বুধবার, ১৩ এপ্রিল, ২০১৬

সাঁইবাড়ি ~ সুশোভন পাত্র

ঐ ২০১২। রাস্তার কোল ঘেঁষে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে লেনিন। কার্ল মার্ক্স আর এঙ্গেলস খাবি খাচ্ছে পিছনের নর্দমার হাঁটু ভর্তি জলে। ফোট ফ্রেম সহ স্তালিন হামাগুড়ি দিচ্ছে রাস্তায়। জ্যোতি বসুর মুখে লেপা আলকাতরা। সাদা-কালো কাকাবাবুর ছবিতে পেচ্ছাবের বিশ্রী গন্ধ। সাবল দিয়ে ভাঙ্গা গেটের তালাটা ছুঁড়েই ভাঙ্গা হয়েছে টিভিটা। মেঝে ভর্তি ভাঙ্গা চেয়ার-টেবিল। উপরের তাকটা থেকে মাঝে মাঝে গায়ে এসে পড়ছে মেম্বারশিপ ফর্মের টুকরো গুলো। গোটা ঘর তছনছ। আর বাইরে, এককোণে, তখনও, আগুনে পুড়ছে কিছু জরুরী কাগজপত্র আর গোটাকতক লাল পতাকা। হার্মাদ সিপিএমে'র ৩৪ বছরের বা তারও আগের 'গণহত্যা'র বদলা নিয়ে, জোনাল পার্টি অফিসে, 'গণতন্ত্রে'র নিদর্শন রেখে গেছেন, একালের 'সততা'র পূজারীরা। পাড়ার মোড়, রাস্তা-ঘাট, চায়ের ঠেক স্পিকটি নট। লোকাল পুলিশ আরও স্পিকটি নট। অ্যাপলিটিক্যাল, নিরপেক্ষ, মধ্যপন্থী, সুশীল, বুদ্ধিজীবী,কবি, টেক্সাসের বাঙালি টেকনোক্র্যাট, ম্যানচেস্টারের প্রবাসী চার্টার্ড একাউন্টেন্ট, আরও আরও স্পিকটি নট। আসলে নন্দীগ্রাম থেকে মরিচঝাঁপি, আনন্দমার্গী থেকে নেতাই'র 'গণহত্যার' কাণ্ডারি সিপিএম'র প্রতি নিখাদ জনরোষ দাদা। 'গণহত্যা' বলে 'গণহত্যা'? সেই সাঁইবাড়ি দিয়ে শুরু। ভয়ানয়-ভয়ঙ্কর। সে কি মশাই আপনার সাঁইবাড়ি মনে নেই? সাঁ-ই-বা-ড়ি? 

৭০'র উত্তাল বাংলা।একদিকে কৃষকের অধিকার প্রতিষ্ঠার বাংলা। 'লাঙ্গল যার জমি তার' আর 'বেনামি জমি দখল রাখো, দখল রেখে চাষ কর' শ্লোগানে মুখরিত বাংলা। আর অন্যদিকে, যুক্তফ্রন্ট সরকার, রাষ্ট্রপতি শাসন, মুক্তিযুদ্ধের তাপে তেতে ওঠা বাংলা। বিকল্প জোটের সুশীল ধাড়া কে সঙ্গে নিয়ে, ১৬'ই মার্চ পদত্যাগ করলেন অজয় মুখার্জি। সিপিএম'র নেতৃত্বাধীন সংখ্যাগরিষ্ঠ যুক্তফ্রন্ট কে সমর্থন করতে অস্বীকার করল ফরওয়ার্ড ব্লক, এসইউসিও। ১৩ মাসের মধ্যেই আবারও মুখ থুবড়ে পড়ল দ্বিতীয় যুক্তফ্রন্ট সরকার। বাংলা কংগ্রেসের বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিবাদে, বিপিটিউসি সহ অন্যান্য গণ সংগঠনের ডাকে, পরেরদিন রাজ্য জুড়ে ধর্মঘট পালিত হবে। 

ধর্মঘটের সমর্থনে, ১৭'ই মার্চ সকালে বর্ধমানে তখন আদিবাসী ও কৃষকদের লাল ঝাণ্ডার লম্বা মিছিলে হঠাৎ আক্রমণ। শুরু হল ব্যাপক বোমাবাজি। ছত্রভঙ্গ জনতা প্রতিরোধের রুদ্ররূপ দেখে গুণ্ডারা তখন ঐ সাঁইবাড়ি'র আশ্রিত। জনতার সঙ্গে খণ্ডযুদ্ধে নিহত হলেন মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই এবং জিতেন রায়। অবশ্যই নিন্দনীয় এবং অনভিপ্রেত। কিন্তু কারা এই মলয় সাঁই, প্রণব সাঁই? রবীন্দ্র-নজরুল-বিবেকানন্দ নাকি? না ধোয়া তুলসী পাতা? না, বরং, কংগ্রেস জমানাতেই পিডি অ্যাক্টে অভিযুক্ত জেল ফেরত দাগী আসামী। তাঁদের জামিনের প্রাক শর্তই তো ছিল বর্ধমান শহরে প্রবেশ নিষিদ্ধতা? তাহলে কেন এবং কার মদতে তাঁরা সেদিন এসেছিলেন বর্ধমান শহরে? কোন পুণ্য কাজটা করতে এসেছিলেন? 

তৎকালীন রাজ্যপাল ধরমবীর অবশ্য সেদিন সন্ধ্যেতেই ছুটে গিয়েছিলেন সাঁইবাড়ি তে। সিপিএম'র 'গণহত্যা'। জব্বর ব্যাপার। তা বেশ, সাঁইবাড়ি, না হয় 'গণহত্যা'। আর ঐ দিনই হুগলির ত্রিবেণীর কেশোরাম রেয়নে শ্রমিক নেতা ননী দেবনাথ সহ পাঁচজনের এনকাউন্টার? টুকরো টুকরো করে ফার্নেসে ছুঁড়ে ফেলা লাশ? রাজ্য জুড়ে আরও ১৫ জন বাম কর্মীদের খুনের জমাট রক্ত? হবে নাকি 'গণহত্যা' নিয়ে একটা ঘণ্টা খানেক স্যার? ২২'শে এপ্রিল, মঙ্গলকোটের গরিব খেতমজুর মীরপাড়াতে গর্ভবতী পুস্পরানি মাঝির উপর সিআরপিএফ'র নির্মম অত্যাচার, তুলসী মাঝির কোল থেকে ছুঁড়ে ফেলা শিশুর আর্তনাদ, ডাব বাগদী থেকে শুরু করে ৮০ বছরের ইন্দুমতী মাঝির শ্লীলতা হানি, কুয়োয় ফেলা শ্যাম দাসীর চার বছরের সন্তানের নিথর মৃতদেহ। তখনও আঁতুড় ঘরের চৌকাঠ না ডিঙানো কিম্বা দুগ্ধপোষ্য, আজকের 'সততা'র পূজারী ভাইরা, হোক না 'গণহত্যার' একটা হিসেব-নিকেশ। 

সাঁইবাড়ি কাণ্ডে, ঐ দিনই, দুপুর সাড়ে বারোটায়, দিলীপ কুমার ভট্টাচার্যর অভিযোগের ভিত্তিতে, বর্ধমান থানায় প্রায় ১৫০০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রুজু হয়। ঐ অভিযোগে নাম না থাকলেও, ডিডিআই আসানসোল পরে বিনয় কোঙার নাম যুক্ত করে, মোট ১১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করেন। ৭৩'এ রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে বর্ধমান আদালত মামলাটি আলিপুরের সাব ডিভিশনাল জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে স্থানান্তরিত হয়। ৭৭'এ সরকার ফৌজদারি কার্যবিধির ৩২১ ধারা মতে আবেদন করলেও বিচারপতি গীতেশরঞ্জন ভট্টাচার্য মাত্র চারজন অভিযুক্তর বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহারের অনুমতি দেন। পরে পাবলিক প্রসিকিউটার একটি চিঠি এনেক্সচার রূপে জমা দেন তাতে দিলীপ কুমার ভট্টাচার্য পরিষ্কার লেখেন যে- তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন। তৎকালীন কংগ্রেসের জেলা সম্পাদক নুরুল ইসলামের অভিযোগ পত্রে সাক্ষর করেছেন মাত্র। চার্জশিটের অপর সাক্ষী ইতিকা দত্ত আদালত কে জানান তিনি ঐ সময় শহরেই ছিলেন না। মৃত মলয় সাঁই ও প্রণব সাঁই'র জীবিত ভাই বিজয় সাঁই, ভগ্নী স্বর্ণলতা যশ ও ভগ্নীপতি অমলকান্ত যশও বিচারপতি কে মামলা প্রত্যাহারের আবেদন করলে, বিচারপতি আবেদন মঞ্জুর করে সমস্ত অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস করেন।

প্রতীকী তে কিম্বা পৌত্তলিকতায় আমার কোন বিশ্বাস নেই। তাই স্তালিনের হামাগুড়ি, লেনিনের ডিগবাজি, মার্ক্সের খাবি খাওয়াতেও আমার কিছুই যায় আসে না। ছবি টাঙ্গালেই যেমন পার্টি অফিসে যেমন জ্যোতি বসুর আত্মা ভর করে না, দাঁড়ি রাখলেই যেমন রবীন্দ্রসঙ্গীত আসে না, চে'র টি শার্ট পরলেই যেমন বলিভিয়ার জঙ্গলে বিপ্লব হয় না, হাওয়াই চটি পরে ঘুরলেই যেমন কেউ 'সততার প্রতীক' হয়ে যায় না, ২১শে জুলাই'র মঞ্চে পাগলু নাচিয়ে যেমন 'শহীদ দিবস' পালন হয় না, চোখ বন্ধ করে ট্রাফিক লাইটের নিচে নাচতে শুরু করলে যেমন সেটা ডিস্কো লাইট হয়ে যায় না, ঠিক তেমনই গলার জোরে 'সাঁইবাড়িও 'গণহত্যা' হয় না। গণহত্যার হিসেব-নিকেশ যদি করতেই হয়, তাহলে হোক সেটা, ইতিহাসের পাতা থেকে। যে ইতিহাস আত্মবলিদানের। যে ইতিহাসের পাতা বামপন্থীদেরই রক্তে ভেজা। যেখানে জমাট রক্তের রং লাল। শুধুই লাল...

শনিবার, ৯ এপ্রিল, ২০১৬

সখী, খিস্তি কাহারে কয় ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

"খিস্তি" শব্দটির ভিতরেই কিরকম একটি অনেক না-বলা ব্যঞ্জনা রহিয়াছে। খানিক নিষিদ্ধতা, খানিক ভীতি এবং যৎপরোনাস্তি ঘৃণা- এইসব মিলিত হইয়াই বোধহয় একেকটি বিশেষ শব্দ অসাধারণ অর্থবহ হইয়া উঠে এবং যেকোন মানুষের কর্ণপটাহে তথা মানসসাগরে নিদারুণ যাতনা সৃষ্টি করিতে সমর্থ হয়। কিন্তু সত্যই কি তাই? নাকি সময়, অবস্থান, মানসিকতা এবং ব্যক্তিবিশেষে কোন একটি শব্দের অর্থের তারতম্য ঘটে?
সর্বাগ্রে এই আমার কথাই ধরি। শিশুকাল হইতেই "বইপোকা " হইবার সুবাদে তথাকথিত বড়দের, অতি-বড়দের বই-ও পড়িয়া ফেলিয়াছিলাম। পীতাভ, শুভ্র বা নীলাভ, বই পড়িবার ক্ষেত্রে কোনরূপ বর্ণবৈষম্য না থাকার ফলে আমি জাগতিক প্রায় সমস্ত রকম চলতি অশ্রাব্য গালিগালাজ সম্বন্ধে যথেষ্ট জ্ঞান অর্জন করিয়া ফেলিয়াছিলাম অল্প বয়সেই। তথাপি মুশকিল ছিল যে, কিছুতেই একটি অশালীন শব্দও আমার মুখ গহ্বর হইতে নির্গত হইতে চাহিতনা। মনে মনে ভাবিতাম, বলিব, এই বার ঠিক বলিব, তথাপি কার্যকাল উপস্থিত হইলে কোন্‌ বারাঙ্গনার সন্তান যে আমার কণ্ঠরোধ করিয়া ফেলিত তাহা ভাবিয়া পাইতামনা। শুধু যে বলিবার সমস্যা ছিল তাহা নহে, কেহ কুবাক্য উচ্চারণ করিলেও রীতিমতন  শিহরিয়া উঠিতাম।   এমতবস্থায়, এক সুন্দর স্বর্নালী সন্ধ্যায় এক বালক-বন্ধু ইতিহাসে পঁচিশে পাঁচ পাইল এবং সমস্ত সম্পর্কের মাতা-ভগিনী করিয়া শিক্ষিকাকে শ্যালিকা সম্বোধন করিয়া বসিল। আমি যথারীতি চমকাইয়া উঠিয়া তাহাকে নিরস্ত করিবার চেষ্টা করিতেই বিকট মুখব্যাদান করিয়া আমাকে ভ্যাংচাইয়া আমার প্রাপ্ত পূর্ণমানের প্রতি অনাস্থা জ্ঞাপনপূর্বক সে আমাকে জানাইল যে এরূপ সম্বোধনই শিক্ষিকার প্রাপ্য, এবং যেহেতু ইহাতে আমার একটিও যৌনকেশ উৎপাটিত হইতেছে না সেহেতু নীরবতা পালনই আমার পক্ষে শ্রেয়!
অদ্যপি সকলেই জ্ঞাত আছেন যে বাঙালী  নারী কদাচ এরূপ বাচালতা সহ্য করেনা। সুতরাং আমিও ক্রোধে অন্ধ হইয়া, সমস্তরকম শিষ্টতা বিসর্জন দিয়া 'মূর্খ -সঙ্গমকারী'  বলিয়া তাহার হাত মোচড়াইয়া দিয়া দ্রুতপদে সেই স্থান ত্যাগ করিলাম। বালক-বন্ধুটি বিস্ময়াহত হইয়া স্থাণুবৎ হইয়া রহিল। "আমি তখন নবম শ্রেণী"।
সেই শুরু।
তাহার পর কলিকাতার রাজপথ দিয়া বহু জল প্রবাহিত হইয়াছে। আমিও বেশ অনেকগুলি বসন্ত পার হইয়া আসিয়াছি। মাতা ঠাকুরানী যাহা ছিলেন এবং মাতা ঠাকুরানী যাহা হইয়াছেন- তাহার মধ্যে সহস্র যোজন ব্যবধান। অদ্য নানাবিধ কুবাক্য অনায়াসে উচ্চারণ করিতে পারি এবং কী আশ্চর্যের ব্যাপার, এতটুকু পাপবোধ হয়না। শুধুমাত্র তাহাই নহে, উপরোক্ত শব্দাবলী আর তদ্রূপ অশালীন বলিয়াও বোধ হয়না। অবশ্য বহু ব্যবহারে তরবারির শাণিত ফলা-র তীক্ষ্ণতাও হ্রাসপ্রাপ্ত হয়, আর ইহা তো নিতান্তই আমার নিজস্ব শালীনতা বোধ!
যাহা হউক, এক্ষণে গৌরচন্দ্রিকা যথেষ্ট হইয়াছে, পূর্বোক্ত আলোচনায় ফিরি। "খিস্তি", এক অর্থে প্রকৃত সাম্যবাদের প্রবক্তা। যে খিস্তিসকল নগণ্য  রিক্‌শাওয়ালা  দিয়া থাকেন, সেই একই ভাষা আপনি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত প্রকোষ্ঠে বসিয়া আপনার ঊর্ধতন কর্মচারীর প্রতি প্রয়োগ করেন। বলাই বাহুল্য, যে catharsis-ও অভিন্ন দুই ক্ষেত্রেই। আবার, সামান্য দুইটাকা খুচরা না দিতে পারার হেতু অটো ওয়ালা  যে মুহূর্তে আপনার চৌদ্দ গুষ্টির গুহ্যদ্বারের  একশত আট করিতে থাকেন, তখন যেরূপ মনোবেদনা বোধ করেন, সেই একই বাক্য যখন কোন বন্ধুবর প্রয়োগ করে তখন সেরূপ প্রবল প্রসববেদনা হয়না। ইহার কারণ প্রথমেই উল্লেখ করিয়াছি, ব্যক্তি ও স্থানবিশেষে একই খিস্তির বিভিন্ন অর্থ হইয়া থাকে এবং মনোজগতে তার প্রভাবও ভিন্ন।
একটি উদাহরণ রাখিতেছি; আমার পরম পূজনীয় পতিদেবের এক অভিন্ন হৃদয় বন্ধু, যিনি উচ্চশিক্ষিত এবং সমাজে অতীব সম্মানিত, তাঁহার একটি মহৎ দোষ হইল যে হলাহল-সম আসব সামান্য অধিক পরিমাণে পান করিবার পর তিনি কিঞ্চিৎ অস্থির হইয়া পড়েন এবং তখন তাঁহার বাক্যাবলীর মধ্যে পুরুষের প্রধান অঙ্গটির (অধিকাংশ পুরুষের মতানু্যায়ী উহাই তাহাদের প্রধান অঙ্গ, মস্তিষ্ক নহে) একটি চলিত রূপের প্রয়োগ বিশেষভাবে বৃদ্ধি পাইয়া থাকে।
অপর এক বন্ধুর নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে কয়েক বৎসর পূর্বে আমার পতিদেব, এবং উল্লিখিত বন্ধুটি তাঁহার গৃহে গমন করেন। উষ্ণ পানীয় সমাপনান্তে যেক্ষণে সকলেই আহারাদিতে ব্যস্ত এবং বন্ধুর মাতৃদেবী স্বয়ং তদারকিতে, সেক্ষণে ইনি হঠাৎ বিগলিত হইয়া গদ্গদ কন্ঠে বলিয়া উঠিয়াছিলেন, (পাঠকের বোধের সুবিধার্থে হুবহু প্রতিলিপি দেওয়া হইল), "মাসিমা, বাঁআ, মাংসটা যা বানিয়েছেন বাঁআ, ওঃ, বহুদিন পরে বাঁআ এমন মাংস খেলাম"।
ইহা শ্রবণ করিয়াও 'মাসিমা' র হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া যে সহসা স্তব্ধ হইয়া যায় নাই, ইহাতেই প্রমাণ হয় যে এই কলিকালেও ভগবান আধা-জাগ্রত অবস্থায় বিরাজমান। ইহাতে আরো প্রমাণ হয় যে কথার মাত্রা হিসেবে, শুধুমাত্র নিজ অভিব্যক্তি প্রকাশের নিমিত্তও কোন কোন সময় খিস্তি ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যাঁহারা এরূপ করিয়া থাকেন, কাহাকেও মানসিক আঘাত দিবার জন্য নহে, শুধুমাত্র অভ্যাসের বশেই বলিয়া ফেলেন।
যাহা হউক, আরো একটি ব্যাপার হইল যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ হওয়ার কারণে নারীজাতির অবমাননা করা হয় খিস্তির মাধ্যমে। উহা লইয়া পৃথক একটি আলোচনা করিবার অভিপ্রায় রাখিলাম।ইয়ে, তেমন গুরুপাক কিছু নহে। 

ক্ষমা? ~ সুশোভন পাত্র

নিভিয়া'র বডিলোশেন নিয়মিত মাখলে নাকি আপনার স্ত্রী'র ত্বক এমন একটা বিশেষ মাত্রায় 'সফট' হবে যে ঘর ছেড়ে আপনার আর অফিস যাওয়াই দায়। ডাভ সাবানের যত্নশীল ব্যবহারে আপনার গালে আবার ফিরে আসতে পারে শৈশবের নরমতা। জনসন অ্যান্ড জনসনের ম্যাসাজ ওয়েলের দ্বি-প্রাহরিক মর্দনে আপনার শিশু পুত্রের পশ্চাদদেশের নমনীয়তা টেক্কা দেবে কাপার্সের কোমলত্ব কে। লোরিয়েলের লাস্যময়ী শ্যাম্পু আপনার মাথার চুল কে করবে গোড়া থেকে শক্ত এবং বাইরে থেকে নরম। আজকাল তো, ক্লোস আপের দয়ায় ৩২ পাটি দাঁত, সিন্ডিকেটের ক্যারিশমায় উড়ালপুলের স্ল্যাব, আর ভোটের বালাইয়ে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সুরও নরম হচ্ছে। কিছুদিন আগেও যিনি সবাইকে "ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে মেপে" নিচ্ছিলেন, "কত ধানে, কত চাল" কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নিচ্ছিলেন, পুলিশ কে "চাবকে লাল" করে দিচ্ছিলেন, নিজেকে "রাফ এন্ড টাফ" দাবি করছিলেন, নিজের মার্কশিটে নিজেই ১০০/১০০ বসিয়ে ফেলছিলেন আর গলার শিরা ফুলিয়ে "আমাকে ধমকালে আমি চমকাই, আমাকে বর্ষালে আমি গরজাই", "তুমি বুনো ওল হলে আমি বাঘা তেঁতুল" -- ডায়লগে বাজার গরম করছিলেন, তিনি কিনা শেষে  করজোড়ে ক্ষমা চাইছেন? ভুল স্বীকার করে মানুষের করুণা আর সহানুভূতি ভিক্ষা করছেন?
তা কে আপনাকে ক্ষমা করবে ম্যাডাম? গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ খেয়ে মধ্যমকুমারির জঙ্গলে পড়ে থাকা সালকু সরেনের লাশটা? না মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, সালকুর মৃতদেহ সৎকার করতে  সাহস না করা গ্রামবাসীরা? কার সহানুভূতি আপনি চাইছেন? ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা? না, অজিত লোহার, পূর্ণিমা ঘড়ুই, জিতেন নন্দী, প্রদীপ তা, কমল গায়েন, সুদীপ্ত-সৈউফুদ্দিন হয়ে স্বপন মালিকের ১৭৫'র লম্বা তালিকাটা? কে আশীর্বাদ করবে আপনাকে দিদিমণি? সিঙ্গুরের  অনিচ্ছুক কৃষকরা? শালবনী আর নন্দীগ্রামের জমিদাতারা? ৬৮ লক্ষের গল্প শোনা টেট আর এসএসসি'র জন্য হা-পিত্যেশ করে বসে থাকা বেকাররা? ৫০% বকেয়া ডিএ'র ভুক্তভোগী সরকারী কর্মচারীরা? ফসলের দাম না পাওয়া কৃষকরা? অনাহারে মরা চা-বাগানের শ্রমিকরা? এ রাজ্যের মানুষ আর আপনাকে আশীর্বাদ করে না ম্যাডাম।  বরং গত চার বছরের আপনার স্বেচ্ছাচারিতা কে আর দশ হাজার ক্লাব কে ৩৮৪ কোটি ৬২ লক্ষ টাকা অনুদান দিয়ে পোষা, আপনার তা-বেদরা-তোলাব-লুম্পেনদের-গুণ্ডা-চোর'দের ঘেন্না করে, ধিক্কার দেয়, জবাব দেওয়ার জন্য তৈরি হয়।
ঐ যেদিন আপনার হেলিকপ্টারটা গাঁয়ের মাঝ বরাবর, মাথার উপর দিয়ে পতপত করে উড়ে গেল, সেদিনই সন্ধ্যে বেলায় বসেছিলাম পার্টি অফিসে। সদ্য বন্ধ হয়েছে শিলাবৃষ্টি। চারিদিক অন্ধকার।পার্টি অফিসে যিনি এসে ঢুকলেন, বয়োজ্যেষ্ঠ'দের সম্বোধনে জানলাম তিনি সবার 'দীনু দা'। অবশ্য বার্ধক্যের ছাপে, মলিন পাঞ্জাবির অবয়বে, হাঁটু অবধি ভাঁজ করা কোমরের ধুতির বাঁধনে, পুরু কাঁচের চশমার চাউনিতে, আর হাতে ধরা শেষ সম্বলের লাঠির ভারে, তিনি বোধহয় 'দিনু জ্যাঠু' হিসেবেই  বেশি মানানসই।চারিদিকের ভ্রু-কুঞ্চিত ফেসিয়াল এক্সপ্রেশন দেখে বুঝলাম তিনি কনটেম্পোরারি অ্যান্ড্রয়েড কমরেড'দের কাছে বেশ অপরিচিতই। ঘরে ঢুকেই একঘর ভর্তি লোকের সামনে 'দিনু দা' তাঁর গভীর উদ্বেগ নিঃসংকোচে উগরে দিলেন
-মেশিনে না হয় আমি ভোটটা কেস্তায় দিলম, কিন্তু বুঝব কি করে যে আমার ভোটটা কেস্তাতেই পড়ল? অন্য কুথাও চলে যায় যদি?
ভালবাসার আশংকা থেকে নিঃসৃত এই অনর্থক উদ্বেগ কে বাকি সবাই মিলে প্রশমিত করেই তাঁকে একটা মডেল ব্যালটে ভোট দিতে বলা হয়। বোধহয় তাঁর দৃষ্টিশক্তির দুর্বলতার কথা ভেবেই  এই  অমূলক পরীক্ষা। একঘর লোকের সামনে প্রথম চেষ্টাতেই 'কাস্তেটা' চিনে ফেলে, গর্বের হাসি হেসে, পুরু চশমার ভেতর দিয়ে সবার দিকে ঘুরে, ঘুরে তাকিয়ে 'দিনু দা' বললেন
-৫২ বছর ধরে ভোট দিচ্ছি ব। আর কেস্তা চিনতে লারবো? ইবার তো চিনতেই হবেক। গাঁয়ে হেলিকপ্টারও উড়বেক আর আমাদের ধান গুলাও পচে মরবেক, এইটা তো চলবেক নাই।
আশ্বস্ত 'দিনু দা'র নিশ্চিন্ত প্রস্থানের পরে শুনলাম, আগে নাকি তিনি নিয়মিতই এখানে আসতেন।বসতেন। কাজও করতেন।ভবঘুরে মানুষ। হঠাৎ কি যে হল, আসা বন্ধ করে দিলেন। গত ৮-৯ বছর আর এ পথ মাড়াননি একবারও। আজ এলেন। আবার এলেন। নিজেই এলেন। কে জানে কেন এলেন... 
ম্যাডাম, আপনার তো অপরিসীম ক্ষমতা। এতো শত মন্ত্রী-সন্ত্রী,আমলা,পুলিশ পাইক, বরকন্দাজ, পেয়াদা। আর সামান্য 'দিনু দা'রা কিনা আপনাকে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করছে? চিড় ধরিয়ে দিল আপনার অহংকারে? হিমালয়সম আত্মবিশ্বাসে? আচ্ছা, আপনি কি ভয় পেয়েছেন ম্যাডাম? তা বেশ করেছেন। ভয় আপনার পাওয়াই উচিত, 'দিনু দা'রা ফিরে আসছে যে, প্রতিদিন ফিরে আসছে, নিজের ঘরে ফিরে আসছে, জোটে বেঁধেই ফিরে আসছে, আপনাকে হারাতেই ফিরে আসছে...

বৃহস্পতিবার, ৭ এপ্রিল, ২০১৬

অমিত মিত্র ~ সাক্যজিত ভট্টাচার্য্য

কুমি কাপুরের লেখা ইমার্জেন্সির ইতিহাসের ওপর বইটা পড়ছিলাম। লেখিকা সাংবাদিক হয়েও তৎকালীন জনসংঘের প্রতি নিজের অনুরাগ গোপন করেন নি। তাতে সমস্যা নেই। তবে একটা ইন্টারেস্টিং অ্যানেকডোট শেয়ার করি।

ইমার্জেন্সির সময়ে সুব্রম্ম্যণিয়াম স্বামী পালিয়ে বেড়িয়েছেন অনেকদিন। স্বামী তখন জনসংঘের টিকিটে এমপি। নানাজী দেশমুখ, মানে তখন জনসংঘের প্রধান, স্বামীর স্ত্রী রোক্সনাকে বলেছিলেন বিদেশে গিয়ে জনসংঘ এবং আর এস এস-এর কর্মীদের ওপর যা যা অত্যাচার হচ্ছে সেগুলো নিয়ে প্রচার করতে। বিশেষত বিদেশের আরএসএস কর্মীদের সাথে যোগাযোগ করতে যারা টাকাপয়সা এবং অন্যান্য সাহায্য দিতে পারেন। রোক্সনা বিদেশে গিয়ে দেখেছিলেন লন্ডনে বসবাসকারী আরএসএস-রা বেশ ভয় পেয়েছেন। সাহায্য করতে রাজী নন। কিন্তু আমেরিকায় আরএসএস কর্মী যারা আছেন তারা প্রচুর হেল্প করেছিলেন। রোক্সনা বিশেষত উল্লেখ করেছিলেন পেনসিলভানিয়ার ফ্র্যাংকলিন মার্শাল কলেজের অধ্যাপক দম্পতির কথা যারা আরএসএস কানেকশন কাজে লাগিয়ে রোক্সনাকে সাহায্য করেছিলেন।

দম্পতির নাম মীরা এবং অমিত মিত্র। দ্বিতীয়জন পরবর্তীকালে পশ্চিমবংগের অর্থমন্ত্রী হন।

(Page 135, The Emergency: A Personal History-Coomi Kapoor, Penguin Viking, 2015)

শুক্রবার, ১৮ মার্চ, ২০১৬

অভ্যেস ~ মধুবনী ঘোষ

সক্কালে দাঁত মাজা, কফি এক কাপ
কার পুলে কথা কম, আপিসের চাপ
ছানাদের টুইশন, রাতে ছোটা পেগ
অভ্যেস হয়ে গেছে নো মোর আবেগ
থোর বড়ি খাড়া আর খাড়া বড়ি থোর
অভ্যেস হয়ে গেছে নেতা ঘুষখোর
হাতি পোষা ভোট এলো খরচের ধুম
পাঁচ সাত লাখ নেব কা বোলেগা তুম ?
ভিডিও তুলেছ নাকি বিদেশী টাকায় ?
যতসব ফটোশপ গপ্প পাকায় !
গামছা চাদর আর কাগজ রঙিন
চাপিয়ে অর্থ নেবে সিক্স এলগিন
কে আছিস? ভাল করে গুনে নিস ভাই
ইমপেক্স ব্যাটাদের লবির দোহাই
অভ্যেস হয়ে যাওয়া লোভ চকচকে
অভ্যেসে হাত পাতা চোখের পলকে
নালিশ করবে কাকে? সকলেই চোর
তাদের মায়ের আজ গলার কি জোর !!
দাঁত মাজো কফি খাও সিরিয়াল দেখো
ঘুষ টুশ নিয়ে বাপু বেশি ভেবো নাকো
এগিয়ে বাংলা বেবি হেবি কপচাবে
একদিন খুনটাও অভ্যেস হবে |


বৃহস্পতিবার, ১৭ মার্চ, ২০১৬

সোমরা মারান্ডী সরকার হোসেইন ~ দেবযানী ভট্টাচার্য্য

​বাবার নাম - দেলওয়ার হোসেইন।
মায়ের নাম - রুপা সরকার
ছেলের নাম - সোমরা মারান্ডী সরকার হোসেইন
চমকে গেলেন? আমিও গিয়েছিলাম। ছেলেটি এসেছিল মায়ের সাথে। আমার কাছে ইংরাজী পড়বে। আমার বাবা যে ইশকুলে চাকুরী করতেন সেই ইশকুলে পড়ে, ক্লাস নাইন। ওখানকার একজন স্যর পাঠিয়েছেন। ভালো কথা। মায়ের চেহারার সাথে ছেলের চেহারার ভীষন তফাত। ভাবলাম হয়তবা বাপের চেহারা পেয়েছে। নাম জানতে চাইলাম। এবং বিষম খেলাম শুনে। একে অমন নাম তার উপর মায়ের কপালে সিন্দুর হাতে নোয়া, কি কান্ড! ভদ্রমহিলা আমার হতভম্ব চেহারা দেখে বুঝে নিলেন যে আমায় বিষয়টা বোঝানো প্রয়োজন। ছেলে কে কলম কেনার ছুতোয় দোকানে পাঠিয়ে বললেন সব। নিজেরা ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। অনেক ঝড় সামলে নিজের নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস অক্ষুন্ন রেখেই আজ সংসার করছেন বাইশ বছর। ছেলেটি কুড়িয়ে পাওয়া। ইঁট ভাটার পাশেই ঘর। এক শিবরাত্রির সন্ধ্যেবেলায় মন্দির থেকে বাবার মাথায় জল ঢেলে ফিরে ছেঁচতলায় পড়ে থাকতে দেখেন সদ্যোজাত শিশুটিকে। পিপড়ে ছেঁকে ধরেছে। ছুটে গিয়ে কোলে নেন। আজ অবধি কোল জুড়ে। খোঁজ নিয়ে জেনেছিলেন ভাটায় কাজ করতে আসা আদিবাসী এক মেয়ের উপর ঠিকাদারের সেই বিশেষ মহতী অনুভুতির ফলাফল এই অবাঞ্ছিত প্রাণ। একে নিয়ে দেশে ফেরার উপায় নেই মেয়েটির। তার মরদ জানলে মা বাচ্চা দুজন কেই জ্যান্ত কবর দেবে। সবটা বুঝে ছেলেটিকে নিজেদের কাছেই রাখার সিদ্ধান্ত নেন তারা। শুধু জেনে নিয়েছিলেন নিজের বুকে রাখতে পারলে মেয়েটি কি নাম দিত তার সন্তানের। সেই নামই রেখেছেন। সাথে জুড়ে গেছে নিজেদের পরিচয়। পুরো গল্প বলে এক চোখ পরিতৃপ্তি নিয়ে ভদ্রমহিলা কি বলে উঠলেন জানেন? "দিদিমনি, ও আমার ভোলানাথ। শিবরাত্তিরে আমার ঘরে এসেছে ও। ওকে বুকে করে রাখব চিরকাল। ওর বাবাও ওকে চোখে হারায় জানেন। ভ্যান টেনে সন্ধ্যেবেলা ঘরে ফিরে ছেলে পাশে নিয়ে পড়তে বসায়, নিজে নামাজ পড়ে। ছেলেও বাপের দেখাদেখি নামাজে বসতে চায়। উনি দেননা। বলেন , তুই তো তোর জন্ম কথা সব জানিস বাপ আমার, আদিবাসী দের ধর্ম টাই তো আসলে তোর সেই মায়ের ধর্ম কিন্তু আমরা সেটা তত জানিনে, তাই তোর ধর্ম এখন কেবল পড়াশোনা বাপ, বড় হয়ে নে তারপর পুজো নামাজ যেটা ভালো লাগে করবি, চাইলে দুটোই করবিখন। আবার কিছু না ইচ্ছে করে করবিনা। আমি রা কাড়ব না। কিন্তু লেখাপড়া না করলে পিঠে চ্যালাকাঠ ভাংগব। বলেই ছেলে জড়িয়ে সোহাগ করেন। উনি নাকি মারবেন! তালেই হয়েছে আর কি! দিদিমনি, আপনিই মেরে বকে পড়া আদায় করে নেবেনখন। আপনাকেই ভরসা করে দিয়ে গেলাম।" চলে গেলেন উনি। আসলে আমিই ভরসা পেলাম। বিরাট এক ভরসা। মানুষ জাতটা এখন পুরোপুরি পচে নি। মালাউন মা আর মোস্লা বাপের ঘরে একান্ত আদরে মানুষ তৈরী হচ্ছে এই ভুমিখন্ডের আদিপুত্রের বংশজ। আলি সাহেব, এটাই আপনার ভারতবর্ষ।

বুধবার, ১৬ মার্চ, ২০১৬

আলিমুদ্দিন ~ সুশোভন পাত্র

৩০'শে অগাস্ট আলিমুদ্দিন গিয়েছিলাম। ঐ প্রথমবার। খবরের কাগজে, টিভিতে তো প্রায়ই দেখি-শুনি, 'আলিমুদ্দিন চক্রান্ত করেছে', 'আলিমুদ্দিন ভয় পেয়েছে', 'আলিমুদ্দিন হিমশিম খাচ্ছে', 'আলিমুদ্দিনের কপালে ভাঁজ', 'আলিমুদ্দিন অমুক', 'আলিমুদ্দিন তমুক।' তাই অনেকদিনের সখ ছিল এই 'আলিমুদ্দিন' নামক 'নরকের দ্বার'টাকে একবার দেখবোই। বড্ড ম্যাড়ম্যাড়ে আলিমুদ্দিন, বুঝলেন। কোনও আড়ম্বর নেই। জৌলুস নেই। ঢোকার মুখটায় আলো নেই। ১৫ ফুট লম্বা ৫ হাত পুরু বিশাল প্রাচীর নেই। ব্ল্যাকক্যাট আর জেড ক্যাটাগরির সিকিউরিটি নেই। প্রায় নিশ্চিন্তেই, আপনি পৌঁছে যেতে পারেন একেবারে আলিমুদ্দিনের 'অলিন্দে'। সেই অলিন্দে, যেখানে সর্বদা আড়ি পেতে, নাড়ির খবর জোগাড় করেন আনন্দবাজার-বর্তমান এবং আরও অনেক শ্রী-মান। এমনকি আলিমুদ্দিনের উপরে যে লাল পতাকাটা, যেটাকে স্টার আনন্দের ফুটেজে ২৪X৭ পতপত করে উড়তে দেখেন, সেটাও হাওয়া না দিলে একবারে নেতিয়েই থাকে।
একটা বই'র জন্য অপেক্ষা করছি, টেবিলের অপর দিকে এসে বসলেন সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরিহিত এক ভদ্রলোক। লোকে বলে, বিমান বসু। একহাতে লাল চা'র গ্লাসে চা পাতা গুলো তখনও পাতনের নিয়মে থিতিয়ে পড়ছে, আর অন্য হাতে একটা ওষুধ। সৌজন্যের খাতিরেই জিজ্ঞাসা করলাম
-কিসের ওষুধ সুগারের? ভাবলাম বুড়োর বয়স তো হয়েছে সুগারের ঢিলটা নিশ্চয় লেগেই যাবে। ভদ্রলোক হেসে উত্তর দিলেন,
-৭০ থেকে দুধ-চিনি ছাড়াই চা খাচ্ছি। সুগার, প্রেশার আর কোলেস্টরেল কোনটাই আমার নেই। ঐ যে নবান্ন অভিযানের দিন মাথায় মারলো পুলিশ। ওষুধটা নেহাত সেই জন্যই।
ঠিকই তো। যে উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে সুখ স্বাচ্ছন্দ্য ত্যাগ করে রাজনীতিতে এসেছেন, একসময় আদিবাসীদের সাথে ঘরে-দাওয়ায় চাটাই পেতে একপাতে ইঁদুর-পোড়া, ব্যাঙ-ভাজা খেয়েছেন, বিনিদ্র রাত কাটিয়েছেন, ছিয়াত্তরে যে বুড়ো গণতন্ত্র ফেরানোর দাবিতে তিনদিন অনশন করেন, ২১ কিলোমিটার হেটে কেশপুরের পার্টি অফিসে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েন, তিনি যে চায়ে দুধ-চিনি কবেই ছেড়ে দেবেন, এতে আর আশ্চর্য কি। ভাবনাটা শেষ হবার আগেই উনি পকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে ধরালেন। বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান, সিপিআইএম'র পলিট ব্যুরো মেম্বার, এত বড় 'হার্মাদ' শেষে কিনা বিড়ি টানছেন? আমি তো টোটাল ট্যান। ভাবলাম, আচ্ছা পায়ে হাওয়াই চটি যদি 'সততার প্রতীক' হয় তাহলে, ঐ একই ত্রৈরাশিকে, হাতে বিড়ি ঠিক কিসের প্রতীক হওয়া উচিত?  ঘড়ি ধরে ১৫ মিনিটের আলিমুদ্দিন অভিযান শেষে ফিরে আসার পথে ১০ সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ালাম এক জায়গায়। 'ফিরে দেখা'র ডিকটেশন দিচ্ছেন এক ভদ্রলোক। গাল ভর্তি সাদা দাঁড়ি। আমি লেখালিখি করার চেষ্টা করি শুনে বললেন "লেখ। আমাদের যে ভুলের কথা গুলো কেউ লিখতে না, সেগুলোই সাহস করে লেখ।" আচ্ছা এই লোকটার "আমরা ২৩৬ ওরা ৩৬" মন্তব্যে মিডিয়া ঔদ্ধত্য'র মহাভারত লিখেছিল না? তাহলে বর্তমানে অন ক্যামেরা যিনি পুলিশ কে চাবকে পিঠের ছাল তুলে দেবার হুমকি দেন? সেটা কি তাঁর 'ঔদ্ধত্য' না জননেত্রীর মমতা?
পূর্বস্মৃতির বিলম্বিত অবতারণা নিতান্তই উদ্দেশ্য প্রণোদিত। গ্রেট কোলকাতা কিলিংস,  তেভাগা, খাদ্য আন্দোলন, জরুরি অবস্থা, অপারেশন বর্গা আজ না হয় ওল্ড ফ্যাশানড। কনটেম্পোরারি বং' জেনারেশন না হয় সেসব হানি সিং ঢেলে আর সানি লিওনে গুলে খেয়েছেন। কিন্তু ঐ ভয়ঙ্কর ৩৪। কিম্বা এই স্বপ্নের পাঁচ। সেটা তো মডার্ন? তা এই ৩৯ বছরে, স্যামুয়েল ম্যাথুরা আলিমুদ্দিনের ভেতরে কিম্বা বুদ্ধ-বিমান বা ছোট-মাঝারি হার্মাদ গুলোর উপরে স্টিং অপারেশনের জন্য মাত্র ২৩ মিনিট খুঁজে পেলেন না? হোক না একটা স্টিং এঁদের উপরেও। ২৩ মিনিটের। যেকোনো ২৩ মিনিটের।
বছর সাত আগে, একটা স্টিং অপারেশনে, নন্দীগ্রামের সিপিআই'র প্রাক্তন বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের হাতে প্রায় জোর করেই গুঁজে দেওয়া হয় ১০,০০০ টাকা। বিধানসভায় জমা পড়ে সেই সিডি। স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনেন আজকের এই 'পাঁচ লাখি' সৌগত রায়। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে পদত্যাগ করেন ইলিয়াস। আজ ইলিয়াস গুরুতর অসুস্থ। দু-বিঘা জমি বেঁচে তার চিকিৎসা চলছে। সংসার চলে বিধায়কের পেনশনে। আর সেই স্টিং অপারেশনর সাংবাদিক শঙ্কুদেব পণ্ডা ও তার পরামর্শ দাতা শুভেন্দু অধিকারী একবার 'সারদা' আর একবার 'নারদা'। ইলিয়াসের ছেলে আজ জানতে চায় সৌগত বাবু,   আপনি কি স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ আনবেন? করবেন ইলিয়াসের মত পদত্যাগ?
রথে চেপে দেশ ঘুরে 'মরেঙ্গে মর জায়েঙ্গে/ মন্দির ওহি বানায়েঙ্গে'র' চ্যাংড়ামি ও রাজনৈতিক আদর্শের জন্য আমি আডবানী কে অপছন্দ করি এবং বিশ্বাস করি হাওলা কাণ্ডে সিবিআই তদন্তও নিরপেক্ষ ছিল না। কিন্তু তবুও তদন্তের স্বার্থে লৌহপুরুষের অগ্রিম পদত্যাগের সিদ্ধান্ত শ্রদ্ধাযোগ্য। এরকম প্রতিটি রাজনৈতিক দলেই কিছু বিবেকবান, সৎ মানুষ আছেন। যারা আডবাণী-ইলিয়াসের সৎ সাহস ধরেন। বিমানের আত্মত্যাগ ধরেন। যারা পেটে গামছা বেঁধে নিঃস্বার্থে রাজনীতি করেন। রোদে পুড়ে, জলে ভিজে পার্টির  ডাইরেক্টিভস অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলেন। যাদের কোনদিন কোন স্টিং হয়নি। একটা ঘন্টাখানেক হয়নি। মিডিয়া ফুটেজ দেয়নি। সোশ্যাল মিডিয়া দেওয়ালে ঘুঁটে লেপেনি। এনারাই স্বচ্ছ রাজনীতির  মুখ। এনারাই আমাদের আদর্শ। আমার ভরসা। আর যে রাজনীতি, যে রাজনৈতিক দল এদের অবজ্ঞা করে অবহেলা করে, ঐ ঘুষখোর ক্ষমতা লোভীদের দল চালানোর দায়িত্ব দেয়, নেতা-মন্ত্রী বানিয়ে মাথা তুলে নাচে, ফাঁদে পড়লে আঁচল দিয়ে আগলে রাখেন তাঁদের আমি ঘেন্না করি। আমার গর্ব, আমার অতিক্ষুদ্র সামর্থ্যে, আমি সেই রাজনীতির বিরুদ্ধেই লড়াই করি...

শনিবার, ১২ মার্চ, ২০১৬

চল বাংলায় ~ অমিতাভ প্রামাণিক

চল বাংলায়, লিখি পোস্টার, মাটি মানুষের ম্যানিফেস্টো –
আহা দিনকাল কত নির্মম, রাধা নাচলেও দোষ কেষ্টর।।

চল বাংলায় ...

হাসে জঙ্গল হাসে পর্বত, বাছুরের দল আঁকে স্বস্তিক –
স্বামী ভুলে যায় কে যে তার বৌ, আর কীসে তার জাগে মস্তি।।

চল বাংলায় ...

'জিও পাগলা' বলে ভাগলাম, দেখি ক্ষীর খায় বসে পাগলি;
হাতে কলম চলে বা জলরং, যা বেরোয় সব পাতি, আগলি।
পায়ে নীল স্ট্র্যাপ সাদা ফ্লিপফ্লপ, ধুয়ে জল খায় গোদা পাব্লিক –
আমি ছুটে যাই ভেঙে ব্যাকবোন, খেতে নুন-ঝাল আলুকাবলি।।

চল বাংলায় ...

খোসা ছাড়ানোর মত বললাম – যারা চলমান ফোঁড়া-অর্শ,
তারা রগটা ফুলিয়ে চিল্লায়, ঘরে ঢোকাবে চামচা ধর্ষক।
দ্বারে করাঘাত ক'রে বাড়া ভাত কেড়ে – ভোট চাই, ওহ, লাভলি!
আমি ফেলে দিই স্পাইনাল কর্ড, খেতে নুন-ঝাল আলুকাবলি।

চল বাংলায় ...

সোমবার, ৭ মার্চ, ২০১৬

নারী দিবস ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

সেই মেয়েটা ট্রেন পেতে রোজ ঘন্টাখানেক
হাঁটে।
রাস্তাতে সব লোলুপ নজর শরীরটা তার
চাটে।
ভীড় ট্রেনে ফের ছোঁকছোঁকানি, যেমন বাজার
হাটে।
কলেজ হোক বা চাকরি, মেয়ের এইভাবে দিন
কাটে।
বিয়ের আগে হাজার বারণ মনেতে খিল
আঁটে।
বিয়ের পরে সুখের নামে ঘেন্না আসে
খাটে।
বাপের বাড়ি, শ্বশুর বাড়ি, তার স্থান চৌ-
কাঠে।
শখ-আহ্লাদ? সবকিছু বাদ। মন উঠেছে
লাটে।
মুখ বুজে স্রেফ হুকুম তামিল, লেখাই যে ল-
লাটে!
ছেলে বিয়োলে পাড়া জুড়োল, হাজারো ঝন-
ঝাটে
'মা' ডাকটুকুন শুনবে, যতোই কষ্টেতে বুক
ফাটে।
সেই ছেলে আজ লায়েক হয়েই আলাদা তল-
লাটে।
বছর বছর নারীর দিবস, সুজ্যি নামে
পাটে।
বন্ধু ক'জন হারিয়ে যায় তেপান্তরের
মাঠে,
সারাজীবন মেয়েটা সেই একলা পথেই
হাঁটে।

দেশপ্রেম পায় ~ সুশোভন পাত্র

​"সবচেয়ে বেশি জোরে কেঁদেছিলেন হারুর ঠাকুরমা। তিনি আবার কানে শোনেন কিছু কম।তাঁকে সবাই জিজ্ঞেস করল, "আপনি এত কাঁদছিলেন কেন?" তিনি বললেন, "আমি কি অত জানি? দেখলুম ঝিয়েরা কাঁদছে, বৌমা কাঁদছে, তাই আমিও কাঁদতে লাগলুম—ভাবলুম একটা কিছু হয়ে থাকবে।"
অতএব হারুর ঠাকুরমার দেশপ্রেম পেলো। এবার জেএনইউ তে পেলো। দেশপ্রেম বড়ই অমূল্য। রেখে ঢেকে খরচা করতে হয়। তাও সবসময় আবার দেশপ্রেম পায় না। মহারাষ্ট্রে কৃষক মরলে পায় না। কন্যাভ্রূণ হত্যা হলে পায় না। লেবার ল রিফর্ম হলে পায় না। ৪৪২ জন কোটিপতি সাংসদ মিলে দৈনিক ২৫ টাকায় 'বিলো প্রভাটির' লক্ষণরেখা টেনে দিলে পায় না। রেভিনিউ ফোরগোন'র নামে কর্পোরেটদের ৬৮,৭১০ কোটি টাকার ট্যাক্স ছাড় দিলে পায় না। কৃষি 'সেস' বসলে পায় না। 'ক্লিন এনভায়ারোমেন্ট সেস' দ্বিগুণ হলে পায় না। প্রত্যক্ষ করে সরকার ১০৬০ কোটি টাকা আয় কমিয়ে পরোক্ষ করে ২০ হাজার বেশী আয়ের কোপ জনসাধারণের উপর চাপালেও পায় না। কিন্তু সিয়াচেনে সৈনিক মরলে পায়। ক্রিকেট মাঠে জাতীয় সঙ্গীত বাজলে পায়। ১৫'ই অগাস্ট দুপুরে টিভি'তে রোজা সিনেমা দেখলে পায়। পি-এফ'এ ট্যাক্স বসলে পায়। মাঝে মাঝে গোবর আর ঘুঁটেতেও পায়।
কিন্তু আম ছাড়া আবার আমাশা হয় না। একটি সংবাদ সংস্থার 'মুড অফ দ্য নেশন' সমীক্ষায় বলছে ২০১৪'য় নরেন্দ্র মোদীকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পছন্দ করতেন ৫৭% মানুষ, ২০১৬ সালে তা ৪০%৷ ৫১% জানিয়েছেন মোদীর আমলে অর্থনৈতিক অবস্থা একই থেকে গেছে কিংবা আরও খারাপ হয়েছে৷ ৫৮%'র মতে মোদী সরকার মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ৷মূল্যবৃদ্ধি এখন ৫ .৬৯ শতাংশ। এই সরকার যেদিন শপথ নেয়, সেদিন সেনসেক্সের সূচক ছিল ২৪৫৫০৷ এই মুহূর্তে ২৩০০০। বিহার-দিল্লী ছাড়ুন। গুজরাট ও ছত্তিসগড়ে তো খাঁটি দেশপ্রেমের চাষ হয়। সেখানেও পৌরনির্বাচনে দেশপ্রেমের সার্টিফিকেট বণ্টনকারীদের শক্তি কমেছে৷ উত্তরপ্রদেশে খোদ প্রধানমন্ত্রীর কেন্দ্রে বিজেপি ৫৮টির মধ্যে ৫০টিতেই হেরেছে৷ এবং গৃহমন্ত্রী রাজনাথ সিং'র কেন্দ্রে ২৮টি আসনের মধ্যে ২৪টিতে৷
লাজুক মধুচন্দ্রিমা কাটলে আগে দাঙ্গা পেত। কনটেম্পোরারি সময়ের লেটেস্ট ফ্যাশন -এখন দেশপ্রেম পায়।
আরএসএস'র প্রতিষ্ঠাতা কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের 'ফ্রেন্ড ফিলজফার অ্যান্ড গাইড', বালকৃষ্ণ শিবরাম মুঞ্জে ১৯৩১'এ মুসলিনির সাথে সাক্ষাৎ করতে ইতালি যান। সেখানে তিনি ফ্যাসিস্ট অ্যাকাডেমি পরিদর্শন করে লেখেন, "আমি অভিভূত। প্রতিটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিকাশমান জাতির এই রকম ফ্যাসিস্ট সংগঠনই প্রয়োজন।" অতএব সঙ্ঘে প্রবর্তন হয় ৬-১৮ বছরের বালকদের প্রতিক্রিয়াশীল দক্ষিণপন্থী উগ্র দেশপ্রেমে মগজধোলাই। পরে গোলওয়ালকার হিটলারের ইহুদি নিধন যজ্ঞের ভূয়সী প্রশংসা করে লিখেছিলেন "জাতিগোষ্ঠীর শুদ্ধতা রক্ষা করতে জার্মানি দেশটাকে সেমেটিক জাতিভুক্ত ইহুদিদের ক্লেদ মুক্ত করেছিলো।" এখন অবশ্য প্রকাশ্যে এই দেশপ্রেমী'দের আর হিটলার-মুসলিনি পায় না। স্তালিন-ক্রুশচেভ পায়। গান্ধী পায়। সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল পায়। সেই গান্ধী, সেই সর্দার বল্লভ ভাই প্যাটেল, যিনি ১৯৪৮'র ১১ই সেপ্টেম্বর চিঠি তে লিখেছিলেন "সঙ্ঘের নেতাদের বিষাক্ত ভাষণের জন্য গান্ধী কে হত্যা করা হয়েছে। আর সঙ্ঘের অনুগামীরা তা উৎযাপন করতে মিষ্টি বিতরণ করছে।"
জেএনইউ'র মত সেটাও ছিল ফেব্রুয়ারি। ২৭'এ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৩। জার্মানির বিলাসবহুল হেরেন ক্লাবে ভাইস চ্যান্সেলর ফন পাপেন তখন প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবুর্গের হাতে তুলে দিচ্ছেন দুর্লভ বিদেশী মাদকের স্বর্ণাভ সুরাপাত্র। অন্যদিকে গোয়েবলসের প্রাসাদে, গ্রামাফোনের মৃদুমন্দ আবহসঙ্গীতের সিম্ফনি তে মোহিত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কর্পোরাল হিটলার, তাঁর গুণমুগ্ধ স্তাবকদের জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব পুনরুদ্ধারে সম্মোহনী পরিকল্পনার রূপরেখা বর্ণনা করছেন। রাত তখন ১১, ক্রমশ লাস্যময়ী, প্রথম ফোনটা এলো হানফস্টাঙ্গেলের কাছ থেকে। 'রাইখস্ট্যাগে আগুন লেগেছে'। ফুয়েরার কে নিয়ে ঝড়ের গতিতে রাইখস্ট্যাগে পৌঁছে গেলেন গোয়েবলস। নিমেষে সবাই নিশ্চিত হয়ে গেলেন। ফুয়েরার গোটা বিশ্ব কে জানিয়ে দিলেন 'এই কাজ অবশ্যই কমিউনিস্টদের'। গেস্টাপো-চিফ রুডলফের উদ্দেশ্যে গোয়েরিং'র চিৎকার করে 'অ্যাডমিনিসট্রেটিভ ডায়রেক্টিভস', "আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা নয়। কোন ক্ষমা নয়। প্রতিটি কমিউনিস্ট কে এক্ষুনি গুলি করে মারতে হবে।"
রাইখস্ট্যাগের আগুনে কমিউনিস্টদের ভূমিকা অবশ্য আজও খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু গুলি সেদিন চলেছিল। ঝাঁঝরা হয়ে কমিউনিস্টরা মরেও ছিল। তবুও, তবুও, আজও, কানহাইয়ারা জন্মাচ্ছে, কানহাইয়ারা জন্মেছে, কানহাইয়ারা জন্মাবে...

বুধবার, ২ মার্চ, ২০১৬

আমার স্যার ~ অরুণাচল দত্ত চৌধুরী

আমার স্যার চলে গেলেন। আজ শুধু তাঁর কথা। ডাঃ দেবব্রত সেন। প্রফেসর ডি সেন। দেবু সেন। এমবিবিএস, ডিটিসিডি, ডাবল এমআরসিপি। মেডিকেল কলেজের উজ্জ্বল ছাত্রদের একজন। কিন্তু এ'সব তো তাঁর পোশাকি পরিচয়। আর্তজন (আর ছাত্ররাও) জানত, উনি দেবতা সেন। হ্যাঁ, মমতায় ভালবাসায় মেধায় ও জ্ঞানে স্যার তেমনই ছিলেন। আমরা মানে মুর্খ ভক্তরা আড়ালে বলতাম শনিঠাকুর। মুখ দিয়ে যদি কোনও ডায়াগনোসিস, ভালোমন্দ যা হোক, বেরিয়ে গেল, অন্যথা হবার জো নেই। প্রায় সংস্কারের মত দাঁড়িয়ে গেছিল আমাদের মনে। আমার সহপাঠী ঘনিষ্ঠ বন্ধু অমিতাভর বাবার শরীর খারাপ হল। তেমন মারাত্মক কিছু না। স্যারকে দেখাতে বললেন, ভাল লাগছে না। বেরিয়াম মিল করানো হল। নর্মাল ছবি। স্যার কিন্তু ছবি দেখে আরও গম্ভীর। তখন কলকাতায় এন্ডোস্কোপি সবে শুরু হয়েছে। ডাঃ জালান। রায় বেরোল স্টমাকের ক্যান্সার। ছ'মাসের মধ্যে আমার কলকাতার আশ্রয়, সেই প্রিয় মানুষ, শ্রী বিজয় ভট্টাচার্য চলে গেলেন। এই রকম অসংখ্যবার তাঁর ডায়াগনোসিস আমাদের চমকে দিত। রোগীর জন্য, মানুষের জন্য এমন মমতা সারা জীবনে দ্বিতীয় কারুর মধ্যে দেখিনি।
মেদিনীপুর, বহরমপুর, জলপাইগুড়ি, চাকরি সূত্রে যে'খানে পোস্টিং হয়েছে, সে'খানেই মানুষের চোখে দেবতা হয়ে উঠতে পেরেছিলেন এই মমতা ভালোবাসা বিছিয়ে। প্রত্যেক জায়গাতেই চেম্বারে চাপ হত খুব। সাহিত্যিক দেবেশ রায় একবার অধুনা লুপ্ত "শারদীয় অমৃত''তে স্যারকে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখেছিলেন। তা'তে জলপাইগুড়ির প্রেক্ষাপটে স্যারের চেম্বারে রোগীদের ভিড়ের খুব ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন । জলপাইগুড়ির সম্পন্ন মানুষেরা সেই কালে কলকাতায় আসতেন বড় রোগব্যাধি হলে। কলকাতায় থাকা তাঁদের পরিচিত কাউকে দিয়ে বা অন্য কোনও ভাবে তথাকথিত বড় ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নেওয়া হত। বলাই বাহুল্য, সাথে সাথে পাওয়া যেত না সেই সব মহার্ঘ অ্যাপয়েন্টমেন্ট। এই যে দেরি হত এটাই ছিল সেই সম্পন্ন মানুষদের স্ট্যাটাস সিম্বল। এদিকে স্যার ছিলেন হাসপাতাল অন্ত প্রাণ। সকাল সন্ধ্যার রাউন্ডতো আছেই, তার সাথে আরও বহুবার যেতেন রোগীর পাশে অশেষ উৎকণ্ঠায়, রোগ বুঝবার আর সারাবার জন্য। হাসপাতালের বেড থেকে পেশেন্ট ভাগিয়ে চেম্বারে নিয়ে যাওয়া দুরস্থান, চেম্বারে তাঁকে পাওয়াই ছিল ভাগ্যের ব্যাপার। নাম লিখিয়ে ডেট নিতে হত কাজেই। সেই সম্পন্ন মানুষরাও বেশ ভালো সুযোগ হিসেবে নিলেন এই ঘটনাটাকে। তাঁদের স্ট্যাটাসের জন্য প্রয়োজন ছিল লাইন দিয়ে ডেট নিয়ে দেখাতে হয় এমন ডাক্তারের। সেই জন্যেই তো কলকাতা যাওয়া। জলপাইগুড়িতেই যদি সেই লাইন দিয়ে ডেট নিয়ে দেখানোর সুব্যবস্থা পাওয়া যায়, তবে সেই সুবিধা না নেবার কোনও মানে হয় না। শুনেছিলাম জলাতঙ্ক আক্রান্তকে নিজে স্ট্রেচারে তুলতে গিয়ে তাঁকে সেই সময়ে চালু চোদ্দোটা প্রাণান্তকর ইনজেকশন নিতে হয়েছিল একদা। এই স্যারই আবার টিচিংএ পিজিতে এসে, যে হেতু নন-প্র্যাকটিসিং পোস্ট, কোনও প্রাইভেট প্র্যাকটিস করলেন না। সেই প্র্যাকটিস আবার শুরু হবে রিটায়ার করার পর। নতুন করে শুরু করা সেই প্রাইভেট প্র্যাকটিসের গল্পও বর্ণময়। ফিজ, শেষ অবধিও তাঁর কৃতি ছাত্রদের অনেকের চাইতে কম। অন্যরা অর্জুন হলেও আমি ছিলাম একলব্য। স্যারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখার চেষ্টাও করিনি। তিনি কিন্তু মনে রেখেছিলেন। মনে রাখার ধরণটাও অদ্ভুত। বললেই বোঝা যাবে। একবার আমার পাঠানো এক পেশেন্টকে কিছুতেই দেখবেন না। কী ব্যাপার? না, 'অতদিন ধরে অরুণাচলকে কী শেখালাম, যে সেই এত সহজ কেসও আমার কাছে রেফার করে?'
অবুঝ স্যারকে বোঝাই কী করে, যে মফসসলের এই অধম চিকিৎসক রোগীর চাহিদাতেই রেফার করতে বাধ্য হয়েছে।
স্যারের সল্ট লেকের বাসায়, রোগীদের কাছ থেকেই শুনেছি, দেখানোর পদ্ধতিটা ছিল কিছুটা অন্যরকম। সকালে আটটা নাগাদ ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে হত। পেশেন্ট পিছু একঘণ্টার স্লট। আমার এক রোগী বিকেল চারটেতে অ্যাপয়েন্টমেন্ট। পৌঁছেছেন একটু দেরিতে, মানে চারটে বেজে দশ নাগাদ। স্যার নাকি তাঁকে বলেছিলেন বেজায় হা হুতাশ করে, 'ইস, এত দেরি করে এলেন, আমি দশ দশটা মিনিট কম দেখতে বাধ্য হলাম।' দিনে চেম্বারে দেড়শ'টা করে পেশেন্ট দেখা আমার সহকর্মীরা ভাবতেও পারবে না, এ হেন আপশোষের কথা। খুঁটিয়ে হিস্ট্রি নিয়ে, ক্লিনিক্যাল একজামিনেশন করে, পুরনো কাগজপত্র থাকলে তা' দেখে, প্রেসক্রিপশনে সব কিছু লিপিবদ্ধ করেও শান্তি পেতেন না। এক জাবদা খাতায় নাম তারিখ দিয়ে তুলে রাখতেন সব। বলা তো যায় না, রোগী যদি কোনও কারণে কাগজ হারিয়ে ফেলে!
স্যারের বন্ধু আর ভাইএর মত ছিলেন আমার আর এক শিক্ষক, ডাঃ প্রণব চৌধুরী। তিনি মারা গেছেন বেশ কয়েকবছর আগে। তাঁর কাছে শোনা, তাঁদের ছাত্রাবস্থায় দেবব্রত আর প্রণব কলকাতার চার মেডিক্যাল কলেজের মেডিসিন ওয়ার্ডে কোন বেডে কোন ইন্টারেস্টিং কেস রয়েছে দেখে বেড়াতেন অক্লান্ত। আরজিকর থেকে পার্ক সার্কাসের ন্যাশনাল অবধি অবলীলায় হেঁটে চলে যেতেন মুড়ি বাদাম চিবোতে চিবোতে। কেস দেখবার আর শেখবার লোভে। সেই সব বেড নাম্বার লেখা থাকত তাঁদের পকেট ডায়রিতে।
'মোটর নিউরন ডিজিজ খুঁজছ?'
পকেট ঘেঁটে ডায়রি বার করে হদিশ দিতেন সমসাময়িক উৎসাহী কাউকে,
'উম্‌ম্‌... চলে যাও মেডিকাল কলেজে মতিলাল শীল ওয়ার্ডে ছেচল্লিশ তা না হলে এনআরএস মেডিসিনের পাঁচ নম্বর ফিমেল নইলে ন্যাশনালের একশ সতের নম্বর বেডে। আমি আর প্রণব গত দুদিনে দেখে এসেছি সব ক'জনকে। তবে ন্যাশনালের কেসটার ফাইন্ডিং বেশি। যাবার আগে ভালো করে পড়ে নিয়ো। আর মেডিক্যালের পেশেন্ট হয় তো ছুটি হয়ে যাবে আজকালের মধ্যে।'
এখনকার এমসিকিউ মুখস্তর যুগে এই কাণ্ড কেউ ভাবতে পারে?
মেধার সাথে পরিশ্রম আর অনুসন্ধিৎসা যোগ করলে কী দাঁড়ায় তার উদাহরণ ছিলেন এঁরা।
টুকরো টুকরো কত ঘটনাই যে খেয়াল পড়ছে। একদিন রেফার্ড কেসের ডাক এসেছে অর্থোপেডিক্স ওয়ার্ড থেকে। আর্জেন্ট লেখা। স্যার আউটডোরে। সাথে আমি। রওনা হলেন আমাকে নিয়ে। গিয়ে দেখা গেল তেমন জরুরি কিছু না। কুড়ি বছর আগে টিবি হয়েছিল। বুকের এক্স-রে তে তার পুরনো দাগ এসেছে সামান্য। এক্ষুনি করণীয় কিছু নেই। তবু রেফার। ডাক্তারি কথ্য ভাষায় যাকে বলে 'ছুঁইয়ে রাখা'। বেড হেড টিকিটে দেখা গেল একজন হাউসস্টাফ এই রেফারটি লিখেছে। স্যার যখন তাকে ডেকে বললেন, 'আর্জেন্ট লিখেছ বলে ব্যস্ত আউটডোর ছেড়ে আমাকে আসতে হল', সে তো হতভম্ব। নিজের ঘাড় থেকে দায়িত্বের বোঝা নামাতে এই আর্জেন্ট লেখাটাই দস্তুর। তাকে সে'রকমই শেখানো হয়েছে।
হাসপাতালে ঢুকতেন সকাল সাড়ে আটটায়। ঘড়ি মেলানো যেত। এরপর রাউন্ড, আউটডোর, রেফার্ড কেস দেখা, আমাদের পড়ানো, এই সব নানান কাজ সেরে বিকেল চারটেতে স্যারের সেকেন্ড রাউন্ড। দিদির ক্যান্টিনে খেতাম আমরা। সেখানের দিদিরা জানতেন চেস্টের চারটে ছেলে দেরি করে আসবে। খাবার রেখে দিতে হবে।
ছাত্রদের মধ্যে জ্যোতিষ্ক যেমন ছিল অনেক, তেমনই আমার মত অলস নিরুদ্যমি মেধাহীন দু'চারজনও জুটেছিলাম। স্যারের কিন্তু আমাদের নিয়ে উদ্যমের কোনও ঘাটতি ছিল না। রোজ দুপুরে ম্যারাথন আউটডোরের পর আমাদের নিয়ে বসতেন স্যার। হয় তো হ্যারিসন অথবা অন্য কোনও টেক্সট বই, নইলে নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল যাতে ওয়ার্ডে ভর্তি কোনও রোগীর যে রোগ তার বিবরণ। স্যার প্রায়শই ডাক্তারদের সেই আপ্ত বাক্য মনে করিয়ে দিতেন, 'হোয়াট ইয়োর মাইন্ড ডাসন্‌ট নো ইয়োর আইজ ক্যানট সি'। তার মধ্যেই 'অ্যাই অরুণাচল চোখ ছোট হয়ে আসছে। ঘুমিয়ে পোড়ো না।' তাঁকে তো আর বলা যায় না, অনেকক্ষণ ধরেই আমি বসে বসে ঘুমোচ্ছি। স্যার ভাবতেই পারেন না আউটডোর চলাকালীনও আজ একবার ঘুমের ঢেউ এসেছিল। আমি টয়লেটে গিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে পাঁচ মিনিট ঘুমিয়ে এসেছি।
চেনা শোনা তথাকথিত ক্যাচ কেস, স্টাফের মেসোমশাই, রাজনৈতিক নেতার চিরকুট আউটডোরে এলে আগে দেখে দেওয়া স্যারের ধাতে ছিল না। কতবার দেখেছি, খুব ডাকাবুকো অন্য ডিপার্টমেন্টের কোনও মাস্টারমশাইএর হাত থেকে সাথে আনা রোগীর টিকিট একদম শেষে রেখে জিজ্ঞেস করেছেন স্মিত মুখে, 'দেরি হবে বেশ, আপনি কি ততক্ষণ শুধু শুধু অপেক্ষা করবেন? কোনও দরকার নেই।' মহম্মদ ইসমাইল সিপিআইএমের ডাকসাইটে নেতা, তখন এমএলএ না এমপি, বাইরের বেঞ্চে বসে আছেন টিকিট জমা দিয়ে। স্যারের ওপর অচলা ভক্তি। যত দেরিই হোক, দেখিয়ে ফিরবেন। আজকের মেরুদণ্ডহীন সুপার বা ভিজিটিং যাঁরা ক্ষমতাবান কারওর চিরকুট দেখলে ভয়ে আইসক্রিমের মত গলে যান, তাঁরা ভাবতেও পারেন না সত্যিকারের সততার দাপট কাকে বলে।
বাড়াবাড়ি রকমের কথা বলতেন কিছু কিছু। 'একটা ওষুধ যদি দিয়েছ তবে তুমি রোগ ধরতে পেরেছ। দু'টো দিলে, ইউ আর ইন এ ডায়লেমা। আর তিনটে ওষুধ মানে তুমি কিছুই ধরতে পারোনি।' আমার এক সহকর্মী, বারাসতের বিরাট প্র্যাকটিশনার, ওষুধ লেখেন দশটা থেকে বাইশ তেইশটা। এই সব প্রেসক্রিপশন দেখলে স্যার কী বলতেন কে জানে। স্যার শেখাতেন, রোগীর ইতিহাস ঠিকমত জানতে পারলে পরিভাষায় যাকে বলে 'হিস্ট্রি টেকিং' অধিকাংশ রোগের ডায়াগনোসিস হয়ে যায়। আর বাকিটুকুর জন্য লাগে ক্লিনিক্যাল একজামিনেশন। মানে ইন্সপেকশন, প্যালপেশন, পারকাশন আর অসকালটেশনে বাকিটুকু। খুব সামান্য অংশ পড়ে থাকে যাদের ইনভেস্টিগেশন করে রোগ ধরতে হবে। সিনিয়র শিবদা' বলত ' নিজে প্রত্যেকটা কেস নিজে হাজার দু'হাজারটা করে দেখেছেন। তাই রোগীর মুখের ভাঁজ দেখলে রোগ ধরে ফেলেন।' সত্যিই তাই। মাঝে মাঝে অলৌকিক মনে হত তাঁর সে সব ডায়াগনোসিস।
সেই অলৌকিক এক গল্প বলে শেষ করি।
উনিশশ' সাতাশি সালের ঘটনা। তখন হাসপাতালে হাউসস্টাফ আন্দোলনে স্বাভাবিক কাজকর্ম মোটামুটি স্তব্ধ। বেলা দেড়টা নাগাদ এমারজেন্সিতে এক রোগী ঢুকল। বয়েস বছর বারো।অজ্ঞান। সাথে নাক ডাকার মত শব্দ… আমাদের ভাষায় স্ট্রাইডর। সহজ ডায়াগনোসিস, আপার এয়ার ওয়েতে ফরেন বডি অবস্ট্রাকশন। ই এন টির আরএমও কে কল বুক দেওয়া হল। যদি ফরেন বডি বার করে আনা যায়।
স্ট্রাইকের বাজারে কোথায় কে! এ দিকে রোগীর অবস্থা যখন তখন। কী করা? এমারজেন্সীর ডাক্তার বুদ্ধি বার করলেন। চেস্টে ভর্তি করে দেওয়া যাক। ওরা ডিপার্টমেন্টে অনেকক্ষণ থাকে।
সেদিন ছিল আমাদের আর এক স্যার ডাঃ ডি এন সিনহার অ্যাডমিশন ডে। বেলা তিনটে নাগাদ ডাঃ সিনহা রাউন্ডে এসে রোগীর বিবরণ শুনে, হতাশ ভাবে বললেন, 'কি আর করা। আগামী কাল সকাল সকাল রেফার লিখে ই এন টি সার্জন এনে দেখিয়ো, মানে ততক্ষণ যদি বাঁচে'।
স্যার এলেন বেলা চারটে নাগাদ। উনি খালি নিজের রোগীই নয়, সব রোগীকেই দেখতেন। এই বাচ্চাটার কাছে এসে, সব শুনে, নাকটা কুকুরের(স্যারের কাছে ক্ষমা চাইছি) মত তুলে কী যেন শুঁকলেন বার কতক। তারপর আমার একদা সিনিয়ার হাউসস্টাফ, আলোচ্য সময়ে আরএমও আলোকদা'কে বললেন, 'আলোক, এর প্যান্টটা খোলো তো'। প্যান্ট খোলা হল। ফাইমোসিস। পেচ্ছাপের জায়গাটা… ডাক্তারির ভাষায় যাকে বলে পিনহোল মিয়েটাস। স্যার ব্যাখ্যা করলেন, 'পেচ্ছাপ আটকে ইউরিমিয়া হয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে। ওর নিঃশ্বাসের থেকে অ্যাসিডোটিক স্মেল পেলাম এই জন্যেই। চট করে ওপরের তলায় ডায়ালিসিস ইউনিটে পাঠাও। এখুনি ডায়ালিসিস করতে হবে।' পরদিন রাউণ্ডে ডাঃ সিনহা দুঃখিত ভাবে জিজ্ঞেস করলেন,'কী, কতক্ষণ পরে মারা গেল?'। আসলে চিনতেই পারেননি। ডায়ালিসিসে সুস্থ হয়ে সে তো তখন বেডে বসে পাঁউরুটি কলা খাচ্ছে।
আশ্চর্য হয়ে ভাবি, আমরা সবাই ডাক্তার। কই কেউই তো রোগের সেই গন্ধ বুঝতে পারিনি। সেই দাদা আড়ালে মন্তব্য করেছিলেন শুধু, 'হবে নাই বা কেন? দু'হাজারটা অমন গন্ধ শুঁকেছিলেন যে আগে'।
এই এতদিন বাদেও গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে স্যারের আলোয় আলো হয়ে ওঠা সেই সব অলৌকিক দিনের কথা ভাবলে।

শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

দুর্গা ও মনুস্মৃতি ইরানি ~ অবিন দত্তগুপ্ত

গতকাল মনুস্মৃতি ইরানির রাজ্যসভার বক্তব্যের একটি অংশ নিয়ে , আমার হাল্কা কিছু অশিক্ষিত সি পি এম সুলভ বক্তব্য আছে । আগে কোট-টা করি ,

"What is Mahishasur Martyrdom Day, madam speaker? Our government has been accused. I miss today Sugata Bose and Saugata Roy in the House - champions of free speech, because I want to know if they will discuss this particular topic which I am about to enunciate in the House, on the streets of Kolkata. I dare them this.
Posted on October 4, 2014. A statement by the SC, ST and minority students of JNU. And what do they condemn? May my God forgive me for reading this.
"Durga Puja is the most controversial racial festival, where a fair-skinned beautiful goddess Durga is depicted brutally killing a dark-skinned native called Mahishasur. Mahishasur, a brave self-respecting leader, tricked into marriage by Aryans. They hired a sex worker called Durga, who enticed Mahishasur into marriage and killed him after nine nights of honeymooning during sleep."
Freedom of speech, ladies and gentleman. Who wants to have this discussion on the streets of Kolkata? "

আচ্ছা প্রথম লাইনে উনি জিজ্ঞেস করেছেন , মহিষাসুর শহীদ দিবস আবার কি ? এবং শেষ লাইনে বলেছেন , এমন কথা কোলকাতার রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন ?? জোট সঙ্গি সুগত আর সৌগত বাবুর উপর একটু রুষ্ট হয়েছেন , সে হতেই পারেন , ওদের নিজস্ব ব্যপার । এবার ভারতবর্ষের একজন মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী , যদি নিজের দেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্র্যাকটিসের ব্যপারে সম্পূর্ণ মূর্খ হন , তো দায় কার ? ভারতবর্ষের বিভিন্ন আদিবাসী- মূল নিবাসি জনগোষ্ঠী দুর্গা পুজার সময় মহিষাসুর উপাসনা করেন । তারা মনে করেন , ফর্সা চেহারার দুর্গা আসলে আর্য আক্রমণকারীর রূপক এবং মহিষাসুর ভারতের মুলনিবাসী অনার্য গোষ্ঠীর রাজা , যোদ্ধা । উনি টাইমস নাওএর ছাগল অর্ণব গোস্বামীর উপর এতো ভরসা রাখেন , চ্যানেলে ফোন করে ক্রন্দনরত জেনারেলকে সান্ত্বনা দেন , অথচ টাইমস গ্রুপের কাগজ পরেন না । এই খবর , এর আগে টাইমস অফ ইন্ডিয়াতেই বেরিয়েছে । লিঙ্ক ঃ ( http://timesofindia.indiatimes.com/…/articlesh…/23927688.cms ) । এবং হ্যা কোলকাতা গুজরাট নয় , কোলকাতার মানুষ অসহিষ্ণু নয় । কোলকাতা, ডায়েলেক্টিক বা ডিবেটে ভরসা রাখে । কলকাতায় , আপনি যা ইচ্ছে নিয়ে আলোচনা করতে পারেন , নইলে আপনাদের হনুমান ভাইয়েরা প্রকাশ্যে ঘর বাপসি নিয়ে আলোচনা করে ৮বি থেকে অক্ষত ফিরতে পারত না ।

এবার একটু ডাইগ্রেস করব । মেঘনাদ বধ কাব্য পড়েছেন মনু বাদী ইরানি ? মেঘনাদ কে ? অনার্য রাক্ষসদের সেরা যোদ্ধা , ট্র্যাজিক হিরো । রাক্ষস কারা ? যারা বিন্ধ্য পর্বতের দক্ষিণে থাকত । আপনার দেশের মূল নিবাসী , পৌরাণিক ভারতবর্ষের আসল বাসিন্দা । তাদের গায়ের রঙ কালো , নাক চোখ থ্যাবড়া । আর্যরা দারুণ দেখতে , চোখা নাক , ফর্সা । কিন্তু আদি ভারতবর্ষে তারা আগ্রাসনকারি । আর আদিবাসীদের তাদের চেহারার কারণে ডেমোনাইজ করার লক্ষেই , তারা রাক্ষস । ঠিক যেমন ডেমোনাইজ আপনারা করে থাকেন । মুসলমান মানেই সন্ত্রাসবাদী , বামপন্থী মানেই দেশদ্রোহী , লম্বা দাড়ি -বুরখা মানেই সন্ত্রাসের মদতদাতা , দলিত মাত্রেই নোংরা-অচ্ছুত । এই আর্যদের বিরুদ্ধে অসম যুদ্ধে , নিজের বাসস্থান রক্ষার আদিম ভারতের জনগোষ্ঠীর লড়াইয়ের নেতা ছিলেন এই রাবন , মেঘনাদ বা মহিষাসুর । তারা জানতেন , তাদের হেরে যাওয়া মানে তাদের ইতিহাসের বিকৃতি , তাদের গানের বিকৃতি , তাদের সংস্কৃতির বিকৃতি, তাদের ভাষার বিকৃতি । রাবণদের মতোই কালো আফ্রিকার এক সাহিত্যিক বহু বছর পরে , এই কারণেই বলেছিলেন " Until The Lions have their Own Historian , the history of the hunt will always Glorify the Hunter . " যতদিন না সিংহের নিজের ঐতিহাসিক জন্ম নিচ্ছে , ততদিন ইতিহাস শিকারির ছল-চাতুরিকেই গৌরবান্বিত করবে । সিংহের লড়াই কেউ জানতে পারবে না । মাইকেল মধুসূদন ছিলেন সিংহের ঐতিহাসিক । তিনি সিংহের দুর্দমনীয় লড়াই এবং কপটতার কাছে হার স্বীকারের গল্প নথিভুক্ত করে গেছেন । আপনি মধু কবি পড়েন নি , স্মৃতি ইরানি । বাংলার বাচ্চারা ৯-১০ ক্লাসে পরার সময় থেকেই পড়েছে । তাদের মনন আপনার মতো হিন্দুত্ববাদীর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় ।

তা রাবন হেরে যাওয়ার পর কি হল ? বা মহিষাসুর বধের পর কি হল ? ইতিহাস রাবণদের খারাপ এবং আগ্রাসনকারিদের ভালো বানিয়ে দিল । কারণ ইতিহাস লিখলেন বিজয়ীদলের স্তাবক ঐতিহাসিকরা । রাবণদের গোষ্ঠীর , ভারতের মুল নিবাসী মানুষের সংস্কৃতি , তাদের গান , তাদের ভাষা , তাদের বসবাসের অধিকার সব হারিয়ে যেতে লাগল , হু হু করে । ভারতবর্ষের এক ভগ্নাংশ মানুষের বলা হিন্দী ভাষাকে , তাদের মাতৃভাষার উপর চাপিয়ে দেওয়া হল । তারা সরে গেলেন , লোক চক্ষুর অন্তরালে । এমনকি আমাদের বাংলা ভাষার ক্ষেত্রেও , আমি যে ভাষা লিখছি ,সে ভাষাও অনেক আংশেই অন্য ডায়ালেক্টকে একরকম একঘরে করে রেখেছে ।

সে যাই হোক , এক বন্ধু জিজ্ঞেস করেছেন , জে এন ইউ তে এই কর্মসুচীতে বামন্থীরাও অংশগ্রহণ করেছিল কি ? এবং আমরা বাম্পন্থীরা এই বক্তব্য সমর্থন করি কি না ? তার উত্তরে এবং স্মৃতি ইরানির "Freedom of speech, ladies and gentleman. Who wants to have this discussion on the streets of Kolkata? " উত্তরে এটুকুই বলার , দুর্গা পূজা বা অসুর পুজা কোনটাকেই বিরোধিতা বা সমর্থন করে না বামপন্থীরা । তবে হ্যা , বিজয়ীর উৎসব যদি বিজিতের রিচুয়ালকে বেয়াইনি ঘোষিত করতে চায় ,সেক্ষেত্রে বাম্পন্থীরা বিজিতের পাশেই দাঁড়াবে । তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার , নিজেকে প্রকাশ করার অধিকার , তার দুঃখের গানের অধিকারকেই রক্ষা করবে ।

এমনটা নয় , যে মূলনিবাসী মানুষ আমাদের জন্য হাপিত্যেশ করে বসে আছেন । সব হারালেও , লড়াইটা হারান নি । জঙ্গলের অধিকারের জন্য , কখনো বিদেশী শক্তির থেকে কখনো উঁচু জাতের নিষ্পেষণের থেকে আজদির জন্য তারা বার বার যুদ্ধ করেছেন , হেরে গেছেন, আবার যুদ্ধ করেছেন । লড়াই করেছেন বিরসা মুন্ডা , লড়াই করেছেন সিধু-কানহু ,লড়াই করেছেন রোহিত ভেমুলা । পাওনা এটাই ,এখন মূলনিবাসীদের পাশে বামপন্থীরাও লড়াই করছে । ভেমুলার পাশে লড়ছেন ,কানহাইয়া । এবারের ইতিহাসটা আপনারা লিখবেন না মনু স্মৃতি ইরানি । আমাদের-ও ইরফান হাবিবরা আছেন ।

জয় ভীম ।
ইনকিলাব জিন্দাবাদ ।

বৃহস্পতিবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

দূর্গা পুজো ~ পূরন্দর ভাট

মাননীয়া মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি কাল পার্লামেন্টে ভাষণ দিয়েছেন তার বিরুদ্ধে ওঠা নানান অভিযোগকে নস্যাৎ করতে। ভাষণে অনেক অসত্য কথাই তিনি বলেছেন এবং নাটুকেপনার মধ্যে দিয়ে অনেক কিছুই এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেইসব বাদ দিয়েও ওনার ভাষণের একটা অত্যন্ত সমস্যাজনক দিক রয়েছে। স্মৃতি ইরানি জেএনইউর ছাত্র ছাত্রীদের অপরাধমূলক কাজকর্মের তালিকা দেওয়ার সময় দূর্গা পুজোতে বিলি হওয়া একটি রাজনৈতিক প্যামফ্লেটের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন যে সেই প্যামফ্লেট দেবী দুর্গার হাতে মহিষাসুর বধকে আর্য্যদের হাতে অনার্য্যদের দমন করবার প্রতিকী রূপ বলে বর্ণনা করা হয়েছিলো। তাতে মহিষাসুরকে মহান এবং দেবী দুর্গাকে এক ছলনাময়ী নারী বলা হয়েছে যে ছল চাতুরীর ব্যবহার করে মহিষাসুরকে বধ করেছে। স্মৃতি ইরানি বলেছেন যে এরকম প্যামফ্লেট লেখা বাকস্বাধীনতার চূড়ান্ত অপব্যবহার এবং অপরাধমূলক কাজের মধ্যেই এগুলো পড়ে। তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের এমপি-দের চ্যালেঞ্জ করেছেন সংসদে দাঁড়িয়ে যে তারা এইরকম প্যামফ্লেট কলকাতার রাস্তায় বরদাস্ত করতেন কিনা। (লিংক: http://goo.gl/RYOmGx)

যে প্যামফ্লেট নিয়ে এতো আলোচনা সেই প্যামফ্লেটটি আসলে সাঁওতালদের "হুদুর দূর্গা" উত্সব নিয়ে ছিলো। সাঁওতালদের কিছু উপজাতি বহু বহু যুগ ধরে "হুদুর দূর্গা" উত্সব পালন করে আসেন যে উত্সবে তাঁরা সাঁওতাল রাজা মহিষাসুরকে স্মরণ করে। তাদের মধ্যে যে কিংবদন্তি প্রচলিত তা হলো মহিষাসুর ছিলেন এক সাঁওতাল রাজা যাকে দূর্গা নামের এক বেশ্যা ছলে বলে ভুলিয়ে বিষ খাইয়ে খুন করে। তাঁরা ওই জন্যে দূর্গা পুজোতে আনন্দ না করে শোকের দিবস হিসেবে পালন করেন। এই নিয়ে এখন কিছু ইতিহাসবিদ গবেষণা শুরু করেছেন এবং ইংরেজি মাধ্যমের সংবাদপত্রতেও এই উত্সবের কথা প্রকাশিত হয়েছে গত বছর। (লিংক: http://goo.gl/rhkdcN)

স্মৃতি ইরানি হয়তো "হুদুর দূর্গা" উত্সব সম্পর্কে জানেন না। নাই জানতে পারেন, কলকাতার উচ্চবর্ণ বাঙালিরাও জানে না। কিন্তু পার্লামেন্টে এই উত্সবকে "অপরাধ" বলে দাগিয়ে দেওয়ার আগে কি একবার খোঁজ নেওয়া উচিত ছিলো না? না কি খোঁজ নিয়েও এই কথা বলেছেন? আসলে এতে সংঘ পরিবারের মানসিকতাই প্রকাশ পায়। তারা যাকে ভারতীয় সংস্কৃতি বলে আখ্যা দেয় তাতে প্রান্তিক মানুষের সংস্কৃতির কোনো জায়গা নেই, তাদের নিয়ে ভাবনাচিন্তা করবার কোনো অবকাশ নেই। কলকাতা, দিল্লি, মুম্বাই, ব্যাঙ্গালোরের মতো শহরের উচ্চবর্ণকেন্দ্রিক সংস্কৃতিকেই তারা ভারতীয় সংস্কৃতি বলে মনে করে, সেখানে বহুত্ববাদ নেই। জেএনইউতে বেশ ধুম ধাম করেই কালী পুজো, সরস্বতী পুজো বা দূর্গা পুজো উদযাপিত হয় প্রতি বছর, যাতে হাজার হাজার ছাত্র ছাত্রী, কর্মচারী এবং অধ্যাপকরা অংশগ্রহন করেন। তার মধ্যে যদি কোথাও প্রান্তিক মানুষের আওয়াজ উঠে আসে তাকে "অপরাধ" এবং "বাকস্বাধীনতার অপব্যবহার" বলে দাগিয়ে দেওয়া হবে? এমনিতেই তো ভারতের অর্থনৈতিক প্রগতি অথবা উচ্চশিক্ষা থেকে আদিবাসী এবং দলিতদের ব্রাত্যই করে রাখা হয়েছে। "শাইনিং ইন্ডিয়া"-র ঝলমলে আলোর চারপাশে যে ঘোর অন্ধকার তার মধ্যে যারা রয়েছেন তাদেরকে আমরা আলোর ঝলকানির চোটে দেখতেই পাই না অধিকাংশ সময়। সেই অন্ধকার থেকে যদি কোনো এক টুকরো আওয়াজ, ফাঁক গলে দেশের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রে ঢুকে পড়ে তাকে "অপরাধ" বলে দেবেন সংসদে দাঁড়িয়ে? এই হলো সংঘ পরিবার কল্পিত ভারতবর্ষ। যে ভারতবর্ষ নির্মাণে সাঁওতালরা প্রাণপাত করেছেন বিদ্রোহ করে সেই ভারতবর্ষে তাদের সংস্কৃতিটুকুরও জায়গা নেই। বীরসা মুন্ডা যখন শহীদ হচ্ছিলেন তখন স্মৃতি ইরানির পূর্বপুরুষরা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মন্ত্রী হতে আর মুচলেকা লিখতে ব্যস্ত ছিলো। আজকে তারাই পার্লামেন্টের মধ্যে দাঁড়িয়ে কত সহজে বলে দিচ্ছেন যে হুদুর দূর্গা উত্সবের কথা বলাও অপরাধ।

আপনাকে ধন্যবাদ স্মৃতি দেবী, একটা গোটা উপজাতির সংস্কৃতিকে সংসদে দাঁড়িয়ে অপমান করে "মনুস্মৃতি" ইরানি নামের সার্থকতা প্রমাণ করলেন।

সোমবার, ২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

সেবার শীতকালে - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

আমার আবার বরাবরের গরম গরম বাতিক ছিল একটু গরম হলেই ছাওয়া চাই, হাওয়া চাই। হাঁসফাঁস অবস্থা। কিন্তু কি জানি কেন, বয়স বাড়ছে বলেই বোধহয়, আজকাল আর তেমন গরম করেনা। বরং শীতের কাঁপুনি প্রতি বছর একটু একটু করে বেড়ে যাচ্ছে। আগে যেখানে হাতকাটা সোয়েটার পরতুম, এখন সেখান টুপি আর জ্যাকেট চাপাই। সারা রাত গায়ে কম্বল নিয়ে ঘুমোতে পারি, যেটা আগে পারতুম না এবার শীত অবিশ্যি কমসমের ওপর দিয়েই গেল। কদিন হলো “বসন্ত এসে গেছে” বলে ফোনে অনেক মেসেজ আর ছবিও পেয়ে চলেছি। তবে আমাদের এখানের শীত আর কতটুকু? যেতে হয় দার্জিলিং কি সিমলা। শীত বলে শীত? বাপরে! হাড়ের ভেতর মজ্জা পর্যন্ত জমিয়ে দেয়। আমার বাঙালি ধাতে এর চেয়ে বেশী ঠান্ডা কল্পনা করা অসম্ভব। তাই ভাবি, যেখানে শূন্যের নিচে ৩৫-৪০ ডিগ্রি নেমে যায় থার্মোমিটারের পারা, সেখানে কেমন পারা অনুভুতি হয়!

শনিবার, ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

হিরক রাজার দেশ ~ শাক্যজিৎ

​সত্যজিৎ রায় মারা যাবার পর পশ্চিমবংগ সরকার থেকে ওনার ওপর একটা বিশেষ সংখ্যা করা হয়েছিল। সেখানে একটা লেখায় উৎপল দত্ত একটা ইন্টারেস্টিং গল্প শুনিয়েছিলেন। যখন হীরক রাজার দেশে শুটিং হচ্ছে, উৎপল দত্ত-র প্রথম দিনের শুটিং-এ কয়েকটা ডায়ালগ থ্রো করার পর মাণিকবাবু ওনার কানে কানে বললেন "উচ্চারণে একটু গ্রাম্যতা আর অশিক্ষার ছাপ আনো। 'করেছিল' না বলে বলো 'কইরেছিল'"।

উৎপল জিজ্ঞাসু চোখে তাঁর দিকে তাকাতে দীর্ঘদেহী মানুষটি একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন "আসলে এই জোতদার ধরণের লোক বেশ ক্রুড আর অশিক্ষিত হয়। নাহলে অন্য লোকেদের অপ্রেস করবার চিন্তা এদের মাথায় আসত না। তাই এই ধরণের লোককে ডিমীন করে দাও। যাতে ভয় পাবার বদলে লোকে তোমায় দেখে হাসাহাসি করে"।

উৎপল তারপর লিখছেন "আমি স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলাম। মনে পড়ছিল চেয়ারম্যান মাও-এর কাগুজে বাঘের তত্ব। শত্রুকে সবসময় হাস্যকর করে খড়ের সৈনিকের স্ট্যান্ডার্ডে নামিয়ে আনতে হবে। এই তত্বের এরকম প্রয়োগ যে হতে পারে আমি ভাবতে পারিনি এর আগে"।

এই মুহূর্তে ভারতে যে ব্যাটল অফ আইডিয়াজ চলছে সেখানে কাগুজে বাঘেদের লাফালাফি দেখে হীরক রাজের কথাই মনে পড়ছিল। এই ব্যাটলের একদিকে মেধাবী ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবিরা। অন্যদিকে রাইটিস্টরা যাদের উপন্যাস পড়ার দৌড় চেতন ভগত এবং বিজ্ঞানচর্চার দৌড় গণেশের শুঁড়ে ইঞ্জিনিয়ারিং কারীকুরী আবিষ্কারেই জিভ বার করে হ্যা হ্যা হাঁপাতে থাকে। একদিকে চমস্কি, পামুক, প্রভাত পটনায়েকরা, অন্যদিকে সাদ্ধ্বী ঋতাম্ভরা, বাবা রামদেব এবং যোগী আদিত্যনাথেরা। এরকম অ্যাবসার্ড ব্যাটল অফ আইডিয়াজ যখন স্ট্রিট ফাইটিং-এর পর্যায়ে নেমে আসে এবং উজ্জ্বল ছেলেমেয়েরা ব্যারিকেড রক্ষার্থে ছুটে যায়, সেই মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কাগুজে বাঘেদের রিঅ্যাকশন দেখার মত হয়। 'আমার ট্যাক্সের টাকায় কেন ইউনিভার্সিটিতে দেশদ্রোহী স্লোগান দেওয়া হবে', 'জেএনইউ তে পর্ন ফিল্ম তোলা হয়', 'কোনো আইআইটি ছাত্র কেন আর্মীতে যোগদান করে না', 'ইউনিভার্সিটির ছেলেরা মহিষাসুরের পুজো করে তাই তাদের বিরুদ্ধে সিডিশন অ্যাক্ট আনা উচিত' এরকম অসংখ্য পেটফাটা কমেডির ডায়লগ বেরিয়ে আসতে থাকে। অশিক্ষিত, ক্রুড এবং অসংস্কৃত রাইটিস্টদের হাতে দেশের সরকার থাকলে ভয়ের পাশাপাশি এরকম হাসির জিনিসপত্র-ও আসার সম্ভাবনা আছে আজ বুঝছি। দেশপ্রেমকে ইন্সটিটিউশনালাইজ করতে গেলে যে মিনিমাম শিক্ষা এবং রুচি লাগে সেটা এদের নেই। তাই দেশজোড়া ইন্টেলিজেনশিয়ার ডিসকোর্সে এদের অবস্থান গ্রাম্য ভাঁড় হয়েই থেকে গেল।

আজকের এই ২০১৬ সালে দেশজুড়ে যে হীরক রাজার সিনেমা অভিনীত হচ্ছে, সেখানে উৎপল দত্তদের তাই আর আলাদা করে নিজ-অভিনীত চরিত্রকে ভাঁড় সাজাতে হয় না। হীরক রাজ বাস্তব জীবনে যা যা বলছেন হুবহু সেইগুলো রিপীট করে গেলেই দর্শকদের পেটে খিল ধরে যায়।

বৃহস্পতিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

যাদবপুরে দ্রৌপদী ~ অনির্বাণ মাইতি

অতঃপর দ্রৌপদী একশো লেঠেল লইয়া ভ্যানিটি ভ্যানে চড়িয়া যাদবপুর আক্রমণ করিয়া বসিলেন। পথিমধ্যে নগরকোটাল পথ আটকাইয়া কহিল ভদ্রে এ বড় অবিবেচকের কার্য হইবে। যাদবকুল নেশাড়ু ও আক্রমণাত্মক তাহাদিগের সহিত যুদ্ধে আপনি কেন?  সেনাপতি তপনভানু কই? দ্রৌপদী হুঙ্কার  দিলেন কাহারেও লাগিবে না যাদবকুলের রক্ত দিয়া কেশবিন্যাস করিব। নগরকোটাল তবু রাজি নন  দেখিয়া দ্রৌপদী পথ অবরোধ করিয়া  বসিলেন। শকটযাত্রীরা শকট হইতে দ্রৌপদীকে ফ্রেমে রাখিয়া  সেলফি তুলিতে  উদ্যত হইলেন। বেগতিক দেখিয়া নগরকোটাল  দ্রৌপদীকে বলিলেন যাদবকুল অশালীন বিদ্রোহী ওখানে আপনি আক্রান্ত হইলে কে আপনার সম্ভ্রম  রক্ষা করিবে ?  কানহাইয়া তো কারাগারে। দ্রৌপদীর সম্বিত ফিরিল কানহাকে কে কারারুদ্ধ করিয়াছে?  নগরকোটাল  উত্তর করিলেন আপনি তো কানহাইয়ার মিত্রোদের ই আক্রমণ করিয়াছেন। যাদবকুল যে কানহাইয়ার  কুল। উহারা কানহাইয়ার  মুক্তির  দাবী করিয়াছে। অতঃপর  দ্রৌপদী হা কানহাইয়া  বলিয়া মূর্ছা  গেলেন । আকাশে বাতাসে ধ্বনিত  হইল তার চীৎকার। কখন যে কানহাইয়ার মুক্তির স্লোগান আর দ্রৌপদীর কান্না মিলিয়া গেল তা তিনি নিজেও বুঝিলেন না।

***ইহা মহাভারতে লিখিত নাই। যদি কখনো মহাভারতবিদ্বেষ বলিয়া  কোন মহাকাব্য লিখা হয় সেখানে থাকিবে।

মঙ্গলবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

জে এন ইউ ~ পরিচয় পাত্র

নিজস্ব সংবাদদাতাঃ রতন টাটার পরেই এক বিশেষ টুইট ঘোষণায় জেএনইউয়ের ছাত্রদের নিয়োগ করতে অস্বীকার করেন অ্যাপল আবিষ্কর্তা স্টিভ জোবস। জোবসের এই ঘোষণার পরে সাংবাদিক সম্মেলন করে তাঁকে বিরাট হিন্দু বলে দাবী করেন আদিত্যনাথ এবং (বিজয়)বর্গী। এইসময় জোবসের বায়োলজিক্যাল পিতা মধ্যপ্রাচ্যের লোক এই তথ্য উপস্থিত সাংবাদিকরা জানানোয় বর্গীরা উদাসীন হয়ে পড়েন। এরপর তাঁদের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটিতে যত্রতত্র ফ্রি সেক্সের কুফল সম্পর্কে আলোচনা করতে দেখা যায়।

মার্ক জুকারবার্গ ঘোষণা করেন দেশভক্তিহীনদের ফেসবুক প্রোফাইল গায়েব করে দেওয়া হবে। পরীক্ষামূলকভাবে শুরুতেই উমর খালেদ এবং ধ্রুপদী ঘোষের প্রোফাইল গায়েব করা হয়েছে বলে তিনি জানান। তাঁর এই উষ্মার কারণ ফ্রী বেসিকসের ট্রাইতে পরাজিত হওয়া কিনা তা জানতে চাইলে জুকারবার্গ হাত তুলে বলেন, "থাক, আর গভীরে যাওয়ার দরকার নেই"। 

মানবসম্পদোন্নয়নমন্ত্রী একটি প্রেস রিলিজে জানিয়েছেন আলোচ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেসের পাঠ্য তালিকায় 'তারাপীঠের বামাবতার' এবং সাহিত্য বিভাগে দেশের প্রথম এবং একমাত্র সচিত্র ইন্দ্রজাল কমিক্স 'বাল নরেন্দ্র' বইদুটি যোগ করা হবে।

ওয়েটলিস্টেড মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী থেকে আরএসি (রিজার্ভেশন এগেনস্ট ক্যানসেলেশন) মানবসম্পদ উন্নয়নমন্ত্রী পদে প্রোমোশনপ্রাপ্ত মধু কিশওয়ার তাঁর আকস্মিক পদোন্নতির জন্য বর্তমান মন্ত্রীকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন। বর্তমান মন্ত্রী তাঁর পদের উপযুক্ত কিনা জানতে চাওয়া হলে দৃশ্যত উত্তেজিত মধু বলেন "কালে কালে কত হল কাল কাল রাতি/মোগল পাঠান হদ্দ হল ফার্সি পড়ে তাঁতি"।

আবিশ্ব বিভিন্ন নেতা দিল্লির সংগ্রামী উকিল, পুলিশ এবং এবিভিপিকে অভিনন্দন জানান। এক তারবার্তায় ডোনাল্ড ট্রাম্প এদের চলমান আন্দোলনকে সমর্থন জানান। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ আইভি লীগ ইউনিভার্সিটি উকিল-পুলিশের বিরুদ্ধে গিয়ে জেএনইউকে সমর্থন করেছে জানায় উত্তেজিত ট্রাম্প বলেন তিনি ক্ষমতায় এসে কলাম্বিয়া, শিকাগো সহ এইসব ইউনিভার্সিটি বন্ধ করে দেবেন। এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে (বিজয়)বর্গী বলেন ইউনিভার্সিটি ভাল নহে, সেখানে সকলে সেক্স করে, ইউনিভার্সিটি না থাকিলে জোবস এবং তাহার আপেল কেহই থাকিত না।

অ্যান্টার্কটিকা সফররত প্রধানমন্ত্রী স্বল্পকালীন ভারত সফরে এলে ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে সাংবাদিকরা তাঁকে ছেঁকে ধরলেও তিনি তাঁর পূর্বসূরির মত মৌনব্রত অবলম্বন করেন। তাঁর সঙ্গে দফায় দফায় অন্য মন্ত্রীদের বৈঠক হয়। পরে এক প্রকাশ্য জনসভায় প্রধানমন্ত্রী জানান জরুরি অবস্থার স্মৃতিবিজড়িত ইন্দিরা গান্ধী এয়ারপোর্ট থাকুক এটা তিনি চান না। যেহেতু জরুরি অবস্থার আরেক স্মৃতি বাজপেয়ীজির স্মৃতি লোপ পেয়েছে তাই এয়ারপোর্টের নাম বদলালেই জরুরি অবস্থা স্মৃতি থেকে হারিয়ে যাবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন ২০১৯ এর নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ক্ষমতায় ফিরলেই ইন্দিরা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নাম বদলে দেওয়া হবে।

২০১৯ এ তাঁরা ক্ষমতায় ফিরবেন কিনা এই প্রশ্ন তোলায় প্রধানমন্ত্রী কিছুক্ষণ নীরব থাকেন। এইসময় দৃশ্যতই ঘর্মাক্ত প্রধানমন্ত্রীকে গলায় জড়ানো জাতীয় পতাকায় ঘাম মুছতে দেখা যায়। এরপর তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে তাঁর হয়ে প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য ইশারা করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং আবেগঘন কণ্ঠে 'একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি' গানটি পরিবেশন করেন। 

যোগগুরু রামদেব জানিয়েছেন সমকামিতার মতই সোশ্যাল সায়েন্স এবং সামগ্রিকভাবে ইউনিভার্সিটি একটি রোগ। এই রোগের উপশম কিভাবে হতে পারে জানতে চাওয়া হলে তিনি সর্বসমক্ষে তাঁর বিখ্যাত গেরুয়া লুঙ্গিটি পরে শীর্ষাসন করেন।

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

পেট্রোল - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকা বড় বড় পাথরের টুকরোর আড়ালে দু চার জন করে সৈনিক বসে আছে চারিদিকে চোখ ধাঁধানো সাদা। বরফের পুরু আস্তরন সব কিছুর ওপর। এই ধপধপে সাদার ওপর সূর্‍্যের রোদ পড়লে সেদিকে খালি চোখে তাকানো মুশকিল। তাই সব ফৌজির মুখেই, কপাল থেকে গাল পর্যন্ত বিশাল বড় আর  মোটা কালো চশমায় ঢাকা। একে সকলেই সাদা হাই অল্টিচিউড ফৌজি উর্দী পরে আছে। মাইনাস চল্লিস কি পঞ্চাশ ডিগ্রিতে দাড়ি গোঁফ কামানোর প্রশ্নও ওঠেনা। তার ওপর মুখের আধখানা ঢাকা বিশেষ ভাবে তৈরি রোদ চশমায়। কাজেই সকলকেই কেমন এক রকম দেখতে লাগছে। তবুও ফৌজিরা নিজেদের চিনে নেয় কোনো ভাবে। ওই যে লোকটা একবালতি বরফ নিয়ে অল্প লেংচে লেংচে আসছে গরম করে খাবার জল তৈরি করবে বলে, ও হলো হাবিলদার রামদত। অনেক উঁচু থেকে দড়িতে ঝুলতে ঝুলতে পড়ে গিয়েছিল। সে আঘাত এখনো সারেনি হয়ত। তাই চলার সময় খুব ভাল করে নজর করলে ওকে হালকা ল্যাংচাতে দেখা যায়। সামনে প্যাকিং বাক্সর ওপর বসে থাকা লেফটেন্যান্ট চেঁচিয়ে রামদতকে চা চাপাতে বললেন। ইনিই বোধহয় এ চৌকির কম্যান্ডার। এ জায়গাটা বোধহয় পাকিস্তানি ফৌজের সরাসরি গুলির পাল্লার বাইরে। কারন এখানে লোকজন বাংকার বা পরিখার মধ্যে ঢুকে বসে নেই। বরং বেশ নিরাপদেই ঘুরছে। লেফটেন্যান্টের উর্দীতে নামের ট্যাগটা পড়া যাচ্ছে। রাজীব পান্ডে। আইডি আর ট্যাগ খুঁটিয়ে দেখে লেফটেন্যান্ট তাকালেন সামনের দিকে -

শুক্রবার, ১২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

মনে পড়ে? ~ সুশোভন পাত্র

ডিয়ার ম্যাডাম, অজিত লোহার কে মনে পড়ে? পড়ন্ত বিকেলে, লোডশেডিং'র অন্ধকারে, অজ গাঁয়ের হাসপাতালে যখন আনা হয়েছিল নিথর দেহটা, তখনও অবশ্য আপনি মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে শপথই গ্রহণ করেননি। বিজয়োল্লাসে আপনার দুষ্টু, দামাল ভাইরা স্রেফ পিটিয়ে খুন করলো অজিত লোহার কে। আপনার মনে আছে বর্ধমানের পূর্ণিমা ঘড়ুই কে? কিম্বা গড়বেতার জিতেন নন্দী কে? 

জানেন ম্যাডাম, মধ্যমকুমারির জঙ্গলে সালকু সরেনের মরদেহটা যখন পাওয়া গেলো তখন তাঁর গলায় ছ-খানা টাঙ্গির কোপ। সবার চোখের সামনে লাশটার শরীরের চামড়া পচে গলে যাচ্ছে, পোকাতে কুরে কুরে খাচ্ছে সারা দেহ, চোখ গুলো ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে আসছে, চারিদিকে দুর্গন্ধ। অথচ মাওবাদীদের ফতোয়ায়, বৃদ্ধা বিধবা মা'র শত অনুরোধেও, মৃতদেহ সৎকারে সাহস করছে না ধরমপুর গ্রামের কেউ! আপনার মনে পড়ে ভালুকবাসা জঙ্গলঘেরা পাথরপাড়া গ্রামের বাদল আহিরের কথা? জ্যান্ত অবস্থায় যার গোটা দেহে গুনগুনে একশ আটটা পেরেক পুঁতেছিল মাওবাদীরা। ২০০১-১১ দশ বছরেই জঙ্গলমহলে ২৩ ব্লকে মাওবাদীদের হাতে শহীদ হয়েছিলেন ২৭৫ জন। আর আপনি বলেছিলেন "মাউ-ফাউ কিছুই নেই"। গত পাঁচ বছরে অজিত লোহারদের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭৫। সর্বশেষ সংযোজন উচিতপুর গ্রামের শীর্ণকায়,এই স্বপন মালিক। আপনার কাছে দু-মুঠো চাল-ডাল চাইতে গিয়ে গুলি-বোমা আর রক্তে মাখা হয়ে মরলো যে। 

আজ লাল পতাকায় মোড়া স্বপন মালিকের নিশ্চল দেহটা যখন বর্ধমান মেডিকেল কলেজ মর্গ থেকে শেষ বারের মত বেরোল আপনি তখন নেতাজী ইন্ডোরে দলের কেষ্ট বিষ্টু-দের সাথে আপকামিং 'অল ইম্পরট্যান্ট ইলেকশনের' রণকৌশল তৈরিতে ব্যস্ত। আপনি এখন মুখ্যমন্ত্রী, সর্বময়ী নেত্রী। আপনি ব্যানার, আপনিই পোস্টার। আপনি বিজ্ঞাপন, আপনিই সরকার। আপনিই মালিক। আপনি রাখলে রাখবেন। মারলে মারবেন। শুধু বলে দিন এই স্বপন মালিকের লাশের সাইজটা কেমন? সুদীপ্তর মতই 'ছোট্ট'? সৈফুদ্দিনের মতই 'তুচ্ছ'? না প্রদীপ তা-কমল গায়েনের মত 'বিক্ষিপ্ত'? 

৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৫৯। ম্যাডাম, আপনি তখনও আঁতুড় ঘরে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের জনবিরোধী খাদ্যনীতির বিরুদ্ধে বিধানসভা অধিবেশনের প্রথম দিনেই ১৫ দফা মুলতুবি প্রস্তাব জমা পড়ে ১১ টি বিরোধী দলের পক্ষ থেকে। স্পিকার শঙ্করদাস ব্যানার্জি বিবেচনা প্রস্তাব দিলেও পরে তা অস্বীকার করেন। ২৫'ই জুন রাজ্যব্যাপী ধর্মঘট ও হরতালের পর বামপন্থী দলগুলি ২০'ই অগাস্ট থেকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে শান্তিপূর্ণ ভাবে খাদ্যের দাবীতে গনআন্দোলনের ঘোষণা করে। আতঙ্কিত সরকারের আন্দোলন দমনের উদ্দেশ্যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় প্রমোদ দাসগুপ্ত, হরেকৃষ্ণ কোঙার, হেমন্ত বসু,  জ্যোতি বসুর নামে।  নিরঞ্জন সেন, গণেশ ঘোষ, বিনয় চৌধুরী, গীতা মুখার্জি, প্রশান্ত শূর সহ ২৭ অগাস্ট অবধি রাজ্য জুড়ে মোট গ্রেপ্তার হন, ৭০,০০০। ৩১'শে অগাস্ট খাদ্য-মন্ত্রীর অপসারণ ও খাদ্যের দাবীতে শহীদ মিনার ময়দানে ৩ লক্ষ মানুষের ব্যাপক জমায়েতের মহাকরণ মুখী অভিযানে গুলি চালায় পুলিশ। আহত সহস্রাধিক। ১৩০ জন আশঙ্কাজনক। পরে শহীদ ৮০ জন। ১'লা সেপ্টেম্বর পুলিশের এই হিংস্র তাণ্ডবের বিরুদ্ধে আবার গুলি চালায় পুলিশ। নিহত আরও ৮। আহত ৭৭। জারি হয় ১৪৪ ধারা। ২১'শে সেপ্টেম্বর খাদ্য আন্দোলন  শহীদদের শ্রদ্ধা জানিয়ে বিধানসভায় এক মিনিট নীরবতা পালন করতে অস্বীকার করে কংগ্রেস। বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি প্রত্যাখ্যান করেন মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায়ও। হতাহতের জন্য দুঃখ প্রকাশ করতে অস্বীকার করেন পুলিশ-মন্ত্রী কালি মুখার্জি। 

কেমন লাগবে বলুন, যদি স্পার্টাকাসের জন্য দু মিনিট নীরবতা পালন করতেন জুলিয়াস সিজার? সিপাহী বিদ্রোহের শহীদ মঙ্গল পাণ্ডের প্রতি শোক ও শ্রদ্ধায় নিজের রত্নখচিত বহুমূল্য মুকুট থেকে রানী ভিক্টোরিয়া খুলে ফেলতেন বেশ কিছু মরকতমণি? হিরোশিমা-নাগাসাকির পরমাণু বোমার জন্য শোকপ্রস্তাব এনে নীরবে অশ্রু ঝরাতেন মার্কিন কংগ্রেসের সনেট বৃন্দ? 

তাই ম্যাডাম, আপনি স্বপন মালিকদের জন্য দুঃখ প্রকাশ করবেন না। খবরদার করবেন না। ওঁদের জীবনের মূল্য যখন লাল ঝাণ্ডা, অধিকার আদায়ের রং যখন লাল ঝাণ্ডা, ন্যায্য চাল-ডালের ছিনিয়ে নেওয়ার রং যখন লাল ঝাণ্ডা, শহীদের রক্তে ভেজা যে লাল ঝাণ্ডা তখন আপনি দুঃখ প্রকাশ করে ওঁদের অসম্মান করবেন না। লালঝাণ্ডার অপমান করবেন না। ইতিহাসই ওঁদের মনে রাখবে। ইতিহাসই ওঁদের বাঁচিয়ে রাখবে। আর মানুষ আপনার বিচার করবে।করবেই ...

অথ রেশন কথা ~ অনামিকা

চাইলে রেশন মরতে হবে, বুঝিয়ে দিল রায়না
নেহাত ছোট্ট দুর্ঘটনা বুঝতে কেউই চায় না।

ভোট এসেছে, গদির দখল রাখতে হলে আজ যে
ভরসা নিছক বোমা-বুলেট, জিগির সারা রাজ্যে।
সবাই নাকি জোট বেঁধেছে, বুঝছে না তো বোকারা
অবাধ্যদের মরতে হবেই, যেমন মরে পোকারা।
বাঁচতে হলে ভক্তিতে নয়, শুদ্ধ ভয়েই কাঁপো।
কলেজমোড়ে পাড়ায় ঘোরে হাজারটা গেস্টাপো।

চাকরি চাওয়া খাবার খোঁজা, ফালতু এ'সব বায়না।
উন্নয়নের রক্তধারায় ভিজতে থাকুক রায়না।

মৃত্যুশীতল গ্রামবাংলার অশ্রু পরুক চলকে।  
সাধ্যটি কার সামলাবে এই ডালকুত্তার দলকে?
একটা কণ্ঠ মানুক সবাই, একটা থাকুক পার্টি,
উঁচিয়ে আঙুল নির্দেশ দেয় মহিলা হিটলারটি।
নিজেও তবু কাঁপছে রানী নিজের ভেতর আজ।
নিজের ধ্বংসআভাস সে ঠিক পেয়েছে আন্দাজ।

রাক্ষসীরূপ দেখছে রাণী, সামনে ধরে আয়না।
কাঁদছে শোকে… ফুঁসছে ক্রোধে, প্রতিবাদের রায়না।

মঙ্গলবার, ২৬ জানুয়ারি, ২০১৬

একবগ্‌গা - সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়

বাবুসোনা ইশকুলে রোজ মার খেতো। মার বলে মার? সাধু স্যারের খেজুর ছড়ির মার, হেডস্যারের ডাস্টারের বাড়ি, লক্ষিকান্ত স্যারের কানমোলা, এমনকি রামচন্দ্র স্যারের মত ভালমানুষ লোকের কাছেও চড়-থাপ্পড় জুটিয়ে নিত কিছুনা কিছু করে। কিন্তু এত মার পড়া সত্ত্বেও বাবুসোনা একটা দিনের জন্যেও বদমায়েশি বন্ধ করেনি। মার খেয়েও বসে পড়তনা, মার এড়াতে চেষ্টা করতনা। চোখে চোখ রেখে শাস্তি নিতো প্রতিবার। ক্লাস সিক্সে উঠে দুজনের আলাদা আলাদা ইশকুল হয়ে গেল। মাঝের ক বছর আর তার দেখা পাইনি। শেষে উচ্চমাধ্যমিকের সময় আবার দুজনে একই ইশকুলে একই ক্লাসে এসে বসলুম। তখন অবিশ্যি বয়স অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু কদিন যেতেই বুঝলুম, বাবুসোনা বদলায়নি। নিয়ম না মানায় সিদ্ধহস্ত বাবুসোনা নিয়ম করে কিছুনা কিছু করে বসত যাতে গোটা ইশকুলে হুলুস্থুলু । হাজার শাস্তি পেয়েও সে শুধরোয়নি। এরকম একবগগা ছেলে খুব কমই দেখেছি।  

সোমবার, ২৫ জানুয়ারি, ২০১৬

নেতাজি অন্তর্ধান রহস্য ~ পুরন্দর ভাট

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর ফাইল প্রকাশ হওয়ার পর সেই নিয়ে অনেকের মতো আমারও কৌতুহল ছিলো। গত দু দিন ধরে মোটামুটি গোটা পঞ্চাশেক প্রকাশিত নথি ঘেঁটে দেখলাম। প্রচুর সময় গেলো কিন্তু সুভাষ বসু আমার মত কিঞ্চিত মানুষের কাছে এইটুকু সময় এবং মনোযোগ অবশ্যই দাবি করেন। জানি না যারা এই ফাইল প্রকাশ করে সুভাষ বসুকে নিজেদের লোক দেখানোয় সবচেয়ে উত্সাহী সেই দেশপ্রেমিকরা আদেও একটিও ফাইল পড়ে দেখেছে কিনা।

ফাইলগুলো দেখে যা বুঝলাম তা হলো প্রায় ৯৯%-ই অত্যন্ত সাধারণ ফাইল। এগুলো এতদিন সিক্রেট নথি হিসেবে লোকানো থাকার ব্যাখ্যা একটাই তা হলো বেশিরভাগ নথিতেই বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে কিছু যোগাযোগের রেকর্ড রয়েছে এবং কুটনৈতিক নিয়ম মেনে সেগুলো প্রকাশ করা হয়নি। কোনো ফাইলেই গোপন কোনো ষড়যন্ত্রের হদিস এখনো অবধি নেই। ফাইলগুলি পড়তে পড়তে বার বার যেটা মনে হচ্ছিলো যে নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্য ভেদ করতে এতো মানুষ এতো সময় ব্যয় করেছে যে গোটা বিষয়টা অপচয় বলেই মনে হয়। একের পর এক প্রধানমন্ত্রী, বিশেষ করে নেহেরুর লেখা গুচ্ছ চিঠি আর তত্পরতা দেখে সত্যি যে কারুর মনে হবে যে সদ্য স্বাধীন হওয়া দরিদ্র্য এক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীর কি এইরকম একটা বিষয় নিয়ে এতোখানি সময় ও মনোযোগ ব্যয় করা সাজে? সুভাষ বসুর অন্তর্ধানের পেছনে নেহরুর কিছু ষড়যন্ত্র আছে এই অভিযোগ অসত্য প্রমান করতেই বোধয় উনি এতখানি ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা আর যত্ন নিয়েছিলেন রহস্যের সমাধান করতে। আরো আশ্চর্য্যের বিষয় হলো যে যখনই বিষয়টার একটা নিষ্পত্তি করে নেতাজীর স্মৃতিকে যথাযোগ্য সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করেছে সরকার তখনই একাধিক জন মামলা মোকদ্দমা করে ফের বিষয়টাকে ঘেঁটে দিয়েছে এবং পাছে নেতাজীর অপমান হয় এই ভয়ে সরকারও এইসমস্ত গুচ্ছের মামলা মোকদ্দমাকে গুরুত্ব দিয়ে অভিনিবেশ করেছে। সমস্তটা দেখে এটাই বার বার মনে হচ্ছিলো যে দেশের এতো সমস্যা যেখানে সরকারের মনোযোগ পায় না সেইখানে এই বিষয় নিয়ে এতখানি সময় দেওয়া বোধয় বাহুল্য।

যাই হোক, আনন্দবাজার এবং অন্যান্য সংবাদমাধ্যমে দেখলাম নেহরুর ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলিকে লেখা একটা চিঠি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্ঠি হয়েছে। চিঠিতে নেহেরু নেতাজীকে "যুদ্ধ অপরাধী" বলে সম্মোধন করেছেন। চিঠির বয়ানটি হলো :

"Dear Mr Attlee,
I understand from reliable sources that Subhas Chandra Bose, your war criminal, has been allowed to enter Russian territory by Stalin. This is a clear treachery and betrayal of faith by the Russians as Russia has been an ally of the British-Americans, which she should not have done. Please take note of it and do what you consider proper and fit."
Your's Sincerely,
Jawaharlal Nehru

কংগ্রেস বলেছে এইরম কোনো চিঠি নেহেরু লেখেননি। আমি ফাইল ঘেঁটে এই চিঠি তিন জায়গায় পেলাম। এই তিন জায়গা বাদ দিয়ে এই চিঠি আর কোথাও নেই। আপনারা খুঁজে নিজেদের মূল্যবান সময় নষ্ট করতে পারেন অথবা আমার কথা বিশ্বাস করতে পারেন।

১. এই চিঠির প্রথম উল্লেখ রয়েছে শ্রী রুদ্রজ্যোতি ভট্টাচার্য্যের ১৯৯২ সালে করা কলকাতা হাই কোর্টে একটি পিটিশনে (লিংক: http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html…)। সেই সময় নেতাজীকে মরনোত্তর ভারত রত্ন দেওয়ার কথা উঠেছিলো সরকার থেকে আর তা ঠ্যাকাতে বেশ কিছু মামলা হয় যার মধ্যে এইটি একটি। এই পিটিশনে কিন্তু সরাসরি বলা হয়নি যে নেহেরু এরকম কোনো চিঠি দিয়েছিলেন। যা বলা হয়েছে তা হলো ১৯৭০-এ গঠিত খোসলা কমিশন, যার কাজ ছিলো নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যভেদ, সেই কমিশনের সামনে নেহরুর ব্যক্তিগত স্টেনোগ্রাফার শ্যামলাল জৈন এইরম একটা চিঠি টাইপ করার কথা বলেছেন। যে বয়ানটা ওপরে দিলাম নেহেরু সেই বয়ানটি একটি প্যাডে হাথে লিখে শ্যামলালকে দেন এবং তিনি সেটা টাইপ করে নেহরুকে ফেরৎ দেন। নেহেরু তারপর সেই চিঠি নিয়ে কি করেছিলেন শ্যামলাল জানেন না। শ্যামলাল কিন্তু এই বয়ান স্মৃতি থেকে বলেছেন খোসলা কমিশনের কাছে, তাঁর কাছে সেই চিঠির কোনো প্রমাণ নেই। যদি ধরেও নি যে শ্যামলাল সত্যি বলেছেন তবুও ১৯৪৫-এ লেখা একটি চিঠি হুবহু ১৯৭০-এ এসে স্মৃতি থেকে আওড়ানো সোজা কথা না। কিছু শব্দের এদিক ওদিক যে হবেনা কেউই হলপ করে বলতে পারে না। যেটা আশ্চর্য্যের বিষয় তা হলো রুদ্রবাবু কোথা থেকে শ্যামলালের বয়ানের কথা জানলেন সেটা রহস্যময়। খোসলা কমিশনের রিপোর্টের মধ্যে শ্যামলালের বয়ানের কোনো উল্লেখ নেই। এই হলো খোসলা কমিশনের রিপোর্টের লিংক : http://subhaschandrabose.org/report-one-man-commission-inqu

২. দ্বিতীয়বার এই চিঠির উল্লেখ রয়েছে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীকে লেখা নেতাজীর ভাই সুরেশ চন্দ্র বসুর ছেলে প্রদীপ বসুর ৯৮ সালের একটি চিঠিতে (লিংক: http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html… , পৃষ্ঠা - ১১২)। প্রদীপ বসুও সেই খোসলা কমিশনকে দেওয়া শ্যামলাল জৈনের বয়ানকেই তুলে দিয়েছেন চিঠিতে কিন্তু তিনিও শ্যামলাল জৈনের বয়ানের কোনো রেফারেন্স দেননি, খোসলা কমিশনের রিপোর্টে ওই বয়ান কেনো নেই তাও লেখেননি।

৩. তৃতীয়বার এই চিঠির উল্লেখ রয়েছে আবার শ্রী রুদ্রজ্যোতি ভট্টাচার্য্যের করা ২০১৩ সালে কলকাতা হাইকোর্টে একটি পিটিশনে। নেতাজীর অন্তর্ধান রহস্যের কি কিনারা হলো তা জানতে চেয়ে সেই পিটিশন। এখানেও সেই শ্যামলাল জৈনের বয়ানকেই উধৃত করা হয়েছে যদিও শ্যামলাল জৈনের ওই বয়ান কোথায় পাওয়া গেছে তার কোনো উল্লেখ এখানেও নেই। (লিংক : http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html… ) যেটা আশ্চর্য্যের বিষয় তা হলো শ্যামলাল জৈনের ওই বয়ান কিন্তু আদেও গোপন কিছু নয়। যেহেতু হাই কোর্টের পিটিশন তাই সেটা পাবলিক ডকুমেন্ট এবং সেই ডকুমেন্টে শ্যামলালের বয়ানের উল্লেখ থাকবে। একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখলাম যে যা সন্দেহ করেছিলাম তাই, এই পিটিশন নিচের দেওয়া India Kanoon ওয়েবসাইটে রয়েছে আর তাতে ওই শ্যামলালের তথাকথিত বয়ানও রয়েছে। অর্থাৎ নেহেরু সত্যি শ্যামলালকে এরকম বলেছেন কিনা জানা নেই আর শ্যামলালও এরকম কোনো কথা খোসলা কমিশনের কাছে বলেছেন কিনা তাও পরিষ্কার না কিন্তু এই তথাকহিত বয়ান পাবলিক ডকুমেন্টের মধ্যেই ছিলো, তার জন্যে ফাইল প্রকাশের প্রয়োজন ছিলো না। লিংক : http://indiankanoon.org/doc/176710997/

নেহেরু সুভাষ বসুকে যুদ্ধ অপরাধী বলেছেন এর কোনো সরাসরি প্রমাণই প্রকাশিত ফাইলে নেই, উল্টে যা আছে তা হলো সুরেশ চন্দ্র বসুর এক প্রশ্নের জবাবে নেহরুর চিঠি যাতে উনি লিখেছেন যে নেতাজীকে যুদ্ধ অপরাধী বলবার কোনো প্রশ্নই ওঠে না এবং অন্য কোনো দেশ যদি তা মনেও করে তাদের হাতে নেতাজীকে খুঁজে পাওয়া গেলে তুলে দেওয়ার কোনো প্রশ্ন নেই। নেহেরু গঠিত শাহ নওয়াজ কমিশনে সুভাষ বসুর দাদা সুরেশ চন্দ্র বসু একজন সদস্য ছিলেন এবং সেই কমিশনের কাজ শুরুর আগে তিনি নেহেরুকে প্রশ্ন করেছিলেন যে নেতাজীকে যদি জীবিত খুঁজে পাওয়া যায় তাহলে ভারত সরকার তাকে যুদ্ধ অপরাধী বলে ধরবে কিনা। তার উত্তরে নেহেরু ওই চিঠি লেখেন। লিংক : http://netajipapers.gov.in/pdfjs/web/viewer.html… পৃষ্ঠা ১৩০।

উপরন্তু, ভারত সরকার একাধিকবার জাতিসংঘ এবং মার্কিন ও ব্রিটিশ সরকারকে চিঠি লিখেছে জানতে চেয়ে যে আদেও যুদ্ধ অপরাধীর তালিকায় সুভাষ বসুর নাম আছে কিনা এবং প্রত্যেকবারই তারা জানিয়েছে যে এরকম কোনো তালিকায় সুভাষ বসুর নাম নেই। এইসবও বেশ কয়েকটা ফাইলে আছে। এমন কি ফাইলের মধ্যে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং ভারতে ব্রিটিশ সরকারের প্রতিনিধিদের মধ্যে একাধিক চিঠিপত্রও ফাইলগুলির মধ্যে রয়েছে যেগুলো সুভাষ বোস বেঁচে থাকতে লেখা। সেগুলোয় তাদের মধ্যে আলোচনা দেখা যাচ্ছে যেখানে তারা বলছেন যে কোনো আইনেই সুভাষ বসুকে যুদ্ধ অপরাধী হিসেবে ধরা যাবে না, ধরা পড়লে তার বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরোধিতা করবার কনস্পিরাসির কেস দেওয়া যেতে পারে কিন্তু সেরকম কোনো কেসের ট্রায়াল মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে সেই নিয়ে তারা চিন্তিত।

অমর্ত্য সেন যে মন্তব্য করেছেন তার সাথে একমত। নেতাজীকে সংকীর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে ব্যবহার করা বন্ধ করা হোক, দিন কে দিন মানুষের বিরক্তিই এতে বাড়বে আর সেই বিরক্তির ভাগীদার অকারণে নেতাজীকে হতে হবে। তাঁর কাজকম্ম, আদর্শ নিয়ে আলোচনা হলে সেটা অনেক বেশি লাভজনক।

মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০১৬

ইউ.এফ.ও, নোবেল ও টেনিদা ~ আশিস দাস

চাটুজ্যেদের রোয়াকে একলা বসে সামনের ত্রিফলাটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হঠাৎ কেমন একটা ভাব চলে এল। সবে বেশ মেজাজে রঙ দে তু মোহে গেরুয়া গানটা শুরু করতে যাব মাথায় খটাং করে এক গাঁট্টা! "কে বে" বলে চিৎকার করে পিছন ঘুরেই দেখি তিনি। কে আবার? সেই আদি ও অকৃত্রিম টেনি মুখুজ্জে।
রোয়াকে বসে দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলে উঠল, "এটা গান হচ্ছে? মনে হচ্ছে তো গলায় দুটো কোলাব্যাং ঢুকে হানি সিং এর গানের তালে ডিস্কো নাচছে!"
আমার মাথাটা গেল গরম হয়ে। মনে হল বলি,"এসব সূক্ষ কলার তুমি কি বুঝবে? সারাদিন শোন তো পাগলু আর খোকাবাবু!" তবে কিনা আগের গাঁট্টায় তো পেটের পিলে অব্দি চমকে উঠে এক্সকিউস মি বলে উঠেছিল তাই হালকা চেপে গেলাম।
টেনিদা জিগেস করল, "হাবুল আর ক্যাবলা বাছাধনেরা গেল কই?"
আমি ব্যাজার মুখে বললাম,"দুজনেই বেড়াতে গেছে, তাও আবার বিদেশ। হাবুল নেপাল আর ক্যাবলা সিঙ্গাপুর-ব্যাঙ্কক।"
টেনিদা নাকমুখ কুঁচকে বলল, "সবকটাকে মোদীরোগে ধরল নাকি? যাকগে যাক। তুই তো আছিস, তুই আমার সেরা চ্যালা রে প্যালা।"
আমি খুশি হয়ে বললাম," তাতো বটেই। কিন্তু ওরা কি বিশ্বাসঘাতক ভাবো একবার তুমি!"
টেনিদা ভাবুক মুখ করে বললো,"হ্যাঁ, তাও গেল কোথায়? না নেপাল আর সিঙ্গাপুর। তাও যদি ইকিয়াং টুচিস্কি তে যেত না হয় বুঝতাম।"
গল্পের গন্ধ পেয়ে আমি টেনিদার দিকে সরে বসলাম। নিরীহভাবে বললাম, "সেটা কোথায় গো টেনিদা? চীন না আফ্রিকা?"
কিন্তু টেনিদা তো আর দেশের জনগণ নয় যে নেতা থেকে জুকারবার্গ সবাই বোকা বানিয়ে চলে যাবে! সঙ্গে সঙ্গে বলে, "অত সোজা নয় বাবা প্যালারাম বাঁড়ুজ্জে। ফ্রিতে গপ্প শোনার মতলব? বড় রাস্তার লেবানিজ রোলের দোকানটা থেকে চটপট ঘুরে এস একবার দেখি।"
ব্যাজার মুখে চিকেন র‍্যাপটা নিয়ে ফিরতেই ছোঁ মেরে নিয়ে গপ গপ করে তিন কামড়ে গোটাটা সাবাড় করে দিয়ে হাতটা আমার জিন্সেই মুছে শুরু করল টেনিদা," সেবার যখন নোবেল চুরি গেল রবীন্দ্রনাথের, সিবিআই তো অনেক খুঁজেও কিছুই করতে পারলো না। সবরকম চেষ্টার পর শেষে মুখ্যমন্ত্রী আমায় ডেকে বললেন, 'টেনি, দেখো গত ৩৪ মাস ধরে নোবেল পাওয়া যাচ্ছেনা। এর পিছনে সিপিয়েমের চক্রান্ত আছে আমি জানি, সব সাজানো ঘটনা। কিন্তু প্রমাণ পাচ্ছিনা। তোমাকেই নোবেলটা খুজে আনতে হবে, আমি তোমাকে নোবেলশ্রী উপাধি দেব।'
বার খেয়েই হোক আর কৌতুহলেই হোক আমি রাজী তো হয়ে গেলাম। কিন্তু খুজি কোথায়? ব্যাপারটা ভীষণ পুঁদিচ্চেরি হয়ে উঠছে দেখে একদিন মেট্রো করে ময়দান গেলাম ব্রেনটা ফ্রেশ করে নিতে একটু। তো ময়দানে শুয়ে শুয়ে খুব ভাবছি খুব ভাবছি। রাত হয়ে গেছে আশপাশে কেউ নেই বুঝলি! হঠাৎ দেখি আকাশে চাকতি মতো কি একটা জ্বলজ্বল করছে। প্রথমটায় ভাবলুম হয়তো এই বিশ্ববাংলা টাংলার জন্য ফানুস উড়িয়েছে হয়তো। কিন্তু একটু বাদেই সেটা মাঠে নেমে এল। দেখি সেটা একটা ইউ.এফ.ও-"
আমি খাবি খাওয়া কাতলার মত ঢোঁক গিলে আঁতকে উঠলাম, "কি! ময়দানে ইউ.এফ.ও!!"
দাঁত খিঁচিয়ে টেনিদা চেঁচিয়ে উঠল, "কেন শুনি? ওগুলো কি শুধু নিউ ইয়র্ক আর এল.এ তেই নামতে পারে? বঙ্কুবাবুর বন্ধু পড়িস নি? বাংলায় এত শিল্প আসছে আর একটা এলিয়েন এলেই দোষ?"
আমি মনে মনে ভাবলাম "ঢপ তো এবার স্মৃতি ইরানির লেভেলে যাচ্ছে মাইরি!" কিন্তু টেনিদার চোখে (মোদি প্রধানমন্ত্রী হবার পর আডবানির চোখের মত) হিংস্র আগুন দেখে থেমে গেলাম। বরং বললাম, "হ্যাঁ হ্যাঁ তাতো বটেই। তাছাড়া এলিয়েন তুমি ছাড়া আর কার কাছেই বা আসবে?"
টেনিদা বলল, "লাস্ট ওয়ার্নিং প্যালা। আর একবার কুরুবকের মত বকবক করলে এক চড়ে তোর কান-"
"কানহা রিসার্ভ ফরেস্টে বাঘের মুখে গিয়ে পড়বে", শেষ করলাম আমি।
বদরাগী হলেও টেনিদা গুনের কদর করে। তাই খুশি হয়ে বললো,"এটা বেশ নতুন দিলি তো, আচ্ছা গপ্প শোন। তো ইউ.এফ.ও থেকে কটা লিকলিকে চেহারার পিঁপড়ের মত দেখতে লোক এসে প্রথমে বলে 'ইস্টাকু হুপিয়াকু চিং?' আমি তো বললাম, 'যা বলবে বাংলায় বল বাপু'। তখন কি একটা মাথার নব ঘোরালো আর বলতে শুরু করল, 'মহাশয়, আপনার শুভ নাম কি ভজহরি মুখার্জী?' আমি বললুম, 'হ্যাঁ'। ব্যাস কি একটা লেসার মত তাক করল আমার দিকে আর আমি পুরো ফ্ল্যাট। জ্ঞান আসতে দেখি আমি বন্দি। বাইরে আকাশে দেখা যাচ্ছে কিন্ত কি আশ্চর্য! আকাশের রঙ নীল সাদা ডোরা কাটা! সে যাই হোক খানিকবাদে আমাকে ওরা নিয়ে গেল ওদের রাজার কাছে। সে বললো, 'মহাশয় শুনুন। আমাদিগের গ্রহের নাম ইকিয়াং টুচিস্কি। আমরা অতীব নিরীহ প্রাণী, আমরাও রবীন্দ্রনাথ পড়িয়া থাকি। কয়েক বৎসর পূর্বে আমাদিগের জ্যোতিষী ভবিষ্যৎবাণী করিয়াছিলেন যে আপনাদিগের গ্রহে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ঘোর দুর্দিন আসিতেছে। রাস্তার মোড়ে হিসি করা প্রৌঢ় হইতে গাছের আড়ালে কিসি করা যুগল সকল ব্যক্তিকে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনিতে বাধ্য করা হইবে। অতএব প্রতিবাদস্বরুপ আমরা নোবেল হরণ করিয়া লইয়া আসি। আপনাকেও আমরা যাইতে দিতে পারিবনা, আপনাকে আজীবন বন্দি থাকিতে হইবে।'
আমি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলাম। তারপর হঠাৎ মাথায় একটা সাংঘাতিক বুদ্ধি খেলে গেল। আমি বললাম, 'দেখুন স্যার আমি কিন্তু শিল্পী মানুষ, এখানে আমার শিল্পসাধনা করতে পারব তো?' ওরা খুশি মনে সায় দিল। আমিও একটু পর থেকে কাজ শুরু করলাম, একটা হতে না হতেই খেল খতম। চেয়ে দেখি মেঝেতে পড়ে সব ব্যাটা চিঁ চিঁ করছে! কেউ কান চেপে বসে, কেউ মাথার চুল ছিঁড়ছে। ব্যাস আর আমাকে পায় কে। বললুল,'দেখুন স্যার এখানে আমাকে রাখলে কিন্তু এই রকমই চলবে সারাদিন।' ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে সেই রাতেই ব্যাটারা আমাকে ময়দানে নামিয়ে দিয়ে গেল! নোবেলটাও চাইলে দিয়েই দিত, কিন্তু ভাবলাম যা খিল্লি হচ্ছে বুড়োকে নিয়ে ওটা অন্যগ্রহেই থাক।"
আমি কৌতুহল চাপতে না পেরে বলেই ফেললুম, "কিন্তু কি করলে তুমি ওদের?যার এত ক্ষমতা?"
টেনিদা কেজরিওয়ালের মত হালকা হাসি দিয়ে বলল, "আরে বোকা যখন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে গেছিলাম তখন উনি ওনার লেখা কবিতার ২টো বই গিফট দিয়েছিলেন তো! সেটারই একটা মুখস্ত করে ঝেড়ে দিয়েছিলাম! হু হু বাওয়া, এ হল টেনি শর্মা! আমার সাথে পাঙ্গা!"

রবিবার, ১৭ জানুয়ারি, ২০১৬

উন্নয়নের জোয়ার ~ সুশোভন পাত্র

আদর করে প্রেমিকার নাম রাখল সে 'রাজকন্যে'। কিম্বা ধরুন 'ডার্লিং'। নিদেনপক্ষে 'সোনা','রূপা'। এর নিচে জাস্ট আর নামা যায় না। প্রেমিকের নাম আর যাই হোক 'লোহা-লক্কড়' তো হতে পারে না। বিয়ের পর নববধূর নবীকরণ। নতুন নাম 'সুইট বাবি'। কাউন্টার পার্টের তুমুল জবাব ওয়ান অ্যান্ড অনলি আমার 'হাবি'। কনটেম্পোরারি সময়ে, জীব প্রেমের ঈশ্বর সেবাতে মানুষ যখন পোষা কুকুরের নাম রাখে 'পেপসি' কিম্বা 'পোস্ত', তখন প্রেম রাখতে, প্রেমে থাকতে মানুষ স্বাভাবিক কারণেই 'নামকরণে' ব্যস্ত। আর নামকরণ শুধু নামকরণই নয়। নামকরণ তো আর্ট। উপরন্তু এ রাজ্যে নামকরণ আবার উন্নয়নেরও পার্ট। ঐ যে যেমন চার মাসেই দিদিমণির ৯৯% কাজ –আগের প্রকল্পের নতুন নামকরণে কিসেরই বা লাজ ?
আমেরিকায় এখন বাচ্চাদের নামা রাখা হচ্ছে বন্দুকের থিমে। পিস্তল, ট্রিগার, শুটার। 'শর্ট অ্যান্ড প্রিসাইস'। যেমন ধরুন ইউপিএ-১ সরকারের 'কমন মিনিমাম প্রোগ্রামের' অংশ 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনার' নতুন নাম পড়ল 'কন্যাশ্রী'। 'শর্ট অ্যান্ড প্রিসাইস'। ২০১৩-১৪ এ রাজ্যে কনাশ্রী প্রকল্পে মোট আবেদনপত্র জমা পড়েছে ১৯.৮৮ লক্ষ। মঞ্জুর হয়েছে ১৮.৩ লক্ষ। আর ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে ১০,২৮৬। হল তো, ৯৯% কাজ? 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনা'য় যেখানে চতুর্থ শ্রেণীর কন্যা শিশুরা পেত ৫০০ টাকা আর নবম-দশম শ্রেণীর কন্যা শিশুরা ১০০০ টাকা, সেখানে এখন সবাই হাতে পরার বালা পায়, কেউ আবার সাইকেলও পায়। সে সাইকেল বিক্রি করতে OLX –এ বিজ্ঞাপনও পড়ে। এটাই তো উন্নয়ন যজ্ঞ। সাবড়াকোনের সালমা খাতুনের সাইকেল চালাচ্ছে মনিপুরের ইয়াইফাবা প্যাংগাম্বম। 'বালিকা সমৃদ্ধি যোজনার' মোট খরচের ১০% পণপ্রথা ও শিশু বিবাহের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি তে তথ্য ও সম্প্রচার দপ্তরের থেকে খরচা হবার কথা ছিল। এখন ১০%'র বেশী হয়। সচেতনতা বাড়াতে নয়। গজলের জলসা বসাতে। হল, শিল্পও হল। সিঙ্গুর না হোক। গুলাম আলি তো হল।
বাঙালি তো আবার ডাকনাম ছাড়া কাজ চলে না। বিখ্যাত কিছু ডাক নাম যেমন পচা, ক্যাবলা, নন্টে ফন্টে, গাবলু , হাবলু এবং 'আনন্দধারা'। ১৯৯৯'র 'স্বর্ণজয়ন্তী গ্রাম স্ব-রোজগার যোজনা'র বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে ২০১০ কেন্দ্রীয় সরকার নাম দিল, 'ন্যাশনাল লাইভলিহুড মিশন'। বাংলার কৃষ্টি ও ঐতিহ্যে বিশ্বাসী আমাদের মুখ্যমন্ত্রীর আবার ঐ শক্ত নাম পছন্দ হল না, নাম রাখলেন 'আনন্দধারা'। আগে রাজ্যের সব জেলায় যে প্রকল্প চালু ছিল। পরিসংখ্যানে দেশের মধ্যে ছিল প্রথম সারির এখন তা সর্বসাকুল্যে চালু আছে ২৪ টি ব্লকে। কিন্তু তাতে কি ? নাম তো বদল হল। অতএব, আবার উন্নয়ন হল।
বাচ্চা ছেলের নাম 'গুগল'। গুগলের গার্লফ্রেন্ড 'কিউটি পাই'। ঠিক যেমন কন্যাশ্রীর সুরে সুরে মিলিয়ে 'বেকার ভাতা' আর' যুব উৎসাহ প্রকল্পের' নতুন নাম 'যুবশ্রী'। ২০১০'র বাজেটে এই প্রকল্পের  আর্থিক বরাদ্দ দ্বিগুণ করা হয়েছিলো। আর নতুন মুখ্যমন্ত্রী ঐ প্রকল্পের সুবিধা পাবার শর্ত হিসেবে 'সম্পূর্ণ বেকার' শব্দবন্ধ কে বদলে দিয়ে শুধু 'বেকার' করেছেন। আফটার অল তোলাবাজরা তো আর 'সম্পূর্ণ বেকার' না। উন্নয়নের দ্রবণ, আদিবাসী তপশিলি দরিদ্র বেকার থেকে শুরু করে তোলবাজ হয়ে সাম্বিয়া সোহরাব, সবার জন্যই তো হোমজিনিয়াস হওয়া উচিত। সুতরাং তোলাবাজরাও পয়সা পেল। হল,আবার 'পরিবর্তন' হল।    
২০০৬ সাল থেকেই বৃষ্টির জল ধরে রেখে, সেচের মাধ্যমে রাজ্যের প্রায় ৭২% জমিতে চাষ যোগ্য জল পৌঁছে দেওয়া গিয়েছিলো। এখন কত শতাংশ জমি সেচের আওতায়? সরকারী তথ্য কি বলে? জানেন? ছাড়ুন তো। এই প্রকল্পেরও নতুন নাম তো পড়েছে। 'জল ধর জল ভর'। নাম যখন  নতুন,তখন নিশ্চয় উন্নয়নও হয়েছে। ৯৯% জমিতেই সেচের জলও পৌঁছে গেছে। আগের 'স্বনির্ভর গোষ্ঠীর' উন্নয়নও হয়েছে, "আত্মমর্যাদা"। প্রতি ব্যক্তির ঋণ পিছু প্রকল্পেরও উন্নয়ন আজ "আত্মসম্মান"।
আসলে কি জানেন, হিজিবিজ্‌বিজ্‌ বলল, 'একজনের মাথার ব্যারাম ছিল, সে সব জিনিসের নামকরণ করত। তার জুতোর নাম ছিল অবিমৃষ্যকারিতা, আর ছাতার নাম ছিল প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, তার গাড়ুর নাম ছিল পরমকল্যাণবরেষু- কিন্তু যেই বাড়ির নাম দিয়েছে 'নবান্ন', অমনি ভূমিকম্প হয়ে বাড়িটাড়ি সব পড়ে গিয়েছে...

বৃহস্পতিবার, ১৪ জানুয়ারি, ২০১৬

ঋণ নিয়ে ডাহা মিথ্যা ~ পুরন্দর ভাট

• তৃণমূলীরা বারবার প্রচার করে, বামফ্রন্ট সরকার ১লক্ষ ৯২হাজার কোটি টাকা ঋণ করে গেছে। বাস্তবে সেই ঋণ স্বাধীনতা প্রপ্তির সময় থেকে ২০১১ সালের ১১ই মে পর্যন্ত সময়ে করা। বাজার থেকে করা ঋণের পরিমাণ তুলনায় কমই ছিল।

• বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে স্বল্পসঞ্চয়ে পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে অগ্রগণ্য ছিল। চিটফান্ডগুলির রমরমা ঠেকাতে তা কাজে এসেছিল। অথচ, কেন্দ্রীয় সরকারের বিচিত্র একতরফা আইন অনুসারে রাজ্যে যত অর্থ স্বল্পসঞ্চয়ে সংগৃহীত হতো, তার একটি অংশ বাধ্যতামূলকভাবে রাজ্য সরকারকে নিতে হয়। সেই কারণে, কেন্দ্রীয় আইন অনুসারে ৭৯হাজার কোটি টাকা ঋণ হয় কেন্দ্রের কাছে। এই ঋণ বাজার থেকে করা ঋণ নয়।

• কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা খাতের বরাদ্দের ৭০শতাংশ রাজ্য সরকারকে নিতে হতো ঋণ হিসাবে। সেই ঋণের পরিমাণ বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে ছিল ১২হাজার ৩০০কোটি টাকা।

• নাবার্ডসহ বিভিন্ন কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানের সাহায্য থেকে রাজ্যের ৩৪বছরে ঋণ দাঁড়ায় ৮হাজার ৫০০কোটি টাকা।

• পি এফ তহবিলে ঋণের পরিমাণ বামফ্রন্ট সরকারের সময়কালে ছিল ৮হাজার কোটি টাকা।

• কেন্দ্রীয় সরকার আর্থিক বছরের শেষ লগ্নে টাকা পাঠানোয় কখনও কখনও টাকা খরচ করা যায় না। খরচ না হওয়া ওই টাকা পরের আর্থিক বছরের ধারের তালিকায় ঢুকে পড়তো। এমন ১২হাজার কোটি টাকাও চৌত্রিশ বছরে ঋণের তালিকায় রয়েছে।

• এইসব নিয়ে ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ১লক্ষ ৯২হাজার কোটি টাকা।  তার মধ্যে বাজার থেকে ধারের পরিমাণ ৭২হাজার কোটি টাকা।

• তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রায় সাথে সাথেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির প্রশ্ন ছিল ঋণভারে জর্জরিত অর্থনীতির সাহায্যে কি কোনো উন্নতি করা সম্ভব? রাজ্যের বহুল প্রচারিত একটি সংবাদপত্র সেদিন তাদের  প্রতিবেদনে লিখেছিল, ''সম্প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে বৈঠকে রাজ্যের আর্থিক পরিস্থিতি বোঝাতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন রাজ্যের এক টাকা আয়ের ৯৪ পয়সাই চলে যায় বেতন পেনশন, সুদ ইত্যাদি যোজনা বহির্ভূত খরচ মেটাতে। তাঁর প্রশ্ন ছিল, ৬ পয়সায় কি উন্নয়ন সম্ভব? (আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬ অক্টোবর, ২০১১)

• সত্যিই কি এক টাকা আয়ের ৯৪ পয়সাই চলে যায় বেতন, পেনশন, সুদ ইত্যাদি যোজনা বহির্ভূত খরচ মেটাতে? ডাহা মিথ্যা কথা।  তৃণমূল রাজ্য সরকারেরই তথ্য বলছে, ২০১৪-১৫ আর্থিক বর্ষে  ঋণ, বেতন, পেনশন বাবদ রাজ্য সরকারের খরচ হয়েছে মোট  ৭৪ হাজার ৮৮৮ কোটির সামান্য বেশি। সেখানে  ২০১৪-১৫ আর্থিক বর্ষে রাজ্য সরকারের  মোট আয় ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা। (সূত্র : বাজেট অ্যাট এ গ্লান্স ২০১৫-১৬, পৃ: ১ ও পৃ: ১৩) অর্থাৎ, বেতন, পেনশন, সুদ এই তিনটি খাতে রাজ্য সরকারের খরচের পরিমাণ আয়ের ৫৮ শতাংশ, মমতা ব্যানার্জি কথিত ৯৪ শতাংশ নয়।

• বর্তমানে ধার করার হিসেবে তৃণমূল-শাসিত পশ্চিমবঙ্গ দেশের মধ্যে 'এক নম্বর'। বামফ্রন্ট সরকার বিদায় নেবার সময় (২০১১ সালের ১১ মে) সব মিলিয়ে (স্বাধীনতার পর কংগ্রেসী আমলের ঋণসহ) রাজ্যের পুঞ্জিভূত ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লক্ষ ৯২ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের বাজেটে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত রাজ্যের মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ২ লক্ষ ৯৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। সরকারি তথ্যই জানিয়ে দিচ্ছে মমতা ব্যানার্জির সরকার পাঁচ বছরে রাজ্যবাসীর মাথায় অতিরিক্ত ১ লক্ষ ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ চাপানোর ব্যবস্থা করেছে। সবটাই বাজার থেকে নেওয়া ধার।

• ২০১১সালের ২০শে মে মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েছিলেন মমতা ব্যানার্জি। ক্ষমতায় আসার প্রথম ১০মাসে নতুন সরকার বাজার থেকে ধার করেছিলো ১৭হাজার ৫০০কোটি টাকা। ২০১২-১৩আর্থিক বছরে রাজ্য ধার করে প্রায় ২১হাজার কোটি টাকা। ২০১৩-১৪ আর্থিক বছরে  বাজার থেকে মমতা ব্যানার্জির সরকারের ধারের পরিমাণ ছিলো ২১হাজার ৫৫৬কোটি ৪২লক্ষ টাকা। ২০১৪-১৫-তে বাজার থেকে রাজ্য সরকার ধার নিয়েছিল ২১হাজার ৯০০কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ আর্থিক বর্ষের প্রথম মাসে, অর্থাৎ ২০১৫-র এপ্রিলে, রাজ্য সরকার ১০০০কোটি টাকা ধার করে। তারপর প্রায় প্রতিমাসেই ধার।

• ১৯৪৭ থেকে ২০১১ পর্যন্ত রাজ্য সরকার  গড়ে প্রতি বছর ঋণ নিয়েছিল  ৫ হাজার ৪৪৯ কোটি টাকা। অন্যদিকে গত পাঁচ বছরে বছরে গড়ে ২৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে।

ঋণের টাকা কোথায় গেল?

• লক্ষাধিক কোটি টাকা রাজ্য সরকার ধার করলেও কাজ কী করলো? প্রশ্ন সেটাই। নতুন কোনো স্থায়ী সম্পদ সৃষ্টি হয়নি বলেই চলে। শুধু শিলান্যাস হচ্ছে। বামফ্রন্টের আমলে তৈরি সরকারী বাড়ি, হাসপাতাল, সেতুতে নীল-সাদা রঙ চাপিয়ে পাথরে মন্ত্রী-নেতাদের নাম খোদাই চলছে। রেগার মজুরি দেওয়া হয়নি। সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলি বন্ধ হবার মুখে, উন্নয়নমূলক কাজে টাকা নেই। টাকা ঢালা হচ্ছে  সরকারী মেলা, মোচ্ছব আর উৎসবের নামে  এবং চক্ষু লজ্জাহীন সরকারী প্রচারে।  মুখ্যমন্ত্রীর জেলা সফর ঘিরে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।

• পরিকল্পনা বহির্ভূত খরচে রাশ না টানার ফলেই প্রতি মাসে নিয়ম করে বাজার থেকে টাকা ধার করছে রাজ্য সরকার। ২০১৪-১৫সালের রাজ্য বাজেটে পরিকল্পনা উন্নয়ন খাতে সরকার ৪২হাজার কোটি টাকা ব্যয় করার উদ্যোগ নিয়েছে। আর উলটোদিকে পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে রাজ্য সরকারের ব্যয় বরাদ্দ ১লক্ষ ১৪হাজার ৩১৯কোটি টাকা। বিপুল পরিমাণ পরিকল্পনা বহির্ভূত খাতে খরচ করার মধ্য দিয়েই বেহিসাবি খরচে কোনো লাগাম নেই।

• সরকারি হিসাব অনুযায়ী এক শতাংশ মহার্ঘ ভাতা বাবদ মাসিক ব্যয়ের পরিমাণ ২৫ কোটি টাকা বা বছরে ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এর জন্য বছরে ১৬ হাজার ২০০ কো‍‌টি টাকা সরকারের হাতে রয়ে গেছে। বর্তমানে বকেয়া ৫৪ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা দিয়ে ২০১২ সালের জুলাই মাস থেকে ২০১৫ সালের অক্টোবর মাস পর্যন্ত সাশ্রয়ের পরিমাণ ৩০ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এত টাকা কোথায় নয়ছয় করলো তৃণমূল সরকার?

চর্বিতচর্বণ ~ মনিপর্ণা সেনগুপ্ত মজুমদার

" আমার বর না ... বিছানায় পড়লেই বাঘ ! "

উঁহু উঁহু, আঁতকে উঠবেন না, নীল ছবিজনিত কোন দৃশ্যকল্প বা আলোচনা নয়, এ এক গভীর সমস্যা। এবং উপরোক্ত মন্তব্যটি নেহাতই বাস্তব।
এ সমস্যা যে কী নিদারুণ তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝবেন না ...রাতের বেলা ঘুমের মাঝে কী ভয়ানক আতঙ্কে চমকে চমকে উঠতে হয় বা হঠাৎ মনে হয় বুঝি অনেকগুলো বাঘ ঘিরে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ...এই ঝাঁপিয়ে পড়লো বলে! ভয়ে শিঁটকে গিয়ে সঙ্গীকে ঠেলে তুলে দিতে হয় , যাক্‌ বাবা ...কিছুক্ষণের জন্য নিশ্চিন্তি। সবে চোখ বুঁজে এসেছে , এমন সম, আবার আবার "ওই আসে ওই অতি ভৈরব হরষে " ...ঘুমের দফারফা ।

আরে হ্যাঁ রে বাবা, নাক ডাকার কথাই বলছি। বিভিন্ন স্টাইলের নাক ডাকা আছে , বেশীরভাগই অবশ্য গোদা টাইপ "ঘোঁঊঊঊঊঊঊ " করে এক ভয়ানক চিক্কুর ছেড়ে পর মুহূর্তেই "ভা ভা ভা ভা ঘঁতঘঁতঘঁত হুঁ হুঁ হুঁ " । কিছু ওস্তাদ ডাকিয়েও আছেন । প্রথমে মিঠে তান ধরেন, তারপর আস্তে আস্তে ক্রমশঃ উচ্চকিত হয় স্বর...ঠমক-গমক শুনে বাচ্চারা রাত-বিরেতে ভয়ে চিল্লিয়ে ওঠে। ঠাট্টা - মস্করা করছিনা মশাইরা, জানি নাকের গঠনজনিত কারণে বা ঘুমের সময় মুখের ভেতরের মাংসপেশি শিথিল হয়ে পড়ায় শ্বাস প্রশ্বাসে অসুবিধা হওয়ায় বা এরকম আরো একশো আটটি কারণে মানুষ নাক ডাকে বা ডাকতে বাধ্য হয়। কিন্তু তার ফলে অন্য মানুষের যে জীবনমরণ সমস্যা উপস্থিত হতে পারে তার কথাই বলছি আর কী। সম্মানহানিও হতে পারে। বিশ্বাস না হলে স্বচক্ষে দ্যাখা বা স্ব কর্ণে শোনা দু- একটি ঘটনার উল্লেখ করছি । সঙ্গত কারণেই নাম গোপন রাখতে হচ্ছে ...

'ক' বাবু বাবা হয়েছেন খুব বেশীদিন নয়, কন্যাটির সবেমাত্র আধো বুলি ফুটেছে মুখে । শ্রীমতি 'ক' যেখানে পারছেন সেখানেই এই ক্ষণজন্মা কন্যাটির নানাবিধ গুণপনা ব্যক্ত করছেন এবং বিস্ময়ের অতলে গিয়ে ভাবছেন '' এ মেয়ে বড় হয়ে আইনস্টাইন না হয়ে যায়না '' । তা এরকমই এক সময়ে 'ক' পরিবার নিমন্ত্রণ রক্ষায় এক সান্ধ্যবাসরে উপস্থিত। 'ক' গিন্নী হাসি হাসি মুখে বেড়াল দেখিয়ে মেয়েকে জিজ্ঞেস করছেন " বল তো সোনা ওটা কী " ...মেয়েও ঝট্‌পট্‌ জবাব দিচ্ছে । আচমকা কছেই কোথাও গভীর, গম্ভীর এক হাম্বারব শোনা যায় এবং খুকি হাততালি দিয়ে বলে ওঠে , "বাবা ডাকছে , বাবা ডাকছে, বাবা আত্তিবেলায় এইলোম কয়ে ডাকে " । তারপরের ঘটনা আর নাই বা বললাম, সহজেই অনুমেয় ।

পতিব্রতা ভার্‌তীয় নারীরা মানিয়ে গুছিয়ে নেন ভাগ্যকে অভিশাপ দিয়ে। গর্জনের সঙ্গে ঘর করতে প্রথম প্রথম অসুবিধে হলেও ( আমার এক বন্ধু তো এক রাতে ' চীঁচঁঈঈঈঈ হোয়াও হোয়াও হোয়াও ঘ্যাস ঘ্যাস ঘ্যাস ' এরকম আওয়াজ শুনে ভেবেছিল ঘুমের মধ্যে বুঝি বা তার বরের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে , অন্তিম সময় উপস্থিত ...তাকে জাগানোর চেষ্টায় বিছানায় জল-টল ঢেলে একাক্কার কান্ড! ) । একেকজন অভ্যস্ত হয়ে যান এমনই যে একসময় ওই বীভৎস আওয়াজ না হলে তাঁদের ঘুমই আসতে চায়না। অনেকে ' শব্দই ব্রহ্ম ' এই তত্ত্ব মেনে নিয়ে যাহোক একটা রফা করে নেন নিজের সঙ্গে বা নিজের নিদ্রাজনিত শান্তির সঙ্গে। বাকিরা গুম্‌রে মরেন এবং ক্যানো বিয়ের আগে একবার ঘুমিয়ে দ্যাখেননি হবু বরের সঙ্গে ( মাইন্ড ইট্‌, ঘুমিয়ে বলা হয়েছে ) সেই ভেবে কপাল চাপড়াতে থাকেন।

এতক্ষণ ধৈর্য ধরে পড়ার পর (যদি আদৌ এতটা পড়ে থাকেন কেউ ) কোন পুরুষ পাঠক আমায় একচোখো ভেবে হয়তো মনে মনে একচোট খিস্তিই দিয়ে ফেলেছেন আর ভাবছেন " বললেই হল , মেয়েরা নাক ডাকে না নাকি !" অবশ্যই ডাকে। এবং সময়ে সময়ে তা অতীব ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। এ বিষয়ে সামান্য একটি ঘটনার উল্লেখ করছি ।

দিল্লী চলেছি , রাজধানী থ্রী টায়ার এসি কামরা। প্রায় সকলেই খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়েছে, ইতিউতি দু-একটা রিডিং ল্যাম্প ছাড়া সব বড় আলোই প্রায় নেভানো। নাইট বাল্‌ব গুলোর আলো-ছায়ায় বেশ একটা মায়াময় আবহাওয়া। হঠাৎ অন্ধকারের বুক চিরে, ট্রেনের আওয়াজ কে ছাপিয়ে এক হৃদয়-বিদারক আর্তনাদ "আআআআআআউঁঁউঁউঁউঁ ওঃওঃওঃ"। সে যে কী পৈশাচিক লিখে বোঝানোর ক্ষমতা নেই আমার !! আশপাশের প্রায় সকলেই প্রচন্ড আতঙ্কে ঘুম ভেঙ্গে কাঠের মত শক্ত হয়ে শুয়ে আছে বেশ বুঝতে পারছি ... আমার উল্টোদিকের বার্থে এক অবাঙালী ভদ্রলোক ছিলেন , তিনি নামতে যেতেই তাঁর স্ত্রী শক্ত ভাবে চাপা কন্ঠস্বরে বললেন, "আরে রহ্‌নে দো জী, উঠো মৎ"। আমি নিজেও ঘুম ভেঙ্গে কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এমন সময়ে আচম্বিতে আবার সেই চীৎকার! এবার অনেকেই বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। শব্দের উৎস স্থল দু-তিনটি বার্থের পরে একটি সাইড-আপার বার্থ। দুজন ভদ্রলোক এগিয়ে গেলেন, যদি ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে কিছু উপকার হয় ...কারণ ওই আর্তনাদ বা নাক-নিনাদের মধ্যে ট্রেনে অন্য সহযাত্রীদের ঘুমানো অসম্ভব। কিন্তু পরক্ষনেই জানা গেল যে উনি একজন ভদ্রমহিলা। ' ও দিদি , ও দিদি , ও ভাবীজি , ম্যাডাম ম্যাডাম করে হাঁকডাঁক করেও তার ঘুম ভাঙ্গানো গেলনা। কামরার সকলেই প্রচন্ড বিরক্ত । তারমধ্যে দ্যাখা গেল মহিলার সঙ্গী কেউ-ই নেই যিনি তাঁকে সজোরে ধাক্কা মেরে জাগিয়ে একটু সাহায্য করতে পারেন । মহিলার ঠিক নীচের বার্থের ভদ্রলোক সকলের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলতে লাগলেন যে এই ধরণের মানুষের ট্রেনে উঠে ঘুমানো প্রায় একটা পানিশেব্‌ল ক্রাইমের মধ্যে পড়ে। যাইহোক , উপায়ান্তর না থাকায় কোনক্রমে রাত টা কাটলো ।
সকালবেলায় আর কেউ-ই ব্যাপারটা নিয়ে ঘাঁটালোনা ; কারণ সত্যি কথা বলতে কী সারারাত প্রায় জেগে থাকা আমরা , মানে ভদ্রমহিলার আশপাশের যাত্রীরা সকালের দিকে প্রায় সক্কলেই ঘুমিয়ে কাদা হয়ে ছিলাম। ওদিকে ট্রেন রাইট টাইম যাকে বলে । বেলা দশটায় দিল্লী।

যাইহোক , ভালোয় ভালোয় পৌঁছে ব্যাগ-ট্যাগ গুছিয়ে নামতে একটু দেরি হচ্ছিল আমার, হঠাৎ দেখি যে ভদ্রলোক গতরাত্রে ভদ্রমহিলার বাপান্ত করছিলেন তিনি হাঁচোড়পাঁচোড় করে তিনখানা মস্ত স্যুট্‌কেস টেনে নামাতে গলদঘর্ম হচ্ছেন এবং মহিলাকে বলছেন "আরে তুমি আগে নামো তো, যত্ত গন্ধমাদন বয়ে নিয়ে এসোছো"! অপার বিস্ময়ে তাঁর দিকে তাকাতেই চোখাচুখি হয়ে গেল। যে মিনতি ভরা দৃষ্টিতে তিনি করুণ ভাবে আমার দিকে তাকালেন তাতে বোধহয় পাষাণও গলে জল শুধু না...একেবারে বাষ্পীভূত হয়ে হাইড্রোজেন -অক্সিজেনে পরিণত হবে! যা বোঝার বুঝে নিয়ে আর কথা না বাড়িয়ে নেমে গেলাম তাঁদের পাশ দিয়ে। শুধু ভাবলাম কী সাংঘাতিক এই নাক-নিনাদ ...!

যার জ্বালা সেই বোঝে ।

রবিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০১৬

টেনিদার জঙ্গিদমন ~ আশিস দাস

চাটুজ্জদের রোয়াকে আমরা তিন জন বসেছিলাম। পাঠানকোটে জঙ্গিহামলা নিয়ে জোর তর্ক হচ্ছিল। হঠাৎ পিঠে জোর চাপড় খেয়ে চমকে তাকিয়ে দেখি স্বয়ং টেনিদা দাঁড়িয়ে। রোয়াকে পা ছড়িয়ে বসেই বললো, "খুব জঙ্গি নিয়ে ভাটাচ্ছিস দেখছি? নিজেদের কি অর্ণব গোস্বামী ভেবেছিস? যুদ্ধের আর আসল জঙ্গিদের খবর পেতে চাইলে আমাকে বল।"
হাবুল সেন বলে উঠল, "তুমি তো ক্যামোফ্লেজ কইর‍্যা জাপানি মারছিলা, জঙ্গির খবর তোমার কাছে আসে ক্যামনে শুনি সেডা?"
টেনিদা বলে, "হু হু বাওয়া আমি পাগল না মদন মিত্র? এসব সিক্রেট খবর অমনি অমনি হয়? যা প্যালা মোড়ের মাথার কেএফসি থেকে একটা জেঙ্গার বার্গার নিয়ে আয় দেখি।"
আমি জানতাম, সকালে উঠেই আনন্দবাজারে প্রথম পাতায় দিদির মুখ দেখা মানেই দিনটা অশুভ। কি আর করা, গচ্চা গেল ১৫০ টাকা।
বার্গারে মস্ত একটা কামড় দিয়ে টেনিদা শুরু করল, "জানিস তো আমার ছাতি ৫৬ ইঞ্চি-"
বেরসিক ক্যাবলাটা সাথে সাথে বলে কিনা, "ডাহা মিথ্যে, এই তো সেদিন পাড়ার নাটকে ড্রেস বানানোর সময় ৪২ মাপল দেখলাম"।
টেনিদা উদুম ক্ষেপে গিয়ে বললো, "শাট আপ ক্যাবলা, আর একবার বাজে বকবক করলে এক ঘুষিতে তোর নাক-"
"নাগপুরে চলে যাবে", কমপ্লিট করলাম আমি।
হাবুল সেন জুড়ে দিল, "আর মোহন ভাগবত সেডা লইয়্যা লোফ্যালুফি খেলবে। তুমি থাইম্যো না টেনিদা, ক্যাবলাডা পোলাপান। রামদেবের মত ইগনোর কর ওডাকে।"
নাকমুখ কুঁচকে টেনিদা বলল, "আর বেশি বকলে জলপান করে ফেলব একদম। সব ব্যাপারে চেতন ভগতের মত ফোড়ন কাটা বেরিয়ে যাবে তখন। যাই হোক ৫৬ ইঞ্চি ছাতি নিয়ে তখন আর্মিতে পোস্টেড আমি। তখন তো যা দিন গেছে, উঠতে জঙ্গি মারছি, বসতে জঙ্গি মারছি, ফেসবুকেও জঙ্গি মারছি-"
"ফেসবুকে? সে আবার কেমন?" - আমি আর থাকতে না পেরে বললাম।
টেনিদা ফিচকে হেসে বললো," আরে মেয়েদের ফেক প্রোফাইল বানিয়ে জঙ্গিগুলোকে রিকোয়েস্ট পাঠাতাম, ব্যাটারা ফ্রেন্ড হয়ে চ্যাট শুরু করত। কিছুদিন বাদেই হ্যাপি নিউ ইয়ার, কিক, চাঁদের পাহাড় এসব সিনেমার ডাউনলোড লিঙ্ক পাঠাতাম। ব্যাস আর যায় কোথা, ব্যাটারা নিজেরাই সুইসাইড করে মরতো।"
ক্যাবলা বললো," বেড়ে বুদ্ধি তো"।
টেনিদা হেভি খুশি হয়ে বললো,"হু হু বাওয়া, পটলডাঙার টেনি মুখুজ্যের ব্রেন এটা। তারপর শোন। একটা জঙ্গি ঘাঁটি আমাদের পাশের পাহাড়ে অনেকদিন ধরে রয়েছে। ব্যাটারা আমাদের ওয়্যারলেস ট্যাপ করে শোনে সারাদিন আর মাঝে মাঝেই নিচের গ্রামে হামলা চালায়। কর্নেল জবরদস্ত সিং একদিন আমাকে ডেকে বলে, ক্যাপ্টেন টেনি আপহি হামারে ভরোসা হো, কুছ করো আপ। আমি তো বার খেয়ে রাজি হয়ে গেলাম। কিন্তু কি করা যায় বুঝতে পারলাম না। ব্যাটারা রাত জেগে আমাদের ওয়্যারলেস ট্যাপ করে আর পাহারা দেয়। আচমকা হামলাও করা যাবেনা। তার উপর ওদের ডেরা এমন একটা গুহার আড়ালে যে আমাদের গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেবে বেশি পাঁয়তাড়া করলে। কি করি কি করি ভাবতে ভাবতে চোখ পড়ল রেডিওটার দিকে। দেখেই চট করে মাথায় বুদ্ধি খেলে গেল। সেই রাতেই ১০ জন সেনাকে নিয়ে আমি হামলা করলাম ওদের ডেরায়। ব্যাস সবাই ডেড। মিশন সাক্সেসফুল যাকে বলে।"
সবাই সমস্বরে বললাম, "কি করে হল? রাত জেগে পাহারা দিত যে ওরা?"
টেনিদা বললো,"ওই যে রেডিও।"
আমি বললাম,"তাতে কি?"
টেনিদা ধ্যানগম্ভীর বুদ্ধের মত হেসে বললো, "আরে রেডিও তে মোদিজির মনকি বাত চালিয়ে ওয়্যারলেসের সামনে লাগিয়ে গেছিলাম। ব্যাটারা ওয়্যারলেস ট্যাপ করে ওই শুনে শুনে বোর হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল তো! পাহারা আর দেবে কে? আমাকে তো পরমবীর চক্র দিয়েই দিত। নেহাত দাদরি হল, তাই ফিরিয়ে দিলাম ওটা দেবার আগেই। বুঝলি?  এ হল সত্যিকার জঙ্গি মারার গল্প।এই এই.. ক্যাবলা ক্যুইক, কোয়ালিটি ওয়ালশের গাড়ি যাচ্ছে একটা"।

রবিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০১৬

বাঘ ~ প্রকল্প ভট্টাচার্য

আমি বাঘকে ভয় পাই না। কখনোই পেতাম না।
শীতের ছুটিতে বাবা চিড়িয়াখানায় নিয়ে গেছিল, দেখিয়েছিল কেমন করে অসহায়ভাবে খাঁচায় বন্দী হয়েও পশুটা রাজকীয় ভঙ্গীতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাইরে লোকেরা চেঁচামেচি করছে, কেউ কেউ ঢিল ছোঁড়ার চেষ্টা করছে, হাততালি দিয়ে, শিস দিয়ে বিরক্ত করছে। বাঘটা পাত্তাও দিচ্ছে না। একবার একটু গা-ঝাড়া দিতেই সবাই হূরমুড়িয়ে পালালো।
বাবা বলেছিল, "দেখেছিস! সত্যিকারের সাহসী যারা, পরিস্থিতিও তাদের চরিত্র বদলাতে পারে না! অন্যায় কৌশলে ওকে বন্ধ করে রেখেছে, কিন্তু ওর সাহস, ওর তেজ কমাতে পেরেছে কী? বরং খাঁচার বাইরে, নিরাপদে থাকা লোকেরা ওকে এতদূর থেকে দেখেও ভয় পাচ্ছে!" 
আমার বাবার খুব সাহস। বাবার বন্ধুরা বাবাকে বলে 'বাঘের বাচ্চা!'
আর আমি তো তারই ছেলে, আমি কেন বাঘকে ভয় পাব!
বাবার একটা বুলেট মোটরবাইক আছে। আমাকে সামনে বসিয়ে যখন সেটা চালিয়ে ভটভট করে বড় রাস্তা দিয়ে যায়, লোকেরা রাস্তা ছেড়ে দেয়। কেউ ভয়ে, কেউ সম্ভ্রমে।
বাবার নাম বিপ্লব, অনেকে ডাকে বুলেট বিপ্লব বলে।
আমাদের স্কুলে মিস সকলের নামের মানে জেনে আসতে বলেছিলেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "বাবা, বিপ্লব মানে কি?"
একটু হেসেছিল বাবা, তারপর বলেছিল, "তোকে এবার থেকে ক্লাবে নিয়ে যাব।"
শুনে মা খুশী হয়নি, "আবার ওকে টানছ কেন..."
বাবা শুনেও শোনেনি।
আমি ভেবেছিলাম, বিপ্লব মানে ক্লাব।
রাত্তিরে বাবার পাশে শুয়ে বাবার বুকে সুড়সুড়ি দিচ্ছিলাম। একটা কাটা দাগ আছে বাবার বুকে, আগেও দেখেছি, কিন্তু প্রশ্ন করিনি। সেদিন জানতে চাইলাম, "বাবা, এই দাগটা কিসের?"
একটু হেসে বাবা বলেছিল "ওটা একটা বাঘের থাবার দাগ।"
-"তোমাকে বাঘে থাবা মেরেছিল?"
-"না, মারতে পারেনি। চেষ্টা করেছিল।"
-"তারপর! বাঘটার কি হলো?"
-"আর কী, এমন তাড়া করলাম, পালিয়ে গেল আমার ভয়ে!"
-"বাবা, পুরো গল্পটা বলো, আমি শুনবো!"
-"আজ নয়, আর একদিন বলব, কেমন?"
আমি ভেবে নিলাম, বিপ্লব মানে বাঘ।
বাবা খুব মোটা সোটা ছিল না, কিন্তু হাতদুটো ছিল লোহার মতো শক্ত, আর পরিশ্রম করতে পারতো খুব। যখন রাস্তার মাঝখান দিয়ে বুলেট বাইক চালিয়ে যেত, সামনে বসে আমি বাবার শক্ত হাতদুটো ধরে থাকতাম। গাড়ি যতোই জোরে যাক না কেন, আমার ভয় করতো না। সেদিনও ঐভাবেই ক্লাবে নিয়ে গেল বাবা। যেতে যেতে আমার মনে হল, বিপ্লব মানে নিশ্চয়ই ভরসা, সাহস!
আমি ভাবতাম ক্লাবে দোলনা থাকে, ছোটরা খেলাধুলো করে, বড়রা গান গায়, খাওয়াদাওয়া হয়। কিন্তু এই ক্লাবে দেখি সবাই অনেক বড়, খুব গম্ভীর আলোচনা করছে। এক একজন করে উঠে দাঁড়িয়ে কিছু বলছে, আর সকলে হাততালি দিচ্ছে। আমার বাবাও কিছুক্ষণ কথা বললো, সবাই খুব হাততালি দিল। তারপর বললো, 'ইঙ্কলাব জিন্দাবাদ'। আমিও বললুম তাদের সঙ্গে।  দু'জন কাকু সেটা দেখে আমার গাল টিপে আদর করে বললো, হবে না! বাঘের বাচ্চা তো!
ফেরার সময় বাবাকে বললাম, "বাবা, ক্লাবের মধ্যে বলে ইন ক্লাব বলতে হয়, তাই না?"
বাবা হা-হা করে হেসে বললো, "আরে না না, কথাটা ইনকিলাব জিন্দাবাদ, তার মানে বিপ্লব দীর্ঘজীবি হোক!'
ভালো লাগলো যে এতজন কাকু চাইছেন আমার বাবা দীর্ঘজীবি হোন! বিপ্লব মানে তাহলে দীর্ঘজীবি!
তার কয়েকদিন পরেই শুনলাম "অবরোধ অবরোধ"। ভোরবেলা বাবা বেরিয়ে গেল। মা ফুঁপিয়ে কাঁদছিল আর গজগজ করছিল। সারাদিন কেটে গেল, বাবা ফিরলো না। সন্ধ্যেবেলা দু'জন কাকু এসে মা-কে কীসব বলল, মা তাড়াতাড়ি শাড়ি বদলে, একটা ব্যাগ নিয়ে, আমাকে ঘরের পোশাকে নিয়েই কাকুদের সংগে একটা গাড়িতে উঠে চলল। আমি কিছু বুঝতে না পেরে চললাম চুপচাপ। মা মুখে শাড়ির আঁচল চেপে কাঁদছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর একজন কাকুকে জিজ্ঞেস করলাম, "আমরা কোথায় যাচ্ছি?"
-"তোমার বাবাকে দেখতে।"
-"বাবা কোথায়? কী হয়েছে বাবার?"
-"কিছু খারাপ লোক তোমার বাবাকে মেরেছে, বাবা হাসপাতালে ভর্তি।"
-"কেন! আমার বাবাকে অন্যরা মারবে কেন!"
-"তোমার বাবা তো ভাল লোক, তাই খারাপ লোকেরা বাবাকে ভয় পায়। সেই ভয় থেকেই মারে। তোমার বাবা মানুষের ওপর অত্যাচার মেনে নেয় না, অন্যায়ের প্রতিবাদ করে। তাই খারাপ লোকেরা বাবাকে ভয় পায়। "
-"খারাপ লোকেদের পুলিশ ধরে না কেন? কেন তারা অন্যায় করবে?"
-"পুলিশও যে তাদের কথা শুনে চলে! তারাই যে দেশ চালায়, আতি তাদের অনেক ক্ষমতা! তাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে সাহস লাগে, আর সেই সাহস সকলের থাকে না। তোমার বাবার আছে।"
-"হ্যাঁ, বাবার খুব সাহস। জানো কাকু, একবার বাবা একটা বাঘের সংগে লড়াই করেছিল, বুকে কাটা দাগ আছে!"
-"বাঘ নয়, ওই খারাপ লোকেরাই আগে একবার বাবাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল, পারেনি। ওটা তারই দাগ। বাঘ তো সাহসী, আড়ালে লুকিয়ে মারে ভিতুরা। তোমার বাবার মতো যারা প্রতিবাদ করে, তাদের মারার চেষ্টা করে।"
-"কাকু, বিপ্লব মানে কি প্রতিবাদ?"
কাকু হাসলো। "ঠিক বলেছ। বিপ্লব মানে প্রতিবাদের লড়াই। একে চেপে রাখা যায় না।"
হাসপাতালে মাথায়, হাতে ব্যাণ্ডেজ বাঁধা বাবাকে শুয়ে থাকতে দেখে কেমন অচেনা লাগছিল, সারা গা কাঁপছিল আমার রাগে, অসহায়তায়। বাবা ইশারায় আমাকে কাছে ডাকল, মাথায় হাত রেখে ধীরে ধীরে, কেটে কেটে বলল, "ভয় পাসনা, আমি সেরে উঠব শিগগির! পড়াশোনা করবি, মায়ের খেয়াল রাখবি, কেমন?"
আমার বলতে ইচ্ছে করল, "ইনকিলাব জিন্দাবাদ!" কিন্তু গলায় কী যেন আটকালো, তাই বলতে পারলাম না। 
মনে পড়লো খাঁচায় বন্দী সেই অসহায় বাঘটার কথা। কৌশলে বন্দী করে রেখে সক্কলে মজা দেখছে আর টিটকিরি দিচ্ছে। যদি একবার বাবা গা ঝাড়া দিয়ে ওঠে...
বিপ্লব দীর্ঘজীবি হবে। হবেই!!