঝে সাঁঝে লাল গোলাপ লাগাত নাজিয়া । লাল রঙটা ভালোবাসত ওরা দুজনেই । রতন দারুণ পোস্টার লিখতে পারত । ওর ঝাঁকড়া চুল মাথা , রুক্ষ মুখ , আধখাওয়া বিড়ি --- সব কিছুকেই ভালোবাসত নাজিয়া । ওরা একসাথে ছাত্র ফেডারেশন করত । বাড়ি থেকে ওদের সম্পর্ক মেনে নেয়নি । অনেক লড়েও হেরে গিয়েছিল রতন । তিন বোনের দাদার পক্ষে বাড়ি ছাড়া সম্ভব ছিল না । নাজিয়া , ওসমান কে বিয়ে করে ।  ওসমান-ও মিছিলে হাঁটত । তখন ভরা জোয়ারের সময় । সক্কলে বাম ।

 

                          তারপর কেটে গিয়েছে প্রায় বছর কুড়ি । নাজিয়া আর ওসমানের ছেলে ওমর । বয়স ১৫ । নাজিয়া এখন মহিলা সমিতি করে । মিড ডে মিলের রান্নার কাজ করে স্থানিয় একটি স্কুলে । রতন কাজ করে কারখানায় । সিটু করে রতন । ওসমান কন্ট্রাক্টর । ক্লাস নাইনে পড়ে ওমর । রতন আর নাজিয়া তখনো কমরেড । ওসমান নাজিয়ার স্বামি, কমরেড নয় আর ।

 

                          সালটা ২০০৯ ।  গ্রামে অপিরিচিত মুখের আনাগোনা বেড়েছে বেশ কিছুদিন হল । আশেপাশের চেনা মুখগুলো বদলে যাচ্ছে , আলোর গতিতে । বহুদিন বিস্মৃত হায়নারা, নখে শান দিচ্ছে । ওসমান দারুণ ঘুড়ি ওড়াতো । হাওয়ার দিক নির্ণয় করার একটা সহজাত ক্ষমতা ছিল ওসমানের । ওসমান দল বদলালো । বহুদিন ধরেই নাজিয়া আর ওসমানের সম্পর্কে চিড় ধরছিল ।ওসমানের ধারনা ছিল, কারণটা রতন । নাজিয়া জানত , কারণটা শিরদাঁড়া । দলবদলানোর ঘটনা চিড়কে , ফাটলে পরিণত করলো । এক ছাঁদের তলায় , ওরা দুজন তখন সম্পূর্ণ অন্য গ্রহের বাসিন্দা । শুধু ওমরের জন্য-ই ছাঁদ ভাগ হয়নি ।

 

                          আরও দু-বছর কাটলো । সেবার নির্বাচনে প্রচার করতে গিয়ে ,বেদম মার খেল নাজিয়া । রতনের মনে আছে, দিনটা ১২ই ফেব্রুয়ারি ২০১১ । সরকারি স্বাস্থকেন্দ্রে রক্তাক্ত নাজিয়াকে দেখতে ছুটে এসেছিল রতন । স্মিত হেসে নাজিয়া জানতে চেয়েছিল , " কেমন লাগছে আমায় দেখতে ? "

"রক্তিম ...  কি হয়েছিল ?"

"ওরা আমায় পার্টি ছাড়তে বলেছিল । বলেছিল প্রচার করা যাবে না । "

"কি জবাব দিলে ? "

"বলেছি , বাড়ির লোকের আদেশ অমান্য করে , আমি আমার প্রেমিকের সাথে দেখা করেছি । কেউ আটকাতে পারেনি । লাল ঝাণ্ডা , আমার প্রথম প্রেম । তোমরা আটকাবে কি করে ? ঝাণ্ডা ছাড়ব না । "

সেদিন রাতেই রতনদের বাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হয় । গ্রাম ছাড়ে রতন । দু-মাস পরে নাজিয়ার চাকরি চলে যায় । এখন বাড়ি বাড়ি কাজ করে খায় , ছেলেকে পড়ায় । ওসমানের একটা পয়সাও নেয় না । নাজিয়া এখনো শিরা ফুলিয়েই স্লোগান দেয় ।

 

                                                         রতন আর নাজিয়ার গ্রামের নাম করবী । জেলা বর্ধমান ।

 

                                                                                         ৩

 

                              দারুণ ছবি আঁকে ওমর । পড়াশুনাতেও খারাপ নয় । ফুটবলটা বেশ ভালোই খেলে । হাতে-পায় দুরন্ত । লোকে বলে ওমরের চোখ দুটো ওর আম্মির মতো । ওমর আম্মির হাত ধরে মিছিলে যায় । আব্বু ওকে ঘুড়ি ওড়াতে শিখিয়েছে ।রতন কাকু, ফুটবল খেলা । ওমরের মিছিল ভালো লাগে না । স্লোগান ভালো লাগে না । ছবি আঁকতে , আর পাশে বাড়ির সাল্‌মাকে ওর বেশ ভালো লাগে ।

 

                              ঝরঝরে তরুণ , বেশ ভালোই কেটেছে জীবনের ১৫টা বছর । হঠাত-ই একদিন তাল কাটলো । স্কুল থেকে সাইকেলে বাড়ি ফেরার পথে , সেদিন ওকে ঘিরে ধরে চারটে ছেলে । ওরা এ-গাঁয়ের নয় । কোন কথা না বলে , প্রথমেই দুটো চড় মেরেছিল ওরা । তারপর কলার চেপে ধরে, খিস্তি করে বলেছিল "তোর মাকে বলিস্‌ ,বেশী না উড়তে । হাল খারাপ হয়ে যাবে । সময় বদলাচ্ছে । " প্রচণ্ড অপমানিত হয়েছিল সেদিন ওমর । কোনদিন-ও রাজনীতি করেনি,শুধু আম্মির ছেলে বলেই মার খেয়েছিল সেদিন । " গ্রামের মানুষ তো তোমায় এত্ত ভালোবাসে , তবু কেন ওরা তোমায় গালি দিল আম্মি ? " - জানতে চেয়েছিল ওমর । উত্তরে নাজিয়া  নিঃশব্দে , গলির মোড়ে বাশের মাথায় বাঁধা, একটা  জরাজীর্ণ লাল ঝান্ডার দিকে আঙুল দেখিয়েছিল । তার পরদিন-ই স্বেচ্ছায় প্রথম মিছিলে হেঁটেছিল ওমর । আম্মিকে প্রচন্ড ভালোবাসত । আম্মির ঝান্ডাকে ভালোবেসেছিল সেদিন প্রথমবার । 

 

                              পরের দুবছরের ইতিহাস , শুধুই ভাঙ্গার । কখনো পরিবার ভেঙ্গেছে , কখনো সাইকেল তো কখনো পা । কিন্তু মন ভাঙ্গেনি ওমরের । লোকে বলত ওমরের চোখ দুটো ওর আম্মির মতো । ওমর জানতো , ওর ভেতরটাও আম্মি মতোই , ইস্পাতের । ২০১১র ১২ই ফেব্রুয়ারি আম্মিকে মেরেছিল ওরা । সেদিন স্বাস্থকেন্দ্রে ডাক্তারের চোখে চোখ রেখে ,ওমর বলেছিল " ওষুধ কেনার টাকা আমাদের নেই । লাল ওষুধ লাগিয়ে দিন । আম্মি ভালো হয়ে যাবে । " দিন দশেক বাদে পরীক্ষা দিতে স্কুলে গিয়ে ওমর জানতে পারে , তার নাম কাটা গেছে ।  সেদিনের সন্ধ্যা ওমর কোনদিন-ও ভোলেনি । সেদিন রাতেই তাকে খুনের ভুয়ো কেসে ফাঁসানো হয় । সেদিন-ই রাতে ওমর শেষবার সাল্‌মাকে দেখেছিল , সেদিন রাতেই শেষ দেখেছিল তার আম্মিকে । করবীকে ।

 

                               তারপর শুধুই পালিয়ে বেড়ানোর গল্প । এখন ওমর বাঘাযতীনে থাকে । ঘরে কোন ফ্যান নেই । ব্যাগে একটা লাল পতাকা আছে আর খাটের তলায় রাখা থাকে একটা মোটা লাঠি । শহরে কোন লাল মিছিলের খবর পেলে , মোটা লাঠিতে পতাকার কাপড় জুরে, সে মিছিলের পিছে পিছে হাঁটে । এভাবেই সে শহর চিনেছে । শহরের জল , খাওয়ারের স্বাদ , আকাশ ,পাখি , হাওয়া কোনটাই করবীর মতো নয় । শুধু মিছিলের মানুষ গুলোকে ওমরের আপন মনে হয় । ওমর প্রতি রাতে স্বপ্ন দেখে । সাল্‌মার । আম্মির । করবীর । স্বপ্নের ভোরের ।

 

                                                                                         ৪

 

                                    রতনকাকুকে আজকে অন্যরকম লাগছিল । দরজা খুলে দেওয়ার পর অনেকক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে মুখের দিকে চেয়েছিল । প্রায় মিনিট দশেক চুপ করে থাকার পর কথা বললো রতন কাকু , "একটা খারাপ খবর দেওয়ার আছে ওমর । "

"কী ? "

"কাল রাতে ... " বলেই চুপ করে গেল রতন কাকু । দুগাল বেয়ে অবারিত ধারা । কাল রাত থেকেই কিছু খায় নি ওমর , তাই হয়ত মাথাটা ঘুরছিল । মনে হল , রতন কাকুর চোখ বেয়ে , গাল বেয়ে রক্তের ধারা বইছে যেন ... " কী, কী হয়েছে কাল রাতে ? "

"কাল রাতে , তোর আম্মিকে হায়নার বাচ্চারা ছিড়ে খুড়ে গেছে । নাজিয়া আর নেই । "

হঠাত-ই একটা সিনেমার মতো ঘটনা ঘটল । ওমরের চোখের সামনেটা সম্পূর্ণ অন্ধকার হয়ে গেল । তারপর স্পট পড়ল একে একে ৮বি মোড়ে , বাঘাজতিনের চায়ের দোকানে , ধর্মতলায় গড়িয়াহাটে , সারা শহর জুড়ে । সর্বত্র আকাশ থেকে পলাশ ফুল বৃষ্টি হচ্ছে । হচ্ছে তো হচ্ছেই । আকাশ ভেঙ্গে মাটি ভাসছে রক্ত পলাশে ।   জ্ঞান ফেরার পরে ওমর জিজ্ঞেস করেছিল " কাকু এ শহরে কোথাও পলাশ গাছ, আছে কি ? " রতনের কাছেও এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না । 

 

 

                                     মা কে কবর দিতে যাওয়া হয়নি ওমরের । এই ঘটনার প্রায় এক মাস বাদে গ্রামে ফিরেছিল রতন আর ওমর । মানুষের মিছিল তাদের নাজিয়ার কবরের কাছে পৌঁছে দিয়েছিল । একটা মাঠ । তার উত্তর দিকে ওমরের বাড়ি । দোতলার জানলার ডানদিকের পাট্‌টা বন্ধ । মাঠের ডান কোনে একটা বুড়ো বটগাছ । বটগাছটা পেরোলেই --- আম্মির কবর ।  ওই বটগাছটা ছাড়া , আশেপাশে একটি গাছ-ও ছিল না । আম্মির কবরের বুকে , একটা লাল পলাশ পড়েছিল । কোথা থেকে , কত দূর থেকে উড়তে উড়তে এসেছে কেউ জানে না । গন্তব্যে পৌঁছতে এক মাস সময় লেগেছে , ওমর জানে । 

 

                                    লাল পলাশটাকে রতনের গোলাপের মতো লাগছিল । কবরটা------ নাজিয়ার কালো খোঁপা ।    

সোমবার, ২৩ মার্চ, ২০১৫

পোলাপান ~ তিতলী রায়চৌধুরী

এ যুগের পোলাপান ভয়ে সন্ত্রস্ত,
বুকস্থ বিদ্যা, করছে মুখস্থ।
ক্লাসে ফার্স্ট হওয়া চাই, বাপ-মা'র হুমকি,
জানে না সে খেলা ধুলো, বোঝে না সে ঘুম কি!
সকাল ও সন্ধ্যা, গরুতাড়া খাচ্ছে,
স্কুল থেকে ফিরে ফের টিউশন যাচ্ছে।
কোনটা যে কেন হয় যায় না সে প্রশ্নেই,
নম্বর পেলে পরে কিছুতেই দোষ নেই।
যত পারো ঠেসে দাও, মাথা যেন বস্তা!
অসহায় খোকাদের করুণ অবস্থা!

সোমবার, ৯ মার্চ, ২০১৫

"রাজ্যটা এখনও গুজরাট হয়ে যায়নি"... স্যার ~ সুশোভন পাত্র

কিন্ত স্যার...

আপনি তো এখন প্রধানমন্ত্রী স্যার। গলার অনেক জোর। মিডিয়ার পালিশে চকচক করেন। আম্বানিদের টাকায় দশ লাখি স্যুট পরেন। কাজেরও অনেক চাপ। কত দিকে খেয়াল রাখতে হয়। কত শত জায়গায় ৫৬ ইঞ্চির ছাতি ফুলিয়ে বক্তৃতা দিতে হয়। তাই আপনার একটু আধটু স্মৃতিভ্রম তো হতেই পারে। রাজ্যসভায় উঠে দাঁড়িয়ে, "বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের  "তিন দশকের"  পশ্চিমবঙ্গের পিছিয়ে পড়া নিয়ে খুব উদ্বিগ্ন হয়ে উঠতেই পারেন তাঁদের  চোদ্দো পুরুষ কে নেতিয়ে নব্বই, হেদিয়ে হান্ড্রেড সেভেন আপনি করতেই পারেন স্যার। কিন্তু অঙ্ক যে বড় কঠিন স্যার ... 


আয়নায় মুখ দেখুন...


নভজোৎ সিং সিধু একবার বলেছিলেন ক্রিকেটে পরিসংখ্যান নাকি "Statistics are like mini skirts my friend. It reveals more than what it hides." রাজ্য পরিচালনার সাথে না হয় ক্রিকেটের দূরত্ব কয়েক যোজন, কিন্তু আজ আপনি  যে গুজরাট মডেলের গল্পের গরু কে গাছে চড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন আসুন আপনাকে সেই আয়নায় আপনারই মুখ দেখাই স্যার। 

আপনার সময়েই গুজরাটর আর্থিক উন্নয়ন হার  ছিল (১০.১%) । জাতীয় গড়ের ( ৮.৩%) থেকে অল্প বেশী হলেও তামিলনাড়ু (১০.৩%), মহারাষ্ট্র (১০.৮%) এমনকি আপনার অপছন্দের নিতিশ কুমারের বিহারের (১১.৪%) থেকেও অনেক পিছনে। ২০০০ থেকে ২০১১ পর্যন্ত গুজরাটে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে ৭.২ বিলিয়ন ডলার এই একই সময় মহারাষ্ট্রতে ও দিল্লীতে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ হয়েছে  যথাক্রমে  ৪৫.৮ বিলিয়ন ডলার ও ২৬  বিলিয়ন ডলার।  মানব উন্নয়ন সূচকে গুজরাটের অবস্থা ভয়ঙ্কর। ২০০৮ -র তথ্য অনুসারে ০.৫২৭ সহ বড় রাজ্য গুলির মধ্যে দশম স্থানে রয়েছে গুজরাট। কেরালা প্রথম (০.৭৯২) এমনকি হিমাচল প্রদেশ (০.৬৫২) পাঞ্জাব(০.৬০৫), মহারাষ্ট্র(০.৫৭২) হরিয়ানা (০.৫৫২) সবাই গুজরাটের থেকে ভালো জায়গায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের দেওয়া ২০১৩-র হিসাব অনুযায়ী মাথাপিছু ঋণের  শীর্ষে রয়েছে মোদীর গুজরাট(২৯২২০ টাকা)  সাক্ষরতাতে গুজরাট (৭৯.৩%) রাজ্য গুলির মধ্যে রয়েছে ১৮ তম স্থানে। জনগণনা ২০০১ গুজরাটে প্রতি হাজার পুরুষের তুলনায় মহিলা সংখ্যা ছিল ৯২০। ২০১১ এর টা কমে দাঁড়িয়েছে ৯১৮ তে। যেখানে জাতীয় গড় ২০০১ (৯৩৩) থেকে ২০১১ তে বেড়ে হয়েছে ৯৪০। এনএসএসও রিপোর্ট অনুসারে গুজরাটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির হার গত ১২ বছরে প্রায় শূন্য তে এসে ঠেকেছে। এটা বাস্তব যে গুজরাটে বিদ্যুৎ উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু টা সাধারন মানুষের কাছে পৌছায় না। এখানেও গুজরাটের স্থান রাজ্যগুলির মধ্যে ১৬তম।  ২০১২-১৩ র প্ল্যানিং কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে গুজরাটে দারিদ্র্য সীমার নিচে থাকে প্রায় ২৩% মানুষ যা অন্ধ্র, হরিয়ানা, কেরালা, ত্রিপুরা, হিমাচল প্রদেশ থেকে অনেক বেশী। এমনকি বিশ্ব ক্ষুধার সুচকে  গুজরাট ১৯৯৪ সালে  যেখানে ছিল দশম  স্থানে মোদীর উন্নয়নের চোটে তাঁরা আরও নেমে এখন ১৩ তম।  দ্রুত বেড়েছে নিরক্ষরের সংখ্যা। ১৯৯০ থেকে ২০১০ পর্যন্ত গুজরাটে বাজেটের মাত্র .৭৭% ব্যায় করা হত স্বাস্থ্য খাতে যা তুলনামূলক ভাবে গরীব বিহার(১.১%) ও ওড়িশার( ১.৬৬%) থেকেও কম। আপনার গুজরাটেই ৪২% শিশুর ওজন স্বাভাবিকের থেকেক কম স্যার সে খবর রাখেন আপনি ? জন্মের সময় শিশু মৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৪৪। অনূর্ধ্ব ৫ বছরের ৫০% অপুষ্টিতে ও ৭৫% রক্তাল্পতার শিকার। মাত্র ৫০% শিশু হাসপাতালে জন্মায়। প্রসব কালীন মায়ের মৃত্যু প্রতি হাজারে ৬২.৮ । ৬৭% গ্রামীণ পরিবারে নেই শউচালয়। আর আমুল,আম্বানি,আদানি, নিরমা, টরেন্ট, জাইদাস, ক্যাদিলা, আইপিসিএল, জিএসএফসি , জিএনএফসি এমনকি রাজকোটের মেশিন শিল্প বা ডিসেল ইঞ্জিন শিল্প, সুরাটের ও ভাবনগরের হীরা প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র ; এসবই আপনি  মুখ্যমন্ত্রী হবার আগেই গুজরাটে ছিল। তাই আগে আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন স্যার...  



দাঙ্গাবাজের সার্টিফিকেট...


৫০-র দশকে  রাজনৈতিক বন্দীদের নিঃশর্তে মুক্তির দাবী, ঐতিহাসিক শিক্ষক আন্দোলন, ট্রামের ভাড়া বৃদ্ধির বিরুদ্ধে আন্দোলন, ক্যালকাটা ট্রামওয়েসের রাষ্ট্রীয়করনের দাবীতে আন্দোলন, ১৯৫৯-র খাদ্য আন্দোলন, বাংলা-বিহার সংযোজনের বিরুদ্ধে এমনকি পর্তুগীজ শাসন মুক্ত গোয়ার দাবীতে প্রতিবাদ গড়ে তোলাতে কোনও ভূমিকাই কি থাকেনি এই "বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের ?  ৭৭-এ দলমত  নির্বিশেষে ১৭০০০ রাজনৈতিক বন্দীমুক্তি এবং সংশ্লিষ্ট ১০০০০ এর বেশী মামলা প্রত্যাহারও করেনি এই বিদেশ থেকে আমদানি করা নীতি'র গর্ভজাত সন্তানরা ?  দেশে প্রথম ত্রিস্তর পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং ১৮ বছরের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পৌরসভা নির্বাচন,মহিলাদের জন্য অর্ধেক আসন সংরক্ষণও  চালু হয়নি এই "তিন দশকে" ? দেশের মোট কৃষি জমির  ৪% -র কম পশ্চিমবাংলাতে হওয়া সত্ত্বেও ২০১১ পর্যন্ত দেশের ২৩% এবং উপকৃত ৫৫% (মোট ৫০ লক্ষ) মানুষের স্বার্থে ভূমি সংস্কারও হয়নি এই  "পিছিয়ে পড়া রাজ্যে ?" ২০০৫-০৮ সময়কালে যখন তৎকালীন রাজ্যসরকারের বিরুদ্ধে শিল্পায়নের জন্য কৃষকদের জমি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠেছিল তখনও ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে ৩০,০০০ একর জমি বণ্টন করেছিলো এই "বিদেশ থেকে আমদানি করা নীতি'র" গর্ভজাত সন্তানরাই। ২০১১ সালে পশ্চিমবঙ্গের উৎপাদিত খাদ্যশস্যের পরিমান (১৭০ লক্ষ টন) সারা দেশের মোট উৎপাদিত খাদ্যশস্যের  ৮% । ২০১০-১১ সালে  চাল, পাট, আলু, সবজি, ফল, মাছ  উৎপাদনে  পশ্চিমবঙ্গ কে দেশের  সেরা করেনি "বিদেশ থেকে আমদানি কর আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানরা ?  ৭০০০ সমবায় কৃষি উন্নয়ন সমিতি, ৩৭টি বহুমুখী হিমঘর, নেতাজী সুভাষ কৃষি বিপনন কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি এই "পিছিয়ে পড়ার তিন দশকে" ?

আপনার, কেন্দ্রীয় সরকারের রেজিস্টার জেনেরল অফ ইন্ডিয়ার সার্ভে রিপোর্ট অনুসারে  ১৯৯৭-২০০৯ স্থূল জন্ম  হ্রাসের জাতীয় গড় যেখানে ২০% সেখানে  পশ্চিমবঙ্গের  ২৫%, দেশে চতুর্থ। ২০০৮ সালে গ্রাম ও শহরের মৃত্যু হারের পার্থক্যের জাতীয় গড়ের (২৬.২%) তুলনায় পশ্চিমবঙ্গে (৭.৫%)। ওই একই সার্ভে রিপোর্ট অনুসারে জাতীয় গড় ২.৫৪-র তুলনায় তৎকালীন  পশ্চিমবঙ্গে মাতৃত্বকালীন মৃত্যু হার, ১.৪১ ছিল দেশের মধ্যে অন্যতম সেরা এবং শিশু মৃত্যু হার হ্রাসে তামিলনাড়ুর পরেই ছিল পশ্চিমবঙ্গ। রাজ্যের ৭৩% মানুষের কাছে সরকারী চিকিৎসা সহজলভ্য।

ন্যাশানাল স্যাম্পেল সার্ভের তথ্য অনুসারে "বিদেশ থেকে আমদানি করা নীতি'র" গর্ভজাত সন্তানদের আমলেই ১৯৯০-২০০৪ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গে জনগণের মাথা পিছু আয় এবং গ্রামীণ ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানের হার বেড়েছে জাতীয় গড়ের থেকে দ্রুত। একাদশ প্ল্যনিং কমিশনের রিপোর্ট অনুসারে ১৯৯৫-৯৬ থেকে ২০০৪-০৫ সময়কালে পশ্চিমবঙ্গের কৃষিতে উন্নয়নের হার ছিল ২.৬৭% যা জাতীয় গড় ১.৮৭% থেকে অনেক বেশী ও বৃহৎ রাজ্যগুলির মধ্যে তৃতীয়। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ ১৯৯০-র দশকে( ৬.৭৫%) এবং ২০০০-র দশকে( ৬.৬১%)  আভ্যন্তরীণ মোট উৎপাদনে ছিল দেশের অন্যতম সেরা। এই পিছিয়ে পড়ার সময়েও  ২০১১ তে পশ্চিমবঙ্গে দারিদ্র সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা ২৮.৬% যা ১৯৭৩-৭৪ এর কংগ্রেস শাসিত বাংলার ৭৩.২% থেকে ঢের ভালো। ২০১১ তে এই "বিদেশী আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের রাজ্যেই সাক্ষরতার হার (৭৭.১%) শুধু ৭০-র দশকের (৩৩.২%) থেকে শুধু  উন্নতই ছিলনা জাতীয় সাক্ষরতার হারের (৭৪.০৪%) থেকেও ছিল ভালো। ১৯৭৬-৭৭ সালে আদিবাসী ও পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য বরাদ্দ (৮.৫ কোটি) এবং মাদ্রাসা শিক্ষায় বরাদ্দ (৫.৬ লক্ষ)  ২০১১-তে বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৬৭৪ এবং ৬১০ কোটিতে। এই "বিদেশী আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের  আমলেই ২০০৯-১০ এর তথ্য অনুসারে সারা দেশে ক্ষুদ্র সঞ্চয় প্রকল্পে সংগৃহীত অর্থের (৩৬,৩৩৩.৩৯ কোটি) সর্বাধিক ২৫% ( ৮,৮৫৬.২১ কোটি) সংগ্রহ হত। এছাড়াও ৬১টি অসংগঠিত শ্রমিকের জন্য চালু হয় স্বাস্থ্যবীমা, প্রভিডেন্ট ফান্ড, ১ লক্ষ ২১ হাজার বৃদ্ধ আদিবাসীর জন্য পেনশেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক কাজে মহিলাদের অংশগ্রহন, নারী নিরাপত্তা,  ১৪ লক্ষাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠী, মাত্র ৪% হারে ঋণের ব্যবস্থা, চা বাগিচার শ্রমিকদের জন্য ভাতা চালু হয়নি এই "তিন দশকে" ? এরাজ্য শুধু অস্পৃশ্যতার অভিশাপ মুক্তই ছিল না,ছিল সাম্রদায়িক দাঙ্গা মুক্তও। দেশে শিখ বিরোধী দাঙ্গা  হয়েছে, বাবরি মসজিদ ভাঙ্গা হয়েছে, গুজরাটেদাঙ্গা হয়েছে – এরাজ্য ধিক্কার জানিয়েছে।"বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের জন্যই কিন্তু রাজ্যটা কিন্তু আজও গুজরাট হয়ে যায়নি। তাই আপনি আজ প্রধানমন্ত্রী হলেও, আপনার মত দাঙ্গাবাজের সার্টিফিকেট  আর যাই হোক "বিদেশ থেকে আমদানি করা আদর্শের" গর্ভজাত সন্তানদের লাগবে না স্যার।


ঐ ৩৪


হ্যাঁ এরপরও অনেক জরুরী কাজ বাকি রয়ে গিয়েছিলো।শিল্পায়ন, কৃষকের মালিকানা ভিত্তিক কৃষিব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে সমস্যা ছিল।  রাজনৈতিক  বিচ্যুতিও হয়েছে একাধিক। কর্মসূচী সফলভাবে রুপায়নের দ্রুততা ও অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা সহ কিছু বিষয়ে ভুল ত্রুটিও হয়েছে। তাই অনেক কাজই হয়নি। তবে তার সাথে আরও যেটা হয়নি স্যার,"রাজ্যটা এখনও গুজরাট হয়ে যায়নি..."তাই ৫৬ ইঞ্চির বুকের ছাতি নিয়ে  সাদা কে সাদা আর কালো কে কালো বলার সাহস যে দেখাতে হবে স্যার। তথ্যের আর ইতিহাসের বাস্তবতার ভিত্তিতে বিচার করতেহবে স্যার ৩৪ কে। আপনি কি ভুলে যাচ্ছেন স্যার আপনি সারা দেশের প্রধানমন্ত্রী ? এবার তো অন্তত সঙ্ঘপরিবারের দাঙ্গাবাজ থেকে প্রকৃত মানুষ হয়ে উঠুন...  

শনিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

লিখিস যারা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

লিখিস যারা, লিখতে থাকিস। মারিস যারা, মার।
সবাই নিজের জাত চেনালি, এটাই পরিষ্কার!
বলার কথা হবেই বলা, দিলেও ভেঙ্গে মুখ,
জানবে সবাই কোনটা উচিত, কোনটা অহেতুক।
আদালতের নেই প্রয়োজন করতে এ বিচার!!
মার খেতে ভয় পাই না তোদের, মরতেও প্রস্তুত,
ভয় তো তোদের নিজের মনে, ধরা পড়ার ভুত!
বুঝবি নিজেই, লড়াইতে আজ কার জিত কার হার!!
লিখিস যারা, লিখতে থাকিস। মারিস যারা, মার।

শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

তোমারই কবর ~ শঙ্খ করভৌমিক

​পূবদিকে সূর্য ওঠে, এই বুঝি তোমার বিশ্বাস?
যারা বলে পশ্চিমে তারা এসে ফেলে দেবে লাশ।
নীল রঙ প্রিয় বুঝি? ততটা পছন্দ নয় লাল?
মেলা থেকে ফিরে তুমি মারা পড়তেই পারো কাল।
শিরোনাম হতে গেলে আজকাল লাগছে না সেরকম ব্যতিক্রমী গুণ।
গান্ধী বা কেনেডি না, তুমি বা আমিও পারি যখন তখন হতে খুন।
ভেবে যদি থাকো শুধু এইসব ঘটে থাকে খবর কাগজে-
অর্ধেক মরে আছ- এইবেলা শান দাও নিজের মগজে।
নিতান্ত অকারণে হয়ে যেতে পারো তুমি গরম খবর।
চুপ করে থাকা মানে নীরবে খুঁড়তে দেখা তোমারই কবর।

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

২১শে ফেব্রুয়ারি ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়


ফেব্রুয়ারির দিনটি থাকে যুদ্ধসাজে
সকাল সকাল যন্ত্রিরা সব বর্ম আঁটে
মাতৃভাষায় স্বপ্নরা খুব ছোঁয়াচ লাগায়
"ভায়ের রক্ত" ছড়িয়ে থাকে রাস্তাঘাটে

জেতার মতই যুদ্ধটি হয় বাংলা জুড়ে
মুহূর্মুহূ বর্নমালার জয়ধ্বনী
উথলে ওঠে মাতৃভাষায় ঘনিষ্ঠতা
সাইনবোর্ডেও বাংলা আখর বিজ্ঞাপনি

সন্ধ্যে নামলে রনক্লান্ত আঁধার ঘণ
বই-কেতাবে পরিশ্রান্ত বাংলা লেখা
শুকিয়ে যাওয়া জিভ ওদিকে গলাও ভাঙ্গা
"বাংলা অতীত" এইটা কেবল ভাবতে শেখা

মধ্যরাতে নদীর বুকে ভাসছে ডিঙ্গি
গাইছে কারা? ভাটিয়ালি? জারি, সারি?
কোন ভাষাতে? বাংলা কিনা, কি এসে যায়?
মনের ভাষা, এইটুকু তো বলতে পারি।


মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

বঙ্গীয় রাজনীতির অবস্থা ~ অমিতাভ প্রামাণিক

বেশি না, এই সপ্তাখানেক আগেই বোধহয় লিখেছিলাম, আমাদের বাংলা হচ্ছে ছোটলোকের জায়গা। উরিব্বাবা, তাতে জনগণের কী রাগ! হাতের সামনে পেলে আমায় কুচি কুচি করে কেটে কুকুর দিয়েই খাইয়ে দিতো।

এখন দেখো! ভোটের রেজাল্ট দেখো।

ছোটলোক বলেই এখানকার লোক লোভে পড়ে নিজের জমানো শেষ পয়সাটা তুলে দেয় অজানা ঠগের হাতে, ঠকে গিয়ে হা-হুতাশ করে, হ্যান করেঙ্গা ত্যান করেঙ্গা বলে গালাগালি দেয়, আবার সেই ঠগ পার্টিকেই ভোটে জেতায়।

বলেছিলাম কিনা?


রাজনীতির অবস্থা দেখুন।

"কুণাল চোর? টুম্পাই চোর? মদন চোর? মুকুল চোর? আমি চোর?"

চোরদের লিস্ট বেরিয়ে এলো 'ঠাকুরঘরে কে রে' টাইপ! একে একে ঢুকতেও লাগল সব যেখানে তাদের মানায় ভালো।
মুকুল এখন বোঁটা থেকে ঝুলছে। যে কোনো মুহূর্তে খসে পড়বে। টুম্পাই অলরেডি খসে গেছে।

হঠাৎ উপনির্বাচনে দল জিতে যেতে বিপক্ষদের ধ্বনি-প্রতিধ্বনি শোনা যাচ্ছে - আহা, এতদিন ধরে যে লোকটা দল গড়লো, আজ কিনা তাকেই সাইডলাইন করে দিচ্ছে! এ তো ঘোর অন্যায়।

অর্থাৎ সে যে কাঙালের ধন চুরি করেছে, সেটা তেমন অন্যায় নয়। ওসব ভুলে গেলেও চলবে। সে দল গড়ার নায়ক, তাকে সাইড করে দেওয়াটাই মেইন ফ্যাক্টর! জনগণ নাকি এই অন্যায়ের প্রতিশোধ নেবে।
নীতি-ফিতির কোনো সংজ্ঞাই এদের কাছে পরিষ্কার না। কোন দু:খে জনতা এদের ভোট দেবে?

কিন্তু কেসটা এই রকম।

লোকজন জানে, বোঝে যে তৃণমূলের ওপরতলার দাদা-দিদি মানেই জালিস্য জালি। এক এক করে জেলে ঢুকছে, মানুষ জানবে না, বুঝবে না, এতই কি হাঁদা? কিন্তু উপায় কী? ভোট যে দেবে, কাকে দেবে?

বাম-কে? তার মানে তো ভোটটা জলে ফেলে দেওয়া। কেননা, গুন্ডা-ফুন্ডা বেরিয়ে গিয়ে বামে যারা পড়ে আছে, তাদের ইমেজ অনেক ক্লীন হলেও, নেতা কই? এদের জিতিয়ে লাভ কী? অতীতের অভিজ্ঞতা তো জানাই। রুখেছি, রুখবো। আর থিওরেটিক্যাল দাদাগিরি। নিজে কিচ্ছু করবে না, অন্যকেও করতে দেবে না। কেউ দাঁড়িয়ে বলছে না - আমি হলে এটা না, এই রকম করতাম, তাতে এই রেজাল্ট হত। তাহলে?

বিজেপি-কে? সে আর এদের চেয়ে আলাদা কী? এও তো স্কীমার। যে দল ভেঙে বিজেপিতে ঢুকতে চায় পিঠ বাঁচাতে, সে অসৎ না, তার সার্টিফিকেট রেডি, তাকে জেল যেতে নাও হতে পারে। প্লাস, এ রাজ্যে এদের নেতা কে? ম্যাড়মেড়ে রাহুল সিনহা? ভাঁওতাবাজ বাবা রামছাগলের আশির্বাদধন্য বাবুল? এর থেকে ওর গলায় ঝুলে যাওয়া লকেট? ছো:।

যারা মনস্থির করতে পারেনি, তারা তৃণমূলকেই আবার ভোট দিয়েছে। যারা পেরেছে, তারা বাম-বিজেপির মধ্যে আলাদা কিছু পায়নি, তাই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে ভোট ভাগ হয়েছে। ফল সবার সামনে।

ভাবছ, জনতা খুশি? নো ওয়ে। দে সিম্পলি ডোন্ট নো হোয়াট টু ডু। গো আস্ক দেম।

আমাদের এখনই প্রবলভাবে একটা অরবিন্দ কেজরিওয়াল চাই। একটা আম আদমি। যার কোনো ব্যাগেজ নেই। দুর্নীতি নেই। দাস ক্যাপিটাল নেই। পাশার চাল নেই। হিংসে নেই। লোভ নেই। শুধু বাঙালির গরিমা আছে, অভিমান আছে, তুষের আগুনের মত বুকের মধ্যে কোথাও এক চাপা অহঙ্কার আছে। নিজের কাছে প্রশ্ন আছে - রামমোহন বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথের জন্মভূমি এইভাবে বারোভূতে লুটেপুটে খাবে?

কোই হ্যায়? আছো কেউ?

বৃহস্পতিবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

প্রমিস ডে ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

মালতিকে কি প্রমিস করেছিল তপনে
মাখোমাখো ভালোবাসা নলবনে গোপনে,
মনে আছে নাড়ুদাকে বলেছিল শিবানী
লালুভুলু ভালো ছেলে, কথা বলে কি ফানি;
বিকেলের মরা রোদে বলেছিল পামেলা
রেগুলার দেখাকরা ফালতু এ ঝামেলা;
মনে আছে প্রতিজ্ঞা করেছিল সাকিরা
বর হেটে যাবে আর গাড়ি চেপে বাকিরা;
কেঁদে কেটে একদিন বলেছিল শ্রাবণী
হ্যারিকেনে তেল নেই আগে কেন ভাবনি?
কি জানি কি বলেছিল গোবিন্দ, গোপালে
টিনাদিকে হানিমুনে নিয়ে যাবে নেপালে;
সকালের কৈশোরে বলেছিল হাসিনা
ঝালমুড়ি ভালবাসি, তোকে ভালবাসিনা;
প্রতিজ্ঞা করেছিল লালটু কি কারনে
বুলাদিকে নাকি নিয়ে যাবে মহাকরণে;
ভয়ানক প্রতিজ্ঞা করেছিল অশোকে
রাত্তিরে কিছুতেই ঘুমবেনা তোষকে;
ম্লান মুখে একদিন বলেছিল তাপসে
নেড়িটা তো রাত্তিরে শুয়ে থাকে পাপোশে;
প্রেমে বিতাড়িত হয়ে বলেছিল মনিশে
হৃদয়ের দাগা যদি উঠে যেত ভ্যানিশে;
একদিন বলেছিল অনাবিল জোছনা
স্টেডি প্রেম কেটে গেছে? বিচলিত হোস না;
প্রতিজ্ঞা করেছিল পিতামহ ভীষ্ম
ডন বৈঠক দিয়ো কিবা রোদ গ্রীষ্ম;
প্রতিজ্ঞা করেছিল অর্জুন ভীমেতে
স্বাস্থ্যর উদ্ধারে রোজ যাবে জিমেতে;
কেউ বলে শোনা কথা সহদেব নকুলে
রাধিকার সাথে নাকি লুডু খেলে গোকুলে;
আরো কত প্রতিজ্ঞা চারপাশে ছড়ানো
প্রমিসের আমি তুমি সাদা খাতা ভরানো।।

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

​ও মেয়ে… অবুঝ মেয়ে ~ অনামিকা মিত্র

সেমিনারে কখা ওড়ে, রাশি রাশি ধ্যান ওড়ে।
ও মেয়ে, অবুঝ মেয়ে, জন্মালি কেন রে?

হিসেব জানিস না কি? তোর কী কী প্রাপ্য?
তোর যা গল্প, সে'তো ভ্রুণেই সমাপ্য।

সমাপ্ত নয়? যদি কাহিনিটি গড়ালো…
কেউ হেসে বলবে না … হল এই ঘর আলো

কেউ ডেকে বলল না এলি যদি বাঁচ রে।
বরঞ্চ মেরে ফেলা হোক তোকে আছড়ে!

যদি বেঁচে যাস, নিস যৌবন চিহ্ন
লোভে আর অধিকারে তুই হবি ছিন্ন।

কান্নারা গড়াবেই… আজ থেকে কালকে
পার্ক স্ট্রিট… কামদুনি… কখনও বা শালকে'।

এ'টাই ভাগ্যলিপি, যা লিখেছে কোষ্ঠী।
ছোট্ট ঘটনা… নাকি দ্বন্দ্বের গোষ্ঠী।

মেনে নিতে না পারলে রাষ্ট্রের ভাষ্য…
জ্বলে ওঠ। ক্রোধ হোক ক্রমশ প্রকাশ্য।

মঙ্গলবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৫

'লজ্জা' ~ সুশোভন পাত্র

​'লজ্জা' ! আর এই 'লজ্জা' নিয়েই পড়েছি মহাফাঁপরে ! গত কয়েকদিন ধরেই দোকানে, হাটে-বাজার, রাস্তা-ঘাটে সর্বত্র হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছি, যেকোনো মূল্য দিতেও প্রস্তুত, কিন্তু কোথাও দেখছি 'লজ্জা' কিনতেই পাওয়া যায় না। গাছেও ধরে না 'লজ্জা' ! মাটি খুঁড়েও পাওয়া যায় না 'লজ্জা' ! বিদেশ থেকে আমদানিও করা যায় না 'লজ্জা' ! সমস্যাটা গভীর।

ফ্লিপকার্ট, স্ন্যাপডিল, জাবং, মিন্ত্রা এরকম দস্তুর অনলাইন সাইটে শুনেছি নাকি কেঞ্জাকুড়ার গামছাও পাওয়া যায়, বিভিন্ন সময়েই বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থাও থাকে। কদিন আগে চিরুনি তল্লাসি করলাম। সার্চ অপশেনে গিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে বাঙলায় লিখলাম "১০০ গ্রাম লজ্জা"। পাতি ইংলিশে জবাব এলো "No matching products available." বাধ্য হয়ে গেলাম একটা শপিং মলে। খুঁজে খুঁজে ওঁদের সেলএক্সিকুইটিভ কে জিজ্ঞেস করলাম "দাদা লজ্জা কত কেজি?" শুনে সে তো এক বারে রেগে খাপ্পা। জানেন কি বলল ? বলল "লজ্জা খুঁজে আপনি এখানে এসেছেন ?এক্ষুনি 'মল ত্যাগ' করুন না হলে পুলিশ ডাকবো কিন্তু।" মনের দুঃখে মল ত্যাগ করলাম, বেরিয়ে আসতেই চোখে পড়ল পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানে লেখা "ধার চাহিয়া লজ্জা দেবেন না ।" জয়গুরুর নাম করে সটান দোকানে ঢুকে বললাম "দাদা ধারে একটা গোল্ড ফ্লেক দিন তো। আর দয়া করে আপনি যে লজ্জাটা পাবেন ওটা আমাকে দিন। যা দাম চান দেবো।" শুনে ভদ্রলোক এমন ভাবে তাকালেন যেন গিলেই ফেলবেন। উফ! শেষে গেলাম এক বইয়ের দোকানে বললাম "দাদা লজ্জা আছে?" " বললেন "হ্যাঁ। আছে। ক-কপি চান ?" যেই আমি বললাম " মানে, কেজি দরে পাওয়া যায় না দাদা ?" দিলেন দোকান থেকে ঘাড় ধাক্কা ! ভাবুন একবার !

ছোটবেলার এক বিকেলে তবলার শেখানোর মাস্টারমশায় কে বসিয়ে রেখে, বাথরুম যাবার নাম করে পিছনের দরজা দিয়ে খেলতে চলে গিয়েছিলুম, ফিরে আসার পর মা বলেছিল "তুই এটা করতে পারলি ? এতটুকু লজ্জা লাগলো না তোর ? জীবনে তুই তবলা শিখতে পারবি না, দেখিস।" সেদিনই বুঝেছিলাম 'লজ্জা' হল লাগার 'বস্তু'। মায়ের ভবিষ্যৎ বানী পাই টু পাই মিলে আমার তবলার ভবিষ্যৎ অচিরেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেও 'লজ্জা' আমি পেতে শিখেছিলাম। যখন জানলাম গাছের প্রাণ আছে প্রমান করা যায় লজ্জাবতী লতা ছুঁয়ে, বুঝলাম 'লজ্জা' প্রাণের একটি সুন্দর আবেগ। আবার যখন শুনলাম 'লজ্জা নারীর ভূষণ'। তখন ভাবলাম তাহলে পুরুষ মাত্রই বোধহয় 'বি-ভূতি-ভূষণ'। কিছুদিন আগে লোকে বলছিল "VC'র গণ্ডারের চামড়া ! লজ্জা নেই।" বুঝলাম গণ্ডারের বোধহয় 'লজ্জা' নেই তাহলে। মামাবাড়ি গেলেই দিদা বলত "খাওয়ার সময় লজ্জা করতে নেই "। বুঝলাম খেতে বসার আগেই 'লজ্জার' মাথা চিবিয়ে খেতে হয়। দিদার কথা এখনও শিরোধার্য। কিন্তু তসলিমা'র আবার বিখ্যাত 'লজ্জা' আছে। ভারতের ক্রিকেট টিমও বিদেশে মাটিতে সময় অসময়ে ভালোবেসে আমাদের অনেক 'লজ্জাই' দেয়, জার্মানি নাকি এ বারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল কে শ্রেষ্ঠ 'লজ্জা' উপহার দিয়েছে , বলিউডে মাধুরী দীক্ষিতের 'লজ্জা' একসময় বক্সঅফিস কাপিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তো কবেই লিখে গিয়েছেন "...প্রাণ চায় চক্ষু না চায়,/মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা..." মোটকথা পৃথিবীতে ম্যাদামারা ভদ্দরলোক যেমন নিজের মতো করে লজ্জা পায়, বোদা গামবাট লোকেরও তাদের মতো করে লজ্জা পায়।

আসলে লজ্জার সাথে আত্মসম্মান, আত্মবিশ্বাস, বিবেক, বুদ্ধি, মর্যাদা, মান, হুশের, অঙ্কের ভাষায় একটা 'সমানুপাতিক' সম্পর্ক আছে। এসব থাকলে আপনি ভুল করলে, অন্যায় করলে, নিজের স্বার্থ লাভের জন্য অন্য কে বঞ্চিত করলে, প্ররোচিত করলে লজ্জা পাবেন। লজ্জিত হবেন। আর এসব এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক ব্যস্তানুপাতিক হলে, বিবেক, বুদ্ধি, মান মর্যাদা, বিক্রি করে নির্লজ্জ হয়ে, মুখে রং মেখে, সানগ্লাস পরে সং সেজে, রাস্তায় রাস্তায় 'পরিবর্তন চাই পরিবর্তন চাই' করে মাস দু -এক টানা কেত্তন আর ঢং করে সঠিক সময় কর্পূরের মত উবে যেতে পারলেই... তবেই, একমাত্র তবেই আপনি 'বুদ্ধিজীবী'।

ঠাকুর তো কবেই বলে গেছেন 'ইষ্টলাভের' জন্য , লজ্জা, ঘৃণা, ভয় -- তিন থাকতে নয় ...

শুক্রবার, ৩০ জানুয়ারি, ২০১৫

ব্যঙ্গ ও সোশাল নেট ওয়ার্ক ~ সুশোভন পাত্র

কান দিয়ে রক্ত পড়ছে ? না চোখে সর্ষে ফুল দেখছেন ? তাহলে কানে আঙ্গুল দিন। চোখ বুজে বসে থাকুন। আর একান্তই দুটোর কিছুই না পারলে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরুন। নিজেরটা নিজে না পারলে, একে অপরেরটা ধরুন। কিন্তু ভুলেও হাসবেন না যেন। রসিকতাও করবেন না। ব্যাঙ্গ বাণে ফেসবুকের দেওয়াল ভরাবেন না।

পশ্চিমবঙ্গের মহামান্য মুখ্যমন্ত্রী কিছুদিন আগে চিন্তিত হয়ে বলেছিলেন রাজ্যের মুরগি কম ডিম পাড়ছে কেন ? বিজেপি সাংসদ, সদস্য আর কয়েকজন ধর্মগুরুরা আবার চিন্তিত হয়ে পড়েছেন যে হিন্দু মেয়েরা কেন ডজন ডজন 'হিন্দু বাচ্চা' উৎপাদন করছেন না। এলি-তেলি-স্বাধী থেকে পাড়ার নেতা কেউ বলছেন ৪ টে চাই, কেউ বলছেন ৫ টা। শ্রী শ্রী শঙ্করাচার্য তো এক কাঠি উপরে গিয়ে বলেছেন "নরেন্দ্র মোদী কে পরেরবার পুনারায় ভোটে জেতাতে কমপক্ষে ১০ টা করে হিন্দু বাচ্চা চাই"। আমি বলি কি আগে ঠিক করুন সঠিক সংখ্যাটা কত ? ৪ না ৫ না একেবারে ১০ টা ? তারপর শিশুদের অন্নপ্রাশনের আগে ভোটাধিকারের বিল সংসদে পাশ করুন। গর্ভবতী হিন্দু মায়েদের ২ বার ভোটাধিকারের কথাও বিবেচনা করুন। হিন্দু ভোটারের জোগান যদি চাহিদার থেকে বেশী হয় তাহলে নিখাদ, নিখুঁত, হিন্দুভোটার কে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে রাজকোষের ঘাটতি মেটানোর কথাও ভাবা যেতে পারে। সমস্যা একটাই মুরগির ডিম ফুটে সবগুলো যদি ছেলে বেরোয় তাহলে পরের বার মোদীর জন্য হিন্দুভোটার পাব কি করে ?
যে বিচিত্র দেশের রঙ্গমঞ্চে একাঙ্ক নাটক পরিবেশন করতে এসে কখনও শাহাজাদা বলেন "Poverty is a state of mind !" , ভোটের প্রচারে এসে হবু প্রধানমন্ত্রী বলেন "বীর আলেকজেন্ডার কে গঙ্গাতীরে বিহারীরা পরাজিত করেছিলেন ", কেউ বলবেন "সবাই হিন্দু" কেউ বলবেন "জন্মেই মুসলিম", অনাহার আর অপুষ্টির পক্ষাঘাতে উন্মাদ্গামী দেশের প্রধানমন্ত্রী সোনা দিয়ে নিজের নামাঙ্কিত ৯ লাখ টাকার জ্যাকেট পরে "রায় বাহাদুরের আশায়" বড়লাটের পদ লেহন করতে যান, সে দেশের অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী , শেক্সপিয়ার, কিটস আর রবীন্দ্রনাথের কল্পবিজ্ঞানের কথামৃত খোদ বইমেলায় উপহার দিলে আপনি অবাক হবেন ? না কানে আঙ্গুল দেবেন ?

শুনলাম সোশাল নেটওয়ার্কে ব্যঙ্গ ঠেকাতে সরকার নাকি বিশেষ নজরদারির ব্যবস্থা করছে। বটেই তো ! আপনার শিক্ষা, আপনার সংস্কৃতি, আপনার রুচি , আপনার জানা ইতিহাস, ভূগোলের চোদ্দ গুষ্ঠি উদ্ধার করার সম্পূর্ণ অধিকার ওনাদের আছে। শুধু আপনারই সেগুলো নিয়ে রসিকতা করার অধিকার নেই। ব্যাঙ্গ করার অধিকার নেই। মুখ চেপে হাসারও অবকাশ নেই।

একবার হিটলার নাটক দেখতে গিয়েছিলেন, সাথী ছিলেন গোয়েরিং। নাটকটা খুব পছন্দ হয় হিটলারের। শুধু ভিলেনের বাটারফ্লাই গোঁফ হিটলারের চরম অস্বস্তির কারন হয়ে ওঠে। নাটক শেষেই অর্ডার দেন যাতে নাটকটা মঞ্চস্থ না করা হয় আর ভিলেন কে গুলি করে মেরে ফেলা হয়। গোয়েরিং বলেন " ফুয়েরার, ভিলেন যদি গোঁফটা কেটে দেয় তাহলে ? " হিটলার বলেন "তাহলে গোঁফটা কাটার পর গুলি করে দিও। কেমন ? "

জনাব, হিটলারের বিচার ইতিহাস করেছে। নাৎসির বিচারও মানুষ করেছে। রসিকতাটা কিন্তু অমলিনই রয়ে গেছে। আজও।

বৃহস্পতিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০১৫

​মৃত্যুবিষয়ক কথোপকথন ~ শঙ্খ করভৌমিক

- "বাবা, এটা কিসের ছবি?"
- "হারমিট ক্র্যাব, সন্ন্যাসী কাঁকড়া।"
- "ওরকম নাম কেন?"
- "এরা খুব নিরীহ। সাধুদের মত। কেউ ওদের খেতে চাইলেও ওরা কিছু বলে না।"
- "তাহলে সবাই ওদের খেয়ে ফেলে না কেন?"
- "কি করে খাবে? ওরা তো ফাঁকা ঝিনুক বা শাঁখের খোলায় ঢুকে থাকে। ওটা খুব শক্ত হয়, তাই ওদের কেউ কামড়াতে পারে না।"
- "ও তাইতো, ওর জামাটা শাঁখের মত দেখতে।"
- "হ্যাঁ, জামাও বলতে পারো, বাড়িও বলতে পারো।"
- "বাবা, ও যে শাঁখটাকে জামা বানিয়ে পরে নিল, শাঁখটা কোথায় গেল?"
- "মরে গেছে। ওরা তো আর জ্যান্ত শাঁখ দিয়ে জামা বানায় না।"
- "সবাই মরে যায়?"
- "যায়।"
- "তুমিও মরে যাবে?"
- "হ্যাঁ, তবে তুমি বড় হবার পর।"
- "আমার যে খুব কষ্ট হবে। আমার সঙ্গে কে খেলবে?"
- "বললাম যে, তুমি বড় হয়ে যাবে। আমার সঙ্গে খেলার মত ছোট আর থাকবে না।"
- "তাহলে তোমার বাবা মরে যাবার পর তুমি কেঁদেছিলে কেন? তুমি তো বড়।"
- "বাহ! আমি বাবার সঙ্গে খেলতাম না তো কি হয়েছে। গল্প তো করতাম।"
- "এখন তো তুমি আমার সঙ্গে গল্প করতে পারো।"
- "হ্যাঁ, সেইজন্যই তো আর কাঁদি না।"
- "জানো বাবা, আমি আগে ভাবতাম শুধু আমারও বাবা আছে। দাদা স্টার হয়ে যাবার পর বুঝলাম তোমারও বাবা ছিল।"
- "স্টার? হতেও পারে।"
- "কি বলছ? মরে গেলে সবাই স্টার হয়ে যায় না?"
- "ওইরকম ভাবতে ভাল লাগে আর কি।"
- "মরে গেলে লোক তাহলে কোথায় যায়?"
- "আমরা সবাই জল, মাটি, বাতাস এসব দিয়ে তৈরি। তাতেই মিশে যায়।"
- "তাহলে তোমার বাবা এখনো আছে?"
- "যা দিয়ে তৈরি সেটা থেকে যাওয়া মানে যদি থাকা হয়, তাহলে আছে।"
- "তাহলে তুমি মাঝে মাঝে মন খারাপ করো কেন?"
- "যেমন আমার ভাই বিদেশে থাকে। তোমার বোন বিদেশে থাকে। আমরা জানি ওরা আছে, তবু দূরে আছে বলে মন খারাপ করি- অনেকটা সেরকম ব্যাপার।"
- "তাহলে তুমি স্টার হয়ে গেলে আমার মন খারাপ হবে না।"
- "সেকি, কেন?"
- "তুমি তো জল, মাটি, বাতাস এসব হয়ে থেকেই যাবে। আর আকাশের দিকে তাকালেই তোমাকে দেখা যাবে। ওয়েবক্যামট্যামের দরকারই হবে না।"

শনিবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৪

​ অথ বুদ্ধিজীবী কথা (জনস্বার্থে প্রচারিত) ~ পরিচয় পাত্র

সাম্প্রতিককালের নন্দন-আকাদেমি স্বল্পদৈর্ঘ্যের মিছিল মনে রেখে

 

 এই এই, এই লেড়ো, বিস্কুট দে, সঙ্গে দুটো ডবল হাফ আর একটা চারমিনার চমকা। এই, এই শালা, কোনদিকে যাচ্ছিস? বলিনি তখন, আবে মিছিল যাবে এইদিকে রে শালা, চোখের কি মাতা খেয়েছিস? এই, এই একদম মিডিয়ার সামনে বাইট দিবিনা, কখন কি বলে ফেলবি। দাদা বলে দিয়েছে, কোনোরকম চুদুরবুদুর নয় চাঁদু। হ্যাঁ যাও, যাও না, টিবির সামনে গিয়ে পোঁদ উলটে পড়ে থাকো, একটা পয়সা পাবে না শালা বলে দিচ্চি। আগাম বললুম মাইরি, মা কালীর দিব্যি, পরে আমাকে দোষ দিবিনা শালা। একদম ফালতু কিচাইন করবি না।

 

বিশৃঙ্খল মিছিলের দিকে চোখের চশমা সামলাতে সামলাতে মতিলাল শীল এগিয়ে আসেন। এই এই, কি হচ্ছে? ঠিক করে লাইন সামলে নাও সবাই। (ক্যামেরার দিকে ফিরে) কি বললেন? মিছিল? নানা, মিছিল মুখ্যমন্ত্রীর কথায় নয়, বাংলার অপমানের বিরুদ্ধে। পেছনের দিকে এগিয়ে যান, হ্যাঁ, বাস কন্ডাক্টররা যেমন বলেন আরকি, সেইভাবে, দেখতে পাবেন কত লোক হয়েছে।  

 

হঠাৎ শোরগোল। টিভি চ্যানেলের রূপসীরা এসেছেন, সঙ্গে দৃপ্ত মহানায়ক। সামনে মহানায়ককে পেয়ে সবাই প্রশ্ন করতে মরিয়া, এই মিছিল সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য জানতে চায় সবাই। চোখের রোদচশমা সামলে নেন মহানায়ক, আত্মপ্রসাদের হাসি হেসে বলেন, দেখুন, আমি দিদির কথায় চলে এসেছি। দিদির কথায় আসতে হবেই। কিন্তু এও তো ঠিক, আমার জন্যেই ভিড় খানিকটা হলেও বেড়েছে, আমাকে  দেখতে লোক তো কম হয়নি।কত ছাত্তবন্ধুরা, মা বোনেরা আমাকে দেখতে দেখতে এসেচেন। থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ, থ্যাঙ্ক ইউ। বেফাঁস মন্তব্য দেখে দ্রুত সামলে দেন শীল, ব্রাত্য প্রমুখেরা। বিরক্ত শীল মহানায়ককে উদ্দেশ্য করে ব্রাত্যর কানে কানে বলেন রথ ভাবে আমি দেব, পথ ভাবে আমি/ মূর্তি ভাবে আমি দেব... সেই কেস, বুঝলি? ব্রাত্য সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়েন।

 

টালিগঞ্জের টাকলা ওসি (পড়ুন প্রোডিউসার) ছিলেন, তিনি চাকরি যাওয়ার ভয় দেখিয়ে অনেক লোক এনেছেন। হন হন করে তিনি এগিয়ে যান।  

 

টালিগঞ্জের এক সফল দুঃসাহসী পরিচালক তাঁর নতুন ছবি অভিশপ্ত গামছার কাজ অসমাপ্ত রেখে এসেছেন মিছিলে। সাংবাদিকদের ইচ্ছে ছিল নতুন ছবির নামকরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করার, কারণ টাকলা ওসি ব্যতীত তাঁর সব প্রযোজকই শোনা যাচ্ছে আজকাল গামছা বিক্রি করছেন। কিন্তু প্রশ্ন করার সুযোগ মিলল না।

 

এছাড়া মরশুমি নাট্যশিল্পী সহ অনেককেই দেখা গেল মিছিলে। অনেকেই নিজেকে বুদ্ধিজীবী হিসেবে দাবী করছিলেন ম্যাটাডোর থেকে নামতে নামতে। শেষ কবে এমন হোলসেল বুদ্ধিজীবীর ঝাঁক শহর আক্রমণ করেছে তা কেউ মনে করতে পারলেন না।

 

হঠাৎ আবার চঞ্চল ক্যামেরাধারী সাংবাদিককুল। এসে উপস্থিত হলুদ পাঞ্জাবি ভূষিত কবি সুবোধ অতি গোপাল বালক এবং তাঁর পেছনে পেছনে ৩৬৫ পাড়ার পাঁচু। পঞ্চানন পাঁচু সরে পড়ার চেষ্টায় ছিলেন, কিন্তু তার আগেই ক্যামেরা তাকে পাকড়াও করায় তিনি সরাসরি বলেই দিলেন বিরোধীদের মতই সাংবাদিকরাও বানচোত এবং তাদের মেরে তিনি গাঁড় ভেঙ্গে দেবেন। এইসব অশ্লীলতায় ভ্রুকুঞ্চিত করে এগিয়ে এলেন কবি সুবোধ। সবার সামনে হাসি মুখে তিনি আবৃত্তি করলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা 'মদনের একটা চাকরি চাই'। শেষ লাইনে "একটা মানুষকে এমএ পড়তে হলে যত অক্ষর পড়তে হয় সেইসব ব্যর্থ অক্ষর মমতার গায়ে লেগে আছে" বলে তিনি চোখের জল মুছতে মুছতে এগিয়ে গেলেন।

 

মিছিল শেষ। মিছিলের পরে সভা। গরিব সিনেমা টেকনিশিয়ানরা হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন, যাক বাবা, নিশ্চিন্ত। কিন্তু চমকের তখনও বাকি ছিল। জানা গেল মিছিলে না আসতে পারলেও নিজের কবিতা পড়তে আসবেন প্রবীণ কবি, কবিকুলতিলক। এসেও পড়লেন কবি, কেশবিরল মাথা, চোখে চশমা, মুখে অবিন্যস্ত দাড়ি, দৃষ্টিতে ভয় আর সংশয় মিশে গেছে। বন্ধু কাকপ্রসন্ন না থাকায় কবিকে বিপন্ন লাগছে। মানসিকভাবেও কি দ্বিধাগ্রস্ত? জানা গেল কবি মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রীর এই হেনস্তা, এই অপমানের প্রতিবাদ করবেন, সমর্থন জ্ঞাপন করবেন তাঁর প্রতি।

 

মাইকের সামনে দাঁড়িয়ে কবি ধীরে ধীরে নিচুগলায় পড়তে শুরু করলেনঃ

 

পাগলী তোমার সঙ্গে ভয়াবহ জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে বিষমদ কাটাব জীবন

এর চোখে ধাঁধাঁ করব, ওর জল করে দেব কাদা

পাগলী তোমার সঙ্গে ডেলো বাংলো যাব দুকদম

 

অশান্তি চরমে তুলব, কাক-চিল বসবে না বাড়িতে

বিরোধীরা বাম্বু দেবে, তুমি ছুঁড়বে খিস্তির ভাষণ

পাগলী তোমার সঙ্গে বঙ্গভঙ্গ জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে চৌতিরিশ কাটাব জীবন  

 

মেঘে মেঘে বেলা বাড়বে, কৃষি শিল্পে লক্ষ্মী লোকসান

লোকসান না পুষিয়ে তুমি রাঁধবে খালি সিঙ্গুর ব্যঞ্জন

পাগলী তোমার সঙ্গে অপকর্ম জীবন কাটাব    

পাগলী তোমার সঙ্গে কালনিদ্রা কাটাব জীবন

 

পাগলী তোমার সঙ্গে মাকুমশলা জীবন কাটাব  

পাগলী তোমার সঙ্গে মাও-মাংস কাটাব জীবন

পাগলী তোমার সঙ্গে নিরক্ষর জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে চার অক্ষর কাটাব জীবন

 

পাগলী তোমার সঙ্গে বই দেখব পাগলুদের হলে

মাঝে মাঝে মিছিলে যাব অ্যাকাডেমি রবীন্দ্রসদন

পাগলী তোমার সঙ্গে নাইট্যশালা জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে শিলাদিত্য কাটাব জীবন

 

পাগলী তোমার সঙ্গে কালীঘাট জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে তপসিয়া কাটাব জীবন

পাগলী তোমার সঙ্গে কি সুদীপ্ত জীবন কাটাব   

পাগলী তোমার সঙ্গে কি মিথ্যুক কাটাব জীবন

 

এক হাতে উপায় করে দুহাতে উড়িয়ে দেবে তুমি

ক্লাবে চাঁদা, ধর্ম ভাতা, ধারে কাটবে সহস্র রকম

লটারি তোমার সঙ্গে চিটফান্ড জীবন কাটাব

লটারি তোমার সঙ্গে বকেয়া ডিএ কাটাব জীবন

 

দেখতে দেখতে পুজো আসবে, সকলে চিৎকার করবে সেল

তোমার কবিতায় খুঁজব রূপসাগরে অরূপ বিশ্বাস

পাগলী তোমার সঙ্গে পুজোসংখ্যা জীবন কাটাব

বুর্জোয়া এবিপি নয়, জাগো বাংলা কাটাব জীবন

 

নতুন পার্টির সঙ্গে দেখা করব লুকিয়ে চুরিয়ে

ধরা পড়ব তোমার হাতে, নবান্নতে হেনস্তা চরম

পাগলী তোমার সঙ্গে ভ্যাবাচাকা জীবন কাটাব

পাগলী তোমার বঙ্গে বিভীষণ কাটাব জীবন  

 

পাগলী তোমার সঙ্গে শারুখ খান জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে আইপিএল কাটাব জীবন

পাগলী তোমার সঙ্গে রেলরোকো জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে বাংলা বনধ কাটাব জীবন

 

সন্ধেবেলা ঝগড়া হবে, হবে দুই চেয়ার আলাদা

হপ্তা হপ্তা কথা বন্ধ, ধান্দাতেই আচমকা মিলন

পাগলী তোমার সঙ্গে খাগড়াগড় জীবন কাটাব

পাগলী তোমার সঙ্গে মা সারদা কাটাব জীবন

 

কুণালকে কনুই মারব, রাস্তা করব ওকে ধাক্কা দিয়ে

পাপোশকে লেলিয়ে দেব, ঢেউ ভাঙতে কেষ্ট দুকদম

পাগলী তোমার সঙ্গে নর্দমায় জীবন কাটাব

যাদবপুরে অন্ধকারে লাঠিখেলা কাটাব জীবন

 

 

 

পুনশ্চঃ মূল কবিতা থেকে 'পাগলী তোমার সঙ্গে রামরাজ্য জীবন কাটাব' প্যারা বাদ পড়ায় রাহুল-তথাগত-অমিত শাহরা শোনা যাচ্ছে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন।


https://www.youtube.com/watch?v=pgVWpPcBXP0&feature=youtu.be


শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০১৪

হিন্দুত্ববাদ - সংস্কৃতি ও শ্রেণী ~ শতদ্রু দাস

​হিন্দুত্ববাদকে শুধুমাত্র একটা সাংস্কৃতিক ইস্যু বলে ভাবতে অসুবিধে আছে, যে কোনো বামপন্থীরই থাকবে। আর এটাই বোধ হয় বামপন্থীদের আর অন্যদের হিন্দুত্ববাদ নিয়ে মূল্যায়নে তফাত। আমার মতে বিজেপি  হিন্দুত্ববাদকে ব্যবহার করে তার অর্থনৈতিক এজেন্ডা গুলোকে আড়াল করতে। ধর্মের সুরসুরি দিয়ে তারা মানুষের নজর ঘুরিয়ে রাখে। হিন্দুত্ববাদকে কাজে লাগিয়ে তারা শ্রমিক শ্রেনীর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং তাদের ঐক্যবদ্ধ হতে বাধা দেয়। আমার কাছে হিন্দুত্ববাদের সবচেয়ে বড় বিপদ এটাই। 


ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিজেপি যে অর্থনৈতিক দিশার দিকে এগিয়েছে সেটা কিরকম? এনরেগাকে তুলে দেয়ার পরিকল্পনা হচ্ছে, বিভিন্ন সমাজ কল্যাণ মূলক সরকারী প্রোগ্রাম গুলোকে কাটছাট করছে, শ্রম আইন শিথিল করা সুরু করেছে, আরো করবে। বাজেটের রিভিশনে বিভিন্ন সামাজিক খাতে যেমন শিক্ষা স্বাস্থ্যে ৭-৮ হাজার কোটি টাকা করে আর্থিক অনুদান কমিয়েছে। এটা ব্যাকডোর দিয়ে করা হয়েছে যাতে হই চৈ না হয়। জমি অধিগ্রহণ আইন পাল্টে কর্পোরেট জমি লুঠকে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করছে, বিভিন্ন লাভজনক সরকারী সংস্থা জলের দরে বেচে দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে, রেশনে কেরোসিন দেয়া বন্ধ করেছে, সরকারী ব্যাঙ্ক এসবিআই-কে বাধ্য করেছে আদানিকে বিদেশে বিনিয়োগ করার জন্যে ৬ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিতে যাতে আর. বি. আই গভর্নর বাধ্য হয়েছেন বলতে যে কর্পোরেটের অনাদায়ী ঋণ সরকারী ব্যাঙ্কগুলোর সবচেয়ে বড় সমস্যা। এনরেগার সুফল নিয়ে অনেক অর্থনীতির পেপার লেখা হয়েছে, ভারতের বেশিরভাগ বিখ্যাত অর্থনীতিবীদ এনরেগার পক্ষে বলেছেন, এমনকি আর. বি. আই পর্য্যন্ত একটা রিপোর্ট বের করেছে যাতে এনরেগার প্রসংসা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো কথা শুনতে নারাজ মোদী সরকার। ভুলে গেলে চলবেনা যে এই এনডিএ-র আমলেই FRBM নামক কলা কানুন চালু করা হয় যার ফলে সামাজিক খাতে সরকারী খরচ ব্যাপক হারে কাটছাট করা হয়। এই কাটছাটের ফলেই ২০০০-২০০৮ এর মধ্যে আমাদের দেশ দক্ষিন এশিয়ার অন্য দেশগুলোর তুলনায় প্রায় সমস্ত মানব উন্নয়নের মাপকাঠিতে পিছিয়ে পড়তে থাকি। অমর্ত্য সেন এই নিয়ে একটি লেখা লিখেছিলেন আউটলুক পত্রিকায়। কংগ্রেস যে এই বিষয়ে বিজেপির চেয়ে ভালো তা নয় তবুও ভোটের খাতিরে তাদের একটা মুখোশ রাখতে হয়, যাকে ওরা বলে "growth with a human face". তাই ওরা RTI, এনরেগা, চাষীদের ঋণ মকুব, খাদ্যের অধিকার আইন, অরণ্যের অধিকার আইন ইত্যাদির মত সব প্রকল্প নেয়। কিন্তু  বিজেপির হিন্দুত্ববাদের ভেক থাকার ফলে মানবিক মুখোশ টুকুও পরার দরকার হয়না, ওরা নগ্নভাবে নিও-লিবেরাল নীতি অনুসরণ করতে পারে। নিও-লিবেরাল নীতির জন্যে যে ভোট কমবে তা হিন্দুত্বর হাওয়া তুলে মেকআপ করে দেবে।              


এবার যারা উচ্চবিত্ব বা মধ্যবিত্ব তাদের কিন্তু বিজেপির এই নগ্ন নিও-লিবেরাল নীতি নিয়ে বিশেষ সমস্যা নেই। তারা বরং লাভবান হয়েছে এসব নীতির ফলে। এই শ্রেনীর মানুষের মধ্যে যারা ধর্ম নিরপেক্ষ এবং উদারপন্থী তাদের কাছেও  বিজেপির যেটুকু সমস্যা তারা দেখতে পান সেটুকু মূলত হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি নিয়ে। হিন্দুত্ববাদ একটা সামন্তবাদী সংস্কৃতিকে তোল্লাই দেয় যার নিজস্ব সমস্যা অবশ্যই আছে কিন্তু শুধুমাত্র সেই সংস্কৃতির পশ্চাত্পর চেতনাকে যদি হিন্দুত্ববাদের মূল বিপদ বলে চিন্হিত করি তাহলে তার আসল উদ্দেশ্যটা অধরা থাকে, যা হলো শ্রেণী চেতনাকে দুর্বল করা।  এখানে মুসলমান মৌলবাদের প্রসঙ্গটাও টানবো। যারা হিন্দুত্ববাদকে শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক সমস্যা বলে মনে করে তারা হিন্দু মৌলবাদ আর মুসলমান মৌলবাদের তুলনামূলক বিচার করতে গিয়ে দ্বিতীয়টাকে বেশি বড় বিপদ বিচার করতে পারে। তার কারণ হলো আধুনিকতার বিরুদ্ধে হিন্দুত্ববাদ যতটা না জোরদার এবং আক্রমনাত্বক তার চেয়ে বেশি আক্রমনাত্বক মুসলমান মৌলবাদ। হিন্দুত্ববাদীরা যেসব প্রাক-আধুনিক সামন্তবাদী সংস্কৃতি প্রচার করে সেসব ততক্ষণ আর ততটুকুই করবে যতক্ষণ বাজার অর্থনীতি তাকে করতে দেবে, বেশি বাড়াবাড়ি করলে বাজার মেনে নেবেনা। এটা হিন্দুত্ববাদীরা ভালই জানে। মুসলমান মৌলবাদ কিন্তু বাজারের ওপর নির্ভরশীল না তাই বাজারের মন যুগিয়ে চলার দায় তার নেই, বরং বাজারের উল্টোটাই করবে। এর ফলে একটা সম্ভাবনা থাকে অনেক উদারপন্থী মানুষের এটা মনে করার যে হিন্দুত্ববাদীরা তমসাচ্ছন্ন ঠিকই কিন্তু মুসলমান মৌলবাদীরা সেই দোষে আরো বেশি দোষী। আমার মনে হয় হিন্দুত্ববাদের শ্রেণী শক্তিকে দুর্বল করার ভূমিকাকে না দেখতে পেলে এরকম সিদ্ধান্তে আসবেন অনেকেই।    


হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতি দলিত চেতনা আর নারীবাদকেও দুর্বল করে যেটার প্রশ্ন শ্রেণীর থেকে ভিন্ন এবং সেটাও বড় বিপদ। কিন্তু আমি যেহেতু সেই বিষয়ে খুব বেশি জানিনা তাই লিখলাম না।  আশা করি কেউ এই লেখা পড়ে ভেবে বসবেন না যে আমি সাংস্কৃতিক প্রান্তিকীকরণকে ছোট সমস্যা বলছি। আমি শুধু বিপদের একটা দিক তুলে ধরেছি।

শনিবার, ২৯ নভেম্বর, ২০১৪

চুরি ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

কেউ করে ফুলচুরি রোজ রাতভোরে
কেউ বলে সংসদ ভরে গেছে চোরে;
বইচুরি করে কেউ উদাসীন মুখে
সময়ও তো চুরি যায় বলে নিন্দুকে;
প্রেমিকার মন চুরি নানা ছলেবলে
জানিনাকি মতলব আছে তলে তলে;
ছ- সেকেন্ড চুরি যায় প্রতি বৎসরে
পুঁথি দেখ, লেখা আছে ছাপা অক্ষরে;
অপিসের বড়বাবু, গোঁফ গেল চুরি
কবিতায় সুকুমার নেই তার জুড়ি;
প্রচলিত চোরে চুরি করে রাত্তিরে
থালা, বাটি, গ্লাস, জুত, জহরত হীরে;
কনসেপ্ট চুরি করে কেউ অগ্রণী
নোবেলের সন্মান পান মারকনি;
রেষারেষি নেই কোন সাড়ি, চুড়িদারে,
সগর্বে ঘোরে কেউ বারমুডা পড়ে;
এঁচোড়ে কি চোরে খায়,রীতিমত ভাবি
কেউ সাধে রুটি দিয়ে চচ্চড়ি খাবি?
ইস্কুলে যায় কেউ সাইকেল চড়ে
কি বিপদ গেল কই? নিল নাকি চোরে?
কচুরিতে প্রাতরাশ জিলিপির প্যাঁচে
সবকিছু নিঃশেষ দেখি শেষ ব্যাচে;
ছায়া চুরি, খোলা মাঠে খটখটে রোদে
টিফিনে তো চুরি যেত পাউরুটি বোঁদে;
সুর চুরি হলে সোজা যেও আদালতে
গল্পের প্লট চুরি হয় বাঁধা গতে;
কেউ বলে দেখছকি মেশে তেলে জলে
ছোটোখাটো চুরি? সেতো করে সক্কলে;
কেউ বলে, আমি চোর? বাকি সব সাধু?
পুকুর যে চুরি গেল, দেখলেনা চাঁদু;
মিছিলেতে হেটে কেউ রাঙা প্রতিবাদে
গুণীজনও চুরি করে, দেখি সংবাদে;
পোস্টারে বলে কেউ সব্বাই চোর
বল দেখি কি কারনে মাথাব্যাথা তোর?
স্পেকট্রাম চুরি হয়, চুরি কোল গেটে,
পাসওয়ার্ড চুরি যায় রেগুলার নেটে;
চুরি নিয়ে আলোচনা আনন্দ,স্টারে
বুঝে গেছি মোটামুটি বাঁশ কেন ঝাড়ে?
চোরেদের সভা ছেড়ে ভয়ানক রাগে
প্রতিবাদী বাম নেতা বহুদিন আগে;
তারপর চোরে চোরে মাসতুত ভ্রাতা
সংসদে 'কালিধন',হাতে কালো ছাতা;
মিছিমিছি বকো, আগে হোক প্রমানিত
মোবাইল, ট্যাব চুরি যায় নিয়মিত;
কেউ বলে আমি চোর? অভিমান ভরে,
জান যদি বল কেন এতদিন পড়ে?
মার গলা বড় হলে,ছেলে বুঝি চোর?
এ তো শুধু অনুমান, ভুল উত্তর;
আইনত সমাদর পাক চুরি, চোরে
চোরকাঁটা, চোরাবালি, চোরাস্রোত ধরে।।



শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০১৪

হাসি ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

কেউ হাসে খিলখিল, কেউ হাসে মেপে
অকারনে হাস যদি জ্যাঠা যাবে ক্ষেপে;
নামে কিবা আসে যায় হাসে তাই হাঁস
কেউ হাসে শত্রুকে দিয়ে কচি বাঁশ;
কেউ হাসে ফিকফিক অঙ্কের ক্লাসে
নিয়মিত হাসি চলে, ঠোকাঠুকি গ্লাসে;
ঘোড়াতেও হাসে বুঝি আজগুবি শুনে
পাঁজি দেখে হাসে কেউ, হাচিঁ দেয় গুনে;
হাসিসের নেশা হলে সারারাত ধরে
অবিরাম হাসে কেউ সিদ্ধির ঘোরে;
কারো হাসি কোলগেট, রোজ দাঁত মেজে
বড় পিসি হাসে কেন পুঁটিমাছ ভেজে?
পুলিসেও হাসে দেখ যদি পায় ঘুষ
চার্চিল, হিটলার হাসে মোদী, বুশ;
হাসত না জ্যোতি বোস, কানাঘুষো শুনি,
শুনেছ কি হাসতেন দুর্বাসা মুনি?
নেতা হাসে দেঁতো হাসি, ভয় দিনেরাতে
হাসিখুশি থাকে যারা আছে দুধেভাতে;
দেখলেই বোঝা যায় বাড়ি হাসিমারা
চা বাগানে সর্বদা হাসিতেছে তারা;
জাপানের ফুরসোয়া খুক খুক কাশে
আমি ভাবি কি বিপদ, এত কেন হাসে?
সর্বদা হাসে কেউ, হেসে গড়াগড়ি
কেউ হেসে কুটিপাটি, সাথে হাসে ভুঁড়ি;
চীনাম্যান হাসে সুখে, দুটি চোখ বুজে
Laughআlaughই কর কেন, হাস নিজে নিজে;
ক্লাবে গিয়ে হাসি শেখে আট থেকে আশি
বিয়ে হলে প্রেমিকার হাসি হয় বাসি;
হাসিনার হাসি নাকি দুর্লভ ভারী
মেসো হাসে খেয়ে লুচি বাটি চচ্চড়ি;
বাঁকা হাসি হাসে কেউ হাসি রাখে চেপে
ক্লাসে হাসাহাসি দেখে স্যার যান ক্ষেপে;
কারো কারো শেষ হাসি, কান্নায় মেশে
গোটা পাঠা খেয়ে কেউ হাসে অক্লেশে;
নায়িকার হাসি নাকি ভয়ানক দামী
হেসে হেসে ঘুঁটে দিত শিবানীর মামী;
স্বপ্নের হাসি যদি টোল পড়ে গালে
হা হা করে হাস তুমি কোন আক্কেলে?
সিনিয়ার সিটিজেন হাসে বিনা দাঁতে;
কাকা কাকী এতো হাসে কেন মাঝরাতে?
ন্যাচারাল হাসি থাকে হেরিডিটি, জিনে
অফিসেতে হাসি নাকি নিষিদ্ধ চীনে;
হাঁসফাঁস করে কেউ হেসে ক্রমাগত
মোনালিসা হাসি হেসে হন বিখ্যাত;
কেউ খুন হেসে,কেউ হাসে বোকাবোকা
প্যান্টেতে হিসি করে হাসে কচিখোকা;
শিশু হাসে আনন্দে, অনাবিল হাসি
মিঠে রোদ, প্রজাপতি বড় ভালোবাসি;
মোক্ষম কত হাসি, রয়ে গেল তবে
পড়ে যদি ভালো লাগে, ফের দেখা হবে।।

বৃহস্পতিবার, ২০ নভেম্বর, ২০১৪

চুমুৎকার ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

কেউ গালে চুমু খায়, কেউ খায় বক্ষে
কেউ বলে কি ফ্যাসাদ,ক্ষমা কর রক্ষে;
কেউ বুঝি চুমু খায় ভালোবেসে ওষ্ঠে
দূরদেশে চুমু নাকি যায় বুকপোস্টে;
কারো চুমু ফ্লাই করে সিনেমার হলেতে,
কেউ ভাবে প্রচেষ্টা বুঝি গেল জলেতে;
হারুদা তো চুমু খায় চিলেকোঠা ছাদে তে,
ধরা পরে কানমলা, শুনি সংবাদে যে;
মুহূর্তে চুমু খায়, কারো চুমু লেনদি,
হাফ চুমু খেতে নাকি শর্বাণী সেন দি;
আরও হাফ রেখে দিত ব্যাঙ্কের ভল্টে,
দিত নাকি ফিয়াসেকে অ্যাড্রেস পালটে;
চুমু খায় বিপ্লবী, বড়বাবু, কেরানী
পেটরোগা, ভুঁড়িওয়ালা, এলোকেশী কি funny!
কেউ কেউ চুমু খায় নিরাপদে গোপনে
মাধুরীকে নাড়ু নাকি কিস করে স্বপনে;
উষ্ণতা ভালো লাগে পেয়ালার চুমুকে
চুমু খেতে গেল কেউ দিঘা,গড়চুমুকে;
কারো মুখে পাইরিয়া, ভয়ানক গন্ধ
রেগুলার দাঁত মাজে? মনে জাগে সন্দ্য;
কেউ ভারী পরিপাটি ব্রাশ করে সকালে
আশা মনে,যদি কেউ কিস করে বিকেলে;
ফুটফুটে মেম বলে 'হরে হরে কিস না'
শ্রী কৃষ্ণ বলে চুমু কালকেই দিস না;
নিষিদ্ধ চুমু বুঝি ধর্মের বিচারে
ছাত্রীকে চুমু খেল ইংলিশ টিচারে;
কেউ কেউ চুমু খায় নির্জনে লিফটে,
নিয়মিত চুমু খায় কেউ তিন শিফটে;
কবিরাও চুমু খায় বসন্তে, শ্রাবণে,
কোন মুখে চুমু খায় বল দেখি রাবনে?
খেলোয়াড় চুমু খায় ম্যাচ জিতে মাটিতে
শান্তির খোঁজে কেউ জয়রামবাটিতে;
গালে যারা চুমু খায় ব্যাঙ আর সর্পে
সবখানে আছে তারা বলে বীরদর্পে;
জ্যাঠা বলে চুম্বন মোটে ভালো কাজ না
জেঠী বলে কাল হবে, একাদশী আজ না?
কেউ কেউ চুমু খায় সশব্দে সজোরে
কলেজের মেয়ে যদি পরে যায় নজরে;
যাবে নাকি বেলেঘাটা মেগা কিস ফেয়ারে?
টালা থেকে সোজা রুট, অটো পাবে শেয়ারে;
চুমু চলে ইতালিতে, লিসবন, ফ্রান্সে
রাশিয়ান চুমু নাকি ইদানীং পানসে!
চুমু থেকে হয় বুঝি এডস কিবা ইবোলা?
বেপাড়ার ছেলে বুঝি বাঁশ দেব আছোলা!
'ঝুমা প্লিজ চুমা দিয়ো' বচ্চনী আর্তি
কি লজ্জা বল দেখি হল লোকে ভর্তি!
বল দেখি কিসমিস কথাটার অর্থ
মাদুলিটা পরে নিয়ো প্রেমে হলে ব্যার্থ;
চাঁদ মামা চুমু দিয়ে দিত ঘুম পাড়িয়ে
শৈশব,মার চুমু গেল সব হারিয়ে।।

----- চরিত্র সব কাল্পনিক ---------------

অবাধ্য মন ~ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

আকাশ কুসুম ভাবনা-চিন্তা সারাটা দিন অন্ধকারে
এই যে সময় বদলে যাচ্ছে ঘড়ির কাঁটায় ক্যালেন্ডারে
তাই বলে কি মান ভেঙ্গেছি? বান ঢেকেছে দু-কূল জুড়ে?
তাই বলে কি ভাববো না আর, যা ভেবেছি নির্বিচারে?
 
ঠিক বুঝেছ, পাঁচিল দেওয়াল যাই তুলি সব ভঙ্গপ্রবন
যতই কালো পর্দা টানি, যতই সাজি ভিক্ষু-শ্রমন
যতই গাঁথি চীনের প্রাচীর, যতই কালো বোরখা পরি
অবাধ্য সব ভাবনা চিন্তা করছে সে সব অতিক্রমন

মঙ্গলবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৪

​ক্যাকফনি ~ অবিন দত্তগুপ্ত

সেবার বীরভূম বেড়াতে গেছিলাম । শান্তিনিকেতনে যাওয়ার উৎসাহ কোনদিন-ও ছিল না (মা কে বলি নি যদিও) , যাওয়ার কারণ ছিল মূলত দুটো ।প্রথমত , সেই নদীটার পারে প্রাণের গান শোনা যেত , এবং দ্বিতীয়ত ভারত সেবাশ্রমে থাকা । দ্বিতীয়টায় অবাক হচ্ছেন জানি , কিন্তু ওইটাই মূল আকর্ষণ । আমি শত্রুর ভাত খেয়ে, শত্রুর মুখ চিনতে গেছিলাম ।আমার চারআনা পড়াশুনা শিখিয়েছিল , শত্রুকে মারতে হলে , তার মুখ চিনতে হয় । জায়গাটা ঠিক শান্তিনিকেতনে নয় , পরে জেনেছিলাম জায়গাটার নাম মুলুক ।

তা ভারত সেবাশ্রমের তৎকালীন ' ভারতীয় কাল্‌চার ' জানা সর্বেসর্বা তার ব্রহ্মচর্যের আগে যাদবপুরে থাকতেন । তা তিনি , জাগতিক আনন্দ থেকে সম্পূর্ণ বিমূখ তিনি , তৃতীয় স্বর্গে সপ্তম মেঘে যার বাস তিনি , আমার বাড়ির পথ চিনতে বি.দাশগুপ্তকে ল্যান্ডমার্ক ধরলেন । যাদবপুরিইয় বা তদসম-তদ্ভব অঞ্চলের বাইরের মানুষদের সুবিধার্থে জানাই , বি দাশগুপ্ত অঞ্চলের সর্বশ্রেষ্ঠ মদের দোকান । দশমি,কালীপূজোর এবং ভোটের আগের দিন মোটামুটি সেলিম্পুর থেকে ঢাকুরিয়া অব্দি লাইন পরে । ব্রহ্মচারী উনি , ওইটাই ঠিকঠাক ল্যান্ডমার্ক ধরেছিলেন ।

সে যাই হোক , দুপুর বেলায় হাঁটতে হাঁটতে একটা গাছে ছাওয়া ধু ধু জমি দেখতে পাই আশ্রমের থেকে ঠিক দু মিনিট দূরে । স্বভাবসুলভ জানার তাড়নায় , জমিটায় ঢোকার মুখেই একটি বাচ্চা ছেলে পথ আটকে দাঁড়ায় । " এখানে আমার বাপ-দাদা শুয়ে আছে ,এটা বেড়ানোর জায়গা নয়" , গম্ভীর কিশোর কণ্ঠ পিছিয়ে আসতে বাধ্য করে ।

 

ভাগ্যিস হাতে শহুরে ক্যামেরা ছিল । ছোপ ছোপ গাল ,নাকে শিকনি, ফোকলা দাঁতের দু-তিন ফুটরা জুটে যায় । সক্কলের মুখের হাসি একরকমের , হাঁসিতে ধর্ম আলাদা করা মুশকিল । একমাত্র জল চাইলাম যখন , তখন একজন পানি আর একজন জল আনতে তাদের ঘর ছুটলেই বুঝে ছিলাম , হাসি বাঁ উচ্চতা এক হলেও আশ্রমের চোখে এরা আলাদা ।

 

সমস্ত খেলার মধ্যে , টেবিল টেনিস আর ভলিবলটা আমি মোটামুটি খেলে দিতে পারি । বিকেল বেলা সেবাশ্রমে ফিরে দেখলাম , মাঠে ভলি খেলা হচ্ছে । তো আমি আর আমার বন্ধু খেলতে শুরু করলাম । মিথ্যে বলব না ,দুজনে বেশ ভালোই খেলেছিলাম । নীল বেশ লম্বা , নেটে ভালোই খেলে, আর আমি থার্ড কোর্ট(পাড়ায়)...উলু বনে মিডল ম্যান( ডাইভ ভালো মারতাম , যে কোন বিষয় ) ।

খেলার সময় একটা ১২-১৩ বছরের বাচ্চা বার বার চোখ টানছিল । খেলতে একদম জানে না, কিন্তু ঠিক বলের কাছে পৌঁছে গিয়ে বল তুলে দিচ্ছিল । দারুণ ফিটনেস । খেলার পর, টিউবওয়েলে পা ধুতে গেলাম যখন , ছেলেটা কল টিপছিল । নাম জোসেফ । বন্ধুত্ব করে ফেললাম । বললাম তোর গ্রামটা দেখা । ও বলল "আগে ভজনটা হয়ে যাক , নইলে খেতে পাব না "...

 

সন্ধ্যা নেমছে । ওই অঞ্চলে আশ্রমে গোটা দশেক টিউব এবং আশে পাশের গ্রাম গুলোতে গোটা ৫এক ৬০ ওয়াটের বাল্ব ছাড়া কিস্যু জ্বলত না । সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় নিকষ অন্ধকার , একটা তেলেভাজার দোকানের সামনে বসে , গ্রামের বুড়োদের গল্প শুনছিলাম । বয়স্ক মানুষদের নিজেদের মধ্যে গল্প, তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে শুনতে বেশ লাগে । তা হঠাতি ভজনের আওয়াজ শোনা গেল । আশ্রমের ভিতরে ঢুকে দেখি , মা সহ সব ভক্তরাই ভক্তি ভরে গান শুনছে । কনকনে শীতে , গায়ে চাদর জড়িয়ে গান গাইছে ,শাওতালি বাচ্চারা। বয়স ৭ থেকে ১৩ , বেশীর ভাগ আশেপাশে খোঁচাখুচি করছে, খরগোশের মতো সাদা সাদা দাঁত বের করে, কালো মুখে এক একটি পোট্রেট হচ্ছে প্রতি মুহূর্তে । আমাদের জোসেফ ( ১৩ বছরের ভলি মাঠের বন্ধু) , তাদেরি মধ্যে একটি মুখ । বার বার ,মুখ ফিরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে ,অদ্ভুত সারল্যে হেসেই যাচ্ছে। সাধারণত নাগরিক আমরা এতো সহজে হাসতে পারি না , অবশ্য নাগরিক আমার এই ধারনাটা আমার-ই এক কমরেড অক্লেশে ভেঙ্গেছেন বেশ কিছুমাস হল...অবশ্যি তিনি কলকাতার নন ,তবে নাগরিক বটে । বছর পাঁচেকের একটা বাচ্চা ছেলে অবিরাম আরতি করে যাচ্ছে , আর বাকিরা বিরিবির ,এভাবেই ভজন শেষ হল । তারপর খাবার ঘরে একটা লম্বা লাইন । আমি বাইরে এসে গোল্ডফ্লেক ধরালাম । হঠাত হাতে একটা নরম হাতের ছোঁয়া । এক হাতে শালপাতায় মোড়া খাওয়ার ,জোসেফ আমার হাত টানছে ।

 

জোসেফের বাড়িটা গ্রামের একদম মাঝখানে । পাতকুয়া থেকে পুকুর অব্দি সব দেখিয়ে , এ গলি ও গলি ঘুড়িয়ে যখন বাড়ি নিয়ে এলো, ততক্ষনে আমি দেখে নিয়েছি প্রতিটাবাড়ির দরজায় ক্রস ঝোলানো । সন্ধ্যায় , বুড়োদের আড্ডায় বসে জেনেছিলাম, পাকা রাস্তা থেকে লাল রাস্তায় ঢোকার মুখে প্রথম গ্রামটা হিন্দু,ডানদিকেরটা মুসলমান এবং সেবাস্রমের পাশের দুটো সাওতালি গা ক্রিশ্চান । বুঝতে অসুবিধে হল না , কেন ঠিক এখানেই ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘ ।

 

তা আমি আর নীল বাড়িতে ঢুকলে , জোসেফের দাদু আমাদের মহা সমাদরে বসতে দিলেন তার খাটিয়ায় । জোসেফের মা কোলের বাচ্চাটকে কোনক্রমে ওর দিদির কোলে দিয়ে দৌরে ভেতরে চলে গেলেন । দাদু জিজ্ঞেস করলেন " একটু চা খেয়ে যাবেন, আমাদের বাড়ি ?" কোন ভেজাল ছিল না , নাতির অসম বয়িসী বন্ধু ,'ভিনদেশী' নাগরিকদের প্রতি অকৃত্রিম আতিথেয়তাও বলতেই পারি । জোসেফের মা দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে জোসেফের হাতে কিছু একটা দিলেন । জোসেফ-ও হুট বলতেই ছুটে পালাল । ওদের বাড়িতে চিনি ছিল না । দাদু জানালেন, সবাশ্রম সাঁওতাল বাচ্চাদের ক্লাস ৫ পর্যন্ত পড়ায় , তারপর ধর্মান্তরের চেষ্টা করে। যারা হিন্দু হয় না , তাদের তাড়িয়ে দেয় । যারা ধর্মান্তরিত হয়, তারা খাওয়া পড়া পায় । জোসেফের দাদু জানিয়েছিলেন , জোসেফ ধর্মান্তরিত হবে না । জোসেফ জানিয়েছিল , ও অঙ্কতে ভালো ,ইংরিজিটা তেমন পারে না ।

 

তারপর যা হয়ে থাকে । নীল জোসেফের বোনকে কোলে নিল । আমি ছবি তুললাম । চিনি এলো । চা খেলাম । বেড়িয়েও এলাম । ঘুটঘুটে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে হাঁটছি , হঠাতি কানে এলো বাঁদিকের গ্রামটা থেকে সন্ধ্যের শঙ্খের আওয়াজ , প্রায় একি সাথে ডানদিকের গ্রামটা থেকে আজান ভেসে আসতে শুরু করল । রুপকথায় এমন হয় বোধহয় , সাঁওতাল গ্রামটায় বহু বহু দূরে দ্রিম দ্রিম শব্দে ধামসা বাজল । যে সেদিন ঐ নিকষ কালো রাতে ,অসংখ্য তারার নীচে,লাল কাঁকড়ে দাঁড়িয়ে ওই অদ্ভুত ক্যাকফনি শোনেনি, তাদের প্রত্যেকের জন্য খারাপ লাগে । সন্ধ্যে ভালো লাগলেই নাগরিক আমি ,নাগরিক কবিয়ালের "সন্ধ্যে হল,সন্ধ্যে হল " গানেই অভ্যস্ত। এই অদ্ভুত সুরটা অচেনা হলেও 'ছোঁয়াচ' লাগে । প্রতিটা আলাদা সুর , প্রতিটা আলাদা তাল , কিন্তু কেউ কাউকে কাটছে না-কেউ কাউকে ছাপিয়ে যাচ্ছে না। হয়ত আমার কানটাই গণ্ডগোলের ,কিন্তু সেদিন আমি কোন সুর কে কাউকে ছাপাতে শুনিনি , একটি অন্যটিকে আরও বেশী ভরাট করে তুলেছিল বোধহয় ।

 

পরদিন সকালে (আগন্তুক আমি) জোসেফকে বলেছিলাম , " তোদের কোন পরব আছে নাকি রে ? কাল আওয়াজ শুনলাম" ।

"না দাদা কাল রাতে বস্তিতে একজন মারা যায় , তাই শুনেছ"

 "তোদের নাচ হয় না ? কবে হয় "

"হয় তো পরবে।"

 

মাস খানেক পর ,অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি ,তখনো শিত ভালোই । হঠাত মোবাইল বেজে উঠল । অপিরিচিত নাম্বার । তুললাম । ওদিক থেকে বলছে " দাদা পরশু পরব আছে , লাচ্‌ হবে , আসবে ?"

"তুই..."

"আমি জোসেফ । চিনতে পাড়ছ না ?"

" হ্যা পাড়ছি,তুই আমার নম্বর মনে রেখেছিস?"

"ও মা, দাদু লিখে রাখল যে ...আসবে ?"

"কি করে আসব ... আমার তো অনেক কাজ। মন দিয়ে অঙ্ক করছিস্‌ তো ।"

"হ্যা , একদিন কলকেতা যাব... তুমি বলেছিলে আমায় শহর দেখাবে। আমি কিন্তু গ্রাম দেখিয়েছিলাম "

"নিশ্চয়ই । তুই এলেই দেখাবো ...চিড়িয়াখানা, ভিক্টরিয়া সব । "

শেষের কথা গুলো আর মনে নেই । আমার কানে তখন সেই নিকষ কালো রাত্রের মিউজিকটা বাজছে । সরল সুন্দর একে অপরকে না ছাপিয়ে যাওয়া মানুষের সঙ্গিত ।মানুষ এভাবেও মনে রাখে ?

 

মোবাইল হারিয়েছিল কয়েকমাস পর । জোসেফ নামটা , নামের জন্য দেওয়া । নাম হারিয়েছি শহরের ভিড়ে । কিন্তু ছেলেটার মুখটা , সোজা সরল বাঁচার লড়াইটা, আর সেদিনের রাতের সুর আমায় কোনদিন-ও ছেড়ে যাবে না । আজকেও , যে কোন অন্ধকার রাতে ,যখন আলো দেখতে পাই না , তখন ওই মানুষের সুর-ই বাঁচিয়ে রাখে ।

 

সরি জোসেফ , চিড়িয়াখানা দেখানো হল না ।​

রবিবার, ৯ নভেম্বর, ২০১৪

আপনার আল্টিমেট গোল মেটানোর দায় আমার রেজিস্টান্সের নয় ~ শাক্যজিৎ ভট্টাচার্য্য

এই নোটটা বেশ কিছুদিন ধরেই নামাব ভেবে রেখেছিলাম। যেদিন দক্ষিণ ভারতে চুম্বন-আন্দোলনের জন্য বেশ কিছু ছেলেমেয়েকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে সেদিন থেকেই। তার মাঝখানে কলকাতাতেও যে এর রেশ ছড়িয়ে যাবে  সেটা ভাবিনি। আপাতত এই আন্দোলন অনেকের কাছেই বেশ মাথাব্যাথার কারণ হয়েছে। ঘোষিত দক্ষিণপন্থীদের অবস্থানটা মোটামুটি সহজ। তাঁরা কন্ডেম করেছেন, করবেন। এই রাজ্যের বামেরা না পারছেন ফেলতে না পারছেন গিলতে। মোটামুটি তেতো মুখ করে 'আন্দোলন যাঁরা করেছেন তাঁদের অভিরুচির ব্যাপার' বলে চালিয়ে দিয়ে সাথে ডিসক্লেইমার যোগ করে দিচ্ছেন 'কিন্তু খেটে খাওয়া মানুষের দৈনন্দিন রুটি-রুজির লড়াই এভাবে সমাধান হবে না'। কোনো এক কাগজে পড়লাম মানবাধিকার কর্মী সুজাত ভদ্র এই আন্দোলনকে ছেলেমানুষী আখ্যা দিয়েছেন।

তবে কিঞ্চিত মজা পেলাম তৃণমুল সরকারের প্রতিক্রিয়া দেখে। সিভিল সোসাইটির যে কোনো আন্দোলনকেই তাঁরা বিরোধীতা করাটা মোটামুটি অভ্যাসে পরিণত করেছেন। হয়ত জানেন-ও না কি কারণে কেন বিরোধীতা এদিকে তড়িঘড়ি মন্ত্রীসভার দুই বর্ষীয়ান মন্ত্রী দেখলাম এই আন্দোলনকে ধিক্কার জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। যদিও পশ্চিমবংগে এই দলীয়-রাজনীতির রংমুক্ত সিভিল সোসাইটির আন্দোলনের একটা মডেল প্রথম তৃণমূলের হাত ধরেই এসেছিল। সিংগুর নন্দীগ্রামের পর এক-ই প্ল্যাটফর্মে মমতা-কবীর সুমন-দোলা সেন-নক্সাল নেতারা, এবং আশেপাশে ঘুরছেন এপিডিআর-এর কর্মীরা, মাঝে মনে হয় একবার রাজনাথ সিং-ও এসেছিলেন। শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় সেই মঞ্চে উঠতে গিয়ে ধমক খেলেন মমতা ব্যানার্জীর কাছে। সিভিল সোসাইটির সেই আন্দোলনের এক্সটেনশনকেই এখন অস্বীকার করছেন তাঁরা।

তবে এই লেখার উদ্দেশ্য কোনও বিশেষ দলকে সমালোচনা নয়। সাম্প্রতিককালে বারে বারে সমস্ত রাজনৈতিক দল-ই বিব্রত হয়েছে সিভিল সোসাইটির নানা আন্দোলনে, কারণ পরিচিত বাম বা দক্ষিণপন্থী রাজনীতির কোনো ছকেই এদের ফেলা যাচ্ছে না। আবার সত্যি কথা বলতে কি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন শ্রেণী-সংগ্রামের সাথেও এই মুভমেন্টগুলোর কোনো প্রত্যক্ষ যোগ নেই। সে নির্ভয়া কান্ডে দিল্লীর রাজপথ অচল করে রাখাই হোক বা চুমু খাওয়া অথবা ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢোকানোর বিরুদ্ধে নাগরিক সমাজের রাস্তায় নামা। অস্বস্তির কারণগুলো মোটামুটি এরকম ঃ

১। কোনো আশু বা সুদুরপ্রসারী ইকনমিক প্রবলেমকে অ্যাড্রেস করছে না এই আন্দোলনগুলো।
২। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে এরা রাস্তায় নামছে না। বরং ব্যানার ছাড়া আসতে বলা হচ্ছে সকলকে।
৩। আন্দোলনের মুখ হিসেবে উঠে আসছেন আলোকপ্রাপ্ত শিক্ষিত মধ্যশ্রেণীর, বেশিরভাগ সময়েই ছাত্র-ছাত্রী। খেটে খাওয়া গরীব নিম্নবিত্ত মানুষের সাথে কানেক্ট করা যাচ্ছে না যাঁদের।

মোটামুটি এই তিনখানা বিষয়ে বাম বা দক্ষিণ, বিশেষত বাম, সমস্ত চিরাচরিত পার্টিগুলোই বেশ কনফিউজড। কতটুকু রাখবেন কতটা ছাড়বেন, অংশগ্রহণ করবেন না বাইরে থেকে সমর্থন এসব নিয়ে নানারকম আলোচনা তর্ক-বিতর্ক শোনা যাচ্ছে বামপন্থীদের অন্দরমহলে। কিস অফ লাভ এই সমর্থন বিরোধীতার মার্জিনটা অনেকটা স্পষ্ট করে তুলেছে। যে দক্ষিণপন্থীরা নির্ভয়া আন্দোলনে ব্যানারহীন রাজনীতি নিয়ে ঢোঁক গিলতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা মুক্তকন্ঠে কিস অফ লাভ-কে 'ভারতীয় সংস্কৃতির পরিপন্থী' বলে দাগিয়ে দিতে পারছেন। যে বামেরা কামদুনির ঘটনায় পথে নেমেছিলেন তাঁরাও সহজেই ডিস্ক্লেইমার দিতে পারছেন যে 'এই আন্দোলন কোনো বেসিক ইস্যুর সমাধান করবে না'। কিন্তু তার পরেও অনেকগুলো প্রশ্ন রয়েই যায়।
সেগুলো শুধু কিস অফ লাভ নিয়েই নয়। বরং ২০১৪ সালের ভারতবর্ষের প্রতিরোধের চরিত্র নিয়ে।

১৯৯১-পরবর্তী ভারতবর্ষে শহুরে মধ্যশ্রেণীর একটা চমকপ্রদ উত্থান হয়েছে। তাদের হাতে টাকা এসেছে, ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, মার্কেট এক্সপ্যানসন হয়েছে এবং সেই সাথে এসেছে অ্যাসপিরেশন। এই উচ্চাকাংখা শুধু ব্যক্তিগত উন্নতির উচ্চাকাংখা নয়, এ হল শাসন প্রক্রিয়ার অংশ হবার উচ্চাকাংখা। বাজার-ও স্বাভাবিক নিয়মেই চেয়েছে তার ক্রেতা যেন সেন্ট্রাল লেভেলে ডিসিশন মেকিং-এর জায়গায় থাকে, ফলে বাজারের নিজেকে প্রসার করতে সুবিধে হবে। নরেন্দ্র মোদীর উত্থানের পেছনে এই রাইজিং মধ্যশ্রেণীর একটা বড় অংশের আকাঙ্ক্ষা একটা বড় কাজ করেছে। এবং সেই সাথেই ভারতবর্ষের রাজনীতি একটা দক্ষিণপন্থী বাঁক নিয়েছে, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক দুই দিকেই। কিন্তু এই যে মধ্যশ্রেণী এটা কোনো হোমোজিনাস এন্টিটি নয়। এর মধ্যেও নানা রঙ আছে। একটা অংশ শুধুই ইকনমিক গ্রোথকে পাখির চোখ করে। একটা অংশ তার সাথে সাথে সামাজিক বৃদ্ধিও চায়। তাদের কাছে ভারতবর্ষের বর্তমান যা অবস্থা 'আ লিবারাল ইকনমি অ্যান্ড আ কনজারভেটিভ সোসাইটি' সেটা কাম্য নয়। অর্থর্নৈতিক স্বাধীনতার সাথে সাথে ব্যক্তি-স্বাধীনতার ওপর তারা জোর দেয়। আবার আরেকটা অংশ আছে যারা চায় 'আ কনজারভেটিভ ইকনমি অ্যান্ড আ লিবারাল সোসাইটি'। এই অংশটা তুলনামুলকভাবে ছোট যারা মোটামুটি মোদী-বিরোধী। এই নানা অংশের চাহিদা পুরণের জন্য তারা সবসময়েই স্টেটের সংগে দর-কষাকষিতে নামছে। একটা অংশ দাবী করছে 'তুমি আমায় মুক্ত বাজারের সুযোগ সুবিধা দাও বদলে আমি তোমায় রাজনৈতিক স্থিতাবস্থা দেব'। আরেকটা অংশ দাবী করছে 'তুমি আমায় স্টেটের চোখরাংগানী থেকে সামাজিক মুক্তি দাও বদলে আমি তোমার অর্থনৈতিক আগ্রাসনে নাক গলাব না'। এরকম আর কি!

মুশকিলটা হল বামপন্থীরা দুর্বল হয়ে যাবার কারণে সাবেকি শ্রমিক-কৃষক আন্দোলনের অভিমুখ অনেকটা নষ্ট হয়ে গেছে। আগে অন্যান্য বর্গগুলোর এই দাবীদাওয়াগুলো কিছুটা বামেদের আন্দোলনের ফলে মিটত আর বেশির ভাগটাই চাপা পড়ে যেত অনেক বেশি তীব্র এবং অনেক বেশি পলিটিকালি ওরিয়েন্টেড অন্যান্য নানা আন্দোলন দিয়ে, যেমন ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্ট। এখন সেই ফাঁকা জায়গাটা পুরণ করার জন্য উঠে আসছে সামাজিক শক্তিগুলো। দক্ষিণপন্থীরা এই আন্দোলন চালাতে পারবে না কারণ তারা নিজেরা রাষ্ট্রশক্তির অংশ। পড়ে থাকে
দলীয় রাজনীতির রঙমুক্ত সামাজিক বর্গগুলো, এলজিবিটি, পরিবেশরক্ষার আন্দোলন, কিস অফ লাভ, উচ্ছেদবিরোধী সংগ্রাম এসব। অনেক সময়েই এসব আন্দোলনে যুক্ত করে নেওয়া হচ্ছে প্রান্তিক নিম্নবর্গীয় মানুষজনকে, তাদের দলীয় রাজনীতির রংটুকু বাদ রেখে। আবার অনেক সময়েই এগুলো আবদ্ধ থাকছে মধ্যবিত্তের মধ্যে।

এই যে অচিরাচরিত রেজিস্টান্স, তাহলে কি একে আমরা গ্রহণ করব না? কবে বামপন্থীরা আবার শক্তিশালী হবেন সেই দিশা দেখার অপেক্ষায় বসে থাকব? ভারতবর্ষে যে ছোটবড় এতগুলো তাহিরীর স্কোয়ার ঘটে চলেছে প্রতিদিন, সেটা কপিবুক মুভমেন্ট হচ্ছে না বলে অবজ্ঞা করব? এবং আমরা, বামেরা বা নানা রঙের লিবারাল রাজনীতিকরা, বুদ্ধিজীবীরা ঠিক করে দেব কোন আন্দোলন ঠিক কোনটা ভুল? সব থেকে বড় কথা আমরা ঠিক করে দেবার কে? কেনই বা আমাদের স্বপ্নপূরণের দায় সেই প্রতিরোধের ওপর চাপাব?



একটা আন্দোলন শুরু হবার পরে সেটা কোন ফর্মে চলবে কেউ জানে না, বলতেও পারে না। সেটা অনেক সময়েই আমাদের পছন্দ নাও হতে পারে, তাতে সেই প্রসেসের কিছু যায় আসে না। এটা অনেকটা স্বতঃস্ফুর্ততার ওপর নির্ভর করে। এই রেজিস্টান্সের মধ্যে অনেক মতবাদ আলাদা আলাদা ভাবে না মিশেও পাশাপাশি আছে। বিভিন্ন মতবাদ তাদের বিভিন্ন লাইন নামায় একটা গণ-আন্দোলনে। যারা কিস অফ লাভ করছে তাদের-ই অনেকে হয়ত নরেন্দ্র মোদিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছিল। কিন্তু এক ইস্যুতে রেজিস্টান্স দেখায়নি বলে অন্য ইস্যুতে তাকে অবজ্ঞা করবই বা কেন? বরং যে্টা পারি তা হল পাশাপাশি কিছুটা চলা। যদি আমার অ্যাসপিরেশন, একটা বামপন্থী দলের রাজনৈতিক হিসেব নিকেশ এবং একটা এলজিবিটি আন্দোলন, এই তিনখানার অভিমুখ শেষ পর্যন্ত এক নাও হয়, তাহলেও যেটা করা যাবে সেটা হল কিছুটা রাস্তা পাশাপাশি হাঁটা। হয়ত এক বামপন্থী হিসেবে আমি ট্রেড ইউনিয়ন করেছি সারাজীবন। সেটা তো আমায় বাধা দেয় না সমকামীদের আন্দোলনের পাশে দাঁড়াতে, এটা জেনেও যে সেই সমকামীদের-ই কেউ কেউ ভারতে লেবার ল-এর তীব্র বিরোধী হতে পারেন। কিন্তু একটা ক্ষেত্রে যে শোষক সে অন্য ক্ষেত্রে শোষিত হতেই পারে এই সত্যিটা কেন অস্বীকার করব?

ক্লাসিকাল মার্ক্সিস্টরা বলেন, এবং আমাদের দেশে তাঁরাই বেশি স্বীকৃত, যে সমস্ত সমস্যা আসলে এক সুতোয় বাঁধা। জাত পাতের বৈষম্য বা লিংগ-সমতার দাবীতে আন্দোলন আসলে অর্থনৈতিক প্রশ্নগুলোর নানা আদলে রিফ্লেকশন। মনে হয় এখন সময় এসেছে এই ইউনিফায়েড থিওরির বদলে সমস্ত আন্দোলনকে তার নিজের পার্স্পেক্টিভে দেখার। নাহলে ওই 'যে যেখানে লড়ে যায় আমাদের-ই লড়া' বলে সমস্ত প্রতিরোধের ওপর আলোকপ্রাপ্ত শিক্ষিত সমাজ নিজেদের আকাঙ্ক্ষা ইচ্ছে অনিচ্ছেগুলো চাপিয়ে দেবে এবং দিয়ে এসেছে এতদিন ধরে। আর তাই প্রান্তিক মানুষের উচ্ছেদ হওয়ার সংগ্রাম শুধুই উচ্ছেদবিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখা হোক। কবে সরকার বদলাবে ব্যবস্থা পাল্টাবে সেই দিকে না তাকিয়ে আশু কোন উপায়ে রেজিস্টান্স করা যায় এবং জাস্টিস আনা যায় সেটার কথা ভাবা হোক। তার জন্যে যদি রাজনৈতিক দলের হাত ধরতে হয় তো হবে। যদি রাজনৈতিক দল সেই আন্দোলনকে জোর করে নিজের প্রোগ্রামের সাথে মিলিয়ে দিতে চায় তো দলহীন ভাবেই চলতে হবে। প্রয়োজনে বিরোধী দলের-ও হাত ধরতে হবে। কিন্তু কবে ব্যাকরণ মেনে একটা স্ট্রাকচারড বামপন্থী শ্রমিক কৃষকের আন্দোলন হবে তার অপেক্ষায় বসে থেকে এই আনস্ট্রাকচারড রেজিস্টান্সগুলোকে অবজ্ঞা করার মতন জায়গায় এখন য়ার নেই আমরা।

এখন সম্ভবত বোঝার সময় এসেছে যে সমস্ত রেজিস্টান্স আসলে অধিকার রক্ষার লড়াই। সে কিস অফ লাভ-ই হোক বা নির্ভয়া। এবং এক আন্দোলনের বিরোধী হয়েও অন্য আন্দোলনে কারোর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করায় সমস্যা নেই কোনও। কিস অফ লাভ কে যে বিরোধীতা করছে ভারতীয় ঐতিহ্যের বিরোধী বলে কামদুনির ঘটনা ঘটলে সে-ই ব্যারিকেড গড়তে ছুটে যাবে এবং তার সেই ছুটে যাওয়াটাও এক-ই রকমভাবে সমান সত্যি। সেই সত্যিটাকে অস্বীকার করলে গোটা শাহবাগ বা তাহিরীর স্কোয়ারকে অস্বীকার করা হয়। বরং বামপন্থীদের কাজ হতে পারে সেই আন্দোলন তাঁদের পছন্দসই না হলেও তার পাশাপাশি হাঁটা। একটা মডেল দিল্লীতে আম আদমী পার্টি দেখিয়েছে, দেখাচ্ছে। রেজিস্টান্সের প্রয়োজনে গান্ধীবাদ, বামপন্থা, অ্যানার্কি যে কোনো মডেল বা তাদের মিশ্রণ স্বাগত। কোনোকিছুই অচ্ছ্যুত নয়, প্রতিরোধ সংগ্রামে। আর কে কেমনভাবে কোন ইস্যুতে প্রতিরোধ করবে সেটা আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে কেউ ঠিক করে দিতে পারে না। এমনকি সেই রেজিস্টান্স যদি ফর দ্য সেক অফ রেজিস্টান্স-ও হয় তো সেটাও স্বাগত। লোকদেখানো হলেও স্বাগত। এই অক্ষম সময়ে দক্ষিণপন্থার তীব্র বাঁকের মুখে দাঁড়িয়ে সামাজিক-অর্থনৈতিক আগ্রাসন মুখ বুজে মেনে নেবার বদলে কেউ যদি রাজভবনের গায়ে একটা মলোটভ ককটেল ছুঁড়ে মারে, কেউ যদি কলকাতার রাস্তায় সাইকেল চালানোর দাবীতে মুভ করে, অথবা কেউ যদি শুধুই লোক-দেখানোর জন্য রাস্তা অবরোধ করে চুমু খায় তো সেই সব, সবকিছুই স্বাগত।

এই আন্দোলনগুলো আল্টিমেটলি কোন ফর্ম নেবে কেউ বলতে পারে না। হয়ত মুছে গেল কিছুদিন বাদে। আবার হতেই পারে পাশাপাশি চলতে চলতে মিলে গেল একে অপরের সাথে। ভবিষ্যতের ঠিকা নিয়ে তো কেউ-ই বসে নেই! হতেই পারে যে একটা পর্যায়ে গিয়ে মধ্যবিত্তের অ্যাসপিরেশন এবং নিম্নবিত্তের চাহিদা মুখোমুখী প্রতিদ্বন্দী হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। উদাহরণস্বরূপ, কিস অফ লাভ-এর সংগঠকদের কোনো গ্রামের মেয়ে তো বলতেই পারে যে 'আপনাদের এই কাজের জন্য আমার বাড়ি থেকে আমায় কলকাতায় পড়তে পাঠাচ্ছে না'। আবার উল্টোটাও হতে পারে। হতেই পারে যে নির্ভয়া কান্ডের পর তথ্যপ্রযুক্তির মহিলা কর্মীরা প্রশ্ন তুলে দিলেন যে 'চিরাচরিত ঝুপড়ি, রাস্তার ধারের দোকান, রুটিওয়ালা ইস্তিরিওয়ালা এই চেনা পরিবেশকে উচ্ছেদ করে আর্বানাইজেশনের নামে স্টেট যে হাইরাইজ আর শপিং মল বানিয়ে চলেছে গন্ডগ্রামের মতন ফাঁকা জায়গায়, সেই অচেনা পরিবেশে অচেনা মুখের ভিড়ে আমার রাত্রিবেলা রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ভয় লাগে'। এই বিচ্ছিন্নতা আর মেলানোর প্রসেসটা কোথায় গিয়ে শেষমেষ দাঁড়াবে সেটা সময় বলবে। তবে 'সব পথ এসে মিলে যাবে শেষে' এমন স্বপ্ন আজকের দিনে না দেখাই ভাল। যদি কেউ
উদ্দেশ্যহীনতার অভিযোগ তোলেন তাহলে একটাই কথা বলার, পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত এমন কোনো রেজিস্টান্স হয়নি যেটা ভবিষ্যত চোখের সামনে দেখতে পেয়েছে। রেজিস্টান্স হয়েছে আশু সমস্যার খাতিরে। আর উদ্দেশ্য নেই বলে মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার সংগ্রাম, জাস্টিসের জন্য এবং অপ্রেশনের বিরুদ্ধে তার লড়াই থেমে থাকবে না। আপনার আল্টিমেট গোল মেটানোর দায় আমার রেজিস্টান্সের নয়।

জাঁ পল সাঁর্ত্র বুড়ো বয়েসে, স্বপ্নভংগ তিতকুটে মনে এক ইন্টারভিউতে বলেছিলেন যে আজকের পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে যেখানে দক্ষিণপন্থী পার্টিগুলো হারামজাদা আর বামপন্থী পার্টিগুলো বিপ্লবের সব থেকে বড় শত্রু, সেখানে তিনি চেয়ে আছেন নতুন কোনো ফোর্সের উঠে আসার দিকে। কোনো এক তৃতীয় শক্তি যারা প্রতিরোধ কামনায় রাত জাগবে। আমরা সেই শক্তি দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে, দিনের পর দিন। কপিবুক মুভমেন্ট নয় তো কি এসে গেল! মলোটভের অভাবে পাঁকভরা বেলুন ছুঁড়েই আপাতত না হয় কমরেড আচার্য্যর নিদ্রাভংগ করা যাক!

বৃহস্পতিবার, ৬ নভেম্বর, ২০১৪

কিষাক্ত ~ পার্থ দাশগুপ্ত


হাম ভাই তুম বোন -
হবে না তো চুম্বন।
তাই ঘরে জুস খাই,
আপিসেতে ঘুষ খাই।
কেউ যদি খায় কিস
হাত করে নিশপিশ।
দিই তাকে পিটিয়ে
চুমু-ঝাল মিটিয়ে,
ডেকে দিই হরতাল
লিখি এডিটোরিয়াল।
কারও ঠোঁটে শাস্ত্র
কাহারও বা কাস্ত্রো,
কারও ঠোঁটে রামনাম
কারও ছুতো ইসলাম -
চুমু নিয়ে সব্বাই
গলাগলি সব ভাই।
রাস্তায় মুতে দাও,
ন্যাপকিন ধুতে দাও,
খুন করে পুঁতে দাও,
ফুটপাথে শুতে যাও,
কাটমানি ছুঁতে চাও
তোলা তুলে খুঁটে খাও -
তাতে নেই কোনও পাপ
সাড়ে সাত খুন মাপ।
চুমুতেই যত বিষ,
ফণা তুলে হিসহিস
বলে দিই এখনি।
ফাঁদটি তো দেখনি -
খাস কলকাত্তায়
সাঁঝবেলা সাতটায়
যদি মাঝরাস্তায়
দোকানের পাশটায়
প্রেমিকাকে চুমু খাস
পশ্চাতে দিমু বাঁশ।
ঠোঁট রাখ সামলে
শ্রীরামের নাম লে।
প্রেম কর প্লেটোনিক
বুঝেছিস বেরসিক?


Courtesy: http://thecommentator.in/2014/11/তোমাকে-ভাবাবোই-কিষাক্ত/

রবিবার, ২ নভেম্বর, ২০১৪

ছিঃ! ছিঃ! এত্তা জঞ্জাল... - সুশোভন



অন্য রাজ্যে কর্মরত হওয়ার কারণে বাড়ি আসার সেভাবে সুযোগ হয় না সবমিলিয়ে বছরে হয়ত দিন পনেরো আবার এই ১৫ দিন ম্যানেজ করাও একটাস্কিল প্রথমত, প্রায় সারা বছরের প্ল্যান ভেবে-চিন্তে , ক্যালেন্ডার দেখে ছুটি ম্যানেজ তারপর 'ম্যানেজিত' ছুটির দিন সময় দেখে টিকিট করা এর সঙ্গে যদি সেটা দুর্গা বা কালির আশীর্বাদ থাকে তাহলে, ট্রেনের রিজার্ভেশেন   মাস আগেই না করলে, ‘মায়ের কৃপায়ঘেঁটে হয়ে যেতে বাধ্য এবার অফিসের ছুটির ক্যালেন্ডার দেখে, একদম ঝোপ বুঝে কোপ মেরে, ৩টি ক্যাজুয়াল লিভ নিয়ে  বাক্স-প্যাঁটরা গুটিয়ে দুর্গা দুর্গা বলে সোজা বাড়ি চলে এলাম কিন্তু, দুর্ভাগ্য আপিসের ছুটির ক্যালেন্ডার যখন তৈরি হয়েছিল তখন লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশিত হয়নি ৫৬ ইঞ্চির প্রধানমন্ত্রীর রাজ্যাভিষেক হয়নি দেশ গেরুয়া রাজপুত্রদের হিন্দুস্থান হয়ে ওঠেনি। 'আশ্বিনের কোন এক শারদপ্রাতে...' স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর মনে হল এ দেশ বড্ড নোংরা হয়ে গেছে লোকে এখানে থুতু ফেলে তো ওখানে পানের পিক, সেখানে বিস্কুটের প্যাকেট তো এখানে আধ পোড়া বিড়ির টুকরো তাই ঝাঁট দিয়ে বিদেয় করতে হবে এত্তা জঞ্জাল সুতরাং ঠিক গান্ধীজীর জন্মদিনেই (একদিন আগেও না পরেও না) উনি ক্যামেরার সামনে কিছুক্ষণ ঝাঁট দেবেন আর সবাই কে আপিস এসে স্ব-ইচ্ছায় ঝাঁট দিয়ে দেশ পরিষ্কারের অনুরোধ করবেন ব্যাস, মাসে আগের টিকিট, বছর খানেকের প্রস্তুতি শেষ ছুটি বাতিল
 
গায়ে লেগেছে ? হয়ত তাই বিরক্ত হয়েছি ? হয়ত তাই স্বার্থক্ষুন্ন হয়েছে ? হয়ত তাই কিন্তু আপত্তিটা শুধু সে কারনেই নয় বরং অনেক বেশি করে মজ্জাগত কারনে এবং চমক সর্বস্ব রাজনীতির প্রতি অবিশ্বাসের কারনে প্রশ্নটা কর্মসূচী বা উদ্যোগ নিয়ে নয় কখনই নয় নিশ্চিত ভাবেই এই উদ্যোগ কে স্বাগত এই কর্মসূচী কে সাদর আমন্ত্রন। কিন্তু তাঁর সাথে সাথেই এই কর্মসূচীর কার্যকারী সাফল্য নিয়ে যেমন সংশয় থেকে যায়, উদ্যোগের অন্তর্নিহিত কারন অনুসন্ধান করতে গিয়ে যেমন বারবার হোঁচট খেতে হয়, তেমনই কিছু প্রশ্নও আবার অনুত্তরিত রয়ে যায়  

যদি প্রধানমন্ত্রী আর তাঁর সাথে একমুঠো মন্ত্রী, আমলা, চিত্রতারকা, খেলোয়াড় সেলিব্রেটি মিলে রাস্তা-ঘাটে বছরে একদিন ঝাঁটা দিয়ে জঞ্জাল পরিষ্কার করলেই দেশকে ‘নির্মল’ আর ‘পরিচ্ছন্ন’ করা যেত তাহলে সেটার জন্য স্বাধীনতার ৬৭ বছর পর ‘আচ্ছে দিনে’ আসার অপেক্ষা করতে হত না। আমাদের দেশের প্রায় সর্বত্র বিশেষ করে বিভিন্ন বড় শহর গুলি আদপে কেন এতো নোংরা, সে সমস্যা, সরকারি পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও নীতির অভাব গভীরে গিয়ে গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন না করে পরিকল্পনা মাফিক রূপরেখা তৈরি করে বাস্তবায়নের চেষ্টা না করলে ‘স্বাচ্ছ ভারত অভিযানের’ বকলমে শুধু ক্যামেরায় সামনে ছবি তোলা, মিডিয়ায় ঝড় তোলারই নামান্তর হয়ে উঠবে ঠিক যেমন ইন্দিরা গান্ধীর সময়ে “গরিবি হাটাও” বা রাজীব গান্ধীর সময় “সাক্ষরতা অভিযান” আজ শুধু শ্লোগানের নামান্তর হয়ে ইতিহাসে পাতার কয়েকটা লাইনেই সীমাবদ্ধ।   

২০০১ সালে দেশের শহরের সংখ্যা ৫১৬১ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৯৩৫টি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র সেন্সাস শহরের সংখ্যা ২৫২ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৯২টিতে ১৯৫১ সালে আমাদের দে‍‌শের শহর বা নগরে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ৬.২ কোটি, ২০১১ সালে তা বৃদ্ধি পে‍‌য়ে হয়েছিল ৩৭.৭ কোটি যা ২০৩১ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হবে, ৬০ কোটি যদিও সাংবিধানিকভাবে প্রতিটি শহরেই পৌরসভা থাকাটা বাধ্যতামূলক কিন্তু তথাপি আমাদের দেশের অধিকাংশ শহরেই এখনও পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়নি দেশের শহরগুলির গড়ে প্রায় ১৭ শতাংশ মানুষ বসবাস করেন বস্তি এলাকায় বহু শহরে আজও পরিস্রুত পানীয় জল সরবরাহ ব্যবস্থা চালু হয়নি, নিকাশি ব্যবস্থা উন্মুক্ত, নর্দমার আবর্জনা ন্যূনতম পরিস্রুত না হয়ে পড়ছে নদী, জলাশয় বা সমুদ্রে, নেই স্বাস্থ্যসম্মত ও বিজ্ঞানভিত্তিক জঞ্জাল অপসারণ ব্যবস্থাপনা, এমনকি নেই বিভিন্ন ধরনের জঞ্জাল পৃথকীকরণের ব্যবস্থাও আমাদের দেশের শহরগুলিতে প্রতি বছরে সৃষ্টি হয় মোট ৬০-৭০ মিলিয়ন টন বর্জ্য পদার্থ বেশিরভাগ শহরের যে আবর্জনা দৈনিক সৃষ্টি হয় তার ৫০ ভাগও সংগৃহীত হয় না সরকারি হিসেব অনুসারে শহরেরই ৫৪ শতাংশ মানুষের এখনও বাড়িতে নিজস্ব শৌচালয় নেই গ্রামের অবস্থা আরও খারাপ  সমস্যা সব চাইতে বেশি মধ্য প্রদেশ, ছত্তিশগড় এবং ঝাড়খণ্ডে যেখানে প্রায় ৭৭ শতাংশ গৃহে‍‌ শৌচালয় নেই ৯২ শতাংশ মানুষ উন্মুক্তস্থানে শৌচকার্য করে থাকে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের রিপোর্ট অনুসারে ২০১২-১৩ শহরে প্রতিদিন ১,৩৩,৭৬০ মেট্রিক টন MSW (Municipal Solid Waste) তৈরি হয় যার মাত্র ২৫, ৮৮৪ TPD-(Tons per day) সঠিক ব্যবস্থা করা হয় যদি এভাবে বার্ষিক ৬২ মিলিয়ন MSW কে সঠিক ভাবে অপসারিত ও মজুত( dump) করতে হয় তাহলে প্রতিদিন ৩,৪০,০০০ কিউবিক মিটার জমির (landfill space ) প্রয়োজন যে প্ল্যানিং কমিশন কে প্রধানমন্ত্রী তুলে দিতে চাইছেন তাঁদের রিপোর্টই বলছে২০০০ সালের Municipal Solid Waste আইনের ধার্য সময়সীমা পেরিয়ে যাবার পরও সরকার ও প্রশাসন তার সঠিক প্রয়োগের ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র উদ্যোগী হয়নি শহরের পরিকাঠামো উন্নয়নে কারণীয় সম্পর্কে কেন্দ্রের বিগত সরকার যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছিল, তাদের সুপারিশ মতো আমাদের দেশের শহরগুলির পানীয় জল, পয়ঃপ্রণালী, রাস্তা, বর্জ্য পদার্থ ব্যবস্থাপনা, যানজট নিরসন ইত্যাদির জন্যে ২০০৯ সালের মূল্যমানের ভিত্তিতে ২০১২ সাল থেকে ২০৩২ সাল এই ২০ বছরের জন্যে প্রয়োজন প্রায় ৪০ লক্ষ কোটি টাকার কোথা থেকে আসবে এই বিপুল পরিমান টাকা ? কিভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব এই গুরুতর সমস্যার ? সরকারি স্তরে কি ধরনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে ? কর্মসূচী রুপায়নের রূপরেখাই বা কি হবে ? ‘স্বাচ্ছ ভারত অভিযানের’ গ্ল্যামারে আড়ালে, মিডিয়ার ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে এই প্রশ্নগুলো আগের মত একই রকম উপেক্ষিত রয়ে গেলো। তাই ৫৬ ইঞ্চির বুক ফুলিয়ে প্রধানমন্ত্রী, সমাধানটা ঠিক যতটা সহজ ভাবছেন, বাস্তবে কিন্তু বিষয়টা ততটা সহজ নয়। কি বলুন ?     

‘স্বাচ্ছ ভারত অভিযানের’ আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘আব হামারে কর্তব্য হে কি গন্দেগি কো দূর করকে ভারতমাতা কি সেবা করে’। কিন্তু যথেষ্ট সচেতন এবং সন্তর্পণে যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেলে তা হল আমাদের দেশের জাত-পাতের সমস্যা। আর সামাজিক ভাবেই এই সমস্যা আমাদের কাছে বর্তমানে বোধহয় এতই আত্মিক এবং নিবিড় যে আমরাও মিডিয়ার সাথে সাথে এই বিষয়ে ভাবার, আলোচনা করার এবং সমস্যা সমাধানের কোনরূপ প্রয়োজন যে রয়েছে, সেটাই অনুভব করিনা। আসলে আমাদের সমাজের বৃহত্তর অংশ ধর্মাচরণের অনুমোদন নিয়েই সমাজের কিছু বিশেষ শ্রেণীকেই জন্মগত ভাবে ঝাড়ুদারের দায়িত্ব সমর্পণ করেছে। ২০০৭ সালে ‘India Stinking’ বইয়ে গীতা রামাস্বামী লিখেছেন এই মানুষগুলি, দিল্লীতে বাল্মীকি উত্তরপ্রদেশে ধনুক, পশ্চিমবাংলায় হাণ্ডি, মেথর, অন্ধপ্রদেশে পাকি আবার তামিলনাড়ুতে থোত্তি সম্প্রদায়ভুক্ত। আজ স্বাধীনতার ৬৭ বছর পর যখন আমাদের দেশের অনেকের মানিব্যাগ প্রথমবিশ্বের মানিব্যাগের সাথে টেক্কা দিচ্ছে, যখন আমরা ইংরেজি সিনেমার ‘থ্রিলিং’ দৃশ্যে মনোরঞ্জনের সম্পৃক্ততা খুঁজে পাচ্ছি, টুইটারে আইস বাকেট চ্যালেঞ্জ নিচ্ছি ঠিক তখনই পেটের দায়ে এই মানুষগুলি আমাদের সমাজ ঝাঁটিয়ে পরিষ্কার করার সেই মহান কর্তব্য পালন করছেন অথচ রাষ্ট্র এই মুষ্টিমেয় মানুষ গুলি সামাজিক স্বীকৃতি তো দূরের কথা, নুন্যতম মজুরি বা কাজের স্থায়ীকরনের বিষয়েও আশ্চর্য রকমভাবেই উদাসীন। খুবই সূক্ষ্মভাবেই আমাদের বাক্যবাগীশ প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই চমকসর্বস্ব প্রচার অভিযানের জন্য বেছে নিয়েছিলেন দিল্লীর সেই  বাল্মীকি বস্তিকেই যেখানে গিয়ে গান্ধীজী কিছুদিন ছিলেন। গান্ধীজী অনুরূপ সচেতনতামূলক কর্মসূচীতে সাধারন ঝাঁটাই ব্যবহার করেছিলেন আসলে লম্বা হাতল দেওয়া ঝাঁটায় যেমন কোমর নুইয়ে ‘মাটির কাছাকাছি’ পৌঁছান যায়না ঠিক তেমনি ধোপ-দুরস্ত কেতাবি পোশাকের ঝাড়ুদার আমাদের দেশে বড্ড বেশি ‘কসমেটিক’ এবং বেমানান। আসলে এই সমস্যার গভীরে গিয়ে সমাধান করার পথে আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা বোধহয় তাঁর রাজনৈতিক চেতনা নিয়ন্ত্রনকারি আদর্শগত ধর্মীয় অনুশাসন। ২০০৭ সালে নরেন্দ্র মোদীর বক্তব্যের একটি সংকলন “কর্মযোগ” নামে প্রকাশিত হয়, এক বক্তব্যে উনি গুজরাটের সাফাইকর্মী দের উদ্দেশ্যে বলেছিলেন- “ ...আমি মনে করিনা যে সাফাই কর্মীরা শুধুমাত্র পেট চালানোর জন্যই একাজ করেন। যদি তাই হত তাহলে তাঁরা দিনের পর দিন এই কাজ করে যেতেন না। কোন সময় নিশ্চয় এদের মধ্যে কারও বোধোদয় হয়েছে যে সমাজের স্বার্থেই  ভগবান আমাদের সাফাই কাজে নিযুক্ত করে পৃথিবী তে পাঠিয়েছেন। এটি একটি আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা। আর তাই নৈতিক কর্তব্য রূপেই তাঁদের এই কাজ পালন করা উচিত...” ( সুত্রঃ কর্মযোগ পৃষ্ঠা- ৪৮,৪৯)। নরেন্দ্র মোদী যদি নিজের জ্ঞানচক্ষু  উদ্ভাসিত করেন তাহলে দেখতে পাবেন, আম্বেদকর গান্ধীজীর অনুরূপ মন্ত্যবের প্রেক্ষিতে ঠিক কি বলেছিলেন... “ গরিবি শূদ্রদের বিধেয় অন্য কারও না, সাফাই শুধু অচ্ছুত(untouchables ) দের কাজ এটাই তাঁদের জীবনের উদ্দেশ্য  এই ধরনের মন্তব্য আমাকে, ফ্রেঞ্চ দার্শনিক Voltaire- কথা স্মরন করিয়ে দেয় যিনি বলেছিলেন... তোমার দুর্ভোগ যদি অন্য কারও সুখের কারন তাহলে তা গর্বের, এমন জ্ঞানদান উপহাস ছাড়া আর কিছুই না। তোমার দেহাবশেষ খেয়ে কিছু পোকা মাকড়ের উপকার হবে একথা মৃতপ্রায় ব্যাক্তির কাছে আর যাইহোক কোন সান্ত্বনা হতে পারে না...” (সূত্রঃ What Congress and Gandhi have done to the Untouchables, Dr Ambedkar : Writings and Speeches, Vol 9  P. 290-93)  
বাস্তব এটাই যে নরেন্দ্র মোদী মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন, ২০০৭-এ গুজরাটে “নির্মল গুজরাট” নামে অনুরূপ একটি কর্মসূচী শুরু করেছিলেন, পরবর্তী সময় ২০০৯, ২০১১ এবং ২০১৩-তে সেন্ট্রাল পলিউশন কন্ট্রোল বোর্ডের রিপোর্ট অনুসারে ‘critically polluted areas’ ক্রমাঙ্কের প্রথমেই জায়গা করে নিয়েছে সেই সাধের নির্মল গুজরাট-ই। ২০০৯- এ গুজরাটের আঙ্কেলেশ্বর এবং ২০১১ -১৩ তে ভাপি শিল্পাঞ্চল যথাক্রমে ৮৮.৫০ এবং ৮৫.৩১ CEPI(Comprehensive Environmental Pollution Index) দেশের সবচেয়ে দূষিত জায়গার অন্যতম সেরা তাই আগেই বলেছি প্রশ্নটা একেবারেই উদ্যোগ বা কর্মসূচির নয়। প্রশ্নটা চমক সর্বস্বতার, প্রশ্নটা পরিকল্পনা অভাবের, প্রশ্নটা  সমস্যা অনুধাবনের, প্রশ্নটা গভীরে যাওয়ার অনিচ্ছায়, প্রশ্নটা বাস্তবায়নের প্রাসঙ্গিকতায়। এই প্রশ্নগুলো অনুত্তরিত থাকলে, এড়িয়ে গেলে,    মিডিয়ার প্রচার পাওয়া যেতে পারে, টুইটারে আর ফেসবুকে ঝড় উঠতে পারে, ক্যামেরার ফ্ল্যাশে সেলিব্রেটিদের মেকআপ নষ্টের কিছু সস্তা ছবি ছাপা যেতে পারে, ভোটের বাক্স কানায় কানায় পূর্ণ হতে পারে, রাজনৈতিক কৌশল ভক্ত দের কাছে সমাদৃত হতে পারে কিন্তু ভারতমাতা‘স্বাচ্ছ’ , ‘নির্মলবা পরিচ্ছন্নও  কোনটাই হবেনা আচ্ছে দিনের স্বপ্নভঙ্গ হলেই  মানুষ  আবার বলবে ... ছিঃ! ছিঃ! এত্তা জঞ্জাল ... আর তখনজঞ্জালপরিষ্কার শুরু হবে সেই পার্লামেন্ট থেকেই