বৃহস্পতিবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

কেকের পেছনে কে কে?? ~ অরিজিৎ ঘোষ

কালীপূজোয় যেমন বাজি, কেষ্টপুজোয় যেমন তালের বড়া তেমনই খেষ্টোপুজোয় কেক। মুল দোকানটা কিসের তা ম্যাটার করে না। আজকের জন্য ওটা কেকের দোকান। কারণ কাল যিশুখ্রিস্টের বাড্ডে।

কিন্তু সত্যি সত্যি যিশুখ্রিস্টের কোনও ডকুমেন্টেড বাড্ডে তো নেই বাপু। সবটাই তো ক্যালকুলেটেড বাড্ডে। যীশু তো নন-বায়োলজিক্যাল বাচ্চা। মানে জোসেফ বেথলেহেমে যাওয়া টাওয়া সবই করেছিলেন, কিন্তু মেরীর সাথে যৌন সঙ্গমটাইতো কখনও করেননি। মেরী জোসেফের বাগদত্তা ছিলেন। সেই অবস্থাতেই উনি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন, যাতে জোসেফের কোনও ভূমিকা ছিল না। কে এই মহান কর্মটি করল তা ধরতে না পেরে ভগ্নহৃদয়ে জোসেফ কেটে পড়ার, মানে ডিভোর্স দেওয়ার তাল করছিলেন, কিন্তু বোধহয় হঠাৎ খেয়াল করলেন যে বিয়েটাই তো হয়নি। 

এইরকম কেলোকালে স্বপ্ন দেখার একটা মেজর ভূমিকা থাকে। অতএব জোসেফখুড়োও স্বপ্ন দেখলেন যে বাংলা সিরিয়ালের ঢংএ বিধাতা তাঁকে বলছেন - "তোর বাগদত্তার পেটে যে বাচ্চা, সে সাক্ষাৎ ঈশ্বর, সে পৃথিবীর পাপ মোচন করবে। অতএব খবর্দার কেটে পড়িসনি, মেরীকে ঝটপট বিয়ে করে নে"। আচ্ছা জোসেফ কি তখন বিধাতাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন "স্যার সে নয় বাচ্চা পাপ মোচন যা করার করবে, কিন্তু কার পাপে আমার এই দশা হল মিলিয়ে যাওয়ার আগে প্লিজ একটু বলে যাবেন?" নাহ্‌। ম্যাথিউ তাঁর গসপেলে এইসব আজেবাজে কথা লেখেননি। যাইহোক, জোসেফ আজ্ঞা পালন করে মেরীকে বিয়ে করে নিলেন কিন্তু আর কিছু 'করলেন' না। 

সেই জোসেফের জন্য নন-বায়োলজিক্যাল আর মেরীর জন্য ভেরি মাচ বায়োলজিক্যাল কনসেপশনের দিনটা ছিল ২৫শে মার্চ। তার সাথে ন'মাস যোগ করে যেই ডেট, সেটাই আগামীকাল। যেদিন নিজে নিজেই কনসিভড্‌ হওয়া যীশু হিসেব মতো বেরিয়ে এসেছিলেন মাতৃজঠর থেকে। অতএব কাল পার্কস্ট্রিটের এমাথা থেকে ওমাথা হাঁটতেই হবে সেই ঐতিহাসিক কেএলপিডির ঘটনার কথা মনে রেখে। 

বাই দ্য ওয়ে, হাঁটার রুটটাকে ইন্টারেস্টিং করা যেতেই পারে। কারণ ম্যাথিউ আর লিউক, এই দুজনের গসপেলের ফিলসফিই আলাদা। ম্যাথিউ পরমপিতা আব্রাহাম থেকে শুরু করে সামনের দিকে এগিয়ে মাত্র বিয়াল্লিশতম প্রজন্মে যীশুকে দেখিয়েছেন। তাঁর কাহীনিতেই বেথলেহেমের তারা, পুবের দেশের সেই তিন জ্ঞানী পুরুষ এইসব আছে, যেগুলো আমরা প্রায় সবাই ছোটবেলায় পড়েছি। ম্যাথিউয়ের মতে মেরীর কোলে বাচ্চা আসার পরেই জোসেফ তাঁর বেথলেহেমের বাড়ি ছেড়ে ইজিপ্টে চলে যান, পরে নাজারেথে ফিরে গিয়ে সেটলড হন। পালানোর কারণ হচ্ছে তখন রাজা হেরাড সব বাচ্চা ছেলেদের মাথা কেটে নিচ্ছিল। 

অন্যদিকে লিউকের গল্পে ওসব তারা, জ্ঞানীলোক, ইজিপ্ট যাওয়া ইত্যাদি নেই। জোসেফের বাড়ি নাজারেথেই, স্রেফ সন্তানের জন্মের জন্য বেথলেহেমে আসা এবং কাজ মিটে গেলে ফিরে যাওয়া, এটাই তাঁর মুদ্রণ। লিউকের বানানো বংশতালিকায় তিনি যীশু থেকে পিছোতে পিছোতে সাতাত্তরতম লেভেলে স্বয়ং ঈশ্বরকে পেয়েছেন, যার এক ধাপ নিচেই আছে আদম। 

তবে তিনটে বিষয়ে ম্যাথিউ আর লিউক এক্কেরে একমত - (১) জন্মটা নন-বায়োলজিক্যাল, (২) জন্ম বেথলেহেমেই এবং (৩) জোসেফ হলেন রাজা ডেভিডের বংশধর। এইটা দারুণ ইন্টারেস্টিং!
এইবারে ঠিক করুন আপনি কোন রুটটা ফলো করবেন। যদি ম্যাথিউ রুট ফলো করেন, তাহলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পার্কস্ট্রিট প্রচুর ভিড় ঠেলাঠেলি করে, সঙ্গের লোকজনকে হারিয়ে ফেলে হোয়াটস্যাপ লোকেশনের মাধ্যমে আবার তাঁদের খুঁজে পেয়ে চায়না টাউনে বসে শক্ত বা নরম পানীয়ের সাথে ধোঁয়া ওঠা চিলি চিকেন নিয়ে বসে অল্পক্ষণ পরেই বাড়ি ফিরে আসতে পারেন, অথবা লিউক রুটে গিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে অযথা সময় নষ্ট না করে সোজা চায়না টাউনে গিয়ে মাঝরাতে অথবা ভোররাতে ফিরতে পারেন। 

আমাদের প্রধানমন্ত্রী নন-বায়োলজিক্যাল, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী দ্বিজা, মানে দুটো জন্মদিন, তাই দুটো করে প্যান-আধার, আমাদের বাবা লোকনাথের দুটো জন্মস্থান। আমাদের স্টকে সব কম্বিনেশন আছে, তাই আমাদের সারপ্রাইজ দেওয়া সোজা না। তাই জন্মদিন কবে, জন্ম কিভাবে, ওসব নিয়ে ভাবার দরকার নেই। এগিয়ে যান, পার্ক স্ট্রিটে, নিউ মার্কেটে, বো-ব‌্যারাকসে। শুধু দিনের কোনও একটা সময়ে কেকটা খেতে ভুলবেন না। ওটুকু না করলে অধম্ম হবে। 

🍷🍷🍷

 অরিজিৎ ঘোষ, ২৪/১২/২০২৫

সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২৫

উডেন চেস্ট ~ শৈবাল বিষ্ণু

দাদু বলতেন উডেন চেস্ট, আসলে পাঁচ ফুট উঁচু একটা কারুকাজ করা ব্রিটিশ আমলের আলমারি। সেগুন কাঠের। দাদু বলতেন বার্মা টিক। আলমারির ওপরে একটা কাঠের ফ্রেম, ফ্রেমের মধ্যে আটকানো আয়না। দাদুর মতে বেলজিয়াম গ্লাস। আজকেও বিকেলে দেখলাম, মনে হলো যেন একদম নতুন। এডিনবরা ইউনিভার্সিটি থেকে ডক্টরেট করে দেশে ফেরার পরে চিফ কেমিস্ট হয়ে একটা বড় ওষুধ কোম্পানিতে কাজ শুরু করেন। ওনার কাজের আর বাকি গোপনীয় বা দরকারী কাগজপত্র রাখতেন এই উডেন চেস্ট এর ভিতরে। আলমারি থাকতো ওনার ল্যাবে। ওনার অফিসের সবার ধারণা ছিল যে এই আলমারি অভিশপ্ত। আলমারির দুটো পাল্লা কাঠের হুড়কো দিয়ে বন্ধ থাকতো, ওপরে আর নিচে। পাল্লা খুলে গেলেই সেদিন কোনো খারাপ ঘটনা ঘটতে চলেছে। সাথে সাথে বন্ধ করলে একটু কম কিছু  হওয়ার সম্ভাবনা। ওটা নাকি আগাম বার্তা দিত কোনো ভয়ংকর বিপদের।


আলমারি কে বানিয়েছিলেন, কে প্রথম মালিক ছিলেন, সেসব জানা নেই, তবে খোদাই করা আছে ১৮৯৩, কানপুর। দাদু বাহান্ন সালে এটি কিনেছিলেন, বেশ সস্তায়, কারণ আগে যারা কিনেছিল তারা ফেরত দিয়ে গিয়েছিল। গুজব ছিল যিনি এটা বানিয়েছিলেন, তাকে নাকি মেরে এই আলমারির ভিতরে রেখে দেওয়া হয়েছিল। দিদার প্রচণ্ড আপত্তি সত্বেও আলমারিটা দাদু বাড়ি এনেছিলেন।


আলমারিটা আসার মাস চারেকের মধ্যেই একদিন দেখা গেছিল আলমারীটা হাঁ করে খোলা, আর আমার মেজো মামা, বয়স আড়াই বছর, সামনে থেবড়ে বসে আছে, আর আলমারিটার সাথে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে, অবশ্যই নিজের ভাষায়। এর কদিনের মধ্যেই মামার খুব জ্বর আসে। টাইফয়েড। কিছুদিন ভুগে মেজো মামা মারা যান। বাড়িতে সবার ভীষণ আপত্তিতে, আর বাড়ীওয়ালার অনড় মনোভাবে শেষ পর্যন্ত দাদু আলমারিটা বাড়ি থেকে সরিয়ে ওনার অফিসের ল্যাবে রাখতে শুরু করেন। যদিও ওনার বৈজ্ঞানিক মন কিছুতেই মানতে চায়নি এই দুটো ঘটনার মধ্যে কোনো যোগাযোগ আছে।


ওষুধ কোম্পানি একটা সময় সেই আলমারী ফেরত দিয়ে দেয় দাদুর মৃত্যুর কয়েক বছর পরে। কিন্তু কেউই নিতে রাজী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আমার বাবা ওটাকে নিজের চেম্বারে নিয়ে রেখে দেন। 


ওটা বন্ধই থাকতো। চেম্বারে, এক কোনায়। বাবার এসিস্ট্যান্ট সরকার জেঠু ওটাকে সহ্য করতে পারতেন না, গজগজ করতেন, আর রোজ ধুপ ধুনো দিয়ে পূজো করতেন, যাতে অভিশাপ না লাগে। 


আমি বাবা দাদাদের মত ডাক্তারি পড়িনি, চার্টার একাউন্ট্যান্ট হয়ে ভালই কামাই, সাথে শেয়ার বাজার আমাকে বেশ তাড়াতাড়িই প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। গাড়ি বাড়ি বিদেশ ভ্রমণ চাকচিক্য এমনকি পাড়ায় সম্মান সবই পর্যাপ্ত পরিমাণে উপভোগ করি। পাড়ার ক্লাবে আমার অনেক উঁচুতে স্থান। ইদানিং ক্লাবও ফুলে ফেঁপে উঠেছে, বিরাট বাজেটের পূজো, দুটো বড় বাড়ি ভাড়া দেওয়া হয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, একটা নাটক আরেকটা সিনেমা সপ্তাহ, দুটো মেলা, একটা খেলার মাঠ, দুটো পার্ক, ফোয়ারা, বাগান। অনেক আয়, অনেক ব্যয়। এছাড়াও দুতিনজন কাছের নেতার অবৈধ টাকা ঘোরাবার জন্য কাজে লাগে। ক্লাবের হিসেবপত্র মাসে দুতিনবার দেখে দিয়ে যাই। একতলার কোনের লাইব্রেরি, রিডিং রুম, ক্লাবের অফিস পাশাপাশি। ওই লাইব্রেরীতেই ওটা এখন প্রতিষ্ঠিত, বাবা চেম্বার বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকেই। এখানে এরা কেউই জানেনা ওটার পেছনে আসল গল্পটা। আমি যেদিনই যাই দেখে রাখি আলমারি ঠিকঠাক আছে কিনা। বন্ধ আছে কিনা। কিছু কাগজপত্র দলীল দস্তাবেজ এর কপি আছে ওটাতে। ক্লাবের একদম ওপরতলার চার পাঁচজন ওটা খোলে বন্ধ করে, দরকার লাগলে ব্যবহার করে। বাকিরা জানে ওটা আমার জিনিস, দামী জিনিস, ছোঁয়া বারণ।


চারবার ওটা খোলা পেয়েছি। সরকার জেঠুর এক্সিডেন্টের দিন, বাবার হঠাৎ করে ক্যান্সার ধরা পড়ার দিন। আর বাকি দুবারই ক্লাবের দুজন বরকর্তার মৃত্যুর দিন।


একদম শেষ বেলায় বাবা বোধহয় দুর্বল হয়ে গেছিলেন, আমায় আলাদা করে ডেকে বলেছিলেন ওটাকে বিদায় করে দিতে। কিন্তু আমার মধ্যে ততদিনে একটা অপ্রতিরোধ্য রোখ চেপে গেছিল, আমি পুরো ব্যাপারটাকে খেলা হিসেবে নিচ্ছিলাম। মায়ের মৃত্যু, জামাইবাবুর হার্ট এটাকের সময়, একবারও তো ওটা কিছু করেনি। মনে হয়নি ওটাকে আর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। 


আমার মনে প্রথম ভয় ধরলো যেদিন ক্লাবে হিসেব পত্র দেখে বেরোবার সময় খুট করে শব্দ পেলাম। ঢোকার সময় দেখেছি আলমারিটার হুড়কো খোলা। বন্ধ করে এসেছিলাম ভালো করে। নিজের হাতে। আবার কিকরে খুললো? সেদিনই রাত্রে ইডির রেড হলো কাছের নেতার বাড়িতে। 


আমারও শরীরটা কদিন বেশ খারাপ যাচ্ছিল, জরুরী ভিত্তিতে স্টেন্ট বসানো দরকার, প্রায় ৯০ পার্সেন্ট ব্লক ধরা পড়েছে এনজিওগ্রাম করে। বুকে মাঝে মাঝেই ব্যথা হয় ভোর রাত্রের দিকে। কিন্তু ডাক্তারের থেকে কিছুদিন সময় চেয়ে নিয়েছিলাম, এই ঝামেলার থেকে নিজেকে না সরাতে পারলে পুরো পরিবার শুদ্ধ রাস্তায় নেমে আসতে হবে। বেশ কয়েকশো কোটি টাকার ব্যাপার। 


আজ একটু তাড়াতাড়ি ক্লাবে পৌঁছেই হিসেবপত্র নিয়ে বসে গেছি। অনিমেষদা সাথে আছেন। উনি কাউন্সিলর, ক্লাবের প্রেসিডেন্ট। খুব ঘামছেন, এসি চালিয়েও। আমরা মন দিয়ে সব ক্যাচরা পরিষ্কার করার চেষ্টা করে যাচ্ছি। চারিদিক নিঃশব্দ। হঠাৎ খুট করে শব্দ। ছ্যাঁত করে উঠলো। দেখলাম হুড়কো দুটো খোলা। গিয়ে বন্ধ করে এলাম। অনিমেষদার নামেই সব কাগজপত্র, সই সাবুদ। উনি বুঝতে পারছেন খুব খারাপ ভাবে ফেঁসে গেছেন। বেরোবার উপায় নেই। এরা জাল গুটিয়ে এনেছে, আজকে কালকের মধ্যেই কিছু একটা হবে। তার আগে যতটা গুছিয়ে ফেলা যায় চেষ্টা করতে হবে। আমিও আপ্রাণ চেষ্টায় আছি এই তদন্তে যেন আমাকে কোনোভাবে না জড়িয়ে ফেলে। ঘটি বাটি বিক্রী করেও পার পাবনা। অনেকটাই রাত্রি হয়ে গেছে। অনিমেষদা কে এগিয়ে দিয়ে আসতে বললাম ড্রাইভার কে। গাড়ি ফিরে এলে আমিও বেরোবার জন্যে তৈরী হলাম। দরজা আর লাইট বন্ধ করতে বললাম। বন্ধ করে বেরোবার সময় মনে হলো যেন আবার একটা খুট করে শব্দ শুনলাম।


ফিরে যাবো? বন্ধ করে আসবো, যাতে বিপদ কমে। নাকি পুরোটাই মনের ভুল? আর তাছাড়া লোকে কী ভাববে! আমার মত মানুষের এত কুসংস্কার? কিন্তু লোকে কী ভাববে তা কি আজ ভাবার সময়? গিয়ে বন্ধ করে আসি, অন্তত দেখে আসি। পুরোটাই হয়তো মনের ভুল। নাহ, এত বছরের শিক্ষা দীক্ষার তাহলে কিসের মূল্য যদি এই সামান্য ব্যাপারেই কুসংস্কারগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কিন্তু এটা কি সামান্য ব্যাপার নাকি জীবন মরণ সমস্যা? গাড়ি প্রায় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছিল, বললাম গাড়ি ঘোরাতে, একটা কাজ ভুলে গেছি। বাড়ি থেকে এদিকে উৎকণ্ঠিত ফোন এসে গেছে বেশ অনেকবার, বুঝতে দিইনি যে ভিতরে ভিতরে আমি কতটা কেঁপে গেছি। বলেছি কালকেই তো হাসপাতালে ভর্তি হব, পরশুদিন সার্জারী, এই অল্প কিছু কাজ গুটিয়ে ফেললে আর ওমুখো হতে হবে না অনেক মাস। সবাইকে সব বুঝিয়েই বেরোচ্ছি। ফিরে গেলাম ক্লাবে। 


দরজা খুলে দিলো। লাইট জ্বালিয়ে দিলো। ঠিক যা ভয় পেয়েছিলাম। ওটা খোলা! একদম হাট করে খোলা। বন্ধ করার চেষ্টা করছি কিন্তু হুড়কো গুলো যেন কাজই করছেনা। গায়ে যেন একটুও শক্তি নেই। যেন ওটা আজ আমার সাথে যুদ্ধে নেমেছে। আমাকে ওটাকে হারাতেই হবে। আবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু আজ কেন হেরে যাচ্ছি। ওটা জিতে যাচ্ছে। আবার চেষ্টা করি, নাহ ওটা যেন আজ জ্যান্ত হয়ে উঠেছে, অসম্ভব শক্তি ওটার গায়ে। অসম লড়াই লড়ছি মনে হচ্ছে। একা পারবনা। ড্রাইভার চঞ্চল আর ক্লাবের কেয়ারটেকার মণিদাকে ডাকলাম। ডাকছি, কিন্তু আওয়াজ কেন বেরোচ্ছেনা। ওটা কি আজ আমার ওপরে আক্রোশ ফলাচ্ছে? আবার একবার চেষ্টা করে দেখি। নাহ, খুলেই যাচ্ছে। পারছিই না বন্ধ করতে। ওটাকে ছেড়ে বাইরে বেরোতে হবে, সাহায্য দরকার চঞ্চল আর মনিদার। কিন্তু একি, নড়তে পারছিনা কেন? পাল্লা গুলোর সাথে আটকে যাচ্ছি কেন, জড়িয়ে যাচ্ছি কীকরে ওটার সাথে? আটকে যাচ্ছি কেন? বেরোবার দরজাটাকে আর দেখতে পাচ্ছিনা কেন? আলো কে নিভিয়ে দিল? ওটা কি আমার ওপরে চেপে বসলো? বুকে এত চাপ কিসের? ওটা আমার বুকের ওপরে বসে আমাকে মেরে ফেলতে চাইছে, ওটা আমাকে শেষ করে দিতে চাইছে। আর লড়াই করতে পারছিনা। ঘুম পাচ্ছে। ওটা জিতে গেল…


সাদা রঙের আলো। হালকা। চারিপাশ ঠান্ডা। অল্প ব্যথা। মাথা ভার ভার। ঘুম পাচ্ছে। চারিপাশে অনেক কিসব অপরিচিত আলো। খুব ঘুম পাচ্ছে।


ঘুম ভাঙ্গার পরে জানলাম সেদিন রাত্রে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হয়েছিল, সকালেই সার্জারী হয়ে ৯টা স্টেন্ট বসেছে। সেদিন রাত্রে অনিমেষদাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে। ইডি বা পুলিশ আমার খোঁজ করেনি। 


কদিন পরে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েই লম্বা ছুটি নিয়ে নিয়েছি। ঘরেই থাকছি।  ডাক্তার বলেছেন আমার অবস্থা অত্যন্ত জটিল তাই আরো একটা সার্জারী লাগবে খুব শিগগিরই। যে নয়টা স্টেন্ট বসেছে সেগুলো ৯০% এর বেশী ব্লক ছিল। আরোও ছয়টা ব্লক আছে যেগুলো ৮৫ শতাংশের বেশী। এক্ষুনি স্টেন্ট বসাতে হবে। আমি রাজি হলেই আরেকটা সার্জারী করে দেবেন। আর বুকে ব্যাথা হলেই যেন জানাই, সাথে সাথে সার্জারির ব্যবস্থা করবে।


ঘরে ফিরে ছুটি নিয়ে রেস্ট নিচ্ছি। ক্লাবের কাঁচা কাজ থেকে নিজে কীকরে উদ্ধার পাই তার জন্যে যাকে যেখানে যা দেওয়ার সেসব ব্যবস্থা করছি। আরো মাস দুতিন লাগবে সম্পূর্ণ থিতোতে, ততদিন সময় চাই আমার। তারপর সার্জারী করা যাবে। প্রায় রোজই বুকে ব্যাথা হচ্ছে, ভোরের দিকে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। ওষুধ পত্র খেয়ে কমছে। বউ এখন মেয়ের ওখানে গেছে, মেয়ে প্রাইভেট মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয়েছে। কয়েক কোটির ওপর খরচ কিন্তু হোস্টেলের খাবার ভালো নয়। তাই বউ গেছে মেয়েকে নিয়ে পাশেই একটা বাড়ি ভাড়া করে থেকে মেয়েকে সুস্থ স্বাভাবিক করে তুলতে যাতে কলেজ যেতে পারে।


শুধু লোক লাগিয়েছি ওটাকে সরিয়ে দিতে, কারপেন্টার রাজেনবাবু কে দিয়ে কাটিয়ে দিয়ে ওটাকে নষ্ট করে দিতে। কুসংস্কার নয়। আসলে বউ খুব ঝামেলা করছে। বলছে আমাকে নাকি ওই ওটার সামনেই পাওয়া গেছিল। দরজা খোলা ছিল। ওটাই অপয়া। কীকরে বোঝাই যে আমি তো ভেবেছিলাম মরেই গেছি। যাইহোক সংসারে শান্তি বজায় রাখতে কার্পেন্টার এর কাছে ওটা চলে গেছে। নামমাত্র টাকায়, দরাদরি করিনি। বলেছি ক্লাব এর সাথে আর সম্পর্ক থাকবেনা, তাই সরিয়ে দিতে হচ্ছে, আর বাড়িতে এ জিনিস রাখার জায়গা নেই।


উনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অনেক করে ওটার ইতিহাস জানতে চাইলেন, বারবার। একটু এদিক ওদিক করে সযত্নে আসল কথাটা এড়িয়ে ইতিহাস বলেছি। চোখ মুখ দেখে মনে হলনা রাজেনবাবু বিশ্বাস করলেন। উনি বলে গেলেন আগে চেষ্টা করবেন খদ্দের পেতে, তেমন খদ্দের পেলে দিয়ে দেবেন, অর্ধেক আমার অর্ধেক ওনার। না পেলে কেটে দেবেন। কেন আমি অত সুন্দর একটা ওয়ার্ক অফ আর্ট কে কাটাতে চাই ভেবে পাচ্ছেন না। সন্দেহ নিয়েই যেন ফিরে গেলেন। 


৩:৫৪ বাজে। সকাল হয়নি। আলো ফোটেনি। পাখি ডাকেনি। আজ আমার আবার ব্যথা করছে। ওষুধ খেয়েছি। ব্যথা কমছেনা। আবার ওষুধ খেলাম, আরেকটা ডোজ নিলাম। তাও ব্যথা বেড়েই চলেছে। ফোন কোথায়? ফোন। কাউকে ডাকতে পারছিনা। আবার সেদিনের মত লাগছে। আবার চোখ ঝাপসা হয়ে আসছে। গলা শুকিয়ে আসছে। আমি চিৎকার করছি। ছটফট করছি। কই ব্যথা কমছে না কেন। কখন কমবে। 


মনে হচ্ছে এবারে যেন কমছে? হালকা লাগছে কি? অবশ লাগছে। ঘুম পাচ্ছে। ঘুম। ঘুম। ঘুম।


ঠিক সেই সময়ে, রাজেন বাবুর দোকানের পেছনে গুদামে ওটা থেকে কি খুট করে একটা শব্দ এল?


না, আসেনি। আসবেও না আর কোনোদিন। ওটা তো আর রাজেনবাবুর কাছে নেই। ওটা চলে গেছে, ওটা নতুন জীবন পেয়েছে কোনো বড়লোকের সংগ্রহে, বা হোটেলে, বা মিউজিয়ামে। কিন্তু ওটা আর আমাদের পরিবারে নেই। 


আমাদের পরিবারে, বংশানুক্রমে চিরকালই শোক, তাপ, দুঃখ, মৃত্যু, অসুখ, লোভ, লালসা, অপরাধ, সব ছিল, ভবিষ্যতে থাকবেও। শুধু সামনে থাকবেনা একটি নিরীহ কাঠের আলমারি, এই সবকিছুর জন্যে দোষ চাপানোর, অপয়া বলে দায়ী করার জন্যে!


(ছবি ইন্টারনেট থেকে)



শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫

ভারতমাতা ও তার জন্ম ~ অরিজিত মুখার্জী

শিক্ষিত উঁচু জাতের বাঙালি ভদ্রলোকের হাতে ভারতমাতার জন্মের এই গল্পটা অনেকদিন ধরেই লেখার ইচ্ছে ছিল। অনেক টালবাহানার পর লিখেই ফেললাম, কারণ আজকের দিনে এই ন্যারেটিভটা জানা জরুরী। অবশ্যই মৌলিক কিছু নয়, মূলতঃ তনিকা সরকার, সুমিত সরকার, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, আশিস নন্দী, মৃণালিনী সিনহা — এরকম বেশ কিছু স্কলারের লেখা পড়ার পর একটা সাধারণ ভাষায় সিন্থেসিস। আমি ইতিহাসের ছাত্র নই, মানে এই বিষয়ে ফর্মাল কোনো ট্রেনিং নেই। নিজের ইচ্ছেতে কিছু বই পড়ি। পরিচিত লোকজনের সঙ্গে আলোচনা করে বোঝার চেষ্টা করি। এই লেখাটা সেইরকমই — ঠিক বুঝলাম কিনা সেইটা যাচাই করার জন্যে। ভুল থাকাই বরং স্বাভাবিক। তাই, যাঁরা ইতিহাসের ছাত্র, তাঁরা শুধরে দিলে উপকৃতই হব।
গল্পটা ঊনবিংশ শতকের আলোকপ্রাপ্ত বাঙালি ভদ্রলোক সমাজকে নিয়ে — যাঁরা সাধারণভাবে শিক্ষিত আর অবশ্যই উঁচু জাতের। গল্পের ক্লাইম্যাক্স ঊনবিংশ শতকের শেষার্ধে, যে সময়ে নানান কারণে তাঁরা খানিকটা অস্বস্তিকর জমির ওপরে দাঁড়িয়ে। কলোনিয়াল ইতিহাসের গবেষকরা মনে করেন এই জমি থেকেই জন্ম নিয়েছিল হিন্দু পুনরুত্থান বা রিভাইভালিজমের ধারণা, যার চূড়ান্ত ফলাফল হয়ে দাঁড়ায় একটা ভৌগোলিক অঞ্চলকে দেবীর রূপে দেখতে শুরু করা। ঐতিহাসিকভাবে যে কথাটা মনে রাখা দরকার, সেটা হল এই মাতৃমূর্তির জন্ম পুরাণকথা থেকে হয়নি, কারণ ভারত অ্যাজ আ স্টেট/রাষ্ট্র কনসেপ্টটা ব্রিটিশ আমলের। আজকের নেশন-স্টেটের ধারণার মতনই এই দেবীপ্রতিমার ধারণাও আদপেই "টাইমলেস" নয়, বরং এর জন্ম হয়েছিল ঊনবিংশ শতকের বাংলার কঠিন বাস্তবের মধ্যে। একের পর এক সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ধাক্কায় ক্ষতবিক্ষত বাঙালি ভদ্রলোক বাঙালি তখন পরিচয়ের সংকটে ভুগছে। সেই অবস্থার মধ্যে জাতীয়তাবাদী ইন্টেলেকচুয়ালরা একটা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র তৈরী করে নিয়েছিলেন — খানিকটা স্যাংচুয়ারি বলা যায় — ঘরবাড়ি সংসার, বাড়ির মেয়েরা, আর পরিবার — যে স্যাংচুয়ারিতে কলোনিয়াল শাসকের কর্তৃত্ব থাকবে না, সেই অধিকার থাকবে শুধু পরিবারের কর্তা বাঙালি ভদ্রলোকের হাতেই। এই আবহেই জন্ম হয় "দেশমাতৃকা'-র, বলা যায় বঙ্কিমচন্দ্রের হাতেই, এবং অচিরেই এই মাতৃমূর্তি ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের আইকন "ভারতমাতা" হয়ে ওঠে।
একটা ক্রনোলজিকাল অর্ডারে এই ঘটনাগুলো পর পর সাজাতে পারলে আমরা সেই সময়ের ছবিটা খুঁজে পাব।
এই সময়টাকে জানতে হলে আমাদের শুরু করতে হবে ১৭৯৩ সালের পার্মানেন্ট সেটলমেন্ট অ্যাক্ট, অর্থাৎ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের আইন থেকে। অভিজাত হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক জমিদার শ্রেণী, বা ল্যান্ডহোল্ডিং ক্লাস — আমাদের গল্পের এক চরিত্র — এর জন্মও এই আইনের পরেই। এই আইন অনুযায়ী ভদ্রলোক জমিদারেরা কোম্পানি বাহাদুরকে দেওয়া পূর্বনির্ধারিত খাজনার বিনিময়ে পাকাপাকিভাবে তাদের এস্টেটের মালিক পরিচিতি পেয়ে যায়, পেয়ে যায় রায়তদের ওপর যেমন খুশী খাজনা চাপানোর স্বাধীনতা। বেসিক্যালি পরজীবী বা প্যারাসাইট বলতেই পারেন এই ক্লাসকে — কারণ এদের বেঁচে থাকা ছিল অন্যের পরিশ্রমের ফসলের ওপর নির্ভরশীল, আর একই সঙ্গে তাদের স্ট্যাটাসও পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল কলোনিয়াল শক্তির ওপর। উল্টোদিকে, এই ভদ্রলোক শ্রেণী আবার নিজেদের অধিকার আর আধিপত্যের ব্যাপারে ছিল মারাত্মক রক্ষণশীল। এই শ্রেণীরই একটা অংশের উচ্চাশা ছিল জমিদারির বাইরেও কলোনিয়াল শাসকের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার। ১৮০০ শতকের শুরুর দিকে নানান ধরণের ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে, যেমন জাহাজ বা ব্যাঙ্কিং ইত্যাদিতে বাঙালি ভদ্রলোক ভালোই পরিচিতি পেয়েছিল — দ্বারকানাথ, রামদুলাল দে (মানে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাবা) ইত্যাদি নাম ইতিহাসে পড়ে থাকবেন। তবে ওপর ওপর আশাব্যঞ্জক হলেও খানিক অনিশ্চয়তাও ছিল সেই যুগের এই অন্ত্রপ্রনরশিপে।
অভিজাত ভদ্রলোক বাঙালির ব্যবসায়িক আশাভঙ্গ হয় ১৮৪০ নাগাদ, যখন একাধিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা এসে একের পর এক ধাক্কা মারতে শুরু করে। একাধিক ইউরোপীয় ব্যাঙ্কিং সংস্থা, যেমন ইউনিয়ন ব্যাঙ্ক বন্ধ হয়ে যায়। এই ব্যাঙ্কগুলোর আমানতে থাকা বাঙালি পুঁজি পুরোপুরি মুছে যায় বাজার থেকে। কোম্পানি সরকার এই সংকটের সময়ে জাতিবিদ্বেষের ধ্রুপদী সংজ্ঞা মেনে সাদা চামড়ার ইউরোপীয় পুঁজির স্বার্থ দেখায় মন দেয়। বাঙালি তথা ভারতীয় আমানতকারীদের কাছে একটা স্পষ্ট বার্তা পৌঁছয় — যে আধুনিক পুঁজিবাদী ভবিষ্যতের দরজা দেশীয় পুঁজিপতিদের জন্যে বন্ধ। ওসব সাহেবদের খেলার মাঠ, নেটিভ বাঙালির সেখানে জায়গা নেই। বাঙালি উচ্চবিত্ত ভদ্রলোক আচমকা ধাক্কা খেয়ে পিছু হটে আসে, আর তার নিরাপদ এলাকা, অর্থাৎ জমিজমা সম্পত্তির মধ্যে গুটিয়ে যায়। সম্ভাব্য অন্ত্রপ্রনর থেকে বাঙালি উচ্চবিত্ত ভদ্রলোক হয়ে যায় পুরোদস্তুর ভূস্বামী। তাদের পুঁজি সীমাবদ্ধ থেকে যায় খাজনা বা রেন্টের মধ্যেই। ইউরোপীয়দের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার স্বপ্ন দেখা বাঙালি ভদ্রলোক অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে হয়ে ওঠে অন্তর্মুখী।
অর্থনৈতিক পরিসর ছোট হয়ে আসার পাশাপাশি ঊনবিংশ শতকের প্রথম ভাগে আরও দুটো বড় ধাক্কা খায় এই রক্ষণশীল হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক। এবং এই দুটোকেই সে দ্যাখে তার নিজের সনাতনী সাংস্কৃতিক এবং গার্হস্থ্য জীবনের সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে। প্রথম ঘটনা ১৮২৯ সালে সতীদাহ প্রথা রদের আইন এবং দ্বিতীয় ঘটনা ১৮৫৬ সালের বিধবাবিবাহ আইন। রেনেসাঁর সময় থেকে মুক্তচিন্তায় শিক্ষিত এক শ্রেণীর বাঙালি এই দুই আইনকে প্রয়োজনীয় সামাজিক সংস্কার হিসেবে দেখলেও সংখ্যাগরিষ্ঠ সনাতনী হিন্দু বাঙালির কাছে এই দুটো আইন ছিল পবিত্র ধর্মীয় আচারের মূলে অযাচিত কলোনিয়াল/বিদেশী আক্রমণ। তার কারণটাও সহজবোধ্য। হিন্দু পুরুষের চিরকালীন কনসেপ্ট ছিল স্ত্রীসুলভ ভক্তি, বংশগৌরব আর বিয়ের অলঙ্ঘনীয় পবিত্রতা। সতীদাহ রদ আর বিধবাবিবাহ — দুটোই সেই চিরকালীন সনাতনী হিন্দু পৌরুষের ধারণার ওপর আক্রমণ। হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোকের অন্দরমহলে পুরুষই ছিল সর্বময় কর্তা, তার হাতেই যেখানে নিয়ন্ত্রিত হত লিঙ্গ, জাতি আর ধর্মের সমস্ত আচার, পুরুষই ছিল পারিবারিক পবিত্রতার রক্ষক। সেই অন্দরমহলের ভিতরে কলোনিয়াল আইনের ঢুকে পড়ার ধাক্কা সমস্ত সনাতনী ধ্যানধারণাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই সময়ে। রামমোহন এবং বিদ্যাসাগর সেই যুগের ভদ্রলোক বাঙালির কাছে হয়ে ওঠেন খলনায়ক।
[এবং আজও এর অন্যথা হয় না। উত্তর ভারতীয় সনাতনী হিন্দুর ডেফিনেশনে আজও স্ত্রীকে মুখ বুজে স্বামীর হুকুম মানতে হয়। আজও রক্তের শুদ্ধতা সনাতনী হিন্দুর কাছে জরুরী। এবং আজও অগ্নিসাক্ষী করে বিয়ে করা মানে অলঙ্ঘনীয় জন্মজন্মান্তরের সম্পর্ক। বেশ কয়েক দশক আমরা কিছুটা স্বাধীনভাবে ভাবতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু উত্তর ভারতীয় সনাতনী হিন্দুত্বের ছোঁয়ায় নতুন করে সনাতনী হয়ে ওঠা সেদিনের সনাতনী হিন্দু বাঙালির বংশধর আধুনিক বাঙালির মধ্যে যদি আপনি রামমোহন বা বিদ্যাসাগর সম্পর্কে একই ঘৃণার আভাস পান, তাহলে বুঝব এই লেখার উদ্দেশ্য সফল।]
১৮৫৭ সালে সিপাহী বিদ্রোহের পর কোম্পানির হাত থেকে ক্ষমতা চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে। ইংরিজী শিক্ষায় শিক্ষিত বাঙালি মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক তখন বিভিন্ন সরকারি অফিসে চাকরি করে। তার পরিচিতি "বাবু" হিসেবে। সে সাহেবের অনুগত কর্মচারী (যে আনুগত্য খানিকটা ১৮৫৭ সালের ব্যর্থ বিদ্রোহের ফসল), তাকে ছাড়া সাহেবের একটা দিনও চলে না। মোটামুটি এই শতকের মাঝামাঝি সময়ে সরকারি দপ্তর আর সওদাগরি অফিসে চালু হয় ঘড়ির ব্যবহার — ইউরোপীয় স্টাইলে ক্লক টাইম। বাবুর চাকরি বাঁধা পড়ে ঘড়ির নিয়মানুবর্তিতায় — দশটা পাঁচটার অফিসের বাঁধনে — বাঙালি বাবুর কাছে যেটা ছিল পুরোপুরি অচেনা একটা ব্যবস্থা। দুই দশকের মধ্যেই সাহেবের অনুগত কর্মচারীর কাছে রোজকার এই সাবর্ডিনেশন আর ঘন্টা মিনিটের চাপ ক্রমশ: দাসত্বের মত মনে হতে থাকে। অফিসের বাইরে বাড়িই তার নিরাপদ স্যাংচুয়ারি হয়ে ওঠে, যেখানে সে তার একান্ত ব্যক্তিগত কোলাহলহীন জগতের অভ্যন্তরে নীরবে ধার্মিক চিন্তাভাবনার সময় পায় — মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে যা তার বাইরের জীবনের ফাঁপা দাসত্বের একদম উলটো পিঠ। দাসত্বের চাপ মধ্যবিত্ত ভদ্রলোকের কাছে বোঝা হয়ে উঠতে শুরু করে।
এই সময়েই আসে ভূমিকম্প (অবশ্যই প্রতীকী অর্থে)। যে জমি ছিল অভিজাত জমিদার শ্রেণীর মূলধন বা আশ্রয়, সেই জমিই ভয়ানকভাবে কেঁপে ওঠে তাদের পায়ের নীচে — ১৮৭৩ সালে পাবনার রায়তি দাঙ্গার সময়ে। প্রধাণতঃ মুসলমান এবং নীচু জাতের হিন্দু রায়তরা বাড়তে থাকা খাজনা আর জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগঠিতভাবে রুখে দাঁড়ায়। জমিদার আর প্রজাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কটা পিতা ও সন্তানের মত — বহু বছর ধরে সযত্নে লালিত এই কল্পকথা রাতারাতি মুখ থুবড়ে পড়ে এই রায়তি বিদ্রোহে। তবে এই বিদ্রোহের ধাক্কার চেয়েও ভদ্রলোক জমিদারদের কাছে বড় ধাক্কা ছিল কলোনিয়াল শাসকের প্রতিক্রিয়া — অনুগত জমিদারদের প্রতি নয়, বরং রায়তদের প্রতি সরকারি সহানুভূতি, খাজনার অবস্থা যাচাই করার উদ্দেশ্যে রেন্ট কমিশন তৈরী আর প্রজার অধিকার সংক্রান্ত আলোচনার শুরু। হিন্দু বাঙালি ভদ্রলোক নিজেদের দুই দিক থেকে আক্রান্ত মনে করতে শুরু করে — একদিকে তাদের এতদিনের প্রজাদের ঔদ্ধত্য বা ইনসাবর্ডিনেশন, অন্যদিকে সরকার তরফ থেকে তাদের আনুগত্যের পুরস্কার হিসেবে পাওয়া বিশ্বাসঘাতকতা। সেই সময়ের বাংলা কাগজে জমিদারি সম্পত্তির ক্ষতির পাশাপাশি ফলাও করে "নীচুজাতের অপমান”-এর কথাও ছাপা হতে থাকে। লেখা হয় "নারীর অবমাননা" বা "সতীত্ব লঙ্ঘন”-এর কথাও। জমিদারি অত্যাচারের বিরুদ্ধে অপবিত্র ছোটজাত আর মুসলমানদের রুখে দাঁড়ানোর এই ঘটনা অভিজাত মধ্যবিত্ত নির্বিশেষে বাঙালি ভদ্রলোক সমাজে হয়ে দাঁড়ায় কালচারাল এবং সেক্সুয়াল পলিউশন — হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্তঃপুরের ক্ষেত্রে যেটা চরমতম অপমান।
শেষ ধাক্কাটা আসে ১৮৮৩ সালে — ইলবার্ট বিলের সময়ে। ব্রিটিশ সরকার একটা আইন আনার চেষ্টা করে যাতে বলা হয় ভারতীয় (অর্থাৎ কালো চামড়ার নেটিভ) ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে ইউরোপীয়দের বিচার হতে পারবে। খুবই সাধারণ একটা মানবিক আইন — বিচারব্যবস্থায় একটা সমতা আনার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এই প্রস্তাবিত আইনের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া ব্রিটিশ রাজের চরম জাতিবিদ্বেষকে একদম উলঙ্গ করে দেয় সকলের চোখের সামনে। সরকার এই জাতিবিদ্বেষের সামনে আত্মসমর্পণ করে এবং প্রমাণ করে দেয় যে পশ্চিমী শিক্ষা বা আনুগত্য কোন কিছুর বিনিময়েই কালো চামড়ার ভদ্রলোক "বাবু" ব্রিটিশদের সমকক্ষ হয়ে উঠতে পারবে না; সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে এই শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক শ্রেণী চিরকালই সাদা চামড়ার সাহেবের পায়ের নীচেই থাকবে, অফিস কাছারিতে দশটা পাঁচটার দাসত্ব করবে — ব্লাডি নেটিভ হিসেবে।
১৭৯৩ থেকে ১৮৯০ — এই একশো বছরের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, কৃষি এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে একের পর এক ধাক্কা খাওয়ার পর একমাত্র একটাই জায়গা হিন্দু ভদ্রলোক বাঙালির কর্তৃত্বের আওতায় থেকে গিয়েছিল — আর সেটা হল অন্দরমহলের নারীশরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ। শিশু বয়সে বিয়ে, এবং দশ বছর বয়সে রজঃস্বলা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই গর্ভাধানের জন্যে জোর করে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেওয়ার আচারের ফলে একাধিক ১০-১২-১৪ বছরের বাচ্চা মেয়ে জবরদস্তি শারীরিক সঙ্গমের ফলে মারা যায়। আদালতে বেশ কিছু মামলা ওঠার পরে ব্রিটিশ সরকারের টনক নড়ে, এবং ১৮৯১ সালে স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কারণ দেখিয়ে তারা এজ অফ কনসেন্ট বিলের প্রস্তাব আনে বিয়ের বয়স দশ থেকে বাড়িয়ে বারো করার জন্যে। প্রস্তাব আসার সঙ্গে সঙ্গেই সর্বগ্রাসী প্রতিরোধ শুরু হয় সমাজের চতুর্দিক থেকে। হিন্দু বাঙালি মনে করে মেয়েদের বিয়ের বয়স দুই বছর বাড়ানোর এই প্রস্তাব মোটেও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত কারণে নয়, বরং হিন্দু আচারব্যবস্থার ওপর চরম আঘাত যার ফলে মেয়েদের গর্ভ কলুষিত হবে, বংশধারা দূষিত হবে, এবং সবচেয়ে বড় কথা, এর ফলে পতন হবে বাঙালি হিন্দু ভদ্রলোকের শেষ দুর্গ, অর্থাৎ নারীশরীরকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতার। নারীশরীরকে নিয়ন্ত্রণের এই অধিকার রক্ষাই হয়ে ওঠে চারপাশ থেকে আক্রান্ত হিন্দুধর্মকে রক্ষা করার সমান। একটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল — এই এজ অফ কনসেন্ট বিলের সময়ে, না ব্রিটিশ সরকার, না বিলের সমর্থক বা বিরোধী বাঙালি জনগণ — কেউই এই বিল আসলে যাদের জন্যে আনা, সেই মেয়েদের সম্মতি নেওয়ার কথা ভাবেনি।
[হিন্দু খতরে মে হ্যায় – এনিওয়ান?]
রেনেসাঁর আলোকপ্রাপ্ত বাঙালির প্রগতিশীল রিফর্মার থেকে হিন্দু রিভাইভালিস্ট হয়ে ওঠার গতিপথের ধারণা সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় যদি আমরা বঙ্কিমের লেখা খুঁটিয়ে দেখি। বঙ্কিমের পরিবর্তনও ঊনবিংশ শতকের এই ক্রাইসিসগুলোর মধ্যে দিয়েই এসেছিল। লেখকজীবনের একদম শুরুর দিকে বঙ্কিম ছিলেন ক্ষুরধার সমালোচক — বিশেষ করে নানান পিতৃতান্ত্রিক এবং ব্রাহ্মণ্যবাদী ট্র্যাডিশনের। যেমন ধরুন "সাম্য" (যদিও পরের দিকে বঙ্কিম নিজে এই রচনাকে প্র্যাক্টিকালি অস্বীকার করেন) রচনায় বঙ্কিম এই ব্রাহ্মণ্যবাদী এবং পিতৃতান্ত্রিক আচারব্যবস্থাকে কলোনিয়াল শাসনের চেয়েও খারাপ বলে অভিহিত করেছিলেন। কপালকুণ্ডলায় নায়িকার মুখে শোনা যায় — “যদি জানিতাম যে, স্ত্রীলোকের বিবাহ দাসীত্ব, তবে কদাপি বিবাহ করিতাম না"। বা "বিষবৃক্ষ" উপন্যাসে পুরুষের বহুগামিতা এবং কামনা, ব্রাহ্মণ্যবাদের নানান আচারের মধ্যে মেয়েদের দমবন্ধ করা অবস্থার সরাসরি সমালোচনা পাওয়া যায়। এই পিরিয়ডে বঙ্কিম পশ্চিমী ধ্যানধারণার আদলেই সামাজিক গোঁড়ামোকে আঘাত করেছিলেন। ব্যঙ্গ করেছিলেন ইংরিজী চালচলনের নকলকারী বাবুদেরও। আবার, বঙ্কিমের ধারণা যে খানিক ফ্র্যাকচার্ড ছিল, তারও প্রমাণ পাওয়া যায় ১৮৭৫ সালে লেখা কমলাকান্তে যেখানে তিনি স্বামীর সঙ্গে সহমরণে যাওয়া নারীর মধ্যে স্ত্রীলোকের আসল রূপ কল্পনা করেন —
"যখন আমি উৎকৃষ্টা, যোষিদ্বর্গের বিষয়ে চিন্তা করিতে যাই, তখনই আমার মানস—পটে, সহমরণপ্রবৃত্তা সতীর মূর্ত্তি জাগিয়া উঠে। আমি দেখিতে পাই যে, চিতা জ্বলিতেছে, পতির পদ সাদরে বক্ষে ধারণ করিয়া প্রজ্বলিত হুতাশন মধ্যে সাধ্বী বসিয়া আছেন। আস্তে আস্তে বহ্নি বিস্ত‌ৃত হইতেছে, এক অঙ্গ দগ্ধ করিয়া অপর অঙ্গে প্রবেশ করিতেছে। অগ্নিদগ্ধা স্বামিচরণ ধ্যান করিতেছেন, মধ্যে মধ্যে হরিবোল বলিতে বলিতেছেন বা সঙ্কেত করিতেছেন। দৈহিক ক্লেশ-পরিচায়ক লক্ষণ নাই। আনন প্রফুল্ল। ক্রমে পাবকশিখা বাড়িল, জীবন ছাড়িল, কায়া ভস্মীভূত হইল। ধন্য সহিষ্ণুতা! ধন্য প্রীতি! ধন্য ভক্তি!" [স্ত্রীলোকের রূপ, কমলাকান্ত]
কিন্তু ওই পাবনা রায়ট, ইলবার্ট বিল এবং এজ অফ কনসেন্ট বিল নিয়ে কূটকচালির সময় থেকেই বঙ্কিমের বদলের ট্র্যাজেক্টরিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে রেভারেন্ড হেস্টির সঙ্গে ১৮৮২ সালের একটা বিতর্কের পর থেকেই। রেভারেন্ড হেস্টি (স্কটিশ থিওলজিয়ান এবং স্কটিশ চার্চ কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল) সনাতনী হিন্দু ধ্যানধারণাকে আক্রমণ করেছিলেন ব্যাকওয়ার্ড বলে (কলকাতার অ্যালবার্ট হলে ক্রিশ্চানিটি অ্যান্ড কমন সেন্স অফ ম্যানকাইন্ড বলে একটা পাবলিক লেকচার সিরিজে) — মূলতঃ মূর্তিপূজা, এথিকস (যেখানে কৃষ্ণের লীলাপ্রসঙ্গ উঠে আসে) এবং র্যাশনালিটি নিয়ে। বঙ্কিম সম্পর্কে অভিযোগ করেন যে তিনি পাশ্চাত্য চিন্তাভাবনা থেকে সিলেক্টিভলি কিছু কিছু জিনিস বেছে নিয়েছেন, এবং হিপোক্রিটের মত হিন্দুধর্মকে ডিফেন্ড করেছেন। ঊনবিংশ শতকের শেষের দিকে বাংলার শিক্ষিত ভদ্রলোক সমাজের সার্বিক অসহায়তার অনুভূতি থেকেই বঙ্কিমের মধ্যেও বদল আসতে শুরু করে। হেস্টির আক্রমণের জবাবে বঙ্কিম বঙ্গদর্শনে একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, এবং এই বিতর্কের পর থেকেই হিন্দু রিভাইভালিজমের ছাপ দেখতে পাওয়া যায় বঙ্কিমের পরবর্তী রচনাগুলোতে — যেমন কৃষ্ণচরিত্র, ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি।
বঙ্কিম তাঁর আগের প্রগতিশীল রচনাগুলোকে অস্বীকার করতে শুরু করেন (সাম্য ফর এগজাম্পল), পাশাপাশি গড়তে শুরু করেন জাতীয়তাবাদের একটা নতুন ছবি, যেখানে দেশপ্রেম একই সঙ্গে মিলিট্যান্ট এবং ভক্তিমূলক।
জন্ম হয় দেশমাতৃকার আইডিয়ার — ১৮৮২ সালে আনন্দমঠের মধ্যে দিয়ে। কলমের আঁচড়ে বঙ্কিম সংঘাতের কেন্দ্রে থাকা এই পবিত্র, বিপন্ন, আদর্শ হিন্দু নারীসত্ত্বাকে রূপান্তরিত করলেন এক দেবী চরিত্রে। আঁকলেন পূর্বের গৌরবের ছবি (মা যাহা ছিলেন — সুজলা সুফলা শস্যশ্যামলা), ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষের আবহে আঁকলেন কালরূপিণী এক নারীকে (মা যাহা হইয়াছেন — অত্যাচারী শাসকের হাতে দেশ যখন শোষিত, দরিদ্র, এবং মৃতপ্রায়), এবং কোন এক ভবিষ্যতে বিদেশী শাসনের অবসানের পর বাংলাপ্রদেশের আইকন — দেবী দুর্গা (মা যাহা হইবেন — দশপ্রহরণধারিণী)। এই মাতৃরূপিণীর দেহ হয়ে উঠল গোটা জাতির মানচিত্র — পবিত্র এবং অলঙ্ঘনীয়, যে কোন কলোনিয়াল আইন বা জমির খাজনার আন্দোলন থেকে বহু দূরের এক সত্ত্বা।
এই মাতৃমূর্তি বা ডিভাইন মাদার, বাঙালি ভদ্রলোকের এতদিনের অপমানের জবাব দেওয়ার এক রাস্তা খুলে দিল। এইখানে একটা জিনিস ক্ল্যারিফাই করে দেওয়া দরকার — এই বাঙালি ভদ্রলোক শ্রেণীকে একটা মনোলিথিক ব্লক হিসেবে দেখলে ভুল করা হবে। এই ভদ্রলোক শ্রেণীর মধ্যে স্তরবিন্যাস ছিল। একদম ওপরে ছিল অভিজাত ল্যান্ডেড ক্লাস, যাদের মূল উৎকন্ঠা ছিল পাবনা রায়তি বিদ্রোহ আর রেন্ট অ্যাক্টকে ঘিরে — মুসলমান এবং নীচু জাতের বিদ্রোহ ছিল তাদের অথরিটির প্রতি চ্যালেঞ্জ, এবং কলোনিয়াল সরকারের প্রতি ক্ষোভ তৈরী হয় এইখান থেকেই। এই অভিজাত শ্রেণীর নীচের স্তরে ছিল শিক্ষিত মধ্যবিত্ত — প্রধাণত: চাকরিজীবী — যারা সেই মুহূর্তে ক্রমাগত বর্ণবিদ্বেষ, পৌরুষত্ব নিয়ে উপহাস আর ঘন্টা-মিনিটের জাঁতাকলে আটকে পড়েছিল। দেশমাতৃকার মূর্তি ওপর থেকে নীচ অবধি পুরো ভদ্রলোক শ্রেণীর কাছেই অ্যাপীল করে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে, আদালতে, বা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুরুষত্বহীন ভদ্রলোক নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল এই দেশমাতৃকার একনিষ্ঠ সন্তান এবং রক্ষক হিসেবে। তার রাজনৈতিক অক্ষমতা বদলে গেল পবিত্র সামরিক কর্তব্যে। তার আহত পৌরুষের নিরাময় হল বীরের আত্মত্যাগের প্রতিশ্রুতিতে। নানান জটিল সামাজিক সংস্কার আর বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের কাছে পিটিশন দিয়ে আপোস করার বদলে জাতীয়তাবাদ হয়ে উঠল আবেগ আর ভক্তির মিশেলের পবিত্র ধর্মযুদ্ধ।
এই ছিল দেশমাতৃকার জন্মের ঐতিহাসিক পটভূমি — অনেকদিন ধরে চলে আসা ক্রাইসিসের মধ্যে থেকে তৈরী হওয়া বিপন্ন মাতৃমূর্তি, যাকে যে কোন মূল্যে রক্ষা করা মায়ের যে কোন সন্তানের কর্তব্য।
এই অবধি কোন গোল নেই, সাধারণভাবে গোটা ব্যাকগ্রাউন্ডটা খানিক জটিল হলেও। শুধু প্রশ্ন থেকে যায় বঙ্কিমের এই দেশমাতৃকা কবে এবং কীভাবে ভারতমাতা হয়ে উঠলেন?
বঙ্কিমের মূল উপন্যাসের দিকে যদি তাকাই, দেখব আনন্দমঠে সন্তানদের মূলশত্রু মুসলমান নবাব এবং অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকের দুর্নীতিগ্রস্ত ক্ষয়িষ্ণু মুঘল প্রশাসন। আনন্দমঠের শেষাংশে ব্রিটিশ শত্রু তো নয়ই, বরং শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়ের শাসনের প্রবর্তক — সত্যানন্দ ও চিকিৎসক/মহাপুরুষের মধ্যে বাক্যালাপ মনে করুন...তাহলে, স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে যে এই ব্রিটিশপন্থী, মুসলিমবিরোধী আখ্যান কীভাবে উপনিবেশ—বিরোধী জাতীয়তাবাদের বাইবেল হয়ে উঠল?
আনন্দমঠ, দেশমাতৃকা আর বন্দেমাতরমের এই ট্রান্সফর্মেশন ঘটেছিল জাতীয়তাবাদের স্ট্র্যাটেজিক কারণে। বঙ্কিম নিজে ১৮৮০-র দশকে বসে ১৭৭০ সালের সন্ন্যাসী বিদ্রোহের পটভূমিতে আনন্দমঠ লিখেছিলেন। তাঁর প্রজন্মের কাছে ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে একটা কমপ্লিকেটেড ও খানিক মোহভঙ্গের দৃষ্টিভঙ্গি থাকলেও আশাবাদ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। সেই প্রজন্ম ব্রিটিশ শাসনকে হিন্দু অনৈক্য এবং দুর্বলতার সাজা হিসেবে দেখেছিল, আর ব্রিটিশ শাসককে দেখেছিল আধুনিকতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও যুক্তিবাদের শিক্ষা দেওয়া স্কুলমাস্টার হিসেবে — যাদের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ভারতীয় হিন্দুরা একদিন স্বশাসনের যোগ্য হয়ে উঠতে পারে।
“সনাতনধর্মের পুনরুদ্ধার করিতে গেলে, আগে বহির্বিষয়ক জ্ঞানের প্রচার করা আবশ্যক। এখন এদেশে বহির্বিষয়ক জ্ঞান নাই — শিখায় এমন লোক নাই; আমরা লোকশিক্ষায় পটু নহি। অতএব ভিন্ন দেশ হইতে বহির্বিষয়ক জ্ঞান আনিতে হইবে। ইংরেজ বহির্বিষয়ক জ্ঞানে অতি সুপণ্ডিত, লোকশিক্ষায় বড় সুপটু। সুতরাং ইংরেজকে রাজা করিব। ইংরেজী শিক্ষায় এদেশীয় লোক বহিস্তত্ত্বে সুশিক্ষিত হইয়া অন্তস্তত্ত্ব বুঝিতে সক্ষম হইবে। তখন সনাতনধর্ম প্রচারের আর বিঘ্ন থাকিবে না। তখন প্রকৃত ধর্ম আপনা আপনি পুনরুদ্দীপ্ত হইবে। যত দিন না তা হয়, যত দিন না হিন্দু আবার জ্ঞানবান গুণবান আর বলবান হয়, তত দিন ইংরেজরাজ্য অক্ষয় থাকিবে। ইংরেজরাজ্যে প্রজা সুখী হইবে — নিষ্কণ্টকে ধর্মাচরণ করিবে। অতএব হে বুদ্ধিমান — ইংরেজের সঙ্গে যুদ্ধে নিরস্ত হইয়া আমার অনুসরণ কর।" [আনন্দমঠ]
