শনিবার, ২০ জুন, ২০২৬

জামাই ষষ্ঠী ~ কৌশিক মজুমদার

সে অনেকদিনে আগের কথা। এক পরিবারে দুটি বউ ছিল ৷ ছোট বউ ছিল খুব লোভী ৷ বাড়ির মাছ বা অন্যান্য ভাল খাবার রান্না হলেই সে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে নিত আর শাশু ড়ির কাছে অভিযোগ করত ‘সব কালো বেড়ালে খেয়ে নিয়েছে ’৷ বেড়াল মা ষষ্ঠীর বাহন ৷ তাই বেড়াল, মা ষষ্ঠীর কাছে অভিযোগ জানাল ৷ মা ষষ্ঠী রেগে গেলেন ৷ যার জেরে ছোট বউ-এর একটি করে সন্তান হয় আর মা ষষ্ঠী তার প্রাণ হরণ করেন ৷ এইভাবে ছোট বউয়ের সাত পুত্র ও এক কন্যাকে মা ষষ্ঠী ফিরিয়ে নেন ৷ ফলে স্বামী, শাশুড়ি ও অন্যান্যরা মিলে তাকে ‘অলক্ষণা’ বলে গালিগালাজ করে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় ৷ অথচ বড় বউ পুত্রকন্যাদের নিয়ে সুখে ঘর করতে থাকে ৷

ছোট বউ মনের দুঃখে বনে চলে যান ও একাকী কাঁদতে থাকেন ৷ শেষে মা ষষ্ঠী বৃদ্ধার ছদ্মবেশে তার কাছে এসে কান্নার কারণ জানতে চান ৷ সে তার দুঃখের কথা বলে ৷ তখন মা ষষ্ঠী তার পূর্বের অন্যায় আচরণের কথা বললে সে মাফ চায় ৷ ষষ্ঠী তাকে ক্ষমা করেন | এরপর বলেন — ভক্তিভরে ষষ্ঠীর পুজো করলে সাতপুত্র ও এক কন্যার জীবন ফিরে পাবে ৷ তখন ছোট বউ সংসারে ফিরে এসে ঘটা করে মা ষষ্ঠীর পুজো করে ও ক্রমে ক্রমে তার পুত্র কন্যাদের ফিরে পায় ৷ এর থেকে দিকে দিকে ষষ্ঠী পুজোর মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে ৷

এদিকে বৌয়ের শ্বশুর-শাশুড়ি তাঁকে বাপের বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দেয়। তাঁর মা-বাবা দিনের পর দিন মেয়ের মুখ দেখতে পান না। শেষে মেয়েকে দেখতে উন্মুখ মা-বাবা একবার ষষ্ঠীপূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে আসার জন্য জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানান। এ নিমন্ত্রণ উপেক্ষা করার সাধ্যি জামাইয়ের ছিল না। ষষ্ঠী পূজার দিন শ্বশুরবাড়িতে জামাই সস্ত্রীক উপস্থিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়।

ষষ্ঠীপূজা রূপান্তরিত হয় জামাইষষ্ঠীতে।

আসল ঘটনা একটু অন্যরকম। ভারতবর্ষ তথা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে একসময় সংস্কার ছিল কন্যা যতদিন না পুত্রবতী হয় ততদিন কন্যার পিতা বা মাতা কন্যাগৃহে পদার্পণ করবেন না ৷ এই ব্যবস্থায় সমস্যা দেখা দিল —সন্তানধারণে সমস্যা হলে বা সন্তান মৃত্যুর (শিশুমৃত্যু তখন প্রচুর হত) ফলে কন্যার পিতামাতাকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হত কন্যার বাড়ি যাওয়ার জন্য ৷ সেক্ষেত্রে বিবাহিত কন্যার মুখদর্শন কীভাবে ঘটে? তাই সমাজের বিধানদাতা জৈষ্ঠ্য মাসের শুক্লা ষষ্ঠীকে বেছে নিলেন জামাই ষষ্ঠী হিসাবে ৷ যেখানে মেয়ে জামাইকে নিমন্ত্রণ করে সমাদর করা হবে ও কন্যার মুখ দর্শন করা যাবে ৷ পুরুষতান্ত্রিক সমাজের এই নিয়ম একটু এদিক ওদিক করে এখনও চলছে একইভাবে...

মিষ্টির সঙ্গে জামাইদের বহুকালের সম্পর্ক। দ্বারকানাথ বিদ্যারত্ন তাঁর কবিতাকুসুমাঞ্জলি বইয়ের প্রথম খণ্ডে লিখেছেন বিয়েতে কে কী চায়? তাতে বলা হচ্ছে, কন্যা চায় বরের রূপ, মাতা চান জামাইয়ের ধন, পিতা চান পাত্রের জ্ঞান, বান্ধবরা দেখেন পাত্রের কুল আর জনগণ মিষ্টি পেয়েই খুশি, মিষ্টান্নমিতরে জনাঃ। 

সূর্য মোদকের জলভরা সন্দেশের গল্প সবাই জানেন। তবু একবার বলেই দি। তখন ১৮১৮ সাল। বাংলায় তখন ইংরেজ শাসন চালু হলেও আনাচেকানাচে দু-চারটে জমিদারি তখনও টিকে আছে বহাল তবিয়তে। আয় যেমনই হোক, আদবকায়দায়, ঠাটেবাটে একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা পুরোপুরি বর্তমান। এমনই এক জমিদার ছিলেন ভদ্রেশ্বরের তেলিনীপাড়ার বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার। বাড়ির মেয়ের বিয়ে দেওয়ার পরে মেয়ে এসেছে বাপের বাড়ি জামাই নিয়ে জামাইষষ্ঠী উপলক্ষ্যে। তখন আবার জামাইঠকানো বা বউঠকানো বহু প্রথা চালু ছিল। এখন সেগুলো বোকা বোকা মনে হলেও তখন এইসব প্রথা রমরম করে চলত। সে যাই হোক, জামাইকে ঠকাতে হবে। কী করা যায়? ঠকানোও হল আবার জামাই বাবাজীবন রাগও করতে পারলেন না, এমন কিছু ব্যবস্থা করতে হবে। 
অনেক ভেবে তেলিনীপাড়ার জমিদারবাড়িতে তলব হল এলাকার নামকরা ময়রা সূর্যকুমার মোদকের। তাঁকে নির্দেশ দেওয়া হল এমন একটা মিষ্টি বানাতে হবে যা দিয়ে জামাই ঠকানো যাবে অথচ তাঁর মানসম্মান যেন কোনওভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়। বহু ভাবনাচিন্তা করার পর মোদক মহাশয় একটা বিশাল আকারের মিষ্টি বানালেন, যার ভেতরে জল ভরা থাকে, অথচ বাইরে থেকে দেখে বোঝার কোনও উপায়ই নেই। সেই মিষ্টি দেওয়া হল জামাইয়ের পাতে। মিষ্টিতে মাতোয়ারা জামাই সেই মিষ্টি হাতে নিয়ে দিলেন বিশাল এক কামড়। আর যেই না কামড়ানো, মিষ্টির ভেতরের লুকোনো জল বেরিয়ে এসে ভিজিয়ে দিল জামাইয়ের সাধের গরদের পাঞ্জাবি। জামাই অপ্রস্তুত। হো হো করে হেসে উঠলেন শালা-শালিদের দল। ঘোমটার আড়ালে হাসিতে ভরে উঠল শাশুড়িদের মুখ আর জমিদারবাবু গোঁফে দিলেন তা। জন্ম হল জলভরার। 

ধর্মচর্চার পীঠস্থান হওয়ার জন্য গুপ্তিপাড়াকে 'গুপ্ত বৃন্দাবন' বলা হত। ক্রমে 'গুপ্ত বৃন্দাবন পল্লী', তার থেকে 'গুপ্ত পল্লী' এবং পরিশেষে গুপ্তিপাড়া নাম হয়। কথিত আছে যে গুপ্তিপাড়াতেই সন্দেশের জন্ম। এখানেই প্রথম তৈরি হয় সন্দেশের মিশ্রণ, যা মাখা সন্দেশ নামে পরিচিত। পরে সেই মাখা সন্দেশকেই আকার দিয়ে তৈরি হয় গুপো সন্দেশ। এই সন্দেশ জনপ্রিয় হলে তা 'গুপ্তিপাড়ার সন্দেশ' বা সংক্ষেপে 'গুপো সন্দেশ' বলে পরিচিতি লাভ করে। অপর মতে অবশ্য সন্দেশটি খাওয়ার সময় গোঁফে লেগে যায় বলে তার নাম হয়েছে গুঁফো সন্দেশ। 

এখানে এর একটা অন্য গল্প বলি বরং... 

মেয়েরা দুঃখ করে বলেন "বউমা কখনই মেয়ে হয় না"। 
শাশুড়ী মুখে যাই বলুন, নিজের মেয়ে আর পরের মেয়ের তফাত নাকি ঠারেঠোরে, কথার চিমটিতে ঠিক বুঝিয়ে দেন। শ্বশুর অবশ্য একটু সেফসাইডে "উনি আবার বলবেন কি? মেনিমুখো মানুষ। বউয়ের আঁচলের তলায় শুয়ে থাকে। ছেলেটাকেও বানিয়েছে তেমনি। এক আঙ্গুলে উঠায় আর বসায়। নেহাত আমি আসার পর থেকে..." 
যাক গে যাক! এসব অভিযোগ সত্যি কি মিথ্যে, সে তর্কে যাব না। কিন্তু বেচারা জামাইদের অবস্থা আরো খারাপ। সিরিয়াসলি। 

বউদেরবেলায় ভিতরে ভিতরে চোরা স্রোত যাই থাক না কেন, বাইরে একটা আবরণ থাকে। জামাইদের বেলা সেটুকুও নেই। খুল্লম খুল্লা যাতা বলা হচ্ছে সেই কবে থেকে। খেয়াল করতে গিয়ে ব্যোমকে গেলাম মাইরি!! বাংলায় জামাইদের নিয়ে যে কটা প্রবাদ প্রবচন আছে খেয়াল করে দেখুন, একটাও সুখকর না। সুখকর কি বলি, রীতিমত অপমানজনক। একটা একটা করে বলা যাক-
শুরুতেই "যম, জামাই ভাগ্না/ তিন না হয় আপনা"। জাস্ট ভাবুন, জামাইয়ের সঙ্গে যমের তুলনা। যমদুয়ারে তাও কাঁটা বিছানোর মন্ত্র আছে, কিন্তু জামাই ঠেকাই কি দিয়ে? কেউ কেউ যমকে আবার জন দিয়ে রিপ্লেস-ও করেন। একই ফ্লেভারের এর একটা আছে 'মামা ভাগনে জামাই শালা, আর পোষ্য পুত / ঘরে ঘরে বিরাজ করে, এই পাঁচটি ভূত'।   
পরেরটা আরো খতরনাক "'জামাই হারামখোর, আর বেড়াল হারামখোর'। কি আর বলি। এসবে ব্যাখ্যা হয় না। 

আসি তিন নম্বরে। বাংলা না সংস্কৃত শ্লোক। তাতে বলা হচ্ছে "জামাত্রর্থং স্রপিতস্য সূপাদেরতিথ্যুপকারকত্বম" সোজা বাংলায় 'জামাইয়ের জন্য মারে হাঁস, গুষ্টিশুদ্ধ খায় মাস'। মানে এক জামাইষষ্ঠীর যা খরচ, তাতে গোটা পরিবারের একমাস চলে যায়। এতেই শেষ নয়। আরো একটা বলি "'সদা বক্রঃ সদা ক্রূরঃ সদা মানধনাপহঃ। কন্যারাশিস্থিতো নিত্যং জামাতা দশমো গ্রহঃ'। মানে কুটিল, বক্র, ধন মান সব হরণকারী জামাতা নবগ্রহের পর দশম গ্রহ। এবং সেই গ্রহ অবশ্যই কুগ্রহ। এই কুগ্রহকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি খুব একটা বদার-ও করেন না। না হলে "খেয়ে বাঁচলে কামাই/ মেয়ে বাঁচলে জামাই" প্রবাদটাই বা আসবে কেন? এমনকি কখনও কখনও দেখি জামাইয়ের উপরে উপকারের এক্সপেক্টেশনটুকুও নেই "গতর কুশলে থাক, করে খাব কামাই / বিস্তর করলে পেটের পুত, কি করবে জামাই"। সোজা কথা জামাই আর তার খাই মেটানো প্রায় অসম্ভব। জামাই তো খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কোনো জিনিসেই মন ভরেনা তাঁর। তাই বলা হয় "পাঁচ ব্যন্নন দুধ রুটি / তবু জামাইয়ের ভিরকুটি"।

Uploaded Image


শুধু জামাইদের সেলফ এস্টিম কত কম, তা ভেবে দেখুন। এত কথার পরেও যেই না জামাইষষ্ঠী এল, জামাই চললেন হাতে আম কাঁঠালের ব্যাগ নিয়ে। 'খাওয়া দাওয়ার গন্ধে / জামাই আসে আনন্দে'। তখন তার যত্ন আত্তি না করে উপায় কী! 'জামাই এলো কামাই ক'রে, বসতে দাও গো পিঁড়ে / জলপান করতে দাও গো সরু ধানের চিঁড়ে'। আর এতেই শেষ না, 'রুইয়ের মুড়ো, কেটো মুড়ো, দাও আমার পাতে / আড়ের মুড়ো, ঘিয়ের মুড়ো, দাও জামাইয়ের পাতে'। এই উপলক্ষে 'জামাই গেলে শ্বশুরবাড়ি, তিনদিন আদর বাড়াবাড়ি'। 

এতো গেল নর্মাল জামাই। ঘরজামাইদের নিয়ে যা যা লেখা আছে, তা যত কম বলা যায় ততই ভাল। ব্যাখ্যা ছাড়া। একটাই বলি। এতেই গোটা অ্যাটিটিউডটা বোঝা যাবে

দূর জামাইয়ের কাঁধে ছাতি / ঘর জামাইয়ের মুখে লাথি'

শেষ করি জামাইদের প্রকারভেদ দিয়ে। আজ রাস্তাঘাটে বেরুলে মূলতঃ চার রকম জামাই দেখতে পাবেন।

১। সদ্য বিবাহিত জামাই- এদের প্রথম কি দ্বিতীয় জামাইষষ্ঠী। বউমা সুন্দর পাটভাঙা শাড়িতে চকচকে। বরের টকটকে লাল পাঞ্জাবিতে সাদা কলকা। বউ ঘামলেই বর মুছিয়ে দিচ্ছেন। হাতের ব্যাগে আম, মিষ্টি আর লিচুর ডালপালা উঁকি দিচ্ছে। দুজনেই ফিসফাস করছেন আর হেসে উঠছেন। বর আপ্রাণ চেষ্টায় আছেন অন্যজনের কষ্ট না হয়। বেশ মাখোমাখো ব্যাপার। 

২। সদ্য সন্তানপ্রাপ্ত জামাই- গরমে বাচ্চা তেড়ে চিল্লাচ্ছে। বউ মেজাজ গরম করছে"একটু ধরতেও ও পারো" ধরলে বাচ্চা আরও রেগে লাল হয়ে যাচ্ছে। মুশকিল হল পাশেই দুই একজন মহিলা টিপ্পনি কাটছেন "আমার মনা তো বাসে উঠলেই ঘুমিয়ে পড়ত। কোনদিন জ্বালায় নি। ও ঘুমাচ্ছে না কেন?" বাবার পাঞ্জাবি আর মায়ের শাড়ি দুমড়ে গেছে। বাচ্চা এখনো কেঁদে যাচ্ছে।

৩। একটু বড় বাচ্চাযুক্ত জামাই- পুরোনো শার্ট আর প্যান্ট পড়া। মুখ ভয়ানক গম্ভীর। হাতে ছোট একটা থলে। সঙ্গে বউ আর ক্লাস ওয়ান আর ক্লাস ফোরে পড়া দুই ছেলে মেয়ে। বাবা বাসে উঠে কোণ দেখে বসে মোবাইলে রবীশ কুমার দেখতে লাগলেন। বাচ্চাদুটো কে জানলার ধারে বসবে নিয়ে ঝগড়া করতে লাগল। মা ছোটটাকে কোলে নিয়ে বড়টাকে জানলায় বসিয়ে ঝগড়া মেটালেন

৪। প্রাচীন জামাই- আমার মত জামাই। যারা আজকের দিনেও অফিস করছি আর তাদের বড় বড় ছেলেমেয়েরা স্কুলে গিয়ে ক্লাস করছে।
এর বাইরেও অনেক রকম আছেন। 

আজ জামাইষষ্ঠীর পুণ্য প্রভাতে সব জামাইকে অভিনন্দন। সমস্ত সমবেদনা নিয়েই বলছি, যুগে যুগে এইসব বাঁকা কথা অগ্রাহ্য করে যেভাবে আপনারা পদের পর পদ সাঁটিয়েছেন, সেই ধারা অক্ষুন্ন থাক। 
সবচেয়ে বড় কথা সেই কবে কিশোরকুমার বলে গেছেন-"কুছ তো লোগ কহেঙ্গে/ লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা"

(সঙ্গের ছবিটি শিল্পী দেবাশীষ দেবের অরিজিনাল পেন এন্ড ইংক আর্টওয়ার্ক থেকে। কাল্ট হয়ে যাওয়া এই ছবির আসলটা এখন আমার ব্যক্তিগত সংগ্রহে আছে)...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন