শুক্রবার, ১৭ জুন, ২০১৬

ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন ও পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ~ নগর যাযাবর



এবারের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের আলোচনার শুরুতে অবশ্যই কৃতিত্ব দিতে হবে বিজয়ী পক্ষকে | দীর্ঘদিনের শাসকদলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কারণে তৈরি হওয়া ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতায় আসা এক জিনিস আর পাঁচ বছর রাজ্য চালানোর পর পুনর্নির্বাচিত হওয়া আরেক জিনিস, কারণ এক্ষেত্রে বিচার হয় প্রধানত তার কাজের ভিত্তিতে, আর কারুর বিরুদ্ধে ক্ষোভের ভিত্তিতে নয় | সুতরাং তৃণমূলের এবারের জয় অবশ্যই হ্যাঁ-ভোটের ভিত্তিতে (সেই হ্যাঁ-ভোট যেভাবেই জোগাড় হয়ে থাকুক না কেন), এটা স্বীকার করেই কোনো আলোচনা শুরু করতে হবে |

নির্বাচন শুধু প্রার্থীদের পরীক্ষা নয়, রাজনৈতিক দলগুলির পরীক্ষা, এবং জনগণেরও পরীক্ষা |

প্রার্থীদের পরীক্ষার সাফল্য-অসাফল্য স্পষ্ট, ফলাফল বেরোয় তৎক্ষণাৎ, খুব একটা কিছু গন্ডগোল না হলে মেয়াদ পাঁচ বছর | বাকিদের ক্ষেত্রে হিসাবটা আরেকটু জটিল এবং বহুমুখী | সেখানে বর্তমানের সঙ্গে অনেক সময়েই মিশে থাকে অতীত ও ভবিষ্যৎ |  

যেমন ধরুন ভোটার অর্থাৎ জনসাধারণ | তাদেরও পরীক্ষা হয় নির্বাচনে | সেই পরীক্ষায় তাদের সরাসরি কোনো হারজিত হয়না, কিন্তু সেই সময়ের সমাজের একটি প্রতিচ্ছবি হিসাবে তাদের মতামত ইতিহাসে লেখা হয় | সেই ইতিহাসের ভিত্তিতে সময় সেই সমাজের, তার নৈতিকতার, মূল্যবোধের বিচার করে | বলাই বাহুল্য সেই বিচার স্বল্পমেয়াদী রাজনীতির ক্ষেত্রে কোনো তফাৎ করে না | যেমন ধরুন এই নির্বাচনের আগে ক্যামেরায় ধরা পড়ল শাসক দলের একগুচ্ছ শীর্ষ নেতা ঘুষ নিচ্ছেন, দাপুটে আঞ্চলিক নেতা থেকে ডাক্তার, অধ্যাপক | কিন্তু দেখা গেল এর ফলে জনগণ এটা মনে করেনি যে তৃণমূল দলটা এতটা অনৈতিক যে তাকে সরিয়ে দিতে হবে, বা তার জয়ের পরিমান কম করতে হবে | দেখা গেল যে বৃহত্তর জনগণ এটাও মনে করেনি যে ওই ঘুষখোর নেতারা ব্যক্তিগতভাবে এমন কোনো অনৈতিক কাজ করেছেন যে তার জন্য তাদের হারাতে হবে | সেরকম মনে করলে এমন ফলও হতে পারত যে তৃণমূল জিতল কিন্তু ওই নেতারা হারলেন | কিন্তু না, তা হয়নি | যে নেতা ঘুষ নিতে নিতে সগৌরব জানিয়েছিলেন যে তিনি এত কম টাকা ঘুষ নেন না ("ছুঁচ মেরে হাত গন্ধ" করেন না), তিনিও হাসতে হাসতে জিতেছেন | শহুরে লোকের কারুর কারুর একটু আত্মশ্লাঘা দেখা গিয়েছিল যে তাঁরা এসব অপছন্দ করেন, কিন্তু গ্রামের গরিব মানুষ এত কিছু বোঝে না, তাই এসব সত্ত্বেও তৃণমূল জিতবে | বাস্তবে দেখা গেছে, না, গ্রাম শহর কোথাও কোনো প্রভাব পরেনি, ঘুষখোররা সব জায়গাতেই জিতেছেন | এত যে কটু কথা হলো, এত যে ভয় দেখানো হলো, এই যে কার্টুন পাঠানোর জন্য অধ্যাপককে জেলে পাঠানো হলো, তার কোনো প্রভাব দেখা গেল ভোটে পড়ল না | দেখা গেল যে দু-টাকা কেজি চাল ও সাইকেল-দান প্রভাব ফেলল | আমরা এ-ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না, কারণ এটা আমাদের এই লেখার মূল বিষয় নয়, সাক্ষী হিসেবে এই-কথাগুলো লিপিবদ্ধ করলাম শুধু |

এ-ব্যাপারে আরেকটা কথাও বলা দরকার - এই যে মানুষ এই যে নৈতিকতার ভিত্তিতে ভোট দিল, এটা শুধু গত পাঁচ বছরের তৃণমূলের শাসনের ফসল নয়, কারণ এই ভোটাররা তাদের জীবনের বেশিরভাগ এবং দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন বামফ্রন্টের শাসনে | আর নৈতিকতা বা আদর্শ একদিনে তৈরি হয়না বা ভাঙ্গে না | এ-প্রসঙ্গে আমরা পরে ফিরব |

নির্বাচনের আরেক মূল অংশীদার রাজনৈতিক দলগুলো | তাদের ক্ষেত্রে আবার চোখে যা দেখা যাচ্ছে, সাধারণত নির্বাচনের ফলের অভিঘাত হয় তার থেকে বেশি |

যেমন ধরুন এই নির্বাচনে বামফ্রন্ট ৩২-টি আসনে জিতেছে এবং বিজেপি ৩-টি মাত্র আসনে জিতেছে | মানে হবু বিধানসভায় বামফ্রন্টের শক্তি বিজেপির প্রায় দশগুণ | এটুকু হচ্ছে স্বল্পমেয়াদী হিসাব | তার সঙ্গে এটাও পরিষ্কার যে বামফ্রন্ট এখন এই রাজ্যে একটি ক্ষয়িষ্ণু শক্তি এবং বিজেপি বর্ধিষ্ণু শক্তি | প্রায় অর্ধেক শতক বাংলার একটা গুরুত্ত্বপূর্ণ শক্তি থাকার পর, সাড়ে তিন-দশক দাপটের সঙ্গে রাজ্য শাসন করার পর, নিজেদের মতাদর্শে রাজ্যের মানুষকে অনুপ্রাণিত করার প্রচুর এবং দীর্ঘ সুযোগ পাওয়ার পর বামফ্রন্ট এখন এই রাজ্যে মাত্র এক-দশমাংশ আসনে জয়ী, ভোট মোটামোটি ২৫%, যার মানে প্রতি চারজনে তিনজন মানুষ বামফ্রন্ট-কে ভোট দেননি (এই হিসাবে কংগ্রেস-কে আসন ছাড়ার প্রভাব সামান্য)| অন্যদিকে, রাজ্যের দীর্ঘ ইতিহাসে যারা প্রায় অনুপস্থিত ছিল, সেই বিজেপি প্রায় সব আসনে ভোট বাড়িয়েছে, বহু আসনে ফলাফলে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে এবং শুধু শহরাঞ্চলে নয়, আরএসএস-এর ধীরে ধীরে বাড়ানো সংগঠনের ভিত্তিতে তারা এমনকি মাদারিহাট আসনটি জিতে নিয়েছে এবং কালচিনিতে মাত্র দেড়হাজার ভোটে হেরেছে | তৃণমূল বা কংগ্রেসের কি হবে জানিনা, তবে এই ধারা চলতে থাকলে পরের নির্বাচনের আগে রাজ্যে বিজেপি এবং বামফ্রন্টের পারস্পরিক পরিষদীয় অবস্থাটা উল্টে যেতে পারে | সুতরাং বামফ্রন্ট-বিজেপির ওই ৩২-৩-টা নিরেট সংখ্যার বাইরেও আরো অনেক কিছু নির্দেশ করে |

এইটুকু প্রাথমিক কথার ভিত্তিতেই আমরা ঢুকব আমাদের মূল আলোচ্য প্রশ্নে - কোন দিকে যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন?

এই নির্বাচনের ফলের ভিত্তিতে নিশ্চয়ই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে ও বাইরে বহু আলোচনা হবে | পার্টির আলোচনায় অবশ্যই বুথভিত্তিক খুঁটিনাটি আলোচিত হবে এবং আলোচিত হবে কংগ্রেসের সঙ্গে জোটের প্রভাব | সেসব আলোচনা অনেক হয়েছে, আরো হোক |

কিন্তু শুধু তার ভিত্তিতে সমস্যাটির মূলে পৌঁছনো যাবেনা, কারণ সমস্যাটি কৌশলগত নয়, আদর্শগত |

আমাদের মনে হয় কমিউনিস্ট শক্তির এই লাগাতার শক্তিক্ষয়ের কারণ মানুষ আর কমিউনিস্ট পার্টিকে কমিউনিস্ট পার্টি বলে চিনতে পারছেনা, বুঝতে পারছেনা অন্য অনেক দলের সঙ্গে তার আদর্শগত তফাতটা কোথায়, সোজা কথায় কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়োজনটা কী |

চিনতে পারছেনা কারণ এরা আর এখন কোনো আদর্শচালিত কর্মসূচী নেয়না বা স্লোগান দেয়না, দিলেও বোঝা যায়না | যেমন ধরুন এই নির্বাচনে এবং তার বেশ কিছুদিন আগে থেকে সিপিএম-এর পশ্চিমবঙ্গ-কেন্দ্রিক মূল স্লোগান ছিল দুটো - শিল্প করে কর্মসংস্থান করতে হবে আর রাজ্যে অপশাসনের অবসান চাই | এখন বড় পুঁজিপতিকে সুবিধা দিয়ে - কম পয়সায় জমি, কর-ছাড়, সুবিধাজনক শর্তে ঋণ, এমন কি সময় বিশেষে মুনাফার গ্যারান্টি - ডেকে এনে শিল্প করলে কিছু কর্মসংস্থান হবে, দেশের অর্থনৈতিক বিকাশ হবে আর তার "সুফল" চুঁইয়ে পরে দেশের গরিব মানুষের কাছে পৌঁছবে, আর এই রাস্তায় পুঁজিপতি যত লাভ করবে তত তার ব্যবসা করার ইচ্ছা বাড়বে - প্রগতির এই ধারণা সম্পূর্ণ ধনতান্ত্রিক আদর্শের ধারণা, এই মডেলে উন্নতি করার জন্য কমিউনিস্ট পার্টিকে ভোট দেওয়ার দরকার নেই | বিজেপি-কংগ্রেস, এমন কি তৃণমূল, এই কাজ সম্ভবত আরো ভালোভাবে করবে, বহু ক্ষেত্রে বড় পুঁজিপতিরা এইসব পার্টির নেতৃত্বে আছে এবং তারা মনে প্রাণে এই তত্ত্ব বিশ্বাস করে |



দ্বিতীয় স্লোগান সুশাসন | এই দাবি সবাই করবে, এই মুহুর্তে বিশেষ করে করার দরকার, কিন্তু সুশাসনের জন্যও কমিউনিস্টদের ভোট দেওয়ার আলাদা করে দরকার নেই, পৃথিবীর উন্নত ধনতান্ত্রিক দেশগুলোতে চমৎকার সুশাসন আছে, আইন আইনের পথে চলে, কাজের জন্য কাউকে ঘুষ দিতে হয়না, ইত্যাদি |

তাহলে করণীয় কী? অদ্ভূতভাবে এই প্রশ্নটি গত কুড়ি বছরে এ-দেশের কমিউনিস্টদের কাছে জটিল এক ধাঁধা হয়ে উঠলো | পার্টি কংগ্রেসের পর পার্টি কংগ্রেস গেল, প্লেনাম গেল, কিছুতেই আর তার উত্তর পাওয়া যাচ্ছে না! ক্রমশ তারা বুঝলো যে ধ্যান-ধারণায় "আধুনিক" হতে হবে | আর কমিউনিস্ট হিসাবে "আধুনিক" হওয়ার জাদুকাঠিটি খুঁজে না পাওয়ায় কমিউনিস্ট পার্টির এক অদ্ভূত অবস্থা দাঁড়ালো - ভারতে সিপিএমের নেতারাসহ সম্ভবত একজনও বিশ্বাস করেনা যে সিপিএম সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য লড়ছে, বরং তাকে জঙ্গি আন্দোলনের নিরিখে যথেষ্ট নিরীহ একটি সংসদীয় দল বলে মনে হয়, কিন্তু পার্টি সশস্ত্র বিপ্লবের কথা তার কর্মসূচী থেকে সম্পূর্ণ মুছে দেয়নি | "সর্বহারার একনায়কতন্ত্র" প্রতিষ্ঠা করার কোনো ইচ্ছা বা সেদিকে কোনো ভূমিকা চোখে পরছেনা, বরং অন্য অনেক "গণতান্ত্রিক" দলের থেকে সিপিএম অনেক বেশি সংসদীয়ভাবে গণতান্ত্রিক, তবু ওই কথাটি কর্মসূচীতে আছে | "জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব" বা "সর্বহারার একনায়কতন্ত্র" আছে কমিউনিস্ট পার্টি হিসাবে, যদিও মানুষ বহুদূর পর্যন্ত দলের কাজে তার কোনো ব্যবহারিক প্রভাব দেখছেনা | আর সামনে দেখছে রাস্তায় নেমে আন্দোলনবিমুখ একটি দল পুঁজিপতিদের ডেকে এনে কর্মসংস্থান করে দেশের উন্নতি করতে চাইছে ! হিসেবগুলো মিলছেনা কমরেড, মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যাচ্ছে, ভাবছে এরা ঠিক কোন পার্টি, ঠিক কাদের প্রতিনিধিত্ব করছে | আর যা হওয়ার তাই হচ্ছে, শুধু সংসদীয় বিচারে নয়, সবদিক থেকে ক্রমহ্রাসমান হয়ে যাচ্ছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন | হিসেব মিলছে শুধু শাসক শ্রেণী ও তাদের প্রতিনিধি মিডিয়ার, যারা চায় কমিউনিস্ট আন্দোলন হয় আক্ষরিক অর্থে বা অন্তত আদর্শগতভাবে মুছে যাক |

 

তাহলে উপায় কী? করণীয় কী?

উপায় একটাই | আদর্শের মূল ভিত্তিকে ধরে থাকা এবং আদর্শচালিত আন্দোলন করা |

দু-দশক আগে যখন কলেজে ঢুকেছিলাম, শুনেছিলাম যে দর্শন জানার জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা, মাঠে নেমে পড়তে হবে, বাকি দর্শন কাজ করতে করতে শিখতে হবে | কথাটা অংশত ঠিক, যতক্ষণ পর্যন্ত দর্শনের মূল ভিত্তি নিয়ে কোনো সংশয় না থাকে | যদি সংশয় তৈরি হয়, তাহলে দর্শনের পুনঃপাঠের প্রয়োজন, যাকে ইংরিজিতে বলে "ব্যাক টু দ্য ড্রয়িং বোর্ড" | কমিউনিস্ট পার্টির মূল আদর্শ শ্রেণীসংগ্রাম | যখন থেকে মানুষ শ্রমের উদ্বৃত্ত তৈরি করতে সক্ষম হলো, মানে শুধুমাত্র জীবনধারণের উপকরণ সংগ্রহ করতে আর সারাদিন ব্যয় করতে হলো না, তখন থেকেই সেই উদ্বৃত্ত শ্রমের সাহায্যে সম্পদ তৈরি হতে শুরু করলো | সভ্যতার শুরু থেকেই ব্যাপক জনসাধারণের উদ্বৃত্ত শ্রমের ভিত্তিতে তৈরি সম্পদ ভোগ করেছে ছোট একটা শ্রেণী | সে রাজা হোক, জমিদার হোক বা পুঁজিপতি হোক | যত উদ্বৃত্ত, তত লাভ | সুতরাং যুদ্ধ, সুতরাং দাসত্ব, সুতরাং লেঠেল | কিন্তু সম্পদের এই গভীর বৈষম্য ও এই শ্রেণীবিভাজন বহু কারণে (সেগুলো এখানে আলোচনা করার প্রয়োজন বা পরিসর নেই) শোষিত শ্রেনীর জন্য শুধু নয়, সভ্যতার অগ্রগতির জন্য ভালো নয় | সুতরাং শ্রেণীহীন (বা অন্তত শ্রেণীগুলির মধ্যে ব্যাপক বৈষম্যহীন) সমাজের লক্ষ্যে শোষিত-নিপীড়িত শ্রেণীকে শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে অবিরাম লড়াই করতে হয়, আর তার সেই লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেবে তার পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি | এই সামান্য কথাটুকুই মার্কসবাদী দর্শনের মূল কথা যা মার্কস একা নন, আরো অনেক দার্শনিকের দর্শনের ভিত্তিতে তৈরি ও সমৃদ্ধ | এই মূল কথার ব্যাপারে কোনো দ্বিধা থাকলে, পার্টির আন্দোলনে-কর্মসূচিতে এ-ব্যাপারে বিন্দুমাত্র অস্পষ্টতা থাকলে কমিউনিস্ট পার্টি সম্পর্কে মানুষ বিভ্রান্ত হয়, বারবার হলে কমিউনিস্ট আন্দোলন গুরুত্ত্ব হারায় |

এই মূল বক্তব্যে আধুনিক হওয়ার কিছু নেই | আধুনিক হওয়ার প্রয়োজন, অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করার প্রয়োজন প্রয়োগে, কৌশলে | সিপিএম যে জঙ্গলে গিয়ে বোমা তৈরি করার বদলে বহুদলীয় সংসদীয় গণতন্ত্রে অংশ নিয়ে কাজ করছে, এটা প্রয়োজনীয় আধুনিকতা | আমাদের দেশের সংবিধান ও আইন যা সুযোগ দিয়েছে, তার মধ্যে থেকেই শোষিত শ্রেণীর আন্দোলনকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, মার্ক্সের সময় বা বলশেভিক বিপ্লবের সময় পরিস্থিতি আলাদা ছিল | সশস্ত্র বিপ্লবের বদলে শান্তিপূর্ণ পথে এগোনো প্রয়োজন, একদলীয় শাসনের বদলে বহুদলীয় শাসনের দিকে যাওয়া প্রয়োজন, কারণ শেষ কথা কেউ বলতে পারে না | কিন্তু আধুনিকতার স্বার্থে শ্রেণীসংগ্রাম পিছনে পরে গেলে কমিউনিস্ট পার্টি ও আন্দোলনের আর কিছু থাকেনা |

পাশাপাশি একবার দেখুন বাস্তবটা | মেহনতি মানুষের তৈরি বিপুল সম্পদ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে জনসংখ্যার অতি ক্ষুদ্র অংশের হাতে | ২০০৭ সালে ভারতের জনসংখ্যার ৭৫% মানুষের দৈনিক আয় ছিল ২০ টাকার কম (ভারত সরকার-নিযুক্ত অর্জুন সেনগুপ্ত কমিটি রিপোর্ট), যে একই সময় ভারতের বিখ্যাত পুঁজিপতির ছেলে বিখ্যাত পুঁজিপতি মুম্বইতে ৬৫০০ কোটি টাকা দিয়ে নিজের বাড়িটি বানালেন! ২০১৩ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের রিপোর্ট বলছে যে পৃথিবীর পঞ্চাশ শতাংশ সম্পদ কেন্দ্রীভূত এক শতাংশ মানুষের হাতে, পৃথিবীর অর্ধেক মানুষের সম্পদের পরিমাণ ধনীতম ৮৫-জন মানুষের সম্পদের সমান | শোষিত শ্রেণীর অবস্থার হয়ত সামান্য উন্নতি হয়েছে, অন্যদিকে ধনীতমরা ধনী হয়েছে আরো অনেক বেশি | শুধুমাত্র কোন পরিবারে জন্ম এই হাতে-না-থাকা ঘটনাটির ভিত্তিতে আকাশ-পাতাল তফাৎ হয়ে যাচ্ছে একটি শিশুর শৈশবে, তার পাওয়া সুযোগে, শিক্ষায়, স্বাস্থ্যে, বাসস্থানে | ঠিক কোন যুক্তিতে বুদ্ধিতে নৈতিকতায় এই ব্যবস্থাটা ঠিক সেটা বোঝা যাচ্ছে না, কিন্তু এই প্রাচীন লুঠতরাজের ব্যবস্থার প্রতি সমর্থনে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে যাচ্ছে শাসকশ্রেণী ও তাদের তাঁবেদার ও সুবিধাভোগী সংসদ, মিডিয়া | এই ব্যবস্থা অতি প্রাচীন, তাকেই আঁকড়ে আছে শাসকশ্রেণী, কারণ তারা এর সুবিধাভোগী | তারা দখল করতে চায় সমস্ত কিছু | তাই ২০০৯-এর ভারতের সংসদীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের সম্পত্তির হিসাবে দেখা যায় যে বামপন্থীরা ছাড়া আর প্রায় সব দলের বেশিরভাগ প্রার্থী কোটিপতি | সামাজিক ও আদর্শগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে অনেক তফাৎ থাকা সত্ত্বেও শ্রেণীগত প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে সবাই সমান - কংগ্রেস বিজেপি বিএসপি এডিয়েমকে ডিএমকে বিজেডি, ইত্যাদি | সোজা কথায় সংসদটা ভারতের ধনীতমদের |

আর এই ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে ক্রমশ বাড়ছে পণ্য ও তার প্রতি আকর্ষণ, পৃথিবী ভরে উঠছে জিনিসে | আর এইসব জিনিস তৈরির মাশুল দিচ্ছে প্রকৃতি, আমাদের বাতাস ও জল ভরে উঠছে বিষে, আমাদের সমুদ্র ভরে উঠছে বর্জ্যে | মানুষ ক্রমশ আরো দূরে চলে যাচ্ছে তার শ্রমের থেকে, আমরা বেশিরভাগ মানুষ সারাদিন যা ব্যবহার করি, তার কিছুই নিজেরা তৈরি করিনা, যা তৈরি করি, তা ব্যবহার করিনা!

আর হচ্ছে অবৈজ্ঞানিক চিন্তার প্রসার - জ্যোতিষী, আংটি, মাদুলি, লাল-সুতো, নতুন নতুন পুজো | খবরের কাগজের পাতা আর টিভি চ্যানেলের পর্দা ভরে উঠছে এদের বিজ্ঞাপনে, সমাজের গণ্যমান্যেরা হাসিমুখে পুজোর উদ্বোধন করে বেড়াচ্ছেন | সেই যে অদৃষ্টের ভয়টা সভ্যতার শুরু থেকে দেখানো শুরু হয়েছিল, রাজাই "দেবতা" হয়ে উঠেছিল বহুক্ষেত্রে, সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে |

এইটুকু বলতে হলো এই কারণে যে শ্রেণীসংগ্রামের কারণ বিন্দুমাত্র কমেনি, বেড়েছে; মানুষের পণ্য-ব্যাকুলতা কমেনি, বেড়েছে, শ্রমের থেকে দুরত্ব কমেনি, বেড়েছে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাস কমেনি, বেড়েছে | কিন্তু কোনো এক রহস্যময় কারণে ভারতীয় কমিউনিস্টদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে ভাবনার অস্পষ্টতা | তাই একমাত্র স্লোগান হয়ে দাঁড়াচ্ছে যে বড় পুঁজিপতিকে ডেকে শিল্প করতে হবে, যদিও ন্যুনতম মজুরির দাবিতে, পুঁজিপতিদের অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে, শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে, পড়াশোনায় সমান সুযোগের দাবিতে, পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে, কুসংস্কার ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে, লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে, কৃষিতে সমবায় আন্দোলনে, কৃষিভিত্তিক শিল্পের উন্নতির লক্ষ্যে, অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমিকদের দাবি দাওয়া নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টির কোনো বড় আন্দোলন দেখা যাচ্ছেনা | যদিও সিপিএম এখনো পৃথিবীর বৃহত্তম কমিউনিস্ট পার্টিগুলির একটি যার ডাকে আজও সহজেই এক লক্ষ লোক জড়ো হতে পারে |

বর্তমান পরিস্থিতিতে কোন একটি বড় শিল্প একজন বড় পুঁজিপতিকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে করতে হতেই পারে, কিন্তু সেটা সময়ের বাধ্যতা, কমিউনিস্ট পার্টির উন্নতির মূল মডেল হতে পারেনা | অর্থাৎ সেটাই প্রধান স্লোগান হতে পারেনা, আরো পাঁচটা আন্দোলনে কমিউনিস্ট আদর্শের ভিত্তি স্থাপিত থাকলে এটা কোন বড় কথা নয়, মানুষের মনে কোন বিভ্রান্তিও তৈরি হবেনা |

দ্বিতীয়ত দরকার বড় আন্দোলন, যেটা দেখা যাবে, যার দ্বারা বিপুল মানুষ অনুপ্রাণিত হবে, এমন কি পার্টির সমর্থকদের বাইরের একটা অংশও | নিবিড় জনসংযোগ ও স্থানীয় সমস্যা নিয়ে আন্দোলন জরুরি, কিন্তু সেটা বড় আইকনিক আন্দোলনের বিকল্প নয় | গত বহু বছরে ভারতে সংসদের বাইরে যে চোখে পরার মত আন্দোলন বা কর্মসূচী হয়েছে, অদ্ভুতভাবে তার একটাও বামপন্থীদের নয়! অযোধ্যায় কড়া কট্টরপন্থী ও ধ্বংসাত্মক "করসেবা", যার দ্বারা বিজেপি তার আকর্ষণকে একটা বৃহত্তর জনগোষ্টির কাছে পৌঁছে দিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাস্তা আটকে বসে থাকা, যা জমি অধিগ্রহণকে প্রশাসনিক বিষয় থেকে (যেমন বামফ্রন্ট সরকার চেয়েছিল) একটা সামাজিক এবং বড় রাজনৈতিক বিষয়ে উন্নীত করলো, মেধা পাটকারের "নর্মদা বাঁচাও" আন্দোলন যা বড় ড্যাম তৈরির (এবং সাধারণভাবে বড় "উন্নয়নমূলক" প্রকল্পের) সামাজিক ও পরিবেশগত কু-প্রভাব সম্পর্কে দেশবাসীকে অবহিত করলো, অরবিন্দ কেজরিওয়ালের দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করার অঙ্গীকার এবং দিল্লি-কাঁপানো আন্দোলন, যার ভিত্তিতে রাজনীতিতে আনকোরা কিছু লোক নিয়ে আম আদমি পার্টি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে দিল্লিতে বিজেপি-কংগ্রেসকে ধরাশায়ী করল - এগুলো বড় চোখে পরার মত আন্দোলন বা কর্মসূচী, যার প্রভাব তার স্থান-কাল-কে অতিক্রম করতে পারে | এই আন্দোলনগুলো দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন এবং অনেকাংশে পরস্পরবিরোধী শক্তি বা ব্যক্তিরা করেছে, কিন্তু এই তালিকায় কমিউনিস্ট পার্টির কোনো আন্দোলন দেখা যাচ্ছেনা! চরম দক্ষিণপন্থী শক্তি থেকে এনজিও - সবাই তাদের আদর্শ ও ইস্যু নিয়ে বাজার কাঁপিয়ে দিল, শুধু যাদের "বিপ্লব" করার কথা ছিল তারা চুপচাপ! এই আন্দোলনগুলোর কোনটা সমর্থনযোগ্য, কোনটা ক্ষতিকর, কোনটা ক্ষণস্থায়ী, সে ব্যাপারে আমরা কিছু বলছিনা, কিন্তু বড় আন্দোলনের প্রত্যক্ষ এবং ব্যাপক প্রভাব এরা প্রমাণ করে | টিভির তর্কে অংশ নেওয়া, বিধানসভার উঠোনে স্লোগান দেওয়া আর রাজ্যপালকে স্মারকলিপি দেওয়ারও হয়ত প্রয়োজন আছে, কিন্তু এর কোনটাই আবেগ ও আদর্শচালিত বড় আন্দোলনের বিকল্প নয় |

আর তৃতীয় মূল প্রয়োজন রাজনৈতিক দর্শনের ক্রমাগত ও প্রাণবন্ত চর্চা | যে নৈতিকতার কথা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, সেখানে একটু ফিরতে হয় | সাড়ে তিন দশক যে রাজ্যে কমিউনিস্ট পার্টি সরকার চালালো, তার বাসিন্দারা পাহাড়প্রমান দুর্নীতি চোখে দেখতে পেয়েও তার দ্বারা বিচলিত হচ্ছেনা, তোয়ালে জড়িয়ে ঘুষ নেওয়াকে আদৌ কোনো অনৈতিক কাজ বলে ভাবা হচ্ছেনা, অথবা তাদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা এতই খারাপ যে এসব দেখেও কিছু ব্যক্তিগত সুবিধা পাওয়ার জন্য জনগণ ওই দুর্নীতিবাজদেরই ভোট দিচ্ছে, এর কোনটাই রাজ্যের মানুষের চেতনাকে কোনো উজ্জ্বল আলোয় দেখায় না | এর একটা বড় দায়িত্ব অবশ্যই কমিউনিস্ট পার্টিকে নিতে হয় | আগে লোকে অন্তত কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মীদের দেখে বলত যে লোকগুলো আর যাই হোক, আদর্শবান, সৎ, সাহসী এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের পেছনে ছুটছে না | এখন আর এ-কথা কজনের সম্পর্কে বলা যায় নিশ্চিত নই, তবে জনমানসে সেই উঁচু আসনটি যে আর নেই তা প্রায় নিশ্চিতভাবেই বলা যায় | কজন পার্টি-সদস্য নিশ্চিতভাবে জানেন যে এই মুহুর্তে ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনের গুরুত্ত্ব কোথায় এবং মূল কাজ কী, এ নিয়ে সন্দেহ আছে | তাই প্রতিদিনের মিটিং, কর্মসূচী, মেম্বারশিপের হিসেবের পাশাপাশি দরকার দর্শন ও রাজনীতির নিবিড় চর্চা, আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক | সেই আলোচনা এবার এই কেন্দ্রে কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করলে সুবিধা হবে কিনা, তার থেকে একটা ওপরের স্তরের হওয়া দরকার | এই আলোচনা শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি বা রাজ্য কমিটি স্তরে হলে চলবেনা, শাখা স্তরে হতে হবে | জেলায় জেলায় নিয়মিত তাত্ত্বিক ওয়ার্কশপ হওয়া দরকার শাখা থেকে রাজ্য স্তরের সদস্যদের মধ্যে | সময় নেই বললে চলবেনা, এটাই এখন মূল কাজ |

প্রাক-স্বাধীনতা যুগ থেকেই ভারতের মানুষ, সমাজ ও রাজনীতির জন্য অসামান্য অবদান রেখেছে ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলন | সংসদীয় বৃত্তের মধ্যে (ভূমি সংস্কার, ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ) এবং তার থেকেও গুরুত্ত্বপুর্ণভাবে, সংসদীয় বৃত্তের বাইরে (নিপীড়িত মানুষের পক্ষে সওয়াল করতে, তাকে জোটবদ্ধ করতে, অধিকারের দাবি জানাতে, প্রাচীন সামন্ততান্ত্রিক এবং অবৈজ্ঞানিক রীতিনীতি নিয়ে প্রশ্ন তুলতে, তাদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধের ধারণাকে তুলে ধরতে) ক্রমাগত বিশ্বস্ত ভূমিকা নিয়ে গেছে কমিউনিস্ট পার্টি, ভুলভ্রান্তি সত্ত্বেও | এখন দক্ষিণপন্থী শক্তির উত্থানের সময় তাই আরো বেশি করে প্রয়োজন বামপন্থী আদর্শের শক্তিশালী হওয়ার | আদর্শ, আবেগ ও আন্দোলনের মধ্য দিয়েই প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে কমিউনিস্ট আন্দোলন, রাস্তা বেরোবে | মনে রাখতে হবে শাসক শ্রেণী কমিউনিস্ট পার্টিকে ভয় পায়, মানুষের সংঘবদ্ধতাকে ভয় পায় | ভয় পায় পার্টির বর্তমান শক্তির জন্য নয়, আদর্শের শক্তির জন্য | আর ভয় পায় বলেই তাকে বারবার "বস্তাপচা তত্ত্ব" বলতে চায় | সত্যিই কোনো তত্ত্ব বস্তাপচা হলে বা তা ভূল প্রমাণিত হলে তা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না |

(লেখক ৯০এর দশকে যাদবপুরে ইঞ্জীনিয়ারিং পড়ার সময় থেকে বাম আন্দোলনের সাথে যুক্ত, বর্তমানে একটি সফটওয়্যার কম্পানিতে কর্মরত)

মঙ্গলবার, ১৪ জুন, ২০১৬

সাতশো কোটি টাকা জরিমানা ~ আশুতোষ ভট্টাচার্য্য

দিল্লীর মুখ্যমন্ত্রী কেজরিবালের ওপর কিছু জনতার ব্যাপক ক্ষার , কারো মতে মালটা বদ্ধ উন্মাদ,যখন যা মনে আসে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে, পপুলার পলিটিক্স করে ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই যে কিছুদিন আগে জোড় বিজোড় গাড়ি চালানোর বিধান দিলেন দিল্লীতে, সে পনেরো পনেরো তিরিশ দিন লোকের কি গুসসা হল, বহুত পরিশানি হল। পলুসন তো কিচ্ছু কম হল না বেকার বেকার মানুষের কষ্ট।
সম্প্রতি উনি নির্দেশ দিয়েছেন বিদ্যুৎ পরিষেবা দেয় যারা তারা কোন ব্রেকডাউন বা ফল্ট সারাই করতে নির্দিষ্ট সময়ের বেশী সময় নিলে গ্রাহককে পরের বিলে ছাড় বা ডিসকাউন্ট দিতে হবে। কি আবদার বলুন তো দেখি, এসব করলে তো ব্যাবসা লাটে উঠবে, লাভের গুড় পিঁপড়েতে খাবে।কিন্তু পরিষেবা দানকারী কোম্পানিই বা কি করে, মেনে তো নিতেই হবে। ব্যাবসা তো আর হিমালয়ে কি মরুভূমিতে করা সম্ভব নয়।

দু একদিন আগে আবার কামান দেগেছেন, এবার দিল্লীর কিছু বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে। বেসরকারি হাসপাতাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোকে সরকার অনেক কম মুল্যে জমি দেয়, এটা সব রাজ্যেই পরিকাঠামো উন্নয়নে সাহায্য করে আর সাথে সাথে কিছু শর্ত দিয়ে দেয় সরকার, যেমন হাসপাতালে ফিছু ফ্রি বেড রাখতে হবে দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার জন্য কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কিছু সিট অর্থনৈতিক ভাবে দুর্বল মানুষের পড়াশুনার জন্য। সে নিয়ম তো অনেক আছে তা আর মানে কে? ভাবুন এক পাঁচতারা হাসপাতালে বিশাল মন্ত্রী, নেতা,শিল্পপতির চিকিৎসা চলছে আর তার পাশাপাশি এক রিকশাওয়ালা বিনি পয়সায় একই চিকিৎসার সুযোগ নিচ্ছে, এটা হয় কখনো, কিংবা আপনার আমার ছেলেমেয়ের সাথে ডিপিএস এ পড়ছে আমার বাড়ির কাজের মেয়েটির ছেলে! মেনে নেওয়া যায়। এমনিতে ট্যাক্স দিয়ে দিয়ে আমাদের পকেট খালি তাপ্পর এইসব।

হঠাৎ কথা নেই বার্তা নেই পরশু সেই পাগল মুখ্যমন্ত্রী দিল্লীর পাঁচ বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে সাতশো কোটি টাকা জরিমানা করেছেন, এই টাকা জমা করতে হবে ৯ই জুলাইয়ের মধ্যে কারন জমি নেবার সর্ত অনুসারে তাঁদের দরিদ্র্য মানুষের জন্য যে সেবা বিনামূল্যে দেবার কথা ছিল টা তাঁরা দেন নি।এই তালিকায় আছে ফরটিস এস্করটস হার্ট ইন্সিটিউট, ম্যাক্স সুপার স্পেশালিটি (সাকেত), শান্তি মুকুন্দ হাসপাতাল, ধরমশিলা ক্যান্সার হাসপাতাল, পুষ্পবতী সিঙ্ঘানিয়া হাসপাতাল। 

বড়লোকের কোর্ট আছে তাই হাসপাতাল সকল আদালতে যাবে শুনালি হবে, রায় বেরোবে, তারপর সুপ্রিম কোর্ট ইত্যাদি ইত্যাদি। হয়তো প্রমান হবে ওই হাসপাতালগুলো নিয়ম মেনে দরিদ্র সেবা করেছেন ( দেখেছেন নাকি আপনারা এমন কাউকে)। 

তা এহেন মানুষকে লোকে ফাগল বলবে না তো কি করবে, মুখ্যমন্ত্রী তায় আবার রাজধানী শহরের অন্য কত কাজ থাকে যেমন ফ্লাইওভার বানানো, রাস্তা মেরামত করা,ফুলের গাছ লাগানো, হাসি হাসি মুখে নানা অনুষ্ঠানে ফিতে কাটা সেসব নয় পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর সার্টিফিকেট ভেরিফাই করতে, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ কোম্পানির যথেচ্ছাচারের মুখে লাগাম পরাতে।

তা কলকাতার বাইপাসের দুপাশ ধরে লাইন দিয়ে যে হাসপাতাল তাঁদেরকেও সরকার ন্যুনতম মুল্যে জমি টমি দিয়েছিল শুনেছি( সে অবশ্য বামফ্রন্ট আমলে) আর এসব শর্তও লেখা আছে তাতে। দান বাম কোন সরকার কিছু করেছে বলে শুনিনি। এএমআরআই তে আগুন লাগার ঘটনায় কারো শাস্তি হয়েছে বলে শুনিনি, অবশ্য দিদি বিমানবাবুর হাত ধরে বলেছিলেন সব্বার নাকি শাস্তি হবে!!

কেজরিবালের এই সব কাণ্ড কারখানা দেখে বিজেপি তো রেগে আগুন, এই সব টাকা সরকার নাকি বিজ্ঞাপনের কাজে ব্যাবহার করবে তার পর ব্যাবসায়ীদের অধিকারে হস্তক্ষেপ, কি কাণ্ড।
আপনি কি বলেন?

সোমবার, ৬ জুন, ২০১৬

সংখ্যালঘু ~ মাহফুজ আলম

মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি জানিয়েছেন যে 'রমজান' মাসে রেশনে রমজান স্পেশাল প্যাকেট দেওয়া হবে।সংবাদ মাধ্যম অনুযায়ী, প্যাকেটে চাল, ময়দা, তেল, খেজুর, ছোলা এবং চিনি থাকার কথা l সংখ্যালঘু মুসলিম মানুষদের সুবিধার জন্যই এই ব্যবস্থা l তবে, শুধু সংখ্যালঘুরাই নন, চাইলে সবাই রেশন থেকে ওই প্যাকেট তুলতে পারবেন l

বেশ ধেই ধেই করে লাফাবার মতন খবর, মোহন বাগান লিগ জিতলে যেরম হয় আর কি। গোটা রোজার মাস ধরে মুসলিম ভাই-বোনেরা 'রমজান' স্পেশাল প্যাকেট পাবেন। যে গরিব মুসলিম রিকশাওলা যে ধর্ম মেনে রোজা রাখে কিন্তু অভাবে পর্যাপ্ত ইফতারি জোটেনা, তার তো ভালো হবেই।

প্লাস, নিন্দুকেরা যদি 'মোছলমান পীরিতি' খোঁজে, তার জন্যে এটাও জুড়ে দেওয়া হয়েছে যে চাইলে অমুসলিমরাও এই স্পেশাল প্যাকেট পাবে।

এই হ্যাপি এন্ডিং মার্কা গপ্পের শেষে কিছু কোশ্চেন থাকছে।

সংবিধান অনুসারে ধর্মীয় সংখ্যালঘু বলতে খালি মুসলমান বোঝায় না। বৌদ্ধ, জৈন , পারসিক, খ্রীস্টান সব্বাই সংখ্যালঘু। এদের ধর্মেও একমাস টানা না হলেও উপোস ব্যাপারটা রয়েছে।

তা, দিদিমণি এদের উপোসের সময় স্পেশাল প্যাকেট দেবেন না?

সংখ্যাগুরু হিন্দুদের মধ্যেও অনেকে নানাসময় নানাকারণে উপোস করে থাকেন। তারাই বা নিজেদের সময় এ সুবিধে থেকে বঞ্চিত হবেন ক্যানো?

তাহলে কি এই 'রমজান' প্যাকেট এর আসল উদ্দেশ্য নিতান্তই রাজনৈতিক? নিজেকে মুসলিম-প্রেমী বলে প্রমাণ করা?

সন্দেহ নেই, যে এই কাজে 'তিনি' বেশ সফল। জমিয়তও এখন বকলমে তৃণমূলের সমর্থক। তাদের সিদ্দিকুল্লা মন্ত্রীত্ব পেলেন, মৌলানারা ইমাম ভাতা পেলেন, বাকিরা মাদ্রাসা অনুমোদনের প্রতিশ্রুতি পেলেন, আর গরিব মুসলমান পেলেন 'রমজান' স্পেশাল প্যাকেট।

অতএব 'তিনি'ই বর্তমানে বাংলার মুসলমানেদের জান-মালের রক্ষাকর্তা, তাদের পরবরিশ করনে-ওয়ালা এবং খুদ-খেয়াল-মর্জি'র মালিক।

ব্যাস? গপ্পো শেষ?

দাঁড়ান সার, এট্টু খানি বাকি আছে।

আমি বা আপনি চাই বা না চাই, আমাদের এই রাজ্য এখন জামাত আর আরএসএস
এর পরীক্ষাগার হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা নিজেদের স্বার্থেই চাইছে যে হিন্দু ভোট আর মুসলমান ভোট এর মেরুকরণ হোক, যাতে তারা শক্তিশালী হয়ে বিষাক্ত ছোবল মারতে পারে।

এরা খুব সন্তর্পণে এগোচ্ছে। ধর্মের মাধ্যমে কাছে টানা, মগজ-ধোলাই আর অন্য সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে বিষ ঢালা-এটাই এদের কাজ। আমার কথা বিশ্বাস করার দরকার নেই। এই ফেবুতেই জামাত আর আরএসএস এর পেজগুলো দেখবেন সময় করে। দেখতে পাবেন অর্ধ-শিক্ষিত লোকেরা কিভাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিষ ছড়িয়ে যাচ্ছে, যাতে দাঙ্গা লাগে আর এদের শক্তি বাড়ে। যেকোনো রকম সংঘর্ষের ঘটনাকেই সাম্প্রদায়িক রূপ দেবার চেষ্টা চলছে।

শহর আর শহরতলি'র লোকেরা খেয়াল করে দেখবেন যে ধীরে ধীরে হিন্দু আর মুসলমান বসত আলাদা হচ্ছে। ধর্মের ভিত্তিতে ফ্ল্যাট বিক্রি হওয়া শুরু হয়েছে।

আজ হয়ত একটা হিন্দু বা মুসলমান খালি হিন্দু বা মুসলমানের মধ্যে বাস করে আপাত নিশ্চিন্তি বোধ করছে, কিন্তু একই সাথে হারাচ্ছে একে অপরকে চেনার সূযোগ।
এবং ভুলে যাবেন না, দাঙ্গা লাগলে কিন্তু শত্রু এলাকা বাছতেও সময় লাগবেনা।

অনেক কেই দেখি হিন্দু সন্ত্রাসবাদের অস্ত্বিত্ব স্বীকার করেননা। ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের আন্তর্জাতিক ব্যাপকতা অনেক বেশী। কিন্তু এদেশে হিন্দু সন্ত্রাসবাদও যথেষ্ট খারাপ চেহারা নিয়েছে।

এবং একটা বোকা যুক্তি দেওয়া হয় যে ইসলামিক সন্ত্রাসবাদের বিরোধিতায় হিন্দু সন্ত্রাসবাদের জন্ম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই কোনকালে লিখে গেছেন স্বদেশি আমলে জল খাবার জন্য হিন্দু প্রচারক তার মুসলমান সহযোগীকে দাওয়া থেকে নেমে যেতে বলছেন।

তালিবান দেরও একসময় বিপদ হিসেবে না দেখে সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিপ্লব হিসেবে দেখা হয়েছিল। সৌজন্যে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র। তার ফলাফল এখনও ভোগ করছি। আরএসএস এর ক্ষেত্রেও একই ভুল করলে বিপদ আছে।

বাজে ক্লিশে বকা শেষ। যদি এতটা পড়ে থাকেন, তাহলে শেষটুকুও ভেবে দেখুন, এই 'রমজান' প্যাকেটের মাধ্যমে কি বিজেপি'কে হিন্দু ভোটের মেরুকরণ এর সূযোগটাই হাতে তুলে দেওয়া হল না? 'তিনি' কি প্রকারান্তে সেটাই চাইছেন?

গরিব মানুষ কে যদি সাহায্য করাটাই উদ্দেশ্য হয়ে থাকে তাহলে শুধু ইসলাম ধর্মটাই আসছে ক্যানো? বাকি ধর্ম গুলো কি দোষ করলো?

আর শুধু রমজান মাসই ক্যানো? সারা বছর সব বিপিএল তালিকাভুক্ত মানুষ কে এই স্পেশাল প্যাকেট দেওয়া হোক। এই দাবীটা উঠুক।

ইমাম ভাতা দেবার সময়ও একই প্রশ্ন ছিল। গরিব ইমাম রা ভাতা পেলেন। আমার বাড়ির পাশের কালীমন্দিরের গরিব পুরোহিত মশাই কি দোষ করেছিলেন? তারও তো সংসার চলে কোনোরকমে।

বিজেপি সেবারও এই ইস্যু তুলে ধর্মীয় মেরুকরণে সফল হয়েছিল। এই রমজান প্যাকেট নিয়েও তারা যথারীতি একই রকম প্রচারে নামবে।

ক্ষমতার মোহে 'তিনি' নাহয় ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণের মাধ্যমে আরএসএস আর জামাত কে প্রশ্রয় দিচ্ছেন, কিন্তু আমরা তো আর একই ভুল করতে পারিনা।

আসুন, আমরা প্রত্যেকটি শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ এই ধর্মীয় মেরুকরণ ঘটাবার সুবিধেবাদী রাজনীতি'র বিরোধিতা করি।

খুব দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই...

বৃহস্পতিবার, ২৬ মে, ২০১৬

অনাগত শহিদের মা ~ মন্দাক্রান্তা সেন

(অর্পিতার জন্য )

কী  উন্মত্ত ক্রূর  ও হিংস্র গর্বে
ওরা লাথি মারে মায়ের আর্ত  গর্ভে

আর্ত ? নয় তো ! সম্ভাবনার ছিল ভ্রূণ
পিশাচেরা তাকে ভয় পেয়েছিল নিদারুন

যদি সেই ভ্রূণ জন্মেই হয় যোদ্ধা !
মানুষের  মতো যদি গড়ে ওঠে বোধ তার

যদি বেড়ে ওঠে ক্রমাগত তার মান হুশ
অঙ্কুর হয়ে ওঠে যদি তার অঙ্কুশ ?

তাই ওরা ভয় পেয়ে গেছে অনাগতকে
দেশ ভরে গেছে নৃশংস যত ঘাতকে

কিন্তু শতেক মায়ের লুকোনো গর্ভ
সম্ভাবনাকে করেনি বন্ধু খর্ব

জন্ম নিচ্ছে লড়াকু হাজারো সন্তান
জন্মেই তার শিরদাড়া এত টানটান

আমরা বাচছি  তাদের গভীর আশাতে
জন্মেই তার চিত্কারে, তার ভাষাতে

শুনছি আমরা ভবিষ্যতের আহ্বান
শুনছি আমরা শেকল ভাঙ্গার সেই গান

জন্মাও ওহে অনাগত , তোর  জন্য
ওগো  মা, কাতর, --- তাহলেও তুমি ধন্য

জন্মের আগে শহীদ হয়েছে যে জাতক
তার সংগ্রামে পিশাচেরা হবে পলাতক

ওরে হানাদার, দেশ থেকে তোকে তাড়াতে
মায়ের গর্ভ জেগে আছে রুখে দাড়াতে

বুধবার, ২৫ মে, ২০১৬

আমি ও সবে নেই ~ শতরূপা সান্যাল

ওরা মার খেলে আমার কি আসে যায় ?
আমি তো দিব্যি আছি নিরাপদ ঘরে।
যারা মার দেয়, তাদের সেলাম করি
পাছে ওরা এসে এখানে ঝাঁপিয়ে পড়ে !
চাবুক খাবার আগেই কুঁকড়ে আছি !
ডাকাত পড়লে খুলে দিই সিন্দুক !
আমি নিতান্ত গোবেচারা ভালো লোক,
ক্ষমতার পাশে থাকতেই উৎসুক !
যে সব বোকারা প্রতিরোধ গড়ে তোলে
মার খায় ঘরে বাইরে হাতে ও ভাতে
পুলিশও নেয়না যাদের এফ আই আর-
আমি বাপু নেই সেই সব ঝামেলাতে !
পাশের বাড়িতে আগুন লাগালে ওরা
আমি নিশ্চিত , আমি ঠিক বেঁচে যাব
আমি যে আসলে ওদেরই দলের লোক
এমন একটা নিরীহ ভাব দেখাব !
প্লেট মুছে দেব, মোটা টাকা চাঁদা দেব
দুই হাত তুলে নাচব ওদের সাথে
ওদের ভাষাকে বলব-অমৃত বাণী
এভাবে থাকব বাঙালির মাছে-ভাতে !
অনেকে ভাবছ, আমি শিরদাঁড়া হীন
মনে মনে পুষে রাখছ তীব্র ঘৃণা
আমার ওসবে কিছু যাবে আসবেনা-
মেরুদণ্ডের ঠিকানাই তো জানিনা !!

বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০১৬

বোদ্ধাদেবের নির্বুদ্ধিতা ও একটি টকটকে লাল স্টেগোসরাসের অপমৃত্যু ~ অভিজিৎ মুখোপাধ্যায়

হাজার হাজার বছর আগে যখন পৃথিবী অন্য রকম ভূগোল নিয়ে অবস্থান করতো - ঠিক তখনকার কাহিনী এটি। সেই প্রাগৈতিহাসিক দুনিয়ায় এক উপমহাদেশ ছিল যার নাম ছিল রংবং। সেখানে দানবাকৃতি সবুজ গাছপালার মধ্যে বিচরণ করতো নানা রকম ডাইনোসর, আর তাদের বিবর্তনও সাথে সাথে ঘটে চলেছিল। এটি একটি অসাধারণ স্টেগোসরাসের গল্প যার নাম ছিল লালু। কেন মশাই, কুকুর, বেড়াল, বাঁদরের নাম থাকতে পারে, আর স্টেগোসরাসের নাম থাকতে পারে না? প্রথমে স্টেগো নাম দেব ভেবেছিলাম, কিন্তু স্টেথো-স্টেথো শুনতে লাগছিল আর গা গোলাচ্ছিল বলে লালু নামটাই রাখলাম। এই নামের পেছনে আরো একটা কারণ আছে, বলছি দাঁড়ান...
এখন মনে হতেই পারে এই স্টেগোসরাস অসাধারণ কিসের? প্রথমতঃ, সে ছিল টকটকে লাল, ঠিক ধরেছেন - লালু নামটা এই জন্যেও মানানসই। দ্বিতীয়তঃ, তার স্বভাবটি ছিল খুবই পরোপকারী - সে নিজে শাকপাতা খেয়ে থাকত, আর আশেপাশের অন্যান্য জন্তুজানোয়ার যারা শাকপাতা খেত (যেমন ম্যামথ, ব্রকিওসরাস ইত্যাদি) তাদের রাতের বেলা পাহারা দিত। কেউ বলে নি লালুকে, কিন্তু লালু তাও পাহারা দিত, সবাই শান্তিতে আর নিরাপত্তায় থাকলে তার লম্বা প্লেট-লাগানো ল্যাজটা তিড়িংতিড়িং করে লাফাত, সেটা লালুর খুব ভালো লাগত। তাই সে পাহারা দিত, আর সবাইকে নিরাপদ রাখত।
তৃতীয়তঃ, তার একটা গভীর সংবেদনশীল মনও ছিল, ছোট জানোয়ার, কীটপতঙ্গদের সে খাওয়াত জল থেকে শ্যাওলা আর আরো কি সব হাবিজাবি উদ্ভিদ তুলে এনে। এই ভাবে বেশ চলছিল, প্রায় ২৫-৩০ বছর লালু রংবং-এর প্রাণী ও উদ্ভিদকুলকে সুখে শান্তিতে রেখেছিল, ফলে সবাই তাকে ভালবাসত, আর আদর করে লাল সেলাম ঠুকত।
ইতিমধ্যে রংবং-এ এসে হাজির হল একগাদা টেরোডাকটিল। তারা আকাশ থেকে এসে চোখের সামনে যাকে পেত তুলে নিয়ে গিয়ে খেয়ে ফেলত আর খাওয়ার পরে বিষাক্ত বিষ্ঠা ত্যাগ করে যেত রংবং-এর জঙ্গলে। অতিষ্ঠ হয়ে বাকিরা সবাই লালুকে বললো - "তোর তো প্রচুর গায়ের জোর, যা না গিয়ে এই আপদগুলোকে বিদেয় করে আয়।"
সব শুনে লালু চড়তে আরম্ভ করল সেই পাহাড়ের গা বেয়ে যার ওপরে টেরোডাকটিলের দল থাকত। হতভাগারা আবার নিজেদের নাম দিয়েছিল "মুক্ত বিহঙ্গ" আর পাহাড়টাকে বলতো "কং ফ্রেশ" কারণ পাহাড়ের গুহায় ফ্রেশ কিং কং পাওয়া যেত। এখন রাগে আরো লাল হয়ে গিয়ে লালু পাহাড় চড়তে লাগল। চূড়ার কাছাকাছি পৌঁছে লালু দেখত পেল মুক্ত বিহঙ্গদের দলপতি মোহন বিহঙ্গকে। মারামারি করবে বলে যেই না এগিয়ে গেল সাথে সাথে মোহন বিহঙ্গ ততোধিক মোহন স্বরে লালুকে বলল - "এসো, এসো বোদ্ধা, তোমার জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম।" অবাক লালু পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল, মোহন বলে উঠল - "তোমাকে আমরা সবাই চিনি বোদ্ধা হিসেবে, তুমি আমাদেরও রাজা হতে পারো।"
অবাক লালু বলে - "কিভাবে?" মোহন বললো - "গুটিকতক শর্ত আছে, আর একটা সহজ পরীক্ষা দিতে হবে।" লালু - "তা সে শর্তগুলোই না হয় আগে শুনি।" মনমোহিনী হাসি হেসে মোহন - "এক - তোমাকে ওই নীচের জঙ্গলের হতভাগা জন্তু জানোয়ার কীট পতঙ্গগুলোকে ত্যাগ করতে হবে; দুই - ওদের আমরা যাতে সহজেই টপাটপ গিলে খেয়ে ফেলতে পারি সেই জন্যে তোমাকে সাহায্য করতে হবে, তুমি রোজ সন্ধ্যেবেলা ওদের পশুসভা, নির্বাচন বা কিছু একটা বলে নদীর ধারে ডেকে নিয়ে আসবে, বাকিটা আমরা বুঝে নেব; তিন - কেউ যদি কোন প্রশ্ন করে তাহলে তুমি বলবে - "বিপ্লব নামের এক মোহিনী সাতরঙ্গা পাখী আসবে, আর সে আমাদের খাওয়া, দাওয়া, থাকার সব দুঃখকষ্ট ভুলিয়ে দেবে।" তারপরেও যদি কোন বেয়াদব ঝামেলা করে তাকে কান ধরে জঙ্গলের বাইরে বার করে দিয়ে আসবে। এইভাবে পাঁচ বছর চালাও, তারপরে তোমাকে একটা ছোট পরীক্ষা দিতে হবে। তারপরেই তোমার নামে এই পাহাড়কে আমরা লালপাহাড় বলে ডাকব, তুমি হবে আমাদের অবিসংবাদী দেবতা, তোমার নতুন নাম হবে বোদ্ধাদেব। রাজী আছো?"
লালুর শক্ত প্লেটলাগানো ল্যাজটা একেবারে ঝোড়ো হাওয়ায় পাতা নড়ার মত দুলতে লাগল আনন্দে। লালু বুঝতে পারল ডাইনোসর কুলে তার নাম অমর হয়ে যেতে চলেছে। সে মুক্ত মোহন বিহঙ্গর কথামত চলতে লাগল, জঙ্গলের জানোয়ার শেষ হয়ে যেতে লাগল, টেরোডাকটিলদের বিষ্ঠায় গোটা রংবং দূষিত হয়ে গেল, আর লালুর সঙ্গীসাথীরা সব তাকে ছেড়ে চলে গেল অন্য জঙ্গল খুঁজতে। কিন্তু লালুর মাথার ভূত নামল না, তাকে যে বোদ্ধাদেব হতে হবে!
পাঁচটা বছর কেটে গেল, লালু কথা রাখল, লালু মোহনের ইশারায় সব কাজ করে খুশী করে দিল আর গভীর মমতায় মোহন বিহঙ্গ রংবং-কে প্রায় শ্মশানে পরিণত করে দিল। ঠিক পাঁচ বছর শেষ হওয়ার পরে লালু গেল মোহনের কাছে, বলল - "মোহন, আমি আর পারছি না, এবারে কি পরীক্ষা দিতে হবে বল, আমাকে বোদ্ধাদেব হতেই হবে।" মোহন বলল - "খুব সহজ, আমরা যে রকম এই পাহাড়ের ওপর থেকে ডানা মেলে উড়ে যাই, তোমাকেও সেটা শিখে ফেলতে হবে, তুমি অর্ধেক দেব হয়েই গেছ, এটা শিখে নিলেই বোদ্ধাদেব, আগামীকাল এসো, তোমাকে শিখিয়ে দেব।"
মনের আনন্দে দ্বিগুণ জোরে ল্যাজ নাড়তে নাড়তে লালু রংবং-এ ফিরলো আর তার মাকে বলল সব কথা, মা অনেক চেষ্টা করল লালুকে বোঝানোর যে স্টেগোরা উড়তে পারে না, প্রকৃতি তাদের সে ক্ষমতা দেয় নি, কিন্তু লালু মানল না। লালুর বন্ধুদেরও মুক্ত বিহঙ্গেরা একে একে খেয়ে নিয়েছে এর মধ্যে, ফলে তাকে বোঝানোর আর কেউই নেই রংবং-এ। সকাল হতেই লালু উঠে গেল পাহাড়ের মাথায়, সেখানে মোহন অপেক্ষা করছিল তার জন্যে, যেতেই তাকে নিয়ে চলে গেল পাহাড়চূড়োর ধারে। সেখানে নিয়ে গিয়ে বলল - "কোন ব্যাপার নয়, লাফিয়ে পড়ো, গা ভাসিয়ে দাও, একটু বাদেই দেখবে তুমি উড়ছো, আর তারপরেই তুমি বোদ্ধাদেব।" লালু লাফিয়ে পড়ল, গা ভাসিয়ে দিল...
..............................................................
(এই গল্পের সাথে যারা আজকের রংবং নির্বাচন ফলাফলের মিল খুঁজে পাচ্ছেন - তাদের অনুরোধ আজকের মাথামোটা লালুদের কং ফ্রেশ পাহাড় থেকে নামিয়ে নিয়ে আসুন বুঝিয়ে সুঝিয়ে, নয়তো তারাও কিন্তু ডাইনোসরদের মত প্রাগৈতিহাসিক হয়ে যাবে একের পর এক লাফ মেরে মেরে)

বুধবার, ১৮ মে, ২০১৬

চল রাস্তায় ~ অমিতাভ প্রামাণিক

​​চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড, এই ভোট-টোট সব থামলে
আহা, ডিমফ্রাই কত সুন্দর যবে লোক কয় তারে মামলেট।
ক্যানে চা'র জল, প্যানে ছ্যাঁকছোঁক, ভুলে টেটে ফেল, নাকি পাশটি
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড...

ভুখা পথঘাট, পাড়া নির্জন, চেনা দাদা যায় অটোরিকশ'য়,
মুখে যা কিছু বলুক সবলোক, পেটে প'লে তবে কিনা পিঠে সয়!
শুধু গুড় জল খেয়ে চলে বল? শুধু পিছনে আছোলা বাঁশটি -
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড ...

পোষা কুকুরের মত ঘেউঘেউ, যারা সন্ধ্যেয় নিতো হপ্তা
তারা কবে হলো এত ঝিনচ্যাক, চড়ে জেটপ্লেন-হেলিকপ্টার!
কেউ ঝরে গিয়ে ফের ফিরে চায়, কেউ হাসপাতালেই থার্স্টি!
চল হৈ হৈ করে খুলি চল গিয়ে তেলেভাজা ইন্ডাস্টি।
চল রাস্তায়, খুলি রোডসাইড ...

শনিবার, ১৪ মে, ২০১৬

তোর নামতা ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

তুই এক্কে তুই, তুই দু'গুনে কার?
ফাগুন বুকেই আগুন জ্বালাস, এস্পার ওস্পার!
তুই তিরিক্ষে হোস, তুই চারে সন্তোষ,
মরশুমি তোর মনের খবর জানতে চাওয়াও দোষ।
পাঁচ তুইয়ে তুই আলো, ছটায় তাই জানালো,
তুই হলি ভোর, আলতো আদর, শিহরণ জমকালো
তুই সাত্তেই থাক, আটকে আমায় রাখ,
তোর জিম্মায় জীবন চাবি, হাত ধরে সাতপাক!
তুই নাহলেই নয়, দশা কেমন হয়,
ভাবতেও পারছিনা, সোনা, স্বপ্নেও পাই ভয়!

বৃহস্পতিবার, ১২ মে, ২০১৬

(মিছিলের আগে) যে কবিতা লাল কাপড়ে লেখা হবে ~ সৌম্যজিৎ রজক

সুশীল খন্ড 
'বুদ্ধিজীবী'তে গিজগিজ করছে অডিটোরিয়াম। মঞ্চে হাত নাড়া চলছে। চলছে বক্তৃতা ও টীকাটিপ্পনী। 'বুদ্ধিজীবী'রা জানেন, শুধুমাত্র তাহাই পবিত্র যাহা ব্যক্তিগত। মানুষের ভিড় তাঁহাদের পক্ষে আন-হাইজেনিক। ব্রিগেড ক্ষতিকারক এবং হকার ভর্তি ফুটপাথ 'নোংরা'। যদিও গ্রামের হাট 'বুদ্ধিজীবী'দের কাছে রোমান্টিসিজমের উপাদান। আর গ্রামের লোক 'সাইলেন্ট সাব-অল্টার্ণ'।
ওরা এমনটা যে ভাবেন সেটাও শ্রেণি-নিয়ন্ত্রিত। যতই লাফ-ঝাঁপ করুন; শেষ অব্দি মধ্যবিত্তের স্বভাবই তো এই। ছৌ-শিল্পী খুন হলে ওঁরা চুপ থাকবেন। খেতমজুরের জমি কেড়ে নিলে চুপ থাকবেন। শ্রমিকের অধিকার কেড়ে নিলেও রা কাড়বেন না। তবে শ্রমিক, খেতমজুর আর প্রান্তিক শিল্পীরা এসে নগর কলকাতার রাজপথ দখল করলেই ওঁরা চিৎকার করে উঠবেন; দোহাই দেবেন ট্রাফিক-জ্যামের। এঁদের পছন্দ-
                                             "ক্ষমতার আশেপাশে চক্কর, এবং সাংস্কৃতিক ফ্রন্ট"
                                                            (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ পাঁচ; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার)।
গরিব-গুরবো মেহনতি মানুষ মানেই বিপদ। তাই দূরে রাখো ওদের। 'বুদ্ধিজীবী'র নোটবই থেকে দূরে রাখো। কবিতার ব্যকরণ নিয়ে ভাবো,ভাবো ছন্দ-শিল্পরূপ নিয়ে। কবিতা থেকে দূরে রাখো মানুষকে। 'বুদ্ধিজীবী' তাই রায় দিয়েছেন বারেবারে, জীবনের জন্য নয়; শিল্প নিখাদ শিল্পেরই জন্য। দায়  নেই তার কোনও আর। জীবনের কাছে, ভবিষ্যের কাছে।

হার্মাদ খন্ড
অডিটোরিয়ামে ঢুকে পড়ল একটি ছেলে; ব্যাগে যার লালঝান্ডা, গায়ে মিছিল ফেরত ঘাম আর প্রত্যয়। সাথে সাথে ধিক্কার জানাল কলাকৈবল্যবাদীরা। রে রে করে উঠল।

আর যদি দেখা যায়, মিছিলেরই কথা লিখে ফেলেছে সে! তখন? তার কবিতা ছাপতে অস্বীকার করবেন মহান গণতান্ত্রিক প্রকাশক। 'কবি' – এই বিশেষণ তাহলে তার জন্য নয়। ছেলেটির জন্য বরাদ্দ থাকবে 'হার্মাদ' আর 'ক্যাডার' শব্দ দুটো। আমাদের এই কমরেডও, নিশ্চয়, এরকমই অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে গেছেন। তাই তো, প্রথম কবিতার বইতেই, তিনি লিখেছেন ...
"... মারুন, কাটুন আর কুচিকুচি করুন আমাকে, আমি এভাবেই শুরু করব লেখা। কবিতার ভার নিয়ে আমার সত্যি কোনও মাথাব্যথা নেই শ্বৈলেশ্বরদা, ওগুলা ছাড়ান দেন, মিডিলকেলাস আজো বাকি আছে চেনা?...
পারেন তো ক্ষ্যামা দিন। নাইবা বলুন 'কবি'।... যতক্ষণ তবু এই সি পি এম পার্টি রয়ে যাবে, কলম ঘষটানো আর যে কোনও কবিতা থেকে আমাকে নিবৃত্ত করা নিছকই অলীক। আমরা ক্যাডার, এটা জানেন নিশ্চয়।"
                                                                                                                   (উন্মোচিত চিঠি ; ভ্রমণকাহিনী)।
প্রসঙ্গত মনে রাখা জরুরি, বাজারের কাগজগুলো 'ক্যাডার' শব্দটি যেভাবেই ব্যবহার করুক; শব্দটার আসল মানেটি যারা জানেন তাদের কাছে কম্যুনিস্ট পার্টির ক্যাডার হওয়াটা গর্বের। আর কিছু নয়।

যাইহোক, 'বুদ্ধিজীবী' কোনও শ্রেণি নয় কখনই। প্রতিটি শ্রেণিরই কিছু বুদ্ধিজীবী থাকে। যেমন থাকে প্রতিটি শ্রেণির নিজস্ব পার্টি আর যোদ্ধা। আমাগো বাংলায় শ্রমিক শ্রেণির বুদ্ধিজীবীর সংখ্যাটা কোনও কালেই কম নয়; যারা এই শ্রেণির কথা বলেছেন, গান গেয়েছেন। আপোষহীনভাবেই। তবে এত রাগ, এত জোর, এত অভিমান জয়দেব বসুকে আলাদা করেই চেনায়। 'প্রতিহিংসা'র বৈধতা নিয়ে এত তীব্র সওয়াল এঁকেই মানায়। শ্রেণির প্রতি, শ্রেণির শক্তি – কম্যুনিস্ট পার্টির প্রতি, পার্টি-শৃঙ্খলার প্রতি গর্ববোধ ও ভালোবাসা বারেবারে ছলকে উঠেছে শব্দে, এঁর কবিতায়। নিজেকে 'ক্যাডার' বলে প্রকৃতই স্পর্ধিত হতেন তিনি। নাম আর পদবির মাঝে 'হার্মাদ' শব্দটা পুরে নিতে মজা পেতেন। আর ছিল হিম্মত; যার কিছুই নেই হারাবার তার যেরকমটা থাকে। নাহলে কবিতা লিখতে আসা কোনও তরুণ, এ বাংলাতেও, প্রথম কবিতা-বই উৎসর্গ করে 'ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী)'কে? তখনও কবি-সমালোচক-পাঠক মহলে নেই কোনও 'স্বীকৃতি' (পরে যেটা পেয়েছেন)! আপনি তো জানতেন, বাংলা কবিতার জগতে মধ্যবিত্ত বুদ্ধিজীবীর রাজনৈতিক বাচন মানে কী এবং সেটাই শেষ কথা! প্রথম বইয়ের 'উৎসর্গ পৃষ্ঠা'টাই যথেষ্ঠ কারণ হতে পারত আঁতুড় ঘরে আপনায় খতম করে দেওয়ার জন্য। তবু কী দুঃসাহস কমরেড!