বঙ্কিমের এক প্রজন্ম পরে, ১৯০৫ সালে স্বদেশী আন্দোলনের সময়, রাজনৈতিক আবহাওয়া ক্রমশঃ আরও উগ্র হয়ে ওঠে। দুর্ভিক্ষ, জাতিবিদ্বেষ, আর বঙ্গভঙ্গের পরে সাধারণ মানুষের ব্রিটিশ শাসন সম্পর্কে হতাশ হতে শুরু করে। অরবিন্দ ঘোষের মত বিপ্লবীরা মনে করতে শুরু করেন যে তাঁদের গণআন্দোলনের জন্যে প্রয়োজন একটা শক্তিশালী প্রতীকের। এবং শুধুমাত্র স্ট্র্যাটেজিক কারণেই তাঁরা আনন্দমঠের একটা সিলেক্টিভ ন্যারেটিভ বেছে নেন, যেখানে উপন্যাসের শেষে ব্রিটিশপন্থী অংশটুকু বাদ দেওয়া হয়। গল্প শেষ হয় যুদ্ধের ধ্বনি দিয়ে, ব্রিটিশ শাসনকে বৈধতা দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে নয়। একটা কথা মাথায় রাখবেন — আনন্দমঠ লেখা হয়েছিল তৎকালীন বাংলা প্রদেশের (মানে সুবাহ্‌ বাংলা — বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা মিলিয়ে যে প্রদেশ) পটভূমিতে। "সপ্তকোটিকন্ঠ কলকলনিনাদকরালে, দ্বিসপ্তকোটি ভূজৈঃধৃত খরকরবালে" — এখানে সপ্তকোটি অর্থাৎ সাত কোটি সেই সময়ের সেন্সাস অনুযায়ী বাংলা প্রদেশের জনসংখ্যা। এবং ইন্টারেস্টিংলি, সেই জনতার মধ্যে হিন্দু এবং মুসলমান, সকলেই ছিল। জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রয়োজনে বাংলায় অরবিন্দ, মহারাষ্ট্রে তিলক, আর তামিল প্রদেশে সুব্রমনিয়া ভারতীর হাত ধরে বঙ্কিমের দেশমাতৃকা হয়ে উঠলেন ভারতমাতা, ভারতীয় উপমহাদেশের ম্যাপ হয়ে উঠল ভারতমাতার দেহ, বাংলার সাত কোটি সন্তানের বদলে যার অ্যাপীল ছড়িয় পড়ল সমস্ত দেশবাসীর কাছে, শত্রু আর কোন বিশেষ ধর্মালম্বী রইল না, বরং হয়ে উঠল যে কোন বিদেশী শাসক। মূল উপন্যাস থেকে বন্দেমাতরমকে বের করে আনা হল জাতীয়তাবাদী স্লোগান হিসেবে।
কিন্তু কিছু সমস্যা থেকেই গেল। বন্দেমাতরমের দেবী হিন্দু দেবী, তার ভাষা সংস্কৃত ও বাংলার মিশেল। কিন্তু বাস্তবে অনেক মুসলমান ধর্মাবলম্বীর কাছে এই প্রকট হিন্দু ইমেজকে সরাসরি গ্রহণ করা একটু সমস্যার হয়ে পড়েছিল ধর্মীয় কারণে, এবং সেটা অযৌক্তিকও নয়। মাথা ঠাণ্ডা করে ভেবে দেখলে এটা আপনারও মনে হবে — যদি আপনাকে এলিয়েন কোন ধর্মীয় স্লোগান দিয়ে কোন জাতীয় অনুষ্ঠানে যেতে হয়। নাস্তিকদের তো যে কোন ধর্মীয় চিহ্নেই অস্বস্তি হবে। তিরিশের দশকে এই বিষয়টা বড়সড় চর্চায় আসে। সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের পরামর্শে বন্দেমাতরমের প্রথম দুটো স্তবককে আলাদা করে আনার পরেও কিছু ক্ষেত্রে অস্বস্তি থেকেই গিয়েছিল। যেমন, মুসলিম লীগ এই গানের দিকে আঙুল তুলে বলত কংগ্রেসের ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে হিপোক্রেসি, ভুয়ো। উল্টোদিকে হিন্দু দক্ষিণপন্থী জাতীয়তাবাদের কাছে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ হয়ে দাঁড়ায় ভারতমাতার পবিত্র শরীর থেকে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আলাদা করে দেওয়ার সামিল। হিন্দু মহাসভার পোস্টারে বা প্যামফ্লেটে রক্তাক্ত ছিন্ন অঙ্গের ভারতমাতার ছবি ছাপা হত সেই সময়ে...
আমাদের দুর্ভাগ্য, যে এইখান থেকেই শুরু হয়েছিল ভারতমাতার আইডিয়ার ওয়েপনাইজেশন। ঔপনিবেশিক অপমানের জবাব দেওয়ার প্রতীক হিন্দু জাতীয়তাবাদের হাতে হয়ে দাঁড়িয়েছিল সংখ্যাগুরুর অস্ত্র। আজও তার ব্যতিক্রম হয় না, উলটে এই ধারণা আরো পোক্ত হয়েছে বিভিন্ন কারণে। সঙ্ঘ পরিবারের ভারতমাতার প্রতি শ্রদ্ধা বা বন্দেমাতরমের প্রতি আজকের পীরিত আসলে তাদের নিজেদের প্রতিচ্ছবি হিসেবে ভারতকে দেখার উদাহরণ — যেখানে ভারত দেশটাকে ভালোবাসা মানে ভারতমাতার মূর্তির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো; দেশের মানুষ, নদী, বনজঙ্গল, পাহাড়, পশু পাখি সেখানে গৌণ; এখানে দ্বিধা মানে অবাধ্যতা, দেশদ্রোহ। নিজস্ব পলিটিকাল এজেন্ডার রূপায়ণের উদ্দেশ্যেই সঙ্ঘ পরিবার রামজন্মভূমি আন্দোলনকে রামের পবিত্র ভূখণ্ডকে মুক্ত করার ধর্মযুদ্ধ হিসেবে দেখিয়েছিল। বন্দেমাতরম এদের কাছে দেশপ্রেমের নামে প্রশ্নহীন ভক্তিমূলক আনুগত্যের প্রতীক...
=========================================
ভারতমাতার জন্মের গল্প এইটুকুই। প্রাচীন পুরাণকথা থেকে তাঁর জন্ম হয়নি। বরং, বাস্তবে শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটের আগুনে তাঁকে তৈরী করা হয়েছিল। তাঁর সশস্ত্র মূর্তি দাঁড়িয়ে রয়েছে ব্যাঙ্ক ফেলিওর, রেন্ট স্ট্রাইক, জাতিবিদ্বেষ, নারীর অধিকার-বাল্যবিবাহ-বৈধব্য ইত্যাদি নিয়ে আদালত এবং সেই সময়ের সমাজমাধ্যমে তির্যক বিতর্কের ইতিহাসের ওপর। তিনি ঊনবিংশ শতকের কঠিন বাস্তবের মাটিতে হেরে যাওয়া হিন্দু ভদ্রলোকের শেষ আশ্রয় — এক কল্পিত অলঙ্ঘনীয় দেবীমন্দিরের প্রতিমা, উঠতি অ্যান্টিকলোনিয়াল "ইম্যাজিনড কমিউনিটির" ভিত্তি, যাঁকে ঘিরে এক বিচিত্র ভূখণ্ডের নানান ধরণের বৈচিত্রসম্পন্ন অসংখ্য মানুষ এক হয়ে দাঁড়িয়েছিল কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে। আবার একই সঙ্গে তাঁর হিন্দু রূপের জন্যেই অহিন্দুদের সামনে অলঙ্ঘনীয় সীমানা তৈরী হয়েছিল একটা সময়ে। যাদের বিশ্বাস বা ওয়ার্ল্ডভিউ কোন দেবদেবীর প্রতি শ্রদ্ধাপ্রদর্শনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেনি, তাদের শুরু থেকেই "অপর" করে রাখা হয়েছে।
ভারতমাতার লিগ্যাসি কাজেই অস্পষ্ট। যে প্রতীক কলোনিয়াল শাসকের বিরুদ্ধে ছিল শক্তিশালী অস্ত্র — একটা, সাহস আর আইডেন্টিটির উৎস — সেই একই প্রতীকের ডিএনএর মধ্যেই লুকিয়ে থেকেছে সংখ্যাগুরুর গা-জোয়ারি। স্বাধীনতার পর থেকেই এই লুকিয়ে থাকা শক্তিকে খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলেছে সঙ্ঘপরিবার। "মা যা হইবেন" — দশপ্রহরণধারিণীর পরিবর্তে "মা যা হইয়াছেন" — দেশপ্রেমের এক লিটমাস টেস্ট — যার মাধ্যমে বহিরাগত "অপর"-কে চিহ্নিত করা যায়। ভারতমাতার গল্প তাই যতটা না পবিত্র দেশপ্রেমের কাহিনী, তার চেয়ে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদের ধারালো দ্বিমুখী তরোয়াল সম্পর্কে শিক্ষা — যে প্রতীক স্বাধীনতার লড়াইয়ে লক্ষ মানুষের স্লোগান হতে পারে, লক্ষ মানুষকে এক করতে পারে, সেই একই প্রতীক নতুন ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে এক দেশ — এক ধর্ম — এক ভাষা — এক পোশাক — এক খাদ্যাভ্যাসের নামে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া ইউনিফর্মিটির হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে, উলটে সামাজিক বিভেদকে তীব্র করার অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
আধুনিক নেশন-স্টেট নিজেদের লেজিটিমাইজ করার জন্যে যে ধরণের কাহিনী ব্যবহার করে, ভারতমাতা সেই সমস্ত কাহিনীর মধ্যে একইসাথে লুকিয়ে থাকা ঐক্য এবং বিভাজনের ক্ষমতার টেস্টামেন্ট।
রেফারেন্স (ইন নো পার্টিকুলার অর্ডার):
(১) Hindu Wife, Hindu Nation: Community, Religion, and Cultural Nationalism, Tanika Sarkar, Permanent Black
(২) Rebels, Wives, Saints: Designing Selves and Nations in Colonial Times, Tanika Sarkar, Permanent Black
(৩) The Truths and Lies of Nationalism as Narrated by Charvak, Partha Chatterjee, State University of New York
(৪) The Unhappy Consciousness: Bankimchandra Chattopadhyay and the Formation of Nationalist Discourse in India, Sudipta Kaviraj, OUP India
(৫) The Swadeshi Movement in Bengal, Sumit Sarkar, People’s Publishing House
(৬) ‘Kaliyuga’, ‘Chakri’ and ‘Bhakti’: Ramakrishna and His Times, Sumit Sarkar, Economic and Political Weekly, Vol 27, No 29, Jul 18 1992
(৭) Colonial masculinity: The 'manly Englishman' and the 'effeminate Bengali' in the late nineteenth century, Mrinalini Sinha, Manchester University Press
(৮) Imagined Communities: Reflections on the Origin and Spread of Nationalism, Benedict Anderson, Verso

বৃহস্পতিবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৫

তাজ মহল ও একটি কিশোর ~ শৈবাল বিষ্ণু

যমুনার কালো জলে হালকা হাওয়ার পরশ, সামান্য ঢেউ, পাখিরা তাদের বাড়ি ফিরে গেছে, সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলে উঠেছে ঘরে ঘরে। বারো বছরের এক কিশোর তখনও বিভোর হয়ে আছে সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম শিল্পকর্ম সহ এক আশ্চর্য্য সৃষ্টির সামনে। বিকেলে প্রথম দর্শনে তেমন আপ্লুত না হলেও, চারিপাশ ফাঁকা হয়ে আসার পরে, পুরো পরিবেশটা যেন গ্রাস করে নিল, আচ্ছন্ন করলো অস্তিত্ব। কিশোর কোনোভাবে একা হয়ে গেছিল। তার সাথের মানুষজন একটু অন্য দিকে সবাই। 

বেটা আপ কাহাঁসে আয়ে হো? সম্বিত ফিরল পাশে বসা সাদা দাড়িওয়ালা অতি বৃদ্ধ মানুষটির কথায়। বললেন, উনি এখানেই থাকেন, উনি কোনোভাবে মুঘলদেরই বংশধর। ফুল ধুপ ধুনো দেন, ওনাদের রীতি নীতি অনুযায়ী ধর্মীয় কাজগুলো করেন, সরকার থেকে ভাতা পান। 

বললেন আমি কি আসল সমাধি দেখতে ইচ্ছুক? অবশ্যই! আমি চললাম ওনার সাথে। জানতামও না যে যে সমাধি দেখলাম সেই দুটো আসল নয়, আসল গুলো আরো নিচে। সবাই যে সমাধি দেখে, সেই দুটো সমাধিই নয়।

তালা খুলে খুব সরু একটা সিঁড়ি দিয়ে নিচে নিয়ে গেলেন। উনি দেখালেন। আলো দিলেন। চোখ বন্ধ করে কিছু একটা বিড়বিড় করে বললেন। মমতাজ আর শাহ জাহান শুয়ে আছেন সামনে।

বললেন এবারে ফিরে চল বেটা। আর ভুলেও একবারও পিছনে তাকাবেনা। সোজা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে বাইরের চত্বরে ফাঁকা আকাশের নিচে চলে যাও। ফিরে তাকিও না। তাজ মহলের সব দরজা বন্ধ হবে এবারে, এরপর এক মুহুর্ত থাকলেও আটকে যাবে।

আমিও কিছু না ভেবে উঠে এলাম। বাবা মা কাকু কাকিমারা আমাকে খুঁজছিল। আমাকে দেখে নিশ্চিন্ত হলো। সেই মুহূর্তে ফিরে তাকালাম একবার। 

পুরো চত্বর ফাঁকা। আমরা গুটি কয়েক ট্যুরিস্ট, পনেরো ষোলজন খুউব বেশী হলে। অতি বৃদ্ধ নেই।

চার পাঁচজন সিকিউরিটি এসে সব দরজা শিকল তুলে দিয়ে আমাদের বেরোতে বললো, কারণ প্রায় আটটা বাজে। তাজ মহল বন্ধ হবে।

আবার ফিরে তাকালাম। নাহ্! কেউ কোত্থাও নেই।

ওই সিকিউরিটির লোকজন কে জিগালাম, আচ্ছা এক বয়স্ক সাদা দাড়িওয়ালা মানুষ, ওনারা দেখেছেন? জানেন? 

না, ওনারা জানেন না। দেখেননি কোনোদিন। আর কেউই দেখেনি। কোনোদিন।

অনেক বছর পরে সেই কিশোর খুঁজে দেখবে, সেই দিনটা ছিল ১৭ই জুন। মমতাজের মৃত্যুদিন!