বুধবার, ১৮ আগস্ট, ২০২১

১৫ই আগস্ট ও গিরিশ চন্দ্র সেন ~ শুভাশীষ মোদক চৌধুরী


পনেরই আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালনের জন্য যা আমরা ভুলে যাই বলে মনে করি - তা হল অরবিন্দের জন্মদিন, কিন্তু সত্যি সত্যি ভুলিনা । যেটা ভুলে যাই তা হল গিরিশ সেনের মৃত্যুদিন । 

উনি কে ছিলেন, কেন মনে রাখবো, ইত্যাদি ইত্যাদি লেখার আজকাল আর কোনো প্রয়োজন নেই । কারন: যার ইচ্ছে, সে এখুনি একটু Google করতে পারে, আর যার ইচ্ছে নেই তার তো অন্য কাজ রয়েইছে । উনি অনেক কিছু করেছিলেন । কিন্তু যার জন্য ওনাকে কেউ কেউ হয়ত মনে রেখেছে, এবং যার জন্য এই post এর অবতারণা, তা হল: উনিই ছিলেন কোরান এর প্রথম (এবং তর্ক সাপেক্ষে সবচেয়ে ভাল) বাংলা অনুবাদক ।

এসব আমরা ছোটবেলায় পড়েছি, ভুলেও হয়ত যেতাম - যদিনা ওই বই এর এক খন্ড আমার ISI হোস্টেলের লাইব্রেরীতে থাকতো ।  প্রায় এক বছর আমার দায়িত্বে ওই লাইব্রেরি ছিল, ফলে বই প্রচুর পড়তাম । তার আগে ওটার ভার ছিল কৌ বলে একজনের ওপরে (কেউ কেউ হয়তো চিনবে), সে ওই কোরান এর অনেক জায়গায় দাগ দিয়ে রেখেছিল । কৌ যেহেতু কড়া হিন্দু ছিল, তাই দাগ দেয়া জায়গাগুলো খুব একটা সুবিধের ছিলনা । কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, সে জন্য পড়তে কোনো অসুবিধে তো হয়ইনি, বরং চটপট পড়া হয়ে গিয়ে ছিল ।

এই গিরিশ সেনকে যে হিন্দুরা ভুলে যাবে এতে নতুনত্ব বা আশ্চর্যের কিছু নেই । তবে অবাক হতে হবে যদি ধর্মপরায়ন বাঙালি মুসলিমরা ভোলে । এক দিন তা দেখেই মজা পেয়েছিলাম - এবং এটা তারই রোমন্থন আর কি ...

আমার বিলেত বাসের প্রায় এক দশক হতে চলল । আমি সুযোগ পেলেই যাই লন্ডনের ব্রিক লেনে।  ওখানে অনেক বাংলাদেশী/ বাঙালি মুদিখানা, মিষ্টান্নভাণ্ডার, খাওয়াদাওয়া এবং সর্বোপরি  বই এর দোকান (যা এখন উঠে গেছে) আছে । তাই গেলে বাঙলার মাছ, সবজি আর বই কিনে ফিরি । যে গল্প বলছি, তা প্রায় তিন-চার বছর আগেকার । তখন বইয়ের দোকানটি ছিল বেশ ভাল - পশ্চিম এবং পূর্ব দুই বঙ্গেরই বই পাওয়া যেত, এবং ভয়ঙ্কর সিরিয়াস বই থেকে বটতলা - সব কিছুর যোগান ছিল । দোকানদার মানুষটি যদিও ছিলেন বেশ গম্ভীর, ফলে তার সাথে কথা বিশেষ হয়নি ।

একদিন আমি যখন বই ঘাঁটছি, এক বয়স্ক দম্পতি দোকানে এলেন এবং বাংলা কোরানের খোঁজ করলেন । ওনাদের বেশ ভূষাতেই বোঝা যায় ওনারা practicing মুসলিম। দোকানদার দু-এক কথায় জিজ্ঞাসা করলেন কি কারনে বাংলা কোরান দরকার (আমি বই এর স্তুপের অন্য দিক থেকে শুনে জানতে পারলাম যে, কোরান মূল ভাষা ছাড়া অন্য ভাষায় পড়লেও দোষ হয়) ! ওই দম্পতি বললেন যে তারা ভালো করে বোঝার জন্য বাংলা কোরান চান, কারণ এই বয়সে আর নতুন ভাষা শিখতে পারবেননা ।   

দোকানদার তখন বললেন যে তাহলে উনি গিরিশ চন্দ্র সেনের অনূদিত কোরান কিনতে বলবেন । তারপর কিছুক্ষন নিস্তব্ধতা । আমি উঁকি মেরে দেখি দম্পতি, যাকে বলে, বজ্রাহত । ওনারা জিজ্ঞেস করলেন অন্য 'ভালো' কিছু আছে কিনা । তাতে দোকানদার জানালেন ওটাই সবচেয়ে ভালো এবং মূলের প্রতি তন্নিষ্ঠ । আমি ক্রেতা ভদ্রলোকের মুখ দেখে বুঝলাম 'আতান্তর'  কাকে বলে ।

শেষে ক্রেতা বললেন যে - যার নামই কোনো দিন শোনেননি তার অনুবাদ করা বই কিনতে ওনার ইচ্ছে নেই, এবং অন্য কারোর অনুবাদ করা বই আছে কিনা দোকানদার যেন জানান । বেগতিক বুঝে দোকানদারও আরো দু তিনটে নাম জানালেন । সত্যি কথা বলতে কি, ওনাদের নামও ক্রেতা ভদ্রলোক কোনোদিন শুনেছেন বলে আমার মনে হলনা, তবে একটা বই কিনলেন শেষ অবধি ।


আমি আমার বই কেনার সময় দোকানদার ভদ্রলোকের সাথে একটু কথা হয় । উনি জানান যে - গিরিশ সেনের বইই উনি পড়েন কিন্তু ওটা বিক্রি করা খুব কঠিন, কারন বাঙালি (উনি হিন্দু মুসলাম কিছু বলেন নি) ওনাকে ভুলে গেছে ।

এইতো আরেকটা পনেরই আগস্ট চলে গেলো, আরেকটা প্রয়াণ দিবস । আমরা সত্যি ভুলে গেছি ব্রাহ্ম গিরিশ সেনকে: (আমার মতে) হিন্দুরা - উনি কোরান অনুবাদ করেছিলেন বলে, আর মুসলিমরা -  উনি মুসলিম না হয়েও কোরান অনুবাদ করেছিলেন বলে ।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন