শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২০

বীণা দাস ~ দিপাঞ্জন ঘোষ



আচ্ছা, আপনারা এ পাড়ায় অনেকদিন আছেন?

আমরা এসেছি নাইন্টিন এইট্টি।

ও, তাহলে আপানারা বলতে পারবেন। এখানে কি বীণা দাস বলে কেউ…

থাকতেন। স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন।

***

আজ হয়তো বীণা দাসের নাম শুনে আপনি চিনতে পারছেন না। কিন্তু আজ থেকে ৮৮ বছর আগে সবাই তাঁকে এক নামে চিনত। ১৯৩২ সালের ৬-ই ফেব্রুয়ারি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের কনভোকেশান অনুষ্ঠান চলছে। বক্তৃতা দিতে উঠে দাঁড়ালেন ইংরেজ রাজ্যপাল, স্যার স্ট্যানলি জ্যাক্সন। হঠাৎ দর্শকের আসন থেকে উঠে এলেন এক ছাত্রি - বীণা দাস। কনভোকেশানের গাউনের ভেতর থেকে বার করলেন রিভলভার। গুলি চালালেন সোজা জ্যাকসনকে লক্ষ করে। কানের পাস দিয়ে বেরিয়ে গেলো গুলি। লাফিয়ে মঞ্চ থেকে নেমে এলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হাসান সুরাওয়ার্দি। টিপে ধরলেন বীণার টুটি। ধ্বস্তাধস্তির মধ্যেও আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন বীণা। রিভলভার থেকে পর পর পাঁচটি গুলি চালালেন, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হলেন। ওইটুকু মেয়েকে ঠেকাতে সেদিন দুজন জোয়ান পুরুষমানুষের সমস্ত শারীরিক শক্তির দরকার পড়েছিল।

বীণাকে নিয়ে যাওয়া হল লালবাজার। ডাকা হল মা বাবাকে। পুলিশের তরফ থেকে বলা হল, বীণা যদি শুধু বলে দেন যে রিভলভার তাঁকে কে দিয়েছে, তাহলেই তাঁর সাজা অনেক কমিয়ে দেওয়া হবে। তবে বাবা বেনিমাধব ছিলেন গান্ধিবাদি শিক্ষক। কটকের র‍্যাভেনশ কলেজে যখন পড়াতেন, তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস। বেনিমাধবের অন্য দুই সন্তান তখন স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগ দিয়ে জেল খাটছেন। তিনি এ কাজ কোনভাবেই করতেন না। "আমার বাবা মেয়েকে বিশ্বাসঘাতক হতে শেখাননি", বলেন বীণা।

মাত্র একদিনের বিচার। ভাগ্যে জুটল ৯ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। কারাগারের অবস্থার উন্নতির জন্যে সেখানে অনশন করেন। ৭ বছরের মাথায় মুক্তি পান। ছাড়া পেয়ে যোগ দেন অসহযোগ আন্দোলনে। ভাগ্যে জোটে আরও তিন বছরের কারাবাস। স্বাধীনতার বছর, বিয়ে করেন আর এক স্বাধীনতা সংগ্রামী জ্যোতীশ ভৌমিককে। ১৯৫১ নাগাদ বাংলা সংবাদপত্র অমৃত বাজার পত্রিকার কর্মিরা আন্দোলন শুরু করেন বেতন বৃদ্ধির দাবিতে। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন বীণা। কিন্তু তাঁর দল, কংগ্রেস, মালিকের পক্ষ্য নেয়। কিন্তু তাও আন্দোলন চালিয়ে যান বীণা। পূর্ব পাকিস্তান থেকে বিতাড়িত বাঙালীদের দণ্ডকারণ্যে পাঠিয়ে দেওয়া, তারা পশ্চিমবঙ্গে ফিরতে চাইলে তাদের ওপর পুলিশি জুলুম, তারও প্রতিবাদ করেন।

কিন্তু বারংবার নিজের দলের কাছ থেকে বিশ্বাসঘাতকতা পেয়ে, হতাশ হয়ে দল ছাড়েন। স্বাধীনতা সংগ্রামীদের জন্য সরকারি পেনশন নিতে অস্বীকার করেন। আসলে বীণার আনুগত্য কোন সরকার বা দলের প্রতি ছিলনা। বীণার আনুগত্য ছিল শুধু নিজের আদর্শের প্রতি। আদর্শের ব্যাপারে আপোশ করতে তিনি নারাজ, পরিণতি যাইই হোক না কেন। স্বামীর মৃত্যুর পর, কেমন যেন গোলমাল হয়ে যেতে থাকে বীণার জীবন। ছোট হয়ে আসতে থাকে সামাজিক বৃত্য। শেষে সব ছেড়ে দিয়ে চলে যান হরিদ্বার।

২৬-এ ডিসেম্বর ১৯৮৬ সাল। হরিদ্বারের রাস্তার ধারে পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি মহিলার মৃতদেহ। খবর যায় পুলিশে। পুলিশ এসে দেখে মহিলার মৃত্যু হয়েছে কয়েকদিন আগেই। দেহে পচন ধরেছে। তুলে নিয়ে যাওয়া হয় মৃতদেহ। শনাক্ত করতে লাগে এক মাস সময়। হরিদ্বারের রাস্তার ধারে, কপর্দকশূন্য অবস্থায় যিনি মারা গেছেন, তিনি বাংলার অগ্নিকন্যা, বীণা দাস।

***
১৭/এ একডালিয়া প্লেস। এটাই ছিল বীণার শেষ ঠিকানা। সে বাড়ি আজ আর নেই। তার যায়গায় গড়ে উঠেছে হোটেল। একমাত্র পাড়ার বয়োজ্যেষ্ঠরা আজও মনে রেখেছেন বীণাকে। আপনি যদি বীণা দাসের নাম না শুনে থাকেন, তাঁর বাড়ি না দেখে থাকেন, তাতে লজ্জার কিছু নেই। আসলে আমাদের দেশে সব উৎসব, সব উন্মাদনা, কেবল ধর্ম নিয়ে। স্বাধীনতা দিবস স্রেফ একটি সরকারি ছুটির দিন। তাই জন্যেই আপনি একডালিয়ার পুজোর কথা জানেন। কিন্তু একডালিয়ার বীণা দাসের কথা জানেন না। শুনেছি বড় পুজোয় নাকি প্রায় কোটি টাকা খরচ হয়। সেই খরচের একটি ছোট অংশ বাঁচিয়ে, একটা স্মৃতিস্তম্ভ, একটা পাথরের ফলক, কিছুই কি বসানো যেত না?

কাদের জন্য আপনি আন্দোলন করেছিলেন বীণা? কাদের ওপর অভিমান করে চলে গেছিলেন? আপনার শহর, আপনার মানুষ, আপনাকে কবে ভুলে গেছে। শেষ ঠিকানা ১৭/এ, গ্রেফতারের সময় ৬৭/১ একডালিয়া প্লেস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন