সোমবার, ২৯ মার্চ, ২০২১

নন্দীগ্রামের চক্রান্ত ~ সৌনক দত্ত

কাল থেকে মমতার হয়ে এপোলোজিয়া নামানো স্বাধীন বাম , লিবু, ম্যাও সবারই অনেক ন্যারেটিভই চোখে পরছে। সব কটার জবাব দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না, কিন্ত নির্দিষ্ট একটা ন্যারেটিভের বিরুদ্ধে জবাব দেওয়াটা খুবই জরুরি, সেটা হলো গুলি চালানো প্রসঙ্গে ১৪ই মার্চের পর  নাকি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের করা একটি মন্তব্য 𝗧𝗵𝗲𝘆 𝗵𝗮𝘃𝗲 𝗯𝗲𝗲𝗻 𝗽𝗮𝗶𝗱 𝗯𝘆 𝘁𝗵𝗲𝗶𝗿 𝗼𝘄𝗻 𝗰𝗼𝗶𝗻 "

টিপিকাল দক্ষিণপন্থী প্রোপাগান্ডা মেশিনারির কায়দা গুলো কি নিখুঁত ভাবে রপ্ত করে ফেলেছে এই রাজ্যের সিপিআইএম বিরোধী লিবারেল, স্বাধীন সহি বাম, অতিবাম সহ কিছু বুদ্ধিজীবী ব্যক্তিবিশেষ। তা হলো আউট অফ কনটেক্স একটা স্টেটমেন্টকে পুরো পুরি বিকৃত করে একটি চূড়ান্ত মিথ্যা  ন্যারেটিভ কনস্ট্রাক্ট করে হোয়াটাবাউট্রি করে যাওয়া, অবাক লাগে এখনো  এরা এতটাই নির্লজ্জ, এতটাই সংকীর্ণ যে এই পর্যায়ের সিপিআইএম বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালাতে এতটুকু ক্লান্তি নেই এদের।

অবশ্যই বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য এই মন্তব্যটি করেছিলেন, কিন্তু মন্তব্যটি ছিল সম্পূর্ণ অন্য কনটেক্সে, অন্য প্রসঙ্গে। দেখা যাক সেই কনটেক্স।

নন্দীগ্রামে কোনো শিল্প অভিযান প্রক্রিয়া শুরুর আগেই, শুধুমাত্র কেমিকাল হাব নির্মাণের পূর্ব পরিকল্পনার আঁচ পেয়েই ২০০৬ এর ডিসেম্বর থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত করে তোলে 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি ', যার অংশ ছিল তৃণমূল-কংগ্রেস-বিজেপি-নকশালপন্থী গোষ্ঠী-এসইউসিআই-জামাতে উলেমা হিন্দ -সবাই।  সাথে ঘাঁটি বেঁধেছিলো মাওবাদীরাও। এই ঘটনায় অগ্নিসংযোগ করে শুধুমাত্র দুটো ঘটনা--একটি  ২৩শে ডিসেম্বর সিপিআইএম এর শিল্পায়নের দাবিতে রাজারামচক থেকে সোনাচূড়া পর্যন্ত মিছিল আর দ্বিতীয়টি তার কদিন পরেই সংবাদমাধ্যমে বেরোনো একটি খবর, সালিম গোষ্ঠীর সাথে রাজ্য সরকারের একটি মৌ স্বাক্ষর।

২০০৭ এর  ২রা জানুয়ারি গঠিত  হয়ে যায় 'ভূমি উচ্ছেদ প্রতিরোধ কমিটি' যথেষ্ট সময় এবং  চিন্তা করে ব্যাপক একটি পরিকল্পনার ওপরে ভিত্তি করে আগ্নেয়গিরির প্রথম বিস্ফোরণটা ঘটলো তার পরেরদিন অর্থাৎ ৩রা জানুয়ারি। শুরু হলো গোটা নন্দীগ্রাম জুড়ে অশান্তি। মাত্র দুই তিনদিনের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো গোটা নন্দীগ্রামকে, প্রশাসনিক ব্যর্থতা অবশ্যই অনস্বীকার্য্য, সাথে ছিল অবশ্যই গ্রাস রুটে পার্টির প্রতিরোধের ব্যর্থতা।

এই সব ঘটনা চলছে যখন তখন মহাকরণে বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য জানান, নন্দীগ্রামে জমি অধিগ্রহণের কোনো সরকারি বিজ্ঞপ্তিই জারি হয়নি। নন্দীগ্রামের মানুষ না চাইলে সেখানে কোনো কোনো শিল্প হবে না, জমি অধিগ্রহণের তো প্রশ্নই নেই।

নন্দীগ্রামের সিপিআইএম বিরোধী রংধেনু জোট এতে কিন্তু কর্ণপাত করা দূরের ব্যাপারে, তারা ধরে নেয় সরকার পিছু হাটছে তাদের ভয়ে, এইখান থেকে শুরু হয় নন্দীগ্রামে সিপিআইএম কর্মীদের ওপর নৃশংস অত্যাচার, খুন হতে থাকে একের পর এক কর্মী, কেবল দুদিনে  জ্বালিয়ে দেওয়া, ভেঙে দেওয়া হয় ১০০র ওপর বাড়ি, হামলা চলতে থাকে সিপিআইএম এর পার্টি অফিস এবং দপ্তর গুলোতে। ৭ই জানুয়ারি পাঁচজন সিপিআইএম কর্মীকে ইট পাথর দিয়ে থেঁতলে কুপিয়ে পিটিয়ে জীবন্ত অবস্থায় আগুনে ফেলে খুন করা হয়, এই পাঁচজন -বিশ্বজিৎ মাইতি (সাউডখালী), ভুদেব মন্ডল(সোনাচূড়া), রবীন ভূঁইয়া, সুদেব মন্ডল (সোনাচূড়া), শঙ্কর সামন্ত( তাল ডাংরা)। এদের মধ্যে শঙ্কর সামন্ত ছিলেন পঞ্চায়েত সদস্য। তাকে ছুড়ি দিয়ে চিরে জ্বলন্ত খড়ের গাদায় ছুড়ে ফেলা হয়। ভুদেব মন্ডলকে তাঁর পরিবারের লোকজনের সমানেই ইট দিয়ে থেঁতলে খুন করা হয়। শিল্প হওয়া দূরের ব্যাপার, শিল্প হচ্ছে না ঘোষণার পর ও আরো বেশি করে চলেছে এই হত্যালীলা। মাত্র দিন চারেকের মধ্যে সহাস্রাধিক সিপিআইএম কর্মী নিরাশ্রয় হয়ে নন্দীগ্রাম ত্যাগ করে প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছে পাশের খেজুরী, কনতাই, পটাশপুরের মতো সংলগ্ন অঞ্চলে। এর পরেই ঘটে যায় সেই ১৪ই মার্চের তোলপাড় করা ঘটনা, মুহূর্তের মধ্যে সংবাদমাধ্যম সহ সুশীল বুদ্ধিজীবী মহলের  তরফ থেকে শুরু হয়ে যায় মুখ্যমন্ত্রী সহ সিপিআইএম এর মুন্ডুপাত, একদিকে চলছে যেখানে মুন্ডুপাত, আরেকদিকে ঠিক এই ঘটনার পরেরদিন থেকে নন্দীগ্রাম হয়ে ওঠে সিপিআইএম কর্মীদের সমাধি ক্ষেত্র, নিত্যদিন ৩-৪ টে সিপিআইএম কর্মীদের মৃতদেহ ছিল নন্দীগ্রামের নিউ নরমাল। অত্যাচারের মাত্রা ছাড়িয়ে যায় কল্পনাতীত সীমা , নিত্য নতুন উপায়ে চলতে থাকে হত্যা প্রক্রিয়া, এর মধ্যেই নির্মম ভাবে গণধর্ষণের পর খুন হন সিপিআইএম এর আরেক পঞ্চায়েত সদস্য সুনিতা জানা, তালিকা এর পর শুধু দীর্ঘ হতে থেকেছে। নৈরাজ্য এবং 'গণতন্ত্রের হত্যাকারী' সিপিআইএম এর বিরুদ্ধে সেই সময় 'সদা সক্রিয়', 'সদা জাগ্রত' একটাও ব্যক্তি বাম অথবা বুদ্ধিজীবি মহল থেকে ওঠেনি এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। রংধেনু জোটের 'মুক্তাঞ্চলে হয়তো এই হত্যালীলাই ছিল তাদের কাছে নব্য যুগের প্রতিষ্ঠান বিরোধী বিপ্লব।

এর পর সাত আট মাস যাবৎ গৃহ হীন সেই সহস্র সিপিআইএম কর্মীদের পরিস্থিতির এতটুকু বদল হয়নি  , ঈদ দুর্গাপুজো তাদের কাটাতে হয়েছে পাশের এলাকায় নয়তো ত্রাণ শিবিরে আর এর পাশাপাশি নন্দীগ্রাম তো তখন শ্মশান। রোজ ৩-৪টে লাশ পরছে সিপিআইএম কর্মী, সমর্থকদের, বাদ যায়নি সাধারণ মানুষও। যারা পালিয়ে আসতে সফল হননি অথবা মোহন মন্ডল, মীর খুরশেদ, চঞ্চল মিদ্যার মতো যারা  শেষ মুহূর্ত অব্দি থেকে যেতে চেয়েছেন অকুতোভয় হয়ে গর্বের সাথে লাল পতাকাকে আঁকড়ে, মূল্য চোকাতে হয়েছে প্রাণের বিনিময়ে।

অনেক আগেই পার্টি মেশিনরীকে ব্যবহার করে কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল, যা নিতে ব্যর্থ হলেও এবার সহ্যর সব বাঁধ ভেঙে যাওয়ার পর ২০০৭ এর নভেম্বর মাসে সিপিআইএম  তাদের কর্মীদের ঘরে ফেরানোর চেষ্টা করতেই জ্বলে ওঠে অশান্তির আগুন। ঘরের ফেরার এই লড়াই ও কম ভয়ঙ্কর ছিল না। হাজার অনুরোধ, প্রশাসনিক দিক দিয়ে শান্তিপূর্ণ মীমাংসার প্রচেষ্টা, হাজার আকুতি মিনতি সত্ত্বেও বিরোধী  রঙধেনু জোট কর্ণপাত না করে উল্টে তাকে সরকারের দুর্বলতা ভেবে সিপিআইএম কর্মীদের খতম অভিযান জারি রাখার  ফলস্বরূপ  নভেম্বর মাসের ১৩ তারিখ ওই ঘরে ফেরার পর্বে সিপিআইএম কর্মীদের সশস্ত্র অভিযান ছিল পাল্টা প্রতিরোধ মাত্র (যে প্রতিরোধ. দরকার ছিল আরো আগে থেকেই), এই অভিযান প্রসঙ্গেই বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য বলেছিলেন 𝗧𝗵𝗲𝘆 𝗵𝗮𝘃𝗲 𝗯𝗲𝗲𝗻 𝗽𝗮𝗶𝗱 𝗯𝘆 𝘁𝗵𝗲𝗶𝗿 𝗼𝘄𝗻 𝗰𝗼𝗶𝗻 " 

কোনোভাবেই এই কথা ১৪ই মার্চের দিন বলেননি উনি, বলেছিলেন ৮ মাস পর নিজের কর্মীদের আত্মরক্ষা প্রসঙ্গে।এবার প্রশ্ন উঠতে পারে উনি কী তাহলে এটা বলে ভুল করেননি, আমার মতো অনেকের মতেই হ্যা উনি ভুল করেছিলেন, বিশাল বড়ো ভুল করেছিলেন, এই মানসিকতা উনার শুধু ওই একদিনের জন্য নয়, গোটা ১০টা বছরই দেখানো প্রয়োজন ছিল,  সিপিআইএম এর একজন শীর্ষস্থানীয় নেতা হিসাবে উনার এই সফ্ট স্টান্স এর প্রবল সমালোচক আমি। 

যাই হোক শুধু একবার দেখা যাক ১৪ই মার্চ ঘটনা ঘটার পর বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্যর কি প্রতিক্রিয়া ছিল। অন্তত সিবিআই এর অফিসিয়াল রেকর্ড মতে এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে। সেইদিন বিধানসভাতে অধিবেশন চলছিল, গুলি চালানোর ঘটনা শুনেই  হতবাক হয়ে যান বুদ্ধদেব ভট্টাচাৰ্য। বেশ কিছুক্ষন স্তব্ধ হয়ে থাকেন, চোখে মুখে চূড়ান্ত হতাশার ছাপ স্পষ্ট, তারপর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় একটাই কথা বলেন "গুলি চললো কেনো? গুলি চালানোর তো কথা ছিল না। কি এমন পরিস্থিতি হলো যে গুলি চালাতে হলো!" সেদিন বিধানসভায় কোনো সরকারি বিবৃতি দেননি তিনি, চূড়ান্ত হতাশা থেকে বাকি সময় নিজের ঘরেই কাটিয়ে দেন তিনি। "

 কৃষি নির্ভর এই রাজ্যকে একটি উন্নত শিল্প ভিত্তিক রাজ্যে পরিণত করতে চাওয়ার ব্যাপারে তার পার্টির  সিদ্ধান্ত এবং তার নিজের বাসনার  এরকম  পরিণতি হতে দেখে আত্মগ্লানি এবং অভিমানের মধ্যেই ডুবে গেছিলেন খানিক। ভাবতেও পারেননি সেই সময় থেকেই যে বৃহৎ ষড়যন্ত্রর উল্লেখ করতে গিয়ে বারবার অতি বোদ্ধা, ধান্দাবাজ বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কাছে  হাস্যস্পদে পরিণত হয়েছিলেন তিনি এবং তার পার্টি, আজ ১৪ বছর পর সেই সময়ের এই ষড়যন্ত্রের মূল ঘুঁটি নিজের বিনাশকালে, একটি মরিয়া প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে এই ষড়যন্ত্রের মিসিং লিংক গুলো জুড়ে দেবেন।  যাই হোক সব চেয়ে বড়ো মিসিং লিংক এখনো বাকি। সময়ের থেকে এগিয়ে গিয়ে কোনো কিছুর ব্যাখ্যা দিলে মানুষের জেনারেল কনসেনসাসে গ্রহণযোগ্য হয় না, সময় মতো তাই অন্তিম মিসিং লিংক হিসাবে সিআইএ যোগসূত্র টাও প্রমান হবে। সবে তো শুরু।

P. S-  ওপরের লেখার প্রমান হিসাবে নিচে বিখ্যাত সাংবাদিক অঞ্জন বসুর বই "বাংলায় বামেরা : রাজ পথে ও রাজ্যপাটে"  বই এর দুটো পাতার ছবি কমেন্ট সেকশনে দিয়ে রাখলাম।

.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন