সোমবার, ১৩ এপ্রিল, ২০০৯

গোর্খাল্যান্ড ২ ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য



পর্ব-২
পার্বত্য পরিষদের গঠন ও তার পর---



২৬ এ আগষ্ট, ১৯৮৮ সালে রাজ্য সরকারের সদিচ্ছা আর ইতিবাচক ভূমিকায় পত্তন হয়, দার্জিলিং গোর্খা পার্বত্য পরিষদের। এই স্বশাসিত সংস্থা এর নাম করন হয় দার্জিলিং গোর্খা হিল কাউন্সিল (DGHC)। ওই দিনে শ্রী জ্যোতি বসু, মুখ্যমন্ত্রী আর সুভাস ঘিসিং(DGHC) এর মধ্যে এই সংস্থা এর চুক্তি সই হয়। সেই অনুষ্টানে উপস্থিত ছিলেন শ্রী বুটা সিং, সি জি সমাইয়া আর রবিন সেনগুপ্ত। সর্বশ্রী নির্মল বসু, কানাই ভোমিক, ্যতিন চক্রবর্তী, কিরণময় নন্দ, হারকিষেণ সিংসুরজিৎ, আবদুস সাত্তার আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য্য ঊপস্থিত ছিলেন সাক্ষী হিসেবে। বর্তমানে আমাদের রাজ্যের সজ্জন গষ্টি এবং সংবাদমাধ্যম বোধহয় জানেন না যে সেই চুক্তি তে কি ছিলো। সেই চুক্তি তে পরিষ্কার আছে যে দেশের স্বার্থে এবং দেশের সার্বোভৌমত্বর জন্যে এবং প্রধানমন্ত্রির অনুরোধে, জি এন এল এফ আলাদা” গোর্খাল্যান্ড” এর দাবি পরিত্যাগ করছে এবং রাজ্য সরকারের আইন এবং বিধি অনুযায়ী, পাহাড়ের মানুষের আর্থসামাজিক, শিক্ষাগত এবং সাংষ্কৃতিক উন্নয়ন এর ধারা কে জারি রাখতে, পার্বত্য পরিষদের এর গঠনের প্রস্তাব কে অনুমদন করছে এবং সহমত পোষণ করছে। সেই চুক্তির কিচ্ছু দরকারি বিশ্লেষন তুলে দেওয়া হল।


১) পরিষদের নাম হবে দার্জিলিং গোর্খা হিল কাঊন্সিল।

২) এই পরিষদের কার্য্যের বা উন্নয়নের jurisdiction হবে দার্জিলিং জিলার দার্জিলিং, কার্সিয়াং আর কালিম্পং মহাকুমাএবং সাথে আছে লোহাগড় চা বাগান, লোহাগড় বন, পানিঘাটা, রঙ্গমোহন, বরাচেংগা, ছোটো আদলপুর, পাহাড়, সুখনাবন, সুখনা-পার্ট -১, শানন্দাপতি বন - ১, মহানদি বন, চম্পাসারী বন আর সালবাড়ি চাট- পার্ট ২ মৌজা। এই মৌজা গুলি সব ই শিলিগুড়ি মহাকুমা অন্তর্গত। তাছাড়া এই চুক্তি তে লেখা আছে যে পরিষদ গঠনের পরে, রাজ্য সরকার পরিষদকে প্রশাসনিক কাজের এবং তৎসহ পারিষধিয় উন্নয়ন এর জন্যে জমি দেবে লিজ বা অন্য কোনো উপায়ে। এবং সেই জমি দেওয়া হবে শিলিগুড়ি মহাকুমা অন্তর্গত দার্জিলিং মোড়ের কাছে।

৩) পরিষদের প্রশাসনিক এবং কার্য্যকারি ক্ষমতাপরিচালিত এবং পরিদর্শিত হবে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারে মাধ্যমে। জনগনের উন্নয়ন এর জন্যে এবং সর্বসাধারণের স্বার্থে, সংরক্ষিত বনাঞ্চল এবং তৎসহ অন্য কনো কারণ ছাড়া, পরিষদের যে কোনো জমি অধিগ্রহন করার ক্ষমতা থাকবে নিম্নলিখিত ঊন্নয়ন প্রকল্পে----১) বনাঞ্চল সম্প্রসারণ ২) কৃষি কার্যের স্বার্থে সেচ এর জলের জন্যে ক্যানেল এর ব্যাবস্থা ৩) কৃষি কাজ ৪) স্বাস্থ্য ব্যাবস্থা এর পরিকাঠামো ৫) পর্যটন শিল্প ৬) শিক্ষা ব্যাবস্থার পরিকাঠামো ৭) জনকল্যানমূলক কাজ---্যেমন রাস্তা ঘাট এর ব্যাবস্থা---- তার পরিদর্শন এবং মেন্টেনেন্স (জাতিয় ও রাজ্য সড়ক বাদে)

৪) পঞ্চায়েতের নিয়ন্ত্রনের বাইরে বাজার সমিতি নিয়ন্ত্রন এবং পরিচালনের দায়িত্ব।

৫) শিক্ষা র বিকাশ এর নিয়ন্ত্রণ, প্রাইমারী, মাধ্যমিক এবং উচ্চ্যমাধ্যমিক স্তর অবধি।

৬) ক্ষুদ্র এবং কুটির শিল্পেরপ্রসার ও নিয়ন্ত্রন।

৭) পঞ্চায়েত এবং পুরসভার ঊন্নয়নমূলক, প্রশাসনিক কাজকর্ম নিয়ন্ত্রন এবং পর্যবেক্ষন। এই পার্বত্য পরিষদের ৪২ টি সদস্য সংক্ষ্যার মধ্যে, ২৮ জন নির্বাচিত হবেন আর বাকিরা হবেন রাজ্য সরকার থেকে মনোনিত। এই পরিষদের একটি নিজস্ব এক্সিকিউটিভ বডি থাকবে এবং পরিষদের চেয়ারম্যান এবং ভাইস চেয়াম্যান স্বাভাবিক ভাবে এই এক্সিকিউটিভ বডির সদস্য হবেন। এই এক্সিকিঊটিভ কাউন্সিল এর চেয়ারম্যান হবেন স্বাবাভিক ভাবেই পরিষদের চেয়ারম্যান যিনি একজন পূর্ণ রাজ্য মন্ত্রীর সন্মান এবং দায়িত্ব ও পাবেন।


ঊল্লেখ্য যে এই পার্বত্য পরিষদের নির্বাচন শেষ করতে হবে ১৫ই ডিসেম্বর’ ১৯৮৮ এর মধ্যে। গোর্খাল্যান্ড দাবির সাথে জড়িত বিভিন্ন অপরাধ মূলক দোষে দোষী ব্যাক্তি দের বিরুধ্যে আইনী ব্যাবস্থা নেবার ব্যাপারে রাজ্য সরকার পুনরায় বিবেচনা করবে। এই পূণর্বিবেচনার প্রক্রিয়াকরণ শুরু হবে এই চুক্তি সই এর ১৫ দিন এর মধ্যে।


ধংস্বাত্বক কাজকর্মে লিপ্ত দোষী ব্যাক্তি দের ব্যাপারে চুক্তির বয়ান কি বলছে----?

১) খুন ব্যাতিরেখে যে সরকারি কর্মচারিরা অন্যান্য ধ্বংস্বাত্বক কাজকর্মের সাথে লিপ্ত ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যাবস্থা রাজ্য সরকার তুলে নেবে।
২) গোর্খা ন্যাশানাল লিবেরেশন ফ্রন্ট তার সদস্য দের ঊদ্দেশ্যে একটি লিখিত বিবৃতি জারি করবে যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তাদের কাছে সঞ্চিত বিভিন্ন অস্ত্র জেলা প্রশাসন এর হাতে তুলে দিতে হবে। এর জন্যে তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যাবস্থা নেওয়া হবে না।
৩) প্রকারান্তে জি এন এল এফ কেও নির্দিষ্ট দায়িত্ব নিয়ে সমস্তরকমের ধ্বংসাত্তক কাজকর্মের থেকে বিরত হতে হবে এবং রাজ্য সরকারের সাথে মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে পাহাড়ে শান্তি, উন্নয়ন এর ধারাকে বজায় রাখতে হবে।


এই ঐতিহাসিক চুক্তিতে সই করেন পশ্চিমবঙ্গের তৎকালিন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী জ্যোতি বসু, জি এন এল এফ প্রধান শ্রী সুভাষ ঘিসিং এবং কেন্দ্রীয় সরকারের তরফে মুখ্য সচিব শ্রী সি জি সোমাইয়া।


কিন্ত এই চুক্তি সই হবার ২০ বছর পার হয়ে যাবার পর দেখা যে পাহাড়ের মানুষের স্বার্থে সার্বিক কোনো উন্নতি হয় নি। কোটি কোটি টাকা নয়ছয় করে এই ডি জ়ি এইচ সি র প্রধানেরা ফুলে ফেপে ঊঠেছে। ঊপরের স্তরে গনতন্ত্র দেখালেও অন্তরীক্ষে গনতন্ত্রকে হত্যা করা হয়েছে। চোরাগোপ্তা বাঙ্গালী বিদ্বেষ তো ছিলোই কিন্ত তার সাথে জুড়ে whisper campaigning করা হতো যে সি পি আই এম বাঙ্গালী দের পার্টি এবং নেপালী দের শত্রু। সি পি আই এম পাহাড়ে কোনো জায়গায় সভা করলেই আগের থেকে এই DGHC সেখানে বন্ধ ডেকে দিতো এবং স্বাবাভিক ভাবেই পার্টির কর্মী - সদস্য রা সেই সভাস্থলে আসতে পারতেন না। সব কিছুর মধ্যেই ছিলো কংগ্রেসী মদত। পাহাড়ে সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে কর্মরত বাঙ্গালি কর্মচারিদের ওপর চলতো মানসিক অত্যাচার। জাতপাত নিয়ে অশ্লীল গালি-গালাজ শুনতে হত। এই ব্যাপারে আমিও ভুক্তভূগি। প্রতিবাদ করলেই সন্ধ্যেবেলায় নেশাখোরদের হাথে মার। যাই হোক এই উন্ন্যয়নখাতের অর্থের লুন্ঠনের ব্যাপকতা, সাথে মারাত্মক ভাবে প্রচারিত সাম্প্রদায়িকতা এবং পাহাডের এক শ্রেনীর মানুষের ক্রমবর্ধমান পূঁজি প্রমান করেছিলো এই পূঁজিপতি-সামন্ত্রতান্ত্রিক শ্রেনীর দৈন্যতা। সাথে প্রমান করে কংগ্রেসের সাপ্রদায়িক , আধা-ফ্যাসিস্ত দের লেজুড়বৃত্তি। জি এন এল এফ এর ২০ বছর অপশাসন এর ফলে সাধারণ গরিব শ্রমজিবি মানুষের মধ্যে তিব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। জি এন এল এফ থেকে বেরিয়ে আসে কিছু গষ্ঠি, এই ঘটনা আবার প্রমান করে, পূঁজিবাদী সামন্ত্রতান্ত্রিক ব্যাবস্থার ভঙ্গুর অবস্থা । যাই হোক সুভাষ ঘিসিং বুঝতে পারে যে তার নাম তলানিতে ঠেকেছে এবং পরবর্তি হিল কাউন্সিল এর আগেই তোরজোড় আরম্ভ করে দেন ষষ্ঠ তপশিল এর দাবিতে আনন্দলোন। আবার অশান্ত পাহাড়, আবার দিন এর পর দিন বন্ধ, রাস্তা অবরোধ, সরকারি অফিস বন্ধ, বন্ধ চা বাগান, রিক্ত চা শ্রমিক, বেহাল পর্যটন শিল্প... ইত্যাদি ইত্যাদি। রাজ্য সরকার পাহাড়ের শান্তি বজায় রাখার জন্যে ষষ্ঠ তপশীল এর অন্তর্ভুক্তির দাবি বিবেচনার জন্যে আশ্বাস দেয়। জি এন এল এফ , রাজ্য সরকারের পাহাড়ে শান্তি প্রক্রিয়া বজায় রাখার এই ইতিবাচক ভূমিকাকে, ভাবে রাজ্য সরকারের দুর্বলতা এবং হার, আর তাদের জিত। তাই সেই জিত এর উপলক্ষে তারা দার্জিলিং এর ম্যাল এবং পাহাড়ের সর্বত্র বিজয় মিছিল করে। বর্তমান জনমুক্তিমোর্চার সভাপতি সেইদিন, সেই বিজয় মিছিলের পুরোভাগে ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ কয়েক মাসের মধ্যে পরিস্থিতির আমুল পরিবর্ত্তন হয়ে যায়। জি এন এল এফ ভেঙ্গে বেরিয়ে আসে প্রচুর সমর্থক এবং তাদের নেতা হন বিমল গুরুং স্বয়ং। তিনি গঠন করেন গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা। তাদের দাবিতে দেখা যায় আমুল পরিবর্ত্তন। তাদের দাবি হয়...”dssolve hill council”…” remove Ghising”….”We want separate GORKHALAND including Siliguri and Dooars and no 6th schedule….etc etc”….” ইত্যাদি ইত্যাদি। আবার পাহাড়ে জ্বলে আগূন। দিন এর পর দিন বন্ধ। সাধারণ মানুষের জ়ীবন হয়ে ওঠে ওষ্ঠাগত। গুরুং , ঘিসিং এর ৩০ দিনের বন্ধ এর রেকর্ড ভেঙ্গে দেন। চলে বন্ধ আর হিংসাশ্রয়ী আনন্দোলনের কম্পিটিশন। ওনারা দাবি করেন যে ওনারা নাকি ওনাদের গোর্খাল্যান্ড এর দাবি তে “গান্ধীবাদি” আনন্দোলন করছেন কিন্ত তা কতটা গান্ধীবাদী তার কিছু নজির নিচে পেশ করা হোলো।



১) পাহাড়ে সি পি এম পার্টি অফিস ভাংচুর, পার্টি অফিস আগুন দিয়ে পোড়ানো। লাল ঝান্ডা ছিড়ে নিয়ে পার্টি অফিসের মাথায়ে নিজেদের ফ্ল্যাগ লাগানো। সি পি আই এম পার্টি সদস্য ও সমর্থকদের সামাজিক বয়কট, তাদের বাড়ির জলের লাইন কেটে দেওয়া, তাদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের স্কুলে জেতে না দেওয়া, তাদের বাড়ির সামনে সর্বক্ষন গার্ড দেওয়া, তাদের পার্টি ছেড়ে দেবার জন্যে হুমকি দেওয়া, না ছাড়লে পাহাড় থেকে তাড়িয়ে দেওয়া, সি পি আই এম এর সব রকম জনসভা বলপূর্বক বানচাল করা। এখানে উল্লেখ্য যে এই অত্যাচার হয়েছে এবং এখন হচ্ছে কেবলমাত্র সি পি আই এম দলের সমর্থক ও সদস্যদেরওপর। ওন্যরা সবাই সাধু।

২) রাজ্য পুর ও নগোরোন্নয়ণ মন্ত্রী শ্রী অশোক ভট্টাচার্য্য কে তার বিধানসভা এলাকা অন্তর্ভুক্ত এলাকা মিরিকে ঢুকতে না দেওয়া। এবারের লোকসভাতে নির্বাচনেদার্জিলিং লোকসভা তে সি পি আই এম প্রার্থী শ্রী জিবেশ সরকারকে পারাডে প্রচার আর কর্মিসভা করতে বাধা দেওয়া ইত্যাদি।


৩) প্রায় এক বছর বকেয়া বিদ্যুত, দুরভাষ দপ্তরের বিল। তাদের ক্যাশ কাউন্টার আর ডিসকানেকশনের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা মোর্চার। প্রাইভেট এবং কমার্শিয়াল গাড়ীর ওপর নাম্বার প্লেট এর অপর WB মুছে GL লেখা বাদ্ধ্যতামুলক। রাজ্য সরকারি দপ্তরের বোর্ডের ওপর Government of West Bengal মুছে Government of Gorkhaland লিখে দেওয়া হচ্ছে এবং সম্পুর্ণ বেয়াইনি ভাবে। গাড়ীর নাম্বার প্লেট এর অপর GL লেখা হচ্ছে শুকনা থেকে আর সেবক থেকে। পাহাড়ে রাজ্য সরকারি বাকি দপ্তরে যেমন ভূমি সংস্কার , এম ভি আই ( মটর ভেইকেলস) দপ্তরে রাজস্ব আদায়ে মানা।

৪) পাহাড় ও সমতলে মোর্চা সমর্থকদের নানা সাম্প্রদায়িক প্ররোচোনামূলক উক্তি। মোর্চার নেতারা পাহাড়ের থেকে শিলিগূড়ি এবং ত্বরাই এলাকাতে মিছিল, মিটিং করতে আরো বেশী তৎপর । এই সব সমতল এবং ত্বরাই এলাকাতে বেশী রকম সাম্প্রদায়িক উক্তির মাধ্যমেয় মোর্চার নেতারা এইসব অঞ্চলে আরো বেশী মাত্রায় গন্ডগোল পাকাতে উদ্যত। বছর খানেক আগের ঘটনা। মোর্চার নেতারা ২০০৮ সালে ইন্ডিয়ান আইডল খ্যাত প্রশান্ত তামাং এর চিত্র নিয়ে মিছিল করলেনপাহাড়ে। তারপরেই শিলিগুড়িতে এসে ওনারা নানান ছুতোয়ে, ভেনাস মোড়ে টাঙ্গানো ইন্ডিয়ান আইডল রানার্স খ্যাত আমিত পালের চিত্র পোড়ালেন। শুরু হয়ে গেলো সাম্প্রদায়িক লড়াই, চললো টিয়ার গ্যাস, গুলি, ১৪৪ ইত্যাদি ইত্যাদি। এর পর সুযোগ পেয়ে গেলো “আমরা বাঙ্গালী” সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়াতে।

৫) চাবাগান গুলি বন্ধ। চা শ্রমিক দের ঊপার্যনের পথ বন্ধ। সেখানকার ট্রেড য়ুনিয়ন সি আই টি ঊ এর সমর্থ, সদস্য এবং নেতারা বিতাড়িত।

৬) স্কুল, কলেজ দিনের পর দিন বন্ধ রেখে সেখানকার ছাত্র ছাত্রী দের বলপূর্বক মিছিলে এবং অনশনে নিয়ে আসা।

বর্তমানে এই ভাবে এবং আরো নানান ভাবেই চলছে মোর্চার “গান্ধীবাদি “ আন্দোলন। এর সাথে তাল মিলিছে আমাদের পাড়াতুতো দিদির দল। দিদির এক সাগ্রেদ তো সোজাসুজি শুকনা তে গিয়ে মোর্চার অনশন মঞ্চে গোর্খাল্যান্ড এর দাবি কে সমর্থন জানিয়ে আসলেন। এরপর স্বয়ং গুরুং বাবু সোজা লালগড়ে গিয়ে আদিবাসী - মাওবাদী দের বিপথে চালিত আন্দোলন কে ঊস্কে দিয়ে আসলেন। এই দিকে উত্তরবঙ্গে চলছে মোর্চার সাথে আদিবাসী বিকাশ পরিষদের এক অশুভ আঁতাত। এইদিকে রাজ্যের প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শিলিগুড়ি তে এসে বলে গেলেন যে ওনারা আলাদা রাজ্যের দাবি মানেন না, অথচ তৎকালিন জি এন এল এফ এর সাথেয় কংগ্রেসে এর অশুভ আঁতাত এর ফল বর্তমান দার্জিলিং লোকসভা কেন্দ্রে কংগ্রেসী সাংসদ পরের দিন ই বললেন যে কংগ্রেস গোর্খাল্যান্ডের দাবি কে সমর্থন করে। তাই চারদিকেই চলছে এক রাজ্য ভাঙ্গার চক্রান্ত। মমতার সাথে তাই সমান ভাবে পাল্লা দিচ্ছে বিমল গুরুং। মমতার কারখানা তাড়ানোর স্টাইলে ঊনি পাহাড়ে যা করছেন তাতে পাহাড়ে পর্যটক যাওয়া বন্ধ হবে তাই নয়, ক’দিন বাদে অনেককে পাহাড় ছেড়ে অন্যত্র বসবাসের পরিকল্পনা নিতে হবে। নেপালের রাজা বা প্রধানমন্ত্রীও যে পোষাক পড়েন না, ঊনি হুঙ্কার দিলেন দার্জিলিংবাসীকে(স্কুল ছাত্র-ছাত্রী সহ) সেই নেপাল দেশের পোশাক পরতে হবে। অথচ ওখানে লেপচা, ভুটিয়া, তিব্বতী, বাঙ্গালী, আদীবাসী, হিন্দুস্থানী মানুষ আছেন। দেখে তো মনে হয় যে গুরুং বাবু আলাদা দেশ পেয়ে গ্যাছেন। সম্প্রতি একটি টিভি চ্যানেল খুব ই তাৎপর্যপূর্ণ এবং উত্তেজনা পূর্ণ একটি খবর প্রকাশ করেছে। মাওবাদীদের তিন শীর্ষ নেতা দার্জিলিং গেছেন বিমল গুরুং এর সাথে গোপন সভা করার জন্যে। আলোচ্য বিষয় ঊত্তরবঙ্গকে টুকরো টুকরো করে কে কোনটা পাবে। কার্জনীয় নীতি বহাল এখোনো। তফাৎ খালি বাইরে শ্যাম চাচা দের সাথে আভ্যান্তোরিণ বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির গোপন আঁতাত। একটা এলাকার দাবিদার কামতাপুরিরা আর একটা ঊত্তরখন্ডীরা সাথে আদিবাসীদের জন্যে ডুয়ার্সের খানিকটা চাই। সর্বোপরি গোর্খাল্যান্ড। ম্যাপে ম্যাপে ঠোকা-ঠুকি চলছে। মাওবাদী মাইনওয়ালারা গ্যাছেন শান্তিপূর্ণভাবে, সবাই মিলেমিশে যাতে চুটিয়ে অশান্তি করতে পারে তার পাকাপাকি ব্যাবস্থা চলছে। প্রশ্ন শুধু বাংলা ভাগের নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মুল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করার। নেপালের ত্বরাই এর মদেশীয়দের বাড়বাড়ন্তের বদলা নাকি আরো কিছু।

ঈতিহাসের দিক থেকে বিশ্লেশন করে দেখলে বোঝা যায় যে দার্জিলিং কোনোদিন ই নেপালী দের নিজস্ব জায়গা বা (place of origin) ছিলো না। গোর্খা বলতে আমরা কিন্ত আলাদা জাত বুঝি না। এই অঞ্চলে ব্রিটিশেরা কিছু লেপচা সম্প্রদায়ের লোকজনদের নিয়ে এসেছিলো তাদের খানসামাগিরীর জন্যে। এদের ব্রিটিশ রা নিয়ে এসেছিলো সিকিম থেকে। তাছাড়া কিছু লোকাল জনজাতি ছিলো যাদের ভুটানী বলা যেতে পারে। কিন্ত তাদের গোর্খা কিছুতেই বলা যায় না। নেপাল ও ভুটান থেকে ক্রমাগত সামরিক আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য, স্বাধীন এবং ততোধিক দুর্বল রাজ্য সিকিম, ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দ্বারস্থ হয়। ফলত নেপাল ও ভুটান আক্রমণ করা বন্ধ করে এবং সিকিম রাজ, দার্জিলিং, কালিম্পং ,শিলিগুড়িএবং কাশিয়াং, ব্রিটিশদের (মানে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী) হাথে দেয় লিজ ভীত্তিতে। ১৯০৭ সালে জলপাইগুড়ির কিছু অংশ নিয়ে শিলিগুড়ি মহাকুমা তৈরী হয়। প্রফেসর হরেন ঘোষের লেখা থেকে পাওয়া যায় যে কালিম্পং আগে ভুটান রাষ্ট্রের অধীনে ছিলো।


তাই আমাদের বুঝতে অসুবিধে নেই যে এই দার্জিলিং জেলার কোনো অংশই ণেপাল রাষ্ট্রে মধ্যে ছিলো না। চার মহাকুমা নিয়ে এই দার্জিলিং জেলা ব্রিটিশ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই জেলা টাকে লিজ নেয় বাৎসরিক তিন হাজার টাকার চুক্তিতে। এই চুক্তিটা হয় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে সিকিম রাজ এর , ১৮৩৫ সালে। ব্রিটিশ দার্জিলিং জেলা টাকে তাদের নিজস্ব সোসাইটিতে পরিনত করে। ওরা এখানে ওদের সিপাইদের ছাউনী করে এবং সাথে তৈরী করে শিক্ষা প্রতিষ্টান, হাসপাতাল। জলাপাহাড় আর লেবং এ তৈরী হয় সেনা ছাউনী। ১৮৬৫ সালে মকাইবাড়িতে চা চাষ আরম্ভ হয় এবং সেই জন্যে তাদের প্রচুর চা-শ্রমিকের দরকার পড়ে। এই ক্ষেত্রে নেপাল রাজ্য থেকে রুজিরুটির জন্যে হাজার হাজার নারী পুরুষ এই জেলাতে আসে। এই জনতার একটা বড়ো অংশ যোগ দেয় ব্রিটিশ ফৌজে এবং গোর্খা রেজিমেণ্ট এই ভাবেই তৈরী হয়। ১৮৮০ সালে প্রথম টয়-ট্রেন চালু হয়। পরবর্তি কালে এবং সময়ে এই দেশে নানা রাজ্য থেকে মানুষ আসে এখানে ব্যাবসা-বানিজ্য, চাকরির এবং নানান ব্যাবসায়িক কাজে এবং অনেকেই এখানে স্থির ভাবে বসবাস করে বাড়ি-ঘর বানিয়ে থাকতে আরম্ভ করে।

সাধারণ লোকসভা নির্বাচনে এই জেলায়রাজনৈতিক বিশ্লেষনঃঃ-

দেশের পনেরো তম লোকসভার নির্বাচনের দামামা বেজে ঊঠেছে। চারিদিকে হই হই রই রই। সাথে মেডিয়ার ভোট নিয়ে দৈনিক লম্ফঝম্ফ। এই নির্বাচন একটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ সময়ে হচ্ছে, যখন সারা পৃথিবির পুজিবাদী অর্থনিতির প্রানকেন্দ্রআমেরিকা , ব্রিটেনের মত পূঁজিবাদী অর্থনিতির এবং পূঁজিবাদী অর্থনিতির ধারক ও বাহক দের মাথায় হাত পড়ে গেছে। বিশ্ব লগ্নীপূজির প্রানকেন্দ্র ওয়ালস্ট্রিটে ফেটে গিয়েছে ৯/১১ এর মতন আরেকটি বড়ো বিস্ফোরন যার দায়িত্ব আজ আর মার্কিন প্রশাসন কমুউনিস্টদের ঘাড়ে বা কোনো সন্ত্রাসবাদীদের ঘাড়ে ফেলতে পারছেন না। আন্তর্জাতিক লগ্নিপূজির সারা বিশ্বে অবাধ চলাচলের ফলের বহু আকাঙ্কিত এবং সর্বসময়ে বহু প্রতিক্ষিত লাভের বুদ বুদের বিষ্ফারণ ঘটেছে। এই বিষ্ফারণের কম্পণ আজ সারা পৃথিবির সব দেশ গুলি কম -বিস্তর অনুভব করছে। এই আর্থনৈতিক মন্দার প্রভাব ১৯২৯ -৩০ সালের বিশ্ব -মহামন্দা কেও ছাপিয়ে গেছে। এই পূজিবাদী অর্থনৈতিক ব্যাবস্থা কেবাঁচাতে কোনো রকমের কোরামিন-ইন্সুলিনে কাজ দিচ্ছে না। উপায় একটাই, আরো উদারিকরণ এবং আরো স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার বাড়ানো। তাই এখন ভারত লক্ষ্য, চিন কে ঘাটিয়ে লাভ নেই। আজ আমাদের দেশে র এই আসন্ন নির্বাচনে সারা বিশ্বের লগ্নিপুজির লক্ষ্য ভারত, কারণ সে তার মালিকের মর্জির তোয়াক্কা করে না। তাকে বাড়তে গেলে, তার আরো স্বাধীনতা চাই। তার অবাধ চলাচল কে এই দেশে নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তাই আজ তার তাবেদার আমেরিকা নিশ্চিত করতে চায় যে এই নির্বাচনে যাতে বাম বা কমিউনিস্টদের শক্তি খর্ব করা যায়। তার জন্য ঢালো ডলার, যে করেই হোক, পশিমবঙ্গকে ছিন্ন-ভিন্ন করো। যাতে বামেরা দুর্বল হয় আর কেন্দ্রে শ্যামচাচাদের স্ট্র্যাটেজিক ভাস্তেরা ক্ষমতায় আসে। এই অভিপ্রায়ে, তাই ডলার ঢালা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের সব বিচ্ছিন্নতাকারী এবং প্রতিক্রিয়াশিল শক্তিগূলোকে উজ্জিবিত করার জন্যে। এই ডলারের ইঞ্জেকশন শুধু আমাদের দেশেই নয়, নেপালে, মধেশীয়দের মধ্যেও দেওয়া হচ্ছে। ওদের মারফৎ টাকা থুরি ডলার এবং বন্দুক এই জিলা তেও আসছে। এই ঘটনা কংগ্রেস এবং বি জে পি উভয়েইজানে। তাই মোর্চাকে এতো তোষন। আমাদের পাড়াতুতো দিদিভাই ও আছেন ইদূর দৌড়ে, কিন্তু ওনার জ্ঞ্যন-গম্মি কম বলে ইদূর দোঊড়ে টিকতে পারলেন না বা শয়তানি বুদ্ধি মারাত্মক বলে বি জি পি কে লেলিয়ে দিলেন। অথয়েব বি জ়ে পী মোর্চার মন পেতে সমর্থ হলো। তুমুল দরা দরিতে কংগ্রেস পিছিয়ে গেলো। দার্জিলিং এ মোর্চার দাবি পৃথক গোর্খাল্যান্ড এর দাবি সমর্থন করলো বি জ়ে পী। সর্বোচ্চ দর দিয়ে দার্জিলিং লোকসভা আসনে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনে আদায় করে নিলো বি জ়ে পি। বি জ়ে পি র ইস্তেহারে কিন্ত প্রধানত হিন্দুত্ববাদ আর ঊদারনীতির তাবেদারী ছাড়া কিচ্ছুই নেই এবং তারা কিন্ত কিন্ত আগে মুখে কখনো আলাদা রাজ্যে প্রশ্ন তোলেনি। এমনকি ওদের প্রধানমন্ত্রী পদে ঘোষিত প্রার্থী এল কে আডবানী পর্যন্ত কয়েকদিন আগে এই গোর্খাল্যান্ডের দাবি নস্ব্যাৎ করেছিলেন, কিন্ত ঠিক এই ভোট দানের কয়েকদিন আগেই বি জ়ে পি এই গোর্খাল্যান্ডের দাবি কে সমর্থন করলেন এবং সুদুর রাজ্বস্থান থেকে প্রার্থী হয় দাড়ালেন যশোবন্ত সিং, যাঁর দার্জিলিং বা তার ভুমির সাথে কনো রকম প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যোগাযোগ নেই। এখন শুনছি যে তিনিই নাকি গুরুং পক্ষের হয়ে পাহাড়ে এসে দাবি তুলেছেন। দার্জিলিং এর পাহাড়ের মানুসষের কাছে মোর্চা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো যে জাতিয় দল পরিষ্কারভাবে আলাদা রাজ্য গোর্খাম্যান্ড আদায়ে তাদের সমর্থন করবে, সেই দল বা প্রার্থীকেই তারা সমর্থন জানাবে। এতদিন পর্যন্ত যে কংগ্রেস দল মোর্চার সমর্থন পাবার জন্য ঊদগ্রীব হয়ে ছিলো, সেই দলের কিছু নেতাদের দেখা যাচ্ছে গোর্খাল্যান্ডের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে! কারণ তাদের সমর্থন পাওয়ার যখন আর কোনো সম্ভাবনা কংগ্রেস দেখতে পেল না, তখনই তারা মুখ খুললেন। অথচ মোর্চার সমর্থন পাবার ব্যাপারে তারা প্রায় নিশ্চিত ছিলেন। এই প্রসঙ্গে ইদানিংকালে জি এন এল এফ প্রধান সুভাষ ঘিসিং এর নির্বাচনী ততপরতা ইংগিতপূর্ন, কারন এখন তার পুরোনো বন্ধু কংগ্রেসের দরকার পড়তে পারে। যাই হোক, এই কংগ্রেসে এর মোর্চাকে সমর্থনের দ্বিচারিতা লক্ষনীয়। চিদাম্বরমের সাথে যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিলো দিল্লি থেকে টেলিফোনে এমন কথাই জানিয়েছিলেন মোর্চার এক নেতা। তা প্রকাশিত হয়েছিলো একটা নেপালী দৈনিকে। তিনি নাকি মোর্চার নেতাদের আলাদা রাজ্যের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছিলেন এবং একথাও বলেছিলেন ১৯৪৯ সালেই আলাদা রাজ্য হওয়া উচিত ছিলো। তৎঅকালীন কংগ্রেস নেতারা এই বাস্তবতা কে উপলব্ধি করতে পারেননি। যদিও পরে তিনি এই সংবাদকে অস্বীকার করেছেন। কংগ্রেসের পক্ষে সরাসরি গোর্খাল্যান্ডের দাবির পক্ষে বলা সম্ভব নয় বলেই, পরোক্ষভাবেই ছোটো ছোটো রাজ্যের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নেওয়া হয়েছিলো, স্রেফ দার্জিলিং আসনে কংগ্রেসের পক্ষে মোর্চাকে পাওয়ার জন্যে। কিছুদিন আগে বিদেশমন্ত্রী এবং প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রনব মুখার্জি গিয়েছিলেন শিলিগুড়িতে। তিনি সরাসরি বাঙ্গলা ভাগের দাবি ঊড়িয়ে দিয়েছিলেন। আর তার পরের দিনই কংগ্রেস সাংসদ ও দার্জিলিং আসনে বর্তমান কংগ্রেস প্রার্থী দাওয়া নরবুলা প্রনব মুখার্জির বক্তব্যকে খন্ডন করে পরিস্কারই জানিয়ে দেন কংগ্রেস গোর্খাল্যান্ডের রাজ্যের দাবির বিরুদ্ধে নয়, বা বাংলা ভাগের ও বিরুদ্ধে নয়। প্রনব বাবু এমন কথা নাকি বলেননি। (এই স্থানে লক্ষনীয়ো যে মোর্চানেতারা কিন্তু আডবানীর গোর্খাল্যান্ডের অশ্বীকারের বিবৃতি টি ভোলার চেষ্টা করছেন)। একটি নেপালী দৈনিকেই তা প্রকাশিত হয়েছিলো। পরের দিন টেলিগ্রাফ পত্রিকার (উত্তর বঙ্গের পাতায়---১০ই মার্চ) লেখা হলো। ‘Narbula rubbs Pranab Claim’, কি বলেছেন নরবুলা সাহেব......” The CPM is unnecessarily creating confusion for political mileage. I want to make it clear that our leader, Pranab Mukherjee, had never said the Congress has against the division of Bengal and formation of Gorkha land” । এই বিষয়ে প্রনববাবু চুপ, কংগ্রেস চুপ, তাই এই চুপ থাকাটাই হচ্ছে কংগ্রেসের গেম প্ল্যান। এই বিষয়ে কিঞ্ছিৎ মুখ খুলেছেন আমাদের পাড়াতুতো দিদির সাগ্রেদ প্রবর। কি বলছেন তেনেরা। পার্থ চ্যাটার্জি এমন একজন নেতা যিনি গোর্খাল্যান্ডের দাবিতে শিলিগূড়ির পাশে শালবাড়িতে মোর্চার অনশন মঞ্চে শুধু অংশগ্রহন করেছিলেন তাই নয়, তিনি তার বক্তৃতায় গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার আলাদা রাজ্যের দাবির আন্দোলনকে যেন সি পি আই (এম) ও রাজ্যের বামফ্রন্ট বিরোধী আন্দোলনে পরিনত করা যায় তার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাদের আন্দোলনের পেছনে যে তৃনমূল নেত্রীর সমর্থন আছে, সে কথা বলতেও কিন্ত তিনি ভোলেননি। এরপর মেধা আর অনুরাধা শিলিগুড়ি-জলপাইগুড়ি ও ডুয়ার্স ভ্রমন। এটা ছিলো তৃনমুল নেত্রীর পরিকল্পনা মতন। তার শরিক এস ইঊ সি নেতা মানিক মুখার্জির গোরুবাথানে মোর্চার অনশনের মঞ্চে উপস্থিত থাকা ও বিমল গুরুং এর সাথে সাক্ষাৎ ছিলো একই পরিকল্পনার অঙ্গ।


৩০ শে মার্চ দার্জিলিং এ জিমখানা ক্লাব হলে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সভাপতি বিমল গুরুং প্রকাশ্যেই এক ভাষনে কংগ্রেস প্রার্থী দাওয়া নরবুলার নির্বাচন থেকে নাম প্রত্যাহার করার হুমকি দেন। যে তিব্বতী ও মুসলমানেরা কংগ্রেসকে ভোট দেন, তাদেরকেও তিনি হুশিয়ার করে জানিয়েছেন, মোর্চার বাইরে কাউকে ভোট দেওয়া চলবে না। প্রতিটি ভোটে তারা দেখে নেবেন কে কাকে ভোট দিচ্ছে। আর ওই সভাতে এও তিনি বলেন, কিভাবে ৯০% ভোট করাতে হবে, কিভাবে বুথ দখল করতে হবে। এক্কেবারে লালগড়ের ছত্রধর মাহাতর বিবৃতির সাথে মিলে যাচ্ছে। এই সব কথা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়। টেলিগ্রাফ কাগজ়, ১ লা এপ্রিল, “At a reporters meet in Darjeeling yesterday, Morcha president Bimal Gurung had said, “Our Tibetan brothers have for long been voting blindly for the congress, but all the hill people, including our Muslim brothers, should only think about Gorkha Land as this is their place too.” He had also said the party would keep an eye on every vote during the coming polls.”

কংগ্রেস থাকলো নীরব ......কেন? কারণ ওদের আশা ছিলো যে মোর্চার আশীর্বাদ বা সমর্থন ওরাই পাবেন। শুধুমাত্র একটি আসন লাভের বিনিময়ে বি জ়ে পি বা কংগ্রেসের রাজ্য বা দেশ খন্ড খন্ড হয়ে যাক তাতে তাদের কিচ্ছু যায় আসে না। নীতিহীনতাই তাদের একমাত্র সম্বল ভোট জিততে। ছলে বলে কৌশলে নির্বাচনে জেতাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য--তার দারা রাজ্য বা দেশ বাঁচলো কি বাঁচলো না, তা তাদের কোনো বিবেচনার মধ্যেই থাকছে না। এনাদের বর্তমান অবস্থা চরম সঙ্কটজনক, এনাদের পুজিবাদী অর্থনীতি মুখ থুবরে পরেছে, এনাদের সাম্প্রদায়িক উস্কানি এবং বিভান্তী দেশের লোক পদদলিত করছে, এনারা কমুউনিস্টদের কাছে, যুক্তি , তর্কে, অর্থনীতিতের , দর্শনে হেরে বসে আছেন। নির্বাচনী ব্যাবস্থায় বামপন্থী দের কাছে হারছে এবং সারা দেশে বাম্পন্থীদের ক্রমাগত শক্তিবৃদ্ধি আটকাতে পারছে না, তাই এদের এই সঙ্কটজনক অবস্থায় এরা নানারকম নীতিহীন জোট করছে, ফ্যাসীবাদের আশ্রয় নিচ্ছে, পশ্চিম্বঙ্গে ১৯৭০-৭২ সালের কালো দিনগুলিফিরিয়ে আনতে চাইছে।


চলবে___________________
পর্ব ১ http://pnachforon.blogspot.com/2009/04/blog-post_10.html

বামফ্রন্ট অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধ ~ বিমান বসু


কিছু সংবাদমাধ্যম রাজ্যের মানুষকে বিরোধীদের জোটের কথা বলে যতই বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করুক, রাজ্যের মানুষ জানেন কিসে তাঁদের ভালো, আর কিসে তাঁদের খারাপ হয়। তাই মানুষ এবারেও বামফ্রন্টের পাশেই থাকবেন, বামফ্রন্টকেই জয়ী করবেন। পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে ‘গণশক্তি’-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে একথা বলেছেন বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান ও সি পি আই (এম)-র পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক বিমান বসু। সিঙ্গুর থেকে বিরোধীদের গাড়ি কারখানা তাড়ানো থেকে শুরু করে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে তৃতীয় শক্তির উজ্জ্বল সম্ভাবনা, নানা বিষয়েই তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতামত দিয়েছেন এই সাক্ষাৎকারে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন প্রসূন ভট্টাচার্য



প্রশ্ন: পঞ্চদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে দেখা যাচ্ছে কংগ্রেসের জোট ইউ পি এ টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। ইউ পি এ-র শরিকরা আলাদা আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে তৃতীয় শক্তির সম্ভাবনা কতটা? তারা কি আদৌ কেন্দ্রে সরকার গড়তে পারবে?


বিমান বসু: এবারের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের নেতৃত্বাধীন ইউ পি এ এবং বি জে পি—র নেতৃত্বাধীন এন ডি এ উভয়েই ভারতের জনগণের কাছে প্রত্যাখ্যাত হবে। ইতোমধ্যেই ইউ পি এ এবং এন ডি এ —র শরিকদের অনেকে ঐ জোটগুলি থেকে সরে এসেছে। এই দলগুলির মধ্যে যারা কংগ্রেস এবং বি জে পি কাউকেই সমর্থন করে না, তারা উপলব্ধি করছে ভিন্ন কোনো কর্মসূচী প্রয়োজন। ফলে বামপন্থীরা যে ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের আহবান জানিয়ে ধীরে ধীরে তৃতীয় বিকল্প গড়ে তুলছে তাতে এই দলগুলির অনেকে যুক্ত হচ্ছে। সম্ভবত আরো অনেকে যুক্ত হবে নির্বাচনের পরে। কিন্তু এটা পরিষ্কার যে নির্বাচনের আগেই একটা ধর্মনিরপেক্ষ বিকল্পের কাঠামো গড়ে উঠতে শুরু করেছে। নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে এতে আরো অনেকে আসবে। আজ যারা তৃতীয় বিকল্প সম্পর্কে হেয় করা মন্তব্য করছে বা তৃতীয় ফ্রন্টের ভূমিকাকে গুরুত্বহীন বলে দেখানোর চেষ্টা করছে তারাও তখন বুঝতে পারবে কোনটা বাস্তব আর কোনটা অবাস্তব।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে গত লোকসভা নির্বাচনের পর আমরা কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউ পি এ সরকারকে সমর্থন করেছিলাম কেন্দ্রে সাম্প্রদায়িক শক্তি বি জে পি-কে ক্ষমতায় ফিরে আসা ঠেকাতে। গত লোকসভা নির্বাচনের আগে কেন্দ্রে সাম্প্রদায়িক এন ডি এ জোটের বদলে একটা ধর্মনিরপেক্ষ সরকার গঠনের স্লোগান আমরা দিয়েছিলাম। সেই রাজনৈতিক অবস্থান থেকেই আমরা এই সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু আমাদের এই সমর্থন নিঃশর্ত ছিল না। সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী রূপায়ণের শর্তেই বামপন্থীরা ইউ পি এ সরকারকে সমর্থন করেছিল। ইউ পি এ সরকার সেই কর্মসূচী রূপায়ণে অনীহা দেখিয়েছে। যেটুকু হয়েছে তা বামপন্থীদের ধারাবাহিক চাপের ফলেই। শুধু তাই নয়, ওরা সাধারণ মানুষের স্বার্থের এই কর্মসূচী রূপায়ণে বিরত থেকে জনস্বার্থবিরোধী নীতি নিয়ে চলেছে। দেশের স্বাধীন বিদেশনীতি বিসর্জন দিয়ে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অনুসারী পররাষ্ট্রনীতি নিচ্ছে। সেকারণেই এখন দেশে একটি ধর্মনিরপেক্ষ তৃতীয় বিকল্পের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, যারা স্বাধীন বিদেশ নীতি নিয়ে চলবে, দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থে নীতি নেবে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ ক্রমশ সেটা উপলব্ধি করছেন।


প্রশ্ন: বামপন্থীরা এই তৃতীয় শক্তিকে সংহত করতে বিভিন্ন অকংগ্রেসী এবং অ-বি জে পি দলের সঙ্গে আলোচনা করে একত্রিত করার চেষ্টা করছে। এই সংহতকরণ কতটা নীতির ভিত্তিতে হচ্ছে? তৃতীয় শক্তির মঞ্চে আসা এই দলগুলিকে কতটা বিশ্বাস করা যায়?


বিমান বসু: বিভিন্ন আঞ্চলিক দল তাদের কাজ নিজস্ব আঞ্চলিক ঘরানায় করে থাকে। কিন্তু আমরা বামপন্থীরা চেষ্টা করছি দেশের মানুষের ঐক্য ও সংহতির প্রশ্নে একযোগে কাজ করতে একটি সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে পথ চলার উদ্যোগ নিতে। সর্বভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গীতে এভাবে পথ চলার চেষ্টা করলে, ভিন্ন ভিন্ন পার্টি হলেও একই নীতির দ্বারা পরিচালিত হলে তখন বিষয়টিকে আদৌ নীতিহীন বলে মনে হবে না। আঞ্চলিক দলগুলির নেতৃত্বের কারো কারো মনে যাই থাক না কেন, তারা যদি সর্বভারতীয় ভিত্তিতে ভারতীয় জনগণের স্বার্থবাহী কর্মসূচী রূপায়ণ করার জন্য একটি নির্দিষ্ট কর্মসূচী গ্রহণ করে ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তাদের দুর্বলতা থাকলেও তারা নিজেদের কাজের মধ্য দিয়ে বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারবে। কেউ বিশ্বাসযোগ্য কিনা, এটা কাজের নিরিখ ছাড়া বিচার করা খুবই কঠিন।


সব থেকে বড়ো কথা কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক পুনর্বিন্যাস করার কর্মসূচী নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারলে তাতেও আঞ্চলিক দলগুলির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে। এই কাজের মধ্যে দিয়ে সর্বভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠবে।


প্রশ্ন: নির্বাচনের পরে তৃতীয় শক্তি সরকার গড়ার মতো অবস্থায় এলে সি পি আই (এম) কি তাতে যোগ দেবে?


বিমান বসু: নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে তৃতীয় শক্তির বর্তমান অবস্থার কিছু পরিবর্তন ঘটতে পারে। ভারতীয় জনগণের স্বার্থে সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী তৈরি করা এবং নতুন নতুন শক্তির সম্মিলিত প্রয়াসের মধ্য দিয়ে যে উদ্ভুত পরিস্থিতি গড়ে উঠবে সেই অবস্থার বিচারে তৎকালীন সময়ে সি পি আই (এম)-কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে সরকারে যোগ দেওয়ার প্রশ্নে। রাজনীতিতে কিছু বিষয় থাকে যার সবটা আগাম ঘোষণা করা যায় না। এটা ভবিষ্যৎবাণীর মতো নয়। এধরনের বিষয় নীতিভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে, এবং সি পি আই (এম) বস্তুনিষ্ঠ সিদ্ধান্ত নিতে কোনো কুন্ঠা বোধ করবে না। রাজনীতি হলো প্র্যাকটিক্যাল সায়েন্স এবং মার্কসবাদ লেনিনবাদও কোনো আপ্তবাক্য নয়, প্রয়োগের বিদ্যা। স্বাভাবিকভাবেই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতির ওপর অনেককিছুই নির্ভর করবে এবং কিছু সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতেই নিতে হবে।


প্রশ্ন: সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে বি জে পি-কে এখনো কতটা বিপদ বলে মনে করে বামপন্থীরা? কংগ্রেসের জায়গায় বি জে পি কি কেন্দ্রে সরকার গড়ার মতো জায়গায় ফিরে আসতে পারে?


বিমান বসু: কেন্দ্রে বি জে পি-র ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনাই নেই। আর বি জে পি এখনো বিপদ তো বটেই। বি জে পি রাজনৈতিক দর্শন পরিবর্তন না করলে এই শক্তি দেশের বিপদ হিসাবেই অবস্থান করবে। ভারতের জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ক্ষেত্রে, জাতীয় সংহতি, অখন্ডতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বি জে পি সবসময়ই বিপদ। আমরা ২০০৪ সালে চতুর্দশ লোকসভা নির্বাচনের পরেও বলেছিলাম, নির্বাচনে বি জে পি পরাস্ত হয়েছে মানে এই নয় যে দেশের সাম্প্রদায়িকতার বিপদ কেটে গেছে। বিগত পাঁচ বছরেও পরিস্থিতির এমন পরিবর্তন হয়নি, যে এই বিপদ কেটে গেছে বলা যাবে।


অন্যদিকে বি জে পি বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তিকে সাহায্য করার নামে যেভাবে দার্জিলিঙ-এ গোর্খাল্যাণ্ড ইস্যুকে ঘিরে ভূমিকা পালন করছে তা এ-রাজ্যের অখণ্ডতা রক্ষা করার ক্ষেত্রে বিপদ হিসাবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে।


প্রশ্ন: পশ্চিমবঙ্গের প্রসঙ্গে চলে আসি। এরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এখন বেশ উত্তপ্ত। অনেকেই বলছে এবার এরাজ্য থেকে বামফ্রন্টের আসন অনেক কমে যাবে। এমনকি কিছু সংবাদমাধ্যম সি পি আই (এম)-র নিজস্ব ‘বিশ্লেষণ’-র নাম করে বলছে, কিছু সংবাদমাধ্যম জনমত সমীক্ষার নামে বলছে বামফ্রন্টের আসন সংখ্যা ব্যাপক কমে যাবে। এব্যাপারে আপনাদের কি মনে হয়?


বিমান বসু: এরাজ্যের মানুষকে আমরা যতদূর চিনি এবং জানি, তাদের সঙ্গে চলাফেরা করে, কথাবার্তা বলে একথা বলতে পারি, বামফ্রন্টের আসন সংখ্যা কমে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। যদিও কিছু সংবাদমাধ্যম মানুষের মনকে বিষিয়ে দিতে উঠে পড়ে লেগেছে। তারা প্রচার করছে, এবার কংগ্রেসের সঙ্গে তৃণমূলের জোট হয়েছে, অতএব এবার তারাই জিতবে। কিন্তু জোট তো নতুন নয়। ২০০১ সালেও জোট হয়েছিলো। ১৯৯৬ সালেও হয়েছিলো। এমনকি ২০০৪ সালেও একধরনের জোট হয়েছিলো। কিন্তু তাতে বামফ্রন্টের আসন কমেনি, বরং বেড়েছিলো। আসল কথা হলো, জোটটা কিসের জন্য? দেশকে, রাজ্যকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য না কি পিছিয়ে দেওয়ার জন্য? মানুষ কী এটা বিচার করতে পারবে না? বামফ্রন্ট বিরোধীরা এবং কিছু সংবাদমাধ্যম রাজ্যের মানুষকে বোকা বানাবার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমরা রাজ্যের মানুষকে মূর্খ মনে করি না। এর জবাব তাঁরা নির্বাচনে সুদে আসলে দেবেন।


আরো একটা কথা বলা প্রয়োজন যে এবারের নির্বাচনটা হচ্ছে দিল্লিতে সরকার গড়ার জন্য, ভারতের যে পঞ্চদশ লোকসভা গঠিত হবে তার ৫৪৩জন প্রতিনিধির মধ্যে এরাজ্যের ৪২জন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার জন্য। কোনো পঞ্চায়েত, পৌরসভা গঠনের জন্য নয়, অথবা রাজ্য সরকার গঠনের জন্যও না। অথচ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলি এবং কিছু সংবাদমাধ্যম এমনভাবে প্রচার করছে যেন এটা রাজ্যেরই নির্বাচন, তাদের প্রচারে কোনো জাতীয় বিষয়ের উল্লেখই নেই। দেশ আগামী পাঁচ বছর কিভাবে চলবে, দেশের বিদেশনীতি, অর্থনীতি, শিল্পনীতি, কৃষিনীতি, শিক্ষানীতি, সামাজিক ক্ষেত্রে নীতি কি হবে তা নিয়ে ওদের মুখে কোনো রা নেই। বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে কুৎসা ও অপপ্রচারই ওদের মূল হাতিয়ার। মানুষ নিশ্চয়ই এটা বুঝবেন।


প্রশ্ন: কিন্তু এবার দেখা যাচ্ছে, বিরোধীদের জোটে শুধু কংগ্রেস তৃণমূল নয়, অন্যান্য কিছু চরমপন্থী শক্তিও অংশ নিচ্ছে এবং সমর্থন দিচ্ছে। এটা কি আরো ভয়ানক দিক নয়?


বিমান বসু: ভারতে প্রাক্তন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড‌্যানিয়েল প্যাট্রিক ময়নিহান তাঁর ‘এ ডেঞ্জারাস প্লেস’ বইতে লিখেছেন, ১৯৭১ সালে আমাদের রাজ্যের রাজনীতিতে কীভাবে কমিউনিস্টদের ঠেকাতে বিদেশী শক্তির পক্ষ থেকে সরাসরি সাহায্য দেওয়া হয়েছিলো। তারপরে গঙ্গা দিয়ে অনেক জল বয়ে গেছে। মানুষের অভিজ্ঞতা বেড়েছে। মানুষ বুঝতে পারছেন দেশী বিদেশী প্রতিক্রিয়ার শক্তি এরাজ্যে বামপন্থীদের অগ্রগতি ঠেকাতে বিরোধিতার শক্তিকে জোটবদ্ধ করে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে আদাজল খেয়ে নেমে পড়েছে। কথায় বলে নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। এরাজ্যের মানুষ বুঝবেন না কিসে তাঁদের ভালো হবে? তাঁরা জানেন, বামপন্থীরাই জনস্বার্থবাহী কর্মসূচী রূপায়ণ করতে আন্তরিক। দেশের স্বাধীনতা ও স্বার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য কমিউনিস্টরাই বামপন্থী ও অন্যান্য আঞ্চলিক দলগুলিকে সঙ্গে নিয়ে কংগ্রেস ও বি জে পি-র বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছে। কেন্দ্রের ইউ পি এ সরকার দেশের স্বার্থকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বন্ধক দেওয়ার কর্মসূচীকে আঁকড়ে থাকলে আমাদের তার ওপর থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে নিতে সময় লাগেনি। তাই দেশ ও মানুষের স্বার্থ রক্ষায় বামপন্থীরা যে ঐকান্তিক প্রচেষ্ঠা নিয়ে চলে তা রাজ্যবাসী নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন।


প্রশ্ন: দেখা যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের কয়েকটি জেলায় প্রায় প্রতিদিনই সি পি আই (এম)-র কর্মী সমর্থক বা নেতারা খুন হয়ে যাচ্ছেন। গত ১৮ই মার্চ একদিনে ৫ জন সি পি আই (এম) কর্মী খুন হয়েছেন। বিরোধীরা বলছে এগুলি নাকি সি পি আই (এম)-র আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ফল। প্রকৃত কারণটা কি?


বিমান বসু: এধরনের খুন ও হত্যার ঘটনা বামফ্রন্টবিরোধীদের কর্মসূচীতে নতুন নয়। এরাজ্যে বামফ্রন্টের মূল শক্তি সি পি আই (এম)কেই তারা আক্রমণের প্রধান লক্ষ্যবস্তু করেছে। দেশী বিদেশী প্রতিক্রিয়ার শক্তি একাজে তাদের পৃষ্ঠপোষকতা করছে। সমাজে নৈরাজ্য ও সন্ত্রাস সৃষ্টির লক্ষ্যেই তারা এই অপরাধমূলক কাজ করে চলেছে। আমাদের নেতা-কর্মীরা প্রতিদিন খুন হচ্ছেন, অথচ তৃণমূলসহ বিরোধীরা প্রচার করছে আমরাই নাকি সন্ত্রাস করছি! শুধু গত ১৮ই মার্চ ২৪ ঘন্টার মধ্যে আমাদের ৫জন নেতা-কর্মী রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খুন হলেন। এটা কিসের ইঙ্গিত? আসলে বামফ্রন্টবিরোধীরা খুন-সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে রাজ্যে একটা নৈরাজ্যের বাতাবরণ সৃষ্টি করতে চাইছে। আমরা এর মোকাবিলায় জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রচার ও প্রতিরোধ সংগঠিত করবো। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই এই আক্রমণ প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তোলা হবে। এভাবেই সন্ত্রাসবাদী শক্তিগুলিকে জনগণের কাছথেকে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। দুএকটি সংবাদমাধ্যম গল্পকাহিনী ছড়িয়ে যে-এলাকায় এই আক্রমণ, তার বাইরে অন্য কোন এলাকায় কিছু মানুষকে ভুল বোঝাতে সক্ষম হতে পারে। কিন্তু যে এলাকায় এই খুন-খারাপি হচ্ছে, সেই নির্দিষ্ট এলাকার মানুষ জানেন কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যা।


প্রশ্ন: লালগড়, দার্জিলিঙ এবং কামতাপুরের নামে যে বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনগুলি চলছে, সেগুলি নির্বাচনে কেমন প্রভাব ফেলবে?


বিমান বসু: এই সব বিচ্ছিন্নতাবাদী ঘটনা স্থানীয়ভাবে কিছু সমস্যা করতে পারে। হয়তো কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় প্রভাবও ফেলতে পারে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে রাজ্যে এর কোনো প্রভাব পড়বে বলে আমি মনে করি না। তবে লালগড়, দার্জিলিঙ এবং কোচবিহারকে কেন্দ্র করে রাজ্যকে খন্ড খন্ড করার যে চক্রান্ত চলছে, সেই সম্পর্কে বামফ্রন্ট কর্মীদের মানুষকে সচেতন করে তুলতে হবে। নির্বাচনী প্রচারে এটা বারে বারে তুলে ধরার প্রয়োজন আছে।পশ্চিমবঙ্গবাসী নতুন করে বাংলা ভাগের কোন চক্রান্তকে মেনে নেবেন না বলেই মনে করি।


প্রশ্ন: বামফ্রন্টের ঐক্যের ঘাটতির জন্য নাকি গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে কিছু জেলায় ফলাফল খারাপ হয়েছে। এবার লোকসভা নির্বাচনের আগে বামফ্রন্টের ঐক্য কেমন রয়েছে?


বিমান বসু: একথা সত্য যে গত পঞ্চায়েত নির্বাচনে বামফ্রন্ট ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইতে অংশ না নিতে পারায় এবং পরস্পর বিরোধী প্রচার ধারা পরিচালনা করায় মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছিলো। এতে যে জনগণের শত্রুরা লাভবান হবে এটা সবাই যথাসময়ে ঠিকমতো বুঝে উঠতে না পারায় এলাকাগতভাবে বামফ্রন্টের ঐক্যের চাপ তৈরি হয়নি। বিরোধীরা কিছুটা লাভবান হয়েছিলো। এক্ষেত্রে বামফ্রন্টের সবশরিক দলের ভ্যন্তরীণ কিছু আত্মসন্তুষ্টি কাজ করেছিলো। এখন পঞ্চায়েতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে লোকসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বামফ্রন্টের ঐক্যকে দৃঢ় করতে সব শরিকদল ঐকান্তিকভাবে প্রয়াসী হয়েছে। বামফ্রন্টও অনেক বেশি ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াইয়ের ময়দানে সামিল হয়েছে।


প্রশ্ন: সিঙ্গুর থেকে টাটাদের কারখানা তাড়ানো এবং নয়াচরসহ নানা শিল্পপ্রকল্পের বিরোধিতা করছে তৃণমূল কংগ্রেস। নির্বাচনী প্রচারে আপনারা এগুলিকে সাধারণ মানুষের কাছে কীভাবে তুলে ধরছেন?


বিমান বসু: রাজ্যের অর্থনীতি বিকাশের যে কর্মসূচী নেওয়া হয়েছে এবং কৃষির উন্নয়ন বজায় রেখে শিল্প বিকাশের কথা, তা নিশ্চয়ই আমরা প্রচারে তুলে ধরবো। সিঙ্গুর রাজ্যের ছোট মোটরযান তৈরির ক্ষেত্রে একটা ল্যান্ডমার্ক হতে পারতো। গত ২৩শে মার্চ মুম্বাইতে ‘ন্যানো’ যে বাজারে ছাড়া হলো তা পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুর কারখানা থেকেই দেশে-বিদেশে যেতে পারতো। অথবা ৩১শে মার্চ কলকাতার বাজারে যে প্রচারের জন্য এলো, সেটাও সিঙ্গুর কারখানা থেকেই সরাসরি আসতে পারতো। কিন্তু এরাজ্যের প্রধান বিরোধীদলের শিল্পবিরোধী-উন্নয়নবিরোধী কর্মসূচীর জন্য সেটা হতে পারলো না। তারা রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটিকে ব্যঙ্গ করে বলেছিলো, ‘ন্যানো, কেন?’ এই শিল্পের ফলে যে অসংখ্য অনুসারী শিল্প হতে পারতো এবং তাতে হাজার হাজার কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব হতো, তা তারা নস্যাৎ করে দিয়েছে। হাজার হাজার যুবক যুবতীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তারা কেড়ে নিয়েছে। কাজেই আমার মনে হয় না, বিরোধী শক্তিকে রাজ্যের নতুন প্রজন্ম ক্ষমা করবে।


প্রশ্ন: বিরোধীরা অভিযোগ করছে, গ্রামের গরিব মানুষ, তফসিলী জাতি, আদিবাসী এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বামফ্রন্ট সরকার নাকি বঞ্চনা করছে। এই ব্যাপারে আপনাদের মত কি?


বিমান বসু: এসব একদম বাজে কথা। গ্রামের গরিব মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা কংগ্রেস আমলে কি ছিলো? আর বামফ্রন্টের আমলে কোন জায়গায় আছে? এই হিসাবটা করলেই পরিষ্কার হয়ে যাবে সত্যিই বামফ্রন্ট সরকার জনস্বার্থবাহী কাজ করেছে কিনা। কংগ্রেসের আমলে যেখানে গ্রামের মানুষের শিল্পজাত পণ্যের ক্রয়ক্ষমতা ছিলো মাত্র ৪-৫ হাজার কোটি টাকার, সেখানে এখন তা বেড়ে ২০-২২ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এটা কোন যাদুতে হয়েছে? জমিদার জোতদারদের বেআইনী খাস জমি ও বেনামী জমি উদ্ধার করে গ্রামের গরিবের মধ্যে তা বন্টন করা হয়েছে। এর ৭০ শতাংশই তো তফশিলী জাতি, আদিবাসী, ও ধর্মীয় বিচারে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষজনদের মধ্যে বন্টন করা হয়েছে। এই জমিতে যে সোনার ফসল হচ্ছে তার উপকার তো এই সব অংশের মানুষ প্রত্যক্ষভাবে পেয়েছেন। তাছাড়া বেশীরভাগ গ্রামে পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি এলাকায় প্রাথমিক বিদ্যালয়, শিশু শিক্ষা কেন্দ্র, জুনিয়র হাইস্কুল, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্কুল হয়েছে। কলেজের সংখ্যাও অনেক বেড়েছে। কংগ্রেস আমলে তিন লক্ষের বেশি মাধ্যমিক পরীক্ষা দিত না। এখন প্রতি বছর ৮লক্ষ ছাত্রছাত্রী মাধ্যমিক পরীক্ষা দেয়। ৭০ শতাংশের বেশি মানুষ সরকারী পরিকাঠামো থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা পান। এইসবের উপকার তো গ্রামের তফসিলী জাতি আদিবাসী ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরাই পাচ্ছেন। এইসব দিক বিচার বিবেচনা করে সামগ্রিকতার দৃষ্টিতে উন্নয়নের দিকটি দেখতে হবে। তাহলেই বোঝা যাবে বামফ্রন্ট সরকারের কাজের অভিমুখে সমাজের দুর্বলতর অংশের মানুষ কত গুরুত্বপূর্ন স্থান নিয়ে রয়েছে।

শুক্রবার, ১০ এপ্রিল, ২০০৯

কংগ্রেস নয়, বি জে পি নয়, লক্ষ্য তৃতীয় শক্তির সরকার ~ বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য




আমাদের মূল লক্ষ্য কেন্দ্রে একটি বিকল্প সরকার গঠন করা। অর্থাৎ কংগ্রেসও নয়, বি জে পি-ও নয়। বাম, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক শক্তির বিকল্প সরকার। এর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আর এজন্যই এবারের নির্বাচনে বামপন্থীদের নিজেদের জমিকে শক্ত রাখা অত্যন্ত জরুরী। গণশক্তি-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বল‍‌লেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। এরাজ্যে বিরোধীদের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, নীতিহীন জোট, রাজ্যকে ভাঙার ষড়যন্ত্র নিয়ে যেমন আলোচনা করেছেন, তেমনই সরকারের উন্নয়নের বিভিন্ন দিক, অভিমুখ উঠে এসেছে কথোপকথনে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন অতনু সাহা

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের কাছে প্রথম প্রশ্নটাই ছিল এবারের লোকসভা নির্বাচনের রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে কারণ গত পাঁচ বছরের রাজনৈতিক ঘটনাক্রম বহুমুখী প্রথমত সাম্প্রদায়িক বি জে পি-কে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখতে কংগ্রেসের ইউ পি এ জোটকে শর্তসাপেক্ষে বাইরে থেকে সমর্থন জানালো বামপন্থীরা সেই শর্ত ছিল সাধারণ ন্যূনতম কর্মসূচী মেনে চলা। কংগ্রেস মানেনি। উলটে আমেরিকার কাছে নতজানু হয়ে কংগ্রেস দেশকেই বিকিয়ে দিচ্ছে তাই জানতে চাইলাম এবারের নির্বাচনে বামপন্থীদের বক্তব্যের মূল অভিমুখ কী?

উঃ এবারের লোকসভা নির্বাচনে বামপন্থীদের মূল লক্ষ্য একটি বিকল্প সরকার তৈরি করা। কংগ্রেসও নয়, বি জে পি-ও নয়। এখন বলা যায়, বামপন্থী, ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক আঞ্চলিক দলগুলোর সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবার সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এই সম্ভাবনাকে বাস্তবায়িত করতে হবে।

প্রঃ .... এই আঞ্চলিক দলগুলোর অবস্থান কী এক জায়গায় থাকবে?


উঃ এখানেই বামপন্থীদের দায়িত্ব। তৃতীয় বিকল্প গড়ে ওঠার যে সম্ভাবনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে তাকে কর্মসূচীগত ঐক্যের ভিত্তিতে দাঁড় করাতে হবে। যার ভিত্তিতে চলবে এই সরকার। এই ঐক্যের ভিত্তি হবে শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, সংখ্যালঘু এবং পিছিয়ে পড়া মানুষের স্বার্থে কাজ করার কর্মসূচী। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোকে শক্তিশালী করা, রা‍‌জ্যের হাতে আরও ক্ষমতা দেওয়া। তৃতীয়ত, ধর্মনিরপেক্ষতার নীতিকে বলিষ্ঠভাবে রূপায়িত করা। এবং চতুর্থত, স্বাধীন বিদেশনীতি। অর্থাৎ আমেরিকার দিকে ঝুঁকে পড়া বিদেশনীতিকে আবার নিজের পায়ে দাঁড় করানো। এই চারটি নীতির ওপর দাঁড়িয়ে সরকার গড়াটাই বর্তমান পরিস্থিতির দাবি। যার বাস্তবতা ইতোমধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে, নির্বাচনের পর আরও হবে।

প্রঃ আরেকটা বিষয়, ভয়ঙ্কর আর্থিক মন্দা, বিশ্বজোড়া এই সঙ্কট
এবারের নির্বাচনে তার গুরুত্ব কতটা? বামপন্থীদের ভাবনায় তার থেকে দেশকে বাঁটচানোর রাস্তা কী?
উঃ বিশ্ব আর্থসঙ্কট অবশ্যই এবারের নির্বাচনের গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। যেহেতু কংগ্রেস বা বি জে পি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনুসৃত তথাকথিত নয়া বিদেশনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে চায় না, তাই সঙ্কটের ছাপ আমাদের দেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কর্মসঙ্কোচন হচ্ছে, কর্মী ছাঁটাই হচ্ছেন। রপ্তানির বাজারে মন্দা, ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্প থেকে তথ্য প্রযুক্তি সবই আক্রান্ত। এ‍ই সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারবে কোন্‌ সরকার? কোন্‌ সরকার পারবে দেশের অর্থনীতিকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে? কংগ্রেসও নয়, বি জে পি-ও নয়, তা পারবে একমাত্র তৃতীয় বিকল্প সরকারই।

প্রঃ এই সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে বামফ্রন্ট সরকার কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটা কী একটা বিকল্প দিশা হিসাবে ধরা যেতে পারে?
উঃ একটা রাজ্য সরকারের ক্ষমতা খুবই সীমাবদ্ধ। দেশের আইন, আর্থিক নীতির চৌহদ্দির মধ্যেই কাজ করতে হয়। তবু এই সঙ্কটের মুখোমুখি যতখানি সম্ভব রাজ্যের অর্থনীতিকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা আমরা করেছি। ৫১০৬ কোটি টাকার একটা বিশেষ ব্যয়-বরাদ্দ করেছি। যার মধ্যে দিয়ে পরিকাঠামো নির্মাণ শিক্ষা-স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে এবং কর্মসংস্থানের মত বিষয় অব্যাহত রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেন্দ্রীয় সরকারও একটা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। সারা দেশের জন্য ২০ হাজার কোটি টাকা। প্রথমত, এটা যথেষ্ট নয়, দ্বিতীয়ত, এই ব্যয় বরাদ্দের অভিমুখটা গরিব সাধারণ মানুষের দিকে নয়। এখানেই ওদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। এখানেই বিকল্পের লড়াই।

প্রঃ গত কয়েকটা নির্বাচনেই দেখা গেছে, কংগ্রেস নয়, বি জে পি, কোন্‌ বিপদটা বড়? নির্বাচনোত্তর পরিস্থিতিতে এবারও কী তেমন বিষয় সামনে চলে আসতে পারে?
উঃ প্রথমেই ফারকটা বুঝে নেওয়া ভালো। এবারের নির্বাচনের প্রশ্ন কংগ্রেস এবং বি জে পি’র বিকল্প হিসাবে তৃতীয় শক্তির সরকার তৈরি করা। বি জে পি-র মৌলবাদী বিপদতো আছেই। কিন্তু কংগ্রেসও আমেরিকার সঙ্গে যে স্ট্র্যাটেজিক পার্টনারশিপ গড়তে চায় তার বিপদও কম নয়। তাই আমাদের লক্ষ্য দু’পক্ষকেই পরাস্ত করা।

প্রঃ আরেকটা প্রসঙ্গ ঘুরে ফিরে উঠে আসছে বাইরে থেকে হলেও যেহেতু ইউ পি এ সরকারকে বামেরা সমর্থন করেছিল, তাই ওদের খারাপ কাজের দায় বামপন্থীদেরও আপনি এই বিষয়টি সম্পর্কে কী বলবেন?
উঃ এটা ঠিক যে, গতবার কংগ্রেসের জোটকে আমরা সরকার গড়তে সমর্থন দিয়েছিলাম, বলা ভালো দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। আর তা করেছিলাম একটিই কারণে, তাহলো সাম্প্রদায়িক বি জে পি, আর এস এসের কাছ থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য। কিন্তু কংগ্রেসের কোন জনবিরোধী কাজ আমরা সমর্থন করিনি, প্রতি পদক্ষেপে বিরোধিতা করেছি। শেষপর্যন্ত পারমাণবিক চুক্তির প্রশ্নে এক অসম্ভব পরিস্থিতি সৃষ্টি করলো কংগ্রেস। তখন বাধ্য হয়েছিলাম সমর্থন তুলে নিতে। দেশের মানুষ এটা বুঝেছেন। বর্তমান মার্কিনী অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থায় মানুষ আরও বুঝছেন আমাদের মার্কিন বিরোধিতার কেন প্রয়োজন ছিল।

প্রঃ গত কয়েক মাসের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতিতে তৃতীয় শক্তি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে কংগ্রেস বি জে পি-র আক্রমণের মূল লক্ষ্যও হয়ে উঠেছে তৃতীয় শক্তি কিন্তু তৃতীয় শক্তি কী সত্যিই সংহত? সত্যিই বিকল্প সরকার দিতে সক্ষম হবে?
উঃ তৃতীয় ফ্রন্ট সত্যিই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে শক্তি এবং সংখ্যার বিচারে। কিন্তু এটাই যথেষ্ট নয়। কর্মসূচীর ভিত্তিতে একে আরও সংহত করতে হবে। সেই আলোচনা শুরুও হয়েছে। নির্বাচনের পরেও সেই আলোচনা হবে। সঠিক কর্মসূচীর ওপর দাঁড়ালেই বিকল্প সরকার গড়ে তোলা সম্ভব। বামপন্থীরা এই কর্মসূচীর ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে। কোন বিশেষ দল বা নেতাকে নয়।

প্রঃ দেখুন, এখনই পরিষ্কার বলে দেওয়া যায় নির্বাচনের পরেও জোট গঠন প্রক্রিয়া চলবে সব শিবিরেই ইউ পি এ এবং তৃতীয় শক্তি দু’দিকেই এটা সমান সত্যি এতে সুবিধাবাদী রাজনীতির জন্ম নেবে কী? বামপন্থীদের অবস্থান কী হবে?
উঃ হ্যাঁ, এটা ঠিক যে নির্বাচনের পর জোট গঠনের প্রক্রিয়া আরও সুস্পষ্ট চেহারা নেবে। ইউ পি এ আরও ভাঙবে, এন ডি এ ভাঙবে। এই ভাঙাভাঙির মুখে যে নতুন শিবিরের জন্ম হবে তাকে কর্মসূচীগত ঐক্যে রূপান্তরিত করতে হবে। না হলে সেটা হবে সুবিধাবাদ। এখানেই বামপন্থীদের দায়িত্ব। এই দায়িত্ব আমরা পালন করবো।

প্রঃ তেমন পরিস্থিতিতে কী বামপন্থীরা সরকারে যাবে?
উঃ পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিচার করে, তারই পটভূমিতে ঠিক করতে হবে আমরা সরকারে যাব কিনা।

প্রঃ যদিও লোকসভার নির্বাচন, কিন্তু এরাজ্যে বিরোধীরা রাজ্যের ইস্যুগুলোই বলে যাচ্ছে আপনি বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
উঃ আসন্ন নির্বাচন লোকসভার হলেও, এরাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সরকার এবং বিরোধী দলগুলোর অবস্থান নির্বাচনী লড়াইয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিশেষ করে রাজ্য উন্নয়নের পথে চলবে না দাঁড়িয়ে থাকবে? কৃষির সাফল্য থে‍‌কে শিল্পায়ন কী সঠিক রাজনীতি নাকি বিরোধীদের ধংসাত্মক বিরোধিতাই সঠিক? রাজ্যকে উত্তরে-দক্ষিণে ভাঙাভাঙির যে ষড়যন্ত্র, সেই বিষয়ে মানুষের মনোভাব কী তা তো নির্বাচনী লড়াইতে আসবে। কিন্তু যেহেতু লোকসভা নির্বাচন অতএব দেশের সরকার কী হবে, তার নীতি কী হবে তা প্রধান বিবেচ্য বিষয়। কিন্তু মুশকিল হলো এনিয়ে আমাদের রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের তেমন কোন কথা শোনা যায় না। কখনও কংগ্রেসের বক্তব্যই ওদের বক্তব্য, কখনও বি জে পি-র বক্তব্যই ওদের বক্তব্য।

প্রঃ এবার তো তৃণমূল জোট করেছে কংগ্রেসের সঙ্গে আপনি এই জোটকে কীভাবে দেখছেন?
উঃ বিরোধীদের এই জোট সম্পর্কে বলা যেতে পারে, কংগ্রেস তাদের দুর্বল অবস্থা থেকে খড়কুটো ধরে বাঁচতে চাইছে। আর সেজন্য সর্বভারতীয় একটা দল নিজেদের নীতি স্বার্থ বিসর্জন দিয়েও তৃণমূলী জোটের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে। অস্তিত্ব রাখার চেষ্টা বলা যেতে পারে একে। কংগ্রেস জোট করেছে ঠিকই কিন্তু তারা এখনও নিশ্চিত নয়, অতীতের মতো তৃণমূল আবার বি জে পি শিবিরে ফিরে যাবে কিনা। দেখা গেছে, এই নীতিহীন অবস্থানই কংগ্রেসকে বারে বারে বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে। নীতিহীন জোটের এটাই হয় অনিবার্য ফলাফল।

প্রঃ কিন্তু তৃণমূল তো আগে থেকে নানা রঙের পতাকাধারী দলের সঙ্গে জোট করে বসে আছে...
উঃ হ্যাঁ, সেতো আরও মারাত্মক। কংগ্রেসও সেটা জানে। চরম দক্ষিণপন্থী থেকে চরম বামপন্থী সবরকম দলের সঙ্গেই তৃণমূলের কোথাও প্রকাশ্য, কোথাও অপ্রকাশ্য সমঝোতা আছে। বিচ্ছিন্নতাবাদী, সন্ত্রাসবাদী সমস্ত শক্তিকেই ওরা ওদের জোটে জড়ো করেছে। এটা এরাজ্যের গণতন্ত্রের পক্ষে, উন্নয়নের পক্ষে বড় বিপদ। এসব মানুষ দেখছেনও।

প্রঃ এধরনের জোট সম্পর্কে, ওদের কার্যকলাপ সম্পর্কে রাজ্যের মানুষ নিশ্চয়ই বুঝছেন কিন্তু ওদের নৈরাজ্যের কার্যকলাপ এরাজ্যের কতটা ক্ষতি করেছে?
উঃ বিরোধীদের নৈরাজ্য সৃষ্টি, রাজ্যের শিল্পায়নের ক্ষেত্রে খানিকটা প্রশ্ন চিহ্ন যে টেনেছে তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু মূলত আমরা তাকে অতিক্রম করেই এগচ্ছি, ভবিষ্যতে আরও এগিয়ে যাব। শিল্পের জন্য পুঁজি আসছে, এই সঙ্কটের মধ্যেও আসছে।

প্রঃ বিরোধীদের এই নৈরাজ্য সৃষ্টি, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ রাজ্যের ক্ষতি করেছে এটা যেমন বাস্তব, আবার অনেকে মনে করেন প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল আরও দৃঢ় পদক্ষেপের কথা বলছেন অনেকেই আপনি কী মনে করেন?
উঃ একথাটা আমিও বিভিন্নভাবে শুনেছি। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে প্রশাসনের আরও সক্রিয় হওয়া উচিত ছিল। যেমন ধরা যাক সিঙ্গুরের ক্ষেত্রে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম জনসমর্থনের ভিত্তিতেই কারখানাটি হোক। কারখানা, কর্মসংস্থান এটাইতো আমাদের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিরোধীরা তা হতে দেয়নি। এই সময়ে পশ্চিম মেদিনীপুরের লালগড় অঞ্চলে যে অবস্থার সৃষ্টি করেছে, বলা যেতে পারে, তৃণমূল-মাওবাদীরা আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা করছে। কিন্তু আমাদের চেষ্টা ছিল এবং এখনও আছে, শুধু প্রশাসন নির্ভর নয়, রাজনৈতিকভাবেই সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে এই সমস্যার মুখোমুখি হওয়া। ২০০৭-এ নন্দীগ্রামেও কিছু মানুষ ভুল বুঝলেন। ওখানে আমাদের শিল্প গড়ার পরিকল্পনা কী, রাসায়নিক শিল্প, পেট্রোকেমিক্যাল এসব বোঝানোর আগেই অন্য ঘটনা ঘটতে শুরু করলো। আমরা তখনই জমি অধিগ্রহণ না করার সরকারী সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিই। তা সত্ত্বেও টানা একবছর সেখানে কেন একের পর এক হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে চললো, মানুষ এখন তা বুঝতে পারছেন। তাঁরা বুঝতে পারছেন তৃণমূল-মাওবাদীদের আসল উদ্দেশ্য কী ছিল। এইসব অভিজ্ঞতা থেকেই ভবিষ্যতে আমাদের আরও সতর্ক পদক্ষেপ নেওয়ার প্রয়োজন আছে।

প্রঃ এসব ঘটনায় সরকারের শিল্পায়ন নীতি কী কিছুটা থামকে দাঁড়িয়েছে? মনে হতে পারে, অবস্থা কিছুটা থিতু হোক, ততোক্ষণ ধীরে চলো এটা কী সরকারের এখনকার মনোভাব
উঃ না, বিন্দুমাত্র নয়। সরকারের শিল্পায়ন নীতি দাঁড়িয়ে যায়নি। বিগত এক বছরে যে বিনিয়োগ হয়েছে, কিংবা আগামী এক বছরের জন্য যে বিনিয়োগ প্রস্তাবগুলো এখন আমরা বিবেচনা করছি, তাতে থমকে যাবার মতো অবস্থা যে হয়নি তা স্পষ্ট। কিন্তু সরকারের মনোভাবের দিক থেকে একথা বলতে পারি, জ‍‌মি অধিগ্রহণ, পুনর্বাসন পরিকল্পনা আরও নিখুঁত করা দরকার, তার জন্য যেটুকু সময় লাগছে তা লাগবে। বলতে পারেন, সাম্প্রতিক ঘটনাবলী থেকেই আমাদের এই সতর্ক ব্যবস্থা।

প্রঃ মাওবাদীদের কার্যকলাপ, সন্ত্রাসবাদীদের সক্রিয় হয়ে ওঠা গোটা রাজ্যেই উদ্বেগ তৈরি করছে প্রশাসন কি ভাবছে, পার্টি কী করবে?
উঃ ঠিকই, এটা উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে। আমাদের রাজ্যের পশ্চিমে ঝাড়খণ্ড রাজ্যকে ব্যবহার করতে পারছে বলে এই লাগোয়া অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ চালাচ্ছে। তাদের একটা অংশ আবার প‍‌শ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, পুরুলিয়াকে ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করতে চায়। এসমস্ত ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য প্রশাসনকে আরও তৎপর করা। কিন্তু সর্বোপরি রাজনৈতিক সমাবেশের মধ্যে দিয়ে একে নির্মূল করা।

প্রঃ উত্তরেও সমস্যা বাড়ছে আরেকটা বিষয় সমস্ত ক্ষেত্রেই দেখা যা‍‌চ্ছে এদের সঙ্গে রয়েছে তৃণমূল....
উঃ হ্যাঁ, তা তো স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। এর কেন্দ্রে রয়েছে তৃণমূল। এরাই এই শক্তিগুলোকে একত্রিত করছে। দার্জিলিঙ আসছে লালগড়ে। লালগড় যাচ্ছে দার্জিলিঙে। সকালে লালগড় ফোন করছে তৃণমূল দপ্তরে, রাতে ফোন যাচ্ছে ঝাড়খণ্ডে, মাওবাদী ডেরায়। সতর্ক থেকেই এর মোকাবিলা করতে হবে। এরাজ্যের মানুষও বুঝছেন কতটা বিপজ্জনক ওরা।

প্রঃ একইসঙ্গে সংখ্যালঘু কিংবা আদিবাসীদের বিভিন্ন ইস্যু তুলে তাদের বিভ্রান্ত করারও চেষ্টা চলছে বিরোধীরা একে ব্যবহার করতে চাইছে ভোটে এই বিষয়টা আপনি কিভাবে দেখছেন?
উঃ একটা জিনিস স্পষ্ট হচ্ছে দার্জিলিঙ হোক বা কোচবিহার, পশ্চিম মেদিনীপুর কিংবা সংখ্যালঘু অধ্যুষিত কোন এলাকাই হোক, একটা পরিকল্পিত চেষ্টা চলছে এই অংশের মানুষকে বিভ্রান্ত করা, বামবিরোধী করে তোলা। কিন্তু একটা বিষয় জোর দিয়ে বলা যায়, ৩০ বছর অতিক্রম করে আদিবাসী কিংবা তফসিলী সম্প্রদায় অথবা সংখ্যালঘু মানুষের জীবনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। জমি পেয়েছেন, শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হয়েছে, কর্মসংস্থানও বেড়েছে। কিন্তু সেটা সবক্ষেত্রে আশানুরূপ নয়। আমরা চেষ্টা করছি। যদিও এখনই সব পরিবর্তন ঘটে যাবে তা আমরা মনে করি না। যেমন আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামগুলো অতীতের চেহারা থেকে বর্তমানে অনেক পালটে গেছে। জীবনযাত্রার মানও উন্নত হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও তুলনামূলক বিচারে তাদের পিছিয়ে পড়া অবস্থাকে বিরোধীরা ব্যবহার করতে চাইছে। আমরা বিশ্বাসী, সঠিকভাবে আমাদের কর্মসূচীগুলো রূপায়ণ করতে পারলে, রাজনৈতিক শক্তি সমাবেশ ঘটাতে পারলে, বিরোধীদের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। অতীতেও তা হয়েছে। সংখ্যালঘু, আদিবাসী কিংবা তফসিলী সম্প্রদায়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ বাম শিবিরে ছিলেন, এখনও আছে। নির্বাচনী ফলাফলেও তার প্রতিফলন ঘটবে।

গোর্খাল্যান্ড ১ ~ পারিজাত ভট্টাচার্য্য


অনেকেরই জানা যে বাংলাভাঙ্গার আদি চক্রান্ত হয়েছিল ১৯৪৭ এর ৪২ বছর আগে অর্থা১৯০৫ সালে । তখন ব্রিটিশরাই ছিলেন আমাদের দেশের শাসক দল । লর্ড কার্জন ছিলেন ভাইসরয় । বাংলা ভাগের কার্জনীয় আদেশ জারি হয়েছিল ১লা সেপ্টেম্বর , ১৯০৫ এবং বাংলা ভাগ কার্যকর হয়েছিল ওই সালের ১৬ ই অক্টোবর । তবে বাংলা ভাগের পরিকল্পনার কথা লর্ড কার্জন প্রকাশ করেছিলেন তার আগের বছর , ১৯০৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এবং ওই ফেব্রুয়ারী মাসেই স্বরাষ্ট্রসচিব এইচ এইচ রিজলে তার একটি নোটে রাজনৈতিক ভাবে বাংলাকে দুর্ব ল করার লক্ষ্যে বাংলাকে ভাগ করার প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন । কেন এই বাংলা ভাঙ্গার চক্রান্ত। কারন লর্ড কার্জন আর রিজলে বাংলা কে ভয় করতেন । রিজলে তখন ১৯০৪ এর ৬ই ডিসেম্বর তার নোটে লিখেছিলেন : “Bengal United is a power; Bengal divided will pull in several different ways….one of our main objective is to split up and thereby weaken a solid body of opponents to our rule” স্বয়ং কার্জন ও ভারত সচিবকে সতর্ক করে দিয়ে লিখেছিলেন : “………if we are weak enough to yield to their clamour now, we shall not be able to dismember or reduce Bengal again; and you will be cementing and solidifying, on the eastern flank of India, a force already formidable, and certain to be a source of increasing trouble in the future….” তবে শেষ পর্যন্ত কার্জন কেও প্রতিবাদী বাংলার কাছে মাথা নোয়াতে হয়েছিল । বয়কট- স্বদেশী-বিপ্লব্বাদী আন্দোলনের সামনে ছ বছর পর বাংলা ভাঙ্গার সরকারী সীদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নিতে হয়েছিল ব্রিটিশ সরকার কে । কিন্ত কলকাতা থেকে সরিয় নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো ভারতের রাজধানীকে পাকাপাকিভাবে ১৯১১ সালে । এই বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ । তারপর আমাদের দেশের রাজনৈতিক প্রশাসন এর মঞ্চ থেকে কার্জন গষ্ঠি বিদায় নেবার পরও ঐক্যবদ্ধ বাংলা চিরকালী দিল্লির শাসক দের চক্ষুশূল হয়ে থেকেছে । কেবল ব্রিটিশ শাসক দের কাছেই নয়, ভবিষৎ কংগ্রেসী শাসকদের সভাপতির পদে সুভাষচন্দ্র বসুর জয়লাভের তাকে মেনে নিতে পারেন্ নি গান্ধীজি । এবং ১৯০৫ - ১১ সালে কার্জন রা যা পারেন নি তা তার উত্তরাধিকাররা ১৯৪৭ সালে এসে সক্ষম হয়েছিলেন ভারত ভাগ করে বাংলাকেও ভাগ করতে। অবশ্যই জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃতের সমর্থনে ও সহায়তায় । লক্ষনীয়, তখন বাংলা ভাগের বিরুদ্ধে কমিউনিস্ট পার্টি স্বাধিন ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে ঐক্যবদ্ধ বাংলার দাবী করেছিল। কিন্ত কংগ্রস ও মুস্লিম লিগ উভয়েই তা প্রতাখ্যান করেন । অতঃপর ভারত ভাগের সঙ্গে বাংলাও ভাগ হয়ে যায়। কার্জন না থাকলেও কার্জনিও নীতি সফল হয়। স্বাধীনতার পরেও কংগ্রেস শাসকেরা মনে করেছিলেন যে ঐক্যবদ্ধ বাংলা এমনই এক শক্তির আধার যা কিনা ভবিষৎতে তাদের একচ্ছত্র শাসনের সামনে বিপদের উৎস হয়ে থাকবে। তাই তারা বাংলা ভাগের এক নতুন চক্রান্ত সুরু করলেন। শুধু এই বাংলা ভাগে এনারা সন্তষ্ট থাকেন নি। যদিও বিভাজিত তবু স্বতন্ত্র বাংলার অস্তিত্ব বিলুপ্ত করার পথ ধরেছিল স্বাধীনতার ৮ বছর পার হতে না হতেই, ১৯৫৬ সালে। ২০ শে জানুয়ারী, ১৯৫৬ কেন্দ্রীয় কংগ্রেস সরকারের নিদের্শে পশ্চিম বঙ্গের কংগ্রসী মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় এবং বিহারের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ শ্রীকৃষ্ণ সিংহ এই দুই রাজ্যের সংযুক্তিকরনের প্রস্তাব দেন। কেন্দ্রের কংগ্রেস সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গোবিন্ধব ল্লভ পন্থ ঘোষনা করেন ঃ বাংলা ও বিহারের সংযুক্তিকরন সম্ভব হইতে চলিয়াছে এবং হইবেও।"


এই সংযুক্তিকরনের লক্ষ্য ছিলো পশ্চিম বঙ্গের গনতান্ত্রিক আন্দোলন এর বাধা সৃষ্টির করার জন্যে পশ্চিমবঙ্গের অবলুপ্তি ঘটানো। এই প্রসঙ্গে ১১ ফেব্রুয়ারী নাগরিক বিরোধী সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সাহিত্যিক অতুলপ্রসাদ গুপ্ত ঃ
এসব সুস্থ মনের চিন্তা নয়, অনাস্বাদিতপুর্ব ক্ষমতার মত্ততায় উচ্ছৃঙ্খল খামখেয়ালির লিলানৃত্য । প্রতিবাদে গরজে উঠেছিল সারা বাংলার সমস্ত বামপন্থী দলগুলি এবং সাথে ছিলো শুভ বুদ্ধি সম্পন্য মানুষ, শিল্পী, সাহিত্যিক, চিকিৎসক, শ্রমিক- কৃষক, মধ্যবিত্ত ইত্যাদি। এই প্রতিবাদী আন্দোলনে কংগ্রেস ছাডা সবাই ছিলেন। একের পর এক সংগঠিত হয় ধর্মঘট। ওই সময়ে উত্তর-পশ্চিম লোকসভা কেন্দ্র (কলকাতা) থেকে জেতেন বঙ্গ-বিহার সংযুক্তিকরন বিরোধী আন্দোলনের নেতা কমরেড মোহিত মিত্র। আর তার ফলে বঙ্গ-বিহার সংযুক্তিকরনের চক্রান্ত ব্যর্থ হয়। অবশ্য এই চক্রান্ত থেমে থাকেনি। বহু চক্রান্ত এর সাথে এই বাংলা ভাঙ্গার চক্রান্ত রখে দিয়েছিলেন পশিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার সাধারণ মানুষ কে পাশে নিয়ে। তাই এই ৩২ বছরে এই রাজ্জ্যের বামবিরোধী শক্তি গুলো বুঝে গেছে যে ওনারা জনতার সাথে বামফ্রন্টসখ্যে ফাটল ধরাতে পারবে না। তবে মনে হয় যে শ্যাম চাচারা ১৯০৪ সালের রিজলের উক্তি টি মনে রেখেছেন যে Bengal United is a power; Bengal divided will pull in several ways” তাই ওনাদের বোধহয় রাতের ঘুম চলে গেছে। ওনারা এখন বাংলা দুই ভাগ চান না, চান টুকরো- টুকরো করতে। অনেকটা সেই উত্তর-পুর্ব ভারতের বলকানাইজেশন এর মতন।


ঠিক ওই অপারেশন ব্রম্মপুত্র এর মতন ভারতে বলকানাইজেশ্ন চাইছেন। তাই উত্তরবঙ্গে কামতাপুরি, সুর্যাপূরি, গোর্খাল্যান্ড, গ্রেটার ইত্যাদি এবং দক্ষিনে পুরুলিয়া, বাঙ্কুড়া ও পশ্চিম-মেদিনীপুর। এই শ্যাম চাচা থুড়ি আমেরিকা র চরেরা এখন সর্ব শক্তি নিয়ে জনগন এবং এই বাংলা কে বিচ্ছিন্ন্য করতে উঠে পড়ে লেগেছে। আমার নিজের বাড়ি উত্তরবঙ্গের দার্জিলিং জেলার শিলিগুড়ি শহরে। আমার পিতামহের বাড়ি দার্জিলিং এ হবার জন্যে এই জেলা টাকে এবং এই জেলার মানুষজন, তাদের সংষ্ক্রিতির সম্মন্ধে কিছুটা জানা আছে। এখানকার পাহাড়ের সাধারন নেপালী সমপ্রদায় খুব কর্মঠ, সত এবং অথিতিপরায়ন। কিন্ত এদের গত১৯৭৫ সাল থেকে খেপিয়ে তোলা হয়। এদের অধিকাংশের দাবি এখন গোর্খল্যান্ড। এই সুযোগে স্যাম চাচাদের আরেক দালাল পক্ষ, সংবাদ্মাধ্যম আজ সেই অতিপরিচিত হলুদ সাংবাদিকতায় নেমে পরেছেন। যা ইচ্ছা তাই লিখে চলেছেন। পূর্বাপর প্রেক্ষাপট বিবেচনা না করে, ইতিহাসের পাতা থেকে কোনো ঘটনার অংশকে তুলে ধরে তথ্য বিকৃতি ও ভ্রান্ত উপস্থাপনা নতুন বিষয় নয় এনাদের কাছে কারণ এনারাই প্রমান করেন যে শ্যাম চাচা দের দরকার গোয়েবেলস এর মতন সুযোগ্য সহায়ক। তাই আজ আনন্দবাজার এর বাজারি খবর যদি প্রকাশ করে ্যে গোর্খাল্যান্ডের দাবি একসময়ে বাংলার অভিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি১৯৪৭ সালে করেছিল তাতে অবাক বা আশ্চর্য্য হবার কারন নেই, কারন এই বাজারি সংবাদমাধ্যম পড়াতে চায় আবার ভোলাতেও চায়, না ভুল্লে পিছিয়ে পরতে হয়। (এটি আনন্দবাজারের ২ রা জুলাই ২০০৮ এর সম্পাদকিয় কলমে শ্রীমান গৌতম রায়ের লেখা )। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) এর প্রকাশিত বক্তব্যটি হোলো ঃ রাজ্যের মধ্যেই আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন দার্জিলিং জেলার পার্বত্য অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি। অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি এবং পরবর্তী সময়ে সি পি আই (এম) পার্বত্য এলাকার জনগনের সেই দাবিকে বরাবর সমর্থন জানিয়ে এসেছে, দাবির সমর্থনে আন্দোলন ও করেছে, সংসদে সোচ্চার হয়েছে। রাজ্যকে ভাগ করার চক্রান্তের বিরুদ্ধে সি পি আই (এম) । সেইজন্যই চক্রান্তকারীদের আক্রমনের লক্ষ্য তারা। তাই এই ভদ্রলোক ওনার সম্পাদকীয় নিবন্ধে গোর্খাস্থান কারা চেয়েছিলেন এ, উদ্দেশ্যপ্রনোদিতভাবে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি কে আক্রমন করেছিলেন। স্বল্পজ্ঞ্যন অথবা ইচ্ছাকৃত বিকৃতি সূত্রে ভ্রান্ত কিছু তথ্য দিয়ে লেখক বলেছেন যে, কমিউনিস্ট পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটি ১৯৪৭ সালে গোর্খাস্তান এর দাবি তুলে চিঠি পাটায় ও তখন পার্টির সম্পাদক ছিলেম রতনলাল ব্রাক্ষণ, এটি ওনার লেখায়ে অদ্ভুত ভাবে উল্লেখ ছিলো যে রতনলাল ব্রাক্ষণ বিধানসভার নির্বাচনে নাকি জয়লাভ করেছিলেন গোর্খাল্যান্ডের দাবির মাধ্যমে। এই তথ্য ভ্রান্ত এবং কমরেড রতনলাল ব্রাহ্মিণ এর প্রতি অপমানকর। আনন্দবাবু এবং তার সাগরেদ রা জানেন না যে একসময়ে শিলিগুড়ি তে কমিউনিস্ট পার্টি জলপাইগুড়ি থেকে পরিচালিত হলেও দার্জিলিং পাহাড়ে সে ব্যাবস্থা ছিলো না। দার্জিলিং পাহাড়ে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার ভার ছিলো সুশীল চ্যাটার্জির ওপর। এই দায়িত্ব ওনাকে দেওয়া হয় প্রাদেশিক কেন্দ্র থেকে। এই কমরেড ই কমঃ রতনলাল ব্রাম্মিণ কেই কমিউনিস্ট পার্টি তে নিয়ে আসেন। তথাকথিত গোর্খাস্তান এর যে প্রস্তাবের কথা আনন্দবাবু রা বলছেন সেটার সময় ছিলো ৬ই এপ্রিল, ১৯৪৭ সাল, অর্থাৎ দেশ স্বাধীন হবার আগেই। তখন দার্জিলিং এর সাংগোঠনিক সম্পাদক ছিলেন গণেশলাল সুব্বা। ইনি পরবর্তী সময়ে পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন। পরবর্তিকালে আলাদা রাজ্জ্য গডার দাবিতে পার্টি থেকে বহিষ্কৃত হন সাংসদ আর বি রাই এবং দাওয়া লামা। ১৯৪৭ সাল, ১৫ই আগস্ট, দেশ স্বাধীন, বাংলা ভাগ, পশ্চিম বঙ্গ গঠন এবং পরের মাসেই অনুষ্টিত হয় কমিউনিস্ট পার্টি এর চতুর্থ প্রাদেশিক সম্মেলন। ১৯৫১ সালে কলকাতা কংগ্রেসে স্বায়ত্তশাসনের বিষয়টি স্বাধীন ভারতের বাস্তবতায়ে বিশ্লেসন করা হয়। এরপর উপজাতি জনজাতি বিসয়ক যে প্রস্তাব গ্রহন করা হয় তাতে দার্জিলিঙের নেপালী (গোর্খা) জনগোষ্ঠীর বিষয়ে উল্লেখ করে স্বায়ত্তশাসনের প্রকৃত ধারনাটি কে ব্যাখা দেওয়া হয়। এরপর থেকেই দার্জিলিঙের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিই সুস্পষ্ঠ ও সুনির্দিষ্ঠ ধারনা প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) ১৯৭২ সালে মাদুরাইতে অনুষ্ঠিত নবম পার্টি কংগ্রেস ভারতে জাতি সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সুস্পষ্ট নীতি ঘোষনা করে রাজ্জ্যের মধ্যেই আঞ্ছলিক স্বায়ত্ত্যশাসন বৈজ্ঞানিক দৃষ্ঠিভঙ্গি তুলে ধরেছে। কমিউনিস্ট পার্টির দার্জিলিং জেলা কমিটি ১৯৫৬ সালে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের কাছে রাজ্যের মদ্ধ্যেই আঞ্চলিক স্বায়িত্তশাসন দাবি জানিয়ে স্বারকলিপী পাঠায় এবং তার অনুলিপী দেওয়া হয় ভারতের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীসহ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলিকে। ১৯৫৫ সালের ৯ই ডিসেম্বর রাজ্যের বিধানসভায় জ্যোতি বসু প্রস্তাব তোলেন নেপালী ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির, দার্জিলিং পার্বত্য এলাকার জন্যে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন ও চা বাগান শ্রমিকদের অধিকার সুরক্ষিত রাখার জন্যে।


এই সময়ে বহুবার স্বায়ত্তশাসন এবং নেপালী ভাষার সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য সাংসদ হীরেন মুখার্জি, সত্যেন্দ্রনারায়ণ মজুমদার , সমর মুখার্জি, সোমনাথ চ্যাটার্জি, রতণলাল ব্রাহ্মমিন, আনন্দ পাঠক বারবার দাবি জানিয়ে এসেছেন। ১৯৭৭ সালে যুক্তফ্রন্ট ইশ্তেহারেও এই দাবি ছিলো অন্যতম। ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পর সি পি আই (এম) বিধায়ক বীরেন বসু বিধানসভায় এই দাবি উত্থাপন করেন। আঠের দশকে সুভাষ ঘিসিঙের নেতৃত্বে হিংসাশ্রয়ী গোর্খাল্যান্ড আন্দোলনের সময়ে ২৫০ জনের বেশী সি পি আই (এম) নেতা-কর্মী শহীদ হলেন এবং বাস্তুচুত হলেন অনেক পার্টির নেতা ও কর্মীরা। এনারা সবাই ছিলেন কিন্ত পাহাডের মানুষ। এখনকার মতই অন্য কোনো দল কিন্ত আক্রান্ত হয় নি। রাজ্য সরকার সবরকমের আলোচোনা চালিয়ে জাবার চেষ্ঠা করে শান্তিপুর্ণ ভাবে কিন্ত ঘিসিং এর গঠিত জি এন এল এফ (GNLF) সমস্তরকমের শান্তিচুক্তি বাতিল করে দেয়। সাম্প্রদায়িক আচরণ এর সাথে সরকারের সম্পত্তি নষ্ঠ করে তারা। শেষমেশ রাজ্য সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে আলোচনা করে এই ধংসাত্বক কর্মসুচি কে প্রশাসনিক তৎপরতায় শান্তী এবং সম্পীতি আনার চেষ্ঠা হয় কিন্ত GNLF ১৯৮৯ সালের ভোট বয়কট করে । সেই সময়ে কংগ্রেস, তাদের বিচ্ছিন্নতাকারী রুপ প্রকাশ হয়ে পড়ে এবং এই কংগ্রস লোক সভা নির্বাচনের কিছু মাস আগে জি এন এল এফ কে সমর্থন করে, পাহাড়ে সি পি আই এম এর সাংসদ আনন্দ পাঠক কে হারাবার জন্যে। এবং কংগ্রেস তারা শ্রেনী চরিত্র অনুযায়ী জি এন এল এফ কে সমর্থন করে এবং আনন্দ পাঠক হেরে যান। যাই হোক, আজ ও গোর্খাজনমুক্তির আক্রমনের লক্ষ্য সি পি আই (এম) এবং কমিউনিষ্ট দের হারাতে এই লোকসভা নির্বাচনে মোর্চির মন পেতে উদ্দোগী কংগ্রেস ও বি যে পী। এটাই এদের শ্রেনী চরিত্রের আরেক দিক, এরা শ্রমিক এবং সাধারন মানুষ কে ধর্মের নামে , জাত-পাতের শৃঙ্খলে এ আবদ্ধ করতে চায় যাতে শ্রেনীচেতনার বিকাশ থেকে এরা ছিন্ন থাকতে পারে। যাই হোক পাহাডে কমঃ রতণলাল ব্রাহ্মীণ খুব জনপ্রিয় ছিলেন। চা শ্রমিকেরা এবং সর্বসাধারণ ওনাকে মাইলা বাজে (মানে মেজ কর্তা ) বলে ডাকতো। তিনি কোনো বিচ্ছিন্নতাবাদী স্লোগান তুলে কমিউনিষ্ট পার্টি কে গড়ে তোলেন নি। চা বাগান শ্রমিক আন্দোলনের পাশাপাশি গরিব গোর্খাদের সহায়তাকারী সংঘটন গোর্খা দুঃখ নিবারণ সমিতির সংগঠক ছিলেন তিনি। তার সাহস, মমত্ববোধ ও ঔদার্য তাকে জনপ্রিয় করে তুলেছিলো। ১৯৪৬ সালে যে ইশতেহার প্রচার করে কমিউনিষ্ট পার্টির প্রার্থী রতনলাল ব্রহাম্মীণ বিজয়ী হয়েছিলেন, সেখানে কিন্ত কোনো আলাদা রাজ্যের কথা (গোর্খাস্তান ত নয়ই) ছিলো না। ইশ্তেহারটিতে যে ১১ দফা দাবি ছিলো তা পাহাড়ের চা বাগানের শ্রমিক ও গরিব মানুষের স্বার্থে। দার্জিলিং পাহাড়ে চা শ্রমিক দের ঐতিহাসিক আন্দোলন হয় ১৯৫৫ সালে। এই আন্দোলনরত শ্রমিকদের অপর পুলিশ নির্মমভাবে গুলি চালায়। নারী-শিশু সহ ৬ জন শহীদ হন। এই ঐতিহাসিক আন্দোলনের নেতা ছিলেন রতনলাল ব্রাহ্মীণ। যে স্মারকলিপিটির একটি অনুচ্ছেদ প্রমাণ করে জাতি সত্তার পক্ষে থেকেই একদিকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও একি সাথে ঐক্য সং হতি পক্ষে কমিউনিষ্ট দের দৃষ্ঠিভঙ্গি, সেই অনুচ্ছেদ তাই তুলে দেওয়া হলো ঃ

The Communist Party of India vehemently opposes the sinister British Imperialistic plot of excluding the district of Darjeeling from the rest of India and its constitution into a separate chief Commissioner’s Province as has been put forward by the Hillmen’s Association in its memorial to Lord Pethick Lawrence, Secretary of State of India, in December 1946. This Association (Hillmen’s Association) represents none but the local agents of the British Imperialism. The Communist Party of India is also opposed to any such plans that might be put forward by the local agents of British Imperialism in a modified form. It has reason to apprehend that the British Imperialists are hatching a plot to place the district of Darjeeling with other tribal peoples of Assam and Dooars in an altogether new Province to be called the North Eastern Himalayan Hill Province.”

চলবে________________


পর্ব-২
পার্বত্য পরিষদের পত্তন ও তার পর---

বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০০৯

পশ্চিমবঙ্গকে পিছিয়ে দিতে চায় বিরোধীরা ~ জ্যোতি বসু




পশ্চিমবাংলাকে পিছিয়ে দিতে চায় কংগ্রেস ও তৃণমূল। ওরা রাজ্যের শিল্প গড়ার কাজে বাধা দিচ্ছে, উন্নয়নের সব কাজেই বাধা দিচ্ছে। এমনকি বেকার যুবকদের কাজের সুযোগ তৈরি করতেও ওরা বাধা দিচ্ছে। এরাজ্যের মানুষ ওদের ক্ষমা করবেন না। গণশক্তি-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে একথা বললেন প্রবীণ জননেতা জ্যোতি বসু। তিনি এই সাক্ষাৎকারে দেশ ও রাজ্যের পরিস্থিতি নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। বলেছেন, কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউ পি এ এবং বি জে পি-র নেতৃত্বে এন ডি এ, যে নীতির ভিত্তিতে দেশ চালিয়েছে তা সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে। তাই তৃতীয় মোর্চাই এখন দরকার। মানুষ তার পক্ষেই রায় দেবেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন অজয় দাশগুপ্ত

প্রশ্ন: গত লোকসভা নির্বাচনের তুলনায় একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষিতে এবারের নির্বাচন হতে চলেছে। বামপন্থীরা গতবার কংগ্রেসকে সমর্থনের কথা বললেও এবারে কংগ্রেস এবং বি জে পি, উভয়কেই পরাস্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। এরকম পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটের কারণ কি?

জ্যোতি বসু: এটা ঠিকই, গতবারের তুলনায় পরিস্থিতির অনেকটা পরিবর্তন হয়েছে। গত লোকসভা নির্বাচনের পর আমরা কংগ্রেসকে সমর্থন করেছিলাম কেন্দ্রে সাম্প্রদায়িক শক্তি বি জে পি-কে ঠেকাতে। বি জে পি-র নেতৃত্বে এন ডি এ আবার ক্ষমতায় এলে দেশকে আরেকটা গুজরাট বানিয়ে ফেলতো। গুজরাটে আর এস এস-বি জে পি পরিকল্পনা করে মুসলমানদের গণহত‌্যা করেছে রাজ্য সরকারের মদতে। আমরা এটা সারাদেশে হতে দিতে চাইনি। সেজন্যই কংগ্রেসের নেতৃত্বে ইউ পি এ সরকারকে আমরা সমর্থন করেছিলাম। এটা একটা অভিনব ব‌্যাপার ছিল। যে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আমরা চিরকাল লড়াই করে এসেছি, এখনও লড়াই করছি, সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রুখতে তাদেরকেই আমাদের সমর্থন করতে হয়েছিল। কিন্তু এটাও মনে রাখতে হবে, আমাদের এই সমর্থন নিঃশর্ত ছিল না। সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী রূপায়ণের শর্তেই বামপন্থীরা ইউ পি এ সরকারকে সমর্থন করেছিল।

প্রশ্ন: কিন্তু সমর্থন তো তুলে নেওয়া হলো....

জ্যোতি বসু:
হ‌্যাঁ, সমর্থন তুলে নিতে হলো, কারণ কংগ্রেস দেশের মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছে। ওরা সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী মানেনি। দেশের স্বাধীন বিদেশনীতিকে বিসর্জন দিচ্ছে, আমেরিকার পদলেহন করছে। আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করে এমন নীতি নিয়ে দেশ চালাচ্ছে, যা দেশের সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে। যখন সরকার হয়, তখন কথা হয়েছিল যে ওদের একটা কমিটি হবে, আমাদের একটা কমিটি হবে, যারা নিয়মিত আলোচনা করবে সরকার পরিচালনা নিয়ে, সাধারণ ন্যুনতম কর্মসূচী রূপায়ণ করার বিষয়ে। কিন্তু কংগ্রেস এই কর্মসূচী রূপায়ণে অবহেলা করেছে, এর বিরুদ্ধে কাজ করেছে। মানুষের রায় ওরা মানেনি। ওরা আত্মসমালোচনা করে না, ভুল থেকে শিক্ষা নেয় না। যে নীতির জন্য ওদের মানুষ প্রত‌্যাখ‌্যান করেছিল, বি জে পি-ও যে নীতির জন্য হেরে গেলো, তাকেই ওরা আঁকড়ে ধরে রেখেছে। আমরা, বামপন্থীরা তাই এর বিরোধিতা করেছি।

প্রশ্ন: তাহলে এই নির্বাচনে কংগ্রেস-ও না, বি জে পি-ও না, এবারে দিল্লিতে কেমন সরকারের কথা বলছেন?

জ্যোতি বসু:
আমরা চাই, কেন্দ্রে এমন একটা সরকার হবে যারা দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করবে। সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ নীতি নিয়ে চলবে। আমেরিকার কাছে নতজানু হয়ে নয়, দেশ চলবে স্বাধীন বিদেশনীতি নিয়ে। পরনির্ভর নয়, স্বনির্ভর অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে দেশ এগোবে। আমরা সারাদেশে একথা বলছি। আমাদের পার্টি খুবই জোর দিচ্ছে, একটা অ-কংগ্রেসী, অ-বি জে পি সরকার গড়ে তুলতে, যাকে আমরা তৃতীয় মোর্চা বলছি। আমাদের পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিতে এবিষয়ে আলোচনা হয়েছে। অবশ্য আমি অসুস্থ থাকায় বৈঠকে যোগ দিতে পারিনি।

প্রশ্ন: কিন্তু এই তৃতীয় মোর্চার সরকার সম্পর্কে জনমানসে একটা দ্বিধাগ্রস্ততা রয়েছে। এই সরকার তৈরি হওয়া সত্যিই সম্ভব কিনা, শরিক দলগুলি আদৌ এক থাকবে কিনা, কংগ্রেস অথবা বি জে পি-র দিকে ঢলে পড়বে কিনা, এইসব প্রশ্ন রয়েছে অথবা তোলা হচ্ছে। এসম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

জ্যোতি বসু:
আমাদের নেতারা যা বলছেন, দেখতে পাচ্ছি তাতে বিভিন্ন আঞ্চলিক দল ইতোমধ্যেই সাড়া দিয়েছে। আমরা কতগুলি নীতির ভিত্তিতে এই দলগুলিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার কথা বলছি। এটা ঠিকই, এই তৃতীয় মোর্চাকে গড়ে তোলা কঠিন কাজ। কিন্তু সেই কাজই আমাদের করতে হবে। কারণ, কংগ্রেস এবং বি জে পি, যে নীতির ভিত্তিতে দেশ চালিয়েছে, তা সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে। তাই তৃতীয় মোর্চাই এখন দরকার। তৃতীয় মোর্চাই হলো আসল বিকল্প। রাজ্যে রাজ্যে মানুষ নিশ্চয়ই এর পক্ষে রায় দেবেন।

প্রশ্ন: এরাজ্যের বামফ্রন্টবিরোধী দলগুলি তো এবারে সমঝোতা করে নির্বাচনে লড়ছে। এসম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?

জ্যোতি বসু:
শুনেছি, আমাদের বিরুদ্ধে কংগ্রেস আর তৃণমূল একজোট হয়েছে। আর চরম দক্ষিণপন্থী এই সব শক্তির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে নিজেদের বামপন্থী বলে দাবি করে একটা দল। আবার অস্ত্র নিয়ে যারা আমাদের পার্টিনেতা-কর্মীদের খুন করছে, তারা ওদের সাহায্য করছে। এটাও ঘটনা যে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে বিরোধীরা চিরকালই একজোট হয়ে লড়েছে, কখনো খোলাখুলি, কখনো গোপনে। কিন্তু মানুষকে তো এটা বলতে হবে, কংগ্রেস আর তৃণমূল আমাদের বিরুদ্ধে যে জোট করেছে, তা কিসের ভিত্তিতে, ওদের কর্মসূচী কি? সেটা তো ওরা বলছে না। আসলে ওদের কোনো নীতি নেই, নৈতিকতা নেই, কোনো কর্মসূচীও নেই। ওদের একটাই কর্মসূচী, বামফ্রন্টকে হারাও। তার জন্য অনৈতিক জোট গঠনেও ওরা পিছপা নয়। ওরা পশ্চিমবাংলাকে টুকরো টুকরো করতে চায়। সেজন্য বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তির সাথে হাত মেলাচ্ছে, সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গেও আঁতাত করেছে। পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কখনোই এসব মেনে নেবেন না। পশ্চিমবঙ্গের মানুষের চেতনার ওপর আমার পূর্ণ আস্থা আছে। তাঁরা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে উপলব্ধি করেছেন কে শত্রু, কে মিত্র। তাঁরা নিশ্চয়ই কোনো সুবিধাবাদী জোট বা সুবিধাবাদী দলকে ভোট দেবেন না। আমি বিশ্বাস করি, এরাজ্যের মানুষ এবারেও নির্বাচনে বামফ্রন্টকেই বিপুলভাবে জয়ী করবেন।

প্রশ্ন: গোটা দেশের জন্য লোকসভা নির্বাচন হলেও বিরোধীরা রাজ্যের ইস্যুকেই প্রচারে সামনে নিয়ে আসছে? এবিষয়ে আপনার বক্তব্য কী?

জ্যোতি বসু:
এরাজ্যে প্রধান বিরোধী দল, তৃণমূলের দেশের বিষয়ে বলার কী আছে? একটা সর্বভারতীয় ইংরাজি দৈনিকে দেখলাম, এরাজ্যের ৪২জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে সবচেয়ে কমদিন সংসদে হাজির ছিলেন ওদের নেত্রী। এই তো অবস্থা! আর গত ৩২ বছর ধরে এরাজ্যের মানুষ বারে বারে আমাদের নির্বাচিত করে আসছেন। মানুষ আমাদের জানেন। মানুষ দেখছেন বিরোধীরা কি করছে। যে সরকার মানুষের কল‌্যাণের জন্য কাজ করে যাচ্ছে এবং আগামীদিনেও করবে, যে সরকার কৃষির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শিল্পও গড়ে তুলছে, ওরা তার বিরোধিতা করছে। যেকোনো ভালো কাজে ওরা বাধা দিচ্ছে। বামফ্রন্ট সরকার মানুষের জন্য অনেক কাজ করেছে। দেশের মধ্যে অনেক বিষয়ে আমাদের রাজ্য প্রথমস্থানে। কৃষিতে আমরা এখনও প্রথমস্থানে, কৃষির আরো উন্নতি আমাদের করতে হবে। কৃষি বিশেষজ্ঞ,কৃষি বিশ্ববিদ‌্যালয়ের পরামর্শ নিয়ে কৃষি উৎপাদন আরো বাড়াতে হবে। এরাজ্যে কৃষক আত্মহত‌্যা হয় না। সামাজিক বনসৃজন, মাছচাষ প্রভৃতি আরো অনেক ক্ষেত্রে আমরা এগিয়ে। গরিব, ভূমিহীন কৃষকদের মধ্যে ১৩ লক্ষ একর জমি বিলি আমরা করেছি। সারা দেশে আর কোথাও একাজ হয়নি। সবচেয়ে বড় কথা, বামফ্রন্ট সরকার গরিব মানুষের আত্মমর্যাদা বাড়িয়েছে।

প্রশ্ন: বিরোধীরা সংখ‌্যালঘু, বিশেষত মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি করার চেষ্টা করছে। এই বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?

জ্যোতি বসু:
কংগ্রেস অথবা তৃণমূল কখনো মুসলিমদের স্বার্থ দেখেছে নাকি? বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় কেন্দ্রে কংগ্রেসের সরকার ছিল, মমতা ব‌্যানার্জি তখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছিলেন। উনি তখন কোনো কথা বলেননি। গুজরাটে মুসলিমদের গণহত‌্যা করলো যে নরেন্দ্র মোদীর সরকার, নির্বাচনে জেতার পর তাকেই উনি অভিনন্দন জানিয়ে ফুল পাঠালেন। বাবরি মসজিদ ভাঙার আগে আমার মনে আছে, নরসিমা রাও তখন প্রধানমন্ত্রী, দিল্লিতে একটা মিটিঙে আমরাই তাঁকে বললাম যে ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ আমরা পছন্দ করি না, কিন্তু এক্ষেত্রে প্রয়োজনে আপনি সেটাই প্রয়োগ করুন। পরে আমি এবং কমরেড সুরজিত টেলিফোন করেও প্রধানমন্ত্রীকে বললাম, পরিস্থিতি খুবই খারাপ, আপনি দ্রুত ব্যবস্থা নিন। উনি বললেন, আমার পার্টির মিটিং আছে, সেখানে আলোচনা করবো। কিন্তু কিছুই করলেন না। পরে লিবেরহান কমিশন আমাকে ডেকেছিল, আমি বিচারপতিকে বললাম, ভাঙার পর ওরা কি বলছে আমার কাছে ক‌্যাসেট আছে, সেটা আপনি শুনুন।

প্রশ্ন: বিরোধীরা তো সাচার কমিটির রিপোর্টের কথা বলছে...

জ্যোতি বসু:
সাচার কমিটি তো এখন হয়েছে। আমরা যখন সরকারে আসি, তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে মুসলিমরা পিছিয়ে আছে আর্থিকভাবে, শিক্ষার দিক দিয়ে, সামজিকভাবে। তাদের অবস্থার উন্নতি করতে হবে। এজন্য আমরা অনেক মাদ্রাসা তৈরি করেছি, মাদ্রাসা শিক্ষকদের সরকার থেকে বেতন দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি, যা দেশের কোথাও ছিল না। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। স্বনির্ভর হওয়ার জন্য ঋণের ব্যবস্থা ইত‌্যাদি হয়েছে। উর্দু আকাদেমি তৈরি হয়েছে। যে ৩০ লক্ষ মানুষ ভূমি সংস্কারের ফলে এরাজ্যে জমি পেয়েছেন, তার মধ্যে একটা বড় অংশ সংখ‌্যালঘু মানুষ রয়েছেন। সাচার রিপোর্টে সেকথা বলা হয়নি। তবে এক্ষেত্রে আরো অনেক কাজ করতে হবে, আমরাই তা করবো, তারজন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এরাজ্যে সংখ‌্যালঘু মানুষের স্বার্থ সুরক্ষিত। বামফ্রন্ট সরকারের আমলে কখনো দাঙ্গা হয়নি। আমরা সরকারে আছি বলেই এটা সম্ভব হয়েছে। সংখ‌্যালঘু মানুষরা নিশ্চয়ই সেটা উপলব্ধি করেন।

প্রশ্ন: বিরোধীরা যে শিল্পস্থাপনের কাজে বিরোধিতা করছে, সেবিষয়ে আপনি কি বলেন?

জ্যোতি বসু:
এটা কোনো নতুন বিষয় না। ওরা চিরকাল পশ্চিমবাংলায় শিল্প গড়া, এরাজ্যের উন্নতির বিরোধিতা করেছে। স্বাধীনতার পর কেন্দ্রে কংগ্রেস সরকারের নীতির জন্যই পশ্চিমবঙ্গ শিল্পে পিছিয়ে গিয়েছিল। বামফ্রন্ট সরকারকে আবার নতুন করে শিল্প গড়ার কাজ করতে হয়েছে। হলদিয়া পেট্রোকেমিক‌্যালস্‌-এর অনুমোদন পেতে আমাকে ১১ বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। আমার মনে আছে, ১৯৮৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের কিছুদিন পরে আমি এরাজ্য থেকে নির্বাচিত কংগ্রেস সাংসদদের দিল্লিতে একটা মিটিঙে ডেকেছিলাম, যাতে রাজ্যের উন্নতির জন্য একসাথে সবাই কেন্দ্রকে বলা যায়। কিন্তু সেই মিটিঙে প্রিয়রঞ্জন দাসমুন্সী, অজিত পাঁজা, মমতা ব‌্যানার্জিরা এসে ‘আপনার সঙ্গে আমরা যাবো না’ বলে তিনমিনিট বাদেই বের হয়ে গেলেন। এখন তো অনেকে আসছেন শিল্প করতে, বেকার ছেলেমেয়েদের কাজের সুযোগ তৈরি করতে আমাদের শিল্প করতে হবে। যে হারে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন দিয়ে জমি আমরা নিচ্ছি, তার নজির দেশের কোথাও নেই। বিরোধীরা রাজ্যের উন্নয়নে বাধা দিচ্ছে, বেকার যুবকদের কাজের সুযোগ তৈরিতে বাধা দিচ্ছে। ওরা পশ্চিমবাংলাকে পিছিয়ে দিতে চায়। মানুষ ওদের ক্ষমা করবেন না।