বুধবার, ১১ মার্চ, ২০২৬

ধরনা মঞ্চ ~ ডাঃ বিষান বসু

"ধরনা মঞ্চ" আজ সন্ধের পর উঠে গেল, বঙ্গজীবনে এর তুল্য দুঃসংবাদ, সাম্প্রতিককালে, খুব একটা আসেনি।

রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের ভাষণ নিয়ে বেশী কিছু বলার থাকে না, তাই বলছি না। নইলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘিরে-ধরলে-এক-সেকেন্ডে-বারোটা-বাজিয়ে-দেওয়া নিয়ে অনেক কথা বলা যেত। কিংবা কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবেগমথিত ভাষণ। অথবা নব-আনন্দে উদ্ভাসিত প্রতিকুর-এর বক্তব্য পরিবেশন (যার ব্যাকগ্রাউন্ডে ফ্যাতাড়ুর সেই অবিস্মরণীয় লাইনগুলো সুর করে বাজালে দারুণ লাগত, ওই যে... "ছিলাম চোদু, হলাম সাধু/ হতেই দেখি আজব বাঁx/ হিপ পকেটে বুক পকেটে/ ফাকিং ফরেন নোটের তাড়া"), অথবা ঋতব্রতর কোটেশন-বহুল বক্তব্যের মাঝে মাননীয়ার "থাক থাক, এখন অতো সংস্কৃতি করতে হবে না, পয়েন্টে এসো"...  এর যেকোনোটিই আলাদা করে আস্ত একখানা লেখা দাবি করে, কিন্তু কথা বাড়িয়ে লাভ নেই।



তবে যেটা বিশেষ করে নজর টানল, তা হলো সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের বক্তব্য পরিবেশন। কবীর সুমনকে হিসেবের মধ্যে ধরছি না - উনি দলীয় সাংসদ ছিলেন, সুতরাং সাংস্কৃতিক অতীতের পাশাপাশি ওঁর দলীয় আনুগত্যের দিকটাও থাকা প্রত্যাশিত। জয় গোস্বামীও নতুন করে অবাক করেন না। কবি হিসেবে তিনি যে মহান তা নিয়ে, অন্তত আমার মনে, সন্দেহের অবকাশই নেই, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর স্থান বাঁধা - কিন্তু একনিষ্ঠ চাটুকার হিসেবে তিনি আরও বড়মাপের কিনা সে নিয়ে তর্ক করাই যায়।

এঁদের মধ্যে সত্যিই চমকে দিয়েছেন রাজ চক্রবর্তী। তিনি তৃণমূলের বিধায়ক। সুতরাং তাঁর কথা যাকে বলে ইনসাইডার-এর কথা। রাখঢাক না করে তিনি স্পষ্ট জানালেন, তৃণমূল ঠিক করে নিয়েছে যে বিজেপিকে পঞ্চাশটা আসন দেবে (একে কি আসন-সমঝোতা বলা যাবে?) - অবশ্য বিজেপি যদি লক্ষ্মী ছেলে হয়ে থাকে, তবেই। নইলে কিন্তু তাঁর দল (তৃণমূল) বিজেপি-কে তিরিশের নীচে নামিয়ে দেবে। সুতরাং... 

কিন্তু, যে যা-ই বলুক, সত্যিকারের শো-স্টপার ছিলেন আবুল বাশার। তাঁকে প্রতিভাবান বলে জানতাম, কিন্তু জিনিয়াস বলে বুঝিনি। 'সেদিন চৈত্রমাস' ছবির চিরঞ্জিৎ যেমন বলতেন - " আমি ভুল করেও ভুল করি না" - প্রায় তেমন করেই বাশার-সাহেব বললেন, 'আমি ভেবে দেখেছি, আমার খুব একটা ভুল হয় না'। মফস্বলে বসে তিনি ষোল বছর বয়সে (খুব সম্ভবত তাঁর নিজের ষোল বছর বয়স, জীবনানন্দের নয়) জীবনানন্দকে আবিষ্কার করেছিলেন (জীবনানন্দের পক্ষে এ এক মস্ত বড় সম্মান, নিঃসন্দেহে) - আর এমন করে আবিষ্কার করতে করতে অবশেষে... ইয়ে কাঁহা আ গ্যায়ে হাম... পৌঁছেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ে, যিনি কবি হিসেবে অত্যুত্তম, গীতিকার হিসেবে অতুলনীয়া... বাশার-সাহেব জানালেন, মাননীয়া যখন থাকবেন না তখন বাংলার ঘরে ঘরে তাঁর লেখা গান বাজবে!

তো আশার কথা বাশার-মশাই-ই (অনুপ্রাস অনিচ্ছাকৃত) শোনালেন। বললেন, রবীন্দ্রনাথ যেমন, জীবনানন্দ যেমন, মাইকেল যেমন - মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তেমনই - এ পৃথিবী একবারই পায় তারে, পায়নাকো আর! আর এইখানেই আকবর বাদশা, থুড়ি জয় গোস্বামী আবুল বাশার ও আমা-হেন হরিপদ কেরাণী এক হয়ে যায় - ধর্নামঞ্চের ভাষণ থেকে জানা গেল, পিতৃদেবের অনুপ্রেরণায় (অনুপ্রেরণা জোগাতে তখনও মাননীয়া জীবনে আসেননি, নিশ্চিত) জয়বাবু সাত বছর বয়স থেকে রাজনীতি-সচেতন সংবাদপত্র-পাঠক, কিন্তু তিনি মাননীয়ার মতো মুখ্যমন্ত্রী দেখেননি - বাশার-সাহেব কখনও ভুল করেন না, তিনি জানেন যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো ইয়ে (মানে, অলৌকিক প্রতিভা) আর দ্বিতীয়বার জন্মগ্রহণ করবেন না - আর, এঁদের সঙ্গে একই অনুচ্ছেদে নিজের নামোচ্চারণে একটু আত্মপ্রচার হয়ে যাচ্ছে জানি, তবু বলি, মাননীয়ার সুস্থসবল জীবন ও দীর্ঘায়ু কামনা করার পর আমিও আশায় আশায় আছি, যাতে মাননীয়ার মতো মুখ্যমন্ত্রী বাংলাকে আর না দেখতে হয় এবং এমন রাজনীতিক যেন বারবার না আসেন!

মোদ্দা কথা হলো, ষাট লক্ষ মানুষ এখনও বিচারাধীন। আজ নাকি সর্বোচ্চ আদালত সে নিয়ে যা বলার বলেছেন, কিন্তু তাতে এঁদের ভাগ্যবদলের আশা কিছু দেখতে পাইনি।

বামদলগুলো এই নাম-কাটা এসআইআর-এর বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে - কিন্তু টিভি দেখলে আপনি তার খবর পাবেন না। মাননীয়ার পুলিশ তৃণমূল-সাংসদ রাজীব কুমারকে স্যালুট ঠুকছে আর বাম-আন্দোলনকারীদের বেধড়ক ঠ্যাঙাচ্ছে, কেস দিচ্ছে - টিভি খুললে আপনি সেগুলোও জানতে পারবেন না।

জ্ঞানেশবাবু এদিক-ওদিক পুজো দিচ্ছেন, হাসিমুখে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছেন - মাঝেমধ্যে আমলা চমকাচ্ছেন। টিভিতে সেসব থাকছে।

ধর্না উঠে গেল। আজ। নইলে ধর্না-বিষয়ক যাবতীয় আপডেট দু'বেলাই টিভিতে থাকছিল।

তবে খুবই দুর্ভাগ্যজনক যে ধর্নামঞ্চে বাংলার সংস্কৃতিজগতের বিভিন্ন সেলিব্রিটি প্রতিদিন যেমন করে নিজেদের ন্যাংটো করে চলছিলেন, তা দেখতে পাওয়ার সুযোগ থেকে, আপাতত, আপামর বাঙালি বঞ্চিত হবেন।  

অবশ্য বাঙালি বলতে কে? মহুয়া মৈত্র তো বলেইছেন, তৃণমূল নামক অলীক কুনাট্যরঙ্গে সম্পূর্ণরূপে নিমজ্জিত হতে না পারলে আপনি বাঙালিই নন! সুতরাং...

সুতরাং, শূন্য ধর্নামঞ্চের বাঁশ খোলা দেখতে দেখতে গল্পের সেই পোস্টমাস্টারের মতোই ভাবুন - "পৃথিবীতে কে কাহার!"

(সঙ্গের ছবির শিল্পীর নাম বলাই বাহুল্য। ধর্নামঞ্চে উচ্চস্তরের সংস্কৃতিচর্চা চলছিল পুরো সময় জুড়েই। সেই চর্চার স্থায়ী ফসল হিসেবে এটি রইল।)

শনিবার, ৭ মার্চ, ২০২৬

কলকাতার বাগান ~ কৌশিক মজুমদার

১৬২২ সালের জুন মাস। পারস্যের সম্রাট শা আব্বাস কান্দাহারের দুর্গ মুঘলদের হাত থেকে পুনরুদ্ধার করেন। শাহজাহান তক্কে তক্কে ছিলেন। শা আব্বাসের এক মীরজাফর ছিল (কিংবা বিভীষণ)। তাঁর নাম শা আলি মরদান। শাহজাহান তাঁকে পটিয়ে পাটিয়ে বিনাযুদ্ধে আবার দুর্গের দখল নেন। এই শা আলি মরদান দারুন ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। সিভিল আর আর্কিটেকচার। এমন লোককে কাজে লাগাতেই হবে। সম্রাট তাই তাঁকে দিয়ে কাশ্মীর আর লাহোরে দু'খানি দারুণ বাগান বানালেন। শা আলি মারের নামে সেই দুই বাগানের নাম হল "শালিমার বাগ"। 

সে তো হল। কিন্তু আমাদের এই বাংলায় শা আলি এলেন কেমন করে? চলে আসি দুশো বছর পর। কলকাতায় ইংরেজরা করেকম্মে খাচ্চে, কর্নেল রবার্ট কিড নিজের গ্যাঁটের পয়সা খরচা করে বোটানিক্যাল গার্ডেনের উত্তরে এক বাগান বানালেন। সেখানে বউ আর আন্ডা-বাচ্চা নিয়ে গুষ্টিসুখ উপলব্ধি করবেন। তিনি নাকি এদেশে থেকে দিব্বি দেশি হয়ে গেছিলেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন এক মুসলমান রমণী। কথা বলতেন চোস্ত উর্দুতে। নিজেকে নিষ্ঠাবান মুসলমান ভেবে তিন রোজ নামাজও পড়তেন। তাঁর বাগানের নাম তাই যে শাহজাহানের বাগানের নামে শালিমার গার্ডেন হবে তাতে আশ্চর্য কি? তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে ওই বাগানেই মাটি দেওয়া হয়, মুসলমান মতে। সে বাগান আর নেই। রয়ে গেছে গঙ্গার ধারে সেই বাগানের শেষ চিহ্ন "শালিমার পয়েন্ট" নামে… শালিমার পেইন্ট, শালিমার রোপ ওয়ার্কের ঘিঞ্জি বসতি আর রোজ শয়ে শয়ে ভিড় জমানো ক্যাপ্টেন কিডের নামটুকু না জানা যাত্রীরা…। 




এভাবেই সেকালের কলকাতার বহু বাগান শুধু প্রাচীন স্মৃতিকথা আর গল্প কাহিনিতেই রয়ে গেছে। লোয়ার সার্কুলার রোডে কলকাতার সবচেয়ে ধনী পার্সি সদাগর রুস্তমজি কাওয়াসজি বানাজি এক বিরাট বাগান বানিয়েছিলেন। সঙ্গে থাকার মতো বাড়ি। গৃহপ্রবেশের দিন বল নাচ, বাই নাচ হয়েছিল। এসেছিলেন স্বয়ং বড়লাট লর্ড অকল্যান্ড। এই বাগানবাড়িতেই ১৮৫২ সালে মারা যান তিনি। তার মৃত্যুর পর বড় ছেলে মানেকজি রুস্তমজি এই বাড়ি থেকেই ব্যবসা চালাতেন। ১৮৭৪ সালে তাঁকে কলকাতার শেরিফ করা হল। তিনিও এই বাড়ি, এই বাগান ছেড়ে উঠে এলেন সাহেবপাড়ায়। সেই বাগানবাড়ি ভাড়া নিয়ে হিন্দুমেলার আয়োজন শুরু হল। ১৮৭৬ সালে পটলডাঙার বসুমল্লিক পরিবারের দীননাথ এই বাগান কিনে নেন। কিন্তু আগের মালিকের নাম অনুসারে 'পার্সিবাগান' নামটুকু রয়ে যায়। আর আশেপাশের এলাকা মানেকজির নামে মানিকতলা নামে ডাকা হত। বসুমল্লিকরা এই বাগান ধরে রাখতে পারেননি। তাঁর দুই ছেলে নগেন্দ্র আর যোগেন্দ্র মিলে এই বাগান যখন কালীকৃষ্ণ ঠাকুরকে বিক্রি করেন তখনই এর মৃতপ্রায় দশা। ১৮৯৮ সালেই ইন্দিরা দেবী প্রমথ চৌধুরীকে চিঠিতে লেখেন– 

কাল ওঁরা একদল… একটা কি প্রকাণ্ড বাড়ি দেখতে গিয়েছিলেন – পার্সিবাগান – নামটা অনেকদিন থেকে শুনে আসছি, কিন্তু কখনো দেখিনি। শুনলুম খুব জাঁকালো মস্ত ব্যাপার, যদিও অযত্নে পড়ে আছে ঘরের অবধি নেই, সর্বত্র মার্বেল পাথর বসানো, কেতাদুরক্ত বাগান, ফোয়ারা, ফুলের গাছ ইত্যাদি যেমন বাদশাহী কাণ্ড হতে হয়।

ধীরে ধীরে এই বাগান নষ্ট হয়ে বিস্মৃতির গর্ভে তলিয়ে যায়। প্রায় দশ বারো বছর এর নাম কেউ শুনল না। আচমকা ১৯০৬ সালে জাতীয় শিক্ষা পরিষদ প্রতিষ্ঠার দিন আদর্শের বিরোধে তারকনাথ পালিত মশাই কারিগরী শিক্ষার জন্য এক আলাদা সংস্থার প্রস্তাব দিলেন। ভোটাভুটি হল। তিনি তাঁর সমর্থকদের নিয়ে আলাদা 'বেঙ্গল টেকনিক্যাল স্কুল' খুলবেন বলে ঠিক করলেন। করলেন তো বটে, কিন্তু খুলবেন কোথায়? সেই কাজেই ৩০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিয়ে পার্সিবাগানের পড়ে থাকা বাগানবাড়ি ভাড়া করা হল। ১৯১২ সালের শেষের দিকে এটি পঞ্চবটি ভিলায় চলে গেলে আশুতোষ মুখুজ্জের সহায়তায় পার্সিবাগানের জমি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে দান করা হয়। সেখানে স্থাপন করা হয় সায়েন্স কলেজ। আর সেই টেকনিক্যাল স্কুলের কি হল? ১৯২৪ সালে সেটি স্থানান্তরিত হল যাদবপুরে, নাম হল কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলোজি। স্বাধীনতার পরে সেটাই আজ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়।

যাদবপুরের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের সূচনা হয়েছিল পার্সিবাগানে
মানিকতলায় আরও এক হারিয়ে যাওয়া বাগানের কথা পাই রবি ঠাকুরের জীবনস্মৃতি-তে। সে এক মজার বিবরণ।পুরোটা উদ্ধৃত করার লোভ সামলাতে পারা গেল না-

রবিবারে রবিবারে জ্যোতিদাদা দলবল লইয়া শিকার করিতে বাহির হইতেন। রবাহূত অনাহূত যাহারা আমাদের দলে আসিয়া জুটিত তাহাদের অধিকাংশকেই আমরা চিনিতাম না। তাহাদের মধ্যে ছুতার কামার প্রভৃতি সকল শ্রেণীর লোক ছিল। এই শিকারে রক্তপাতটাই সবচেয়ে নগণ্য ছিল, অন্তত সেরূপ ঘটনা আমার তো মনে পড়ে না। শিকারের অন্য সমস্ত অনুষ্ঠানই বেশ ভরপুরমাত্রায় ছিল— আমরা হত-আহত পশুপক্ষীর অতিতুচ্ছ অভাব কিছুমাত্র অনুভব করিতাম না। প্রাতঃকালেই বাহির হইতাম। বউঠাকুরানী রাশীকৃত লুচি তরকারী প্রস্তুত করিয়া আমাদের সঙ্গে দিতেন। ঐ জিনিসটাকে শিকার করিয়া সংগ্রহ করিতে হইত না বলিয়াই, একদিনও আমাদিগকে উপবাস করিতে হয় নাই।

মানিকতলায় পোড়াবাগানের অভাব নাই। আমরা যে-কোনো একটা বাগানে ঢুকিয়া পড়িতাম। পুকুরে বাঁধানো ঘাটে বসিয়া বসিয়া উচ্চনীচনির্বিচারে সকলে একত্র মিলিয়া লুচির উপরে পড়িয়া মুহূর্তের মধ্যে কেবল পাত্রটাকে মাত্র বাকি রাখিতাম।

ব্রজবাবুও আমাদের অহিংস্রক শিকারিদের মধ্যে একজন প্রধান উৎসাহী। ইনি মেট্রোপলিটান কলেজের সুপারিণ্টেণ্ডেণ্ট এবং কিছুকাল আমাদের ঘরের শিক্ষক ছিলেন। ইনি একদিন শিকার হইতে ফিরিবার পথে একটা বাগানে ঢুকিয়াই মালিকে ডাকিয়া কহিলেন, "ওরে, ইতিমধ্যে মামা কি বাগানে আসিয়াছিলেন।" মালি তাহাকে শশব্যস্ত হইয়া প্রণাম করিয়া কহিল, "আজ্ঞা না, বাবু তো আসে নাই।" ব্রজবাবু কহিলেন, "আচ্ছা, ডাব পাড়িয়া আন্‌।" সেদিন লুচির অন্তে পানীয়ের অভাব হয় নাই। আমাদের দলের মধ্যে একটি মধ্যবিত্ত জমিদার ছিলেন। তিনি নিষ্ঠাবান হিন্দু। তাঁহার গঙ্গার ধারে একটি বাগান ছিল। সেখানে গিয়া আমরা সকল সভ্য একদিন জাতিবর্ণনির্বিচারে আহার করিলাম। অপরাহ্নে বিষম ঝড়। সেই ঝড়ে আমরা গঙ্গার ঘাটে দাঁড়াইয়া চীৎকার শব্দে গান জুড়িয়া দিলাম। রাজনারায়ণবাবুর কণ্ঠে সাতটা সুর যে বেশ বিশুদ্ধভাবে খেলিত তাহা নহে কিন্তু তিনিও গলা ছাড়িয়া দিলেন, এবং সূত্রের চেয়ে ভাষ্য যেমন অনেক বেশি হয় তেমনি তাহাঁর উৎসাহের তুমুল হাতনাড়া তাঁহার ক্ষীণকণ্ঠকে বহুদূরে ছাড়াইয়া গেল; তালের ঝোঁকে মাথা নাড়িতে লাগিলেন এবং তাঁহার পাকা দাড়ির মধ্যে ঝড়ের হাওয়া মাতামাতি করিতে লাগিল। অনেক রাত্রে গাড়ি করিয়া বাড়ি ফিরিলাম। তখন ঝড়বাদল থামিয়া তারা ফুটিয়াছে। অন্ধকার নিবিড়, আকাশ নিস্তব্ধ, পাড়াগাঁয়ের পথ নির্জন, কেবল দুইধারের বনশ্রেণীর মধ্যে দলে দলে জোনাকি যেন নিঃশব্দে মুঠা মুঠা আগুনের হরির লুট ছড়াইতেছে।

এ-ঘটনা ঘটেছিল মানিকতলার কোন বাগানে? রাধারমণ মিত্র এই নিয়ে বিস্তর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে এসেছেন "মনে রাখতে হবে ফেরবার পথে সকলে এই বাগানে ঢুকেছিলেন। সুতরাং এ-বাগান থাকার কথা মানিকতলা মেন রোডের পূর্বপ্রান্তে নয়, পশ্চিমপ্রান্তে, কলকাতার কাছাকাছি। এখন এই বাগানের নাম 'মল্লিক লজ'। প্রকাণ্ড বাগান। ম্যাকিনটস বার্ন-এর তৈরি বাড়ি। এঁরা চিৎপুরের বিখ্যাত ঘড়িওয়ালা বাড়ির মল্লিকের, অর্থাৎ বৈষ্ণবদাস মল্লিকের বংশ।" 

পার্সিবাগানের মতো আরও এক জমকালো বাগান ছিল দেওয়ান মানিকচাঁদের বাগান। বেহালায় ডায়মন্ডহারববার রোডে তাঁর বাগানবাড়ির কথা রেভারেন্ড লং সাহেব নিজে লিখে গেছেন। সিরাজদ্দৌলা বাংলার নবাব হলে ইনি ঢাকার শাসনকর্তা নিযুক্ত হন। ১৭৫৬ সালের জুন মাসে নবাব সিরাজদ্দৌলা কলকাতা আক্রমণ করে দখল করার পর রাজা মানিকচাঁদকে কলকাতার শাসনকর্তা নিযুক্ত করে তিনি মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। মানিকচাঁদ সিরাজদ্দৌলার সৈন্যবাহিনীতে সেনাপতি হয়ে এসেছিলেন। ১৭৫৭ সালের জানুয়ারি মাসে ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসন মাদ্রাজ থেকে এসে কলকাতা পুনর্দখল করেন। সেই পর্যন্ত রাজা মানিকচাঁদ কলকাতায় শাসনকর্তা ছিলেন, কিন্তু তিনি কখনও কলকাতা শহরের ভেতরে থাকেননি। থাকতেন কলকাতার উপকণ্ঠে বেহালায়– ডায়মন্ড হারবার রোডের উপর অবস্থিত চতুর্দিকে পরিখাবেষ্টিত এক প্রকাণ্ড বাগানবাড়িতে। সেই বাগানবাড়ি অনেক পরিবর্তিত হয়ে এখনও বর্তমান আছে। এইটিকেই লোকে দেওয়ান বা রাজা মানিকচাঁদের বাগান বলে।

কলকাতার এক হারিয়ে যাওয়া বাগানের সঙ্গে বিবেকানন্দের একটা সম্পর্ক আছে। নবাব মিরকাশিমের সেনাপতি গুর্গিনের বংশধর এক মহিলা এখনকার নারকেলডাঙার কাছেই বিরাট এক বাগানবাড়িতে থাকতেন। সেই বাড়ির নাম ছিল মোগলবাগান। বাড়ির আইনি সব কাজকর্ম করে দিতেন অ্যাটর্নি বিশ্বনাথ দত্ত। অনেক পরে এই বাগানের উপর দিয়ে বালিগঞ্জ- দমদম রেললাইন চলে গিয়ে এই বাগান নষ্ট হয়ে যায়। তবে নামটুকু রয়ে গেছে। 

দমদমের ক্লাইভ হাউসের পাশেই বিরাট বাগান ছিল আনন্দমোহন বসুর। র‍্যাংলার হলো গণিতশাস্ত্রের ওপর প্রদত্ত সর্বোচ্চ উপাধি, যা ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেওয়া হয়। আর এই র‍্যাংলার উপাধি পান কিশোরগঞ্জের আনন্দমোহন বসু। তিনিই প্রথম এবং একমাত্র 'র‍্যাংলার' উপাধি পাওয়া ভারতীয়। এই আনন্দমোহন বসু ৭০ বিঘে জমি-সমেত এক বাগানবাড়ি কেনেন। সেই বাগানবাড়ির নাম রাখলেন 'ফেয়ারি হল।' ১৮৪৮ সালে এই বাড়ি ছিল ওয়ারেন হেস্টিংস লেসলি ফ্রিথ নামে এক সাহেবের। এই বাড়িতে আগে সিন্ধু দেশের হায়দ্রাবাদ, খয়েরপুর ও মীরপুরের তিন আমিরকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। ১৮৪৩ সালে তাঁদের গদিচ্যুত করা হয়। একতলার একটি ঘরে লোহার গরাদে দেওয়া একটি ঘেরা জায়গা ছিল। সেখানে আমিরদের চিতাবাঘ বাঁধা থাকত। ১৯২০ সালের গোড়ার দিক থেকে এই বাগানবাড়ি ব্রিটিশ অ্যালুমিনিয়ম কর্পোরেশন লিমিটেডের সম্পত্তি হয়ে যায়। বাগানের আর বিশেষ কিছু অবশিষ্ট নেই। 

গঙ্গার ধারের বন্দর-বাগান থেকেই নাম হল 'গার্ডেনরিচ'
ওয়াজিদ আলি অযোধ্যা হারালেন ৭ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৬। লখনউ ছাড়লেন সে বছরেরই ১৩ মার্চ, কলকাতা এলেন ৬ মে। বছর ঘুরতে না ঘুরতেই জ্বলে উঠল মহাবিদ্রোহের আগুন।  কিন্তু কলকাতায় এসেও সেখানেই ছোট এক লখনৌ বানিয়ে নিয়েছিলেন ওয়াজিদ আলি শাহ। ছিল বিরাট এক বাগান, আর সেই বাগানে অদ্ভুত এক চিড়িয়াখানা। আবদুল হলিম শররের লেখায় একেবারে জীবন্ত হয়ে হয়ে উঠেছে তার কথা। সেখানে "বিচরণ করত শত শত চিতা, হরিণ ইত্যাদি, অরণ্য পশুর দল ঠিক মাঝখানে, শ্বেত-পাথরে একটা পুকুর, সর্বদা ভরাভর্তি তার মধ্যে দেওয়া হয়েছিল শুতুরমুর্গ, কিশোরী, ফীলমুর্গ, সারশ, কায়া, বগলা, করকর, চকোর, ময়ূর, হাঁস নানান জাতের পাখি কচ্ছপ পুকুরের এক ধারে খাঁচায় থাকত বাঘ। চরণভূমির পাশে, লোহার রেলিংঘেরা জাতের এবং কোথাকার বাঁদর এনে রাখা হয়েছিল। এদের জলাধারের স্থানে পোষা হত। ইশারা করলেই জড়ো হত; খাবার নেচে কুঁদে বাহার দেখাত। শাহানশাহ মঞ্জিলের দীর্ঘ গভীর জলাশয়; পিছলা করে নেওয়া; ঠিক মাঝখানে সামনের দিকে ঝোঁকানো একটা কৃত্রিম পাহাড়। পাহাড়ের সংখ্যাহীন নালী; জলস্রোত বইয়ে দেওয়া হয়েছে। পাহাড়ে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে হাজার হাজার সাপ। দু'গজ তিন বড়ো বড়ো সাপ চব্বিশ দৌড়ত, ঘুরত, কিলবিল করত; পাহাড়ের উঠত, ব্যাঙ হলে দৌড়ে ধরত। পাহাড়ের আশেপাশে খালের মতো নালা; তার মধ্যেও সাপেরা এঁকেবেঁকে ছুটত, ব্যাঙের পিছু নিত; লোকেরা পাশে দেখত। পাহাড়ের দুটো খাঁচা, তাতে থাকত বড় বড় চিতা। এমনিতে চুপচাপ কিন্তু দেওয়া হত লাফ দিয়ে ধরে গোটাটাই ফেলত। সাপ পোষার ব্যবস্থা আগে কোথাও হয়নি। এটা ওয়াজিদ আলি আবিষ্কার। য়োরোপের পর্যটক অবাক হয়ে ছবি এঁকে ও যেত। এই জানোয়ার ছাড়া হাজার হাজার পাখি ছিল। তারা থাকত খাশ সুলতানখানার অন্দরে, পিতল-পিঞ্জরে লোহার জাল সুরক্ষিত গোটাকুড়ি বড় বড় ঘর ছিল, 'গঞ্জ'। তার নানাধরনের অসংখ্য পাখি। বাদশাহর পশুপাখির যতো জাতি আছে, এখানে করবেন এবং এমন এক সম্পূর্ণ জীবন্ত চিড়িয়াখানা বানিয়ে যাবেন, দুনিয়ার কোথাও তার জুড়ি নেই। এদের সংগ্রহের তিনি বেপরোয়া অর্থব্যয়ও করেছেন। কেউ কোন পাখি বা আনলে যে চাইত যেত। শোনা যায়, বাদশাহ একজোড়া 'রেশমপাখা' পায়রা চব্বিশ হাজার টাকায় এবং এক ময়ূর এগারো টাকায় কিনেছিলেন। আফ্রিকার জিরাফও দুটো। কোহানের দুটো বাগদাদী উটও—যা হিন্দুস্থানের আর কোথাও চোখে পড়েনি কোনও জানোয়ারই যাতে বাদ না বাদশাহ সেজন্য গাধাও রেখেছিলেন চিড়িয়াখানায় তাঁর পায়রাই নাকি ছিল চব্বিশ পঁচিশ হাজারের মত"। 

ভাবা যায়! নবাবের মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এই বাগান আর মিনেজারি একেবারে ধ্বংস হয়ে যায়। যেহেতু বাগানই আলোচনার প্রধান, তাই এই আলোচনায় বাদ গেল বেশ কয়েকটি বিখ্যাত বাড়ি, যেখানে বাগানের স্থান নেহাত ফেলে দেবার মতো ছিল না। কিন্তু সেগুলোতে বাড়িই মুখ্য। তাই বাদ গেল ডিরোজিওর বাড়ি, রাজনারায়ণ বসুর বেনেটোলার বাড়ি, ব্রাহ্ম সমাজের শাঁখারিটোলার বাড়ি, পাথুরেঘাটার গোপীমোহন ঠাকুরের বাড়ি, মরকত কুঞ্জ এবং অবশ্যই যার নাম না করলেই নয়, দ্বারকানাথের বেলগাছিয়া ভিলা আর নৈহাটির পাটের ব্যবসায়ী প্রিয়নাথ মিত্রের মোহনবাগান ভিলা, যার বিস্তীর্ণ মাঠে খেলতে খেলতে একটা ক্লাবেরই জন্ম হয়ে গেল, মোহনবাগান স্পোর্টিং ক্লাব। কিন্তু সে সব আলোচনা অন্যত্র করা যাবে।

বুধবার, ৪ মার্চ, ২০২৬

ভানুবাবু ~ কৌশিক মজুমদার

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের তিনটে দোষ ছিল।

তিনি নিজেই বলেছেন সাংবাদিক রবি বসুর কাছে। এক, তিনি টাকা ধার দিয়ে ফেরত চাইতে পারতেন না। দুই, নিজের জন্য কিছু চাইতে পারতেন না। আর তিন, সেটাই সবচেয়ে ঝামেলার, তিনি কারও অন্যায় কথাবার্তা সহ্য করতে পারতেন না। আর এই শেষেরটার জন্য কত মানুষের অপ্রিয় হয়েছেন কতবার।



সেই সেবার এক ইন্টালেকচুয়াল স্টার থিয়েটারে বসে একমনে মহাশ্বেতা দেবীর কুৎসা গাইতে ব্যস্ত। কেন তিনি বিজন ভট্টাচার্য্যকে ছেড়ে অজিত গুপ্তকে বিয়ে করলেন তা নিয়ে রসিয়ে চারটি গপ্পো করছিলেন। বোঝেন নি ভিতরেই ভানুবাবু আছেন। আচমকা বাইরে এসে তিনি জিজ্ঞেস করলেন "আচ্ছা মশাই আপ্নের পিতৃদেব এই বৎসর কত বিঘা জমিতে ধান চাষ দিছেন?"
ভদ্রলোক অবাক। "আমার বাবা ধান চাষ করবেন কেন? তিনি তো দেহ রেখেছেন অনেকদিন হল"
"বেশ। তবে বাঁইচা গেছেন। জীবিত থাকলে জিগাইতাম মহাশ্বেতা দেবী আপনের কয় বিঘা জমির পাকা ধানে মই দিসে যে আপনের ইন্টালেকচুয়াল পুত্তুর তারে লইয়া প্যাচাল পাড়তাসে? জন্মের সময় এমন পোলারে নুন দিয়ে মাইরা ফেলেন নাই ক্যান?"

আবার এই ভানুই যখন জানতে পারেন এইচ এম ভি নতুন কমেডিয়ান সুশীল চক্রবর্তীকে ভাগিয়ে দিয়েছে, বলেছে ভানু ছাড়া কারও রেকর্ড করবে না, তখন তিনিই ফোন করে শর্ত রাখেন "সুশীলের রেকর্ড করলেই আমি রেকর্ড করুম। নয়তো গুডবাই"। এইচ এম ভি মেনে নিতে বাধ্য হয় তার কথা।

আমরা দুর্ভাগা এখনও আশিতে আসিও না, মাসিমা মালপোয়া খামু, ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্টেন্ট কিংবা ওরা থাকে ওধারে-র "অরে আর ঢুকতেই দিমু না" কিংবা কমেডি স্কিটে ইনি আর গীতা দে-র সেই সব অসামান্য নাটকের বাইরেও যে এক সিরিয়াস ভানু আছে, তা আমরা মানতে নারাজ। কমেডিয়ানদের সমস্যা হয়তো এটাই। কেউ মানতেই চায় না কমেডি ইজ এ সিরিয়াস বিজনেস।
সেই সৌমিত্রবাবুর গল্পটা মনে পড়ে। তখন আর্টিস্ট ফোরাম আর শিল্পী সংসদ নিয়ে চরম দোলাচল। ভানু এসেছেন সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আলোচনায়। গাড়িতে বসে কথা হচ্ছে। এমনসময় প্রায় ভিতরে মুখ ঢুকিয়ে এক ফাজিল জিজ্ঞেস করলে "কেমন আছেন ভানুবাবু?"। ভানু একটু বিরক্ত। বললেন "আগে যেমন ছিলাম" বলে আবার আলোচনা শুরু করলেন।
সে থামবার পাত্র নয় । রস করে বললে "আগে কেমন ছিলেন সেটাও ত জানি না"
ভানু এবার চার অক্ষরের এক গালি দিয়ে বললেন "সেটা যদি নাই জানো, এখন কেমন আছি জাইন্যা কি করবা?"

মাত্র ১২ বছর বয়সেই বৈপ্লবিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন ভানু। বিপ্লবী দীনেশ গুপ্ত ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহকে গুরু মানতেন৷ তাঁদের কাছেই সংগ্রামের প্রথম পাঠ । এক জায়গা থেকে অন্য এক জায়গায় রিভলভার পাচারও করেছেন বহুবার। সত্যেন বসুর প্রিয় ছাত্র এই মানুষটি তরুনকুমারকে একবার দেখা করাতে নিয়ে গেছিলেন বিজ্ঞানীর সঙ্গে। সে গল্প কে না জানে? অবশ্য তাঁর কাছে তিনি ভানু নন। সাম্যময়। বাংলা সিনেমায় বাঙাল বা পুব বঙ্গের কমেডিকে প্রায় একার কাঁধে বয়েছেন এককালে। ঠিক যেমন আশিতে আসিও না ছবিতে নায়িকা রুমাকে বইতে দেখেছি।

আজ তাঁর মৃত্যুদিন। প্রণাম রইল।

শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

একুশে ফেব্রুয়ারি কম্যুনিস্ট ইশতেহার ~ ডাঃ সমুদ্র সেনগুপ্ত

"ভুখা মানুষ, ধরো বই, ওটা তোমার হাতিয়ার"

মার্কসবাদ লেনিনবাদকে আক্রমণ করার, তাকে খাটো করার তাকে উপহাস করার অসংখ্য টেমপ্লেট বাজারে আছে। ।সবচেয়ে মারাত্মক টেমপ্লেট যেটা সেটা আজ একটু বলবার চেষ্টা করছি। এটা করা হয় বামপন্থার মুখোশধারীদের দিয়ে কারণ দক্ষিণপন্থী দের আক্রমনগুলি প্রকৃত বামপন্থীরা সহজেই ধরে ফেলতে পারেন। এটার শুরু হয় লেনিনবাদ কে প্রথমে বৌদ্ধিক স্তরে আক্রমণ করে। এবং এটা অবধারিত ভাবে শুরু হয় স্টালিন কে ঘিরে কারণ উনি ফাউন্ডেশন অফ লেনিনিজম এর রচয়িতা। যেনতেন ভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে স্টালিন আদলে মার্কসবাদ লেমিনবাদ কিছুই বুঝতেন না, বরঞ্চ ট্রটস্কি বুঝতেন। একই ভাবে লেনিন ও মার্কসবাদ এর প্রকৃত অনুগামী ছিলেন না বলে অপপ্রচার করা হয় লেনিন এর বিপ্রতীপ এ কখনও রোজা লুক্সেমবার্গ কে বা কখনও গ্রামসিকে খাড়া করে। শেষমেষ পরে রইলেন মার্কস। তাকেও ম্যালাইন করার এক অত্যশ্চর্য টুল আবিষ্কার করেছেন এই ছদ্ম বামেরা। রিয়াজননভ এর মেগা (Marx-Engels-Gesamtausgabe) 
প্রজেক্ট এর দৌলতে  মার্কস এর অল্প বয়সের কিছু লেখা আবিষ্কার করে এরা পরিণত বয়েসের মার্কসকে তার বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে চান। 



মার্কস এর দেখানো পথে লেনিন যেদিন একটা ছোট্ট কিন্তু বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টির সাহায্যে পৃথিবীর দ্বিতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র তৈরি করে ফেললেন সেদিন থেকেই আসলে শাসক শ্রেণীর ভয়ে ঘুম উড়ে গেছে। এটা মনে রাখতে হবে ঠিকঠাক ভাবে একটা দেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রথম লেনিনই তৈরি করেন, মার্কস নয়। কিন্তু মার্কস (এবং অবশ্যই) এঙ্গেলস ) এর অবদান হল যে তারাই সবার প্রথমে একটা নতুন ধরনের পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, তৈরির স্বপ্ন দেখেছিলেন। 

যার জন্ম এখনো ভবিষ্যতের গর্ভে সেই পার্টির ইশতেহার লেখার দায়িত্ব নেওয়ার পরেই মার্ক্স ব্যস্ত হয়ে পড়েন ব্রাসেলস এ।  কমিউনিস্ট লীগ ২৬ শে জানুয়ারি মার্ক্সকে চরমপত্র পাঠিয়ে বলে যে পয়লা ফেব্রুয়ারির মধ্যে পাণ্ডুলিপি পাঠাতে হবে। মার্ক্স তাড়াহুড়ো করে লিখে পাঠালেন। মার্ক্স এমনিতেই লিখতেন ঝড়ের বেগে, খুদে অক্ষর, প্রায় সর্টহ্যান্ড এর ঢঙ্গে। প্রায় গোটা পাতা জুড়ে, একটুও জায়গা নষ্ট না করে। নিষিদ্ধ সেই ইশতেহার চললো তারপরে গোপন পথে লন্ডনে। 

আদি পাণ্ডুলিপির প্রায় সবটাই হারিয়ে গেছে। একটা পাতা খালি বেঁচে। এডুয়ার্ড বার্নস্টাইনকে ১২ই জুন, ১৮৮৩ এ লেখা একটা চিঠির সাথে আটকে ছিল ওই পাতাটা। পাতাটির ওপর লেখা এঙ্গেলসের নোট, "Mscript Karl Marx: Erster Entwurf z. Comm Manifesta" ম্যানুষ্ক্রিপ্ট কার্ল মার্ক্স: ফার্স্ট ড্রাফট অফ কম. ম্যানিফেস্ট.।

বাইবেলের পরেই যে বইটার সবচেয়ে বেশি বিক্রি সেই বই কম্যুনিস্ট পার্টির ইশতেহার প্রকাশিত হয় ২১ শে ফেব্রুয়ারি, ১৮৪৮ সাল। ২৩ পাতার চটিবই। কালচে সবুজ মলাট। নিছক পরিসংখ্যানের বিচারে ভাববাদীদের বাইবেল এর কাছে এখনো হেরে আছে বস্তুবাদীদের বাইবেল। কিন্তু এমন দিন আসবে বস্তুবাদীদের  বাইবেল জিতবেই জিতবে। 

আজ ২১শে ফেব্রুয়ারি আবার। আজ আন্তর্জাতিক লাল বই দিবস। 

পু: এই পাতার লাস্ট লাইনটা হল সেই বিখ্যাত লাইন "শৃঙ্খল ছাড়া শ্রমিক শ্রেণীর হারাবার কিছু নেই , জয় করার জন্য পড়ে আছে সারা দুনিয়া।

মঙ্গলবার, ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

'প্রতীক উর' প্রশ্ন ~ বিভাস সাহা

গতকাল ১৬ই ফেব্রুয়ারি বেশ একটা ঝড় বয়ে গেল। সকালে যা ছিল একটা চাপা ফিসফাস বিকেলে তা হয়ে দাঁড়ালো 'পাক্কা খবর' । অনেক চ্যানেল দীর্ঘ বিশ্লেষণ দিল যেখানে বলা হল 'মহম্মদ সেলিম এবং তাঁকে ঘিরে এক দুষ্টচক্র সি পি  এম চালাচ্ছে' এবং প্রতীক উর তৃণমূলে এসে গেছেন -- শুধু ঘোষণার অপেক্ষা। 

আজ প্রতীকের  একটি সাক্ষাতকার শুনলাম। সেখানে উনি পরিষ্কার বললেন, যে চিঠিটা বাজারে ঘুরছে, সেটি উনি লেখেনইনি। উনি একটি দলীয় ফর্ম পূরণ করে ওনার মতামত যথার্থ জায়গায় জানিয়েছেন, এবং অপেক্ষা করছেন দল কী উত্তর দেয়। 

 এসব শুনে কয়েকটি জিনিস মাথায় এল, তাই এই লেখা। 

প্রথমত, প্রতীক অত্যন্ত জনপ্রিয়, লড়াকু, এবং সৎ নেতা হিসেবে জনমানসে একটি ভাবমূর্তি রাখতে পেরেছেন। তাঁকে টিভির পরদায় দেখা যায় না। তিনি যে অঞ্চলে রাজনীতি করেন সেখানে চোখে পড়ার মত দলীয় শক্তি নেই।  সর্বোপরি ওই অঞ্চলে ভাইপো ব্যানার্জীর  পোষা বাহুবলীরা সর্বক্ষণ দাপাদাপি করে। 

এসব সত্ত্বেও তিনি রাজ্যস্তরে একটি পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। তার মানে রাজনীতিতে এখনও  সততা এবং নীতির একটা জায়গা আছে। এটা খুবই আশার জায়গা। প্রতীক উরের মত নেতা আরও চাই এবং বাজারের খবর যাইই হোক না কেন, এইরকম নেতাদের জন্য বামদলই যথার্থ জায়গা।

দ্বিতীয়ত, প্রতীক উর যে রাজ্য নেতাদের কাছে তাঁর সদস্যপদ ছাড়ার ইচ্ছা জানিয়েছেন, এই খবর উপরের স্তরের কোন নেতাই মিডিয়াকে জানিয়েছেন এবং ঠিক হিসাব করে তা কূণাল ঘোষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক ব্যাপার। প্রতীক উরকে  যাতে  দল বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়, এবং তারপর তাঁকে প্রতিক্রিয়াশীল, চটিচাটা ইত্যাদি বলে আক্রমণ করা যায় -- এই কুমতলব তাঁদের আছে। এটা পরিষ্কার। এরা যদি সি পি এমের শীর্ষস্তরে থাকেন, তাহলে  ভোটে যে দল খারাপ ফল করবে তার সম্ভাবনা বেড়ে গেল। 

তৃতীয়ত, সি পি এম দলটির কিছু সাংগঠনিক সংস্কার দরকার। দলের মধ্যে সদস্যদের ভিন্ন মত প্রকাশের একটা জায়গা দেওয়া উচিত। এই ভিন্নমতের  প্রশ্ন এলেই সঙ্গে সঙ্গে পার্টির গঠনতন্ত্র, সংবিধান, শৃঙ্খলা ইত্যাদি তুলে চুপ করিয়ে রাখা হয়। এটি আধুনিক যুগে একেবারেই বেমানান। তার উপর বিধানসভায় শূন্য হয়ে গেলে আরও বেমানান।  

চতুর্থত, দলের সাধারণ সম্পাদক মহম্মদ সেলিম একটা মহাজোট করার চেষ্টা করছেন, সেটা বোঝা যায়। শুধু  ভোটের জন্য হুমায়ন কবীর ও নওশাদ সিদ্দিকি নয়, বৃহত্তর বাম ঐক্যের কথা মাথায় রেখে  উনি অনেক অতি বাম, বা বিশিষ্ট নিরপেক্ষ বাম বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ব্যক্তিগত ভাবে সাক্ষাত বা যোগাযোগ করে তাঁদের মতামত নিয়েছেন (এ খবর আমি জানি)। এর মধ্যে অনেক উদারতা এবং বাস্তববুদ্ধির একটা প্রকাশ রয়েছে। 

কিন্তু একই সঙ্গে দলের কর্মীদের কাছে এবং জনমানসে কী বার্তা দিতে হবে সে  বিষয়ে কোন পরিষ্কার হিসাব দেখা যাচ্ছে না। অর্থাৎ নিজস্ব দলীয় নীতি এবং ভোটের রণনীতি ও কৌশল এই দুটোর মধ্যে একটা ভারসাম্য রাখতে হবে, এবং সেটা মানুষকে এবং দলের দ্বিতীয় স্তরের নেতাদেরকে বুঝিয়ে তাঁদের সঙ্গে নিয়েই করতে হবে। 

এই কাজটা যে হয়নি, তা এই প্রতীক উর কাণ্ড থেকে বোঝা গেল। এর পাশাপাশি বিরুদ্ধ দলগুলি ও তাদের মিডিয়া থেকে যে 'সেলিম ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে ঘুরছেন' এই ন্যারেটিভ ছড়ানো হয়েছে, তার কোন পাল্টা ন্যারেটিভ সি পি এম দিতে পারেনি। বরং ব্যাকফুটে খেলে চলেছে। 

আমার নিজের মূল্যায়ন, ভোট বাড়াতে গেলে এই ২০২৬-এ সি পি এমকে মুসলিম সম্প্রদায়ের দিকে তাকাতেই হবে। সেখানে হুমায়ুন কবীর যে হই চই ফেলেছেন তাতে তার সঙ্গে কথা বলার অবশ্যই একটা বড়ো যুক্তি আছে।    প্রশ্ন হচ্ছে, মুর্শিদাবাদের বাইরে হুমায়ুনের প্রভাব অন্যান্য জেলায় কতদূর এবং তার সূত্রে ভোট সি পি  এমে আসতে  পারে কিনা, এর কোন তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে কিনা জানি না। অর্থাৎ মুর্শিদাবাদের বাইরে কোন লাভ যদি না থাকে তাহলে হুমায়ুনের সঙ্গে কথা বলায় বিশেষ কোন লাভ নেই।  

হুমায়ুন-নওশাদ বিষয়টি রণকৌশলের ব্যাপার, নীতির নয়। কিন্তু বিষয়টি সি পি এম নেতৃত্ব সেভাবে প্রজেক্ট করছেন না। ফলে দলের ভিতর অনেক বিভ্রান্তি হচ্ছে।

পঞ্চমত, বিভ্রান্তি ছাড়াও সি পি এম দলের মাঝারি স্তরে (যাকে চর্বিযুক্ত মধ্যপ্রদেশ বলা যেতে পারে) একটা উদ্ধত/অশিক্ষিত কালচার আছে। (এই রোগ অন্যান্য বাম দলেও আছে।) সেখানে  সুযোগ পেলেই মার্ক্সবাদ, বিপ্লব, পুঁজিবাদ ইত্যাদি নিয়ে লেকচার দেওয়ার  প্রবণতা আছে, এবং  নিজের দলের  সমর্থক না হলে তাকে নানা বিশেষণে গালিগালাজ করা হয়। এদের নতুন কিছু শেখার বা নতুন ভাবে ভাবার কোন আগ্রহ নেই। 

এই কালচারটি বৃহত্তর বাম ঐক্যের পরিপন্থী। অতি সম্প্রতি 'মার্ক্সবাদী পথ' গোষ্ঠীর উদ্যোগে মৈত্রীশ ঘটকের একটি সাক্ষাতকার নিয়েছেন। সাম্প্রতিক কালের মধ্যে একটি অসাধারণ অনুষ্ঠান। মৈত্রীশ তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে অত্যন্ত সহজ ভাষায় পশ্চিমবঙ্গের অর্থনীতির আপেক্ষিক অবস্থানের কথা ব্যাখ্যা করেছেন, এবং শেষ দিকে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার সহ নানা সরকারি অনুদানের বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর মতামত দিয়েছেন এবং যথার্থ সমালোচনা করেছেন । 

কিন্তু তাঁর সমালোচনা তীব্র নয় বলে, সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে চটিচাটা বলে আক্রমণ করছেন (মৈত্রীশের ফেসবুক পেজে দেখলাম)। এগুলি অত্যন্ত রুচিহীন ব্যাপার। এই নিন্দা যদি কোন সি পি এম সমর্থক করে থাকেন, তা আরও গর্হিত। 

পরিশেষে, প্রতীক উর রহমানের কথা ফিরে আসি। প্রতীক উর দলে থাকছেন কি যাচ্ছেন, বা গেলে কোন্ দলে যাবেন, সেটা তাঁর ব্যাপার। কিন্তু তাঁকে বৃহত্তর বাম আন্দোলনে দরকার। যদি তিনি এই বাম আন্দোলন ছেড়ে তৃণমূলে  যান তাহলে তা খুবই  দুর্ভাগ্যজনক হবে। 

বোঝা যাচ্ছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বেশ কঠিন ব্যাপার।

বিভাস সাহা 
(অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়) 

সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বাংলাদেশে নির্বাচন ও বামপন্থী ~ শুভ বসু

বাংলাদেশে বামপন্থীরা কেন খুব একটা ভালো করতে পারেনি? অনেকেই এই প্রশ্নটি জিজ্ঞাসা করে এবং একটি বিভ্রান্তিকর উত্তর দেয়। ইসলাম কমিউনিজমের সাথে ভালো যায় না। কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস সম্পর্কে অন্ধ ব্যক্তিরা এমন একটি ভাসাভাসা উত্তর দিতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে, এম এন রায় এবং অবনী মুখার্জি ছাড়া, বাংলায় কমিউনিস্ট পার্টি প্রতিষ্ঠার সময় সকল সদস্যই ছিলেন মুসলমান। এর মধ্যে ছিলেন মুজাফফর আহমেদ, যিনি পরে কাকাবাবু নামে পরিচিত; কুতুবউদ্দিন আহমেদ; আব্দুল হালিম; আবদুর রেজ্জাক খান; এবং সম্ভবত আব্দুল মোমিন। "কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল" গানের প্রথম অনুবাদ করেছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি মুজাফফর আহমেদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। এই সকল নেতা ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের প্রসার, শ্রমিক ও কৃষক দল প্রতিষ্ঠা এবং পরবর্তীতে হিন্দু বিপ্লবী জাতীয়তাবাদীদের কমিউনিজমের দিকে ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। ১৯৪০-এর দশকে, কমিউনিস্টরা কলকাতায় পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিংবদন্তি ইতিহাসের অধ্যাপক সুশোভন সরকার পূর্ব পাকিস্তান রেনেসাঁ সোসাইটির কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করেছিলেন। ১৯৪২ থেকে ১৯৪৭ সালের মধ্যে, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি পাকিস্তান প্রশ্নে মুসলিম লীগের সাথে একটি সমঝোতা করে এবং "আজাদ হিন্দুস্তান  মে  আজাদ পাকিস্তান" স্লোগান উত্থাপন করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে, বিজয়ের স্থপতি আবুল হাশিম সমাজতন্ত্রের ধারণায় অনুপ্রাণিত হয়ে মুসলিম লীগের ইশতেহার তৈরি করেন। তার দুই ভাগ্নে, সহিদুল্লাহ এবং মনসুর হাবিবুল্লাহ পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলায় কমিউনিস্ট আন্দোলনের নেতা ছিলেন। সামগ্রিকভাবে, প্রগতিশীল লেখক আন্দোলন বেশ কয়েকজন উর্দু লেখককে আকৃষ্ট করেছিল, যার মধ্যে সাজ্জাদ জহির, কাইফে আজমি, ইসমত চুগতাই এবং সাদাত হোসেন মান্টো ছিলেন।

পূর্ব বাংলায়, মনি সিং সুসং দুর্গাপুরে দলীয় সংগঠনের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন এবং জমিদারদের বিরুদ্ধে কৃষক প্রতিরোধের পথিকৃৎ ছিলেন। দিনাজপুরে, সুশীল সেন, বিভূতি গুহ এবং হাজী দানেশ তেভাগা আন্দোলন গড়ে তোলেন। বরিশালে, মনোরোমা বসু এবং গোলাম কিবরিয়া কৃষকদের নেতৃত্ব দেন। সিলেটে   টঙ্ক আন্দোলনের সময়, সামন্ততন্ত্রের ভিত্তি কেঁপে ওঠে। মজার বিষয় হলো , পূর্ববঙ্গে বেশিরভাগ কমিউনিস্ট কর্মী হিন্দু থাকলেও, পশ্চিমবঙ্গে অনেকেই ছিলেন মুসলিম, যেমন আবদুল্লাহ রসুল, মুহাম্মদ ইসমাইল, মুহাম্মদ ইলিয়াস, মনসুর হাবিবুল্লাহ, সহিদুল্লাহ এবং আরও অনেকে। অবশ্যই, কিংবদন্তি কাকাবাবু ছিলেন অগ্রণী।

১৯৪৮ সালে দেশভাগের পর, সিপিআই বি.টি. রনদিভের নেতৃত্বে একটি তাৎক্ষণিক বিপ্লব লাইন গ্রহণ করে। পূর্ববঙ্গে কমিউনিস্ট কর্মীরা বিদ্রোহে লিপ্ত হয়। এর ফলে মূলত দলিত আদিবাসী এবং পাহাড়িদের মধ্যে বিদ্রোহ দেখা দেয়। সাঁওতাল, গারো এবং নমশুদ্র জনগোষ্ঠী বিদ্রোহে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল একটি দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। এই সময়েই ইলা মিত্রকে নাচোল থেকে বন্দী করা হয় এবং কারাগারে নির্যাতন করা হয়। ১৯৫০ সালে, যখন বাংলার উভয় প্রান্তে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তখন প্রায় ১৫,০০০ কমিউনিস্ট কর্মী সীমান্ত অতিক্রম করে পশ্চিমবঙ্গে আশ্রয় নেন, কারণ তাদের বেশিরভাগই হিন্দু ছিলেন। এর ফলে কমিউনিস্ট আন্দোলনের প্রথম পর্বের সমাপ্তি ঘটে। 

দেশভাগের পর, দল সংগঠিত করার জন্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক মুসলিম কমিউনিস্টকে পাঠানো হয়েছিল, কিন্তু তারা পরে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসেন, যাদের মধ্যে মনসুর হাবিবুল্লাহও ছিলেন। তবে, হিন্দু কমিউনিস্টরা সেখানেই থেকে যান এবং মনি সিং এবং খোকা রায় তরুণ প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যেমন মোহাম্মদ ফরহাদ, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ, মুহাম্মদ তোয়াহা এবং পরে তরুণ বদরুদ্দিন ওমর। তারা একটি ছাত্র আন্দোলন এবং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন গড়ে তোলেন। লেখকদের মধ্যে সত্যেন সেন বিশেষভাবে সক্রিয় ছিলেন। বাংলায়, মুসলমানদের মধ্যে কৃষক আন্দোলনের একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য ছিল। মাওলানা ভাসানী সেই ঐতিহ্য থেকে এসেছিলেন। ১৯৫০-এর দশকে, তিনি কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আকৃষ্ট হন এবং একজন সহযাত্রী হয়ে ওঠেন। কমিউনিস্ট পার্টি বিভিন্ন ফ্রন্টাল পার্টির মাধ্যমে পরিচালিত হত, যার মধ্যে ছিল গণতান্ত্রিক দল, এবং পরে, ১৯৫৭ সালে, যখন ভাসানী ন্যাপ প্রতিষ্ঠা করেন, তখন দলটি ন্যাপের আন্ডারগ্রাউন্ড সংগঠনে জড়িত হয়।

এটি ছিল শীতল যুদ্ধের যুগ, এবং মাওলানা ভাসানী একজন সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী যোদ্ধা হয়ে ওঠেন। তিনি পূর্ব পাকিস্তানে সুয়েজ যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তিনি বিশ্ব শান্তি পরিষদ (WPC) কর্তৃক আয়োজিত শান্তি সম্মেলনে যোগদান করেন। তিনি চীনে যান এবং মাও এবং ঝৌ-এর সাথে দেখা করেন। তিনি হাভানায় ত্রি-মহাদেশীয় কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের মাওবাদীদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তোহা, কাজী জাফর, আলাউদ্দিন , হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ শিষ্য। বৃহত্তম প্রচারিত সংবাদপত্রগুলির মধ্যে একটি, সংবাদ তখন বামপন্থী ছিল। ন্যাপ ছিল দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক দল। ১৯৬৭-৬৮ সালে, দলটি বিভক্ত হয়ে যায় এবং তারপরে অতি-মার্কসবাদের ফলে তোহা ভাসানীর ইসলামী সমাজতন্ত্রের ধারণার কারণে ভাসানীর থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নেন। পূর্ব পাকিস্তানে কমিউনিস্ট আন্দোলনের বিভক্তির ফলে শেখ মুজিব বাঙালি জাতীয়তাবাদের দিকে মূল স্রোতের রাজনীতিকে পরিচালিত করেন . মনি সিং, ফরহাদ এবং মুজাফফর আহমেদের মতো সোভিয়েতপন্থী কমিউনিস্টদের একটি দল তার সাথেই ছিল। কিন্তু মাওবাদীরা বেশ কয়েকটি দলে বিভক্ত ছিল। সিরাজ সিকদারের নিজস্ব একটি দল ছিল যারা আওয়ামী লীগের আগে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম ঘোষণা করেছিল। ইপিসিপি (এমএল) মুক্তি সংগ্রামের প্রতি বিরূপ ছিল। রাশেদ খান মেনন, কাজী জাফর এবং রনো স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেছিলেন এবং শিবপুরে একটি মুক্ত অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
স্বাধীনতার পরে, চীন-সোভিয়েত সংঘাত চরমে পৌঁছানোর ফলে , মাওবাদীরা শেখ মুজিবের বিরোধী ছিলেন। মণি সিং, ফরহাদ এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে, তাজউদ্দিন এবং আবদুস সামাদ আজাদ সোভিয়েতপন্থী লাইন অনুসরণ করেছিলেন এবং সিপিবি এমনকি বাকশালে যোগ দিয়েছিলেন, যা সিপিবির জন্য সম্পূর্ণ বিপর্যয়কর পদক্ষেপ ছিল। 

শেখ মুজিবের ছাত্র লীগের বৃহত্তর অংশ তাকে ত্যাগ করে জেএসডি গঠন করে, আরেকটি মার্কসবাদী রাজনৈতিক দল, যেখান থেকে বিএসডির ( বাংলদেশ সমাজতন্ত্রী দল) উদ্ভব হয়েছিল। জেনারেল জিয়া বিএনপি প্রতিষ্ঠা করার পর, অনেক প্রাক্তন মাওবাদী এবং ভাসানীর সমর্থকরা নতুন দলে যোগ দেন। তারা ভারতবিরোধী এবং চীনপন্থী ছিল। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের সময় সিপিবি তার জনপ্রিয়তা ফিরে পায়। ১৯৯১ সালে, তারা আজকের এনসিপির মতো পাঁচটি আসন জিতেছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর, সিপিবি দুটি উপদলে বিভক্ত হয়ে যায় এবং একটি উপদলে দল ভেঙে দেয় । এর ফলে সিপিবি ভেঙে যায়। কাজী জাফর এবং হায়দার আকবর খান রনো একটি শ্রমিক দল ( Workers' Party)গঠন করেন। তারা শেখ হাসিনার সাথে জোটবদ্ধ ছিলেন এবং রাশেদ খান মেনন কারাগারে আছেন। রনো পরে সিপিবিতে ফিরে আসেন। জাসদ বিভিন্ন উপদলে বিভক্ত ছিল, যার মধ্যে সবচেয়ে বড়টি ছিল হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে, যিনি আওয়ামী লীগের সাথেই ছিলেন এবং এখন সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত। জাসদের একটি শাখা বাংলদেশ সমাজতন্ত্রী দল সক্রিয় ছিল।

সুতরাং, বাংলাদেশে কমিউনিস্টদের পতন ধর্মের সাথে খুব একটা সম্পর্ক রাখেনি; বরং, এটি একটি ঐক্যফ্রন্ট এবং রাজনৈতিক কৌশলের উপর একমত হতে না পারার কারণেই হয়েছিল। নতুন প্রজন্ম তৃণমূল স্তর থেকে কমিউনিস্ট আন্দোলনকে সংগঠিত করতে পারে যা বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জামাতের বিকল্প হিসেবে কাজ করবে। আমি এটি হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি।

রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ পয়েন্ট ~ শৈবাল বিষ্ণু


অরুণাভ আর আমি সেই ছোট্টবেলার বন্ধু। এক পাড়ায় বড় হয়েছি, দুর্গাপুরে কাছাকাছি আমাদের কোয়ার্টার, তাই একই মাঠে ফুটবল খেলি, একই স্কুলে যাই, একই ক্লাসে পড়ি। দুর্গাপুরের আরই কলেজেও একসাথে পাশ করি অরুণাভ রায়, আর আমি। আমি সাথে সাথেই দুর্গাপুর ষ্টীল প্ল্যান্টে চাকরী পেয়ে ঢুকে যাই। এখন উচ্চপদস্থ অফিসার। অরুণাভ ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স থেকে এমটেক করে আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে ওই দেশেই কিছু বছর চাকরী করে এখন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। এক মেয়ে, এক ছেলে, মেয়ে বড়, ডাক্তারী পড়ছে। ছেলে  ক্যালিফোরনিয়া ইউভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ওর বউও ওর ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতো। ওখানেই আলাপ। এখন চাকরী করে। ভরা সংসার। সুখী গৃহকোন।

 

কলেজে পড়তে ছোটবেলাতেই একটা নেশার মত শখ আমার আর অরুণাভর শুরু হয়, ফটোগ্রাফির। তখন ভাল ক্যামেরা ছিল না, রাশিয়ান জেনিত ক্যামেরা আমরা দুজন মিলে কিনেছিলাম। ছবি তুলতে আমরা কোথায় কোথায় না গেছি, ঘুরেছি। অরুণাভ এখনও যেখানেই যায়, সাথে একটা ছোট্ট মিররলেস ক্যামেরা থাকে। ক্যামেরা নিয়ে আমার নেশা কেটে গেছে। আমার ডিএসএলআর আর মিররলেস ক্যামেরা, দুটোই এখন মেয়ের জিম্মায়। ব্যাঙ্গালোরে। ছবি তোলার নেশায় আমরা সেসময়ে কত ঝুঁকিই না নিয়েছি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ছবি তুলতে গিয়ে গউর, মানে ভারতীয় বাইসনের তাড়াও খেয়েছি। তবে কে সেদিন জানত, সেই ছবি তোলার নেশাই একদিন অরুণাভর মৃত্যুর কারণ হবে।

 

আরুনাভরা প্রতি বছর একবার করে দেশে আসত, নিয়ম করে। তখনও ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক কাছাকাছি একটা ট্যুর করেই নিত, যতদিন ওর বউ শর্মিলা ওর বাপের বাড়ি, সেলিমপুরে থাকে।

 

কিন্তু এবারে অরুণাভ একাই এলো। জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি। কোন একটা কাজ নিয়ে এদিকে আসবে, জাপান আর ভারতে কিছু মিটিং আর সেমিনার আছে ওর। তার মাঝেই এক সপ্তাহের একটা ছুটি ম্যানেজ করেছে। দুজন মিলে দার্জিলিং যাওয়া হবে ঠিক হোল। সিঙ্গালীলাতে বার্ডিং করা হবে। এই সময়ে পাতা ঝরে যায়, পাখি দেখার সুবিধে। দার্জিলিং এর ছবি তোলা হবে। এই সময়ে আকাশ পরিস্কার থাকে। আর অতি অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘার বিভিন্ন রূপের ক্লোজ আপ!

 

দার্জিলিংয়ের ম্যাল থেকে মহাকাল মন্দিরের রাস্তা দিয়ে আরেকটু গিয়ে ডানদিকে, ভিউ পয়েন্টের একটু আগেই হোটেলটা। ঘর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে হাঁটলে ভিউ পয়েন্ট কয়েক পা।

 

সেদিন বেশ ঠান্ডা, পাহাড়ের ওপরে নিশ্চই বরফ পরেছে। আকাশ পুরোপুরি পরিস্কার। মেঘের লেশমাত্র নেই। সেদিন পূর্ণিমাও। গোল একটা চাঁদ উঠেছে আকাশ জুড়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘা সেই পূর্ণিমার চাঁদের মায়াবি আলোয় তার রূপের তুঙ্গে বিচরণ করছে। সে এক মায়াভরা সন্ধ্যাঅরুণাভ বললো চল রাত্তির হলে ভিউ পয়েন্টে গিয়ে ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে পূর্ণিমার আলোয় মায়াবি কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলবো। সারে এগারোটার মধ্যে দার্জিলিংয়ের বাকি আলো নাকি নিভে যাবে, অরুণাভ হোটেলের লোকাল মানুষজনের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে। ওরা অরুণাভকে সাবধান করে দিয়েছে, রাজভবনের দিক থেকে আসা কোন ঘোড়ার খুরের শব্দ পেলে যেন সেদিকে না তাকায়, উপেক্ষা করে, পারলে সরে যায়। লুকিয়ে থাকে। আর কিছু ভেঙে বলেনি তারা।

 

আমরা সারে এগারোটার আগেই ওখানে পৌঁছে, ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চ গুলোতে বসে বসে ফ্লাস্কে আনা কফি খাচ্ছি। অরুণাভ ওর একটা ফুল ফ্রেম ক্যামেরা, বড় লেন্স সেট করে, ট্রাইপডের ওপরে লাগিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাক করে রেখেছে। ক্যামেরার রিমোট দিয়ে মাঝে মাঝে ছবি তুলছে। অন্য ছোট মিররলেস ক্যামেরা দিয়েও ছবি তুলছে, এদিক ওদিক। এই মিররলেস ছোট ক্যামেরাটা হাতেই আছে ওর। আস্তে আস্তে সব আলো নিভে আসছে। স্পষ্ট হচ্ছে আকাশের তারারা। স্পষ্ট হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তার রূপ খুলছে। এ এক অপার্থিব দৃশ্য। এরকম আগে কোনদিন দেখিনি। আর দেখবও না।

 

ওদিকে প্রচন্ড ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আমি ঠিক করলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে দুটো কম্বল নিয়ে আসি। না হলে আর থাকা যাচ্ছে না। ঘড়িতে পোনে বারোটা বাজে। রুমে এসে দুটো কম্বল নিয়ে আমি বেরোচ্ছি, হটাৎ শুনি একটা গুলির শব্দ। ডান দিক থেকে। ওই ভিউ পয়েন্টের দিক থেকেই। দৌড়ে বেরোতে বেরোতেই শুনলাম ডান দিক থেকে, মানে রাজভবন, ভিউ পয়েন্টের দিক থেকে বাঁ দিকে, মানে ম্যালের দিকে একটা ঘোড়ার খুরের ঠকাঠক আওয়াজ। হোটেল থেকে বেরোতে বেরোতেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজটা মিলিয়ে গেল। দৌড়ে পৌঁছলাম। ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চে অরুণাভ শুয়ে আছে। হাতে ক্যামেরা। বুকের কাছে চাপ চাপ রক্ত। অন্ধকারে কালো রঙের লাগছে। নিশ্বাসের কোন চিহ্ন নেই।

 

জানুয়ারীর রাত্তিরে দার্জিলিং নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত। অনেক হৈচৈ করে ফোনাফোনি করে কিছু মানুষ পাওয়া গেল। দার্জিলিং ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালের এমার্জেন্সির ডাক্তার বললেন, ব্রট ডেথ। অরুণাভ নেই।

 

যেসব লোকাল মানুষজন ওখানে ছিল, তারা বললো যে ডাক্তার সাহেব গুলি করেছেন। উনি ঘুরে বেড়ান রাত্তিরের দিকে, ঘোড়ায় চড়ে। অ্যান্ডারসন সাহেব। বৃটিশ আমলের ডাক্তার। কোন কারণে নিজেই নিজেকে গুলি করে মারা যান। আজকের দিনেই। তেরোই জানুয়ারী। থাকতেন ম্যালের ওপরেই। উনিই নাকি একটা টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে এইদিনে ঘুরে বেড়ান ম্যাল থেকে এখনকার এনসিসি রোড ধরে, এখনকার রাজভবন হয়ে, ম্যাল রোড দিয়ে গোল চক্কর লাগিয়ে ফিরে আসেন। সাথে থাকে ওনার রাইফেল। অনেকেই নাকি দেখেছে।

 

বেশ কিছু সপ্তাহ হয়ে গেছে। মৃত্যুর কারণ বন্দুকের গুলি, সেটা জানা গেছে। কিন্তু কার গুলি, কিসের গুলি, সেই রিপোর্ট এলো অনেকদিন পরে।

 

পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর ডেকেছিল। যেটুকু যতটা জানি বললাম। ওনারা বললেন, এরকম নাকি হতেই পারেনা। অরুণাভকে যে বন্দুক আর কার্তুজ দিয়ে মারা হয়েছে, সেসব বহুবছর তৈরী হয়না। সেসব ভিন্টেজ। একমাত্র মিউজিয়ামে আছে। আর কোথাও নেই।

 

ওনারা বললেন, অরুণাভর মৃত্যু হয়েছিল যে বন্দুক দিয়ে তার নাম লী-এনফিল্ড রাইফেল। বৃটিশ আমলের। ইছাপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে তৈরী। আর পাওয়া গেছে একটা .৩০৩ কার্তুজ। পুনাতে তৈরী হয়েছিল অন্তত একশ বছর আগে। সেও বৃটিশ আমলের। ওনারা আরও বললেন, অরুণাভর মিররলেস ক্যামারাতে শেষ তিনটে ছবি রাস্তার, ভিউ পয়েন্টের পাশের রাস্তার দিকে তাক করে। ফ্রেমে সামনে রাস্তা পেছনে দেওয়ালের মত পাহাড়। আর কিছু নেই। তিনটে ছবিই তাই। তার আগের সবকটা ছবি কাঞ্চনজঙ্ঘার! 

 

 

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বর্ষাকাল, পাহাড়, আর একজন সাহেব ভূত ~ শৈবাল বিষ্ণু

দার্জিলিং এর ম্যাল রোডে ঠিক যেখানে এখন শ্যালেট হোটেল আছে, সবুজ রঙা বাড়িটা, নিচে বইয়ের দোকান, ঠিক সেখানেই থাকতেন এন্ডারসন সাহেব। পেশায় ডাক্তার, নেশায় পর্বতপ্রেমী। সে একশো বছরেরও আগের কথা। 

তবে যদি আপনি গহীন বর্ষায়, এই ধরুন জুলাইয়ের মাঝামাঝি, যখন টানা সাত দিন ধরে বর্ষা চলছে, যেন মনে হচ্ছে কেউ বালতি বালতি জল ঢালছে ছাদের ওপরে, সেই সময়ে গিয়ে পড়েন ওইখানে, আর রাত্তিরের দিকে এই ধরুন এগারো সারে এগারোটা নাগাদ ওইদিকে ভুল করেও তাকিয়ে দেখেন, খুব সম্ভব আপনি এন্ডারসন সাহেব কে পায়চারি করতে দেখতে পাবেন। উইন্ডামেয়ার হোটেলের সামনের চাতালটা থেকে দেখাই নিরাপদ। সাহেব ভূত বলে কথা, বেশী কাছে না যাওয়াই ভাল। তাও আবার ওনার সান্ধ্যভ্রমন হয়নি, তাই নিচের বারান্দাতেই পায়চারি করতে হচ্ছে, মনটা ওনার নিশ্চই তিতকূটে হয়েই আছে।

কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এন্ডারসন সাহেব পায়চারি করছেন ঠিকই কিন্তু ওনার গোড়ালি আর নিচে পায়ের পাতা দেখা যাচ্ছে না। জুতোর দেখা নাই।

আসলে কি হয়েছে। উনি আগের বারান্দাটার ওপরেই পায়চারি করে চলেছেন। উনি তো আর জানেন না যে, বারান্দাটা ওনার মৃত্যুর পরে আরো এক থাক ইঁটের স্তর দিয়ে অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। 

ওনার এতসব জানার কথা নয়। তাই উনি আগের ছয় ইঞ্চি নিচু বারান্দার ওপরেই পায়চারি করেন। আর তাই ওনার গোড়ালির নিচের অংশ আর জুতো মোজা, পায়ের পাতা দেখা যায়না ইদানিং। বিশ্বাস না হলে এই জুলাইতেই চেষ্টা করে দেখতে পারেন!

রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ ~ অবীন দত্তগুপ্ত

এস আই আর প্রসঙ্গে এক শ্রেনীর বামপন্থীর মতামত হলো, সি পি আই এম ভোটার হেল্পডেস্ক করে ঠিক করে নি। তাতে নাকি আদতে এস আই আর, যা বিজেপির মানুষকে ডিস ফ্র‍্যাঞ্চাইজ করার একটি নক্কার জনক প্ল্যান, তাকে লেজিটিমাইজ করা হয়। 

এই একি লোকজন এস আই আর এর বিরুদ্ধে তৃণমুলের প্রথম মিছিলকে বাহবা জানালেও,এইটা কোথাও লিখছেন না যে 

১. বাংলায় এস আই আর হেল্পডেস্ক সবচেয়ে বেশি চালিয়েছে তৃণমুল এবং 

২. এস আই আর প্রগ্রেসন দেখে তারা সারা রাজ্যে ইয়েস স্যার নামক ফ্লেক্সে মুড়ে দেয়। 

এবার আসা যাক এস আই আর হেল্পডেস্ক এর কথায়। বাংলায় একমাত্র একটি দল ভোটার হেল্পডেস্ক চালায় নি। সেটা বিজেপি। সি পি আই এম ব্যাপক ভাবে চালিয়েছে, তৃণমুল চালিয়েছে আরো বেশি, কংগ্রেস - আই এস এফ প্রত্যেকে চালিয়েছে। কেন চালিয়েছে?  এবং ভোটার হেল্পডেস্ক চালানো মানেই সি পি আই এম এস আই আর সমর্থন করছেন এ কথা যারা বলছেন,তারা তৃণমুলের নাম মুখে আনছেন না কেন?  তৃণমুল আপনাদের ভাসুরঠাকুর হয়?  

তৃণমুল কেন করেছে আমি জানি না। আমাদের হেল্পডেস্ক কেন চলেছে আমরা জানি। সি পি আই এম হেল্পডেস্ক চালিয়েছে, যাতে একজন  বৈধ ভোটারের নাম-ও ডকুমেন্টাল মিসম্যাচের কারণে বিজেপির ইলেকশন কমিশন না কাটতে পারে৷ এবং একি সাথে ভুয়া ভোটার (ডেড সিফটেড ডুপ্লিকেট) যাতে সরানো সম্ভব হয়।(আমাদের তথাকথিত প্রবল বামেদের এতে অসুবিধে আছে। কেন ভুয়া ভোটার কমবে?)   তৃণমুল কিছুদিনেই বুঝে যায় যে এই একি কাজ তাদের ও করতে হবে, এবং রীতিমতো এপ নামিয়ে এই কাজ করে। তো তার ফলস্রুতিতে ৫৮ লাখ ভুয়া নাম বাদ যায়, যার মধ্যে বেশির ভাগ অ বাঙালি। 
এই পুরো হেল্পডেস্ক প্রসেসে সি পি আই এম এস আই আর নিয়ে তাদের বিরোধিতা বজায় রাখে, এবং হেল্পডেস্ক ব্যবহার করে মানুষকে জানাতে কেন বিরোধিতা করা প্রয়োজন। 

মনে রাখবেন, এই অবস্থা পর্যন্ত, মানুষের বেশির ভাগ এস আই আর নিয়ে কোন অভিযোগ ছিল না। সং্খ্যালঘু অঞ্চলে প্রায় ১০০% ম্যাপিং ছিল।  এই পর্যায়ের পরে বিজেপি যখন দেখলো দেড় কোটি রোহিঙ্গার ফানুস ফেটে গেছে, যখন দেখল মতুয়ারা (যাদের সি এ এ র গাজর দেখানো হয়েছিল) তারাই সবচেয়ে বেশি এফেক্টেড, যখন দেখল ডুপ্লিকেট ভোটারের মধ্যে অবাংালি বিজেপির ভোটার বেশি, তখন তারা স্ট্র‍্যাটেজি পাল্টালো। 

২০০২ এর সাথে ম্যাপিং থাকলে কাউকে হিয়ারিং এ ডাকা হবে না, নিজেদের এই স্টেটমেন্ট কে নাল এন্ড ভয়েড করে দিয়ে, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নাম লাখ লাখ মানুষকে আক্রমণ করা শুরু করলো। মূলত সং্খ্যালঘু মানুষ টার্গেট হলেও, সংখ্যাগুরুরাও আক্রান্ত হলেন। এবং একটা প্যাটার্ন ফলো হলে। যেখানে বিজেপি নেই সেই বুথে ভোটার কমাও।  এবার প্রতিটা দল-ই গিয়ার চেঞ্জ করল। এতদিন ডেপূটেশন, বক্তব্য,লিফ্লেট দিয়ে যে বিরোধিতা ছিল তা আক্রমনাত্মক হলো। সি পি আই এম একের পর এক বিডিও অফিস ঘেরাও করতে আরম্ভ করলো। 

এইবার সেইসব 'বামপন্থীরা' লাইন নামালেন,সি পি আই এম প্রথম থেকে বিরোধিতা করলো না কেন? এই ক্রনোলজি তাদের বোঝার জন্য। পিট সিগারের একটা গান আছে ,যার মূল কথা 'দেয়ার ইজ আ টাইম ফর এভ্রিথিং '।  আ টাইম ফর লাভ এন্ড আ টাইম ফর হেট। সি পি আই এম প্রথম থেকেই এস আই আরের বিরধিতা করেছিল।  সেন্সাস ছাড়া এস আই আরের প্রসঙ্গ, ভোটার লিস্টের সাথে নাগরিকত্ব জুড়ে ঘুর পথে এন আর সির প্রচেষ্টা, কারা কারা বিপদে পড়বে - সবটাই। কিন্তু এগসিস্টিং ফ্রেমওয়ার্ককে ব্যবহার করে আক্রমণ ভোতা করে দিতে পেরেছিল। মানুষের মধ্যে এস আই আর নিয়ে অসন্তোষ না থাকলে তো আন্দোলনের পারদ বাড়বে না। যখন আক্রমণ বেড়েছে তখন প্রতিরোধ ও বেড়েছে। 



না বোঝার মতো কঠিন কিছু নয়।

শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

বেলিফুলের সুবাস

রোদ তখনও মাঠের ওপর ট্যারচা হয়ে পড়ছে, পেছনের সাল গাছের নিচু ডালটার ওপর সে রোদ এক লাফে উঠে পড়লেই, এই নবম দশম শ্রেণীর কয়েকটি কিশোর সেদিনের মতো খেলা শেষ করে যে যার ঘরে ফিরে যাবে। দুপাশে সারি দিয়ে কমলা হলুদ রঙা কোয়ার্টার, সামনে একটা করে ফুল বাগান, হালকা বেলি ফুলের সুবাস। সেদিকে মন নেই রনির। চারিপাশে কোয়ার্টারগুলোর মাঝে কচি দেখে একটা খেলার মাঠ, সরস্বতী পুজো থেকে হাফ প্যাডেল সাইকেল শেখা, সবই এখানেই। আজকের খেলাটাও। রনির পায়ে ফুটবল, সামনে বুবুন। বাম পায়ের হালকা ভাজে বুবুন কেটে গেল, সামনে টুকুন। দুটো ছোট্ট ছোট্ট ডজ দিতেই টুকুন ধুলোয়, মাটিতে। সামনে অজয় আটকাতে আসতেই ওর দুপায়ের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়ে দিল রনি। সামনে ফাঁকা গোল। আর মাত্র একটা টাচ, ব্যাস! কিন্তু এটা কে? সামনে এটা কে! কাকে কাটাতে হবে! অনির সামনে ওরই বয়সী .... মেয়েটির নাম জানতে জানতেই আরো একটা বছর ঘুরে যাবে। নিশ্বাস যেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো। স্ট্যাচু হয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে রনি যেন কয়েক যুগ স্থির হয়ে থাকল। ওদিকে বল তো পরে থাকলো দুজনের মাঝখানে, শুধু রনির হৃদয় টা লাব ডাব করতে করতে তিনটে চারটে ড্রপ খেয়ে মেয়েটির জিম্মায় চলে গেল। 

আসলে ওই আরেকটু দূরের কোয়ার্টার গুলো থেকে মার্কেটে যেতে হলে শর্টকাট এই মাঠের মধ্যে দিয়েই। তাই আরো কয়েকবার এই মাঠেই দেখা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলনা। আর নাম ঠিকানাটাও জানা হচ্ছেনা, হলনা। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও ভরসা হয়না, যদি সবাই জেনে যায়। তারপর যদি ওদিক থেকে নাকচ হয়, তাহলে মুখ দেখাবার জায়গাটাও থাকবেনা। সাইকেল নিয়ে টই টই করে ঘুরেও আর তোমার দেখা নাই অবস্থা।

সেই পুজোতে ফাঁকা ফাঁকা মনমরা নবমীর দিন দুপুরে হঠাৎ সে! জিন্স পড়েছে বলে কেউ টিপ্পনী কাটলো, তাই ওদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল। এবার অনেক কসরত করে ঠিকানাটা আন্দাজ করা গেল, চার নাম্বার স্ট্রিটের দশ বা বারো নাম্বার কোয়ার্টার। আরো মাস কয়েক লাগলো নাম জানতে, পলি। ভালো নাম জানতে জানতে মাধ্যমিকের রেজাল্টও বেরিয়ে গেল। 

একই স্কুলের দুই শিফটে দুজনের ইলেভেন টুয়েলভ, তাও দেখা হয়না কোথাওই। টিউশনও আলাদা জায়গায়। দুবছরে অনেক লেবার দিয়ে বার চারেক দেখা হল, আর প্রত্যেকবারই দেখামাত্রই শ্বাস প্রশ্বাস পুরোপুরিই বন্ধ। এর মধ্যে অল্পবিস্তর নোট থেকে শুরু করে ক্লিফ রিচার্ডসএর ক্যাসেট বা আর্চিস কার্ড আদান প্রদান, প্রদানই মূলত। 

এগারো বারো শেষ। রনি চলল ইঞ্জিনিয়ার হতে সেই সুদূর দক্ষিণে, পলি চলল ডাক্তার হতে। দুজনেই নিজেদের শহর ছেড়ে নতুন জায়গায়। ভবিষ্যত গড়তে। রনির পুজোর ছুটি বলে কিছু নেই। চিঠিতে কার্ডে বলার চেষ্টা করেছে এই কয় মাসে, কিন্তু কোনই উত্তর নেই! সেমিস্টারের শেষে প্রায় ছয় মাস পরে ফিরেই ছুটলো পলির বাড়িতে, যা থাকে কপালে, বলেই দেবে, আর তো জমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা নিজের কাছে।

 অনেক চেষ্টা করেও রনি আর খুঁজে পেলনা পলিকে। ওরা এই কোয়ার্টার ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, অন্য কোয়ার্টারে নাকি অন্য শহরে, কেউই বলতে পারলোনা। বন্ধুদের মাধ্যমে কলেজে খোঁজ নিয়েও চেষ্টা কম করেনি রনি। কিন্তু যেন, হওয়ায় উবে গেছে পলি, কোত্থাও কিছুতেই দেখতে পাওয়া গেলনা। তারপর চার বছর ধরে প্রতিবার বাড়ি ফিরে চেষ্টা করে গেছে একবার যোগাযোগ করতে, কিন্তু দেখা হয়নি। বলাও হয়নি।



এইভাবেই রনি আর পলি, দুজনের রাস্তা  সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলল, কিন্তু আর একসাথে হলনা। তখনও অরকুট ফেসবুক মোবাইল আসেনি, এসব থাকলে কি আর এরকম দশা হত।

ইঞ্জিনিয়ারিং আর এমবিএ করে, প্রভাব প্রতিপত্তি আর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটে গেল সারা জীবন। শুধুই সামনের দিকে তাকিয়ে ছুটে চলা, পেছনে তাকানোর অবসর আর কই। অল্প বয়সেই মা বাবা কে হারানোর জন্যে, বিয়েটাও করা হয়ে উঠলনা। তবে রনি হয়ে উঠলো রনজয় দাশগুপ্ত।

পলিও জানতে পারেনি কোনোদিন। মনের মধ্যে একটা নরম স্মৃতিটুকু শুধু কাছ ছাড়া করেনি। পরীক্ষার পর পরীক্ষা, দিন রাত্তির খাটনি, নিরন্তর ঘাড় গুঁজে কাজ করতে করতে, কখন যে কিভাবে বিয়েটা না হয়ে গেলো, টিকলো না, তবে হয়ে উঠলো ডাঃ পৌলমী সেন।

পলি আর রনি একটু সুসময়ের খোঁজে জীবনের ঝড় ঝঞ্ঝা রোদ বৃষ্টি গুলো সইতে সইতে শুধুই সামনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেছে। মনে মনে হয়তো চেয়েছিল দুদণ্ড শান্তি। মুখোমুখি, কথা বলার, চেনার, চেয়ে থাকার!

আগামী কাল রনির বড় সার্জারী। এ্যানেসথেটিক চেক আপ আজ সকালেই। ডাক্তারের নামটা দেখেই পেটের ভিতরে ফুরফুরিয়ে কয়েকটা প্রজাপতি উড়তে থাকলো! দুজনের দেখাও হলো। বেলিফুলের সুবাস কি এতগুলো বছর পেরিয়ে ভেসে এলো? অন্তত সাইতিরিশ বছর পর! সার্জারির আগের দিন সন্ধ্যে বেলা কেবিনে বসে দুজনে কথা বলল! প্রাণ খুলে। পরের দিন রনির সার্জারীও হয়ে গেল। রনজয় দাশগুপ্ত কে সার্জারী করেছিলেন, না ডাঃ পৌলমী সেন নন, অন্য একজন ডাক্তার।

পুরোনো বন্ধুরা আলোচনা করছিল, শুধু জানা হলনা রনি আর পলি কি দুজনে দুজনকে সত্যি ভালবেসেছিল? দুজনে দুজনকে বলতে পেরেছিল? দুজনের কি দেখা হয়েছিল আর, সম্ভবই না।

কারণ, সেদিন হাসপাতালে ওদের দেখা তো হয়নি। পলি বহুবছর হল নেই, আর আজ থেকে রনিও নেই! তাই আজ আর জানার কোনো উপায়ও নেই! হায়রে কল্পনা, আর কল্পনা নিয়ে বাঁচা!

বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬

হল্লা বোল ~ অরিজিত গুহ

দিল্লির সেন্ট স্টিফেন কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রটি পড়াশোনার ফাঁকেই কিভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছিল এসএফআই আর আইপিটিএ'র সাথে। পড়াশোনার পাশাপাশি চুটিয়ে চলত নাটকে অভিনয়। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর যখন সিপিআই(এম) এর সদস্য পদ পেল তখন নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি শুরু হয়ে গেছে কবিতা লেখা, নাটক লেখা, বাচ্চাদের জন্য গল্প লেখা। 
    ৭০ সালের একটা পথ নাটক কাঁপিয়ে দিয়েছিল দিল্লি আর আশেপাশের অঞ্চল। একজন রাজা, তিনি যেখানেই যান, সাথে তাঁর সিংহাসনটা নিয়ে ঘোরেন। যদি কখনো সেটা বেহাত হয়ে যায় সেই ভয়ে।


     ইন্দিরা গান্ধীর কুর্সির প্রতি আশক্তিকে ব্যঙ্গ করে 'কুর্সি, কুর্সি, কুর্সি' নাটকটা নিউ দিল্লির বোট ক্লাবের লনে প্রতি সপ্তাহে অভিনীত হত। সেখান থেকেই উঠে আসে 'জন নাট্য মঞ্চ' বা সংক্ষেপে 'জনম' গ্রুপ তৈরি করার চিন্তা ভাবনা। 
    ৭৫ সাল অব্দি জনম একের পর এক পথ নাটক করে গেছে যেসব নাটকের মূল সুর ছিল শ্রমজীবী মানুষ৷ 
     সাধারণতই পছন্দ হয় নি শাসকদের। ৭৫ এ এমার্জেন্সি ঘোষণা করার পর দেশে সমস্ত রকম রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিটি বন্ধ করে দিতে হয়। সাথে সাথে রাজনীতির গন্ধ যেখানে রয়েছে সেসবও বন্ধ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই জনমের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়৷ সেই সময়ে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে গাঢ়োয়াল ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন সফদার হাশমি। 
     এমার্জেন্সি উঠে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসেন মানুষের মাঝে রাস্তায়। শুরু হয় 'আওরত', 'মেশিন' ইত্যাদির মত যুগান্তকারী পথ নাটক।
   ১৯৮৯ সালের ১লা জানুয়ারি, বছরের প্রথম দিন, দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের ঝাণ্ডাপুরে লোক ভেঙে পড়েছে সিআইটিইউ আর কিষান সভার উদ্যোগে শ্রমিক আর কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে তৈরি পথনাটক 'হাল্লা বোল' দেখার জন্য৷
    ইতিমধ্যে নাটকটার কথা ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লি ছাড়িয়ে উত্তর প্রদেশের দারিদ্র্য সমন্বিত বিভিন্ন অঞ্চলে। খেটে খাওয়া মানুষ তাঁদের প্রতিদিনের লড়াইকে উঠে আসতে দেখছে নাটকের দৃশ্যে। কিন্তু মানুষকে এভাবে প্রভাবিত করলে যে কায়েমী স্বার্থে আঘাত লাগবেই! সেই কায়েমী স্বার্থের আঘাত তারা ফিরিয়ে দিল সফদারকে পিটিয়ে মেরে। 
    কংগ্রেসি গুণ্ডাবাহিনী নাটকের ওপর হামলা চালাল। গাজিয়াবাদ মিউনিসিপালিটি নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী রামানন্দ ঝা এর সমর্থনে চলছিল সেই নাটকের শো৷ কংগ্রেসি প্রার্থী মুকেশ কুমারের গুণ্ডার দল নৃশংসভাবে পেটাল নাটকের দলকে। ঘটনাস্থলে সাথে সাথেই মারা গেল নেপালী অভিনেতা রাম বাহাদুর। সফদারকে ভর্তি করা হল রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে। 
    সেই রাতে হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছিল সফদারের বন্ধু সহমর্মীরা। হাসপাতাল লাগোয়া পার্ক আর বাস স্ট্যান্ড সেদিন ভরে গেছিল মানুষে। শুধু মানুষ আর মানুষ। সফদার হাশমির টানে ছুটে এসেছে সবাই। ছুটে এসেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, কিন্তু লোকের প্রবল বিক্ষোভে তিনি আর ঢুকতে পারেন নি ভেতরে।  মৃত্যুর সাথে লড়াই করে পরদিন মারা যান সফদার। থেমে গেছিল কালের কন্ঠ। কিন্তু থামানো যায় নি হাল্লা বোলকে। দুদিন পর সেই একই জায়গায় সফদারের বন্ধু কমরেড ও স্ত্রী মলয়শ্রী হাশমি কমরেডের মৃত্যু শোক নিয়েই মঞ্চস্থ করেন হাল্লা বোল। 
   সফদার বা সফদারদের আসলে মৃত্যু হয় না। যতই ১লা জানুয়ারি আসুক, সফদাররা মরবে না। ওরা বেঁচে থাকবে কলে কারখানায় ক্ষেত খামারে। 

   সফদারের স্মৃতিতে আনন্দ পটবর্ধন একটা কবিতা লিখেছিলেন, সেই মূল কবিতা আর তার অনুবাদটা এখানে দিলাম।

'বাবরি মসজিদ ভাঙতে তুমি দেখো নি
তুমি দেখো নি তার পরের হিংসা আর ঘৃণাকে
তুমি রামাবাঈ আর অন্যান্য দলিতের মৃত্যু দেখো নি
পরমাণু বোমার জন্য দেশের আকুলতা তুমি দেখো নি
২০০২ এ গুজরাটের সাম্প্রদায়ীক হিংসা তুমি দেখো নি
প্রতিবেশি পাকিস্তানে তালিবানের উৎপত্তি তুমি দেখো নি
আর এখানে তুমি হত্যাকারীর রাজ্যাভিষেক দেখো নি
আমরা যারা এখনো বেঁচে রয়েছি তারা এগুলো সব দেখেছি
কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না।'

"So you missed the demolition of the Babri Masjid
And the violence and hate that followed
You missed Ramabai and other Dalit massacres
You missed your nation's love for the atom bomb
In 2002, you missed the Gujarat pogrom
And in neighbouring Pakistan you missed
The creation of the Taliban and here
This year you missed the coronation of killers

We who survived you missed none of these
We missed you."

কমরেড সফদার হাশমি অমর রহে