রবিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

কাঞ্চনজঙ্ঘার ভিউ পয়েন্ট ~ শৈবাল বিষ্ণু


অরুণাভ আর আমি সেই ছোট্টবেলার বন্ধু। এক পাড়ায় বড় হয়েছি, দুর্গাপুরে কাছাকাছি আমাদের কোয়ার্টার, তাই একই মাঠে ফুটবল খেলি, একই স্কুলে যাই, একই ক্লাসে পড়ি। দুর্গাপুরের আরই কলেজেও একসাথে পাশ করি অরুণাভ রায়, আর আমি। আমি সাথে সাথেই দুর্গাপুর ষ্টীল প্ল্যান্টে চাকরী পেয়ে ঢুকে যাই। এখন উচ্চপদস্থ অফিসার। অরুণাভ ব্যাঙ্গালোরের ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স থেকে এমটেক করে আমেরিকার প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি করে ওই দেশেই কিছু বছর চাকরী করে এখন স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়। এক মেয়ে, এক ছেলে, মেয়ে বড়, ডাক্তারী পড়ছে। ছেলে  ক্যালিফোরনিয়া ইউভার্সিটিতে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে। ওর বউও ওর ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করতো। ওখানেই আলাপ। এখন চাকরী করে। ভরা সংসার। সুখী গৃহকোন।

 

কলেজে পড়তে ছোটবেলাতেই একটা নেশার মত শখ আমার আর অরুণাভর শুরু হয়, ফটোগ্রাফির। তখন ভাল ক্যামেরা ছিল না, রাশিয়ান জেনিত ক্যামেরা আমরা দুজন মিলে কিনেছিলাম। ছবি তুলতে আমরা কোথায় কোথায় না গেছি, ঘুরেছি। অরুণাভ এখনও যেখানেই যায়, সাথে একটা ছোট্ট মিররলেস ক্যামেরা থাকে। ক্যামেরা নিয়ে আমার নেশা কেটে গেছে। আমার ডিএসএলআর আর মিররলেস ক্যামেরা, দুটোই এখন মেয়ের জিম্মায়। ব্যাঙ্গালোরে। ছবি তোলার নেশায় আমরা সেসময়ে কত ঝুঁকিই না নিয়েছি। পশ্চিমঘাট পর্বতমালায় ছবি তুলতে গিয়ে গউর, মানে ভারতীয় বাইসনের তাড়াও খেয়েছি। তবে কে সেদিন জানত, সেই ছবি তোলার নেশাই একদিন অরুণাভর মৃত্যুর কারণ হবে।

 

আরুনাভরা প্রতি বছর একবার করে দেশে আসত, নিয়ম করে। তখনও ক্যামেরা নিয়ে এদিক ওদিক কাছাকাছি একটা ট্যুর করেই নিত, যতদিন ওর বউ শর্মিলা ওর বাপের বাড়ি, সেলিমপুরে থাকে।

 

কিন্তু এবারে অরুণাভ একাই এলো। জানুয়ারী মাসের মাঝামাঝি। কোন একটা কাজ নিয়ে এদিকে আসবে, জাপান আর ভারতে কিছু মিটিং আর সেমিনার আছে ওর। তার মাঝেই এক সপ্তাহের একটা ছুটি ম্যানেজ করেছে। দুজন মিলে দার্জিলিং যাওয়া হবে ঠিক হোল। সিঙ্গালীলাতে বার্ডিং করা হবে। এই সময়ে পাতা ঝরে যায়, পাখি দেখার সুবিধে। দার্জিলিং এর ছবি তোলা হবে। এই সময়ে আকাশ পরিস্কার থাকে। আর অতি অবশ্যই কাঞ্চনজঙ্ঘার বিভিন্ন রূপের ক্লোজ আপ!

 

দার্জিলিংয়ের ম্যাল থেকে মহাকাল মন্দিরের রাস্তা দিয়ে আরেকটু গিয়ে ডানদিকে, ভিউ পয়েন্টের একটু আগেই হোটেলটা। ঘর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়। হোটেল থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে হাঁটলে ভিউ পয়েন্ট কয়েক পা।

 

সেদিন বেশ ঠান্ডা, পাহাড়ের ওপরে নিশ্চই বরফ পরেছে। আকাশ পুরোপুরি পরিস্কার। মেঘের লেশমাত্র নেই। সেদিন পূর্ণিমাও। গোল একটা চাঁদ উঠেছে আকাশ জুড়ে। কাঞ্চনজঙ্ঘা সেই পূর্ণিমার চাঁদের মায়াবি আলোয় তার রূপের তুঙ্গে বিচরণ করছে। সে এক মায়াভরা সন্ধ্যাঅরুণাভ বললো চল রাত্তির হলে ভিউ পয়েন্টে গিয়ে ক্যামেরা ট্রাইপডে বসিয়ে পূর্ণিমার আলোয় মায়াবি কাঞ্চনজঙ্ঘার ছবি তুলবো। সারে এগারোটার মধ্যে দার্জিলিংয়ের বাকি আলো নাকি নিভে যাবে, অরুণাভ হোটেলের লোকাল মানুষজনের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জেনেছে। ওরা অরুণাভকে সাবধান করে দিয়েছে, রাজভবনের দিক থেকে আসা কোন ঘোড়ার খুরের শব্দ পেলে যেন সেদিকে না তাকায়, উপেক্ষা করে, পারলে সরে যায়। লুকিয়ে থাকে। আর কিছু ভেঙে বলেনি তারা।

 

আমরা সারে এগারোটার আগেই ওখানে পৌঁছে, ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চ গুলোতে বসে বসে ফ্লাস্কে আনা কফি খাচ্ছি। অরুণাভ ওর একটা ফুল ফ্রেম ক্যামেরা, বড় লেন্স সেট করে, ট্রাইপডের ওপরে লাগিয়ে কাঞ্চনজঙ্ঘার দিকে তাক করে রেখেছে। ক্যামেরার রিমোট দিয়ে মাঝে মাঝে ছবি তুলছে। অন্য ছোট মিররলেস ক্যামেরা দিয়েও ছবি তুলছে, এদিক ওদিক। এই মিররলেস ছোট ক্যামেরাটা হাতেই আছে ওর। আস্তে আস্তে সব আলো নিভে আসছে। স্পষ্ট হচ্ছে আকাশের তারারা। স্পষ্ট হচ্ছে কাঞ্চনজঙ্ঘা। তার রূপ খুলছে। এ এক অপার্থিব দৃশ্য। এরকম আগে কোনদিন দেখিনি। আর দেখবও না।

 

ওদিকে প্রচন্ড ঠান্ডা লাগতে শুরু করেছে। আমি ঠিক করলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে দুটো কম্বল নিয়ে আসি। না হলে আর থাকা যাচ্ছে না। ঘড়িতে পোনে বারোটা বাজে। রুমে এসে দুটো কম্বল নিয়ে আমি বেরোচ্ছি, হটাৎ শুনি একটা গুলির শব্দ। ডান দিক থেকে। ওই ভিউ পয়েন্টের দিক থেকেই। দৌড়ে বেরোতে বেরোতেই শুনলাম ডান দিক থেকে, মানে রাজভবন, ভিউ পয়েন্টের দিক থেকে বাঁ দিকে, মানে ম্যালের দিকে একটা ঘোড়ার খুরের ঠকাঠক আওয়াজ। হোটেল থেকে বেরোতে বেরোতেই ঘোড়ার খুরের আওয়াজটা মিলিয়ে গেল। দৌড়ে পৌঁছলাম। ভিউ পয়েন্টের বেঞ্চে অরুণাভ শুয়ে আছে। হাতে ক্যামেরা। বুকের কাছে চাপ চাপ রক্ত। অন্ধকারে কালো রঙের লাগছে। নিশ্বাসের কোন চিহ্ন নেই।

 

জানুয়ারীর রাত্তিরে দার্জিলিং নিস্তব্ধ, ঘুমন্ত। অনেক হৈচৈ করে ফোনাফোনি করে কিছু মানুষ পাওয়া গেল। দার্জিলিং ডিস্ট্রিক্ট হাসপাতালের এমার্জেন্সির ডাক্তার বললেন, ব্রট ডেথ। অরুণাভ নেই।

 

যেসব লোকাল মানুষজন ওখানে ছিল, তারা বললো যে ডাক্তার সাহেব গুলি করেছেন। উনি ঘুরে বেড়ান রাত্তিরের দিকে, ঘোড়ায় চড়ে। অ্যান্ডারসন সাহেব। বৃটিশ আমলের ডাক্তার। কোন কারণে নিজেই নিজেকে গুলি করে মারা যান। আজকের দিনেই। তেরোই জানুয়ারী। থাকতেন ম্যালের ওপরেই। উনিই নাকি একটা টাট্টু ঘোড়ায় চড়ে এইদিনে ঘুরে বেড়ান ম্যাল থেকে এখনকার এনসিসি রোড ধরে, এখনকার রাজভবন হয়ে, ম্যাল রোড দিয়ে গোল চক্কর লাগিয়ে ফিরে আসেন। সাথে থাকে ওনার রাইফেল। অনেকেই নাকি দেখেছে।

 

বেশ কিছু সপ্তাহ হয়ে গেছে। মৃত্যুর কারণ বন্দুকের গুলি, সেটা জানা গেছে। কিন্তু কার গুলি, কিসের গুলি, সেই রিপোর্ট এলো অনেকদিন পরে।

 

পুলিশের গোয়েন্দা দপ্তর ডেকেছিল। যেটুকু যতটা জানি বললাম। ওনারা বললেন, এরকম নাকি হতেই পারেনা। অরুণাভকে যে বন্দুক আর কার্তুজ দিয়ে মারা হয়েছে, সেসব বহুবছর তৈরী হয়না। সেসব ভিন্টেজ। একমাত্র মিউজিয়ামে আছে। আর কোথাও নেই।

 

ওনারা বললেন, অরুণাভর মৃত্যু হয়েছিল যে বন্দুক দিয়ে তার নাম লী-এনফিল্ড রাইফেল। বৃটিশ আমলের। ইছাপুর গান অ্যান্ড শেল ফ্যাক্টরিতে তৈরী। আর পাওয়া গেছে একটা .৩০৩ কার্তুজ। পুনাতে তৈরী হয়েছিল অন্তত একশ বছর আগে। সেও বৃটিশ আমলের। ওনারা আরও বললেন, অরুণাভর মিররলেস ক্যামারাতে শেষ তিনটে ছবি রাস্তার, ভিউ পয়েন্টের পাশের রাস্তার দিকে তাক করে। ফ্রেমে সামনে রাস্তা পেছনে দেওয়ালের মত পাহাড়। আর কিছু নেই। তিনটে ছবিই তাই। তার আগের সবকটা ছবি কাঞ্চনজঙ্ঘার। ও কি তাহলে অ্যান্ডারসন সাহেবের ছবি তুলতে চেয়েছিল! ঘোড়ায় চড়ে সত্যিই সাহেবের ভুত এখনও আসে? ওই দিনের ওই সময়ে? বন্দুক আর গুলিটাও তাহলে ডাক্তার অ্যান্ডারসন সাহেবেরই?

 

 

বুধবার, ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

বর্ষাকাল, পাহাড়, আর একজন সাহেব ভূত ~ শৈবাল বিষ্ণু

দার্জিলিং এর ম্যাল রোডে ঠিক যেখানে এখন শ্যালেট হোটেল আছে, সবুজ রঙা বাড়িটা, নিচে বইয়ের দোকান, ঠিক সেখানেই থাকতেন এন্ডারসন সাহেব। পেশায় ডাক্তার, নেশায় পর্বতপ্রেমী। সে একশো বছরেরও আগের কথা। 

তবে যদি আপনি গহীন বর্ষায়, এই ধরুন জুলাইয়ের মাঝামাঝি, যখন টানা সাত দিন ধরে বর্ষা চলছে, যেন মনে হচ্ছে কেউ বালতি বালতি জল ঢালছে ছাদের ওপরে, সেই সময়ে গিয়ে পড়েন ওইখানে, আর রাত্তিরের দিকে এই ধরুন এগারো সারে এগারোটা নাগাদ ওইদিকে ভুল করেও তাকিয়ে দেখেন, খুব সম্ভব আপনি এন্ডারসন সাহেব কে পায়চারি করতে দেখতে পাবেন। উইন্ডামেয়ার হোটেলের সামনের চাতালটা থেকে দেখাই নিরাপদ। সাহেব ভূত বলে কথা, বেশী কাছে না যাওয়াই ভাল। তাও আবার ওনার সান্ধ্যভ্রমন হয়নি, তাই নিচের বারান্দাতেই পায়চারি করতে হচ্ছে, মনটা ওনার নিশ্চই তিতকূটে হয়েই আছে।

কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখবেন, এন্ডারসন সাহেব পায়চারি করছেন ঠিকই কিন্তু ওনার গোড়ালি আর নিচে পায়ের পাতা দেখা যাচ্ছে না। জুতোর দেখা নাই।

আসলে কি হয়েছে। উনি আগের বারান্দাটার ওপরেই পায়চারি করে চলেছেন। উনি তো আর জানেন না যে, বারান্দাটা ওনার মৃত্যুর পরে আরো এক থাক ইঁটের স্তর দিয়ে অনেকটা উঁচু হয়ে গেছে। 

ওনার এতসব জানার কথা নয়। তাই উনি আগের ছয় ইঞ্চি নিচু বারান্দার ওপরেই পায়চারি করেন। আর তাই ওনার গোড়ালির নিচের অংশ আর জুতো মোজা, পায়ের পাতা দেখা যায়না ইদানিং। বিশ্বাস না হলে এই জুলাইতেই চেষ্টা করে দেখতে পারেন!

রবিবার, ১৮ জানুয়ারি, ২০২৬

এসআইআর নিয়ে প্রতিবাদ ~ অবীন দত্তগুপ্ত

এস আই আর প্রসঙ্গে এক শ্রেনীর বামপন্থীর মতামত হলো, সি পি আই এম ভোটার হেল্পডেস্ক করে ঠিক করে নি। তাতে নাকি আদতে এস আই আর, যা বিজেপির মানুষকে ডিস ফ্র‍্যাঞ্চাইজ করার একটি নক্কার জনক প্ল্যান, তাকে লেজিটিমাইজ করা হয়। 

এই একি লোকজন এস আই আর এর বিরুদ্ধে তৃণমুলের প্রথম মিছিলকে বাহবা জানালেও,এইটা কোথাও লিখছেন না যে 

১. বাংলায় এস আই আর হেল্পডেস্ক সবচেয়ে বেশি চালিয়েছে তৃণমুল এবং 

২. এস আই আর প্রগ্রেসন দেখে তারা সারা রাজ্যে ইয়েস স্যার নামক ফ্লেক্সে মুড়ে দেয়। 

এবার আসা যাক এস আই আর হেল্পডেস্ক এর কথায়। বাংলায় একমাত্র একটি দল ভোটার হেল্পডেস্ক চালায় নি। সেটা বিজেপি। সি পি আই এম ব্যাপক ভাবে চালিয়েছে, তৃণমুল চালিয়েছে আরো বেশি, কংগ্রেস - আই এস এফ প্রত্যেকে চালিয়েছে। কেন চালিয়েছে?  এবং ভোটার হেল্পডেস্ক চালানো মানেই সি পি আই এম এস আই আর সমর্থন করছেন এ কথা যারা বলছেন,তারা তৃণমুলের নাম মুখে আনছেন না কেন?  তৃণমুল আপনাদের ভাসুরঠাকুর হয়?  

তৃণমুল কেন করেছে আমি জানি না। আমাদের হেল্পডেস্ক কেন চলেছে আমরা জানি। সি পি আই এম হেল্পডেস্ক চালিয়েছে, যাতে একজন  বৈধ ভোটারের নাম-ও ডকুমেন্টাল মিসম্যাচের কারণে বিজেপির ইলেকশন কমিশন না কাটতে পারে৷ এবং একি সাথে ভুয়া ভোটার (ডেড সিফটেড ডুপ্লিকেট) যাতে সরানো সম্ভব হয়।(আমাদের তথাকথিত প্রবল বামেদের এতে অসুবিধে আছে। কেন ভুয়া ভোটার কমবে?)   তৃণমুল কিছুদিনেই বুঝে যায় যে এই একি কাজ তাদের ও করতে হবে, এবং রীতিমতো এপ নামিয়ে এই কাজ করে। তো তার ফলস্রুতিতে ৫৮ লাখ ভুয়া নাম বাদ যায়, যার মধ্যে বেশির ভাগ অ বাঙালি। 
এই পুরো হেল্পডেস্ক প্রসেসে সি পি আই এম এস আই আর নিয়ে তাদের বিরোধিতা বজায় রাখে, এবং হেল্পডেস্ক ব্যবহার করে মানুষকে জানাতে কেন বিরোধিতা করা প্রয়োজন। 

মনে রাখবেন, এই অবস্থা পর্যন্ত, মানুষের বেশির ভাগ এস আই আর নিয়ে কোন অভিযোগ ছিল না। সং্খ্যালঘু অঞ্চলে প্রায় ১০০% ম্যাপিং ছিল।  এই পর্যায়ের পরে বিজেপি যখন দেখলো দেড় কোটি রোহিঙ্গার ফানুস ফেটে গেছে, যখন দেখল মতুয়ারা (যাদের সি এ এ র গাজর দেখানো হয়েছিল) তারাই সবচেয়ে বেশি এফেক্টেড, যখন দেখল ডুপ্লিকেট ভোটারের মধ্যে অবাংালি বিজেপির ভোটার বেশি, তখন তারা স্ট্র‍্যাটেজি পাল্টালো। 

২০০২ এর সাথে ম্যাপিং থাকলে কাউকে হিয়ারিং এ ডাকা হবে না, নিজেদের এই স্টেটমেন্ট কে নাল এন্ড ভয়েড করে দিয়ে, লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সির নাম লাখ লাখ মানুষকে আক্রমণ করা শুরু করলো। মূলত সং্খ্যালঘু মানুষ টার্গেট হলেও, সংখ্যাগুরুরাও আক্রান্ত হলেন। এবং একটা প্যাটার্ন ফলো হলে। যেখানে বিজেপি নেই সেই বুথে ভোটার কমাও।  এবার প্রতিটা দল-ই গিয়ার চেঞ্জ করল। এতদিন ডেপূটেশন, বক্তব্য,লিফ্লেট দিয়ে যে বিরোধিতা ছিল তা আক্রমনাত্মক হলো। সি পি আই এম একের পর এক বিডিও অফিস ঘেরাও করতে আরম্ভ করলো। 

এইবার সেইসব 'বামপন্থীরা' লাইন নামালেন,সি পি আই এম প্রথম থেকে বিরোধিতা করলো না কেন? এই ক্রনোলজি তাদের বোঝার জন্য। পিট সিগারের একটা গান আছে ,যার মূল কথা 'দেয়ার ইজ আ টাইম ফর এভ্রিথিং '।  আ টাইম ফর লাভ এন্ড আ টাইম ফর হেট। সি পি আই এম প্রথম থেকেই এস আই আরের বিরধিতা করেছিল।  সেন্সাস ছাড়া এস আই আরের প্রসঙ্গ, ভোটার লিস্টের সাথে নাগরিকত্ব জুড়ে ঘুর পথে এন আর সির প্রচেষ্টা, কারা কারা বিপদে পড়বে - সবটাই। কিন্তু এগসিস্টিং ফ্রেমওয়ার্ককে ব্যবহার করে আক্রমণ ভোতা করে দিতে পেরেছিল। মানুষের মধ্যে এস আই আর নিয়ে অসন্তোষ না থাকলে তো আন্দোলনের পারদ বাড়বে না। যখন আক্রমণ বেড়েছে তখন প্রতিরোধ ও বেড়েছে। 



না বোঝার মতো কঠিন কিছু নয়।

শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

বেলিফুলের সুবাস

রোদ তখনও মাঠের ওপর ট্যারচা হয়ে পড়ছে, পেছনের সাল গাছের নিচু ডালটার ওপর সে রোদ এক লাফে উঠে পড়লেই, এই নবম দশম শ্রেণীর কয়েকটি কিশোর সেদিনের মতো খেলা শেষ করে যে যার ঘরে ফিরে যাবে। দুপাশে সারি দিয়ে কমলা হলুদ রঙা কোয়ার্টার, সামনে একটা করে ফুল বাগান, হালকা বেলি ফুলের সুবাস। সেদিকে মন নেই রনির। চারিপাশে কোয়ার্টারগুলোর মাঝে কচি দেখে একটা খেলার মাঠ, সরস্বতী পুজো থেকে হাফ প্যাডেল সাইকেল শেখা, সবই এখানেই। আজকের খেলাটাও। রনির পায়ে ফুটবল, সামনে বুবুন। বাম পায়ের হালকা ভাজে বুবুন কেটে গেল, সামনে টুকুন। দুটো ছোট্ট ছোট্ট ডজ দিতেই টুকুন ধুলোয়, মাটিতে। সামনে অজয় আটকাতে আসতেই ওর দুপায়ের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়ে দিল রনি। সামনে ফাঁকা গোল। আর মাত্র একটা টাচ, ব্যাস! কিন্তু এটা কে? সামনে এটা কে! কাকে কাটাতে হবে! অনির সামনে ওরই বয়সী .... মেয়েটির নাম জানতে জানতেই আরো একটা বছর ঘুরে যাবে। নিশ্বাস যেন সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো। স্ট্যাচু হয়ে নিশ্বাস বন্ধ করে রনি যেন কয়েক যুগ স্থির হয়ে থাকল। ওদিকে বল তো পরে থাকলো দুজনের মাঝখানে, শুধু রনির হৃদয় টা লাব ডাব করতে করতে তিনটে চারটে ড্রপ খেয়ে মেয়েটির জিম্মায় চলে গেল। 

আসলে ওই আরেকটু দূরের কোয়ার্টার গুলো থেকে মার্কেটে যেতে হলে শর্টকাট এই মাঠের মধ্যে দিয়েই। তাই আরো কয়েকবার এই মাঠেই দেখা হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হলনা। আর নাম ঠিকানাটাও জানা হচ্ছেনা, হলনা। কাউকে জিজ্ঞেস করতেও ভরসা হয়না, যদি সবাই জেনে যায়। তারপর যদি ওদিক থেকে নাকচ হয়, তাহলে মুখ দেখাবার জায়গাটাও থাকবেনা। সাইকেল নিয়ে টই টই করে ঘুরেও আর তোমার দেখা নাই অবস্থা।

সেই পুজোতে ফাঁকা ফাঁকা মনমরা নবমীর দিন দুপুরে হঠাৎ সে! জিন্স পড়েছে বলে কেউ টিপ্পনী কাটলো, তাই ওদিকে তাকাতেই চোখে পড়ল। এবার অনেক কসরত করে ঠিকানাটা আন্দাজ করা গেল, চার নাম্বার স্ট্রিটের দশ বা বারো নাম্বার কোয়ার্টার। আরো মাস কয়েক লাগলো নাম জানতে, পলি। ভালো নাম জানতে জানতে মাধ্যমিকের রেজাল্টও বেরিয়ে গেল। 

একই স্কুলের দুই শিফটে দুজনের ইলেভেন টুয়েলভ, তাও দেখা হয়না কোথাওই। টিউশনও আলাদা জায়গায়। দুবছরে অনেক লেবার দিয়ে বার চারেক দেখা হল, আর প্রত্যেকবারই দেখামাত্রই শ্বাস প্রশ্বাস পুরোপুরিই বন্ধ। এর মধ্যে অল্পবিস্তর নোট থেকে শুরু করে ক্লিফ রিচার্ডসএর ক্যাসেট বা আর্চিস কার্ড আদান প্রদান, প্রদানই মূলত। 

এগারো বারো শেষ। রনি চলল ইঞ্জিনিয়ার হতে সেই সুদূর দক্ষিণে, পলি চলল ডাক্তার হতে। দুজনেই নিজেদের শহর ছেড়ে নতুন জায়গায়। ভবিষ্যত গড়তে। রনির পুজোর ছুটি বলে কিছু নেই। চিঠিতে কার্ডে বলার চেষ্টা করেছে এই কয় মাসে, কিন্তু কোনই উত্তর নেই! সেমিস্টারের শেষে প্রায় ছয় মাস পরে ফিরেই ছুটলো পলির বাড়িতে, যা থাকে কপালে, বলেই দেবে, আর তো জমিয়ে রাখা যাচ্ছেনা নিজের কাছে।

 অনেক চেষ্টা করেও রনি আর খুঁজে পেলনা পলিকে। ওরা এই কোয়ার্টার ছেড়ে চলে গেছে। কোথায় গেছে, অন্য কোয়ার্টারে নাকি অন্য শহরে, কেউই বলতে পারলোনা। বন্ধুদের মাধ্যমে কলেজে খোঁজ নিয়েও চেষ্টা কম করেনি রনি। কিন্তু যেন, হওয়ায় উবে গেছে পলি, কোত্থাও কিছুতেই দেখতে পাওয়া গেলনা। তারপর চার বছর ধরে প্রতিবার বাড়ি ফিরে চেষ্টা করে গেছে একবার যোগাযোগ করতে, কিন্তু দেখা হয়নি। বলাও হয়নি।



এইভাবেই রনি আর পলি, দুজনের রাস্তা  সমান্তরাল ভাবে এগিয়ে চলল, কিন্তু আর একসাথে হলনা। তখনও অরকুট ফেসবুক মোবাইল আসেনি, এসব থাকলে কি আর এরকম দশা হত।

ইঞ্জিনিয়ারিং আর এমবিএ করে, প্রভাব প্রতিপত্তি আর প্রতিষ্ঠার পেছনে ছুটে গেল সারা জীবন। শুধুই সামনের দিকে তাকিয়ে ছুটে চলা, পেছনে তাকানোর অবসর আর কই। অল্প বয়সেই মা বাবা কে হারানোর জন্যে, বিয়েটাও করা হয়ে উঠলনা। তবে রনি হয়ে উঠলো রনজয় দাশগুপ্ত।

পলিও জানতে পারেনি কোনোদিন। মনের মধ্যে একটা নরম স্মৃতিটুকু শুধু কাছ ছাড়া করেনি। পরীক্ষার পর পরীক্ষা, দিন রাত্তির খাটনি, নিরন্তর ঘাড় গুঁজে কাজ করতে করতে, কখন যে কিভাবে বিয়েটা না হয়ে গেলো, টিকলো না, তবে হয়ে উঠলো ডাঃ পৌলমী সেন।

পলি আর রনি একটু সুসময়ের খোঁজে জীবনের ঝড় ঝঞ্ঝা রোদ বৃষ্টি গুলো সইতে সইতে শুধুই সামনের দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেছে। মনে মনে হয়তো চেয়েছিল দুদণ্ড শান্তি। মুখোমুখি, কথা বলার, চেনার, চেয়ে থাকার!

আগামী কাল রনির বড় সার্জারী। এ্যানেসথেটিক চেক আপ আজ সকালেই। ডাক্তারের নামটা দেখেই পেটের ভিতরে ফুরফুরিয়ে কয়েকটা প্রজাপতি উড়তে থাকলো! দুজনের দেখাও হলো। বেলিফুলের সুবাস কি এতগুলো বছর পেরিয়ে ভেসে এলো? অন্তত সাইতিরিশ বছর পর! সার্জারির আগের দিন সন্ধ্যে বেলা কেবিনে বসে দুজনে কথা বলল! প্রাণ খুলে। পরের দিন রনির সার্জারীও হয়ে গেল। রনজয় দাশগুপ্ত কে সার্জারী করেছিলেন, না ডাঃ পৌলমী সেন নন, অন্য একজন ডাক্তার।

পুরোনো বন্ধুরা আলোচনা করছিল, শুধু জানা হলনা রনি আর পলি কি দুজনে দুজনকে সত্যি ভালবেসেছিল? দুজনে দুজনকে বলতে পেরেছিল? দুজনের কি দেখা হয়েছিল আর, সম্ভবই না।

কারণ, সেদিন হাসপাতালে ওদের দেখা তো হয়নি। পলি বহুবছর হল নেই, আর আজ থেকে রনিও নেই! তাই আজ আর জানার কোনো উপায়ও নেই! হায়রে কল্পনা, আর কল্পনা নিয়ে বাঁচা!

বৃহস্পতিবার, ১ জানুয়ারি, ২০২৬

হল্লা বোল ~ অরিজিত গুহ

দিল্লির সেন্ট স্টিফেন কলেজের ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রটি পড়াশোনার ফাঁকেই কিভাবে যেন জড়িয়ে পড়েছিল এসএফআই আর আইপিটিএ'র সাথে। পড়াশোনার পাশাপাশি চুটিয়ে চলত নাটকে অভিনয়। পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর যখন সিপিআই(এম) এর সদস্য পদ পেল তখন নাটকে অভিনয়ের পাশাপাশি শুরু হয়ে গেছে কবিতা লেখা, নাটক লেখা, বাচ্চাদের জন্য গল্প লেখা। 
    ৭০ সালের একটা পথ নাটক কাঁপিয়ে দিয়েছিল দিল্লি আর আশেপাশের অঞ্চল। একজন রাজা, তিনি যেখানেই যান, সাথে তাঁর সিংহাসনটা নিয়ে ঘোরেন। যদি কখনো সেটা বেহাত হয়ে যায় সেই ভয়ে।


     ইন্দিরা গান্ধীর কুর্সির প্রতি আশক্তিকে ব্যঙ্গ করে 'কুর্সি, কুর্সি, কুর্সি' নাটকটা নিউ দিল্লির বোট ক্লাবের লনে প্রতি সপ্তাহে অভিনীত হত। সেখান থেকেই উঠে আসে 'জন নাট্য মঞ্চ' বা সংক্ষেপে 'জনম' গ্রুপ তৈরি করার চিন্তা ভাবনা। 
    ৭৫ সাল অব্দি জনম একের পর এক পথ নাটক করে গেছে যেসব নাটকের মূল সুর ছিল শ্রমজীবী মানুষ৷ 
     সাধারণতই পছন্দ হয় নি শাসকদের। ৭৫ এ এমার্জেন্সি ঘোষণা করার পর দেশে সমস্ত রকম রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিটি বন্ধ করে দিতে হয়। সাথে সাথে রাজনীতির গন্ধ যেখানে রয়েছে সেসবও বন্ধ করতে হয়। স্বাভাবিকভাবেই জনমের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়৷ সেই সময়ে ইংরেজির অধ্যাপক হিসেবে গাঢ়োয়াল ইউনিভার্সিটিতে যোগ দেন সফদার হাশমি। 
     এমার্জেন্সি উঠে যাওয়ার পর আবার ফিরে আসেন মানুষের মাঝে রাস্তায়। শুরু হয় 'আওরত', 'মেশিন' ইত্যাদির মত যুগান্তকারী পথ নাটক।
   ১৯৮৯ সালের ১লা জানুয়ারি, বছরের প্রথম দিন, দিল্লির কাছে গাজিয়াবাদের ঝাণ্ডাপুরে লোক ভেঙে পড়েছে সিআইটিইউ আর কিষান সভার উদ্যোগে শ্রমিক আর কৃষকদের দুর্দশা নিয়ে তৈরি পথনাটক 'হাল্লা বোল' দেখার জন্য৷
    ইতিমধ্যে নাটকটার কথা ছড়িয়ে পড়েছে দিল্লি ছাড়িয়ে উত্তর প্রদেশের দারিদ্র্য সমন্বিত বিভিন্ন অঞ্চলে। খেটে খাওয়া মানুষ তাঁদের প্রতিদিনের লড়াইকে উঠে আসতে দেখছে নাটকের দৃশ্যে। কিন্তু মানুষকে এভাবে প্রভাবিত করলে যে কায়েমী স্বার্থে আঘাত লাগবেই! সেই কায়েমী স্বার্থের আঘাত তারা ফিরিয়ে দিল সফদারকে পিটিয়ে মেরে। 
    কংগ্রেসি গুণ্ডাবাহিনী নাটকের ওপর হামলা চালাল। গাজিয়াবাদ মিউনিসিপালিটি নির্বাচনে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী রামানন্দ ঝা এর সমর্থনে চলছিল সেই নাটকের শো৷ কংগ্রেসি প্রার্থী মুকেশ কুমারের গুণ্ডার দল নৃশংসভাবে পেটাল নাটকের দলকে। ঘটনাস্থলে সাথে সাথেই মারা গেল নেপালী অভিনেতা রাম বাহাদুর। সফদারকে ভর্তি করা হল রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালে। 
    সেই রাতে হাসপাতালে এসে হাজির হয়েছিল সফদারের বন্ধু সহমর্মীরা। হাসপাতাল লাগোয়া পার্ক আর বাস স্ট্যান্ড সেদিন ভরে গেছিল মানুষে। শুধু মানুষ আর মানুষ। সফদার হাশমির টানে ছুটে এসেছে সবাই। ছুটে এসেছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী, কিন্তু লোকের প্রবল বিক্ষোভে তিনি আর ঢুকতে পারেন নি ভেতরে।  মৃত্যুর সাথে লড়াই করে পরদিন মারা যান সফদার। থেমে গেছিল কালের কন্ঠ। কিন্তু থামানো যায় নি হাল্লা বোলকে। দুদিন পর সেই একই জায়গায় সফদারের বন্ধু কমরেড ও স্ত্রী মলয়শ্রী হাশমি কমরেডের মৃত্যু শোক নিয়েই মঞ্চস্থ করেন হাল্লা বোল। 
   সফদার বা সফদারদের আসলে মৃত্যু হয় না। যতই ১লা জানুয়ারি আসুক, সফদাররা মরবে না। ওরা বেঁচে থাকবে কলে কারখানায় ক্ষেত খামারে। 

   সফদারের স্মৃতিতে আনন্দ পটবর্ধন একটা কবিতা লিখেছিলেন, সেই মূল কবিতা আর তার অনুবাদটা এখানে দিলাম।

'বাবরি মসজিদ ভাঙতে তুমি দেখো নি
তুমি দেখো নি তার পরের হিংসা আর ঘৃণাকে
তুমি রামাবাঈ আর অন্যান্য দলিতের মৃত্যু দেখো নি
পরমাণু বোমার জন্য দেশের আকুলতা তুমি দেখো নি
২০০২ এ গুজরাটের সাম্প্রদায়ীক হিংসা তুমি দেখো নি
প্রতিবেশি পাকিস্তানে তালিবানের উৎপত্তি তুমি দেখো নি
আর এখানে তুমি হত্যাকারীর রাজ্যাভিষেক দেখো নি
আমরা যারা এখনো বেঁচে রয়েছি তারা এগুলো সব দেখেছি
কিন্তু তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না।'

"So you missed the demolition of the Babri Masjid
And the violence and hate that followed
You missed Ramabai and other Dalit massacres
You missed your nation's love for the atom bomb
In 2002, you missed the Gujarat pogrom
And in neighbouring Pakistan you missed
The creation of the Taliban and here
This year you missed the coronation of killers

We who survived you missed none of these
We missed you."

কমরেড সফদার হাশমি অমর রহে