শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

একুশে ফেব্রুয়ারি কম্যুনিস্ট ইশতেহার ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"ভুখা মানুষ, ধরো বই, ওটা তোমার হাতিয়ার"

মার্কসবাদ লেনিনবাদকে আক্রমণ করার, তাকে খাটো করার তাকে উপহাস করার অসংখ্য টেমপ্লেট বাজারে আছে। ।সবচেয়ে মারাত্মক টেমপ্লেট যেটা সেটা আজ একটু বলবার চেষ্টা করছি। এটা করা হয় বামপন্থার মুখোশধারীদের দিয়ে কারণ দক্ষিণপন্থী দের আক্রমনগুলি প্রকৃত বামপন্থীরা সহজেই ধরে ফেলতে পারেন। এটার শুরু হয় লেনিনবাদ কে প্রথমে বৌদ্ধিক স্তরে আক্রমণ করে। এবং এটা অবধারিত ভাবে শুরু হয় স্টালিন কে ঘিরে কারণ উনি ফাউন্ডেশন অফ লেনিনিজম এর রচয়িতা। যেনতেন ভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে স্টালিন আদলে মার্কসবাদ লেমিনবাদ কিছুই বুঝতেন না, বরঞ্চ ট্রটস্কি বুঝতেন। একই ভাবে লেনিন ও মার্কসবাদ এর প্রকৃত অনুগামী ছিলেন না বলে অপপ্রচার করা হয় লেনিন এর বিপ্রতীপ এ কখনও রোজা লুক্সেমবার্গ কে বা কখনও গ্রামসিকে খাড়া করে। শেষমেষ পরে রইলেন মার্কস। তাকেও ম্যালাইন করার এক অত্যশ্চর্য টুল আবিষ্কার করেছেন এই ছদ্ম বামেরা। রিয়াজননভ এর মেগা (Marx-Engels-Gesamtausgabe) 
প্রজেক্ট এর দৌলতে  মার্কস এর অল্প বয়সের কিছু লেখা আবিষ্কার করে এরা পরিণত বয়েসের মার্কসকে তার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চান। 



মার্কস এর দেখানো পথে লেনিন যেদিন একটা ছোট্ট কিন্তু বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পৃথিবীর দ্বিতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করে ফেললেন সেদিন থেকেই আসলে শাসক শ্রেণীর ভয়ে ঘুম উড়ে গেছে। এটা মনে রাখতে হবে ঠিকঠাক ভাবে একটা দেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম লেনিনই তৈরি করেন, মার্কস নয়। কিন্তু মার্কস (এবং অবশ্যই) এঙ্গেলস ) এর অবদান হল যে তারাই সবার প্রথমে একটা নতুন ধরনের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। 

যার জন্ম এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে সেই পার্টির ইশতেহার লেখার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই মার্ক্স ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্রাসেলস এ।  কমিউনিস্ট লীগ ২৬ শে জানুয়ারি মার্ক্সকে চরমপত্র পাঠিয়ে বলে যে পয়লা ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাণ্ডুলিপি পাঠাতে হবে। মার্ক্স তাড়াহুড়ো করে লিখে পাঠালেন। মার্ক্স এমনিতেই লিখতেন ঝড়ের বেগে, খুদে অক্ষর, প্রায় সর্টহ্যান্ড এর ঢঙ্গে। প্রায় গোটা পাতা জুড়ে, একটুও জায়গা নষ্ট না করে। নিষিদ্ধ সেই ইশতেহার চললো তারপরে গোপন পথে লন্ডনে। 

আদি পাণ্ডুলিপির প্রায় সবটাই হারিয়ে গেছে। একটা পাতা খালি বেঁচে। এডুয়ার্ড বার্নস্টাইনকে ১২ই জুন, ১৮৮৩ এ লেখা একটা চিঠির সাথে আটকে ছিল ওই পাতাটা। পাতাটির ওপর লেখা এঙ্গেলসের নোট, "Mscript Karl Marx: Erster Entwurf z. Comm Manifesta" ম্যানুষ্ক্রিপ্ট কার্ল মার্ক্স: ফার্স্ট ড্রাফট অফ কম. ম্যানিফেস্ট.।

বাইবেলের পরেই যে বইটার সবচেয়ে বেশি বিক্রি সেই বই কম্যুনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশিত হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৮ সাল। ২৩ পাতার চটিবই। কালচে সবুজ মলাট। নিছক পরিসংখ্যানের বিচারে ভাববাদীদের বাইবেল এর কাছে এখনো হেরে আছে বস্তুবাদীদের বাইবেল। কিন্তু এমন দিন আসবে বস্তুবাদীদের  বাইবেল জিতবেই জিতবে। 

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আবার। আজ আন্তর্জাতিক লাল বই দিবস। 

পু: এই পাতার লাস্ট লাইনটা হল সেই বিখ্যাত লাইন "শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর হারাবার কিছু নেই , জয় করার জন্য পড়ে আছে সারা দুনিয়া।

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'প্রতীক উর' প্রশ্ন ~ বিভাস সাহা

গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারি বেশ একটা ঝড় বয়ে গেল। সকালে যা ছিল একটা চাপা ফিসফাস বিকেলে তা হয়ে দাঁড়ালো 'পাক্কা খবর' । অনেক চ্যানেল দীর্ঘ বিশ্লেষণ দিল যেখানে বলা হল 'মহম্মদ সেলিম এবং তাঁকে ঘিরে এক দুষ্টচক্র সি পি  এম চালাচ্ছে' এবং প্রতীক উর তৃণমূলে এসে গেছেন -- শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। 

আজ প্রতীকের  একটি সাক্ষাতকার শুনলাম। সেখানে উনি পরিষ্কার বললেন, যে চিঠিটা বাজারে ঘুরছে, সেটি উনি লেখেনইনি। উনি একটি দলীয় ফর্ম পূরণ করে ওনার মতামত যথার্থ জায়গায় জানিয়েছেন, এবং অপেক্ষা করছেন দল কী উত্তর দেয়। 

 এসব শুনে কয়েকটি জিনিস মাথায় এল, তাই এই লেখা। 

প্রথমত, প্রতীক অত্যন্ত জনপ্রিয়, লড়াকু, এবং সৎ নেতা হিসেবে জনমানসে একটি ভাবমূর্তি রাখতে পেরেছেন। তাঁকে টিভির পরদায় দেখা যায় না। তিনি যে অঞ্চলে রাজনীতি করেন সেখানে চোখে পড়ার মত দলীয় শক্তি নেই।  সর্বোপরি ওই অঞ্চলে ভাইপো ব্যানার্জীর  পোষা বাহুবলীরা সর্বক্ষণ দাপাদাপি করে। 

এসব সত্ত্বেও তিনি রাজ্যস্তরে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার মানে রাজনীতিতে এখনও  সততা এবং নীতির একটা জায়গা আছে। এটা খুবই আশার জায়গা। প্রতীক উরের মত নেতা আরও চাই এবং বাজারের খবর যাইই হোক না কেন, এইরকম নেতাদের জন্য বামদলই যথার্থ জায়গা।

দ্বিতীয়ত, প্রতীক উর যে রাজ্য নেতাদের কাছে তাঁর সদস্যপদ ছাড়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন, এই খবর উপরের স্তরের কোন নেতাই মিডিয়াকে জানিয়েছেন এবং ঠিক হিসাব করে তা কূণাল ঘোষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। প্রতীক উরকে  যাতে  দল বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়, এবং তারপর তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল, চটিচাটা ইত্যাদি বলে আক্রমণ করা যায় -- এই কুমতলব তাঁদের আছে। এটা পরিষ্কার। এরা যদি সি পি এমের শীর্ষস্তরে থাকেন, তাহলে  ভোটে যে দল খারাপ ফল করবে তার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। 

তৃতীয়ত, সি পি এম দলটির কিছু সাংগঠনিক সংস্কার দরকার। দলের মধ্যে সদস্যদের ভিন্ন মত প্রকাশের একটা জায়গা দেওয়া উচিত। এই ভিন্নমতের  প্রশ্ন এলেই সঙ্গে সঙ্গে পার্টির গঠনতন্ত্র, সংবিধান, শৃঙ্খলা ইত্যাদি তুলে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এটি আধুনিক যুগে একেবারেই বেমানান। তার উপর বিধানসভায় শূন্য হয়ে গেলে আরও বেমানান।  

চতুর্থত, দলের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একটা মহাজোট করার চেষ্টা করছেন, সেটা বোঝা যায়। শুধু  ভোটের জন্য হুমায়ন কবীর ও নওশাদ সিদ্দিকি নয়, বৃহত্তর বাম ঐক্যের কথা মাথায় রেখে  উনি অনেক অতি বাম, বা বিশিষ্ট নিরপেক্ষ বাম বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে সাক্ষাত বা যোগাযোগ করে তাঁদের মতামত নিয়েছেন (এ খবর আমি জানি)। এর মধ্যে অনেক উদারতা এবং বাস্তববুদ্ধির একটা প্রকাশ রয়েছে। 

কিন্তু একই সঙ্গে দলের কর্মীদের কাছে এবং জনমানসে কী বার্তা দিতে হবে সে  বিষয়ে কোন পরিষ্কার হিসাব দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিজস্ব দলীয় নীতি এবং ভোটের রণনীতি ও কৌশল এই দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে, এবং সেটা মানুষকে এবং দলের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে বুঝিয়ে তাঁদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। 

এই কাজটা যে হয়নি, তা এই প্রতীক উর কাণ্ড থেকে বোঝা গেল। এর পাশাপাশি বিরুদ্ধ দলগুলি ও তাদের মিডিয়া থেকে যে 'সেলিম ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন' এই ন্যারেটিভ ছড়ানো হয়েছে, তার কোন পাল্টা ন্যারেটিভ সি পি এম দিতে পারেনি। বরং ব্যাকফুটে খেলে চলেছে। 

আমার নিজের মূল্যায়ন, ভোট বাড়াতে গেলে এই ২০২৬-এ সি পি এমকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকাতেই হবে। সেখানে হুমায়ুন কবীর যে হই চই ফেলেছেন তাতে তার সঙ্গে কথা বলার অবশ্যই একটা বড়ো যুক্তি আছে।    প্রশ্ন হচ্ছে, মুর্শিদাবাদের বাইরে হুমায়ুনের প্রভাব অন্যান্য জেলায় কতদূর এবং তার সূত্রে ভোট সি পি  এমে আসতে  পারে কিনা, এর কোন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানি না। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের বাইরে কোন লাভ যদি না থাকে তাহলে হুমায়ুনের সঙ্গে কথা বলায় বিশেষ কোন লাভ নেই।  

হুমায়ুন-নওশাদ বিষয়টি রণকৌশলের ব্যাপার, নীতির নয়। কিন্তু বিষয়টি সি পি এম নেতৃত্ব সেভাবে প্রজেক্ট করছেন না। ফলে দলের ভিতর অনেক বিভ্রান্তি হচ্ছে।

পঞ্চমত, বিভ্রান্তি ছাড়াও সি পি এম দলের মাঝারি স্তরে (যাকে চর্বিযুক্ত মধ্যপ্রদেশ বলা যেতে পারে) একটা উদ্ধত/অশিক্ষিত কালচার আছে। (এই রোগ অন্যান্য বাম দলেও আছে।) সেখানে  সুযোগ পেলেই মার্ক্সবাদ, বিপ্লব, পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়ে লেকচার দেওয়ার  প্রবণতা আছে, এবং  নিজের দলের  সমর্থক না হলে তাকে নানা বিশেষণে গালিগালাজ করা হয়। এদের নতুন কিছু শেখার বা নতুন ভাবে ভাবার কোন আগ্রহ নেই। 

এই কালচারটি বৃহত্তর বাম ঐক্যের পরিপন্থী। অতি সম্প্রতি 'মার্ক্সবাদী পথ' গোষ্ঠীর উদ্যোগে মৈত্রীশ ঘটকের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালের মধ্যে একটি অসাধারণ অনুষ্ঠান। মৈত্রীশ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অত্যন্ত সহজ ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির আপেক্ষিক অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেছেন, এবং শেষ দিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ নানা সরকারি অনুদানের বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন এবং যথার্থ সমালোচনা করেছেন । 

কিন্তু তাঁর সমালোচনা তীব্র নয় বলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে চটিচাটা বলে আক্রমণ করছেন (মৈত্রীশের ফেসবুক পেজে দেখলাম)। এগুলি অত্যন্ত রুচিহীন ব্যাপার। এই নিন্দা যদি কোন সি পি এম সমর্থক করে থাকেন, তা আরও গর্হিত। 

পরিশেষে, প্রতীক উর রহমানের কথা ফিরে আসি। প্রতীক উর দলে থাকছেন কি যাচ্ছেন, বা গেলে কোন্ দলে যাবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। কিন্তু তাঁকে বৃহত্তর বাম আন্দোলনে দরকার। যদি তিনি এই বাম আন্দোলন ছেড়ে তৃণমূলে  যান তাহলে তা খুবই  দুর্ভাগ্যজনক হবে। 

বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেশ কঠিন ব্যাপার।

বিভাস সাহা 
(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়) 

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশে নির্বাচন ও বামপন্থী ~ শুভ বসু

বাংলাদেশে বামপন্থীরা কেন খুব একটা ভালো করতে পারেনি? অনেকেই এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করে এবং একটি বিভ্রান্তিকর উত্তর দেয়। ইসলাম কমিউনিজমের সাথে ভালো যায় না। কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে অন্ধ ব্যক্তিরা এমন একটি ভাসাভাসা উত্তর দিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, এম এন রায় এবং অবনী মুখার্জি ছাড়া, বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় সকল সদস্যই ছিলেন মুসলমান। এর মধ্যে ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, যিনি পরে কাকাবাবু নামে পরিচিত; কুতুবউদ্দিন আহমেদ; আব্দুল হালিম; আবদুর রেজ্জাক খান; এবং সম্ভবত আব্দুল মোমিন। "কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল" গানের প্রথম অনুবাদ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি মুজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এই সকল নেতা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রসার, শ্রমিক ও কৃষক দল প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে হিন্দু বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীদের কমিউনিজমের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে, কমিউনিস্টরা কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিংবদন্তি ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের সাথে একটি সমঝোতা করে এবং "আজাদ হিন্দুস্তান  মে  আজাদ পাকিস্তান" স্লোগান উত্থাপন করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে, বিজয়ের স্থপতি আবুল হাশিম সমাজতন্ত্রের ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম লীগের ইশতেহার তৈরি করেন। তার দুই ভাগ্নে, সহিদুল্লাহ এবং মনসুর হাবিবুল্লাহ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ছিলেন। সামগ্রিকভাবে, প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন বেশ কয়েকজন উর্দু লেখককে আকৃষ্ট করেছিল, যার মধ্যে সাজ্জাদ জহির, কাইফে আজমি, ইসমত চুগতাই এবং সাদাত হোসেন মান্টো ছিলেন।

পূর্ব বাংলায়, মনি সিং সুসং দুর্গাপুরে দলীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক প্রতিরোধের পথিকৃৎ ছিলেন। দিনাজপুরে, সুশীল সেন, বিভূতি গুহ এবং হাজী দানেশ তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলেন। বরিশালে, মনোরোমা বসু এবং গোলাম কিবরিয়া কৃষকদের নেতৃত্ব দেন। সিলেটে   টঙ্ক আন্দোলনের সময়, সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। মজার বিষয় হলো , পূর্ববঙ্গে বেশিরভাগ কমিউনিস্ট কর্মী হিন্দু থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই ছিলেন মুসলিম, যেমন আবদুল্লাহ রসুল, মুহাম্মদ ইসমাইল, মুহাম্মদ ইলিয়াস, মনসুর হাবিবুল্লাহ, সহিদুল্লাহ এবং আরও অনেকে। অবশ্যই, কিংবদন্তি কাকাবাবু ছিলেন অগ্রণী।

১৯৪৮ সালে দেশভাগের পর, সিপিআই বি.টি. রনদিভের নেতৃত্বে একটি তাৎক্ষণিক বিপ্লব লাইন গ্রহণ করে। পূর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট কর্মীরা বিদ্রোহে লিপ্ত হয়। এর ফলে মূলত দলিত আদিবাসী এবং পাহাড়িদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সাঁওতাল, গারো এবং নমশুদ্র জনগোষ্ঠী বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। এই সময়েই ইলা মিত্রকে নাচোল থেকে বন্দী করা হয় এবং কারাগারে নির্যাতন করা হয়। ১৯৫০ সালে, যখন বাংলার উভয় প্রান্তে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তখন প্রায় ১৫,০০০ কমিউনিস্ট কর্মী সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেন, কারণ তাদের বেশিরভাগই হিন্দু ছিলেন। এর ফলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। 

