অরুণাভ আর আমি সেই ছোট্টবেলার বন্ধু। এক পাড়ায় বড় হয়েছি, দুর্গাপুরে কাছাকাছি আমাদের কোয়ার্টার, তাই একই মাঠে ফুটবল খেলি, একই স্কুলে যাই, একই ক্লাসে পড়ি। দুর্গাপুরের আরই কলেজেও একসাথে পাশ করি অরুণাভ রায়, আর আমি। আমি সাথে সাথেই দুর্গাপুর ষ্টীল প্ল্যান্টে চাকরী পেয়ে ঢুকে যাই। এখন উচ্চপদস্থ অফিসার। অরুণাভ ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স থেকে এমটেক করে আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে ওই দেশেই কিছু বছর চাকরী করে এখন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। এক মেয়ে, এক ছেলে, মেয়ে বড়, ডাক্তারী পড়ছে। ছেলে ক্যালিফোরনিয়া ইউভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ওর বউও ওর ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতো। ওখানেই আলাপ। এখন চাকরী করে। ভরা সংসার। সুখী গৃহকোন।
কলেজে পড়তে ছোটবেলাতেই একটা নেশার মত শখ আমার আর অরুণাভর শুরু হয়, ফটোগ্রাফির। তখন ভাল ক্যামেরা ছিল না, রাশিয়ান জেনিত ক্যামেরা আমরা দুজন মিলে কিনেছিলাম। ছবি তুলতে আমরা কোথায় কোথায় না গেছি, ঘুরেছি। অরুণাভ এখনও যেখানেই যায়, সাথে একটা ছোট্ট মিররলেস ক্যামেরা থাকে। ক্যামেরা নিয়ে আমার নেশা কেটে গেছে। আমার ডিএসএলআর আর মিররলেস ক্যামেরা, দুটোই এখন মেয়ের জিম্মায়। ব্যাঙ্গালোরে। ছবি তোলার নেশায় আমরা সেসময়ে কত ঝুঁকিই না নিয়েছি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ছবি তুলতে গিয়ে গউর, মানে ভারতীয় বাইসনের তাড়াও খেয়েছি। তবে কে সেদিন জানত, সেই ছবি তোলার নেশাই একদিন অরুণাভর মৃত্যুর কারণ হবে।
আরুনাভরা প্রতি বছর একবার করে দেশে আসত, নিয়ম করে। তখনও ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক কাছাকাছি একটা ট্যুর করেই নিত, যতদিন ওর বউ শর্মিলা ওর বাপের বাড়ি, সেলিমপুরে থাকে।
কিন্তু এবারে অরুণাভ একাই এলো। জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি। কোন একটা কাজ নিয়ে এদিকে আসবে, জাপান আর ভারতে কিছু মিটিং আর সেমিনার আছে ওর। তার মাঝেই এক সপ্তাহের একটা ছুটি ম্যানেজ করেছে। দুজন মিলে দার্জিলিং যাওয়া হবে ঠিক হোল। সিঙ্গালীলাতে বার্ডিং করা হবে। এই সময়ে পাতা ঝরে যায়, পাখি দেখার সুবিধে। দার্জিলিং এর ছবি তোলা হবে। এই সময়ে আকাশ পরিস্কার থাকে। আর অতি অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘার বিভিন্ন রূপের ক্লোজ আপ!
দার্জিলিংয়ের ম্যাল থেকে মহাকাল মন্দিরের রাস্তা দিয়ে আরেকটু গিয়ে ডানদিকে, ভিউ পয়েন্টের একটু আগেই হোটেলটা। ঘর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে হাঁটলে ভিউ পয়েন্ট কয়েক পা।
সেদিন বেশ ঠান্ডা, পাহাড়ের ওপরে নিশ্চই বরফ পরেছে। আকাশ পুরোপুরি পরিস্কার। মেঘের লেশমাত্র নেই। সেদিন পূর্ণিমাও। গোল একটা চাঁদ উঠেছে আকাশ জুড়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘা সেই পূর্ণিমার চাঁদের মায়াবি আলোয় তার রূপের তুঙ্গে বিচরণ করছে। সে এক মায়াভরা সন্ধ্যা। অরুণাভ বললো চল রাত্তির হলে ভিউ পয়েন্টে গিয়ে ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে পূর্ণিমার আলোয় মায়াবি কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলবো। সারে এগারোটার মধ্যে দার্জিলিংয়ের বাকি আলো নাকি নিভে যাবে, অরুণাভ হোটেলের লোকাল মানুষজনের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে। ওরা অরুণাভকে সাবধান করে দিয়েছে, রাজভবনের দিক থেকে আসা কোন ঘোড়ার খুরের শব্দ পেলে যেন সেদিকে না তাকায়, উপেক্ষা করে, পারলে সরে যায়। লুকিয়ে থাকে। আর কিছু ভেঙে বলেনি তারা।
আমরা সারে এগারোটার আগেই ওখানে পৌঁছে, ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চ গুলোতে বসে বসে ফ্লাস্কে আনা কফি খাচ্ছি। অরুণাভ ওর একটা ফুল ফ্রেম ক্যামেরা, বড় লেন্স সেট করে, ট্রাইপডের ওপরে লাগিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাক করে রেখেছে। ক্যামেরার রিমোট দিয়ে মাঝে মাঝে ছবি তুলছে। অন্য ছোট মিররলেস ক্যামেরা দিয়েও ছবি তুলছে, এদিক ওদিক। এই মিররলেস ছোট ক্যামেরাটা হাতেই আছে ওর। আস্তে আস্তে সব আলো নিভে আসছে। স্পষ্ট হচ্ছে আকাশের তারারা। স্পষ্ট হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তার রূপ খুলছে। এ এক অপার্থিব দৃশ্য। এরকম আগে কোনদিন দেখিনি। আর দেখবও না।
ওদিকে প্রচন্ড ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আমি ঠিক করলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে দুটো কম্বল নিয়ে আসি। না হলে আর থাকা যাচ্ছে না। ঘড়িতে পোনে বারোটা বাজে। রুমে এসে দুটো কম্বল নিয়ে আমি বেরোচ্ছি, হটাৎ শুনি একটা গুলির শব্দ। ডান দিক থেকে। ওই ভিউ পয়েন্টের দিক থেকেই। দৌড়ে বেরোতে বেরোতেই শুনলাম ডান দিক থেকে, মানে রাজভবন, ভিউ পয়েন্টের দিক থেকে বাঁ দিকে, মানে ম্যালের দিকে একটা ঘোড়ার খুরের ঠকাঠক আওয়াজ। হোটেল থেকে বেরোতে বেরোতেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজটা মিলিয়ে গেল। দৌড়ে পৌঁছলাম। ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চে অরুণাভ শুয়ে আছে। হাতে ক্যামেরা। বুকের কাছে চাপ চাপ রক্ত। অন্ধকারে কালো রঙের লাগছে। নিশ্বাসের কোন চিহ্ন নেই।
জানুয়ারীর রাত্তিরে দার্জিলিং নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত। অনেক হৈচৈ করে ফোনাফোনি করে কিছু মানুষ পাওয়া গেল। দার্জিলিং ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালের এমার্জেন্সির ডাক্তার বললেন, ব্রট ডেথ। অরুণাভ নেই।
যেসব লোকাল মানুষজন ওখানে ছিল, তারা বললো যে ডাক্তার সাহেব গুলি করেছেন। উনি ঘুরে বেড়ান রাত্তিরের দিকে, ঘোড়ায় চড়ে। অ্যান্ডারসন সাহেব। বৃটিশ আমলের ডাক্তার। কোন কারণে নিজেই নিজেকে গুলি করে মারা যান। আজকের দিনেই। তেরোই জানুয়ারী। থাকতেন ম্যালের ওপরেই। উনিই নাকি একটা টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে এইদিনে ঘুরে বেড়ান ম্যাল থেকে এখনকার এনসিসি রোড ধরে, এখনকার রাজভবন হয়ে, ম্যাল রোড দিয়ে গোল চক্কর লাগিয়ে ফিরে আসেন। সাথে থাকে ওনার রাইফেল। অনেকেই নাকি দেখেছে।
বেশ কিছু সপ্তাহ হয়ে গেছে। মৃত্যুর কারণ বন্দুকের গুলি, সেটা জানা গেছে। কিন্তু কার গুলি, কিসের গুলি, সেই রিপোর্ট এলো অনেকদিন পরে।
পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর ডেকেছিল। যেটুকু যতটা জানি বললাম। ওনারা বললেন, এরকম নাকি হতেই পারেনা। অরুণাভকে যে বন্দুক আর কার্তুজ দিয়ে মারা হয়েছে, সেসব বহুবছর তৈরী হয়না। সেসব ভিন্টেজ। একমাত্র মিউজিয়ামে আছে। আর কোথাও নেই।
ওনারা বললেন, অরুণাভর মৃত্যু হয়েছিল যে বন্দুক দিয়ে তার নাম লী-এনফিল্ড রাইফেল। বৃটিশ আমলের। ইছাপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে তৈরী। আর পাওয়া গেছে একটা .৩০৩ কার্তুজ। পুনাতে তৈরী হয়েছিল অন্তত একশ বছর আগে। সেও বৃটিশ আমলের। ওনারা আরও বললেন, অরুণাভর মিররলেস ক্যামারাতে শেষ তিনটে ছবি রাস্তার, ভিউ পয়েন্টের পাশের রাস্তার দিকে তাক করে। ফ্রেমে সামনে রাস্তা পেছনে দেওয়ালের মত পাহাড়। আর কিছু নেই। তিনটে ছবিই তাই। তার আগের সবকটা ছবি কাঞ্চনজঙ্ঘার। ও কি তাহলে অ্যান্ডারসন সাহেবের ছবি তুলতে চেয়েছিল! ঘোড়ায় চড়ে সত্যিই সাহেবের ভুত এখনও আসে? ওই দিনের ওই সময়ে? বন্দুক আর গুলিটাও তাহলে ডাক্তার অ্যান্ডারসন সাহেবেরই?