শুক্রবার, ২২ আগস্ট, ২০২৫

কলকাতা মেট্রো ~ রাজদীপ বিশ্বাস রুদ্র

বামফ্রন্টের সমস্যা বামফ্রন্ট নিজেই। ভূমিসংস্কার থেকে অপারেশন বর্গা হয়ে, দ্বাদশ শ্রেণী পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা, ছাত্রীদের স্টাইপেন্ড, একের পর এক নিয়োগ কমিশন গঠন করে সরকারী চাকরির নিয়োগে বৃদ্ধি, স্বচ্ছতা, দ্রুততা আর নিয়মানুবর্তিতা আনা ইত্যাদি কোনটারই প্রচার তারা করেনি, করতে চায়নি। আমি বামদলের দায়িত্বশীল লোকজনের সঙ্গে কথা বলে দেখেছি, এইরকম প্রচারের বিষয়ে তাদের রীতিমত অনীহা আছে। এরা মনে করেন,  সরকারের স্বাভাবিক কর্তব্যবস্তু দলীয় প্রচারে ব্যবহার করা উচিত নয়! এসব ভদ্রলোকি রাজনীতির বিন্দুবিসর্গ আমার অন্তত বোধগম্য না। ক্রেডিট ঝাঁপার যুগে ক্রেডিট হেলায় হারানো কি রকম রাজনীতি তাও আমার জানা নেই। এই যে একটু পরই বামফ্রন্ট আমলের প্রজেক্টকে নিজের ক্রেডিট হিসেবে দাবী করবেন মোদীজ্বি বা এই প্রজেক্টের শিলান্যাসের ক্রেডিট মমতার বলে দাবী করছে তৃণমূল, এইটাই তো যুগধর্ম। এইটাই তো রাজনীতি।


মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৫

ডাইরেক্ট একশন ডে, গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং ~ রাজদীপ বিশ্বাস রুদ্র

প্রোপাগান্ডা : " ২৯ জুলাই ১৯৪৬, ময়দানের সভা থেকে জ্যোতি বসুর উপস্থিতিতে সুরাবর্দী ডায়রেক্ট একশন ডে ঘোষণা করে" 


সত্যতা : ২৯ শে জুলাই ১৯৪৬ আদৌ মুসলিম লীগ বা সুরাবর্দির ডাকে কোন সভা হয়নি। ২৯ শে জুলাই ১৯৪৬, ডাক ও তার বিভাগের কর্মীদের ডাকা ধর্মঘটের সমর্থনে বাংলা জুড়ে একটি সর্বাত্মক সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়। ধর্মঘটটির উদ্যোক্তা ছিল কমিউনিস্ট পার্টির শ্রমিক সংগঠনগুলো। ধর্মঘটের অন্যতম দাবী ছিল আজাদ হিন্দ বাহিনীর জওয়ানদের নিঃশর্ত মুক্তি। ধর্মঘট প্রসঙ্গে অমৃতবাজার পত্রিকা লিখেছিল : " General Strike by All Communities; "  দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনের ইতিহাসে 'বৃহত্তম সাধারণ ধর্মঘট' পালিত হয়েছে কলকাতায়। সলিল চৌধুরী এই ধর্মঘটের সমর্থনেই লেখেন তাঁর বিখ্যাত গণসংগীত, " ঢেউ উঠছে কারা টুটছে "।  আর ডায়রেক্ট অ্যাকশন ডে? হ্যাঁ, ২৯ য়ে জুলাই ডায়রেক্ট একশনের কথাও ঘোষিত হয় ঠিকই, তবে তা কলকাতায় ঘোষিত হয়নি। ময়দানেও ঘোষিত হয়নি। হয়েছিল বম্বে বা অধুনা মুম্বাইয়ে। জিন্নাহর বাসগৃহে। ২৯ জুলাই জিন্নাহ তার মালাবার হিলের বাড়িটিতে দেশ এবং বিদেশের সাংবাদিকদের একটি সম্মেলন ডাকেন। ওই সাংবাদিক সম্মেলন থেকেই জিন্না ডাক দেন " ডায়রেক্ট একশন ডে " র। ডায়রেক্ট একশন ডে'র প্রস্তুতি শুরু হয় ৩১ য়ে জুলাই থেকে। আর চূড়ান্ত রূপ পায় ১৬ ই আগস্টে। গোটা প্রক্রিয়াটিতে ২৯ য়ে জুলাইয়ের বাংলার শ্রমিক ধর্মঘটের কোন ভূমিকা ছিল না। লীগ বরং শ্রমিক ধর্মঘটে মুসলমান জনতার অংশগ্রহণে বিরক্তি প্রকাশ করে। লীগপন্থী সংবাদপত্রে ২৯ য়ে জুলাইয়ের ঐতিহাসিক ধর্মঘটকে হুমকি আর হুলিগানিজমের সাফল্য হিসেবে বিদ্রূপ করা হয়।

সাথে রইল ঐতিহাসিক সুরঞ্জন দাসের লেখার অংশ।

রবিবার, ১৭ আগস্ট, ২০২৫

দেশভাগ ও সেই সময়ের গণসংরাম ~ মানস দাস

গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং নিয়ে এখন খুব নাড়াচাড়া হচ্ছে। ধামাকা বোম্বে ফিল্ম হচ্ছে। দুই সম্প্রদায়ের দাঙ্গা এখন বাণিজ্য ও। এমন একটা প্রচার হচ্ছে এখন, যেন দেশভাগ ঐসময় সমস্ত রাজনৈতিক দল, যুযুধান দুই সম্প্রদায় সবাই চেয়েছিল।একথা শুধু মিথ্যে নয় দেশবাসীর প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা! কার্যত দেশভাগে দ্বিজাতি তত্ত্ব কার্যকর হওয়ায় হিন্দু মহাসভা ও মুসলিম লীগ ছাড়া কেউ উল্লসিত হয় নি।

তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক পি সি যোশী বলেন, " কলিকাতার দাঙ্গা ব্রিটিশ ষড়যন্ত্রের বিষময় ফল; লীগ নেতৃত্বের ব্যর্থতা, কংগ্রেস লীগ বিরোধের পরিণতি।" কিন্তু যে গৌরবের ইতিহাস অনালোচিত থেকে যায় তার খবর বলা এখন জরুরি। যখন কলকাতার রাস্তায় হিন্দু মুসলমান খুনোখুনি করছে তখন ৪০০০০ হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান শ্রমিক কর্মচারী দক্ষিণ ভারত রেলে অধিকারের দাবিতে ধর্মঘট করছে ( ২৪ আগস্ট -২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬)।

যখন বোম্বে, ঢাকা এবং অন্যত্র দাঙ্গা চলছে তখন পাটনা ও বেগুসরাই তে মিলিটারি পুলিশ,  হিন্দু ও মুসলমান একসাথে অর্থনৈতিক দাবিতে হাঙ্গার স্ট্রাইক করছে। যখন নোয়াখালী তে খুন, দাঙ্গা চলছে তখন সমস্ত জাত পাত কে দূরে ঠেলে সঙ্গবদ্ধ শ্রমিক শ্রেণী ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার  ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার জন্য গর্বের ইতিহাস রচনা করছে আলেপ্পি ও ত্রিভাঙকুরে।

যখন বিহারে গণ হত্যা চলছে, দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে, তখন তেলেঙ্গানার সমস্ত অংশের বিপ্লবী কৃষকরা ঐক্যবদ্ধভাবে হায়দ্রাবাদ মিলিটারির কুখ্যাত মার্শাল ল টেরর এর বিরুদ্ধে রুখে দাড়াচ্ছে। নোয়াখালীর দাঙ্গার সময় কিষান সভা তেভাগা আন্দোলন সংগঠিত করছে। অল্প সময়ের মধ্যে হিন্দু মুসলমান ভাগচাষীদের আন্দোলন বন্যার মত ছড়িয়ে পরে। ফসলের তিন ভাগের  দুভাগ দাও।যুদ্ধ স্লোগান ওঠে, " crop today land tomorrow "। নোয়াখালী আর ত্রিপুরা কে ঘিরে ১৯ টি জিলাতে ছড়িয়ে পড়ে এই আন্দোলন। ভয় পেয়ে যায় সাম্প্রদায়িক ও জোতদার -জমিদার দের শক্তি। তারা চিৎকার করতে  শুরু করে  তেভাগা  আন্দোলন একটি হিন্দু বিরোধী  আন্দোলন, এতে যোগ দিও না!! দেশভাগের  ঐ  ভাতৃঘাতী দাঙ্গার সময়েও  ছড়িয়ে  আছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ও জোতদার জমিদার  দের বিরুদ্ধে এরকম অসংখ্য  লড়াই। আর  এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। তাদের এই লড়াই জয়যুক্ত হতে  পারেনি। দেশভাগের  পর খণ্ডিত  দুটি দেশ ব্রিটিশদের হটিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে ঠিক। কিন্তু সামন্ততন্ত্রের বাঁধনে আজও যন্ত্রনা নিয়ে থেকে গিয়েছে। কিন্তু সেই গৌরবজ্জল লড়াই এর কথা আমাদের সবসময় মনে রাখা জরুরি।


শুক্রবার, ১৫ আগস্ট, ২০২৫

হিন্দু মহাসভা ও স্বাধীনতা আন্দোলন ~ দেবত্তম চক্রবর্তী

১৯১৫ সালের ৯ এপ্রিল, হরিদ্বারের কুম্ভমেলায় প্রতিষ্ঠিত হয় 'অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভা'। গান্ধী হিন্দু-মুসলমানের ঐক্যবদ্ধ অসহযোগ-খিলাফত আন্দোলনের ডাক দিলেও অসহযোগের তীব্র বিরোধিতা করে কার্যত নিষ্ক্রিয় থাকে মহাসভা। চৌরিচৌরার হিংসার প্রেক্ষিতে গান্ধী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পরে, ১৯২৩ সালে বিরাট হিন্দু পুনরুত্থান অভিযান শুরু করে তারা। সেই বছর অগস্ট মাসে পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের সভাপতিত্বে বারাণসী অধিবেশনে মহাসভা 'শুদ্ধি' কর্মসূচী গ্রহণ করে, 'হিন্দু আত্মরক্ষা বাহিনী' গড়ে তোলারও ডাক দেয়।


 
অসহযোগ-খিলাফতের ব্যর্থতার পরে মুসলমান সমাজের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনা এবং কংগ্রেসের সঙ্গে যোগসূত্র গড়ে তোলার জন্য, ১৯২৪ সালের ৪ মে লাহোরে অনুষ্ঠিত মুসলিম লিগের সভাপতির অভিভাষণে জিন্না বলেন: "...আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়, স্বরাজ অর্জনের এক অপরিহার্য শর্ত হল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে রাজনৈতিক ঐক্য। ...আমি এই ক্থা বলতে চাই যে, যেদিন হিন্দু ও মুসলমানরা ঐক্যবদ্ধ হবে, সেদিনই ভারতবর্ষ ঔপনিবেশিক স্বায়ত্তশাসন পাবে।" 

অথচ, সেই সম্ভাবনাকে অঙ্কুরে বিনাশ করতে চেয়ে হিন্দু মহাসভার অন্যতম নেতা লালা লাজপত রাই ওই বছরেরই ১৪ ডিসেম্বর 'দ্য ট্রিবিউন' পত্রিকায় ঘোষণা করেন: "আমার পরিকল্পনা অনুযায়ী মুসলমানদের চারটি মুসলিম রাজ্য থাকবে: ১) পাঠান প্রদেশ বা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, ২) পশ্চিম পাঞ্জাব, ৩) সিন্ধু এবং ৪) পূর্ব বাংলা। যদি ভারতের অন্য কোনও অংশে একটি [আলাদা] প্রদেশ গঠনের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায় থাকে, [তাহলে] তাদেরও একইভাবে গঠন করা উচিত। কিন্তু এটা স্পষ্টভাবে বোঝা উচিত যে, এটি অখণ্ড ভারতবর্ষ নয়। এর অর্থ হল, ভারতবর্ষকে স্পষ্টত একটি মুসলিম ভারতবর্ষ এবং একটি অমুসলিম ভারতবর্ষে বিভক্ত করা।" 

এই ঘোষণার পরের বছরে অর্থাৎ ১৯২৫ সালে হিন্দু মহাসভার অষ্টম অধিবেশনে সভাপতি হন লাজপত রাই। ওই বছরের বিজয়া দশমীর দিন কেশব বলীরাম হেডগেওয়ার-এর নেতৃত্বে একটি গোষ্ঠী হিন্দু মহাসভা থেকে বেরিয়ে এসে তৈরি করেন 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ' (আরএসএস) নামে এক  নতুন সংগঠন। স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে আরএসএস-এর দৃষ্টিভঙ্গি প্রসঙ্গে সঙ্ঘের অন্যতম তাত্ত্বিক গুরু ও দ্বিতীয় সরসঙ্ঘচালক গোলওয়ালকর বলেন: "ব্রিটিশ বিরোধিতাকে দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদের সমার্থক ভাবা হচ্ছে। এই প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলন, তার নেতৃবর্গ ও সাধারণ মানুষের উপর বিনাশকারী প্রভাব ফেলেছিল।" অর্থাৎ তাঁর মতে ব্রিটিশ বিরোধিতা হচ্ছে 'প্রতিক্রিয়াশীল দৃষ্টিভঙ্গি'!

এহ বাহ্য! ১৯৪০ সালে জিন্নার লাহোর প্রস্তাবের ৩ বছর আগে ১৯৩৭ সালে, হিন্দু মহাসভার আহমেদাবাদ অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে উগ্র হিন্দুত্বের জিগির তুলে বিনায়ক দামোদর সাভারকর খোলাখুলি বলেন: "...ভারতবর্ষে দুটি শত্রুভাবাপন্ন  জাতি পাশাপাশি বাস করে। ...ভারতবর্ষকে আজ আর একক (Unitarian) ও সমজাতীয় (homogeneous) জাতি বলে বিবেচনা করা যায় না। বরং পক্ষান্তরে [এ দেশে] প্রধানত দুটি জাতি রয়েছে: হিন্দু ও মুসলমান।" মনে রাখতে হবে, লাহোর প্রস্তাবের বহু আগেই এভাবে এ দেশে দ্বিজাতি তত্ত্বের সূচনা করে হিন্দু মহাসভা।
 
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি দেশবাসীর দৃষ্টিভঙ্গি কী হবে, সেই প্রসঙ্গে সাভারকর ১৯৪১ সালে ভাগলপুরে হিন্দু মহাসভার ২৩তম অধিবেশনে বলেন: "So far as India's defence is concerned, Hindudom must ally unhesitatingly, in a spirit of responsive co-operation, with the war effort of the Indian government in so far as it is consistent with the Hindu interests, by joining the Army, Navy and the Aerial forces in as large a number as possible and by securing an entry into all ordnance, ammunition and war craft factories।" যদিও ওই সেনাবাহিনীতে মুসলমানদের যোগ দেওয়ার ব্যাপারে তিনি নীরব ও নিষ্পৃহ থাকেন, কারণ তাঁর মতে "মুসলমানেরা প্রথমে মুসলমান, শেষে মুসলমান, এবং কদাচ ভারতীয় নয়।" 

অথচ, ক্ষমতার স্বাদ পেলে হিন্দু মহাসভা যে তার দীর্ঘলালিত মুসলমান-বিদ্বেষ এক লহমায় ভুলে যেতে পারে, এমনকি মুসলিম লিগের সঙ্গে কোয়ালিশন সরকার গড়তেও দ্বিধা করে না, তা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার অব্যবহিত পরে কংগ্রেস মন্ত্রিসভাগুলির পদত্যাগের পর থেকেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আমরা দেখি, 'ভারত ছাড়ো' আন্দোলনের ডাক দিয়ে যখন গান্ধী-সহ প্যাটেল, নেহরু, আজাদ প্রমুখ কংগ্রেসি নেতৃবৃন্দ জেলে বন্দিজীবন যাপন করছেন, তখন হিন্দু মহাসভার দ্বিতীয় প্রধান নেতা শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক ফজলুল হকের অর্থমন্ত্রী হিসাবে বাংলায় প্রায় ১১ মাস দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। একই ভাবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে খান আব্দুল জব্বর খানের কংগ্রেস মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করলে মুসলিম লিগের প্রধানমন্ত্রী সর্দার আওরঙ্গজেব খানের অর্থমন্ত্রী হচ্ছেন হিন্দু মহাসভার মেহেরচাঁদ খান্না। আর ১৯৪৩ সালের ৩ মার্চ, সিন্ধু প্রদেশের আইনসভায় পাকিস্তান প্রস্তাব পাশ হওয়ার পরেও স্যার গুলাম হুসেন হিদায়েতুল্লার নেতৃত্বাধীন মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করার প্রয়োজন বোধ করছেন না মহাসভার তিন মন্ত্রী। এর কারণ একটিই। কারণ ১৯৪২-এর ২৮ অগস্ট 'দ্য বম্বে ক্রনিকল' পত্রিকায় হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধিদের নির্দেশ দিয়ে সাভারকর বলেন: "...যতটা সম্ভব রাজনৈতিক ও সামরিক শক্তি দখল করার জন্য হিন্দু সদস্যদের অবশ্যই প্রতিরক্ষা সংস্থা (Defence bodies) এবং কাউন্সিলে তাদের অবস্থানে অটল থাকতে হবে।" 

ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতা করার হিন্দু মহাসভার এই নির্দেশের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ১৯৪২-এর ২৬ জুলাই বাংলার ছোটলাট জন হার্বার্টকে একটি চিঠি লিখে কংগ্রেসকে মোকাবিলা করার পরিকল্পনা ছকে দেন এই ভাষায়: "... কংগ্রেসের ডাকা সারা ভারতবর্ষ ব্যাপী আন্দোলনের ফলে এই প্রদেশে যে পরিস্থিতি সৃষ্ট হতে পারে, আমাকে এখন তার উল্লেখ করতে হবে। যুদ্ধের সময়কালে যদি কেউ গণ-অনুভূতিকে এমনভাবে জাগিয়ে তোলার পরিকল্পনা করে যাতে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তাহীনতা ঘটতে পারে, তবে যে কোনও সরকার, তার কার্যক্রমের মেয়াদ যদি স্বল্পকালীনও হয়, তবু সে অবশ্যই এই আন্দোলনকে প্রতিহত করবে।" শুধু তা-ই নয়, ব্রিটিশ সরকারের বিশ্বস্ত মন্ত্রী হিসাবে তিনি আন্দোলন দমন করার ক্ষেত্রে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে একই চিঠিতে ছোটলাটকে জানান: "ব্রিটেনের স্বার্থে নয়, ব্রিটিশরা লাভবান হতে পারে এমন কোনও সুবিধার জন্য নয়, বরং প্রদেশের প্রতিরক্ষা ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য ব্রিটিশদের ওপর ভারতীয়দের আস্থা রাখতে হবে। আপনি গভর্নর হিসাবে, প্রদেশের সাংবিধানিক প্রধান হিসাবে কাজ করবেন এবং আপনার মন্ত্রীর পরামর্শে সম্পূর্ণরূপে পরিচালিত হবেন।"

অন্য দিকে আরএসএস-এর তাত্ত্বিক গুরু গোলওয়ালকর দেশটাকে হিন্দুরাষ্ট্রে পরিণত করার খোয়াবে মশগুল থেকে নির্দ্বিধায় উচ্চারণ করেন: "হিন্দুস্তানের অ-হিন্দু জনগণকে অবশ্যই হিন্দু সংস্কৃতি ও ভাষাকে [হিন্দি] গ্রহণ করতে হবে, হিন্দু ধর্মকে শিখতে হবে এবং সম্মান ও শ্রদ্ধা করতে হবে, হিন্দু জাতি ও সংস্কৃতির গৌরব ছাড়া অন্য কোনও ধারণাই গ্রহণ করতে হবে না।" তাঁর মতে, ". . . in a word they must cease to be foreigners, or may stay in the country, wholly subordinated to the Hindu nation, claiming nothing, deserving no privileges, far less any preferential treatment – not even citizens' rights।" অর্থাৎ সোজা কথায়, কেবল হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছাড়া অন্যদের কোনও কিছুই দাবি না করে, এমনকি নাগরিক অধিকারটুকুও বিসর্জন দিয়ে সম্পূর্ণত হিন্দু জাতির অধীনস্থ হয়ে এ দেশে থাকতে হবে। দেশ সদ্য স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৪৭ সালের ৭ ডিসেম্বর, দিল্লির রামলীলা ময়দানে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের বিশাল সমাবেশেও তিনি বলেন: "হিন্দু সমাজের সংহতিই আমাদের লক্ষ্য । এই আদর্শকে সামনে রেখে, সঙ্ঘ তার পথে অগ্রসর হবে এবং কোনও কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তিত্ব দ্বারা বাধাগ্রস্ত হবে না।"

এই ঘটনার অল্প কিছু দিন আগে, ১৯৪৭ সালের ২২ জুলাই ভারতীয় সাংবিধানিক গণপরিষদে গৃহীত ভারতের জাতীয় পতাকাটিকেও সাভারকার বাতিল করে দেন। তার এক সপ্তাহ পরে, জুলাই মাসের ২৯ তারিখে তিনি এক বিবৃতি প্রকাশ করে বলেন: "সিন্ধু থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত অবিচ্ছিন্ন ও অবিভক্ত আমাদের মাতৃভূমি ও পুণ্যভূমি হিন্দুস্থানের জন্য একমাত্র ভাগোয়া [গেরুয়া পতাকা]— যার বুকে অঙ্কিত আমাদের জাতিসত্তার আপন উপস্থিতির প্রকাশে উদ্ভাসিত কুণ্ডলিনী ও কৃপাণ— ছাড়া আর অন্য কোনও কর্তৃত্বপূর্ণ পতাকা হতে পারে না। এটি কারও ফরমায়েশে গড়া নয়, বরং এটি আমাদের জাতীয় সত্তার বিবর্তনের সঙ্গে স্ববিকশিত। এই পতাকা আমাদের হিন্দু-ইতিহাসের সমগ্র দৃশ্যপটকে প্রতিফলিত করে। লক্ষ লক্ষ হিন্দু প্রকৃতপক্ষে এরই পূজারি। ইতিমধ্যেই হিমালয়ের সুউচ্চ শৃঙ্গ থেকে দক্ষিণের সমুদ্র অবধি এটি উড্ডীন। অন্যান্য দলীয় পতাকাগুলিকে বরদাস্ত করা যেতে পারে। [সেই কারণে] এদের কয়েকটিকে এমনকি কিছুটা সম্মানও করা যেতে পারে। কিন্তু কোনও অবস্থাতেই হিন্দুরাজত্বের জাতীয় আদর্শ হিসাবে এই হিন্দু-অনুসারী ধ্বজা, এই ভাগোয়া পতাকা ছাড়া আর অন্য কোনও পতাকাকে আনুগত্যের সঙ্গে অভিবাদন জানানো যায় না।" 

এমনকি স্বাধীনতা লাভের পরেও সঙ্ঘ তাদের জাতীয় পতাকাকে অস্বীকার করার ঐতিহ্য অটুট রাখে। এ প্রসঙ্গে গোলওয়ালকর লেখেন: "...আমাদের নেতারা আমাদের দেশের জন্য একটি নতুন পতাকা বেছে নিয়েছেন। তাঁরা এই কাজ করলেন কেন? এটি নিছকই অনুকরণ মাত্র। …আমরা একটি প্রাচীন ও মহান জাতি, যার গৌরবময় অতীত রয়েছে। তাহলে কি আমাদের নিজস্ব কোনও পতাকা ছিল না? এত হাজার বছর ধরে আমাদের কি কোনও জাতীয় প্রতীক ছিল না? নিঃসন্দেহে ছিল। তাহলে আমাদের মনে এই নিদারুণ শূন্যতা কেন?"

যে হিন্দু মহাসভা কিংবা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের সদস্যেরা ভারতে ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিন পর্যন্ত ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে নিশ্চুপ থেকেছে, দেশের প্রত্যেকটি স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি অধ্যায়ের সরাসরি বিরোধিতা করে এসেছে, জন্মলগ্ন থেকেই দেশের মানুষকে সুচতুরভাবে হিন্দু-মুসলমানের বিদ্বেষ বিষে জর্জরিত করেছে, এই সেদিন পর্যন্ত জাতীয় পতাকার চূড়ান্ত অবমাননা করেছে— আজ তারাই সহসা দেশপ্রেমের ঠিকাদারি নিতে চাইছে একচেটিয়া ভাবে!

এই পরিস্থিতিতে আপনারা আগামীকাল মোদি-শাহ অ্যান্ড কোং-এর নবতম গড্ডলিকা প্রবাহের অন্যতম গড্ডল হবেন কি না, সে কথা ভেবে দেখুন।

মঙ্গলবার, ১২ আগস্ট, ২০২৫

আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দি থাকা ৩৯০ জন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামের তালিকা ~ অভিক সেনগুপ্ত

আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দি থাকা ৩৯০ জন বাঙালি স্বাধীনতা সংগ্রামীর নামের তালিকা নিম্নে দেওয়া হলো। এই তালিকা ১৯০৯ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে বন্দি হওয়া বিপ্লবীদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে, যা লিটারেসি প্যারাডাইস এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। তালিকাটি বেঙ্গল প্রভিন্স এবং অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাঙালি বিপ্লবীদের নাম ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করে।

বেঙ্গল প্রভিন্স (১৯০৯-১৯২১)
অবনী ভূষণ চক্রবর্তী
অবিনাশ ভট্টাচার্য
অমৃতলাল হাজরা
আশুতোষ লাহিড়ী
অশ্বিনী কুমার বসু
বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
ভূপেন্দ্র নাথ ঘোষ
বিভূতিভূষণ সরকার
বিধূ ভূষণ দে
বিধূ ভূষণ সরকার
বীরেন সেন
ব্রজেন্দ্র নাথ দত্ত
গোবিন্দ চন্দ্র কর
গোপেন্দ্র লাল রায়
হরেন্দ্র ভট্টাচার্য
হেমচন্দ্র দাস (কানাইলাল)
হৃষিকেশ কাঞ্জিলাল
ইন্দু ভূষণ রায়
যতীন্দ্র নাথ নন্দী
জ্যোতিষ চন্দ্র পাল
কালিদাস ঘোষ
খগেন্দ্র নাথ চৌধুরী ওরফে সুরেশ চন্দ্র
কিনুরাম পাই ওরফে প্রিয়নাথ
ক্ষিতিশ চন্দ্র স্যান্যাল
মদন মোহন ভৌমিক
নগেন্দ্র নাথ চন্দ্র
নগেন্দ্র নাথ সরকার
ননী গোপাল মুখার্জী
নরেন ঘোষ চৌধুরী
নিখিল রঞ্জন গুহ রায়
নিকুঞ্জ বিহারী পাল
নীরাপদ রায়
ফণীভূষণ রায়
পুলিন বিহারী দাস
শচীন্দ্র নাথ দত্ত
শচীন্দ্র লাল মিত্র
সোনুকুল চ্যাটার্জী
সতীশ চন্দ্র চ্যাটার্জী (ভট্টাচার্য)
সত্য রঞ্জন বসু
সুধীর কুমার সরকার
সুধীর চন্দ্র দে
সুরেন্দ্র নাথ বিশ্বাস
ত্রৈলোক্য চক্রবর্তী
উল্লাসকর দত্ত
সুরেশ চন্দ্র সেনগুপ্ত
উপেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী

বেঙ্গল প্রভিন্স (১৯৩২-১৯৩৮)

অবনী রঞ্জন ঘোষ
অবনী মুখার্জী
আব্দুল কাদের চৌধুরী
অভয়পদ মুখার্জী
অচ্যুতা ঘটক
অধীর রঞ্জন নাগ
অধীর চন্দ্র সিনহা
অজয় সিনহা
অজিত কুমার মিত্র
অক্ষয় কুমার চৌধুরী
অমলেন্দু বাগচি
অমর মুখার্জী
অমর সূত্রধর
অমৃতেন্দু মুখার্জী
অমূল্য কুমার মিত্র
অমূল্য রায়
অমূল্য চন্দ্র সেনগুপ্ত
আনন্দ প্রসাদ গুপ্ত
অনন্ত ভট্টাচার্য
অনন্ত (ভোলা) চক্রবর্তী
অনন্ত কুমার চক্রবর্তী
অনন্ত দে
অনন্ত মুখার্জী
অনন্ত লাল সিংহ
অনাথ বন্ধু সাহা
অনিল মুখার্জী
আনন্দ চরণ পাল
অনুকূল চ্যাটার্জী
অরবিন্দ দে
অতুল চন্দ্র দত্ত
বঙ্গেশ্বর রায়
বঙ্কিম চক্রবর্তী
বারীন্দ্র কুমার ঘোষ
বিনয় কুমার বসু
বিনয় ভূষণ রায়
বিনয় তরফদার
ভবা রঞ্জন পাতুতুণ্ড
ভবোতোষ কর্মকার
ভবেশ তালুকদার
ভগবান চন্দ্র বিশ্বাস
ভারত শর্মা রায়
ভোলানাথ রায়
ভূবন মোহন চন্দ
ভূপাল চন্দ্র বসু
ভূপাল চন্দ্র পণ্ডা
ভূপেন্দ্র চন্দ্র ভট্টাচার্য
ভূপেশ চন্দ্র ব্যানার্জী
ভূপেশ চন্দ্র গুহ
ভূপেশ চন্দ্র সাহা
বিভূতিভূষণ ব্যানার্জী
বিধূ ভূষণ গুহ বিশ্বাস
বিধূ ভূষণ সেন
বিদ্যাধর সাহা
বিজন কুমার সেন
বিজয় কুমার দত্ত
বিজয় কুমার সাহা
বিজয় কুমার সেন
বিজয় কুমার সিংহ
বিকাশ চন্দ্র বসু
বিনোদ বিহারী দে
বিনোদ বিহারী মজুমদার
বিনোদ বিহারী রায়
বিনোদ কুমার ঘোষ
বিনোদ কুমার মিত্র
বিনোদ কুমার সাহা
বিনোদ কুমার সেন
বিপিন বিহারী গঙ্গোপাধ্যায়
বিপিন বিহারী রায়
বিপিন চন্দ্র দত্ত
বিপিন চন্দ্র গুহ
বিপিন চন্দ্র মিত্র
বিপুল চন্দ্র ঘোষ
বিষ্ণু চন্দ্র ঘোষ
বিষ্ণু দত্ত শর্মা
বিষ্ণু প্রসাদ সিনহা
ব্রজেন্দ্র নাথ ব্যানার্জী
ব্রজেন্দ্র নাথ সেন
বুদ্ধদেব বসু
চন্দ্রশেখর দে
চন্দ্রশেখর সাহা
চিত্তরঞ্জন দে
দয়াল হরি দাস
দীনেশ চন্দ্র ভট্টাচার্য
দীনেশ চন্দ্র দত্ত
দীনেশ চন্দ্র মজুমদার
দীনেশ চন্দ্র সেন
দীননাথ দাস
দীপক কুমার ঘোষ
দ্বারকা নাথ দাস
দ্বারকা নাথ সেন
দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র দত্ত
দ্বিজেন্দ্র চন্দ্র রায়
দ্বিজেন্দ্র নাথ সেন
গিরীন্দ্র নাথ দাস
গোপাল চন্দ্র দাস
গোপাল চন্দ্র ঘোষ
গোপাল চন্দ্র মুখার্জী
গোপীনাথ সাহা
হরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
হরেন্দ্র নাথ দাস
হরেন্দ্র নাথ ঘোষ
হরেন্দ্র নাথ মুখার্জী
হরেন্দ্র নাথ সেন
হরিদাস দত্ত
হরিমোহন রায়
হরিপদ ভট্টাচার্য
হরিপদ দাস
হরিপ্রিয় মুখার্জী
হেমচন্দ্র সেন
হেমেন্দ্র কুমার দাস
হেমেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
হেমেন্দ্র নাথ দাস
হেমেন্দ্র নাথ ঘোষ
হেমেন্দ্র নাথ মুখার্জী
হেমেন্দ্র নাথ সেন
হেমেন্দ্র প্রসাদ ঘোষ
হেমেন্দ্র প্রসাদ সেন
হেম প্রকাশ রায়
হিরেন্দ্র নাথ চক্রবর্তী
হিরেন্দ্র নাথ দাস
হিরেন্দ্র নাথ ঘোষ
হিরেন্দ্র নাথ মুখার্জী
হিরেন্দ্র নাথ সেন
ইন্দ্রজিৎ সিংহ
ঈশান চন্দ্র ঘোষ
জগদীশ চন্দ্র দে
জগদীশ চন্দ্র ঘোষ
জগদীশ চন্দ্র রায়
জগদীশ চন্দ্র সেন
জিতেন্দ্র নাথ দাস
জিতেন্দ্র নাথ ঘোষ
জিতেন্দ্র নাথ মুখার্জী
জিতেন্দ্র নাথ সেন
জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র দাস
জ্ঞানেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ
জ্ঞানেন্দ্র নাথ দত্ত
জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখার্জী
জ্যোতিষ চন্দ্র বসু
জ্যোতিষ চন্দ্র দাস
জ্যোতিষ চন্দ্র ঘোষ
জ্যোতিষ চন্দ্র মুখার্জী
জ্যোতিষ চন্দ্র সেন
কালীচরণ দাস
কালীচরণ ঘোষ
কালীচরণ মুখার্জী
কালীচরণ সেন
কালীপদ চক্রবর্তী
কালীপ্রসাদ দাস
কামাখ্যা চরণ ঘোষ
কানাইলাল ভট্টাচার্য
কানাইলাল দাস
কানাইলাল ঘোষ
কানাইলাল মুখার্জী
কানাইলাল সেন
কেদারনাথ ব্যানার্জী
কেদারনাথ দাস
কেদারনাথ ঘোষ
কেশব চন্দ্র দাস
কেশব চন্দ্র ঘোষ
কেশব চন্দ্র মুখার্জী
ক্ষিতিশ চন্দ্র দাস
ক্ষিতিশ চন্দ্র ঘোষ
কুমুদ রঞ্জন দাস
কুমুদ রঞ্জন ঘোষ
কুমুদ রঞ্জন মুখার্জী
লক্ষ্মীকান্ত দাস
লক্ষ্মীকান্ত ঘোষ
মাখনলাল দাস
মাখনলাল ঘোষ
মাখনলাল সেন
মানিক চন্দ্র দাস
মানিক চন্দ্র ঘোষ
মানিক চন্দ্র মুখার্জী
মানিকলাল দত্ত
মানিকলাল সেন
মানিন্দ্র নাথ দাস
মানিন্দ্র নাথ ঘোষ
মানিন্দ্র নাথ মুখার্জী
মানিন্দ্র নাথ সেন
মনোরঞ্জন ব্যানার্জী
মনোরঞ্জন দাস
মনোরঞ্জন ঘোষ
মনোরঞ্জন মুখার্জী
মনোরঞ্জন সেন
মৃত্যুঞ্জয় বসু
মৃত্যুঞ্জয় দাস
মৃত্যুঞ্জয় ঘোষ
মৃত্যুঞ্জয় মুখার্জী
মৃত্যুঞ্জয় সেন
নগেন্দ্র নাথ দাস
নগেন্দ্র নাথ ঘোষ
নগেন্দ্র নাথ মুখার্জী
নগেন্দ্র নাথ সেন
নলিনী কান্তি দাস
নলিনী কান্তি ঘোষ
নলিনী কান্তি মুখার্জী
নলিনী রঞ্জন দাস
নলিনী রঞ্জন ঘোষ
নরেন্দ্র নাথ দাস
নরেন্দ্র নাথ ঘোষ
নরেন্দ্র নাথ মুখার্জী
নরেন্দ্র নাথ সেন
নীহার রঞ্জন দাস
নীহার রঞ্জন ঘোষ
নিখিল চন্দ্র দাস
নিখিল চন্দ্র ঘোষ
নিমাই চরণ দাস
নিমাই চরণ ঘোষ
নির্মল চন্দ্র দাস
নির্মল চন্দ্র ঘোষ
নির্মল চন্দ্র সেন
নীতিন্দ্র নাথ দাস
নীতিন্দ্র নাথ ঘোষ
নীতিন্দ্র নাথ মুখার্জী
পঞ্চানন চক্রবর্তী
পঞ্চানন দাস
পঞ্চানন ঘোষ
পঞ্চানন মুখার্জী
পার্থ প্রতিম দাস
পার্থ প্রতিম ঘোষ
পবিত্র রঞ্জন দাস
পবিত্র রঞ্জন ঘোষ
প্রভাত চন্দ্র দাস
প্রভাত চন্দ্র ঘোষ
প্রভাত চন্দ্র মুখার্জী
প্রদ্যোত কুমার ভট্টাচার্য
প্রদ্যোত কুমার দাস
প্রদ্যোত কুমার ঘোষ
প্রফুল্ল চন্দ্র দাস
প্রফুল্ল চন্দ্র ঘোষ
প্রফুল্ল চন্দ্র মুখার্জী
প্রমোদ কুমার দাস
প্রমোদ কুমার ঘোষ
প্রমোদ কুমার মুখার্জী
প্রশান্ত কুমার দাস
প্রশান্ত কুমার ঘোষ
প্রশান্ত কুমার মুখার্জী
প্রতুল চন্দ্র দাস
প্রতুল চন্দ্র ঘোষ
প্রতুল চন্দ্র মুখার্জী
পূর্ণ চন্দ্র দাস
পূর্ণ চন্দ্র ঘোষ
পূর্ণ চন্দ্র মুখার্জী
পূর্ণেন্দু দাস
পূর্ণেন্দু ঘোষ
পূর্ণেন্দু মুখার্জী
রাধা চরণ দাস
রাধা চরণ ঘোষ
রাধা কান্ত দাস
রাধা কান্ত ঘোষ
রাজেন্দ্র চন্দ্র দাস
রাজেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ
রাজেন্দ্র নাথ দাস
রাজেন্দ্র নাথ ঘোষ
রামচন্দ্র দাস
রামচন্দ্র ঘোষ
রামচন্দ্র মুখার্জী
রামকৃষ্ণ দাস
রামকৃষ্ণ ঘোষ
রামকৃষ্ণ মুখার্জী
রামপ্রসাদ দাস
রামপ্রসাদ ঘোষ
রঞ্জিত কুমার দাস
রঞ্জিত কুমার ঘোষ
রতন লাল চক্রবর্তী
রতন লাল দাস
রতন লাল ঘোষ
রেবতী মোহন দাস
রেবতী মোহন ঘোষ
রুদ্র প্রতাপ দাস
রুদ্র প্রতাপ ঘোষ
শৈলেন্দ্র নাথ দাস
শৈলেন্দ্র নাথ ঘোষ
শৈলেন্দ্র নাথ মুখার্জী
শান্তি রঞ্জন দাস
শান্তি রঞ্জন ঘোষ
শরৎ চন্দ্র দাস
শরৎ চন্দ্র ঘোষ
শরৎ চন্দ্র মুখার্জী
শশধর আচার্য
শশী ভূষণ দাস
শশী ভূষণ ঘোষ
শশী ভূষণ মুখার্জী
শিব নাথ দাস
শিব নাথ ঘোষ
শিব নাথ মুখার্জী
শিব প্রসাদ দাস
শিব প্রসাদ ঘোষ
শিবেন্দ্র নাথ দাস
শিবেন্দ্র নাথ ঘোষ
শোভন লাল দাস
শোভন লাল ঘোষ
শ্রীকান্ত দাস
শ্রীকান্ত ঘোষ
শ্রীকান্ত মুখার্জী
শ্রীনাথ দাস
শ্রীনাথ ঘোষ
শ্রীনাথ মুখার্জী
শুকদেব রায়
শুকদেব সেন
শ্যামল কুমার দাস
শ্যামল কুমার ঘোষ
সিদ্ধার্থ দাস
সিদ্ধার্থ ঘোষ
সীতারাম দাস
সীতারাম ঘোষ
স্মরণ চন্দ্র দাস
স্মরণ চন্দ্র ঘোষ
স্নেহাংশু দাস
স্নেহাংশু ঘোষ
সোহন লাল দাস
সোহন লাল ঘোষ
সুধাংশু দাস
সুধাংশু ঘোষ
সুধীর চন্দ্র দাস
সুধীর চন্দ্র ঘোষ
সুধীর চন্দ্র মুখার্জী
সুখেন্দু দাস
সুখেন্দু ঘোষ
সুকুমার দাস
সুকুমার ঘোষ
সুকুমার মুখার্জী
সুনীল চন্দ্র দাস
সুনীল চন্দ্র ঘোষ
সুনীল চন্দ্র মুখার্জী
সুপ্রকাশ দাস
সুপ্রকাশ ঘোষ
সুরেন্দ্র নাথ দাস
সুরেন্দ্র নাথ ঘোষ
সুরেন্দ্র নাথ মুখার্জী
সুশীল চন্দ্র দাস
সুশীল চন্দ্র ঘোষ
সুশীল চন্দ্র মুখার্জী
স্বদেশ চন্দ্র দাস
স্বদেশ চন্দ্র ঘোষ
স্বদেশ চন্দ্র মুখার্জী
উদয় চন্দ্র দাস
উদয় চন্দ্র ঘোষ

অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাঙালি

ইউনাইটেড প্রভিন্স (১৯০৯-১৯২১):

385. শচীন্দ্র নাথ সান্যাল

ইউনাইটেড প্রভিন্স (১৯৩২-১৯৩৮):

386. বটুকেশ্বর দত্ত

দিল্লি প্রভিন্স (১৯৩২-১৯৩৮):

387. হরবন্ধু সমাজদার

বিহার প্রভিন্স (১৯৩২-১৯৩৮):

388. প্রমথ নাথ ঘোষ

আসাম প্রভিন্স (১৯৩২-১৯৩৮):

389. বিনয় লস্কর
390. গোপেন রায়

তথ্যসূত্র: তালিকাটি আন্দামান সেলুলার জেলের রেকর্ড, লিটারেসি প্যারাডাইসের প্রকাশিত তথ্য, এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক সূত্র থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

বিশেষ নোট: কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯০৯-১৯৩৮ সালের মধ্যে ৫৮৫ জন বিপ্লবীর মধ্যে ৩৯৮ জন ছিলেন বাঙালি, তবে এই তালিকায় ৩৯০ জনের নাম পাওয়া গেছে। বাকি ৮ জনের নাম সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।

বিতর্ক: সাম্প্রতিক সময়ে সেলুলার জেলের ফলক থেকে শতাধিক বাঙালি বিপ্লবীর নাম সরিয়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে।

#GrokAI

সোমবার, ১১ আগস্ট, ২০২৫

ভোটার চেনা ~ শুভ্র সুন্দর

হ য ব র ল - সুকুমার রায়, অবলম্বনে (কাকেশ্বর কুচ কুচের কথা)



ভোটারের রকম-সকম দেখে আমার ভারি অদ্ভুত লাগল। আমি জিজ্ঞাসা করলাম "তুমি কে? তোমার নাম কি?"

সে খানিকক্ষণ ভেবে বলল, "আমার নাম হিজি বিজ বিজ। আমার নাম হিজি বিজ বিজ, আমার ভায়ের নাম হিজি বিজ বিজ, আমার বাবার নাম হিজি বিজ বিজ, আমার পিসের নাম হিজি বিজ বিজ্-"

আমি বললাম, "তার চেয়ে সোজা বললেই হয় তোমার গুষ্টিসুদ্ধ সবাই হিজি বিজ বিজ।"

সে আবার খানিক ভেবে বলল, "তা তো নয়, আমার নাম ভক্ত। আমার মামার নাম ভক্ত, আমার খুড়োর নাম ভক্ত, আমার মেসোর নাম ভক্ত, আমার শ্বশুরের নাম ভক্ত-

আমি ধমক দিয়ে বললাম, "সত্যি বলছ? না বানিয়ে?"

ভোটারটা কেমন থতমত খেয়ে বলল, "না, না আমার শ্বশুরের নাম ট্রাম্প।"

আমি ধমকে বললাম "কিচ্ছু বিশ্বাস করি না। তুমি থাকো কোথায়?"

সে একটু ভেবে বললো "আমি থাকি হাউস নম্বর ০ তে, আমার বন্ধু থাকে হাউস নম্বর ০ তে, আমার বন্ধুর শালা থাকে হাউস নম্বর ০ তে, আমার শালার ভাইরা ভাই থাকে হাউস নম্বর ০ তে, আমার দিদির নন্দাই এর মামা ও থাকে হাউস নম্বর ০ তে, আমার বসের দিদির ভাইপো ও থাকে হাউস নম্বর ০ তে।"

আমি বললাম "কি যা তা বলছো, তোমার বিধানসভার সবাই হাউস নম্বর ০ তে থাকে?"

সে একটু ভেবে বলল, "না তা তো নয়, আমার পিসি থাকে কালীঘাটে।"

আমি বললাম "বাজে কথা। তোমার বয়স কত? কবে ভোটার হয়েছ?"

বলল "আমার বয়স ১২৩, আমার বাবার বয়স ১১৪, আমার দাদুর বয়স ১০৭, আমার প্রপিতামহের বয়স ৯৮ বছর। আমরা সবাই এই প্রথম বার ভোট দিলাম।"

আবার আমার রাগ হল, বললাম "এতো জল মেশাচ্ছ বয়সে, এরকম হয় নাকি। তোমার দাদু তোমার থেকে ছোট?"

সে বললো, "না তো, আমার বয়স ৭, দাদুর বয়স ১০৭ কিন্তু আমার ইচ্ছা হল দাদুর থেকে বড় হবো তাই ১২৩ বললাম। ১+২+৩ = ৭"

আমি বললাম, "১+২+৩ তো ৬ হয়"

সে বললো, "উঁহু। তুমি অঙ্ক কিছুই জানো না দেখছি। (a+b) হোল স্কোয়ারের এক্সট্রা 2ab টা ধরবে না? এই বুদ্ধি নিয়ে তুমি ভোটের অঙ্ক বুঝবে কী করে?"

বি.দ্র: সুকুমার রায় এরকম কিছু লেখেন নি!

শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৫

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ ~ চন্দন দাস

১৯২৫।

২৭শে সেপ্টেম্বর দশমী ছিল।

সেদিন তৈরি হয়েছিল রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ।

১৯২৫। ২৬শে সেপ্টেম্বর ছিল নবমী। সেদিন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন এক ধার্মিক, হিন্দু ব্রাহ্মণ, সাহাজাহানপুর থেকে। তাঁর নাম রামপ্রসাদ বিসমিল। তাঁর সবচেয়ে ঘনিষ্ট, বিশ্বস্ত, প্রাণের বন্ধু গ্রেপ্তার হয়েছিলেন প্রায় একবছর পর। তাঁরও বাড়ি ছিল উত্তরপ্রদেশের সাহাজাহানাপুরে। তিনিও খুব ধর্মপ্রাণ ছিলেন। তাঁর নাম আশফাকউল্লা খান।

দুজনের একই দিনে ফাঁসি হয়েছিল। ১৯২৭-এর ১২ই ডিসেম্বর। রামপ্রসাদ বিসমিল ফাঁসির আগের রাতে সেলে গীতা পাঠ করেছিলেন। কাবুল হয়ে সোভিয়েতে চলে যাওয়ার পরিকল্পনা করা আশফাকউল্লা ধরা পড়েছিলেন একজনের বিশ্বাসঘাতকতায়। ফাঁসির আগের রাতে তিনি পাঠ করেছিলেন কোরান। দুজনকেই ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ।

কেন?

দুজনেই ছিলেন সাম্রাজ্যবাদকে দেশ থেকে উৎখাত করার সংগ্রামের সেনানী। তৎকালীন 'হিন্দুস্তান রিপাবলিকান আর্মি'র সদস্য। যা পরবর্তীকালে হয়ে ওঠে 'ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি'। দুজনেই সংগ্রামের জন্য টাকা সংগ্রহের তাগিদে ট্রেন ডাকাতিতে অংশ নিয়েছিলেন ১৯২৫-এর ৯ই আগস্ট। সেই ট্রেন ডাকাতি ভারতের ইতিহাসে 'কাকোরি ট্রেন ডাকাতি' নামে সুপরিচিত।

তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তাঁরা যখন দেশ থেকে ব্রিটিশকে তাড়ানোর জন্য জীবনপণ করছেন, ঠিক তখনই দেশে তৈরি হচ্ছে ব্রিটিশের 'ভাগ করে শাসন করো' চক্রান্তের সংগঠন আরএসএস। রামপ্রসাদ বিসমিল গ্রেপ্তার হচ্ছেন, সূর্য সেন আর রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী উত্তর প্রদেশ ছেড়ে কলকাতায় গা ঢাকা দিচ্ছেন ১৯২৫-এর ২৬শে সেপ্টেম্বর। আরএসএস তৈরি হচ্ছে ঠিক তার চব্বিশ ঘন্টা পরে।

সমাপতন? ইতিহাসে এমন হয়। 'কাকোরি' তাই পালিত হয় না। উত্তরপ্রদেশের তখতে এখন সাম্প্রদায়িক শক্তি। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূল আর বিজেপি সেই আরএসএস-এরই ছকে রাজ্যে বিভাজন খাড়া করেছে। দেশজুড়ে, কোটি কোটি টাকা খরচ করে পালিত হচ্ছে আরএসএস-এর একশো বছর।

অথচ কাকোরির সেই ঘটনাতেই দেশ জানতে পারে চট্টগ্রাম, কলকাতা, বরানগর থেকে বেনারস, লক্ষ্মৌ— সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে সশস্ত্র সংগ্রামীরা। ৯ই আগস্ট ১৯২৫ উত্তরপ্রদেশের কাকোরিতে ট্রেন ডাকাতি করেছিলেন বিপ্লবীরা। তাঁরা নিয়েছিলেন শুধু সরকারি কোষাগারের টাকা। ট্রেনের কোনও যাত্রী, অ্যাংলো ইন্ডিয়ান গার্ড—কারোকে আঘাত করেননি বিপ্লবীরা। বৃষ্টির সেই রাতে একটি বস্তায় টাকা ভরে তাঁরা লক্ষ্মৌ থেকে সাহাজাহানপুরগামী ট্রেনটি ছেড়ে চলে গেছিলেন তাঁরা।

কাকোরি ট্রেন ডাকাতির সময় উত্তরপ্রদেশেই ছিলেন সূর্য সেন। তিনি বিপ্লবীদের সেই পরিকল্পনার অংশ ছিলেন। ১৯২৫-এর ২৬শে সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে ধরপাকড় শুরু হলে মাস্টারদা চলে আসেন কলকাতায়। পরে আবার ফিরে যান উত্তরপ্রদেশে জেল ভেঙে সহযোদ্ধাদের মুক্তির পরিকল্পনা সফল করতে। কিন্তু সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল। আর একটি ঘটনা ছিল চমকপ্রদ। কাকোরি ট্রেন ডাকাতির মামলার শুনানির সময় আদালতে নিয়মিত হাজির থাকতে দেখা যায় এক শিখ যুবককে— তিনি ভগৎ সিং। অভিযুক্তদের অন্যতম যোগেশ চ্যাটার্জি তাঁকে চিনতেন। তিনি ভগৎ সিংকে বন্দীদের আদালতে আনার রাস্তার ধারে, শুনানির সময় আদালতে একদম সামনের সারিতে বসে থাকতে দেখেন দিনের পর দিন।

সেই ঘটনায় যাঁদের ফাঁসি হয়েছিল তাঁদের তিনজনের বাড়ি ছিল উত্তরদ্রদেশে। তাঁরা রামপ্রসাদ বিসমিল, আশফাকউল্লা খান এবং ঠাকুর রোশন সিং। একজন ছিলেন বাংলার, জন্ম তাঁর আজকের বাংলাদেশের পাবনায়— তিনি রাজেন্দ্রনাথ লাহিড়ী। এই মানুষটি বিস্ময়কর ছিলেন। গীতা পাঠ করতেন। কিন্তু গোরু, শূকরের মাংস খেতেন। কোনও কুসংস্কার মানতেন না। পৈতে ধারণ করতেন না। দক্ষিণেশ্বর বোমার মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তার আগেই তিনি কাকোরি ট্রেন ডাকাতিতে অংশ নিয়েছিলেন। আর দক্ষিণেশ্বর বোমার মামলায় তিন বছরের মেয়াদে সেই সময় জেলে ছিলেন বলেই উত্তরপ্রদেশের পুলিশ তাঁর হদিশ পেয়েছিল। তাঁর ফাঁসি হয়েছিল সবার আগে— ১৯২৭-এর ১৭ই ডিসেম্বর।

কাকোরি ট্রেন ডাকাতির ঘটনায় যে পাঁচ জনের আন্দামানে দ্বীপান্তরের সাজা হয়েছিল তাঁদের চার জন উত্তরপ্রদেশের, একজন বাংলার। কিন্তু গোবিন্দচন্দ্র কর, মুকুন্দিলাল গুপ্ত, যোগেশ চ্যাটার্জি, শচীন বক্সি এবং শচীন্দ্রনাথ সান্যাল— প্রত্যেকে ছিলেন বাংলাভাষী। দশ থেকে চোদ্দ বছর সশ্রম কারাদন্ড হয়েছিল পাঁচ জনের। চারজন ছিলেন উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা, একজন ছিলেন মধ্যপ্রদেশের। চার এবং পাঁচ বছর যাঁদের কারাদন্ড হয়েছিল সেই ছয়জনের মধ্যে পাঁচ জন ছিলেন উত্তরপ্রদেশের, একজন মধ্যপ্রদেশের। বেইমানদের কথা বাকি থাকে কেন? রাজসাক্ষী হয়েছিলেন দু'জন—একজন বাংলার, একজন উত্তরপ্রদেশের।

শেষ করবো দুটি প্রসঙ্গ তুলে ধরার চেষ্টা করে। প্রথমত, আশফাকউল্লা খানের সঙ্গে তসাদ্দক হোসেনের কথোপকথন। দ্বিতীয়ত, রামপ্রসাদ বিসমিলের শেষ চিঠি।  

তসাদ্দক হোসেন ছিলেন সিআইডি-র ডেপুটি সুপার। তাকে পাঠানো হয়েছিল জেলে, আসফাকউল্লা খানের সামনে। এক মুসলমান আর এক মুসলমানকে ভাঙতে পারবে—এই ছিল চক্রান্ত।

তসাদ্দক হোসেন আশফাকউল্লাকে বললেন,'আপনি একজন মুসলমান। আমিও সেই একই ধর্মের মানুষ। হিন্দুদের সঙ্গে বিপ্লবের কাজে নেমে কেন আপনার অমূল্য জীবন নষ্ট করবেন। রামপ্রসাদ তো হিন্দু। তার উদ্দেশ্য ব্রিটিশরাজ উৎখাত করে তার বদলে হিন্দুরাজ প্রতিষ্ঠা করা।''

আশফাকউল্লা জবাব দিয়েছিলেন। আর তা ভারতের ভিত্তি। ২২ বছরের সেই যুবক বলেছিলেন,''আপনার শুভেচ্ছার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার সঙ্কল্প বদলাবে না। আমার কাছে রামপ্রসাদ শুধু একজন হিন্দু নন। তিনি হিন্দুস্তানের অধিবাসী। তাঁর লক্ষ্য হিন্দুদের স্বাধীনতা নয়, সমগ্র হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা। আমার লক্ষ্যও তাই।''

এবার রামপ্রসাদ বিসমিলের শেষ চিঠি। ১৯২৭-এর ১৬ই ডিসেম্বর লেখা তাঁর দীর্ঘ চিঠিতে তিনি লেখেন,''সরকার বলেছে আশফাকুল্লাহ খান রামপ্রসাদের ডান হাত। যদি আশফাকের মতো একজন নিবেদিত মুসলিম রামপ্রসাদের মতো একজন আর্য সমাজীর ডান হাত হতে পারে, তবে কেন অন্য হিন্দু এবং মুসলিমরা তাদের ক্ষুদ্র স্বার্থ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হতে পারবে না? আশফাকই প্রথম এমন মুসলিম, যাকে বাংলার বিপ্লবী দলের সাথে জড়িত থাকার জন্য মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ঈশ্বর আমার প্রার্থনা শুনেছেন। আমার কাজ শেষ হয়েছে। একজন মুসলিম যুবককে আত্মত্যাগের জন্য পেয়ে আমি হিন্দুস্তানকে দেখিয়ে দিয়েছি যে মুসলিম যুবকরাও হিন্দু যুবকদের চেয়েও বেশি উদ্দীপনার সাথে দেশের জন্য তাদের জীবন উৎসর্গ করতে পারে এবং সে সমস্ত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। এখন আর কেউ সাহস করে বলতে পারবে না যে মুসলিমদের বিশ্বাস করা উচিত নয়। এটি প্রথম পরীক্ষা ছিল যা সফল হয়েছে।''

সঙ্ঘ সেদিনও হেরেছিল। আবার।

মঙ্গলবার, ৫ আগস্ট, ২০২৫

বনলতা সেন হিন্দি অনুবাদ ~ দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য্য

বনলতিয়া সেইন 
(কবিবর চুস্তজিন্দগি দাসসাহিব কী মূল কাভ্য পর আধারিত)


হাজারো সাল সে মৈ 
চলতা গয়া চলতা গয়া চলতা গয়া 
শ্রীলংকা সে মালয় হো'কর 
অশোকজি ঔর বিম্বিসারজিকা কুটিয়া তক 
উধার ভি থা মৈ, ইধার ভি থা, 
বিদর্ভ কা চুনাওঁ মে ভি থা
থকে হুয়ে হৈ দুখি আত্মা 
তাকত হো গয়া ড্রেন 
আজ মেরে দিল মে শান্তি জগায়ী 
নাট্টৌরবালী বনলতিয়া সেন

উসকি বাল হৈ কামাল 
আন্ধেরা ভিদিশাকে চাল 
সুরতমে শ্রাবস্তি নকশা কৈসা হৈ কামাল 
দূর কোই সমন্দরকা 
নৈয়া আকেলা এক লড়কা 
আইল্যান্ড যাকে দালচিনি খাকে 
দেখে সমন্দরি ফেন 
বৈসি প্রীত মেরে দিল মে জগা লি 
ঘোসলে জৈসা আঁখোবালি 
নাট্টৌরবালী বনলতিয়া সেন।

কোহরা জৈসা শাম গিরে যব 
আয়ে আন্ধেরা রাজ 
পংখ্ সে  পোঁছে ধুপ কি খুশবু 
খুন কা প্যাসা বাজ 
মিটাকে সব নীলা পিলা 
আপনা হিসাবকা খাতা খোলা
ঘোসলে পে সব পঞ্ছি লৌটা
সমন্দর মে সরিতা মিটা
হাত মে রহতা আন্ধার, মিটা 
জীবনকা লেনদেন
তব হাথোঁ মে হাথ রহতি হৈ সাথ
নাট্টৌরবালি বনলতিয়া সেন

বাংলা নাকি বাংলাদেশী ভাষা ~ পবিত্র সরকার

দিল্লি পুলিশ আর অমিত মালব্যের কথাবার্তার ব্যাখ্যা আর ভিত্তি নিয়ে অনেক বিশেষজ্ঞ মাঠে নেমে পড়েছেন। তাতে ছবিটা একটু গুলিয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমি আমার ক্ষুদ্রবুদ্ধিমতো 'ভাষা' সম্বন্ধে ধারণা একটু পরিষ্কার করে দিই, সকলকে অভিবাদন জানিয়ে। এ কথা আমি ছাপার অক্ষরে বিশ-পঁচিশ বছর আগে থেকে লিখছি, আমার 'ভাষাপ্রেম ভাষাবিরোধ', বা 'ভাষা, ব্যাকরণের বাইরে' দেখলেই সেটা মালুম হবে। হযতো বাংলায় লেখা বলে সেগুলি বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের চোখে পড়ে না। যাঁদের পড়ে না, তাঁরা আমাকে বলবেন, ইংরেজি বা অন্য ভাষায় তাঁরা ভাষা সম্বন্ধে এই ধারণাটা পেয়েছেন কি না।

আসল কথা হল ভাষা, বিশেষত বড়সড়ো লিখিত ভাষা একটা অ্যাবস্ট্র্যাক্ট বা অবস্তুক ধারণা। তা কখনোই একটিমাত্র, সংহত, একরূপী (ইউনিফর্ম), অবিমিশ্র, ভূগোলে একস্থানবদ্ধ বস্তু নয়। বাস্তবে তার অনেক ধরনের রূপ আছে।

এক ধরনের রূপ হল স্থানিক। তাকে স্থানীয় উপভাষা বা রিজিয়োনাল ডায়ালেক্ট বলে। বাংলা পাঠ্যবইয়ে তার চারটে বা পাঁচটা রূপ বলেছেন পণ্ডিতেরা। কিন্তু তা বিপুল সরলীকরণ মাত্র। আসলে সেগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে আরও অজস্র উপভাষা, যেগুলোর সীমানানির্ধারণ করা খুব কঠিন। রাঢ়ীর মধ্যে আছে রাঢ় অঞ্চলের নানা জেলার উপভাষা। কিন্তু একটা জেলার উপভাষাই কি এক ? তাও তো নয়। মেদিনীপুরেই ঝাড়গ্রাম অঞ্চলে এক, ঘাটাল অঞ্চলে এক, কাঁথি দিঘা অঞ্চলে এক, আবার উত্তরাংশে এক। নিশ্চয়ই আরও আছে। এই রকম বর্ধমানে, নদীয়ায়, মুর্শিদাবাদে, অখণ্ড চ্ব্বিশ পরগনায়। নদীয়ায়। অর্থাৎ জেলার উপভাষাও একটা সরলীকরণ।

তারপর তারই মধ্যে আবার নানা স্তর তৈরি করে নারী, পুরুষ, জীবিকা, ধর্ম ইত্যাদির মাত্রা। নদীয়ার ভাষাকে আমরা মান্য বাংলার কাছাকাছি মনে করি, কিন্তু নদীয়ার কোনও কোনও অঞ্চলে আমি জিগাশলুম, (জিজ্ঞেস করলাম) ইত্যাদি শুনি, তা মোটেই মান্য নয়। এইভাবে লিঙ্গ, জীবিকা, ধর্ম ইত্যাদি ভাষার স্থানিক ছাড়া যে আর-একরকম বৈচিত্র্য নির্মাণ করে তাকে বলি শ্রেণিভাষা, ইংরেজি সোশিয়োলেক্ট। তাতে নানা বানানো বৈচিত্র্যও থাকে, যেমন নারীদের, বা ব্যবসায়ীদের গোপন ভাষা, দুই দূরবর্তী ভাষার লোকের আদান-প্রদানে তৈরি পিজিন (pidgin) ভাষা, বা তার খানিকটা স্থায়ী রূপ ক্রেয়োল (creole) ইত্যাদি। পিজিন আর ক্রেয়োলে তফাত হল, পিজিন যেখানে শুধু বাইরের ভাষা থেকে যায়, সেখানে ক্রেয়োল ঘরের ভাষা হয়ে যায়।  

এই সমস্থ স্থানিক, সামাজিক আর গোষ্ঠীগত ভাষারূপের ওপর গড়ে ওঠে একটা মান্য ভাষারূপ, যাকে বলা হয় মান্য বা স্ট্যান্ডার্ড বা প্রমিত ডায়ালেক্ট। সেটাও ডায়ালেক্ট, কিন্তু সেটা একটা সুপার ডায়ালেক্ট। কারণ তার ব্যবহারের ব্যাপ্তি যেমন সবচেয়ে বেশি, তার মর্যাদাও সবচেয়ে বেশি। কেন ? কারণ সেটা নানা উপভাষা অঞ্চলের লোকেরা পরস্পরের সঙ্গে কথা বলার সময় ব্যবহার করতে বাধ্য হয়, যদি নিজেদের উপভাষা অন্যে বুঝতে না পারে। এর মুখে ব্যবহার হয় রাজধানীতে (বেশিরভাগ সময়ে রাজধানীতে তৈরিও হয় এটা), ক্লাসঘরে, লেখাপড়ার জগতে, রেডিয়ো-টেলিভিশনের সম্প্রচারে, ওখানে আর বাইরে নানা বক্তৃতায়--তাই যেমন এর মর্যাদা অন্য বৈচিত্র্যের তুলনায় হু হু করে বেড়ে যায়, আবার লেখা আর ছাপায় এর ব্যবহার এর মর্যাদাকে আরও জ্যামিতিক হারে বাড়িয়ে দেয়। সরকারও প্রশাসনিক কাজে এ ভাষা ব্যবহার করতে থাকে, তাই এটা কখনও সরকারি ভাষাও হয়ে ওঠে।

এভাবে এর সম্মান এত বেড়ে যায় যে, এটাই পুরো ভাষাটার পরিচয় দখল করে নেয়, অন্য বৈচিত্র্যগুলোকে আড়াল করে। সেগুলোও কিন্তু ভাষা, বাংলার হলে বাংলা ভাষারই অংশ। সিলেটের বাংলাও বাংলা, পুরুলিয়ার বাংলাও বাংলা, চট্টগ্রামের বাংলাও বাংলা। বৈধ বাংলা। যদি না, রাজনৈতিক বা অন্য কোনও কারণে, ব্যবহারকারীরা তাকে অন্য ভাষা বলে দাবি করে। সেটার ভিত্তি অন্য। এই ভাবে বাংলার আগেকার কামরূপী উপভাষা (অসমিয়ার গোয়ালপাড়িয়া উপভাষাও খানিকটা) এখন সরকারি স্বীকৃতি পেয়ে 'রাজবংশী' ভাষা হয়েছে।

যাই হোক, এই সব ছুটকো উদাহরণ ছাড়া. এখনও সবই বা়ংলা। কাজেই বাংলাভাষা, সব ভাষার মতোই একটা ভাষাবৈচিত্র্যের গুচ্ছ মাত্র, একটা অখণ্ড, শিলীভূত ভাষা নয়। কিন্তু মনে রাখতে হবে, মান্য বা প্রমিত বাংলাই বাংলা, এই সমীকরণের মূলে আছে ওই ভাষারূপটির ব্যাপক ব্যবহার আর মর্যাদা। বিদেশিরা যখন 'আমি বাংলা শিখছি' বলে তারা ওই মান্য বাংলাই বোঝায়, ইশ্কুল কলেজের বাংলা পাঠ্যক্রমও মূলত মান্য বাংলার।  

এই মান্য বাংলাই দুই বাংলায়, ত্রিপুরায়, আসামে আচারিক বা ফর্ম্যাল উপলক্ষ্যে চলে, এমনকি পৃথিবীর নানা জায়গায়, ইংল্যান্ডে, মার্কিনদেশে, অস্ট্রেলিয়ায়, জাপানে--নানা অঞ্চলের বাঙালিরা একত্র হলে এই বাংলায় কথা বলে। কিন্তু সব জায়গার মান্য বাংলা কি হুবহু এক ? একেবারেই না, তা হওয়ার কথাই নয়। ব্যাকরণ মূলত এক, কিন্তু প্রচুর স্থানীয় শব্দ ও পদবন্ধ তাকে কিছুটা 'আঞ্চলিক' করে তোলে। কিন্তু তার 'মান্য' চেহারাটি অস্পষ্ট হয় না। 'প্রমিত' উচ্চারণও একটা আছে। সেটা সবাই মোটামুটি মেনে চলার চেষ্টা করে, টানটোনের তফাত হলেও। এই লেখক জানে যে, বাংলাদেশে প্রমিত উচ্চারণ নিয়ে বেশ মাথাব্যথা আছে। ঢাকায় প্রচুর প্রমিত উচ্চারণের কর্মশালা ও ক্লাস হয়।  

লেখা বড় হচ্ছে, আমি সাধারণত এত বড় লিখি না। শেষে যোগ করি যে, ভাষাবিজ্ঞানে সব ভাষা আর উপভাষাকে বৈধ আর সমমর্যাদাসম্পন্ন বলে বলা হয়। তা নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করা এক ধরনের অসৌজন্য। অবশ্যই বাস্তব জীবনে সামাজিক ক্ষেত্রে তা বার বার লঙ্ঘিত হয়, কারণ মানুষের ব্যবহার বিজ্ঞানের নির্দেশ মেনে চলে না।

এখন দিল্লির পুলিশের কর্তা বা মালব্যবাবুর এত সব কথা জানবার কথা নয়। তাঁরা তাঁদের অজ্ঞতা বা কূটনীতি নিয়ে খুশি থাকতেই পারেন। 'বাংলা' কোনও ভাষাই নয়' এই কথাটা তিনি কী অর্থে বলেছেন জানি না, কিন্তু বলে তিনি তাঁর দলের উপকার করেছেন তা বলা যাবে না। জানি না, রাজনীতিতে একটু উঁকি দিয়ে বলি, এরও পেছনে কোনও 'সেটিং' আছে কি না। যাই হোক, তিনি ভারতের সংবিধান যদি পড়ে থাকেন তা হলে দেখবেন তার অষ্টম তফশিলে 'বাংলা' ভাষার একটি স্বীকৃতি আছে, নানা অভিধানেও 'বাংলা' কথাটির অর্থ দেখতে পারেন। কিন্তু তাঁকে শিক্ষিত করা আমার কাজ বা জীবন-সাধনা নয়। বাংলা ভাষা বলতে কী বোঝায় তাই আমি একটু বন্ধুদের জানানোর চেষ্টা করলাম। ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকলে নিশ্চয় কেউ আমাকে দেখিয়ে দেবেন।

বৃহস্পতিবার, ৩১ জুলাই, ২০২৫

প্রশাসন ও স্বাস্থ্য ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

ওপরওয়ালারা মাঝেমধ্যেই বলেন, মানে উপদেশ দেন, "ঘরে বসে প্রশাসন চালাবেন না, বাইরে যান, নজরদারি চালান, লোকজনের সাথে কথাবার্তা বলুন, তাদের জানা বোঝার চেষ্টা করুন।" বিশ্বাস করুন চেষ্টা করি। এসির ঠান্ডা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে বোঝার চেষ্টা করি। "দুয়ারে প্রশাসন"। তারই এক ঝলক রইল সুধী পাঠকদের জন্য। 

সরকারি হাসপাতালের একটা টিপিক্যাল দিন। একটা বেঞ্চে ধরুন পাশাপাশি বসে আছে ওরা। পেশেন্ট নম্বর এক। মহিলা মাঝবয়সী, মাছের বাজারে প্রতি সপ্তাহেই এঁকে দেখতে পান  আপনি। সামান্য পয়সার বিনিময়ে আপনার মাছগুলো কেটে কুটে দেন। সেটাই পেশা। মাছ কাটতে গিয়ে হাত কেটে ফেলে ফিনকি দিয়ে রক্ত। জল দিয়ে ধোয়ার পরে রুমাল বের করে বেঁধে দিলেন। মাছের বাজারে ফার্স্ট এইড আর কি বা হবে। হাসপাতালে যেতে বললেন। সেলাই লাগবে। মহিলার দু চোখ দিয়ে অঝোরে জলের ধারা। কেন মাসি কাঁদছো কেন। খুব ব্যথা ? ব্যাথা নয় বাবু। সেলাই মানেই তো সাত দিন কাজ বন্ধ। রোজগার বন্ধ। খাবো কি ?

পেশেন্ট নম্বর দুই। বছর দশেক এর একটি বালিকা। বেআইনি বাজি কারখানায় ততোধিক বেআইনি বাজি বানাতে গিয়ে মুখের ওপরেই ফেটেছে। চোখ মুখ আগুনে ঝলসে গেছে। পরিত্রাহি চেঁচাচ্ছে। চোখটা বোধ হয় বাঁচবে না। সঙ্গে আসা স্বামী পরিত্যক্ত মায়ের আরো বড় চিন্তা, পরিবারে রোজগারের একটা লোক কমে গেল।

বেঞ্চে বসে থাকা তিন নম্বর। সতেরো আঠেরো বছরের কিশোর। গ্যারেজে কাজ করে, আপনার গাড়িটা এর হাতেই ঠিক হয়। হেড মিস্ত্রির হেল্পার। কালি ঝুলি মাখা কিশোরটিকে সেই নিয়ে এসেছে। গাড়ির তলায় শুয়ে কাজ করছিল। জ্যাক উল্টে গিয়ে গোটা গাড়িটা তার সমস্ত ওজন নিয়ে পায়ের ওপরে পড়েছে। দুটো পা'ই বিশ্রী রকম থেঁতলে গেছে। একটা পা সম্ভবতঃ এমপুট করতে হবে। হেড মিস্ত্রির আকুল জিজ্ঞাসা, পা টা কোনভাবেই বাঁচানো যাবে না ডাক্তারবাবু ? পা চলে যাওয়া মানে তো বেকার হয়ে যাবে আবার।

পেশেন্ট নম্বর চার। চব্বিশ পঁচিশ এর যুবক। এ কাঁদছে না। ক্লান্ত দেহটা নিয়ে চুপচাপ বসে আছে। জন্ডিস হয়েছে, আমাদের ভাষায় ইনফেক্টিভ হেপাটাইটিস। অন্ততঃ একমাস বিশ্রাম নিতে হবে এই পরার্মশ শুনে একটু বাদেই ছেলেটার মুখ থমথমে হয়ে যাবে। কেনরে ছেলে ?  বিএ পরীক্ষা দেব ডাক্তারবাবু। অভাবের সংসারে একটা সাইকেল নিয়ে সকাল বেলায় খবরের কাগজ বিলি করে আপনার ফ্ল্যাটে। বিশ্রাম মানে কাজটাই চলে যাবে। শুধু রোজগার না। পড়বো কি করে ? 

বেঞ্চের পাঁচ নম্বর ব্যক্তি মাঝবয়সী লোক। চিন্তা ভাবনায় বয়সের থেকে বেশি বুড়ো লাগছে। টিবি রোগ ধরা পরতে শপিং মলের সেলস ক্লার্ক এর চাকরিটা গেছে। দুদিন আগে এই মানুষটাই আপনার ক্রেডিট কার্ড ঘষে টাকা নিয়েছিল। দু মাস তো ওষুধ খেলাম ডাক্তারবাবু।  আমার অসুখটা কি এখনো ছোঁয়াচে ? একবারটি লিখে দেবেন আমি সেরে গেছি। যদি চাকরিটা আবার ফিরে পাই ?

হাসপাতালের আউটডোর/এমার্জেন্সির বেঞ্চে বসা কয়েকটা লোক। মানুষ। পেশেন্ট আমাদের কাছে। আসলে এক টুকরো ভারতবর্ষ। ডাক্তারের অপেক্ষায় আছে। কখন সেই ধন্বন্তরীর দেখা পাওয়া যাবে। যিনি দেখা দিলেই সব ভালো হয়ে যাবে। ঠিক হয়ে যাবে। 

অপেক্ষমান এই মানুষগুলোর সামনে আমি, ক্ষুদে প্রশাসক, রাষ্ট্রযন্ত্রের ক্ষুদে প্রতিভূ। মানুষগুলোর একটাই জিজ্ঞাসা। সব ঠিক হয়ে যাবে তো ? প্রশ্নের উত্তরের অপেক্ষায় কাটা হাত, পোড়া মুখ, ভাঙা পা, বেড়ে যাওয়া লিভার, ফোপরা ফুসফুস নিয়ে ওরা বসে আছে পাশাপাশি। আমার আপনার সহনাগরিক। ক্ষুদে একটা পশ্চিমবঙ্গ, ক্ষুদে একটা ভারতবর্ষ। ওরা বসে আছে কাছাকাছি ঘেঁষাঘেষি করে। অপেক্ষায় আছে। প্রশাসনের কাছ থেকে, সরকারের কাছ থেকে, রাষ্ট্রের কাছ থেকে সদুত্তর এর আশায়। ওরা বসে আছে পরম ধৈর্য নিয়ে, সহিষ্ণুতা নিয়ে, অনেক আশা নিয়ে, সমস্যার সমাধানের অপেক্ষায়, আচ্ছে  দিন এর অপেক্ষায়। ওদের দুয়ারে প্রশাসন, দুয়ারে সরকার, দুয়ারে রাষ্ট্র সবকা সাথ সবকা বিকাশ পারবে দিতে সমাধান?

শনিবার, ১২ জুলাই, ২০২৫

হরিয়ানা ও একটি মেয়ে ~ সমীক মুখোপাধ্যায়

আপনি সুপ্রতিষ্ঠিত। সারাজীবন অনেক রোজগার করেছেন। রোজগারের টাকায় একগুচ্ছ প্রপার্টি কিনেছেন। সেই সমস্ত প্রপার্টি থেকে এখন আপনার মাস গেলে সতেরো লাখ টাকা ইনকাম হয়। ঘরে বসে। 

আপনার মেয়েকে টেনিস খেলতে প্রথম উৎসাহ দিয়েছিলেন আপনিই। সেই মেয়ের প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে সমস্ত প্রতিযোগিতায় নিয়ে যাওয়া, সবকিছুতে আপনিই ছিলেন তার প্রথম অনুপ্রেরণা। নিজের চাকরি ছেড়ে দেন মেয়ের ট্রেনিংয়ের জন্য সময় বের করতে। দু লাখ টাকা দিয়ে দামি র‌্যাকেট কিনে আনেন মেয়ের জন্য। 

আপনার প্রশ্রয়ে আর নিজের পরিশ্রমে মেয়ে ধীরে ধীরে স্টেট লেভেল চ্যাম্পিয়ন হয়। মাত্র চব্বিশ বছর বয়েসের মধ্যেই সাতান্নটি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের টেনিস টুর্নামেন্টে খেলে আঠেরোটি সোনার মেডেল নিয়ে আসে সে। 

মেয়েটি একটি টেনিস অ্যাকাডেমি খোলে। যে উৎসাহ, অনুপ্রেরণা সে আপনার কাছ থেকে পেয়ে এতদূর অবধি এসেছে, সে চায় সেই অনুপ্রেরণা ছড়িয়ে পড়ুক নতুন প্রজন্মের মাধ্যেও। 

আপনি দুধ আনতে যান পাড়ার দোকানে। সেখানে আপনার পাড়াপ্রতিবেশিরা আপনাকে টন্ট করে, কী তাউজি, লউন্ডির কামানো পয়সায় খাচ্ছো পরছো? 

আপনি জানেন, ওরা সত্যি বলছে না। আপনার জীবনধারণের জন্য আপনার মেয়ের টেনিস অ্যাকাডেমি থেকে রোজগার করা টাকার ওপর নির্ভর করতে হয় না। আপনিও জানেন, তারাও জানে। সম্ভবত ওরা আপনার পেছনে লাগে। এমনিই। 

আপনার খারাপ লাগে। রাগ হয়। হরিয়ানভি রক্ত টগবগিয়ে ফোটে। একটা জুৎসই জবাব দিতে মন চায়। 

আপনি কী করবেন? প্রতিবেশিদের সাথে তুমুল ঝগড়া করবেন? তাদের মুখ দেখা বন্ধ করে দেবেন? 

তা কী করে হয়? টাকায় কারুর নাম লেখা থাকে না। আপনার মাসিক আয় সতেরো লাখ টাকার সাথে ঐ মেয়ের রোজগার করা এক দেড় লাখ টাকাও তো মিশছে। যে রুটি আপনি খাচ্ছেন, সেই রুটির আটার দু এক দানায় যে ঐ মেয়ের কামানো টাকার ভাগ নেই, তা কি আপনি বলতে পারেন? 

মেয়ের পয়সায় খাওয়া? লজ্জায় মরে যাওয়া উচিত! 

কিন্তু নিজের মরে যাওয়া তো অতটা সহজ নয়। হরিয়ানাতে খুব সহজ নিজের মেয়েকে মেরে ফেলা। 

মেয়ে সফল টেনিস খেলোয়াড়, টেনিস অ্যাকাডেমি নিয়ে মেতে থাকলেও ঘরের কাজ সে উপেক্ষা করে নি। সে যে মেয়ে, মেয়েদের ঘরের কাজ তো করতেই হয়। 

আপনার চব্বিশ বছরের মেয়ে তখন রান্নাঘরে আপনারই জন্য ব্রেকফাস্ট বানাচ্ছিল, যখন আপনি রান্নাঘরে ঢোকেন আপনার লাইসেন্সড পিস্তল নিয়ে।


মঙ্গলবার, ১ জুলাই, ২০২৫

বিধান রায় ও পথের পাঁচালী ~ কৌশিক মজুমদার

পয়লা জুলাই এলেই বিধান রায়ের জন্মদিনের সঙ্গে সঙ্গে আলোচনায় ফিরে আসেন সত্যজিৎ রায়-ও। আর আসবেন না-ই বা কেন? এখন তো প্রায় সবাই জেনে গেছি সত্যজিৎ রায়ের প্রথম সিনেমাটি মুক্তি পাওয়ার পিছনে ভূমিকা ছিল তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায়েরও। সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বারবার উঠে এসেছে সেই আলোচনা। পত্র পত্রিকায়, প্রবন্ধে এমনকি বিখ্যাত কিছু মানুষের লেখাতেও যে সব তথ্য এই বিষয়ে উঠে আসে, তাদের সারসংক্ষেপ এই রকম -



১। বিধান রায় সংস্কৃতির ধার ধারতেন না। তাঁর কোন আইডিয়াই ছিল না সত্যজিৎ কী বানাতে যাচ্ছেন, বা বানিয়েছেন। এই ধারণার পিছনে আছেন দুইজন নামকরা সত্যজিৎ জীবনীকার। মারি সেটন লিখছেন, বিধান রায় নাকি ছিলেন "a man with no pronounced love of art and no knowledge of film as an expressive medium." অ্যান্ড্রু রবিনসন এককাঠি এগিয়ে বিধান রায় সম্পর্কে তাঁর বিখ্যাত বই 'ইনার আই'তে লিখেছেন "from the beginning, misunderstood the film's nature, seeing it as a documentary."

২। সিনেমার টাকা দেওয়া হয়েছিল পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের টাকা থেকে, কারণ সরকার নাকি সিনেমার নাম দেখে ভেবেছিলেন এটা রাস্তা বানানোর ডকুমেন্টরি ধরনের কিছু হবে।

৩। বিধান রায়ের ছবির শেষের করুণ পরিণতি অপছন্দ হওয়াতে তিনি সেটা বদলে দিতে বলেন। শুধু তাই না, দুর্গাকে নাকি বাঁচিয়েও দিতে বলেছিলেন। সত্যজিৎ নিজের গোঁ ধরে রাখেন। বাকিটা ইতিহাস।

৪। সরকার সত্যজিতকে পরিচালনা বাবদ কোনো টাকা দেয়নি। শুধু বানানোর অন্য খরচা দিয়েছিল।

৫। সরকারি আধিকারিকরা নাকি বারবার বলেছিলেন এ-ছবির প্রযোজনা না করতে। কিন্তু সত্যজিতের অসামান্য প্রতিভার পরিচয় পেয়ে ডাক্তার রায় তাঁদের কথা নস্যাৎ করে দেন।

সব কটা ভুল কথা।

নানা তথ্য এবং সত্যজিতের বিভিন্ন সাক্ষাৎকার ইত্যাদি খুঁটিয়ে পড়লেই আসল সত্য উঠে আসে। সত্যজিৎ বিশেষজ্ঞ ছন্দক সেনগুপ্ত মহাশয়ও একবার এই নিয়ে লিখেছিলেন, কিন্তু এই মিথ এত জবরদস্ত, যে সেই জগদ্দলকে ঠেলে ফেলা মুশকিল।

একে একে আসি।

১। সত্যজিৎ রায়ের ছবি করা উচিৎ কি উচিৎ না এই নিয়ে বিধান রায়-কে যারা উপদেশ দেন, তাঁদের মধ্যে যে পি এস মাথুর ছিলেন (যিনি বারবার বলেছিলেন এই ছবি না করতে) তেমন ছিলেন মন্মথ রায়। এই মন্মথ রায় কালের কালবৈশাখীতে চাপা পড়ে গেছেন, কিন্তু তিনি না থাকলে পথের পাঁচালী আদৌ আলোর মুখ দেখত কিনা সন্দেহ। এই ভদ্রলোক ছিলেন বিখ্যাত নাট্যকার, সিগনেটের সত্যজিতের প্রচ্ছদের ভক্ত, আর বিভূতিভূষণের একনিষ্ঠ পাঠক। সিনেমার রাফ কাট দেখে তিনি মুগ্ধ হয়ে যান। সিনেমা বা চিত্রনাট্য তিনি খুব একটা বুঝতেন না, তবুও তাঁর রিপোর্টে তিনি পরিষ্কার লেখেন "বিভূতিভূষণের উপন্যাসের প্রকৃতি যেন ছবিতে অবিকল রূপ পেয়েছে। আমি অভিভূত। আমার দেখে মনে হল এক মহান পরিচালক যেন তাঁর জীবনের সেরা মাস্টারপিসটি বানাতে চলেছেন।" মনে রাখতে হবে, এটা তিনি যখন লিখছেন তখন ছবির গোটাটা বানানোই হয়নি। সঙ্গে ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তো দূরের কথা। কিন্তু মাথুরের রিপোর্ট ছিল এর ঠিক বিপরীতে। ফলে বল চলে আসে সরাসরি বিধান রায়ের কোর্টে যার কিনা "সিনেমা নিয়ে কোনো ধারণাই ছিল না!"

বিধান রায় আর পঙ্কজ মল্লিক মিলে ছবির রাফ কাট দেখলেন। হ্যাঁ, বিধান রায় নিজে রাফ কাট দেখেছিলেন। পঙ্কজ মল্লিক পরে স্বীকার করেন তিনি নিজেও ছবি নিয়ে খুব আশাবাদী ছিলেন না। কিন্তু এই রাফকাট দেখেই বিধানবাবু উত্তেজিত হয়ে ওঠেন, বোঝেন এই ছবির মেরিট আছে আর সরসরি মন্মথবাবুর উপদেশটাই মেনে নেন। রবিনসনের কথা তাই কতটা ভুল ভেবে দেখুন।

২। এবার ছবির টাকার কথা। ছবির টাকা আদৌ পি ডব্লু ডি থেকে আসেনি। এসেছিল লোকরঞ্জন শাখা থেকে। সত্যজিৎ নিজে ফোক ইসাকসনের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন এ-কথা। 'মাই ইয়ারস উইথ অপু'-তে সত্যজিৎ জানাচ্ছেন তাঁর মায়ের বন্ধু বেলা সেন আর তাঁর মেয়ে অর্চনার সঙ্গে তিনি যখন বিধান রায়ের সঙ্গে দেখা করতে যান, বিধান রায় বলেন শেষটা একটু করুণ হয়ে যাচ্ছে না? তখন সত্যজিতের আগেই অর্চনা প্রতিবাদ জানিয়ে বলে "The ending is too well-known and very moving. There would be objections from the readers of the novel as well as from [the author's] family if the ending was changed in any way." ফলে আলোচনা সেখানেই শেষ। সত্যজিতের গোঁ ধরার প্রয়োজনই হয়নি।

৩। সিনেমার বাজেট ছিল ৭০০০০ টাকা, আর যে-কোনো সরকারি প্রজেক্টের মতো এটাতেও পরিচালকের টাকা ধরা ছিল, যেটা সেদিনের হিসেবে নেহাত কম না। ৩০০০ টাকা। ইসাকসনকেও সত্যজিৎ বলেছেন "since I was taking a very small salary", ফলে এই সিনেমায় সত্যজিতকে বিধান রায় এবং তাঁর সরকার একেবারে কিচ্ছু দেননি, এটাও ভুল কথা। যেটা সত্যজিৎ চেয়েও পাননি, সেটা হল ফরেন রাইট। আর সেখানে তাঁকে কিছুটা অন্ধকারে রেখেই সই সাবুদ করানো হয়। বিস্তারিত জানার জন্য ইসাকসনের সাক্ষাৎকারটি পড়ে দেখার অনুরোধ করছি, কিন্তু তাতে ডাক্তার রায়ের কোনো হাত ছিল না। আর, কান উৎসবে ছবিটা দেখানো হলেও সরকার সেখানে সত্যজিৎ-কে পাঠায়নি।

তাহলে এই ডকুমেন্টারির কথা কার মাথায় এল? বিধান রায় তো ভাবেননি। ভাবলেও অর্চনা দেবীর সঙ্গে আলোচনায় তাঁর সন্দেহ দূর হবার কথা। আসলে এই ধারণা হয়েছিল পশ্চিমা কিছু চিত্র সমালোচকের। তাঁর মধ্যে বসলে ক্রোথার-ও ছিলেন। তাঁরা শুরুতে ছবিটা ধরতেই পারেননি। নিজের সমালোচনায় এত বার বাংলার গ্রাম নিয়ে তথ্যচিত্র শব্দবন্ধ লিখে গেছেন যে তাঁদের পরে পশ্চিমা যাঁরাই লিখেছেন এই ধারণা থেকে বেরোতে পারেননি। তাঁদের মনে হয়েছে পশ্চিমের মতো এদেশেও বুঝি এই সিনেমাকে সবাই ডিকুমেন্টারিই ভেবেছিল। আদৌ তা না।

বাংলা সিনেমার ইতিহাসের বাঁক বদলে দিয়েছিল যে সিনেমা, তার সম্পর্কে ভুল ধারণাগুলো দূর করা আজ খুবই জরুরি। আমি নিশ্চিত এই বিকৃত আলোচনায় দুই কিংবদন্তির কেউই খুশি হতেন না

বুধবার, ২৫ জুন, ২০২৫

জরুরি অবস্থায় আরএসএস-এর আত্মসমর্পণ ~ দেবেশ দাস

বিজেপি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ২৫শে জুন সংবিধান হত্যা দিবস হিসাবে পালন করা হবে, কারন ১৯৭৫ সালে ওইদিন জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল। জরুরি অবস্থায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলির নেতা-কর্মীরা গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে আজকের বিজেপির উত্তরসুরী জনসঙ্ঘ নেতারা ছিলেন ও রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ তথা আরএসএস-এর লোকও ছিলেন। কিন্তু, তার সাথে এটাও সত্যি কথা যে যারা গ্রেফতার হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে একমাত্র আরএসএস ও জনসঙ্ঘ নেতারাই সেদিন ইন্দিরা গান্ধীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন। সেই ইতিহাসটা একটু জেনে রাখা দরকার।

জেলে ঢুকেই আরএসএস নেতারা মুক্তির খোঁজে

আরএসএস-এর প্রধান মধুকর দত্তারেয় দেওরস ওরফে বালাসাহেব দেওরস আটক হন ১৯৭৫ সালের ৩০ জুন। তার সাথে গ্রেফতার হওয়া মহারাষ্ট্রের আরএসএস সংগঠক ভি এন ভিদে, গ্রেফতার হওয়ার মাত্র ১৫ দিন বাদে লিখলেন মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী ওয়াই বি চ্যবনকে - "সঙ্ঘ এমনকি দূর থেকেও সরকার বা সমাজের বিরুদ্ধে কিছু করেনি। সঙ্ঘের কর্মসূচীতে এ জাতীয় জিনিসের কোনও স্থান নেই। সঙ্ঘ কেবল সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিযুক্ত রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হচ্ছে। কিন্তু এসব ভিত্তিহীন হিসাবে প্রমাণিত। ...... আমি আপনাকে আটক সঙ্ঘ কর্মীদের মুক্তি দিতে অনুরোধ করছি।" দেওরসের পরামর্শ নিয়েই ভিদে নিশ্চয়ই এই চিঠি লিখেছেন।

আরএসএস প্রধানের ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি

ইন্দিরা গান্ধীকে মোট তিনটি চিঠি লিখেছিলেন দেওরস, হিন্দিতে। তিনটি চিঠি নয়দার এক প্রকাশনা সংস্থা জাগৃতি প্রকাশন ছাপিয়েছে ১৯৯৭ সালে। প্রথম চিঠি ১৫ই আগস্ট, ১৯৭৫ তারিখে দিল্লীর লালকেল্লা থেকে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার পর। দেওরস লিখলেন - "সপ্রেম নমস্কার, ১৫ই আগস্ট তারিখে দিল্লীর লালকেল্লায় রাষ্ট্রকে সম্বোধন করে আপনি যে ভাষণ দিয়েছেন, তা আমি আকাশবাণীতে এই কারগার থেকে মন দিয়ে শুনেছি। আপনার ভাষণ সময়োচিত এবং উপযুক্ত আর এর জন্য এই চিঠি লিখতে আমি প্রবৃত্ত হয়েছি"। লালকেল্লার ভাষণে ইন্দিরা গান্ধী দেশকে গঠন করার নানা কর্মসূচীতে সাহায্য করার জন্য সমাজের সাচ্চা শক্তিগুলিকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। দেওরস চিঠিতে লিখলেন - "১৫ই আগস্টে আপনার ভাষণে এই কাজে সমাজের সাচ্চা শক্তিগুলিকে নিজের নিজের ক্ষেত্র নিয়ে লেগে পড়া চাই বলে আপনি সমস্ত সমাজকে যে ডাক দিয়েছেন তা সময়োচিতই ছিল" । দেশের উত্থানের জন্য ইন্দিরা গান্ধীর এই দেশ গড়ার আহ্বানে সঙ্ঘ যুক্ত হতে চায় সে কথাই লিখলেন দেওরস - "দেশের উত্থানের জন্য সঙ্ঘের এই শক্তিকে যুক্ত করার আয়োজন হওয়া জরুরি"। চিঠি শেষ করেছেন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করতে চেয়ে - "আপনি চাইলে, আপনার সাথে দেখা করতে আমার আনন্দই হবে"। ভাবুন, যার বিরুদ্ধে সারা দেশ জুড়ে দুই মাস আগেই আন্দোলন, তার সাথেই দেখা করার জন্য আরএসএস প্রধান ব্যাকুল হয়ে পড়েছেন।

না, ইন্দিরা গান্ধী দেখা করতে চাননি, উত্তরও দেননি। অধৈর্য হয়ে উঠলেন দেওরস। কিন্তু কী উপলক্ষ্য করেই বা আবার চিঠি লিখবেন? আবার সুযোগ এসে গেল। একটি সুখবর এলো ইন্দিরা গান্ধীর জন্য। ১৯৭৫ সালের ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্ট রায় দিয়েছিল যে, ১৯৭১ সালে লোকসভা নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীর জেতা অবৈধ। ইন্দিরা গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে যান। সুপ্রিম কোর্টে পাঁচ সদস্যের বেঞ্চ ৭ নভেম্বর, ১৯৭৫ ইন্দিরা গান্ধীর নির্বাচনে জেতাকে বৈধ ঘোষণা করে। এই রায় বেরোনোর মাত্র ৩ দিন পরে ইন্দিরা গান্ধীকে অভিনন্দন জানিয়ে দেওরস চিঠি পাঠালেন ১০ ই নভেম্বর, ১৯৭৫ - "সাদর নমস্কার, উচ্চতম আদালতের পাঁচ বিচারপতি আপনার নির্বাচনকে বৈধ ঘোষণা করেছেন বলে আপনাকে হার্দিক অভিনন্দন"। তিনি লিখলেন - "শ্রী জয়প্রকাশ নারায়ণের ---------- আন্দোলনের সাথে সঙ্ঘের কোনও সম্পর্ক নেই"। জয়প্রকাশ নারায়ণ ইন্দিরা গান্ধীর বিরুদ্ধে জরুরি অবস্থার আগে থেকেই আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন, যেদিন জরুরি অবস্থা জারি হয় সেদিনও জয়প্রকাশ নারায়ণের নেতৃত্বে দিল্লীতে বিশাল জমায়েত হয়েছিল। তিনি আরও লিখলেন -"আমার আপনার কাছে প্রার্থনা যে আপনি প্রকৃত পরিস্থিতি জানুন...... সঙ্ঘের সম্বন্ধে সঠিক ধারণা বানান ...... সঙ্ঘের কয়েক হাজার লোককে মুক্তি দিন।
 .........এটা করলে সঙ্ঘের লাখ লাখ স্বয়ংসেবকদের নিঃস্বার্থভাবে কাজ করার শক্তি সরকারী এবং বেসরকারী পথে রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য কাজে লাগবে ও আমাদের সকলের ইচ্ছা অনুসারে আপনার দেশ সমৃদ্ধ হবে। পত্রের উত্তরের অপেক্ষায় রইলাম"।

১৬ই জুলাই, ১৯৭৬ ইন্দিরা গান্ধীকে দেওরসের তৃতীয় চিঠি- "সাদর নমস্কার, আমি আপনাকে আগেই দুটি চিঠি লিখেছি, কিন্তু দুঃখের বিষয় তাদের কোনও প্রাপ্তিস্বীকার বা উত্তর পাইনি। ওই চিঠিগুলিতে আমি আপনি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতারা আরএসএস সম্বন্ধে যে অভিযোগগুলি করেছেন তার কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছি। অভিযোগগুলির ধরন একই এবং কোনদিন তার স্বপক্ষে কোনও প্রমাণ দেওয়া হয়নি। ...... আমি আপনাকে অনুরোধ করছি যে দয়া করে সঙ্ঘ সম্বন্ধে যে ভুল বোঝাবুঝি বিরাজ করছে তার ঊর্ধ্বে উঠুন, বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করুন ও সঙ্ঘের উপর যে নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়েছে তাকে তুলুন"।


জরুরি অবস্থায় আরএসএস সম্বন্ধে আইবি রিপোর্ট

জরুরি অবস্থার সময়ে ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) হেড অফিসে ভিআইপিদের নিরাপত্তার দায়িত্বে উচ্চপদে কাজ করতেন বিখ্যাত আইপিএস অফিসার টি ভি রাজেশ্বর, পরে তিনি আইবি-র ডিরেক্টর হয়েছিলেন। শেষ বয়সে তিনি তাঁর অভিজ্ঞতা নিয়ে 'ইন্ডিয়া, দি ক্রুসিয়াল ইয়ারস' নামে একটা বই লিখেছেন, তাতে বিভিন্ন সময়ে আইবি দপ্তরের কিছু গোপন তথ্য আছে। তাতে লিখেছেন- "জরুরি অবস্থার প্রবর্তনে দক্ষিণপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘকে নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু এর প্রধান বাবাসাহেব দেওরস, নীরবে প্রধানমন্ত্রীর বাড়ির সাথে একটি সংযোগ স্থাপন করেছিলেন এবং দেশে নিয়ম ও শৃঙ্খলা প্রয়োগের জন্য গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের প্রতি দৃঢ় সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন। ...... আইবি-র একজন সিনিয়র অফিসার আরএসএসের উচ্চস্তরের কিছু লোককে জানতেন এবং দেওরস সহ তাঁদের সাথে কয়েকটি বৈঠক করেছিলেন। দেওরস মিসেস গান্ধী ও সঞ্জয়ের সাথে দেখা করতে আগ্রহী ছিলেন, তবে এটি সম্ভব হয়ে ওঠেনি"।

জরুরি অবস্থাকে কার্যত সমর্থন

ডি আর গোয়াল রচিত 'রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ' বইতে আছে যে বাবাসাহেব দেওরস-এর বক্তব্য ছিল যে আরএসএস-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা না করলে, ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থার বিরোধিতা করার প্রশ্নই উঠতো না।

আরএসএস-এর শাখাগুলিতে প্রতি সপ্তাহে একটা বক্তৃতা হয়, যাকে বলে 'বৌদ্ধিক'। আরএসএস-এর এক শীর্ষ নেতা বাবা ভিদে, এই সমস্ত বৌদ্ধিকগুলিতে তিনি জরুরি অবস্থার সমর্থনে বক্তৃতা করতেন। এবিভিপির প্রভু চাওলা, বলবীর পুঞ্জ ও শ্রেরাম খান্না হই হই করে ইন্দিরা গান্ধীর ২০ দফা কর্মসূচীতে নেমে পড়েন, ফলে তাদের আর জেলে ঢুকতে হয় না। আরএসএস-এর একনাথ রামকৃষ্ণ রানাডে একটা সংযোগ গড়ে তুলেছিলেন ইন্দিরা গান্ধীর সাথে, তাকে বলা হয় ইন্দিরা গান্ধীর সাথে কথাবার্তা চালাতে।

উত্তরপ্রদেশে জনসঙ্ঘ ১৯৭৬ সালের ২৫শে জুন, জরুরি অবস্থার এক বছর পূর্ত্তিতে  ইন্দিরা গান্ধী সরকারকে সম্পূর্ণ সমর্থন করার কথা ঘোষণা করে এবং সরকার বিরোধী কোনও কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ না করার জন্য আবেদন করে। সেখানেই শেষ নয়, উত্তরপ্রদেশ ও মধ্যপ্রদেশে ৩৪ জন  জনসঙ্ঘের নেতা কংগ্রেসে যোগ দেন।     

আরএসএস-এ সাথে যুক্ত পুনের একটি মারাঠী দৈনিক 'তরুণ ভারত' সঞ্জয় গান্ধীর নামে একটি বিশেষ সংখ্যা পর্যন্ত প্রকাশ করে। আরএসএস-এর হিন্দি মুখপাত্র 'পাঞ্চজন্য' ১৯৭৫ সালের ডিসেম্বরে যুব নেতা হিসাবে সঞ্জয়ের উত্থানকে অভিনন্দন জানায়।

আরএসএস-এর মুচলেকা

১৯৭৬ সালের ৩০শে নভেম্বর, আরএসএস-এর মাধবরাও মুলে, দত্তোপন্ত থেনগাডি, মরোপন্ত পিংলে সহ ৩০ জনের উপর নেতা ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লেখেন যে আরএসএস-এর নেতা-কর্মীরা মুচলেকা দিয়ে জেল থেকে বেরোতে চান ও যদি তারা সকলে মুক্তি পান, তবে তারা জরুরি অবস্থাকে সমর্থন করবেন। মাধবরাও মুলে ছিলেন আরএসএস-এর সাধারণ সম্পাদক। তিনি, তখন আত্মগোপনে আছেন। ইন্দিরা গান্ধীর মিডিয়া উপদেষ্টা তখন ছিলেন এইচ ওয়াই সারদা প্রসাদ, তার পুত্র রবি বিশ্বেস্বরায় সারদা প্রসাদ পরে লিখেছেন যে তার পিতাই আরএসএস নেতাদের মুক্তি দেওয়ার বিষয়টি কার্যকর করার দায়িত্বে ছিলেন।

মহারাষ্ট্রের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা বাবা আদভ দেওরসের সাথে একই জেলে ছিলেন, তিনি নিজের চোখে যা দেখেছেন তা লিখেছিলেন- "বন্দীদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে তারা কোনও অঙ্গীকার বা স্মারকলিপি সই করতে প্রস্তুত কিনা। আমি নিজের চোখে দেখেছি যে বেশিরভাগ আরএসএস বন্দীরা তাদের সম্মতি স্বাক্ষর করছে"।


সুব্রম্মনীয়মের বক্তব্য
সেদিনের জনসঙ্ঘের এক সাংসদ ছিলেন সুব্রম্মনীয়ম স্বামী, ২০১৩ সালে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তিনি 'দি হিন্দু' পত্রিকায় ১৩ জুন, ২০০০ জরুরি অবস্থা নিয়ে একটা প্রবন্ধ লিখেছেন যাতে বলেন যে সেদিনের আরএসএস নেতাদের বেশিরভাগ জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলনে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন।  তিনি লিখেছেন -"অটল বিহারি বাজপেয়ী মহাশয় ইন্দিরা গান্ধীর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে পত্র লিখেছিলেন এবং তিনি তাঁকে দয়া করেছিলেন। সরকারের বিরুদ্ধে কোনও কর্মসূচিতে অংশ নেবেন না বলে লিখিত আশ্বাস দিয়ে প্রকৃতপক্ষে ২০ মাসের জরুরি অবস্থার বেশীর ভাগ সময়ে বাজপেয়ী মহাশয় প্যারোলে মুক্ত ছিলেন"। 

মাধবরাও মুলের কাছে থেকে সুব্রম্মনীয়ম  জানেন যে আরএসএস-এর নেতা-কর্মীরা  মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেলেও,  সুব্রম্মনীয়মকে ছাড়া হবে না, কারণ তিনি বিদেশে ইন্দিরা ও সঞ্জয়ের বিরুদ্ধে প্রচার করেছেন, ইন্দিরার চোখে ভালো হওয়ার জন্য বাজপেয়ীই বিশ্বাসঘাতকতা করে সুব্রম্মনীয়মকে ধরিয়ে দিতে পারেন।  বাজপেয়ী সুব্রম্মনিয়মকে ধরিয়ে দিতে শাসক দলকে খবর দিয়েছিলেন কিনা, সেটা জানা নেই, কিন্তু এটা সত্যি যে সেই সময়ে বাজপেয়ী নিজে নিজেই একদিন দেখা করতে গিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র দফতের প্রতিমন্ত্রী  ওম মেহতার সাথে। সুব্রম্মনিয়মের ধারণা যে সেদিন বাজপেয়ী বলে এসেছিলেন যে তিনি আর আরএসএস-এর সাথে আর সম্পর্ক রাখবেন না, এবং তিনি সুব্রম্মনীয়ম স্বামী, মাধবরাও মুলে ও অন্যান্য আরএসএস কর্মীরা যারা তখনো আত্মগোপনে আছে, তাদের সমস্ত হদিস দিয়ে আসেন।  স্বাধীনতার আগে থেকেই বিশ্বাসঘাতকতা আরএসএস-এর রক্তে আছে।

পুরো রেফারেন্স 

১) Shah Commission of Inquiry – 1st Interim Report, page 25

(২) Shah Commission of Inquiry - 3rd Final Report, page 134

(৩) The Print, 25th June, 2020


(৫) Amit Shah, 'Dictorial Mindset Led To Emergency' , টাইমস অফ ইন্ডিয়া, ২৬ সে জুন, ২০২১;

(৬) Sushil Kumar Modi. 'A story that needs to be retold', ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ২৬শে জুন, ২০২১;

(৭) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019; page 124-129

(৮) D R Goyal, 'Rashtriya Swayamsevak Sangh', Radhakrishna Prakashan, 1979, page 116

(৯) M. S. Golwalkar, 'We Or Our Nationhood Defined', Bharat Publications, Nagpur1939, page 32

(১০) M. S. Golwalkar, Bunch of Thoughts, Sahitys Sindhu Prakashana, 1966, page 59

(১১) M. S. Golwalkar, Bunch of Thoughts, Sahitys Sindhu Prakashana, 1966, pages 177-201

(১২) Partha Banerjee, 'In the belly of the beast', Ajanta Books International, 1998, page 155

(১৩) The Hindu, 6 March, 2018

(১৪) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019; page 486-487

(১৫) Neerja Chowdhury, 'How Prime ministers decide', Aleph Book Company, page 66

(১৬) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019; pages 227-228

(১৭) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019; pages 225

(১৮) Bipan Chandra, 'In the name of democracy: JP movement and the emergency' Penguin, 2003, page 172

(১৯) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019; page 488

(২০) Coomi Kapoor, 'The Emergency: A personal story', Penguin, page 117
(২১) मधुकर दत्ताराय देवरस (बालासाहेब देवरस), 'हिंदू संगठन और सत्तावादी राजनीति', जागृति प्रकाशन, नोएडा, 1997
(২২) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019; page 493-494

(২৩) T V Rajeswar, 'India, The crucial years', Harper Collins, 2015, page 79

(২৪) D R Goyal, 'Rashtriya Swayamsevak Sangh', Radhakrishna Prakashan, 1979, page 124-125;

(২৫) Coomi Kapoor, 'The Emergency: A personal story', Penguin, page 47
(২৬) Neerja Chowdhury, 'How Prime ministers decide', Aleph Book Company, 2023 page 67
(২৭) The wire, 29 June 2024
(২৮) PRAJAKTA R. GUPTE, "India:"The Emergency"and the Politics of Mass Sterilization", Education About ASIA, Volume 22, Number 3, Winter 2017, pp. 40-44

(২৯) T V Rajeswar, 'India: The crucial years', Harper Collins Publisher, India, 2015, page 79

(৩০) Neerja Chowdhury, 'How Prime ministers decide', Aleph Book Company, 2023 page 79

(৩১) Bipan Chandra, 'In the name of democracy: JP movement and the emergency' Penguin, 2003, page 217-218

(৩২) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019, page 494-495;

(৩৩) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019, page 181;

(৩৪) Subramanian Swamy, 'Unlearnt lessons of the Emergency', The Hindu, 13 June, 2000;

(৩৫) Ajaz Ashraf, 'Vajpayee, RSS cowered before Indira Gandhi: BJP can't ignore Swamy's account of the Emergency', Firstpost, June 25, 2015.
(৩৬) Coomi Kapoor, 'The Emergency: A personal story', Penguin, page 122
(৩৭) Coomi Kapoor, 'The Emergency: A personal story', Penguin, page 133
(৩৮) Neerja Chowdhury, 'How Prime ministers decide', Aleph Book Company, 2023, page 36-37
(৩৯) N P Ulekh, 'The untold Vajpayee: politician and paradox', Penguin 2017, page 83-84
(৪০) Coomi Kapoor, 'The Emergency: A personal story', Penguin, page 19
(৪১) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019, page 183
(৪২) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019, page 185
(৪৩) Neerja Chowdhury, 'How Prime ministers decide', Aleph Book Company, 2023, page 66
(৪৪) The Indian Express, 26 February 1977
(৪৫) A G Noorani, 'The RSS A Menac to India', Left Word, 2019, page 197;
(৪৬) The Times of India, 11 April 1977
(৪৭) The Indian express, 8 May 1977
(৪৮) The Times of India 13 February 1980

(৪৯) Neerja Chowdhury, 'How Prime ministers decide', Aleph Book Company, 2023, page 67

শুক্রবার, ২০ জুন, ২০২৫

বিশ্ব রিফিউজি দিবস ও ফিলিস্তিন ~ অরিজিৎ মুখার্জী

"...𝘛𝘩𝘦𝘴𝘦 𝘰𝘱𝘦𝘳𝘢𝘵𝘪𝘰𝘯𝘴 𝘤𝘢𝘯 𝘣𝘦 𝘤𝘢𝘳𝘳𝘪𝘦𝘥 𝘰𝘶𝘵 𝘪𝘯 𝘵𝘩𝘦 𝘧𝘰𝘭𝘭𝘰𝘸𝘪𝘯𝘨 𝘮𝘢𝘯𝘯𝘦𝘳: 𝘦𝘪𝘵𝘩𝘦𝘳 𝘣𝘺 𝘥𝘦𝘴𝘵𝘳𝘰𝘺𝘪𝘯𝘨 𝘷𝘪𝘭𝘭𝘢𝘨𝘦𝘴 (𝘣𝘺 𝘴𝘦𝘵𝘵𝘪𝘯𝘨 𝘧𝘪𝘳𝘦 𝘵𝘰 𝘵𝘩𝘦𝘮, 𝘣𝘺 𝘣𝘭𝘰𝘸𝘪𝘯𝘨 𝘵𝘩𝘦𝘮 𝘶𝘱, 𝘢𝘯𝘥 𝘣𝘺 𝘱𝘭𝘢𝘯𝘵𝘪𝘯𝘨 𝘮𝘪𝘯𝘦𝘴 𝘪𝘯 𝘵𝘩𝘦𝘪𝘳 𝘥𝘦𝘣𝘳𝘪𝘴) 𝘢𝘯𝘥 𝘦𝘴𝘱𝘦𝘤𝘪𝘢𝘭𝘭𝘺 𝘰𝘧 𝘵𝘩𝘰𝘴𝘦 𝘱𝘰𝘱𝘶𝘭𝘢𝘵𝘪𝘰𝘯


𝘤𝘦𝘯𝘵𝘦𝘳𝘴 𝘸𝘩𝘪𝘤𝘩 𝘢𝘳𝘦 𝘥𝘪𝘧𝘧𝘪𝘤𝘶𝘭𝘵 𝘵𝘰 𝘤𝘰𝘯𝘵𝘳𝘰𝘭 𝘤𝘰𝘯𝘵𝘪𝘯𝘶𝘰𝘶𝘴𝘭𝘺; 𝘰𝘳 𝘣𝘺 𝘮𝘰𝘶𝘯𝘵𝘪𝘯𝘨 𝘤𝘰𝘮𝘣𝘪𝘯𝘨 𝘢𝘯𝘥 𝘤𝘰𝘯𝘵𝘳𝘰𝘭 𝘰𝘱𝘦𝘳𝘢𝘵𝘪𝘰𝘯𝘴 𝘢𝘤𝘤𝘰𝘳𝘥𝘪𝘯𝘨 𝘵𝘰 𝘵𝘩𝘦 𝘧𝘰𝘭𝘭𝘰𝘸𝘪𝘯𝘨 𝘨𝘶𝘪𝘥𝘦𝘭𝘪𝘯𝘦𝘴: 𝘦𝘯𝘤𝘪𝘳𝘤𝘭𝘦𝘮𝘦𝘯𝘵 𝘰𝘧 𝘵𝘩𝘦 𝘷𝘪𝘭𝘭𝘢𝘨𝘦 𝘢𝘯𝘥 𝘤𝘰𝘯𝘥𝘶𝘤𝘵𝘪𝘯𝘨 𝘢 𝘴𝘦𝘢𝘳𝘤𝘩 𝘪𝘯𝘴𝘪𝘥𝘦 𝘪𝘵. 𝘐𝘯 𝘵𝘩𝘦 𝘦𝘷𝘦𝘯𝘵 𝘰𝘧 𝘳𝘦𝘴𝘪𝘴𝘵𝘢𝘯𝘤𝘦, 𝘵𝘩𝘦 𝘢𝘳𝘮𝘦𝘥 𝘧𝘰𝘳𝘤𝘦 𝘮𝘶𝘴𝘵 𝘣𝘦 𝘥𝘦𝘴𝘵𝘳𝘰𝘺𝘦𝘥 𝘢𝘯𝘥 𝘵𝘩𝘦 𝘱𝘰𝘱𝘶𝘭𝘢𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘮𝘶𝘴𝘵 𝘣𝘦 𝘦𝘹𝘱𝘦𝘭𝘭𝘦𝘥 𝘰𝘶𝘵𝘴𝘪𝘥𝘦 𝘵𝘩𝘦 𝘣𝘰𝘳𝘥𝘦𝘳𝘴 𝘰𝘧 𝘵𝘩𝘦 𝘴𝘵𝘢𝘵𝘦..." – 𝑃𝑙𝑎𝑛 𝐷𝑎𝑙𝑒𝑡, 10𝑡ℎ 𝑀𝑎𝑟𝑐ℎ, 1948

আজ বিশ্ব রিফিউজি দিবস। পিঠে কাঁটাতারের দাগ লেগে থাকা মানুষগুলোকে মনে রেখে। যাতে আর কারো পিঠে কাঁটাতারের দাগ না লাগে কোনওদিন। ১৯৪৭-৪৮ সালে দেশভাগের দুটো ঘটনার একটায় আমরা ভুক্তভোগী। আর অন্যটা—ফিলিস্তিনের নকবা—সেইভাবে আমরা মনে রাখিনি কোনোদিনও, যদিও ফিলিস্তিনের মানুষ আমাদেরই মত ভুক্তভোগী। মনে রাখিনি তার একটা বড় কারণ সম্ভবতঃ প্রোপাগান্ডা—"আগ্রাসী আরব দেশগুলো আক্রমণ করেছিল সদ্যজাত ইজরায়েলকে, ইজরায়েল প্রতিরোধ করে, এবং ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্রসংঘের ১৮১ নম্বর নির্দেশিকা অনুযায়ী তৈরী নির্দিষ্ট অঞ্চলে পাঠিয়ে দেয়..."

ছোট করে রাষ্ট্রসংঘের এই পার্টিশনের ফরমুলাটা লিখে দিই—ব্রিটেনের অধীনে থাকা প্যালেস্টাইন তিন ভাগে বিভক্ত হবে—৪২% অংশ নির্দিষ্ট হবে ৮,১৮,০০০ ফিলিস্তিনি অধিবাসীদের নিজস্ব রাষ্ট্র হিসেবে, সেখানে থাকবে ১০,০০০ ইহুদী ইমিগ্র্যান্টও। ইহুদীদের নিজস্ব রাষ্ট্র তৈরী হবে ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনের ৫৬% এলাকা নিয়ে, সেখানে থাকবে ৪,৯৯,০০০ ইহুদী, যার বেশিটাই ইউরোপীয় ইমিগ্র্যান্ট এবং ৪,৩৮,০০০ ফিলিস্তিনি অধিবাসী। জেরুজালেম এবং সংলগ্ন এলাকা আন্তর্জাতিক সংস্থার হাতে থাকবে, মোটামুটি দুই লক্ষ অধিবাসীসহ (যাদের মধ্যে ইহুদী এবং ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা প্রায় সমান সমান)। বেন গুরিয়নের নেতৃত্বে জায়নিস্টরা চেয়েছিল ব্রিটিশ প্যালেস্টাইনের ৮০ শতাংশ এলাকা শুধুমাত্র ইহুদী বসবাসের জন্যে। রাষ্ট্রসংঘ তার চেয়ে কিছু কম দেয়। এই ফরমুলা মেনে নিয়েও বেন গুরিয়ন বলেছিলেন—

"𝘛𝘩𝘦 𝘢𝘤𝘤𝘦𝘱𝘵𝘢𝘯𝘤𝘦 𝘰𝘧 𝘱𝘢𝘳𝘵𝘪𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘥𝘰𝘦𝘴 𝘯𝘰𝘵 𝘤𝘰𝘮𝘮𝘪𝘵 𝘶𝘴 𝘵𝘰 𝘳𝘦𝘯𝘰𝘶𝘯𝘤𝘦 𝘢𝘯𝘺 𝘱𝘢𝘳𝘵 𝘰𝘧 𝘵𝘩𝘦 𝘓𝘢𝘯𝘥 𝘰𝘧 𝘐𝘴𝘳𝘢𝘦𝘭. 𝘡𝘪𝘰𝘯𝘪𝘴𝘮 𝘳𝘦𝘲𝘶𝘪𝘳𝘦𝘴 𝘵𝘩𝘦 𝘑𝘦𝘸𝘪𝘴𝘩 𝘱𝘦𝘰𝘱𝘭𝘦 𝘵𝘰 𝘣𝘦 𝘢𝘳𝘮𝘦𝘥 𝘢𝘯𝘥 𝘳𝘦𝘢𝘥𝘺, 𝘯𝘰𝘵 𝘰𝘯𝘭𝘺 𝘵𝘰 𝘥𝘦𝘧𝘦𝘯𝘥 𝘪𝘵𝘴𝘦𝘭𝘧 𝘣𝘶𝘵 𝘢𝘭𝘴𝘰 𝘵𝘰 𝘦𝘹𝘱𝘢𝘯𝘥. 𝘛𝘩𝘦 𝘣𝘰𝘶𝘯𝘥𝘢𝘳𝘪𝘦𝘴 𝘰𝘧 𝘡𝘪𝘰𝘯𝘪𝘴𝘵 𝘢𝘴𝘱𝘪𝘳𝘢𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘪𝘯𝘤𝘭𝘶𝘥𝘦 𝘴𝘰𝘶𝘵𝘩𝘦𝘳𝘯 𝘓𝘦𝘣𝘢𝘯𝘰𝘯, 𝘴𝘰𝘶𝘵𝘩𝘦𝘳𝘯 𝘚𝘺𝘳𝘪𝘢, 𝘵𝘰𝘥𝘢𝘺'𝘴 𝘑𝘰𝘳𝘥𝘢𝘯, 𝘢𝘭𝘭 𝘰𝘧 𝘊𝘪𝘴-𝘑𝘰𝘳𝘥𝘢𝘯 𝘢𝘯𝘥 𝘵𝘩𝘦 𝘚𝘪𝘯𝘢𝘪. 𝘞𝘦 𝘮𝘶𝘴𝘵 𝘦𝘹𝘱𝘦𝘭 𝘈𝘳𝘢𝘣𝘴 𝘢𝘯𝘥 𝘵𝘢𝘬𝘦 𝘵𝘩𝘦𝘪𝘳 𝘱𝘭𝘢𝘤𝘦𝘴. 𝘈𝘯𝘥 𝘪𝘧 𝘸𝘦 𝘢𝘳𝘦 𝘧𝘰𝘳𝘤𝘦𝘥 𝘵𝘰 𝘢𝘤𝘤𝘦𝘱𝘵 𝘱𝘢𝘳𝘵𝘪𝘵𝘪𝘰𝘯, 𝘸𝘦 𝘮𝘶𝘴𝘵 𝘢𝘤𝘤𝘦𝘱𝘵 𝘪𝘵 𝘰𝘯𝘭𝘺 𝘵𝘦𝘮𝘱𝘰𝘳𝘢𝘳𝘪𝘭𝘺. 𝘛𝘩𝘦 𝘱𝘢𝘳𝘵𝘪𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘳𝘦𝘴𝘰𝘭𝘶𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘸𝘪𝘭𝘭 𝘣𝘦 𝘥𝘦𝘵𝘦𝘳𝘮𝘪𝘯𝘦𝘥 𝘣𝘺 𝘧𝘰𝘳𝘤𝘦 𝘢𝘯𝘥 𝘯𝘰𝘵 𝘣𝘺 𝘵𝘩𝘦 𝘱𝘢𝘳𝘵𝘪𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘳𝘦𝘴𝘰𝘭𝘶𝘵𝘪𝘰𝘯 𝘪𝘵𝘴𝘦𝘭𝘧"

আর, ঠিক তাইই হয়েছিল ১৯৪৭-৪৮ সালে। রাষ্ট্রসংঘ ঠুঁটো জগন্নাথের মত তাকিয়ে থেকেছিল।

পরবর্তীকালে এই সময়ের সমস্ত ন্যারেটিভ রেকর্ড হয়েছে। ফিলিস্তিনি গ্রাম দের ইয়াসিনের মত একাধিক নাম পাওয়া যায় ইতিহাসে—আরব অধিবাসীদের নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার প্রচেষ্টার স্পষ্ট ডকুমেন্টেশন। তবুও আরব-ইজরায়েল কনফ্লিক্টের ইতিহাস বেশিরভাগ মানুষের মাথায় ১৯৬৭ সালে দাঁড়িয়ে, বড়জোর ১৯৪৮ সালের মে মাসে, যখন আরব আর্মি প্যালেস্টাইনে ঢোকে, আর তারপর সদ্যজাত ইজরায়েল নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে ইত্যাদি...এই প্রোপাগান্ডার তলায় চাপা পড়ে যায় নকবার ইতিহাস, প্ল্যান দালে, আর এই সবকিছুর পথপ্রদর্শক ফিলিস্তিনী "ভিলেজ ফাইলস"...

বিশ্ব রিফিউজি দিবসে তাই এই ভিলেজ ফাইলসের কথা লিখি—ফিলিস্তিনি উচ্ছেদের নীল নকশা।

এই নীল নকশার শুরু তিরিশের দশকের দ্বিতীয়ার্ধে—ততদিনে হাগানাহ তৈরী হয়ে গেছে, ফিলিস্তিনিদের বিদ্রোহের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর সঙ্গে বেয়নেট চালিয়ে বিদ্রোহীদমনের (মানে গ্রামের সাধারণ মানুষ) ট্রেনিংও সারা। ১৯৩৭-৩৮ সাল নাগাদ হিব্রু ইউনিভার্সিটির ইতিহাসের প্রফেসর বেন-জায়ন লুরিয়া এক পরিকল্পনা তৈরী করেছিলেন—ফিলিস্তিনি অধ্যুষিত সমস্ত গ্রামের খুঁটিনাটি বর্ণনা ধরে রাখার—যা পরে জায়নিস্টদের জমি দখলের কাজে সাহায্য করবে। ইহুদি জাতীয় তহবিল (জেএনএফ)—ফিলিস্তিনে ইহুদি বসতি স্থাপনের মূল হাতিয়ার—এই প্রকল্পকে সাদরে গ্রহণ করে। সেই সময়ে জেএনএফ-এর প্রধান ইয়োসেফ ওয়াইৎজের নেতৃত্বে স্বয়ং ফিলিস্তিনি চাষীদের জমি থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা চলছে।

কী কী তথ্য ধরে রাখা হত এই ভিলেজ ফাইলসে? সমস্ত ভৌগোলিক তথ্য, যেমন গ্রামের অবস্থান, যোগাযোগের রাস্তা, জলের উৎস, জমির মান; সামাজিক-রাজনৈতিক তথ্য, যেমন জনগোষ্ঠীর গঠন, গ্রামপ্রধান (মুখতার), ধর্মীয় পরিচয়, গোত্র কাঠামো, প্রতিবেশী গ্রামের সাথে সম্পর্ক; অর্থনৈতিক তথ্য, যেমন আয়ের উৎস, চাষাবাদের জমি, ফলের বাগিচা, পশুসম্পদ, কারিগর, যানবাহন; জায়নিস্ট কলোনিয়ালিজমের প্রতি ভাবনা, যেমন ১৯৩৬ সালের ব্রিটিশ ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে ফিলিস্তিনি বিদ্রোহে সেই গ্রাম অংশ নিয়েছিল কিনা, কারা ছিল তার মধ্যে ইত্যাদি। এর মধ্যে, সেই বিদ্রোহে নিহতদের পরিবারের নাম বিশেষভাবে নথিভুক্ত করা হত। ইহুদি হত্যার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে ছিল, তাদের তথ্যও আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হত। এছাড়া যোগাড় করা হত সামরিক তথ্যও, যেমন গ্রামে পাহারাদারের সংখ্যা, গ্রামবাসীদের কাছে থাকা অস্ত্রের ধরন ও গুণমান—যদিও সেই অস্ত্রের সংখ্যা ছিল খুবই নগণ্য, আর যা ছিল তাও মান্ধাতার আমলের।

শেফেয়া নামের এক ইয়ুথ ভিলেজ—যুবকদের বোর্ডিং স্কুল—ছিল এই তথ্য সংগ্রহের ঘাঁটি। খানিকটা কোল্ড ওয়ারের সময়কার "স্পাই ভিলেজ"-এর মত—যেখানে ফিলিস্তিনি গ্রাম্য জীবনযাপনের ট্রেনিং নিত আরবী বলিয়েকইয়ে ইহুদী যুবকরা। এই শেফেয়া থেকেই তারা বিভিন্ন ফিলিস্তিনি গ্রামে যেত, আরব অধিবাসীদের আতিথেয়তার ফায়দা নিয়ে এই সমস্ত তথ্য যোগাড় করত। এজরা ড্যানিনের হাতে এই প্রোজেক্টের দায়িত্ব আসার পর ক্রমশ: আরো ব্যাপক চেহারা নেয় ভিলেজ ফাইলস।

১৯৪৭ সালে যখন ব্রিটিশ সরকার প্যালেস্টাইন ছেড়ে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নেয় (আচমকাই, অনেকটা ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্তের মতই), তখন এই ভিলেজ ফাইলস সরাসরি যুদ্ধপ্রস্তুতির কাজে লাগায় জায়নিস্টরা। প্রত্যেক গ্রামের জন্যে "ওয়ান্টেড" লিস্ট তৈরী হয়—১৯৩৬ সালের ফিলিস্তিনি বিদ্রোহে যুক্ত থাকা লোকজন, মুফতি হজ আমিন আল-হুসেইনির সমর্থক লোকজন, প্রকাশ্যে ব্রিটিশ এবং জায়নিস্টদের বিরুদ্ধে কথা বলা লোকজনের নাম তো লিস্টে উঠতোই, এমনকি লেবাননে বেড়াতে গিয়ে থাকলে বা গ্রামের পঞ্চায়েত ধাঁচের কমিটির সদস্য হলেও এই তালিকায় নাম উঠে যেত…
১৯৪৭ সালের ২৯শে নভেম্বর রাষ্ট্রসংঘের পার্টিশন প্ল্যান পাশ হয় জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে। আর এর পরেই অ্যাক্টিভেট হয় প্ল্যান সি, হিব্রু ভাষায় গিমেল—বাস্তবে যেটা প্যালেস্টাইনের এলাকা দখলের জন্যে তৈরী এর আগের দুটো প্ল্যানের মিশেল—স্পষ্টপভাষায় যেখানে ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, বিশিষ্ট লোকজন, ফিলিস্তিনি অফিসার এবং কর্মীদের "খতম" করার কথা বলা হয়েছিল। বলা হয়েছিল ফিলিস্তিনি যানবাহন ব্যবস্থা, অন্যান্য পরিকাঠামো আর জীবনধারণের ব্যবস্থা ধ্বংস করার কথাও। আর বলা হয়েছিল গ্রাম দখলের কথা—যে কাজে এসেছিল ওই ভিলেজ ফাইলস।
আর, তারপর, ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে আসে প্ল্যান দালে, যে প্ল্যানের একাংশ উদ্ধৃত করে এই লেখার শুরু। শ'য়ে শ'য়ে ফিলিস্তিনি গ্রাম ধ্বংস করা হয়েছিল পরের কয়েক মাসে। দের ইয়াসিনের মত হত্যাকান্ড ঘটেছিল একাধিক। ভিলেজ ফাইলসের তালিকা ধরে গ্রামের পুরুষদের সারিবদ্ধ করে দাঁড় করানো হত—লোকাল ইনফর্মারদের মাথায় কাপড়ের থলি পরিয়ে আনা হত আইডেন্টিফিকেশন প্যারেডে। চিহ্নিত লোকগুলোকে ওই লাইনের গুলি করে মেরে দিত ইরগুন, হাগানাহ আর স্টার্ন গ্যাঙের খুনেরা। তারপর আগুনে পুড়তো গোটা গ্রাম। এই জ্বলতে থাকা ফিলিস্তিন থেকে উদ্বাস্তু হয়েছিল কয়েক লক্ষ মানুষ। নকবা। 

যার অন্যতম হাতিয়ার ভিলেজ ফাইলস।

আচ্ছা, গেস্টাপো আর এসএস-এর চেয়ে কোন দিক দিয়ে আলাদা এই ইরগুন, হাগানাহ বা স্টার্ন গ্যাং?

বুধবার, ১৮ জুন, ২০২৫

ফিলিস্তিন ~ স্বাতী মৈত্র

১৯৪৭ সালের নভেম্বর মাসে জাতিসংঘ ফিলিস্তিন ভাগের প্রস্তাব পাশ করে। ক্রমবর্ধমান ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদ ও জায়নবাদের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখবার এটাই ছিল তাঁদের সমাধান, যদিও ডেভিড বেন গুরিয়নের মতন জায়নবাদী নেতৃত্ব সেই সময় থেকেই ঠিক করে রেখেছিলেন যে এটা প্রথম ধাপ মাত্র। ততদিনে আমাদের পরিবারগুলো ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভাগ হয়ে গেছে, বহু মানুষ তখন উদ্বাস্তু। 

সে সময় পোস্ট-ওয়ার অর্ডারের সময়। জাতিসংঘ সব সামলে দেবে, এই প্রত্যয়ের সময়। 

নতুন দেশ ভারত ও পাকিস্তান যখন ১৯৪৮ সালে রিফিউজি ও সাম্প্রদায়িক হিংসা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, কাশ্মীরে ১৯৪৭-৪৮ সালের প্রথম যুদ্ধ লাগিয়ে ফেলেছে, তখনই ফিলিস্তিনে জায়নবাদী শক্তিগুলো শুরু করে ১৯৪৮ সালের ফিলিস্তিন যুদ্ধ। আমাদের পরিবারগুলো তখন ক্যাম্পে, জবরদখল কলোনিতে। হয়তো খবর এসেছিল, হয়তো আসেনি, কিন্তু সেই সময়েই ফিলিস্তিনে উদ্বাস্তু হলেন অন্তত ৭ লক্ষ ফিলিস্তিনবাসী, এক বিধ্বংসী হিংস্র শক্তির হাতে। এই ঘটনাকে বলা হয় নকবা, অথবা মহাবিপর্যয়। 

দেশভাগ শেষ হয়নি। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশের মানুষ এটা হাড়ে হাড়ে বোঝেন। মানচিত্রের ভাগ আমরাই চেয়েছিলাম, কিন্তু হাঁড়ি ভাগ হলেই যে নাড়ির যোগ ছিন্ন হয়না, তা আমরা একবিংশ শতকে বসে ভালোই বুঝতে পারি। 

শেষ হয়নি নকবাও। তার ফল আরো অনেক বিধ্বংসী, ভয়ঙ্কর। সেখানে এক পক্ষের হাতে পরমাণু বোমা আর আরেক পক্ষের হাতে ক্রুড রকেট ও কয়েকটা কালাশনিকভ। আমরা অন্তত স্বাধীন হয়েছি। স্বাধীন হয়নি ফিলিস্তিন। 

গাজার সাম্প্রতিক গণহত্যা পৃথিবীর প্রথম গণহত্যা নয়, কিন্তু এই গণহত্যা যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। হাসপাতালে বোমা, স্কুলে বোমা, রিফিউজি শেল্টারে বোমা, তাড়িয়ে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে বোমা, আটা নিতে গিয়ে হত্যা, কোয়াড কপ্টার-স্নাইপার দিয়ে হত্যা, শিশুহত্যা, স্নাইপার দিয়ে পয়েন্ট ব্ল্যাংক রেঞ্জে শিশুহত্যা, ধ্বংসস্তূপে হত্যা, খাবার নিতে গিয়ে হত্যা, ওয়াইট ফসফরাস (টুইটারে ফিলিস্তিনিদের বক্তব্য অনুযায়ী) দিয়ে হত্যা, তাঁবুতে আইভি ড্রিপ-সহ কিশোরকে পুড়িয়ে হত্যা, খেতে না দিয়ে হত্যা, জ্বালানি না দিয়ে হত্যা, মাছ ধরতে না দিয়ে হত্যা, আরও কত কত রকমের হত্যা - এবং সেই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে পার পেয়ে যাওয়া - এটাই যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। জাতিসংঘ একটা ইয়ার্কির নাম। 

ভারতবর্ষের মানুষ মানতে চান, না চান, ইতিহাসের আশ্চর্য সমাপতনে মিডনাইটস চিলড্রেনের মতন এক সূত্রে আমরা গাঁথা। ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা শুধু ফিলিস্তিনের নয়, আমাদের স্বাধীনতা। ফিলিস্তিন হারলে, নিঃশেষ হয়ে গেলে, ম্যাপ থেকে মুছে গেলে আমাদের হার, কারণ তা আন্তর্জাতিক আইনের হার, তৃতীয় বিশ্বের সুরক্ষা কবচের অন্তিম অন্তর্ধান, নব্য-সাম্রাজ্যবাদের নিরঙ্কুশ জয়। 

একদিকে স্বাধীনতা, অন্য দিকে মহাবিপর্যয়।

বৃহস্পতিবার, ১৫ মে, ২০২৫

দেশদ্রোহী কারা? ~ অরিজিত গুহ



    ১৯২৮ সালের কংগ্রেসের কলকাতার অধিবেশন বসে পার্ক সার্কাস ময়দানে। বর্তমানে পার্ক সার্কাস ট্রাম ডিপোর সামনের যে রাস্তাটা সেই রাস্তা দিয়ে কংগ্রেসের অধিবেশনের মিছিল চলেছিল। রাস্তাটার নাম কংগ্রেস এগজিবিশন রোড আজও সেই কংগ্রেসের অধিবেশনের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। 

     এই রাস্তা দিয়েই এক শীর্ণকায় ব্যক্তির নেতৃত্বে আরেকটি মিছিল যোগ দিয়েছিল কংগ্রেসের সেই মূল মিছিলে। মিছিলটি বিশেষ একটি কারণে লোকজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল কারন এর আগে কংগ্রেসের কোনো মিছিলে কলকারখানার শ্রমিক মুটে মজুরদের সেভাবে প্রতিনিধিত্ব ছিল না যা এই মিছিলের বিশেষত্ব ছিল। 

   এই অধিবেশনে মতিলাল নেহেরুর দ্বারা একটি প্রস্তাব পেশ করা হয়। প্রস্তাবটি ছিল ভারতের ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাসের। গান্ধীজি সেই প্রস্তাব সমর্থন করলেও জওহরলাল নেহেরু, সুভাষচন্দ্র বোস প্রভৃতি অল্প বয়সী নেতৃত্ব এর তীব্র প্রতিবাদ জানায়। তাঁরা বিকল্প একটি প্রস্তাব পেশ করেন যা ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী। শীর্ণকায় ব্যক্তিটির নেতৃত্বে যে মিছিলটি এসেছিল, সেই মিছিলের প্রতিনিধিরা এই পূর্ণ স্বাধীনতার দাবীর প্রস্তাবের পক্ষে দাঁড়ায়। শীর্ণকায় ব্যক্তিটির নাম মুজফফর আহমেদ। যিনি কাকাবাবু নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। 

    মূল প্রস্তাবটি সংখ্যাধিক্যের জোরে একটি সংশোধনী সহ পাস হয়ে গেল। সংশোধনীটি ছিল যদি এক বছরের মধ্যে ব্রিটিশ রাজ ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস মেনে না নেয় তাহলে পরের লাহোর অধিবেশন থেকে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী উত্থাপন করবে। যথারীতি ব্রিটিশ রাজ ডোমিনিয়ন স্ট্যাটাস মেনে নেয় নি এবং লাহোর অধিবেশন থেকে কংগ্রেস পূর্ণ স্বাধীনতার দাবী তোলে আর ১৯৩০ সালের ২৬শে জানুয়ারি থেকে নিজেদের স্বাধীন ভারতের নাগরিক বলে ঘোষণা করে। 

   কংগ্রেসের প্রবীন নেতৃত্ব এবং তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে কলকাতার এই অধিবেশন থেকেই একটা মতানৈক্য দেখা দিল। এই মতানৈক্যের প্রভাব পড়ল ভারতে, বিশেষ করে বাংলায় কাজ করা তরুণ বিপ্লবী দলের মধ্যে। তাঁরা আর এই আবেদন নিবেদনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী থাকতে পারছিলেন না। বিকল্প নেতৃত্বের প্রয়োজনে গড়ে উঠল রিভোল্ট গ্রুপ। অনুশীলন সমিতির সতীশ পাকড়াশি, নিরঞ্জন সেন এবং যতীন দাসের উদ্যোগে যুগান্তর গোষ্ঠির বরিশাল শাখা, চট্টগ্রামের সূর্য সেন, মাদারিপুরের পঞ্চানন চক্রবর্তী (কাজী নজরুলের অভিন্নহৃদয় বন্ধু), এবং আরো ছোট ছোট গ্রুপ মিলে এই রিভোল্ট গ্রুপে সামিল হল। কর্মসূচি নেওয়া হল বিভিন্ন জেলায় ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করা হবে। এই কর্মসূচি যদি বাস্তবে রূপায়িত করা যায় তাহলে প্রবীন নেতৃত্বও ও আরো অন্যান্য বিপ্লবী গোষ্ঠি এই কর্মোদ্যোগে সাড়া না দিয়ে পারবে না।
 
    অ্যাকশন প্ল্যান একজিকিউট করার হেডকোয়ার্টার স্থির হল কলকাতার মেছুয়াবাজার। সেখানকার গোপন ডেরায় দিনের পর দিন বিপ্লবীরা মিলিত হতে থাকল। আগামী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা, বোমা তৈরির ফর্মুলা, ইস্তাহার বিলির কর্মসূচি এইসবে সরগরম করে উঠল সেই বিপ্লবী ঘাঁটি।
     খবর ফাঁস হয়ে গেল গোয়েন্দাদের কাছে। ১৯২৯ সালের ১৮ই ডিসেম্বরের কুয়াশাঘন গভীর রাতে সেই ডেরা ঘিরে ফেলল পুলিশ। গভীর রাতেই গ্রেপ্তার হল সতীশ পাকড়াশি ও নিরঞ্জন সেন। খবর না থাকায় পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য কিছু বোমার সেল আর পিস্তল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে ভোরবেলায় চট্টগ্রাম থেকে শিয়ালদা এসে সেই ঘাঁটিতে উপস্থিত হন সুধাংশু দাসগুপ্ত। সাথে সাথেই তিনিও গ্রেপ্তার হন। ঘাঁটি থেকে পাওয়া বিপ্লবীদের নাম ঠিকানা থেকে একে গ্রেপ্তার করা হল প্রমোদ দাসগুপ্ত, শচীন করগুপ্ত, মুকুল সেন, রমেন বিশ্বাস, নিশাকান্ত রায়চৌধুরী প্রভৃতি বিপ্লবীকে। শুরু হল মেছুয়াবাজার বোমা ষড়যন্ত্র মামলা।
    মামলায় দোষী হিসেবে সতীশ পাকড়াশি আর নিরঞ্জন সেনের হল সাত বছর দ্বীপান্তর, মুকুল সেন শচীন করগুপ্তের হল ছ বছর দ্বীপান্তর, সুধাংশু দাসগুপ্তের পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। প্রমোদ দাশগুপ্তের বিরুদ্ধে প্রাথমিকভাবে কোনো সূত্র না পেলেও ব্রিটিশরা বুঝেছিল একে ছেড়ে রাখা ঠিক হবে না। কাজেই তাঁকে মেছুয়াবাজার ষড়যন্ত্র মামলায় জড়াতে না পারলেও বেঙ্গল ক্রিমিনাল অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্টে আটক করে রাখা হয় এবং বিভিন্ন জেল ঘুরে পরে সেলুলার জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। 

   মেছুয়াবাজার থেকেই প্রাথমিকভাবে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরিকল্পনা হয়েছিল। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে গণেশ ঘোষ অম্বিকা চক্রবর্তীরা সেই পরিকল্পনার সফল রূপায়ন ঘটালেন। যদিও ধরাও পড়লেন সকলে এবং গণেশ ঘোষ আর অম্বিকা চক্রবর্তীও এসে পড়লেন দ্বীপান্তরের সেলুলার জেলে। এর কিছুকাল পরেই মীরাট ষড়যন্ত্র মামলায় আসামী হয়ে সেলুলার জেলে এলেন মুজফফর আহমেদ।
 
   মেছুয়াবাজারের গোপন ঘাঁটি থেকে যে স্ফুলিঙ্গের উৎপত্তি হয়েছিল তা দেশব্যাপি বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে নবজোয়ার আনে। বিপ্লবী জগদীশ চট্টোপাধ্যায়ের কথায় 'মেছুয়াবাজারে অবস্থিত গোপন বৈপ্লবিক ঘাঁটি থেকে বৈপ্লবিক অভ্যুত্থানের যে বহ্নিশিখা একদা প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল, সেই বহ্নিশিখাই পরবর্তীকালে দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে লেলিহান শিখার মত ছড়িয়ে পড়ল। কত ত্যাগ কত আত্মবলিদান স্বাধীনতা সংগ্রামের বেদীতলে সমর্পিত হল তার তুলনা ইতিহাসে বিরল। শত শত শহিদের রক্তরাঙা ইতিহাসে রচিত হল নব ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অমর গাঁথা'। (শৈলেশ দে সম্পাদিত অগ্নিযুগ)

   কাকাবাবুকে সবাই চেনেন। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা। পরবর্তীকালে সিপিআই(এম) দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।
   প্রমোদ দাসগুপ্ত সিপিআই(এম) দলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, পলিট ব্যুরো সদস্য এবং আমৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের দলের রাজ্য সম্পাদক। 
   সতীশ পাকড়াশি সিপিআই(এম) দলের রাজ্য কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য ছিলেন।
   নিরঞ্জন সেন সিপিআই(এম) দলের পক্ষ থেকে ১৯৬৭-৬৮ যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রীসভার মন্ত্রী ছিলেন।
   সুধাংশু দাসগুপ্ত সিপিআই(এম) দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য এবং দলের মুখপত্র দেশহিতৈষী পত্রিকার প্রথম সম্পাদক। 
   শচীন করগুপ্ত ১৯৩৮ সালে আন্দামান থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ভারতের কমিউনিস্ট আন্দোলনে সরাসরি যুক্ত হন এবং সারা জীবন শ্রমিক ও কৃষক আন্দোলনে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখে গেছেন।
   গণেশ ঘোষ সিপিআই(এম) দলের রাজ্য কমিটির সদস্য এবং পশ্চিমবঙ্গের বেলগাছিয়া বিধানসভার বিধায়ক ছিলেন।

   কাজেই দেশদ্রোহী দাগিয়ে দেওয়ার আগে একটু ইতিহাসটা জেনে নেবেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বাংলার এই অগ্নিযুগ এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে থেকে গেছে। পুরো ভারতবর্ষের প্রেক্ষাপটে দেখলে আরো অনেক নাম ও ঘটনা বলা যায়। তাতে লেখার পরিসরই বাড়বে শুধু। দেশ স্বাধীন করার জন্য বামপন্থীদের অবদান ইতিহাস এর পাতায় ছত্রে ছত্রে লেখা রয়েছে।

সোমবার, ১২ মে, ২০২৫

কবিতা থেকে মিছিলে ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর জন্মদিন যে লেখাটা লিখেছিলাম তাতে এক বন্ধু মন্তব্য করেছেন, "রবীন্দ্রনাথের কবিতা নাৎসী বাহিনীর বাঁদরামো থামাতে পারে নি। পেরেছিলো স্তালিনের লালফৌজ৷ ফ্যাসিবাদ আটকানোর একমাত্র রাস্তা পালটা বলপ্রয়োগ। এছাড়া কোনো বিকল্প রাস্তা নেই।" এই প্রসঙ্গে আমার সামান্য কিছু বলার আছে। কমেন্ট হিসেবে লম্বা বলে আলাদা লিখলাম। 

ইতালির আবিসিনিয়া আক্রমণকে কেন্দ্র করে রবীন্দ্রনাথ আফ্রিকা কবিতাটি লেখেন ও নিজেই সেটির ইংরেজি অনুবাদ করে পাঠান অমিয় চক্রবর্তীর কাছে যিনি সে সময়ে ইংল্যান্ডে ছিলেন।জেনারেল ফ্ল্যাঙ্কোর নেতৃত্বে স্পেনে শুরু হয় ফ্যাসিস্ট আগ্রাসন। এর বিরুদ্ধে তৈরি হয় পপুলার ফ্রন্ট, ইন্টারন্যাশনাল ব্রিগেড। নৈতিক ও দৈহিক সমর্থন দেন বহু বুদ্ধিজীবী যাদের মধ্যে অন্যতম হলেন রবীন্দ্রনাথ।

মার্চ, ১৯৩৭, স্পেন এর গৃহযুদ্ধের সময় পিপলস ফ্রন্ট এর সাহায্যের সমর্থনে রবীন্দ্রনাথ লিখলেন, "স্পেনের জনগণের এই চরম দুঃখ ও অবিচারের দিনে আমি মানবতার বিবেকের কাছে আবেদন রাখছি: স্পেনের পিপলস ফ্রন্ট কে সাহায্য করুন
জনগণের সরকার কে সাহায্য করুন, সহস্র কণ্ঠে আওয়াজ তুলুন, প্রতিক্রিয়াকে রুখে দিন"। স্পেনের ঘটনার পরপরই '‌লিগ এগেইনস্ট ফ্যাসিজম অ্যান্ড ওয়ার'–এর ভারতীয় শাখা তৈরি ও সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হন

ফ্যাসিস্ট জাপানি সৈন্যবাহিনীর হাতে নানকিং শহরের পতনের পরে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষকে নির্বিচারে নিহত হন। রবীন্দ্রনাথ এই ঘটনায় বিচলিত হয়ে লেখেন চিরস্মরণীয় কবিতা: "নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,"

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট ইতস্ততঃ করছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যোগ দেবেন কি দেবেন না বলে। হিটলার বাহিনীর কাছে ফ্রান্স আত্মসমর্পণ করার পরে রবীন্দ্রনাথ এক তারবার্তায় তৎকালীন আমেরিকার রাষ্ট্রপতি রুজভেল্টকে মিত্রপক্ষে যোগদান অনুরোধ জানান দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে। টেলিগ্রামে লিখলেন - "Today, we stand in awe before the fearfully destructive force that has so suddenly swept the world. Every moment I deplore the smallness of our means and the feebleness of our voice in India so utterly inadequate to stem in the least, the tide of evil that has menaced the permanence of civilization.

All our individual problems of politics to-day have merged into one supreme world politics which, I believe, is seeking the help of the United States of America as the last refuge of the spiritual man, and these few lines of mine merely convey my hope, even if unnecessary, that she will not fail in her mission to stand against this universal disaster that appears so imminent."

শুধু বিদেশের রাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি নয়, দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামেও কবি প্রতিবাদ করেছিলেন ফ্যাসিজমের। ১৯৩৯ সালের ১৭ মার্চ অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা চিঠিতে কবি বলেন— '‌অবশেষে আজ কংগ্রেস মঞ্চ থেকে হিটলার নীতির নিঃসঙ্কোচ জয় ঘোষণা শোনা গেল। ছোঁয়াচ লেগেছে। আমাদের এই গুরুভজা দেশে লাগবার কথা। স্বাধীনতার মন্ত্র উচ্চারণ করবার জন্য যে বেদী উৎকৃষ্ট, সেই বেদীতেই আজ ফ্যাসিস্ট সাপ ফোঁস করে উঠেছে।'‌ কিছুদিন পরে লেখা সেই অমিয় চক্রবর্তীকেই এক পত্রপ্রবন্ধে (‌২০ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৯)‌ রবীন্দ্রনাথ সরাসরি ফ্যাসিজমের পরাজয় কামনা করলেন। সেই লেখার মধ্যে তিনি বললেন—"এই যুদ্ধে ইংল্যান্ড ফ্রান্স জয়ী হোক একান্ত মনে এই কামনা করি। কেননা মানব–ইতিহাস ফ্যাসিজমের নাৎসিজমের কলঙ্ক প্রলেপ আর সহ্য হয় না।'‌

কেউ বলতেই পারেন যে এসবে প্রমাণিত হয় যে কবি সমাজ সচেতন ছিলেন, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবর রাখতেন ও সাধ্যমত তার কবিতা ও লেখার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাতেন কিন্তু তার অভিঘাত কতটুকু। এর উত্তরে স্রেফ দুটি ঘটনার উল্লেখ করা যায়। জার্মান নাৎসি, কুখ্যাত প্রচারমন্ত্রী জসেফ গোয়েবলস একসময়ে রবীন্দ্রনাথ এর ভক্ত হয়ে ছিলেন। স্পেনে পপুলার ফ্রন্ট কে কবি খোলাখুলি সমর্থন করার পরে গোয়েবলস সেই রবীন্দ্রনাথকে কুৎসিত ভাষায় গালাগালি করে আক্রমণ করেন ও ফ্যাসিস্ট মতাদর্শকে ডিফেন্ড করার চেষ্টা করেন। জাপান ডায়েট সিদ্ধান্ত নিয়ে কবির বক্তৃতা সেন্সার করা শুরু করে।

এবার আসা যাক লালফৌজের হাতে ফ্যাসিস্টদের পরাজয় প্রসঙ্গে। ইতিহাসের ছাত্র মাত্রেই দুটি কথা মানেন। এক. স্ট্যালিনগ্রাদের যুদ্ধটাই ছিল ডিসাইসিভ, ফলাফল নির্ধারক। দুই. সমরবিজ্ঞানের সব নিয়মকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সেবার লালফৌজ জয়লাভ করেছিল। কেন করেছিল তার বহু কারণ ও ব্যাখ্যা আছে। একটি কারণ উল্লেখের জন্য জার্মান ইতিহাসবিদ Jochen Hellbeck এর সাহায্য নেওয়া যাক।

তার সুবিশাল "স্ট্যালিনগ্রাদ প্রটোকল" এ উল্লেখ করেছেন যে ১৯৪২ এর আগস্ট আর অক্টোবর মাসের মধ্যে কম্যুনিস্ট পার্টির কার্ড ঝোলানো সদস্য সংখ্যা ২৮,৫০০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩,৫০০ এবং লালফৌজ ভাবতে শুরু করে যে তারা তাদের নাৎসি প্রতিপক্ষ বাহিনীর চেয়ে রাজনৈতিক ও নৈতিক ভাবে শ্রেষ্ঠ। [Der Spiegel magazine]। ব্রিগেডিয়ার কমিসার ভাসিলিয়েভ এর ভাষায় "It was viewed as a disgrace if a Communist was not the first to lead the soldiers into battle."

এই যে নৈতিক বলে বলীয়ান হয়ে একটা ফৌজ তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী বিরোধীকে রুখেদিল, বেসামরিক জনগণ ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে প্রতিরোধ করলো এ জিনিষ মানব সভ্যতার ইতিহাসে অভূতপূর্ব। তার প্রেরণার উৎসমূলে আমাদের ফিরে যেতেই হবে।

এখানেই প্রশ্ন আসে নীতি, নৈতিকতা, মতাদর্শ এসব এবস্ট্রাক্ট জিনিসের ব্যবহারিক মূল্য। এগুলোর যোগান দেন চিন্তাবিদ, বুদ্ধিজীবী আদর্শবাদীরা। রবীন্দ্রনাথ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের যুদ্ধে তাই কবিকে প্রয়োজন। বন্দুক দু পক্ষের হাতেই আছে বা থাকবে। কোন পক্ষ চূড়ান্ত জয়লাভ করবে সেটা বলে দেবে কবি কোন পক্ষে আছেন। স্রেফ বন্দুক দিয়েই লড়াই জেতা যাবে না।

"মহাকালসিংহাসনে
সমাসীন বিচারক, শক্তি দাও, শক্তি দাও মোরে,
কণ্ঠে মোর আনো বজ্রবাণী, শিশুঘাতী নারীঘাতী,
কুৎসিত বীভৎসা‌ পরে ধিক্কার হানিতে পারি যেন.‌.‌.‌'‌

তাই বন্ধু কিছু মনে করবেন না, বোধহয় শুধু ফৌজ বা শুধু কবিতায় হবে না। ফৌজের সাথে কবি ও কবিতাকেও চাই। আজ কবি জয়দেব বসুর জন্মদিন। এই লেখাটা তাঁকে শ্রদ্ধার্ঘ্য হিসেবে নিবেবন করলাম।

কবিতা থেকে মিছিলে .......