রবিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

Syzygy (ফেলুদা ফ্যান ফিকশন) ~ মালবিকা রায়

Syzygy ফেলুদা ফ্যান ফিকশন
পর্ব ১ঃ প্রথম দেখা
—————————————————
কেদারে সিংঘনিয়ার সঙ্গে দেখা করে ধর্মশালায় ফেরার পথে ফেলুদাকে কোন অজ্ঞাত আততায়ী কাঁধে বাড়ি মেরে পালাল।ওকে আমি আর লালমেহনবাবু মিলে ধরে তুলতেই দেখলাম কাঁধে বেশ জখম। একজন ডাক্তার লাগবে শীগ্গীর। ধর্মশালায় ফিরতে মাখনবাবু বললেন পাঁচ মিনিটের হাঁটা পথে ডঃ ব্যানার্জির বাড়ি। শুনেই আমরা ফেলুদাকে নিয়ে রওনা দিলাম। ও অবশ্য গাঁইগুঁই করছিল কিন্তু জটায়ু যখন বললেন "যাবেন, নাকি কাঁধের ব্যথায় ভুগে কালকের ক্লাইম্যাক্সটা মিস করবেন ফেলুবাবু?" তখন রাজী হল।
ছোট্ট পাহাড়ী জায়গায় রাত নটা মানে অনেক। দুটো গলি পেরিয়ে নির্দেশমত একটা দোতলা বাড়ির একতলার দরজায় নক করতেই কিছুক্ষণ পর বেরিয়ে এলেন বছর ছাব্বিশের এক ভদ্রমহিলা, মনে হল ঘুমোতে যাচ্ছিলেন, পাজামার ওপর চাদর জড়ানো।
"কিছু মনে করবেন না, বাধ্য হয়ে এত রাতে বিরক্ত করতে এলাম। আপনার বাবাকে একটু ডেকে দেবেন?"
"আমার বাবা! তিনি তো কলকাতায়!"
ভদ্রমহিলা অবাক।
"তবে কি আপনার স্বামী? মানে ডাঃ ব্যানার্জিকে খুঁজছি…আসলে এই ভদ্রলোকের একটু চোট লেগেছে… দেখাতে হবে।" লালমোহনবাবু বলেন।
" আসুন ভেতরে।" ভদ্রমহিলা দরজা ছেড়ে দাঁড়ান।
ভেতরে গিয়ে দেখি বেশ বড় একটা ঘর। বেশ গোছানো। জানলার পাশে একটা ডেস্ক আর চেয়ার। তারপাশে একটা বড় বুকশেল্ফ। দূরের দেওয়ালে একটা খাট।আর কোন লোক দেখা গেল না। ভেতরের দিকের একটা দরজা দিয়ে ডাইনিং টেবলের অংশ বিশেষ আর চেয়ার দেখা যাচ্ছে।
"বসুন আপনি এই চেয়ারে..কোটটা খুলে রাখুন ঐ হ্যাঙ্গারে।"ফেলুদাকে বলেন উনি।
"আর আপনারা ঐ মোড়াদুটো টেনে নিন" আমি আসছি। বলে ভেতরের দরজা দিয়ে চলে গেলেন। বোধহয় ওঁর স্বামী ডাঃ ব্যানার্জিকে ডাকতে।
মিনিট খানেক পরে ফিরে এলেন একাই।চাদরটা খুলে এসেছেন। হাতদুটো সদ্য ধোওয়া।জামার হাতাদুটো কনুই অব্দি গোটানো।
"আপনি শার্টটা খুলুন। ইনজুরিটা দেখতে হবে.." ভদ্রমহিলা গম্ভীরভাবে নির্দেশ দেন ফেলুদাকে।
আমি ততক্ষণে আন্দাজ করেছি ব্যাপারটা..
"কিন্তু আপনার স্বামী মানে ডাঃ ব্যানার্জি…" জটায়ু এখনো বোঝেননি মনে হচ্ছে।
"স্বামী টামী নেই। আমিই ডাঃ মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি। চলবে তো তাতে?"
জটায়ু বেকুবের মত ঘাড় নাড়েন।
ভদ্রমহিলা এত গম্ভীর কেন!
আমি ফেলুদাকে সাহায্য করতে গেলাম…ও ডান হাত প্রায় ব্যবহার করতে পারছে না। মুখের চেহারাও দেখার মত। উঠে আসতেও পারছে না কিন্তু থাকার যে বিশেষ ইচ্ছে আছে তাও মনে হচ্ছে না।
শার্ট খোলা হয়ে গেছে। ডাঃ ব্যানার্জি দেখে নিলেন একবার আঘাতটা। মুখটা আর গম্ভীর করা সম্ভব নয় ওঁর। তাও একটা চেষ্টা হল মনে হল। কানে স্টেথোটা গুঁজে বললেন
"গেঞ্জিটা খুলুন এবার।"
কাঁধের যে জায়গায় চোট তার মধ্যিখান দিয়ে স্যান্ডো গেঞ্জির হাতাটা গেছে। না খুললে যে চিকিৎসা সম্ভব নয় সেটা বুঝতে ডাক্তার হতে হয় না।
ফেলুদার ভ্রূকুটিও ম্যাক্সিমাম হয়ে গেছে। কিন্তু ওর ক্ষুরধার বুদ্ধিতে ওখান থেকে উঠে আসার কোন উপায় বের করার আগেই আমি আর লালমোহনবাবু মিলে ওর গেঞ্জিটা মাথার ওপর দিয়ে সাবধানে তুলে নিলাম।
ভদ্রমহিলা মনে হল ডাক্তার হিসেবে ভালই। চোটের জায়গাটা আর পিঠে, কাঁধে তার আশপাশটা ভাল করে মনোযোগ দিয়ে দেখলেন। ফেলুদা পুরো সময়টা দেওয়ালে একটা গ্ল্যাক্সোর ক্যালেন্ডার আর তার ওপর বসা টিকটিকির দিকে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে রইল।
"দেখুন, ফ্র্যাকচার কিনা বুঝতে তো এক্স রে করতে হবে। সে তো এখন হবে না। ইন দ্যাট কেস, দ্য বেস্ট আই ক্যান ডু ইজ…আপনি আসুন মিঃ..
"মিত্র। প্রদোষ মিত্র। কোথায় যাব"?
"ঐ খাটে গিয়ে শুয়ে পডুন। অন ইওর টামি। আমি দেখব শোল্ডার ব্লেডে কোনো অবভিয়াস ফ্র্যাকচার আছে কিনা…"
"কিন্তু ওটা তো পেশেন্ট বেড নয়…" ফেলুদার গলায় ভীষণ অনিচ্ছা।
"না নয়। দ্যাটস মাই ওন বেড। আ্যন্ড এই যে চেয়ারটায় আপনি বসে আছেন সেটাও পেশেন্টদের নয়। আমার পড়ার চেয়ার। এই ঘরটাও ডিসপেন্সারী নয়, আমি এখানে থাকি। এমার্জেন্সী সিচুয়েশনে বোধহয় আগে কখনো পড়েননি না? খুব সিকিওরড, প্ল্যানড জীবনে অভ্যস্ত নাকি? কি করেন আপনি, সরকারী চাকরী?"
বাপরে। ডাঃ ব্যানার্জি তো ভালই বকুনি দিতে পারেন!
ফেলুদা আর কোনো কথা না বলে উঠে দাঁড়াল। জিনসের ওপর ব্যায়ামপুষ্ট খোলা গা আর উস্কোখুস্কো চুলে বেশ একটা র্যাম্বো সুলভ ভাব এসেছে। কাঁধের কাটাটা একটা এক্সট্রা রাফনেস যোগ করেছে।
গটগট করে গিয়ে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ল খাটটায়। ডাঃ ব্যানার্জি কাঁধ, পিঠ টিপেটুপে, স্টেথো লাগিয়ে, হাত কতটা উঠছে এসব দেখে মনে হল সন্তুষ্ট হয়েছেন।
"আমি শিওর ভাঙেনি। তবে চাইলে পরে এক্স রে করে নিতে পারেন। আমি প্রেসক্রিপশন লিখে দিচ্ছি আ্যন্টি ইনফ্লামেশন আর পেইনকিলারের । আজকের রাতের মত আমার থেকে নিয়ে নিন। কাল কিনে নেবেন।"
চেয়ারে বসে লিখতে লিখতে বলেন ডাঃ ব্যানার্জি।
ফেলুদা খাটেই বসে। কারণ ঘরে আর কোনো বসার জায়গা নেই।
"আপনি এখানে এসে বসুন মিঃ মিত্র। উঠে দাঁড়িয়ে বলেন উনি। একটা ব্যান্ডেজ করে দিই আর একটা মেকশিফট স্লিং.."
"না, ব্যান্ডেজ করুন। তবে নো স্লিং"।
"কেন বলুন তো?"
"কারণ স্লিং সমেত রিভলভার চালানো সম্ভব নয়, যেটা আমার কয়েকঘন্টা পরেই হয়তো লাগবে।"
এবার ডাঃ ব্যানার্জি সত্যি গম্ভীর।
"বিকজ অফ দ্যাট হিপোক্র্যাটিক ওথ আমি সব ধরণের লোকের চিকিৎসা করতে বাধ্য। কিন্তু ইউ আর পুশিং ইট ট্যু ফার। স্মাগলিং বা গ্যাং ওয়ার যাই আপনার প্রফেশন হোক না কেন, আ্যজ এ ডক্টর আই উড রেকমেন্ড…"
"এই যে বললেন আমি সিকিওর সরকারী চাকরী করি.." র্যাম্বো এবার চান্স পেয়েছে।
"আমি কি করে জানব বলুন! রিভলবার টিভলবার.."
"আপনার শেলফে তো ভর্তি ক্রাইম থ্রিলার। গুন্ডা বদমাইশ ছাড়া সেগুলোতে কারো রিভলভার থাকে না?"
"পুলিশ নাকি আপনি? তাহলে কিন্তু রিভলভার আর সরকারী চাকরী দুটোই হল",
ব্যান্ডেজের জোগাড় করতে করতে এতক্ষণে ফিক করে হাসলেন উনি। বেশ দেখায় কিন্তু হাসলে। কেন যে গম্ভীর থাকেন এত জানিনা।
"আপনি কেমন পুলিশ? লেস্ট্রেডের মত না বচ্চনের ইনস্পেক্টর বিজয়ের মত?" ব্যান্ডেজটা বাঁধতে বাঁধতে বলেন ডাঃ ব্যানার্জি।
"আরে ম্যাডাম, লেস্ট্রেড অব্দি গেলেন আর আসল লোককে ভুলে গেলেন?" জটায়ু এখন কথা খুঁজে পেয়েছেন।

"দোহাই আপনার, ম্যাডাম বলবেন না। নাম ধরে ডাকুন, ডাক্তারবাবু বলুন, বহেনজী বলুন…যা খুশী। কেবল ঐ ট্যাঁশ ফিরিঙ্গি সম্বোধনটা করবেন না।"
ফেলুদার ঠোঁটে এক চিলতে হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল।ও ও পারতপক্ষে স্যর শুনতে চায় না।
"তা আসল লোক মানে…শার্লক হোমস? ডিটেক্টিভ?" ব্যান্ডেজ শেষ করতে করতে বলেন ডঃ ব্যানার্জি।
"আমার ধারণা ছিল ওটা শুধু গল্পে হয়…আপনি শার্টটা পরে ফেলতে পারেন মিঃ মিত্র।"
"গল্পেই বেশী হয়। যেমন এঁর গল্প। তবে আমি বাস্তবের.." চেয়ার ছেড়ে উঠে বলে ফেলুদা।
"উনি কি গোয়েন্দা গল্প লেখেন?"
"হ্যাঁ। ওঁর বই দেখলাম তো আপনার শেলফে। সাহারায় শিহরণ!" শার্টটা পরতে পরতে বলে ফেলুদা।
"মাই গড! আপনি লালমোহন গাঙ্গুলী? দারুণ টানটান লেখেন আপনি, ধরলে ছাড়া যায় না…"
লালমোহনবাবুর মুখে একগাল হাসি।
"তবে…কয়েকটা ফ্যাকচুয়াল এরর আছে। যেমন ধরুন উটের পাকস্থলীতে জল জমিয়ে রাখার ব্যাপারটা। ওটা ঠিক নয়। হয় কি জানেন, ওদের ঐ কুঁজের ফ্যাটটা অক্সিডাইজ হয়ে.."
লালমোহনবাবু চুপসে গেছেন, কিন্তু ওঁর হাসি ফেলুদার ঠোঁটের একপাশে সংক্রামিত হয়েছে।
—————————————————-
পর্ব ২ঃ শব্দ-জব্দ
—————————————————
পরদিন ভোরের মধ্যেই কেদারের ক্লাইম্যাক্স ভালয় ভালয় মিটে গেছে। দেবীশংকর পুরী ওরফে মিঃ ভার্গব ধরা পড়েছেন। লালমোহনবাবু ছোটকাকাকে খুঁজে পেয়েছেন। সেই সঙ্গে বহুমূল্য বালগোপাল লাভ হয়েছে। কিন্তু এত ভাল ভাল ঘটনার মধ্যে একটা বাজে ব্যাপার হল যে ফেলুদার কাঁধের চোট থেকে আবার রক্ত পড়ছে। ওরই দোষ। কয়েকঘন্টার মধ্যে একটুও বিশ্রাম না নিয়ে এইরকম ছোটাছুটি করলে আর কি হবে!
"তাহলে চল আবার ডাঃ ব্যানার্জির ওখানে, এটার একটা ব্যবস্থা করতে হবে তো।" আমি বললাম।
"আর কোনো ডাক্তার পাওয়া যায় না?"
ফেলুদা বলে ওঠে।
"এই ছোট পাহাড়ী জায়গায় আবার কটা ডাক্তার পাব ফেলুবাবু? উনি দেখছিলেন এটা। ডাক্তার তো উনি খারাপ বলে মনে হল না…"
"খারাপ ডাক্তার তা আমি বলি নি। তবে…"
ও কি নিজেও জানে প্রবলেমটা কি!
"তবে ওটা ওঁর থাকার বাড়ি, ডাক্তারখানা নয়। সেখানে এরকম বারবার গিয়ে হানা দিলে…"
এতক্ষণে একটা অজুহাত পেয়েছে।
"আরে কতক্ষণ আর লাগবে, সেরকম হলে আমরা বাইরে দাঁড়াই, আপনি দেখিয়ে আসুন.."জটায়ু বলেন।
"না না, তার দরকার নেই। আপনারা আসুন সঙ্গে".. চটপট বলে দেয় ফেলুদা।
"কি হল, কিছু প্রবলেম?" আমাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন ডাঃ ব্যানার্জি।
"হ্যাঁ, মানে ব্যান্ডেজটা থেকে ব্লীডিং হচ্ছে.."
"সেকি? কথা নয় তো। আসুন ভেতরে।"
আজ এই সকালবেলা বিছানা টিছানা সব পরিপাটি করে তোলা। টেবলে একটা স্ক্র্যাবলের বোর্ড পাতা…অর্ধেক খেলা হয়েছে।
ফেলুদা বসল চেয়ারে।
"আসলে আপনার দোষ না, আমিই একটু বেশী স্ট্রেন করে ফেলেছি" শার্ট খুলতে খুলতে বলে ও।
"সে তো দেখতেই পাচ্ছি…সাতসকালে মারামারি করতে গেছিলেন? ডাক্তারের কথা টথা শোনার দরকার নেই…ওঃ স্যরি, মাই হ্যান্ডস আর কোল্ড।"
শেষ কথাটার কারণ হল ওঁর হাত ফেলুদার গায়ে পড়তেই ও শিউড়ে উঠেছে।
"আসলে এইমাত্র চান করে এলাম তো!"
"দ্যাটস ওকে!" গম্ভীর গলায় বলল ফেলুদা।
আবার সেই ক্ষতস্থান পরীক্ষা, ড্রেসিং, ব্যান্ডেজ..! তবে আজ আর টিকটিকি না দেখে ফেলুদা স্ক্র্যাবলের বোর্ডের দিকে তাকিয়ে রইল।
একবার নিজের মুখটা যখন ফেলুদার প্রায় কানের কাছে এনে উনি ক্ষতটা পরীক্ষা করছিলেন, মনে হল ওর মুখের রংটা একটু বদলে গেল…তবে সেটা আমার চোখের ভুলও হতে পারে।
"ওকে। ইটস ডান নাও। জল না লাগানোর চেষ্টা করবেন দুদিন।আপনার স্ত্রীকে বলবেন যেন স্পঞ্জ বাথ দিয়ে দেন"।
"স্ত্রী-টী নেই ।তবে আমি জল লাগাব না। থ্যাঙ্ক ইউ।" শার্ট পরতে পরতে বলে ফেলুদা।
"বেশ পোক্ত করেই ড্রেসিং করে দিয়েছি। তবে ফরওয়ার্ড শর্ট লেগে ক্যাচ ধরতে যাবেন না ক'দিন, তাহলেই হল।" বলে দেন ডাঃ ব্যানার্জি ।
"আর সিলি মিড অফে?" ফেলুদার ঠোঁটে মৃদু হাসি। ও কলেজে ক্রিকেট খেলত, তাই মেটাফোরগুলো বেশ উপভোগ করছে বুঝতে পারলাম।
"ডোন্ট বী সিলি! আই ক্যান ওনলি আ্যলাউ ফিল্ডিং আ্যট দ্য মিড উইকেট!"
ভদ্রমহিলা বেশ উইটি।
"কিছু যদি মনে না করেন , আপনি কি একা একা স্ক্র্যাবল খেলছিলেন?" ফেলুদার গলাটা এখন রিল্যাক্সড।
"হ্যাঁ । এখানে আর দোকা কোথায় পাব বলুন! তাই একাই খেলি।"
"আরে আমাদের ফেলুবাবুও তো তাই, কেউ না থাকলে একা একা স্ক্র্যাবল বা দাবা…" লালমোহনবাবু বলে ওঠেন।
"ফেলুবাবু!"
"আরে ওঁর ডাক নাম তো ঐ। ভাল নাম.."
"মিত্র! ফেলু মিত্তির! ইয়েস আই হ্যাভ হার্ড আ্যবাউট ইউ। সেই বোম্বাই এর ঘটনাটা কাগজে বেরিয়েছিল তো!
গুড ওয়ার্ক। তারপর আপনার গার্লফ্রেন্ড ফিল্ম আ্যকট্রেস রূপার ইন্টারভিউ।"
"আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। ওটা নেহাতই ফিল্মি গসিপ। দুদিন বেরিয়েছিল এখন খবরের অভাবে চাপা পড়েছে বহুদিন। আপনি এই পান্ডববর্জিত জায়গায় না থাকলে জানতে পারতেন। আমাদের জীবন ভীষণরকম নারীবিবর্জিত।"
"ইউ সীম ট্যু বী প্রাউড অফ দ্যাট! হোয়াটস রং উইথ আস?"
"আমি বলিনি আমি প্রাউড। আই মেয়ারলি স্টেটেড দ্য ফ্যাক্ট।দেয়ার ইজ নাথিং রং উইথ এনি জেন্ডার। আপনি যেভাবে আমাকে চিকিৎসা করেছেন তারপরে তো ওকথা মুখে আনাও পাপ।"
"খালি একটা প্রশ্ন, এই যে এই ওয়ার্ডটা…syzyg-ওটা কি…?" ফেলুদা স্ক্র্যাবল বোর্ড দেখিয়ে জিজ্ঞেস করে।
"ঐ ব্ল্যাঙ্কটা y. শব্দটা Syzygy"
"আ্যকচুয়েল ডিকশনারীতে আছে নাকি..?"
"তার মানে? নিজেই নিজেকে চীট করে খেলছি নাকি? সর্বভূতে ক্রিমিনাল দেখেন কি আপনি?"
"আহা, ভুল হতে পারে তো!"
"স্ক্র্যাবলে ভুল হয় না আমার মিঃ মিত্তির। মেডিক্যালে আমি অবিসংবাদী চ্যাম্পিয়ান ছিলাম।"
"ডাক্তারদের কলেজ তো! তারা আর শব্দের মাস্টার কবে থেকে? ওষুধের নাম হলে নয় হত…"
"আর আপনার আ্যলমা ম্যাটারটা.."?
"ঐ আপনার পাশেই!"
"ঠিক জানি! প্রেসি ছাড়া এরকম বিশ্ব স্নব আর কে হবে! এক হাত খেলে দেখুন না ডাক্তাররা ওয়ার্ড গেম পারে কিনা।"
"আমার ক্রিমিনাল ধরা পড়ে গেছে। এখানে ছুটি কাটাতেই এসেছিলাম। এক হাত খেলতেই পারি। কিন্তু আপনার কি কাজ নেই? আজ তো সোমবার।"
"আমি শনি রবি কাজ করি কেদারে।এনজিওর হয়ে।সোম মঙ্গল আমার ছুটি। আজ বিকেলে চলে যাব রুদ্রপ্রয়াগ। সপ্তাহের বাকী ক'দিন ওখানে থেকে কাজ করি।
"ঠিক আছে। আমরাও বিকেলে নেমে যাব রুদ্রপ্রয়াগে।ওখানে আর দুটো দিন কাটিয়ে কলকাতায়। সুতরাং আমরা একসঙ্গেও যেতে পারি।তবে আপনাকে বলা আমার কর্তব্য যে আমি কিন্তু কখনো স্ক্র্যাবলে হারিনি। কলেজে না, বাড়িতে না, বন্ধুদের সঙ্গে না। কাজেই.. "
"চ্যালেঞ্জ আ্যকসেপ্টেড মিঃ মিত্র। ওদিকে চলুন, এখানে তো জায়গা নেই। ডাইনিং টেবলে বসতে হবে।
কিন্তু লালমোহনবাবু আর…তোমার নাম কি ভাই?"
"তপেশ। তপেশ রঞ্জন মিত্র।"
"তা ওরা কি করবেন?"
"যদি কিছু মনে না করেন তো আমি একটু ঐ চৌমাথার দিকে যাব। দারুণ আলুর পরটা করছিল কাল দেখেছি।" জটায়ু বললেন।
"আর আমি আশপাশটা ঘুরে দেখে ছবি তুলব আমার নতুন ক্যামেরায়। চলুন লালমোহনবাবু।"
আলু পরটা খেয়ে, ছবি তুলে, বাজারে ঘুরে, আমি একটা হিমাচলী টুপি কিনলাম আর লালমোহনবাবু একটা পাথরের শিব কিনলেন।
"এটাও তো আপনার আর একটা ব্লান্ট ইনস্ট্রুমেন্ট হয়ে গেল লালমোহনবাবু।" পাথরের তৈরী ওজনদার জিনিসটা দেখে আমি না বলে পারলাম না।
"এটা একটা ওয়ার্ক অফ আর্ট তপেশ, আর রিলিজিয়াস ইমপর্টেন্সটাতো জানই।"
আমার অবিশ্যি ওটা দারুণ কিছু ওয়ার্ক অফ আর্ট মনে হচ্ছিল না, তবে আর ঘাঁটালাম না। বললাম,
"এগারটা বেজে গেছে , চলুন লালমোহনবাবু, ফেলুদাকে নিয়ে আসি।"
"চল। কে জিতবে বলে মনে হয় তোমার তপেশ ভাই?"
"কি করে জানব বলুন। ফেলুদা ভাল, তবে…"
"তবে টবে কিছু নেই। ভারী জাঁহাবাজ মেয়ে ঐ ডাঃ ব্যানার্জি। না জিতলেই ভাল।"
"তা বলছেন কেন? চিকিৎসা করলেন ফেলুদার। আপনার বই পড়েন.."
"হ্যাঁ আর রাজ্যের ভুল ধরেন! ফেলুবাবুকে শুদ্ধ বকুনি! জিতবে না, দেখ তুমি!"
গিয়ে দেখলাম ফেলুদার সামনে একটা শেষ হওয়া প্লেট।
"ক্যারামেল পুডিং খাওয়ালেন ডাঃ ব্যানার্জি।" ফেলুদা সাফাই দেয়।
"তা কে জিতল?" জটায়ুর প্রশ্ন।
"আমি। একবার না দু দুবার।" ডাঃ ব্যানার্জির মুখে এখন ঝকঝকে হাসি। বলেছিলাম তো পাঙ্গা না নিতে।"
"কি না নিতে?"জটায়ুর জিজ্ঞাসা।
"পাঙ্গা, পাঙ্গা! হিন্দি কি কিছুই বোঝেন না নাকি আপনি?"
"এই নিন। ক্যারামেল পুডিং। আপনাদের জন্য।আপনারা তো হেরোর দলে। তাই অন্ততঃ এটুকু করা আমার কর্তব্য।"
জটায়ু গম্ভীর মুখে প্লেটটা টেনে নিলেন।কিন্তু মুখে প্রথম চামচটা দিয়েই ওঁর মুখের চেহারা বদলে গেল। অসম্ভব ভাল খেতে।
"বাই দ্য ওয়ে, এটাতে কিন্তু আপনার সই চাই।"সাহারায় শিহরণ বাড়িয়ে দিলেন ভদ্রমহিলা।জটায়ুর মুখে এবার অনাবিল হাসি।


———-—————————————-
পর্ব ৩ঃ ভানু গোয়েন্দা জহর আ্যসিসট্যান্ট
—————————————————

রুদ্রপ্রয়াগে আমরা নদীর ধারে দাঁড়িয়ে বাদামভাজা খাচ্ছিলাম। ডাঃ ব্যানার্জিও আমাদের সঙ্গে আছেন। আমার সঙ্গে এখন দারুণ ভাব হয়ে গেছে…মণিদি আর তুমিতে নেমে এসেছি। কারণ ওঁর কাছে ‘ডার্কসাইড অফ দ্য মুন’ ক্যাসেটটা দেখেই আমি ধার চাইলাম আমার ওয়াকম্যানের জন্য। দেখা গেল উনিও পিঙ্ক ফ্লয়েডের ভক্ত। লেখাপড়া নিয়েও অনেক কথা হল।

“কোন সাব্জেক্ট ফেভারিট তোমার, তপেশ?”
“ফিজিক্স। ম্যাথও ভাল”।
“তাহলে কেমিস্ট্রি আর বায়োলজি খারাপ লাগে, তাই  তো?” হেসে জিজ্ঞেস করে মণিদি।
“হ্যাঁ। ঐ মানে…তুমি জানলে কি করে ?”
“এরকমই হয়।ইলেভেনে পড়ে আমার মামাতো বোন পুকাই, তারও তাই… হাসলে যে?”
“না, আসলে ঐ…পুকাই নামটা…”
“আর তোমার দাদা যে তোমাকে তোপসে বলেন সে বেলা? পুকাই-এরও ভাল নাম আছে, রূপমঞ্জরী ।”

“বাবা! আপনাদের বাড়ির মেয়েদের নামের তো খুব ঘটা! আপনারা কি জুতোর নাম দেন অবিমৃষ্যকারিতা, ছাতার নাম প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আর বাড়ির নাম কিংকর্তব্যবিমূঢ”? জটায়ু বলে উঠলেন।
“আর আপনার কি মেসোর নাম তকাই, শ্বশুরের নাম বিস্কুট”? মণিদিরও সুকুমার রায় ঠোঁটস্থ।
“শ্বশুর তো নেই, ডাঃ ব্যানার্জি। আমি, ফেলুবাবু সবাই ব্যাচেলর। তপেশের বয়স কম, এখনো সময় আছে তাই ওকে ওদলে ফেললুম না।”
“তা আপনাদের দুজনের কি সময় গেছে নাকি?”
“আমার সময় কোনদিনই ছিল না। ফেলুবাবুর কথা উনিই জানেন। কি মশাই?”

ফেলুদা অবশ্য জটায়ুর প্রশ্নের কোন উত্তর দিল না। তার বদলে একটা চারমিনার ধরিয়ে বলল,

“আমার শরীরটা ঠিক জ্যুৎ নেই বলে হারলাম।” 
বেচারা! উপুর্যপরি দুবার স্ক্র্যাবলে হারের কথাটা ভুলতে পারছে না।

“জীবনে শুনিনি লোকে কাঁধে ব্যথা বলে স্ক্র্যাবলে হারে। তাও দু বার।” মণিদি সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিল।
“ওষুধগুলোর এফেক্ট আছে তো!”
“কি নেপ্রক্সেন আর প্যারাসিটামল? এতে আপনার ব্রেন ফাংশন গুলিয়ে গেল! মেডিসিনে নবদিগন্ত খুলে যাবে এই আবিষ্কারে।”
“ভোরে উঠে ছুটতেও হয়েছিল ক্রিমিনালের পেছনে। যদি কাল একবার চান্স পেতাম তো…”

ঠিক শুনছি কি! ফেলুদা আবার একবার ওঁর ওখানে যেতে চায়। তাও কোনো ডাক্তারী কারণে না, স্ক্র্যাবল খেলতে! আঁতে লেগেছে মনে হয়।

“বেশ বারবার তিনবার হয়ে যাক। আপনার বুদ্ধির তো খুব প্রশংসা চারিদিকে। তৃতীয়বার হারলে মুচলেকা লিখে দেবেন। আমি বাঁধিয়ে রাখব।”
“আগে তো হারি!”
“ওহো! কিন্তু কাল যে…মণিদির কিছু মনে পড়েছে।
“কি ভয় পেয়ে গেলেন? পরাজয় স্বীকার করে নিতে
পারেন। ওয়াক ওভার দিয়ে ।”
“হ্যাঁঃ। মণিকঙ্কণা ব্যানার্জি ভয় পায় এমন শর্মা এখনো জম্মায়নি, বুঝলেন মিত্তির মশাই! কাল দুপুরে আমি একবার পাহাড়ে চড়তে যাব ভাবছিলাম তাই…”
“ও, তাই ঘরের কোনে ঐ মাউন্টেনিয়ারিং বুটগুলো দেখছিলাম। আমারি তো লোভ হচ্ছে মশাই আপনার সঙ্গে ঝুলে পড়ার।”
“একেবারেই না। কাঁধের এই অবস্থায় পাহাড়ে চড়তে আমি আপনাকে আ্যলাউ করতে পারি না ডাক্তার হিসেবে। শেষে যদি আমার ওপর পড়েন তো আমিই ছবি হয়ে যাব।”
“হ্যাঁ হ্যাঁ একদম ঠিক। পাহাড়ে আর চড়তে হবে না। যথেষ্ট চড়েছি গত ক’দিনে।” জটায়ু বলে দেন।
“ক’টায় বেরোবেন কাল?” ফেলুদার প্রশ্ন
“এই দশটা নাগাদ। “
“যদি আমি আটটায় যাই তাহলে একদান খেলা যাবে তো?”
 
ওরে বাবা। এতো উৎসাহ! হেরে গিয়ে খুব মানে লেগেছে বোধহয়।

পরদিন দশটা নাগাদ ডাঃ ব্যানার্জির বাড়ি গিয়ে দেখলাম উনি হাসিমুখে বেরোচ্ছেন পাহাড়ে চড়ার জন্য রেডি হয়ে। মুখ দেখলেই বোঝা যায় উনি জিতেছেন।
যেটুকু সন্দেহ ছিল সেটুকুও উনি মাথার ওপর দুহাত তুলে নাচের ভঙ্গিমা করায় ঘুচে গেল।

“সে কি আবার হেরে গেলেন ফেলুবাবু?” 
জটায়ুও বুঝেছেন।
“হি হি! আমি তো আগেই বলেছিলাম! আজ তো আর ক্যারামেল পুডিং নেই, তবে দুঃখ করবেন না, এই নিন ম্যাঙ্গো ড্রপস লজেন্স।”
একগাল হেসে লজেন্স সমেত হাতটা বাড়িয়ে দেন ডাঃ ব্যানার্জি।

যাকে দেওয়া হল সে যে হেরে বিশেষ দুঃখিত তা মনে হল না অবিশ্যি। কিন্তু একটা লজেন্স মুখে দিয়েই ফেলুদার মুখটা অদ্ভুত হয়ে গেল।

“কি, পছন্দ নয় ফ্লেভারটা?” মণিদি জিজ্ঞেস করল।
“কি রকম একটা…ঠিক আপনার শ্যাম্পুর মত গন্ধ।”

ডাঃ ব্যানার্জি সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন। 
আমি আর লালমোহনবাবু চুপ।

“না মানে আপনার বিছা-আ-নায়…আই মীন বা-বালিশে ..মা-মানে সেদিন কেদারে চেকআপের সময়…আমার ঘ্রাণশক্তি আসলে বেশ …”
কোনোদিন ফেলুদাকে এত তোতলাতে দেখিনি তো!
“হ্যাঁ, আমি ক্লোরানে ম্যাঙ্গো শ্যাম্পু ব্যবহার করি। আপনার নাক তো দারুণ…আমার বাচ্চাটার মত প্রায়।” মণিদি আবার সহজ।

“আপনি যে বললেন আপনি ব্যাচেলর। তাহলে বাচ্চা?” লালমোহনবাবু বলে উঠলেন।

“কে বলেছে মশাই বিয়ে করতেই হবে বাচ্চা পেতে গেলে? একটা মেয়ে যদি চায় তাহলে সে মা হতেই পারে। দ্যাটস হার প্রেরোগেটিভ। থিংকিং আদারওয়াইজ ইজ রিগ্রেসিভ। আপনি নীনা গুপ্তা আর ভিভ রিচার্ডসের কথা শোনেননি?” এক নিঃশ্বাসে বলে যান উনি।

“আপনার তো মশাই ভিভ রিচার্ডসও নেই, বাচ্চাও নেই…শুধু শুধু কেন তর্কগুলো করছেন”?
ফেলুদা বলে উঠল।
“কি করে জানলেন নেই”?
“দেখলেই বোঝা যায় কার কতদূর দৌড়। ভিভ রিচার্ডস! বাচ্চা বলতে কি পালিত কুকুর নাকি বেড়াল? কুকুরই হবে। নাক ভাল যখন।”
“হ্যাঁ কুকুর। হল তো! কি মহান ডিটেক্টিভ! সরুন এখন আমার ট্রেকিং এর দেরী হয়ে যাবে।”
“ফিরছেন কখন?”
“এই চারটে নাগাদ..”
“তো আজ রাতে ডিনারটা আমাদের সাথে করলে অসুবিধে আছে?”
“না, অসুবিধা আবার কিসের! সন্ধেবেলা এসে হোটেল থেকে ডেকে নেব আপনাদের।” বলে রওনা দিল মণিদি।

ফেলুদা তো দেখছি ওঁর সঙ্গে সময় কাটানোর কোন সুযোগই ছাড়তে রাজী নয়!
               
“তা ফেলুবাবু, ডাঃ ব্যানার্জির সঙ্গে আপনার বেশ ভাব হয়ে গেছে দেখতে পাচ্ছি।”
 জটায়ু বলে উঠলেন মণিদি বিদায় নেবার পর। ওঁরও নিশ্চয় একই কথা মনে হয়েছে।
“ভাব বলতে যদি মীন করেন বন্ধুত্ব তবে নিশ্চয়ই হয়েছে। কিন্তু যদি অন্যকিছু দ্ব্যর্থবোধক ইঙ্গিত করেন তো ডেফিনিটলি না। শী ইজ গুড কম্পানি, দ্যাটস অল।”
                   ——————
সারাদিন আশপাশের জায়গাগুলো বেড়িয়ে এসে বিকেলে আমরা হোটেলের লবিতে বসে গল্প করছিলাম। মণিদির একক্ষণ এসে পড়ার কথা। 
“ভুলে যাননি তো আবার উনি”, সবে বলেছেন জটায়ু এমন সময় ঝড়ের মত এসে হাজির হল মণিদি…

“মিঃ মিত্র আমার বাচ্চাটাকে না কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না!”
“তা ওরা স্বাধীন জীব তো, গেছে কোথাও…”
“কি করে যাবে বেশীদূর? ওর একটা ঠ্যাং ভাঙা তো! কাছাকাছিই থাকে। আমি খেতে না দিলে মরেই যেত ! রোজ বিকেলে ব্রীজের কাছেই বসে থাকে, আমি পাঁউরুটি দিই তো! যখন কেদারে থাকি পাশের চায়ের দোকানদার ওকে খেতে দেয়। পয়সা দিয়ে বলা আছে ওকে।কাল রাত অব্দি ছিল। এখন গায়েব।”

“তা আপনি কি আমাকে আ্যপয়েন্ট করতে চাইছেন? কুকুর খুঁজতে?” 
ফেলুদার মুখ গম্ভীর কিন্তু চোখ হাসছে!
“না না সে কি! আপনি এত বিখ্যাত গোয়েন্দা…আপনি কেন করবেন এসব…কিন্তু কি যে করি …খুঁজলাম চতুর্দিক!” ডাঃ ব্যানার্জির মুখটা করুণ।
“সে তো বুঝলাম, কিন্তু মনে হচ্ছে যেন আপনি চান যে আমি তদন্তটা করি কিন্তু সোজাসুজি বলতে লজ্জা পাচ্ছেন!”
“ওসব লজ্জা টজ্জা আমার আসে না মিঃ মিত্তির। কিন্তু ভয় হয় আপনার ভক্তবৃন্দ তেড়ে আসবেন ফেলু মিত্তিরকে দিয়ে কুকুর খোঁজালে।”
“হুম! তবে লজ্জা নয়, ভয়! কিন্তু শোনেননি, ঘৃণা, লজ্জা, ভয়…তিন থাকতে নয়?”
“হ্যাঁ কিন্তু আপনার ভক্তরা…”
“তা ভক্তরা আমায় ভালবাসে কিনা, ওরা তো ওরকম ভাবতেই পারে। না বললেই তো হল ওদের। হোয়াট হ্যাপেনস ইন রুদ্রপ্রয়াগ, স্টেস ইন রুদ্রপ্রয়াগ!
চলুন তবে, একটু তদন্ত করে আসি।”

“না না, সত্যি, আপনি কেন এ রকম তুচ্ছ ব্যাপারে…”
“আপনার কাছে তুচ্ছ কি ব্যাপারটা?”
“তা নয় তবে..”
“তবে টবে আর কিছু নেই। তাছাড়া সেদিন চিকিৎসার পরে ফিজটাও নেননি। তারওপর ক্যারামেল পুডিং। ফলে কৃতজ্ঞতার ভারটাও একটু নামানো দরকার। আপনি একটু বসুন এখানে,আমরা ঘরে গিয়ে গরম জামা পরে আসি তারপর চলুন দেখাবেন কোথায় বাসস্থান ছিল আপনার সারমেয়টির।”
—————————————————
পর্ব ৪ঃ হর্ষবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়
—————————————————

“কি মশাই? শেষে কুকুর হারানোর কেস? তা আবার তিন ঠেঙে রাস্তার কুকুর! আপনার একটা ইজ্জৎ নেই? ভানু গোয়েন্দা জহর আ্যসিসট্যান্টেও তো ওরা গরু চুরির কেস নিল না। আর আপনি এই দুদিন আগে এখানেই এতবড় একটা কেস সমাধা করে কিনা…”

ঘরে যেতেই বললেন জটায়ু। ভীষণ অফেন্ডেড হয়েছেন।
আমারও মনে হচ্ছিল একটু বাড়াবাড়ি হচ্ছে। কি যে হয়েছে ফেলুদার কে জানে!

“কেন লালমোহনবাবু? পাখি চুরির কেস নিই নি আমি? সাধু সাবধান!” ফেলুদার যুক্তি অকাট্য।
“আহা সে তো পরে অন্য রকম দাঁড়াল…”
“এখানে তেমন হবে না আপনি জানেন?”
“না তা নয়, তবে ভাবলুম…মানে আপনি ঐ ডাঃ ব্যানার্জির জন্য একেবারে…মানে স্ক্র্যাবলে হারলেন ইচ্ছে করে, তারপর এই কুকুরের কেস…”
“কে বলল আমি ইচ্ছে করে হেরেছি? খেলেছেন কখনো স্ক্র্যাবল বা দাবার মত মাইন্ড গেম? খেললে বুঝতেন ওতে হারার চেয়ে হাজারগুণ বেশী খারাপ হল অযোগ্য প্রতিদ্বন্দীর সঙ্গে খেলা! শিশু তো নন উনি যে জিতিয়ে দিতে হবে! 
        তাছাড়া এটা কি লুডো যে দুটো খাবার ঘুঁটি না খেলেই জিতে যাবেন উনি! ক্যাট ম্যাট ধরণের বালখিল্য শব্দ গড়লে বুঝবেন না উনি? ওঁর মাথায় যে নেহাৎ গোবর পোরা তেমন ভাবার কোন কারণ আছে কি? আ্যদ্দিনে আপনার সঙ্গে খেলেছি কি একবারও? উপযুক্ত প্রতিপক্ষ ছাড়া ফেলু মিত্তিরের মস্তিষ্ক পুষ্টি হয় না, বুঝলেন?”
“বুঝলুম ফেলুবাবু। এখন চলুন দেখি এই তিন ঠেঙে কুকুরের কেস কোন রোমহর্ষক দিকে মোড় নেয়!”

“কি ব্রীড ছিল আপনার কুকুরের?” 
মেইন রোডের দিকে যেতে যেতে প্রশ্ন করল ফেলুদা।
“কুকুর কুকুর করবেন না মিঃ মিত্র। ও আমার…”
“তা নাম দিয়েছিলেন কিছু ওর?”
“হ্যাঁ । ভাল নাম হর্ষবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়—ওকি, আপনি হাসলেন নাকি মিঃ গাংগুলী?”? 
পেছনে “খিঁক” শুনে বললেন ডাঃ ব্যানার্জি ।
“না না। হাসব কেন? হাসার কথা  নাকি! আমার হেঁচকি উঠল বলেই তো..”
“আর ডাকনাম!”? 
ফেলুদা যে কি করে না হেসে আছে কে জানে। আমার তো পেট ফেটে যাচ্ছে।
“ডাকনাম হালুম।”
“তা এই হালুমের বংশ পরিচয় কিছু জানেন? না মানে এখন উনি ব্যানার্জি পরিবারভুক্ত ঠিকই, তবে জন্মসূত্রে ঠিক কি?”
“জার্মান শেপার্ড। ইফ দ্যাটস হোয়াট ইউ আর আস্কিং!”

বলতে বলতে আমরা ব্রীজের পাশে এসে গেছি। ব্রীজের নীচের একটা খোঁদল মত দেখিয়ে মণিকঙ্কণা বললেন “ওখানেই থাকত হালুম! আমি ভেবেছিলাম বাড়িতে নিয়ে আসব। কিন্তু বাড়িওয়ালা রাজী না। তার ওপর আমি সারাদিন থাকি না, কে দেখবে ওকে। তারপর আবার দুদিন পরে দার্জিলিং চলে যাব..”
“আপনি দার্জিলিং চলে যাবেন? চাকরী নিয়ে?” জটায়ু শুধোন।
“হ্যাঁ । ওখানে আ্যপ্লাই করেছিলাম,হয়ে যাবে মনে হয়। আসলে আমার পাহাড় ভাল লাগে বলে খালি এসব জায়গাতেই খুঁজি।”

ব্রীজের পাশে একটা ছোট্ট গুমটি চায়ের দোকান। সেটার দোকানদার দেখলাম মণিদিকে চেনে। 
“আরে বহেনজী, ও কুত্তা আভি মিলা নেহি ক্যায়া আপকো?”
“নেহি ভাইসাব। আজ শুভেসে উসকো নেহি দেখা আপনে, হ্যায় না?”
“নেহি বহেনজী। পাতা নেহি কাঁহা গয়া, আ্যয়সে তো রোজ আ যাতা হ্যায় খানে কে লিয়ে। শান্তি সে বৈঠা রহতা হ্যায়। মগর কাল রাতকো, জব ম্যয় দুকানকে অন্দর শো রাহা থা তো বহৎ ভোঁক রাহা থা। ম্যয় শোচ ভি রাহা থা কি যাকে দেখুঁ ক্যায়া হ্যায়…লেকিন সর্দি ইতনি থী…অউর থোড়ি দের বাদ তো চুপ ভি হো গয়া।”

ফেলুদা ইতিমধ্যে ঢালু দিয়ে নেমে ঐ খোঁদলের পাশে চলে গেছে। আমরাও ওর কাছে গেলাম।
“ম্যাগনিফায়িং গ্লাস নেই আপনার?” মণিদির প্রশ্ন।
“ কেন তাছাড়া ঠিক গোয়েন্দা গোয়েন্দা লাগছে না?” ফেলুদা চারপাশটা দেখতে দেখতে বলে।
“ভাববেন না, দরকার লাগলে সব পাওয়া যাবে, ম্যাগনিফায়িং গ্লাস, রিভলভার…তবে আপাততঃ…”বলে আশপাশের মাটিতে মন দিয়ে কি যেন দেখতে দেখতে হঠাৎ উবু হয়ে বসে একটা মাঝারি গোছের পাথরের ওপর তর্জনী বুলিয়ে কি যেন তুলে আনল।

মণিদি এতক্ষণ চোখ গোল গোল করে সব কিছু দেখছিল। ওর দিকে আঙুলটা বাড়িয়ে দিয়ে ফেলুদা বলে
 “কি, কিছু বুঝতে পারছেন?”
খপাৎ করে ওর আঙুলটা ধরে মণিদি নিজের চোখের কাছে এনে ভুরু টুরু কুঁচকে দেখল খানিক্ষণ।

“টেস্ট না করলে তো বুঝতে পারব না, তবে টেক্সচার আর কালার যা দেখছি তাতে মনে হয়…”
“হুম। যা ভাবছেন তাই।টেস্ট না করলেও বুঝতে পারছি আমি”। 
আঙুলটা মণিদির কবল থেকে ছাড়িয়ে নিজের নাকের কাছে নিয়ে বলল ফেলুদা।
“খুব হাল্কা কোকোর গন্ধ।ভেরী ফেইন্ট।বললাম না, আমার ঘ্রাণশক্তি খুব প্রখর!”
“ওহ্, তার মানে কি…”
“ইয়েস ডাঃ ব্যানার্জি। আপনার হালুম মনে হচ্ছে স্নিফার ডগ ছিল। জার্মান শেপার্ড বললেন তো, তাই না! এল কি করে এখানে! কতদিন ধরে এখানে ছিল জানেন?”
“মাস তিনেক হবে। একটা পা খুব ইনজিওরড ছিল। এখানে তো সেরকম ভেট টেট নেই। আমিই একটু দেখাশোনা করে অনেকটা সারিয়েছিলাম।”
“ইন্টারেস্টিং! স্নিফার ডগ, জার্মান শেপার্ড এভাবে রাস্তার ধারে…”

“ঐ সাদা গুঁড়োটা কি ফেলুবাবু?” জটায়ু বলে ওঠেন।
“কোকেন। মনে হয় কাল রাতে এখানে কিছু ডেলিভারি হচ্ছিল যেটি হালুমবাবু টের পেয়ে চেঁচিয়ে উঠে ধরতে যায়।”
“ধরতে যায় বুঝলেন কি করে?”
“কারণ এই পড়ে থাকা গুঁড়ো। আরো কয়েক জায়গায় আছে আশপাশে।হয়ত প্যাকেট কামড়েছিল হালুম। আর ঐ দেখুন ঐ ঘাসে…দু ড্রপ রক্ত.”
“সেকি? হালুমের রক্ত নাকি!”
“ঐ রক্তের ফোঁটা সম্ভবতঃ ড্রাগ পেডলারদের। হালুমচন্দ্র বিনা যুদ্ধে জমি ছাড়েননি। হাজার হোক সম্রাট হর্ষবর্ধনের নামে নাম তো!”

“কিন্তু ও গেল কোথায় বলতে পারেন?”
“সে তো বলা মুশকিল ডাঃ ব্যানার্জি । হয়তো ওকে কাবু করে ধরে নিয়ে গেছে। শুনলেন না, চায়ের দোকানী বলল চিৎকারটা হঠাৎ থেমে গেল!”
“ঈশ! মেরেই ফেলেছে বোধহয় হালুমটাকে”।
কেঁদে ফেলবেন নাকি ভদ্রমহিলা ! 

“আমি বাড়ি যাই মিঃ মিত্তির। অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।” হঠাৎ উল্টো দিকে হাঁটা লাগালেন উনি।
“আরে, আরে! দাঁড়ান, দাঁড়ান! কোথায় চললেন? ডিনার খাবেন না?”
“আপনারা যান। আমার খিদে নেই।”
“এভাবে আহার নিদ্রা ত্যাগ করলে তো কোনো লাভ হবে না। তারচেয়ে চলুন কিছু খেয়ে নিই সবাই মিলে। পেটটা ভরা থাকলে দেখবেন আইডিয়া আসবে মাথায়।”
“হ্যাঁ মণিদি চল। তোমার থেকে আমার বেঞ্জিন রিং এর স্ট্রাকচারটা বোঝার আছে।”
“চলুন ডাঃ ব্যানার্জি, আমার পরের গল্পের প্লটটা একটু বলি আপনাকে। এটা ভাবছি একদম মাসাইমারায় ফেলব…সেরেঙ্গেটি ন্যাশনাল পার্ক, ভিক্টোরিয়া ফলস…”জটায়ু উৎসাহ দেন।
“ওটা মাটেরুনি ফলস হবে লালমোহন বাবু “, মণিদি ফোঁৎ করে নাকটা টেনে ধরা গলায় শুধরে দেয়। 
ফেলুদার মুখটা দেখতে পেলাম না, কারণ তক্ষুণি ও হাত মুঠো করে একটা ছোট্ট কাশি আড়াল করল।

রেসট্যুরেন্টে গিয়ে মণিদি শুধু একটু স্যুপ খেল। কথাবার্তাও হুঁ হাঁ দিয়ে চালিয়ে দিল।
“আপনি তো এনজিওর হয়ে ডাক্তারী করেন। পেশেন্টদের মধ্যে ড্রাগ প্রবলেম দেখেন?” ফেলুদা অবশেষে একটা চারমিনার ধরিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“বিনি পয়সায় চিকিৎসা করাতে আসে যারা তারা সব গরীব লোক। কোকেনের পয়সা কোথায় পাবে? নেশার সমস্যা আছে, কিন্তু সেগুলো ঐ বাংলা চোলাই জাতীয়। 
তবে একবার আমার ডাক পড়েছিল সরকারী হাসপাতালে, একটা সার্জারীর জন্য…এখানে তো সার্জন অত আ্যভেলেবল নয়, তাই ওরা অনেক সময় আমাদের হেল্প নেয়। তো সেটা ছিল একটা ড্রাগ মিউলের কেস।”

“ড্রাগ মিউল আবার কি ফেলুবাবু? খচ্চড় ড্রাগ বয়ে আনে নাকি?”
“না লালমোহনবাবু, পশুতে নয়। মানুষে বয়। গরীব মানুষকে সামান্য পয়সার লোভ বা ভয় দেখিয়ে এই কাজ করানো হয়। তাদের ছোট ছোট ড্রাগ ভর্তি প্লাস্টিকের পোঁটলা গিলিয়ে দেওয়া হয়। ফলে পুলিশের চোখে ধুলো দেওয়া যায়। ঐ লোকগুলোই তখন চলমান ড্রাগবাহক বা মিউল। এভাবে এক এক জন মিউল কোটি টাকার কোকেন ক্যারি করতে পারে।”

“কি সাংঘাতিক! কিন্তু পেটে তো আ্যসিড থাকে মশাই।ঐ প্লাস্টিকের পোঁটলাগুলো ফেটে টেটে যায় না?”
“এমন জিনিস ব্যবহার হয় যাতে তা না হয়। কারণ ফেটে গেলে মিউল মরবে তো বটেই, কিন্তু কোটি টাকার কোকেনও বরবাদ হবে। তাই ঠিকঠাক মেটিরিয়ালের পাউচ বানানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। গুড কোয়ালিটি ল্যাটেক্স, প্রেফারেবলি মাল্টি লেয়ার্ড, লো পারমিয়াবিলিটি…” 

“এত স্বত্ত্বেও সে রকম দুর্ঘটনা মাঝে মাঝে ঘটে বই কি! ঐ মিউলের তখন প্রাণ সংশয়…হেভি ড্রাগ ওভারডোজে। সেকরমই হয়েছিল এখানে ক’দিন আগে। সরকারী হাসপাতালে নিয়ে এসেছিল একজনকে। তারই এমার্জেন্সী গ্যাস্ট্রিক সার্জারীতে সাহায্য করতে আমার ডাক পরে।” মণিদি বুঝিয়ে বলে।
“যে লোকটির অপারেশন হয়েছিল তার নামধাম পাওয়া যাবে?” ফেলুদা জিজ্ঞেস করল।
“তা আমি গিয়ে হাসপাতালে চাইলে ওরা দেবে মনে হয় আমাকে।”
“তাহলে চলুন হাসপাতাল” ফেলুদা উঠে বলল।
“কিন্তু এত রাতে?”
“তাতে কি? হাসপাতাল তো! ২৪ ঘন্টা খোলা।”

হাসপাতালে গিয়ে কিন্তু কোন লাভ হল না। লোকটিকে কেউ হাসপাতালের সামনে ফেলে গেছিল। সেরে যাবার পর পুলিশ এসেছিল। কথা ছিল পরদিন এসে জেরা করবে। কিন্তু তার আগেই লোকটি পালায়। এই সরকারী হাসপাতালে সিকিউরিটি এমন কিছু কড়া না, কোন ওয়ার্ডবয়কে কিছু টাকা দিয়ে পালানো কিছুই নয়। লোকটি নিজের নাম বলেছিল মোহন, এর চেয়ে বেশি কিছু জানা গেল না।

“আপনি বাড়ি যান ডাঃ ব্যানার্জি। আমি ভেবে দেখছি কি করা যায়।” ফেলুদা অবশেষে বলল।
“হ্যাঁ সে তো যেতেই হবে। আপনিও হোটেলে ফিরে যান। অনেক করেছেন আপনি, আর ঝামেলায় জড়াবেন না। আপনার সোল্ডার ইনজুরি এখনো পুরো সারে নি।”
বলে মণিদি বিদায় নিল।

—————————————————
পর্ব ৫ঃ শিবতীর্থ
—————————————————

ফেলুদা কিন্তু হোটেলে না ফিরে ঘুরল বাজারের দিকে।
“আপনি কি মশাই আবার তদন্ত করার তালে আছেন? এবার ক্ষ্যামা দিন তো। এখনো পুরো সারেননি আগের জখম থেকে, একটা কুকুরের জন্য…ডাঃ ব্যানার্জিও তো বললেন ছেড়ে দিতে।”
“এটা কিন্তু আর কুকুরের নেই লালমোহনবাবু, কোকেনের মামলা হয়ে গেছে। যাকগে, আপনারা হোটেলে যান, আমি ঐ ওষুধের দোকান থেকে  আরো ক’টা পেইনকিলার কিনে নিয়ে আসছি। মিনিট পনেরর বেশী লাগবে না।”

হোটেলে ফিরে আমাদের ঘরে বসে গপ্প করতে করতে আমি আর জটায়ু যখন এক ঘন্টা কাটিয়ে ফেলার পরেও ফেলুদা ফিরল না, তখন চিন্তা হতে লাগল।
“তোমার দাদার এই ব্যাপারটা না ফ্র্যাঙ্কলি ভেরি ইরিটেটিং তপেশ।” জটায়ু ভুরু টুরু কুঁচকে বললেন।
“দেখি আর আধঘন্টা মত, নাহলে…”
“না হলে কি করবে বলতো তপেশভাই?”
“জানিনা। মাথায় আসছে না কিছু। একবার মণিদিকে..”
“না না, এই রাত বিরেতে, এটা তো কোন ডাক্তারী কেসও নয়। তারচেয়ে বরং পুলিশের কাছে..”

“পুলিশের কাছে কি হবে লালমোহনবাবু?”
 ফেলুদা ফিরেছে।
“এই তোমার পনের মিনিট? ওষুধ কিনতে ক ঘন্টা লাগে ফেলুদা?”
“আরে ওষুধ কিনতে গিয়েই তো অযাচিত ভাবে একটা ক্ল্যু পেয়ে গেলাম। ফলে সেটার একটু তদন্ত না করে তো আর আসা যাচ্ছিল না।”
“কিসের ক্ল্যু মশাই”?
“দেখলাম আমার আগের লোকটা ষোল বাক্স কন্ডোম কিনল।”
“ক্কি, কি বলছেন মশাই…তপেশের সামনে…ছি ছি ছি…”
“আপনি ধিক্কারটা থামান মশাই। এগুলো ইউরোপে ১০/১২ বছরের বাচ্চাদের স্কুলে শেখায়।তোপসে আর তিন মাস পরে আ্যডাল্ট হবে। ওর বায়োলজি টেক্সট বইতে আছে, ও যদি কিছু না জানে তো আমি ওর আসন্ন হায়ার সেকেন্ডারী নিয়ে সবিশেষ চিন্তায় পড়ব।”

“কিন্তু ফেলুদা তার থেকে তুমি ক্ল্যুটা কি পেলে? একটা লোক ফার্মেসীতে কিনতে এসেছে তো এর মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যাপারটা কোথায়?”
“অস্বাভাবিকত্বটা পরিমাণে। ঐ পরিমাণ একসঙ্গে কেনা…হাউ শ্যুড আই সে ইট…মোস্ট লাইকলি ইজ নট ফর দ্য ইনটেন্ডেড পারপাস!”
“তার মানে?” লালমোহনবাবুর প্রশ্ন।
“জানেন আর কিসে কিসে এর ব্যবহার হতে পারে?”
“হ্যাঁ …মা-মানে, সে তো আর না জানার কি আছে…” লালমোহনবাবু বেগুনী হয়ে গিয়ে তোতলাচ্ছেন।
“না, আমি এর প্রাইমারী ফাংশন আ্যজ এ বার্থ কন্ট্রোল টুলের কথা বলছি না…” ফেলুদাকে অসহিষ্ণু শোনায়।
“দেয়ার আর মেনি আদার লেসার নোন ইউজেজ, যেমন আন্ডার ওয়াটার সাউন্ড রেকর্ডিঙে লাগে আ্যজ এ ওয়াটার টাইট স্যাক ট্যু পুট দ্য মাইক্রোরেকর্ডার ইন। তেমনি…”

“আ্যজ ড্রাগ পাউচ…ফর দ্য মিউলস!” আমি বলে উঠি কারণ আমার মাথায় চট করে খেলে গেছে টাইমস ম্যাগাজিনের একটা আর্টিকেল।

“সাবাশ তোপসে। হ্যাঁ , আমি শিওর এগুলো কেনা হচ্ছে ওগুলোকে ড্রাগ পাউচ হিসেবে ব্যবহার করতে। আর তারপর সেগুলো মিউলের মাধ্যমে পাচার করতে।এটা অত্যন্ত ওয়েল নোন টেকনিক।পৃথিবীর সর্বত্র…মেক্সিকো, কলম্বিয়া থেকে ফার ইস্টের বিভিন্ন দেশেই বহুল প্রচলিত।”
“বলেন কি মশাই? ঐ জিনিস ড্রাগ পাচারের কাজে লাগে? জানতুম না তো!” বলে ওঠেন জটায়ু।
“ গুড কোয়ালিটি ল্যাটেক্স, ভেরি লো পারমিয়াবিলিটি, —মিউলদের পেটে ইনট্যাক্ট অবস্থায় থাকার সব গুণ আছে।তা ছাড়াও সস্তা, সহজলভ্য এবং সন্দেহউদ্রেককরী নয়। সুতরাং ড্রাগের কারবারীদের কাছে বেশ পছন্দের অপশন।”

“আমি একবার টাইমসে একটা আর্টিকেল পড়েছিলাম।দু তিন পিস একসঙ্গে ইউজ করে মাল্টিলেয়ার্ড পাউচ বানায়, মিউলদের পেটের আ্যসিডে অক্ষত রাখার জন্য। তাই বোধহয় এই বাল্ক পারচেস, না ফেলুদা?”
“এক্সাক্টলি! তাই আমি দোকানদারের সঙ্গে ভাব জমিয়ে জানার চেষ্টা করলাম ক্রেতাটি কে! “
“জানতে পারলেন কে?”
“হ্যাঁ । সাম তিওয়ারী। মাঝে মাঝেই এভাবে এসে লার্জ কোয়ান্টিটিতে কিনে নিয়ে যায়। অদ্ভুতভাবে কেউ সন্দেহও করে না…দে ওয়্যার জাস্ট মেকিং সাম টেস্টলেস পুয়োর জোকস আ্যবাউট হিজ প্রাওয়েস। এনিওয়ে ওরা বলতে পারল না তিওয়ারী কোথায় থাকে, তবে বলল যে ও একটা বাইকে চেপে আসে যেটা সারাই করায় মাঝে মাঝে বাজারের নাথ্থু গ্যারেজে।”

“তা তখন আপনি নাথ্থু গ্যারেজ গেলেন নাকি?”
“ন্যাচেরালি!  ওখানে ওদের মেকানিক ইসমাইলের থেকে পাওয়া গেল আসল খবর। ওদের ওখানে কাজ করত মোহন নামে এক হেল্পার যে গত একমাস ধরে আসছে না পেটে আ্যপেন্ডিক্স অপারেশন হয়েছে বলে। তিওয়ারীর কাজ মূলতঃ মোহনই দেখত। ওদের কাজের চাপ খুব বেড়ে গেছে মোহন না থাকায়। আর শেষ খবরটা হল…তিওয়ারী ওয়ার্কস আ্যট দ্য মেঘরাজ হাউস!”

এরপর খট করে যে আওয়াজটা হল সেটা জটায়ুর দাঁতে দাঁতে লাগার।
              ———-
“আমাদের আগেই বোঝা উচিৎ ছিল মশাই। পাহাড়ী জায়গা, ড্রাগ…এ আমাদের মগনলাল ছাড়া কেউ না।”
পরদিন সকালে গাড়ির দিকে যেতে যেতে বলেন জটায়ু।
“শুধু তাই না। সবই শিবের তীর্থ। কাশী, পশুপতিনাথ কিম্বা এই কেদার-বদ্রী।” ফেলুদা মনে করিয়ে দেয়।
“হ্যাঁ মশাই, সেই জন্য তো কেদারে কেনা ঐ পাথরের শিবও কাছেই রেখেছি।”
কাঁধের ঝোলা থাবড়ে বুঝিয়ে দেন জটায়ু।
“বেশ একটা কনফিডেন্স পাওয়া যায়, বুঝলেন তো!”

“ভেবে দেখুন আপনি যাবেন কিনা। আপনাকে যেতেই হবে এমন কিন্তু কোন মানে নেই। মগনলাল পার্টিকুলারলি আপনাকে যেমন নাজেহাল করে তাতে করে আপনি না গেলে আমি কিচ্ছু মনে করব না…”
“ফেলুবাবু, আপনি কিন্তু আমায় দারুণ আন্ডার এস্টিমেট করছেন। আমরা যে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স তাও কি ভুলে গেলেন?” জটায়ু গম্ভীর হয়ে বললেন।
“এবারে তাহলে থ্রি নয়, ফোর মাস্কেটিয়ার্স।” দূরে মণিদিকে দেখিয়ে বলল ফেলুদা।
“কি মশাই! ওঁর মত একজন মহিলাকে নিয়ে মগনলালের বাড়িতে… না না। মানা করুন ওঁকে।”
“পারলে করুন আপনি। সকালে উনি ফোন করেছিলেন। বললাম এই ব্যাপার তো উনি জেদ ধরলেন যাবেনই। বারণ করতে গেলাম তো দুকথা শুনিয়ে দিলেন কিসব নারীবিদ্বেষী টেসী বলে। আপনার সাহসে কুলোয় তো মানা করুনগে যান।”

মেঘরাজ হাউস শহর থেকে একটু দূরে একটা সুন্দর ছবির মত সাদা বাড়ি, বিরাট কম্পাউন্ডের মাঝখানে। চারপাশে পাইন ফারের জঙ্গল। গেট থেকে নুড়ি বিছানো পথ তার মধ্যে দিয়ে অনেকটা গিয়ে শেষ হয়েছে গাড়িবারান্দার নীচে। গোল গাড়িবারন্দার নীচে বড় ফোয়ারা, চারপাশে ফুলের কেয়ারি।আমরা গেটের সামনে গিয়ে আমাদের ভাড়ার গাড়ি ছেড়ে দিয়ে দারোয়ানকে বললাম মেঘরাজ মশাইকে জানাতে যে কলকাতা থেকে তাঁর চেনা মিঃ মিত্র এসেছেন দেখা করতে। সে ইন্টারকমে কথা বলে নিয়ে আমাদের প্রবেশের অনুমতি দিল।

ভেতরের সুসজ্জিত বসার ঘরে কিছুক্ষণ বসার পরেই শুনলাম পরিচিত কণ্ঠস্বরঃ
“আরে মিঃ মিত্তর নাকি! কি সৌভাগ্য হামার…সাথমে কাজিন ঔর আঙ্কল কো তো ম্যয় পহচানতা হুঁ, লেকিন ইয়ে মোহতরমা কৌন হ্যায়? ভাবীজী?”
“ না মিঃ মেঘরাজ। ওঁর একটা জিনিস হয়তো আপনার কাছে আছে। সেই জন্যেই আসা আর কি!”
“আচ্ছা। উনকি কোঈ চীজকে লিয়ে আপ সিধা মেরে ঘর আ পঁহচে। বিনা কোঈ ডর! তব তো ইয়ে সায়দ হোনেবালি ভাবীজী হ্যায়। শরমাইয়ে মত। বোল দিজিয়ে, হাম তো ঠেহরে পুরানে জান পহচান বালে..”

ফেলুদা মগনলালের খোঁচা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বলল,
“মগনলালজি, পরশু রাতে আপনার লোকেরা যখন কোকেন ডেলিভারী নিচ্ছিল ব্রীজের পাশে, তখন কোনো কুকুর আপনাদের বড্ড বিরক্ত করে। যার ফলে আপনারা তাকে চুপ করান জোরপূর্বক।সেই কুকুরটি কোথায় এখন বলতে পারেন?”
“কুকুর ? আরে উয়ো স্নিফার ডগ! ক্যায়া ভাবীজী, উয়ো স্নিফার ডগ লেকে আপ ক্যায়া করেঙ্গে? মিঃ মিত্রা সে কহিয়ে উয়ো আপকো এক ছোটাসা, প্যারা সা পুডল দিলা দেঙ্গে। খুব যাচেগা আপকো!”
মণিদিও দেখলাম বেশ বুদ্ধিমতী। কোনো রিআ্যক্ট করল না।

“তাহলে আপনার ড্রাগ মিউলের কারবারটা…মানে পাউচ বানানো , মিউলদের দিয়ে সেটা ক্যারি করানো সব কি আপনার এই বাড়ি থেকেই হয় নাকি?” 
ফেলুদা নিজের লাইন অফ কোয়েশ্চনসে অটল।
“আপ ইয়ে ক্যায়া অনাব শনাব বকে যা রহে হ্যায় মিঃ মিত্তর? হাঁ কোকেন কা কাম হাম থোড়া বহুৎ করতে হ্যায়  আ্যজ এ রিক্রিয়েশনাল ড্রাগ। লেকিন ইয়ে ড্রাগ মিউল ব্যাগেড়া…”
“তাহলে আপনার কর্মচারী তিওয়ারী কাল ওরকম বাল্ক পারচেজ অব কন্ডোমস করল কেন? দোকানে যা ছিল সব?”

“ আররে মিঃ মিত্র … আব সমঝা!” হেসে উঠল মগনলাল ।
“আপকো জরুরত থী  উয়ো চীজ, পর মিলি নেহি…ইসি লিয়ে ইতনা নারাজ হ্যায়….মুঝ পর, তিওয়ারী পর, সারি দুনিয়া পর! বহুৎ গলত কিয়া উস তিওয়ারী নে…”
মগনলালের উস্কানি অব্যাহত।

“ঔর আঙ্কলজি, আপ ক্যায়সে হ্যায়? ঠিক ঠাক”?
“আ্যঁ হ্যাঁ …সব ঠিক ঠাক, ঠিক ঠাক”। জটায়ু চমকে উঠে বলেন।
“মিঃ মিত্তর নে তো ঢুঁঢ লিয়া আপনি মাশুকা, ঔর আপকো কোঈ মিলি নেহি ক্যায়া আভি, আঙ্কলজি?”
“না না…মেরা তো মানে কুছ নেহি…মানে ম্যায় করতা নেহি এই সমস্ত।”
“কিঁউ? নামর্দ হ্যায় আপ…?”
মগনলালের সাহস বেড়ে চলেছে। ফেলুদা কি ভাবছে জানিনা। এই বাক্যবাণ আর কতক্ষণ সহ্য করবে ও…!

“ইউ কান্ট টক ট্যু হিম লাইক দ্যাট”, ফেলুদা কিছু বলার আগেই মণিদি বলে উঠেছে।
“ক্যায়া”? মগনলাল হকচকিয়ে গেছে।
“উনি একজন নামকরা সাহিত্যিক এবং ভদ্রলোক । এভাবে আপনি ওঁর সঙ্গে কথা বলতে পারেন না”। মণিদি গনগনে গলায় বলে ওঠে।

“আরে মিঃ মিত্তর, আপকো তো শেরনি মিলি হ্যায়। বাধাই হো। ঔর মেরে নসিব দেখিয়ে… কালি ভৈঁস!
খ্যার ছোড়িয়ে, আপ আয়ে হ্যায় ইধার শিউজিকা দর্শন কিজিয়ে আঙ্কলকে সাথ, কাজিন কে সাথ পাহাড় মে চঢিয়ে, ভাবীজীকে সাথ রোমান্স কিজিয়ে…কেঁও ঝুটমুট আপনা অউর মেরা টাইম এক কুত্তে কে পিছে বরবাদ কর রহে হ্যায়? 
তিওয়ারীকে বারেঁ মে পুছ রহে থে না? বুলাতা হুঁ ম্যয় …তিওয়ারী,আরে ও তিওয়ারী ইধার আ জারা…” 

ভেতর থেকে বেরিয়ে এল খোলা পিস্তল হাতে ন্যাড়া মাথা তিওয়ারী। হাতের কব্জির কাছে একটা ব্যান্ডেজ। বোধহয় হালুম বাবুর দাঁতের কাজ।

“যা তিওয়ারী ইন লোগোকো বাহার ছোড় আ। অউর গনেশ , তু ভী ইধার আ…”

আর একজন দশাসই লোক এসে হাজির হল। এর হাতে পিস্তল নেই বটে তবে রীতিমত পালোয়ান।
“গনেশ, তু মিঃ মিত্তরকে বিলকুল বগল মে রহনা, কোঈ উল্টি সিধি হরকত করনে না পায়ে ইয়ে।”

আমরা পর পর লাইন করে বেরিয়ে এলাম। আগে আমি, তারপর জটায়ু , তারপর ফেলুদা সবার শেষে মণিদি। নুড়িবিছানো পথ দিয়ে একটু এগোতেই শুনলাম “আঃ”, মণিদি বেচারা হোঁচট খেয়ে পড়ছে। তুলবার জন্য এগোনো যাবে কিনা ভাবার আগেই দেখলাম তিওয়ারী একটু নীচু হয়ে বাঁ হাত বাড়িয়ে দিয়েছে মণিদির দিকে । ডান হাতে রিভলভার ধরা।
বেচারী ভূপতিত মহিলার প্রতি গুন্ডাদেরও দয়া হয়!

কিন্তু মণিদি বাড়ানো হাত ধরে ওঠার বদলে এক হ্যাঁচকা টান এমন ভাবে দিল যে তিওয়ারী কুমড়ো গড়াগড়ি আর একই সঙ্গে ও নিজে উঠে দাঁড়াল। তিওয়ারীর হাতের রিভলভার ছিটকে গেল যেটা সঙ্গে সঙ্গে আমি তুলে নিয়ে তাক করলাম।ফেলুদা ওর পাশের গনেশ লোকটাকে ততক্ষণে কাবু করে মাটিতে ফেলেছে, ধ্বস্তাধস্তি চলছে…এমন সময় ঠকাং। গনেশের মাথায় জটায়ুর ঝোলায় থাকা পাথরের শিবের বাড়ি। এবার লোকটা চোখ এলিয়ে চিৎপাত।

ফেলুদা রিভলভারটা আমার থেকে নিয়ে তিওয়ারীর দিকে চোখ রেখেই মণিদিকে জিজ্ঞেস করল “জুজুৎসু শিখতেন বুঝি?’ উচি মাতা ‘প্যাঁচে কাত করলেন না তিওয়ারীকে?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ । ব্লু বেল্টের বেশী এগোইনি, তবে কাজে লেগে গেল আজ! তা এবার কি? কতক্ষণ এভাবে পিস্তল তাক করে থাকবেন।”? মণিদির প্রশ্ন।
“আমার হিসেব মত বেশীক্ষণ না। ইনপেক্টর সিং এলেন বলে। সব সিনেমার মত শেষ দৃশ্যে।”
“বাতাইয়ে তিওয়ারী জী সারা সামান অউর উয়ো কুত্তা কিধার হ্যায়।”?

ফেলুদা পরে বলেছিল যে এটা নাকি সাইকোলজ্যিকাল। মানুষের পিউপিল মুভমেন্ট থেকে খুব সহজেই তার আসল মনের ভাব বোঝা যায়।
                তিওয়ারীও মুখে কিছু না বললেও একবার নিজের কব্জির আঘাতের দিকে আর পরক্ষণেই গাড়িবারান্দার নীচে ফোয়ারাটার দিকে তাকাল। আমরা সবাই ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে দেখি ফোয়ারার সামনে বাঁধানো জায়াগাটায় একটা ম্যানহোলের ঢাকনার মত। ওপরে আংটা লাগানো। 

“ছুটবেন না ডাঃ ব্যানার্জি “,
বলাটা দরকার ছিল কারণ মণিদি ছুটতে যাচ্ছিল।
“আমি বাইরের রাস্তায় গাড়ির শব্দ পেলাম। পুলিশ ঢুকছে মনে হয়। এদুটোকে তাদের হাতে দিয়ে তারপর আপনার হালুম উদ্ধার।”

পাঁচমিনিটের মধ্যে পুলিশ এসে তিওয়ারী আর গনেশকে হাতকড়া পড়িয়ে জীপে তুলল। দুজন বাড়ির ভেতরে গেল বোধহয় মগনলালের সঙ্গে কথা বলতে।তারপর ম্যানহোলের ঢাকনা তুলতেই দেখা গেল ভেতর দিয়ে লোহার সিঁড়ি নেমে গেছে। পুলিশের পেছন পেছন আমরা চারজনও নেমে এলাম সেটা দিয়ে। নীচে একটা হলের মত। সামনের দরজাটার তালা খুলতেই দেখা গেল ভেতরে বিশাল কারখানার মত ঘর। সেখানে কোকেনের প্যাকেট, পাউচ সবই পাওয়া গেল। আসলে পুরো মেঘরাজ হাউসের বেসমেন্ট জুড়েই এই কারবার। আমরা যেখান দিয়ে এলাম সেটা ছাড়াও বাড়ির মধ্যে থেকে এখানে আসারও নিশ্চয় রাস্তা আছে। তবে সেসব এখন পুলিশ দেখবে। আমরা উঠে এলাম ওপরে।

“ও মিঃ মিত্তির, সবই তো হল, কিন্তু আমার বাচ্চাটা…” মণিদি এখনো দুঃখী।
“চলুন ঐ আউট হাউসে দেখি, নয়তো মগনলালকে আবার দাবড়ানি দিয়ে খোঁজ বের করতে হবে।”
“ওকে দাবড়ানি এমনিই দিতে হবে! ভাবীজি বলা আমি বের করছি ওর”।
“দেখুন মগনলালের হাজার দোষ, কিন্তু ভাবীজি বলা ইজ হার্ডলি এ ক্রাইম। বহেনজীতে তো চটেন না। ভাবীজি বললে চটেন কেন?”
“ইজি ফর ইউ ট্যু সে! আপনাকে তো আর বলেনি!”
“বলতে তো কিছু বাকীও রাখেনি। ছিলেন তো ওখানেই বসে, শোনেননি?”

এর মধ্যে এসে গেছি আউটহাউসের সামনে।
ভেতরের ঘর থেকে চাপা ভৌ ভৌ আওয়াজ আসছিল। একজন কনস্টেবল দরজা টা খুলতেই তীরের মত ছিটকে বেরিয়ে এলেন হর্ষবর্ধন বন্দ্যোপাধ্যায়।

তারপর কুড়ি সেকেন্ডে যে ঠিক কি কি জিনিস কি অর্ডারে ঘটল তা বোঝানোই শক্ত, তবু চেষ্টা করছি।
বাইরে দাঁড়িয়েছিল ফেলুদা। তার একটু পেছনে মণিদি। হালুম মারল ঝাঁপ মণিদির দিকে। ফেলুদা গেল লাফিয়ে পিছনে সরতে, মণিদি গেল এগিয়ে হালুমকে ধরতে…এই ত্রিবিধ ঝটাপটিতে দেখলাম ফেলুদা, মণিদি আর হালুম তিনজনেই ঢালু মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে।

-————————————————
পর্ব ৬ঃ Syzygy 
—————————————————

“সেই পড়লেন আমার ঘাড়ে?” উঠে দাঁড়িয়ে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বলল মণিদি!
“আমার পেছনে দাঁড়িয়েছিলেন কেন? “ ফেলুদাও উঠে দাঁড়িয়েছে।
“আমি মোটেই আপনার পেছনে দাঁড়াইনি। হালুমটা ছুটে আসছিল আমার দিকে, আপনি কোথায় সরে যাবেন, তা না…”
“সরতে গিয়েই তো এই কান্ড। যাকগে, লেগেছে নাকি আপনার?”
“তা আর না লাগে! ওজন আছে বাপু আপনার! দেখে তো মোটা লাগে না, তবু…”
“ওজন ফ্যাটের হয় না। হয় মাসল আর হাড়ের । ডাক্তার হয়ে জানেন না সেকথা?”
“জানি কিন্তু…ও কি? আবার আপনার কাঁধে চোট পেলেন নাকি?”
“না না ঠিক আছে বোধহয়”। কাঁধে হাত বুলিয়ে বিকৃত মুখে বলে ফেলুদা।
“ঠিক আছে কিনা সে তো আমি বুঝব। প্রেসির লোকেরা ভাবে বটে তারা সর্বজ্ঞ, তবে সেটা তো ঠিক নয়! দেখি কি অবস্থা। বসুন একটু, নয়তো আমি নাগাল পাব কি করে? যা ঢ্যাঙা আপনি!”

আমি যতক্ষণ হালুমের সঙ্গে খেলছিলাম তারমধ্যে আবার চোট পরীক্ষা হল। এবার যে ফেলুদার মুখের রং বদলে গেল সেটা আমি আড়চোখে হলেও পষ্ট দেখেছি…চোখের ভুল টুল নয় মোটেই। আবার ফেলুদার চোখে চোখ পড়তেই মণিদিও কেমন জানি দুম করে ডাক্তারীটা শেষ করে হুটপাট সরে দাঁড়াল।
“ঠি-ঠিক আছে। সে-এ-রে এসেছে মনে হয়”। এবার দেখছি মণিদির তোতলানোর পালা।

তা, সব  যখন ঠিকঠাক আছে, তখন ফেরা যেতে পারে।

                   ——————
বিকেলে একটা ক্যাফেতে বসেছিলাম চার জনে। আমি জ্যুস নিয়েছি। ফেলুদা আর মণিদি কফি আর লালমোহনবাবু চা।

“মগনলালের কি হবে ফেলুবাবু”? জটায়ু জিজ্ঞেস করলেন।
“এখনকার মত তো বামাল সমেত গ্রেপ্তার । কিন্তু এই নিয়ে তো তিনবার হল। লোকটার পয়সাও আছে, কানেকশনও।দুবছর পর আবার কোন তীর্থে দেখা হয়ে গেলে আশ্চর্য হব না।সেই জন্যই আরো কাল গেলাম ওর বাড়ি। শুধু পুলিশকে খবর দিলে ওরা একটা রুটিন এনকোয়ারি করে কোন লীড না পেয়ে ফিরে আসত। মেঘরাজ হাউসের বেসমেন্টে ড্রাগের ব্যবসা চলতেই থাকত ।”
“ও কি আপনার পুরোনো শত্রু নাকি মিঃ মিত্র”? মণিদির প্রশ্ন।
“তা একরকম বলতে পারেন। শার্লক হোমসের যেমন প্রফেসর মরিয়ার্টি…ইনিও তেমন ঘুরে ফিরে এসে পড়েন আমার জীবনে। তবে আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি সেদিন অতগুলো ভুলভাল কথা আপনাকে শুনতে হল…”
“তাতে আপনার ক্ষমা চাওয়ার কি হল? আপনাকেও তো বহুকিছু বলল। বললেই কি হয়ে গেল নাকি? যত্তসব। আপনি ছিলেন বলে হালুমটা ফেরত এল…”
“হ্যাঁ , হালুম তো বেশ অভিজ্ঞ স্নিফার ডগ, পুলিশের কুকুরই ছিল তো। ইনস্পেক্টর সিং বললেন যে মাস তিনেক আগে একটা অপারেশনের সময় ও ইনজিওরড হয়ে নদীতে পড়ে যায়। সবাই ভেবেছিল মরেই গেছে, কিন্তু দেখাই যাচ্ছে ও কোনরকমে তীরে উঠে ঐ ব্রীজের তলায় আশ্রয় নেয়।। নামটা অবশ্য হর্ষবর্ধন নয়, জ্যাক! তো সে যাই হোক, নামে কি যায় আসে, এখন আবার ও সঠিক জায়গায় ফিরবে, চিকিৎসাও পাবে।”

“হালুমটার জন্য মন খারাপ লাগছে জানেন। জানি ও ভাল থাকবে, তাও”।
“অত ভাববেন না। বরং আপনি এবার একটা বিয়ে থা করে নিন, নিজের ছেলেপুলে হোক তাহলে দেখবেন আর…” লালমোহন বাবু বলে ওঠেন।
“আপনি কি আমায় প্রস্তাব দিচ্ছেন নাকি?” 
চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করল মণিদি। 
আমি জ্যুসের গ্লাসে বিষম খেলাম।
ফেলুদা অব্দি একটা খোলা হাসি হেসে উঠল।

“এই দ্যাখ! কি কথার কি মানে করে বসল, আপনি কিন্তু খুব গোলমেলে লোক মশাই ।”
“ ভাববেন না, আমি আপনার লেগ পুলিং করছিলাম। আমি জানি আপনি ভাল লোক।”
ফিক করে হেসে বলে মণিদি।
“তাহলে আপনাকে কেউ প্রস্তাব দিলে সে খারাপ লোক হবে বলছেন?” ফেলুদা হাসি থামিয়ে বলল।
“ধুর ধুর, আমাদের দেশে আবার কেউ দিতে পারে নাকি প্রস্তাব… যত সব মায়ের আঁচল ধরা বুড়ো খোকার দল,
মায়ের জন্য দাসী আনতেই শিখেছে কেবল।
                   এক হাঁটু গেড়ে বসে, আংটি দিয়ে বলবে…’উইল ইউ ম্যারি মী’…ব্যাকগ্রাউন্ডে মুন রিভার বাজবে, তবে না…”!
“হুম একদম বিলিতি মতে। তাহলে অবিশ্যি একটু শক্ত ! কখনো যদি পান কাউকে তো জানাবেন, শুভদিনে হাজির থাকব কথা দিলাম।”
           ————————
পরদিন সকালে গাড়িতে মালপত্র তুলছি হোটেলের বাইরে। 
“কই ফেলুবাবু, উঠে আসুন।” হাঁক দেন লালমোহনবাবু।
ফেলুদার চোখ চারিদিকে কি যেন খুঁজছে।
“চলুন”, বলে সবে উঠতে যাবে ড্রাইভারের পাশে এমন সময় দেখা গেল প্রায় দৌড়তে দৌড়তে আসছে মণিদি।

“স্যরি, ভীষণ দেরী হয়ে গেল। আর একটু হলেই মিস করে যেতাম আপনাদের।”
“খুব ভাল হল দেখা হয়ে মণিদি।”
“হ্যাঁ ভাই। বেস্ট উইশেস ফর ইওর হায়ার সেকেন্ডারী। ভালোই হবে তোমার পরীক্ষা। লালমোহনবাবু, আপনার প্লট শুনেও কিন্তু মনে হচ্ছে পরের বইও সুপার হিট। আপনাদের সঙ্গে আর কখনো দেখা হবে কিনা জানি না, তবে…”

“এ আবার কি কথা ডাঃ ব্যানার্জি , দেখা হবে না কেন? ফোন নাম্বার দিলুম যে! ফোন করবেন। কলকাতা গেলে অবশ্যই দেখা করবেন গড়পারে। ক্যারামেল পুডিং খাওয়াতে পারব না, তবে আমার রান্নার ঠাকুর রাঁধে কিন্তু খাসা।” জটায়ু বলে ওঠেন।
“তা না হলে আর আপনার বাড়িতে ওর চাকরী থাকত নাকি!” ফেলুদা বলে।
“আর ডাঃ ব্যানার্জি, আর একদান খেলা বাকী রইল কিন্তু! সে কলকাতায় হোক দার্জিলিঙে।”
“হারবেন তো সেই আবার! যেখানেই হোক।”
“দেখবেন দার্জিলিং গিয়ে আপনাকে এবার ঠিক হারিয়ে আসব”।
                   ———————
“ কখন যে মানুষের অন্য কারো সঙ্গে যোগাযোগ হয়ে যায় কিছুই বলা যায় না, বুঝলে তপেশ ভাই”। গাড়ি চলতে শুরু করার কিছুক্ষণ পরে বললেন জটায়ু।
“সে তো বটেই।আপনার সঙ্গেও তো আমাদের আলাপ এরকম পথেই।” আমি মনে করিয়ে দিলাম।
“যা বলেছ ভাই, ভবিতব্য ! আ্যলাইনমেন্ট অফ স্টারস। তাকেই তো বলে ঐ যে ঐ খটমটে শব্দটা…syzygy…তাই না ফেলুবাবু?”

ফেলুদা কিছু না বলে দূরের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে ধোঁয়ার রিং ছাড়তে লাগল।

বৃহস্পতিবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

এ কে আর স্যার ~ অরিজিৎ গুহ

আইআইটির প্রথম বর্ষে যে যেই স্ট্রিমেই থাকুক না কেন, প্রত্যেককে সাধারণভাবে কিছু জিনিস পড়তেই হয়। তার মধ্যে একটা হচ্ছে নিউটনের মেকানিক্স। এই বিষয়টা ছাত্রছাত্রীরা সেই ক্লাস নাইন টেন থেকে পড়ে আসছে, আর যারা আইআইটি তে চান্স পেয়েছে সেইসব ছাত্রছাত্রীরা তো এই বিষয়ে নিজেদের একদম অথরিটি ভাবে। উচ্চমাধ্যমিকে হার্ডার প্রবলেম নামের সব অঙ্ক টঙ্ক সলভ করে তারা আইআইটি তে ঢুকেছে। তো তাদেরকে মাস্টারমশাইরা এই মেকানিক্স বিষয়টা পড়াতে গিয়ে বেশ বিব্রতই হন। ছাত্রছাত্রীরা যেন তৈরিই হয়ে থাকে যে কত বড় অধ্যাপক আছে দেখি যে আমাকে নিউটনের মেকানিক্স পড়াবে! কাজেই এই ক্লাসটা করানো মাস্টারমশাইদের কাছে প্রায় দু:স্বপ্নের মত।(অনেকেই হয়ত ভালো পড়ান, আমি গল্পটা শুনেছি এক আইআইটির অধ্যাপকের কাছেই)। তো এরকমই আইআইটির এক অধ্যাপককে ফার্স্ট ইয়ার মেকানিক্স এর ক্লাস নিতে হবে। উনি তো পড়লেন মহা সমস্যায়। ছাত্রছাত্রীদেরকে ক্লাসে ধরে রাখা শুধু নয়, বেয়ারা বেয়ারা উদ্ভট প্রশ্নের ঠিকঠাক জবাব দেওয়া সবই সামলাতে হবে। ভাবতে ভাবতেই তাঁর মাথায় এলো প্রেসিডেন্সিতে পড়ার সময়ে তাঁর নিজের মাস্টারমশাই, যাঁর ক্লাস তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনতেন তাঁর কথা। মেকানিক্স নিয়ে তাঁর একটা বইও রয়েছে। বইটা তিনি পড়েছেন। অধ্যাপক করলেন কি তাঁর মাস্টারমশাই এর লেখা বইটা থেকে লাইন বাই লাইন তুলে ক্লাসে পড়াতে শুরু করলেন। পুরো ক্লাসরুম মন্ত্রমুগ্ধের মত নিউটনের মেকানিক্স এর ওপর লেকচার শুনে গেল। যেন পিনপতনের মত নিস্তব্ধতা ক্লাস রুম জুড়ে। ক্লাস শেষ হওয়ার পর অধ্যাপক মশাই হাঁপ ছেড়ে বাচলেন। আরেকবার তাঁর স্যারের উদ্দেশ্যে মনে মনে প্রণাম ঠুকলেন। 

      যে স্যারের লেখা বই থেকে আইআইটির ওই অধ্যাপক ক্লাসে পড়ালেন সেই স্যারকেই সাহা ইন্সটিটিউটে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে টক দেওয়ার জন্য। বিখ্যাত পদার্থবিদ, সাহা ইনস্টিটিউটের তৎকালীন ডিরেক্টার ডক্টর বিকাশ সিনহা ছাদে নিয়ে গিয়ে স্যারের সাথে আড্ডা মারতে মারতেই বলে উঠলেন সরকার থেকে একটা বড় গ্রান্ট আসছে আমাদের আগামী এই প্রোজেক্টের জন্য বলে প্রোজেক্টের নামটা বললেন। বিকাশ সিনহা এরপর সেই প্রসঙ্গে স্যারের মতামত জানতে চাইলেন। স্যার তাঁর স্বভাবসুলভ একটু মুচকি হেসে বললেন আমি আমার কাজ করি কাগজের পাতায়। সেখানে ইকুয়েশন লিখি, সলভ করি, এরপর সেগুলো ডাকযোগে পাঠাই বিদেশে। খুব বেশি হলে হয়ত শ খানেক টাকার ব্যাপার। আপনাদের এই কোটি কোটি টাকার প্রোজেক্ট কি আমি বুঝব! স্যারের স্বভাবসুলভ রসিকতা। উল্লেখ্য বাঙালি এই পদার্থবিদের গবেষণা নিয়ে তখন কাজ করছেন বেশ কয়েকজন নোবেল লরিয়েট, এবং ভবিষ্যতেও কয়েকজন পদার্থবিদ নোবেল পাবেন তাঁর কাজের ওপর ভিত্তি করেই। 
 
কী নিয়ে কাজ করেছিলেন বাঙালি এই পদার্থবিদ? একটু দেখে নিই। 
    এই যে মহাবিশ্বে আমরা সহ সমস্ত গ্রহ নক্ষত্র ছায়াপথের অবস্থান, এরা আসলে ডুবে রয়েছে এক বিশাল মহাসমুদ্রের মধ্যে। এই মহাসমুদ্রের নাম স্পেস-টাইম। নিউটন যে গ্রহ নক্ষত্র বা যে কোনো দুটি বস্তুর মধ্যে আকর্ষণ বলের কথা বলেছিলেন, আইনস্টাইন নিউটনের সেই তত্ত্বকে কিছুটা পরিমার্জিত করে সেই আকর্ষণ বলকে বলেছিলেন স্পেস-টাইমের বক্রতা। আসলে দুটি বস্তু একে অপরকে আকর্ষণ করে নিউটনের ভাষ্যমতে। এবং এটাই বস্তুর স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। বস্তুর এই প্রবৃত্তি বা আকর্ষণ বলের নাম তিনি দিয়েছিলেন গ্র‍্যাভিটি। আইনস্টাইন বললেন যে না, গ্র‍্যাভিটি কোনো আকর্ষণ বল নয়। যে কোনো বস্তু ডুবে থাকে স্পেস-টাইমের মহাসমুদ্রের মধ্যে এমনভাবে, ঠিক যেমনভাবে রবারের চাদরের মধ্যে কোনো বস্তু ডুবে থাকে। রবারের চাদরটা হচ্ছে স্পেস-টাইম। এবার সেই স্পেস-টাইমের মধ্যে বস্তু ডুবে থাকলেই সেই বস্তু তার চারদিকের রবারের চাদরটাকে যেমন বেকিয়ে চুরিয়ে দেয়, সেরকমই যে কোনো বস্তু তার চারদিকের স্পেস-টাইম বেকিয়ে চুরিয়ে দেয়। এই যে বেকিয়ে চুরিয়ে দেওয়া হল সেই বক্রতার মধ্যে অন্য কোনো বস্তু এসে পড়লে আগের বস্তুর দিকে সে ধেয়ে যাবে যদি আগের বস্তুর থেকে পরের বস্তুটা হাল্কা হয়, অথবা আগের বস্তুটাকে নিজের দিকে টেনে আনবে যদি ভারী হয়। আইনস্টাইন বললেন এটাই গ্র‍্যাভিটি। অর্থাৎ এটা বস্তুর কোনো আকর্ষণ বল নয়। বস্তুর স্পেস-টাইমের বক্রতাটাই হচ্ছে গ্র‍্যাভিটি। 
     বেশ ভালো কথা। মহাজাগতিক যে কোনো স্থানে যদি কোনো বস্তুর উপস্থিতি না থাকে তাহলে সেখানে স্পেস-টাইম থাকবে একদম টানটান হয়ে। অর্থাৎ ফ্ল্যাট স্পেস-টাইম। এই ফ্ল্যাট স্পেস-টাইম এর মধ্যে যদি ধরে নিই যে কোনো দুটি বস্তুকে যারা এই স্পেস-টাইমকে প্রভাবিত করছে না, অর্থাৎ টানটান করে রাখা চাদরের ওপর দুটো চিনির দানাকে যদি ধরে নিই, তাহলে সেই চিনির দানা দুটো নিউটনের তত্ত্ব অনুযায়ী একে অপরকে আকর্ষণ করবে এবং এই আকর্ষণ বলের মান হবে দুজনের ভরের সমানুপাতিক এবং দুরত্বের বর্গের ব্যাস্তানুপাতিক। এমনকি চিনির দানা দুটোকে স্থির অবস্থায় ফেলে রাখলে ওই চাদরেই তারা স্থির অবস্থায় চিরকাল থেকে যাবে এবং বাইরে থেকে যে কোনো একটা চিনির দানাকে কিছুটা এগিয়ে দিলে যদি চাদরের ঘর্ষণ বল ধরে নিই শূন্য তাহলে সেই চিনির দানাটা চিরকাল একই বেগে চলতে থাকবে। নিউটনের প্রথম সূত্র। অর্থাৎ স্পেস-টাইমের প্রভাব না থাকলে নিউটনের সূত্র একদম খাপে খাপ পঞ্চুর বাপ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু যখনই স্পেস-টাইমকে বিবেচনার মধ্যে আনছি তখন আর নিউটনের সূত্র কাজে দিচ্ছে না। তখন যে সূত্র মানতে হবে সেটা ১৯১৫ সালে আইনস্টাইন বের করেছিলেন তাঁর সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সূত্রে। 
    আইনস্টাইনের এই আপেক্ষিকতাবাদের সূত্র আবিষ্কারের পরের বছরই সেই সূত্রের একটা সমাধান বের করলেন সোয়ার্জচাইল্ড যেখানে তিনি এক অদ্ভুত সমস্যার উত্থাপন করলেন। কোনো বস্তুকে চাপ দিয়ে ছোট করতে করতে এমন একটা অবস্থা আসে যে অবস্থায় সেই বস্তু তার চারপাশের স্পেস-টাইমকে এমনভাবে গুটিয়ে ফেলে যে তার ভেতর থেকে কোনো কিছুরই আর বেরিয়ে আসা সম্ভব হয় না। এটাকে যদি রবারের চাদর দিয়ে ভাবি তাহলে কীরকম হবে দেখা যাক। রবারের চাদরের মধ্যে ধরা যাক দশ কেজি ওজনের বেশ বড়সর, মানে একটা ফুটবলের আকারের একটা লোহার বল রেখেছি। সেই বলটা তার আসেপাশের চাদরটাকে দুমরে মুচরে দিয়ে স্পেস-টাইমের বক্রতা সৃষ্টি করেছে। এবার লোহার বলটাকে গলিয়ে ছোট করে একটা ক্রিকেট বলের সাইজ করে ফেললাম। অর্থাৎ দশ কেজি ওজনের একটা ক্রিকেট বল। সেই বলটা তখন চাদরটাকে যে দুমরে মুচরে দেবে এবং নিচে টেনে ধরে রেখে দেবে তার গভীরতা আগের বলের থেকে অনেক বেশি হবে। এবার যদি বলটাকে একটা দশ কেজি ওজনের গুলির সাইজে নিয়ে আসি তাহলে তখন গুলিটা চাদরটাকে এমনভাবে নিচের দিকে টেনে ধরে রাখবে যে ওপর থেকে সেটাকে অনেক গভীর বলে মনে হবে। এবার একটা পিঁপড়েকে ওই চাদরের মধ্যে ফেলে দিলাম। তখন কী দেখা যাবে? দেখা যাবে বলটা যখন ফুটবলের আকারে ছিল, পিঁপড়েটা তখন রবারের চাদরে বলের প্রভাব এড়িয়ে দোমড়ানো মোচড়ানো জায়গা পেরিয়ে টানটান জায়গায় উঠে আসতে পারছে। ক্রিকেট বলের সাইজে যে রবারের চাদরের দোমড়ানো মোচড়ানো অবস্থা, হাঁচড়পাঁচড় করে হলেও উঠে আসতে পারছে, কিন্তু গুলির সাইজের বলটা চাদরের যে অবস্থা করছে, সেখান থেকে পিঁপড়েটা আর টানটান জায়গায় উঠে আসতে পারছে না। এরকমভাবে গুলির সাইজ আরো ছোট করতে করতে বিন্দুসম করে ফেললে তার আসেপাশের রবারের চাদরের বক্রতাকে সেই গুলিটা করে ফেলবে অসীম। 
     ওই গুলির সাইজের বলটা চাদরের যে অবস্থা তৈরি করল সেটাকে নাম দেওয়া হল ট্র‍্যাপড সারফেস। দেখা গেল এই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সূত্র ঠিকঠাক মিলছে না। কোনো বস্তু, আমাদের আলোচ্য ক্ষেত্রে ওই পিঁপড়েকে যদি ধরি, তাহলে পিঁপড়েটা ওই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে পড়লে অবধারিতভাবে সে গুলিটা চাদরটাকে টেনে ধরে যে একদম নিচের দিকে নামিয়ে এনেছে, সেই নিচের দিকে এগিয়ে চলবে। এর প্রভাব থেকে রেহাই পাওয়ার কোনো উপায় নেই। যেহেতু ওই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে স্পেস-টাইমের বক্রতা হয়ে যাচ্ছে অসীম বা আনডিফাইনড, কাজেই সেক্ষেত্রে আইনস্টাইনের সমীকরণ এই ট্র‍্যাপড সারফেসের মধ্যে কাজ করছে না। বোঝাই যাচ্ছে যে এই ট্র‍্যাপড সারফেস বলে যেটা বলছি সেটা একটা ব্ল্যাক হোলকে বোঝাচ্ছে। ব্ল্যাক হোলের মত অভ্যন্তরের জ্যামিতি বা অভ্যন্তরে বস্তুর পরিণতি এটা যখন আইনস্টাইনের সমীকরণ দিয়ে বের করা সম্ভব হল না তখন প্রয়োজন হল আরো সাধারণ একটা সমীকরণের। 
            ১৯৫৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বরে প্রথমবার কলকাতায় প্রকাশিত একটা পেপার যা পরে ফিজিকাল রিভিউ নামের বিজ্ঞান পত্রিকায় ১৯৫৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়; সেই পেপার এই ট্র‍্যাপড সারফেসের অভ্যন্তরে স্পেসটাইমের বক্রতা সংক্রান্ত সমস্যা থেকে বিজ্ঞানীদের মুক্তি দিল। পরবর্তীকালে এই পেপারে যে সূত্র প্রকাশিত হয়েছিল সেই সূত্রকে কাজে লাগিয়ে বিজ্ঞানী রজার পেনরোজ প্রমাণ করলেন কৃষ্ণগহ্বর থাকলে অবধারিতভাবে তার একটা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিন্দুসম স্থান থাকবে যার নাম সিঙ্গুলারিটি বা সিঙ্গুলার পয়েন্ট; যেখানে স্পেস-টাইম কার্ভেচার হবে অসীম।      পেনরোজের এই ধারণা এবং তিরিশের দশকে এডউইন হাবল এর পর্যবেক্ষণের ফলে প্রাপ্ত মহাবিশ্বের প্রসারণের ধারণা, এই দুই ধারণাকে কাজে লাগিয়ে স্টিফেন হকিং কিছু গাণিতিক হিসাব নিকাশের মাধ্যমে মহাবিশ্বের একটা সম্ভাব্য শুরুর সময় বের করে ফেললেন। উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা গেল মহাবিশ্বের শুরুর সেই সময়তেও অবধারিতভাবে একটা সিঙ্গুলারিটি ছিল যে সিঙ্গুলারিটিতেও স্পেসটাইমের বক্রতা ছিল অসীম।
    যে কোনো বড় নক্ষত্রের ভবিষ্যৎ পরিণতি হচ্ছে ব্ল্যাক হোল আর মহাবিশ্বের অতীত শুরু হচ্ছে বিগ ব্যাঙ্গ থেকে এবং এই দুই ক্ষেত্রেই, অর্থাৎ একটা ভবিষ্যতের পরিণতি এবং আরেকটা অতীতের শুরুর সময়ে, দুই ক্ষেত্রেই অবধারিতভাবেই একটা সিঙ্গুলারিটি থাকবে। এই তত্ত্বকে হকিং আর পেনরোজ দুজনের নামে বলা হয় হকিং-পেনরোজ সিঙ্গুলারিটি থিওরেম। 
           হকিং আর আর পেনরোজ এই দুই পৃথিবী বিখ্যাত বিজ্ঞানী তাঁদের সিঙ্গুলারিটির তত্ত্ব আবিষ্কারই করতে পারতেন না ১৯৫৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় প্রথমবার প্রকাশিত ওই পেপারের একটি গাণিতিক সূত্র ছাড়া। গর্বের বিষয় সেই গাণিতিক সূত্রটি প্রণীত হয়েছিল এক কৃতি বঙ্গসন্তান দ্বারা।
    
             মহেন্দ্রলাল সরকার দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্যা কাল্টিভেশন অফ সাইন্স এর অধিকর্তা তখন মেঘনাদ সাহা। প্রতিষ্ঠান কাজ করে মূলত পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানের এর ওপর। নানা যন্ত্রপাতির ক্রমাঙ্কন, পরীক্ষাগারে নানারকম পরীক্ষা নিরীক্ষা এ সবই হচ্ছে তখন প্রতিষ্ঠানের কাজ। এরকম সময়ে কলকাতার সাইন্স কলেজ থেকে অমল নামের একটি ছেলে যুক্ত হল ইনস্টিটিউশনে। ছেলেটির উৎসাহ তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে। মহাবিশ্বের রহস্য তাকে অপার বিস্ময় প্রদান করে। সে যখন মাস্টার্স ডিগ্রি করছে তখন আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতার ওপর কাজ করছেন ফাউলার চন্দ্রশেখর ওপেনহাইমার যাদের নাম আগেই উল্লেখ করা হয়েছে। হোয়াইট ডোয়ার্ফ, নক্ষত্রের পরিণতি, ম্যাজিক স্ফিয়ার বা ডার্ক স্টার (ব্ল্যাক হোল নাম তখনো আসে নি, খুব আদি পর্যায়ে কৃষ্ণগহ্বরের একটা ধারণা যা সোয়ার্জচাইল্ডের তত্ত্ব থেকে এসেছিল, সেরকম একটা ধারণা পোষণ করা হত। হুইলার কৃষ্ণগহ্বর নামকরণের আগে এরকম বস্তুকে এইসব নামেই ডাকা হত) এইসবই তখন তাকে বুঁদ করে রেখেছিল। অথচ কাল্টিভেশনে এসে তাকে ব্যাস্ত থাকতে হচ্ছে পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞানে যা তার একেবারেই না পসন্দ। কাজের জায়গা পছন্দ হচ্ছে না। অথচ ইন্সটিটউশন ছেড়েও সে কিন্তু যেতে পারছে না। তাকে আটকে রাখছে ইনস্টিটিউশনের লাইব্রেরির সম্ভার। প্রচুর প্রচুর বই এর সন্ধান সে পাচ্ছে লাইব্রেরি থেকে যার মধ্যে তার পছন্দের বিষয়ের বইও রয়েছে। ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৯ অব্দি সে থেকে গেল ইনস্টিটিউটে।      ১৯৪৯ এ আশুতোষ কলেজে একটা অস্থায়ী লেকচারের পদে যোগ দিল। এই সময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক নিখিল রঞ্জন সেনের সংস্পর্শে আসে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন জেনারাল রিলেটিভিটি নিয়ে একমাত্র নিখিল রঞ্জন সেনদের গ্রুপ কাজ করছিলেন। কলেজে পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে সে এই অধ্যাপকের সেমিনারগুলোয় উপস্থিত থাকতে শুরু করল।
     ১৯৫১ সালে আবার সে কাল্টিভেশনে ফিরে এলো। এবার স্থায়ী রিসার্চ ফ্যাকাল্টি হিসেবে। ১৯৫৩ সালে কাল্টিভেশনে থাকতে থাকতেই সে তার প্রথম গবেষণা পত্রটি লিখল যা সাধারণ অপেক্ষবাদের অনেকদিনের সমস্যার সমাধানের দ্বার খুলে দেয়। ১৯৫৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর কাল্টিভেশন অফ সাইন্সে গবেষণারত ছেলেটির তিরিশ বছরের জন্মদিনের দিন কাল্টিভেশন অফ সাইন্সেই একদল বরিষ্ট বিজ্ঞানীদের সামনে সে তার পেপারটি পেশ করল। ছেলেটির এই দিনটির কথা খুব ভালোভাবে মনে ছিল যেহেতু সেটা তার জীবনের বিশিষ্ট্য একটা দিন এবং ঘটনাক্রমে সেটা তার জন্মদিনেরই দিন। ইকুয়েশনটা শুধুমাত্র যে স্পেস-টাইমের যে কোনো অবস্থার একটা সাধারণ ইকুয়েশন শুধু তাই নয়, যেখানে যেখানে বস্তু আছে এবং যেখানে শক্তি, ভরবেগ,,চাপ আর shear stress(এর বাংলা পাওয়া গেল না। বিষয়টা অনেকটা একটা বাক্সের দুটো পাশ দু হাত দিয়ে ধরে এক হাত দিয়ে বাক্সটাকে ওপর দিকে চাপলে আরেক হাত দিয়ে বাক্সটাকে নিচের দিকে চাপলে বাক্সটা যেরকম চাপ অনুভব করবে সেরকম চাপ) থাকবে, সেই জায়গাতেই এই ইকুয়েশন কাজ করবে। যেমন সুনামির ক্ষেত্রে যে shear stress থাকে তার কস্টিক পয়েন্ট অর্থাৎ যেখানে সুনামির প্রাবল্য সর্বাধিক, সেই কস্টিং পয়েন্ট বের করা সেটাও এই ইকুয়েশন দিয়ে সম্ভব। 
     কাল্টিভেশনের ওই সিনিয়ার বিজ্ঞানীদের পক্ষে তখনই আন্দাজ করা সম্ভব ছিল না অমল নামের ওই ছেলেটির সূত্রটা কতটা শক্তিশালী! সে যে মহাবিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ রহস্যের সমাধান করে ফেলেছে সেটা কাল্টিভেশনের এক ঘন্টার সেই সেমিনারে উপস্থিত থাকা বিজ্ঞানীদের জানা ছিল না। পরিবর্তে তাকে ইনস্টিটিউট থেকে প্রফেসার প্রিয়দারঞ্জন রায়ের সাথে দেখা করতে বলা হয় এবং প্রিয়দারঞ্জন রায় তাকে বলেন 'অমল, ওইসব রিলেটিভিটি ফিটি ভুলে যাও, তুমি কোয়ান্টাম কেমিস্ট্রি নিয়ে কাজ করো'। প্রফেসার তাকে অনেক বই পত্তরও দেন পড়াশোনা করার জন্য। এমনকি ১৯৫৫'র মাসে যখন ফিজিকাল রিভিউতে প্রকাশিত হয় এই পেপারটি, তখনও আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীমহলে খুব একটা সাড়া জাগায় নি। অবশেষে ১৯৫৫ সালে হামবুর্গে পাস্কাল জর্ডান সেমিনারে সৌভাগ্যবশত পদার্থবিদ রতনলাল ব্রহ্মচারী উপস্থিত ছিলেন। যিনি পরে ব্যাঘ্র বিশেষজ্ঞ হন। রতনলাল ব্রহ্মচারী লক্ষ্য করেন জ্যোতির্পদার্থবিদ অটো হেকমান আর এঙ্গেলবার্ড শুকিঙ্গ 'রায়চৌধুরি ইকুয়েশন' বলে একটা পেপার নিয়ে বেশ আগ্রহের সাথে আলোচনা করছেন। রতনলাল ব্রহ্মচারীর মাধ্যমে অমল কুমার রায়চৌধুরীর কাছে খবর এসে পৌঁছায় যে বিদেশে তার 'ইকুয়েশন' এর খুব আলোচনা চলছে। এর দশ বছর পরে যখন হকিং পেনরোজ সিঙ্গুলারিটি থিওরেম প্রকাশিত হল এই রায়চৌধুরী ইকুয়েশনকে চাবিকাঠি করে ততদিনে অমল কুমার রায়চৌধুরী প্রেসিডেন্সিতে অধ্যাপক হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২০ সালে রজার পেনরোজ ব্ল্যাক হোল গবেষণার জন্য যখন নোবেল প্রাইজ পেলেন, ততদিনে প্রয়াত হয়েছেন একেআর।
            প্রেসিডেন্সির অধ্যাপক অমল কুমার রায়চৌধুরীকে আম বাঙালি স্টিফেন হকিং বা রজার পেনরোজের মত অত ভালোভাবে না চিনলেও প্রেসিডেন্সির যারা পদার্থবিজ্ঞানের ছাত্রছাত্রী, বিশেষত ১৯৬১ থেকে ১৯৮৮ অব্দি, তাঁরা প্রত্যেকেই একেআর নামের সাথে সুপরিচিত। তিনি যে একজন বিখ্যাত গবেষক বা উজ্জ্বল পদার্থবিদ ছিলেন শুধু তাই নয়, শিক্ষক হিসেবেও দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। তাঁর 'রায়চৌধুরী ইকুয়েশন' যদি নাও থাকত, শিক্ষক হিসেবেই তিনি একজন জ্যোতিষ্ক হিসেবে বিরাজমান থাকতেন। তাঁর শিক্ষক জীবনের অসংখ্য গল্পের মধ্যে দুটি খুব বিখ্যাত গল্প তাঁরই ছাত্রদের মুখে শোনা যেখানে বোঝা যায় বিখ্যাত 'একেআর স্যার' হিসেবে তিনি তাঁর ছাত্রদের কীভাবে আগলে রাখতেন। এছাড়াও তাঁর স্বভাবগত রসিকতাও গল্পদুটির মধ্যে দিয়ে ফুটে ওঠে।  
             সাতের দশক। ঘোর নকশাল আমল। প্রেসিডেন্সিতে ক্লাস করাচ্ছেন একেআর। ঠিক সেইসময়ে কয়েকটা ছেলে হইহই করে এসে ক্লাসরুমের বাইরে দাঁড়াল। লক্ষ্য ক্লাসরুমের মধ্যের তাদের বিরোধী ছাত্র ইউনিয়নের একটা ছাত্র। ক্লাস শেষ হলেই তাকে তারা ধরবে এবং উত্তম মধ্যম দেবে। একেআর বুঝে যান সেটা। ক্লাস শেষ হওয়ার পর তিনি বাইরের সেই ছাত্রদের মুখোমুখি দাঁড়ান। জিজ্ঞাসা করেন তোমরা এখানে কেন? ছাত্রদের মধ্যে যে একটু নেতা গোছের, সে বলে স্যার আমরা অমুকের সাথে একটু দেখা করব। ইতিমধ্যে সেই অমুক ছাত্রটি ক্লাসরুমের ভেতর দিয়ে টিচার্স রুমে ঢুকে সেখান দিয়ে বেরিয়ে গেছে। প্রেসিডেন্সির ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের ভূগোলটা যারা জানেন তারা এই ব্যাপারটা বুঝতে পারবেন। ক্লাস রুমের ভেতর দিয়েই টিচার্স রুমে আসা যাওয়া করা যেত। 
     নেতা গোছের ছাত্রটির কথা শুনে একেআর বললেন 'কিন্তু আমি যতদূর জানি সে তো তোমাদের সাথে দেখা করতে চায় না'।
    'না স্যার, ওর সাথে আমাদের দেখা করতেই হবে' ছাত্ররাও নাছোরবান্দা। 
   স্যার বললেন 'তোমাদের কথা শুনে বোঝা যাচ্ছে তোমরা ছেলেটিকে পছন্দ করো না। আর ছেলেটিও আমি জানি তোমাদের পছন্দ করে না। তো তোমারা কেউই যখন কাউকে পছন্দ করো না তখন সব থেকে ভালো সমাধান হচ্ছে তোমরা কেউই কারো সাথে দেখা করো না'।
    ছাত্র নেতার ছাত্রদের বক্তব্য 'স্যার আপনি বুঝতে পারছেন না, ও আমাদের ইউনিয়নে ছিল, ভুল করে অন্য ইউনিয়নে চলে গেছে। ছেলে যখন ভুল করে তখন অভিভাবক হিসেবে বাবাই তো তাকে বোঝাবে! আমরা ওকে বোঝাতে এসেছি'। 
    স্যার বললেন, 'ও তুমি ওর বাবা! আচ্ছা। আমি আসলে বুঝতে পারি নি তোমাকে দেখে'। 
   ছাত্ররা এরপর আর স্যারের সামনে কোনো প্রতিযুক্তি খাঁড়া করতে না পেরে রণে ভঙ্গ দেয়।
   ওই সাতের দশকেরই ঘটনা। প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন কুড়ি দফা কর্মসূচী। তাঁর দলের ছাত্র ইউনিয়ন থেকে ছাত্রদের জন্য একটা প্রশ্নপত্র তৈরি করা হয়েছে। সেই প্রশ্নের মধ্যে একখানা প্রশ্ন রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কুড়ি দফা কর্মসূচী সম্পর্কে তোমার কী মত। সেই প্রশ্নের উত্তরে একজন ছাত্র লিখেছে 'পুরো ধাপ্পা'। ছাত্র ইউনিয়ন তো সেই উত্তর দেখে রেগেই অগ্নিশর্মা! কোনোরকমভাবে একেআর উক্ত ছাত্র আর ছাত্র ইউনিয়নের মধ্যে জড়িয়ে পড়েন। ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা স্যারকে বলে, 'স্যার দেখুন, প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচীকে কীভাবে লিখেছে! আপনি বলুন স্যার এভাবে লেখা কি ঠিক হয়েছে?' 
   স্যারের জবাব 'ছোটর মধ্যে গুছিয়ে ভালোই তো লিখেছে!' স্যারের কথার ওপরে আর কথা চলে না। সে যাত্রায় উক্ত ছাত্রটি ছাত্র ইউনিয়নের হাত থেকে স্যারের জন্য বেঁচে গেল।

     এই ছিলেন একেআর। খুব কম শিক্ষকই হয়ত এভাবে ছাত্রদের আগলে রাখে। দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা একেআর স্যারের প্রচুর প্রতিষ্ঠিত ছাত্র এখনো একেআর বলতে অজ্ঞান। বাঙালির অনেক আক্ষেপের মধ্যেই আরো বড় এক আক্ষেপ যোগ হতে পারে হাতেগোণা কয়েকটা ইনস্টিটউশন ছাড়া বিখ্যাত এই অধ্যাপকের জন্মশতবর্ষ সম্পর্কে আর কেউ অভিহিতই হল না। আজ থেকে ঠিক একশ বছর আগে ১৯২৩ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বর যে মহীরুহের জন্ম হয়েছিল, তাঁর জন্ম বাঙালির অনায়াসেই গর্বে বুক ফুলে ওঠার কথা।

(পরের গল্প দুটি কাল্টিভেশন অফ সাইন্সে একেআর এর জন্মশতবর্ষ উদযাপনের অনুষ্ঠানে প্রফেসার পলাশ বরণ পালের মুখে শোনা। দ্বিতীয় ছবিতে কাল্টিভেশনেরই ওই অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্সির বর্তমান ফিজিক্স এর হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট প্রফেসার অরুনাভ চক্রবর্তীর প্রাক্তন হেড অফ দ্যা ডিপার্টমেন্ট প্রফেসার একেআরের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন।)

রবিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

শায়নাদের স্বপ্ন ~ দিপসিতা ধর

এই যে এক চিলতে ঘর দেখছেন, এ আমার লন্ডন এর দুদিনের ঠিকানা। মেয়েটির নাম ধরে নিন শায়না, কেরালার পালাক্কাদ এর মেয়ে। বাবা মুটে মজুরী করেন, মা ও। একটা ভাই একটা বোন, ছোটো। এক বছর আগে ব্রুনেল ইউনিভার্সিটি তে Data Science পড়তে এসেছিলো কেরালা সরকারের স্কলারশিপ এ। স্কলারশিপ এ কোর্স ফি হয়ে যায়, কিন্তু থাকা খাওয়া? সপ্তাহে ৩ দিন Mcdonalds এ কাজ করে ও, ৬ ঘন্টা ৩ দিন। সপ্তাহে ১৮ ঘন্টার বেশি কাজের অনুমতি নেই ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস দের। তাতে থাকা খাওয়া চলে যায়, চলে যাওয়ার মতোই। এই দু তলার ১০x১০ ঘরের মাসিক ভাড়া ৬০০ পাউন্ড, ভারতীয় মুদ্রায় ৬০,০০০ টাকা। ফ্যান নেই, ফ্যান এর টাকা আলাদা, এই মুহূর্তে ফ্যান কেনার টাকা নেই শায়নার, তাই ৩০-৩১° সেলসিয়াসে কখনো ভেজা তোয়ালে, কখনো ভেজা জামা সম্বল। যদিও এসব ভাবার সময় নেই ওর, সামনেই dissertation, তারপরে একটা চাকরি, শাটোর্ধ মা কে আর মাল বইতে দেবে না শায়না।

শায়না একা নয় গোটা লন্ডন জুড়ে কয়েক লক্ষ ভারতীয় ও দক্ষিণ এশিয়ার ওয়ার্কিং স্টুডেন্টস দের দেখা মিলবে। কেউ ফাস্ট ফুড সেন্টার, ডেলিভারি ওয়ার্কার, ভালো জীবন এর লড়াই ক্লান্তিহীন দৌড়। গত বছরই SFI United Kingdom সার্ভে করেছ, উঠে এসেছে এমন নানা তথ্য। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এর MP দের কাছে রুম রেন্ট কন্ট্রোল এর আবেদন ও করেছে ওরা।

শায়না গল্প করছিলো, ফ্লাইট এ টিকিট কাটার পয়সা ছিলো না ওর, বন্ধুরা ধার করে ভিসা, কোর্স এর ডাউন পেমেন্ট দিয়েছিলো, কিন্তু টিকিট হবে কি করে? SFI UK এর বিশাল দায়িত্ব নিলো, এখানকার কমরেড দের সাথে নিয়ে চাঁদা করে টিকিট কাটা হোলো শায়নার। স্বপ্ন উড়ান।

আপাতত শায়না দের স্বপ্ন বাঁচানোর লড়াই এ অনেকটা পথ হাঁটা বাকি, লড়াই বাকি অনেকটা।

বুধবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৩

নিরীহাসুরের খিক্স ~ ডাঃ সব্যসাচী সেনগুপ্ত

ইমারজেন্সি নাইট ডিউটি চলছিল সেদিন। রাত পৌনে বারোটা-র মতো বাজে। হুড়মুড় করে পেশেন্টের পর পেশেন্ট আসার আর বিরাম নেই। এসেই যাচ্ছে তো এ-সে-ই যাচ্ছে। নাগাড়ে। কাতরাতে কাতরাতে। ঝাঁপাতে লাফাতে। এবং...অতি অবশ্যই–খিস্তাতে খিস্তাতে! হুঁ হুঁ বাওয়া, যে সে দিন তো আর নয়! 'অমৃৎ মহোৎসব'-ওয়ালা স্বাধীনতা দিবস বলে কথা। বন্যার স্রোতের মতো রোগী যে আসবেই, এ কথা তো জানাই ছিল আগেভাগেই। 
                         অন্তত পঞ্চাশ জনকে ভর্তি করে ফেলেছি এলরেডি। মদ খেয়ে হুড়ুম বাইক চালিয়ে স্বাধীনতা উদযাপন করতে গিয়েছিল বেটা-বিটিরা। ওই সেই তারাই এসে যাচ্ছে। নাগাড়ে। কারো খুলি ফেটে দুই ভাগ, কেউ লেংচে, কারোর ডান হাতখানি আবার ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়ে লটপট করছে পতাকার মতোই। নারী পুরুষের বিভেদ নেই। 
        হ্যাঁ, স্বাধীন আমরা হতে পেরেছি বটে– এ কথা বোঝা যাচ্ছিল বেশ রকম। আর... তারই মাঝে, ওই যে বললাম, রাত তখন পৌনে বারোটা মতো হবে, উর্ধস্বসে উর্ধ্বশ্বাসে রোগী দেখে চলেছি আমি। 

এক্ষণে, আপাতত,  আমার সামনে চারটে ট্রলি পরপর দাঁড়িয়ে। একটিকে পরীক্ষা করছি পেট টিপে টুপে। সম্ভবত গল ব্লাডারে পাথর হয়েছে তার। বিশেষ স্থানে একটু চাপ দিতেই হাউ মাউ করে চিল্লাছে বিকট। পিছনের অপেক্ষমান ট্রলিগুলির একটিতে হাঁফানি, বাকি দুইখানি বাইক দুর্ঘটনা ঘ্রিয়াওঁ। বাতাসে বাতাসে তখন আমার ম ম করছে মদের গন্ধ ফুরফুরিয়ে। 

এমত সসেমিরা অবস্থায় হঠাৎ খেয়াল হলো, কাঁধে টুকটুক করে টোকা মারছে কেউ একজন। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই – টলটলায়মান এক ছোকরা। আঙুল উঁচিয়ে কি যেন একটা বলার চেষ্টা করছে চোখ মুখ কুঁচকে। বাম কানের স্টেথোর ইয়ার পিস সরিয়ে ঠাহর করলাম সেকেন্ড খানিক।টলটলায়মান যুবকটির বক্তব্য। শোনার পরেও, বুঝতে সময় লাগলো আরো সেকেন্ড খানিক। ছেলেটি যা বলছে স্খলিত ভাষ্যে, তার অর্থ হলো– "দশ সেকেন্ড"। 
হ্যাঁ ওই একটি কথাই সে বলে যাচ্ছে নাগাড়ে–, দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড। 

খানিকটা ভ্যাবলার মতোই জিজ্ঞেস করে ফেলেছিলাম তাই –" কী হয়েছে ভাই? কী দশ সেকেন্ড?" 
ফলাফল হলো ভয়াবহ। নিজের বাম হাতের তর্জনীটি দেখিয়ে বললো যুবক–" দেখতে পাচ্ছিস, পা-চ্ছি-স? হারামি?"

খিস্তি আমরা, স্বাস্থ্যকর্মীরা অনেক শুনেছি। সেসব কথা এখন বলতে গেলে রাত কাবার হয়ে যাবে বেমালুম। তবুও, জীবনের প্রথম খিস্তি শোনার গল্পটা নাহয় বলেই যাই খানিক।

এ ঘটনা বছর বিশেক আগেকার। ইন্টার্নশিপ চলছে তখন আমার। বিদেশ ফেরত এক প্রফেসর পড়াতে এলেন আমাদের সার্জারি ওয়ার্ডে। সকালের রাউন্ড চলছে, আর স্যারের পিছু পিছু ঘুরছি আমরা। গন্ডগোলটা বাঁধলো এক্কেবারে শুরুয়াতি পেসেন্টেই। রোগীটি গতরাতেই ভর্তি হয়েছে। আঘাত পেয়ে, রক্ত জমেছে মস্তিষ্কে। ফ্রন্টাল লোব। আর তাই, হাত পা তার বেঁধে রাখা হয়েছে দড়ি দিয়ে। 
যখন পৌঁছেছি সদলবলে আমরা রাউন্ড দিতে, রোগী তখন সেই বাঁধা হাতই টেনেটুনে চোখের উপর রেখে ঘুমাচ্ছে বিন্দাস। সিনিয়র পি.জি.টি ( পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেইনি), অভ্যাস মাফিক বলতে গেলো তড়বড়িয়ে–" স্যার, ইটস আ কেস অফ ফ্রন্টাল লোব হেমাটোমা। একটু সামলে হ্যান্ডেল করতে হবে। হ্যাঁ... এই...এই যে ভাই... তাকাও তো...।" 
                      বিলেত ফেরত স্যার ক্ষেপে গেলেন দুম করে– " হোয়াট ননসেন্স ইজ গোয়িং অন! হাত বেঁধে রেখেছো? হোয়াট এবাউট হিউম্যান রাইটস! ছিঃ! আর তোমরা কি পেশেন্ট এক্সামিনেসন প্রশিজিওর টুকুও ভুলে গেছো ভাই? ইউ হ্যাভ টু গ্রিট দা পেশেন্ট ফার্স্ট। লেট মি ডেমনস্ট্রেট। দ্যাখো, কি ভাবে করতে হয় এসব।"  
              এই ব'লে ট'লে, ভদ্রলোক টাই গুছিয়ে পেসেন্টের কানের পাশে গেলেন ধীরে ধীরে। তারপর রোগীর চোখে ঢাকা কনুইটি ধরে, তুমুল ভালোবাসা ঝরিয়ে বললেন– " হেক্সকিউজ মি স্যার, ক্ষমা করবেন । মাই সেলফ...আমি... আপনার ডক্টর। একটু দেখব আপনাকে। আপনার হাতটা সরাতে হচ্ছে আমাকে, ক্ষমা করবেন। পিউপিল এক্সামিন করব। স্যার... শুনছেন... স্যার...এলাউ মি প্লিজ।" 
                      উত্তরে, পেশেন্টটি এক ঝটকায় হাত সরিয়ে বলেছিল– "এই কোন খানকির বাচ্চা ঘুম ভাঙালি রে গাঁড়মারানি?"
                      স্যার, সভয়ে ছিটকে গিয়েছিলেন। আমরা ফ্যাকফ্যাক করে হেসেছিলাম। আর পি জি টি বলেছিল– "স্যার বললাম না? ফ্রন্টাল লোব? ফ্রন্টাল লোব ড্যামেজ হলে তো হিতাহিত জ্ঞান থাকে না স্যার। "
                     

 তো ওই। ওই শুরু আমার খিস্তি শোনার। কখনো রোগের উপসর্গের কারণে। কখনো আবার দাদা কিংবা দিদির আশীর্বাদ ধন্য বলে। মোটমাট কথা এই যে, বাবা এবং মা ধর্মী খিস্তি, আমাদের রোজকার বরাদ্দ। অবাক হই না তাই আর। ফলত,  সেদিন ইমারজেন্সিতে টলটলায়মানের মুখে 
"হারামি" শুনেও তাই ঘাবড়ে যাইনি এতটুকুও। বরং একটু  অবাক হয়েই দেখেছিলাম, ছেলেটির বাম তর্জনীতে এট্টুসখানিক খেটে গেছে। আর তাই নিয়েই সে তড়পে যাচ্ছে–" দশ সেকেন্ড। দশ সেকেন্ডের মধ্যে মাই টিটমেন্ট না হলে,মাডার করে দেব তোকে বাঁড়া।" 

নিজের কষ্টটা সব্বার কাছেই সবচাইতে বেশি 'কষ্ট', একথা যদিও অনস্বীকার্য। ঠিক তেমনই এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন, চিকিৎসার ক্ষেত্রে 'ট্রায়াজ' নামক একটি বিষয় আমাদের পড়তে হয়েছে পাঠ্যক্রমে। যে ' ট্রায়াজ'-এর মোদ্দা কথা হলো– যদি জরুরি বিভাগে তোমার সামনে একসাথে একাধিক রোগী এসে উপস্থিত হয়, তবে সব্বার আগে তাকেই দেখবে, যার অবস্থা সবচাইতে সঙ্গীন।

ট্রায়াজ বোঝাবো, এমন স্বাধীনতা আমরা ছিল না। ছেলেটি ততক্ষণে কলারে হাত দিয়েছে,– " দশ সেকেন্ড, দশ সেকেন্ড বাঞ্চত...দশ সেকেন্ড দিলাম তোকে। "

হিসাব মাফিক এ সময়ে সিকিউরিটি অথবা পুলিশের কথাই মনে আসা উচিত প্রথমে। কিন্তু... আসে না। আমাদের। আমাদের মানে, আমরা যারা সরকারি স্বাস্থ্যকর্মী, তাদের। পুলিশ বা হোমগার্ড যদিও একজন থাকেন বটে। তবে তাঁদের উপর অলক্ষ্যে নির্দেশ থাকে– ঝামেলা করতে যাবেন না। যা হচ্ছে হতে দিন। 
বিডিওর রুমের বাইরে দণ্ডায়মান সান্ত্রী কিংবা ব্যাংকের ম্যানেজারের কেবিনের বাইরের নিরাপত্তা যতখানি, যে সবখানে স্রেফ প্রবেশ করতে হলেও রক্তচক্ষু দেখতে হবে তুমুল, তার দশ ভাগের এক ভাগও পাওয়া যাবে না সরকারি হাসপাতালে হুলিগ্যান তান্ডব চললেও। অথচ, পদাধিকার বলে, উপরিউক্ত আমরা সক্কলেই  'গ্রূপ A' অফিসার। অথচ, সবটাই সরকারি পরিকাঠামোর অফিস। 

যাক গে যাক। যাক সে কথা। তর্ক করব না। সে রুচিও নেই।  মোটমাট বিষয় এই যে, পুলিশের ভারী বয়ে গেছে আমাকে কলার ধরে কেউ 'বাঞ্চত' বললে। এ তো আমাদের, স্বাস্থ্যকর্মীদের জানা কথাই। আর তাই আমাদের ইন্ডিজেনাস পদ্ধতিতে ভরসা করতে হয় সর্বদা। অধুনা যার নাম- জুগাড়। 
          এবং সেই 'জুগাড়'ই করলাম। খুব শান্ত ভাবে বললাম–" ইউ টক ইংলিশ? ওকে! আই টক ইংলিশ টু। ওয়ান থেকে দশ কাউন্ট করুন তো স্যার। যদি তার মধ্যে আপনাকে না দেখি, দেন লাথ মারুন আমাকে। ফাক মি।  কই! কী হলো? শুরু করুন, কাউন্ট। ওয়ান টু...। করুন। করুন।"

                ব্যাস! তারপর আর কি! আমি ট্রলিতে শায়িত ওই চারজনকে তো দেখলামই। তারপরেও আরো জনা চার পাঁচ জনকে দেখে ফেললাম বিন্দাস। এবং শেষমেশ ফাঁকা হলাম যখন, তখন ছোকরার সামনে এসে বললাম এক গাল হেসে–
" দেখলেন তো? দাদা? দশ সেকেন্ডও লাগলো না?"
ছোকরা তখনও পাখি পড়ার মতো বলে যাচ্ছে– 
" পাঁ-চ! পাঁচ। বাঁড়া পাঁচের পর কী? এই সঞ্জয়? বোকচোদ? পাঁচের পর কী বাঁড়া?...ফাইভ...
সি– হিক্স। হিক্স।"

যাওয়ার আগে রীতিমত আমার পা ছুঁয়ে গিয়েছিল ব্যাটা। বলেছিল–" দশ সেকেন্ডও লাগলো না বস তোমার। তুমি...শুওয়ের বাচ্চা গড বাঁড়া। ভগবান। হিক্স। "

এবং আরো একবার বেঁচে বর্তে বাড়ি ফিরে এসেছিলাম আমি। খিক্স।

শনিবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৩

ভানু বন্দ্যোাধ্যায় ~ কৌশিক মজুমদার

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটে দোষ ছিল। 

তিনি নিজেই বলেছেন সাংবাদিক রবি বসুর কাছে। এক, তিনি টাকা ধার দিয়ে ফেরত চাইতে পারতেন না। দুই, নিজের জন্য কিছু চাইতে পারতেন না। আর তিন, সেটাই সবচেয়ে ঝামেলার, তিনি কারও অন্যায় কথাবার্তা সহ্য করতে পারতেন না। আর এই শেষেরটার জন্য কত মানুষের অপ্রিয় হয়েছেন কতবার। 

সেই সেবার এক ইন্টালেকচুয়াল স্টার থিয়েটারে বসে একমনে মহাশ্বেতা দেবীর কুৎসা গাইতে ব্যস্ত। কেন তিনি বিজন ভট্টাচার্য্যকে ছেড়ে অজিত গুপ্তকে বিয়ে করলেন তা নিয়ে রসিয়ে চারটি গপ্পো করছিলেন। বোঝেন নি ভিতরেই ভানুবাবু আছেন। আচমকা বাইরে এসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন "আচ্ছা মশাই আপ্নের পিতৃদেব এই বৎসর কত বিঘা জমিতে ধান চাষ দিছেন?"
ভদ্রলোক অবাক। "আমার বাবা ধান চাষ করবেন কেন? তিনি তো দেহ রেখেছেন অনেকদিন হল"
"বেশ। তবে বাঁইচা গেছেন। জীবিত থাকলে জিগাইতাম মহাশ্বেতা দেবী আপনের কয় বিঘা জমির পাকা ধানে মই দিসে যে আপনের ইন্টালেকচুয়াল পুত্তুর তারে লইয়া প্যাচাল পাড়তাসে? জন্মের সময় এমন পোলারে নুন দিয়ে মাইরা ফেলেন নাই ক্যান?" 

আবার এই ভানুই যখন জানতে পারেন এইচ এম ভি নতুন কমেডিয়ান সুশীল চক্রবর্তীকে ভাগিয়ে দিয়েছে, বলেছে ভানু ছাড়া কারও রেকর্ড করবে না, তখন তিনিই ফোন করে শর্ত রাখেন "সুশীলের রেকর্ড করলেই আমি রেকর্ড করুম। নয়তো গুডবাই"। এইচ এম ভি মেনে নিতে বাধ্য হয় তার কথা। 

আমরা দুর্ভাগা এখনও আশিতে আসিও না, মাসিমা মালপোয়া খামু, ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট কিংবা ওরা থাকে ওধারে-র "অরে আর ঢুকতেই দিমু না" কিংবা কমেডি স্কিটে ইনি আর গীতা দে-র সেই সব অসামান্য নাটকের বাইরেও যে এক সিরিয়াস ভানু আছে, তা আমরা মানতে নারাজ। কমেডিয়ানদের সমস্যা হয়তো এটাই। কেউ মানতেই চায় না কমেদি ইজ এ সিরিয়াস বিজনেস। সেই সৌমিত্রবাবুর গল্পটা মনে পড়ে। তখন আর্টিস্ট ফোরাম আর শিল্পী সংসদ নিয়ে চরম দোলাচল। ভানু এসেছেন সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আলোচনায়। গাড়িতে বসে কথা হচ্ছে। এমনসময় প্রায় ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে এক ফাজিল জিজ্ঞেস করলে "কেমন আছেন ভানুবাবু?"। ভানু একটু বিরক্ত। বললেন "আগে যেমন ছিলাম" বলে আবার আলোচনা শুরু করলেন। 
সে থামবার পাত্র নয় । রস করে বললে "আগে কেমন ছিলেন সেটাও ত জানি না"
ভানু এবার চার অক্ষরের এক গালি দিয়ে বললেন "সেটা যদি নাই জানো, এখন কেমন আছি জাইন্যা কি করবা?"  

মাত্র ১২ বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন ভানু। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে গুরু মানতেন৷ তাঁদের কাছেই সংগ্রামের প্রথম পাঠ । এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় রিভলভার পাচারও করেছেন বহুবার। সত্যেন বসুর প্রিয় এই মানুষটি তরুনকুমারকে একবার দেখা করাতে নিয়ে গেছিলেন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সে গল্প কে না জানে? অবশ্য তাঁর কাছে তিনি ভানু নন। সাম্যময়। বাংলা সিনেমায় বাঙাল বা পুব বঙ্গের কমেডিকে প্রায় একার কাঁধে বয়েছেন এককালে। ঠিক যেমন এই ছবিতে নায়িকা রুমাকে বইছেন।  

আজ তাঁর জন্মদিন। প্রণাম রইল।

শুক্রবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৩

যাদবপুরের গল্প ~ কৌশিক মজুমদার

লোয়ার সার্কুলার রোডে কলকাতার সবচেয়ে ধনী পার্সি সদাগর রুস্তমজী কাওয়াসজী বানাজী এক বিরাট বাগান বানিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকার মত বাড়ি। গৃহ প্রবেশের দিন বল নাচ, বাই নাচ হয়েছিল। এসেছিলেন স্বয়ং বড়লাট লর্ড অকল্যান্ড। এই বাগানবাড়িতেই ১৮৫২ সালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে মানেকজী রুস্তমজী এই বাড়ি থেকেই ব্যবসা চালাতেন। ১৮৭৪ সালে তাঁকে কলকাতার শেরিফ করা হল। তিনিও এই বাড়ি, এই বাগান ছেড়ে উঠে এলেন সাহেবপাড়ায়। সেই বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে হিন্দুমেলার আয়োজন শুরু হল। ১৮৭৬ সালে পটলডাঙ্গার বসুমল্লিক পরিবারের দীননাথ এই বাগান কিনে নেন। কিন্তু আগের মালিকের নাম অনুসারে পার্সিবাগান নামটুকু রয়ে যায়। আর আশেপাশের এলাকা মানেকজির নামে মানিকতলা নামে ডাকা হত। 

বসুমল্লিকরা এই বাগান ধরে রাখতে পারেন নি। তাঁর দুই ছেলে নগেন্দ্র আর যোগেন্দ্র মিলে এই বাগান যখন কালীকৃষ্ণ ঠাকুরকে বিক্রি করেন তখনই এর মৃতপ্রায় দশা। ১৮৯৮ সালেই ইন্দিরা দেবীর প্রমথ চৌধুরীকে লেখা চিঠিতে লেখেন-

কাল ওঁরা একদল... একটা কি প্রকাণ্ড বাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন – পার্সিবাগান - নামটা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি, কিন্তু কখনো দেখিনি। শুনলুম খুব জাঁকালো মস্ত ব্যাপার, যদিও অযত্নে পড়ে আছে ঘরের অবধি নেই, সর্বত্র মার্বেল পাথর বসানো, কেতাদুরক্ত বাগান, ফোয়ারা, ফুলের গাছ ইত্যাদি যেমন বাদশাহী কাণ্ড হতে হয়।
ধীরে ধীরে এই বাগান নষ্ট হয়ে বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যায়। প্রায় দশ বারো বছর এর নাম কেউ শুনল না। 

আচমকা ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার দিন আদর্শের বিরোধে তারকনাথ পালিত মশাই কারিগরী শিক্ষার জন্য এক আলাদা সংস্থার প্রস্তাব দিলেন। ভোটাভুটি হল। তিনি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে আলাদা বেঙ্গল টেকনিক্যাল স্কুল খুলবেন বলে ঠিক করলেন। করলেন তো বটে, কিন্তু খুলবেন কোথায়? সেই কাজেই ৩০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে পার্সিবাগানের পড়ে থাকা বাগানবাড়ি ভাড়া করা হল। ১৯১২ সালের শেষের দিকে এটি পঞ্চবটি ভিলায় চলে গেলে আশুতোষ মুখুজ্জের সহায়তায় পার্সিবাগানের জমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় সায়েন্স কলেজ। 

আর সেই টেকনিক্যাল স্কুলের কি হল? ১৯২৪ সালে সেটি স্থানান্তরিত হল যাদবপুরে। এই যাদবপুর আবার সোনারপুরের জমিদার যাদবচন্দ্র সরকারের নামে।

কিন্তু যাদবপুরেই কেন? আসলে আধার প্রস্তুত ছিল আগেই। ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে ডঃ মহেন্দ্রলাল সরকার এখানেই  প্রতিষ্ঠা করেন  Indian Association For The Cultivation Of Science , ১৯০৬ তে রাজা সুবোধ চন্দ্র মল্লিক , ব্রজেন্দ্র কিশোর রায়চৌধুরী ও অন্যান্যদের বদান্যতায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করা হয় । যে যাই হোক, নতুন কলেজের নাম হল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলোজি। স্বাধীনতার পরে  সেটাই আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

সঙ্গে রইল সরকারী আদেশনামার প্রথম পাতা।

মঙ্গলবার, ২২ আগস্ট, ২০২৩

প্রসঙ্গ CCTV ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত


এ নিয়ে হাজার একটা কথার ফুলঝুরি হয়ে যাওয়ার পরেও দুটো লাইন লিখতে ইচ্ছে হল। কারণ একটাই। বহুবার দেখেছি যে নাকের ডগায় বুম আর মুখে তাগ করে জুম এই অবস্থায় দুম করে বলে দেওয়া কথাবার্তার ওপরে দাড়িয়েই আজকাল জনমত তৈরি এর চেষ্টা চলছে এবং সেটা সফলও হচ্ছে। চিন্তা নেই, ভাবনা নেই, ওসব অবকাশ নেই, দু মিনিট ইনস্ট্যান্ট ম্যাগীর মতো ইনস্ট্যান্ট সব সমাধান চলে আসছে আমাদের সামনে আর আমরাও অগ্র পশ্চাৎ বিবেচনা না করেই সেগুলো টপাটপ গিলে ফেলেছি। অথচ একটু তলিয়ে ভাবলে আমরা কি দেখতে পাবো ?
যে সব কলেজ বা বিশ্ব বিদ্যালয় তে যথেষ্ট সংখ্যক সিসিটিভি আছে সেগুলোর সব কটা তে ragging বন্ধ হয়ে গেছে ? উত্তরটা হল, না বন্ধ হয় নি। যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলিতে ragging বন্ধ হয়ে গেছে সেগুলির সবকটিতে সিসিটিভি বসানো আছে। এর ও উত্তর হল না, বসানো নেই। Ragging বন্ধে সিসিটিভি এর অনস্বীকার্য কোনো ভূমিকা তাই আদৌ প্রতিষ্ঠিত নয়। এবার যারা প্রবল ভাবে চাইছেন যে সিসিটিভি দিয়ে যাদবপুর মুড়ে ফেলা হোক, প্রতিটি কোনায়, প্রতিটি ইঞ্চিতে তাদের দাবির যথার্থতা মেনে নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। আচ্ছা, সিসিটিভি বসালে ঠিক কি সুবিধে হবে ragging আটকানোর ? আজ্ঞে না, এটা বোকার মতো প্রশ্ন নয়, সত্যি করেই বলুন না কি কি সুবিধে হবে। অনেকেই বলবেন, কেন, এতে ওই দুষ্কৃতি ধরা পড়বে, দেখতে পাওয়া যাবে কে বা কারা ওই অপকর্ম করছে, মানুষের চোখ কে ফাঁকি দেয়া যায়, ক্যামেরার চোখ কে নয়। ঠিকই তো। এই বার আসছে দ্বিতীয় প্রশ্ন।
যারা নজরদারি চালাবেন সেই কর্তপক্ষের চোখে ধরুন ধরে নিলাম যে ওই অপকর্মের খল নায়ক এরা ধরা পড়লো (যদিও তার সম্ভাবনা খুবই কম কারণ ওই অপকর্মের বেশিরভাগ টাই হয় হোস্টেলে বন্ধ দরজার আড়ালে যেখানে সিসিটিভি এর চোখ নেই)। তারপর ? আপনি আমি কি শিওর যে তারপরে কর্তৃপক্ষ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে ? আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কি বলে ?
যে কিশোর ছাত্রটি মারা গেল, তার হোস্টেলে একজন সুপার ছিলেন, মনে পড়ে ? হোক সামান্য বেতনভুক কর্মচারী, ছিলেন তো একজন। তাঁর অভিজ্ঞতা কি ? তিনি খোলাখুলি স্বীকার করছেন j তিনি হোস্টেলের বারান্দা ঘর কোনো কিছুতেই টহল দিতেন না, নজরদারি চালাতেন না, বলা ভালো, পারতেন না ভয়ের চোটে। হোস্টেলের গেটে সিকিউরিটি কর্মীরা মোতায়েন ছিলেন। হতে পারে তারা আরো সামান্য বেতনের নগন্য কর্মচারী, তবুও ছিলেন তো। তাদের সামনে দিয়ে বহিরাগত দের অবাধ আনাগোনা, নিষিদ্ধ মাদকের চালান, কোনো কিছুই বাদ যায় নি। তারা আটকানোর চেষ্টাই করেন নি, বা পারেন নি, ভয়ের চোটে।
দিনের শেষে মোদ্দা কথা এটাই দাড়ায় যে অনৈতিক, অসামাজিক এবং অপরাধমূলক কাজকর্ম বন্ধ করতে সিসিটিভি কোনো জাদুমন্ত্র হতে পারে না যেমনটা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে। প্রযুক্তির ব্যবহার বা অব্যবহার বা অপব্যবহার নয়, শেষ কথা বলে কর্তৃপক্ষের, প্রশাসকের সদিচ্ছা, আন্তরিকতা, এবং সাহস। কোন কর্তৃপক্ষের, কোন প্রশাসকের, এবং তাদের মূল পৃষ্ঠপোষক দেশের কোন শাসক দলের মধ্যে আমি আপনি সেই সদিচ্ছা, সেই আন্তরিকতা সেই সাহস দেখেছি ? ঘটনার নৈতিক দায় নিয়ে ওই দ্বায়িত্বে থাকা মানুষজনের একজনও পদত্যাগ করেছেন ?
রাজনীতির ঘোলা জলে মাছ ধরতে যাওয়ার নামে, লাশের রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে যাদবপুরের মাটিতে নিজেদের দলের একটু জমি শক্ত করার কুৎসিত প্রতিযোগিতা ছাড়া তাদের কাছ থেকে আমরা কি উপহার পেয়েছি ? একটি কিশোরের অকাল মৃত্যুতে ব্যথিত, বিচলিত, ক্রুদ্ধ জনতা যাতে এই অস্বস্তিকর প্রশ্ন না তুলতে পারে তার জন্যই তার মুখে ওই সিসিটিভি এর ললিপপ গুঁজে দেয়ার এত তোড়জোড়। প্রশ্ন করিস না বাপ। সিসিটিভি চুষে খা। খা সিসিটিভি।

বৃহস্পতিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৩

সত্যি ভূতের গল্প ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত



একটা ভূত তখন তারক জিডিএ এর সঙ্গে থাকে। প্রাইমারি হেল্থ সেন্টারের পুকুর পাড়ের পেছল পথ ধরে তারক যখন বর্ষার রাতে ডাক্তারবাবুর কোয়ার্টার থেকে একহাতে ছাতা আর অন্য হাতে কলবুক নিয়ে ডাকতে যায় ভূতটা তখন সঙ্গে থাকে। তারকের পাশে পাশে হাঁটে। আশেপাশের ঘাস জঙ্গলের বনে, ভেঙে পড়া পাম্প হাউসের ইটের পাঁজায় বসে থাকা দাঁড়াশ আর কালাচগুলোকে ভূতটা আঙ্গুল তুলে শাসানি দেয়। খবরদার তারকের কাছে আসিস না।

আরেকটা ভূত তখন নীলিমা সিস্টারের সঙ্গে থাকে। মাঝরাতে এপিএইচ ব্লিডিং এর পরে ক্লান্ত ফ্যাকাসে মায়ের ঠান্ডা হয়ে আসা হাতটা ধরে লেবার রুমের আলোয় চ্যানেল করার জন্য ভেন খুঁজতে গিয়ে হয়রান নীলিমার মাথার ওপর দিয়ে ভূতটা উঁকি দেয়, স্পট ল্যাম্পটা একটু বাঁকিয়ে ফোকাস ফেলে হাতের ওপর। এই তো অনায়াসে শিরার মধ্যে ঢুকে যাচ্ছে জেলকোর সরু সূচ।

আরেকটা ভূত তখন অয়ন ডাক্তারের সঙ্গে থাকে। ভোর রাতে সাপে কাটা বাচ্ছা ছেলেটার শরীর থেকে নেয়া রক্ত টোয়েন্টি ডাবলুবিসিটির টেস্ট টিউবে ঢেলে দিয়ে অয়ন যখন ইমারজেন্সি ঘরে কুড়িজন পেশেন্ট পার্টির তৈরি করা চক্রব্যূহে অভিমন্যুর মতো অপেক্ষা করে তখন ওই ভূতটাইতো অয়নের কাঁধে বসে ভরসা দেয়। কানে কানে বলে আরে কিচ্ছু হবে না, এরা ভালো লোক, রুগী মরে গেলেও তোর গায়ে হাত দেবে না। অয়ন ভরসা পেয়ে সিরিঞ্জ ঢোকায় এভিএস এর শিশিতে। 

তারক রিটায়ার করে যায়। নীলিমা বদলি সুপার স্পেশালিটিতে। অয়ন নিট পিজিতে চান্স পেয়ে পড়তে। হেল্থ সেন্টারে রাতে আর রুগী আসে না। লোকে ভূতের বাড়ি বলে বদনাম দেয়। ভূতগুলো খালি এমনি এমনি হেল্থ সেন্টারের এঘর ও ঘর ঘুরে বেড়ায়। 

নীলিমার যত্ন করে লিউকোপ্লাস্ট দিয়ে বাঁধানো রেজিস্টারগুলোতে ওরা হাত বোলায়। তারকের গজ থান কাটার কাঁচিটা সযত্নে কাচ ভাঙা আলমারিতে তুলে রাখে। অয়ন এর নিজের পয়সায় কেনা চা খাওয়ার সেই ইলেকট্রিক কেটলির জল ফেলে মুছে দেয়। ওরা আশায় থাকে। আরেকটা তারক, আরেকটা নীলিমা, আরেকটা অয়ন কবে আসবে আবার। ওদের বড় একা লাগে। ওদের মন খারাপ হয়। ভূত বলে কি ওরা মানুষ নয় ?

ব্লকের নতুন বড় ডাক্তারবাবু আসে। পিএইচসির এ ঘর, ও ঘর ঘুরে দেখে। ভূত গুলো খবর পেয়ে শেওড়া গাছ থেকে সুরুৎ করে নেবে আসে। খুব খটোমটো নাম, সুহৃদ না সুরহিত কি একটা। ওদের চোখে চোখে কথা হয়। এ কি পারবে হাল ফেরাতে ? অভিজ্ঞ ভূতেরা মাথা নেড়ে কচিগুলোকে স্বান্তনা দেয়, দেখছিস না, এক্কেবারে ছেলেমানুষ বিএমওএইচ, গোঁফ ওঠেনি ভালো করে, মনে তো হয় পারবে না। তবে চোখ দুটো খুব জ্বলজ্বলে। কচিগুলো মাথা নেড়ে সায় দেয়, পারবে না, পারবে না। গাছের পাতাগুলো সায় দেয়। 

সুহৃদ না সুরহিত ডাক্তার বোধহয় শুনতে পায়, চোখ দুটো সত্যিই জ্বলে ওঠে। তার জন্ম, বেড়ে ওঠা, রকে  বসে আড্ডা দেয়া, মাস্তানি করা সবই তো এই গ্রামে। পারবে না মানে। ইয়ার্কি হচ্ছে নাকি।  জামার হাতা দুটো গুটিয়ে নিয়ে কাজে নামে। এখান থেকে দুটো টাকা জোগাড় করে ওখানে একটু চুনকাম, সেখান থেকে তিনটে টাকা যোগাড় করে ইলেকট্রিকের নতুন একটা লাইন। ডেপুটি সিএমওএইচ তিন এর কাছ থেকে ভিক্ষে করে চারটে নতুন লোক। ধেড়ে ভূতগুলো দেখে আর বড় বড় নিশ্বাস ফেলে, হচ্ছে টা কি বাপু, বাপের জন্মেও দেখিনি। 

দিন নেই, রাত নেই মোটর সাইকেল দাবড়ে সুহৃদ না সুরহীত ডাক্তার পি এইচ সি থেকে ঢোকে আর বেরোও। নীলিমা সিস্টারের জায়গায় মায়া, ছায়া, আরো চারজন নতুন সিস্টার। তারা তাদের স্যার কে দেখায়, ঐখানে একটা বেসিন লাগবে স্যার, আর এইখানে অটোক্লেভ এর প্লাগ পয়েন্ট। সব লেগে যায় একে একে।  কিচ্ছুটি চুরি হয় না, ভেঙ্গে যায় না। কচি ভূতেরা পাহারায় আছে যে। 

ডেপুটি সিএমওএইচ এক এর লোকেরা সাদা হাতি করে নামিয়ে দিয়ে যায় স্যালাইন এর পেটি। ডেপুটি সিএমও এইচ দুই পাঠায় এন্টি স্নেক ভেনম সিরাম। তারকের জায়গায় কাজে আসা নতুন জিডিএ চন্দন, নন্দনরা ফটাফট নামিয়ে ফেলে সে সব। ভূতগুলোও হাত লাগায়। ফার্মাসিস্ট বিপুল কোথায় কোনটা রাখবে ভাবতে ভাবতে অন্যমনস্ক হয়ে চুমুক দিয়ে ফেলে ঠাণ্ডা চায়ের কাপে। একটা ছোকরা ভূতকে ধমক দিয়ে গরম চা নিয়ে আসতে বলে। সুরহিদ ডাক্তার দাঁড়িয়ে থেকে তদারকি করে।  ইটের পাজায় পাশাপাশি বসে দাঁড়াশ আর কালাচ দুটো দেখে চোখ মেলে।

আবার গুটি পায়ে একটি দুটি রুগী আসে সন্ধ্যে বেলায়, মাঝরাতে। ভর্তি হয়, স্যালাইন চলে, মুখে গোঁজা হয় থার্মোমিটার, পেটে পড়ে প্যারাসিটামল। ভূত গুলো জানালার পর্দা সরিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। ছায়া সিস্টার ভাবে বাতাসে উড়ে গেল পর্দা বুঝি।

কচি ভূতগুলো ধেড়েদের দু য় দেয়, তবে যে বলেছিলে পারবে না, পারবে না। তোমরা বুড়োরা হেরে ভূত। এই শুনে ধেড়েগুলো হাসে। কচিগুলোও। হাসতে হাসতে কেঁদেও ফেলে। বাইরে তখন শ্রাবণ মাসের অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ভূতদের চোখের নোনা জল মিশে যায় উত্তর চব্বিশ পরগনার মধ্যমগ্রামের, উত্তমগ্রামের, অধমগ্রামের মাটিতে। ভূত বলে কি আনন্দে কাঁদতে নেই ?

মঙ্গলবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৩

স্বাধীনতা ৭৫ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষন দেন ক্ষমতাসীন দলের নেতা। সেটা প্রচার করে সরকারি গণমাধ্যম। ক্ষমতায় না থাকা মানুষজনের সে ক্ষমতা নেই। তারা কেবল আপনাদের কিছু শোনাতে পারে এই মাধ্যমে। ভাষণ নয়, গল্প, গল্পও ঠিক নয়, সত্যকাহিনী। শুনতে চাইলে এগিয়ে যান। 

প্রথম কাহিনী ১৯৩২ সাল:-
ওই সময় সবে পরীক্ষা দিয়ে উঠেছে ওই কিশোর, সায়েন্স প্র্যাকটিক্যাল তখনো বাকি। ভগত সিং এর প্রথম শহিদ বার্ষিকী পালনের কথা হচ্ছে। গর্ভনর এর সেদিন জলন্ধর থেকে ৪০ কিমি দূরে হোসিয়ারপুর দেখতে আসার কথা। জেলা কংগ্রেস কমিটি ঘোষণা করলো যে সেদিন জেলা আদালত প্রাঙ্গনে ইউনিয়ান জ্যাক এর বদলে ত্রিবর্ন পতাকা ওড়ানো হবে। এই কর্মসূচি বানচাল করার জন্য জেলা শাসক আর্মি মোতায়েন করেন আর কেউ পতাকা তোলার চেষ্টা করলে তাকে গুলি করার আদেশ জারি করেন। 



সেদিন হোসিয়ারপুর পোঁছে মন খারাপ কিশোরের। শুনলো পতাকা তোলার কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কংগ্রেস অফিস সম্পাদক হনুমানজির কাছে কিশোর দাবি করলো, কেন বাতিল হল। উনি প্রশ্ন করলেন, গুলি চালানোর আদেশ এর কথা ঐ কিশোর জানে কি না। তাই শুনে খেপে গিয়ে কিশোর পাল্টা বললো, "গুলি খাওয়ার ভয়ে আপনারা হাল ছেড়ে দিলেন ? এত জাতির প্রতি অপমান!" উনি পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বসেন," এতই যদি তোমার সাহস, তাহলে তুমিই পতাকা তুলে দেখাও।"

কিশোরটি অফিসের একটি ডান্ডায় লাগানো পতাকা খুলে নিয়ে কোর্টের দিকে দৌড় দিল, সেই আদালত যাকে সেই সময়ে ব্রিটিশ শক্তির একটা নিদর্শন হিসেবে ধরা হতো। কর্মসূচির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়াতে তখন পুলিশ আর সেনাবাহিনীর মধ্যে একটু ঢিলেঢালা ভাব। তার সুযোগ নিয়ে সিঁড়ি টপকে ছাদে উঠলো কিশোর, ইউনিয়ন জ্যাক খুলে নামিয়ে দিল, লাগিয়ে দিল ত্রিবর্ন পতাকা। তাই দেখার পরে গুলি চালানো শুরু হয়। দুটো গুলি কিশোরের কাছ দিয়ে বেরিয়ে যায়, গায়ে লাগেনি। ডেপুটি কমিশনার বাখলে বেরিয়ে আসেন। কিশোরটিকে বাচ্চা ছেলে দেখে তিনি গুলি চালানো বন্ধ করার আদেশ দেন। কিশোর স্লোগান দিতে শুরু করে। তার কাছে কোনো অস্ত্র নেই,সে নিরস্ত্র এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে সেনারা সিঁড়ি বেয়ে উঠে আসে। তাকে গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে যায়।

পরের দিন বিচার শুরু হয়। ম্যাজিস্ট্রেট নাম জিজ্ঞেস করলে কিশোর বলে, "আমার নাম লন্ডন তোড় সিং।" আসল নাম কিছুতেই বের করতে পারেনি। যা করেছে তার দায় স্বীকার করে কিশোর, ভগত সিং এর অনুপ্রেরণার কথা বলে। ওর এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ হয়। "মাত্র এক বছর ?" ম্যাজিস্ট্রেটকে জিজ্ঞেস করাতে উনি বাড়িয়ে চার বছর কারাবাস এর আদেশ দেন।" 

সেদিন জাতীয় পতাকা তোলার জন্য প্রাণ তুচ্ছ করে এগিয়ে আসা কিশোরের আসল নাম হরকিসেন সিংহ সুরজিৎ। ডান্ডা বেড়ি পরে অকথ্য পরিবেশে হাজতবাস করা সেদিনের সেই কিশোর পরবর্তীকালে ভারতের মার্ক্সবাদী কম্যুনিস্ট পার্টির প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

দ্বিতীয় কাহিনী, এবার ১৯৪২ সাল:-
"ভারত ছাড়ো" আন্দোলনে যোগ দিয়েছে এক ছাত্রী। ১৫ আগস্ট জেলে বন্দী অবস্থায় মারা গেলেন গান্ধীজির সচিব মহাদেব দেশাই। অহল্যার নেতৃত্বে ছাত্রীরা পথে নামলো প্রতিবাদে। মিছিল। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হল ছাত্রীটি, হল তিনমাসের জেল, পুণের ইয়েরওয়াড়ায়। জেলের মধ্যে থাকাকালীন আবার অবাধ্যতার জন্য শাস্তি হয় ছাত্রীটির, বন্ধু ইন্দুতাই কেরকারের সাথে সাত দিনের সলিটারী। 

সেই ছাত্রীটির নেতৃত্বে ঠিক হয় ইয়েরওয়াড়া জেলের উঁচু পাঁচিল সাজানো হবে জাতীয় পতাকায় যাতে দূর দূর থেকে লোক দেখতে পারে। প্রথমে মহিলা বন্দীদের কাছ থেকে শাড়ি সংগ্রহ করা হয়। তার পরে সেগুলির কাপড় থেকে সেলাই করে তৈরি হয় জাতীয় পতাকা। এবার ওড়ানো হবে সেই পতাকা। কিন্তু কি ভাবে ? মহারাষ্ট্রে ছেলেরা একজন আরেকজনের পিঠে কাঁধে চড়ে হিউম্যান পিরামিড তৈরিতে ওস্তাদ। সেই আইডিয়া ধার করে মেয়েদের দিয়ে তৈরি হয় হিউম্যান পিরামিড। জেলের প্রাচীরের ওপরে পৌঁছে গিয়ে তোলা হয় জাতীয় পতাকা। ছাত্রীটির মুঠি বাঁধা হাত তখন আকাশের দিকে। 

ছাত্রীটির নাম অহল্যা রঙ্গনেকর যার জঙ্গী মনোভাব দেখে পদবি পাল্টে ডাকা হত অহল্যা "রণরঙ্গিনী" বলে। ছাড়া পাওয়ার পরে মহিলা সংগঠনের নেত্রী, মুম্বাই এর কর্পোরেটর, সাংসদ, সিআইটিইউ এই ভাইস প্রেসিডেন্ট, মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভ্য।

এবার তৃতীয় ও শেষ কাহিনী, ১৯৪৭ সাল:-
শেকল ছেঁড়া হাতের খোঁজে এই কমরেড প্রথমে কংগ্রেসে তার পরে কংগ্রেস সোসালিস্ট পার্টিতে। তার পরে মোহ ভঙ্গ হয়ে অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। স্বাধীনতার আগেই অসংখ্যবার কারাবরণ, অত্যাচার সহ্য করা আবার আরেকদিকে প্রথম শ্রেণীর বন্দীর আরাম আয়েশ অগ্রাহ্য করে জেল ভেঙে বেরিয়ে আসা। কালিকট এ ১৯৪৬ সালে পার্টির প্রার্থী। কংগ্রেস এর হাতে হেরে যাওয়া। গণ আন্দোলনে আবার ঝাঁপ পুনাপ্রা ভায়ালার, বিড়ি শ্রমিক ধর্মঘট, চিড়াক্কল কৃষক বিদ্রোহ। 

মাদ্রাজে তখন প্রকাসম মন্ত্রিসভা। কমরেডকে আবার জেলে ভরা হল। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের সেই রাতে কুন্নুর জেলের সলিটারী সেলের গারদ ভেদ করে ভেসে আসছে আওয়াজ, "মহাত্মা গাঁধীজি কি জয়, ভারতমাতা কি জয়।"। কমরেড এর নিজের জবানিতে, "গোটা দেশ অপেক্ষায় আছে কাল সকালের সূর্যোদয়ের, তার পরেই শুরু হবে উৎসব। কতজন কত বছর ধরে অপেক্ষা করছে, সংগ্রামে আত্মত্যাগ করেছে। আমিও ওই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আনন্দিত যার জন্য আমি জীবন-যৌবনকে উৎসর্গ করেছিলাম।" কমরেড বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন কংগ্রেস এর হাতে বন্দী হয়ে, আর তারই এককালের সহকর্মী তখন বিশ্বের সামনে ভাষণ দিচ্ছেন "নিয়তির সাথে অভিসার"।

পরের দিন সকাল। একটা তেরঙা পতাকা জোগাড় করে সেটা তুলে জেল চৌহদ্দির পরিধি বরাবর হাঁটলেন কমরেড। তারপর জেলের ছাদে তোলা হল সেই পতাকা। সব বন্দীরা তার সামনে জড়ো। কমরেড তার স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে তাদের বুঝিয়ে বললেন দিনটির তাৎপর্য। নেমে এসে আবার সলিটারী সেল। জেলার এর বদান্যতার  কয়েক ঘন্টার মেয়াদ শেষ। 

কমরেড এর নাম এ কে গোপালন। ছাড়া পাওয়ার পরে পাঁচ বার সাংসদ। ভারতের মার্ক্সবাদী কমিউনিস্ট পার্টির এর প্রথম পলিটব্যুরোর নবরত্ন এর একজন। 


পোকায় খাওয়া একটা দেশ লাভের ৭৫ বছরের বেশি বুড়িয়ে যাওয়া অগ্রাহ্য করে কাল আবার সেই জাতীয় পতাকা উঠবে দেশের কোনায় কোনায়। আসুন, একবার, সেই পুরোনো রংচটা তিনটে পতাকার কথা মনে করে একটু রং লাগাই। হোসিয়ারপুর আদালতের মাথায়, ইয়েরওয়াড়া জেলের প্রাঙ্গনে, কুন্নুর জেলের পাঁচিলের ওপর পতপত করে উড়তে থাকা সেই পতাকা, আমার আপনার প্রিয় তেরঙ্গা।

মঙ্গলবার, ৮ আগস্ট, ২০২৩

২২শে শ্রাবণ ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

আজকের দিনে যে মানুষটি আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন তিনি আমাদের মধ্যে কতটা জড়িয়ে ছিলেন তার ব্যাপ্তি হিসেবে চারটে ছোট্ট গল্প শোনাবো। 

ঘটনা এক। সুদূর বিদেশের। "ঘটনাটা ঘটেছিল পোল্যান্ডের বুকে। ১৯৪২ সাল, পোল্যান্ড তখন পুরোপুরি নাৎসি সেনাদের দখলে। ৩৫ লক্ষ ইহুদি জানেন না আদৌ এই সময় পেরিয়ে যেতে পারবেন কিনা। ধরে ধরে মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। হয় তাঁদের ক্রীতদাসের মতো খাটানো হচ্ছে, আর নয়তো মেরে ফেলা হচ্ছে। সেইসময় পোল্যান্ডের ওয়ারশ শহরের বুকে একটি অনাথ-আশ্রম গড়ে তুলেছিলেন ইয়ানুস কোরচাক নামে এক ব্যক্তি। তাঁর আশ্রমের প্রায় ২০০ বালক-বালিকার সকলেই ইহুদি। তাদের জোর করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ইহুদি ঘেটোতে। ঘেটো মানে বিরাট উঁচু প্রাচীর দিয়ে ঘেরা জেলখানা। সেই সময়েও শিশুদের হাত ছেড়ে দেননি কোরচাক। তিনিও আশ্রয় নিলেন সেই ঘেটোর মধ্যেই। সেখান থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ত্রেবলিনকা মৃত্যুকূপে। কাউকে আবার প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছে। তাঁদের একমাত্র অপরাধ তাঁরা ইহুদি। মৃত্যু আর বেশি দেরি নেই। এই সত্যিটা বুঝতে সময় লাগেনি। আর এই মৃত্যুচেতনার মধ্যে সেদিন আবারও আশ্রয় দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। কবি নিজে ততদিনে পাড়ি দিয়েছেন সেই পাঁচমুড়ো পাহাড়ের নিচে, শ্যামলী নদীর ধারে – আর এই অসহায় শিশুদের গন্তব্যও সেখানেই। খুব শিগগিরি। নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত ছিলেন কোরচাক। কিন্তু এই শিশুরা! এদের তিনি প্রস্তুত করবেন কীভাবে? ঠিক করলেন সেই ইহুদি ঘেটোর মধ্যেই একটি নাটক অভিনয় করাবেন শিশুদের দিয়ে। কী সেই নাটক? নাটকের নাম 'পোচতা'। পোলিস ভাষায় যার অর্থ 'ডাকঘর'। হ্যাঁ, ১৮ জুলাই ১৯৪২, রবীন্দ্রনাথের সেই অমল আর দইওয়ালার কথোপকথনের সাক্ষী ছিল সেদিন ঘেটোর মধ্যে মৃত্যুর জন্য দিন গুনতে থাকা অসংখ্য মানুষ। যেখানে মৃত্যুপথযাত্রী অমল তার নিশ্চিত ভবিষ্যতকে গ্রহণ করেছে আবিষ্কারের আগ্রহে। নাটকে অবশ্য অমল তার কাঙ্খিত রাজার চিঠি হাতে পায়নি। কিন্তু ইহুদি ঘেটোর সেই শিশুরা শমন পেল কিছুদিনের মধ্যেই। ৬ আগস্ট ১৯৪২, অর্থাৎ নাটকের অভিনয়ের ঠিক আড়াই সপ্তাহ পর কোরচাক, তাঁর সমস্ত সহকর্মী এবং ১৯৫ জন অনাথ বালক-বালিকাকে চলে যেতে হয় ত্রেবলিনকায়।অদ্ভুত এক দৃশ্যের সাক্ষী ছিল সেদিন নাৎসি বাহিনী। কোরচাকের পিছনে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছে সমস্ত বালক বালিকা। একে একে তারা এগিয়ে যাচ্ছে মৃত্যুকূপের দিকে। কারোর চোখেমুখে কোনো ভয় বা আতঙ্ক নেই। মৃত্যুকে তারা গ্রহণ করেছে সহজ ভাবেই। আর সেই নির্ভীক দৃষ্টি যেন আবারও রবীন্দ্রনাথের সেই কথাই মনে পড়িয়ে দেয়, 'আমি মৃত্যুর চেয়ে বড়।"

ঘটনা দুই। ঘরের কাছে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ এর সময় নিউইয়র্ক এর পাকিস্তান রাষ্ট্রদূত দপ্তরের কর্মচারীরা দোটানায় পড়েছিলেন। কোনদিকে থাকবেন, একদিকে ফরেন সার্ভিসের উঁচু লোভনীয় পদ, পোস্টিং অন্যদিকে চালচুলোহীন নবীন রাষ্ট্র তৈরি হলেও হতে পারে। মন্ত্রী এনায়েত করিমকে তার বন্ধু কথা সাহিত্যিক ও কবি শওকত ওসমান মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের আহবান জানিয়ে একটি চিঠি লেখেন। চিঠিটি পাঠ করে করিম সাহেব ও আরো চোদ্দজন বাঙালি রাজপুরুষ মনস্থির করে পদত্যাগ এর পরে যোগ দেন মুক্তি সংগ্রামে। পরে ওরা বলেছিলেন যে ওসমান এর চিঠির শেষ চারটে লাইন তাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। সেই লাইন গুলি ছিল: "জমা হয়েছিল আরামের লোভে/ দুর্বলতার রাশি,// লাগুক তাহাতে লাগুক আগুন,/ ভস্মে ফেলুক গ্রাসি।" 

ঘটনা তিন। নিজের দেশের মাটিতে।।"..জেলার সাহেব আমাদের নারায়নদা ও নিরঞ্জনদা (ডা নারায়ণ রায় ও নিরঞ্জন সেন সেলুলার জেলে বন্দী দুই বিপ্লবী ও পরে কম্যুনিস্ট আন্দোলনের নেতা)কে একটু দূরে ডেকে নিয়ে বললেন, দুঃখের বিষয় মোহন, মোহিত ও মহাবীর (১৯৩৩ সালের অনশন ধর্মঘটের তিন শহীদ মোহনকিশোর নমদাস, মোহিত মৈত্র ও মহাবীর সিং) তিন জনেই মারা গেছে। সন্দেহ সত্য বলে প্রমাণিত হল। বন্দীদের মুখে কোনো কথা নেই। নীরব প্রতিজ্ঞার মাঝে শুধু অশ্রু ঝরছে। এর পর থেকে অনশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত আর 'সেল' খোলে নি। ২৪ ঘন্টা সেল বন্ধ। এই আবদ্ধ অবস্থায় সেল থেকে সেলে চিৎকার করে জানিয়ে দেওয়া হল - আরো বেশিদিন টিঁকে থাকতে হবে, চালিয়ে যেতে হবে। বন্ধুরা গান ধরল: "নাই নাই ভয়, হবে হবে জয়, খুলে যাবে এই দ্বার"। 

ঘটনা চার। হৃদয়ের আরো কাছাকাছি। "১৯৩৮ সাল। রানীগঞ্জের কাছে বল্লভপুর পেপার মিলে শ্রমিক ধর্মঘট – তাতে পিকেটিং জোরদার করতে হবে।কর্মীরা সবাই জড় হয়েছে। ইউনিয়নের তরুণ নেতা কমিউনিস্ট কর্মী সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় কিছুদিন মাত্র বিয়ে  করেছেন। নববধূ মিনতি করে চিঠি লিখেছিলেন সংগ্রামের আগে একবার দেখা করে যেতে। সুকুমার যেতে পারেন নি -আসন্ন কঠিন সংগ্রামের প্রস্তুতির কাজে। কর্মীরা সবাই জড়ো হয়েছেন। একজন হটাৎ বললেন, "সুকুমার, আজ একটা গান করুন না। কাল থেকে তো আর নিশ্বাস ফেলার সময় পাওয়া যাবে না।" উচ্চবাচ্য না করে হাতের চায়ের পেয়ালা এক চুমুকে শেষ করেই গান ধরলেন, "যাও,যাও,যাও গো এবার যাবার আগে রাঙিয়ে দিয়ে যাও।" সবাই অবাক হয়েছিল, কি মিষ্ঠি গলা। প্রাণ ঢেলে গাইলেন। গান থামতেই সবাই সমস্বরে বলে উঠল - "আর একটি"।।বিনয় নম্র হেসে গলা ছেড়ে ধরলেন -"ওগো সুন্দর"। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনলে। সে গানের আওয়াজ কি গিয়ে পৌঁছল সেই বিশেষ ব্যাকুল হৃদয়ের কাছে। এর কয়েকদিন পরেই পিকেটার সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর দেহ নিষ্পিষ্ট হয়ে গেল মালিকের লরির চাকার তলায়। পুলিশের সাহায্যে ধর্মঘট ভাঙার জন্য লরিতে করে মালিক লোক আনছিল বাইরে থেকে।"

এই মানুষটি আমাদের ছেড়ে কোথায় যাবেন? আমরাই  বা কোথায় যাবো তাঁকে ছেড়ে? আমাদের ঠাকুর তো একটাই। রবি ঠাকুর।

"বিদায় করেছ যারে নয়ন-জলে,
এখন ফিরাবে তারে কিসের ছলে?"