শুনেছি, এস এফ আই-এর রাত জেগে অবস্থান ছিল সেদিন। সে রাতেই দুজন কমরেড দেখে ফেলেছিল ব্যাগের ভেতর একটা খাতা। খাতা খোলা হয়। পাওয়া যায় টাটকা নতুন কিছু কবিতা, যা এতদিন লুকিয়ে রাখতেন জয়দেব বসু। কাউকে জানাতেন না। খবর গেল রটে। কবিতাগুলোও, বোধহয়, মুখে মুখে গেল ছড়িয়ে! ব্যাস! আর কখনো সঙ্কোচ করেন নি। লজ্জা পান নি, কবিতা লেখেন বলে। ভয় পান নি, কবিতায় 'সমাজতন্ত্র' আর 'মিছিল' শব্দদুটো লিখে।

কবিতা লিখেছেন কমরেডদের সাথে 'রাতপাহারা'র অভিজ্ঞতা নিয়ে। লিখেছেন মধ্যবিত্তের স্বপ্নের আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চেহারার অ্যানাটমি-
"ওরা ডিজনিল্যান্ডে যায়
আরও নানাবিধ করে বায়না
ওরা পশুদের ভালবাসে
তবে, কালো লোকেদের চায়না
             ...
ওরা ভোট দেয় দুটি দলকে
ভোট নিয়মিত দিয়ে যায়
যারা সৌদিতে সেনা রাখে
রাখে দিয়েগো-গার্সিয়ায়
             ...
ওরা চাকরি রাখার চিন্তায়
কী করবে ভেবে পায়না
ওরা গণতন্ত্রও মানে
তবে, অন্যের দেশে চায়না"
                                                                                      (আপনি কি আদর্শ মার্কিন নাগরিক হতে চান? ; আলাদিন ও আশ্চর্য প্রদীপ)।
প্রেমের কবিতাও লিখেছেন। তবে সেসব কবিতা, ভুলেও, আরচিসের কার্ডে কোট করা হবে না কখনো –
" ... আমার তো মনে হয় কৃষক আন্দোলনে মেয়েটিরও সমর্থন আছে। তোমাকে বলেছে কিছু এ বিষয়ে? রোহিতাশ্ব, অকারণ তোমার এই পুচ্ছ নাচানো দেখে ব্রহ্মতালু জ্বলে যায়। সিরিয়াস হও ভাই। তুমি কি চালাবে কথা? বোলো, আমি কুঁড়ে তবু এখনো বাতিল নই। তেমন সময় এলে আশা করা যায় আমাকেও পুলিশ ধরবে। ভালো মেয়েদের তবু বিশ্বাস করতে নেই খুব। কম্বল ধোলাই খেয়ে আমি যদি কোনোদিন মুখ খুলে ফেলি, তখন আমায় ঘৃণা করবে তো? পারবে তো সে মেয়েটি, বিচ্ছেদ চাইবে তো? জেনে নিও রোহিতাশ্ব। সেই বুঝে বাড়িতে জানাব। "
                                                                                                                                                 (পূর্বরাগ ; ভ্রমণকাহিনী)।
অথবা, সেই লাইনটা যা মিছিলে স্লোগান দিতে দিতে এস এম এস করেছিল আমাদের আরেক কমরেড ...
                                                           " গঞ্জের নাম শ্রেণিসংগ্রাম, মেয়েটির নাম কু। "
                                                                                                                ( কু, ভ্রমণকাহিনী)।
কবিতা সম্বন্ধে প্রিতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকেও তছনছ করে করে গেছেন জয়দেব। কবিতার লাইন সাজানোর চিরাচরিত নিয়ম মানেন নি বহু-বহুবার। ইস্তেহার লেখার মতোই টানা গদ্যে (run on) কবিতা লিখেছেন অজস্র। জয়দেব বসুর এইরকমের কবিতাগুলো বাংলা কবিতার ইতিহাসে এক-একটা মাইলফলক এবং বিদ্রোহ। স্বতন্ত্র, নতুন যে কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন তিনি, তা আমাদের কবিতাকে কতটা অক্সিজেন দিয়েছে - সেকথা 'বিশুদ্ধ কবিতা' বা 'পবিত্র শিল্প'-এর মন্ত্র আওড়ানো বুদ্ধিজীবীরাও জানেন, নিশ্চয়। তাই কবি জয়দেব হার্মাদ বসুকে ওঁরাও অস্বীকার করতে পারেন  নি। পারেন নি বাতিল করে দিতে। উল্টে মেনে নিতে হয়েছে তাঁর শক্তি। শিল্পের জোরেই শিল্পের পরীক্ষাতেও তিনি জিতে গেছেন। উৎপল দত্ত, সলীল চৌধূরীর মতো।

মার্কসবাদীরা জানেন 'শিল্প'-এর সঙ্গে 'রাজনীতি'র বিরোধ নেই কোনও। বরং শিল্পের দাবি পূরণ না করলে, যতই বিপ্লবের কথা থাক, কবিতা-গান-ছবি সবই জায়গা পায় ডাস্টবিনে। এবং উল্টোটাও সত্যি। প্রতিক্রিয়ার প্রোপাগান্ডায় শিল্পসৌন্দর্য যতই সুচারু হোক, ইতিহাস তাকে বাতিল করবেই। জয়দেব বসু, তাই, লিখে যান "জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার''।
"এবার অন্যভাবে কবিতা বানানো যাক – এসো, লেখাপড়া করো,
কবিতা লেখার আগে দু'বছর পোস্টার সেঁটে নেওয়া ভালো,
কায়িক শ্রমের ফলে বিষয় মজবুত হয়- এবং, সমান ভালো
রান্না শেখা, জল তোলা, মানুষের কাছাকাছি থাকা।
পার্টি করার থেকে বিশল্যকরণী আর কিছু নেই কবির জীবনে, আমি
অভিজ্ঞতা থেকে এই পরামর্শ দিয়ে যেতে পারি।"  
                                                                                      (জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহারঃ এক; জনগণতান্ত্রিক কবিতার ইস্তেহার'')।
সাহিত্য মধ্যবিত্তদের জন্য নয়। কবিতা লেখা আয়েসের নয়, পরিশ্রমের কাজ। হ্যাঁ, কবিতা লেখা আসলে 'কাজ'। চাষ করার মতোই, বাড়ি বানানোর মতোই। অর্থাৎ, মানিক ব্যানার্জি যেমন বলতেন নিজেকে – 'কলম-পেষা মজুর'। তেমনই জয়দেব বসু।

আপোষহীনতাই মজুরের সহজাত মনোভাব। শ্রমিক-কবিরও। গণতন্ত্রের কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আপোষ নেই। নীতির প্রশ্নে মধ্যবর্তী কোনও রাস্তা নেই।

যাদের বিশ্বাস নেই তাঁরা পড়ে দেখুক।
আমরাও এই আগুন ঝলসানো সময়ে,আসুন, পড়ে ফেলি আরেকবার। জয়দেব বসুর কবিতা। পোস্টারে লেখার মতো নতুন কোনও লাইন, হয়ত, খুঁজে পেয়ে যাব।

বুধবার, ১১ মে, ২০১৬

আমার পাওয়া প্রথম প্রপোজাল ~ শ্রুতি গোস্বামী

আজকাল ফেব্রুয়ারি মাসে প্রেম দিবস থেকে শুরু করে ব্রেক আপ দিবস সবই পালন হচ্ছে, ফেসবুক এর দৌলতে কে কার প্রেমিকা কে কি কিনে দিল, কি খাওয়াল, কোথায় শোওয়ালো, কবার ভালবাসি বললো, সব ই জানা যাচ্ছে। যাকে বলে, প্রাইভেট বলে আর কিসসু রইল না। সবাই চায়, লোকে তার ব্যপার নিয়ে, সে পার্সোনাল হোক, কি পাব্লিক, ইন্টারেস্ট দেখাক। কি করলাম, সেটা আসল না। ছবি তুলে দেখালাম কিনা, সেটাই আসল হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা এই প্রেম আর বিচ্ছেদ এর মধ্যে আছে প্রপোজাল ডে। আমরা চিরকাল যেটা জানতাম, প্রপোজ মানে বিয়ের প্রস্তাব, সেটা এখন পালটে দাঁড়িয়েছে প্রেমের প্রস্তাব। তাই সই। আজকাল বিয়ে হবে কিনা সেই নিয়েই কেও আর শিয়র নয়। তা এমন ই এক প্রেমের প্রস্তাব নিয়ে আজকের লেখা।

তখন ক্লাস ফাইভ। সকালে কোনো রকমে স্কুল করে ফিরে খেয়ে দুপুর কাটতে না কাটতেই বাইরে খেলতে বেরিয়ে যেতাম। আমার সাথে প্রায়ই সবসময় থাকতো মণি, একই ক্লাস এ আমরা। বাকিরা সবাই পড়াশোনা করতো বলে দেরী তে বেরতো। আমাদের সেসবের বালাই নেই। দুপুর টা গল্পের বই পড়ে কাটিয়ে বিকেলে খেলা। সে কাট ফাটা রোদই হোক কি বৃষ্টি। আমরা জনা আটেক মেয়েরা খেলতাম। এক ই স্কুল, সামনের পেছনের পাড়া, বয়েস ও ওই এক দুবছরের এদিক ওদিক। আমাদের ওখানে দুজন ছেলে ছিল, দুজনের ই ডাক নাম রাণা। তা আমাদের বয়েসী যে ছিল তাকে আমরা ছোট রাণা আর আমাদের চেয়ে বয়েসে এক বছরের বড় যে ছিল,তাকে আমরা ডাকতাম বড় রাণা বলে। ছোট রাণা প্রায়ই আমাদের সাথে খেলতো, একা ছেলে। বড় রাণা বিকেলে সাইকেল চালিয়ে ঘুরে বেড়াত রাস্তায়, মাঝে মাঝে ছোট রাণা কে আওয়াজ দিত, আমাদের সাথে খেলছে বলে। ওর তাতে বয়েই যেত। তা সে দিনকে তখনো বাকিরা বেরয়নি, আমি আর মণি রাস্তায় হাঁটছিলাম,গল্প করছিলাম। দেখলাম বড় রাণা বেশ কয়েকবার সাইকেল নিয়ে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত করলো। কিছুক্ষণ পরে আমরা রাস্তায় হাঁটা বন্ধ করে আমাদের বাড়ির সামনে ছোট ফাঁকা জায়গা তে এসে দাঁড়িয়ে নিজেদের মধ্যে কথা বলছি। জায়গাটার পাশেই একটা সরু পিচ রাস্তা,তারপরে ড্রেন আর তারপরে বিশাল খেলার মাঠ। বিকেলে মাঠে কাছের এক ক্লাবের ছেলেগুলো ফুটবল খেলত। বহুবার বল এসে আমাদের গায়ে লেগেছে, আমরাও খেলছিলাম, রেগে মেগে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছি বল দূরের মেইন রাস্তায়। যাইহোক, বড় রাণা মেইন রাস্তা ছেড়ে এবারে বাড়ির সামনে পিচ রাস্তায় সাইকেল নিয়ে এসে দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকলো:" এই বান্টি শোন।" আমি আর মণি দুজনেই ঘুরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যপার।
" আমার তোর সাথে দরকারী কথা আছে। একটু এদিকে আয়।"
দুজনেই এগতে বলে: " মণি র আসার দরকার নেই। ওকে একটু যেতে বল।"
শুনেই মাথা গরম হয়ে গেল। মণিও ঝাঁঝিয়ে উঠলো:" কেন রে? ও আমার বন্ধু। তোর যা বলার আমাদের দুজনের সামনেই বলতে হবে। কি এমন বলবি যে আমি থাকতে পারবোনা?"
আমিও ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না। কি দরকার? তবে কি ও আমাদের সাথে খেলতে চায়, সেটা বলার জন্য ডাকছে? নাকি আমরা খেলার সময়ে ওকে মেইন রোড এ সাইকেল চালাতে বলি সেই নিয়ে? খেলার জায়গায় বহুবার ওর সাইকেল এ আমরা ধাক্কা খেয়েছি। সেই নিয়ে বেশ কয়েকবার রাগারাগি হয়েছে। তবে কি সেটা নিয়ে বলবে?
উপায় না দেখে রাণা বললো: " তোকে বলার ছিল যে তোকে আমি পছন্দ করি।"
আমি হাঁ করে চেয়ে রইলাম। বাপের জন্মে এরকম কথা শুনিনি। পছন্দ করে মানে? আমার সাইকেল টা চালাতে চায়? মনে পড়লো কিছুদিন আগে আমার নতুন বি এস এ এস এল আর দেখে রাণা বলেছিল সাইকেল টা ভাল।বলেছিলাম রেসিং সাইকেল, রেস করবি নাকি? মুখ ভেটকে বলেছিল আমি মেয়েদের সাথে রেস করিনা। জ্বলে গিয়েছিল, বলেছিলাম ছেলেদের সাথে তো পারবিনা,আমার সাথে চেষ্টা করে দেখ,আস্তে চালাবো। তাতে বেশ চটে গেছিল। তাহলে কি সাইকেলের লোভে এসব বলছে? নাকি পড়াশোনার ব্যাপারে কিছু বলতে চাইছে? কিন্তু ও আমার চেয়ে এক ক্লাস সিনিয়ার। স্কুল ও আলাদা। নাহ। সেটা কারণ নয়।এরকম বলার মানে কি? মাথায় কিছুই ঢুকছেনা।

মণি বুঝে গেছিল। ও হেসে মুখ বেঁকিয়ে বলে " হুঁহ পছন্দ করিস! আয়নায় নিজের মুখ টা দেখেছিস? সাইকেল চালাচ্ছিস তাই চালা। পাকামো মারিস না। প্রেম করার শখ হয়েছে! স্কুল এ কি এই সব শিখছিস নাকি! "

রাণা রেগে গেলে একটু তোতলাতো। বললো" তো তো তোকে বলেছি নয় দূ দূ দূরে যা নাহলে চুপ থাক। তুই কে?"

আমার মাথায় তখন ঢুকলো! আচ্ছা এই ব্যপার! চড়াৎ করে মাথাটা গরম হয়ে গেল। আমাকে পছন্দ করে? আমি কি সাইকেল না বই না জিনিস যে আমাকে পছন্দ করছে? সাহস তো কম না? আমাকে পছন্দ করার কারণ কি? আমাদের সাথে খেলে না বন্ধুত্ব নেই কিছুনা, মুখ উঠিয়ে বলতে চলে এল! এত সাহস!
" তোর যা বলার বলে ফেলেছিস? এবারে যা। চল মণি।"
এগতে যাব, রাণা সাইকেল নিয়ে আমার রাস্তা আটকে দাঁড়ালো।
" তোর উত্তর টা পেলাম না। তুই আমাকে পছন্দ করিস না করিসনা?"
মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। এত বড় আসস্পদ্দা! আবার রাস্তা আটকে দাঁড়িয়েছে! মুখ বেঁকিয়ে বললাম" তোকে পছন্দ করার মতন আছে টা কি? যা তো। বেকার সময় নষ্ট করাচ্ছিস।"
আবার এগতে যাব, আবার সাইকেল নিয়ে রাস্তা আটকালো।
" ভাল হচ্ছেনা রাণা। রাস্তা ছাড়বি? "
" না ছাড়লে কি করবি?"
" দেখবি কি করবো?"
" হ্যাঁ দেখা!"
ওমনি আমি রাণার সাইকেল টা দু হাতে চেপে ধরে ওকে সমেত ঠেলতে ঠেলতে রাস্তার পাশে মাঠের আগে ড্রেন টাতে নিয়ে গিয়ে একটা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলাম। ও বসে ছিল। টাল খেয়ে আদ্ধেক ড্রেন এ আদ্ধেক টা সাইকেল সমেত মাটিতে ঠেকে।
পেছনে মণির অট্টহাস্য।
হাত ঝেড়ে বললাম:" আর ফের যদি রাস্তা আটকাতে আসিস, এর পরে সাইকেল ভেঙে তোর মার কাছে দিয়ে আসবো। আর খবরদার আমাকে পছন্দ করতে আসবিনা।

রাণা তখনো ওই ভাবেই আদ্ধেক ড্রেন এ সাইকেল নিয়ে, হকচকিয়ে গেছে। কি করবে কি বলবে বুঝতে পারছেনা।
মণি শেষে যাওয়ার আগে বলে গেল: " নে এবার ড্রেন এ শুয়ে শুয়ে পছন্দ কর মেয়ে।"

তখন বুঝিনি, ওটা প্রোপোজাল ছিল। ওই বয়েসে এর চেয়ে বেশি ম্যাচিউরিটি ছিলনা। কি আর করা যাবে! তবে থাকলেও ছেলেটির কপালে যে দুর্ভোগ থাকতই, সে নিয়ে আজ ও সন্দেহ নেই।

সোমবার, ২ মে, ২০১৬

জোট নিয়ে এতো প্রশ্ন কীসের? ~ রাহুল পান্ডা

জোট নিয়ে এতো প্রশ্ন কীসের?

প্রফেট সুমন মানসিক ভারসাম্য খোয়াতে পারেন, শ্রীজাতকে চা খাওয়াতে পারেন কমল হাসান, রকস্টার রূপম সুর দিতে পারেন মমতার লিপে, তাহলে জোট হবে না কেন?

আপনি বলবেন ইতিহাসের প্রশ্নে, আদর্শ-এর প্রশ্নে।

হাসালেন মশাই।

ইতিহাস মানেই ঐতিহাসিক ভুল।

আর আদর্শ একটা তাত্ত্বিক ভালোলাগা মাত্র। শিক্ষিত লোকের ইনফ্যাচুয়েসান বলতে পারেন। কিন্তু তাকে ভালোবাসা ভাবলে ভুল হবে। আদতে যা দেখছেন তা স্থিতিশীলতার বোরখা মাত্র। পায়ের তলায় যদ্দিন মাটি আছে, তদ্দিন গোড়ালি গেঁথে বিস্তর বাতেলা দেওয়া যায়। কিন্তু একবার হড়কালে, আপনি এবং আপনার তত্ত্ব সবই বিক্রি আছে। দু গণ্ডা ফুটো কড়িতে তখন আপনাকে ওই আদর্শশুদ্ধ বাগবাজারে কিনে বন্দরে বেচে দেওয়া যায়।

আসলে সবই পেটের ধান্ধা। পেট থাকলে আপনি আছেন, না থাকলে আপনি নেই।

ঠিক যেকারণে এই মুহূর্তে আমার একমাত্র চাহিদা একটা চাকরি। চাকরি ছাড়া কোনকিছু নিয়েই আমি কনসার্নড নই। বিএড করে বসে রয়েছি, এম ফিলের খাতায় নাম লেখানো আছে, কিন্তু আমি খুশি নই। খুশি নই, কারণ আমি ইনসিকিওর্ড। ছাপোষা মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে, ইংরেজি জানি না, বাবা রিটায়ার্ড করে যাবেন আজ বাদে কাল। তখন কে বাঁচাবে আমাকে?
এই সরকার আমাকে চাকরি দেবে বলে আজ পাঁচ বছর ঘোরাচ্ছে। এসএসসি একবার, টেট একবার, সুপার টেট একবার, বিচিত্র ফ্যাকড়া তুলে বিচিত্রতর সমস্যা আমদানি করছে। শিক্ষামন্ত্রী টুকলি করে পিএইচডি করছেন এবং যে রেটে পার্থলীলা শুরু করেছেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছে পরীক্ষাটা তিনি করাবেন না।

তাহলে আমি যাবো কোথায়? আমার মতো আরও কয়েক লক্ষ ছেলে-মেয়ে তারা যাবে কোথায়? এই যে প্রতিবাদী, স্বাধীন তাত্ত্বিক বামবিরোধী বুদ্ধিজীবী, এর উত্তর আছে আপনাদের কাছে? নেই।

বামফ্রন্ট সরকার ৩৪ বছরে কী করেছে আমি জানি না। কিন্তু শেষ একদশক এসএসসি-টা ঠিকঠাক নিয়েছিল। নিপাট সাধারণ বাড়ির, মাঝারি মেধার হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে সেসময় চাকরি পেয়েছে। একটা সুনিশ্চিত ভরসা ছিল, আর কিছু না হোক এসএসসি আছে। সেই ভরসার জায়গাটা পরিকল্পিতভাবে এই সরকার নষ্ট করেছে। আর তার বদলে ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিয়েছে ভিক্ষান্ন। বেকার ভাতা, যুবশ্রী। কে চায় এসব?  ক্ষমতা থাকলে চাকরি দিন। নইলে ফুটুন।

সুতরাং জোটে ভোট না দেওয়া ছাড়া আমার উপায় কী দাদা? একটু বলবেন?

পুনশ্চ: সফদর হাসমী আর এসএসসি দুটো গোলাবেন না দাদা। প্রথমটা বিরিয়ানি, দ্বিতীয়টা ডালভাত। একটা লাক্সারি, একটা নেসেসিটি।

রবিবার, ১ মে, ২০১৬

শিল্প চাই কি চাই না ~ সুশোভন পাত্র

পশ্চিমবঙ্গে ২০১১'র বিধানসভা নির্বাচন চলছে। তখন একটা কলেজে অস্থায়ী পোস্টে শিক্ষকতা করি। ৬ দফায় নির্বাচন। তিনদফা ভোটগ্রহন হয়ে গেছে। ঠিক আজকের দিনে, মানে ১লা মে কলেজ খোলা। অবশ্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হঠাৎ রক্ত পতাকা উত্তোলন করে, ৮ ঘণ্টা কাজের দাবীতে শ্লোগান দিয়ে, শ্রমিক দরদী হওয়ার কোন যৌক্তিকতাও নেই। অগত্যা কলেজ গেলাম।
সেমিস্টারের শেষের দিক। ইন্টারনাল পরীক্ষার নাম্বার তোলা, ট্যাবুলেশন, স্যাম্পল কোশ্চেন পেপার রেডি  আর সাথে কিছু প্র্যাক্টিক্যাল পরীক্ষা। বছরভর, 'ফর্মাল ল্যাঙ্গুয়েজ অ্যান্ড অটোমাটা' নামক অত্যন্ত ভজকট সাবজেক্ট থিয়োরিতে পড়ানোর দরুন এইচ.ও.ডি আমার উপর সদয় হয়েই প্র্যাক্টিক্যালের আপাত সহজ ক্লাস লোড ব্যাল্যান্স করেছিলেন। মাইক্রোবাইলোজি ডিপার্টমেন্টের ডেটা স্ট্রাকচারের ল্যাব। সিলেবাসও তুলনামূলক ভাবে ছোট এবং সহজ। 
তা সেদিন ওদের পরীক্ষা। ভাইবা নিতে গেলাম, সঙ্গে জাহির দা। ওদের আবদার, ভাইবাতে কোর্সের প্রশ্ন ছাড়াও ওদের পছন্দের একটা বিষয়ে, আমাদের পছন্দের একটা প্রশ্ন করতেই হবে। প্রত্যেক কে। ওদের পছন্দের বিষয় সাধারণত, ক্রিকেট, সিনেমা, কম্পিউটার গেমস কিম্বা ফুটবল। আউট অফ দি ব্লু এক ছাত্র বলল "স্যার, পছন্দের বিষয়ঃ রাজনীতি।" আমি আর জাহির দা একে অপরের দিকে তাকালাম। কথায় কথায় নির্বাচনের কথা উঠতেই ওকে জিজ্ঞাসা করলাম, "তোর কোন কনস্টিটুয়েন্সি রে?"
-"যাদবপুর, স্যার"। জাহির দা বলল, "তাহলে তো মুখ্যমন্ত্রীর কেন্দ্র। ভোট তো হয়ে গেছে"। ছেলেটা সদম্ভে, নিজের তর্জনী আমাদের দিকে তুলে, ভোটের কালি দেখিয়ে বলল, "এক্স মুখ্যমন্ত্রী। সেই ব্যবস্থাই করে এসেছি। উই হ্যাভ ভোটেড হিম আউট।" ১৩'ই মে আরও অনেকের সাথে আমার ছাত্রেরও স্বপ্নপূরণ করেছিলো। যাদবপুরে হেরেই গিয়েছিলেন বুদ্ধবাবু। হয়ে গিয়েছিলেন 'এক্স'ও।
কলেজ ছেড়ে নতুন চাকরিতে জয়েন তার পরেপরেই। বেশ যোগাযোগ ছিল অনেকর সঙ্গেই, এই ছাত্রর সঙ্গেও। খবর পাই তারাও কর্মজীবন শুরু করেছে। আর আমারও বেড়েছে অন্য লায়াবিলিটিস। ফলে যোগাযোগটা ক্রমশ ক্ষীয়মাণ হলেও, এখন 'স্যার' থেকে 'দাদা' ডাকেই আমরা উভয়পক্ষ বেশী স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। এই সবকিছুর মধ্যেই, সময়ের নিয়মে কাল যাদবপুরে আবার একটা ভোট হয়ে গেলো। আগের বারের থেকে শীতলে, নীরবে আর ফ্ল্যাশ লাইটের আড়ালে। কাল সন্ধেবেলা মোবাইলে একটা অজ্ঞাত পরিচয় নাম্বারের ফোন তুলে চমকে গেলাম। সেই ছাত্রই ফোন করেছে। বেশ কিছুদিন পর। বলল "আগের বারের ভুলের ক্ষমা হবে কিনা জানিনা। কিন্তু এবার তার প্রায়শ্চিত্ত অবশ্যই করলাম। এটা জানাতেই ফোন করেছিলাম, দাদা।"
১১'র নির্বাচনী ফলাফলের পর বুদ্ধবাবু বেশ কিছুদিন চলে গিয়েছিলেন অন্তরালে। প্রকাশ্য কর্মসূচী করতেনই না। তারপর দীর্ঘদিন পর ফিরে এসে চণ্ডীপুরের এক জনসভায় বলেছিলেন "শিল্প ছাড়া রাজ্য এগোতে পারে না। আজ হোক বা কাল রাজ্যের মানুষ কে এই প্রশ্নের উত্তর দিতেই হবে যে, শিল্প চাই কি চাই না।" 
ঐ ছাত্র ১৩'তেই ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে এখনও বেকার। ভিনরাজ্যে চাকরি হয়, কিন্তু পছন্দের হয় না। না, ১৩'ই মে বুদ্ধবাবু জিতলেই বা বামফ্রন্ট ক্ষমতায় এলেই সে সহ বাংলা ১ কোটি বেকারের চাকরি হতই এমন 'মমতাময়ী' দাবী আমার নেই। হয়ত এই ১৯'শে মে তার 'ভুলের' 'প্রায়শ্চিত্ত' করবে হয়ত করবে না। নির্বাচনের অমোঘ নিয়মে হয়ত তার এবারও স্বপ্নপূরণ হবে হয়ত হবে না। কোনও দল হারবে। কেউ জিতবে। শুরু হবে পোস্টমর্টেম। কিন্তু এই পাঁচবছর সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষকে অভিজ্ঞতা দিয়ে ভাত আর বিরিয়ানির পার্থক্য করতে শিখিয়ে যাচ্ছে। টাটা-সালিম-সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-জমি অধিগ্রহণ এসব বিষয়ে আপনি বুদ্ধবাবু, তাঁর পার্টির বিরোধিতা করতেই পারেন। 'আমরা ২৩৬ ওঁরা ৩৬'র মিডিয়া রচিত গল্পে ঔদ্ধত্য'র মহাভারত আপনি লিখতেই পারেন, বুদ্ধবাবু একের পর এক 'ভুল স্বীকারে' পার্টির মধ্যেও বিরাগভাজন হওয়াতে, সেই আপনিই মশকরা করতে পারেন, 'দুর্বলতা' খুঁজতে পারেন, 'ড্যামেজ কন্ট্রোলের অপচেষ্টা' বলে উড়িয়ে দিয়ে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর পুলিশ কে 'চাবকানোর' ধমকি তে বীরত্ব আর শালীনতাও খুঁজে নিতে পারেন। কিন্তু কি আশ্চর্য দেখুন, এখনও, এবারও, নির্বাচনে ঐ ছাত্রের মত আপনিও ঐ বুড়োটারই প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছেন। 'শিল্প চাই কি চাই না'? 'সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম-শালবনীর' কারখানা থেকে ধোঁয়া উড়বে না গরু চরবে? চপ-তেলেভাজা শিল্প হবে না উইপ্রো আই.বি.এম ন্যানো বেরোবে? রাজ্যের হাজার শিক্ষিত যুবকরা চাকরি করবে না বেকারই থাকবে? আসলে এই প্রশ্নের উত্তর আপনাকে দিতেই হবে। আজ কিম্বা কাল। বিকস, ২০১১ কিম্বা ২০১৬। দি কোশ্চেন রিমেনস সেম...

শুক্রবার, ২৯ এপ্রিল, ২০১৬

বৃষ্টির পূর্বাভাষ ~ দীপাঞ্জন গুহ

সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তাঁর অননুকরণীয় বাচনভঙ্গিতে কারুর সম্পর্কে বলেছিলেন যে সে কী করে বলবে, তার তো কোলে ছেলে? প্রসঙ্গ ছিল কোনো একটা বিষয়ে প্রতিবাদ করা যে ব্যাপারে উদ্দিষ্ট ব্যক্তি অপারগ কারণ তার কোনো একটা নাছোড় পিছুটান বা ভালনারেবিলিটি আছে |  "কোলে ছেলে" ছিল চূড়ান্ত ব্যক্তিগত পিছুটানের প্রতীক |

বাংলার চলতি বিধানসভা ভোট এই সাধারণভাবে সত্যি অসাধারণ অবলোকনটিকে মিথ্যা প্রমাণিত করেছে |

সেদিন হালিশহরে একটি সাড়ে তিন বছরের বাচ্চা মেয়েকে লাঠি দিয়ে পেটায় শাসক দলের গুণ্ডারা! কারণ বাচ্চাটির পরিবারে বিরোধী সমর্থক আছে! অবাক হবেননা না বন্ধুগণ, কারণ গতকালই ভাঙরে একটি দশ বছরের বাচ্চাকে বেধড়ক পিটিয়ে ক্ষেতের মধ্যে ফেলে দেওয়া হয়েছিল কারণ সেই নাকি শাসক দলের "পোস্টার ছিঁড়েছে" |

অবাক হন এর পরের খবরটিতে  | হালিশহরের ওই বাচ্চাটির মা গুণ্ডাদের হুমকি উপেক্ষা করে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে গিয়ে ভোট দিয়ে এসেছেন!

বাংলায় এখন রাজনৈতিক তর্কের কোনো পরিসর নেই, যেটা আমাদের এই কদিন আগেও ছিল | যেমন ধরুন কৃষিজমিতে শিল্প হওয়া উচিত কিনা; হলে জীবিকা-হারাদের কী হবে, না হলে জমি আসবে কোথা থেকে, সেজ হওয়া কাম্য কিনা, হলে কী শর্তে, ভর্তুকি দেওয়া ঠিক কী না, ইত্যাদি | এই ধরনের প্রশ্নের এখন কোনো পরিসর নেই কারণ রাজনীতির মঞ্চ দখল করেছে গুন্ডা আর চোরাকারবারীরা, যে চোরাকারবার শুরু হয়েছিল ভুয়ো ডকটরেট ডিগ্রি দিয়ে আর সারদা নারদ পেরিয়ে প্রতিদিনের ব্যবসার সর্বশেষ নিদর্শন জাল ছবি দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন, কৃতিত্বে শাসক দলের সাংসদ ! বালি মাফিয়া, কয়লা মাফিয়া, সিন্ডিকেট মাফিয়া, ওয়াগন-ব্রেকার তো ছেড়েই দিলাম | এদের হাত থেকে মুক্তি এবং ন্যুনতম গণতন্ত্রের আশাই (যাতে কার্টুন ফরওয়ার্ড করে আর সারের দাম বাড়ছে কেন জিজ্ঞেস করে অন্তত জেলে যেতে না হয়) এখন মূল ইস্যু, তাই রাজনৈতিক প্রশ্ন আপাতত তোলা আছে | এমনকি একদম হালের প্রশ্নও হালে খুব একটা পানি পাচ্ছেনা, যথা বহু কষ্টে প্রতিষ্ঠিত কমিশনগুলোকে, স্কুল সার্ভিস কলেজ সার্ভিস পাবলিক সার্ভিস, প্রায় তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা হলো কার স্বার্থে, পঞ্চায়েতের অধিকার প্রশাসন দিয়ে খর্ব করা হচ্ছে কেন, শিল্পের ব্যাপারে রাজ্যের জমি নীতিটা ঠিক কী, চা-বাগানের জীবন-মরণ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান কী, চাষীরা দাম পাচ্ছেন না কেন, ডোল-পলিটিক্সকে আদৌ কোনো উন্নয়ন বলা যায় কিনা, ইত্যাদি |

এই খরতাপ, লু-বওয়া বৈশাখের বাংলায় আপাতত এই প্রশ্নগুলো তোলা আছে | কারণ চোখের সামনে দেখা যাচ্ছে ঘুষ খাওয়া, প্রধান শিক্ষিকাকে যোগ ছোঁড়া, পুলিশকে চর মারা, ক্রমাগত প্রকাশ্য সভায় বিবিধ হুমকি দিয়ে চলা নেতারা কলার তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে | দেখা যাচ্ছে শুধুমাত্র বিরোধী পোলিং এজেন্ট হওয়ার "অপরাধে" খুন হলেন তিনজন, ক্রমাগত হামলা অব্যাহত | আর শেষ অবধি দেখা গেল যে দুটি শিশুকে আক্রমণ করলো ঠ্যাঙ্গারেরা |

গল্পটা এখানেই শেষ করার ইচ্ছা ছিল শাসকের | কিন্তু হলো কই! 

সাড়ে তিন বছরের মেয়ে মার খাওয়ার পর তাকে কোলে নিয়ে ভোট দিলেন হালিশহরের দেবশ্রী ঘোষ, শুধুমাত্র ভোট দিতে যাওয়ার "অপরাধে" দুর্বৃত্তরা দুটো হাত লাঠি দিয়ে মেরে ভেঙে দেওয়ার পর আরো জেদ নিয়ে ভোট দিলেন গয়েশপুরের পলিটেকনিক শিক্ষক শিবু দাস ও তাঁর স্ত্রী টুলটুল দাস, ছমাস আগের অজস্র দুর্বৃত্তের রক্তচোখকে জবাব দিতে ভোর থেকে লাইন দিয়ে ভোট দিলেন বিধাননগরের বাসিন্দারা, কাল তিরিশ তারিখ ওই ভাঙরের মার খাওয়া দশ বছরের শিশুটির পরিবারও হয়ত ভোট দেবে |

অসংখ্য বুথ দখল, ভয় দেখানো, ছাপ্পা চলছে | কিন্তু প্রতিরোধও চলছে | এই নির্বাচনের এটাই প্রধান পাওনা, ফল যাই হোক |

গ্রীষ্ম প্রচন্ড | কিন্তু বৃষ্টির পূর্বাভাষ আছে!

রবিবার, ২৪ এপ্রিল, ২০১৬

মা মাটির উন্নয়ন ~ মাহফুজ আলম

মাননীয় অভিরূপ সরকার সমীপেষু,

আপনি গত তেইশ তারিখে আনন্দবাজার পত্রিকাতে ক্যানো মা-মাটি'র সরকার সরকারী কর্মচারীদের ডিএ দিচ্ছেনা সেইটে বোঝাতে গিয়ে কিছু যুক্তি দিয়েছেন আর লাস্টে কয়েছেন যে আগের সরকার নাকি প্রছন্নভাবে মধ্যবিত্তের পক্ষে ছিল এবং আপনারা খোলাখুলিভাবে গরিবের পক্ষে। গোটাটা পড়ে সেই গরিবের ভাষাতে আপনাকে কটা মন ভালো করা রেজ্জাকীয় সাব-অল্টার্ন ফ্রিডম অফ এক্সপ্রেসনের নমুনা দিতে যারপরনাই ইচ্ছে করছিল। দিচ্ছিনা, কারণ আপনি একে 'সুশীল', তার উপরে 'বুদ্ধিজীবি' এবং সর্বোপরি পে কমিশনের চেয়ারম্যান (যদিও লেখাটা পড়ে বোঝা গেছে যে সরকারে এলে আপনি ডিএ দেওয়ার নামে কাঁচকলা দেখাবেন)।

আপনি অর্থনীতি'র পন্ডিত লোক, আপনার ডিগ্রি ইস্ট জর্জিয়া থেকে আসেন নি, আপনার পিএইচডি টাও যাদবপুরের কি নর্থবেঙ্গলের কেউ টুকে দেন নি- এতদূর নিয়ে আমাদের কারুরই কোনো দ্বিমত নেই।

এখন রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো নয়, সুতরাং কেন্দ্রীয় হারে ডিএ দেওয়া সম্ভব নয়, অ্যাদ্দূর সব্বাই জানি। এইটে বকার জন্য আপনার জ্ঞান দেওয়াটা জরুরী নয়। এট্টু সমস্যা থেকে যাচ্ছে পরের অংশটা নিয়ে, যেখানে আপনি প্রমাণ করতে চেয়েছেন যে ডিএ না দিয়ে আপনারা সেই টাকায় গরিবের উন্নয়নে খরচ করেছেন।

আপনার ধরে নেওয়া হিসেবে সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত ক্লাবের সংখ্যা সাড়ে-পাঁচ হাজারের বেশি হবেনা। এইটে ডাহা মিথ্যে কথা সার। ২০১৫ তেই সরকারী অনুদানপ্রাপ্ত ক্লাবের সংখ্যা ৭০০০। ২০১২ সালে অনুদান দেওয়া শুরু হয়েছিল ১৫.৫ কোটি টাকা দিয়ে, ২০১৫-১৬ তে সেটা দাঁড়িয়েছে ১৫০ কোটি টাকায়। এই হিসেবে গত তিন বছরে ৩০০ কোটির বেশি টাকা ক্লাবগুলোকে অনুদান দেওয়া হয়েছে। আর ইয়ে, ২০১৫-১৬ বাজেট বক্তব্যে অমিত মিত্র সগর্বে জানাচ্ছেন যে সাহায্যপ্রাপ্ত ক্লাবের সংখ্যা ১৪০০০। আপনার জন্য প্রামাণ্য লিঙ্কগুলোও থাকছে (http://indianexpress.com/article/cities/kolkata/didi-doles-out-rs-105-cr-for-clubs/, http://indiatoday.intoday.in/story/west-bengal-polls-mamata-banerjee-tmc-left-cpm/1/622050.html )

এখন যদি বুঝিয়ে দ্যান যে এই ক্লাবগুলোকে টাকা দিয়ে কোন গরিবের কিভাবে উপকার হয়েছে তাহলে উপকৃত হই।
অথবা, অনুষ্ঠান বাড়ি করে ভাড়া দিয়ে টাকা রোজগার আর বাৎসরিক পূজোটা ভালো করে করা ছাড়া এই টাকায় বাংলার কোন খেলার উন্নতি হয়েছে সেইটে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে বোঝালেও হবে। এবং হ্যাঁ, ক্লাবগুলো সবই কিন্তু তৃণমূলের নেতা-চামচাদের বাছা। সত্যিকারের যে কটা ক্লাব খেলোয়াড় তৈরী করে তাদের পাত্তাই দেওয়া হয়নি।

ক্লাবের ছেলে আর কর্তাদের দিয়ে ভোটের সময় বিরোধী ভোটারদের চমকানোটা কি গরিবের উন্নয়নের মধ্যে ধরেছেন? তাহলে অবশ্যি, আপনি দিদিমণির দুষ্টু ভাই। কিস্যু বলার নেই।

আপনি লিখেছেন যে উৎসব বাবদ খরচ হয় বছরে আরো চল্লিশ কোটি টাকা। সিরিয়াসলি সার, আপনার অ্যাত্তো জ্ঞান, রাতে ঘুম হয় তো?

শুধু কলকাতা ফিল্ম ফেস্টিভ্যালেই কত খরচ হয় আপনার ধারণা আছে? ২০১৪তেই সেরা সিনেমা'র জন্য প্রাইজ মানি ছিল ৫১ লাখ টাকা। অফিসিয়ালদের মতে খরচ ছাড়িয়েছিল ২০ কোটি টাকার বেশি (নিউজ লিঙ্ক http://www.telegraphindia.com/1141107/jsp/frontpage/story_19008855.jsp )। 

অবশ্যি নিন্দুকেরা বলে যে সেবার টাকা যুগিয়েছিলেন সুদীপ্ত সেন যার অনিদ্রার রোগ সারাতে দিদিমণি'র লেখা কবিতার বইগুলো থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা হত।

মুখ্যমন্ত্রী তার 'মিনি-মহাকরণ' এর নামে জেলায় জেলায় যে বিশাল এসি প্যান্ডেলে রাজসভা চালান, গোটা জেলার কর্তাব্যক্তিরা এসে হাজির হয়, ঢালাও খাওয়া-দাওয়া হয়।তার খরচ জানেন? গড়ে ৭০-৭৫ লাখ টাকা। এও শোনা যায় যে সে প্যান্ডেলের বরাত নাকি এক নির্দিষ্ট ঘেসোকেই দেওয়া হয়।

কটা মেলা হয় বছরে তা জানেন আপনি?  আপনার অর্থমন্ত্রীও গুণতে পারেন নি। তিনিও বাজেট বক্তব্যে 'Dance Drama Festival, Mati Utsav, Natya Mela, Bangla Sangeet Mela,Children's Film Festival, Tele Award, Paschimbanga Charukala Utsav' এইগুলোর নাম লিখে তাপ্পর শেষে 'etc' বসিয়েছেন (সোর্স- ওয়েস্ট বেঙ্গল বাজেট স্পিচ, ২০১৫-১৬, পেজ-৫০)।

যাকগে, মেলাগুলোর আয়োজন করে মূলতঃ বিভিন্ন সরকারী দপ্তর। এর মধ্যে তথ্য সংস্কৃতি দপ্তর প্রধান, এইটা নিশ্চয়ই জানেন। তাদের বাজেট-বরাদ্দ দেখলেই মেলার খরচের হিসেব পাওয়া সম্ভব। অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র তার বাজেট বক্তব্যে জানিয়েছেন যে ২০১৪-১৫ সালে তথ্য সংস্কৃতি দপ্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল ১৬৫ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ সালে সেইটে বাড়িয়ে করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে ২০০ কোটি টাকা। ক্রীড়া আর যুবকল্যাণ দপ্তরের জন্য বরাদ্দ ছিল ২৫২ কোটি টাকা, সেইটে বাড়িয়ে ৩৪০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

এরমধ্যে সবটা নিশ্চয়ই মেলার জন্যে খরচ হয়না। কিন্তু বড় অংশটা নিশ্চয়ই হয়। তাহলে এই খরচগুলো মিলিয়ে আপনার গপ্পে দেওয়া মাত্তর চল্লিশ কোটির হিসেব তো জাপানী তেল দিয়েও দাঁড়াচ্ছেনা সার।

বাজেটের লিঙ্কটা দিলাম না। আপনি সরকারী লোক। নিশ্চয়ই নেটে সার্চ মারলেই পেয়ে যাবেন। যেটা জানার সেটা হল এই গুচ্ছের টাকা উড়িয়ে সঠিকভাবে ঘেসো-ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কন্ট্রাক্ট পাইয়ে দেওয়া ছাড়া আর কিভাবে গরিবের উন্নতি হয়েছে সেইটা বোঝাবেন প্লিজ।

আপনি লিখেছেন যে বিস্তর উন্নয়ন হয়েছে। বলছেন যখন তখন নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও হয়েছে। MNREGA বা সোজা বাংলায় একশো দিনের কাজের হিসেব দেখছিলাম যাতে প্রায়শই রাজ্যসরকার নিজেদের এক নম্বর বলে দাবী করে থাকেন। স্টেট ওয়াইজ রিলেটিভ পারফরম্যান্স অনুসারে পশ্চিমবঙ্গ এইমুহুর্তে ১০ নম্বরে। মিজোরাম,অরুণাচল, জম্মু-কাশ্মীর, নাগাল্যান্ড, আসাম, পাঞ্জাব,বিহার, ছত্তিশগড় আর সিকিমের পিছনে। লিস্ট অনুযায়ী, নথিভুক্ত তফশিলীদের ৪১% কে এখনও কাজ দেওয়া যায় নি। এবং ১৫ দিনের মধ্যে টাকা মেটানো হয়েছে মাত্র ২৫.৬১% কে। দারুণ গরিব প্রেম, তাই না?
(রেগার লিঙ্ক- http://164.100.129.6/netnrega/st_weightage_drill.aspx?lflag=eng&fin_year=2015-2016&source=national&labels=labels&Digest=+WYLWwx19OhhVOg6q39p/g
)

বড়বাজারের উড়ালপুলটার কথা ভুলবেন না সার। বাম আমলে টেন্ডার হয়েছিল, তাই আপনাদের যুক্তিতে আপনাদের সরকারের আমলেও বামেরাই সেতুটা বানিয়ে যাচ্ছিল আর কি। ২৭ জনের  প্রাণ গিয়েছে। পরে বেরিয়েছে যে সেতুর মালমশলা সরবরাহ করতেন এক ঘেসো নেতার ভাইপো। দেখার দায়িত্বে কমিটিতে ছিলেন একাধিক ঘেসো নেতা। এক নেতা টিভিতে বলেওছেন যে তিনি জানতেন নকশায় গলদ আছে কিন্তু রাজ্যসরকারের খরচ বাড়বে বলে চেপে গেছিলেন।

মাত্র ২৭টা প্রাণ...উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে তার কিইবা দাম বলুন? আফটার অল, ওরা সিপিএমের আমলে জন্মেছিল নিশ্চিত।

গুচ্ছের রাস্তা আর বাড়িঘর অকারণে নীল-সাদা রঙ হয়েছে। নিন্দুকদের মতে সে রঙও নাকি এক ঘেসোর দোকান থেকেই কেনা হয় বিনা টেন্ডারে। এতে ঠিক কি উন্নয়ন হয়েছে বলবেন?

গত আর্থিক বছরে কুড়ি জন মত চাষী দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন। চা বাগানে অনাহারে মৃত্যুমিছিল বেড়েই চলেছে।

এই খেলা-মেলার টাকা, নীল সাদা রঙ করার টাকা- এসবের একটা অংশ দিয়ে এই দেনার দায়ে বিকিয়ে যাওয়া চাষী, অনাহারে ধুঁকতে থাকা চা বাগানের শ্রমিক-এদের একটু সাহায্য করা যেত না সার?
আপনার গরিব দরদী সরকারের ফিরিস্তি'র তাড়া কাগজ তৈরী আছে জানি কিন্তু কাজের কাজ কি হয়েছে?

আপনি লিখেছেন যে বেতন খাতে রাজ্য সরকারের খরচ কমেছে। ২০১৪-১৫ আর্থিক বছরে বাজেটের বরাদ্দের ৩১.৭% খরচ হয়েছে বেতন বাবদ। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই, তবু এটুকু বোঝা যাচ্ছে বেতন খাতে খরচ কমা মানে রাজ্য সরকারের কর্মী সংখ্যাও কমেছে। অবসরপ্রাপ্তদের জায়গাতে আর স্থায়ী নিয়োগ হয়নি।

এদিকে আপনার মুখ্যমন্ত্রী ভোটের বাজারে বকে বেড়াচ্ছেন যে তিনি নাকি ৬৮ লাখ বেকারকে চাকরি দিয়েছেন। এবার ৬৮ লাখ চাকরি দিলে বেতন খাতে খরচ বাড়া উচিত। কিন্তু আপনার হিসেবে তো খরচ কমেছে।

তাহলে? মিথ্যে কথাটা কে বলছেন বলুন তো? আপনি না আপনার মুখ্যমন্ত্রী?

আপনি লিখেছেন যে ডিএ না দিয়ে সেই টাকায় আপনার সরকার সার্বজনীন উন্নতিতে হাত দিয়েছে। এখন সার্বজনীন উন্নতি বলতে আপনি কি বোঝেন সেইটে জানতে ইচ্ছে করছে। ভোটের হিসেবে দেখা যাচ্ছে ঘেসো পার্টির নেতাদের সম্পত্তি অনেকের ক্ষেত্রেই কয়েকশো থেকে কয়েক হাজার গুণ বেড়েছে, এটাই কি সার্বজনীন উন্নতি?

চাষীরা ধানের সহায়ক মূল্য পাচ্ছেনা।কিষান মান্ডিগুলো গড়া হয়েছে লোকালয়ের মূল বাজারের বাইরে। সেখানে কেউই যায়না। দেনার দায়ে আলু চাষীরা আত্মহত্যা করছেন, এইটাই কি সার্বজনীন উন্নতি?

পাঁচ বছরে কাগজে কলমে ছাড়া কোনো বড় ও ভারি শিল্প গড়ে ওঠেনি যাতে বিকল্প কর্ম-সংস্থান হতে পারে। এটাই কি সার্বজনীন উন্নতি?

সারদা কেলেঙ্কারিতে এটা জলের মতন স্পষ্ট যে গরিব দরদী সরকারের নেতারা গরিবের টাকা লুটের সাথে যুক্ত ছিলেন। কদিন আগেও এক চিটফান্ডের মালিককে দিদিমণির ভাইপো'র পাশ থেকে ধরা হয়েছিল।সত্তরের উপর মানুষ আত্মহত্যা করেছেন। সর্বস্বান্ত হয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। এটাই কি আপনার সার্বজনীন উন্নতি?

সরকারী স্কুল শিক্ষা আপনার মতে অদক্ষতার নজির। সেই স্কুলের চাকরিকে সামনে রেখে গরিব দরদী সরকারের নেতারা প্রাইমারি আর টেট নিয়ে লাখ লাখ বেকারের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা কামিয়েছেন। আপনাদের শিক্ষামন্ত্রী অব্দি বলতে বাধ্য হয়েছেন যে যারা যারা চাকরি দেবার নাম করে টাকা নিয়েছেন তারা যেন টাকা ফেরত দেন। এটাই কি আপনার সরকারের সার্বজনীন উন্নতি?

আপনার গাঁজাখুরি'র আরেকটা উদাহরণ দিচ্ছি। সরকারী স্কুলে বেসরকারী স্কুলের থেকে কুড়িগুণ ছেলে মেয়ে পড়ে। এইটেতে আপনার ভারি দুঃখ হয়েছে নির্ঘাৎ। কারণ, স্কুলশিক্ষাটাকে বেসরকারি করণ করা গেলোনা। আপনি লিখেছেন, 'কিন্তু সমস্যা হল, সরকার বিপুল টাকা স্কুল শিক্ষায় খরচ করা সত্ত্বেও পড়াশোনার পিছনে স্কুল পড়ুয়াদের ব্যক্তিগত খরচ কমছে না। দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের স্কুল পড়ুয়াদের গড় ব্যক্তিগত খরচ সারা ভারত গড়ের খুব কাছাকাছি, এবং পশ্চিমবঙ্গের পড়ুয়ারা যে টাকাটা  স্কুল-বেতনের খাতে বাঁচাচ্ছে তার থেকে বেশি তাদের খরচ হয়ে যাচ্ছে প্রাইভেট কোচিং-এ। এর মানে, সরকার শিক্ষায় এত বেশি খরচ করা সত্ত্বেও ছাত্ররা স্কুল থেকে ঠিকমত শিখতে পারছে না। এত খরচ করেও কিন্তু শিক্ষাপ্রাপ্তির নিরিখে পশ্চিমবঙ্গের স্থান সারা ভারত গড়ের কাছাকাছি। অর্থাৎ একই জায়গায় পৌঁছনোর জন্য সারা ভারতের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গকে সরকারি ও ব্যক্তিগত খরচ মিলিয়ে অনেক বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। এটা অদক্ষতা।'

এবার আপনার এই ফালতু কথাগুলোর জবাব দিই। ভারতে Right of Children to Free and Compulsory Education Act বলে একটা আইন হয়েছিল ২০০৯ সালে যাতে স্পষ্ট করা বলা হয়েছে ১৪ বছর বয়স অব্দি এলিমেন্টারি এডুকেশন হবে অবৈতনিক। অর্থাৎ, স্কুলে কোনো বেতন নেওয়া হবেনা।খরচটা বহন করবে কেন্দ্র এবং রাজ্য (শতাংশ অনুপাতে প্রাথমিকভাবে কেন্দ্রই ৬৫% খরচ দেয়) ।কিন্তু পড়াশুনোর তো কিছু আনুসঙ্গিক খরচ থাকেই এবং সেটা গোটা দেশের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রাজস্থানের ক্লাস সেভেনের ছেলেটাকেও খাতা পেন কিনতে হয় এ রাজ্যের আমডাঙ্গার ছেলেটার মতন। তাহলে পশ্চিমবঙ্গের স্কুল পড়ুয়াদের গড় ব্যক্তিগত খরচ সারা ভারত গড়ের খুব কাছাকাছি হবে এতে আশ্চর্য হবার মতন কিছু আছে কি?

নাকি, আপনারও ধারণা এরাজ্যে স্কুলের গোটা টাকাটাই মন্ত্রীসভার কারুর পৈতৃক সম্পত্তি থেকে আসে?

প্রাইভেট টিউশনের উপর নির্ভরতা বাড়ছে। তার কারণ হল প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে বাচ্চাদের নামিয়ে দেওয়া। সব্বাইকে সব কিছুতে ফার্স্ট হতে হবে।এইটে এক ধরণের সামাজিক অসুস্থতা। আপনি তার দায় দিচ্ছেন স্কুলের উপর। আমি বলছিনা যে সরকারী স্কুলে খুব পড়াশুনো ভালো হয়। একটা পার্সেন্টেজ শিক্ষক নিশ্চয়ই ফাঁকিবাজ। কিন্তু বেশিরভাগ খারাপ হলে তো সরকারী স্কুলের প্রতি এত নির্ভরতাই থাকতো না।

একটা হাইস্কুলে একজন মাস্টারমশাইকে দিনে কটা ক্লাস নিতে হয় সেটা আপনার জানা আছে? একটা হাইস্কুলে একজন মাস্টারমশাইকে কম করেও সপ্তাহে ২২-২৫ টা ক্লাস নিতে হয়। এর বাইরে প্রভিসনাল ক্লাস থাকে।দিনে কম করেও পাঁচটা, মোট দুশো মিনিট। প্রতি ক্লাসে গড়ে কম করেও পঞ্চাশের উপর ছেলে-মেয়ে। চল্লিশ মিনিটের ক্লাসে সবাইকে ঠিকঠাক দেখানো সম্ভব?

উত্তর হচ্ছে না। তাহলে আরো সেকশন বাড়াতে হবে। আরও শিক্ষক লাগবে।
কিন্তু শিক্ষক তো আপনারা নিয়োগ করবেন না। কারণ আপনার মতে 'অদক্ষতার একটা উদাহরণ স্কুলশিক্ষা।'

কিন্তু একইসাথে ঢালাও বেসরকারী বিএড আর ডিএড কলেজের পারমিশন দিয়ে যাবেন। মাঝে মধ্যেই স্কুলে শিক্ষক নেবো বলে বিজ্ঞাপন দেবেন। হাজার হাজার গরিব ছেলে মেয়ে জমি বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা দিয়ে এসব কলেজ থেকে বিএড ডিএড পাশ করে বেরিয়ে এসে দেখবে যে আপনি বক্তিমে ফলাচ্ছেন যে 'অদক্ষতার একটা উদাহরণ স্কুলশিক্ষা' তাই এখানে আর শিক্ষক নিয়োগের দরকার নেই, বরং সেই টাকা দিয়ে সার্বজনীন উন্নয়নের নামে দিদিমণি'র আরও কটা ঢাউস ফ্লেক্স টাঙানো হোক।

পারলে নিজের মুখটা একবার আয়নায় দেখুন। ভালো থাকুন।

শনিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০১৬

আনন্দমার্গী ~ সুশোভন পাত্র

ইমাম আলি কে চেনেন? আজকের এই তৌহিদুল ইসলাম, ফজলে হক, দুখিঃরাম ডালের মতই ইমাম আলি কেও সেদিন মোড়া হয়েছিলো ঐ কাস্তে হাতুড়ির লাল শালুতেই। তখন বিহারের কলিয়ারির শ্রমিক বস্তি গুলোতে লাল ঝাণ্ডার দাপট বাড়ছে ক্রমশ। ঝরিয়া, কেশারিয়া, পিপড়ার অলিগলিতে তখন 'কমরেড' ডাক কানে বাজছে। সকাল আটটার ট্রেনে জ্যোতি বসু কে স্বাগত জানাতে সেদিন পাটনা প্লাটফর্মেই হাজারো মানুষ। পোস্টার-ফেস্টুন আর 'ই-কি-লা-ব'র তুমুল শ্লোগানে ছয়লাপ ষ্টেশন চত্বর। হঠাৎ চলল গুলি। লক্ষ্যভ্রষ্ট বুলেট গিয়ে বিঁধল ইমাম আলির বুকে। আততায়ী মিলিয়ে গেলো জনস্রোতে। হাসপাতাল যাবার আগেই শহীদ হলেন ইমাম আলি। 'কমরেড' ইমাম আলি। পরে গোয়েন্দা দপ্তর জানালো, আততায়ী ছিলেন 'আনন্দমার্গী'। কদিন পর পাঞ্জাব সীমান্তে পাকিস্তান থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করতে গিতে বিএসএফের হাতে ধৃত দুই মার্গী যুবকের স্বীকারোক্তি, তাঁদের সংগঠনই ষড়যন্ত্রের সাথে যুক্ত। আসলে গেঁয়ো যোগী যেমন ভিখ পায় না, লাল শালুতে মোড়া লাশেরও তেমন, 'সিপিএম'র গণহত্যার' মত, প্রথম পাতায় ৬০ পয়েন্টের হেডিং হয় না।          
১৯৫৫'র ৯'ই জানুয়ারি বিহারের জামালপুর অঞ্চলে প্রভাত রঞ্জন সরকার ওরফে 'আনন্দমূর্তি' ওরফে 'বাবা'র হাত ধরে জন্ম এই 'আনন্দমার্গ'র। স্বঘোষিত ধর্মগুরু প্রমাণের তাগিদে শুরু হল বাবার নিত্য বচন। বাবার শিব দর্শন, শৈশবে বাঘের পিঠে জঙ্গল ভ্রমণের অলৌকিক সব কাহিনী। আনন্দমার্গ'র সর্বক্ষণের কর্মী হতে তখন দীক্ষা লাগে। পোশাকি নাম পড়ল 'অবধূত'। মার্গের রাজনৈতিক কর্মসূচী পরিচালনার জন্য তৈরি হল, 'প্রাউটিস্ট ব্লক অফ ইন্ডিয়া'। তাদের মুখপত্র 'প্রাউট' ঘেঁটে জানা যায় বাবা'র  অনন্য বিচারধারা। "অহিংসা উপর ভিত্তি করে আধ্যাত্মিকতা মানবতার কোন উপকারেই আসবে না", "ভারতবর্ষের গণতন্ত্রে নিরক্ষর ও অশিক্ষিতদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া উচিত", "কমিউনিজম মানুষ কে জন্তুতে পরিণত করে" ইত্যাদি।  স্বৈরতান্ত্রিক এবং ধর্মগোঁড়া এই বাবার লালিত পালিত গুপ্ত আধ্যাত্মিক সংগঠন যে পরবর্তী সময় জ্যোতি বসু ছাড়াও বিহারের মুখ্যমন্ত্রী আব্দুল গফুর, সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি এন এন রায় কে হত্যার ব্যর্থ ষড়যন্ত্রের করবে , এমনকি রেলমন্ত্রী ললিতনারায়ন মিশ্র হত্যাও করবে এতে আর  আশ্চর্য কি? বলদ দিয়ে তো আর হাল চাষ হয় না ।
ক্রমশ ভক্ত এবং মার্গের অভ্যন্তরেও বাবা'র বিরুদ্ধে ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হয়। ১৯৭১'এ কলকাতার 'ধর্ম মহাচক্র'র পর 'আনন্দমূর্তি'র স্ত্রী উমা সরকার ও প্রাক্তন অবধূত, 'প্রাউটের' অর্থসচিব নওল কিশোর আনন্দমার্গের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা করলেন। নওল কিশোর তাঁর 'আনন্দমার্গঃ সয়েলিং  দি সাফরন রব' বইয়ে লেখেন 'গুরুর বিরুদ্ধে জেহাদের অপরাধে ৩৬ জন আনন্দমার্গী কে ছোটনাগপুরের জঙ্গলে নিয়ে গিয়ে পেট চিরে, চোখ উপড়ে হত্যা করা হয়।' পরে ঐ মামলায় অভিযুক্ত অন্য এক অবধূত মাধবানন্দ'ও আদালতে জানান 'গুরুর নির্দেশে তিনি নিজেই ১৮ জন অবধূত কে হত্যা করেছেন।' আবার ১৯৭৩'র ৯'ই এপ্রিল মার্গের পক্ষে থেকে প্রচার করা হল যে বিহারের বিধানসভার সামনে দিভিয়ানন্দ অবধূত 'স্বেচ্ছা আহুতি' দিয়েছেন। ২৪শে এপ্রিল দিল্লিতেও আবার 'স্বেচ্ছা আহুতি'। পরে পুলিশি তদন্তে অবশ্য প্রমাণ হয় তাঁদের আসলে জ্যান্ত জ্বালিয়ে মারা হয়েছিল।
পুরুলিয়া ও বিহার সীমান্তে জয়পুর ও ঝালদা ২ নং ব্লকের আদিবাসী, সরকারী ও রায়তি জমি মিলিয়ে হাজার একর জমি বেআইনি ভাবে দখল করতে উদ্ধ্যত হয় এই মার্গীরা। ১৯৯০'র ১৮ই এপ্রিল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মুফতি মহম্মদ সঈদ লোকসভা তে এক বিবৃতিতে মার্গীদের বিরুদ্ধে জমি হাতিয়ে নেওয়ার এই সত্যতা স্বীকার তো করেনই সাথে পুরুলিয়ার বাঁশগড়ের জঙ্গলে বিদেশ থেকে আমদানি করা বে-আইনি অস্ত্র মজুতের অভিযোগও করেন। ১৯৯৫'র ডিসেম্বরর বিমান থেকে পুরুলিয়া অস্ত্র-বর্ষণ কাণ্ডে প্রধান অভিযুক্ত কিম ডেভি তাঁর সাক্ষ্যতেও আনন্দমার্গীর বিরুদ্ধে বিদেশ থেকে আমদানি করা বিপুল বে-আইনি অস্ত্রের কথা উল্লেখ করেন এবং জানান ঐ বিমানেই ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার নাগরিক আনন্দমার্গী দয়ানন্দ অবধূত।      
এতো কিছু পরও ১৯৮২'র ৩০শে এপ্রিল বিজন সেতুতে অগ্নিদগ্ধ হয়ে ১৭ জন মার্গী মারা যাওয়ার ঘটনা  ন্যক্কারজনক। 'ছোট্ট' , 'সাজানো ঘটনা' বা 'বিরোধীদের চক্রান্ত'  নয় বরং  ৪ঠা মে, সিপিএম রাজ্য সম্পাদক প্রমোদ দাশগুপ্ত জানান "আনন্দমার্গীর ঘটনাতে আমরা গভীর ভাবে উদ্বিগ্ন। এই ঘটনার তীব্র নিন্দা করছি। প্রকৃত ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দোষীদের শাস্তি দেওয়া হোক।"  সিপিএম বিধায়ক শচিন সেন, কান্তি গাঙ্গুলি প্রমুখের বিরুদ্ধে মামলা রুজু হয়, বিচারও শুরু হয়। কিন্তু ঠিক কি কারণে আনন্দমার্গীরা সেদিন ঢাল তরোয়াল মড়ার খুলি নিয়ে মিছিলের অনুমতি চেয়েছিল? অনুমতি না থাকলেও তাহলে কেন সেদিন ঐ মিছিল  হয়েছিলো? কেন পরবর্তী সময় আনন্দমার্গীরা আদালতে সাক্ষ্য প্রমাণ দিতে অস্বীকার করলেন? তাঁদের ধারাবাহিক অনুপস্থিতির কারণে যে মামলা বাতিল হল তাঁর দায় কার? 'সিপিএমের গণহত্যা' প্রমাণের এমন সুবর্ণ সুযোগ হেলায় হারালেন কেন? না এটাও ছিল ছোটনাগপুরের জঙ্গলের মতই অন্তর্দলীয় হত্যালীলা?  কিম্বা  দিল্লী-পাটনার অবধূত'দের মত 'স্বেচ্ছা আহুতি'?
২০১১'র আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলার শিরা ফুলিয়ে প্রতিশ্রুতি দিতেন "৩৪ বছরের সমস্ত গণহত্যার তদন্ত করবেন। কমিশন বসাবো"। তাহলে কেন "বিজনসেতুর সিপিএম'র গণহত্যার" প্রায়শ্চিত্ত হল না? কেন  ১৭ জন মার্গীর 'অতৃপ্ত আত্মা' বিচার পেল না? কেন সিপিএম'র কেউ জেলে গেলো না? হোক না একটা গণহত্যার সাচ্চা হিসেব নিকেশ। তৌহিদুল ইসলাম থেকে ইমাম আলি। অজিত লোহার থেকে শালকু সরেন। ঝর্না মান্ডি থেকে রোহিত ভামুলা। হোক সেটা, ইতিহাসের পাতা থেকেই। যে ইতিহাস আত্মবলিদানের। যে ইতিহাসের পাতা বামপন্থীদেরই রক্তে ভেজা। যেখানে জমাট রক্তের রং লাল। শুধুই লাল...

শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০১৬

হাজার লেনিন ~ অনামিকা মিত্র


একটা লেনিন কাগজ কুড়োয়, ঝরতি এবং পরতি
একটা লেনিন ...রক্ত বমি ,হাসপাতাল -এ ভর্তি,
একটা লেনিন ইস্কুল -ছুট ,অনেক রাস্তা হেঁটে
একটা লেনিন বাদাম জোগায়, ট্রেন -যাত্রীর পেটে ,
একটা লেনিন ভর-সন্ধ্যায় ,গলির মুখে ছিনতাই
একটা লেনিন ধুঁকছে নেশায় ,ঝিমোয় সারা দিন টাই ,
একটা লেনিন ,প্রমোটরের বাধ্য কেয়ার টেকার
একটা লেনিন শিক্ষা শেষে ,বিষন্ন -মুখ বেকার ,
একটা লেনিন গলায় দড়ি .."আলু -র তত দাম নেই "
একটা লেনিন চায়ের দোকান, বন্ধ মিলের সামনেই,
আমরা হাজার - লক্ষ্ লেনিন ,আমরা কবে ভাববো -
লেনিন মানে সত্যি বাঁচা ,বেঁচে থাকার কাব্য !

মঙ্গলবার, ১৯ এপ্রিল, ২০১৬

যো ডর গ্যায়া সমঝো মর গ্যায়া ~ সুশোভন পাত্র

কিংসমিড,ডারবান, ২০০৭। স্টুয়ার্ট ব্রডের ওভারের প্রথম বলটা, ওয়াইড লং অন বাউন্ডারির উপর দিয়ে উড়ে গেছে গ্যালারির পিছনে। দ্বিতীয় বলে, কব্জি মোচড়ানো ফ্লিকটা আছড়ে পড়ল ডিপ স্কয়ার লেগের গা ঘেঁষা বিল্ডিং'র কার্নিশে। ক্যামেরার লেন্স তখন জুম করেছে অনুতপ্ত ফ্লিনটফের মুখ। তৃতীয় বলের পর সাইড চেঞ্জ। এবার রাউন্ড দা উইকেট। আর এবার, ডিপ এক্সট্রা কভার। চতুর্থ বলের পর শর্ট মিড উইকেট থেকে দৌড়ে এসে বোলার কে পরামর্শ দিয়ে গেলেন ক্যাপ্টেন কলিংউড। অতঃপর ফিল্ডিং চেঞ্জ। পঞ্চম ও ষষ্ঠ বলের আগে একে একে বলার কে সাহস দিয়ে গেলেন লিউক রাইট, পিটারসেনরা। কিন্তু কোন কিছুই সেদিন রাজসিক যুবরাজ কে ক্রিকেটের ক্যানভাসে ধ্রুপদী রূপকথার ছবি আঁকা থেকে আটকাতে পারেনি। এক মহাপুরুষ বলেছিলেন, "তুমি যাহা চিন্তা করিবে, তাহাই হইয়া যাইবে। যদি তুমি নিজেকে দুর্বল ভাবো, তবে দুর্বল হইবে; তেজস্বী ভাবিলে তেজস্বী হইবে।" ভারতবর্ষের বাস্তবের রুক্ষ মাটিতে এই 'ভাববাদের প্রাসঙ্গিকতা প্রশ্নাতীত না হলেও অনেক সময়ই ক্রিকেট কেবলই 'মনস্তাত্ত্বিক'। আপনি যেখানে চাইবেন বোলার ঠিক সে-খা-নে-ই বল করবে। নাহলে ইংলিশ বা হাতি ওপেনিং ব্যাটসম্যান, ক্রিস ব্রডের, এই ছেলে, যে এখন ইংল্যান্ড ক্রিকেটের মেরুদণ্ড, টি২০ ক্যাপ্টেন, সে কিনা  ছ-খানা বলই নিয়ম করে হয় হাফভলি না হয় ফুলটসে সাজিয়ে দিলেন। আরে টি-২০ ক্রিকেটের স্লগ ওভারে বল করতে যাওয়ার আগে, আমাদের পাড়ার গাবলু অবধি আপনাকে পই পই করে বলবে "আর যাই কর বাছা, ফুলটস আর হাফভলিটা দিস না"। আসলে নার্ভাসনেস দাদা, নার্ভাসনেস। এটাই হল অন ফিল্ড নার্ভাসনেস। গব্বর সিং বেঁচে থাকলে বলতেন "যো ডর গ্যায়া সমঝো মর গ্যায়া।" তখন আপনি যতই ভাবুন ইয়র্কার দেবেন ঠিক দেখবেন ফুলটস পড়ে গেছে। যতই ভাবুন বাউন্সার দেবেন দেখবেন হাফভলি পড়ে গেছে। আর যতই ভাবুন সিপিএম কে বাঁশ দেবেন দেখবেন, মুকুল উল্টো গাইছে, ম্যাডাম ক্ষমা চাইছেন, বৌ-বাজারের মোড়ে স্লিপ ও টাং'এ ভাইদের পথে বসিয়ে বলছেন "আগে জানলে টিকিটই দিতাম না"
তা ম্যাডাম, লজ্জার মাথা খেয়ে, না হয় ধরেই নিলাম যে আপনি আগে কিছুই জানতেন না। কিচ্ছুটি না। আপনি একেবারে শিশুর মত নিষ্পাপ। ফুলের মত কোমল। তা এবার তো জানেন? না হয় প্রার্থী তালিকা ঘোষণাই হয়ে গেছে, কিন্তু ডিয়ার 'অগ্নিকন্যা' ওরফে 'সততার প্রতীক' ওরফে 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়', আপনি যদি সত্যি কাউকে প্রার্থী হিসাবে নাই চান, তাঁদের দুর্নীতির বিরুদ্ধে খড়গহস্তই হন, তা হলে তো শুভেন্দু বাবুর মনোনয়ন পত্র প্রত্যাহারের এখনও তো সময় আছে। হোক প্রত্যাহার। গোটা রাজ্য বয়ে বেড়িয়ে, হেলিকপ্টার হাঁকিয়ে, আপনিই তো বলে বেড়াচ্ছেন, ২২০'র বেশি আসন সহ জয় নাকি নিশ্চিত। তা আপনার তো দয়ার শরীর ম্যাডাম, দিন না ছেড়ে ঐ গোটা পাঁচ-সাতটা সিট। সমুদ্র থেকে দু-বালতি জল তুলে নিলে আর কিই বা যায় আসে বলুন। আপনার সম্মানও বাঁচবে। সততা পারদও চড়চড় করে ঊর্ধ্বগামী হবে। আর একান্তই যদি এসব কিছুই করা না যায়, তাহলে তোয়ালা খ্যাত শ্রী শোভন বাবু কে দিন তো মেয়র পদ থেকে সরিয়ে। করুন স্থাপন একটা জলজ্যান্ত দৃষ্টান্ত। আরে বাবা কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনের তো নিশ্চয় আর প্রার্থী ঘোষণা হয়নি। তাই না?
ইংল্যান্ড তখন ঘরোয়া ক্রিকেটে টি-২০'র আঁতুড় ঘর পেরিয়ে এসেছে। সে ম্যাচে কিছু টি-২০ স্পেশালিষ্ট নামিয়েছিল। কি হাবভাব তাঁদের। কি সব ভয়ঙ্কর নাম। ড্যারেন ম্যাডি, দিমিত্রি ম্যাসকেরেনাস। বলছে, কেউ নাকি ছয় মারার স্পেশালিষ্ট তো কেউ  ইনসুইং'র। ঠিক যেন অনুব্রত আর আরাবুল। কেউ গুড় বাতাসা, কেউ চড়াম-চড়াম। কিন্তু দুঃখ হল, এতো কিছুর পর দিদি এখন আমাদের নার্ভাস স্টুয়ার্ট ব্রড। প্রথম তিন দফার পরই লুস বল দিতে শুরু করেছেন। বুদ্ধিজীবীরা নির্বাচন কমিশনে দৌড়ে গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন। ক্যাপ্টেন এসে পিঠ চাপড়ে সাহস দিচ্ছেন। দিদি সাইড চেঞ্জ করছেন। রিষ্ট ব্যান্ড ঘাম মুছছেন। নতুন করে ফিল্ডিং সাজাচ্ছেন। আজ বর্ধমান তো কাল এন্টালি দৌড়চ্ছেন। কিন্তু যেই রান আপ শেষে বল করছেন, সেই হয় হাফভলি না হয় ফুল্টস। ছ দফা ওভারে এবার একটা নো বল'ও হবে। আর নো বলে তো আবার ফ্রি হিট। দিন ফ্রি হিটে স্টেপ আউট করে ।বাপি এবার বাড়ি যা...

রবিবার, ১৭ এপ্রিল, ২০১৬

চিক্কুস ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য্য

লাল মোরাম বিছানো রাস্তা। গাড়ি গেলে খরখর করে শব্দ হয়।
অবশ্য গাড়ি আর ক'টা! স্কুল ট্রিপ বা মার্কেটিং ট্রিপের ভ্যান, নয়তো বাবার অফিসের এম ডি মাঝেসাঝে এলে।
রাস্তার দু'ধারে কৃষ্ণচূড়া দেবদারু আর নাগকেশর গাছ। তার তলায় রঙ্গন, সিনোয়ারি, বাবলা, লজ্জাবতীর ঝোপ। ওইখানে বহুরূপীগুলো লুকিয়ে থাকে আর মাঝে মাঝে ঘাড় তুলে দেখে কে এলো। মাঝে মাঝে টকটকে লাল রঙ, ভেলভেটের মতো গা, ছোট্ট মাকড়সা দেখা যায়। তুড়ুক তুড়ুক করে কাঠবিড়ালি লাফায়। ফড়িং ওড়ে। একটু ভিজে জায়গায় শামুক থাকে।
  রাস্তা দিয়ে এগোলে কলোনীর গেট। পাশে বুগনভিলিয়া। তার ছায়াতে ফোল্ডিং চেয়ারে বসে থাকে সিকিউরিটি কাকু। আমি ছিপটি হাতে রাস্তায় দাগ টানতে টানতে গেট দিয়ে বেরিয়ে যাই। কাকু আমাকে চেনে, হাসে। এখন গরমের ছুটি। সকালেই আমার পড়াশোনা শেষ করে বেড়াতে বেরোই। হাতে থাকে ছিপটিটা। নতুন কোনো ফুল, নতুন কোনো পাতা পেলে কুড়িয়ে আনি। দুপুরে বাবা ভাত খেতে আসলে দেখাই। গোল নুড়ি পেলে মা-কে এনে দিই। মা সাজিয়ে রাখে।
এইরকমই একদিন হাঁটতে হাঁটতে কলোনীর বাইরে দেখি একটা জটলা। কয়েকজন লোক একটা বাচ্চা বাঁদরকে ঘিরে বসে আছে। মায়ের কোল থেকে নাকি পড়ে গেছে, ভয়ে জুলজুল করে তাকাচ্ছে। আমাকে দেখেই আমার কোলে উঠে পড়লো। সবাই বলল, তাহলে ওটা আমার কাছেই থাক। আমিও নিয়ে চলে এলুম বাড়ি। মা খুব খুশী, বাবাও এসে খুশী হল। ছোট প্লাস্টিকের ডিশে একটু দুধ দিতে চুকচুক করে খেল। জল খেল। আর আমার কোলে উঠে বসে রইল। আমি নাম দিলুম জুলজুল। বাবা নাম দিল মাঙ্কিম্যান। মা নাম দিল চিক্কুস। মায়ের দেওয়া নামটাই রয়ে গেল। 
এইভাবে চিক্কুস আমাদের বাড়ি এল। আমার একটা সারাদিনের সঙ্গী হল। বিস্কুট দিলে অনেকটা মুখে পুরে গালের একপাশে রেখে দিত। রাত্তিরে আমাদের বাইরের চৌবাচ্চার পাশে একটা বস্তা নিয়ে মাথায় ঘোমটার মতো টেনে ঘুমোতো। তখন ওকে দেখতে লাগতো ঠিক একটা বুড়ো দাদুর মতো। সেই সময় ওকে জাগিয়ে দিলে রেগে দাঁত খিঁচোত খুব! চান করতে চাইত না। আমি ওকে ধরে বাগানে জলের পাইপ দিয়ে চান করাতুম। নখ কেটে দিতুম। আমার কাছে খুব শান্ত হয়ে থাকতো। মা একটা প্যান্ট সেলাই করে দিয়েছিল, ল্যাজের জায়গায় ফুটো। সেটা পরে ঘুরতো।
তারপর আমার স্কুল খুলে গেল। সারাদিন আর দেখতে পেতুম না চিক্কুসকে। বিকেলে আমি ফিরলেই লাফিয়ে এসে জড়িয়ে ধরতো। মা বলতে শুরু করতো ওর সারাদিনের গল্প। বদমায়েশীর নালিশ করলে চিক্কুস চুপ করে বসে থাকতো, মাথা নীচু। যেন কতো অনুতাপ। অনুতাপ কথাটা বাবা শিখিয়েছিল আমাকে।
আস্তে আস্তে বড় হতে লাগলো, বদমায়েশিও বাড়তে লাগল। রাস্তায় কুকুরগুলোর সঙ্গে খেলতো, কাঠবিড়ালি দেখলে তাড়া করে জামগাছে, পেয়ারাগাছে উঠে যেত। একদিন দরজা রঙ করবার জন্যে সবুজ রঙের কৌটোটা উল্টে সারা গায়ে মাখলো, ঘরময় করলো। সেদিন ওকে কেরোসিন তেল দিয়ে চান করাতে হলো। টেবিলে পেয়ারা বা কলা রাখলেই এসে খেয়ে নিত। বকলে মাথা নীচু করে থাকতো, আবার যে কে সেই। বাথরুম পেলে টয়লেটে যেত, শিখিয়ে দিয়েছিলুম। মাঝে মাঝে দেখতুম উদাস হয়ে বসে আছে, হয়তো ওর মায়ের জন্যে মন কেমন করতো...
তারপর কলোনীর অন্য কাকুরা নালিশ করতে আরম্ভ করলো। চিক্কুস নাকি ওদের বাড়ি গিয়ে সব নষ্ট করছে! লোকের চাপে ওকে বেঁধে রাখা হোত। করুন স্বরে কাঁদতো, আমার মায়া হোত। খুলে দিতুম। আবার বদমায়েশি করতো, আবার নালিশ আসতো।
  এর মধ্যে আমাকে একটা বড় ইস্কুলে ভর্তির পরীক্ষা দিতে হোল। সেখানে নাকি হস্টেলে থাকতে হবে! চিক্কুসকে একদিন বললুম, যে আমাকেও ওর মতো মা বাবাকে ছেড়ে থাকতে হবে। ও কী বুঝল কে জানে, আমাকে জড়িয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। ওকে ভদ্র করবার যতোই চেষ্টা করতুম, ও আরও বাঁদর তৈরি হছিল। সেই সময়েই ঘটলো দুর্ঘটনাটা। বাবার অফিসের ডিরেক্টরের ছোট্ট নাতি এসেছিল বেড়াতে। আমাদের কোয়ার্টার্সের সামনে দিয়ে হাঁটছিল। নতুন ছেলে দেখে চিক্কুস তেড়ে গেছিল, ভয় পেয়ে ছেলেটা দৌড়ে পালাতে গিয়ে পড়ে গেল। হাঁটু ছড়ে গেল। কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি গিয়ে সে বানিয়ে বললো চিক্কুস নাকি ওকে আঁচড়ে কামড়ে দিয়েছে! বাবাকে ডেকে ডিরেক্টর বললেন, বাঁদরটাকে এখনই বিদায় করতে। বাকিরাও সায় দিল। যারা চিক্কুসের খেলা দেখে মজা পেত এতদিন, তারাও একে একে নালিশ করতে লাগলো। আমরা অবাক হয়ে দেখলুম।
সেই ডিরেক্টরই এক রবিবার ফোন করে ব্লু ক্রসের গাড়ি ডেকে পাঠালো। সেদিন আমরা সকাল থেকে কেউ কিচ্ছু খাইনি। চিক্কুসও খায়নি। ভ্যান থেকে দুজন কাকু নামতেই চিক্কুস পালিয়ে গাছের ওপর উঠে পড়লো। কিছুতেই নামছিল না। শেষে আমি গিয়ে ডাকলুম, তখন নেমে এল। আমার কোলে উঠে আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। একজন কাকু ওকে কী একটা ইঞ্জেকশন দিল, ঘুমের ওষুধ নাকি। চিক্কুস একটু কেঁপে উঠে আমাকে আরো জড়িয়ে ধরলো। আমি দাকলুম, "চিক্কুস! চিকাই!" জুলজুল করে তাকালো, সেই একদম প্রথম দিনের মতো। কী যেন একটা বলতে চাইল। তারপর আস্তে আস্তে ঘুমিয়ে পড়ল আমার কোলে। আমি ওর পিঠে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলুম।
ব্লু ক্রসের কাকুটা বাবাকে বলল, আমরা ওকে যখন খুশী গিয়ে দেখে আসতে পারব। কিন্তু তাতেও বাবা খুব কষ্ট পাচ্ছিল। মা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই বসেছিল। কাকুটা আমার কোল থেলে যত্ন করে চিক্কুসকে নিলেন, একটা নরম তোয়ালে জড়িয়ে ভ্যানে তুললেন। দরজা বন্ধ হল, তারপর চিক্কুসের জামগাছের তলা দিয়ে, পেয়ারা গাছের পাশ দিয়ে, সেই লাল রাস্তা দিয়ে খরখর শব্দ করে ভ্যানটা...
...আর লিখতে পারছি না...

বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

সাঁইবাড়ি ~ সুশোভন পাত্র

ঐ ২০১২। রাস্তার কোল ঘেঁষে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে লেনিন। কার্ল মার্ক্স আর এঙ্গেলস খাবি খাচ্ছে পিছনের নর্দমার হাঁটু ভর্তি জলে। ফোট ফ্রেম সহ স্তালিন হামাগুড়ি দিচ্ছে রাস্তায়। জ্যোতি বসুর মুখে লেপা আলকাতরা। সাদা-কালো কাকাবাবুর ছবিতে পেচ্ছাবের বিশ্রী গন্ধ। সাবল দিয়ে ভাঙ্গা গেটের তালাটা ছুঁড়েই ভাঙ্গা হয়েছে টিভিটা। মেঝে ভর্তি ভাঙ্গা চেয়ার-টেবিল। উপরের তাকটা থেকে মাঝে মাঝে গায়ে এসে পড়ছে মেম্বারশিপ ফর্মের টুকরো গুলো। গোটা ঘর তছনছ। আর বাইরে, এককোণে, তখনও, আগুনে পুড়ছে কিছু জরুরী কাগজপত্র আর গোটাকতক লাল পতাকা। হার্মাদ সিপিএমে'র ৩৪ বছরের বা তারও আগের 'গণহত্যা'র বদলা নিয়ে, জোনাল পার্টি অফিসে, 'গণতন্ত্রে'র নিদর্শন রেখে গেছেন, একালের 'সততা'র পূজারীরা। পাড়ার মোড়, রাস্তা-ঘাট, চায়ের ঠেক স্পিকটি নট। লোকাল পুলিশ আরও স্পিকটি নট। অ্যাপলিটিক্যাল, নিরপেক্ষ, মধ্যপন্থী, সুশীল, বুদ্ধিজীবী,কবি, টেক্সাসের বাঙালি টেকনোক্র্যাট, ম্যানচেস্টারের প্রবাসী চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, আরও আরও স্পিকটি নট। আসলে নন্দীগ্রাম থেকে মরিচঝাঁপি, আনন্দমার্গী থেকে নেতাই'র 'গণহত্যার' কাণ্ডারি সিপিএম'র প্রতি নিখাদ জনরোষ দাদা। 'গণহত্যা' বলে 'গণহত্যা'? সেই সাঁইবাড়ি দিয়ে শুরু। ভয়ানয়-ভয়ঙ্কর। সে কি মশাই আপনার সাঁইবাড়ি মনে নেই? সাঁ-ই-বা-ড়ি? 

৭০'র উত্তাল বাংলা।একদিকে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বাংলা। 'লাঙ্গল যার জমি তার' আর 'বেনামি জমি দখল রাখো, দখল রেখে চাষ কর' শ্লোগানে মুখরিত বাংলা। আর অন্যদিকে, যুক্তফ্রন্ট সরকার, রাষ্ট্রপতি শাসন, মুক্তিযুদ্ধের তাপে তেতে ওঠা বাংলা। বিকল্প জোটের সুশীল ধাড়া কে সঙ্গে নিয়ে, ১৬'ই মার্চ পদত্যাগ করলেন অজয় মুখার্জি। সিপিএম'র নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তফ্রন্ট কে সমর্থন করতে অস্বীকার করল ফরওয়ার্ড ব্লক, এসইউসিও। ১৩ মাসের মধ্যেই আবারও মুখ থুবড়ে পড়ল দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। বাংলা কংগ্রেসের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে, বিপিটিউসি সহ অন্যান্য গণ সংগঠনের ডাকে, পরেরদিন রাজ্য জুড়ে ধর্মঘট পালিত হবে। 

ধর্মঘটের সমর্থনে, ১৭'ই মার্চ সকালে বর্ধমানে তখন আদিবাসী ও কৃষকদের লাল ঝাণ্ডার লম্বা মিছিলে হঠাৎ আক্রমণ। শুরু হল ব্যাপক বোমাবাজি। ছত্রভঙ্গ জনতা প্রতিরোধের রুদ্ররূপ দেখে গুণ্ডারা তখন ঐ সাঁইবাড়ি'র আশ্রিত। জনতার সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে নিহত হলেন মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই এবং জিতেন রায়। অবশ্যই নিন্দনীয় এবং অনভিপ্রেত। কিন্তু কারা এই মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই? রবীন্দ্র-নজরুল-বিবেকানন্দ নাকি? না ধোয়া তুলসী পাতা? না, বরং, কংগ্রেস জমানাতেই পিডি অ্যাক্টে অভিযুক্ত জেল ফেরত দাগী আসামী। তাঁদের জামিনের প্রাক শর্তই তো ছিল বর্ধমান শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধতা? তাহলে কেন এবং কার মদতে তাঁরা সেদিন এসেছিলেন বর্ধমান শহরে? কোন পুণ্য কাজটা করতে এসেছিলেন? 

তৎকালীন রাজ্যপাল ধরমবীর অবশ্য সেদিন সন্ধ্যেতেই ছুটে গিয়েছিলেন সাঁইবাড়ি তে। সিপিএম'র 'গণহত্যা'। জব্বর ব্যাপার। তা বেশ, সাঁইবাড়ি, না হয় 'গণহত্যা'। আর ঐ দিনই হুগলির ত্রিবেণীর কেশোরাম রেয়নে শ্রমিক নেতা ননী দেবনাথ সহ পাঁচজনের এনকাউন্টার? টুকরো টুকরো করে ফার্নেসে ছুঁড়ে ফেলা লাশ? রাজ্য জুড়ে আরও ১৫ জন বাম কর্মীদের খুনের জমাট রক্ত? হবে নাকি 'গণহত্যা' নিয়ে একটা ঘণ্টা খানেক স্যার? ২২'শে এপ্রিল, মঙ্গলকোটের গরিব খেতমজুর মীরপাড়াতে গর্ভবতী পুস্পরানি মাঝির উপর সিআরপিএফ'র নির্মম অত্যাচার, তুলসী মাঝির কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলা শিশুর আর্তনাদ, ডাব বাগদী থেকে শুরু করে ৮০ বছরের ইন্দুমতী মাঝির শ্লীলতা হানি, কুয়োয় ফেলা শ্যাম দাসীর চার বছরের সন্তানের নিথর মৃতদেহ। তখনও আঁতুড় ঘরের চৌকাঠ না ডিঙানো কিম্বা দুগ্ধপোষ্য, আজকের 'সততা'র পূজারী ভাইরা, হোক না 'গণহত্যার' একটা হিসেব-নিকেশ। 

সাঁইবাড়ি কাণ্ডে, ঐ দিনই, দুপুর সাড়ে বারোটায়, দিলীপ কুমার ভট্টাচার্যর অভিযোগের ভিত্তিতে, বর্ধমান থানায় প্রায় ১৫০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রুজু হয়। ঐ অভিযোগে নাম না থাকলেও, ডিডিআই আসানসোল পরে বিনয় কোঙার নাম যুক্ত করে, মোট ১১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ৭৩'এ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বর্ধমান আদালত মামলাটি আলিপুরের সাব ডিভিশনাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্থানান্তরিত হয়। ৭৭'এ সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২১ ধারা মতে আবেদন করলেও বিচারপতি গীতেশরঞ্জন ভট্টাচার্য মাত্র চারজন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দেন। পরে পাবলিক প্রসিকিউটার একটি চিঠি এনেক্সচার রূপে জমা দেন তাতে দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য পরিষ্কার লেখেন যে- তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন। তৎকালীন কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক নুরুল ইসলামের অভিযোগ পত্রে সাক্ষর করেছেন মাত্র। চার্জশিটের অপর সাক্ষী ইতিকা দত্ত আদালত কে জানান তিনি ঐ সময় শহরেই ছিলেন না। মৃত মলয় সাঁই ও প্রণব সাঁই'র জীবিত ভাই বিজয় সাঁই, ভগ্নী স্বর্ণলতা যশ ও ভগ্নীপতি অমলকান্ত যশও বিচারপতি কে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করলে, বিচারপতি আবেদন মঞ্জুর করে সমস্ত অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করেন।

প্রতীকী তে কিম্বা পৌত্তলিকতায় আমার কোন বিশ্বাস নেই। তাই স্তালিনের হামাগুড়ি, লেনিনের ডিগবাজি, মার্ক্সের খাবি খাওয়াতেও আমার কিছুই যায় আসে না। ছবি টাঙ্গালেই যেমন পার্টি অফিসে যেমন জ্যোতি বসুর আত্মা ভর করে না, দাঁড়ি রাখলেই যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীত আসে না, চে'র টি শার্ট পরলেই যেমন বলিভিয়ার জঙ্গলে বিপ্লব হয় না, হাওয়াই চটি পরে ঘুরলেই যেমন কেউ 'সততার প্রতীক' হয়ে যায় না, ২১শে জুলাই'র মঞ্চে পাগলু নাচিয়ে যেমন 'শহীদ দিবস' পালন হয় না, চোখ বন্ধ করে ট্রাফিক লাইটের নিচে নাচতে শুরু করলে যেমন সেটা ডিস্কো লাইট হয়ে যায় না, ঠিক তেমনই গলার জোরে 'সাঁইবাড়িও 'গণহত্যা' হয় না। গণহত্যার হিসেব-নিকেশ যদি করতেই হয়, তাহলে হোক সেটা, ইতিহাসের পাতা থেকে। যে ইতিহাস আত্মবলিদানের। যে ইতিহাসের পাতা বামপন্থীদেরই রক্তে ভেজা। যেখানে জমাট রক্তের রং লাল। শুধুই লাল...

শনিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৬

সখী, খিস্তি কাহারে কয় ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

"খিস্তি" শব্দটির ভিতরেই কিরকম একটি অনেক না-বলা ব্যঞ্জনা রহিয়াছে। খানিক নিষিদ্ধতা, খানিক ভীতি এবং যৎপরোনাস্তি ঘৃণা- এইসব মিলিত হইয়াই বোধহয় একেকটি বিশেষ শব্দ অসাধারণ অর্থবহ হইয়া উঠে এবং যেকোন মানুষের কর্ণপটাহে তথা মানসসাগরে নিদারুণ যাতনা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়। কিন্তু সত্যই কি তাই? নাকি সময়, অবস্থান, মানসিকতা এবং ব্যক্তিবিশেষে কোন একটি শব্দের অর্থের তারতম্য ঘটে?
সর্বাগ্রে এই আমার কথাই ধরি। শিশুকাল হইতেই "বইপোকা " হইবার সুবাদে তথাকথিত বড়দের, অতি-বড়দের বই-ও পড়িয়া ফেলিয়াছিলাম। পীতাভ, শুভ্র বা নীলাভ, বই পড়িবার ক্ষেত্রে কোনরূপ বর্ণবৈষম্য না থাকার ফলে আমি জাগতিক প্রায় সমস্ত রকম চলতি অশ্রাব্য গালিগালাজ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়া ফেলিয়াছিলাম অল্প বয়সেই। তথাপি মুশকিল ছিল যে, কিছুতেই একটি অশালীন শব্দও আমার মুখ গহ্বর হইতে নির্গত হইতে চাহিতনা। মনে মনে ভাবিতাম, বলিব, এই বার ঠিক বলিব, তথাপি কার্যকাল উপস্থিত হইলে কোন্‌ বারাঙ্গনার সন্তান যে আমার কণ্ঠরোধ করিয়া ফেলিত তাহা ভাবিয়া পাইতামনা। শুধু যে বলিবার সমস্যা ছিল তাহা নহে, কেহ কুবাক্য উচ্চারণ করিলেও রীতিমতন  শিহরিয়া উঠিতাম।   এমতবস্থায়, এক সুন্দর স্বর্নালী সন্ধ্যায় এক বালক-বন্ধু ইতিহাসে পঁচিশে পাঁচ পাইল এবং সমস্ত সম্পর্কের মাতা-ভগিনী করিয়া শিক্ষিকাকে শ্যালিকা সম্বোধন করিয়া বসিল। আমি যথারীতি চমকাইয়া উঠিয়া তাহাকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করিতেই বিকট মুখব্যাদান করিয়া আমাকে ভ্যাংচাইয়া আমার প্রাপ্ত পূর্ণমানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনপূর্বক সে আমাকে জানাইল যে এরূপ সম্বোধনই শিক্ষিকার প্রাপ্য, এবং যেহেতু ইহাতে আমার একটিও যৌনকেশ উৎপাটিত হইতেছে না সেহেতু নীরবতা পালনই আমার পক্ষে শ্রেয়!
অদ্যপি সকলেই জ্ঞাত আছেন যে বাঙালী  নারী কদাচ এরূপ বাচালতা সহ্য করেনা। সুতরাং আমিও ক্রোধে অন্ধ হইয়া, সমস্তরকম শিষ্টতা বিসর্জন দিয়া 'মূর্খ -সঙ্গমকারী'  বলিয়া তাহার হাত মোচড়াইয়া দিয়া দ্রুতপদে সেই স্থান ত্যাগ করিলাম। বালক-বন্ধুটি বিস্ময়াহত হইয়া স্থাণুবৎ হইয়া রহিল। "আমি তখন নবম শ্রেণী"।
সেই শুরু।
তাহার পর কলিকাতার রাজপথ দিয়া বহু জল প্রবাহিত হইয়াছে। আমিও বেশ অনেকগুলি বসন্ত পার হইয়া আসিয়াছি। মাতা ঠাকুরানী যাহা ছিলেন এবং মাতা ঠাকুরানী যাহা হইয়াছেন- তাহার মধ্যে সহস্র যোজন ব্যবধান। অদ্য নানাবিধ কুবাক্য অনায়াসে উচ্চারণ করিতে পারি এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটুকু পাপবোধ হয়না। শুধুমাত্র তাহাই নহে, উপরোক্ত শব্দাবলী আর তদ্রূপ অশালীন বলিয়াও বোধ হয়না। অবশ্য বহু ব্যবহারে তরবারির শাণিত ফলা-র তীক্ষ্ণতাও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, আর ইহা তো নিতান্তই আমার নিজস্ব শালীনতা বোধ!
যাহা হউক, এক্ষণে গৌরচন্দ্রিকা যথেষ্ট হইয়াছে, পূর্বোক্ত আলোচনায় ফিরি। "খিস্তি", এক অর্থে প্রকৃত সাম্যবাদের প্রবক্তা। যে খিস্তিসকল নগণ্য  রিক্‌শাওয়ালা  দিয়া থাকেন, সেই একই ভাষা আপনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রকোষ্ঠে বসিয়া আপনার ঊর্ধতন কর্মচারীর প্রতি প্রয়োগ করেন। বলাই বাহুল্য, যে catharsis-ও অভিন্ন দুই ক্ষেত্রেই। আবার, সামান্য দুইটাকা খুচরা না দিতে পারার হেতু অটো ওয়ালা  যে মুহূর্তে আপনার চৌদ্দ গুষ্টির গুহ্যদ্বারের  একশত আট করিতে থাকেন, তখন যেরূপ মনোবেদনা বোধ করেন, সেই একই বাক্য যখন কোন বন্ধুবর প্রয়োগ করে তখন সেরূপ প্রবল প্রসববেদনা হয়না। ইহার কারণ প্রথমেই উল্লেখ করিয়াছি, ব্যক্তি ও স্থানবিশেষে একই খিস্তির বিভিন্ন অর্থ হইয়া থাকে এবং মনোজগতে তার প্রভাবও ভিন্ন।
একটি উদাহরণ রাখিতেছি; আমার পরম পূজনীয় পতিদেবের এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু, যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে অতীব সম্মানিত, তাঁহার একটি মহৎ দোষ হইল যে হলাহল-সম আসব সামান্য অধিক পরিমাণে পান করিবার পর তিনি কিঞ্চিৎ অস্থির হইয়া পড়েন এবং তখন তাঁহার বাক্যাবলীর মধ্যে পুরুষের প্রধান অঙ্গটির (অধিকাংশ পুরুষের মতানু্যায়ী উহাই তাহাদের প্রধান অঙ্গ, মস্তিষ্ক নহে) একটি চলিত রূপের প্রয়োগ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।
অপর এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে কয়েক বৎসর পূর্বে আমার পতিদেব, এবং উল্লিখিত বন্ধুটি তাঁহার গৃহে গমন করেন। উষ্ণ পানীয় সমাপনান্তে যেক্ষণে সকলেই আহারাদিতে ব্যস্ত এবং বন্ধুর মাতৃদেবী স্বয়ং তদারকিতে, সেক্ষণে ইনি হঠাৎ বিগলিত হইয়া গদ্গদ কন্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিলেন, (পাঠকের বোধের সুবিধার্থে হুবহু প্রতিলিপি দেওয়া হইল), "মাসিমা, বাঁআ, মাংসটা যা বানিয়েছেন বাঁআ, ওঃ, বহুদিন পরে বাঁআ এমন মাংস খেলাম"।
ইহা শ্রবণ করিয়াও 'মাসিমা' র হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যে সহসা স্তব্ধ হইয়া যায় নাই, ইহাতেই প্রমাণ হয় যে এই কলিকালেও ভগবান আধা-জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান। ইহাতে আরো প্রমাণ হয় যে কথার মাত্রা হিসেবে, শুধুমাত্র নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশের নিমিত্তও কোন কোন সময় খিস্তি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যাঁহারা এরূপ করিয়া থাকেন, কাহাকেও মানসিক আঘাত দিবার জন্য নহে, শুধুমাত্র অভ্যাসের বশেই বলিয়া ফেলেন।
যাহা হউক, আরো একটি ব্যাপার হইল যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে নারীজাতির অবমাননা করা হয় খিস্তির মাধ্যমে। উহা লইয়া পৃথক একটি আলোচনা করিবার অভিপ্রায় রাখিলাম।ইয়ে, তেমন গুরুপাক কিছু নহে। 

ক্ষমা? ~ সুশোভন পাত্র

নিভিয়া'র বডিলোশেন নিয়মিত মাখলে নাকি আপনার স্ত্রী'র ত্বক এমন একটা বিশেষ মাত্রায় 'সফট' হবে যে ঘর ছেড়ে আপনার আর অফিস যাওয়াই দায়। ডাভ সাবানের যত্নশীল ব্যবহারে আপনার গালে আবার ফিরে আসতে পারে শৈশবের নরমতা। জনসন অ্যান্ড জনসনের ম্যাসাজ ওয়েলের দ্বি-প্রাহরিক মর্দনে আপনার শিশু পুত্রের পশ্চাদদেশের নমনীয়তা টেক্কা দেবে কাপার্সের কোমলত্ব কে। লোরিয়েলের লাস্যময়ী শ্যাম্পু আপনার মাথার চুল কে করবে গোড়া থেকে শক্ত এবং বাইরে থেকে নরম। আজকাল তো, ক্লোস আপের দয়ায় ৩২ পাটি দাঁত, সিন্ডিকেটের ক্যারিশমায় উড়ালপুলের স্ল্যাব, আর ভোটের বালাইয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সুরও নরম হচ্ছে। কিছুদিন আগেও যিনি সবাইকে "ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মেপে" নিচ্ছিলেন, "কত ধানে, কত চাল" কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিচ্ছিলেন, পুলিশ কে "চাবকে লাল" করে দিচ্ছিলেন, নিজেকে "রাফ এন্ড টাফ" দাবি করছিলেন, নিজের মার্কশিটে নিজেই ১০০/১০০ বসিয়ে ফেলছিলেন আর গলার শিরা ফুলিয়ে "আমাকে ধমকালে আমি চমকাই, আমাকে বর্ষালে আমি গরজাই", "তুমি বুনো ওল হলে আমি বাঘা তেঁতুল" -- ডায়লগে বাজার গরম করছিলেন, তিনি কিনা শেষে  করজোড়ে ক্ষমা চাইছেন? ভুল স্বীকার করে মানুষের করুণা আর সহানুভূতি ভিক্ষা করছেন?
তা কে আপনাকে ক্ষমা করবে ম্যাডাম? গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ খেয়ে মধ্যমকুমারির জঙ্গলে পড়ে থাকা সালকু সরেনের লাশটা? না মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, সালকুর মৃতদেহ সৎকার করতে  সাহস না করা গ্রামবাসীরা? কার সহানুভূতি আপনি চাইছেন? ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা? না, অজিত লোহার, পূর্ণিমা ঘড়ুই, জিতেন নন্দী, প্রদীপ তা, কমল গায়েন, সুদীপ্ত-সৈউফুদ্দিন হয়ে স্বপন মালিকের ১৭৫'র লম্বা তালিকাটা? কে আশীর্বাদ করবে আপনাকে দিদিমণি? সিঙ্গুরের  অনিচ্ছুক কৃষকরা? শালবনী আর নন্দীগ্রামের জমিদাতারা? ৬৮ লক্ষের গল্প শোনা টেট আর এসএসসি'র জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা বেকাররা? ৫০% বকেয়া ডিএ'র ভুক্তভোগী সরকারী কর্মচারীরা? ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরা? অনাহারে মরা চা-বাগানের শ্রমিকরা? এ রাজ্যের মানুষ আর আপনাকে আশীর্বাদ করে না ম্যাডাম।  বরং গত চার বছরের আপনার স্বেচ্ছাচারিতা কে আর দশ হাজার ক্লাব কে ৩৮৪ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে পোষা, আপনার তা-বেদরা-তোলাব-লুম্পেনদের-গুণ্ডা-চোর'দের ঘেন্না করে, ধিক্কার দেয়, জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়।
ঐ যেদিন আপনার হেলিকপ্টারটা গাঁয়ের মাঝ বরাবর, মাথার উপর দিয়ে পতপত করে উড়ে গেল, সেদিনই সন্ধ্যে বেলায় বসেছিলাম পার্টি অফিসে। সদ্য বন্ধ হয়েছে শিলাবৃষ্টি। চারিদিক অন্ধকার।পার্টি অফিসে যিনি এসে ঢুকলেন, বয়োজ্যেষ্ঠ'দের সম্বোধনে জানলাম তিনি সবার 'দীনু দা'। অবশ্য বার্ধক্যের ছাপে, মলিন পাঞ্জাবির অবয়বে, হাঁটু অবধি ভাঁজ করা কোমরের ধুতির বাঁধনে, পুরু কাঁচের চশমার চাউনিতে, আর হাতে ধরা শেষ সম্বলের লাঠির ভারে, তিনি বোধহয় 'দিনু জ্যাঠু' হিসেবেই  বেশি মানানসই।চারিদিকের ভ্রু-কুঞ্চিত ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলাম তিনি কনটেম্পোরারি অ্যান্ড্রয়েড কমরেড'দের কাছে বেশ অপরিচিতই। ঘরে ঢুকেই একঘর ভর্তি লোকের সামনে 'দিনু দা' তাঁর গভীর উদ্বেগ নিঃসংকোচে উগরে দিলেন
-মেশিনে না হয় আমি ভোটটা কেস্তায় দিলম, কিন্তু বুঝব কি করে যে আমার ভোটটা কেস্তাতেই পড়ল? অন্য কুথাও চলে যায় যদি?
ভালবাসার আশংকা থেকে নিঃসৃত এই অনর্থক উদ্বেগ কে বাকি সবাই মিলে প্রশমিত করেই তাঁকে একটা মডেল ব্যালটে ভোট দিতে বলা হয়। বোধহয় তাঁর দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার কথা ভেবেই  এই  অমূলক পরীক্ষা। একঘর লোকের সামনে প্রথম চেষ্টাতেই 'কাস্তেটা' চিনে ফেলে, গর্বের হাসি হেসে, পুরু চশমার ভেতর দিয়ে সবার দিকে ঘুরে, ঘুরে তাকিয়ে 'দিনু দা' বললেন
-৫২ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি ব। আর কেস্তা চিনতে লারবো? ইবার তো চিনতেই হবেক। গাঁয়ে হেলিকপ্টারও উড়বেক আর আমাদের ধান গুলাও পচে মরবেক, এইটা তো চলবেক নাই।
আশ্বস্ত 'দিনু দা'র নিশ্চিন্ত প্রস্থানের পরে শুনলাম, আগে নাকি তিনি নিয়মিতই এখানে আসতেন।বসতেন। কাজও করতেন।ভবঘুরে মানুষ। হঠাৎ কি যে হল, আসা বন্ধ করে দিলেন। গত ৮-৯ বছর আর এ পথ মাড়াননি একবারও। আজ এলেন। আবার এলেন। নিজেই এলেন। কে জানে কেন এলেন... 
ম্যাডাম, আপনার তো অপরিসীম ক্ষমতা। এতো শত মন্ত্রী-সন্ত্রী,আমলা,পুলিশ পাইক, বরকন্দাজ, পেয়াদা। আর সামান্য 'দিনু দা'রা কিনা আপনাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করছে? চিড় ধরিয়ে দিল আপনার অহংকারে? হিমালয়সম আত্মবিশ্বাসে? আচ্ছা, আপনি কি ভয় পেয়েছেন ম্যাডাম? তা বেশ করেছেন। ভয় আপনার পাওয়াই উচিত, 'দিনু দা'রা ফিরে আসছে যে, প্রতিদিন ফিরে আসছে, নিজের ঘরে ফিরে আসছে, জোটে বেঁধেই ফিরে আসছে, আপনাকে হারাতেই ফিরে আসছে...

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৬

অমিত মিত্র ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

কুমি কাপুরের লেখা ইমার্জেন্সির ইতিহাসের ওপর বইটা পড়ছিলাম। লেখিকা সাংবাদিক হয়েও তৎকালীন জনসংঘের প্রতি নিজের অনুরাগ গোপন করেন নি। তাতে সমস্যা নেই। তবে একটা ইন্টারেস্টিং অ্যানেকডোট শেয়ার করি।

ইমার্জেন্সির সময়ে সুব্রম্ম্যণিয়াম স্বামী পালিয়ে বেড়িয়েছেন অনেকদিন। স্বামী তখন জনসংঘের টিকিটে এমপি। নানাজী দেশমুখ, মানে তখন জনসংঘের প্রধান, স্বামীর স্ত্রী রোক্সনাকে বলেছিলেন বিদেশে গিয়ে জনসংঘ এবং আর এস এস-এর কর্মীদের ওপর যা যা অত্যাচার হচ্ছে সেগুলো নিয়ে প্রচার করতে। বিশেষত বিদেশের আরএসএস কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করতে যারা টাকাপয়সা এবং অন্যান্য সাহায্য দিতে পারেন। রোক্সনা বিদেশে গিয়ে দেখেছিলেন লন্ডনে বসবাসকারী আরএসএস-রা বেশ ভয় পেয়েছেন। সাহায্য করতে রাজী নন। কিন্তু আমেরিকায় আরএসএস কর্মী যারা আছেন তারা প্রচুর হেল্প করেছিলেন। রোক্সনা বিশেষত উল্লেখ করেছিলেন পেনসিলভানিয়ার ফ্র্যাংকলিন মার্শাল কলেজের অধ্যাপক দম্পতির কথা যারা আরএসএস কানেকশন কাজে লাগিয়ে রোক্সনাকে সাহায্য করেছিলেন।

দম্পতির নাম মীরা এবং অমিত মিত্র। দ্বিতীয়জন পরবর্তীকালে পশ্চিমবংগের অর্থমন্ত্রী হন।

(Page 135, The Emergency: A Personal History-Coomi Kapoor, Penguin Viking, 2015)