দেশভাগের পর, দল সংগঠিত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক মুসলিম কমিউনিস্টকে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারা পরে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন, যাদের মধ্যে মনসুর হাবিবুল্লাহও ছিলেন। তবে, হিন্দু কমিউনিস্টরা সেখানেই থেকে যান এবং মনি সিং এবং খোকা রায় তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যেমন মোহাম্মদ ফরহাদ, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, মুহাম্মদ তোয়াহা এবং পরে তরুণ বদরুদ্দিন ওমর। তারা একটি ছাত্র আন্দোলন এবং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। লেখকদের মধ্যে সত্যেন সেন বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন। বাংলায়, মুসলমানদের মধ্যে কৃষক আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। মাওলানা ভাসানী সেই ঐতিহ্য থেকে এসেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে, তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একজন সহযাত্রী হয়ে ওঠেন। কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন ফ্রন্টাল পার্টির মাধ্যমে পরিচালিত হত, যার মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক দল, এবং পরে, ১৯৫৭ সালে, যখন ভাসানী ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন দলটি ন্যাপের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনে জড়িত হয়।

এটি ছিল শীতল যুদ্ধের যুগ, এবং মাওলানা ভাসানী একজন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সুয়েজ যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বিশ্ব শান্তি পরিষদ (WPC) কর্তৃক আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি চীনে যান এবং মাও এবং ঝৌ-এর সাথে দেখা করেন। তিনি হাভানায় ত্রি-মহাদেশীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মাওবাদীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তোহা, কাজী জাফর, আলাউদ্দিন , হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ শিষ্য। বৃহত্তম প্রচারিত সংবাদপত্রগুলির মধ্যে একটি, সংবাদ তখন বামপন্থী ছিল। ন্যাপ ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। ১৯৬৭-৬৮ সালে, দলটি বিভক্ত হয়ে যায় এবং তারপরে অতি-মার্কসবাদের ফলে তোহা ভাসানীর ইসলামী সমাজতন্ত্রের ধারণার কারণে ভাসানীর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির ফলে শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে মূল স্রোতের রাজনীতিকে পরিচালিত করেন . মনি সিং, ফরহাদ এবং মুজাফফর আহমেদের মতো সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের একটি দল তার সাথেই ছিল। কিন্তু মাওবাদীরা বেশ কয়েকটি দলে বিভক্ত ছিল। সিরাজ সিকদারের নিজস্ব একটি দল ছিল যারা আওয়ামী লীগের আগে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম ঘোষণা করেছিল। ইপিসিপি (এমএল) মুক্তি সংগ্রামের প্রতি বিরূপ ছিল। রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর এবং রনো স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং শিবপুরে একটি মুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
স্বাধীনতার পরে, চীন-সোভিয়েত সংঘাত চরমে পৌঁছানোর ফলে , মাওবাদীরা শেখ মুজিবের বিরোধী ছিলেন। মণি সিং, ফরহাদ এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে, তাজউদ্দিন এবং আবদুস সামাদ আজাদ সোভিয়েতপন্থী লাইন অনুসরণ করেছিলেন এবং সিপিবি এমনকি বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন, যা সিপিবির জন্য সম্পূর্ণ বিপর্যয়কর পদক্ষেপ ছিল। 

শেখ মুজিবের ছাত্র লীগের বৃহত্তর অংশ তাকে ত্যাগ করে জেএসডি গঠন করে, আরেকটি মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল, যেখান থেকে বিএসডির ( বাংলদেশ সমাজতন্ত্রী দল) উদ্ভব হয়েছিল। জেনারেল জিয়া বিএনপি প্রতিষ্ঠা করার পর, অনেক প্রাক্তন মাওবাদী এবং ভাসানীর সমর্থকরা নতুন দলে যোগ দেন। তারা ভারতবিরোধী এবং চীনপন্থী ছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সিপিবি তার জনপ্রিয়তা ফিরে পায়। ১৯৯১ সালে, তারা আজকের এনসিপির মতো পাঁচটি আসন জিতেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, সিপিবি দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং একটি উপদলে দল ভেঙে দেয় । এর ফলে সিপিবি ভেঙে যায়। কাজী জাফর এবং হায়দার আকবর খান রনো একটি শ্রমিক দল ( Workers' Party)গঠন করেন। তারা শেখ হাসিনার সাথে জোটবদ্ধ ছিলেন এবং রাশেদ খান মেনন কারাগারে আছেন। রনো পরে সিপিবিতে ফিরে আসেন। জাসদ বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ছিল হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে, যিনি আওয়ামী লীগের সাথেই ছিলেন এবং এখন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। জাসদের একটি শাখা বাংলদেশ সমাজতন্ত্রী দল সক্রিয় ছিল।

সুতরাং, বাংলাদেশে কমিউনিস্টদের পতন ধর্মের সাথে খুব একটা সম্পর্ক রাখেনি; বরং, এটি একটি ঐক্যফ্রন্ট এবং রাজনৈতিক কৌশলের উপর একমত হতে না পারার কারণেই হয়েছিল। নতুন প্রজন্ম তৃণমূল স্তর থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংগঠিত করতে পারে যা বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জামাতের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। আমি এটি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।

রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ পয়েন্ট ~ শৈবাল বিষ্ণু


অরুণাভ আর আমি সেই ছোট্টবেলার বন্ধু। এক পাড়ায় বড় হয়েছি, দুর্গাপুরে কাছাকাছি আমাদের কোয়ার্টার, তাই একই মাঠে ফুটবল খেলি, একই স্কুলে যাই, একই ক্লাসে পড়ি। দুর্গাপুরের আরই কলেজেও একসাথে পাশ করি অরুণাভ রায়, আর আমি। আমি সাথে সাথেই দুর্গাপুর ষ্টীল প্ল্যান্টে চাকরী পেয়ে ঢুকে যাই। এখন উচ্চপদস্থ অফিসার। অরুণাভ ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স থেকে এমটেক করে আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে ওই দেশেই কিছু বছর চাকরী করে এখন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। এক মেয়ে, এক ছেলে, মেয়ে বড়, ডাক্তারী পড়ছে। ছেলে  ক্যালিফোরনিয়া ইউভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ওর বউও ওর ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতো। ওখানেই আলাপ। এখন চাকরী করে। ভরা সংসার। সুখী গৃহকোন।

 

কলেজে পড়তে ছোটবেলাতেই একটা নেশার মত শখ আমার আর অরুণাভর শুরু হয়, ফটোগ্রাফির। তখন ভাল ক্যামেরা ছিল না, রাশিয়ান জেনিত ক্যামেরা আমরা দুজন মিলে কিনেছিলাম। ছবি তুলতে আমরা কোথায় কোথায় না গেছি, ঘুরেছি। অরুণাভ এখনও যেখানেই যায়, সাথে একটা ছোট্ট মিররলেস ক্যামেরা থাকে। ক্যামেরা নিয়ে আমার নেশা কেটে গেছে। আমার ডিএসএলআর আর মিররলেস ক্যামেরা, দুটোই এখন মেয়ের জিম্মায়। ব্যাঙ্গালোরে। ছবি তোলার নেশায় আমরা সেসময়ে কত ঝুঁকিই না নিয়েছি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ছবি তুলতে গিয়ে গউর, মানে ভারতীয় বাইসনের তাড়াও খেয়েছি। তবে কে সেদিন জানত, সেই ছবি তোলার নেশাই একদিন অরুণাভর মৃত্যুর কারণ হবে।

 

আরুনাভরা প্রতি বছর একবার করে দেশে আসত, নিয়ম করে। তখনও ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক কাছাকাছি একটা ট্যুর করেই নিত, যতদিন ওর বউ শর্মিলা ওর বাপের বাড়ি, সেলিমপুরে থাকে।

 

কিন্তু এবারে অরুণাভ একাই এলো। জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি। কোন একটা কাজ নিয়ে এদিকে আসবে, জাপান আর ভারতে কিছু মিটিং আর সেমিনার আছে ওর। তার মাঝেই এক সপ্তাহের একটা ছুটি ম্যানেজ করেছে। দুজন মিলে দার্জিলিং যাওয়া হবে ঠিক হোল। সিঙ্গালীলাতে বার্ডিং করা হবে। এই সময়ে পাতা ঝরে যায়, পাখি দেখার সুবিধে। দার্জিলিং এর ছবি তোলা হবে। এই সময়ে আকাশ পরিস্কার থাকে। আর অতি অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘার বিভিন্ন রূপের ক্লোজ আপ!

 

দার্জিলিংয়ের ম্যাল থেকে মহাকাল মন্দিরের রাস্তা দিয়ে আরেকটু গিয়ে ডানদিকে, ভিউ পয়েন্টের একটু আগেই হোটেলটা। ঘর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে হাঁটলে ভিউ পয়েন্ট কয়েক পা।

 

সেদিন বেশ ঠান্ডা, পাহাড়ের ওপরে নিশ্চই বরফ পরেছে। আকাশ পুরোপুরি পরিস্কার। মেঘের লেশমাত্র নেই। সেদিন পূর্ণিমাও। গোল একটা চাঁদ উঠেছে আকাশ জুড়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘা সেই পূর্ণিমার চাঁদের মায়াবি আলোয় তার রূপের তুঙ্গে বিচরণ করছে। সে এক মায়াভরা সন্ধ্যাঅরুণাভ বললো চল রাত্তির হলে ভিউ পয়েন্টে গিয়ে ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে পূর্ণিমার আলোয় মায়াবি কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলবো। সারে এগারোটার মধ্যে দার্জিলিংয়ের বাকি আলো নাকি নিভে যাবে, অরুণাভ হোটেলের লোকাল মানুষজনের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে। ওরা অরুণাভকে সাবধান করে দিয়েছে, রাজভবনের দিক থেকে আসা কোন ঘোড়ার খুরের শব্দ পেলে যেন সেদিকে না তাকায়, উপেক্ষা করে, পারলে সরে যায়। লুকিয়ে থাকে। আর কিছু ভেঙে বলেনি তারা।

 

আমরা সারে এগারোটার আগেই ওখানে পৌঁছে, ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চ গুলোতে বসে বসে ফ্লাস্কে আনা কফি খাচ্ছি। অরুণাভ ওর একটা ফুল ফ্রেম ক্যামেরা, বড় লেন্স সেট করে, ট্রাইপডের ওপরে লাগিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাক করে রেখেছে। ক্যামেরার রিমোট দিয়ে মাঝে মাঝে ছবি তুলছে। অন্য ছোট মিররলেস ক্যামেরা দিয়েও ছবি তুলছে, এদিক ওদিক। এই মিররলেস ছোট ক্যামেরাটা হাতেই আছে ওর। আস্তে আস্তে সব আলো নিভে আসছে। স্পষ্ট হচ্ছে আকাশের তারারা। স্পষ্ট হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তার রূপ খুলছে। এ এক অপার্থিব দৃশ্য। এরকম আগে কোনদিন দেখিনি। আর দেখবও না।

 

ওদিকে প্রচন্ড ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আমি ঠিক করলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে দুটো কম্বল নিয়ে আসি। না হলে আর থাকা যাচ্ছে না। ঘড়িতে পোনে বারোটা বাজে। রুমে এসে দুটো কম্বল নিয়ে আমি বেরোচ্ছি, হটাৎ শুনি একটা গুলির শব্দ। ডান দিক থেকে। ওই ভিউ পয়েন্টের দিক থেকেই। দৌড়ে বেরোতে বেরোতেই শুনলাম ডান দিক থেকে, মানে রাজভবন, ভিউ পয়েন্টের দিক থেকে বাঁ দিকে, মানে ম্যালের দিকে একটা ঘোড়ার খুরের ঠকাঠক আওয়াজ। হোটেল থেকে বেরোতে বেরোতেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজটা মিলিয়ে গেল। দৌড়ে পৌঁছলাম। ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চে অরুণাভ শুয়ে আছে। হাতে ক্যামেরা। বুকের কাছে চাপ চাপ রক্ত। অন্ধকারে কালো রঙের লাগছে। নিশ্বাসের কোন চিহ্ন নেই।

 

জানুয়ারীর রাত্তিরে দার্জিলিং নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত। অনেক হৈচৈ করে ফোনাফোনি করে কিছু মানুষ পাওয়া গেল। দার্জিলিং ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালের এমার্জেন্সির ডাক্তার বললেন, ব্রট ডেথ। অরুণাভ নেই।

 

যেসব লোকাল মানুষজন ওখানে ছিল, তারা বললো যে ডাক্তার সাহেব গুলি করেছেন। উনি ঘুরে বেড়ান রাত্তিরের দিকে, ঘোড়ায় চড়ে। অ্যান্ডারসন সাহেব। বৃটিশ আমলের ডাক্তার। কোন কারণে নিজেই নিজেকে গুলি করে মারা যান। আজকের দিনেই। তেরোই জানুয়ারী। থাকতেন ম্যালের ওপরেই। উনিই নাকি একটা টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে এইদিনে ঘুরে বেড়ান ম্যাল থেকে এখনকার এনসিসি রোড ধরে, এখনকার রাজভবন হয়ে, ম্যাল রোড দিয়ে গোল চক্কর লাগিয়ে ফিরে আসেন। সাথে থাকে ওনার রাইফেল। অনেকেই নাকি দেখেছে।

 

বেশ কিছু সপ্তাহ হয়ে গেছে। মৃত্যুর কারণ বন্দুকের গুলি, সেটা জানা গেছে। কিন্তু কার গুলি, কিসের গুলি, সেই রিপোর্ট এলো অনেকদিন পরে।

 

পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর ডেকেছিল। যেটুকু যতটা জানি বললাম। ওনারা বললেন, এরকম নাকি হতেই পারেনা। অরুণাভকে যে বন্দুক আর কার্তুজ দিয়ে মারা হয়েছে, সেসব বহুবছর তৈরী হয়না। সেসব ভিন্টেজ। একমাত্র মিউজিয়ামে আছে। আর কোথাও নেই।

 

ওনারা বললেন, অরুণাভর মৃত্যু হয়েছিল যে বন্দুক দিয়ে তার নাম লী-এনফিল্ড রাইফেল। বৃটিশ আমলের। ইছাপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে তৈরী। আর পাওয়া গেছে একটা .৩০৩ কার্তুজ। পুনাতে তৈরী হয়েছিল অন্তত একশ বছর আগে। সেও বৃটিশ আমলের। ওনারা আরও বললেন, অরুণাভর মিররলেস ক্যামারাতে শেষ তিনটে ছবি রাস্তার, ভিউ পয়েন্টের পাশের রাস্তার দিকে তাক করে। ফ্রেমে সামনে রাস্তা পেছনে দেওয়ালের মত পাহাড়। আর কিছু নেই। তিনটে ছবিই তাই। তার আগের সবকটা ছবি কাঞ্চনজঙ্ঘার! 

 

 

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বর্ষাকাল, পাহাড়, আর একজন সাহেব ভূত ~ শৈবাল বিষ্ণু

দার্জিলিং এর ম্যাল রোডে ঠিক যেখানে এখন শ্যালেট হোটেল আছে, সবুজ রঙা বাড়িটা, নিচে বইয়ের দোকান, ঠিক সেখানেই থাকতেন এন্ডারসন সাহেব। পেশায় ডাক্তার, নেশায় পর্বতপ্রেমী। সে একশো বছরেরও আগের কথা। 

তবে যদি আপনি গহীন বর্ষায়, এই ধরুন জুলাইয়ের মাঝামাঝি, যখন টানা সাত দিন ধরে বর্ষা চলছে, যেন মনে হচ্ছে কেউ বালতি বালতি জল ঢালছে ছাদের ওপরে, সেই সময়ে গিয়ে পড়েন ওইখানে, আর রাত্তিরের দিকে এই ধরুন এগারো সারে এগারোটা নাগাদ ওইদিকে ভুল করেও তাকিয়ে দেখেন, খুব সম্ভব আপনি এন্ডারসন সাহেব কে পায়চারি করতে দেখতে পাবেন। উইন্ডামেয়ার হোটেলের সামনের চাতালটা থেকে দেখাই নিরাপদ। সাহেব ভূত বলে কথা, বেশী কাছে না যাওয়াই ভাল। তাও আবার ওনার সান্ধ্যভ্রমন হয়নি, তাই নিচের বারান্দাতেই পায়চারি করতে হচ্ছে, মনটা ওনার নিশ্চই তিতকূটে হয়েই আছে।

কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এন্ডারসন সাহেব পায়চারি করছেন ঠিকই কিন্তু ওনার গোড়ালি আর নিচে পায়ের পাতা দেখা যাচ্ছে না। জুতোর দেখা নাই।

আসলে কি হয়েছে। উনি আগের বারান্দাটার ওপরেই পায়চারি করে চলেছেন। উনি তো আর জানেন না যে, বারান্দাটা ওনার মৃত্যুর পরে আরো এক থাক ইঁটের স্তর দিয়ে অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। 

ওনার এতসব জানার কথা নয়। তাই উনি আগের ছয় ইঞ্চি নিচু বারান্দার ওপরেই পায়চারি করেন। আর তাই ওনার গোড়ালির নিচের অংশ আর জুতো মোজা, পায়ের পাতা দেখা যায়না ইদানিং। বিশ্বাস না হলে এই জুলাইতেই চেষ্টা করে দেখতে পারেন!